kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

উ প ন্যা স

আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

হরিশংকর জলদাস

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১৬ মিনিটে



আমার মুক্তি আলোয় আলোয়

আরে! তিশা বউদি না? তিশা বউদিই তো! তাঁর তো এখানে থাকার কথা নয় এখন! তিশা বউদি তো চার বছর আগে মারা গেছেন! তাহলে! মৃত মানুষ এখানে কী করে! এই নিউ মার্কেটে! জনাকীর্ণ মানুষের মধ্যে! দুহাতের তালু দিয়ে চোখ ডলে নিল জয়দীপ। চোখ থেকে হাত সরিয়ে দ্রুত সামনের দিকে তাকাল। দেখল, বউদি বেশটুকু এগিয়ে গেছেন।

স্থান-কাল ভুলে প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠল জয়দীপ, বউদি, তিশা বউদি...।

বিজ্ঞাপন

এত ভিড় কোলাহলের মধ্যে ডাকটা বউদি শুনতে পেলেন বলে মনে হলো না জয়দীপের। কিন্তু জয়দীপ দেখল, পেছন না ফিরে ডান হাতটা একটু করে তুললেন বউদি। নিজের নাম পরিচিত কারো কণ্ঠে শুনতে পেলে মানুষ যেমন করে হাতটা তোলে।  

দ্রুত পায়ে বউদির দিকে এগিয়ে যেতে চাইল জয়দীপ। পারল না। তার সামনে যে বহু মানুষের ঠেলাঠেলি! ওদের এড়িয়ে-ছাড়িয়ে এত সিঁড়ি ডিঙিয়ে বউদি পর্যন্ত পৌঁছতে পারল না জয়দীপ। যখন ওই স্থানে পৌঁছল, বউদি নেই। হাওয়া।

হঠাৎ মাথা ঘুরে গেল জয়দীপের। পড়ে যেতে যেতে পাশের রেলিংটা ধরে ফেলল। শক্ত হাতে আঁকড়ে থাকল বেশ কিছুক্ষণ। মাথার মধ্যে তখন তার আঁকিবুঁকি। ইকড়িমিকড়ি।

কাকে দেখল সে? তিশা বউদিকেই তো! সে কি দেখতে ভুল করেছে? না না, ভুল করবে কেন? এত দিনের দেখা! এত দীর্ঘদিনের চিন-পরিচয়! সে কেন ভুল করবে বউদিকে চিনতে? না হয় পেছন দিক থেকে দেখেছে বউদিকে! দশ-বারোটা ধাপের দূরত্বেই তো ছিলেন বউদি! সেই হাঁটার ভঙ্গি, ধবধবে পায়ের গোড়ালি! সেই লাল শাড়ি! সামান্য পৃথুলা দেহ! সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পা ফেলে ফেলে সিঁড়ি ডিঙানো। না না, ভুল হতে পারে না জয়দীপের! সামনের দিক থেকে না দেখলে কী হবে, পেছন দিক থেকেও বউদি জয়দীপের এত দীর্ঘদিনের চেনা যে ভুল হতে পারে না। তাহলে! তাহলে চার বছর আগে বউদি যে মারা গেলেন বললে ভুল হবে, অনেকটা আত্মহত্যাই তো করলেন বউদি! খবর পেয়ে জয়দীপ সেই সকালে দেখতে তো গেছিল! অর্ধনিমীলিত চোখে খাটের ওপর চিত হয়ে শুয়ে ছিলেন বউদি। নিথর নিস্পন্দ। সেদিন যদি বউদি মারা যান, তাহলে আজকের মহিলাটি কে? হুবহু দেখতে দুজন মহিলা তো হতে পারে না!

আপনার কি শরীর খারাপ? এ রকম করে ঘামছেন কেন? আমি কি কোনো সাহায্য করতে পারি?

ঘোরলাগা চোখ দুটো তুলল জয়দীপ। বিভ্রান্ত অপ্রকৃতিস্থ চোখ। তার চোখ দেখে তরুণটি ভয় পেয়ে গেল। চট করে হাত ধরল জয়দীপের। নরম কণ্ঠে বলল, মনে হচ্ছে আপনি অসুস্থ বোধ করছেন। কোথায় যাবেন বলুন, আমি পৌঁছে দিই।

কিছু একটা বলতে চাইল জয়দীপ। কিন্তু মুখ দিয়ে বোধগম্য কোনো শব্দ বেরোল না। শুধু আঁ আঁ মতো অস্পষ্ট কিছু আওয়াজ বেরিয়ে এলো। বিপুল অবিশ্বাস্য অপ্রাকৃত কিছু দেখলে মানুষের মুখ দিয়ে যে রকম অবোধ্য শব্দ বেরোয়, ঠিক সে রকম।

তরুণটি আরো ভড়কে গেল। হাত ছেড়ে এবার জয়দীপকে বুকের কাছে টেনে নিল। ওই অবস্থায়ই দাঁড়িয়ে থাকল দুজন, নিউ মার্কেটের দোতলায়, একটেরে।

 

এখন জয়দীপ শুয়ে আছে। নিজের বিছানায়। চিত হয়ে। অঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। গোটা ঘর সুনসান। উৎকর্ণ হলে জয়দীপের শ্বাস-প্রশ্বাসের মৃদু শব্দ কানে আসছে শুধু।

দুই কামরার ছোট ফ্ল্যাট। ড্রয়িংরুম আর বেডরুম। বেডরুমের সঙ্গে ওয়াশরুম। ছোট্ট একটা কিচেন। যখন মন লাগে রাঁধে। নইলে হোটেল, ড্রাইফুড-ফলমূল। দিব্যি চলে যাচ্ছে জয়দীপের।

আগে বড় ফ্ল্যাটে থাকত। চট্টেশ্বরী রোডে। এখন জামালখান রোডের এই ছোট ফ্ল্যাটটিতে। শ্রেয়সী অর্ণবকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর বড় ফ্ল্যাটের প্রয়োজন ফুরিয়েছিল। কী হবে বড় ফ্ল্যাট দিয়ে? একটা মানুষের অত বড় ফ্ল্যাটের দরকার কী! এই ছোট ফ্ল্যাটটিতে অগোছালো জীবনকে গুছিয়ে নিতে চেষ্টা করে যাচ্ছিল জয়দীপ।

আজ বিকেলে ও রকম আচ্ছন্নতার মধ্যে তরুণটিকে ঠিকানাটা বলেছিল জয়দীপ। আজকালকার তরুণরা তো কেমন কেমন! ঝুটঝামেলা এড়াতে চায়। তরুণটি কিন্তু সে রকম ছিল না। তার ভেতরে কেন জানি দরদ জেগেছিল। হয়তো ওই সময় তার কোনো অসহায় আত্মীয়র কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। বেশ যত্ন করে জয়দীপকে ফ্ল্যাটে পৌঁছে দিয়েছিল তরুণটি। ওই ঘোরের মধ্যেই বিছানায় শুয়ে পড়েছিল জয়দীপ। তরুণটি দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। সেই থেকে ঘুমে আচ্ছন্ন জয়দীপ।

এখন রাত প্রায় এগারোটা। একটু নড়ে উঠল জয়দীপ। তন্দ্রাটা কেটে গেল তার। ওই সময় বড় একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো বুক চিরে। চোখ মেলল সে। চারদিক অন্ধকার। আলোর চেয়ে অন্ধকার ভালো— ভাবল জয়দীপ। প্রথমেই তরুণটির কথা মনে পড়ল জয়দীপের। সে তাকে বিছানায় শুইয়ে দিচ্ছে—এইটুকু পর্যন্ত মনে করতে পারছে। পরের কথা আর মনে পড়ছে না। ধড়মড় করে উঠে বসতে চাইল। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। শুয়েই থাকল। ভাবল, এতক্ষণ কি আর আছে ছেলেটা? নিশ্চয়ই দরজাটা টেনে দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কটা বাজে এখন? হঠাৎ ভাবল সে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেছে অনেককাল আগে, অনুমান করল জয়দীপ। থাক গে, যতটা বাজবে বাজুক। শরীরটা বিছানায় এলিয়ে রাখল জয়দীপ।

এই ঘরটির পশ্চিম দেয়ালে একটা জানালা আছে। ঘরের তুলনায় বেশ বড়। ওই জানালাটাই এই ঘরটির প্রাণ। মন যখন বেজায় খারাপ হয় জয়দীপের, ওই জানালার ধারে গিয়ে বসে। ফ্ল্যাটটি নবম তলায় বলে নিচের রাস্তাটি স্পষ্ট চোখে পড়ে। রাস্তা পেরিয়ে একটু দক্ষিণ-পশ্চিমে স্টেডিয়ামটি। যে রাতে খেলা থাকে, ফ্লাড লাইটের আলো এসে পড়ে জানালায়। জানালা পেরিয়ে ঘরের মেঝেতে আলোর কণাগুলো লুটোপুটি খায়। আজ আলো নেই। খেলা নেই বোধ হয়।

বিল্ডিংটির সোজা পশ্চিমে টিলা মতন। নানা গাছের ঠেলাঠেলি। টিলার গায়ে গায়ে নানা আকারের বিল্ডিং। ওগুলো নৌ অফিসারদের আবাসস্থল। নৌবাহিনীর উঁচুপদের অফিসাররা ওই ঘরবাড়িগুলোতে থাকে। চারদিক ঘেরা ওই জায়গাটা জয়দীপের ফ্ল্যাট থেকে বেশ মনোরম দেখায়। রাস্তা, স্টেডিয়াম, নৌ অফিসার্স কলোনি দেখে দেখে কোনো কোনো বেলা কাটিয়ে দেয় জয়দীপ।

একটা সরকারি কলেজে পড়ায় জয়দীপ। ওটা প্রধান কাজ নয়, তার প্রধান কাজ বাঁশি বাজানো—তাই বিশ্বাস করে জয়দীপ।

এই বাঁশির জন্যই তো শ্রেয়সীর সঙ্গে তার পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা।

নামকরা কলেজে ভর্তি হতে পেরেছিল জয়দীপ। এসএসসিতে ফার্স্ট ডিভিশন ছিল। ফার্স্ট ইয়ারে নবীনবরণের অনুষ্ঠান হচ্ছিল। হল ভর্তি স্টুডেন্ট। ছকবাঁধা প্রগ্রাম। দর্শক সারিতে প্রিন্সিপাল এবং অন্য শিক্ষকরাও ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করছিল     সিনিয়র এক দিদি এবং এক বড় ভাই। দুজনই স্মার্ট। উপস্থাপনা চমৎকার। কিছুক্ষণ আগে প্রিন্সিপালের বক্তব্য শেষ হয়েছে। এখন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নির্ধারিতরা যার যার পারফরম করে যাচ্ছিল। শিউলিদি ও মাসুদ ভাই অনুষ্ঠানে বৈচিত্র্য আনতে চাইল।

হঠাৎ নতুনদের একজনের দিকে তাকিয়ে শিউলিদি বলল, এই ভাই, তোমার নাম কী?

যাকে বলা, সে প্রথমে বুঝতে পারেনি। বুঝল যখন, উঠে দাঁড়াল।

শিউলিদি বলল, স্টেজে উঠে এসো।

ভ্যাবাচেকা খেল ছেলেটা। তারপর এক পা দুই পা করে এগিয়ে গেল।

কাছে গেলে শিউলিদি বলল, যা পারো, করে বা গেয়ে দেখাও।

ছেলেটি একটি কবিতা আবৃত্তি করল, কবি ময়ূখ চৌধুরীর।

এভাবে শিডিউলড প্রগ্রামের মধ্যে শিউলিদি আর মাসুদ ভাই নবীনদের ডেকে নিতে লাগল। নবীনদের কেউ কেউ ভড়কে গিয়ে জড়সড় হয়ে থাকল। আবার কেউ কেউ আবৃত্তি-গান-কৌতুক-নকশা-হরবোলা ইত্যাদি করে দিব্যি আসর জমিয়ে দিচ্ছিল।

দর্শক সারিতে মেয়েরা এক দিকে, ছেলেরা আরেক দিকে বসেছিল। জয়দীপ পেছনের দিকে বসলেও শ্রেয়সী সামনের দুই সারির পর বসেছিল। শ্রেয়সী দেখতে বেশ সুন্দরী। এ কারণে কি না জানি না, মাসুদ ভাইয়ের চোখটা শ্রেয়সীতে আটকে গিয়েছিল। তার দিকে আঙুল তুলেছিল মাসুদ ভাই।

বলেছিল, এই যে দিদি, তোমাকে বলছি, দুবেণির মেয়েটি, হ্যাঁ হ্যাঁ তুমি। তুমি এসো।

শ্রেয়সী তখন ডানে-বাঁয়ে তাকাচ্ছে। সে ভাবতেও পারেনি, তাকেই ডাকছে সিনিয়র ভাইটি।

এই সময় মাসুদ ভাইয়ের কণ্ঠ আবার শোনা গেল, আরে! এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাকে খুঁজছ? তোমাকেই তো ডাকছি! এসো, স্টেজে চলে এসো।

শ্রেয়সী বুঝতে পারল, সিনিয়র দাদাটি তাকেই ডাকছে। তার কুণ্ঠার অবধি থাকল না। আচমকা আহ্বানে ভীষণ ঘাবড়ে গেল সে। একে তো নতুন, তার ওপর নিজেকে গুটিয়ে রাখার মেয়ে শ্রেয়সী। নিজের চেনা বৃত্তের বাইরে বড় সংকুচিত হয়ে থাকে সে। মাসুদ ভাইয়ের ডাকে তার কুণ্ঠা আরো বেড়ে গেল।

কিন্তু মাসুদ ভাই নাছোড়। উঁচু গলায় বলল, এসো এসো। তাড়াতাড়ি এসো। তোমার পরে তো আরো অনেকে পারফরম করবে!

ভারি ভয়ে ভয়ে গুটিসুটি পায়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়েছিল শ্রেয়সী।

আরে, এত ভয় পাচ্ছ কেন? ভয়ের কিছু নেই। যা জানো, তা-ই করবে। নাচ-গান-আবৃত্তি বা অন্য কিছু। বলে মাউথপিসটা মুখের সামনে বাড়িয়ে ধরেছিল শিউলিদি। জিজ্ঞেস করেছিল, তোমার নাম কী ভাই?

শিউলিদির প্রশ্নের উত্তর দেবে কী শ্রেয়সী, ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছিল।

আরে আরে! তুমি ও রকম ভ্যাবাচেকা খাচ্ছ কেন! তোমার আগে আগে যারা গেয়ে গেল বা অভিনয় করে গেল, তাদের কেউ কি ভয় পেয়েছে বলো! পায়নি তো? ওরা যদি ভড়কে না যায়, তুমি যাবে কেন?

শিউলিদির কথায় বেশ কাজ হলো। শ্রেয়সীর ভেতরের কম্পনটা হঠাৎ করেই থেমে গেল। শিউলিদির হাত থেকে মাউথপিসটা নিয়ে স্পষ্ট গলায় বলল, আমার নাম শ্রেয়সী, শ্রেয়সী দেব।

এই তো বেশ। তা শ্রেয়সী, তুমি কী পারফরম করবে? সহজ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল মাসুদ ভাই।

আমি একটা গান করব। বলেই থেমে গিয়েছিল শ্রেয়সী। তখন অডিয়েন্সের দিকে চোখ পড়েছিল তার। দেখেছিল, সামনের সারির শিক্ষকরা এবং কয়েক শ ছেলেমেয়ে ওর দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। আবার ভয় পেতে শুরু করেছিল শ্রেয়সী।

বুঝতে পেরেছিল শিউলিদি। দ্রুত তার কাছে এগিয়ে এসেছিল। বলেছিল, মনোবল হারিয়ো না। যাদের দেখছ তুমি সামনে, তাদের অনেকেই কিচ্ছু জানে না। তুমি তো জানো। কী জানো? গান জানো। যে গান দিয়ে শিল্পীরা ভুবন জয় করে! গাও গাও। প্রাণ খুলে গাও। এখানে কেউ তোমার ভুল ধরবে না।

হারানো মনোবল আবার ফিরে এলো। কয়েক মুহূর্ত চোখ বুজে অপেক্ষা করল শ্রেয়সী। তারপর ধীরে ধীরে গাইতে শুরু করল ওরই প্রিয় একটি গান, যা কারণে-অকারণে গুনগুন করে গায় সে।

প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে,

বংশী বাজায় কে রে সখী বংশী বাজায় কে

আমার মাথার বেণি বদল দেব তারে আইনা দে

আমার মাথার বেণি বদল দেব তারে আইনা দে

প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।

 

যে পথ দিয়ে বাজায় বাঁশি যে পথ দিয়ে যায়

সোনার নূপুর পরে পায়,

আমার নাকের বেশর খুলিয়া দেব সেই না পথের গায়,

আমার গলার হার জড়িয়ে দেব সেই না পথের গায়।

যদি হার জড়িয়ে পড়ে পায়

প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে।

 

এইটুকু গাওয়ার পর আর তর সইল না দর্শক-শ্রোতার। তুমুল করতালিতে ফেটে পড়ল গোটা হলরুম। খালি গলায় গাওয়া গান। কোনো তবলা-ডুগির সংগত নেই। রেওয়াজহীন কণ্ঠে গাওয়া শ্রেয়সীর গান সবারই মন ছুঁয়ে গেল।

শ্রেয়সী তখন ঘামে জবজব। কোনো রকমে মাউথপিসটা শিউলিদির হাতে গছিয়ে দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এলো। ঘটনাটা ওখানেই শেষ হলো না। আরো অনেক দূর পর্যন্ত এগোল।

 

দুই.

মাসুদ ভাইয়ের কাজ যেন নবীনদের মধ্য থেকে পারফরমার খুঁজে বের করা। শ্রেয়সীর গানের সুরের রেশ তখনো কাটেনি। মাসুদ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, বেশ তো গাইল শ্রেয়সী! একেবারে বাজিমাত যাকে বলে সে রকম। এবার যে আসবে সে বেশ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, বুঝতে পারছি আমরা সবাই। তা এখন কে আসবে, মঞ্চে?

নবীনদের মধ্যে উসখুস শুরু হলো। পেছন দিকের একটা ছেলে, রোগা-পাতলা চেহারা, মাথা উঁচু করে সোজা মঞ্চের দিকে চেয়ে আছে। দৃষ্টি এড়াল না মাসুদ ভাইয়ের।

এবার তুমি এসো ভাই। ডান হাতের তর্জনীটা সামনে বাড়িয়ে বলল মাসুদ ভাই।

যাকে বলা সে নির্বিকার। সে বুঝল না যে তাকেই ডাকা হচ্ছে।

এবার মাসুদ ভাই গলা উঁচিয়ে বলল, তোমাকেই বলছি, লম্বা চুলের তোমাকে। না না, তোমাকে না। তোমার পাশের গৈরিক রঙের পাঞ্জাবি পরাকে বলছি। হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি চলে এসো। কী নাম তোমার?

ওখান থেকেই ভরাট গলায় তরুণটি বলল, জয়দীপ বসু।

তা জয়দীপ, তাড়াতাড়ি এসে পড়ো মঞ্চে। এতক্ষণ চুপ থাকা শিউলিদি আহবান  জানাল।

জয়দীপ উঠে দাঁড়াল যখন, সবাই দেখল, তার কাঁধে কাজ করা খদ্দেরের থলে। ওটা জয়দীপের ভাণ্ডার। কাগজ-কলম-বই-খাতা—সব ওখানেই থাকে তার। আর থাকে তার প্রিয় আড়বাঁশিটি।

অনেকটা হেলতে-দুলতে এগিয়ে গিয়েছিল জয়দীপ। মঞ্চে ওঠার পর শিউলিদি জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা জয়দীপ, কী পারফরম করবে তুমি?

শিউলিদির প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে কাঁধের থলে থেকে আড়বাঁশিটি বের করেছিল জয়দীপ।

শিউলিদির দিকে তাকিয়ে একেবারেই সহজ কণ্ঠে জয়দীপ বলেছিল, আমি বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে চাই।

আরে বাব্বা! এ তো ভারি মজার! গ্রেট! এতক্ষণ যারা পারফরম করল, তোমার মতো তো কেউ করেনি জয়দীপ! একেবারে বাঁশি! রাধার মনকে আউলাবাউলা করে দেবার বাঁশি! দেখি আজ ওই দর্শক সারিতে কোনো রাধাকে পাওয়া যায় কি না! সামনে যে প্রিন্সিপালসহ অন্য স্যাররা বসে আছেন, পরোয়া করল না মাসুদ ভাই।

জয়দীপ নির্ভয়ে বাঁশিটি ঠোঁটে ছোঁয়াল।

এক-দুবার ফুঁ দিল বাঁশিতে, ফুঁ-টা কাজ করে কি না পরখ করার জন্য। তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে শ্রেয়সীর গানটিই বাজাতে শুরু করল জয়দীপ—প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে। প্রতিটি শব্দ সুর হয়ে জয়দীপের বাঁশি থেকে বের হয়ে আসতে লাগল। শ্রোতাদের মনে হতে লাগল, এ বাঁশির সুরধ্বনি নয়, এ যেন শ্রেয়সীর কণ্ঠস্বর জয়দীপের বাঁশি থেকে ধ্বনিত হচ্ছে। সবাই যেন কুহকে আটকে গেল, জয়দীপের ঘোর-ধরানো বংশীধ্বনির কুহক। সম্মোহিত হয়ে সবাই শুনে গেল গোটা গানটি। সবাই নির্বাক নিশ্চুপ।

কী সুন্দর বাজাল জয়দীপ! সবাই বাকহারা! শ্রেয়সী হতবাক। একি কাণ্ড! কী অদ্ভুত অকল্পনীয় ব্যাপার! তার গাওয়া গানটাই হুবহু বাজিয়ে দিল জয়দীপ নামের ওই ছেলেটি! হুবহু কি! তার গাওয়া সুরের চেয়ে ভালো বাজাল তো সে! কী আশ্চর্য, কী তাজ্জব! নিজ সিটে বসে এ রকম করে বারবার ভেবে যেতে লাগল শ্রেয়সী।

জয়দীপের বাজানো শেষ হলে দর্শকদের মধ্যে হৈচৈ। আরো চাই, আরো বাজাতে হবে। রিকোয়েস্টের পর রিকোয়েস্ট। মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল জয়দীপ।

মাসুদ ভাই মিষ্টি হেসে বলেছিল, সবাই চাইছে যখন আরেকটা গান অন্তত বাজিয়ে শোনাও।

জয়দীপের কী হলো কে জানে, অস্বীকার করে বসল।

নরম কণ্ঠে বলল, আমার পরে আরো অনেকে পারফরম করবে। আজ থাক মাসুদ ভাই। তবে কথা দিচ্ছি, একদিন আপনাকে বাজিয়ে শোনাব।

মাসুদ মেনে নিয়েছিল জয়দীপের কথা। অন্য পারফরমারের প্রতি দৃষ্টি ফিরিয়েছিল মাসুদ ভাই।

জয়দীপ যে তার বাঁশিতে অন্য গানের সুর তুলতে পারে না, এমন নয়। অনেক গানের সুর তোলা আছে তার বাঁশিতে। তার পরও সেদিন অন্য কোনো গান সে বাজাল না। আসলে সে চাইছিল, দর্শকরা শ্রেয়সীর গানটাই কানে নিয়ে বাড়ি যাক। অন্য গান বাজালে ‘ওই শোন কদম্বতলে বংশী বাজায় কে’র রেশটা দর্শকের মন থেকে সরে যাবে।

সবার করতালির মধ্য দিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এসেছিল জয়দীপ। বন্ধুরা তাকে এমনভাবে স্বাগত জানাল, যেন সে দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডার।

প্রিয়া আর তপতী কাছের দুই বান্ধবী। ডানে-বাঁয়ে বসেছিল। জয়দীপের বাজনা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুই পাশ থেকে দুজনেই হইহই করে উঠেছিল, ছেলেটি তোর পরিচিত? বন্ধু? কত দিনের?

শ্রেয়সী যতই বলে না না, ও আমার পরিচিত নয়, ততই প্রিয়া-তপতী চেপে ধরে।

বল না তুই, কখন থেকে পরিচয়? তপতী বলে।

প্রিয়া বলে, কোথায় কোথায় ঘুরেছিস তোরা?

শ্রেয়সী মহা ফ্যাসাদে পড়ে গেল। কোনোভাবেই সে বান্ধবীদের বোঝাতে পারছে না, জয়দীপের সঙ্গে তার কোনো পূর্বপরিচয় নেই।

প্রিয়া একটু চপলা ধরনের। শ্রেয়সীর হাত চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে, চুমুটুমু খেয়েছিস তো? কে আগে দিয়েছে? তুই না ও?

প্রিয়ার কথা শুনে খেপে গেল শ্রেয়সী। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, কী আবোলতাবোল বকছিস প্রিয়া! বললাম না, আজকের আগে জয়দীপকে আমি দেখিইনি। ফাট্টামি থামা। অনুষ্ঠান দেখ। বলে শ্রেয়সী প্রিয়ার দিকে অসহায় ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকল।

সেদিন বান্ধবীরা থেমে গিয়েছিল। কিন্তু শ্রেয়সীর মন থামেনি। কে এই জয়দীপ? তার গাওয়া গানটিই বাজিয়ে দিল? লজ্জা করল না একটুও? অনুমতিও নিল না সে ওর কাছ থেকে! নির্লজ্জের মতো স্টেজে উঠে সুর তুলল—প্রাণ সখী রে ওই শোন কদম্বতলে...!

ভাবতে ভাবতে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল শ্রেয়সী। বান্ধবী প্রিয়ার ঠেলায় হুঁশে ফিরল। কিরে, ভেবলাকান্তর মতো ও রকম করে বসে আছিস যে! চল চল। দেখছিস না অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে!

