kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

নি স র্গ

বাংলাদেশে হুকারের উদ্ভিদসন্ধান

মোকারম হোসেন

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৩ মিনিটে



বাংলাদেশে হুকারের উদ্ভিদসন্ধান

হানিস্যাকল

ব্রিটিশ ভারতের অরণ্যতরুসন্ধানী যোশেফ ড্যালটন হুকারের বৃক্ষানুসন্ধানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে। স্রেফ উৎসাহবশত দ্বিজেন শর্মার লেখা ‘সতীর্থ বলয়ে ডারউইন’ গ্রন্থটির পৃষ্ঠা ওল্টাতে গিয়ে সেখানে সংক্ষিপ্ত পরিসরে হুকারের কর্মকাণ্ড বিবৃত হয়েছে। হুকারের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ করে চমক দিলেন অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা।

বিজ্ঞাপন

তিনি হুকারের সুবিশাল দুর্লভ গ্রন্থ ‘দ্য হিমালয়ান জার্নাল’ গ্রন্থটি ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’  নামের গ্রন্থে মাধুর্যমণ্ডিত ভাষায় পুনঃকথন করেছেন। বইটি সংগ্রহ করে পড়তে শুরু করি। ভাষা ও বর্ণনাশৈলী জাদুমন্ত্রের মতো টানতে থাকে। পড়তে গিয়ে একাধারে অনেক ধরনের স্বাদ পেতে থাকি। প্রথমে মনে হয়েছে এটি একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত, কিন্তু বৃক্ষপ্রেমীদের কাছে মনে হতে পারে বৃক্ষকথা, আবার প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে মনে হতে পারে প্রকৃতির অনবদ্য বর্ণনাসমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ। আসলে তিনটিই ঠিক। যিনি যে দৃষ্টিকোণ থেকে পড়বেন, তিনি সে ধরনের স্বাদই অনুভব করবেন। তাতে অবশ্য অনুবাদকের ভূমিকাও কম নয়। কারণ দীর্ঘ পটভূমিতে রচিত একটি উদ্ভিদতত্ত্বীয় গ্রন্থকে তিনি সুখপাঠ্য করে তুলেছেন। পড়তে গিয়ে আরেকটি কথাও মনে হয়েছে, গ্রন্থের প্রায় প্রতিটি কথাই অত্যন্ত দরকারি। আদতেও তা-ই। হুকারের হিমালয়ান জার্নাল উদ্ভিদবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যে কজন ব্রিটিশ অরণ্যতরুসন্ধানী আমাদের উদ্ভিদবিদ্যার ভিত রচনা করেছিলেন, হুকার তাঁদের অন্যতম।

হুকার শুধু হিমালয় অঞ্চলের উদ্ভিদরাজির নমুনাই সংগ্রহ করেননি; তিনি দার্জিলিং, সিকিম, নেপাল ঘুরে ঢাকা ও সিলেট হয়ে গিয়েছিলেন শিলং, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সুন্দরবন। এ কারণে হুকারের প্রস্তুতকৃত প্রজাতি তালিকায় এ অঞ্চলের বৃক্ষরাজিও ব্যাপকভাবে স্থান পেয়েছে। সাড়ে তিন বছরের দীর্ঘ অভিযানে ভারতীয় উদ্ভিদ প্রজাতির দেড় লাখ নমুনা তাঁর সংগ্রহে আসে। শুধু তা-ই নয়, হুকার তাঁর গ্রন্থে স্থানীয়দের জীবনধারার একটি চিত্রও তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হুকারের এই সংগ্রহ অভিযান ছিল সত্যিকার অর্থেই শ্রমসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় বিদেশবিভুঁইয়ে তিনি কিভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন, সেটা অনেকটাই বিস্ময়কর, সারা দিন পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যায় রোজনামচা তৈরি করা, ছবি আঁকা, পরিকল্পনা তৈরি করা রীতিমতো দুঃসাধ্য একটি কাজ। সেই সঙ্গে আছে যেকোনো অ্যাডভেঞ্চার গল্পের খলনায়কের মতো মূর্তিমান আতঙ্ক, যা সব সময় তাড়া করে ফেরে। এসব উপেক্ষা করেই হুকার এগিয়ে চলেন। উদ্ভিদ সন্ধানের মায়াবী নেশা তাঁকে আরো উদ্যমী ও পরিশ্রমী করে তোলে।

