kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

প্র ব ন্ধ

শতবর্ষ পেরিয়ে সোমেন চন্দ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩২ মিনিটে



শতবর্ষ পেরিয়ে সোমেন চন্দ

অঙ্কন : মানব

সোমেন চন্দর জন্মের পর ১০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। তাঁর জন্ম ২৪ মে ১৯২০ সালে, মৃত্যু ৮ মার্চ ১৯৪২-এ, অর্থাৎ বেঁচেছিলেন মাত্র ২২ বছর। তা-ও নয়, ২১ বছর ৯ মাস মাত্র। স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেনি, সেটাও অবশ্য ঘটতে পারত, কারণ কৈশোরে তিনি ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, যে রোগে সুকান্ত ভট্টাচার্য মারা যান, আরো কম বয়সে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্যুকালে সুকান্তর বয়স ছিল ২১ বছর; সুকান্তর জন্ম ১৯২৬-এ, মৃত্যু ১৯৪৭-এ। সুকান্ত অধিক পরিচিত, সোমেনের চেয়ে। তার একাধিক কারণ আছে। সুকান্ত সোমেনের পরের লেখক; আবার সুকান্ত ছিলেন বাংলার রাজধানী কলকাতার, সোমেনের বসবাস মফস্বল শহর ঢাকায়। প্রকাশের সুযোগ রাজধানীবাসী সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্য বেশি ছিল, মফস্বলবাসী সোমেন চন্দর তুলনায়। গুণগত তুলনার প্রশ্ন অবান্তর, দুজনই ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান। কিন্তু তাঁদের প্রকাশের মাধ্যম ছিল স্বতন্ত্র; সুকান্ত কবিতা লিখেছেন, সোমেন ছিলেন কথাসাহিত্যিক। এটা অনস্বীকার্য যে কবিতার আবেদন সব সময়েই অধিক, গদ্যের তুলনায়। কবিতা স্মরণে থাকে, উদ্ধৃত হয়, মুখে মুখে ফেরে; গদ্যের জন্য সে সুযোগ কিছুটা হলেও কম। দুজনের ভেতর গভীর ঐক্য ছিল আরেক জায়গায়, উভয়েই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। সেই শ্রেণির সীমানা ও নিষেধ ভেঙে তাঁরা দুজনেই বের হয়ে এসেছিলেন। তাঁরা বিপ্লবী ছিলেন। জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী নন, সমাজবিপ্লবী। আরো নির্দিষ্ট করে বললে কমিউনিস্ট।

২১-২২ বছরের দুই তরুণ, কৈশোর পার হয়ে যৌবনে মাত্র পা দিয়েছেন, ওই সময়েই তাঁরা চলে গেলেন। যক্ষ্মা রোগের তখন সুচিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না, থাকলে সুকান্ত হয়তো আরো অনেক দিন বেঁচে থাকতেন। সোমেন তাঁর শারীরিক ব্যাধি কাটিয়ে উঠেছিলেন, কাজ করছিলেন দিনরাত, পার্টির কাজ সারা দিন, লেখার কাজ রাতভর। বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না, হারিকেনের আলোতে লিখতে হতো। এমনও ঘটনা ঘটেছে যে সোমেন খেয়াল করেননি, রাত কেটে কখন সকাল হয়ে গেছে। অত্যন্ত কর্মঠ এই যুবকের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেনি। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। যারা হত্যা করল তাদের দুর্বৃত্ত, গুণ্ডা, ভাড়া করা লোক ইত্যাদি বলার রেওয়াজ আছে; কিন্তু তারা আসলে ছিল রাজনীতিরই লোক, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির। চল্লিশের দশকে জাতীয়তাবাদীরা প্রবল ছিল, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা ও মুসলিম জাতীয়তাবাদীরা—এমনকি পরস্পরকে হত্যাও করত, দাঙ্গা পরিণত হয়েছিল স্বাভাবিক রাজনৈতিক ঘটনায়। হিন্দু সোমেন চন্দ কিন্তু মুসলমান জাতীয়তাবাদী কর্মীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারাননি; যদিও তেমনটা ঘটতে পারত, ঢাকা শহর বেশ তপ্ত ছিল হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার দরুন, সে বিপদ নিয়ে সোমেন চন্দর অসাধারণ একটি গল্পও আছে। চিহ্নিত শত্রু হিসেবে সোমেন চন্দকে রেল শ্রমিকদের চলমান এক মিছিলের সামনে থেকে টেনে বের করে ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে কয়েকজন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মী। নিজেদের তারা দেশপ্রেমিক বলেই নিশ্চিত জানত, দেশবাসীও তাদের ওই পরিচয়েই চিনত, কারণ তারা ছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর দলের লোক, ফরোয়ার্ড ব্লক ও রেভল্যুশনারি সোশ্যালিস্ট পার্টির সদস্য। এরা দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছিল। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশকে তাড়ানোর লক্ষ্যে সুভাষ বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ তখন ভারত সীমান্তের একেবারে দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে। কমিউনিস্টরাও তো দেশের শত্রু ছিল না। তারা জেল খেটেছে, তাদের পার্টি নিষিদ্ধ হয়েছে, দিনের পর দিন তারা প্রত্যক্ষ সংগ্রাম করেছে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে; কিন্তু জাতীয়তাবাদীরা ছিল উগ্র, তাদের ভেতর অন্ধত্ব দেখা দিয়েছিল, তারা মনে করেছিল কমিউনিস্টরা দেশদ্রোহী। কমিউনিস্টরা ব্রিটিশের পক্ষের লোক, কাজেই ঘরের শত্রু বিভীষণকে নির্মূল করাটা জাতীয়তাবাদীদের জন্য ওই বিশেষ মুহূর্তে একেবারে প্রাথমিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঘাতক রাজনৈতিক কর্মীরা সোমেন চন্দকে চিনত। সোমেন চন্দ তখন ইস্ট বেঙ্গল রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সে কাজ তিনি করতেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসেবেই। ৮ মার্চ ১৯৪২ সাল। সোমেন সেদিন একটি মিছিলের সামনে ছিলেন, মিছিলের সামনেই তিনি সাধারণত থাকতেন। মিছিল যাচ্ছিল শহরের সূত্রাপুরে, সেখানে ফ্যাসিস্টবিরোধী এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সোমেন ছিলেন আয়োজকদের একজন।

কমিউনিস্টদের আরেকটি প্রাথমিক অপারগতা এই যে তারা জাতি-সমস্যার মীমাংসার ক্ষেত্রে অগ্রবর্তী ভূমিকা নেয়নি। ভারতবর্ষ যে এক জাতির দেশ নয়, বহু জাতির দেশ, সেটি তাদের অজানা ছিল না, জাতি গঠনে ভাষার ভূমিকাই প্রধান এই ধারণাও তারা নিশ্চয়ই পেয়ে গিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকে। কিন্তু ওই জ্ঞানকে তারা স্পষ্টভাবে দেশবাসীর কাছে নিয়ে যায়নি। নিয়ে গেলে এবং ওই সত্যকে প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপর হলে ব্রিটিশ শাসনাধীনে সম্প্রদায় যে জাতি হয়ে গেল এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা যে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে রক্তাক্ত করল, যার পরিণতিতে সাতচল্লিশে দেশভাগ ঘটল, সে ট্র্যাজেডিটা হয়তো ঘটত না। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে সামনে নিয়ে আসার কাজটা তারা করেনি। দুই জাতীয়তাবাদী দল দুই দিক থেকে হৈহৈ করে এগিয়ে গেল, তাতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ দিল, লক্ষ লক্ষ মানুষ বাসভূমি থেকে উৎপাটিত হলো এবং জাতীয়তাবাদীদের ‘দেশপ্রেমিক’ অস্ত্রাঘাতে সোমেন চন্দর মতো মুক্তিসংগ্রামীদের প্রাণ হারানোর ঘটনা ঘটল। কমিউনিস্টদের দ্বিতীয় অপারগতটা হলো কৃষকদের কাছে যথোপযুক্ত রূপে যেতে না পারা।

