kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

♦ সা ক্ষা ৎ কা র
♦ খালিকুজ্জামান ইলিয়াসের সাক্ষাৎকার

লেখালেখি কষ্টকর, বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে আনন্দদায়ক

[অধ্যাপক খালিকুজ্জামান ইলিয়াস স্বনামধন্য প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাহিত্য সমালোচক। ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর শিল্পসংগঠন বিস্তার-এর আয়োজনে একটি অন্তর্জাল অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত অনুবাদক আলম খোরশেদ তাঁর ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এখানে তাঁদের সেই কথোপকথনের নির্বাচিত অংশ প্রকাশিত হলো। অনুলিখন করেছেন শাহাদাত হোসেন তৌহিদ।]

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ২২ মিনিটে



লেখালেখি কষ্টকর, বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে আনন্দদায়ক

আলম খোরশেদ : আপনি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু সাহিত্যের সব ছাত্রই তো আর লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয় না। আপনি কিভাবে সাহিত্যের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নিলেন? এর সূচনাপর্বের গল্পটা একটু শুনতে চাই।

 

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : ১৯৬৭-৬৮ সাল।

বিজ্ঞাপন

আমি তখন মুহসীন হলে থাকি। একদিন আহমদ ছফা এসে আমাকে একটা বই দিলেন। বইটার নাম ‘পাপের সন্তান’। লেখক সত্যেন সেন। বইটা দিয়ে তিনি বললেন, ‘তুমি একটা রিভিউ করো। ’ তখন বাইবেল একটু নাড়াচাড়া করতাম। পড়তে গিয়ে দেখি, ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এর একটা কাহিনি পুরোপুরি ওখানে তিনি ব্যবহার করেছেন। আমি রিভিউ করলাম। সেটা ছফা ভাই নিয়ে গেলেন। ছাপলেন একটা পত্রিকায়। সত্যেন সেন এটা দেখে হেসেছিলেন। সেটাই ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম লেখা। এরপর ‘রসোমন’ ছাপা হলো। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, মুহাম্মদ নূরুল হুদা তখন দ্রাবিড় প্রকাশন নামের একটা প্রকাশনা সংস্থা খুলেছিল, সেখান থেকে ছাপা হলো। সেটা ১৯৮২-৮৩ সালে। তো, এটাই আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ আর কি। এরপর আস্তে আস্তে ঢুকে পড়লাম এই জগত্টাতে। এরপর আমার বড় ভাই আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আমাকে ‘ক্রাইস্ট রিক্রুসিফায়েড’ নামের একটা বই পড়তে দিলেন, নিকোস কাজানত্জাকিসের লেখা। সেটা পড়ে এত মুগ্ধ হলাম যে কয়েক সপ্তাহ ওটাই আমার মনের মধ্যে ছিল। সেই কাজানত্জাকিসের একেবারে প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। তারপর আমার ভাইয়ের কাছ থেকে তাঁর আরেকটা বই পেলাম—‘দি ওডিসি : আ মডার্ন সিক্যুয়াল’। এটা হোমারের যে ‘ওডিসি’ আছে তার তিন গুণ বড় একটা মহাকাব্য। এই বইটা পড়ে আমি তো একেবারে হতভম্ব! সাহিত্য কাকে বলে এবং ওখানে যে কত রকমের ইমেজারি, কত রকমের মেটাফোর ব্যবহার করা হয়েছে, তার একটা অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা হলো। তখন থেকে কাজানত্জাকিস আমাকে পেয়ে বসল এবং তাঁর অনেক বই পড়লাম। ‘নিকোস কাজানত্জাকিস’ নামে বড় একটা প্রবন্ধও লিখলাম, যেটা নজরুল একাডেমি পত্রিকায় লিড আর্টিকল হিসেবে দুই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এর সম্পাদক ছিলেন শাহাবুদ্দিন সাহেব। তখন আমি থার্ড ইয়ারে পড়ি। কাজানত্জাকিসের ওপর ওই লেখাটাই মনে হয় বাংলাদেশে প্রথম। ওই সময় আমি আবার এনকাউন্টার পত্রিকার বোর্হেস সংখ্যায় তাঁর একটা ইন্টারভিউ ছিল, সেটা অনুবাদ করলাম। বাংলা একাডেমি পত্রিকায় ১৯৭৩ কি ’৭৪ সালে ছাপা হয়েছিল সেটা। এর আগে বোর্হেসের ওপর কোনো লেখা ছাপা হয়নি এখানে। এ দুটি লেখা নিয়ে আমি বেশ সন্তুষ্ট ছিলাম। কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশি পাঠকদের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটল এ দুই দিকপাল লেখকের। এরপর অনুবাদ করলাম গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাক্ষাৎকার ‘পেয়ারার সুবাস’। যদিও মার্কেস তত দিনে আমাদের দেশে খুবই পরিচিত, কিন্তু তাঁর এত বড় ইন্টারভিউ এর আগে আর ছাপা হয়নি। এটা পড়ে অনেক ক্রিয়েটিভ রাইটারই খুব উপকৃত হয়েছিলেন দেশে। আমি তখন ওয়াশিংটনে থাকি। আমি শুনতে পেয়েছিলাম, বইটার খুব প্রশংসা হচ্ছে। আমার ভাই আমাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। তো, মোটামুটি এভাবেই আমি সাহিত্যের জগতে আসি।

