kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ ল্প

পূর্বে মহানিশা

মৌ কর্মকার

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



পূর্বে মহানিশা

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

যাত্রাকালে পিছু ডাক ভালো নয়। মায়ের মুখে এই কথা শুনেছি বহুবার। পেছন থেকে ডাক শুনে রেগেই বলে উঠলাম, ‘এই, কে রে?’

পেছনে তাকাতেই দেখি লম্বা বন্দুক হাতে এক পুলিশ দাঁড়িয়ে। এমনভাবে চেয়ে আছেন যেন উনি পুলিশ বলেই আমি চোর! এ যেন চোর-পুলিশ খেলা।

‘নাম কী?’ উত্তরে নিজের অজান্তেই অনুকরণ করে বলে ফেললাম, ‘নাম কী?’ উনি বন্দুকটা নাড়াচাড়া করছিলেন! একদম সোজা হয়ে বললাম, ‘আমার নাম মেহেক।’

মেহেক? এ আবার কেমন নাম! ‘মেহেক নামের অর্থ কী?’ জিজ্ঞেস করলেন। খুব সাহস নিয়ে বললাম, ‘ভাগ্যবান।’ ‘কে ভাগ্যবান?’ উনার এই প্রশ্নে আমার সাহস আবার চলে গেল। আমি চুপ করেই দাঁড়িয়ে রইলাম।

‘দেখে তো ভদ্র বাড়ির ছেলেই মনে হয়, তা কেন আসা হয়েছিল এখানে?’ বন্দুকটা মাটিতে ঠেকিয়ে রেখে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

আজ অমাবস্যা। অমাবস্যার রাতে এই কালো অন্ধকারে মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে খুব ভালো লাগে। গাড়িগুলো সামনের হেডলাইট দুটি জ্বেলে সামনে এগিয়ে যায়। কারো হয়তো পথের ঠিকানা জানা থাকে, কারো আবার থাকে না। রাস্তার পাশের দোকানগুলোকেও রাতের এই আঁধারে অচেনা মনে হয়। রাস্তার ঠিক মাঝখানের ওই আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে হলুদ সোনালুগাছের দল। গাড়ির হেডলাইটের আলোতে আরো সুন্দর লাগে ওদের। সৌন্দর্য দেখার লোভে আমি প্রায়ই আসি এই আইল্যান্ডে। ওই সোনালুগাছগুলোর নিচে বসে থাকি। আইল্যান্ডের দুই পাশের দুটি পথ। এক পথে গাড়ি আসে অন্য পথে চলে যায়। আমার সঙ্গে আরো অনেকেই থাকে। আমি, সজল, মনির, সন্ধি, তরু; মাঝেমধ্যে মমিনও যোগ দেয় আমাদের সঙ্গে। মনিরের গানে চলতে থাকে আমাদের এই আড্ডা। আজ আমার সঙ্গে কেউ নেই। ওরা গেল কোথায়?

পুলিশ মহাশয় উত্তরের আশায় আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কিন্তু এসব উনাকে বলি কিভাবে! যদি ঢুকিয়ে দেয় গারদে!

‘কালকে পরীক্ষা আছে, পড়তে পড়তে মাথা ধরে গিয়েছিল, তাই চা খেতে বের হয়েছি।’ সাহস করে বলেই ফেললাম।

‘বাসায় চুলা নেই, চা করে খাওয়া যায় না?’ রেগে জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, ‘আমি মেসে থাকি, বাড়িতে থাকলে হয়তো মা চা করে দিতেন, কিন্তু এখানে তো মা নেই।’

‘ঠিক আছে, যাও।’ অনেক ভেবেচিন্তেই বললেন উনি। মায়ের কথা শুনে খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গেছেন মনে হয়। কিন্তু আমি তো বাঁচার জন্য মিথ্যা কথা বললাম।

‘আমিও অনেক দিন বাড়ি যাইনি, মাকে দেখিনি, মার হাতের চা!’ বলেই থেমে গেলেন উনি। আমিও থেমে গেলাম। ফিরে দেখি, উনার চোখে জল। উনি কাঁদছেন। আমার দিকে তাকিয়ে চোখ মুছে বললেন, ‘যাও, বাসায় যাও, আর বের হবে না। তোমার কিছু হলে তোমার মা কী করবেন, ভেবেছ কখনো?’ আমি কিছু বলতে পারলাম না, শুধু চেয়ে রইলাম।