কমিউনিস্টরা যা করতে পারত তা হলো যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বিপ্লবের পথে এগিয়ে যাওয়া, লেনিনের পার্টি যেমনটা করেছিল, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। তবে সে রকম সাংগঠনিক শক্তি ও প্রস্তুতি ভারতের কমিউনিস্টদের ছিল না। তেমন অবস্থায় তারা অবশ্য উদ্যোগ নিতে পারত সব ব্রিটিশবিরোধী শক্তিকে একত্র করে একটি জাতীয় সরকার গঠনের। সেটা তারা করেনি। ওদিকে দেশের বাইরে চলে গিয়ে সুভাষ বসু যেহেতু যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার আওয়াজ তুলেছেন, সত্যাগ্রহী গান্ধীজি তাই বাধ্য হয়ে ডাক দিলেন ‘ভারত ছাড়’-এর। ব্রিটিশকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করার মতো শক্তি কংগ্রেসের অবশ্য ছিল না, কিন্তু সাধারণ মানুষ যেহেতু ওই রকমের একটা ডাকের জন্য অপেক্ষা করছিল, তাদের দিক থেকে তাই ভালো সাড়া পাওয়া গেল। ওই মুহূর্তে কমিউনিস্টদের জনবিচ্ছিন্নতাটা বাড়ল এবং সুভাষপন্থীরা ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল ‘বিশ্বাসঘাতক’ কমিউনিস্টদের ওপর। সেই ক্ষিপ্তদশারই শিকার হলেন ঢাকার সোমেন চন্দ। দেশের অন্যত্রও এমন ঘটনা ঘটেছে; কেউ কেউ নিহতও হয়েছেন, কিন্তু সোমেন চন্দ যেহেতু অনেক বেশি পরিচিত ছিলেন এবং শুধু রাজনৈতিক কর্মী নন, সাহিত্যিকও ছিলেন, তাই তাঁকে হত্যা করার ঘটনা ব্যাপক ও গভীর দুঃখের ও প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়েছিল।

 

২.

চল্লিশের দশকে ঢাকা শহরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল অতি পরিচিত ঘটনা। শহরের বাসিন্দারা তখন মস্ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছিল। বিপদটা যে কেমন তার সজীব একটা ছবি আছে সোমেনের লিখিত ‘দাঙ্গা’ নামের গল্পটিতে। গল্পের নায়ক অশোক। বোঝা যাচ্ছে সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। গল্পের শুরুতেই দাঙ্গায় আতঙ্কিত শহরের একটি ছবি আছে। ভীতসন্ত্রস্ত একটি লোক খুব তাড়াতাড়ি রেলের লেভেলক্রসিং পার হচ্ছিল।

‘তাহার হাতের কাছে বা কিছু দূরে একটা লোকও দেখা যায় না—সব শূন্য, মরুভূমির মতো শূন্য। দূরে পিচঢালা পথের ওপর দিয়ে মাঝে মাঝে দুই-একটি সুদৃশ্য মোটরকার হুস করে চলে যায় বটে, কিন্তু এত তীব্র বেগে যায় যে মনে হয় যেন এই মাত্র কেউ তাকেও ছুরি মেরেছে, আর সেই ছোরার ক্ষত হাত দিয়ে চেপে ধরে ছুটে চলেছে। নির্জন রাস্তায় মোটরগাড়ির এমনি যাতায়াত আরো ভয়াবহ মনে হয়। ’

অল্প কথার ভেতর দিয়েই শহরের মানুষের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতাটাকে স্পষ্ট করা হয়েছে। সোমেন চন্দ কবি নন, কথাসাহিত্যিক; কিন্তু কবিতার যে গুণ, উপমার ব্যবহার, তা এই তরুণ গল্প লেখকের গল্পে খুব প্রয়োজনীয়, অথচ খুব স্বাভাবিকভাবে চলে এসেছে। মরুভূমির মতো শূন্যতা, ক্ষত চেপে ধরে ছুরিকাহত মানুষের মতো মোটরগাড়ির ছুটে যাওয়া—এমন উপমা জনহীন রাস্তার ভয়াবহতাকে একমুহূর্তে আমাদের চোখের সামনে নিয়ে আসে। এ রকমের উপমা সোমেন চন্দর লেখায় আমরা সবখানেই পাই। সন্ত্রস্ত যে লোকটি দ্রুত পথ পার হচ্ছিল, তাকেও আমরা দেখতে পাচ্ছি। ছবিটা সচল। ছবির এই সচলতা তৈরিতে শিল্পী সোমেনের বিশেষ দক্ষতা। সন্ত্রস্ত লোকটা তো মাঠ ছেড়ে রাস্তায় পড়ল। এরপর কী হলো?

লেখকের পর্যবেক্ষণ আছে, তাঁর কল্পনাশক্তিও কাজ করছে। ছবিটা খুবই জীবন্ত ও দুঃসহ হয়ে উঠেছে। সোমেন চন্দ নিশ্চয়ই জানতেন না যে এই গল্প লেখার বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি নিজেই অচেনা ওই লোকটির মতো নিহত হবেন এবং সেটা ঘটবে ওই রকম ঘাতকদের ছুরিতেই। ছুরি মেরে ঘাতকরাও ওইভাবেই পালিয়ে যাবে।