হুকারের এই সাড়ে তিন বছরের দীর্ঘ বৃক্ষ অভিযানে আমাদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে বাংলাদেশের অংশটুকু। উল্লিখিত কয়েকটি স্থান থেকে তিনি কয়েক হাজার গাছপালার নমুনা সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত এসব নমুনার ফলাফল পরবর্তীকালে ‘দ্য ফ্লোরা অব ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ নামে সাত খণ্ডে প্রকাশিত হয়, যা ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভিদ-শনাক্তির জন্য আজও অপরিহার্য আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।

‘দ্য হিমালয়ান জার্নাল’-এর দ্বিজেন শর্মা অনূদিত বাংলা সংস্করণ ‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’ গ্রন্থের বাংলাদেশ পর্বের কিছু অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো। তার সঙ্গে কিছু প্রাসঙ্গিক ছবিও। প্রকৃত অর্থে হুকার বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে যেসব উদ্ভিদ প্রজাতির উল্লেখ করেছেন এখানে তারই একটি সংক্ষিপ্ত রূপ সচিত্রকরণের চেষ্টা করেছি।

‘হিমালয়ের উদ্ভিদরাজ্যে ড্যালটন হুকার’ গ্রন্থের নির্বাচিত অংশ ও প্রাসঙ্গিক ছবি

বিস্তারিত আলোচনার আগে কিছু ব্যক্তিগত অনুভূতি এখানে হাজির করা জরুরি মনে করছি। দীর্ঘ সময় ধরে এ দেশের উদ্ভিদ প্রজাতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে এমন কিছু পুষ্প-বৃক্ষের সন্ধান পেয়েছি, যা সাধারণভাবে কোনো দূর দেশেরই মনে হয়েছে। কিন্তু হিমালয়ান জার্নালে এ ধরনের অনেক পুষ্প-বৃক্ষের সন্ধান পেয়েছি, যা দূরের কোনো দেশের নয়, আমাদের আশপাশের দেশগুলোতেই পাওয়া যায়। এ ধরনের ফুলের মধ্যে রয়েছে হানিস্যাকল, হাইড্রেনজিয়া, ম্যাগনোলিয়া, বাঁশপাতি, আইভিলতা, গোলাপ ইত্যাদি। [....] হুকার লিখেছেন, ‘হানিস্যাকল আর বিচুটির ঝাড় এতটাই শুকনো যে পায়ের চাপে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছিল। ’ [পৃষ্ঠা ৭৫] তার মানে, হানিস্যাকল এ অঞ্চলেরই লতানো ফুল।

হিমালয়ের আট হাজার ফুট ওপরে উঠে হুকার পেলেন অনেক ধরনের ম্যাগনোলিয়া। তিনি লিখলেন,

[...] ‘উদ্ভিদ-ভূগোলের বইতে লেখা হয়ে থাকে যে উত্তর আমেরিকার রকি মাউন্টেনের পূর্বাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় ম্যাগনোলিয়া জন্মে। কথাটি কিন্তু সত্য নয়। ভারতীয় পর্বতমালা ও দ্বীপপুঞ্জই আসলে এই গোত্রীয় উদ্ভিদের প্রধান কেন্দ্রভূমি। ’ [পৃ. ২৬]

আমাদের প্রকৃতিতে সেঁউতি নামের একটি বুনো গোলাপ আছে। পাওয়া যায় বৃহত্তর সিলেটের হাওরাঞ্চলে। খবরটি অনেকেরই অজানা। হুকার নদীপথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সিলেট পৌঁছার পর পথের দুই পাশের দৃশ্যমান বৃক্ষাদির যে বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন সেখানে সেঁউতির কথাও আছে।