রাত আর কত হবে? মোবাইল ফোন বের করে দেখার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ দৃষ্টি চলে গেল রাস্তার দিকে। রাস্তা ফাঁকা, কিন্তু রাস্তার দুই পাশে চলছে চা খাওয়ার ধুম। রাতযাপনের এই একটিই অবলম্বন। চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠে দূরে হারিয়ে যাচ্ছে। সেই হারিয়ে যাওয়া পথেই চলছি আমি।

দানবের মতো ট্রাকগুলো সামনের হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে চলেছে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে সে! চালক একটু ব্যতিক্রম ঘটালেই রক্তের অঝোর ধারা বয়ে যাবে এই পথে। রক্তের বন্যা দেখেও হয়তো কেউ কেউ পরখ করে নেবে, এটা কি আসলেই রক্ত? নাকি ডাকাতবাহিনীর কোনো চাল। এটাই যে বাস্তবতা। জীবনের এই যান্ত্রিকতার মতোই যান্ত্রিক হয়ে গেছে মানুষের মন।

অনেক পথ চলে এসেছি। এখনো মানুষের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠেনি এই রাস্তা। কালো পিচঢালা রাস্তায় সাদা রঙের আঁচড়ে আঁকা হয়েছে তীর চিহ্ন। উল্টো দিকে মুখ দিয়ে আছে তারা। মাঝখানে আবার টানা হয়েছে কিছু রেখা। কী অর্থ আছে এই রেখাগুলোর? এর অর্থ সবাই বোঝে কি?

চায়ের দোকানের সামনে সজলকে দেখতে পেলাম। খুব মনোযোগ সহকারে তীর চিহ্নগুলো দেখছে ও। দেখে মনে হচ্ছে, এইবার ও এই চিহ্নগুলোর রহস্য খুঁজে বের করবেই।

এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখে বলল, ‘কোথায় ছিলি তুই? কতক্ষণ ধরে খুঁজছি তোকে, জানিস?’ বললাম, ‘এসেছিলি কখন?’ ‘অনেকক্ষণ, ওভারব্রিজের নিচে একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে, সেখানেই ছিলাম।’ আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। ও আবার বলল, ‘আরে ওই যে যেখানে পুলিশ টহল দেয়, সেখানে।’ অবাক হলাম। কী করব বুঝতে পারলাম না। ছুটতে লাগলাম সেই দিকে। কানে ভেসে এলো একটি মাত্র কথা, ‘তোমার কিছু হলে তোমার মা কী করবেন, ভেবেছ কখনো?’

এই সেই জায়গা যেখানে আমাকে পিছু ডেকেছিল পুলিশটি। এখন উনি এখানে নেই। সামনে অনেক ভিড়। এত রাতে এত মানুষ কোথা থেকে এলো? উনি কি সেখানেই? এগিয়ে গেলাম। চোখে পড়ল সেই তীর চিহ্নগুলো। কী অর্থ আছে এগুলোর? বুঝতে পারলাম না। উনাকে খুঁজতে লাগলাম।

রক্তে ভেসে আছে চারদিক। টুকরো টুকরো হলুদ ফুল পড়ে আছে নিচে ভেসে যাওয়া রক্তের ওপর। ওই তো সেই বন্দুক! কিন্তু উনি কোথায়? উনাকে দেখতে পাচ্ছি না।

সজল এগিয়ে গেছে অ্যাম্বুল্যান্সের দিকে। আমিও গেলাম। অনেক পুলিশ এখানে। মানুষও এসেছে অনেক। ভিড়ে কিছু দেখতে পাচ্ছি না, হয়তো উনি এখানেই আছেন! হঠাৎ আমাকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে। অ্যাম্বুল্যান্স চলতে লাগল। চিৎকার করে বললাম, ‘আমাকে যেতে দিন।’ কেউ শুনল না। বাইরে সজলের চিৎকার শুনতে পেলাম, অ্যাম্বুল্যান্স ছুটে চলল। সজলের চিৎকারও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঝাপসা হয়ে গেল।

