kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

উ প ন্যা স

মৃত্যুর মুখ

শাহ্‌নাজ মুন্নী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮৪ মিনিটে



মৃত্যুর মুখ

অঙ্কন : মাসুম

‘আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝতে চাই আর? জানি না কি আহা,

সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেয়ালের মতো এসে জাগে ধূসর মৃত্যুর মুখ;’

—জীবনানন্দ দাশ

 

কলাবাগান ডলফিনের গলিতে চারতলার ওপরে সখিনা খাতুনের ছোট্ট ঘরটা সকালের ঝলমলে রোদে প্রতিদিন আলোকিত হয়ে ওঠে। ঘুম ভাঙার পর সেই কাঁচা আলোও সখিনা খাতুনের চোখে কুয়াশার মতো ঝাপসা লাগে। বিছানায় উঠে বসে কাঁপা কাঁপা গলায় গৃহকর্মী রেশমাকে ডাকেন,

‘ও রেশমা, জুলহাজরে চা দিছস? রেশমা?’

‘কী হইছে, দাদি?’

‘জুলহাজ কি অফিসে চইলা গেছে? ঠিকমতো নাস্তা খাইছিল তো? বিদেশি সাহেবদের সাথে এত বড় চাকরি করে ছেলেটা, কত কাজ ওর, ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া না করলে স্বাস্থ্য ঠিক থাকব? এত বুঝাই, তবু পোলাটা কথা শোনে না। ওর পছন্দের নাস্তা দিছিলি তো?’

সখিনা খাতুন নিজের মনেই বিড়বিড় করেন, হয়তো সারা দিন ধরেই করবেন।

‘কী সব পোলাপাইনের সাথে যে মিশে, বাসাটারে একটা বাজার বানায়া ফেলছে ছেলেটা। এক্কেবারে মাছের বাজার। সারাক্ষণ মানুষ খালি আসে আর যায়।’

‘আপনে শোন তো, দাদি, আমি কাকারে দেখতাছি।’

রেশমা আস্তে করে ধরে বিছানায় শুইয়ে দেয় নব্বই বছর বয়সী সখিনা খাতুনকে।

গতকাল বাদ আসর জুলহাজকেও শুইয়ে দেওয়া হয়েছে বনানী কবরস্থানে, এই অসুস্থ মাকে সেই সত্যটা কেমন করে বলবে রেশমা? আর বললেও কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আবার সেই আগের কথাই বলতে থাকেন সখিনা খাতুন। যদিও জুলহাজের খুনের সময় সখিনা খাতুন এই বাড়িতেই ছিলেন। তনয় ভাইও ছিল আর হয়তো আলী আসগর ভাইও ছিল। রেশমা চা দিয়ে এসেছিল ওদের। ওরা তিনজন তখন চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভারতের ভিসা পাওয়ার সমস্যা নিয়ে কথা বলছিল। আসগরের গোয়াতে একটা আর্ট রেসিডেন্সিতে যাওয়ার কথা ছিল। জুলহাজ আর তনয় যেত মুম্বাইয়ে, একটা সম্মেলনে যোগ দিতে। সেদিন ছিল তনয়ের জন্মদিন। আসগর সেটা মনে করে বলছিল,

‘কিরে তনয়, জন্মদিনের কেক খাওয়াবি না?’

‘খাওয়াব। আগে তুমি জন্মদিনের গিফট দেও।’

তনয় উত্তর দিয়েছিল। কিছুক্ষণ এটা-সেটা বলে খুনসুটি করছিল ওরা। আসগর আসার পর জুলহাজ কথায় কথায় বলেছিল,

‘দুপুরে বাসার গেটে তিনটা ছেলে এসেছিল, বুঝছ, খুব সন্দেহজনক, ওরা সিকিউরিটি গার্ডকে জিজ্ঞেস করেছিল আমি বাসায় আছি কি না। কী নাকি পার্সেল এসেছে আমার নামে। আমার হাতে ছাড়া কাউকে দেবে না। কিন্তু আমার নামে তো কোনো পার্সেল আসারই কথা না। আর যদি এসেই থাকে, তাহলে তো সেটা দারোয়ানের কাছে রেখে গেলেই হতো, তাই না? একটু ভয় লাগছে আমার। দিনকাল তো ভালো না।’

জুলহাজের কপালে চিন্তার ভাঁজ। আসগর পরিস্থিতির গুরুত্ব তখনো সেভাবে বুঝতে পারেনি। সে বলল,

‘ওভার থিংকিং করছেন না তো, ভাই? হয়তো ঘটনাটা তেমন কিছুই না।’

‘জানি না।’ জুলহাজকে কেমন দ্বিধাগ্রস্ত দেখায়। ‘ওই যে, পহেলা বৈশাখে প্রাইড প্যারেডটা করার পর থেকে মনে হচ্ছে মানুষের চোখে পড়ে গেছি, মৃত্যুর হুমকি তো আছেই, মাঝেমধ্যে মনে হয় কেউ বুঝি ফলো করছে। অচেনা কেউ...’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই প্রাইড প্যারেড বা গৌরব পদযাত্রার আয়োজন করা হয়, কানাডার টরন্টোতে, সুইডেনের স্টকহোমে, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে, জার্মানির কোলনসহ পৃথিবীর আরো বিভিন্ন দেশে।

এই প্যারেড নারী ও পুরুষ সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামী সংস্কৃতির উৎসব। ২০১৪ সালের পহেলা বৈশাখ ঢাকায় প্রথমবারের মতো এ রকম প্যারেড করেছিল জুলহাজ ও তার বন্ধুরা। চারুকলার সামনে থেকে শুরু হওয়া শোভাযাত্রায় সাতটি লাইনে রংধনুর সাত রঙের কাপড় পরা সমপ্রেমী মানুষরা হাতে কাগজের তৈরি রঙিন ফুল, পাখি আর বেলুন নিয়ে হেঁটে গিয়েছিল। ১৯৭৮ সালে প্রথম আমেরিকার সানফ্রান্সিসকোতে রংধনুকে সমকামীদের অধিকারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ২০১৫ সালেও এ রকম একটি শোভাযাত্রা করা হয়; কিন্তু ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল পুলিশি বাধায় ওই শোভাযাত্রা পণ্ড হয়ে যায়। পুলিশ তখন গ্রেপ্তারও করেছিল ওদের কয়েকজনকে। জুলহাজের এক প্রভাবশালী আত্মীয়র সহায়তায় ওরা মুক্তি পেয়েছিল। তখনো অবশ্য জুলহাজরা জানত না, ওই ঘটনার প্রভাব এগারো দিন পর ২৫ এপ্রিল কী ভয়ংকর নিষ্ঠুরতায় হানা দেবে তাদের জীবনে।

এর আগেও তো কত কাজ করেছে তারা; যেমন—দুই বছর আগে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো ‘রূপবান’ ম্যাগাজিন প্রকাশ করা। জুলহাজ তখন বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিল, ‘সমপ্রেমে বিশ্বাসী মানুষের ভালোবাসার অধিকারের কথা বলতে চায় তারা। বলতে চায়, এই সমাজেই আছি আমরা। আমরা আপনাদের পরিবারের সদস্য। সমপ্রেমে বিশ্বাসী মানুষদের জীবনধারা, ভালো লাগা আর দুঃখকষ্টের বিষয় তুলে ধরা হবে এই ম্যাগাজিনে।’

তার পরের বছর বেরোল ‘রূপ্্ঙক্তি’। ভালোবাসার স্বাধীনতাকে উৎসর্গ করা কবিতা সংকলন। ‘প্রেম বেশি ঘন হবার আগে চলো না, কফি বানিয়ে খেয়ে ফেলি।’

জুলহাজ লিখেছিল।

তনয় বলে, ‘আমি ইদানীং ব্যাগের মধ্যে একটা ভারী কাঠের টুকরা নিয়ে ঘুরি, কেউ অ্যাটাক করলে যাতে পাল্টা মার দিতে পারি।’

আসগর ঠাট্টা করে বলে, ‘ওই কাঠের টুকরা দিয়ে চাপাতির সঙ্গে পারবে না, অন্য কিছু ভাবো।’

‘আমি তো এখন অচেনা কারো সঙ্গে কথা বলি না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসি। সাবধান থাকার চেষ্টা করি। তবে নিজেকে নিয়ে না, তোমাদের নিয়ে বেশি ভয় হয় আমার।’ জুলহাজ বলে।

আর তখনই দরজায় কলিংবেল বাজে।

‘মনে হয়, ওই কুরিয়ার সার্ভিস! কে জানে, কী মতলব ওদের। শুধু শুধু ভয় দেখাচ্ছে কি না?’

জুলহাজ তার কাঁধছোঁয়া লম্বা রেশমি চুল নাড়িয়ে উঠে যায় দরজা খুলতে। তারপর কিভাবে যে কী ঘটে যায়! পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যে জুলহাজের সেই ভয়ংকর চিৎকার, তনয় ছুটে গিয়েছিল, পেছনে আসগর, দরজার মুখে ধারালো অস্ত্র হাতে কয়েকজন মানুষ, রক্ত, তীব্র আর্তনাদ, জুলহাজ আর তনয়ের মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে যাওয়া—

আসগর দেখল বাঁ দিকে একটা দরজা, ওটা জুলহাজের মায়ের ঘর, সখিনা খাতুন ঘুমিয়ে ছিলেন। হৈচৈ শুনে তিনিও বিছানায় উঠে বসেছেন। আসগর দ্রুত ওই ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

‘কী হইছে? কী হইছে?’ সখিনা খাতুন বলেন। ‘কারা আসল? জুলহাজের বন্ধুরা? এত চিৎকার কিসের?’

