kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

প্র ব ন্ধ

মনের সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে হবে

আহমদ রফিক

২৭ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



মনের সাম্প্রদায়িকতা দূর করতে হবে

অঙ্কন : নাজমুল আলম মাসুম

সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট চিন্তা সমাজে এমন দূষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেকোনো উপলক্ষে বা বিনা উপলক্ষে গুজব বা রটনায় ভর করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবিশ্বাস্য রূপ ধারণ করে। সাম্প্রদায়িকতা নিরসনে তাই দরকার দ্রুত তদন্ত, দ্রুত সুবিচার, কঠোর শাস্তি। তা না হলে বিষবৃক্ষ ধ্বংস হবে না, বারবার নানা রূপে তার বিষক্রিয়া দেখা দেবে। বর্তমান সর্বোচ্চ প্রশাসনকে তাই বিষয়টা নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

একুশে থেকে একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে হলে সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন ও সমাজের প্রতিটি শক্তিকে সম্প্রীতি বাস্তবায়নে গণতান্ত্রিক ও মানবিক ভূমিকা রাখতে হবে।

সেক্যুলার সংবিধানের বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে ও প্রতিকারে কতটা সদর্থক ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে ১৯৬৪-র ‘রুখে দাঁড়ানো’র প্রেক্ষাপট বিচারে? আমরা তো তখন উপদ্রুত এলাকায় ছুটে গিয়েছি। যদিও রায়েরবাজারের কুমারপাড়ার যুবক মাস্টারমশাইকে তাঁর দলবলসহ দেশত্যাগে নিরস্ত করতে পারিনি। কারণ তাঁর ভয়ংকর প্রশ্নের ‘আপনি আমাদের জানমাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা দিতে পারবেন?’ জবাবে নিরুত্তর থাকতে হয়েছে। আমি মনে করি, একালে ছাত্র-শিক্ষক, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সচেতন শিক্ষিত শ্রেণির সমন্বিত চেষ্টায় পূর্বোক্ত নিরাপত্তার কাজটি এখন নিশ্চিত করা সম্ভব। দরকার শপথ নিয়ে মাঠে নামা।

কি জাতীয়তাবাদী, কি বামপন্থী রাজনৈতিক দল বা সাংস্কৃতিক সংগঠন—কেউই একুশ ও একাত্তরের অসাম্প্রদায়িকতা বা আদর্শ ভূলুণ্ঠিত হতে দিতে পারে না বলে আমার বিশ্বাস।

সম্প্রতি বাগেরহাটে ফেসবুকে ‘ধর্ম অবমাননার’ অভিযোগ তুলে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে পূজার সময় জগন্নাথমন্দিরে ঢিল ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হিন্দুদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা একেবারেই নতুন নয়।

বিগত শারদীয় দুর্গাপূজার সময় দেশে বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট চিন্তা সমাজে এমন দূষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেকোনো উপলক্ষে বা বিনা উপলক্ষে গুজব বা রটনায় ভর করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবিশ্বাস্য রূপ ধারণ করে। সম্প্রতি আমরা একটি নতুন মাত্রা যোগ হতে দেখলাম। মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার দাউল বারবাকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আমোদিনী পালের বিরুদ্ধে হিজাব নিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই অপচেষ্টাকারীরা ব্যর্থ হয়েছে।

উপমহাদেশের এবং পরবর্তী ত্রিধাবিভক্ত ভূখণ্ডেরও বিশেষ সামাজিক বৈশিষ্ট্য তথা সমস্যা যে সাম্প্রদায়িকতা, তা নিরসনের সামাজিক গুরুত্ব কেউ অনুধাবন করেনি। করেনি সেই বিভাগপূর্ব কাল থেকে। তাই সমাজটা ইংরেজ আমল শেষেও, এমনকি একাত্তরের যুদ্ধ-পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশেও খুব একটা বদলায়নি সম্প্রদায় চেতনার দিক থেকে।

