kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

প্র ব ন্ধ

বিশ্বাসের বন্ধন ও বুদ্ধির মুক্তি

আবুল কাসেম ফজলুল হক

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



বিশ্বাসের বন্ধন ও বুদ্ধির মুক্তি

জীবনযাপনের জন্য মানুষের যা কিছু দরকার হয় তার কোনোটাই প্রকৃতিতে তৈরি অবস্থায় পাওয়া যায় না। এটা শুধু বর্তমানের বাস্তবতা নিয়ে নয়, দেশ-কাল-নির্বিশেষে ইতিহাসজুড়ে মানুষকে বাস্তবতায় দেখা যায়। খাদ্য, পরিধেয়, আবাস, নিরাপত্তা, আনন্দ ইত্যাদির জন্য সব সময়ই মানুষকে প্রতিবেশী কিংবা অন্য মানুষদের সঙ্গে মিলে কাজ করতে হয়েছে। এসবের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে মানুষ নানা ধারণা লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

কোনো কোনো ধারণাকে মানুষ চিরন্তন বা শাশ্বত বলে মনে করে। ক্রমেই এগুলো বিশ্বাসে পরিণত হয়। প্রকৃতি পরিবর্তনশীল। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে, বংশধারার মধ্য দিয়ে মানুষও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পরিবর্তনের প্রবাহের মধ্যে দেখা যায়, মানুষের বিশ্বাস অপরিবর্তিত থাকে। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি বিশ্বাসের বন্ধনে আটকা পড়ে। তবে অতি অল্প লোককে দেখা যায় খুব কৌতূহলী, জিজ্ঞাসু, অনুসন্ধিত্সু। তাঁদের মধ্যে থাকে স্বাধীন চিন্তাশীলতা। দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, শিল্পী তাঁদের মধ্য থেকেই আত্মপ্রকাশ করেন। সৃষ্টিশীল রাজনীতিকরাও তা-ই। উন্নতির প্রয়োজনে, সর্বজনীন কল্যাণের জন্য কেউ কেউ জীবনপাত করেন, আন্দোলন করেন। তাঁরা প্রগতির প্রয়োজনে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাসের বন্ধন থেকে মুক্ত করতে চান। তবে পুরনো বিশ্বাসের প্রবণতাকে ধরে থাকতে চান এমন মানুষও অনেক থাকেন। তাঁদের উন্নীত করতে হয় দেশকাল-উপযোগী উন্নততর বিশ্বাসে।

পৃথিবীতে মানুষের জীবনযাপনের শ্রেষ্ঠ উপায় কী?—এ প্রশ্নও চিরকাল মানুষের মনে দেখা দিয়েছে। একসময় ধর্মপ্রবর্তকরা তাঁদের প্রচারিত ধর্ম অনুযায়ী এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। প্রতিটি ধর্মেই নানা রকম অলৌকিক ব্যাপার আছে। সেগুলো বিশ্বাসের ব্যাপার। যুক্তিতর্ক দিয়ে, বিজ্ঞান-বুদ্ধি দিয়ে সেগুলো বোঝা যায় না। ধর্মবিশ্বাস কখনো কখনো নৈতিক প্রগতির, সমাজ প্রগতির পক্ষে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে আন্দোলন। বিশ্বাসের বন্ধনে আটকে থাকা মানুষ প্রগতির অন্তরায়। প্রগতির জন্য বুদ্ধির জাগরণ ও বুদ্ধির মুক্তি এবং পুরনো বিশ্বাস ছেড়ে নতুন বিশ্বাসে উত্তরণ অপরিহার্য।

এই রকম চিন্তাধারা ও কর্মধারার মধ্য দিয়েই এগিয়েছে মানুষ; অতি মন্থর গতিতে মূল্যবোধ, নৈতিক চেতনা ও বিবেক বিকশিত হয়েছে। বিকার-বিকৃতিও ঘটেছে। কোনোটাই সহজে হয়ে যায়নি। সাধনা, সংগ্রাম, সংগঠন, আন্দোলন দরকার হয়েছে। সংঘাত-সংঘর্ষও অতিক্রম করতে হয়েছে।