বড় লজ্জা পেল শ্রেয়সী। ভাবতে ভাবতে কোন তেপান্তরে হারিয়ে গিয়েছিল সে! কখন শিউলিদি আর মাসুদ ভাই অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেছে, কখন স্যাররা চলে গেছেন, কখন হল্লাবাজিতে নবীনরা মশগুল হয়ে পড়েছে—কিছুই খেয়াল করেনি শ্রেয়সী।

উঠে দাঁড়িয়েছিল শ্রেয়সী। দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। আগে আগে বান্ধবীরা, পেছনে সে। হলরুমের বাইরে বড়সড় একটা চত্বর। বাঁধানো। স্থানে স্থানে বসার ব্যবস্থা। পুরনো দিনের বেশ কয়েকটি গাছ চত্বরজুড়ে। জায়গাটি ছায়া ছায়া। চত্বরে হলভাঙা ছাত্র-ছাত্রীদের হট্টগোল। দরজা থেকে কদম কয়েক এগিয়েছে শ্রেয়সী, ভিড় ঠেলে এগোতে যাবে, ধুম করে সামনে এসে দাঁড়াল জয়দীপ।

ভূমিকা ছাড়া একগাল হেসে বলল, স্যরি, আপনার গানটাই বাজিয়ে দিলাম।

মানে! থমকে দাঁড়িয়ে বলেছিল শ্রেয়সী।

জয়দীপ একটু জড়সড় ভঙ্গিতে বলল, মানে আপনার অনুমতি না নিয়ে আপনার গানটাই বাজালাম তো! তাই আপনাকে বলতে এলাম।

এই গানের স্বত্বাধিকারী তো আমি নই! গানের রচয়িতাও না আমি। যেকোনো জন চাইলে নিজের কণ্ঠে, বাঁশিতে, হারমোনিয়ামে, মাউথ অর্গানে গাইতে পারে গানটি। কী রকম যেন গরম হাওয়া শ্রেয়সীর গলায়।

সেটা আমলে না নিয়ে কৌতুকী কণ্ঠে জয়দীপ বলল, আপনি আমার আগে গাইলেন। দেখলাম দর্শক-শ্রোতারা মাতোয়ারা। সুযোগটা নিলাম আমি। ভাবলাম, আমার বাজানো খারাপ হলেও আপনার কণ্ঠের জৌলুসের জন্য আমার বাজনাটা উতরে যাবে।

এবার শ্রেয়সী হেসে দিল। কী যে বলেন না! কী দুর্দান্ত বাজালেন আপনি! আপনার বাঁশির সুরে সবাই প্রায় পাগলপারা।

আপনিও? আচমকা জিজ্ঞেস করে বসল জয়দীপ।

কী! কী বললেন? চমকে বলে উঠল শ্রেয়সী।

জয়দীপ হাসতে হাসতে বলল, ও কিছু না। একটু ঠাট্টা করলাম। আপনি কিন্তু অসাধারণ গাইলেন। কথা ঘোরানোর জন্য বলল জয়দীপ।

গানের গ-ও জানি না আমি। সা রে গা মা পা ধা নি-র কিছুই জানা নেই আমার। শুনে শুনে গলায় একটু তুলে নেওয়া এই যা।

তাতেই এই! ওস্তাদের কাছে শিখলে না জানি কী হবে! স্রেফ শুনে শুনে এমন গলা! অবিশ্বাস্য! বলল জয়দীপ।

শ্রেয়সী অভিমানী গলায় বলল, আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন, তাতে তো আমার কিছু আসে-যায় না! তবে সত্য এটা যে কারো কাছে শিখি না আমি, শিখিওনি।

তা বেশ বেশ। সংকুচিত কণ্ঠে বলেছিল জয়দীপ। মনে একটা বাসনা থেকেই গেল আমার।

কী বাসনা? হালকা কণ্ঠে জানতে চাইল শ্রেয়সী।

আপনার সঙ্গে এক মঞ্চে বাজানোর। আপনি গাইবেন, আমি বাজাব। আপনার গানে নাচল শ্রোতারা, আমার বাঁশিতে হাততালি দিল। দুজনের একসঙ্গে পারফরম্যান্সে দর্শক-শ্রোতা কী করে দেখার খুব ইচ্ছে রইল আমার। বলে জয়দীপ সেখানে আর দাঁড়াল না। দ্রুত ভিড়ে মিলিয়ে গেল।

দূরে দাঁড়িয়ে প্রিয়া আর তপতী পিটপিটে চোখে ওদের দিকে তাকাচ্ছিল। জয়দীপ সরে গেলে দুজন শ্রেয়সীর ওপর অনেকটা ঝাঁপিয়েই পড়ল।

কী হলো? কী বলল? প্রেম? প্রেম নিবেদন করল? তুই কী বললি? প্রস্তাবটা কেমন করে দিল রে? ম্যাড়মেড়ে গলায়, না গদগদ কণ্ঠে? তুই কী বললি? গ্রহণ করলি প্রস্তাবটা? কী সাহস, কী সাহস? প্রথম সাক্ষাতেই প্রেম নিবেদন? এ রকম হাজারো প্রশ্নে দুজন শ্রেয়সীকে পাগল করে ছাড়ল।

শ্রেয়সী যা কিছু বলতে চায়, থামিয়ে দেয় দুজনে। বলে, ওসব চুদুরবুদুর বলে আমাদের বুঝ দিয়ো না শ্রেয়সী। তুমি ডালে ডালে থাকলে কী হবে, আমরা হাঁটি পাতায় পাতায়। এসব পথ আমরা অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছি। আমাদের সঙ্গে কাওয়ালি মাইরো না। আসল কথা কইয়া ফ্যালাও।

সেদিন শ্রেয়সীর অনেক কষ্ট হয়েছে প্রিয়া-তপতীকে বোঝাতে যে আসলে ওরা যা ভাবছে, সে রকম কিছু নয়। শুধু গানের কথাই বলাবলি হয়েছে। বড় হতাশ হয়েছিল প্রিয়া-তপতী। তারা বড় আশা করেছিল, শ্রেয়সীর মুখে শুনতে যে জয়দীপ তার প্রেমে পড়েছে।

 

শ্রেয়সীর কণ্ঠের সঙ্গে জয়দীপের বাজানোর সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। দেড়-দুই বছর কেটে গিয়েছিল। প্রিয়া-তপতী এক দুপুরে যা ভেবেছিল, জয়দীপ-শ্রেয়সীর মধ্যে তা-ই ঘটে গিয়েছিল। ওরা আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছিল। সুর-ছন্দ-তাল তাদের কাছে একসময় গৌণ হয়ে গিয়েছিল। প্রধান হয়ে উঠেছিল দুজনের ভালোবাসাবাসি।

ওদের পৃথিবীতে ওরা দুজন ছাড়া বুঝি আর কেউ নেই। ও হ্যাঁ, নদী আছে। কর্ণফুলী নদী। কলেজ থেকে মিনিট পনেরো হাঁটলেই অভয় মিত্র ঘাট। কর্ণফুলীর পার বেয়ে ধাপে ধাপে জলের কিনারা পর্যন্ত নেমে গেছে। চওড়া ঘাট। অনেক দিনের পুরনো। ধাপগুলো আড়ে-দিঘেয় বেশ বড়। বয়সের ছাপ ঘাটের গায়ে। এই ঘাটে সকালে আসে পুণ্যার্থীরা। নদীজলে ডুব দিয়ে পূর্বমুখী হয়ে সূর্যদেবের উদ্দেশে ওঁ জবা কুসুম/সঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিং/ধ্বান্তারিং সর্ব/পাপঘ্নং প্রাণতোহস্মি দিবাকরম্, দুপুরে আসে স্কুল-কলেজ পালানো প্রেমিক-প্রেমিকারা, বিকেলে আসে বুড়ো-বুড়িরা। কাউকে বিমুখ করে না কর্ণফুলী।

জয়দীপ আর শ্রেয়সী যখন আসে, মুখের কথা ফুরিয়ে যায় তাদের। ভেতরের চোখ খুলে যায় দুজনের। ওরা নদীর প্রবহমানতা দেখে, নদীজলের যাত্রাপথ বেয়ে ওদের চোখ চলে যায় দূরদিগন্তে। দুজনেই তন্ময় হয়ে যায়। ভুলে যায় পরস্পরের অস্তিত্ব, ভুলে যায় সময়ের কথা।

একদিন জানাজানি হয়ে যায় শ্রেয়সী-জয়দীপের ভালোবাসাবাসির কথা। সবাই জেনে যায়, ওরা একদিন বিয়ে করবে।

 

তিন.

সিটি কলেজে চাকরিটা হলো তিশার।

ক্যান্ডিডেট কম ছিল না। বিশজন। শহরের কলেজ। সরকারি স্কেলে বেতন। প্রথম তারিখেই মাস-মাহিনা। প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী। সবার বাসনা সিটি কলেজের শিক্ষক হওয়ার।

পাঁচজনের কমিটি। প্রিন্সিপাল কমিটির চেয়ারম্যান। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন। ভাইস প্রিন্সিপাল ও সিনিয়র দুজন অধ্যাপক।

আধাঘণ্টার ইন্টারভিউতে সবাইকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছিল তিশা। রূপে ও কথনে সবাই মুগ্ধ হয়েছিলেন। অন্য ক্যান্ডিডেটদের টেক্কা দিতে পেরেছিল সে। চাকরিটা হয়ে গিয়েছিল তার।

 

তারপর অনেকটা বছর কেটে গেল। সরকার সিটি কলেজকে সরকারি কলেজ হিসেবে ঘোষণা দিল। সিটি কলেজ হয়ে গেল গভর্নমেন্ট সিটি কলেজ। তিশা প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেল।

এই সময়ে তার জীবনে অনেক ওলটপালট হলো। মীরা পিসি মারা গেলেন। মা সুদীপা এক সকালে আর ঘুম থেকে জাগলেন না। বাবা মুকুন্দ মুহুরি স্ত্রী হারিয়ে একেবারে চুপচাপ হয়ে গেলেন। বার্ধক্য হঠাৎ করেই জাপটে ধরল তাঁকে। এখন দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন। একা একা ডাইনিং টেবিলে বসেন। কোনো দিন ইচ্ছে জাগলে রুটি ছিঁড়ে মুখে দেন। ডিম পোচটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খান। আবার কোনো দিন এক টুকরা আপেল, এক কোয়া কমলা মুখে পুরে উঠে যান। মালতি-লক্ষ্মী এখনো তাঁকে ঘিরেবেড়ে আছে। যেদিন ইচ্ছে জাগেন, বাগানে ঘোরেন। কোনো সময় ফুলের গায়ে হাত বোলান, কোনো সময় ফুলগাছের গোড়ায় জল ঢালেন। আবার কোনো বিকেলে ছাদে উঠে হেলানচেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখ-মুখ দেখে মনে হয়, কিছু একটা ভাবেন তিনি। কিন্তু কী ভাবেন, কেউ জানে না। তাঁর ভাবনাটা কারো সঙ্গে শেয়ার করেন না তিনি।

হরিপদর মেরুদণ্ড সোজা থেকে বেঁকিয়ে গেছে। কুঁজো হয়ে লাঠি ধরে হাঁটে এখন হরিপদ। হাত পাঁচেকের বাইরে ভালো করে দেখতে পায় না। তার পরও প্রতিদিন থলে হাতে বাজারে যায়। বাবু যে সদ্য মাছ ছাড়া ফ্রিজের মাছ খেতে চান না! মতিলালও মুহুরিবাড়ি ছেড়ে যায়নি আর। এ বাড়ির ভালোবাসায় জড়িয়ে গেছে সে। বিয়ে করার সময় হয়ে ওঠেনি মতিলালের। বিকেল গড়ানো বয়সে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথা ভাবেনি কখনো মতিলাল। তিশা কখনো সন্তান নিয়ে, কখনো বা স্বামীসহ মুহুরিবাড়িতে আসে। গেট খুলে দিয়ে মিষ্টি করে হাসে মতিলাল। তারপর জোড়হাত কপালে ঠেকায়।

মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছেন দিদিমণি?

বাবার সঙ্গে এবেলা-ওবেলা কাটিয়ে ফ্ল্যাটে ফেরে তিশা।

মুকুন্দবাবু করুণ কণ্ঠে বলেন, তুই চলে আয় মা আমার কাছে। গোটা বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। তোরা এলে বাড়িটি ভরে উঠবে। তোরা ছাড়া আমার আর কেউ নেই রে মা! আগে মেয়েকে তুমি করে বলতেন। বুড়ো বয়সের নরম মন এখন। এখন তিশাকে তুই করে বলেন মুকুন্দবাবু।

তিশা বলে, তুমি তো তোমার জামাইকে চেনো বাবা। একগুঁয়ে। সম্মানজ্ঞান টনটনে। সে কি ঘরজামাই হয়ে এই মুহুরিবাড়িতে থাকতে আসবে?

ঘরজামাই হয়ে আসবে কেন নিখিল! ছেলে হয়ে আসবে! এই বাড়ি, আমার সহায়-সম্পদ যা আছে, সব তো তোর মা, তোদেরই তো সব কিছু! আমি মরে গেলে এই বাড়িতেই তো তোদের উঠে আসতে হবে!

তিশা কাতর গলায় বলে, মরার কথা বোলো না বাবা! তুমি চলে গেলে আমি বড্ড একা হয়ে যাব বাবা! বলতে বলতে চোখে জল এসে যায় তিশার। একটু থেমে ভেজা গলায় বলে, আমি আকারে-ইঙ্গিতে নিখিলকে বলেছি। শুনে কঠোর কণ্ঠে বলেছে, ঘরজামাইয়ের অপবাদ নিতে অনুরোধ করছ আমায়?

তুই কী বললি? উৎকণ্ঠিত মুকুন্দবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

বলেছি, বাবাকে দেখাশোনা করার তো কেউ নেই বাড়িতে! বাবার বয়স হয়েছে। একা একা থাকে। একাকিত্ব বাবাকে কষ্ট দেয়। আমরা গেলে বাবার একাকিত্বটা ঘুচে যাবে। অরিন্দমদের নিয়ে সময়টা আনন্দে কাটবে বাবার।

নিখিল কী বলল? জানতে চাইলেন মুকুন্দবাবু।

তিশা বলল, ওই এক কথা—ঘরজামাই হব না। বলে, তুমি তো যাচ্ছ এবেলা-ওবেলা বাবাকে দেখতে। প্রয়োজনে দু-এক দিন ছেলেদের নিয়ে থেকে যাবে। আপত্তি নেই আমার। আমি বুঝে গেছি বাবা, ও এবাড়িতে কখনো থাকতে আসবে না।

মেয়ের কথা শুনে মুকুন্দবাবুর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

তিশার দ্বিতীয় সন্তান জন্মেছে। এও ছেলে। অরিন্দমের পরে শুভেন্দু। তিশাই রেখেছে ছেলে দুটোর নাম। কী নাম রাখবে—জিজ্ঞেস করেছিল তিশা, নিখিলকে। অরিন্দমের তখনো নাম রাখা হয়নি। শুনে নিখিল বলেছিল, যা মন চায়, নাম একটা রেখে দাও। মানুষের জীবনে নামটা তো বড় নয়, কাজটাই বড়!

ফ্যালফেলে চোখে সেদিন স্বামীর দিকে তাকিয়ে থেকেছিল তিশা। রাগে-ঘৃণায় গা জ্বলে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত করেছিল। তারপর হঠাৎ ফোঁসানো কণ্ঠে হেসে উঠেছিল তিশা। এই হাসির সঙ্গে তিরস্কার-ক্ষোভ যে মিশে আছে, বুঝতে পারেনি নিখিল। তিশা প্রথম ছেলের নাম রেখেছিল অরিন্দম। দ্বিতীয় ছেলেরও। স্বামীকে জিজ্ঞেস না করেই দ্বিতীয় পুত্রের নাম রেখেছিল শুভেন্দু।

তিশা চেয়েছিল তার ছেলেদের নামের মধ্যে তার বাবা বেঁচে থাকুন। বাবার নামের ‘ন্দ’ তাই প্রত্যেক ছেলেদের নামের সঙ্গে জড়িয়ে দিয়েছিল তিশা।

অরিন্দম এখন সিক্সে, শুভেন্দু টুতে। বড়জন মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে, ছোটটি ফুলকি স্কুলে। অরিন্দম নিজে নিজে স্কুলে যেতে শিখেছে। নিজে নিজে মানে জয়িতার সঙ্গে যাওয়া-আসা করে অরিন্দম। জয়িতা পঞ্চম তলার জগমোহনবাবুর মেয়ে। একই স্কুলে এইটে পড়ে। সকালের যত সমস্যা শুভেন্দুকে স্কুলে পৌঁছানো। ফুলকি বেশি দূরে নয়, দশ মিনিটের পথ। ওই দশ মিনিটও ছেলের জন্য দিতে রাজি নয় নিখিল ভৌমিক। বলে, দশটায় ক্লাস আমার। নয়টায় ভার্সিটির বাসটা না ধরলে ক্লাসটা মিস করব আমি।

মনটা খিঁচড়ে যায় তিশার। বিরক্ত কণ্ঠে বলে, আমারও তো সোয়া নয়টায় ক্লাস। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা আসে। তা ছাড়া ক্লাসে ঢুকতে দেরি করলে প্রিন্সিপাল স্যার মুখ দেখে কথা বলেন না। তিনি বলেন, ক্লাস নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো এক্সকিউজ মানব না আমি। এখন তুমিই বলো, আমি কী করব? শুভেন্দুকে স্কুলে পৌঁঁছাব, না ক্লাসে অ্যাটেন্ড করব?

তিশার কথা শুনেও নির্বিকার থাকে নিখিল। তৈরি হয়ে নয়টার বাস ধরার জন্য বেরিয়ে যায়।

শুভেন্দুকে তৈরি করতে করতে পৌনে নয়টা বেজে যায়। নিজের খাওয়ার সময় হয়ে ওঠে না আর তিশার। একেবারে তৈরি হয়ে শুভেন্দুকে নিয়ে রাস্তায় নামে।

ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় তিশা। অরিন্দমকে উদ্দেশ করে বলে, বেরোনোর সময় দরজায় তালা দিয়ো। তালা বন্ধ হয়েছে কি না টেনে দেখো একবার। জয়িতা দিদির সঙ্গে যাবে।

অরিন্দম বলে, আমার ক্লাস তো দশটায় মা। আমি ঠিক সময়ে বেরিয়ে পড়ব। তুমি চিন্তা কোরো না।

যত সমস্যা শুভেন্দুকে স্কুল থেকে আনার ব্যাপারে। শুভেন্দুর ছুটি বারোটায়। আর দেড়টার আগে তিশা কলেজ থেকে বেরোতে পারে না। তিনটা পর্যন্ত কলেজে থাকার নিয়ম। বিভাগীয় প্রধান আবু তাহেরকে অনুরোধ-উপরোধ করে দেড়টার দিকে বেরোতে পারে। ফুলকিতে পৌঁছতে পৌঁছতে পৌনে দুটো। শুভেন্দু তখন নেয়েঘেমে একসা। ভয়ে মুখ শুকানো। মাকে দেখে ভ্যাঁ করে কেঁদে দেয় শুভেন্দু।

ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, মা, তুমি আসতে এত দেরি করো কেন? দেখো স্কুল থেকে সবাই চলে গেছে। একা একা আমার খুব ভয় করে মা। তুমি আরো তাড়াতাড়ি আসতে পারো না! কণ্ঠ বুজে আসে শুভেন্দুর।

দারোয়ান রহিম এগিয়ে আসে। বলে, ম্যাডাম, শুভেন্দু মনমরা হয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে। আপনি স্কুল ছুটির সঙ্গে সঙ্গে চলে আসবেন ম্যাডাম।

শুভেন্দু বা রহিম—কারো উত্তর দিতে পারে না তিশা। মাথা নিচু করে চুপ থাকে। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হতে থাকে তার।

একদিন সামনের ফ্ল্যাটের মৈত্র বউদির কাছে গিয়ে ভেঙে পড়ে তিশা, আমি আর পারছি না বউদি! সংসারটা আর সামাল দিতে পারছি না আমি! বলে ঝরঝর করে কেঁদে দেয় তিশা।

হরবালা বউদি বয়সী মহিলা। সংসারের ঝুটঝামেলা পেরিয়ে পেরিয়ে তাঁর বাষট্টি বছরে পৌঁছা। ব্যথা লাঘব হতে তিশাকে সময় দিলেন তিনি।

কিছুক্ষণ পর বললেন, কী হয়েছে?

তিশা ধীরে ধীরে বউদিকে সব কিছু খুলে বলে। নিখিলের সাংসারিক দায়িত্বে অবহেলার কথা, সন্তানদের প্রতি উদাসীনতার কথা বারবার করে বলে গেল তিশা। শেষে বলল, চাকরিটা বোধ হয় আর করতে পারব না বউদি!

হরবালা বউদি চটজলদি বলে উঠলেন, ওটা কী কথা! চাকরি ছাড়বে কেন? একটা সরকারি চাকরির মূল্য বোঝো তুমি? এ দেশে মেয়েদের চাকরি পাওয়া কত কঠিন, জানো না তুমি? চাকরি তোমায় ছাড়তে হবে না।

তাহলে! তাহলে কী করব আমি বউদি? স্কুল ছুটির পর ছেলেটি স্কুলের সিঁড়িতে বসে একা একা কাঁদে। বন্ধুরা নাকি শুভেন্দুকে সিঁড়ির ছেলে বলে খেপায়। ছেলেটির কান্না আমি সইতে পারি না বউদি।

মৈত্র বউদি এবার একটু গম্ভীর হলেন। মনে মনে কী যেন একটু ভাবলেন। তারপর হাসি হাসি মুখ করে বললেন, তুমি চাকরি ছাড়ার কথা ভাববে না একদম। কী করবে, সবার স্বামী তো আর এক রকম নয়! তোমারটা একটু স্বার্থপর হয়েছে। বিদ্যা জানে অনেক। পিতার দায়িত্ব জানে না। রয়েসয়ে নাও। তুমি এক কাজ করো। শেষে বললেন বউদি।

উদগ্রীব কণ্ঠে তিশা বলে, কী করব বউদি?

যেদিন যেদিন তোমার অসুবিধা হবে, আমাকে জানিয়ো। আমি গিয়ে শুভেন্দুকে নিয়ে আসব।

আপনি! আপনি নিয়ে আসবেন!

আমার কোনো নাতি থাকলে আনতাম না? মাত্র দশ মিনিটের পথ।

তা কী করে হয় বউদি! এই বয়সে আপনি রাস্তায় নামবেন? তা ছাড়া আপনার সংসারের কাজ...

তিশার মুখের কথা শেষ করতে দিলেন না হরবালা বউদি। বললেন, দুজন মানুষের সংসার আমাদের। কতই বা আর কাজ! তোমার দাদা আমাকে সারা দিন সাহায্য করে। যেদিন আমার অসুবিধা হবে, কামেশ্বরবাবু যাবেন শুভেন্দুকে আনতে। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন হরবালা বউদি।

এই দীর্ঘশ্বাস কেন, বোঝে তিশা।

তিশা শুনেছে, হরবালা বউদি আর কামেশ্বর দাদার ছেলে আছে একটা। বউ আর ছেলে নিয়ে এই ফ্ল্যাটেই থাকত সুগত। সুগত ডাক্তার। বউটাও ব্যাংকে চাকরি করত। ওই নাতিটিকে নিয়েই বুড়ো-বুড়ি খেয়ালখুশির দিন পার করতেন। বউদি সকালে নাতিটিকে তৈরি করে দিতেন, কামেশ্বরদা হাত ধরে ফুলকিতে পৌঁছে দিতেন। নিয়েও আসতেন তিনি। আসা-যাওয়ার পথে কত কী আবদার নাতিটির! সব আবদার পূরণ করতেন কামেশ্বরদা।

এক-দুই করে করে ফাইভে উঠল নাতিটি। ওদিকে সুগতর পসার হলো বেশ। রোগী বাড়ল, আয় বাড়ল। বউটিরও প্রমোশন হলো। বেতন বেড়ে গেল অনেক। চুপে চুপে শহরের ওপ্রান্তে বড়সড় একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলল সুগত।

ছুটির দিনের এক সকালে সুগত বলল, বাবা, খুলশীতে ফ্ল্যাট কিনেছি একটা। এখানে জায়গা হচ্ছে না আমাদের। নতুন ফ্ল্যাটে চলে যেতে চাই আমরা।

কামেশ্বর মৈত্র কিছু বলেননি সেদিন। স্তব্ধ হয়ে বসে ছিলেন। হরবালা বউদিও পাথর হয়ে গিয়েছিলেন।

ছেলেসহ নতুন ফ্ল্যাটে চলে গিয়েছিল সুগত আর দেবযানী।

পেনশনের টাকা দিয়ে দাদা-বউদির সংসার চলে যাচ্ছে। কিন্তু বুকের ব্যথা ছলকে ছলকে ওঠে দুজনের। বিশেষ করে নাতিটির জন্য তাদের কলিজা ছিঁড়েফেঁড়ে ছত্রখান হয়।

তার ছেলে শুভেন্দুর মধ্যে নিজের নাতিটিকে খুঁজে পেতে চান হয়তো বউদি, ভাবে তিশা।

বিগলিত কণ্ঠে তিশা বলে, আপনি আমাকে বাঁচালেন বউদি।

ও কিছু না। এ তো আমাদের দায়িত্ব। বুড়োদেরও সংসারের প্রতি দায় আছে। হোক না সে অনাত্মীয়! অনাত্মীয়ও কখনো কখনো আত্মীয়র বাড়া রে তিশা! বলে মাথা নিচু করলেন হরবালা বউদি।

 

 

চার.