সোমেন চন্দর একটিমাত্র উপন্যাসই পাওয়া গেছে, তারও বড় অংশটা গেছে হারিয়ে। ‘বন্যা’ নামের ওই উপন্যাসের শুরু কিশোরী মালতীকে দিয়ে। উপন্যাসের প্রথম বাক্যটি এ রকমের : ‘সন্ধ্যার আগে তালবনের নিচে বর্ষার জল দেখিয়া মালতী নিশ্চয় স্বপ্ন দেখিতেছিল। ’ মনে হচ্ছিল কাহিনিটি মালতীকে কেন্দ্রে রেখেই গড়ে উঠবে। সেটাই ছিল প্রত্যাশিত, কিন্তু সোমেন পারেননি। মালতী গল্পের কেন্দ্রে থাকেনি। দুই কারণে। প্রথমত, পিতৃতান্ত্রিকতার বাস্তবতায় উপন্যাসের জগত্টা স্বভাবতই ঝুঁকে পড়েছে মালতীকে পেছনে রেখে যুবক রজতের দিকে। দ্বিতীয় কারণ উপন্যাসে রজতকে তিনি দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন তাঁর নিজের মুখপাত্র হিসেবে। রজত সম্পর্কে তাঁর সাহিত্যিক-সুহূদ নির্মলকুমার ঘোষকে তিনি লিখেছেন, ‘সে আমার উপন্যাসের নায়ক, ইচ্ছা করেই আমি তাকে (শুধু তাকেই) অস্বাভাবিক করেছি, তার কারণে, যা আমি বলতে চাই, নইলে তা বলা হয় না। একটা নতুন বলিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ওর ওপরই বেশি ছায়াপাত করেছে। ’ রজতের একটা মতাদর্শ রয়েছে, বলছেন তিনি। আরো বলছেন যে রজতের মতাদর্শটা পরিষ্কার করে বলা যাচ্ছে না, অনেকখানিই ‘চেপে’ যেতে হয়েছে, বলেছেন যে লেখক হিসেবে তিনি ‘পুরোপুরি খোলা’ হতে পারেননি। এর কারণ হলো মতাদর্শটি কমিউনিজম। রজতকে কমিউনিস্ট হিসেবে উপস্থিত করার ব্যাপারে অসুবিধা ছিল। সরকার পছন্দ করত না। বই নিষিদ্ধ হয়ে যাবে, এমন ঝুঁকি ছিল। কারণ সরকার ছিল ঘোরতর কমিউনিস্টবিরোধী এবং কমিউনিস্ট পার্টি তখন ছিল নিষিদ্ধ। নির্মলকুমার ঘোষ একাধিক পত্রিকার সম্পাদনা করতেন, একটি পত্রিকা সম্পাদকীয়তে বঞ্চিত মানুষের দুঃখাবসানের জন্য বিপ্লব যে আবশ্যক, এমন কথাও বলা হয়েছিল। সোমেন তাঁকে লিখেছেন, ‘খুবই ভালো লাগল, আমি নিজেই অনুভব করছি যেন। ’ কিন্তু এমনকি বিপ্লব সমর্থক ওই সম্পাদককেও সোমেন চন্দ এটা খোলাসা করে বলতে পারেননি যে ‘বন্যা’ উপন্যাসে তাঁর কল্পনার নায়কটি একজন কমিউনিস্ট। এর কারণ নির্মলকুমার ঘোষ বিপ্লবের পক্ষে হলেও ছিলেন কমিউনিস্টবিরোধী। মালতী প্রসঙ্গে যা বলছিলাম। মালতী যে একজন কমিউনিস্ট হবে, সেটা তো সম্ভব ছিল না; মালতীকে দিয়ে কাহিনির শুরু হলেও সে যে প্রধান চরিত্র হবে না, এটা ছিল একেবারেই অবধারিত।

 

৩.

আটকে পড়া দশাটা খুব ভালোভাবেই দেখা যাচ্ছে সোমেনের সবচেয়ে আলোচিত গল্প ‘ইঁদুর’-এ। গল্পের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারটিকে গলির ভেতর চেপে ধরে রেখেছে যে শত্রু সেটি দাঙ্গা নয়, দাঙ্গার চেয়েও যা স্থায়ী সেই দারিদ্র্য। গল্পের শুরুতেই নায়ক সুকুমার জানাচ্ছে যে তাদের বাসায় ইঁদুরের উৎপাত এতটাই বেড়ে গেছে যে আর কিছুতেই টেকা যাচ্ছে না। ‘তাদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। ’ ইঁদুরগুলো বাস্তবিক সত্য। তারা আছে, নিম্নমধ্যবিত্তের বাড়িতে যেমনটা থাকা স্বাভাবিক। আবার তারা রূপকও। পুঁজিবাদের রূপক। যে পুঁজিবাদ উৎপাত করে, কুরে কুরে খায়। ইঁদুরদের তৎপরতায় কোনো বিরতি নেই। জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। পাগল হওয়ার দশা। সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছেন সুকুমারের মা।

এর মধ্যেই ঘটল এক ঘটনা।

মায়ের ডাকাডাকিতে সাড়া দিয়ে মায়ের অঙ্গুলিনির্দেশে সুকুমার যা দেখল তাতে বিস্মিত হওয়ার কারণ থাকলেও সে বিস্মিত হতে চাইল না। সে দেখতে পেল,

‘আমাদের ক্বচিৎ-আনা দুধের ভাঁড়টি এক পাশে হাঁ করে আমার দিকে চেয়ে আছে আর তারই পাশ দিয়ে একটা সাদা পথ তৈরি করে এক প্রকাণ্ড ইঁদুর দ্রুত চলে গেল। ’

দৃশ্যটি দেখে সুকুমার একটি দার্শনিক অবস্থান গ্রহণ করতে চায়, কিন্তু মা জানেন ঘটনার তাৎপর্যটা কেমন ভয়াবহ। তাঁর নিজের কোনো দোষ নেই, তবু পরিণতির আতঙ্কে তিনি কেঁদেই ফেলেন। বাবা ফিরলেন সন্ধ্যার পরে। তাঁর ভাব দেখে মনে হলো তিনি হতভম্ব হননি, দুঃখও পাননি। বরং বললেন, বেশ হয়েছে, ভালো হয়েছে। ‘আরে, মানুষের জান নিয়েই টানাটানি দুধ খেয়ে আর কী হবে বলো। ’

নিজেকে তিনি হিটলার হিসেবে কল্পনা করে থাকবেন, কিন্তু তাঁর এবং তাঁদের হিসাবে তো মস্তবড় একটা ভুল ছিল। হিটলার জেতেননি, তাঁকে লেজ গুটিয়ে পালাতে হয়েছে, আত্মহত্যাই করতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত। ‘ইঁদুর’ গল্পটি লেখা ১৯৪২-এ, হিটলারের আত্মহত্যা ঘটেছে এর তিন বছরের মধ্যেই। জিতেছে ওই রাশিয়াই, কারণ সে দেশের মানুষ তখন আর জাতীয়তাবাদী ছিল না, সমাজতন্ত্রীতে পরিণত হয়েছিল। সুকুমারের পিতারা এটা অনুধাবন করতে পারেননি যে স্বদেশি হিটলার-প্রেমিকরা কত ভয়ংকর হতে পারে। যারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা করছিল তারা তো হিটলারপন্থীই ছিল, দুই দলে বিভক্ত তারা একে অন্যকে মারছিল। মারছিল তারা নিরীহ মানুষকেও, আরো অধিক মাত্রায়। সুকুমারের পেছনে যিনি আছেন, সুকুমার যাঁর ছায়া, সেই সোমেন চন্দ যে দেশপ্রেমিক উন্মত্ত হিটলারানুরাগীদের হাতে নিহত হবেন, সেটা সুকুমারের পিতারা কতটা আন্দাজ করতে পারছিলেন কে জানে। করার কথা যে নয়, সে তো আমরা জানি। বিশ্বাসের যে জোরে ‘দাঙ্গা’ গল্পের অশোক তার মাকে বলেছিল বিপ্লবের কখনো মৃত্যু হয় না, সেই বিশ্বাস সোমেন চন্দরও। ব্যক্তি সোমেন চলে গেছেন, কিন্তু যে বিপ্লবী শক্তির ওপর সমাজতন্ত্রীদের অবিচল আস্থা ছিল, সেই শক্তিটা রয়ে গেছে। সোমেনের মৃত্যুর পরে বিপ্লব ঘটেছে চীনে, ঘটেছে কিউবায় এবং বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ লড়াই করছে পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদকে হাঁকিয়ে দিয়ে সামাজিক মালিকানার নতুন বিশ্ব গড়ে তুলবে বলে। সে সংগ্রামে সোমেন আছেন, আছে তাঁর অশোক, রয়েছে তাঁর সুকুমার। বড় হিটলার আত্মহত্যা করেছে, ছোট হিটলাররা এখন সোমেন চন্দর লেখা গল্পের ভয়াবহ রকমের উৎপাত সৃষ্টিকারী ইঁদুরগুলোর মতোই ধরা পড়ার এবং মারা যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। সবাই মিলেই মারবে তাদের।