রক্তে ভেজা একটি দেহ, মুখটি ঢাকা। ওপরের সাদা চাদরটা রক্তে লাল হয়ে আছে। কী করব, বুঝতে   পারলাম না। হয়তো অ্যাম্বুল্যান্সের ওপরে সেই লাল লাইট জ্বলছে। বাইরে শব্দ হচ্ছে, পোঁ পোঁ! যে শব্দ শুনে সবাই আঁতকে উঠে বলছে, ‘আহা রে, কার যেন কী হলো?’ আমি হলেও তা-ই বলতাম। বলতাম কি?

আমি এখন অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতরে। সামনে উনি। উনাকে লাশ বলব কি না, বুঝতে পারছি না। একেই মনে হয় বলে ভাগ্যের পরিহাস। কখন যে কার কী হবে কেউ কি বলতে পারে?

পাহাড়ি রাস্তার মধ্য দিয়ে অনেক পথ অতিক্রম করে অ্যাম্বুল্যান্স এসে থামল উনার বাড়ির সামনে। এখনো চলছে অ্যাম্বুল্যান্সের সেই ভয়ানক শব্দ। সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে কিছু মানুষের আর্তনাদ। কী ভয়ানক সেই আর্তনাদ।

‘ও রহমত রে’, বলে কেউ একজন চিৎকার করল। উনার নাম হয়তো রহমত। মনে হয়, উনার মা চিৎকার করছেন!

লাশ নামানো হলো। লাশকে ঘিরে অনেকেই চিৎকার করছে; কিন্তু উনার মা কোন জন, বুঝতে পারলাম না। কান্নার আর্তনাদ উঠেছে সবার মুখে। একজন আমাকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে হয় তোমার?’ আসলেই তো, কে হয় আমার? খানিক চুপ করে থেকে বললাম, ‘পরিচিত!’ উনার মা কে, জানার খুব ইচ্ছা হলো। অপরিচিত সেই লোকটাকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে উনার মা...!’

শেষ করার আগেই তিনি বললেন, ‘হ, ওর মার কবরের লগেই ওরে কবর দেওয়া হইবো।’ আবার স্তব্ধ হয়ে গেলাম। কী হচ্ছে এসব আমার সঙ্গে। ‘এই মা-ই আছিল ওর একমাত্র সঙ্গী। আর কেউ নাই এই সংসারে, বাপ মইরা গেছে অনেক কাল আগেই। ওই তো এক বছর আগে এই সময়েই ওর মাডাও মইরা গেছিল, আর আজ ও...!’ বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন লোকটি।

আমি কোনো কিছু বলার শক্তি পেলাম না। বুকের মাঝখানে কেমন যেন লাগছে! বুঝতে পারছি না। কে হন উনি আমার? বন্ধু, ভাই, আত্মীয়? কেউ নয়তো! তবে?

ফিরতে হবে আমায়। অ্যাম্বুল্যান্স এখনই চলে যাবে। চেয়ে দেখলাম, উনাকে গোসল করানো হচ্ছে। একটু পর হয়তো কাফনের কাপড় পরানো হবে। উনি পাড়ি জমাবেন অন্য কোনো রাজ্যে, যেখানে উনার মা আছেন।

অ্যাম্বুল্যান্স চলছে। ভেতরে বসে আমি। কানে ভাসছে সেই কথা, ‘তোমার কিছু হলে তোমার মার কী হবে, ভেবেছ কখনো?’ মার কথা খুব মনে হচ্ছে। মাকে কল দিলাম। রিং বেজে বেজে কেটে গেল। ভোরবেলা, ঘুমাচ্ছেন হয়তো। মায়ের মন! মা সঙ্গে সঙ্গেই কল ব্যাক করলেন।