এই সময়ের একদিন জয়দীপের সঙ্গে তিশা মুহুরির দেখা হয়।

বিসিএস করার পর নরসিংদী সরকারি কলেজে পোস্টিং হয়েছিল তার। তার আগে শ্রেয়সীর সঙ্গে বিয়েটা সেরে ফেলেছিল। শ্রেয়সীর বাপের বাড়ি থেকে কোনো আপত্তি ওঠেনি। মধ্যবিত্ত পরিবার। জয়দীপে সন্তুষ্ট ছিল। এর মধ্যে শ্রেয়সীর গ্র্যাজুয়েশনটা হয়ে গিয়েছিল। নরসিংদী কলেজে জয়েন করে দুই কামরার বাসা নিয়েছিল জয়দীপ। ওখানেই অর্ণবের জন্ম।

একদিন প্রমোশন হলো জয়দীপের। গভর্নমেন্ট সিটি কলেজে বদলি করা হলো তাকে। প্রিন্সিপালের রুমে জয়েনিংয়ের কাজ সেরে বাংলা বিভাগে এলো জয়দীপ। তেতলায় বিরাট পরিসর নিয়ে বাংলা বিভাগ। বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স পড়ানো হয়। আটজন শিক্ষক এখন বিভাগে। বিভাগীয় প্রধান এখন অর্ধেন্দু রুদ্র। আগের বিভাগীয় প্রধান আবু তাহের রিটায়ারমেন্টে গেছে। অর্ধেন্দু রুদ্র তিশার ইউনিভার্সিটি-ক্লাসমেট। এমএ পাসের সঙ্গে সঙ্গে বিসিএস দিয়ে অধ্যাপনায় ঢুকেছে বলে রুদ্র এখন অধ্যাপক। অনেকটা বছর পার করে বেসরকারি কলেজে জয়েন করেছে বলে তিশা অতটা এগোতে পারেনি। সহযোগী অধ্যাপক হবে হবে।

নিজের পরিচয় দিতেই অধ্যাপক রুদ্র জয়দীপকে স্বাগত জানিয়েছিল। বেশ কজন টিচার তখন টেবিলের চারপাশে। আখতার আহমেদ, রাশেদা রশিদ, খাদেজা বেগম, গোপাল দত্ত ও তিশা মুহুরি।

সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল অধ্যাপক রুদ্র। জয়দীপ পুরুষদের স্যার আর নারীদের ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে নমস্কার জানাল।

একই সম্ভাষণ তিশাকে জানাতে গেলে জয়দীপকে উদ্দেশ করে তিশা বলল, আমি কোনো ম্যাডামফ্যাডাম নই। আমাকে স্রেফ বউদি বলে ডাকবে। তিশা বউদি। বুঝলে খোকা।

তিশার কথা শুনে সবাই হেসে উঠল। শুধু জয়দীপ নিঃসাড় চোখে তিশার দিকে তাকিয়ে থাকল। কী ব্যাপার বাবা! ম্যাডাম শুনতে রাজি নন! বউদি ডাকতে বলছেন! এটা তো প্রটোকলের মধ্যে পড়ে না! তা ছাড়া আপনিটাপনি নয়! প্রথম কথাতেই তুমি! কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা! দ্রুত ভেবে গেল জয়দীপ।

তিশা ম্যাডামের কথা শুনে ভড়কে গেলেন তো? কদিন যাক, পরে আরো কত কী দেখবেন, শুনবেন! হাসতে হাসতে অনুচ্চ কণ্ঠে বলে গেল অধ্যাপক রুদ্র।

তুমিই বলো রুদ্র, ক্লাসমেট বলে সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তিশা অর্ধেন্দুকে তুমি করে বলে, নাম ধরে ডাকে, এত কচি একটা ছেলের ম্যাডাম হওয়া ভালো, না বউদি হওয়া সুখকর?

রাশেদা বলল, কী বলছেন তিশাদি! কচি ছেলে দেখলেন কোথায়? সহকারী অধ্যাপক জয়দীপবাবু!

তুমি কি একবার ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছ? এ রকম ঘোরলাগা চোখ, কোমল সরল চেহারা আর কারো দেখেছ তুমি? দেখোনি তো? তাইতো বলেছি, ওর বউদি হতে চাই আমি। চট করে জয়দীপের দিকে ফিরেছিল তিশা। বলেছিল, কী খোকা, কোনো আপত্তি আছে তোমার আমার দেবর হতে?

জয়দীপের আর কী করা! মাথা নত করে মিষ্টি মিষ্টি হেসে গিয়েছিল।

ধীরে ধীরে জয়দীপের সঙ্গে তিশার মধুর একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

চট্টেশ্বরী রোডে বাড়ি ভাড়া নিয়েছিল জয়দীপ। তিন রুমের ফ্ল্যাট। দুই বেড, এক ডাইনিং। বিশাল টানা এক বারান্দা। শ্রেয়সী সংসারটাকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছিল ওই ফ্ল্যাটে। বারান্দাজুড়ে নানা সাইজের টব। টবে টবে নানা রকম ফুল। শ্রেয়সীর ফুলগাছের দিকে টান। জয়দীপ ভালোবাসে নানা জাতের ক্যাকটাস আর বনসাই। অর্ণবকে সেন্ট মেরিজে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল জয়দীপ, ক্লাস টুতে। অর্ণবকে আনা-নেওয়ার ব্যাপারটা স্বামীতে-স্ত্রীতে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।

সিটি কলেজে পড়িয়ে অপার আনন্দ তখন জয়দীপের। ইন্টারমিডিয়েটে হৈমন্তী, বিলাসী—এসব গল্প পড়ায়, দ্বাদশে ব্যাকরণ। অনার্সে পড়িয়ে তার যত আনন্দ। ফার্স্ট ইয়ারে কপালকুণ্ডলা তো সেকেন্ড ইয়ারে দীনবন্ধুর নীলদর্পণ। মাস্টার্সে জীবনানন্দ পড়াতে গিয়ে নাটোরের বনলতায় বিভোর হয়ে পড়া। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে উত্তাল ব্যাকুলতা।

সেদিন সবাই বিভাগে। কলেজে দুপুর-বিরতি। কুদ্দুস সবার সামনে প্লেটে প্লেটে নাশতা দিচ্ছে।

তিশা নিমকিতে কামড় দিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, কী পড়াও?

উদ্দিষ্ট ব্যক্তি যে জয়দীপ, অন্যরা বুঝলেও জয়দীপ বুঝল না। গরম শিঙাড়ায় কামড় দিয়ে সবেমাত্র চোখ বুজেছে সে।

জয়দীপবাবু, শুনতে পাননি? আপনাকেই জিজ্ঞেস করছিলাম, ক্লাসে কী পড়ান আপনি? কৃত্রিম বিরক্ত কণ্ঠে তিশা জিজ্ঞেস করল আবার।

অ্যাঁ। বউদি আমাকে বলছেন? বিব্রত মুখে জানতে চাইল জয়দীপ।

আপনি ছাড়া এই বিভাগে আর কজন জয়দীপ আছে?

জয়দীপ বুঝতে পারল না তিশা বউদি হঠাৎ করে তাকে আপনি সম্বোধন শুরু করলেন কেন?

অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলল, কিছু বলছিলেন বউদি?

জিজ্ঞেস করছিলাম, ক্লাসে কী পড়াও তুমি? তিশার কণ্ঠ সিরিয়াস।

সবার সিলেবাস সবাই জানেন। আপনিও আমারটা জানেন আমি ক্লাসে ক্লাসে কী পড়াই।

আরে! তা তো জানি! তার পরও জানতে ইচ্ছে করছে কিভাবে পড়াও?

আপনি যে রকম করে পড়ান।

আরে খোকা, আজ চৌদ্দ-পনেরো বছর পেরিয়ে যাচ্ছে এই কলেজে পড়াচ্ছি। আমাদের কোনো নাম-খ্যাতি নেই। তুমি ছোকরা সেদিন এসে একেবারে বাজিমাত করে দিলে! অনার্স-মাস্টার্সের ছাত্র-ছাত্রীরা তো তোমার নামে পাগল দেখছি! তাদের মুখে মুখে তোমার জয়জয়কার!

এতক্ষণে তিশা বউদির প্রশ্নের মর্মার্থ ধরতে পারে জয়দীপ। উত্তরে কী বলবে ঠিক করতে পারে না।

আখতার আহমেদ বলে উঠল, আমিও ছেলেমেয়েদের মুখে শুনেছি, জয়দীপবাবু খুব ভালো পড়ান।

রুদ্রবাবু বলল, আরে, কার দেবর দেখতে হবে না!

ঠিক বলেছ তুমি রুদ্র, আমার দেবর বলেই জয়দীপের এত প্রশংসা ছাত্র-ছাত্রীদের মুখে।

আপনি যেমন রূপসী, আপনার দেবরটিও কম চৌকস তো নয় তিশাদি! রাশেদা বলল।

আপনি ঠিক বলেছেন রাশেদা, তিশার সৌন্দর্যের তুলনা নেই। হাসতে হাসতে অর্ধেন্দু রুদ্র বললেন।

তিশা বলল, সেই সৌন্দর্যে একদিন অনেকে হাবুডুবু খেয়েছে।

জয়দীপ ছাড়া বিভাগের সবাই জানে, রুদ্রবাবু আর তিশাদি অনার্সে এমএতে ক্লাসমেট ছিল। তিশার কথায় রহস্যের সন্ধান পেল তারা।

খাদেজা বেগমের মুখ আলগা। জিজ্ঞেস করল, কী ব্যাপার তিশাদি, কথার মধ্যে কিসের যেন গন্ধ পাচ্ছি!

প্রেমের গন্ধ পাচ্ছ!

মানে! রাশেদা বলে উঠল।

গোপাল দত্তর তর সইল না। দ্রুত বলল, শুধু প্রেমের? অন্য কিছুর নয়!

প্রেমপত্রেরও। চোখেমুখে চিকন হাসি ছড়িয়ে বলল তিশা।

সে কেমন? বলেন তিশাদি, আরে বলেন না তিশাদি! রুদ্রবাবু ছাড়া সবাই প্রায় সমস্বরে বলে উঠল।

থাক থাক তিশা। আর বলতে হবে না। দ্রুত বলে উঠল অর্ধেন্দু রুদ্র।

আরে ভাই, বলতে হবে না কেন? বলি একটু? তোমার চুল পাকতে শুরু করলে কী হবে, মন তো এখনো প্রেমবিলাসীই থেকে গেছে!

রুদ্র বলল, হাটে হাঁড়ি ভাঙবে নাকি?

ভাঙি একটু। হাঁড়ি থেকে যদি তোমার সেদিনের সেই কচি সবুজ মনটি বেরিয়ে আসে, মন্দ কী!

অর্ধেন্দু অসহায় মুখে বলল, এই বয়সে আর যৌবনের কথা টেনে এনে লাভ কী?

আছে লাভ। অল্প সময়ের জন্য হলেও বর্তমানের কষ্টটাকে ভুলব আমরা।

রাশেদা বলল, দুজনে কী সব বলে যাচ্ছেন, কিছুই তো বুঝতে পারছি না আমরা! তিশাদি একটু ঝেড়ে কাশুন না!

কী রুদ্র, কাশব? অর্ধেন্দুবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল তিশা।

আজ তুমি খেপেছ যখন, হাটে হাঁড়ি না ভেঙে ছাড়বে না। তবে ভাই আমার ইজ্জতের দিকে খেয়াল রেখে বলবে।

ধুত্তরি তিশাদি! আমার দম আটকে আসছে। তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন না। রাশেদা আবার বলল।

তিশা রুদ্রর ওপর থেকে চোখ না সরিয়ে বলল, লাইনটা কী ছিল যেন রুদ্র?

আহ্ তিশা! এসব কী? কৃত্রিম রাগ রুদ্রর কণ্ঠে।

তিশা হাসতে হাসতে বলল, উফ্, মনে পড়েছে।

গোপাল দত্ত বলল, কী মনে পড়েছে?

তোমাকে ছাড়া বাঁচব না আমি। সটান গোপাল দত্তর চোখে চোখ রেখে বলল তিশা।

গোপাল দত্তর কলজেটা ধক করে উঠল। বলে কী তিশা মুহুরি! বহুদিন ধরে তার কৃপাদৃষ্টি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে সে। মাসে মাসে নতুন নতুন জামা-প্যান্ট শুধু তিশার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই তো পরে আসে সে। এই যে প্রতিদিন ক্লিন শেভ করা, গায়ে বডি স্প্রে ছিটানো, নিত্যদিন দামি সেন্ট মাখা—সবই তো তিশার দৃষ্টি কাড়ারই জন্য!

এত দিনের ওই সব চেষ্টা বৃথা গেছে। আজ হঠাৎ না চাইতে জল! একেবারে চোখে চোখ রেখে বলা—তোমাকে ছাড়া বাঁচব না আমি। শরীরটা অসাড় হতে শুরু করল গোপালের। সত্যি! সত্যি তিশা তাকে এত ভালোবাসে? বাসে তো! নইলে বিভাগের এতজনের সামনে বলল কেন, তোমাকে ছাড়া বাঁচব না আমি!

গোপাল দত্তর মনের কথা অন্যরা বুঝতে না পারলেও তিশা বুঝে গেল। গোপালকে আরো একটু নিঃসাড় করতে ইচ্ছে করল তিশার।

বলল, তুমি যেন গোলাপের পাপড়ি, শীতসকালের ঘাসের শিশির, দিঘির অতলান্ত জলের মতো তোমার দুটো চোখ...

গোপাল দত্ত দ্রুত নিজের অজান্তে চোখ দুটোতে ডান হাতটা বুলিয়ে নিল।

গোটা বিভাগ ঠাহর করতে পারছে না, ঘটনাটা কোন দিকে যাচ্ছে। দুজনের অবস্থা বেশ কাহিল। একজন অর্ধেন্দু রুদ্র, দ্বিতীয়জন জয়দীপ। রাশেদারা নির্বাক চোখে তিশাদির খেলাটা দেখে যেতে লাগল।

লিখেছিল আমায়। গোপাল দত্তর দম আটকে যাবে আটকে যাবে সময়ে ধুম করে বলল তিশা।

কে? কে লিখেছিলেন তিশাদি? রাশেদা বলে উঠলেন।

আর কে? আমাদের ওই...। বলতে বলতে রুদ্রবাবুর দিকে তর্জনীটা তুলেছিল তিশা।

ব্যস, বহুত হয়েছে তিশা। আর না। আর এগোবে না। অর্বাচীন সময়ের কথা এখানে আর টেনে এনো না। কাতর কণ্ঠে বলে উঠল অর্ধেন্দু রুদ্র।

গোপাল দত্ত ছাড়া সবাই উচ্চৈঃস্বরে হেসে উঠল। যা বোঝার, সবাই বুঝে গেছে তখন।

গোপাল দত্তর কপালে-ঘাড়ে তখন জবজবে ঘাম।

ক্লাস শুরুর ঘণ্টা বাজে। সবাই উপস্থিত খাতা নিয়ে যার যার ক্লাসের উদ্দেশে রওনা দেয়। বসে থাকে তিশা আর জয়দীপ। এই পিরিয়ডে ওদের ক্লাস নেই।

জয়দীপ অভিমান ভরা কণ্ঠে বলে, আচ্ছা বউদি, আপনি এ রকম করেন কেন? এ রকম রঙ্গতামাশা করে আপনি কী ভুলতে চান?

জয়দীপের শেষের কথাটি শুনে চট করে মুখ তোলে তিশা। করুণ মুখে বলে, দুঃখ ভুলে থাকার জন্য এসব করি আমি।

কিসের এত দুঃখ আপনার? দেখে তো মনে হয়, আপনার মতো সুখী মাত্র কয়েকজন আছে এ দেশে!

বাইরেরটা দেখে সব সময় ভেতরটা বোঝা যায় না রে জয়দীপ! ছাইয়ের তলায় যেমন আগুন দগদগ করে, আমার আপাত সুখী চেহারার নিচে দুঃখ ধিকিধিকি করে রে জয়দীপ! ওই দুঃখ ভোলার জন্যই রঙ্গঠাট্টায় গা ভাসাই আমি।

সেদিন আর কথা বাড়ায়নি জয়দীপ।

 

পাঁচ.

হরবালা মৈত্র ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলেন।

তিশা তখন রান্নাঘরে। আটার খামির মাখছে। রুটি বানাবে। তিশার চোখে জল। ছুটির দিনে মূল দরজায় খিল দেওয়া হয় না। মৈত্রবাবুদের যেমন, তিশাদেরও তেমনি। শুভেন্দু গোটা দিন এবাড়ি-ওবাড়ি করে কাটায়। এখন এবাড়ির বিছানায় লুটোপুটি খাচ্ছে তো মুহূর্তেই ওবাড়ির কামেশ্বর মৈত্রর গলা জড়িয়ে ছড়া আওড়াচ্ছে—আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে। মৈত্রবাবুর ঘর যেন তারই ঘর। হরবালা দেবী আর কামেশ্বরবাবু অনাত্মীয়র দূরত্ব ঘুছিয়েছেন অনেক আগে। ছুটির দিনে বারবার এঘর-ওঘর করে বলে মৈত্রদের দরজায় খিল দেওয়া হয় না। একই অবস্থা তিশাদের দরজারও।

এখন কামেশ্বরবাবুর গা ঘেঁষে বসে শুভেন্দু রামায়ণের গল্প শুনছে। চা-পর্ব অনেক আগেই শেষ করেছেন হরবালা। রাতের বেলা ওবাড়ি থেকে হট্টগোলের আওয়াজ শুনেছেন তিনি। সেই থেকে মন উচাটন। কী হয়েছিল, জানতে খুব মন চাইছিল সকাল থেকে। কী করে যান তিনি ওবাড়িতে এখন? এখন তো নিখিল ঘরে আছে! আজ যে সরকারি ছুটির দিন! বুদ্ধপূর্ণিমা। বেশ কিছুক্ষণ দোনোমোনোতে ভুগলেন হরবালা দেবী। একবার ভাবলেন, শুভেন্দুকে জিজ্ঞেস করি—রাতে তোমাদের ঘরে এত হৈচৈ হলো কেন? মায়ে-বাপে ঝগড়া হয়েছে বুঝি? পরক্ষণেই মনে মনে ছি ছি করে উঠলেন তিনি। এ রকম কচি একটা শিশুকে মা-বাপের ঝগড়ার কথা জিজ্ঞেস করবেন তিনি! এ বড় অন্যায় হবে! তার চেয়ে নিজে যাওয়া ভালো। থাক না ঘরে নিখিল! ওর সামনে যে জিজ্ঞেস করবেন, তা তো নয়! তিশাকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করবেন। ওদের ঘরে তো তাঁর অবাধ যাতায়াত!

নিজের অজান্তে কেন জানি তিশাকে ভালোবেসে ফেলেছেন হরবালা। তাকে দেখলেই নিজের মেয়ে বলে মনে হয় তাঁর। তাঁর নিজের কোনো মেয়ে নেই ঠিকই, বাৎসল্য তো আছে! বুকের তলায় মেয়ের জন্য রেখে দেওয়া জায়গাটি বহুদিন খালি পড়ে আছে। সেই খালি জায়গাটিতে তিশাকে বসাতে বারবার ইচ্ছে করে কেন কে জানে? সুগতর বউ দেবযানী যেদিন ঘরে এলো, বুকটা টইটম্বুর হয়ে উঠেছিল বাৎসল্যে। ভেবেছিলেন, এইবার বুঝি মিটল মেয়ের জন্য হাহাকারটা! মিটেছিলও। মেয়ের অভাবটা দেবযানী ভুলিয়ে দিয়েছিল। সারা দিন মা মা! সে যে কন্যা, পুত্রবধূ নয়—এ কথাটা বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল দেবযানী। তারপর তো কেটে গিয়েছিল বেশ কটা বছর! দেবযানীর চাকরি হলো, ব্যাংকে। সুগতর পসার হলো। নাতি জন্মাল। মাঝেমধ্যে হরবালার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করত, তোমরা কে কোথায় আছ, দেখে যাও, ত্রিভুবনে আমার মতো, আমাদের মতো সুখী আর কেউ নেই। আমাদের সুগতর মতো অনুগত ছেলে আছে, দেবযানীর মতো শ্রদ্ধান্বিত পুত্রবধূ আছে। আর আছে কলজের টুকরা সাতরাজার ধন নাতিটি। এর বাড়া সুখের আর কী উপকরণ থাকতে পারে? আমি তৃপ্ত, আমার স্বামী কামেশ্বরবাবু সন্তুষ্ট।

কিন্তু আচমকা কী হলো কে জানে! সুখের নীড়টা ভেঙে তছনছ হয়ে গেল। সুগত একদিন বলল, নতুন ফ্ল্যাটে চলে যেতে চাই আমরা। বজ্রাঘাত তো আচমকাই নেমে আসে! বলেকয়ে তো কখনো আসে না! সুগতদের চলে যাওয়ার বজ্রাঘাতটাও হঠাৎ করে নেমে এসেছিল তাঁদের মাথার ওপর। কামেশ্বরবাবু ধীরস্থির মানুষ। ভেতরটা ঝলসে গেলেও বাইরের কাউকে টের পেতে দেননি। পুত্রের সপরিবারে তাঁদের ত্যাগ করে যাওয়াটাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছেন কামেশ্বরবাবু। কামেশ্বরবাবু মেনে নিলেও হরবালা দেবী মানতে পারেননি। বারবার কপালে করাঘাত করে জানতে চেয়েছেন, কোন পাপে সুগত আমাদের সঙ্গে এ রকম করল ঈশ্বর? একবারও তো বলল না, তোমরাও আমাদের সঙ্গে চলো! ফ্ল্যাটটা বিশাল বড়! তোমাদের থাকতে অসুবিধা হবে না কোনো!

কামেশ্বরবাবু হরবালার মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলেছেন, শান্ত হও হরবালা। ভুলে যাও। ভুলে যাও আমাদের একদিন সব কিছু ছিল।

সেই থেকে অতীতকে ভুলে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হরবালা দেবী। তাইতো তিশাকে কন্যার মতো করে, পুত্রবধূ দেবযানীর মতো করে আঁকড়ে ধরা! বেদনা যদি তাতে একটু কমে তাঁর! কমেছে তো! শুভেন্দু নাতির অভাব মেটাচ্ছে, তিশা কন্যা আর পুত্রবধূর তৃষ্ণা কমাচ্ছে। কেন যে তিশার জন্য বুকের তলায় এত ভালোবাসা-স্নেহ জমে গেছে, ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারে না হরবালা!

ভোর থেকেই ছটফট করছিলেন তিনি। রাতে কী এমন হলো যে তিশার কান্না শুনতে পেলেন! নিখিল তিশার গায়ে হাত তুলল নাকি! যতই ভদ্রলোক হোক, বউয়ের গায়ে হাত তুলতে তো কোনো পুরুষ মুহূর্তকাল দ্বিধা করে না! বউ পেটাতে তাদের অনেক সুখ! পিরিত-ভালোবাসা, রাতে দেহ চাটার কথা তখন পুরুষরা বেমালুম ভুলে যায়। নিখিলও তার ব্যতিক্রম হবে কেন?

ভাবতে ভাবতে আর স্থির থাকতে পারেননি হরবালা। তাড়াতাড়ি সকালের জলখাবার শেষ করেছিলেন। ওই সময় শুভেন্দু ছুটে এসে কামেশ্বরবাবুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। হাত ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলেছিল, গল্প বলো, রামায়ণের গল্প বলো। তিশা কামেশ্বরবাবুকে দাদা আর হরবালা দেবীকে বউদি ডাকে। সেই সুবাদে কামেশ্বরবাবু শুভেন্দুর জেঠা বা মামা হন। কিন্তু শুভেন্দু হরবালাকে ডাকে দিদুন আর কামেশ্বরকে দাদুন। কেউ তাকে বাধা দেননি। ভেবেছেন, এ মন্দ কী! শুভেন্দুর মধ্যে সুগতর পুত্রটিকে তো অনুভব করা যাচ্ছে!

শুভেন্দুর ঘন চুল এলোমেলো করে দিতে দিতে কামেশ্বরবাবু বলেছিলেন, কোথায় থেমেছিলাম যেন শুভ?

তুমি কোনো কিছু মনে রাখতে পারো না দাদুন। সব ভুলে যাও। কালকেই তো বললে! আজ ভুলে গেলে? কচি কণ্ঠে ধমকে গেল শুভেন্দু।

কামেশ্বরবাবু নিজের মাথা চুলকে গল্পকাহিনি মনে করার অভিনয় করলেন। পরে বললেন, নাহ! কিছুতেই মনে করতে পারছি না।

তোমার মাথাটা গেছে দাদুন! তোমাকে ডাক্তার দেখাতে হবে। তাড়াতাড়ি বলে উঠল শুভেন্দু।

তারপর বড়দের মতো চোখ পাকিয়ে বলল, আমি তোমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি। রামচন্দ্র সীতাকে নিয়ে অযোধ্যা থেকে বনের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। পেছন পেছন লক্ষ্মণ হাঁটছেন।

কামেশ্বরবাবু কৃত্রিম উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে বললেন, উ হো হো! মনে পড়েছে! মনে পড়েছে!

একটুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন, রাম-লক্ষ্মণ-সীতা তো হাঁটা দিল, ওদিকে অঝোর কান্নায় ভেঙে পড়লেন কৌশল্যা।

কৌশল্যা কে দাদুন?

রামের মা কৌশল্যা। একমাত্র পুত্র তাঁকে ছেড়ে বনবাসে যাচ্ছে দেখে কোন মা সহ্য করতে পারে বলো! সহ্য করতে না পেরে কৌশল্যাদেবী আকুল হয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।

ওদিকে যে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে হরবালা নামের আরেক কৌশল্যা কেঁদে উঠলেন, খেয়াল করলেন না কামেশ্বরবাবু। খেয়াল করলে বুঝতেন, রাম সুগত হয়ে কবছর আগে হরবালাকে কান্নার সাগরে ভাসিয়ে গেছে।

দ্রুত দরজার আড়াল থেকে সরে গেলেন হরবালা দেবী। চোখেমুখে ভালো করে জলের ঝাপটা দিলেন। তারপর সামনের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়ালেন।

কী করছ তিশা? আলতো কণ্ঠে বললেন হরবালা বউদি।

অ্যাঁ! বউদি আপনি! বাম হাতের পিঠ দিয়ে দ্রুত চোখের কোনা মুছে নিতে নিতে বলল তিশা।

এত বেলা পর্যন্ত কী করছ তুমি রান্নাঘরে?

আটা মাখছি। রুটি বানাব। ছেলেদের সকালের খাবার দিতে পারিনি এখনো। বিষণ্ন কণ্ঠ তিশার।

শুভেন্দুর কথা ভেবো না তুমি। ও ওখানে খেয়ে নেবে। সুগতর বাবা ওকে না খাইয়ে ছাড়বে না। অরিন্দম কোথায়?

ও ওর ঘরে পড়ছে। সামনে ওর পরীক্ষা।

আর নিখিল! অধ্যাপক নিখিলবাবু? ইচ্ছে করে কথার মধ্যে একটু আল রাখলেন হরবালা বউদি।

তৎক্ষণাৎ কোনো উত্তর দিল না তিশা। রুটি বেলা শুরু করল। বউদির দিকে ফিরল না সে।

দু-কদম এগিয়ে গিয়ে তিশার বাহু ধরলেন হরবালা বউদি। জোর করে নিজের দিকে ফেরালেন তিশাকে। ফিরিয়েই আঁতকে উঠলেন, একি! এ কী অবস্থা তোমার বাম গালের!

