kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

গ ল্প

ডিম ভাজা আর গরম ভাত

খালেদ চৌধুরী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০ মিনিটে



ডিম ভাজা আর গরম ভাত

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

মাগি দেখে চেনার কোনো চিহ্ন নাই। তুমি কী করলে, বিশ্বরোডে কিছুক্ষণ এটিএম বুথ খুঁজলে? কোথায় গেলে, তাজমহলে, কেন? সেখানে এটিএম বুথ থাকতে পারে। গিয়ে কী দেখলে, নেই। আর কী দেখলে? কফি ফ্যাক্টরি লি.। রেস্টুরেন্টের কেবিনের মতো করে আলাদা আলাদা কোঠা-কামাষ্পদরা যেন হাস্যরসে কফি পান করতে পারে। ন্যাশনাল হাইওয়ের পাশে তাজমহল কিন্তু আবাসিক হোটেলও। সেখানেও মাগি পাওয়া যায়। তুমি রিসেপশনে গেলে আর বললে, ভাই, মাগি পাওয়া যায়? হবে না। তাজমহলের মালিক কাশেম একসময় পান দোকানদার ছিল। তুমি কেন টাকার ভাবনা ভাবছ? কারণ তোমার পকেটে ১৭০ টাকা আছে। রাজধানীতে যেতে যে বাসের টিকিট কেটেছ, তা পরিশোধ করে তোমার পকেটে মাত্র ১০ টাকা থাকবে। তোমার পকেটে দু-দুটা এটিএম কার্ড আছে। তার পরও তোমার মন উথালপাথাল, পথে যদি কিছু হয়। পাঁচ বছর ধরে তুমি রাজধানী টু জেলা শহর। জেলা শহর টু রাজধানী করছ, কখনো এমন হয়নি। আজই এ রকম হয়েছে। দেখ কী হয়? সে বাসে উঠেছে। বাস এখনো পূর্ণ হয়নি। ডিমওলা মাছের মতো বাসটা পূর্ণ হলেই তোমরা মরণের জন্য ছুটবে। তুমি অপেক্ষা করছ বাস কখন ছাড়বে। এর মাঝে শুনতে পেলে ২০ নম্বর সিটটা আমার। তা-ও রমণী কণ্ঠে। রমণীর দেহকাঠামো দেখে, তার কণ্ঠের কোমলহীনতা দেখে, পাশে একজন মেয়ে মানুষ বসবে, তবু তুমি উত্ফুল্ল হতে পারনি। যা হোক, ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দেয়। তুমি তার নাম জানো না। সে ফোনে একজনকে বলছে, ‘ভাই, ঢাকা থাইকা জ্যাম পাড়ি দিয়া আসলাম। আর আপনি আমারে কত টাকা দিলেন? ৩০০ টাকা। আর কোনো দিন আসব না।’ তুমি পারিপার্শ্বিক কিছু সংলাপের জন্য ৩০ ঊর্ধ্ব মেয়েটিকে মাগি ভাবছ। সে এরই মধ্যে তোমার কাছে সাহায্যও চেয়েছে। সে বলেছে, ‘ভাইয়া, আমার সিটটা একটু নামিয়ে দেবেন?’ যদি তুমি তাকে সাহায্য করতে, তোমার মুখ তার ঊরু ঘসে যেত। তার স্তনের সঙ্গে তোমার পিঠ লাগলেও লাগতে পারত। অবচেতনে কথা বলার জন্য মেয়েটির একটি নাম দরকার। তুমি তার নাম কী রাখলে, চামেলি। তুমি কি তাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের আবাসিক ব্যবসার ধরন জানো? পরিপাটি রুমগুলোতে প্রেমিকযুগল, কিংবা প্রবাসী, অথবা পরকীয়া...। কাজ তো শুধু একটাই, দেহ মন্থন। কতটুকু আর সময় লাগে। এ রকম করে একটা রুম যদি ১০ জন ব্যবহার করে, তাহলে কত টাকা? সাধু ১০ বছর সাধনা করে ভাবের যে গুণ অর্জন করে, সাত দিন গাঁজা খেয়ে তুমি সেই গুণ অর্জন করতে পারো। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ, তা বলিছি না। কিন্তু সাধনা সাধ্যের কাছে যেতে পারে। বিষয়টা একটু ভেবে দেখ, জন্মের পর থেকে একটু যৌনতা শিশুর সঙ্গে যুক্ত হয়। ছেলে শিশু তার মায়ের স্তনে খাবার পায়। আবার তার বাবা এই স্তনে পায় যৌনতা। (শিশুর স্তর থেকে স্বামীর স্তনের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আঠারো বছর। আবার মিথ্যা কথার মতো ১৩ বছরও হতে পারে। ধরো একজন প্রেমিক কোনো এক যুবতীকে ভালোবাসে।) কেন জানি মনে হয় সৌন্দর্য সহিংসতার কারণ। ধর্মের পৃথিবীর প্রথম খুনটা সৌন্দর্য ধারণার জন্যই তো হয়েছে। হাবিল আর কাবিল। তখন যমজ সন্তান জন্মাত। হাবিল আর কাবিল নারীর সৌন্দর্যের ভেতর দিয়েই তো খুন করে। লাইট বন্ধ করে তুমি যখন সৌন্দর্যের সংজ্ঞা মুখস্থ করো। বল তো, সেখানে সাদা আর কালোর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে? যা বলছিলাম, যুবক মেয়েটিকে ভালোবাসে। বিশেষ করে কোনো যুবক যখন কোনো মেয়েকে ভালোবাসে, কোনো কারণ ছাড়াই মেয়েটির রক্ত-মাংস যুবকের  ভাবনায় চলে আসে। আর যুবকটি যদি শুধু নিজে যৌন আনন্দ নিতে চায়? তাহলে কী হবে? ধর্ষণ। ফাঁসিযোগ্য অপরাধ। তোমার নাম যদি কামাল হয় তাহলে একটু কল্পনা করে দেখ, তোমার শাস্তি কী হতে পারে? তোমার ঘাড় পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে আমৃত্যু পাথর নিক্ষেপ করা হবে। একজন গুরু বলছিলেন, গাঁজা খেয়ে আধ্যাত্ম আর সাধনে আধ্যাত্ম অনেকটা ভালোবাসা আর ধর্ষণের মতো। বাস চলছে, চামেলি ২০ টাকা হাতে নিয়ে বসে আছে কন্ডাক্টরকে বলবে, ভাইয়া, গাড়ি থামলে ২০ টাকার একটা রিচার্জ কার্ড আইনা দিয়েন। আর তুমি তাকে মাগি উপযুক্ততার জন্য উপাত্ত সংগ্রহ করছ। চামেলির ফোন আসে। প্রথমে কলারকে সে চিনতে পারে না। দু-তিন মিনিট কথা বলার পর চিনতে পারে। ও কোনো রাখঢাক না রেখে বলেই ফেলে, আমার ফোনে ২০টা টাকা পাঠান। তোমার সন্দেহ আরো ঘনীভূত হয়। বাস চলছে। এর মধ্যে দাউদকান্দি ব্রিজের টোল প্লাজায় জ্যাম। শত শত গাড়ি পিঁপড়ার গতিপ্রাপ্ত হয়। আর তুমি গাড়ি থেকে নেমে এটিএম বুথ খুঁজছ? আশপাশে চোখ ঘুরাচ্ছ। এর মধ্যে তোমার তৃষ্ণাও পেয়েছে। তুমি কখনো ড্রাইভার বা হেলপারের পানি খাও না। প্রচণ্ড তৃষ্ণায় তুমি হেলপারকে একবার জিজ্ঞেস করলে, গাড়িতে পানি আছে কি না। সে জানিয়ে দেয়, নাই। তোমার পকেটে এটিএম কার্ড আর ১০ টাকা আছে। তুমি টাকাটা খরচ করতে চাচ্ছ না। তা ছাড়া ১০ টাকা দিয়ে কোনো কম্পানির মিনারেল ওয়াটার রাস্তাঘাটে পাওয়া যায় না। চামেলি কিন্তু পানি