 

আলম খোরশেদ : এরপর অন্যান্য অভিজ্ঞতার কথাও যদি বলেন, যেমন—আপনার বই প্রকাশের অভিজ্ঞতা, পাঠকের কাছে সমাদৃত হওয়া, অন্য লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক, পরবর্তী সাহিত্যকর্ম ইত্যাদি বিষয়েও জানতে চাই।

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : এরপর আমি ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’টা অনুবাদ করলাম। আমাদের একজন শিক্ষক ছিলেন আহসানুল হক। আমাকে খুব পছন্দ করতেন। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘জনাথন সুইফটের কিছু করতে পারো কি না দেখো তো। সুইফটের যে সাংঘাতিক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, আমাদের সোসাইটির জন্য ওটাই দরকার। ও রকম স্যাটায়ার, সার্কাজম—ওসব দরকার আমাদের এখানে। আমাদের এখানে যে অবস্থা। ’ আসলেই স্বাধীনতার পর এখানকার সামাজিক অবস্থা বেশ খারাপই ছিল। তখন আমি বগুড়ায় চলে গেছি। ওটা আমি বছরখানেক ধরে আস্তে আস্তে করে বাংলা একাডেমিতে জমা দিলাম। সেটা ছাপা হয়েছিল মনে হয় ১৯৮৪ সালে, ‘গালিভারের ভ্রমণকাহিনি’ নামে। ওটাও বেশ প্রশংসা পেয়েছিল। আমার মনে হয়, এটা পশ্চিমবঙ্গে লীলা রায় বা কেউ একজন করেছেন, কিন্তু তখন পর্যন্ত বাংলাদেশে আর কেউ করেনি। কারণ সুইফট অনুবাদ করা বেশ কঠিন। এত বড় বড় বাক্য, সেই যুগের, সেই অষ্টাদশ শতাব্দীর ইংরেজি। একেকটা সেন্টেন্সই একেকটা প্যারাগ্রাফ, ওটাকে বাংলায় করা একটু কঠিনই। সেটাও করেছিলাম।

 

আলম খোরশেদ : এরপর—

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : এরপর গ্যাপ গেল অনেক দিন। তারপর ‘মিথের শক্তিটা’ করলাম, জোসেফ ক্যাম্পবেলের ‘পাওয়ার অব মিথ’-এর অনুবাদ। তখন নৃ নামে একটা পত্রিকা বের হতো, সেখানে তার একটা অধ্যায় ছাপা হয়েছিল। একদম শেষের দিকের একটা অধ্যায়। অধ্যায়টার নাম ছিল ‘গোল্ডেন বাউ’। ওটা ছাপার পর দেখলাম বেশ ভালো রেসপন্স। তখন আমি ‘মিথের শক্তি’ পুরোটাই করে ফেললাম। ওতে মোট আটটা অধ্যায় আছে। অনেক ছবিটবি আছে। ছবির সঙ্গে চমৎকার আলোচনা। তো, সেই আলোচনাটাই আমি অনুবাদ করে ফেললাম এবং সেটা বাংলা একাডেমি থেকেই প্রথম প্রকাশিত হয়। তখন অধ্যাপক হারুনুর রশিদ ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। তিনি বইটা দেখেই কাকে যেন দিলেন রিভিউ করার জন্য। রিভিউ পাওয়ার পর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছাপিয়ে ফেললেন। সাধারণত বাংলা একাডেমি সময় নেয় প্রচুর। কোনো কোনো বইয়ের ক্ষেত্রে পাঁচ সাত আট বছরও কেটে যায়। কিন্তু এই বইটা খুব তাড়াতাড়িই ছাপা হয়ে গিয়েছিল এবং সেটা খুব জননন্দিত হলো। এত লোকে পড়েছে বইটা! হাটহাজারী কিংবা রাঙামাটি থেকে এক সাবরেজিস্ট্রার আমাকে একটা পোস্টকার্ড লিখে খুব প্রশংসা করেছিলেন বইটার। বলেছিলেন, ‘এই বইটা আমরা বন্ধুবান্ধব অনেককে বিয়েতে উপহার হিসেবে দিয়েছি। এটা পড়ে খুব ভালো লাগল। ’ এ রকম দূরাঞ্চলে এমন একজন পাঠক আছেন, যিনি এমন চাকরি করেন, যেটার সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক কম, জমিজমার সম্পর্ক বেশি। যখন এভাবে রেসপন্স আসে, ভালোই লাগে। তারপর তো ’৯৫ সালের দিকে ‘গোল্ডেন বাউ’-এ হাত দিলাম। ধীর ধীরে এগোচ্ছিল সেটা। মাঝে মাঝে ভালো লাগলে করি। এভাবে প্রায় ১৫ বছর ধরে  করেছি। ওটা করতে গিয়ে দেখলাম শেষের পাঁচ বছর ধরাই হয়নি। ফলে ওটা করতে মোটামুটি ১০ বছরের মতো সময় নিয়েছি। পরে উত্তরাধিকার পত্রিকায় ওটা ধারাবাহিকভাবে ছাপানো হলো। উত্তরাধিকার তখন নতুন আকারে বের হচ্ছিল। আমি ভাবলাম, এভাবে না করলে ওটা শেষ হবে না, কারণ এতে একটা তাগাদা থাকবে। উত্তরাধিকার পত্রিকায় প্রায় ৪৮টি অধ্যায় ছাপা হয়েছিল। তারপর ওরা মনে হয় বিরক্ত হয়ে সেটা বন্ধ করে দিল। তারপর আমি ইউনিভার্সিটি থেকে একটু ছুটি নিলাম, তখন দেখলাম যে তিন মাসেই আমি ২৪টি অধ্যায় শেষ করে ফেলেছি। মোট ৬৯টি অধ্যায় ছিল ওখানে। বই আকারে সেটা ছাপার জন্য নিল ‘বিপিএল’ নামের একজন নতুন প্রকাশক। ওরা নিয়ে এমনভাবে ছাপল, আমি পৃষ্ঠা ওল্টাতে গিয়ে দেখি, একেকটা বইয়ে পাঁচ-সাতটা করে সাদা পৃষ্ঠা, প্রিন্ট আসেইনি। আমি ওদের বললাম, এখনই এটা বাজার থেকে উইথড্র করেন। ওরা বোধ হয় সেটা করেছিল। এক বছর পর তারা এর একটা শোভন সংস্করণ বের করল। সেটা ইউজার ফ্রেন্ডলি না; কিন্তু দেখতে সুন্দর। মানে সাজিয়ে রাখার জন্য চমৎকার একটা বই।