তিশা জবাব দিল না কোনো। ছলছল চোখে হরবালার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর বিচূর্ণ গলায় বলল, কী যেন একটা লিখবে। বাড়িতে পরিবেশ নেই। ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে চলে গেছে।

হরবালা বউদি বেলনটা তিশার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বললেন, তুমি স্নানঘরে যাও। বাসি কাপড় ছাড়ো। আমি আসছি। জোর করে তিশাকে রান্নাঘর থেকে বের করে দিলেন হরবালা বউদি।

স্নানঘর থেকে তিশা যখন ফিরে এলো, বউদি তখন টেবিলে জলখাবার দেওয়ার কাজ শেষ করে এনেছেন। অরিন্দমকে ডেকে এনে চেয়ারে বসিয়ে দিয়েছেন।

চোখের জল ফেলতে ফেলতে তিশা রুটি আর আলু ভাজি মুখে পুরেছে। নাশতা খেয়ে অরিন্দম নিজ ঘরে ফিরে গেছে।

মুখোমুখি চেয়ারে বসেছেন হরবালা আর তিশা।

হরবালা বউদি কিছুই বললেন না। শুধু অপলক চোখে তিশার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তিশার বাম গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ স্পষ্ট তখন।

অনেকক্ষণ পর দূরাগত কণ্ঠে তিশা বলল, সংসারটা বোধ হয় আর করতে পারব না বউদি!

ওভাবে বোলো না তিশা! সংসারে কত ঢেউ-তরঙ্গ ওঠে! ত্বরিত বললেন হরবালা বউদি।

বোবা নিয়ে ঘর করা যায়, অন্ধ নিয়ে ঘর করা যায়। মূর্খের সঙ্গেও সংসার করে অনেকে। কিন্তু স্বার্থপরের সঙ্গে ঘর করা যায় না বউদি।

হরবালা বউদি তিশার কথার মর্মার্থ ধরতে পারছেন না। রাতের কথা আর জানতে ইচ্ছে করছে না তাঁর। কী ঘটেছে, তা তো তিশার বাম গালে স্পষ্ট হয়ে আছে। এর পরও যদি জানতে চান একেবারে ভেঙে পড়বে মেয়েটা। এই সময়টাতে তিশাকে ভেঙে পড়তে দেওয়া যাবে না—মনে মনে ঠিক করলেন হরবালা বউদি। তিনি কথা ঘোরালেন।

বললেন, পঞ্চম তলার জে জগন্নাথবাবুকে চেনো তো তুমি? ইচ্ছে করে ভালো নামটি বললেন না বউদি।

ফিক করে একটু হেসে দিল তিশা। বলল, জানি, জগমোহনবাবুর জগন্নাথপ্রীতি দেখে সবাই তাঁকে জে জগন্নাথবাবু বলে ডাকেন।

হরবালা বললেন, গলায় তুলসীমালা, ঘরের মধ্যে ছোট্ট একটা মন্দির। সেখানে জগন্নাথদেবের মূর্তি। দুবাহু তুলে ক্ষণে ক্ষণে জয় জগন্নাথ বলে ধ্বনি। ধর্মপ্রাণ এই মানুষটি কী করে জানো?

তিশা কিছু বলে না। ফ্যালফেলে চোখে বউদির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

বউদি বেদনায় চুরচুর কণ্ঠে বলেন, প্রতি রাতে মদ খেয়ে বাড়ি ফেরে। প্রতি রাতে বউ পেটায়।

তিশার দুচোখ বেরিয়ে আসতে চায়।

এই যে তোমার মাথার ওপর চারতলায় আজিজ সাহেব থাকেন, তাঁকে তো জানো তুমি? ছবুর সাহেবের জামাতা। আগে একটা বিয়ে আছে আজিজ সাহেবের। সেই ঘরের একটা ছেলেও আছে। ইউনিভার্সিটি শেষ করেছে। এই ফ্ল্যাটে ঢুকতে পারে না ছেলেটি। ছবুর সাহেবের মেয়ে আশা ঢুকতে দেয় না। বউয়ের কারণে ছেলেকে ভুলতে বাধ্য হয়েছেন আজিজ সাহেব। আশা স্বেচ্ছাচারী। তার চরিত্র সম্পর্কে নানা কথা কানে আসে। সাংবাদিক বলে আশা সম্বন্ধে আজিজ সাহেব আরো বেশি জানেন। কিন্তু বোবা হয়ে থাকেন। এটাকে কি নির্যাতন বলবে না তুমি?

ঘোরলাগা চোখে হরবালা বউদির দিকে তাকিয়ে থাকল তিশা।

বউদি আবার বলতে শুরু করলেন, ব্যক্তি হিসেবে পঞ্চম তলার স্বপন সোম সজ্জন। ধর্ম মানেন না ঠিক, মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। কোনো দিন কারো ক্ষতি করেছেন বলে শুনিনি। এ রকম লোকের সুন্দরী শিক্ষিত মেয়েটি স্বামীর ঘর করতে পারল না। জামাইটি অ্যাডিক্টেড। আর চারতলার সাজ্জাদ সাহেবের কথা শুনবে?

তিশা তার মুখের কথা হারিয়ে বসে আছে অনেক আগে। বউদির কথায় কোনো রকম মাথাটা ডান দিকে কাত করল শুধু।

হরবালা বউদিকে আজ কথায় পেয়ে বসেছে। বললেন, জুবিলি রোডে বিশাল এক ফিটিংসের দোকান আছে সাজ্জাদ সাহেবের। লাখ লাখ টাকার ব্যবসা। রাতে দোকান থেকে ফিরে নিজের ঘরে যান না তিনি। নিচে ওয়াচম্যানের চেয়ারে গভীর রাত পর্যন্ত বসে থাকেন। কেন জানো? নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিলেন বউদি, বউটা পাগল। বদ্ধ উন্মাদ যাকে বলে সে রকম। দুজন ছেলেমেয়ে। দুজনেই বড় হয়েছে। সাজ্জাদ সাহেবের দুর্ভাগ্য। ছেলেমেয়ে দুজনেরই মাথায় গোলমাল। তিনজনেই যখন-তখন আক্রমণ করে বসে সাজ্জাদ সাহেবকে। বলে নিশ্চুপ হয়ে গেলেন বউদি।

বহুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলেন, এখন বলো তিশা, এ জগতে কে সুখী? কে স্বস্তিতে আছে?

একটা ঢোঁক গিললেন বউদি। দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে বললেন, সংসারটা ভাঙার চিন্তা কোরো না তুমি। ছেলে দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দাও।

তিশার পাণ্ডুর গাল দুটো তখন চোখের জলে ভেসে যাচ্ছে।

 

ছয়.

আপনার কিসের এত কষ্ট বউদি?

বহুদিন ধরে জয়দীপ লক্ষ করে আসছে, তিশা বউদি ভেতরে ভেতরে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। গভীর এক যন্ত্রণায় তার চোখমুখ আচ্ছন্ন থাকে সর্বদা। চোখের নিচে আবছা যে ছোপ পড়েছে, চোখ এড়ায় না জয়দীপের। আগের উচ্ছ্বাস নেই তার কথাবার্তায়। নিত্যসঙ্গী চঞ্চলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তিশা বউদির! জিজ্ঞেস করবে করবে করেও জিজ্ঞেস করেনি এত দিন। হাজার হলেও শেষ পর্যন্ত তো সে তিশা বউদির অনাত্মীয়! যতই বউদি ডাকুক সে তিশাকে, বয়সের ফারাক তো একটা আছেই! তা ছাড়া বউদি একজন নারী, একজন অধ্যাপকের ঘরনি। সংসারে কত রকমের যে ঝুটঝামেলা, ভুল-বোঝাবুঝি, মতান্তর-মনান্তর! নিজের জীবনের দিকে তাকিয়েই তো বুঝছে সে! তিশা বউদির দাম্পত্যজীবনেও তো সে রকম মনোমালিন্য ঘটতে পারে! কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য বেশিদিন তো স্থায়ী হয় না! এক-দুদিনে মিটে যায় দাম্পত্য কলহ। কিন্তু বউদির ক্ষেত্রে তা তো দেখছে না জয়দীপ! তার চোখেমুখে ক্লান্তি-বিষণ্নতা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করে আসছে সে।

আজ দুজন শিক্ষক ছুটিতে। অন্যরা ক্লাসে গেছে। জয়দীপ আর তিশার ক্লাস পরের পিরিয়ডে। ডিপার্টমেন্ট ফাঁকা। নিজের চেয়ারটা বউদির কাছে টেনে নিয়ে সামনে ঝুঁকে মৃদু অথচ গভীর কণ্ঠে জয়দীপ জিজ্ঞেস করে বসল, আপনার কিসের এত কষ্ট বউদি?

চট করে মুখটা নামিয়ে নিয়েছিল তিশা।

অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল জয়দীপ। তিশা মাথাটা তুলল না। কাঁদছে বউদি? দ্রুত ভেবে নিল জয়দীপ। কাঁদছেই তো! নইলে শরীরটা ক্ষণে ক্ষণে কাঁপছে কেন? না, এই সময় তিশা বউদিকে আর কিছু বলা ঠিক হবে না।

মাথা তুলল তিশা। সজল চোখ দুটো জয়দীপের ওপর রাখল।

ব্যথাতুর কণ্ঠে বলল, বলা যাবে না।

কেন বলা যাবে না।

সব কথা কি সবখানে বলা যায়, না বলা উচিত?

মানলাম, সবখানে বলা যায় না। অন্তত ডিপার্টমেন্টে বলা উচিত নয়।

তাহলে!

কিন্তু বউদি, এই ডিপার্টমেন্ট ছাড়া তো আর কোথাও আপনাকে পাওয়া যায় না। বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি, আপনি একেবারে চুপসে গেছেন। আপনার চোখের কোণে কালি।

ঘরের কথা বাইরে বলতে চাই না আমি।

না বলুন। কিন্তু এটা তো ঠিক যে এক অসহনীয় কষ্ট কিছুদিন ধরে আপনাকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে।

বলতে চাই না জয়দীপ! আমি আমার কষ্টের কথা কলেজের কাউকে বলতে চাই না!

কষ্ট আপনজনের সঙ্গে শেয়ার করলে নাকি অনেকটাই লাঘব হয়। অবশ্য আপনি যদি আমাকে আপনজন ভাবেন!

তিশা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল, আমি আর পারছি না রে জয়দীপ! বলে একেবারে চুপ মেরে গেল তিশা।

নিজেকে সামলে নিয়ে মৃদু গলায় বলল, মা-বাবাকে খুশি করার জন্য অপছন্দের লোককে বিয়ে করেছিলাম। বিদঘুটে চেহারা। জিরাফের মতো লম্বা। আমার সঙ্গে বেমানান। তার পরও তাকে বিয়ে করেছিলাম, এই ভেবে যে তার একটা সুন্দর মন আছে। বলে থমকে গিয়েছিল তিশা।

জয়দীপ আর কী বলবে, চুপ করে থাকল। চোখমুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে সে বিব্রত বোধ করছে।

কার্যত তার কিছুই হলো না। নিখিলের মনটায় যেন তার কদর্য চেহারাখানারই ছাপ। নিজের স্বার্থ ছাড়া কিছুই বোঝে না নিখিল। লেখালেখি করবে, বই বেরোবে, নাম ছড়াবে—এ-ই যেন তার ধ্যানজ্ঞান। ঘরে দু-দুটো বাচ্চা। কারো দিকে খেয়াল নেই। কী পড়ে, কোন ক্লাসে পড়ে—খবর রাখে না। সেদিন রাতে বড় ছেলেটার শরীর খারাপ করল। বেশ কিছুদিন ধরে জ্বর হচ্ছিল তার। সে রাতে বাড়াবাড়ি। ডাক্তার ডাকতে বললাম। সাফ জানিয়ে দিল, ডাক্তারফাক্তার ডাকতে পারবে না। কথায় কথা বাড়ল। ধুম করে গায়ে হাত তুলে বসল নিখিল। বলতে বলতে তিশার চোখমুখ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।

জয়দীপ দ্রুত বলে উঠল, ঠিক আছে বউদি, যা বোঝার আমি বুঝে গেছি।

ঠিক এই সময় আখতার আহমেদ রুমে ঢুকল। দুজনকে মুখোমুখি দেখে বেশ চমকে গেল সে। কী একটা বলতে গিয়ে থেমে গেল।

মুচকি হেসে বলল, দেবর-ভাবি কাছাকাছি বসে কী এত ফুসুরফুসুর করছেন তিশাদি?

মনের কথা বলছি।

আমরা কী দোষ করলাম! আমাদের সঙ্গেও তো মনের কথা শেয়ার করতে পারেন!

আপনি বড্ড কালো রে ভাই! গোঁফে কলপ লাগিয়ে আরো বিশ্রী হয়েছেন! আপনার সঙ্গে মনের কথা বলা যাবে না।

আখতার আহমেদ কী বলবে দিশা পেল না। চেয়ারে বসতে বসতে বলল, জয়দীপবাবু বেশ সুন্দর। তার সঙ্গে মনের কথা বিনিময় করা যায়।

তিশা বউদি আগের অবস্থায় ফিরে গেল যেন। ত্বরিত বলল, যথার্থ বলেছেন, জয়দীপের সঙ্গে প্রেমও করা যায়।

জয়দীপ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, এসব কী বলছেন বউদি! মসকরা করে বলছেন, আখতার স্যার কথাটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে বসবেন। তখন ঠাট্টা আর ঠাট্টা থাকবে না বউদি।

তুমি রাখো তো ছোকরা! এই আখতার আহমেদকে আমার চিনতে বাকি আছে! একা পেয়ে উনি তো আমাকে জাপটে ধরেছিলেন একবার।

অর্ধেন্দু রুদ্র কক্ষে ঢুকতে ঢুকতে তিশার শেষ বাক্যটি শুনল। বলল, কে আবার তোমাকে জাপটে ধরল তিশা?

তিশা কাঁপা গলায় বলল, ব্যাপারটা সিরিয়াস রুদ্র। হালকাভাবে নিয়ো না। তোমাদের ওই সুবোধ অধ্যাপক আখতার আহমেদ যে ভেজা বেড়ালের মতো মুখ করে ডিপার্টমেন্টে বসে থাকে, একদিন একা পেয়ে এই রুমেই আমাকে জাপটে ধরেছিল।

আখতার আহমেদ উঠে দাঁড়াল। বলল, আমি যাই স্যার। পরে আসব। বলে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

রুদ্রবাবু ফ্যাকাসে গলায় বলল, আচ্ছা তিশা, এসব কথা যেখানে-সেখানে না বললেই কি নয়!

আমি কী করব বলো রুদ্র! কোথাও শান্তি পাই না আমি, কোথাও স্বস্তি পাই না। শুধু হায়েনার মতো হাত বাড়ায়! সবাই লোভী চোখে তাকায়! বিশ্বাস করো রুদ্র, আমি হতাশ, আমি বিপন্ন।

ম্লান একটু হাসল অর্ধেন্দু। বলল, তুমি ওভাবে বলছ কেন তিশা! সবাই তো তোমার দিকে লোভীর চোখে তাকায় না।

বেশির ভাগই তাকায়। নিজের ওপর বিতৃষ্ণা ধরে গেছে আমার। মাঝে মাঝে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।

শান্ত হও তুমি তিশা। ও রকম করে বোলো না।

তিশা কাঁপা কণ্ঠে বলল, কেউ ভালোবাসে না আমায়। ঘরে-বাইরে সবাই আমাকে শুধু ব্যবহার করতে চায়।

ঘরখানি বিষাদে ভরে গেল হঠাৎ। চারদিক সুনসান। তিশার শেষ কথাটি বাতাসে ভর করে সারা কক্ষে ভেসে বেড়াতে লাগল।

চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় তিশা। বড় একটা আমগাছ জানালার ধারে। সেখানে পাখির কিচিরমিচির।

হঠাৎ পেছনে ফেরে তিশা। বলে, তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করছিলে না জয়দীপ, আমার কিসের এত দুঃখ? এখন বুঝতে পারছ তো আমার কষ্ট শুধু ঘরে নয়, বাইরেও! যাদের সঙ্গে আমি চাকরি করি, যারা আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত, তাদের মধ্যেও আমি নিরাপদ নই। এখন তুমিই বলো, এত কষ্ট আমি রাখি কোথায়? কাকে বুঝিয়ে বুকের ব্যথা হালকা করি?

জয়দীপ কথা খুঁজে পায় না। ফ্যালফ্যাল করে তিশার দিকে তাকিয়ে থাকে।

বড় একটা শ্বাস ফেলে রুদ্রবাবুর উদ্দেশে তিশা বলে, জয়দীপের সঙ্গে আমার দুঃখকথা ভাগাভাগি করছিলাম, আখতার সাহেব কুইঙ্গিত করে বসলেন!

টেবিলের ফোনটা বেজে উঠল এই সময়। রিসিভারটা কানে তুলে নিল অর্ধেন্দুবাবু।

রিসিভারটা রাখতে রাখতে বলল, প্রিন্সিপাল ডেকেছেন। জরুরি মিটিং নাকি। তারপর তিশার দিকে তাকিয়ে বলল, এ-ই জীবনে রে তিশা! এই সংসারে তোমাদের অপমান-লাঞ্ছনার শেষ নেই। বলে মাথা নিচু করল অর্ধেন্দু।

তীব্র ক্রোধে চোখ দুটো জ্বলে ওঠে তিশার। এই ক্রোধ তাকে উন্মত্ত করে তুলছে। হঠাৎ জয়দীপের সহজ-কোমল মুখের ওপর চোখ পড়ে তার। তার মনে হলো, তার সামনে সৌম্যকান্তির এক দেবদূত বসে আছে। সেই দেবদূতের চোখে শান্ত থাকার আহবান । তার নির্লিপ্ত চাহনি, মৃদু হাসির ঔজ্জ্বল্য তিশাকে ঘোরে ফেলে দিল। তার ক্রোধ ধপ করে নিভে গেল। ক্রোধান্বিত অবয়বে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ হাসির মৃদু রেখা।

অর্ধেন্দু রুদ্র চলে গেলে জয়দীপ বলল, কুদ্দুসকে চা দিতে বলি বউদি।

তিশা বলল, বলো।

জয়দীপ দরজার দিকে গলা উঁচিয়ে বলল, কুদ্দুস, অ্যাই কুদ্দুস।

কুদ্দুস তখন দরজার বাইরে টুলের ওপর বসে ঝিমোচ্ছিল। স্যারের ডাক শুনে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়াল।

দ্রুত পায়ে রুমে ঢুকে বলল, স্যার।

তুমি এক কাজ করো কুদ্দুস, তাড়াতাড়ি গিয়ে বোস ব্রাদার্স থেকে দুটো বড় জিলাপি নিয়ে এসো। ও হ্যাঁ, একটা স্পঞ্জের মিষ্টিও আনবে। আর তিনটে শিঙাড়া আনবে। একটা তুমি খাবে, দুটো আমরা।

জে স্যার। কুদ্দুস বলল।

কী কী বললাম মনে থাকবে তো?

জে স্যার, থাকবে। বলে সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

তিশা বলে উঠল, এত খাবার কে খাবে জয়দীপ?

আপনি খাবেন বউদি। আমিও খাব। তিশা বউদি আর কথা বাড়ায় না বলে জয়দীপ চট করে প্রসঙ্গ পাল্টাল, আপনি কুদ্দুস সম্বন্ধে কিছু জানেন?

জানব না কেন? প্রায় সতেরো বছর ধরে সে এই বিভাগে চাকরি করছে। মাস্টার রোলে চাকরি তার। সামান্য বেতন। রাউজানের দিকে বাড়ি। নিজেকে হালকা করার জন্যই বোধ হয় তিশা এত কথা বলে গেল।

হেসে দিল জয়দীপ। বলল, এ ছাড়া আর কিছু?

না তো! আর তো কিছু জানি না! জানার আরো কিছু আছে নাকি!

জয়দীপ বলল, ছুটির পর ও বাড়িতে ফিরে যায় না। মাজারে পড়ে থাকে।

মাজারে পড়ে থাকে! তিশার চোখেমুখে বিস্ময়।

গরিবুল্লাহ শাহর মাজারে গোটা রাত পড়ে থাকে কুদ্দুস। সকালে উঠে মুখ-হাত ধুয়ে রাস্তার দোকান থেকে চা-নাশতা খেয়ে কলেজে আসে।

তুমি এত কিছু জানলে কী করে?

দীর্ঘদিন ধরে কুদ্দুসকে খেয়াল করছিলাম আমি। ধূলিধূসরিত জামাকাপড়। দাড়িটাড়িও কাটে না তেমন। কী রকম উসখুস চেহারা! একদিন চেপে ধরলাম তাকে। ভ্যাঁ করে কেঁদে দিল।

এই বয়সী মানুষটা কাঁদল?

কাঁদল তো! বিশ্বাস করবেন না বউদি, পরিবারের কথা জিজ্ঞেস করায় আকুল হয়ে কেঁদে উঠল কুদ্দুস!

কেন কাঁদল কুদ্দুস?

জয়দীপ বলল, তিন-তিনটে ছেলে তার। তিনজনকেই বিয়ে করিয়েছে। বেশ কবছর হলো কুদ্দুসের বউ মারা গেছে। বেতনের টাকা তিন ছেলে এটা-ওটা বলে হাতিয়ে নেয়। খাওয়ানোর দায়িত্ব নেয় না কোনো বউ। একদিন মনের দুঃখে ঘর ছাড়ে কুদ্দুস। সেই থেকে মাজারে মাজারে রাত কাটায়। দিনটা কলেজে।

আহা রে বেচারা! গাঢ় কণ্ঠে বলে তিশা।

জয়দীপ দেখল, তিশা বউদি অনেকটাই সহজ এখন। আখতার সাহেবের নোংরা ইঙ্গিতে তার মন বেশ ভারী হয়ে গিয়েছিল। কুদ্দুসের প্রসঙ্গে সেই ভারী মন হালকা এখন। জয়দীপ তৃপ্তির একটা শ্বাস ফেলল।

কুদ্দুস প্লেটে নাশতা সাজিয়ে দিলে নিজের জিলাপিটা কুদ্দুসের দিকে এগিয়ে ধরল তিশা।

কুদ্দুসের চোখ থেকে রাশি রাশি আনন্দ ঝরে পড়তে লাগল।

 

সাত.

শুভেন্দুর মৃতদেহ সামনে নিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে তিশা।

অন্য দশ দিনের মতো তিশার সেদিনের সকালটাও একইভাবে শুরু হয়েছিল। তাড়াহুড়া, হাঁকডাক। এই অরিন্দম, এই শুভেন্দু, তাড়াতাড়ি উঠ বাপরা। বাথরুমে যা। ব্রাশ কর। সোয়া নয়টায় ক্লাস আমার। পৌনে নয়টায় বের না হলে ক্লাসটা ধরতে পারব না আমি। প্রিন্সিপালের বকুনি খেতে হবে আমায়। তাতে কি তোদের ভালো লাগবে? তোদের জন্য মা বকুনি খাচ্ছে—শুনতে ভালো লাগছে বাপধনরা? তিশা অবিরত কথাগুলো বলে যাচ্ছে আর দ্রুত হাতে রুটি বেলে যাচ্ছে।

অন্যদিন মায়ের কথা কানে না তুললেও কেন জানি আজ মায়ের এক ডাকেই বিছানা ছেড়েছে শুভেন্দু। ওয়াশরুম থেকে ফিরে হাত-মুখ মুছে স্কুলব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। অরিন্দমকে বলেছে, এই দাদা, উঠ। মায়ের আজ সকালে ক্লাস।

রান্নাঘরে টিফিন তৈরি করতে করতে জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে চোখ পড়েছে তিশার। জালালের দোকানে উনুনের ধোঁয়া উড়ছে। এই চুলায় চায়ের কেটলি বসাবে জালাল। অন্য চুলায় পরোটা ভাজা হচ্ছে তখন। কর্মচারীটি দ্রুত হাতে তাওয়ায় পরোটা পাল্টে পাল্টে দিচ্ছে। দোকানের সামনের বেঞ্চে এর মধ্যে জনা কয়েক বসে পড়েছে। তাদের হাতে সেদিনের নিউজপেপারের একেকটা পাতা। ভাগাভাগি করে পড়ছে তারা। চোখ ফিরিয়ে নিল তিশা। তার যে অনেক কাজ! ছেলেদের সামনে জলখাবার দেওয়া, টিফিন বক্স রেডি করা, বইপত্র ঠিকঠাকমতো ব্যাগে পুরেছে কি না পরখ করা। এরপর নিজে তৈরি হওয়া। নিখিলের জন্যও টেবিলে খাবার গুছিয়ে রাখতে হয়। ইদানীং একটু দেরি করে বিছানা ছাড়ে নিখিল। সংসারের এসব কাজে হাত লাগাতে হবে বলে কি সে দেরি করে ওঠে? জানে না তিশা।

ঘর থেকে বেরোনোর সময় অরিন্দমকে পইপই করে বলেছিল, দেখিস অরিন্দম, রাস্তা পার হওয়ার সময় সাবধান। শুভেন্দুকে হাত ধরে পার করাবি। আসার সময় রিকশা নিবি। হেঁটে আসবি না।

অরিন্দম এখন বড় হয়েছে। টেনে পড়ে। শুভেন্দু সিক্সে। প্রাইমারি পাস করার পর শুভেন্দুকেও মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে ভর্তি করিয়েছে তিশা।

অরিন্দম বলেছিল, ঠিক আছে মা। চিন্তা কোরো না। আমাদের ক্লাস তো দশটায়। আমরা একটু পরে বেরোব। হেঁটে যেতে বেশি সময় তো লাগে না মা!