[...] ‘মালদহ পর্যন্ত দেখলেন আম, কাঁঠাল ও তালের গাছ, সেইসঙ্গে গোলসাগু, গাছে গাছে অর্কিড ও পরাশ্রয়ী ফার্ণ। নদীর চরে প্রচুর চরঝাউ, পারে সোমরাজ, সাদা ফুলের বনগোলাপ বা সেঁউতি। ’ [পৃ. ৮৫]

অবশ্য রবীন্দ্রনাথও সেঁউতিকে যথাযথ আসনে বসিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন—

‘আমি জানি মনে-মনে,

           সেঁউতি যূথী জবা। ’

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাঁশপাতি থাকলেও সংখ্যায় খুবই কম। সে কারণে গাছটি আমাদের কাছে অচেনা। কিন্তু গাছটি হুকারের চোখ এড়ায়নি।

[...] “চেরাপুঞ্জিতে কোন রডোডেনড্রন নেই, কিন্তু আরও উত্তরে কয়েক প্রজাতি আছে। ‘ইউ’ ছাড়াও আছে একটি পাইন এবং দুটি বাঁশপাতি। ” [পৃ. ৯০]

এবার অন্যান্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।

হুকার গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে এ অঞ্চলের উদ্ভিদবৈচিত্র্যের প্রশংসা করেছেন। তিনি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছেন, এই অঞ্চলটি উদ্ভিদ প্রজাতিতেও বেশ সমৃদ্ধ। প্রাসঙ্গিক আলোচনা থেকে জানা যাক—

[...] ‘সিকিমের অন্যান্য জায়গার তুলনায় এখানে ওষুধির সংখ্যা অনেক বেশি। হুকার তাবুর সামনে বসে হাত বাড়িয়ে সংগ্রহ করলেন ৪৩ প্রজাতি। পাহাড়ে উঠে পেলেন বিভিন্ন গণের অনেকগুলো চমৎকার নমুনা...। এখানকার ২০০ প্রজাতির সবগুলোই উত্তর ইউরোপীয় গণের অন্তর্ভুক্ত। ’ [পৃ. ৬৪]

একইভাবে হুকার খাসিয়া পাহাড়ের উদ্ভিদবৈচিত্র্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁর রোজনামচায় লিখলেন—

[...] ‘খাসিয়া পাহাড়ের গাছগাছালির বিস্তারিত বিবরণ লেখার অবকাশ এখানে নেই, কেননা এগুলোর সংখ্যা ও বৈচিত্র্য এতোই অধিক যে কেবল ভারত কেন, সম্ভবত গোটা এশিয়ায়ও এমন দ্বিতীয়টি আর নেই। ’ [পৃ. ৮৯]

খাসিয়া পাহাড়ে অর্কিড সম্ভবত এ অঞ্চলের বৃহত্তম উদ্ভিদগোত্র, প্রজাতিসংখ্যা অন্যূন ২৫০, পরাশ্রয়ীরা থাকে গাছে বা পাথরের ওপর, ভূমিজগুলো জন্মে আর্দ্র বন ও টিলার ঘাসভরা ঢালে।

এই গ্রন্থের একটি বিশেষ দিক হচ্ছে স্থানীয় মানুষ সম্পর্কিত আলোচনা। হুকার তাঁর এই দীর্ঘ ভ্রমণবৃত্তান্তে যেখানেই গেছেন সেখানকার মানুষদের চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস ও পেশা নিয়ে নানা অজানা তথ্য হাজির করেছেন। আবার হিমালয়ের বিস্তৃত অঞ্চলের বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী সম্পর্কেও অনেক কথা বলেছেন। সেদিক থেকে হুকারের অনুসন্ধান নিজের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর বিস্তৃত। আর এ কারণে গ্রন্থটির একটি ঐতিহাসিক মূল্যও তৈরি হয়েছে।   প্রসঙ্গত :