কিনেছে, চিপস কিনেছে, তুমি পানিওলা এলে দরদাম করো কিন্তু পানি কিন না। তোমার ছাতি ফেটে যাচ্ছে। কী, ১০ টাকা খরচ করবে? বাস জ্যামে আটকে আছে। একটা আইসক্রিম কিনে খাও। না, পরে যদি তৃষ্ণা বেড়ে যায়! এর মধ্যেও চামেলিকে সন্দেহ করছ, ও একটা মাগি। তৃষ্ণা নিবারণের জন্য নিজেকে কী বলছ! তোমার রোজা রাখার অভ্যাস আছে। তুমি তৃষ্ণায় মরবে না। বাহ। বেশ বলেছ। এর মানে তুমি ঢাকায় গিয়ে পানি খাবে। কেন শুধু শুধু কষ্ট করছ। এই কষ্টের কোনো মানে হয় না। মাস দুয়েক আগে তুমি বনলতা আর জীবনবাবুকে স্মরণ করছিলে। তুমি বারবার আওড়িয়েছিলে, ‘আমারে দু দণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।’ তুমি বারবার কেন বনলতা সেনকে স্মরণ করেছিলে, কারণ সাবেক আমলা আকবর আলি খানের সেই ব্যাখ্যার পর তুমি ধরেই নিয়েছ, বনলতা একজন গণিকা। হ্যাঁ, আপাতদৃষ্টিতে গণিকার সঙ্গে সঙ্গম অনেক আনন্দের। কারণ গণিকাকে নির্ধারিত একটা ছাপা কাগজ দিতে হয়। তোমার বউ কি তোমার স্বাধীনতা হরণ করেনি! কোথায়, তোমার কি দিন শেষে তাকে বলতে হয়। তোমার একটা অফিস শেষ হলে আরেকটা অফিস শুরু হয়। সংসারও তো আরেকটা অফিস। সেদিন কী হলো, তোমার স্ত্রীকে না জানিয়ে মা-বাপ-বোনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছ। তুমি ভেবেছিলে বউকে বলবে না। পরে তুমি দেখলে, সে জেনে যাবে। বিপদ আরো বেশি প্রকট হবে। কী করলে, বউকে ঘটনা ঘটার ১৫ দিন পর যখন বললে, সে তখন গৌরী রং থেকে আগুন রঙে রূপান্তরিত হলো। তোমার শরীর থেকে এক ফোঁটা রক্তও ঝরেনি। তুমি বলছ, জাহান্নাম দেখেছ। তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াল, জীবনবাবুও মাঝেমধ্যে জাহান্নাম দেখতেন। তুমি বলো, যদি তোমার ব্যক্তিগত বনলতা থাকত, তুমি তাকে বলতে, আচ্ছা নাচো তো দেখি, সে নাচত; বাত্স্যায়নের ব্যাকরণ, একজন বনলতা থাকলেই অনুশীলন করা যায়। তুমি তো সেদিন পাগলের মতো বনলতাকে খুঁজেছ। চামেলির সঙ্গে কথা বলে। সে বনলতা অথবা মনলতার সন্ধান দিতে পারে। চাদু বাস ২০-২৫ মিনিট ধরে থেমে আছে। তোমার আর কোনো সন্দেহের দরকার নেই। তুমি বাস থেকে নামো। টং দোকান আছে। যাও, পানি খেয়ে আসো। যেই না তুমি গলায় পানি ঢাললে, বাস ছেড়ে দিয়েছে। বাসে তোমার ব্যাগ ফেলে এসেছ। তোমার গুরুত্বপূর্ণ সিন্দুকের চাবি ব্যাগে আছে। তুমি দৌড়াচ্ছ, জীবনদৌড় দৌড়াচ্ছ। একবার ভাবলে, যা, ব্যাগ গেলে যাবে। আবার মনে হলো, তোমার পকেটে মাত্র ১০ টাকা। আবার মনে হলো, তোমার পকেটে দুইটা এটিএম কার্ড আছে। আবার মনে হলো, এই মাঝরাস্তায় কোথায় বুথ পাবে। তুমি দৌড়াচ্ছ। গাড়ি ইশারা করছ। কোনো বাস থামছে না। তুমি পড়ে গেছ। তোমার হাত ছিলে গেছে। রক্ত