সুকুমার এগোচ্ছিল নতুন ইতিহাসের পথ ধরে, যেমন এগোচ্ছিলেন সোমেন চন্দ নিজেও। অত্যন্ত উঁচুমাপের প্রতিভাবান সোমেন চন্দ লেখা শুরু করেন ১৭ বছর বয়সে। ওই বয়সে শরত্চন্দ্রেরও সাহিত্যযাত্রা শুরু। সোমেন চন্দ শরত্চন্দ্রের ধারায়ই লিখতে পারতেন। পল্লীজীবনের বিষয়ে তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল। প্রথম পর্যায়ে তাঁর ‘রাত্রিশেষ’, ‘স্বপ্ন’, ‘গান’, ‘পথবর্তী’—এসব গল্পে শরত্চন্দ্রের ধাঁচ আছে। সোমেন সেটা ধরতে পেরেছেন এবং সেখানে থাকতে চাননি। ইতিহাসের ভেতরে থেকেই তিনি লিখেছেন, কিন্তু ইতিহাসকে বুঝতে চেয়েছেন। ইতিহাসকে তিনি বুঝতে পেরেছেনও। আর সেখানেই তাঁর নতুনত্ব। নিম্নমধ্যবিত্ত সোমেন এমনকি উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও পাননি। ম্যাট্রিক পাস করার পরে কোনোমতে ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকার মিটফোর্ড মেডিক্যাল স্কুলে; সেখানে এক বছরের বেশি থাকা হয়নি। খরচ জোগানোটা কঠিন ছিল, তদুপরি শারীরিক দুর্বলতা দেখা দিয়েছিল। শরত্চন্দ্রের মতো করে লেখা যাবে না, সামন্তবাদের প্রতি পক্ষপাতসম্পন্ন রচনা যে তাঁর জন্য নয়, সোমেন সেটা বুঝেছেন। বিত্তহীন মধ্যবিত্তদের নিয়েই তিনি লিখছিলেন; সেখানেই যদি থাকতেন তাহলে সে জীবনের ক্লান্তিতে ভরপুর ও শ্বাসরুদ্ধকর একঘেয়েমি নিয়েই তাঁকেও লিখতে হতো, আটকে থাকতে হতো ছোট একটি বৃত্তে; রয়ে যেতেন ‘ইঁদুর’ গল্পের প্রথম অংশের ভেতরেই, তাঁর আগের ও পরের অনেক লেখকই যেমনটা রয়ে গেছেন। গল্পের দ্বিতীয় অংশটা আর লেখা হতো না। দ্বিতীয় অংশের সমাপ্তিটা স্মরণযোগ্য। সেটি এই রকমের : ইঁদুর মারা কলে কয়েকটি ইঁদুর ধরা পড়েছে। ছেলেপিলে সবাই ছুটে এসেছে। উপস্থিত ছেলেদের মধ্যে যারা সাহসী তারা কেউ লাঠি, কেউ বড় বড় ইট নিয়ে বসেছে রাস্তার ধারে। ব্যাপার আর কিছু নয়, কয়েকটা ইঁদুর ধরা পড়েছে। ইঙ্গিতটা এই রকমের যে বাকিগুলোও ধরা পড়বে। সময়ের অপেক্ষা মাত্র। সহযোদ্ধা এক কমিউনিস্ট কর্মী অনিল মুখার্জিকে সোমেন বলেছিলেন, ‘সারা দিন রেলওয়ে শ্রমিকদের মধ্যে না থাকলে আমি আজকাল লিখতে পারি না। ’ লিখবেন কী করে? নিম্নমধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে যেটুকু লেখার তা তো এরই মধ্যে লেখা হয়ে গেছে; তিনি নিজেও লিখেছেন, নতুন জীবনের খোঁজ না পেলে লেখার উপাদান আসবে কোথা থেকে?

মেহনতিদের জীবন নিয়ে অভিজ্ঞতা ও বই পড়া থেকে সোমেন লেখক হিসেবে অগ্রযাত্রার রসদ পেয়ে গেছেন। নইলে তাৎপর্যপূর্ণ অমন সব রচনা তিনি রেখে যেতে পারতেন না। শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা নিয়েছেন ম্যাক্সিম গোর্কির কাছ থেকেও। গোর্কি ছিলেন রুশ বিপ্লবের সাহিত্যিক প্রস্তুতিতে দায়বদ্ধ লেখকদের অন্যতম। সোমেন চন্দর অন্য একটি গল্পের নায়কের নামও সুকুমার এবং এই সুকুমারও কমিউনিস্ট কর্মী, যে জন্য পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়, রাত্রিবেলায় বসতবাড়ি ঘেরাও করে। গল্পটির নাম ‘একটি রাত’। সুকুমারের কাছে সারা দিন অনেক লোক আসে। আসে কারখানার শ্রমিকও, যাদের মধ্যে হিন্দু আছে, আছে মুসলমান। এরা রাশিয়া, লেনিন—এসব নিয়ে আলোচনা করে। একদিনের ঘটনা। ঘরে সবাই আছে, সুকুমারের মা-ও আছেন।

বাংলা সাহিত্যের কোনো বই সোমেন চন্দকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানা যায় না। তবে বাংলার তরুণ লেখকরা প্রগতিশীল সাহিত্য রচনায় এগিয়ে আসছেন দেখে তিনি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনা যে তিনি উৎসাহের সঙ্গে পড়েছেন, সেটা তিনি নিজেই জানিয়েছেন। ১৯৪০-এর ৩০ সেপ্টেম্বর লেখা চিঠিতে তিনি তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু অমৃতকুমার দত্তকে জানাচ্ছেন, ‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড় লেখক হতে পারেন, তাঁর লেখায় প্রগতির ছাপ আছে। [...] তবে রাজনীতির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ মনে হয় ক্ষীণ, আর পড়া লেখাও কম। ’ সোমেন জানেন, যে ধরনের লেখার প্রত্যাশায় তিনি রয়েছেন তাঁর জন্য দুটিরই দরকার হবে। রাজনীতি চাই এবং চাই পড়ালেখা। জ্ঞান ও প্রেরণা আসবে দুই দিক থেকেই। এর কিছুটা আগে নির্মলকুমার ঘোষকে লেখা চিঠিতে জ্ঞানের আবশ্যকতার কথাটা বিশেষ জোর দিয়ে বলেছিলেন। রাজনীতির প্রসঙ্গটা আনেননি। কারণ হয়তো এই যে নির্মলকুমার যেহেতু শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীই ছিলেন, তাই রাজনীতির বিষয়টা হয়তো পছন্দ করতেন না। সোমেনের বক্তব্য ছিল,

‘মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা আপনি বলেন, আমিও বলি, স্বীকার করি, শ্রেষ্ঠ গল্প লেখকের যা গুণ তার সবই আছে তাঁর মধ্যে—বিশিষ্ট রচনাভঙ্গি, অভিনব চরিত্র সৃষ্টি, অপূর্ব অভিজ্ঞতার উপলব্ধি—সবই আছে, কিন্তু পড়াশোনা কম বলে মনে হয়। কল্পনা করা যায়, এই প্রতিভার সঙ্গে বিস্তর পড়াশোনার যোগ থাকলে আরো কত বড় সাহিত্যই না আমরা পেতাম। ’

ওদিকে সোমেনের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পর্কে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যা বলেছিলেন, তা-ও সমান তাৎপর্যপূর্ণ,

‘নিজস্ব একটি জীবনদর্শন না থাকলে সাহিত্যিক হওয়া যায় না। সোমেন চন্দ ছিল কমিউনিস্ট। সাহিত্যিক হিসেবেও তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে কমিউনিজমের জয়ধ্বনি। ’ (সোমেন চন্দ রচনাবলী, সম্পাদনা বিশ্বজিৎ ঘোষ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯২)

তরুণ সোমেন চন্দ অভিজ্ঞতা ও জীবনদর্শন দুটিই সংগ্রহ করছিলেন। তরুণ এই লেখক জানতেন যে কমিউনিস্টরা বুর্জোয়াদের অবশ্যই পরাভূত করবে; নৈতিকতার ক্ষেত্রে তো বটেই, জ্ঞানের ক্ষেত্রেও। কমিউনিস্ট পার্টির তিনি সার্বক্ষণিক কর্মী হয়ে ছিলেন, ঠিক করেছিলেন নারায়ণগঞ্জে গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে থাকবেন। পার্টির সহযোদ্ধারা তাঁকে নিবৃত্ত করেছেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে তাঁর কাজটা আরো বেশি জরুরি। সোমেন সেখানেই রয়ে গেছেন।

 

৪.