 

আলম খোরশেদ : আপনি একজন প্রাবন্ধিক, দক্ষ অনুবাদক, পাশাপাশি নিষ্ঠাবান, মনোযোগী পাঠকও। বাংলাদেশের সমকালীন সাহিত্য নিয়ে নিশ্চয়ই আপনার একটা পর্যবেক্ষণ আছে। তো, সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সাহিত্যের বর্তমান অবস্থা বিষয়ে আপনার সংক্ষিপ্ত একটি মূল্যায়ন যদি পেতাম।

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমি হতাশ না মোটেও। আমি বলব যে আমাদের সাহিত্য টেকনিক্যালি বেশ উন্নত হয়েছে। অনেক লেখাই পড়া যায়। বিশেষ করে কবিতা সবই পড়া যায়। মানে টেকনিকটা আয়ত্ত হয়ে গেছে। একটু দুর্বল দিক আছে ফিকশন কিংবা উপন্যাসে, তবু আমাদের বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ঔপন্যাসিক আছেন এখনো জীবিত যাঁরা এবং ইয়াংদের মধ্যেও রয়েছে। উপন্যাসের যেটা মূল হাতিয়ার, ভাষা, সেটা রপ্ত করেছেন অনেকেই। আমি অনেক সাংবাদিককে চিনি, যাঁদের ভাষা খুব চমৎকার। সাংবাদিকতা দিয়ে অনেক বড় বড় লেখকও জীবন শুরু করেছেন, যেমন—চার্লস ডিকেন্স, গার্সিয়া মার্কেস প্রমুখ। তাঁরা কিন্তু প্রথম জীবনে সাংবাদিকই ছিলেন। আমাদের দেশেও আমি দেখছি ইয়াংদের মধ্যে প্রচুর ভালো লেখক আছেন। প্রচুর সম্ভাবনাময় লেখক আছেন। তা সত্ত্বেও কেমন যেন একটু একঘেয়ে মনে হচ্ছে সব কিছু, সেই চমকটা যেন নেই। মানে লেখার এক ধরনের ধার, সেই ধারটা অনেক সময় পাওয়া যায় না। ওভার অল ভালো লেখা লিখছেন অনেকেই। মঞ্জু সরকার, জাকির তালুকদারকে খুব ভালো লেগেছে আমার। আরো অনেকেই আছেন, যাঁদের লেখা ভালো লেগেছে আমার। মামুন হোসাইন খুবই এক্সপেরিমেন্টাল ভাষা ব্যবহার করেন। এর জন্য অনেক সময় মনে হয় তিনি বুঝি ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইনটেলেক্টের চর্চা করেন। সেখানে ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইমোশনটা তেমন পাওয়া যায় না। বুদ্ধিবৃত্তিটা বেশি আসছে। আমি পছন্দ করি দুটির মিশেল, ল্যাঙ্গুয়েজ অব ইমোশনটা যদি না থাকে শুধু ইনটেলেক্ট দিয়ে লেখা আবেদনময় হয় না। এরপর ধরুন, কাজী রাফি ভালো লিখছেন। হরিশংকর জলদাসের দু-একটি উপন্যাস আমার খুবই ভালো লেগেছে। প্রশান্ত মৃধা আমার প্রাক্তন ছাত্র, সে তো এখন চমৎকার লেখে। কিন্তু ওই যে বললাম, দ্যুতিটার যেন অভাব বোধ করছি আমি এদের মধ্যে। এ ছাড়া মেয়েদের মধ্যে শাহীন আখতার, অদিতি ফাল্গুনী খুব সিরিয়াস রাইটার। জীবনঘনিষ্ঠ এবং অনেকে খুব রিসার্চ করে লেখালেখি করছেন। আগে এটা ছিল না। আগে শুধু ইমোশনের ওপরেই চলত। কিন্তু রিসার্চ করে যে উপন্যাস লিখতে হয়, কষ্ট করে লেখার যে একটা ব্যাপার আছে, সেটা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস করতেন, ঘুরে বেড়িয়ে, নানা কাগজপত্র, ইতিহাসের বই, পুরনো দলিলপত্র ঘেঁটে তারপর লেখায় হাত দিতেন। যেকোনো বড় লেখকই তা করেন। ইংরেজিতে যাঁরা লিখছেন তাঁরাও তা-ই করছেন। উদাহরণস্বরূপ বিক্রম শেঠ, সালমান রুশদি, অমিতাভ ঘোষ—সবাই রিসার্চ করে লেখালেখি করছেন। অতএব লেখা জিনিসটা এখন আর অত সহজ নয়। এটা কষ্টকর, বেদনাদায়ক এবং একই সঙ্গে আনন্দদায়ক।