[...] ‘টাংগু উপত্যকা বেশ চওড়া, পাহাড় ধীরে ধীরে উঠেছে ১৬,০০০ ফিট পর্যন্ত। নিচ ঘাসভরা, তুষারহীন। একটি প্রকাণ্ড বোল্ডারের পাশে কয়েকটি ঘর ও তাবু। এটিই লাচেন গাঁ আর এখানেই অপেক্ষায় আছেন সিংতাম সেউবাত। হুকার ১২,৭৫০ ফিট উঁচুতে তাবু খাটালেন। লোকে গোল হয়ে বসে চা ও ধুমপান করছিল। ...সন্ধ্যায় হুকারের তাবুর সামনে ভিড় জমল। সবাই রোগী, ভুগছে বাত, গলগণ্ড, চোখ-ওঠা, কাটা-ঘা, অখাদ্য কচু ও ব্যাঙের ছাতা খাওয়ার বিষক্রিয়ায়। তিনি যথাসম্ভব সকলকেই ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেন...। ’ [পৃ. ৬৪]

আবার অন্যত্র আছে তিব্বতিদের কথা—

[...] ‘তাঁরা এক বিস্তৃত তৃণভূমি পেরিয়ে একটি নিচু পাহাড়ে উঠলে মাইলখানেক দূরে তিব্বতী তাবু দেখা গেল। সেখানে পৌঁছে দেখলেন জায়গাটা পাথরের চাঙড়ের দেয়ালে ঘেরা, অনেকগুলো কুকুর বাঁধা—একেকটা বিশাল, গায়ে চামরি গরুর মতো এবড়ো থেবড়ো লোমের ঝালর, চেহারা ভয়ঙ্কর কিন্তু তেমন চালাকচতুর নয়। এই তিব্বতীরা প্রত্যেক বছর সিকিমের পালুং অঞ্চলে গরু চরাতে আসে, রাজাকে কিছু রাজস্ব দেয়, চলে যায় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে। নারী-পুরুষ উভয়ই অত্যন্ত নোংরা, সম্ভবত কখনই স্নান করে না, মুখ পুড়ে কালো হয়ে গেছে আগুনের ধোঁয়া ও রোদে। পুরুষদের গায়ে কম্বলের আলখাল্লা। মুখে পিতলের তৈরি ধুমপানের পাইপ, কোমরে লম্বা ছুরি। মেয়েদের পোষাক কিছুটা খাটো, কোমরে রুপো বা তামার কোমরবন্ধ, কেশসজ্জা নজরকাড়া তাতে জড়ান চামরি গরুর লোমের তৈরি বাড়তি লম্বা বেণী, কপালে সাঁটা পট্টিতে মুদ্রা, প্রবাল ও নীল রঙের রত্নপাথর বসান। মুখ ভারি সুশ্রী। ’ [পৃ. ৬৭]

হুকার এখানে শুধু বৃক্ষানুসন্ধানেই সময় কাটাননি, তিনি কিছু কিছু গবেষণাও করেছেন। তাঁর এসব ছোটখাটো গবেষণাতথ্য পরবর্তী সময়ে গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সিকিমের টংগু অঞ্চলে গিয়ে হুকার দেখলেন একটি ছাগল মুখে ফেনা তুলে দাঁত কড়মড়িয়ে মারা গেল।

হুকার হিমালয় অভিযানের সাড়ে তিন বছরে পাড়ি দিয়েছেন অনেক বিপত্সংকুল পথ, দুর্গম উপত্যকা, খরস্রোতা নদী। থেকেছেন অনাহারে, রোদে পুড়েছেন, ভিজেছেন বৃষ্টিতে। আর সেই সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন নানা ষড়যন্ত্রের। জনৈক খলনায়ক দেওয়ান তাঁকে পদে পদে আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দৃঢ় মনোবলের কারণেই তিনি সব ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হন। এখানে দেওয়ানের চরম অসহযোগিতা ও হেনস্তার একটি চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হুকারের সেই দার্জিলিং সফরে বন্ধু তরুবিদ ক্যাম্বেলও অংশ নিয়েছিলেন—