‘কী হয়েছে মেহেক, শরীর খারাপ? বাবা, কিছু হয়েছে?’ উত্তেজিত গলায় মা বলতে শুরু করলেন। ‘মা, ভালো আছ?’ মা ঘুমের গলায় উত্তর দিলেন, ‘কী হয়েছে, বাবা?’ ‘কিছু না মা, তোমার কথা মনে হচ্ছিল!’ মা হেসে বললেন, ‘দূর পাগল, ঘুমো।’ ‘ঘুমাচ্ছি, মা, তুমি ঘুমাও।’ বলে ফোন রেখে দিলাম। বুকটার মধ্যে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

এখন অ্যাম্বুল্যান্সের সেই ভয়ানক শব্দ আর নেই। আওয়াজহীন এই গাড়ি দেখেও মানুষ মনে হয় বলছে, ‘কার বুকের মানিক জানি গেল রে!’ এখন এই গাড়ির জানালার গ্লাসগুলোও খোলা। নিজেকে কেমন যেন লাশ মনে হচ্ছে!

জানালা দিয়ে মুখ বাড়ালাম। চেয়ে দেখলাম রাস্তাটির দিকে। আহা! এই রাস্তার চর্চার জন্য প্রতিদিন আগমন ঘটে কত প্রসাধনসামগ্রীর। কখনো তরমুজের লাল রং আকস্মিকভাবেই ধুয়ে দেয় এর শরীর, আবার কখনো মানুষের তাজা রক্তে প্রশমন ঘটে তার তীব্র জ্বালার। প্রতিনিয়ত এ রকম নানা রূপ, রং, রস মিলিয়ে মাটির সঙ্গে মিশে থাকে মহান এই সড়ক। ব্যাসবাক্যরূপে যে পরিচিত নয়, এর পরিচয় এককথায় ‘মহাসড়ক’ নামে। ছোটখাটো সড়কের সঙ্গে আবার এর তুলনা চলে না। সারা দেশে ইনি এক নামেই পরিচিত। অবশ্য অজগর সাপের মতো তার চ্যাপ্টা দেহে সৌন্দর্যও কম নয়। গ্রামের প্রশান্তিতে বেড়ে ওঠা বাঁদরলড়ি ফুল সোনালু ফুল নামে জায়গা করে নিয়েছে এই সুনামি মহাসড়কের আইল্যান্ডে। সঙ্গে নাম না জানা সহচরী আরো অনেকেই আছে। মহাসড়কের মাঝে থাকবে বলে কথা, পারলে সব চলে আসে। আমরাও চলার পথে তাদের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই বারবার। এখনো মুগ্ধ হচ্ছি। অজানা মুগ্ধতায় ভেসে যাচ্ছে মন। তবে কিসের এই মুগ্ধতা? বুঝতে পারছি না।

এক পাশ দিয়ে গাড়ি আসছে, অন্য পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ি যাওয়ার সময় গাছগুলো একদিকে হেলছে আবার আসার সময় অন্যদিকে দুলছে। এইভাবে হেলেদুলেই কেটে যায় তাদের সময়। তবু তাদের নেই কোনো অভিযোগ। এমনকি মাঝরাতেও একটু ঘুমানোর সময় নেই তাদের, একটু ঘুমালেই দুঃস্বপ্নের মতো হানা দেয় রাত্রিপ্রিয় মানুষের দল, সেই দলের একজন আমি নিজেই।

মাঝরাতের মায়া কাটিয়ে ভোরের দিকে পা রেখেছে সময়। রাস্তার পাশে দোকানগুলো গত দিনের ক্লান্তিতে যে ঘুম দিয়েছিল তার ঘোর কাটেনি এখনো। এখন নেই চা খাওয়ার ধুম। নেই সেই ধোঁয়াও। দানবের মতো ট্রাকগুলো এখনো সামনের হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে যাচ্ছে বহুদূর।

অ্যাম্বুল্যান্স আমাকে নামিয়ে রেখে চলে গেল। সজল এখনো সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে, সঙ্গে সন্ধি, মমি, তরু ওরা সবাই আছে।

এই সেই জায়গা, যেখানে কাল ছিলাম আমি আর সেই মানুষটি। তবে আজ! সন্ধি জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছিল রে কাল রাতে?’ সজল আমার দিকে তাকিয়ে রইল।

হেসে বললাম, ‘কাল রাত এসেছিল কি?’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা