kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

গ ল্প

এক হাতে তালি বাজে না

ইসহাক খান

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



এক হাতে তালি বাজে না

অঙ্কন : বিপ্লব চক্রবর্ত্তী

আচানক কারবার। সামান্য এক চড়েই চেয়ারসমেত উল্টে পড়ে গেল ছেলেটি। তারপর চোখে তারার ঝিকিমিকি দেখল। চোখ কচলে নিল দ্রুত। দেখল মেয়েটি তখনো মুখ তুলে রাগত তাকিয়ে আছে।

মহল্লার তিন রাস্তার মোড়। যেখানে মধ্যরাত পর্যন্ত লোক গম গম করে। সেখানে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। সেই রেস্টুরেন্ট ঘিরে মানুষের মধ্যরাত পর্যন্ত জমজমাট ভিড়। রেস্টুরেন্টের সামনে বেশ খানিকটা খোলা জায়গা। মহল্লার এই জায়গাটা নিয়ে অনেকেরই নানা অভিযোগ। মেয়েরা বেশির ভাগ সময় জায়গাটা এড়িয়ে চলে। রেস্টুরেন্টের সামনের খোলা জায়গায় মহল্লার কয়েকজন বখাটে ছেলে অযথাই বসে বসে গুলতানি মারে। মেয়েদের দেখলে শিস দেয়। নানা আজেবাজে কথা বলে, উত্ত্যক্ত করে। ভয়ে কেউ টুঁ শব্দটি করে না। তারা অস্ত্রবাজ, চাঁদাবাজ, দখলদার। দিনদুপুরে পাবলিকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে চাঁদাবাজি করে। কারো কিছু বলার নেই। তার বড় কারণ তাদের পেছনে শক্ত খুঁটি। এলাকার কমিশনার তাদের নেতা।

জায়গাটা সারাক্ষণই লোকের ভিড় থাকে। কাছেই একটি কাঁচাবাজার। তার পরও চিপা-চাপায় ভ্যানগাড়িতে অনেকগুলো অস্থায়ী কাঁচা তরকারির দোকান। রেস্টুরেন্টে বেশুমার গান বেজে চলে। বখাটেরা রেস্টুরেন্টের বাইরে কেউ মোটরসাইকেলে কেউ কোমর বাঁকিয়ে বেঢপভাবে দাঁড়িয়ে থাকে। একমাত্র টাকু মন্টু চেয়ারে ভাব নিয়ে বসে। ছোটবেলায় মন্টু খুব সাদামাটা ধরনের ছেলে ছিল। কিন্তু দুবার এসএসসি ফেল করার পর তার জীবন পাল্টে যায়। স্বভাবে বেপরোয়া, মুরব্বিদের সঙ্গে বেয়াদবি খুব সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। চেহারার কোমলতা উধাও হয়ে রুক্ষতা খামচে ধরে। অল্প বয়সে মাথার চুল উধাও। সেই থেকে নামের সঙ্গে টাকু শব্দটি স্থায়ী হয়ে গেছে। এখন শুধু মন্টু বললে অনেকেই চিনতে পারবে না। টাকু বিশেষণ জুড়ে দিলে সবাই একনামে চেনে।

মন্টুর দুর্ব্যবহারে এলাকার মুরব্বিরা ওকে এড়িয়ে চললেও সে কিন্তু তাঁদের ছাড়ে না। কথা না শুনলে জনসমক্ষে কাউকে ঠাস করে চড় বসিয়ে দেয়। গার্জেনদের নালিশ দিলে অপমানের মাত্রা চড়ে। ওর গার্জেনরা বলে, ‘ছেলে আমাদের শাসনের বাইরে। আমাদের কিছু করার নেই।’