শ্রেণিচেতনাকে তীক্ষ করা তো বটেই, আরো একটা জিনিসের দরকার ছিল। সেটি হলো শ্রমিক ও কৃষকের ঐক্য আনয়ন। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ, সেখানে কৃষককে না জাগালে বিপ্লব সম্ভব হওয়ার কথা নয়; সম্ভব হয়ওনি। কৃষককে জাগানোর পথ ছিল শ্রমিক শ্রেণির অগ্রবর্তী অংশের সঙ্গে কৃষকের সংযোগ ঘটানোর ভেতর দিয়ে। ‘ইঙ্গিত’ নামের গল্পটিতে সোমেন চন্দ সেই সত্যটিকেই তুলে ধরেছেন।

শহরের কাপড় কারখানায় শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছেন; তাঁদের পরাভূত করতে ব্যর্থ হয়ে মালিকপক্ষ লঞ্চ নিয়ে এক গ্রামে চলে গেছে। সেই গ্রামের মানুষ একসময়ে তাঁতের কাপড় বুনত, কিন্তু যুদ্ধের ও দুর্ভিক্ষের কারণে এখন তারা দুর্দশাগ্রস্ত। ভরসা কৃষি। অনেকেই বেকার।

অসহায়। তাদের এই অসহায়ত্বকে সুযোগে পরিণত করে কারখানার ম্যানেজার এসেছেন কাজের লোভ দেখিয়ে গ্রামবাসীকে লঞ্চে করে শহরে নিয়ে গিয়ে কারখানা চালু করবেন বলে। গ্রামের কিছু অসহায় মানুষ সেখানে গিয়ে দেখে ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন; শত শত মানুষ নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আছে; আর সব মানুষ যেন একটি মানুষে তার সঙ্গে পরিণত হয়েছে, যে বলছে যে তারা ধর্মঘটি শ্রমিক, তাদের তাড়ানোর জন্যই গ্রাম থেকে কৃষকদের নিয়ে আসা হয়েছে।

শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কৃষকদের উদ্দেশে এমন পরিষ্কার বক্তব্য বাংলা সাহিত্যে কমই শোনা গেছে। শ্রমিকে-কৃষকে সংগ্রামী ঐক্যটা ব্যাপক হারে গড়ে উঠলে এ দেশের ইতিহাস ভিন্ন পথে এগোত। হয়তো বিপ্লবই ঘটে যেত।

বাস্তুচ্যুত হয়ে গ্রাম থেকে কৃষকের শহরের কারখানার দিকে রওনা হওয়ার অবিস্মরণীয় কাহিনি আছে শরত্চন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পে। সেই গল্প ১৯২৬ সালে লেখা। গল্পের নায়ক গফুরও ‘ইঙ্গিত’ গল্পের প্রধান চরিত্র রহমতের মতোই একসময় তাঁতিই ছিল। তাঁত হারিয়েছে ইংরেজের কারণে। জমি ও আবাস হারাল জমিদারের অত্যাচারে। মাতৃহীন কন্যাটিকে নিয়ে অজানা ও অনিরাপদ কারখানা অভিমুখে গফুরের অতি অনিবার্য যাত্রা। শরত্চন্দ্রের ওই গফুরের ১২ বছর পরে সদ্য বিবাহিত রহমতও এসেছে কারখানায়, তবে নেহাত অনিচ্ছুক অবস্থায় নয়, বুকে আশা নিয়ে। আশাটা উপার্জনের। এসে মুখোমুখি হয়েছে শ্রমিক ধর্মঘটের, যেটি গফুরের সময়ে সত্য হয়ে দেখা দেয়নি, কিন্তু যেটা গফুরের গল্পে মোটেই নেই সেটা হলো শ্রমিকদের ঐক্য, তাদের ভেতর শ্রেণিচেতনার বিকাশ এবং তাদের দিক থেকে কৃষকদের নিজেদের কাছে টানার চেষ্টা। ধারণা করার খুব সংগত কারণই রয়েছে যে গল্পের ওই শ্রমিকদের ধর্মঘটের পেছনে ট্রেড ইউনিয়ন ছিল এবং সে ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্টদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। শ্রমিকদের যে ঐক্য, লড়ার এই যে মনোভাব, সর্বোপরি কৃষকদের প্রতি শ্রেণিগত স্বার্থসচেতন হওয়ার ওই যে আহবান  সোমেন চন্দ তাঁর গল্পে নিয়ে এসেছেন, অন্য কোনো লেখক তাঁর কালে সেটা করেননি। শরত্চন্দ্রদের পক্ষে তো করার কথাই নয়। শরত্চন্দ্রের বিপ্লবী সব্যসাচী অনেক দুঃসাহসিক কাজই অতি সহজে করেছেন বলে জানা যায়, কিন্তু তিনি যে কৃষকের পক্ষের লোক নন, এটা অন্যরা যে বলে দেবে, সে জন্য তিনি অপেক্ষা করেননি, তিনি নিজেই জানিয়ে দিয়েছেন। সশব্দে।

রাজনীতিতে পরিবর্তন আসছিল। মেহনতিদের রাজনৈতিক আন্দোলন যে সুবিধা করে উঠতে পারেনি, এটা ঠিক, কিন্তু জাতীয়তাবাদীদের কেউ কেউ যে নিজেদের আন্দোলনের সংকীর্ণতার বিষয়ে সজাগ হয়ে উঠছিলেন তার খবর সোমেন রাখতেন এবং সেটা তিনি তাঁর লেখায়ও নিয়ে এসেছেন বৈকি। যেমন ‘প্রত্যাবর্তন’ গল্পে। ২৫ বছর পরে গ্রামের ছেলে প্রশান্ত নিজ গ্রামে। স্বদেশি করত, জেল খেটেছে, আন্দামানে গিয়েছিল কি না জানা যায় না, যেতেও পারে। যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। ২৫ বছর পরে গ্রামের অন্ধকার পথে বাল্যবন্ধু কৃষক কালু মিঞার সঙ্গে তার দেখা। কালু মিঞা তাকে তার ঘরে নিয়ে গেছে। তারপর একসময়ে জিজ্ঞাসা করেছে, ‘তুমি আজকালও স্বদেশি করো?’ শুনে প্রশান্ত মনে মনে হাসে। সে বলে, ‘সেদিন বড় ভুল করিয়াছিলাম বন্ধু, একলা পথ চলিয়াছিলাম। তোমাদের কথা ভাবি নাই, আজ আর সেই ভুল হইবে না। ’