সাবধানে যাস। আমি গেলাম। বলে অদৃশ্য ঈশ্বরের প্রতি প্রণাম জানিয়েছিল তিশা।

বাড়ির গেট থেকে বেরিয়ে রিকশা ডাকতে যাবে, অমনি সামনে হাতটা পেতেছিল পাগলিটা। বলেছিল, দে, পাঁচ টাকা দে।

দোকানপাট খুলে গেছে। রাস্তাজুড়ে যানবাহনের লাইন। টেম্পো, রিকশা, লরি, অটোরিকশা, বাস, পিকআপ ভ্যান। অবিরাম হর্ন বাজছে। মুমূর্ষু রোগী নিয়ে যানজটের মধ্যে একটা অ্যাম্বুল্যান্স মরণডাক ডেকে যাচ্ছে। হরিবল অবস্থা। কানে তালা লাগার উপক্রম। সকালের রোদ হলেও বেশ চড়া। এসব দেখেশুনে মেজাজটা বিগড়ে গেল তিশার। ঠিক ওই সময় পাগলির চিৎকার, দে, পাঁচ টাকা দে।

তিশা খেপানো কণ্ঠে বলল, দেব না।

দেবে না কেন? পাঁচ টাকাই দিবি তুই।

পাগলিটার মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল। ধূলিমলিন। পরনে ছেঁড়া কাপড়। প্রস্রাবের গন্ধ তাতে। বোঝা যায়—বহুদিন স্নান করেনি। দাঁতের ফাঁকে হলদে ময়লা।

বাম হাতের আঙুল ঝাঁকড়া চুলে ডুবিয়ে দিয়ে ডান হাতটা তিশার সামনে মেলে ধরে জোরগলায় পাগলিটা আবার বলল, দে দে, দিয়ে দে। পাঁচ টাকা না দিয়ে যাবি না। এক পাও নড়বি না।

রাগতে গিয়ে রাগল না তিশা। ব্যাগ খুলে হাতড়াল। খুচরা টাকা পেল না। বলল, খুচরা নেই।

খুচরা নেই তো খুচরা কর। প্রায় নির্দেশের সুরে বলল পাগলিটা।

হঠাৎ হাতঘড়ির দিকে তাকাল তিশা। ওরেব্বাস! নয়টা পাঁচ। আজ নির্ঘাত ফার্স্ট পিরিয়ডটা মিস হবে!

ঝাঁজালো গলায় বলল, খুচরা করতে পারব না। পথ ছাড়ো। আরেক দিন নিয়ো।

তা হবে না। আজকেই দিবি। এখনই দিবি। অদ্ভুত রকমভাবে চোখ পাকিয়ে বলল পাগলিটা।

জেদ চেপে গেল তিশার। পাগলির আবদার   বাড়াবাড়ি রকমের বলে মন হলো তার। ওদিকে ক্লাস হারানো, এদিকে পাগলির পথ আগলে দাঁড়ানো—দুটোই মেজাজটা খিঁচড়ে দিল তিশার।

প্রায় চিৎকার করে বলল, পথ ছাড়বি তুই?

পাশ দিয়ে এক পথচারী হেঁটে যেতে যেতে বলল, ভিক্ষে চাইছে পাগলিটা। দু-চার টাকার বেশি তো নয়! দিয়ে দেন না। হয়তো রাতে কিছু খায়নি!

কেন জানি তার পরও মন গলল না তিশার। একটা রিকশা সামনে এসে দাঁড়াল। টুপ করে উঠে পড়ল রিকশায়। বলল, সিটি কলেজ। একটু জলদি টানবে ভাই।

পেছন থেকে পাগলির আওয়াজ কানে ভেসে এলো, দিলি না তো? পাঁচ টাকা দিলি না তো? দিলে তোর কী এমন ক্ষতি হতো?

ক্লাস নিতে নিতে বারবার পাগলিটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল তিশার। পড়ানোয় মন বসাতে পারছিল না। কানের পাশে পাগলির ‘পাঁচ টাকা দিলি না তো?’ কথাটি বারবার শুনতে পেল সে। কী এমন ক্ষতি হতো যদি দশ টাকার একটা নোট পাগলিটাকে দিয়ে দিত? পাঁচ আর দশ টাকায় কী এমন তফাত! হ্যাঁ, এটা ঠিক যে বাজারমূল্যে পাঁচ-দশ টাকার অনেক দাম। কিন্তু পাগলিটা তো প্রতিদিন তার সামনে হাত পাতে না! এর আগে কোনো দিন দেখেওনি সে পাগলিটাকে। আজ হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। তার ব্যাগে তো অনেক টাকা ছিল! পাঁচ টাকার নোট ছিল না ঠিকই, অন্যান্য নোট তো ছিল! সেখান থেকে একটা নোট দিয়ে দিলেই হতো। তাতে তো তার সংসারে টান পড়ত না! অনেক টাকাই তো বেতন পায় সে! নিখিলও তার বেতনের প্রায় সবটাই তার হাতে তুলে দেয়। দুজনের টাকায় তো সংসারে প্রাচুর্য! সেই প্রাচুর্য থেকে দশ বা বিশ বা পঞ্চাশ এক শ টাকা পাগলিটাকে দিয়ে দিলে কী হতো? কিছু হতো না তো! তার পরও আজ সকালে পাগলিটাকে কোনো টাকা দিল না সে! হয়তো পথিকটির কথাই ঠিক। গত রাতে সে খেতে পায়নি। ওই পাঁচ টাকা দিয়ে চা-পরোটা খেত। আহা, কী অন্যায় কাজটি করল আজ সে!

ভাবতে ভাবতে বারবার আনমনা হয়ে পড়ছিল তিশা। পড়ানোতে খেই হারিয়ে ফেলছিল। কোনো রকমে ক্লাসটা শেষ করে ডিপার্টমেন্টে ফিরে এসেছিল।

রাশেদা জিজ্ঞেস করেছিল, কি তিশাদি, একটু আনমনা বলে মনে হচ্ছে? দুলাভাইয়ের সঙ্গে কিছু হয়েছে নাকি?

অন্যদিন হলে মোক্ষম একটা জবাব দিত তিশা। যে জবাবে হাসির ঝরনাধারা ঝরে ঝরে পড়ত। আজ ওদিকে গেল না। বলল, না রাশেদা, মন খারাপ নয়। খুব সকালে উঠতে হয়। স্কুলের জন্য বাচ্চাদের তৈরি করে দেওয়া, নিজে তৈরি হওয়া, ওর জন্য নাশতা রেডি করা—সব মিলিয়ে সকালে খুব চাপ রে ভাই! তারপর সোয়া নয়টায় ক্লাস ধরা। হাঁপ ফেলার সময় পাই না। অতি সতর্কতায় সকালের ঘটনাটা এড়িয়ে গেল তিশা।

ঠিকই বলেছেন আপনি। সকালটা বড় কঠিন সময় আমাদের জন্য। আমার মামুনের দায়িত্ব আবার ওর আব্বা পালন করে। তাই সকালটায় আমি একটু রিলিফ পাই।

চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে তিশা বলে, আমার কপালে সেই সুখ নাই রে রাশেদা!

এত দিন একসঙ্গে চাকরি করার ফলে তিশাদির দাম্পত্য-অস্থিরতার কথা অল্পবিস্তর জানে রাশেদা। নিখিল যে সংসারের কোনো কর্তব্য পালন করে না, সেটা রাশেদা জেনে গেছে অনেক আগে। তাই তিশার কথা বুঝতে অসুবিধা হলো না রাশেদার। চুপ করে থাকল।

যথাসময়ে কলেজ থেকে ফিরে এসেছিল তিশা। ডিপার্টমেন্টে সবার সঙ্গে বসে চা-নাশতা খেয়েছে। হাসিঠাট্টাও করেছে। কিন্তু আজকের হাসিঠাট্টায় প্রাণ ছিল না তিশার। বারবার তাল কেটে যাচ্ছিল। জয়দীপও কেন জানি প্রাণ খুলে কথা বলেনি আজ! কী হয়েছে কে জানে? পরশু বলেছিল, সংসারে অশান্তি চলছে। কী অশান্তি, কেন অশান্তি জিজ্ঞেস করার ফুরসত মেলেনি সেদিন। আজও সময় হলো না। বিভাগে প্রায় সবাই উপস্থিত। সবার সামনে তো আর জিজ্ঞেস করতে পারে না—জয়দীপ, শ্রেয়সীর সঙ্গে সমস্যা মিটে গেছে তো? তারও আজ ভালো লাগছিল না তেমন। বারবার বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছিল।

বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নেমে খুব করে এদিক-ওদিক তাকাল তিশা। যদি পাগলিটাকে দেখা যায়! দেখা পেলে তার হাতে পঞ্চাশটা টাকা দেবে। বলবে, কিছু মনে কোরো না তুমি। সকালে মনটা ভালো ছিল না আমার। প্রতিদিন ভোরসকালে উঠে সংসারটাকে টানতে টানতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি। তার ওপর গাড়ি-হর্ন-ধুলাবালি এসবে মনটা খিঁচড়ে ছিল আমার। আর বিশ্বাস করো, পাঁচ টাকার খুচরা নোট ছিল না সকালে আমার ব্যাগে। হ্যাঁ, এখন যেমন তোমাকে পঞ্চাশ টাকার নোট দিচ্ছি, সকালেও তা দিতে পারতাম! কিন্তু সকালে এখনকার মতো উদার ছিলাম না আমি। তোমার সম্পর্কে তেমন করে ভাবিওনি সকালে। কিন্তু ক্লাস নিতে নিতে বারবার তোমার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। রাতে তো তুমি কিছু খাওনি, তাই না? আমি পাঁচ টাকার নোটটি দিলে তা দিয়ে হয়তো তুমি খিদে মেটাতে! কিন্তু তা তো আর করিনি আমি! গোঁ ধরেছিলাম, তোমাকে টাকা দেব না বলে। এখন এই টাকাটা নাও। আর আমাকে মাফ করে দাও তুমি।

চারদিকটা আঁতিপাতি করে খুঁজেও পাগলিটাকে দেখতে পেল না তিশা।

বিষণ্ন মন নিয়ে সিঁড়ি ভাঙল তিশা। দরজা খুলে সোফার ওপর ব্যাগটা ঝুপ করে রাখল। তারপর সোফায় গা এলিয়ে দিল। ফ্যানটা চালানো দরকার। উঠতে ইচ্ছে করল না।

জোর করে পাগলিটার কথা মন থেকে বের করে দিল তিশা। বেডরুমে পোশাক চেঞ্জ করে বাথরুমে ঢুকল। আজ সকালে স্নান করে যেতে পারেনি সে।

তারপর রান্না চড়াল। গলদা চিংড়ি রাঁধল। শুভেন্দু বড় খেতে চায় গলদা চিংড়ি। মনে মনে ঠিক করল, আজ শুভেন্দুর পাতে দুটো চিংড়ি তুলে দেবে। দেখে পাশ থেকে অরিন্দম হয়তো ফোড়ন কাটবে, আমি কী দোষ করলাম মা! আমি কি তোমার ছেলে নই!

ওরে দুষ্টু, এমন করে বলতে নেই! আমি কি তোকে কম ভালোবাসি রে বাছা! শুভকে যেমন ভালোবাসি, তোকেও তেমনি ভালোবাসি। তোকে যে ভালোবাসি দেখবি? এই দেখ বলে বড় বাটিটির ঢাকনা ওল্টাবে তিশা। বলবে, তুই খাসির মাংস খেতে খুব পছন্দ করিস না? এই দেখ তোর জন্য মাখা মাখা করে খাসির মাংস রেঁধে রেখেছি। বলে চামচে চামচে মাংস তুলে দেবে অরিন্দমের পাতে।

শুভ-অরির ফিরতে আজ এত দেরি হচ্ছে কেন? চারটা তো বেজে গেছে অনেকক্ষণ। পৌনে পাঁচটা বাজে প্রায়। এখনো এলো না কেন দুজনে? সকালে বারবার করে বলেছি রিকশায় আসতে। রিকশায় আসছে না বোধ হয়। অরিন্দমও হয়েছে তার বাপের মতো কিপটে। রিকশাভাড়া বাঁচানোর জন্য হয়তো হেঁটেই আসছে। মাত্র মিনিট পনেরোর পথ। এই পথটা হেঁটে আসতে এতক্ষণ লাগার তো কথা নয়! তিশা এ রকম করে ভাবছে আর দরজার দিকে ঘন ঘন তাকাচ্ছে।

হঠাৎ দরজায় ধুম ধুম ধমা ধম ধুড়ুম আওয়াজ। তিশার বুকটা ছ্যাঁক করে উঠল। দরজা খুলতেই গড়িয়ে পড়লেন কামেশ্বরবাবু। আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে রে তিশা—গড়াতে গড়াতে বলতে থাকলেন কামেশ্বরবাবু।

বিকেলের রোদটা মিঠে হয়ে এসেছিল। অরিন্দম বলেছিল, চল হেঁটে যাই শুভ।

শুভেন্দু দ্বিমত করেনি। দুই ভাই হাত ধরাধরি করে বাড়ির দিকে এগিয়েছিল। বাড়ির অনতিদূরের মোড়টা একটু ঢালুমতন। রাস্তা পেরিয়ে বিশ-পঁচিশ কদম হাঁটলেই বাড়ির গেট। অরিন্দমরা দুদিকে তাকিয়ে দেখল, গাড়ি নেই। হঠাৎ শুভেন্দু নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দৌড়ে রাস্তাটা পার হতে গেল। অমনি বড় একটা লরি...।

তিশার চারপাশে নানা ফ্ল্যাটের মানুষ। ছবুর সাহেবও লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে এসেছেন। হরবালা বউদি তিশাকে বুকের কাছে ধরে রেখেছেন। কামেশ্বরবাবু শুভেন্দুর মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছেন। শুভেন্দুর নিম্নাঙ্গটা থেঁতলে গেছে। গায়ের ওপর ছড়িয়ে দেওয়া চাদরটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে।

নিখিল এখনো ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরেনি। মুকুন্দবাবুকে দুঃসংবাদটা জানানো হয়নি এখনো।

 

 

আট.

কোথায় গিয়েছিলে? রূঢ় কণ্ঠ শ্রেয়সীর। দরজা খুলে দিয়েই জিজ্ঞেস করেছিল।

জয়দীপের তখন ঘর্মাক্ত শরীর। ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা। বোঝা যাচ্ছে, তার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেছে। শ্লথ পায়ে ঘরে ঢুকল জয়দীপ।

সেদিকে নজর নেই শ্রেয়সীর। কণ্ঠকে আরো কঠোর করে বলল, শুনতে পাওনি? কী জিজ্ঞেস করেছি?

চেয়ারে থপ করে বসে পড়ে জয়দীপ বলল, শুনতে পেয়েছি।

তাহলে বলছ না কেন?

কী বলব?

কোথায় গিয়েছিলে, সেটা বলবে!

এই মুহূর্তে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না শ্রেয়সী। কাতর কণ্ঠ জয়দীপের।

কথা বলতে ইচ্ছে করবে কেন? কথা বলার লোক তো জুটিয়ে নিয়েছ!

কী আবোলতাবোল বকছ শ্রেয়সী! ভদ্রতা হারিয়ে বসলে নাকি?

ভদ্রতা বলো, রুচি বলো, সম্মানবোধ বলো—সবই হারিয়ে বসেছ তুমি। আমি নই।

তুমি এ রকম করে অপমান করছ কেন আমায়? ছেলে ঘরে। কী বলতে চাইছ, তা-ও তো বুঝতে পারছি না!

তোমার বোঝার দরকার নেই, যা জানার জেনে গেছি আমি। তুমি যদি এতই বিকৃত রুচির, তাহলে আমাকে বিয়ে করেছিলে কেন?

জয়দীপের মাথা এখন শূন্য হয়ে আছে। কিছুই খেলছে না এখন তার মাথায়। একটি বাক্য শুধু তার মাথার ভেতরে গুমরে মরছে—শুভ, শুভ রে! এখন আমি কাকে নিয়ে বাঁচব রে!

দুপুর দুটোর দিকে বাড়ি ফিরে এসেছিল জয়দীপ। শেষ পিরিয়ডটা তার ছিল। ফিরে দেখেছিল, কেউ নেই ডিপার্টমেন্টে। কুদ্দুসকে জিজ্ঞেস করলে জানিয়েছিল, স্যাররা সবাই চলে গেছেন।

খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে গেলে শ্রেয়সী বলেছিল, কিছু সদাইপাতি লাগবে। টেবিলে লিস্টটা রেখেছি। সময় করে নিয়ে এসো।

আচ্ছা ঠিক আছে বলে পাশ ফিরেছিল জয়দীপ।

শরীরে আলস্য আছে, কিন্তু কেন জানি আজ ঘুম আসছিল না। তার পরও ছটা পর্যন্ত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করল। একটা সময়ে বিছানা ছাড়ল জয়দীপ। চোখেমুখে জল দিয়ে লিস্টটা নিয়ে নিচে নামল। রাস্তার ওপারে মুদির দোকান—পুলিন স্টোর।

পুলিনবাবুকে লিস্টটা ধরিয়ে দিয়ে বলল, যা যা দরকার, ওতে লেখা আছে। জিনিসগুলো দিন পুলিনদা, আমি দাঁড়ালাম।

দীর্ঘদিন ধরে চট্টেশ্বরী রোডের এই বাড়িতে আছে জয়দীপরা। আশপাশের মানুষগুলোর সঙ্গে এক ধরনের চিন-পরিচয় হয়ে গেছে জয়দীপের। সদাইপাতি কেনার সুবাদে পুলিনবাবুর সঙ্গে সম্পর্কটা একটু গভীর হয়েছে  বৈকি! বয়সী এই মানুষটিকে জয়দীপ অবলীলায় দাদা বলে সম্বোধন করে।

জয়দীপের কথা শুনে পুলিনবাবু মিষ্টি একটু হেসেছিল।

দোকানের সম্মুখভাগ থেকে একটু সরে দাঁড়িয়েছিল জয়দীপ।

দর্শনের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিনকে হেলতে-দুলতে আসতে দেখল দূরে। ওঁর বাড়ি জয়দীপের বাড়ির   তিন-চারটা বিল্ডিং পরে। জয়দীপকে দেখে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন হেলাল উদ্দিন। বিষণ্ন চোখে একবার জয়দীপের দিকে তাকালেন। তারপর মাথা নিচু করলেন। মৃদু কণ্ঠে বললেন, কিছু শোনেননি?

কী, কী শুনব স্যার! উদগ্রীব কণ্ঠে জানতে চাইল জয়দীপ।

তিশা ম্যাডামের ছেলে...। এইটুকু বলে অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন দর্শনের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন।

স্যার, স্যার খুলে বলুন! আমি কিছুই জানি না স্যার! কী হয়েছে, কী হয়েছে তিশা ম্যাডামের ছেলের? তীরবিদ্ধ পাখির মতো কাঁপতে কাঁপতে বলল জয়দীপ।

হেলাল উদ্দিন অন্যমনস্ক কণ্ঠে বললেন, পথে ইংরেজির ইফতেখার সাহেবের সঙ্গে দেখা। তিশা ম্যাডামের পাশের বিল্ডিংয়ে তিনি থাকেন। তিনি বললেন, আজ পাঁচটার দিকে ছোট ছেলেটিকে নাকি গাড়ি...।

দৌড়াতে শুরু করল জয়দীপ। হেলাল সাহেবের শেষ কথাগুলো শুনবার তর সইল না জয়দীপের। যেতে হবে, এখনই পৌঁছতে হবে তিশা বউদির বাড়িতে।

পেছন থেকে হেলাল সাহেবের উচ্চ কণ্ঠ ভেসে এলো, ওভাবে দৌড়াবেন না। রিকশা নিন জয়দীপবাবু।

জয়দীপ যখন বাড়িতে ফিরে এলো ঘড়ির ছোট কাঁটাটি তখন বারোটা ছুঁই ছুঁই।

রেগে ছিল শ্রেয়সী খুব। জয়দীপের জন্য ভয়ও যে করছিল না, তা-ও নয়। তবে ভয়ের চেয়ে রাগটাই করছিল বেশি। না বলে, না কয়ে কোথায় গেল লোকটা! এই ধরনের কেলাস লোকও থাকে পৃথিবীতে!

সামনে জয়দীপকে পেয়ে তুবড়ির মতো জ্বলে উঠেছিল শ্রেয়সী। এত দিনের জমানো ক্ষোভটা তুবড়িতে আগুন লাগাল।

শ্রেয়সীর শেষ কথাগুলো জয়দীপকে বড় কষ্ট দিল। উত্তেজিতও করল। অনেক কষ্টে শান্ত থেকে জয়দীপ বলল, আমাকে একটু সময় দাও শ্রেয়সী। আমি তোমাকে সব কিছু খুলে বলছি।

খুলে বলতে হবে না আমায়! আমি সব জানি।

কী জানো?

তোমার লটরপটরের কথা কি আমার জানতে বাকি আছে?

এসব কী বলছ তুমি শ্রেয়সী!

ঠিকই বলছি। তিশা আর তোমার কথা আমি জানি না ভেবেছ?

তিশা বউদি আর আমার কথা!

ও—! তলে তলে সম্পর্কও পাতিয়ে বসে আছ দেখছি! বউদি! রসের বউদি!

ধৈর্য হারাল জয়দীপ, চোপ রাও। আর একটি কথাও বলবে না তুমি।

বললে! বললে কী করবে তুমি? গায়ে হাত দেবে? মারো, মারো আমাকে। গলা টিপে শেষ করে দাও আমাকে।

শ্রেয়সীর কথা শুনে জয়দীপ স্তব্ধ, স্তম্ভিত। এ কোন শ্রেয়সীকে দেখছে সে? একি সেই প্রেমিকা শ্রেয়সী, যাকে নিয়ে এতটি বছর সে ঘর করে আসছে? একি সেই শ্রেয়সী? শ্রেয়সী তো সব সময় বলত—দাম্পত্যজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির নাম বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই কি হারিয়ে বসল শ্রেয়সী আজ? হারিয়ে বসেছে তো বটেই! নইলে তিশা বউদিকে নিয়ে এ রকম নোংরা কথা বলে বসল কেন? কলেজের কথা, কলিগদের কথা তেমন করে কখনো শ্রেয়সীর সঙ্গে শেয়ার করেনি জয়দীপ। প্রয়োজনীয় কথাটুকুই বলেছে শুধু। তিশা বউদির সঙ্গে তার কামহীন মধুর সম্পর্কের কথা কোনো দিন বলেনি শ্রেয়সীকে। তাহলে তিশা বউদিকে জড়িয়ে এমন অভব্য কথা বলল কেন শ্রেয়সী? কে শ্রেয়সীর কান ভারী করল? দিশা পেল না জয়দীপ।

সেদিন আখতার আহমেদের সঙ্গে নিউ মার্কেটে দেখা শ্রেয়সীর। খুব যে চেনাশোনা ছিল, তেমন নয়। একবার শুধু কলেজের বার্ষিক ভোজে দেখা হয়েছিল। মেরিডিয়ান রেস্টুরেন্টে। সে বছর ওখানেই কলেজের বার্ষিক ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল।

দেখেই চিনে ফেলেছিল আখতার আহমেদ, আরে মিসেস জয়দীপ না? কেমন আছেন?

চোখ কুঁচকে কালাকোলা লোকটির দিকে তাকিয়েছিল শ্রেয়সী।

আখতার আহমেদ বলেছিল, বুঝতে পেরেছি, আপনি আমাকে চিনতে পারেননি। গেল বছরের আগের বছর আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল মেরিডিয়ান রেস্টুরেন্টে, কলেজের বার্ষিক ভোজে। আখতার আহমেদ আমি। আপনার হাজব্যান্ডের ডিপার্টমেন্টে পড়াই।

না চেনার জন্য ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল শ্রেয়সী। কুণ্ঠিত কণ্ঠে বলেছিল, কিছু মনে করবেন না স্যার, চিনতে পারিনি। সেদিন অল্প সময়ে অনেকের সঙ্গে দেখা। আপনার চেহারাটা মনে রাখতে পারিনি। মাফ করবেন স্যার।

ও ঠিক আছে। তা কী জন্য এসেছেন নিউ মার্কেটে? কিছু কিনবেন বুঝি?

হ্যাঁ। একটু কাপড়চোপড় কেনার ছিল।

আখতার আহমেদ তার পাশে দাঁড়ানো মহিলাটিকে দেখিয়ে বলে উঠেছিল, ও হো, ভুল হয়ে গেছে! আগেই আপনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল। এ আমার স্ত্রী। আয়শা, ইনি হলেন আমার ডিপার্টমেন্টের জয়দীপবাবুর ওয়াইফ।

শ্রেয়সী আমার নাম ভাবি। আদাব। কেমন আছেন?

দুই পরিবার মিলেমিশে সেদিন একই দোকান থেকে কাপড়চোপড় কিনেছিল।

পরস্পর থেকে বিদায় নেওয়ার একটু আগে আখতার আহমেদ চাপা স্বরে আচমকা বলেছিল, জয়দীপবাবুকে একটু নজরে রাখবেন।

চকিতে আখতারের দিকে চোখ ফিরিয়েছিল শ্রেয়সী। তড়পানো কণ্ঠে বলেছিল, কেন, কী হয়েছে!

না, এমনিতেই বললাম আর কি! তিশা মুহুরির নাম তো শুনেছেন! আমাদের সঙ্গে পড়ায়। জয়দীপবাবুর সঙ্গে ঢলাঢলিটা ডিপার্টমেন্টের সবার চোখে পড়ছে তো! তাই আপনাকে একটু সতর্ক করলাম।

পাশ থেকে আয়শা ধমকে উঠল, আহ! এসব কী অসভ্যতা করছ? একজন মহিলার কানে বিষ ঢালছ কেন?