সেই টাকু মন্টুকে একটি সাধারণ মেয়ে অনেক মানুষের সামনে চড় মেরেছে। এবং সেই চড়ে এলাকার বড় মাস্তান টাকু মন্টু চেয়ারসমেত উল্টে পড়ে গেছে। একি যা-তা কথা। মুহূর্তে তিন রাস্তার মোড় থমকে গেছে। যারা দৃশ্যটি দেখেছে, তারা চোখ কপালে তুলে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। মুখে কারো রা নেই। মন্টুর সঙ্গীরাও হতভম্ব। আশপাশের সবাই আতঙ্কে পরবর্তী পরিণতির অপেক্ষা করছে।

মেয়েটিও ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে কঠিন ভাব। যেন সে দেখিয়ে দিয়েছে—ইটের জবাব কিভাবে পাথ্বর দিয়ে দিতে হয়। কলেজে আসা যাওয়ার পথে প্রতিদিনই ওই বখাটেরা তাকে উত্ত্যক্ত করে। মন্টুর কাছে সে নালিশ দিয়েছিল। মন্টু উল্টো মেয়েটিকে ধমক-ধামক দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছে। আজ টাকু মন্টুর সামনে ওকে বাজে কথা বললে মেয়েটি সে ছেলেটিকে কিছু না বলে আচমকা টাকু মন্টুর গালে কষে চড় মারে। মন্টুকে মারার কারণ সেদিন নালিশ শুনে সে বিশ্বাস করেনি। উল্টো মেয়েটিকে বকাঝকা করে বিদায় করেছে। আজ সুযোগ পেয়ে মেয়েটি তাই ওদের নেতাকে চড় মেরে বসেছে।                      

 

দুই.

মহল্লার ঘরে ঘরে একমাত্র আলোচনা টাকু মন্টুকে চড় মারা। বিস্ময়ে কারো মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। দুর্বল মানুষেরা আল্লাহকে সাক্ষী মেনে বলছে, ‘উপযুক্ত কাজ হয়েছে। হে মাবুদ, তুমি মুন্নিকে সহি-সালামতে রাইখো।’

সাহস আছে মেয়েটার। সব ঘরেই আলোচনার মূল কথা এই। মুন্নির বড় ভাই বেকার মিন্নাস আলী, তার মুখেও একই কথা। সাহস আছে মুন্নির।

কথাটা লুফে নেন মন্নাফ মিয়া। তিনি বলেন, ‘তোরা যাকে সাহস বলছিস, আমি বলছি সেটা বিপদ। মহাবিপদ। আমাদের কি ওদের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা আছে? আমি চলি আজান দিয়া। এখন আমার আয় বন্ধ হলে সবার উপায় কী হবে?’

মিন্নাস কথা বলে না। বেকারদের সব ব্যাপারে কথা বলতে নেই। তারা পিতা-মাতার ঘাড়ে বোঝা। তাদের কথার কেউ মূল্য দেয় না।

মন্নাফ মিয়া অজু করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন। জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। তাঁকে আজান দিতে হবে। পাঁচবেলা এই তাঁর চাকরি। তাঁর এই চাকরি মেয়ে মুন্নি পছন্দ করে না। বলে, ‘আব্বা তোমার এই চাকরি হাওয়ার ওপর চলে। কোনো স্থায়িত্ব নেই। কোনো প্রমোশন নেই, পেনশন নেই। কোনো নিয়োগপত্র নেই।’

মেয়ের কথায় মন্নাফ মিয়ার শিরায় শিরায় রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। তিনি একটি দ্বিনি কাজ করছেন। আল্লার রাস্তায় তিনি মানুষকে পাঁচবেলা আহ্বান করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহপাক কেয়ামতের ময়দানে তাঁকে পুরস্কৃত করবেন। সেই দ্বিনি কাজকে ওই নাদানরা টাকা দিয়ে বিচার করে। নাওজুবিল্লাহ।

এসব দিন-দুনিয়ার ভাবনায় মন্নাফ মিয়া অজুর দোয়া ভালো করে পাঠ করতে পারছেন না। বারবার দোয়া ভুল হয়ে যাচ্ছে। মরার পর একজন মুমিনের সওয়াবের সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। একমাত্র নেকবান পুত্র এবং কন্যার ভালো আমল পিতার আমলে যুক্ত হয়। সেই কারণে ছেলেকে তিনি মাদরাসায় পড়িয়েছেন। মেয়েটাকেও তাই পড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওপরের ক্লাসে উঠে মেয়ে কিছুতেই মাদরাসায় পড়তে রাজি হলো না। ছেড়ে দিল পড়া। জেনারেল স্কুলে ভর্তি হলো। এখন সে হিজাবও পরে না। আজ সে প্রকাশ্যে একজন মাস্তানকে চড় মেরেছে। এর জের যে কতদূর যাবে সেই কথা ভেবে মন্নাফ মিয়া কূল পাচ্ছেন না।

জোবেদা খাতুন যখন বললেন, ‘আপনি এত পেরেশোন হচ্ছেন ক্যান? মেয়ে বাড়ি আসুক, শুনে দেখেন, কার দোষ?’ শোনামাত্র আজান দেওয়া কণ্ঠ শাণিত হয়ে গেল। রেগে বললেন, ‘কী শুনব? আমি বুঝি না? এক হাতে কোনো দিন তালি বাজে?’

‘আমি তো মুন্নির কোনো দোষ দেখি না। মুন্নি আমাকে অনেক দিন বলেছে, ওই বদমাইশগুলো ওকে রাস্তায় ত্যক্ত করে। আজেবাজে কথা বলে।’

‘বলবে না? তোমার মেয়ে হিজাব পরে না কেন?’

‘পরবে। ছোট মানুষ।’

মন্নাফ মিয়া ভেংচিয়ে বলেন, ‘ছোট মানুষ! সময় মতো বিয়া দিলে আজ তিন পোলার মা অইতো।’

‘আপনার উদ্ভট কথা। মেয়ে মানুষের কি বোঝেন?’

‘ফালতু বক-বক কইরো না।’

‘কিসের ফালতু? সত্যি কথা বললেই ফালতু হয়ে যায়? হিজাব কি মুন্নি একাই পরে না? ওর সাথে আরো অনেকেই তো পরে না। কই, তাদের নিয়ে কোনো কথা নাই ক্যান? কতবার মেয়েটা বলছে, ছেলেগুলো ওকে বিরক্ত করে। আপনাকে তো আমি সে কথা বলেছি। আপনি কোনো প্রতিকার করছেন?’ 

‘তাই বলে মেয়েমানুষ হয়ে পুরুষের গালে চড় মারবে?’  

 

তিন.

এদিকে টাকু মন্টুর পরিবর্তন ভিন্ন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ওর শিষ্যরা ভেবে পাচ্ছে না চড় খেয়ে লিডার খাম হয়ে গেল কেন? সে যে মুখ তুলে একবার মুন্নির দিকে তাকিয়েছিল দ্বিতীয়বার আর তাকায়নি। মুন্নি চলে যাওয়ার পর টাকু মন্টু নিজেও নিঃশব্দে স্থান ত্যাগ করে। শিষ্যরা পিছু পিছু যেতে থাকলে টাকু মন্টু ধমকিয়ে বিদায় করে দেয়। সেই থেকে তিন রাস্তার মোড়ে টাকু মন্টুকে আর দেখা যায় না।

টাকু মন্টুর বারবার মনে হতে থাকে তাকে কোনো মেয়ে চড় মারতে পারে সেটা তার ভাবনায় কোনোকালেই ছিল না। চড় খাওয়ার পর নিজেকে পরাজিত মানুষ ভাবতে শুরু করে সে। তার ভাবনা এমন—যদি সে মুন্নিকে জোর তুলে এনে সারা রাত নির্যাতনও করে তবু তার প্রকাশ্য চড় খাওয়া উঠে আসবে না। নারীর হাতের একটি মাত্র চড় আমূল বদলে দেয় টাকু মন্টুর জীবন।