বিশ্বাসের বন্ধনে পড়ে একসময় বাংলার হিন্দু সমাজ দুরবস্থায় পড়েছিল। তখন সমাজের ভেতর থেকেই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন রামমোহন রায় (১৭৭২-১৮৩৩)। তিনি জীবিত থাকাকালেই কলকাতায় আত্মপ্রকাশ করেছিল ইয়ং বেঙ্গল দল। রামমোহনের মতো এই দলও চেষ্টা করেছিল সমাজকে বিশ্বাসের বন্ধন থেকে মুক্ত করে আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে উন্নতিশীল করে তুলতে।

রামমোহন ও ইয়ং বেঙ্গলরা আত্মপ্রকাশ করেছিল নবচেতনা নিয়ে—রেনেসাঁসের চেতনা। রেনেসাঁস বলতে বোঝায় নবজন্ম—new birth. রামমোহন, ইয়ং বেঙ্গল, বিদ্যাসাগর, অক্ষয় কুমার প্রমুখ চিন্তাধারা ও সমাজসংস্কার প্রচেষ্টার দ্বারা এবং বাংলায় নতুন সাহিত্য সৃষ্টি দ্বারা তাঁরা জাতীয় জীবনে নবজন্ম ঘটিয়েছিলেন।

বাংলার মুসলমান সমাজ বাংলার হিন্দু সমাজ থেকে প্রায় ১০০ বছর পিছিয়ে ছিল আধুনিক শিক্ষা লাভের দিক দিয়ে। মীর মশাররফ হোসেন, রিয়াজউদ্দিন আহমদ আল হাদী, ইসমাইল হোসেন সিরাজীর চিন্তার মধ্যে নবচেতনার পরিচয় কিছুটা ছিল। বেগম রোকেয়ার চিন্তা ও কাজের মধ্য দিয়ে রেনেসাঁসের স্পিরিট পরিচ্ছন্ন রূপ নিয়ে অভিব্যক্তি লাভ করেছে। এস ওয়াজেদ আলি, মোহাম্মদ লুতফর রহমান, এয়াকুব আলী চৌধুরী, মুহম্মদ ওয়াজেদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের চিন্তাধারায় রয়েছে রেনেসাঁসের নবচেতনা।

বাংলায় ইসলাম প্রচার কখন কিভাবে হয়েছে এবং কিভাবে এই মুসলমান সম্প্রদায় গড়ে উঠেছে তার ইতিহাসে গেলে বোঝা যাবে এই সম্প্রদায়ের তুলনামূলক পশ্চাদ্বর্তিতার কারণ।

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে পূর্ব বাংলার বিদ্যোৎসাহী মহলে এবং শিক্ষিত লোকদের মধ্যে দেখা দেয় এক জাগরণ। এই স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণের মধ্যে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি মুসলিম সাহিত্য সমাজ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। এতে উদ্যোগী ছিলেন আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন। ওদুদ ছিলেন ঢাকা কলেজের অধ্যাপক। বাকি দুজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এতে আবুল ফজল, আবদুল কাদির, শামসুল হুদা প্রমুখ ছাত্রও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত ও সক্রিয় ছিলেন। শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন এর শুভানুধ্যায়ী। যেমন—স্যার এফ রহমান, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন।

ইয়ং বেঙ্গলদের কার্যক্রম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ সম্পর্কেও অনেক তথ্য পাওয়া যায়। মুসলিম সাহিত্য সমাজ বার্ষিক শিখা পত্রিকা প্রকাশ করত। শিখার প্রতি সংখ্যায় motto হিসেবে লেখা থাকত ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’। তাঁরা জ্ঞানচর্চায় গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ‘সত্যপ্রীতি ও সাহিত্যচর্চা’। তাঁদের আন্দোলন পরিচিত হয়েছিল ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে। তাঁরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দার্শনিক উইলিয়াম জেমসের ‘A small group of Comitted Thoughtful active citizens can change the whole state and society’—এই উক্তি দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন।