শ্রেয়সীর দিকে ফিরে বলেছিল, বউদি, আপনি যান। ও একটু এ রকমই। কেউ শান্তিতে থাক, চায় না ও। বলে স্বামীর দিকে ঘৃণার চোখে তাকিয়েছিল আয়শা।

আখতারের চোখ শেয়ালের মতো চকচক করে উঠল। স্ত্রীর ধমককে উপেক্ষা করে হিসানো কণ্ঠে বলল, ব্যাপারটা মসকরা করে বলিনি আমি। সিরিয়াসলি বলেছি। আখতারের চোখে তখন প্রতিশোধের আগুন ধকধক করছে।

শ্রেয়সী সেদিন আর দাঁড়ায়নি। বিত্রস্ত্র মন নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিল।

ক্ষোভ, ব্যথা, সন্দেহ, যন্ত্রণা নিজের ভেতর এত দিন চেপে রেখেছিল শ্রেয়সী। আজ রাতে সেটা বিস্ফোরিত হলো।

শ্রেয়সীর কথার পিঠে আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না জয়দীপের। এ রকম নোংরা কথার কী জবাব দেবে সে! বউদির সঙ্গে তার যে সম্পর্ক, তা যে সকালের মতো স্নিগ্ধ, পুষ্পের মতো পূত, বললে বুঝবে শ্রেয়সী? বুঝবে না। তার মনের ভেতর এখন সন্দেহের পোকা কিলবিল করছে। তার ওপর যে গভীর বিশ্বাস ছিল শ্রেয়সীর, তা যে কর্পূরের মতো উবে গেছে, বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না জয়দীপের। কিন্তু এই বিপর্যস্ত সময়ে ভাঙাচোরা মন নিয়ে শ্রেয়সীকে কিছু বোঝাতেও ইচ্ছে করল না জয়দীপের।

শুধু হাত জোড় করে বলল, আমাকে একটু একা থাকতে দাও শ্রেয়সী। আমার মনটা ভীষণ খারাপ এখন। সকালে আমি সব তোমাকে বুঝিয়ে বলব।

ঝাঁজিয়ে উঠল শ্রেয়সী, আমাকে কিছুই বুঝিয়ে বলতে হবে না, যা বোঝার আমি বুঝে নিয়েছি। সেদিন আখতার সাহেবের কথা উড়িয়ে দিয়েছিলাম আমি। ভেবেছিলাম, তাঁর কথা মিথ্যে। আজ দেখছি, তাঁর কথায় একবিন্দুও মিথ্যে ছিল না।

জয়দীপ এতক্ষণে বুঝতে পারল, শ্রেয়সীর এ রকম কথাবার্তার পেছনে আখতার আহমেদের ভূমিকা আছে। কোথাও হয়তো শ্রেয়সীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে! বউদির সেদিনের অপমান জয়দীপের ওপর কড়ায়-গণ্ডায় শোধ নিয়েছে। নোংরামি তার পরিবার পর্যন্ত বিস্তৃত করতে দ্বিধা করেনি আখতার।

এই মুহূর্তে জয়দীপের খুব বলতে ইচ্ছে করছিল, শ্রেয়সী, তুমি যে মহিলাটিকে সন্দেহ করছ, উনি নিষ্পাপ অসহায় একজন নারী। তাঁর ঘরে শান্তি নেই, বাইরে আখতারদের মতো লম্পটদের লোভী চোখ। তিশা নামের ওই মহিলাটি আজ সব হারিয়ে বসে আছেন। ছেলে হারিয়েছেন তিনি আজ। এ রকম ভয়াবহ শোকে একফোঁটা চোখের জল পর্যন্ত ফেলেননি তিনি। সারাটাক্ষণ বোবা, নিস্তব্ধ পাথর হয়ে ছিলেন। আমি অন্য কোথাও যাইনি শ্রেয়সী। এইমাত্র শ্মশান থেকে ফিরছি। তিশা বউদির ছোট ছেলে শুভেন্দুর শেষক্রিয়া সম্পন্ন করে শ্মশান থেকে আসছি আমি। তুমি শান্ত হও শ্রেয়সী। মনের সন্দেহ দূর করো। তোমার জয়দীপ আগের মতোই আছে শ্রেয়সী। আমি তোমাকে ভালোবাসি শ্রেয়সী। মনে মনে দ্রুত ভেবে গেল এসব জয়দীপ। কিন্তু শ্রেয়সীকে মুখ ফুটে বলতে ইচ্ছে করল না। চোখ বন্ধ করে চুপ করে থাকল।

সাপের মতো ফোঁসানো গলায় শ্রেয়সী এই সময় বলে উঠল, কাল অর্ণবকে নিয়ে আমি বাপের বাড়িতে চলে যাব। চরিত্র সংশোধন করে যোগাযোগ কোরো। তার আগে নয়।

ম্লান একটু হাসি জয়দীপের মুখে ছলকে উঠে মিলিয়ে গিয়েছিল।

পরদিন যথারীতি কলেজে চলে গিয়েছিল জয়দীপ। ফিরে দেখেছিল, শ্রেয়সী অর্ণবকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে।

নাহ, শ্রেয়সীর সঙ্গে আর যোগাযোগ রাখেনি জয়দীপ।

সেই থেকে জামালখান রোডের ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে জয়দীপের বসবাস।

 

 

নয়.

দুমাস পরে ডিপার্টমেন্টে ফিরে এসেছিল তিশা মুহুরি। এই তিশা দুমাস আগের তিশা নয়। ভেঙেপড়া শরীর তখন তার। চোখের চাঞ্চল্য, মুখের লাবণ্য কোথায় যেন হারিয়ে গেছে তিশার! তখন সে কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ। খুব যে কথা বলে, তা নয়। চুপচাপ। অন্তর্মুখী। কিন্তু যখন বলে, খেই হারানো কথাবার্তা।

খবর পেয়ে সেই সন্ধ্যায় ডিপার্টমেন্টের সবাই উপস্থিত হয়েছিল তিশার বাড়িতে। প্রিন্সিপাল এসেছিলেন, ভাইস প্রিন্সিপাল এসেছিলেন। রাশেদা তিশাকে ঘিরে বসে ছিল। সামান্য তফাতে অর্ধেন্দু রুদ্র। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়েছে রুদ্র। করুণ বিষণ্ন চোখ দিয়ে সহানুভূতি ঝরে ঝরে পড়ছিল রুদ্রর। একটু তফাতে কাঁচুমাচু মুখ করে আখতার আহমেদ দাঁড়িয়ে। আরো একটু পেছন দিকে, কোনা ঘেঁষে দেয়ালে ঠেস দিয়ে কুদ্দুস নীরবে কেঁদে যাচ্ছে।

প্রিন্সিপাল বাকহারা। অনেকটা দিশাহারাও। সম্প্রতি তাঁর একমাত্র মেয়ে সাজেদার প্রথম পুত্রটি দাদার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। স্বজন হারানোর ব্যথা যে কত দুঃসহ, প্রিন্সিপাল তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। একটা সময়ে রক্তাক্ত মৃত সন্তানকে সামনে নিয়ে তিশার বসে থাকার দৃশ্যটি প্রিন্সিপালের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠল।

চলে আসার আগে অত্যন্ত ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, তিশা, আপনি যত দিন ইচ্ছে ছুটি কাটান। আপনি সামলে উঠুন, ছুটির ব্যাপারটা আমি দেখব। বলে প্রিন্সিপাল তিশার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বেরোনোর আগে নিখিলের ওপর নজর পড়েছিল প্রিন্সিপালের। কথা বলতে ইচ্ছে করেনি তাঁর। পুত্রহারা পিতাকে কী বলে সান্ত্বনা দিতে হয়, জানেন না তিনি।

বেশ কদিন আচ্ছন্নতার মধ্যে কাটল তিশার। ঘুম ঘুম আচ্ছন্নতা। বিছানা, সোফা, ফ্লোর—যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ছে তিশা। শুধু চোখ জড়িয়ে জড়িয়ে আসে। নাওয়া-খাওয়া ভুলে গেছে। ঘুমাতে পারলে বাঁচে যেন সে! ঘুম সর্বদুঃখহরা। ঘুম যেন তিশাকে স্বস্তিময় এক অবাস্তব জগতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তার যে আরেকটা ছেলে আছে এবং সে যে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে, সেদিকে খেয়াল নেই তিশার। অরিন্দম যে প্রতিমুহূর্তে তার গা ঘেঁষে আছে, বোঝার চেতনা নেই তিশার।

অরিন্দম যেন এখন টেনে পড়ে না! সে যেন এখন ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট! দায়িত্বশীল। কর্তব্যপরায়ণ। মায়ের প্রতি কর্তব্যভারের বিন্দুমাত্র খামতি-ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকে তীক্ষ নজর অরিন্দমের। সন্তানের এই যে ভালোবাসা, মায়ের প্রতি গভীর টান—কিছুই বুঝতে পারল না তিশা। তিশার দিন-রাত-মুহূর্ত-পল একটা বিভোর ঘূর্ণির মধ্যে অতিবাহিত হচ্ছিল।

না, নিখিল ভৌমিকের তেমন কোনো রূপান্তর হয়নি। আগের মতোই যথারীতি সে ভার্সিটি-লাইব্রেরি করছে। তার যে মস্তবড় ক্ষতি হয়ে গেছে, দেখে বোঝা যাচ্ছে না। যে শুভেন্দুর হৈচৈয়ে দু-দুটো বাড়ি মুখরিত থাকত, এখন যে চারদিক নিথর বোবা—আমলে নেয় না নিখিল। তার স্ত্রী তিশা যে গহিন-গভীর এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিন-রাত পার করছে, পাত্তা দিচ্ছে না নিখিল। তার দৈনন্দিনের আচরণ দেখে এমন মনে হচ্ছে যে তিশা তার কেউ না! তিশা মারা গেলেও তার কিছু আসবে-যাবে না!

অরিন্দমের স্কুল কামাই হতে লাগল। হরবালা দেবী একজন ঝি ঠিক করে দিয়েছেন। সকালবেলা এসে অঞ্জলি চা-নাশতা তৈরি করে দেয়। রান্নাঘরের কুটাবাছা শেষ করে যেদিন যা পারে একটা-দুইটা তরকারি রেঁধে যায়। ভাতটা রেঁধে অরিন্দমকে ডেকে বলে, সব ঠিক করে দিয়ে গেলাম। মাকে খাইয়ে দিয়ো।

তিশা যখন হুঁশে ফেরে অরিন্দমের মুখে-মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, তুই আর স্কুল কামাই করিস না বাপ। সামনে ফাইনাল। তোকে অনেক বড় হতে হবে রে অরিন্দম! তোরা দুজন আমার দুটো পাখা ছিলি রে বাপ! শুভ চলে গেল রে বাপ! আমার একটা পাখা ভাঙল রে মা! ও মা রে! বলতে বলতে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে তিশা।

অরিন্দম মাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে, তুমি কেঁদো না মা। তুমি কাঁদলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে। অরিন্দমও ডুকরে ওঠে।

মুকুন্দবাবু এ বাড়িতে আসতে পারেন না। জরায় জীর্ণ শরীর তাঁর। সিঁড়ি বেয়ে তেতলা পর্যন্ত উঠতে বুকে টান ধরে যায়। সকাল-বিকাল ফোন করেন। যখন ঘোর থাকে না তিশার, ফোন ধরে। ওপার থেকে মুকুন্দবাবু হ্যালো বলে কাঁদতে বসেন। বুড়া বয়সে কান্না ধরে রাখা কঠিন। তাই মেয়েকে ফোন করেই হাউমাউ করে ওঠেন মুকুন্দবাবু।

পিতা-পুত্রীর কান্না একসময়ে কমে আসে। পিতা বলেন, তুই ওখানে আর পড়ে থাকিস না মা। আমার কাছে চলে আয়। অরিন্দম-নিখিলকে নিয়ে মুহুরিবাড়িতে চলে আয়। তোরা এলে আমার বাড়িটি আবার মুখরিত হয়ে উঠবে। বৃদ্ধ বয়সে প্রত্যেক মা-বাবা তাঁদের সন্তানদের তুই করে বলতে ভালোবাসেন। মুকুন্দবাবুও বলছেন।

তিশা থেমে থেমে বলে, ও তো গোঁয়ার বাবা। ওর মধ্যে তো কর্তব্যবোধ বলে কিছু নেই। নিখিলের কাছে পুত্র, স্ত্রী, শ্বশুর—এদের কোনো মূল্য নেই বাবা।

স্থানান্তরে এলে তোর দুঃখ অনেকটাই লাঘব হবে মা। ওখানকার প্রতিটি কামরা, প্রতিটি আসবাবপত্র তোকে শুভেন্দুর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। এখানে চলে এলে ওসব তোকে আর কষ্ট দেবে না। তা ছাড়া...বলে একটু থামলেন মুকুন্দবাবু।

তিশা জিজ্ঞেস করল না, তা ছাড়া কী বাবা? রিসিভারটা কানে লাগিয়ে চোখ বুজে থাকল তিশা।

মুকুন্দবাবু আবার বললেন, তোদের এত বড় বাড়ি থাকতে শুধু শুধু ও বাড়িতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ভাড়া গুনবি কেন? আজ না আসিস, একটা সময়ে তো এই বাড়িতে তোদের আসতেই হবে। আমার মৃত্যুর পর এই মুহুরিবাড়ি তো তোরই হবে মা! বলতে বলতে হাঁপিয়ে উঠলেন মুকুন্দবাবু।

তিশা কী বলবে ঠিক করতে পারল না।

 

দিন পঁচিশেক পরে এক সন্ধ্যায় নিখিলের মুখোমুখি হলো তিশা। ড্রয়িংরুমেই বসেছিল তারা।

তিশা যে নিখিলের দিকে খুব ভালো করে তাকাতে পারছিল, তা নয়। চোখ মেঝেতে নামিয়ে তিশা বলেছিল, এখন আমাদের ডিসিশন নেওয়ার সময় হয়েছে।

নিখিল কপাল কুঁচলে বলেছে, কী বিষয়ে?

তিশা ভূমিকা না করে চট করে বলল, চলো আমরা ওবাড়িতে চলে যাই।

কোন বাড়িতে? নির্লিপ্ত কণ্ঠ নিখিলের। বোঝা যাচ্ছে বুঝতে পেরেও সে না বোঝার ভান করছে।

উৎসাহী গলায় তিশা বলল, আমার বাপের বাড়িতে, মুহুরিবাড়িতে।

চোখমুখ শক্ত করে তিশার দিকে তাকাল নিখিল। বেশ থেমে থেমে রুক্ষ গলায় বলল, এ ব্যাপারে আগেই তোমার সঙ্গে আমার কথা হয়ে আছে।

কথা! কী কথা?

কী কথা হয়েছিল, তিশা তা বিস্মৃত হয়নি। ভেবেছে—সময়ান্তরে আর ঘটনাক্রমে হয়তো নিখিলের মতে পরিবর্তন আসতে পারে। ভেবেছে—ছোট ছেলে শুভেন্দুকে হারিয়ে নিখিলের মন হয়তো নরম হয়েছে।

কেন অভিনয় করছ আমার সঙ্গে? কী বলেছিলাম, আমি নিশ্চিত, তা তোমার স্পষ্ট মনে আছে। মনে থেকেও কেন নাটক করছ? নাটুকেপনাকে যে আমি ঘেন্না করি, তা তোমার না জানার কথা নয়!

নিখিলের কথাগুলো তিশার বুকে এসে লাগল খুব। নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তার পরও সংযত কণ্ঠে বলল, তুমি এ রকম রূঢ়ভাষী কেন? ভালো করে কথা বলতে জানো না তুমি?

খারাপ করে কী বললাম? সত্যটাই বলেছি। শুনতে তোমার খারাপ লাগছে।

রূঢ় সত্যও মিষ্টি করে বলা যায়।

আমি বলতে শিখিনি।

সেটা পারিবারিক শিক্ষা।

কী বলতে চাইছ তুমি?

বলতে চাইছি—তুমি ভালো মানুষ নও। তুমি দায়িত্বশীল নও। তুমি আস্ত একজন স্বার্থপর। তোমার কাছে স্ত্রী-সন্তান-আত্মীয়-স্বজনের কোনো মূল্য নেই।

এ রকম করে বলছ কেন তুমি? ভড়কানো গলায় বলে উঠল নিখিল।

তোমার সম্পর্কে এতগুলো বছরে আমার যা অ্যানালিসিস হয়েছে, তা-ই বললাম। এককণা মিথ্যে নেই এতে। একটু থামল তিশা। মনকে আরো শক্ত করে নিল। এখন বলো, তুমি ওবাড়িতে যাবে কি না?

বরফ শীতল কণ্ঠে নিখিল বলল, না।

আমি যাব।

সে তোমার সিদ্ধান্ত।

একেবারের জন্য যাব আমি।

ভয় দেখাচ্ছ? ভয় দেখাচ্ছ আমাকে? ভেবেছ, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না আমি? এমন চিৎকার করে উঠল নিখিল, অরিন্দম তার বেডরুম থেকে শুনতে পেল।

শ্লথ পায়ে সামনে এসে ম্লান কণ্ঠে বলল, কী হয়েছে! এ রকম চেঁচাচ্ছ কেন? প্রশ্নটা মায়ের দিকে তাকিয়ে করলেও প্রশ্নটা যে নিখিলকে উদ্দেশ করে, বুঝতে অসুবিধা হলো না নিখিলের।

মুখ বিকৃত করে ভেংচি কেটে নিখিল বলল, ঘরজামাই হওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে আমায়! মুহুরিবাড়িতে চলে যেতে বলছে!

মন্দ কী? এখানে আমার মাকে একা একা থাকতে হয়। আমি থাকি স্কুলে-প্রাইভেটে। তুমি মাকে কোনো সময় দাও না। মা দাদুর বাড়িতে গেলে সঙ্গ পাবে। শুভেন্দুর স্মৃতি ভোলার সুযোগ পাবে। ধীরে ধীরে বলে গেল অরিন্দম।

তিশা হাহাকারের কণ্ঠে বলল, এবাড়িতে আমি আর থাকতে পারছি না রে অরিন্দম! যেদিকে তাকাই, শুভর জামাকাপড়, তার খেলনাপাতি, জুতা-মোজা, খাবারের থালা-গ্লাস-বাটি...। গলা ধরে এলো তিশার।

ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়ো না আমাকে। আমি বুঝতে পেরেছি—ছলচাতুরীতে দুই মা-ছেলে একাট্টা হয়েছ। আমাকে দিয়ে ওসব ধান্দাবাজি করতে পারবে না। দুজনে কান খুলে আমার কথা শুনে রাখো, আমি জান থাকতে ওবাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকতে যাব না। চাই...।

তিশা বলল, থামলে কেন? চাই-এর পরে কী? বলো বলো!

তোমরা আমাকে ছেড়ে চলে গেলেও আমি পরোয়া করি না। নিজে রেঁধে খাওয়ার অভ্যেস আমার আছে।

তিশা হঠাৎ কণ্ঠকে খাদে নামাল, দেখো, বুড়ো বাপ আমার। চলতে-ফিরতে পারে না তেমন করে! এই সময় নিকটাত্মীয় কাছে থাকা জরুরি।

তুমি ছাড়া মুকুন্দবাবুর আর আত্মীয় নেই!

দিশা মুহুরি!

তুমি সব জেনেবুঝেও আমাকে আঘাত দিচ্ছ, আমার বাবাকে অপমান করছ। আমি ভেবেছিলাম, তোমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গিও পাল্টেছে। এখন দেখছি—যে গোঁয়ার, সে গোঁয়ারই থেকে গেছ তুমি।

নিখিল বলল, ডেফিনিটলি। আমার আদর্শের পরিবর্তন হবে কেন? তোমার মতো মেয়ের চাপে পড়ে?

তিশার আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করল না।

শান্ত কণ্ঠে বলল, আমি এবাড়ি থেকে চলে যাব।

সে তোমার ইচ্ছা। যেখানে বেলেল্লাপনা ভালো করে করতে পারবে, সেখানেই তো যাবে তুমি! ছেলে যে সামনে দাঁড়িয়ে আছে, পাত্তা দিল না নিখিল।

এই ঘটনার দশ দিন পর অরিন্দমকে সঙ্গে নিয়ে মুহুরিবাড়িতে চলে গেল তিশা।

 

দশ.

যাওয়ার সময় সঙ্গে করে কিছুই নিল না তিশা। এক কাপড়েই বেরিয়ে পড়ল। তবে শুভেন্দুর বইখাতা-ব্যাগ-জুতা-জামা-প্যান্ট-খেলনা-বল-টুপি—যা যা সামনে পেয়েছে, বড় একটা ব্যাগে ভরে নিয়েছে।

আগের রাতে অরিন্দমকে বলেছে, তুই ঠিক কর অরিন্দম, আমার সঙ্গে যাবি, না তোর বাবার সঙ্গে থেকে যাবি।

অরিন্দম বলেছে, বাবা মস্তবড় ভুল করছে মা। বাবা নিজেকে ঘরজামাই না ভেবে দাদুর ছেলে ভাবলে ভালো হতো।

তোর বাপ তো শিক্ষিত মানুষ! নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বুদ্ধি-বিবেচনা তার আছে। সে যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার দিক থেকে হয়তো সেটাই ঠিক। কিন্তু আমার বাপটা যে এই বৃদ্ধ বয়সে অসহায় জীবন যাপন করছে—কাজের লোক, ঝি—এরা আছে ঠিক, কিন্তু অনাত্মীয় দিয়ে তো আত্মীয়র স্থান পূরণ করা যায় না!

এই সময় দাদুর কাছে থাকা তোমার উচিত মা। তা ছাড়া এই বাড়িটা একটা অশান্তির আখড়া হয়ে গেছে তোমার জন্য। ভাইটির স্মৃতিও তোমাকে কষ্ট দেয়।

তুই আমাকে পরে দোষ দিস না অরিন্দম। পুত্র বলে দাম্পত্যজীবনের অশান্তির কথা তোকে সব খুলে বলতে পারব না। বিশ্বাস কর অরিন্দম, এখানে থাকলে আমি মরে যাব রে বাপ!

আমি তোমার সঙ্গে যাব মা। ছেলে হয়ে বাপকে তো আর ভুলে থাকতে পারব না। মাঝে মাঝে আসব আমি এবাড়িতে। তোমার কাছে আমার একটা অনুরোধ থাকল মা, যেদিন তোমার মনে হবে বাবার পাশে তোমার থাকা উচিত, সেদিন বাবার কাছে এসো।

অরিন্দমের এই কথার কোনো উত্তর দিল না তিশা। মনে মনে বলল, সে জীবন আমার আর হয়ে উঠবে না রে অরিন্দম!

তিশাদের দেখে উত্ফুল্ল হয়ে উঠেছিলেন মুকুন্দবাবু। এদিক-ওদিক তাকিয়ে অন্য একজনকে খুঁজেছিলেন। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, নিখিলকে ছাড়াই তিশা-অরিন্দম মুহুরিবাড়িতে চলে এসেছে।

অনূঢ়া জীবনের ঘরটাই নিজের থাকার জন্য বেছে নিয়েছিল তিশা। দোতলায় অরিন্দমের জন্য একটা রুম সাজিয়ে দিয়েছিল।

তারপর সকালটা-দুপুরটা-সন্ধেটা বাবার সঙ্গেই কাটাতে শুরু করল তিশা। বাবার সান্নিধ্য তিশার জীবনকে স্বস্তিময় করে তুলতে শুরু করল।

অরিন্দম পড়াশোনায় মন দিল।

একদিন সকাল এগারোটার দিকে ডোরবেল টিপেছিল জয়দীপ। বেশ কিছুদিন হয়ে গেল, তিশা বউদির খবর নেয়নি সে। তার ওপর দিয়েও তো কম ঝড়-তুফান গেল না!

নিখিল ভৌমিক দরজা খুলেছিলেন, কী চাই?

জয়দীপ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিল। বউদির পরিবর্তে নিখিলবাবু! তা-ও বগলকাটা গেঞ্জি গায়ে! ওল্টানো লুঙ্গি পরনে! দুহাতে বাটামরিচ লেপ্টে আছে! কী বলবে বুঝে উঠতে পারছিল না জয়দীপ।

ওই সময় নিখিল আবার বলে উঠেছিল, কাকে চাই?

জয়দীপ দ্রুত ভেবে গেল—নিখিলবাবু কি তাকে চিনতে পারছেন না! দু-একবার তো এবাড়িতে এসেছে সে! ও হো! সে সময় তো নিখিলবাবুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি তার। হ্যাঁ, শুভেন্দুর মৃত্যুর দিন দেখা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন এত্ত মানুষ ছিল, এককভাবে নিখিলবাবু তাকে মনে রাখার কোনো কারণ নেই।

আমি তিশা বউদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। জয়দীপ আমার নাম। ওঁর সঙ্গে কলেজে পড়াই।

হিসানো গলায় নিখিল বলে উঠল, বউদির সঙ্গে দেখা করবেন যখন, এখানে কেন?

আপনার কথা বুঝতে পারলাম না।

অতশত বোঝার আপনার দরকার কী? তিশা নামের কেউ এখানে থাকে না। বলে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিল নিখিল।

হতভম্ব জয়দীপ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকল। দরজা বন্ধ করার আওয়াজটা হরবালা দেবীর বাড়ির অভ্যন্তর পর্যন্ত পৌঁছল। দরজা খুলে তিনি বেরিয়ে এলেন। জয়দীপকে কাঁদো কাঁদো অবস্থায় দেখে মায়া লাগল হরবালা দেবীর।

কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ বাবা?

বউদি! তিশা! কোথায়! ছেঁড়া ছেঁড়া এলোমেলো কথা জয়দীপের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো।

তুমি বুঝি তিশার সঙ্গে দেখা করতে এসেছ?

হ্যাঁ। তিশা মুহুরি এই বাড়িতেই তো থাকেন!

আগে থাকত। এখন থাকে না। চলে গেছে। বাপের বাড়ি। অরিন্দমকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে। বাষ্পে গলা আটকে যাওয়ার ভয়ে হরবালা দেবী টুকরা টুকরা করে কথাগুলো বলে গেলেন।

শেষ পর্যন্ত আবেগকে ধরে রাখতে পারলেন না তিনি। ভেউভেউ করে উঠলেন। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে বললেন, অনেক চেষ্টা করেছে মেয়েটা। অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেও সংসারটা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছে। পারেনি। অমানুষের সঙ্গে কি মানুষ থাকতে পারে? তুমিই বলো বাবা! জয়দীপ যেন তাঁর দীর্ঘদিনের চেনা, ও রকম করেই জিজ্ঞেস করলেন হরবালা দেবী।

জয়দীপ মাথা নিচু করে থাকল।

হরবালা দেবী আবার বললেন, আমি অনেক চেষ্টা করেছি বাবা, সংসারটা জোড়া লাগুক। ব্যর্থ হয়েছি আমি।

জয়দীপ ম্লান কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, তিশা বউদি এখন কোথায় থাকেন?