 

আলম খোরশেদ : আপনি বাইরের যে কজন লেখকের কথা বললেন, যাঁরা খুব পরিশ্রম করেন, গবেষণা করে লেখালেখি করেন, তাঁরা কিন্তু সেটার জন্য একটা অনুকূল পরিবেশও পান। প্রয়োজনীয় অবসর, অনুকূল পরিবেশ, উপযুক্ত সম্মানী, সামাজিক স্বীকৃতি ইত্যাদি। ফলে তাঁরা লেখালেখিটাকে পেশা হিসেবে নিতে পারছেন। আমাদের দেশে কি সেভাবে লেখালেখিকে প্রফেশন হিসেবে নেওয়া সম্ভব? দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রকাশনাশিল্পের মধ্যেও কোনো পেশাদারি নেই যে তেমন লেখকদের তারা ধারণ করবে, পৃষ্ঠপোষকতা দেবে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত ও অবস্থানটুকু জানতে চাই।

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আমাদের দেশে অনেক প্রকাশক এসেছেন। সবার কথা বলছি না, তবে বেশির ভাগ প্রকাশকের মধ্যেই এখনো কোনো পেশাদারি আসেনি। একদম লিখে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করেন এ রকম মনে হয় একমাত্র সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন, যদিও তাঁর স্ত্রী কাজ করতেন। বদরুদ্দীন উমর ভাই, তিনিও লেখালেখি করে উপার্জন করেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রীও চাকরি করতেন। এ ছাড়া আমার মনে হয় না আর কেউ তেমন আছেন, শুধু লিখেই যাঁরা জীবিকা নির্বাহ করেন। আমি ঠিক পপুলার রাইটারদের কথা এখানে আনছি না, যাঁরা সিরিয়াস রাইটার এবং বাণিজ্যিক বিষয়টা মাথায় রেখে লেখেন না, তাঁদের কথা বলছি। আর অনুবাদের ব্যাপারে তো প্রকাশকরা আরো বেশি এক্সপ্লয়েট করেন। অনুবাদ করলে মনে হয় কোনো একটা গর্হিত কাজ করেছি এবং তাঁরা দয়া করে লেখাটা ছাপতে নিয়েছেন। তার জন্য কোনো সম্মানী নেই। থাকলেও তা খুবই কম, সেটাও দিতে চান না, দু-একজন প্রকাশক ছাড়া। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কিছু দেয়। তারপর ইউপিএল। এরা মোটামুটি প্রফেশনাল। আর দেয় প্রথমা। তারা কাগজের দাম মেটাচ্ছে, প্রচ্ছদশিল্পী, বাইন্ডারকে পারিশ্রমিক দিচ্ছে; কিন্তু আসল কাজটা যে করল, লেখক, তাঁকে দেয় না। এই বিষয়টা আমার কাছে খুব খারাপ লাগে।

 