উইলিয়াম জেমসের লেখা থেকে তাঁরা আরো উদ্ধৃত করেছেন, ‘The revolution of nations begins always at the top among the reflective member of the state and spreads outward and downward.’ শিখার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তে আবুল হুসেন উল্লেখ করেছেন, বাংলার মুসলমান সমাজে রেনেসাঁস সৃষ্টি ও রেনেসাঁসকে পরিব্যাপ্ত করা তাঁদের উদ্দেশ্য। তাঁদের মধ্যে গভীর শ্রদ্ধা ছিল রামমোহন, ইয়ং বেঙ্গল ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি। তাঁদের মধ্যে তরুণরা নিজেদের উনিশ শতকের কলকাতার ইয়ং বেঙ্গলদের সগোত্র মনে করে গর্ব বোধ করতেন।

ইতালি, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানির রেনেসাঁসেও নানা সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। বাংলার রেনেসাঁসেও ছিল নানা সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি। সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি বড় নয়, বড় তাঁদের মহত্ত্ব ও মহান কার্যাবলি।

আজকের বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, লেখক-শিল্পী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনগুলো সম্পর্কে নানা দিক থেকে নানা অভিযোগ শোনা যায়। আসলে আমাদের জাতীয় চরিত্রের উন্নতি দরকার। ঢাকার মুসলিম সাহিত্য সমাজ লক্ষ করেছিল, বাংলার মুসলমানদের চিন্তা-ভাবনা কোরআন-হাদিসের সুরক্ষিত দুর্গে আবদ্ধ। তারা এই দুর্গ থেকে বাংলার মুসলমানদের মনকে মুক্ত করতে চেয়েছিল। তাদের ভুলে গিয়ে আমরা মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে মত্ত হয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মবোধে ক্রমাগত আঘাত করে আত্মঘাতী কাজ করেছি। আমাদের মূলধারা ব্রিটিশশাসিত বাংলার রেনেসাঁস, ঢাকার মুক্তি আন্দোলন, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা, আওয়ামী লীগের ছয় দফা, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ। ১৯৭৫-এর ট্র্যাজিক পরিণতির পর থেকে বাংলাদেশে আমি কোনো প্রগতিশীল সংঘশক্তি খুঁজে পাই না। উনিশ শতকের কলকাতার ইয়ং বেঙ্গলদের সম্পর্কেও আমাদের কৌতূহলী হওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথের উক্তি :

‘জগতে যত মহৎ আছে হইব নত তাঁদের কাছে,

হৃদয় যেন প্রসাদ যাচে তাঁদের দ্বারে দ্বারে। ’

ডিরোজিও মাত্র ২০ বছর বয়সে কলকাতার হিন্দু কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছিলেন এবং মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁর কর্মময় জীবনের অবসান ঘটে। রামতনু লাহিড়ীর উক্তি : ‘চুম্বক যেমন লৌহকে আকর্ষণ করে তেমনি ডিরোজিও তাঁর ছাত্রদের আকর্ষণ করতেন। ’ মনে হয়, এই উক্তিতে অত্যুক্তি নেই। গোলাপকলির বিকাশের মতো হিন্দু কলেজের তরুণ শিক্ষার্থীদের মনের বিকাশ দেখে তিনি তাঁর জীবনযাত্রার সার্থকতা অনুভব করতেন—এ কথা তিনি অনুভূতিঘন আবেগময় ভাষায় কবিতা লিখে প্রকাশ করেছেন। হিন্দু কলেজ সম্পর্কে ইংরেজিতে লেখা তাঁর এই ১৪ লাইনের কবিতা পৃথিবীর যেকোনো দেশের যেকোনো কালের যথার্থ শিক্ষক মাত্রেরই জন্য প্রেরণার অফুরন্ত উৎস। এ কথাও অবশ্য মনে রাখতে হবে, কলকাতায় সে সময়টা ছিল সমাজসংস্কারের সময়। ওই রকম সম্ভাবনাময় সময়েই একজন প্রতিভাবান শিক্ষকের পক্ষে ওই রকম সাফল্য সম্ভব হতে পারে।