বাপের বাড়িতে। ১৬/১৭ লাভ লেন। মুহুরিবাড়ি। ছেলেকেও সঙ্গে নিয়ে গেছে তিশা। এখন ও ব্যাটা নিজের হাতে রেঁধেবেড়ে খাচ্ছে।

আরো কী কী শুনতে হয়, এই ভয়ে ত্রস্ত হয়ে উঠল জয়দীপ।

ইতস্তত গলায় বলল, আমি যাই মাসিমা।

ঠিক আছে, এসো। দেখা করতে চাইলে মুহুরিবাড়িতে যাও।

আচ্ছা মাসিমা। বলে শ্লথ পায়ে তেতলা থেকে নেমে এসেছিল জয়দীপ।

হাঁটতে হাঁটতে ভেবেছিল, যাই একবার মুহুরিবাড়িতে। দেখা করে আসি বউদির সঙ্গে। লাভ লেনের মুহুরিবাড়িটা কার অচেনা? তিশা বউদির মুখে তাঁর বাপের বাড়ির কথা এতবার শুনেছে যে শুনতে শুনতে বাড়িটার একটা স্পষ্ট অবয়ব তার মনে গেঁথে গেছে।

তৎক্ষণাৎ জয়দীপ আবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, না, মুহুরিবাড়িতে যাবে না সে। তার যাওয়া উচিত নয় সেখানে। নিশ্চয়ই শোক ভুলবার জন্য বউদি বাপের বাড়িতে গেছেন। তাঁকে দেখলে বউদির পুত্রশোক উথলে উঠবে। তখন হিতে বিপরীত হবে। বউদি নিশ্চয়ই বাপের বাড়িতে ভালো আছেন। পিতার সাহচর্য তাঁকে অতীত ভোলাতে সাহায্য করবে।

 

তিশা যেদিন এলো ডিপার্টমেন্টে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছিল জয়দীপ। নানাজনে সান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছিল তখন। তিশা মাথা নিচু করে চোখের জল সামলাচ্ছিল।

শ্রেয়সী যেদিন চলে গেল তাকে ছেড়ে জয়দীপ সেদিনই ঠিক করেছিল, এ ব্যাপারে বউদিকে কিছুই বলবে না সে। কী বলবে? শ্রেয়সীর নোংরা মনের কথা বলবে? আখতার আহমেদের প্রতিশোধপরায়ণতার কথা বলবে? সব শুনে তিশা বউদি মরমে মরে যাবেন যে! না না, বউদিকে ছোট করা যাবে না কিছুতেই। জয়দীপ জানে—তিশা বউদি তাকে দেবর ডাকেন ঠিকই, কিন্তু মনে মনে ভাই বলে মানেন। সেই ভ্রাতৃত্বের অমর্যাদা করবে কী করে জয়দীপ! তার চেয়ে এ-ই ভালো, তার বুকের ক্ষতটা শুধু তারই হয়ে থাকুক।

তারপর জীবন চলতে থাকল তার আপন নিয়মে। জীবন কারো কথা শোনে না। কারো অনুরোধ রাখে না। কারো নির্দেশ মেনে চলে না। সে চলে আপন খেয়ালে। জীবনের খেয়ালিপনায় কেউ বিপর্যস্ত হয়, কেউ সঞ্জীবিত হয়। মানুষের জীবনের ভাঙাগড়ায় জীবনের কিছু আসে-যায় না। অগ্রগমনই জীবনের ধর্ম। সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে জীবন এগিয়ে চলে গন্তব্যের দিকে। কে বাঁচল আর কে মরল, কে ধনী হলো আর কে নিঃস্ব হলো, কে ঘরছাড়া হলো আর কে সুখের নীড় গড়ল, সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই জীবনের। সে যেন অন্ধ, সে যেন বাকরহিত, সে যেন বধির! তার দুটো পা-ই শুধু সচল। সচল পায়ে ভর করে অনির্দিষ্ট গন্তব্যের পানে ছুটে চলতেই জানে শুধু সে। থেমে যাওয়া তার ধাতে নেই। থামলে যে মৃত্যু, জানে সে।

চলিষ্ণু সময়ের স্রোতে ছিন্ন পাতার তরণীতে চড়ে তিশার জীবনও এগিয়ে চলে। তার জীবনের পরিণতি কী, জানে না তিশা। সিরাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল সে। তার বাবা মুকুন্দ মুহুরি তার জীবনে নিয়তি হয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। পিতার বাসনা পূরণের জন্য সে নিখিল ভৌমিক নামের আরেক নিয়তির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। স্বামী হিসেবে নিখিলকে কি সে মেনে নিতে পেরেছিল? না, পারেনি।

ুউৎকট চেহারার এই লোকটি যতবার তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে, প্রতিবার মিলনকে বলাৎকার বলে মনে হয়েছে তার। তার পরও সব কিছু মেনে চলেছে সে। প্রেমের তৃষায় কলজে ফেটেছে তার, বিনিময়ে পেয়েছে কর্কশ, রুক্ষ আচরণ। মানুষরূপী নিয়তি ছাড়াও অদৃশ্য নিয়তি কি তাকে সুখে-স্বস্তিতে থাকতে দিয়েছে? দেয়নি। যদি দিত, তাহলে তার বুকের ধনকে কেড়ে নিল কেন? কেন তাকে পুত্রহারা করল ঈশ্বর নামের সেই নিষ্ঠুর নিয়তি? তিশা আপন মনে এসব ভাবে আর বিড়বিড় করে কী সব যেন বলে! লক্ষ করে জয়দীপ।

 

একদিন জিজ্ঞেস করে, একা হলেই নিজে নিজে কী সব বলেন বউদি! কী বলেন?

তিশা যেন ত্রস্ত হয়। দ্রুত বলে, না না, কিছু না!

কিছু তো বলেন বউদি!

তিশা চুপ করে থাকে।

জয়দীপ কথার মোড় ঘোরায়, অনেকটা বছর কেটে গেল বউদি। অরিন্দম ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করেছে। আপনার বাবাও তো...। কথা শেষ করে না জয়দীপ।

বাবার বয়স হয়েছিল অনেক। স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তার।

নিখিলদার কী খবর?

এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না তিশা। চমকে জয়দীপের মুখের দিকে তাকাল। তারপর চাপা একটা শ্বাস ত্যাগ করে বলল, বাবার মুখাগ্নি করতে এসেছিল। এত কিছুর পরও তার ইগোটা কমেনি।

আপনার কি কমেছে বউদি?

জয়দীপের এ প্রশ্নের উত্তর দিল না তিশা। বলল, অরিন্দম আমেরিকায় যেতে চাইছে। আরো নাকি পড়াশোনা করবে!

তা তো ভালো কথা বউদি।

আমিও ভাবছি, অরিন্দমকে আমেরিকায় পাঠানো উচিত। এত টাকা-পয়সা দিয়ে আমি কী করব! বাবা তো কম দিয়ে যায়নি! ও হ্যাঁ, আরেকটি কথা বলতে ভুলে গেছি জয়দীপ।

কী কথা বউদি?

 

শুভেন্দুর নামে মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে একটা বৃত্তি চালু করতে চাই আমি। স্কুলের হাতে এক লাখ টাকা দেব। বছরে তার থেকে যা সুদ আসবে, তা থেকে সিক্সে বার্ষিক পরীক্ষায় যে ফার্স্ট হবে, তাকে বৃত্তিটা দেওয়া হবে। শুভেন্দু সিক্সে পড়ত তো।

এটা খুব ভালো ডিসিশন বউদি আপনার। বৃত্তিটার মাধ্যমে শুভ ওর স্কুলে বেঁচে থাকবে।

কাল চলো তুমি আমার সঙ্গে। স্কুলে। হেডমাস্টারের সঙ্গে দেখা করি। যদি ব্যবস্থাটা করা যায়!

অবশ্যই করা যাবে বউদি।

 

 

এগারো.

শুভেন্দুর নামে মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুলে বৃত্তিটা চালু হয়েছিল। অরিন্দম উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় চলে গিয়েছিল। তিশা অ্যাসোসিয়েট প্রফেসরের পদে প্রমোশন পেয়েছিল। বেসরকারি কলেজে জয়েন করেছিল বলে বউদির প্রমোশনটা দেরিতে হয়েছিল। একই সময়ে জয়দীপও অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হয়েছিল। সিটি কলেজে একটামাত্র পোস্ট খালি থাকায় জয়দীপকে চট্টগ্রাম কলেজে চলে যেতে হয়েছিল।

জয়দীপ অন্য কলেজে চলে যাওয়ায় অনেকটা একাই হয়ে গেল তিশা। অর্ধেন্দু রুদ্র প্রিন্সিপাল হয়ে অন্য জেলায় চলে গেছে। রাশেদা চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্বামীর সঙ্গে পার্মানেন্টলি লন্ডন চলে গেছে। আগামী মাসে আখতার আহমেদ রিটায়ারমেন্টে যাবে। নতুন যারা এসেছে, তাদের সঙ্গে তেমন সখ্য গড়ে ওঠেনি তিশার। এই একাকিত্বের সময়ে তার মধ্যে অদ্ভুত এক রূপান্তর লক্ষ করা গেল।

পরীক্ষার হলে ডিউটি দেওয়ার জন্য লালায়িত হয়ে উঠল তিশা। ডিউটি দিলে এক্সট্রা টাকা পাওয়া যায়। খুব বেশি যে পাওয়া যায়, তা না। প্রতি ডিউটি আড়াই শ তিন শ। তিশা যে রকম সচ্ছল এবং যে রকম ধনী বাবার মেয়ে, তার কাছে ডিউটির এই টাকাগুলো একেবারেই তুচ্ছ। কিন্তু এক অজানা কারণে ওই সামান্য টাকার ডিউটির জন্য পরীক্ষা কমিটির কাছে গিয়ে ধরনা দেয় তিশা।

এই কলেজে নতুন যারা, তারা তিশা বউদির আদ্যোপান্ত জানে না। তিশাকে লোভী একজন মহিলা ভেবে বসে। তাদের একজন ওসমান গণি।

ওসমান গণি বলে, আপনার প্রাপ্য ডিউটি আপনাকে দেওয়া হয়েছে ম্যাডাম।

তিশা অগোছালো কণ্ঠে বলে, না, দু-একটা যদি বাড়তি পাওয়া যেত!

ওসমান ঠোঁটকাটা। কেঠো গলায় বলে, আপনার এত টাকা দরকার কিসের জন্য? থাকেন তো বাপের বাড়িতে! ভাড়া দিতে হয় না! ছেলে আমেরিকায়!

তোমার অতশত বলার দরকার কী ছোকরা? দিতে পারবে কি না সেটা বলো।

না, দিতে পারব না। দেব না এ জন্য যে আপনার তেমন দরকার নেই।

তিশা কেমন জানি খেপে ওঠে। এই খেপামি স্বাভাবিক নয়। চোখ-মুখ অদ্ভুতভাবে ঘুরিয়ে বলল, তুমি আমাকে অপমান করছ কেন ছোকরা? সেদিনের ছেলে, আদব-কায়দা জানো না? দাঁড়াও প্রিন্সিপালের কাছে গিয়ে কমপ্লেইন করছি তোমার নামে।

তিশার কথা শুনে ওসমান থতমত খেয়ে যায়। এই কলেজে জয়েন করেছে দুই বছর হয়ে গেল তার। জয়েন করে তিশা মুহুরির অনেক সুনাম শুনেছে—দায়িত্ববান, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ভালো শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট সুনামের অধিকারী। সে এও শুনেছে, একটা সময়ে তিশা মুহুরি দুর্দান্ত এক রূপময়ী নারী ছিলেন। এখন যদিও একটু পৃথুলা হয়ে গেছেন। তার পরও এই বয়সে তাঁর দেহ ঘিরে রূপের জোছনা। এই তিশার এ রকম আচরণ দেখে অবাক হয়ে যায় ওসমান।

পাশ থেকে দর্শন বিভাগের হেড রীতা দত্ত বলেন, তিশা বউদি কখনো এ রকম ছিলেন না। ছোট ছেলেটি অ্যাকসিডেন্টে মারা যাওয়ার পর কী রকম যেন পরিবর্তন ঘটে গেল তাঁর মধ্যে! ডিউটির জন্য এ রকম ঝুলাঝুলি তাঁর চরিত্রের সঙ্গে যায় না কিছুতেই।

ওসমান উপহাসের কণ্ঠে বলে ওঠে, তাঁর অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে খাটিয়ায় শুয়ে শ্মশানের দিকে রওনা দেওয়ার সময় মৃত তিশা ম্যাডামের কানের কাছে কেউ যদি চুপে চুপে বলে, ম্যাডাম, আপনার আরেকটা ডিউটি বাকি রয়ে গেল যে! অমনি তিশা ম্যাডাম খাটিয়ায় উঠে বসবেন।

রীতা দত্ত অত্যন্ত কঠিন গলায় বলে উঠলেন, ওসমান সাহেব, এটি আপনার বড় নির্মম ঠাট্টা হলো। তিশাদি অনেক সিনিয়র মানুষ। তাঁর টাকার কোনোই অভাব নেই। মানি, এটা তাঁর অপ্রকৃতিস্থতা। তাঁর দিকটা বুঝে দেখুন। খুব বেশিদিন চাকরি নেই তিশাদির। তাঁকে এই কদিন অপমান করবেন না।

ওসমান গণি লজ্জা পেল খুব। মাথা নিচু করে থাকল।

রীতা দত্ত বললেন, আজকাল মনোরোগের চিকিৎসার অনেক উন্নতি হয়েছে। তিশাদিকে মনোচিকিৎসক দেখানো দরকার। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলেন রীতা দত্ত।

আরেকটা ঘটনা তিশা মুহুরিকে খেলো করে ছাড়ল।

মাঝেমধ্যে জয়দীপ তিশা বউদির সঙ্গে দেখা করতে যায়, মুহুরিবাড়িতে। সেদিনও গিয়েছিল। নানা কথার ফাঁকে জয়দীপ জানাল, অর্ধেন্দু স্যার খুব অসুস্থ।

সে না এখন নোয়াখালী কলেজের প্রিন্সিপাল? জিজ্ঞেস করল তিশা।

অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি এখন চট্টগ্রামের আফিমের গলির বাড়িতে।

তাহলে তো তাঁকে একবার দেখতে যাওয়া উচিত আমাদের!

আপনি ঠিকই বলেছেন বউদি। আপনার একসময়ের ক্লাসমেট। উপরন্তু তিনি আমাদের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন।

কাল কলেজ ছুটির পর চলো। দেখে আসি।

ঠিক আছে।

তোমার ছুটি হয়ে গেলে সিটি কলেজে চলে এসো। এখান থেকে দুজনে একসঙ্গে যাব।

সেদিন বিকেলে তিশা আর জয়দীপ একসঙ্গে রুদ্রবাবুর বাসায় গিয়েছিল। বক্সিহাটের মোড় থেকে বড় সাইজের সাগরকলা কিনে নিয়েছিল জয়দীপ। খালি হাতে স্যারকে দেখতে যায় কী করে!

অর্ধেন্দু রুদ্র খুশি হয়েছিলেন খুব। দুজনকে দেখে। বেডরুম থেকে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছিলেন তিনি। বিশাল আকারের কলা দেখে রুদ্রবাবু বলে উঠেছিলেন, আর  যা-ই হোক তিশার নজরটা ভালো।

আরে আমি না! আমি না! জয়দীপই এনেছে কলাগুলো।

তা জয়দীপবাবু, আপনি আবার টাকা খরচ করতে গেলেন কেন? দেখতে এসেছেন—এ-ই তো যথেষ্ট!

কী যে বলেন স্যার, অসুস্থ আপনাকে দেখতে আসব, খালি হাতে আসব!

এই সময় ট্রে ভর্তি নাশতা নিয়ে রুদ্রবাবুর স্ত্রী ঘরে ঢুকলেন। জয়দীপ উঠে দাঁড়াল।

তিশা বলল, আর যা-ই বলো রুদ্র, তোমার স্ত্রীটি কিন্তু যথেষ্ট লাবণ্যময়ী। এখনো কি আমার জন্য হা-পিত্যেশটা আছে তোমার মধ্যে?

ট্রেটা সেন্টার টেবিলে নামাতে গিয়ে রুদ্রবাবুর স্ত্রীর হাতটা কেঁপে উঠল। মুখটা ম্লান হয়ে গেল তাঁর। লক্ষ করল অর্ধেন্দুবাবু।

হাসতে হাসতে বলল, তিশা একটু ও রকমই! মুখে যা আসে বলে ফেলে! আগপর ভাবে না। আমার ক্লাসমেট তো, তাই ওভাবে বলল! বসো তুমি।

না, আমি আসি। চা-টা আনতে হবে। তোমরা গল্প করো। বিষণ্ন গলায় বলল রুদ্রর স্ত্রী।

এর পরে আলাপ আর তেমন করে জমল না। জয়দীপ বিমূঢ় হয়ে বসে থাকল। অর্ধেন্দুবাবু আরো কিছুক্ষণ আলাপ চালালেন বটে, কিন্তু বারবার তাল কেটে যাচ্ছিল। তিশাদির ওসবে খেয়াল নেই। ট্রের ওপর অনেকটাই হামলে পড়ে খেয়ে যেতে লাগল।

চা নিয়ে রুদ্রবাবুর স্ত্রী আর এলো না। ঝিকে দিয়ে দুই কাপ চা পাঠিয়ে দিল।

একটা সময়ে তিশা বলল, এবার যাই রুদ্র।

রুদ্র বলল, যাবে? আচ্ছা যাও। আরেকটু বসে যেতে পারতে!

জয়দীপ তাড়াতাড়ি বলে উঠল, না না স্যার, আমরা আসি। পরে না হয় কোনো একদিন আসব। জয়দীপের ভেতরটা তখন সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। তিশা বউদি কী বলতে আবার কী বলে ফেলেন! যেতে পারলে বেঁচে যায় যেন সে!

ঠিক আছে। বলে সোফা ছেড়ে উঠতে চাইল অর্ধেন্দু রুদ্র।

জয়দীপ বলল, আপনি উঠবেন না স্যার।

তিশা দরজার দিকে পা বাড়ানোর আগে অদ্ভুত একটা কাজ করে বসল। টেবিলে রাখা জয়দীপের আনা কলা থেকে ঝটাঝট ছটা কলা ছিঁড়ে কাঁধব্যাগে পুরে ফেলল। কেউ কিছু ভাববার আগেই ত্বরিত কাজটা সম্পন্ন করল তিশা।

কী রকম পাগুলে গলায় বলল, এত কলা রুদ্র কী করবে? শুধু শুধু পচবে। তাই কয়েকটি কলা নিয়ে নিলাম আমি।

জয়দীপের চোখ ধপ করে জ্বলে উঠল হঠাৎ। কিছু একটা বলতে গিয়ে অর্ধেন্দুবাবুর ওপর চোখ পড়ল। দেখল, রুদ্র স্যারের চোখেমুখে অনুনয়। রুদ্রবাবুর চোখমুখ বলছে, কিছু বলবেন না জয়দীপ, প্লিজ। যা-ই করুক তিশা, শেষ পর্যন্ত সে আমার ক্লাসমেট। তাকে কিছু বলবেন না জয়দীপ। ও কষ্ট পেলে আমি দুঃখ পাব বড়।

দ্রুত নিজের উত্তেজনাকে গুটিয়ে নিল জয়দীপ। ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, চলেন বউদি। স্যার, নমস্কার। রুদ্রবাবুর দিকে ফিরে বলল জয়দীপ।

দরজা খুলে দুজনে রাস্তায় নেমেছিল। অনেক কথা বলতে চাইল জয়দীপ—বউদি, কেন আপনি রুদ্র স্যারের স্ত্রীকে হার্ট করলেন? কেন কলাগুলো এভাবে ছিঁড়ে ব্যাগে পুরলেন? আপনি কি আগের সেই তিশা বউদি?

এসবের কিছুই বলল না জয়দীপ। শুধু বস্ফািরিত চোখে তিশাকে গোটাটা সময় দেখে গেল। তিশা বউদির আচরণে অদ্ভুত এক রূপান্তর লক্ষ করল জয়দীপ। তার মনে হলো বউদি এখন স্বাভাবিক নন। তাঁর চলায়-বলায় কী রকম এক অস্বাভাবিকতা দেখে ভয় পেয়ে গেল জয়দীপ। বউদি কি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছেন!

বিদায় নেওয়ার আগে তিশার দিকে তাকিয়ে জয়দীপ বিব্রতভাবে বলল, নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন বউদি।

এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর জয়দীপকে মুহুরিবাড়িতে ডাকল তিশা।

কোনো ভূমিকা ছাড়া বলল, ছেলেকে বিয়ে করাব জয়দীপ।

জয়দীপ তিশা বউদির কথা ধরতে পারল না। কিছুটা আনমনা ছিল সে তখন। ভাবছিল, সেদিন রুদ্র স্যারের বাড়িতে ঘটে যাওয়া কলাকাহিনি। ভাবছিল বউদির এলোমেলো আচরণের কথা।

কোনো উত্তর দিচ্ছ না যে! তিশার কথায় সংবিতে ফেরে জয়দীপ।

বলে, কী উত্তর দেব! কিছু বলেছিলেন?

আরে, ছেলের বিয়ের কথা বললাম না! অরিন্দমকে বিয়ে করাব বললাম তো!

অরিন্দমকে বিয়ে করাবেন! সে না নিউ ইয়র্কে? দেশে এসেছে নাকি! কখন এলো?

কী আবোলতাবোল বলছ জয়দীপ? অরিন্দম দেশে আসতে যাবে কেন? আসবে তো বিয়ের সময়!

ওর পড়াশোনা কি শেষ হয়েছে? বিয়ে সম্পর্কে ওর সঙ্গে কথা বলেছেন? রাজি হয়েছে ও? মেয়ে দেখেছেন? ছেলে না দেখে কনেপক্ষ রাজি হলো? এতগুলো প্রশ্ন একনাগাড়ে করে দম নেওয়ার জন্য থামল জয়দীপ।

পাগলের মতো একাদিক্রমে বকে যাচ্ছ কেন জয়দীপ? তুমি ভাবছ অরিন্দমের সঙ্গে কথা না বলে আমি ডিসিশন নিয়েছি! ওর সঙ্গে কথা বলেই তো সিদ্ধান্তটা নিলাম আমি! ফোনে তার সঙ্গে কথা বলেছি, একবার নয়, বারবার। দুবছর হয়ে গেছে ছেলেটা যে গেল! শেষের কথায় বাৎসল্যের মিশেল।

ব্যাপারটা তখনো বিশ্বাস করতে পারছে না জয়দীপ। বলে, মেয়ে...।

সে তোমাকে ভাবতে হবে না। কৃষ্ণা সেনের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। অপর্ণাচরণ হাই স্কুলের টিচার কৃষ্ণা। তিনটে মেয়ে। বড়টা অনার্সে পড়ে। ইংরেজিতে। তোমার কলেজে। কৃষ্ণার স্বামী ছোটখাটো ব্যবসা করে। অরিন্দমের পরিচয় পেয়ে এককথায় রাজি হয়ে গেছে। ছেলে নিউ ইয়র্ক থাকে বলে কথা! ইঞ্জিনিয়ার! হত্যে দিয়ে পড়েছে আমার সামনে। বলেছি, এনগেজমেন্ট আগে হয়ে যাবে। অরিন্দম এলে বিয়ে। তাতেই রাজি। জয়দীপকে কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না তিশা।

তিশার দিকে ভ্যাবাচেকা চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোনো পথ রইল না জয়দীপের। স্তম্ভিত চোখে তিশার দিকে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলল, বউদি, আপনার মাথাটা সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে গেল না তো!

বারো.

জয়দীপ বুঝে নিল, এ তিশা বউদির অবুঝপনার বড় একটা সিদ্ধান্ত। ভাবছে বটে এ বউদির অবুঝপনা, আসলে এ তো পাগলামিই! এক ধরনের অস্থিরতা, বাতুলতা, খেপামি বউদির ইদানীংকালের কাজগুলোর মধ্যে কেমন জানি স্পষ্ট হয়ে উঠছে! বউদি কি শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে যাচ্ছেন? মস্তিষ্ক বিকৃতির দিকে এগোচ্ছেন তিনি?

যদি সত্যি সত্যি পাগুলেপনার দিকে ঝোঁকেন তিনি, তাহলে তার জন্য তো তিনি দায়ী নন! দায়ী তো তাঁর নিয়তি! নিয়তির কথাই বলছি কেন? নিয়তি তো অদৃশ্যমান! অদৃশ্যমান অলীক কাউকে দৃশ্যমানতায় নিয়ে এসে তার কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে দেওয়ার তো কোনো মানে হয় না! মানুষের নিয়তি তো মানুষেরাই! দুর্বল মানুষের ভাগ্য তো সবল মানুষেরাই নিয়ন্ত্রণ করে! বদমাশকে মহান বানায়, সাধুকে চোর বানায় তো ওই ক্ষমতাশালী নিয়তি সদৃশ মানুষগুলোই! তিশা বউদির জীবনটাকে গুঁড়িয়ে, গুলিয়ে দিল তো ওই ক্ষমতাবান মানুষেরাই! মুহুরি, মানে মুকুন্দ মুহুরি তাঁর জীবনে প্রথম নিয়তি হয়ে উপস্থিত হলেন। এত রূপময়ী, শিক্ষিত, সংস্কৃতিসম্পন্ন একজন তরুণীর শিল্পিত একটা বাসনা থাকা স্বাভাবিক। মুকুন্দবাবু কন্যার বাসনার তোয়াক্কা করলেন না। অনেকটা জোর করেই নিখিলের সঙ্গে বিয়েটা দিলেন। বিয়ের পর খোঁজ নিলেন না, মেয়ে তাঁর স্বামীঘরে সুখে আছেন কি না? তারপর নিখিলের অস্বাভাবিক আচরণ বউদিকে অস্থির আর অসুখী করে তুলল। তিনি ধরে নিলেন, স্বামী তাঁর শরীর বোঝে, প্রেম বোঝে না। বউদির কাছে কামের চেয়ে প্রেমের মূল্য অনেক বেশি ছিল। স্বামীর সঙ্গে আদর্শে মিলল না তাঁর। স্বামীর ঘরেই বড় একাকী হয়ে গেলেন। তাঁর রুটিন হয়ে গেল শোয়া-সেক্স-ঘুম, খাওয়াদাওয়া-সেক্স। এ জঘন্যতা থেকে মুক্তি চাইলেন তিশা বউদি। সন্তানদের আঁকড়ে ধরলেন। কিন্তু লরির ড্রাইভার নামক নিয়তি তাঁর ওই স্বস্তিটুকুও কেড়ে নিল। বাপের বাড়ি চলে এলেন তিনি। ভাবলেন, পিতার সান্নিধ্য তাঁকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবে। মুকুন্দবাবু মারা গেলেন, অরিন্দম আমেরিকায় চলে গেল। ভীষণ একা হয়ে গেলেন বউদি। বাড়ি ভর্তি ঝি-চাকর আছে ঠিক, কিন্তু মনের কথা শেয়ার করার তো কেউ নেই তাঁর চারপাশে!