বড় গল্প ‘বনস্পতি’। গল্পের প্রকাণ্ড বটগাছটি ২০০ বছরের সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনার ও পরিবর্তনের সাক্ষী। গ্রামের নাম পীরপুর। স্বদেশি আন্দোলনের সময় সে গ্রামের রাজেন মিত্রর ছেলে সতীন মিত্র ‘কলিকাতা শহরে কোন এক সাহেবকে মারিতে গিয়া নাকি ধরা পড়িয়াছে। ’ ৯ বছর পরে সেই সতীন মিত্রকে দেখা গেল জেল থেকে ছাড়া পেয়ে গ্রামে এসে কৃষকদের সঙ্গে মিলছে। তাদের নিয়ে জটলা করছে। তারপর ওই বটতলায়ই একদিন কৃষকদের এক সমাবেশে সতীনের বক্তব্য শোনা গেল। হায়দর নামের এক কৃষকের ছেলে, নাম বসির, সতীনের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সতীন বলেছে,

‘ভাই সব, সমাজের যারা পরগাছা—যারা আমাদের গায়ের রক্ত শুষে শুধু বসে খায়, তাদের উপড়ে ফেলার দিন এসেছে আজ। ভাই সব, আমাদের জিনিস দিয়েই ওরা মোটর হাঁকায়, ব্যাংকে লাখ লাখ টাকা জমা রাখে; কিন্তু আমরা না খেয়ে মরি। এ অত্যাচার কেন আমরা সহ্য করব? কেন সহ্য করব?’

বোঝা গেল সতীন মিত্র আর জাতীয়তাবাদী নেই, সমাজতন্ত্রের পথ ধরেছে। হয়তো বা কমিউনিস্টই হয়ে গেছে, কিন্তু তার সেদিনের বক্তব্য বেশিদূর এগোতে পারেনি। লাঠি হাতে মস্ত জোয়ান একদল লোক বটতলার বাঁধানো জায়গাটিতে উঠে অনবরত লাঠি চালাতে শুরু করে দিয়েছে। সতীন মিত্র চিৎকার করে শুধু এটুকু বলতে পেরেছে : ‘ভাই সব, এদের চিনে রাখুন, এরা সেই জমিদারদেরই ভাড়াটে গুণ্ডা, লাঠি চালিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করতে এসেছে। ’ এর বেশি আর বলা হয়নি। লাঠির ঘা খেয়ে নিচে পড়ে গেছে। রক্তে তার শরীর এবং মাটি লাল হয়ে গেল। শ্রোতাদের আরো কেউ কেউ মাটিতে পড়ে রইল। অন্যরা পালিয়েছে। এটি ১৯৩৯ সালের ঘটনা। সোমেন তাঁর এ গল্পটি হয়তো ১৯৪০-এ লিখেছেন। তিনি জানতেন না, কেউ জানত না যে দেড়-দুই বছরের মধ্যে গল্পের সতীন মিত্রর মতোই তিনি নিজেও মারা যাবেন, একইভাবে সামাজিক বিপ্লববিরোধী মানুষদের হাতে।

কোনো অবস্থায়ই হতাশ হতে প্রস্তুত ছিলেন না সোমেন চন্দ। তাঁর ‘পথের শেষ’ গল্পটি গলির ভেতরে বন্দি মানুষদের জীবন নিয়ে, কিন্তু সেখানেও আকাশ আছে। গল্পের শেষে হাবু তার বড়দিকে জিজ্ঞাসা করে, ‘বড়দি, ওই দেয়ালের পরে আর কিছু আছে?’

‘বড়দি কোনো উত্তর দিল না। হাবু সেদিকে একদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল। প্রকাণ্ড পুরানো দেয়ালটার পিছনে বাড়িঘর কিছুই দেখা যায় না। কেবল দেখা যায় আকাশ, শীতের কোমল নীল আকাশ। ’

 

৫.

সোমেন চন্দ বিপ্লবী ছিলেন, ছিলেন লেখকও। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে বন্ধু অমৃতকুমার দত্তকে তিনি লিখেছেন, ‘গত কয়েক দিন রেল শ্রমিকদের নিয়ে বেশ ঝামেলায় ছিলাম। লেখার জন্য একটুও সময় পাই না। তবু লিখতে হবে, মেহনতি মানুষের জন্য, সর্বহারা মানুষের জন্য আমাদের লিখতে হবে। ’

সোমেন চন্দ গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রধান কারণ তিনি লেখক ছিলেন এবং তিনি বিপ্লবীও ছিলেন এবং তাঁর লেখক সত্তা ও বিপ্লবী সত্তা ছিল অভিন্ন। লেখক হিসেবে তিনি অত্যন্ত উঁচুমাপের ছিলেন, যে উচ্চতা তিনি অর্জন করতে পারতেন না যদি একই সঙ্গে বিপ্লবীও না হতেন। বিপ্লবী বলেই সমাজের দ্বন্দ্বগুলোকে পরিষ্কারভাবে দেখতে পেয়েছেন। সুস্পষ্ট পক্ষপাত ছিল দুর্বলের প্রতি। কিন্তু সে পক্ষপাত একজন শিল্পীর। অর্থাৎ তাতে শিল্পীর দূরত্ব থেকেছে। থেকেছে বিস্ময়কর সংযম। কোথাও ভাবাবেগ নেই, উচ্ছ্বাস ঘটেনি কোনো প্রকারের। অতিশয়োক্তি করেননি। সে জন্য তাঁর ভাষা খুবই ঝরঝরে, সর্বক্ষণ প্রবহমান। তাঁর ছোট গল্পগুলোতে এবং উপন্যাসটিতেই দেখা যায় অল্প কথায় গুছিয়ে গল্প বলার অসামান্য ক্ষমতা। তাঁর কাহিনি উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। উৎকণ্ঠা সৃষ্টিতে তাঁর ভাষা সহায়ক হয়। বাস্তবতাকে ফুটিয়ে তোলার জন্য বিশদকে তিনি ভোলেন না। প্রয়োজনে খুঁটিনাটির বর্ণনা দেন, সে বর্ণনা কাহিনিকে বাস্তবিক করে তোলে, কিন্তু কখনোই কাহিনিকে ভারাক্রান্ত করে না।

আমরা যদি বলি তিনি ছিলেন অসাধারণ রকমের প্রতিশ্রুতিশীল, তাহলে তাতে বিপদ থাকবে পৃষ্ঠপোষকতার, কিন্তু ঘটনাটা সত্য। দীর্ঘ জীবন লাভ করলে তিনি যে পরিমাণে ও গুণে আরো বেশি সৃষ্টি রেখে যেতে পারতেন তাতে সন্দেহ করাটা মূঢ়তা হবে, কিন্তু যা রেখে গেছেন তা পরিমাণে কম হলেও গুণে অসামান্য। সুকান্ত ভট্টাচার্য সম্পর্কে যা সত্য সেটি সত্য সোমেন চন্দ সম্পর্কেও। উল্লেখ্য যে সোমেন চন্দর সব লেখা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পাওয়া গেছে ২৯টি গল্প ও একটি অসম্পূর্ণ উপন্যাস। উপন্যাসটির বড় অংশই হারিয়ে গেছে। আর আছে দুটি একাঙ্কিকা ও তিনটি কবিতা।