আসগর কোনো উত্তর দেয় না। সে প্রচণ্ড আতঙ্কে যেন বোবা হয়ে গিয়েছিল। তার কি কাউকে ফোন করা উচিত? তার কি পুলিশকে কিছু জানানো দরকার? আসগরের মাথা একেবারে কাজ করছিল না।

বাইরের সেই তীব্র চিৎকার কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যায়। ধুপধাপ করে কয়েকটি পায়ের শব্দ দ্রুত হারিয়ে যায়। তারপর নেমে আসে ঘোর স্তব্ধতা। দরজায় কেউ টোকা দেয়। আসগরের বুক ধুকধুক করে, যেন হৃৎপিণ্ড পাঁজর ভেঙে বেরিয়ে যাবে। ওরা তাহলে যায়নি, কিংবা আবার ফিরে এসেছে? ওরা কি এবার আসগরকেও খুন করবে? কারণ ওদের চোখে তো আসগরও অপরাধী, তার বাইরের চেহারা পুরুষের হলেও সে তো পুরুষও নয়, নারীও নয়। তার আচরণ মেয়েলি অথচ দেহটি পুরুষালি। মায়ের শাড়ি-গয়না পরতে তার ভালো লাগে। বোনের কাজল দিয়ে সে চোখ সাজায়, ঠোঁটে গাঢ় করে লিপস্টিক দেয়। এই দ্বৈত সত্তার কোনো স্থান কি এই পৃথিবীতে, এই সমাজে আছে? তার শিক্ষিত   মা-বাবা যেমন বহুদিন কথা বলে না তার সঙ্গে,     ভাই-বোনরা তাকায় ঘৃণার দৃষ্টিতে। পড়শিরা বিদ্রুপ করে। বন্ধুরা এড়িয়ে চলে।

‘দাদি, দাদি, দরজা খোলেন, আমি রেশমা।’

বাইরে থেকে ওই কথা শুনে দরজা খোলে আসগর, তারপর ওই রক্তস্রোতের ওপর দিয়ে, দুই বন্ধুর মগজ বেরিয়ে পড়া মৃতদেহ পেছনে ফেলে সে আচ্ছন্নের মতো, ঘোরগ্রস্ত প্রাণীর মতো হাঁটতে থাকে। হাঁটতে থাকে।

হায়, জুলহাজ, তুমি কি জানতে না, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় সমকামিতাকে প্রকৃতির বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। এই ধারা অনুযায়ী, ‘যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সঙ্গে প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করে, তবে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যেকোনো মেয়াদের, যা ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে, তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে।’

তার পরও তুমি কোন সাহসে ভালোবাসার স্বাধীনতা চেয়েছ? কেন বলেছ, ভালোবাসা কবির ভাবনার মতো মুক্ত বিহঙ্গ হোক, যেন সে বিচরণ করতে পারে আপন খেয়ালে? কেন ভেবেছ, কে কাকে ভালোবাসবে সেই সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতা তার নিজের?

এত বিরুদ্ধ পরিবেশে, এত ঘৃণার সমাজে, সমকামীদের সমপ্রেমী বলার আহ্বান জানিয়ে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে রূপবান ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিলে তুমি জুলহাজ মান্নান, সেই রূপবানের দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত অভিজিৎ রায়ের সাক্ষাৎকারের কথা মনে আছে? সেই অভিজিৎ রায়, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি যাঁকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে মারল ওরা। অভিজিতের লেখা বইয়ের নাম : ‘সমকামিতা : একটি বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’, ২০১০ সালে যা প্রকাশ করেছিল শুদ্ধস্বর প্রকাশনী।

রূপবানের পক্ষ থেকে অভিজিৎ রায়কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘সমকামী অধিকার সমর্থন করলে সমকামী প্রবণতাকে উৎসাহিত করা হবে বলে অনেকে ধারণা করেন, এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?’

তাঁর উত্তর ছিল : ‘এটা একেবারেই ভুল ধারণা। আমরা সমকামীদের মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার পাওয়ার কথা বলছি। সমকামিতা, বিষমকামিতা, উভকামিতা—কোনো কিছুতেই উৎসাহিত ও নিরুৎসাহিত করার কথা নয়। আর এখানে উৎসাহিত করার কিছু নেই। বিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষের যৌন প্রবৃত্তি জৈবিকভাবে অঙ্কুরিত; আর সেটা তৈরি হয় অনেক ছোটবেলা থেকেই। যে ছেলেটি বা মেয়েটির বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ আছে, তাকে কেউ চাইলেই সমকামী বানাতে পারে না। সেটার দরকারও নেই। এই সুন্দর পৃথিবীতে যে যার মতো অধিকার নিয়ে বাঁচবে, সেটাই প্রত্যাশা। সমকামীরা দুনিয়াসুদ্ধ সবাইকে তাদের মতো হতে বলেনি, তারা কেবল নিজের সঙ্গীকে ভালোবাসার এবং একসাথে থাকার অধিকার চায়।’

ঘৃণাবাদীরা সমস্বরে ছি ছি করে বলেছে, ‘মানুষের রুচিবোধ কতটা নিচে নেমে গেলে এই দেশে রূপবানের মতো পত্রিকা প্রকাশ পায়? মানুষ কতটা নির্লজ্জ হলে এই ধরনের দাবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে? এমন একটা ধারণা সবার সামনে বলার আগে তাদের বিবেক বাধা দেয়নি? এমন অরুচিকর ও বিকৃত যৌনাচরণ কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।’

আবার মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকে বলেছে, ‘সমকামিতা সমর্থন বা বিরোধিতার বিষয় নয়, এটা শেষ বিচারে মানবাধিকারেরই প্রশ্ন। মনে রাখা দরকার যে সমাজে নানা পরিচয়ের, প্রবণতার মানুষ রয়েছে। আছে সমযৌনপ্রবণতাসম্পন্ন মানুষ। এই ভিন্ন যৌনপরিচয় নিয়ে বেড়ে ওঠা মানুষদের যন্ত্রণার কোনো শেষ নেই। ভিন্ন যৌন অনুভূতি একান্তভাবে নিজের মধ্যে জন্ম নেয়। এই বোধ যাদের মধ্যে জন্ম নেয়, তারা সমাজে ভীষণ একা। তারা কাউকে এটা বলতে পারে না। অভিভাবকদের বললেও লাভ হয় না। তাঁরা তাকে ছেলে কিংবা মেয়ে বানানোর চেষ্টা করেন। জোরজবরদস্তি করে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পর হয়তো এটা প্রকাশ পেয়ে যায়। জীবনে নেমে আসে অন্ধকার।

আমাদের মনে সমাজ-সংসারের একটা নির্ধারিত ছক আঁকা আছে। একেই আমরা প্রাকৃতিক ও ধর্মীয় বিধান হিসেবে মেনে নিয়েছি। এর বাইরে জগৎ হতে পারে, এর বাইরে কিছু হওয়া সম্ভব—এটা ভাবতে প্রথাবদ্ধ সমাজ নারাজ। এই বিশ্বাস ভাঙতে গেলেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

অথচ বহুজনকে নিয়েই আমাদের সমাজ। সমাজের প্রত্যেকে যেন নিজের মতো বাঁচতে পারে, নিজের পছন্দ অনুযায়ী চলতে পারে, সেটাই আজকের যুগের মানবাধিকারের মূলকথা। বাইরের ঠিক সব সময় ঠিক নয়। ভেতরের বা সত্তার বিকাশই আসল কথা। আমাদের সমাজ-নির্ধারিত আচরণের বাইরে কেউ যদি ভিন্ন আচরণ করে, তাহলে কি তাকে আমরা মেরে ফেলব? ছুড়ে ফেলব? ঘৃণা করব?’ (চিররঞ্জন সরকার, ২২ মে ২০১৭, চ্যানেল আই অনলাইন)

আমেরিকান দূতাবাসে কাজ করত জুলহাজ। তার মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট শোকবার্তায় লিখেছেন,...‘নিঃস্বার্থ, সবাইকে ভালোবাসেন, সবাইকে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে থাকেন— জুলহাজ মান্নানকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে তার বন্ধুরা এই শব্দগুলোই ব্যবহার করে থাকে।

জুলহাজ নিঃস্বার্থভাবে জীবনযাপন এবং সমাজকে আরো বৈচিত্র্যময় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার জন্য নিরলসভাবে কাজ করতেন। নিজের চেয়ে তিনি সব সময় অন্যকে এগিয়ে রাখতেন, সেটা কর্মক্ষেত্রেই হোক আর বন্ধুদের সঙ্গেই হোক অথবা কোনো অচেনা কেউ, এমনকি নিজের বাড়ির একান্তে থাকা অবস্থায় হোক।...

জুলহাজের হৃদয় ছিল ভালোবাসায় পূর্ণ। সবার প্রতি তাঁর ব্যবহার ছিল সর্বোচ্চ সম্মান ও ভালোবাসায় ভরা এবং যেকোনো কাজই তিনি করতেন অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে। তিনি যে শুধু বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের ভালোবাসতেন, তা-ই নয়; তিনি শিল্পকর্ম, ফুল এবং গাছপালা ভালোবাসতেন।...

জুলহাজ একটি পরিবার। তিনি তাঁর মায়ের প্রতি নিবেদিত ছিলেন, তাঁর ভাই-বোনদের ভালো ও বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন এবং তাঁদের সন্তানদের ভালোবাসতেন।’

(তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকার দূতাবাসে প্রায় এক দশক কর্মরত ছিলেন। সন্ত্রাসীদের হাতে তিনি নিহত হন। হত্যাকারীরা ঘৃণার আদর্শ দ্বারা পথভ্রষ্ট ছিল, যে আদর্শ বাংলাদেশে অপরিচিত।)

—আসগর সেদিন সেই অভিশপ্ত প্রহরে রাস্তায় বেরিয়ে দিশাহারার মতো একটা অ্যাম্বুল্যান্স খুঁজেছিল, নিদেনপক্ষে একটা গাড়ি, যদি ওদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। রাস্তায় মানুষ গিজগিজ করছে; কিন্তু কাউকে কিছু বলতে পারে না। সে ফিরে আসে মৃত্যুবাড়িতে। ততক্ষণে পুলিশ এসেছে। কিন্তু আসগর পুলিশকে আর জানায় না যে হামলার সময় সে এই বাড়িতেই ছিল। পুলিশ তার নিয়মমাফিক কাজ করে, মৃতদেহ ময়নাতদন্তের পর ফিরিয়ে দেয় পরিবারের কাছে।

পরদিন দুপুরে ‘আনসার আল ইসলাম ৫’ নামের খোলা একটি টুইটার পেজে এবং আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখার নামে খোলা ওয়েবসাইটে জুলহাজ ও তনয় হত্যার দায় স্বীকার করা হয়।

আলী আসগর বাড়ি ফিরে যায় এবং কাউকে কিছু না বলে তার পাসপোর্ট আর ল্যাপটপটা হাতে তুলে নেয়।

‘ওই মুহূর্তে কী করছিলাম না করছিলাম, কিচ্ছু মনে নেই আমার, কেউই আমাকে মারার জন্য পিছু নেয়নি ঠিকই; কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, আমি নিরাপদ না, আমি ভয় পাচ্ছিলাম, প্রচণ্ড ভয়, একটা আতঙ্ক সারাক্ষণ আমাকে তাড়া করে ফিরছিল।’

শেষ পর্যন্ত আমেরিকান দূতাবাসের সহায়তায় আলী আসগর তিন মাসের মধ্যে পালিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের মেইন শহরে, ইউনিভার্সিটি অব মেইনে একটি ফেলোশিপ নিয়ে। সেখানে সে আর্ট নিয়ে কাজ করে।

মেইন নিউ ইয়র্ক বা শিকাগোর মতো জায়গা নয়, এখানকার সাদা চামড়ার মানুষজন আসগরের কাছে বাংলাদেশের নাম শুনে অবাক হয়, ‘এটা কি সৌদি আরবে? না আফ্রিকায়?’ তারা জিজ্ঞেস করে।

আসগর তাদের কাছে নিজের ছোট্ট সবুজ দেশটির বর্ণনা দেয়। মেইনের মানুষরা কল্পনাও করতে পারে না, কিভাবে দুজন মানুষকে তাদের ভিন্ন আচরণ বা বিশ্বাসের জন্য কেউ কুপিয়ে হত্যা করতে পারে।

আসগর ওদের সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না, নিজের মতো করে কাজ করে যায়, ছবি আঁকে, ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে নিজের ভাবনাচিন্তা, দুঃখবোধ। শুধু হঠাৎ হঠাৎ কোনো একলা বিকেলে ওর কানে একটা তীব্র মরণচিৎকার ভেসে আসে। সেই চিৎকার মগজের প্রতিটি কোষ, শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরায় উচ্চ শব্দে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। আসগর অস্থির ইঁদুরের মতো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে। সে হাঁটতে থাকে। শুধুই হাঁটতে থাকে। এই অচিন শহরে কেউ তাকে থামায় না। কেউ একবার ভুল করেও ফিরে তাকায় না তার দিকে।

 

দুই

মানুষ কেন খুন হয়?

নাটোরের সুনীল গোমেজ, ঝিনাইদহের অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি আর পাবনার নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে।

ষোলো কোটি বাংলাদেশির মধ্যে তাঁরা এমন কোনো বিখ্যাত লোক নন যে তাঁদের মৃত্যুর খবর সংবাদপত্রে ছাপা হতে পারে। অঙ্কের হিসাবে এ দেশে তাঁরা সংখ্যায় কম, কেতাবি ভাষায় তিনজনই সংখ্যালঘু। ২০১৬ সালের জুন মাসে মৃত্যু এসে তিন জায়গার এই তিনজন সাধারণ মানুষকে একই লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যে লাইনের শুরুতেই রাখতে পারি নড়বড়ে বুড়ো সুনীল গোমেজকে, পেশায় তিনি মুদি দোকানদার। বনপাড়া মিশন পল্লীতে টিনশেড বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটা ছোট্ট নামমাত্র দোকান যাঁর, যেখানে জিনিসপত্র বলতে আছে কয়েক প্যাকেট সস্তা চিপস, বিস্কুট, ডিম, চকোলেট, চানাচুর, মশার কয়েল, চা পাতা...এসব কমদামি জিনিসের মধ্যেই আরেকটা তুচ্ছ সামগ্রীর মতো পঁয়ষট্টি বছর বয়সী সুনীল গোমেজ স্থবির উদাস হয়ে বসে থাকেন, তাঁকে দেখায় পঁচাত্তর বছর বয়সীর মতো। অল্প বয়সেই মুখের নিচের পাটির কয়েকটা দাঁত পড়ে গিয়েছিল, দাঁতগুলো আর বাঁধানো হয়নি। তারপর স্বপন যখন মারা গেল বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে, বিয়ে করার মাত্র দুই মাসের মাথায়, স্পট ডেড, তখন এক রাতেই সুনীল গোমেজের মাথার প্রায় সব চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। আর তিনি আরো বুড়িয়ে বাঁকা হয়ে গিয়েছিলেন। আহা স্বপন, পনেরো বছর আগের ঘটনা। স্বপন তাঁর বড় ছেলে, স্বপন গোমেজ, ঢাকায় চাকরি করতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরে এলো।