সারাক্ষণ গৃহে বন্দি হয়ে থাকে। বাসার লোকজন নানা কথা বলে। বাবা ছেলের ব্যাপারে কথা বলা ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু একটি মেয়ের হাতে চড় খাওয়ার পর সেই অপমানটা তাকেও বিদ্ধ করছে নানাভাবে। ছেলে সাধারণ একটি মেয়ের হাতে চড় খেয়ে এসেছে। এই নিয়ে এলাকায় তুমুল আলোচনা। এলাকায় তিনি মুখ দেখাতে পারছেন না। স্ত্রী বেদানা বেগম ছেলের হয়ে কিছু বলতে গেলে বাবা খেঁকিয়ে ওঠেন। ‘রাখো তোমার অজুহাত। এক হাতে তালি বাজে না। এটা তোমার ছেলের পাওনা ছিল। ওই মেয়ে ঠিকই করেছে। মহল্লায় তোমার ছেলের বিরুদ্ধে নালিশে-নালিশে বাসা থেকে বেরুতে পারতাম না। সবার সঙ্গে বেয়াদবি, মাস্তানি। আর আজ পুচকে একটা মেয়ের হাতে চড় খেয়ে মাস্তানি থেমে গেছে।’

‘আপনি খালি আমার ছেলের দোষ খোঁজেন। ও রকম সবাই একটু-আধটু মাস্তানি করেই থাকে।’

‘ভালো কথা। তাহলে তোমার ছেলে ঘরে বন্দি হয়ে আছে ক্যা? সিনা টান করে পথে বের হতে বলো।’ কথাগুলো ঘরে শুয়ে শুয়ে শুনছিল টাকু মন্টু। লজ্জায় আরো কুঁকড়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত বাবাও এইভাবে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিচ্ছে।

আচমকা মন্টুর ঘরে বেদানা বেগম এসে উপস্থিত। বলে, ‘খোকা তোকে একটা কথা বলি? ওই মেয়েকে তোর কেমন লাগে?’

‘কেন মা?’

‘না, মানে, নিশ্চয়ই তাকে তোর মনে ধরেছিল। না হলে তুই তাকে উড়ো কথা বলবি ক্যা?’

‘কি যে বলো না মা!’

‘খারাপটা কী বলেছি?’

‘দেখ মা, এই নিয়ে আমি আর একটি কথাও শুনতে চাই না। তুমি কী চাও, আমি সারা জীবন ওই মেয়ের সামনে মাথা নিচু করে থাকি?’

‘মানে?’  

 

চার.

যে শিষ্যটি মুন্নিকে বাজে মন্তব্য করেছিল এবং যার পরিপ্রেক্ষিতে মুন্নি ঘুরে এসে টাকু মন্টুর গালে চড় মেরেছিল সেই নুলা মিজান একপেশে হয়ে গেছে দলে। তাকে আর কেউ সহ্য করতে পারছে না। তার কারণেই তারা লিডারকে দলে পাচ্ছে না ওরা। সে নিজেকে ডিফেন্ড করতে চাইলে একজন গালাগাল দিয়ে বলে, ‘চুপ হুমুন্দির পুত। তুই কথা কইস না। তোর কারণে লিডার আজ বোবা হয়ে গেছে।’

‘তাতে আমার দোষ কি?’ আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে নুলা মিজান বলে উঠলে বাকিরা চেপে ধরে। ‘চুপ। চুপ। তুই কথা কয়া মেজাজ খাট্টাস কইরা দিস না।’

একজন বলল, ‘আমরা বরং বসকে দেখে আসি। আজ বেশ কয়দিন হয়ে গেল বসের আমরা কোনো খবর নেই নাই, কামডা কি ভালো হইছে?’

‘মোটেও ভালো হয় নাই।’ জবাব দিল নুলা মিজান।

‘তুই চুপ কর। তোর কারণে আজ আমরা লিডারকে হারাইছি। খবরদার তুই একটা কথাও কবি না। তাইলে কইলাম তোর নুলাগিরি ছুটাইয়া দিমু।’

মিজানকে রেখেই বন্ধুরা গেল টাকু মন্টুকে দেখতে। বাসায় নক করলে দরজা খুলে দেয় টাকু মন্টুর মা বেদানা বেগম। একসঙ্গে বেশ কয়েকটি কণ্ঠে সালামের আওয়াজ ভেসে আসে। বেদানা বেগম সালামের জবাব দিয়ে তাকিয়ে থাকে। একজন বলে, খালাম্মা, আমরা মন্টুভাইকে দেখতে আসছি।’

‘মন্টু তো বাসায় নাই।’

‘কোথায় গেছে?’