সোমেন চন্দ মাত্র দুটি একাঙ্কিকা লেখার সময় পেয়েছিলেন। তবে ওই দুই একাঙ্কিকায় যে রকমের প্রাণবন্ততা আছে, সেটি তাঁর সব রচনার ভেতরই বিদ্যমান। প্রাণবন্ততাটা এসেছে কাহিনিতে চরিত্রের সঙ্গে ঘটনার এবং চরিত্রের সঙ্গে চরিত্রের দ্বন্দ্বে। দ্বন্দ্বের প্রকাশ বিশেষভাবেই প্রকাশ পেয়েছে সংলাপে। সংলাপের ব্যাপারে সোমেন ছিলেন খুবই সতর্ক। তাঁর চরিত্রগুলো প্রত্যেকেই নিজের নিজের ভাষায় কথা বলে এবং বলার মধ্য দিয়ে কাহিনিকে অত্যন্ত সজীব করে রাখে।

আর আছে উপমা। তাঁর যে তিনটি কবিতা আমরা পেয়েছি সেগুলোকে উল্লেখযোগ্য বলা যাবে না, তবে কবিতার যা সাধারণ গুণ, ছন্দস্পন্দ ও উপমা, সে দুটি গুণ তাঁর গদ্য রচনায় সুন্দরভাবে উপস্থিত। তাঁর ভাষার কথা আগেই উল্লেখ করেছি, আমাদের এই আলোচনাটিতে আমরা যেসব রচনাংশ উদ্ধৃত করেছি সেখানেও ভাষার বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে উপমার সুন্দর ব্যবহার চোখে পড়বে। আরো কয়েকটি উল্লেখ করা যাক। ‘বনস্পতি’ গল্পে সিপাহি অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী এক সিপাহি এসেছে পীরপুর গ্রামে, আশ্রয় নিয়েছে বিখ্যাত সেই বটবৃক্ষে। তার সঙ্গে তুলনা দেওয়া হয়েছে সিংহের। ‘সে যেন কোনো পলায়নপর সিংহ, পালাইতেছে বটে, কিন্তু তবুও তাহার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করে। ’ অন্য সব গল্পের নানা স্থানে আমরা পড়ি : ‘সেই মরুভূমিতে কাহার হাতের স্পর্শ, ঐ জ্যোত্স্নার মতো নরম, হাত বুলাইয়া যাইতেছে। ’ ‘লম্বা একটা লোক হঠাৎ কোথায় সাপের মতো সরে পড়ল। ’ ‘বুড়ো হওয়ার আগেই গরুর মতো শান্ত বৌটাকে লাথি গুঁতো মেরে যমের বাড়ি পাঠিয়েছে। ’ ‘এখন সমস্ত বাড়িটাই বিদেশে প্রথম আসা বালকের মতো স্তব্ধ। ’ ‘বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে একঝাঁক সৈন্য চমৎকার একেকটি বলির পাঁঠা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ’ ‘বাড়ির সামনে...শেফালিগাছটি ছোলা মুরগির মতো আজও বেঁচে আছে। ’ ‘অনুভব করিল এখনো যেন সে কারো ফুলের মতো বুকে মুখ রাখিয়া গভীর নিঃশ্বাস ফেলিয়াছে। ’ ‘বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখিল সেখানে, অন্ধকারের সারি তখনো ঠেলাঠেলি করিয়া মরিতেছে। ’ ‘একেবারে সামনে একটা লোকের মধ্যে পেছনের সকল শক্তি যেন একত্রিত হইয়াছে। ’ ‘রক্তবর্ণ আকাশ যেন রণক্ষেত্রে তাহার প্রতি চাহিয়া বিস্তর অশুভ কামনা করিতেছে। ’ ‘ওই কলরবের মতো আগুনের যদি কোনো শাখা থাকিত তবে সারা পৃথিবী পুড়াইয়া ফেলিত। ’ ‘গলার স্বরও আজ ভয়ে পালাইয়াছে। ’ ‘মৃত্যুকে লইয়া জীবনের কাড়াকাড়ি। ’ ‘পৃথিবীর কাতর প্রার্থনা যেন ঝড়ের পায়ে দারুণ লুটোপুটি খাইতেছে। ’ ‘বটগাছের শত ডালের ভেতর রক্তের জোয়ার আসে। ’ ‘একদা যে বাতাস মাটির মানুষের প্রতি উপহাস করে বিপুল অট্টহাসি হেসেছে সেই বাতাসের হাত আজ করতালি দেয় গাছের পাতায়। ’

উপমার পাশাপাশি রূপকও পাওয়া যাবে। ‘ইঁদুর’ গল্পের গোটাটায়ই যে রূপক সে কথা উল্লেখ করেছি।

সোমেন চন্দর একাঙ্কিকা দুটিতে চমৎকার নাটকীয়তা রয়েছে। গল্পে যে নাটকীয়তা পাওয়া যায় এখানে তা আরো বড় হয়ে উপস্থিত। সংলাপও চমৎকার। ‘বিপ্লব’ নামের নাটিকাটিতে কিশোর মন্টু নাটকীয়ভাবেই ঘোষণা করে যে সে হচ্ছে মাও সে তুং, ‘চেয়ারম্যান অব দ্য সোভিয়েট ডিস্ট্রিক্ট অব চায়না’। শুনে তার অভিভাবক, জ্যাঠামশাই ধমকে ওঠেন, ‘কী বলছিস বলরাম। সোভিয়েত ডিস্ট্রিক্ট? নিরীশ্বর সাম্যবাদ? ভদ্রবেশী গুণ্ডামি। ’ উল্লেখ্য যে নাটিকাটি ১৯৪০-এ লেখা। চীনে তখন বিপ্লবী আন্দোলন চলছে, কিন্তু বিপ্লব ঘটেনি। নাটিকাটিতে সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তখন যখন ২৫-২৬ বছরের এক যুবক প্রবেশ করে এবং আবিষ্কার করে যে জ্যাঠামশাইয়ের কন্যাটি তার বাল্যকালের বন্ধু। এর পরের ঘটনা আরো চমকপ্রদ। মন্টু চিনতে পারে যে যুবকটি আর কেউ নয়, তার প্রিয় ‘কমরেড ঘোষ’ বটে। কমরেড ঘোষ ওরফে অনল তার বাল্যবান্ধবী কমলকে বলে, ‘কমল, এবার আগুন জ্বালো, জ্বেলে দাও আগুন পুরনো বীজের গায়ে, পুরনো বীজ ধ্বংস হোক, আগুন জ্বালো অনেকের বিলাস আর খেয়ালে কোটি কোটি মানুষের বঞ্চনায় সঞ্চিত পাপে। ’ পরিণতিতে দেখা গেল অনল যেন হাওয়ায় ভর দিয়ে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে আর কমল তার গলা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেছে।

‘প্রস্তাবনা’ নাটিকাটিতে নন্দিতা সোম এসেছে পরিক্রমা নামের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের অফিসে। নন্দিতার একটি প্রবন্ধ ওই সাপ্তাহিকে ছাপা হয়েছে এবং সেটা বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। প্রবন্ধটি ধর্ম বিষয়ে; তাতে ধর্মপ্রচারকদের আসল উদ্দেশ্য উন্মোচন করে দেওয়া হয়েছে।

 

৬.