আলম খোরশেদ : এ ছাড়া বইপত্র জনসমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য, জনপ্রিয় করে তোলার জন্য প্রচারমাধ্যমেরও একটা ভূমিকা রয়েছে, বিশেষ করে পত্রিকার সাহিত্য পাতাগুলোতে নিয়মিত বুক রিভিউ ছাপা হওয়া উচিত। কিন্তু সেদিকে কারো মন আছে বলে মনে হয় না। দেশে সেই অর্থে কোনো সমালোচনা সাহিত্যই গড়ে উঠল না। আমাদের সমাজে সমালোচনার সংস্কৃতিটাই কেন গড়ে উঠল না; কেন সমালোচনাসাহিত্য, বিচারমূলক ও মননশীল প্রবন্ধের এমন অভাব এখানে?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : এখানে কেউ মননশীল লেখা তেমন লিখতে চায় না। একটা বই পড়ে কারো ভালো লাগলে সেটা নিয়ে যে দুই কলম লিখবে, এই কাজটা করতে খুব অনীহা আমাদের কোনো এক কারণে। মারা না গেলে সাধারণত প্রশংসা করতেই চান না কেউ (হা হা হা)। জীবিত অবস্থায় প্রশংসা পেয়েছেন এমন কিন্তু খুবই কম এ দেশে। এটা আমাদের সংস্কৃতিতেই নেই। এ ছাড়া আমার মনে হয়, সমালোচনাসাহিত্য আমাদের এখানে সেভাবে গড়ে না ওঠার পেছনে আরো একটা কারণ রয়েছে। আমার একটা থিওরি আছে, সমালোচনামূলক সাহিত্য কিংবা প্রবন্ধজাতীয় লেখা লিখতে গেলে শিক্ষাদীক্ষার দরকার হয়, পড়াশোনার প্রয়োজন হয়। কবিতা আপনি মনের ভাব দিয়ে, আবেগ দিয়ে, কিছুটা ভাষার দখল থাকলে, লিখে ফেলতে পারেন। কিন্তু প্রবন্ধসাহিত্য রচনা করতে গেলে পড়াশোনা করতে হবে, রিসার্চ করতে হবে। সেই রিসার্চের কোনো ট্র্যাডিশনই আমাদের নেই। আমাদের তো মাত্র দু-এক পুরুষের ইংরেজি শিক্ষা। সেটা দিয়ে মননশীল রচনা, প্রবন্ধসাহিত্য, সমালোচনাসাহিত্য ইত্যাদির ধারা গড়ে তোলা খুব মুশকিল। সে জন্য হয়তো আমাদের আরো দু-তিন পুরুষ অপেক্ষা করতে হবে।

 

আলম খোরশেদ : পাশাপাশি জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোরও তো কিছু ভূমিকা থাকতে হবে। বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো—এরাও কি ঠিকঠাক দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে হয়?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : এশিয়াটিক সোসাইটি বা বাংলা একাডেমি বলুন—এরা খুব সরকারি টাইপ হয়ে গেছে। মানে একটা প্রতিষ্ঠান যখন দাঁড়িয়ে যায় তখন কেন যেন তাদের ওই উৎসাহটা আর থাকে না। গতানুগতিকভাবে কাজ করে। বাংলা একাডেমির দায়িত্ব অনেক। আমি মনে করি, বাংলা ভাষা-সাহিত্য এসবকে প্রমোট বা সমৃদ্ধ করার জন্য বাংলা একাডেমির সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব তারা পালন করেনি তা নয়। তবে খুবই রয়েসয়ে, ঠিক সেইভাবে না। বিশেষ করে অনুবাদের ব্যাপারে। প্রথম থেকেই অনুবাদের একটা সেল গঠন করা উচিত ছিল তাদের। বঙ্গবন্ধু একসময় ঘোষণা দিয়েছিলেন, সব বাংলায় হবে, তখনই যদি শক্ত একটা অনুবাদ সেল গঠন করা হতো এবং সব টেক্সট বই বাংলায় করা হতো, বাংলা মাধ্যমটা যেহেতু চালু হয়ে গিয়েছিল, তাহলে হয়তো আমাদের চিত্রটা অন্য রকম হতে পারত। একটা বিদেশি ভাষাকে শিক্ষার মিডিয়াম করলে আমার মনে হয় না ছাত্ররা সেটা নিত। আমি ক্লাসে দেখেছি, ইংরেজি বলতে বলতে যখন দু-একটা কথা বাংলায় বলতাম তখন ছেলেমেয়েরা নড়েচড়ে বসত। তার মানে তারা এতক্ষণ অস্বস্তিতে ছিল। প্রশ্নও করে না সে জন্য। কিন্তু বাংলায় বললে তারা খুব নেয়। সুতরাং ক্রিয়েটিভ একটা কিছু করতে গেলে মাতৃভাষা শিখতেই হবে। চায়নিজরা কি ইংরেজি শিখে এত উন্নতি করেছে? ঠিক এভাবে রুশ কিংবা জাপানিদের বেলায়ও এটা সত্য। কোনো উন্নত জাতিই বিদেশি ভাষা শিখে উন্নতি করেনি। একটা ঘরে আমি দেখছি সবাই বাঙালি, এদিকে বক্তা ইংরেজিতে বলছে—অ্যাবনরমাল সিচুয়েশন। আমি একবার এক ইংরেজকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনাদের ওখানে কি এমন হতে পারে? তিনি বললেন, কোনোভাবেই না। ঘর ভর্তি সবাই ইংরেজ, সেখানে কেউ ফ্রেঞ্চে কথা বললে তাকে তাড়িয়ে দেবে।