ডিরোজিও হিন্দু কলেজের শিক্ষকতার চাকরি থেকে অপসারিত হয়েছিলেন ছাত্রদের মধ্যে নাস্তিকতা ও অনৈতিক বক্তব্য প্রচারের অভিযোগে। ডিরোজিও কারণ দর্শানোর নোটিশের উত্তর দিয়েছিলেন, তাতে সত্যভাষণ ছিল। কিন্তু কলেজের ম্যানেজিং কমিটির বেশির ভাগ সদস্য সত্যের কোনো মূল্য দেননি।

১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গে সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে গঠিত বামফ্রন্ট সরকারের কালে সরকারিভাবে প্রথমবারের মতো ডিরোজিওর জন্মবার্ষিকী উদযাপনকালে সরকারের পূর্তমন্ত্রী বলেন : ‘ডিরোজিও ছিলেন মহান বাঙালি, মহান ভারতীয়। তিনি ছিলেন মহান কবি, যুক্তিবাদী, দার্শনিক ও জন্মবিপ্লবী; তাঁর কাছে শুধু বাঙালি নয়, সারা ভারত ঋণী। এত বড় মানবতাবাদী দার্শনিক কবির অকালমৃত্যু বড়ই বেদনার। রাজা রামমোহন রায় ও বিবেকানন্দের কর্মময় জীবন ও উদ্যমের সঙ্গেই কেবল তাঁর তুলনা চলে। ...সামান্য কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আচারসর্বস্ব বাঙালি জীবনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। বিবেকানন্দর মতোই তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক ও মানবদরদি। ’

উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর লিখিত ভাষণে উল্লেখ করেন : ‘স্বাধীনতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও দেশপ্রেমের মনোভাব ছাত্রদের মনে জাগিয়ে তুলবার এক দুর্লভ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন ডিরোজিও। ... ডিরোজিও ও তাঁর ছাত্র কালীপ্রসাদ ঘোষের আগে ভারতবর্ষে অন্য কেউ দেশাত্মবোধক কবিতা লিখেছিলেন বলে জানি না। ’

ডিরোজিওর স্মৃতিরক্ষার সরকারি উদ্যোগকে অভিনন্দিত করে বাঙালির ইতিহাস গ্রন্থের লেখক নীহাররঞ্জন রায় বলেন : ‘ডিরোজিওকে ভুলে যাওয়া বা উপেক্ষা করা জাতীয় জীবনে আত্মহত্যার শামিল। তিনি প্রথম আমাদের যুবসমাজের চোখে নতুন ঊষার স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছিলেন। তাঁর ভাবনার উত্তরসূরি হয়েই আজ আমরা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। এই যুক্তিবাদী দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক, মানবতাবাদী কবি আমাদের জড় জীবনকে নতুন চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রাণপাত করেছেন। তিনি ছিলেন মহান আদর্শবাদী শিক্ষক, ছাত্রগতপ্রাণ। ...ডিরোজিও সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি স্বাধীনতা কী, তা বাঙালি জাতিকে শিখিয়েছিলেন। ’

এসব উক্তিতে আবেগের উত্তাপ আছে, তা সত্ত্বেও এসব উক্তিকে বোধ হয় অত্যুক্তি বলা যায় না। বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসেবে আজ আমরা অনুভব করি যে ডিরোজিও আমাদের ঐতিহ্যেরও অন্তর্গত।