সোমেন চন্দর সময়ে সমাজবদলের জন্য যাঁরা লড়ছিলেন তাঁরা সবাই ছিলেন সমাজতন্ত্রী; তবে তাঁদের অনেকের ভেতরই প্রচ্ছন্ন হলেও একটি বোধ ছিল, সেটা পরাজিতের। সোমেন চন্দ কিন্তু পরাজিত হতে রাজি ছিলেন না। সে জন্য রাজনৈতিক আন্দোলনের সম্মুখ সারিতেই ছিল তাঁর অবস্থান এবং ওই অবস্থানের কারণেই ঘটেছে তাঁর প্রাণদান।

সোমেন চন্দ যখন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে কর্মরত, তখন এই ঢাকা শহরেই একইভাবে কাজ করছিলেন লীলা নাগ ও অনিল রায়। তাঁরা দুজনেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ইংরেজি বিভাগের। সহপাঠী ছিলেন তাঁরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার যাত্রা শুরু করে দুজন মাত্র ছাত্রী নিয়ে, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন লীলা নাগ। লীলা ও অনিল একসঙ্গে কাজ করতেন; বিয়েও করেছিলেন একে অন্যকে। তাঁদের কাজটা ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক। যতটা না সামাজিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। ইংরেজ সরকার ১৯৩১ সালে লীলা নাগকে গ্রেপ্তার করে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রীটি ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনের যেভাবে বিরোধিতা করে যাচ্ছিলেন সরকারের পক্ষে সেটা সহ্য করা সম্ভব হয়নি, বিনা বিচারে তারা তাঁকে আটকে রাখে একটানা সাত বছর। লীলা নাগই সম্ভবত ভারতবর্ষের প্রথম নারী, যিনি বিনা বিচারে ও রাজনৈতিক কারণে এত দিন কারাভোগ করেছেন। জেল থেকে বেরিয়ে এসে লীলা নাগ ফের রাজনীতিতেই যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর কাজের মধ্যে একটি ছিল জয়শ্রী নামে মেয়েদের একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনা। সেই পত্রিকা থেকে থেকে সরকারি রোষানলে পতিত হয়েছে, কিন্তু লীলা নাগ ও সোমেন চন্দ তো একসঙ্গে কাজ করতে পারেননি। ঢাকা শহরের ওয়ারী এলাকায় লীলা নাগ যখন নারীশিক্ষা মন্দির নামে বিদ্যালয় স্থাপন করেন (পরে সেটি শেরে বাংলা মহিলা কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে) তখন খুব কাছেই, নারিন্দায়, সোমেন চন্দরা গড়ে তুলছিলেন প্রগতি পাঠাগার নামে কমিউনিস্টদের সংস্কৃতিচর্চার একটি গোপন কেন্দ্র। কমিউনিস্ট পার্টি তখন নিষিদ্ধ ছিল। লীলা নাগ সুভাষপন্থী ছিলেন, ফরোয়ার্ড ব্লকের নেতৃস্থানীয় ভূমিকা তিনি পালন করেছেন; আর ওই ফরোয়ার্ড ব্লকের কর্মীরাই তো হত্যা করল সোমেন চন্দকে। ইতিহাস হাসছে; হাসাটাই স্বাভাবিক।

সোমেন চন্দর ঘনিষ্ঠ লেখক-বন্ধু কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক নেত্রী লীলা নাগ একই পাড়ায় থাকতেন। লীলা নাগকে তিনি দিদি বলতেন। ওই মহল্লায় রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্য কর্মীরাও বাস করতেন। অনুশীলন সমিতির দাদারাও ছিলেন। কিশোরদের ওপর তাঁরা চোখ রাখতেন, তাদের তাঁরা নিজেদের কাতারে আনতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করতেন না। স্বদেশি বিপ্লবী বাদল-বিনয়-দীনেশের বিনয় ও দীনেশ তো ঢাকারই ছেলে। লীলা নাগরা ‘অনুশীলন’-এর সঙ্গে ছিলেন না, কিন্তু অবশ্যই জাতীয়তাবাদী ছিলেন। তাঁদের জয়শ্রী পত্রিকার রুচিটা ছিল ব্রাহ্মসমাজের। সোমেন জাতীয়তাবাদী ধারায় যুক্ত হননি। তিনি যেতে চেয়েছেন জনগণের কাছে। সোমেন চন্দদের সময়ে ঢাকা শহর থেকে দুটি মাত্র পত্রিকা নিয়মিত বের হতো। একটি মাসিক, অন্যটি সাপ্তাহিক। শান্তি ও সোনার বাংলা। যুদ্ধের সময়ে পত্রিকা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল, সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং কাগজ দুষ্প্রাপ্য হওয়ায়। সাপ্তাহিক সোনার বাংলা ছিল জনপ্রিয়, কিন্তু সেটি ছিল ঘোষিত রূপেই জাতীয়তাবাদী। সোমেন জাতীয়তাবাদী ওই সাপ্তাহিকটিতে লেখা পাঠাতেন না, সম্পাদক বিব্রত হবেন ভেবে। ঢাকা শহরে তাঁর জন্য লেখার জায়গা ছিল উদারনৈতিক মাসিক শান্তি পত্রিকাটিই। সেই স্বল্প পরিসরে সোমেনরা একত্র হয়ে ক্রান্তি নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেছিলেন।

কমিউনিস্ট হলে ঝুঁকি ছিল রাষ্ট্রীয় নির্যাতনেরও। জাতীয়তাবাদীরা তবু সরকারি চাকরি পেতেন, কমিউনিস্টদের জন্য ওই পথ ছিল একেবারেই রুদ্ধ। কিরণশঙ্কর এমএ পাস করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, ইংরেজি সাহিত্যে। কিন্তু তাঁর পক্ষে কোনো সরকারি চাকরি পাওয়া সম্ভব হয়নি; কারণ তাঁর পুলিশ রিপোর্ট ছিল খারাপ। কিরণশঙ্কর ও সোমেন চন্দ—উভয়েই ঢাকা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন। সোমেন চন্দর বিশেষ আগ্রহ ছিল কিশোরদের অনুষ্ঠানে, কিন্তু বেতার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ দুজনের কারোই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি, অল্প পরেই দুজনই তাঁরা নিষিদ্ধ হয়ে গেছেন। কারণ ওই একই—বিরূপ পুলিশ রিপোর্ট।

চল্লিশের দশকে ঢাকায় এক ধরনের সাংস্কৃতিক জাগরণই সৃষ্টি হয়েছিল। বিপ্লবী গান লেখা হচ্ছিল লোকসংগীতের সুরে, এমনকি ছাদ পেটানোর সুরেও। প্রতিরোধ পাবলিশার্স নাম দিয়ে বামপন্থী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এদের দোকানে দেশি-বিদেশি প্রগতিশীল বই ও পত্রিকা বিপণনের ব্যবস্থা ছিল। প্রতিরোধ পাবলিশার্সের তরফ থেকে প্রকাশিত হয় অনিল মুখার্জির সাম্যবাদের ভূমিকা ও সরলানন্দ সেনের মাও সে তুং এবং সোমেনের মৃত্যুর পরে তাঁর সংকেত ও অন্যান্য গল্প।

 

৭.

সোমেন চন্দদের বাড়ি ছিল নরসিংদী এলাকায়; ১৯৬৯-এ ওখান থেকেই বেরিয়ে এসেছিলেন তরুণ আসাদ; সোমেন চন্দদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী এবং সোমেন চন্দর মতোই তিনিও শহীদ হয়েছেন, যদিও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে নয়, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের হাতে। ওই ফ্যাসিবাদীরাও কিন্তু জাতীয়তাবাদীই ছিল। পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী। তার চেয়েও বড় সত্যটা তো এই যে পৃথিবীজুড়েই সমাজ পরিবর্তনকামী মানুষ এখন পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে এবং পরিষ্কার হয়ে গেছে এই সত্য যে ওই লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই। সোমেন চন্দ যা বুঝেছিলেন অনেক আগেই।



সাতদিনের সেরা