 

আলম খোরশেদ : বাংলাদেশের অনুবাদসাহিত্যের একটা সামগ্রিক মূল্যায়ন চাইছি আপনার কাছ থেকে। কেমন অনুবাদ হচ্ছে, কোথায় এর সংকট, কোথায় সম্ভাবনা, কোথায় আটকে যাচ্ছি আমরা, সেখান থেকে উত্তরণেরই বা পথ কী? সব মিলিয়ে আপনি কিভাবে দেখছেন আমাদের অনুবাদের জগত্টাকে?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : অনুবাদ হচ্ছে অনেক, তবে ভালো অনুবাদের সংখ্যা কম। সব জিনিসের ক্ষেত্রেই ভালোটা কমই হয়। অনুবাদের ব্যাপারেও তা-ই। খুব ভালো অনুবাদ হচ্ছে না, কিন্তু আবার হচ্ছেও। বারাক ওবামার আত্মজীবনীও তো ঝটপট বাংলা হয়ে যাচ্ছে। অবশ্য তার উৎকর্ষ কী রকম, অনুবাদকের সততা কী রকম সেটা আমি অতটা জানি না। জানি না কতটা ইনটেগ্রিটি নিয়ে অনুবাদ করা হচ্ছে, কিন্তু প্রচুর অনুবাদ হচ্ছে চারপাশে। কিছু অনুবাদ পড়াও যায়। মানে বেশ ঝরঝরে ভাষা। বিশেষ করে জার্নালিস্টরা যেসব অনুবাদ করেন, সেগুলো বেশ পাঠযোগ্য হয়। এ ছাড়া অনুবাদের ব্যাপারে বলব যে এখনো একটা স্টেপ মাদারসুলভ অ্যাটিট্যুড আছে। আগে তো আরো বেশি ছিল, ইদানীং কিছুটা কমেছে। যাঁরা তথাকথিত ক্রিয়েটিভ রাইটার তাঁরা মনে করেন, অনুবাদক হচ্ছেন একটা সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন। ওটার মধ্যে কোনো ক্রিয়েটিভিটি নেই। কিন্তু আমি মনে করি, ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া কখনোই অনুবাদের কাজ করা যায় না। ক্রিয়েটিভিটি থাকতেই হবে। আপনি আরেকটা ভাষা, আরেকটা কালচারকে নিজের ভাষায়, নিজের কালচারে রূপান্তর করছেন, সেটা ক্রিয়েটিভিটি ছাড়া কখনোই সম্ভব নয়। অনেক ক্রিয়েটিভ রাইটারকে বলি, এটা অনুবাদ করে দেখান তো। তাঁরা পারেন না। চেষ্টা করে ছেড়ে দেন। অনুবাদ কঠিন, কিন্তু ওভার অল যে অ্যাটিট্যুড টুওয়ার্ড ট্রান্সলেশন, সেটা কিন্তু এখন পর্যন্ত যথেষ্ট খারাপ। এমনকি প্রচ্ছদে অনুবাদকের নামও দিতে চান না অনেক প্রকাশক। অনুবাদের প্রতি এই অবহেলা না কমলে অনুবাদসাহিত্য উন্নত হবে না। কথায় বলে না, যে দেশে গুণীর কদর নেই সেই দেশে গুণী জন্মায় না। অনুবাদের কদর না থাকলে অনুবাদকও জন্মাবে না।

 

আলম খোরশেদ : তবু যদি কেউ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতেই চান এবং এই অনুবাদের কাজটা ভালোভাবেই করতে চান তাঁদের জন্য আপনার কী পরামর্শ? অনুবাদ বিষয়ে আপনার নিজের দর্শন কিংবা অবস্থানটাই বা কী?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, করোনার সময় আমি ‘জোর্বা দ্য গ্রিক’ অনুবাদ করলাম। নিকোস কাজানত্জাকিসেরই খুব বিখ্যাত আরেকটা বই। এটা করতে আমার এক-দেড় মাস সময় লাগল। বইটার অনুবাদ শেষ করার পর আমি একটু ইন্টারনেট ঘাঁটছিলাম, তখন দেখি এক ভদ্রলোক ইন্টারনেটে একটা আর্টিকল লিখেছেন এই নিয়ে যে ‘জোর্বা দ্য গ্রিক’-এর পপুলার এডিশনটা, যেটা থেকে আমি অনুবাদ করেছি, সেটা নাকি ভুলে ভরা কিংবা এটাতে বেশি স্বাধীনতা নেওয়া হয়েছে, অনেক জায়গায় এমনকি বাদও দিয়েছে। ওইটা পড়ে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। তারপর আমার বন্ধু রাজু আলাউদ্দিনকে বললাম—ভাই, দেখো তো এই বইটা আনাতে পারো কি না—‘আ নিউ ট্রান্সলেশন অব জোর্বা দ্য গ্রিক’, যেটা অনুবাদ করেছেন পিটার বিয়েন। আর এর আগেরটা, যেটা ১৯৫৩ সালে ছাপা হয়েছিল, ওটা করেছিলেন কার্ল ওয়াইনম্যান। কার্ল ওয়াইনম্যানের বইটাই কিন্তু পপুলার হয়েছিল। এত বছর চলে গেছে, এত দিন পর পিটার বিয়েন বলছেন যে ওটা ফ্রেঞ্চ থেকে করা, অরিজিনাল গ্রিক থেকে নয়। পিটার বিয়েন গ্রিক জানতেনও, তাঁর স্ত্রীও গ্রিক। অতএব তিনি গ্রিক থেকেই অনুবাদ করেছেন। রাজু আলাউদ্দিন যখন আমাকে পাঠাল বইটা, সেটা পড়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। এত ডাইগ্রেশন, এত অলংকরণ, এসব কাজানত্জাকিসের বইয়ে নেই। তখন আমার কাজ বেড়ে গেল। তখন আমি আগে যেটা করেছিলাম সেটাতে অনেক কাটাকাটি করে ওই পিটার বিয়েনের নিউ ট্রান্সলেশনটার সঙ্গে মিলিয়ে নিই। সে জন্য আমি বলব যে অনুবাদ অরিজিনাল ভাষা থেকে করাই ভালো। আর যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে অথেনটিক কোনো ট্রান্সলেশন থেকে করা উচিত।

 

আলম খোরশেদ : আমাদের বেশির ভাগ অনুবাদই আড়ষ্ট, সুখপাঠ্য হয় না। আপনি নিজে কিভাবে এই চ্যালেঞ্জটা মোকাবেলা করেন, যাতে একটা অনুবাদকর্ম একই সঙ্গে সুখপাঠ্য ও সাহিত্যমানসম্পন্ন হয়ে ওঠে, পাশাপাশি মূলের প্রতিও বিশ্বস্ত থাকে? এ জন্য আপনি কি নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন? এ প্রসঙ্গে আমাদের নবীন অনুবাদকদের উদ্দেশে যদি কিছু বলতেন।

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : এটাকেই আমি বলি ক্রিয়েটিভিটি ও জাজমেন্ট। অনুবাদকের জাজমেন্টটা হতে হবে খুব ম্যাচিউর ও অনেস্ট। তিনি বুঝবেন মূল থেকে কতটুকু সরে যাওয়া উচিত, কতটুকু উচিত নয়। আপনাকে কিছুটা হলেও তো সরতে হবে। অনুবাদ মানেই হচ্ছে এক ধরনের ট্রান্সফরমেশন। সরতেও হবে আবার সরার পরও ‘ইনভ্যারিয়েন্ট কোর’ বলে যে একটা টার্ম আছে, সেটাকে অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। এই জিনিসটা কখনোই পাল্টাবে না। এটাকে বজায় রেখেই আপনাকে অনুবাদ করতে হবে। তাহলেই বলব যে অনেস্ট অনুবাদ হয়েছে। আর অনুবাদের সময় ভাষার যে সাটল নুয়ানসেস থাকে, অনেক টুইস্ট অ্যান্ড টার্নস থাকে, এগুলো বুঝতে হবে। সুতরাং যিনি অনুবাদ করবেন, লক্ষ্য ভাষাটির ওপর তাঁর একেবারে মাতৃভাষাতুল্য দক্ষতা থাকতে হবে। আর যে সোর্স ল্যাঙ্গুয়েজ অর্থাৎ উৎস-ভাষা, সেটাতেও যথেষ্ট ভালো দখল থাকতে হবে। এবং তার সঙ্গে কিছুটা সৃজন-প্রতিভা তো থাকতেই হবে। তাহলেই অনুবাদ মোটামুটি সুসম্পন্ন হবে বলে আমি মনে করি।

 

আলম খোরশেদ : সেটাই আরো ভালো হয়ে উঠতে পারে, যদি আমাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা ও পেশাদার সম্পাদকের বিষয়গুলো থাকত। যেটা উন্নত বিশ্বে সব সাহিত্যিকের ক্ষেত্রেই একেবারে অপরিহার্য। আমাদের দেশে এই পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার চর্চাটা কি আদতেই অসম্ভব?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : দু-একজন পাবলিশার বোধ হয় এটা করতে চেষ্টা করেন, তবে সেটা এখনো একটা পর্যায়ে পৌঁছেনি। এডিটিংয়ের যে ব্যাপারটা বলছেন, সেটা কিন্তু আসলেই খুব গুরুত্বপূর্ণ, এডিটররা কিন্তু দারুণ কিছু করতে পারেন এবং লেখক তাতে উপকৃতই হন। ‘ব্ল্যাক বয়’ উপন্যাসের লেখক রিচার্ড রাইট এর একটা সিক্যুয়াল লিখেছিলেন ‘দি আমেরিকান হাঙ্গার’ নামে। তাঁর এডিটর সেটাকে কেটেছেঁটে একদম পাল্টে দিয়েছিলেন, এমনকি নামটা পর্যন্ত বদলে দিয়েছিলেন। তিনি কিন্তু সেটা মেনে নিয়েছিলেন। হ্যাঁ, ওদের সাহিত্যে এই ব্যাপারটা আছে। ওদের এডিটররা যথেষ্ট যোগ্য। আমাদের এখানে সে রকম যোগ্য এডিটর পাওয়াও খুব মুশকিল।

 

আলম খোরশেদ : সে তো গেল বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদের প্রসঙ্গ। কিন্তু আমাদের নিজেদের সাহিত্যকে বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করে, বিদেশি পাঠকদের কাছে, বিদেশি সাহিত্য পরিমণ্ডলে পৌঁছানোর কাজটাও তো সমান জরুরি। তো, সেটা কতটুকু হচ্ছে বলে আপনার ধারণা বা সেটা আরো সুচারু ও সঠিকভাবে করার জন্য আমাদের করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : ধরুন, বাংলা থেকে ইংরেজি করবেন কোনো একজন ইংরেজ। তিনি যদি বাংলা শিখে করেন তাহলে সবচেয়ে ভালো হয়। কারণ তাঁর তো ইংরেজিতে পুরো দখল আছে। আর বাংলা তো তিনি ভালো করে শিখেছেন। ইনফ্যাক্ট রবীন্দ্রনাথকে এই কথাটাই বলেছিলেন, হাল্লাম টেনিসন, কবি আলফ্রেড টেনিসনের পুত্র, তিনি যদি নিজের লেখা নিজে অনুবাদ না করতেন তাহলে ভালো হতো। তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ নামে একটা আর্টিকল লিখেছিলেন, যেখানে ‘গীতাঞ্জলি’র  রবীন্দ্রনাথকৃত অনুবাদ এবং তাঁর নিজের করা কিছু অনুবাদের তুলনা করে দেখিয়েছেন। আমিও দেখলাম যে হ্যাঁ, তাঁর করাগুলো অনেক বেশি বোল্ড আর রবীন্দ্রনাথের ইংলিশটা একটু এলানো। সে জন্যই আমার মনে হয় এটা একটা কারণ হতে পারে, কেন তা অ্যাট্রাক্ট করছে না বিদেশি পাঠকদের। হয়তো আমাদের করা অনুবাদগুলোই তাদের আকর্ষণ করছে না তেমন। সেলিম আল দীনের ‘চাকা’ নাটকটার অনুবাদ হয়েছে; কিন্তু মনে হয় না যে খুব একটা আপিল করার মতো কিছু আছে তাতে। আরেকটা হতে পারে যে বাংলা লিটারেচারকেই সো কল্ড ডেভেলপড কান্ট্রিগুলো সেভাবে দেখে না। না হলে বাংলায় কি কম ভালো সাহিত্য আছে? আন্তর্জাতিক মানের আমাদের লেখা অনেক আছে। শুধু অনুবাদের অভাবে সেগুলো সব জায়গায় পৌঁছাচ্ছে না।

 

আলম খোরশেদ : আপনি নিজে এখন কী লিখছেন বা সামনে কী নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে?

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : করোনাকালে আমি আরেকটা কাজ করেছি কাজানত্জাকিসেরই অন্য একটা বই—‘রিপোর্ট টু গ্রেকোর’ অনুবাদ। এটা একটা স্পিরিচুয়াল অটোবায়োগ্রাফি। এটাও বেশ বড়, ৬০০ পৃষ্ঠারও বেশি। ওটার অনুবাদ করেছি পাঁচ মাস ধরে। ওটা ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’ নিয়েছে প্রকাশ করার জন্য। হয়তো আগামী বছর কিংবা পরের বছর কোনো এক সময় ছাপা হবে।

 

আলম খোরশেদ : সব শেষে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সামনে রেখে আপনার এই মুহূর্তের স্বদেশভাবনা বিষয়ে জানতে চাই।

 

খালিকুজ্জামান ইলিয়াস : আশা তো করতেই চাই অনেক কিছু, কিন্তু আমাদের পলিটিক্যাল মরাল যে একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এ রকম আগে কখনো ছিল বলে মনে হয় না। এ জন্যই আরো বেশি খারাপ লাগে যে এত প্রতিশ্রুতিশীল একটা জাতি, এত বুদ্ধিমান জাতি, এদের যদি ভালো, অনেস্ট লিডারশিপ দেওয়া যেত তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশিরা দুনিয়ায় মাথা তুলে গর্বের সঙ্গে দাঁড়াতে পারত। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়েছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণি অনেক এক্সপান্ড করেছে। সেই হিসেবে আমরা অনেক এগিয়েছি। কিন্তু মরালিটির প্রশ্নে আমার মনে হয় অনেক পিছিয়েও গেছি। এর দায়টা কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদেরই নিতে হবে।



সাতদিনের সেরা