ব্রিটিশ শাসনামলে সাম্প্রদায়িকতার নেপথ্যে বড় শক্তি ছিল ব্রিটিশ শাসকদের ‘ভাগ কর/শাসন কর’ (ডিভাইড অ্যান্ড রুল) নীতি। বিশেষ করে ১৮৫৭-র সিপাহি-রাজন্য যুদ্ধে (ইতিহাসের ভাষায় প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ) হিন্দু-মুসলমানের সমন্বিত লড়াই শাসকদের চোখ খুলে দিয়েছিল এবং উল্লিখিত দুই সম্প্রদায়কে বিচ্ছিন্ন রাখার নানামুখী চেষ্টা চালিয়েছে ইংরেজ শাসক—যেমন বিদ্রোহ দমনের পর থেকে, তেমন বিশ শতকে মর্লি-মিন্টো, মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কারে এবং ১৯৩৫-এ সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদ (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড-এ), সর্বোপরি স্বতন্ত্র নির্বাচনে।

আমার বরাবরের প্রশ্ন ছিল, বোম্বাই-মাদ্রাজ-লাহোর-এলাহাবাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহানগর থাকতে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য কলকাতাকে বেছে নেওয়া হয়েছিল কেন? কারণ অবশ্য একটাই। বঙ্গদেশে তখন মুসলিম লীগের শাসন এবং জিন্নাহর প্রিয় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী। বঙ্গীয় লীগের সাধারণ সম্পাদক সেক্যুলার হাশিম সাহেব যা-ই বলুন না কেন, তাঁদের সভায় গজনফর-নাজিমউদ্দিনের বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই শহরে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে।

কারণ ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। উভয় পক্ষের প্রস্তুতির খবরও কারো অজানা ছিল না। তা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রী মহাহত্যাকাণ্ড রোধে যথাযথ ব্যবস্থা নেননি, সেনা সাহায্য নেওয়ার চেষ্টা করেননি; বরং সেদিন ছুটি ঘোষণা করে দুর্বৃত্তদের সুবিধাই করে দিলেন। এমন সব কারণে কলকাতার হিন্দু সমাজ তাঁকে চরম অভিযোগে দায়ী করে। আমাদের হিসাবেও তিনি এই রক্তস্রোতের দায় থেকে মুক্ত নন। পরবর্তী সময়ে সম্ভবত আত্মগ্লানিতে তিনি সম্প্রীতি প্রচারে গান্ধীর সহযোগী হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু সমাজ ছিল প্রচণ্ড সোহরাওয়ার্দীবিরোধী।

জিন্নাহর উদ্দেশ্য পূর্ণ হয়েছিল। কলকাতা দাঙ্গার প্রতিক্রিয়া যেভাবে নোয়াখালী-বিহার হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, তাতে হিন্দু-মুসলমানে ঘৃণা-বিদ্বেষ স্থায়ী রূপ নেয়। শাসকশ্রেণি মুচকি হাসে। দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে। একমাত্র কমিউনিস্ট পার্টি ও কংগ্রেসের ছোট্ট অংশ দাঙ্গাবিরোধী ভূমিকা নিয়ে শহীদের খাতায় নাম লেখায়। চল্লিশের প্রগতি সাহিত্য-সংস্কৃতির দাঙ্গাবিরোধী ভূমিকা অবিস্মরণীয় হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে।

এ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চেষ্টা (বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকালে তাঁর স্বদেশি সমাজ পরিকল্পনা পর্বে ও পরে) ব্যর্থ হলেও এ সম্পর্কে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ভুল হয়নি। দায়টা কংগ্রেসি রাজনীতি ও তার নেতাদের। অবশ্য মূল বিষয়ে দায় মুসলিম লীগেরও।

সাম্প্রদায়িকতাদুষ্ট চিন্তা সমাজে এমন দূষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেকোনো উপলক্ষে বা বিনা উপলক্ষে গুজব বা রটনায় ভর করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা অবিশ্বাস্য রূপ ধারণ করে। তাই জিন্নাহ ও লীগ নেতাদের ইচ্ছাপূরণ অর্থাৎ ভারত ভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বন্ধ হয়নি নবগঠিত পাকিস্তান ও ভারতে।

কবি বিষ্ণু দে ‘সন্দ্বীপের চর’ কাব্যগ্রন্থে ও অন্যত্র দাঙ্গাবিরোধী একাধিক প্রতিবাদী কবিতা লিখেছেন। গুজব সম্পর্কে লেখেন, ‘উন্মাদ বেলিয়াল ছোটে রটনা ঘটনা করিবারে। ’ পাকিস্তানেও একাধিক দাঙ্গায় রটনার (গুজব) ঘটনা করার উদাহরণ রয়েছে। ‘সন্দ্বীপের চর’ কবিতাটি বিষ্ণু দে উৎসর্গ করেন সন্দ্বীপে দাঙ্গা রুখতে গিয়ে শহীদ লালমোহন সেনের উদ্দেশে। একইভাবে কলকাতায় কয়েকজন কংগ্রেসকর্মী শহীদ হন দাঙ্গা প্রতিরোধের চেষ্টায়। আমরা কজন তাঁদের নাম জানি, তাঁদের স্মরণ করি!

পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যেমন ছিল হিন্দুদের ওপর হামলায়, তেমনি বিহারি বনাম বাঙালি সংঘর্ষে, বিশেষ করে কলকারখানায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল অবাঙালি সরকারি উসকানি, তেমনি শেষোক্ত ক্ষেত্রে ছিল অবাঙালি মিল মালিকদের প্রত্যক্ষ মদদ—এর কিছু প্রমাণ আমার তথ্যঝুলিতে রয়েছে। ধোয়া তুলসীপাতা নয় ভারত। সেখানেও একইভাবে চলেছে নিরীহ মানুষের রক্তের হোলিখেলা।

সেই দাঙ্গা শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয় জনগণের প্রতি ছাত্র-যুবা-সাংবাদিক, শিক্ষিত শ্রেণির সংঘবদ্ধ আহ্বানে : ‘পূর্ব পাকিস্তান রুখিয়া দাঁড়াও’। প্রায় সব পত্রিকায় প্রথম পাতায় মোটা হরফে হেডলাইন। ফলে উল্লিখিত সব শ্রেণির মানুষের বিশাল প্রতিবাদী মিছিল এবং উপদ্রুত অঞ্চলে যাত্রা। আমরা কয়েকজন রায়েরবাজারে গিয়েছিলাম। বিহারিরা ছিল ১৯৫০-এর মতো এই দাঙ্গারও মূল কারিগর। প্রতিকারের চেষ্টা হলেও প্রতিরোধ অর্থাৎ প্রিভেন্টিভ ব্যবস্থা বলতে কিছু ছিল না—কি রাজনৈতিক দল, কি সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে।

ছাত্র ও বয়স্ক রাজনীতি তখন জাতীয়তাবাদী ও সমাজবাদী—এ দুই ধারায় প্রবল বেগে এগিয়ে যাচ্ছিল; দ্বিতীয়টি অবশ্য নানা ধারায় বিভক্ত হয়ে। আসাদ হত্যা এ দুই ভিন্ন ধারাকে অনেকটা কাছাকাছি এনেছিল; কিন্তু ভিন্নমত থেকেই যায়। এটা আমার বিবেচনায় একাত্তরেরও ঘাটতি, পূর্ণ সর্বজনীন রূপ বিচারে। দায় উভয় পক্ষেরই।

এমনকি পরেও উপেক্ষা করেন কবির গ্রাম-নগরের বৈষম্যহীন স্বদেশি সমাজের পরিকল্পনা। ক্ষুব্ধ রবীন্দ্রনাথ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণে ব্যাপকভাবে স্বদেশিদের দ্বারা সমালোচিত হন। রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় তাঁর গ্রামোন্নয়নের কর্মাদর্শে অবিচল থাকেন। তাঁর কর্মযজ্ঞ স্থানান্তর করেন শিলাইদহ থেকে মুসলমানপ্রধান কালীগ্রাম পরগনায়, সদর কাছারি পতিসরে দরিদ্র কৃষকদের ঋণ দিতে স্থাপন করেন ‘কালীগ্রাম কৃষি ব্যাংক’ (১৯০৫)। এই কাজের জন্য নোবেল পুরস্কারটাও তাঁরই পাওনা ছিল। কারণ পতিসর হয়ে গরিব সাঁওতাল গ্রামসংলগ্ন এলাকায় শান্তিনিকেতনের অদূরে স্থাপন করেন উন্নয়নকেন্দ্রিক শ্রীনিকেতন, যা বিদেশিদের নজর কাড়ে। এসব ঘটনায় বিষয়টি স্পষ্ট যে কি বিভাগ-পূর্বকালে, কি বিভাগোত্তরকালে উপমহাদেশীয় রাজনীতি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে কখনো গুরুত্ব দেয়নি, সমাজে এ অন্ধকার দিকটা রয়ে গেছে এবং তা উভয় সম্প্রদায়ে, দুর্ভাগ্যজনক যে শিক্ষিত ও অগ্রসর হিন্দু সমাজেও। মানসিক সাম্প্রদায়িকতার এটা বড় উৎস।

আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পর্বে প্রবেশ করে দেখছি, সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে অবস্থার কোনো হেরফের নেই। এখনো দেখছি পূর্ব ধারায় সেই গুজব-রটনা, হামলা, বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র বা নিম্নবর্গীয় সংখ্যালঘুদের ভিটা-জমি বা সম্পদ হরণের জন্য সাম্প্রদায়িক সহিংসতা—বহুপক্ষ এতে জড়িত—স্থানীয় দুর্বৃত্ত থেকে জনপ্রতিনিধি, পাতি রাজনৈতিক নেতাকর্মী, এমনকি পুলিশ। একদিকে বাবরি মসজিদের ঘটনার উসকানিতে, অন্যদিকে বিনা উসকানিতে সর্বশেষ নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ, অভয়নগর প্রভৃতি স্থানে নিম্নবিত্ত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা।

হামলার কারণ এমন সাম্প্রদায়িক প্রচারে যে সাঈদীর মুখ চাঁদে দেখা গেছে এই রটনায়। হামলা রামু, উখিয়া প্রভৃতি বৌদ্ধপল্লীতে, এমনকি হিন্দু মন্দিরে ও বাড়িতেও। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, এ হামলায় মূলত বিএনপি-জামায়াত জড়িত হলেও বাদ ছিল না অন্যান্য দল। তৃণমূল স্তরে লুটতরাজের লোভ বলে কথা। এর সুবিচার প্রশ্নবিদ্ধ।

আলোচনা দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। আমি সবার জন্য কিছু প্রশ্ন রাখব, যা হয়তো কিছুটা অপ্রিয় হতে পারে। সেক্যুলার সংবিধানের বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে ও প্রতিকারে কতটা সদর্থক ভূমিকা রেখেছে। কথা না বাড়িয়ে আমি তাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রধান শেখ হাসিনাসহ প্রতিটি গণতন্ত্রী ও প্রতিবাদী রাজনৈতিক দল ও অনুরূপ সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রধানদের (স্থানাভাবে নামোল্লেখ করা হলো না) প্রতি আবেদন জানাই সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচিতে সক্রিয় হতে। অশুভ সাম্প্রদায়িক শক্তির বিষঝাড় নির্মূল করার উদ্দেশ্যে সব দলের সমন্বয়ে মঞ্চ গঠন করতে হবে, যে মঞ্চ তাৎক্ষণিক অঘটন ঠেকাতেও তৎপর হবে। আমার বড় প্রশ্নটা হলো, অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শক্তির উপস্থিতিতে কয়েক দিন ধরে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তাণ্ডব চলে কিভাবে? আক্রান্তদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনী অকুস্থলে পৌঁছেছে দেরিতে। এরই মধ্যে যা ঘটার ঘটে গেছে। আক্রান্ত মানুষগুলোর ক্ষুব্ধ অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই আমার প্রশ্ন—সর্ববৃহৎ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো কি তাণ্ডব রোধে সময়মতো সক্রিয় হতে পেরেছিল বা সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীকে অকুস্থলে টেনে আনার চেষ্টা করেছিল?

ভবিষ্যৎ ভেবে, সেক্যুলার বাংলাদেশের চিন্তা মাথায় রেখে আমার প্রত্যাশা—উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠন যেন সক্রিয় হয়, এবারের ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে। শেষ কথা হলো, সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নেও সমাজবদল জরুরি, নিদেনপক্ষে ইতিবাচক মানবীয় সংস্কার, যাতে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ এই বোধ সমাজে প্রাধান্য পায়। যুক্তিবাদী চিন্তা এ বিষয়ে আমাদের সহায়ক হতে পারে। আনুষ্ঠানিকতা নয়, চাই প্রতিরোধের সাহসী বলিষ্ঠতা। কাজটা হতে হবে সার্বক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী, যত দিন সমাজ সাম্প্রদায়িকতার দূষণমুক্ত না হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি, ভাষাসংগ্রামী



সাতদিনের সেরা