[...] ‘দেওয়ানের লোকেরা এই সময় ক্যাম্বেলকে গ্রেফতার করল, মাটিতে ফেলে হাত-পা বাঁধল এবং টেনে-হেঁচড়ে একটি ঘরে নিয়ে আটকাল। হুকারকে খবরটি জানিয়ে বলা হল যে ক্যাম্বেলকে রাজার হুকুমেই গ্রেফতার করা হয়েছে, গত ১২ বছরে তাঁর সিকিমবিরোধী কার্যকলাপে রাজা নাকি খুবই অসন্তুষ্ট। তাঁকে আরো জানান হলো যে, কলকাতার সঙ্গে একটা আপোসরফা না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্বেলকে ছাড়া হবে না। হুকারকেও কিছুক্ষণের জন্য আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে তিনি তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকার করলেন। পরদিন তাঁকে ছেড়ে দিয়ে বলা হল তিনি এখানে থেকে স্বাভাবিক কাজকর্ম চালাতে কিংবা দার্জিলিং চলেও যেতে পারেন। তাঁকে আরও জানান হলো যে, তিনি যেন ক্যাম্বেলকে দেওয়ানের কথামতো চলতে বলেন, নইলে বেঘোরে প্রাণ হারাবেন। ’ [পৃ. ৮২]

আমাদের সিলেট অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদী হয়ে হুকার গিয়েছিলেন কাছাড় (আসাম)। তিনি সেখানে স্থানীয় মণিপুরিদের জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুগ্ধ হন। এমনকি স্থানীয়ভাবে জন্মানো লটকন বা দইগোটা এবং আগরের ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করেছেন।

ওরাই থেকে দার্জিলিং ফিরে হুকার আরেকবার সিকিমের উত্তরাঞ্চল ঘুরে আসার আয়োজনে গোটা এপ্রিল মাস কাটালেন। আট হাজার ৬৭০ ফুট উচ্চতায় দেখলেন লাউরেল, ম্যাগনোলিয়া (উদয়পদ্ম), রডোডেনড্রন। শেষ গ্রীষ্মে বৃষ্টিপাত শুরু হলে পথচলা দুঃসাধ্য হয়ে ওঠে। অচেনা বিভুঁইয়ে হুকার নানা দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হন। তার মধ্যে আছে খলনায়ক দেওয়ানের ষড়যন্ত্র, অক্লান্ত হুকার তবু এগিয়ে চললেন। লামতেংয়ের পথে হুকার চরম খাদ্যসংকটে পড়লেন। ‘তিব্বত সীমান্তে যাওয়ার কোন গাইডও জোগাড় হচ্ছে না। দেওয়ান সম্ভবত কলকাঠি নাড়ছেন। হুকার ৩ জুন কজন সঙ্গী নিয়ে নিজেই পথ খুঁজতে বেরলেন। সঙ্গে সঙ্গে এক স্থানীয় কর্মকর্তা সদলবলে পিছু নিলেন। পথ আর ফুরায় না। নিরুপায় হুকার বুঝলেন তিনি ফাঁদে পড়েছেন। ’ এভাবে প্রতিমুহূর্তেই হুকারকে নানা বৈরী পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছে। লাচেন উপত্যকার দুর্গম এলাকায় দেখলেন নতুন ধরনের কিছু আগাছা, ফরগেট মি নট, কস্তুরীগন্ধী, এখানেই হুকারের কুকুর বাঙেই নামের একটি অদ্ভুত জন্তু ধরল। একটি বেতের পুল পেরিয়ে ওপারে যাওয়ার সময় দীর্ঘদিনের সঙ্গী কুকুরটি পা পিছলে নদীতে পড়ে মুহূর্তে প্রবল স্রোতে তলিয়ে গেল। হুকার বহুকাল কুকুরটিকে ভুলতে পারেননি।

লা গিরিপথের তুষারমৌলি পার্বত্য এলাকায় দেখা মিলল লার্চ, ম্যাপল, চেরি ও লাউরেলের। আর ছিল বানর, শূকর, কস্তুরী হরিণ এবং নতুন জাতের একটি বুনো স্ট্রবেরি। অনেক কষ্টেসৃষ্টে হুকার তিব্বত পৌঁছলেন। রাজদর্শনের কথা থাকলেও দেওয়ানের কারসাজিতে শেষ পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি। অভিযানের শেষ পর্যায়ে হুকার হিমালয়ের ২৪ প্রজাতির রডোডেনড্রনের একটি তালিকা বানালেন। লাচেন উপত্যকায় একটি নতুন গাছ খুঁজে পেলেন। ভুটিয়ারা বলে লাদোমা আর লেপচারা বলে নমরচি, জন্মে সাত হাজার ফুট উঁচু শৈলশিরায়। স্মর্তব্য যে দার্জিলিং সফরের শেষবারে নিসর্গী বন্ধু ক্যাম্বেলও তাঁর সহযাত্রী হন। দুজনে এক হাজার ৩০০ ফুট উচ্চতায় গাছাপালা দেখতে যান। চুলা গিরিপথে যাওয়ার সময় একদল তিব্বতি জানায় যে সীমান্তরক্ষীরা তাদের তিব্বতে ঢুকতে দেবে না। ক্যাম্বেল এ ব্যাপারে কথা বলতে গেলে দেওয়ানের লোকরা তাঁকে গ্রেপ্তার করল এবং হুকারকে সাময়িক গ্রেপ্তার করে আবার ছেড়ে দিয়ে বলা হলো, তিনি যেন দার্জিলিং ফিরে যান। এভাবেই শেষ হয় হিমালয় অভিযান।

হুকারের পরবর্তী গন্তব্য খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়, সঙ্গী টমসন। সেখানকার নিসর্গশোভা হিমালয়ের মতো মোহনীয় নয়। উঁচু গাছপালার সংখ্যাই বেশি। তাঁরা চেরাপুঞ্জির ১০ মাইল এলাকা থেকে দুই হাজার সপুষ্পক উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেন, সেই সঙ্গে ১৫০ প্রজাতির ফার্ন এবং অজস্র মস, লাইকেন ও ছত্রাক। এখানেই পেলেন অন্যূন ২৫০ প্রজাতির অর্কিড। সিলেটে প্রায় এক মাসের অভিযান শেষে হুকার নদীপথে এবার চললেন নোয়াখালী। ১৭ ডিসেম্বর তিনি শহরে পৌঁছলেন, ১৯ ডিসেম্বর আবার চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। পৌঁছলেন ২৩ ডিসেম্বর, প্রায় ২৪ দিনের সফরে উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ ছিল গর্জন, বাবলা, সোনাইল, নাগেশ্বর, বেত, রামডালু ও সাইকাস। অবশেষে সুন্দরবন হয়ে ২৮ জানুয়ারি তাঁরা আবার কলকাতা ফিরে গেলেন।

গ্রন্থের মুখবন্ধে দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন পাঁচ শতাধিক পৃষ্ঠার মূল বইটি তিনি পুনঃকথন করেছেন এক শ পৃষ্ঠায়। সেটি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে একজন সাধারণ পাঠকের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। কিন্তু দীর্ঘ পরিসরে একজন গবেষক তাঁর কাঙ্ক্ষিত জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত থেকে বঞ্চিত হবেন। তা ছাড়া গ্রন্থের পরিসর ছোট রাখার জন্য তুলনামূলকভাবে ছবিও কম ব্যবহৃত হয়েছে।

হুকারের হিমালয় অভিযান গ্রন্থের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, উদ্ভিদরাজ্যের বিস্তারিত বর্গবিভাজন ও প্রজাতির তালিকা। বইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায়ই আছে অসংখ্য উদ্ভিদের নাম ও তথ্যসংক্ষেপ। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় নাম সংযোজিত হলে আরো ভালো হতো। তবু উদ্ভিদপ্রেমীদের জন্য এটি একটি বিস্ময়কর গ্রন্থ।

হুকার এই দীর্ঘ ভ্রমণবৃত্তান্তের পাতায় পাতায় তাঁর ব্যাপক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর রেখেছেন। এখানে তিনি শুধু উদ্ভিদবিদই নন, একজন গবেষক, নকশাবিদ ও চিত্রশিল্পী হিসেবেও নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। সেদিক থেকেও গ্রন্থটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি : মোকারম হোসেন



সাতদিনের সেরা