তার পর থেকে আর কোনো কাজেই উৎসাহ পান না সুনীল গোমেজ। মাঝেমধ্যে বনপাড়া চার্চে যান, চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের কাছে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনা করেন, গির্জার উঠানে লাগানো ফুলগাছগুলোতে পানি দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন আর বাকি সময় নিজের দোকানে বসে অর্ধমৃত মানুষের মতো ঝিমান। এই ঝিমুনির সময়টাতে স্বপন আসে। পাশে বসে বলে, ‘বাবা, তোমাদের ছাড়া একা একা ভালো লাগে না। কত দিন আর দোকানদারি করবা? এইগুলা ছাইড়া আমার কাছে চইলা আসো।’

‘তুই থাইকা যা, তোর ঢাকায় যাওয়ার দরকার নাই।’ সুনীল গোমেজ বিড়বিড় করে বলে। স্বপন তখন হাসে, হাসলে ওর ডান দিকের গ্যাঁজা দাঁতখানা দেখা যায়। স্বপন বলে, ‘থাকনের অনুমতি নাই, বাবা।’

সুনীল গোমেজ তখন স্বপনের হাত আঁকড়ে ধরতে চান; কিন্তু ছেলেটার হাত যেন বালুতে তৈরি, তার মুঠো থেকে ঝুরঝুর করে আলগা হয়ে ঝরে পড়ে।

‘স্বপন, তুই থাক, যাইস না, বাপ আমার...।’ ঝিমুনির মধ্যেই সুনীল গোমেজ আকুতি করেন।

দোকানের সামনের সরু রাস্তায় লোক চলাচল করে, ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে সাইকেল, ভ্যানগাড়ি চলে, সুনীল গোমেজ শোনেন কিংবা শোনেন না। দেখেন কিংবা দেখেন না। ক্রেতা বড় একটা আসেটাসে না তাঁর দোকানে, মাঝে মাঝে পাড়ার দরিদ্র শিশুরা নাকের সর্দি টানতে টানতে আসে, দুই টাকা, পাঁচ টাকা দিয়ে চকোলেট বা বিস্কুট বা নারকেলের নাড়ু কিনে নিয়ে যায়, দিনশেষে এক শ টাকাও বেচাকেনা হয় না অনেক দিন।

স্বপনের মা মাঝেমধ্যে গজগজ করেন, ‘কী লাভ এই দোকান দিয়ে? একটা পয়সাও তো ঘরে আসে না!’

সুনীল গোমেজের বড় মেয়ে, স্বপনের বোন জোছনা, যার বিয়ে হয়েছে বাবার বাড়ির কাছেই বড়পাড়ায়, যে প্রায়ই এই বাড়িতে আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকে, সেই জোছনা মাকে থামিয়ে বলেছিল, ‘থাক না মা, দোকানের লাভ দিয়া কী করবা? দুই ঘরের ভাড়া পাও, তাই দিয়া তোমার চলে না? বাবারে বাবার মতো থাকতে দেও না!’

সুনীল গোমেজ তাঁর নিজের মতোই থাকতেন, নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া মিশন পল্লীতে নীরবে নিজের দোকানের কোনাটিতে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পত্রিকা পড়তেন। তাঁর গালের খোঁচা খোঁচা দাড়ি বড় হয়ে উঠলে রবার্টের সেলুনে গিয়ে শেভ করে আসতেন। আবার কিছুদিন পর সেই দাড়ি বাড়ত। সুনীল গোমেজ দোকানে জবুথবু হয়ে বসে ঝিমাতেন, যেন দোকানটাই তাঁর একান্ত আশ্রয়, ঘর, ঠিকানা। আর আমরা দেখি, শেষ পর্যন্ত সেই দোকানেই খুন হন সুনীল। কারা কেন তাঁকে খুন করে চলে গেছে, কেউ জানে না। শুধু জানা যায়, নীরবে-নিঃশব্দে নিজের দোকানে খুন হয়ে গেছেন সুনীল গোমেজ। করিম মিয়া সেদিন কাজ না পেয়ে শর্টকাটে তার ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছিল বনপাড়া মিশন পল্লীর ভেতর দিয়ে, দোকানের সামনে সুনীল গোমেজের অসহায় রক্তাক্ত দেহ তারই প্রথম চোখে পড়ে।

পরে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার আবাসিক চিকিৎসক আবুল কালাম আজাদ সুনীল গোমেজের মৃত্যুর কারণ ‘অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ’ বলে শনাক্ত করেছিলেন। মৃতদেহের ঘাড়ের পেছনে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। বোঝাই যায়, কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে, ঘাড়ের পেছনের রগ কেটে গিয়ে ঘাড়ের পেছনের অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল লোকটার। কার সঙ্গে তাঁর শত্রুতা, কে তাঁকে এইভাবে মেরে রেখে চলে গেল, কেউ বলতে পারে না।