ঝরছে। তোমার প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে। তুমি কিছুটা শান্ত হলে। যাক, যা হওয়ার হয়েছে। তখন ভাবলে, ১০ টাকা দিয়ে কী হবে? তুমি আবার দৌড়াচ্ছ। তুমি আবার ভাবছ। তোমার সঙ্গে কী হচ্ছে! বাড়িতে যাওয়ার সময় অ্যানড্রয়েড হারিয়েছ। লোকাল বাস থেকে পকেটমার নিয়ে নিয়েছে। আচ্ছা, ব্যাগটা কি তুমি পাবে? এর মধ্যে দেখলে, বাসটা তোমার জন্য থামেনি, জ্যামের জন্য থেমেছে। সামান্য এক কিলোমিটার দৌড়ে তোমার ভেতর মরুর স্বাদ জমা করেছ। বাসে ওঠার পর যাত্রীরা বলাবলি করছে। বাসটা এতক্ষণ থেমে ছিল, নামলেন না। যেই না ছাড়ার সময় হলো বাস থেকে নামলেন। তোমার পাশের আরেকজন যাত্রী বলছিল, ভাই, আমি বাসটা থামানোর জন্য বলছি, ‘কন্ডাক্টর থামায় নাই। এই শালারা মানুষের বাচ্চা না।’ তুমি বললে, ‘ব্যাগটার জন্য দৌড় দিছি। গুরুত্বপূর্ণ কাগজ ছিল।’ তুমি কিন্তু একবারও বলোনি, দুই ঘণ্টা ধরে তুমি এক ফোঁটা পানিও পাওনি। তোমার গায়ে ছিল সাদা শার্ট। তোমার হাতের তালু বেয়ে রক্ত ঝরছে। তোমার সারা শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে ঘাম বের হচ্ছে। এর মধ্যে চামেলি তোমাকে বলল, ‘কখনো গাড়ি থাইকা নামলে ব্যাগ নিয়া নামতে হয়।’ আবার বলল, ‘রুমাল থাকলে চাইপা ধরেন।’ তুমি তার কথামতো রুমাল দিয়ে হাতের তালু চেপে ধরলে। একটা ব্যথার স্বাদ তোমার অনুরণিত হচ্ছিল। তোমার সারা শরীরে ব্যথা। পা ছিলে গেছে। তোমার পাশের যাত্রী তোমার দিকে ঠাণ্ডা পানির বোতল এগিয়ে দিল। সে বলছে, ‘ভাই, মাথায় একটু পানি দেন, ভালো লাগব।’ তুমি তখন ভাবলে, অনেক দিন পর চামড়া ছোলা যন্ত্রণা পাচ্ছ। তুমি মনে মনে কাকে দায়ী করছ? তোমার স্ত্রী যদি তোমার কাছ থেকে আসার সময় ২০ টাকা না নিত। তুমি খুব সহজেই পানির বোতল কিনতে পারতে। যদি পানি কিনতে পারতে তাহলে আজ তোমার এ রকম না-ও হতে পারত। এর জন্য কাকে দোষ দেবে, কপাল না বউকে? আর কী ভাবছ? ইদানীং তোমার ভালো যাচ্ছে না। একাত্তর নেই, বলতে পারো না। একাত্তর বারবার ফিরে আসে। যদি এই অবস্থার মধ্যেও কেউ তোমাকে জিজ্ঞেস করে, কেমন আছ? একাত্তরের তুলনায় বা সিরিয়ার তুলনায় বা ফিলিস্তিনের তুলনায় বা পাক-ভারত সীমান্তের তুলনায় বা রোহিঙ্গাদের তুলনায়...তুমি কত ভালো আছ? তোমার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে। এক কিলো দৌড়ে তুমি ক্লান্ত। তোমার শরীর থেকে লবণ বের হয়ে গেছে। জানো তো, শরীরে লবণই পানি ধরে রাখে। তোমার খাবার দরকার। তোমার পানি দরকার। তোমার চোখ আবার এদিক-সেদিক ঘুরছে। কোথায় এটিএম বুথ। কী ভাবছ? বাস থেকে নেমে কিছু খাবে, না রুমে গিয়ে ডিম ভাজা আর গরম ভাত।

মন্তব্য