ইয়ং বেঙ্গল বলে যাঁরা পরিচিত হয়েছিলেন তাঁদের দলে ডিরোজিও ছাড়া আরেকজন চিন্তানায়ক ছিলেন ডেভিড হেয়ার। তিনি ঘড়ির ব্যবসা নিয়ে ব্রিটেন থেকে কলকাতায় এসেছিলেন। অতঃপর তৎকালীন পতিত বাঙালি জাতির উন্নতি সাধনের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। হিন্দু কলেজের শিক্ষক ছিলেন না তিনি; তবে কলেজ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রদের প্রতি তাঁর ছিল সীমাহীন স্নেহ। তিনি ছিলেন শাস্ত্রনিরপেক্ষ যুক্তিবাদী—ইউরোপের রেনেসাঁসের এবং ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের ধারক-বাহক। খ্রিস্টান মিশনারিরা সেকালে ছাত্রসমাজকে প্রভাবিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তার গ্রাস থেকে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের রক্ষা করার, সেই সঙ্গে হিন্দু সমাজের প্রচলিত অন্ধবিশ্বাস, অনাচার ও অবক্ষয় থেকে ছাত্রদের উদ্ধার করার এবং সন্ধিত্সু মন ও উন্নত চিন্তা গড়ে তোলার কাজে তিনি জীবনপাত করেছিলেন। বলা বাহুল্য, ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের দ্বারা উনিশ শতকের প্রগতিশীল ব্যক্তিমাত্রই অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ইয়ং বেঙ্গলদের ওপর ডেভিড হেয়ারের ব্যক্তিত্বের ও চিন্তাধারারও প্রভাব ছিল অপরিসীম। ডিরোজিওকে চাকরিচ্যুত করার ফলে, অতি অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যুর কারণে, সর্বোপরি তাঁর শিক্ষাদান পদ্ধতির উন্নত মান, তাঁর কাব্য ও অন্য রচনাবলি ইত্যাদির জন্য উত্তরকালে ক্রমেই ডিরোজিওর ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। প্রগতিবিরোধী শক্তি ডিরোজিওর মহত্ত্ব বুঝতে পারেনি। ডেভিড হেয়ার লেখক ছিলেন না। ডিরোজিও প্রতিভাবান ছিলেন—এর প্রমাণ তাঁর লেখার মধ্যেও আছে।

ডিরোজিও-ডেভিড হেয়ারের অনতিপরেই হিন্দু কলেজের আরেক মহত্প্রাণ ইংরেজি শিক্ষক রিচার্ডসন ছাত্রদের মধ্যে নতুন অনুভূতির বিকাশ ঘটান। কলেজের তিনি ছিলেন প্রিন্সিপাল ও ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক, সৌন্দর্যানুরাগী, শিল্প-সাহিত্যানুরাগী। তাঁর শিক্ষার ফলে বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রদের সৌন্দর্যানুভূতি ও সুকুমারবৃত্তির বিকাশ ঘটে। মধুসূদন তাঁর অনুরাগী ছাত্র ছিলেন। রিচার্ডসনের হাতের লেখার স্টাইলও মধুসূদন অনুসরণ করতেন। রিচার্ডসনের হাতের লেখার সঙ্গে মধুসূদনের হাতের লেখার আশ্চর্য মিল দেখা যায়।

বাংলার ইতিহাসে ডিরোজিও-ডেভিড হেয়ার-রিচার্ডসনের ভাবধারা দ্বারা অনুপ্রাণিত গোষ্ঠীই পরিচিত হয়েছে ইয়ং বেঙ্গল বলে। ইয়ং বেঙ্গলদের এর চেয়ে সুস্পষ্ট পরিচয় বোধ হয় দেওয়া সম্ভব নয়। অনেকে হিন্দু কলেজের ছাত্রদের প্রগতিশীল অংশকে অভিহিত করেছেন ইয়ং বেঙ্গল বলে। কারো কারো লেখায় দেখা যায় হিন্দু কলেজের উচ্ছৃঙ্খল ছাত্ররা অভিহিত হয়েছে ইয়ং বেঙ্গল বলে। রামমোহন পাশ্চাত্য আদর্শকে গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন। তা দ্বারা বাঙালির স্বধর্মকে স্থানচ্যুত করার জন্য নয়; স্বধর্মকে সমৃদ্ধ, পরিপুষ্ট ও বিকশিত করার জন্য। পাশ্চাত্য আদর্শকে আত্মস্থ করে বাঙালি আরো উন্নত বাঙালি হবে, ইংরেজ হয়ে যাবে না—এই ছিল রামমোহনের অভিপ্রায়। ইয়ং বেঙ্গলদের মধ্যে স্বধর্ম সম্পর্কে সচেতনতার অভাব ছিল। উনিশ শতকের বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তির ও জ্ঞানের বিকাশের ইতিহাসে ইয়ং বেঙ্গলদের ধারায় অনেকে অক্ষয়কুমার দত্ত ও বিদ্যাসাগরকেও অন্তর্ভুক্ত করেন।



সাতদিনের সেরা