খ্রিস্টভক্ত সুনীলের সঙ্গে সনাতন ধর্মের অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলির পরিচয় ছিল কি না জানা নেই, ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে তা না থাকারই কথা; কিন্তু তাঁদের মৃত্যুদিনের ব্যবধান খুব বেশি নয়। বয়সে দুজন প্রায় কাছাকাছিই হবেন। গাঙ্গুলি মশাই পুরোহিত ছিলেন, সংস্কৃতশাস্ত্রে হয়তো তাঁর কিঞ্চিৎ পারদর্শিতা ছিল, লোকে বলে—এককালে হিন্দুসমাজে পুরোহিতদের যথেষ্ট সম্ভ্রম ছিল, যজমানদের বাড়ি থেকে দক্ষিণাও ভালো পাওয়া যেত। কিন্তু দিনে দিনে পুরুত ঠাকুরের সেই সম্ভ্রম ও দক্ষিণা দুই-ই কমেছে। দরিদ্র পুরোহিত গাঙ্গুলিবাবুরও আয়-রোজগার হতো সামান্যই, মানুষের বাড়ি বাড়ি পূজা-অর্চনা করতেন, নিরীহ সহজ-সরল বলে সবার কাছে প্রিয় মানুষ ছিলেন। সেই কথা পরে তাঁর মেয়ে রিনা গাঙ্গুলি এবং স্থানীয় হাই স্কুল শিক্ষক নীলরতন রায়ের মুখে শুনেছি। তাঁর স্ত্রী শ্রীমতী শেফালি গাঙ্গুলি, ফরসা, গোলগাল মুখখানা, মাথার কাঁচাপাকা চুলের ভেতরে যাঁর লেপ্টে ছিল বাসি সিঁদুর, ঘরের দাওয়ায় বসে গলা ছেড়ে কাঁদছিলেন খুব। কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলছিলেন—সংসারের কথা, মৃত মানুষটির কথা। ছেলে-মেয়েরা শোকাতুর মাকে ঘিরে বসে ছিল।

‘সেই কবে এক কাপড়ে এসেছিলাম গো তার সংসারে, ভেজা কাপড় পরেই থেকেছি, আবার গায়েই সেটা শুকিয়ে গেছে। ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে পরেছি, বছরজুড়ে নতুন কাপড় পাইনি। এভাবেই পঞ্চাশ বছর পার করেছি, তবু অসুখী তো ছিলাম না। সংসারজীবনে কোনো দিন দুকথা হয়নি। ইদানীং হাতে শাঁখা পরতাম না; কিন্তু সে বলত, কেন শাঁখা পরো না। হিন্দু নারীর চিহ্ন এটা। তার কী অপরাধ বলেন, সে তো মানুষের বাড়ি ফুল দিয়ে পূজা করে খেত, আমাদের খাওয়াত।

হায় ভগবান, তুমি আমার সিঁদুর কেড়ে নিলে, সাদা কাপড় পরিয়ে দিলে। ওদের কি বিচার হবে না, ভগবান? সকালে সে সাইকেলে বেরিয়েছিল, আহা! আর ফিরল না, কে জানত এই যাওয়া তার শেষ যাওয়া, কিছুই তো বলে গেল না, যদি জানতাম এভাবে খুন করবে, এইভাবে মেরে ফেলবে, তাকে কি যেতে দিতাম?’

প্রতিদিনকার মতোই পূজা সেরে, একমুঠো চিঁড়া ভিজিয়ে কলা দিয়ে মেখে প্রাতরাশ খেয়ে, জীর্ণ সাইকেলটার হ্যান্ডেলে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ ঝুলিয়ে করাতিপাড়ার বাড়ি থেকে অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি বেরিয়েছিলেন। সত্যিই, কেউ জানত না এটাই তাঁর শেষ যাত্রা হবে। মহিষডাঙায় মাটির রাস্তা ধরে তাঁর সাইকেল চলছিল, রাস্তার এক পাশে কাঁটাভর্তি ডালপালা ছড়ানো কম বয়সী খেজুরগাছের সারি, আর অন্য পাশে নেমে গেছে সবুজ ধানক্ষেত, দূর থেকে ভয়ংকর যান্ত্রিক শব্দ তুলে একটা মোটরসাইকেল আসছিল, পুরুত মশাইয়ের কানে শব্দটা লাগলে তিনি সাইকেলটা রাস্তার বাঁ পাশে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা তিনি জানেন, এই মোটরসাইকেলের চালকরা নিতান্তই বেপরোয়া হয়ে থাকে, ডানে-বাঁয়ে কিছুই দেখে না, সব চূর্ণ করে চলে যায়। অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি প্রথমে বুঝতেই পারেন না, মোটরসাইকেলটা কেন হঠাৎ তাঁর কাছে এসে দুম করে থেমে গেল? যে তিনটা ছেলে মোটরসাইকেলে বসে আছে, তাদের কাউকে তিনি চেনেন কি না ভাবার চেষ্টা করেন। নাহ্্, চেনা মনে হচ্ছে না, নাকি চেনেন; কিন্তু মনে করতে পারছেন না? বয়স তো হয়েছে! হয়তো ওদের দেখেছেন ছোটবেলায়, এখন বড় হয়ে গেছে বলে চিনতে পারছেন না।

‘বাবারা, তোরা কিডা?’