‘তা তো জানি না।’

‘কয়া যায় নাই?’

‘বাইরে গেলে ও কি কখনো কয়া যায়?’

বেদানা বেগম দরজা বন্ধ করে চলে গেলে ওরা হাঁ মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। কারো কারো কাছে বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না। একজন বলে, ‘বস বাইরে গেলে আড্ডার জায়গায় আগে যাইতো। খালাম্মা মিছা কথা কয়া আমগো ভাগাইতে চাইছে।’

‘আমারও তাই ধারণা।’

অগত্যা তারা আবার ফিরে আসে তিন রাস্তার মোড়।

 

পাঁচ.

কলেজ ছুটির পর দল বেঁধে মেয়েরা বেরিয়ে আসছে। কলকাকলিতে চারপাশ সরগরম। অধিকাংশ মেয়েরা মুন্নিকে ঘিরে আসছে। সবাই মুন্নিকে বাহবা দিতে ব্যস্ত।

‘কাজের মতো একটা কাজ করেছিস।’  

‘আচ্ছা—এত সাহস তুই পেলি কিভাবে?’

‘তোর হাতে এত শক্তি। চড় খায়া নাকি ছেচড়া মাস্তান উত্তাইয়া পইড়া গেছে?’

এই কথায় হাসির রোল পড়ে। সেই হাসির রোল সহজে থামে না। দূর থেকে দেখা যায়, একটি মোটরসাইকেলে একজন বসে আছে। একজন তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে আছে। সেই মোটরসাইকেলের কাছে এসে সবার হাসি থেমে যায়। আড়াল দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি নুলা মিজান। বসে আছে টাকু মন্টু। টাকু মন্টু মাথা নামিয়ে বসে আছে।

ধুপধাপ করে হাঁটা মেয়েদের মুখে চাপা হাসি। মুন্নি একঝলক দেখে মাথা নামিয়ে নিঃশব্দে হাঁটতে থাকে। তার হাঁটার গতি শ্লথ হয়। বাকিরা পা টেনে টেনে হাঁটতে থাকে। খানিক দূরে গিয়ে মেয়েরা আবার খলখলিয়ে হেসে ওঠে। তাদের এই অকারণ হাসি মুন্নির কাছেও ভালো লাগে না। টাকু মন্টুর মাথা আরো নুইয়ে পড়েছে। তার কানে গরম সিসার মতো বিঁধছে মেয়েদের হাসি। যারা একদিন মাথা তুলে কথা বলার সাহস পায়নি তারাই আজ ব্যঙ্গ করে হাসছে। এই ভাবনাটা মুন্নিকেও ভাবিয়ে তুলল। লোকটা হয়তো শরমে মরে যাচ্ছে। আর ওরা কি না দাঁত কেলিয়ে হাসছে। মুন্নি সরেজমিনে দেখতে দৃষ্টি ফেরাতে দেখল মন্টুর মুখটি বিবর্ণ। মন্টু তাকালে দুজনের চোখাচোখি হয়। মন্টুর চোখজোড়া থেকে যেন বেদনা গলে গলে পড়ছে। মুন্নির মনটা বেদনায় ভার হয়ে গেল। সে ছুটে গিয়ে বান্ধবীদের ধমকে বলল, ‘তোরা অকারণে হাসছিস কেন?’

‘কোনো সমস্যা?’ একজন তির্যকভাবে প্রশ্ন করল।

মুন্নি কণ্ঠ তুলে বলল, ‘কারো বেদনা নিয়ে হাসাহাসি করা মানুষের কাজ নয়।’

মন্তব্য