বউদি তো সত্যি সত্যি নিঃসঙ্গ এখন! নিঃসঙ্গতা বড়ই দুর্বহ। একাকিত্ব মানুষকে অস্থির করে তোলে। মানুষ তখন ভালো আর মন্দের বোধটুকু হারাতে বসে। কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক—এই উপলব্ধি হারিয়ে মানুষ তখন আবোলতাবোল কাজ করে, অবাস্তব সিদ্ধান্ত নিতে থাকে। তিশা বউদিও এখন সেই স্তরে পৌঁছে গেছেন। নইলে কেন অরিন্দমকে বিয়ে করানোর সিদ্ধান্ত নেন ধুম করে? কোথায় সামনাসামনি বসে ছেলের সঙ্গে কথা বলবেন, তা না, ওভার টেলিফোনে কথা বলে সিদ্ধান্তই নিয়ে বসলেন, ছেলেকে বিয়ে করাবেন!

কোথায় যেন একটা ভুল হচ্ছে! কোথায় ভুল হচ্ছে, ধরতে পারছে না জয়দীপ। কিন্তু ভুল যে হচ্ছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত সে। বউদিকে সতর্ক করতে গিয়েও চুপ থাকে জয়দীপ।

বেশ কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা বউদি, কনেপক্ষ বর না দেখেই এনগেজমেন্টের জন্য রাজি হয়ে গেল?

গেল তো! অরিন্দমের মতো সোনার টুকরা ছেলে পাবে কোথায়? করে তো মাস্টারি! বউদি নিজেও যে মাস্টারি করে সেই মুহূর্তে ভুলে গেল।

ছবি দেখলেন শুধু! বউদির কথা বিশ্বাস করতে মন চাইছে না জয়দীপের।

আরে ছোকরা! আমি কি মিথ্যে বলছি! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অরিন্দমের ছবি দেখলেন তাঁরা। মেয়েকেও দেখালেন। মেয়েও নাকি ভীষণ রাজি বিয়েতে!

কে বলল?

মেয়ের মা-বাবা বললেন। আর কে বলবেন?

মেয়ের সঙ্গে আপনার দেখা হয়নি?

দেখা হয়নি আবার! মুখোমুখি বসিয়ে দুই ঘণ্টা কথা বলেছি। বিশ্বাস করো জয়দীপ, এমন সুন্দরী মেয়ে আমি জীবনে দেখিনি! তিশার গলা আবেগে আপ্লুত।

কী নাম মেয়েটির?

অবন্তী। অরিন্দমের সঙ্গে অবন্তী নামের মিল আছে না? তা আছে মানলাম। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে অবন্তী কী বলল? রাজি সে?

অবশ্যই রাজি। নইলে হাসিমুখে আমার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলল কী করে?

তা কোথায় কথা হয়েছে আপনাদের?

এই বাড়িতেই তো এলেন ওঁরা! মেয়ে এলো, সঙ্গে মা-বাবা এলেন। মা-বাবা দুজনকেই পছন্দ হয়েছে আমার। বেয়াই হিসেবে রজতবাবু বেশ ভালোই হবেন। আরেকটা কথা বলতে ভুলে গেছি তোমায়, যাওয়ার সময় মেয়েটি আমার দু-পা ছুঁয়ে প্রণাম করল!

জয়দীপ বুঝে ফেলল যে ঘটনা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। ব্যাপারটা তার কাছে গোলমেলে ঠেকছে, এটা বলারও উপায় নেই এখন।

তা বউদি, এখন কী করতে চান?

এনগেজমেন্টের তারিখটা ঠিক করার জন্যই তোমাকে ডেকেছি। অনুষ্ঠানটা এ বাড়িতেই হবে। এত বড় বাড়ি! শ-দেড় শ জনের খাওয়ার ব্যবস্থা এখানে অনায়াসেই করা যাবে।

নিখিলদার সঙ্গে কথা বলেছেন?

থতমত খেলেন তিশা বউদি। মৃদু গলায় বললেন, ফোন করেছিলাম, আসতে অনুরোধ করেছি। এলে ভালো, না এলে করার কিছু নেই। শেষের দিকে কণ্ঠটা রুক্ষ হয়ে এলো তিশার।

যথা তারিখে আশীর্বাদের কাজ সম্পন্ন হলো। উভয় পক্ষের আত্মীয়ের উপস্থিতিতে তিশা পুত্রবধূর অনামিকায় দামি আংটি পরিয়ে দিল। না, নিখিল ভৌমিক আসেনি এই অনুষ্ঠানে। এ জন্য তিশার যে খুব মাথাব্যথা, তাকে দেখে মনে হলো না।

খাওয়াদাওয়া শেষে এই সিদ্ধান্ত হলো, অরিন্দম দেশে এলেই বিয়ের অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে আসার জন্য ছেলেকে তাগাদা দিয়ে যাবে তিশা। বিপুল সন্তুষ্টি নিয়ে কনেপক্ষ নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেল। জয়দীপ এ সব কিছুর দর্শক হয়ে থাকল।

তারপর সময় বয়ে যায়। এক মাস, দুই মাস। এক বছর, দেড় বছর। এমনকি দুই বছরও পার হয়ে যায়। অরিন্দম দেশে আসে না।

এরই মধ্যে তিশা মুহুরি রিটায়ারমেন্টে আসে।

রজতবাবু আর কৃষ্ণা সেন বারবার যোগাযোগ করে তিশার সঙ্গে। কখনো চোখ কুঁচকে, কখনো উদ্বেগী কণ্ঠে বলে, দিদি, দুই-দুইটা বছর পার হয়ে গেল! সমাজে তো মুখ দেখানো দায় হয়ে গেল আমাদের! মেজো মেয়েটাও সোমত্ত হয়ে উঠল। আশা করেছিলাম, অবন্তীর বিয়েটা হয়ে গেলে মেজোটারও বিয়ে দিয়ে দেব। কাজের কাজ কিছুই তো হলো না দিদি!

আরেক দিন বলে, আমাদের বাঁচান দিদি। মানুষের মুখে তালা দিতে পারছি না। অবন্তীর দিকে তাকাতে পারি না। সারা দিন মনমরা হয়ে ঘরে বসে থাকে। কী রকম যেন আনচান করে!

কোনো কোনো দিন মুহুরিবাড়িতে চলে আসে রজত-কৃষ্ণা। তিশার সামনে হত্যে দিয়ে পড়ে, কী হলো দিদি, বড় ঢাকঢোল পিটিয়ে এনগেজমেন্টটা করালেন। বললেন, অরিন্দম এলো বলে! এই বলে বলে দুই বছর তো পার করলেন! ছেলের টিকির দেখাও তো পেলাম না!

এই দুই বছর ধরে তিশার চেষ্টারও অন্ত ছিল না। টেলিফোনের পেছনে অনেক টাকা ঢেলেছে। বাংলাদেশ-নিউ ইয়র্ক কথা বলা তো আর চাট্টিখানি কথা নয়। টাকার দিকে তাকায়নি তিশা। বারবার বলেছে, তুই আয় অরিন্দম। তোর জন্য একটা মেয়ে অপেক্ষা করে আছে। বাঙালি সমাজকে তোর তো না চেনার কথা নয়! নোংরা কথা ছড়াতে মুহূর্তকাল দ্বিধা করে না। তোর শ্বশুরবাড়ি নাজেহাল হচ্ছে। তুই ওঁদের বাঁচা বাছা, আমাকে টেনশন থেকে মুক্ত কর।

মনোযোগ দিয়ে সব শোনে অরিন্দম। তারপর বলে, তুমি কী ভাবছ মা, আমি চেষ্টা করছি না! সেই থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি। এত দিন ভালো কোনো জব ছিল না মা। এই মাস পাঁচেক হলো একটা ভালো চাকরি পেয়েছি। অনেক বেতন মা। এই সময় ছুটি মিলছে না। ছুটি না নিয়ে চলে এলে চাকরিটা যাবে মা। তুমি কি  তা-ই করতে বলো মা?

তারপর কণ্ঠকে জলে ভিজিয়ে অরিন্দম বলে, আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। চাকরিটা পোক্ত হোক। ফিরব যখন, তোমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে আসব মা।

ছেলের কথা শোনে তিশা চুপ করে থাকে। অরিন্দমের কথাগুলো নিজের ভাষায় কৃষ্ণা-রজতকে বলে। শেষে বলে, আর কটা মাস অপেক্ষা করুন দাদা। ছেলে এলো বলে।

রজতবাবুর কণ্ঠে ক্ষোভ জড়ায়, আর অপেক্ষা করতে পারছি না আমরা। যে ফাঁদে ফেলেছেন, হয় মেয়ে আত্মহত্যা করবে, না হয় দেশছাড়া হতে হবে আমাদের!

ও রকম করে বলছেন কেন দাদা? শিগগির আসবে বলল তো!

অরিন্দমের কথায় আর বিশ্বাস রাখতে পারছি না। আপনি এক কাজ করুন, ছেলের ফোন নম্বর আর অ্যাড্রেসটা আমাদের দিন। আমরা একবার চেষ্টা করে দেখি। রজতের কণ্ঠস্বর শেষের দিকে কর্কশ হয়ে ওঠে।

আমাকে আর কিছুদিন সময় দিন। বাষ্পাচ্ছন্ন গলা তিশার।

এতক্ষণে কৃষ্ণা সেন কথা বলে, অরিন্দমের ফোন নম্বর আর অ্যাড্রেস দিতে অসুবিধা কোথায়? অবন্তীর বাপ চাইছে যখন, দিন না। ব্যবসা করে। তারও তো দু-একজন নিউ ইয়র্কে জানাশোনা থাকতে পারে!

তিশা একটা কাগজে অরিন্দমের ফোন নম্বর আর ঠিকানা লিখে রজতের হাতে দেয়। বলে, দেখুন দাদা, অরিন্দম আমার প্রাণের ধন। সে হার্ট হয়, এ রকম কোনো কথা বলবেন না তার সঙ্গে। বিদেশ-বিভুঁইয়ে একা একা থাকে ছেলেটা!

তিশা মুহুরির কাকুতি দেখে রজতবাবুর মন নরম হয়ে আসে। বলে, আপনি নিশ্চিত থাকুন দিদি। অরিন্দম শুধু আপনার ছেলে তো নয়, আমাদেরও তো জামাই! আর জামাই তো ছেলের মতোই!

সেদিনের মতো রজত-কৃষ্ণা বিদায় নেয়।

 

দিন কুড়ি পরে এক সন্ধ্যাবেলায় ফিরে আসে রজত সেন, এই মুহুরিবাড়িতে। সঙ্গে অনেক লোকজন।

বীভৎস এক চিৎকার দিয়ে একতাড়া ছবি তিশা মুহুরির মুখের ওপর ছুড়ে দিল রজত সেন। কদর্য কণ্ঠে বলল, প্রাণের ধন, সোনার টুকরার কীর্তি দেখো। যেমন মা, তেমন ছেলে। ফ্রডবাজ। হারামজাদা। শালার পুত। খানকির পোলা। আরো কী কী যেন বলে চলল রজত সেন।

তিশার কান দিয়ে কিছুই ঢুকল না। সে তখন হতভম্ব, স্তম্ভিত! রজতবাবু এ রকম করছেন কেন? এ রকম নোংরা কথাবার্তা বলছেন কেন? তিনি তো তাঁর আত্মীয়ই! আত্মীয় হয়ে তাঁকে এ রকমভাবে অপমান করছেন কেন?

সন্ধের দিকে নিচতলার বড় বারান্দায় আরামকেদারায় গা এলিয়ে বসেছিল তিশা। কিছুক্ষণ আগে পাশের টি-টেবিলে চা দিয়ে গেছে লক্ষ্মী। আধেক খাওয়া চায়ের কাপটি টি-টেবিলে পড়ে ছিল।

হঠাৎ সেই টি-টেবিলে প্রচণ্ড এক লাথি দিয়ে বসল রজত সেন। মুখে বলল, তোরা দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভাঙ। সামনে যা পাস, সব ভেঙে তছনছ কর। যে আমার মেয়ের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে, তাকে শান্তিতে থাকতে দেব না আমি।

রজত সেনের মুখ থেকে নির্দেশ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গের লোকজন বাড়িজুড়ে তাণ্ডব শুরু করল। যা সামনে পেল, লণ্ডভণ্ড করতে থাকল। ড্রয়িংরুমের একটা জিনিসও আস্ত রাখল না। কাপ-ডিশ-আলমারি-সোফা-শোকেস, চেয়ার, ডাইনিং টেবিল সবই চুরমার করল। তারপর তারা সামনের বাগানে নামল। মুহূর্তেই সাজানো বাগানকে শ্মশান বানিয়ে ছাড়ল। গেটম্যান, বাজার সরকার, কাজের ঝি বাধা দিতে চাইল। তাদের বেধড়ক পেটাল রজত সেনের লোকেরা।

মতিলাল কাছে এসে বলল, থানায় ফোন করি দিদি?

তিশা হাত তুলে বারণ করল। স্তব্ধ চোখে লঙ্কাকাণ্ড দেখে যেতে লাগল তিশা মুহুরি। কী কারণে রজত সেন তার বাড়িতে ভাঙচুর চালাচ্ছে, বুঝতে পারল না তিশা। তবে অনুমান করল, ভয়ংকর কিছু একটা হয়েছে।

 

তেরো.

বৃত্তান্তটা এ রকম।

রজত সেনের এক পাড়াতো ভাইপো নিউ ইয়র্কে থাকে। শিপে চাকরি করত সে। সুযোগ বুঝে একদিন জাহাজ থেকে ইংল্যান্ডে নেমে যায়। সেখানে লুকিয়ে-চুপিয়ে অনেকটা বছর কাটিয়ে দেয়। তারপর কী করে যেন আমেরিকায় পাড়ি জমায়! বহুদিনের চেষ্টায় গ্রিনকার্ড পেয়ে যায় গৌতম। ট্যাক্সি চালানো শুরু করে। বিয়ে করে নিউ ইয়র্কের বাঙালিপাড়ায় থিতু হয় সে।

এই গৌতমের সঙ্গেই যোগাযোগ করে রজত সেন। গৌতমের বাবা মানিক বিশ্বাসের কাছ থেকে গৌতমের ফোন নম্বরটা জোগাড় করে রজত। ফোনে গৌতম পূর্বাপর সব কথা খুলে বলে। শেষে অরিন্দমের ফোন নম্বর আর ঠিকানা দিয়ে তার বর্তমান অবস্থা জানানোর জন্য অনুরোধ করে।

বলে, এ আমার জীবন-মরণ সমস্যা ভাইপো। অরিন্দমের খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাও বাপ। তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব আমি।

সেই গৌতম অরিন্দমের বেশ কয়েকটি ছবি পাঠিয়েছে। সে ছবিগুলোতে বিদেশি এক নারীর কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে অরিন্দম। পাশে এক শিশুর ছবিও। চিঠিতে গৌতম লিখেছে, আমাদের স্ট্রিটের একেবারে দক্ষিণ মাথার একটা ফ্ল্যাটে অরিন্দম সপরিবারে থাকে। বড় একটা চাকরি করে সে। বিয়ে করেছে বছর তিনেক হলো।

এই সূত্র ধরেই রজত সেনের মুহুরিবাড়িতে হামলা। অবিরাম গালাগালির ফাঁকে ফাঁকে এসব কথাই বলে গেল রজত।

তার গালাগালি ছিল সব ভব্যতা ছাড়ানো। তিশা মুহুরির গায়ে হাত দেওয়াটা শুধু বাকি রাখল রজত সেন।

সব কিছু মুখ বুজে সহ্য করে গেল তিশা। ছুড়ে দেওয়া ছবিগুলোর একটি তার কোলে এসে পড়েছিল। ছবিটিতে অরিন্দম একটি তরুণীকে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। অপমানে-লজ্জায় তিশার এখন প্রচণ্ডভাবে কান্না করার কথা। কিন্তু দুচোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল না তার। উন্মীলিত চোখে চারদিকে ঘটে যাওয়া সব কিছু দেখে গেল শুধু।

ধ্বংসলীলা সাঙ্গ করে রজত সেনরা বেরিয়ে গেলে আরামকেদারা থেকে নামল তিশা। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছবিগুলো কুড়িয়ে নিল। শ্লথ পায়ে দোতলায় উঠে গেল। দরজায় খিল তুলে বিছানায় ভেঙে পড়ল তিশা। দুচোখে তার তখন অশ্রুর বন্যা।

সকালে দরজা ভেঙে তিশার ঘরে ঢুকতে হয়েছিল। অনেক ডাকাডাকির পরও দরজা খোলেনি তিশা। বাড়ির সবাই দরজার সামনে একত্র হয়েছিল। সবারই সম্মতিতে মতিলাল দরজা ভেঙেছিল।

চিত হয়ে শোয়া। মুখটা সামান্য হাঁ-করা। চোখ দুটো অর্ধনিমীলিত। সেই চোখে কিসের যেন আকুতি। বুকের ওপর দুহাত দিয়ে রজতের ছুড়ে যাওয়া অরিন্দমদের ছবি। রাতের কোনো একটা সময়ে ওই সামান্য হাঁ-করা মুখ দিয়ে তিশার প্রাণবায়ুটা বেরিয়ে গেছে।

নিখিল ভৌমিক এসেছিল। লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলেন কামেশ্বরবাবু। শিয়রের পাশে বসে মায়ের মমতা কণ্ঠে ঢেলে বিলাপ করে গেছেন হরবালা দেবী। কলেজের দু-চারজন, যারা খবর পেয়েছিল, মুহুরিবাড়িতে এসে তিশার মৃত মুখ দেখে গিয়েছিল। বুক উজাড় করে কেঁদে গেছিল জয়দীপ। যেন সে নিজের সহোদরাকে হারিয়েছে।

কাঁদতে কাঁদতে বিড়বিড় করেছে জয়দীপ, অনেক কথা বলার ছিল বউদি, বলা হলো না। তোমাকে সন্দেহ করে বউদি, আমার স্ত্রী শ্রেয়সী আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক বছর। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি, তোমার সঙ্গে আমার ভাই-বোনের সম্পর্ক। বউদি ডাকি বটে তোমায়, মনে মনে দিদিই মানি তোমাকে। বোঝেনি শ্রেয়সী তা। তার মানববোধ ওইটুকু পর্যন্ত পৌঁছায়নি বলে সে ভাবতে পারেনি, দুজন নর-নারীর মধ্যে প্রেম ছাড়াও বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। শেষ পর্যন্ত চলে গেল সে আমাকে ছেড়ে। ছেলেটিকেও সঙ্গে নিয়ে গেল। আজ বহু বছর হয়ে গেল বউদি, তোমার মতো একাকী জীবন আমার।

অনেকের সঙ্গে জয়দীপও শ্মশান পর্যন্ত গিয়েছিল। নিখিল ভৌমিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সব কাজ সম্পন্ন করে স্ত্রীর মুখাগ্নি করেছিলেন।

বলুয়ার দিঘির মহাশ্মশান থেকে নিজের ছোট্ট ফ্ল্যাটটিতে ফিরে গিয়েছিল জয়দীপ।

নিখিল ভৌমিক কিন্তু নিজের ফ্ল্যাটে আর ফিরে যাননি। ছবুর ম্যানশনের পাট চুকিয়ে মুহুরিবাড়িতে আস্তানা গেড়েছেন নিখিল।

 

তিশার মৃত্যুর পর চার বছর কেটে গেছে।

জয়দীপের জীবন আগের মতোই এগিয়ে চলেছে। নির্বাসিত, নির্জন জীবন তার। কখনো খাওয়া, কখনো উপোস দেওয়া। একদিন নিউ মার্কেটের সিঁড়িতে পেছন থেকে তিশা বউদিকে দেখা। চিৎকার করে ওঠা—বউদি—তিশা বউদি—।

এরপর তো কাহিল হয়ে পড়েছিল জয়দীপ। ওই তরুণটি তাকে আগলে ফ্ল্যাটে পৌঁছে না দিলে কী যে হতো! মধ্যরাতে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে ভাবছিল জয়দীপ। সে বুঝতে পেরেছে তিশা বউদির ঘটনাটা একটা ইলিউশন ছাড়া আর কিছুই নয়। তিশা বউদিকে প্রতিনিয়ত এত নিবিড় করে ভেবে যায় সে, যার ফলে তিশা বউদির কাছাকাছি অবয়বের কাউকে পেছন থেকে দেখে তার মধ্যে গভীর এক বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। অলীককে সত্য বলে মনে হয়েছিল তার। অন্য কোনো নারীকে তিশা বউদি ভেবে তার মধ্যে প্রচণ্ড এক ঘোরের ঘূর্ণি তৈরি হয়েছিল। এই ঘূর্ণিতে পড়ে সে দিশে হারিয়েছিল। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠেছিল হঠাৎ। শ্বাসটা কী রকম যেন বন্ধ হয়ে আসছিল! এই দুঃসহ সময়ে ভাগ্যিস তরুণটি এগিয়ে এসেছিল! নইলে হয়তো নিউ মার্কেটেই গড়িয়ে পড়ত জয়দীপ!

এসব ভাবতে ভাবতে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল জয়দীপ। ঘুম মানুষকে অচেতন জগতে নিয়ে যায়।

কখন থেকে ডোরবেল বাজিয়ে যাচ্ছে কে?

দরজা খুলে দিতেই সামনে শ্রেয়সীকে দেখতে পেল জয়দীপ। নত মুখ। পেছনে অর্ণব। কাঁধে মস্ত এক ব্যাগ। চোখেমুখে পথযাত্রার অবসাদ। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে জয়দীপ, শ্রেয়সীর দিকে।

ভেতরে আসতে পারি? শ্রেয়সীর কণ্ঠস্বর শোনে জয়দীপ।

হ্যাঁ, এসো। ভেতরে এসো। এসো অর্ণব। বিভোর গলায় বলে জয়দীপ।

ঘরটা এ রকম অন্ধকার করে রেখেছ কেন? ঘুমাওনি?

ঘুমিয়েছি তো! এই দেখছ না, বিছানা ছেড়ে উঠে এলাম!

গাড়িটা বড় লেট করে ফেলল, বুঝলে। তাই আসতে এত দেরি হয়ে গেল।

ঠিক আছে। ওতে কোনো অসুবিধা নেই।

আলো জ্বালিয়ে শ্রেয়সী আঁতকে উঠল, আরে! তোমার চেহারাটা এ রকম হয়ে গেছে কেন?

কী রকম!

চোয়াল ভেসে উঠেছে! বসা বসা চোখ। বেশ কদিনের আকামানো দাড়ি। চুলও তো কাটোনি বহুদিন!

এবার থেকে কাটব। তুমি এলে! অর্ণব এলো। সবই আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।

সে দেখা যাবে। এখন বলো, এ রকম চেহারা হয়েছে কেন তোমার?

ভালো লাগছিল না।

কেন ভালো লাগছিল না। ভালো না লাগার তো কোনো কারণ দেখছি না। আমি ছিলাম না, তাতে তো তোমার ভালো লাগারই কথা!

জয়দীপ কোনো উত্তর দেয় না।

ঘরের চারদিকে চোখ বোলায় শ্রেয়সী। অভিমানী কণ্ঠে বলে, এটা ঘর না ডাস্টবিন? চারদিকে জঞ্জাল আর জঞ্জাল! সব দিকে আমাকেই খেয়াল রাখতে হবে, তা তো নয় জয়দীপ!

এখন থেকে এ রকম আর থাকবে না। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যাবে।

ঠিক তো? কথা দিচ্ছ তো?

কথা দিচ্ছি।

শ্রেয়সী পুত্রের দিকে তাকিয়ে বলে, বাবা, তুই বাথরুমে ঢোক। ফ্রেশ হয়ে নে। আর জামাজোড়া ওখানেই খুলে আসিস। আমি ধোয়া জামাকাপড় দিচ্ছি তোকে।

অর্ণব বাথরুমে ঢুকে গেলে শ্রেয়সী জয়দীপকে জাপটে ধরে। বাহুবন্ধনে জড়িয়ে জয়দীপের ঠোঁটে নিজের অধর চুবিয়ে দেয়।

শ্রেয়সীর অধরে জিভ ঘষতে ঘষতে জয়দীপ বলে, এত দিন পরে এলে! এতটি বছর একবারের জন্যও মনে পড়ল না আমায়!

ঝট করে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে শ্রেয়সী বলে, তুমিও তো কোনো খোঁজ নাওনি আমার! অন্তত ছেলেটির খবর তো নিতে পারতে!

যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি।

ওই চেষ্টাতেই থেকে গেছ তুমি। আমার তো মৃত্যুও হতে পারত। ছেলেটিরও তো কিছু একটা হতে পারত! বলো, পারত না? শ্রেয়সী জয়দীপকে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলে।

জয়দীপ নিরুত্তর।

শ্রেয়সী কান্না জড়ানো গলায় বলে, আমাকেই ফিরে আসতে হলো তাই। এ কবছরে বুঝেছি।

উদগ্রীব কণ্ঠে জয়দীপ জিজ্ঞেস করে, কী বুঝেছ?

বুঝেছি, তুমি ও রকমই। জেদি। ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না। একরোখা গোঁয়ার তুমি। বলতে বলতে দুম দুম করে জয়দীপের বুকে কিল মারতে শুরু করে শ্রেয়সী। দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রেয়সী আবার বলে, তুমি বদলাবে না যখন, আমাকেই মানিয়ে নিয়ে চলতে হবে।

স্নিগ্ধ মধুর হাসি জয়দীপের সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ে। এ হাসিতে স্ত্রী শ্রেয়সীকে ফিরে পাওয়ার তৃপ্তি, পুত্র অর্ণবকে কাছে পাওয়ার আনন্দ।

আচমকা শ্রেয়সীকে বুকের একেবারে গভীরে টেনে নেয় জয়দীপ।

শ্রেয়সী জয়দীপকে জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে, আহ্, ছেলে এখন ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসবে! গোটা রাত তো পড়ে আছে! এখনই উতলা হচ্ছ কেন?

জোর ধাক্কায় অতলান্ত ঘুম ভেঙে যায় জয়দীপের।

তার গাল বেয়ে তখন লালা গড়াচ্ছে।

চোখ খোলে জয়দীপ।

রোডলাইটের আবছা আলো ঘরে।

দরজাটা আগের মতো ভেজানো।



সাতদিনের সেরা