স্বভাবতই সেই প্রশ্নের উত্তর আসেনি। যখন মোটরসাইকেল আরোহীদের একজন হাতে থাকা লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেয়, তখনো বৃদ্ধ পুরোহিত কোনো প্রতিরোধ করেননি। পরে যখন ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়, আর গ্রামবাসী দেখে একটা মোটরসাইকেল আর কাপড়ে মুখ ঢাকা তার তিন আরোহী যেমন এসেছিল তেমন করে হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়ে যায়, তখন মাটির ওপর পুরুত মশাইয়ের মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মৃতদেহকে ঘিরে নানা রকম গল্প তৈরি হয়। কেউ বলে, এ নিশ্চয়ই আইএস জঙ্গিদের কাজ। আবার কেউ বলে, দেশে আইএসের অস্তিত্বই তো নেই। হোম গ্রোন জঙ্গিরাই এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। এই খুনিরা বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সন্ত্রাসী, আর কিছু নয়।

এই সব গল্প হয়তো নিত্যরঞ্জন পাণ্ডের কানেও পৌঁছেছিল অথবা পৌঁছেনি। তিনি বেরিয়েছিলেন প্রাতঃভ্রমণে, সৎসঙ্গ আশ্রমে সকালের সংক্ষিপ্ত প্রার্থনা শেষে, প্রতিদিনের মতোই, ডায়াবেটিসের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত, ভোর পাঁচটার দিকে, লম্বা লম্বা পা ফেলে দ্রুতগতিতে হাঁটতে হাঁটতে হয়তো গত রাতে দেখা স্বপ্নের কথাটা মাথায় ঘুরছিল তাঁর, কী অদ্ভুত স্বপ্ন, একটা ঝকঝকে সুন্দর সোনালি মন্দির, মন্দিরের স্বর্ণকান্তি চূড়া আর সারি সারি সিঁড়ি থেকে সোনালি সূর্যের উজ্জ্বল আলো ঠিকরে পড়ছে,   সিঁড়ির উচ্চতম ধাপে দাঁড়িয়ে আছেন পরম প্রেমময় আচার্য শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র, দিব্যকান্তি, উন্মুক্ত বক্ষস্থল, ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাসি, তার কয়েক ধাপ পরেই দাঁড়িয়ে আছেন শ্বশুর মশাই স্বর্গীয় ডাক্তার জ্যোতিন্দ্রনাথ বালা, যাঁর হাত ধরে সেই কবে, প্রায় চল্লিশ বছর হবে, জন্মভূমি গোপালগঞ্জের আরুয়া কংসুর গ্রাম থেকে এসে হেমায়েতপুরের শ্রীশ্রী ঠাকুর অনকূল চন্দ্রের সৎসঙ্গ আশ্রমে যোগ দিয়েছিলেন নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে। দুই হাত জোড় করে স্বর্গত শ্বশুর মশাইকে প্রণাম জানান নিত্যবাবু। মন্দিরের সিঁড়িতে পরের ধাপে দাঁড়ানো বাবা স্বর্গীয় রসিকলাল পাণ্ডে। তাঁকেও দূর থেকে প্রণাম। নিত্যরঞ্জন যেন মন্দিরের সামনে দিয়ে কোথায়ও যাচ্ছেন, নাকি ওই মন্দিরের দিকেই যাচ্ছেন, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী দুলু রানী, ছেলে নন্দদুলাল, মেয়ে নন্দিতা আর সন্ধিপাও আছে। পেছন ফিরে বড়দা সত্যরঞ্জনকেও দেখতে পেলেন নিত্যরঞ্জন। যেন দল বেঁধে তাঁরা দূরের ওই সোনালি মন্দিরের দিকেই চলেছেন। মন্দির থেকে শত কণ্ঠে প্রার্থনার গীতল সুর ভেসে আসছে। নিত্যরঞ্জন মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রেখেছেন, তারপর দ্বিতীয় ধাপে, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ধাপও পেরিয়ে এসেছেন। এমন সময় পেছনে দুলুর ডাক, ‘ওগো, তুমি কোথায় চললে, আমরা যে তোমার সাথে আসতে পারছি না।’

নন্দ, নন্দিতা, সন্ধিপাও চিৎকার করে ডাকছে তাঁকে, ‘বাবা, থামো, আমাদের নিয়ে যাও; বাবা, আমাদের ছেড়ে যেয়ো না।’

কিন্তু নিত্যরঞ্জন কিছুতেই ঘাড় ফিরিয়ে পেছনে তাকাতে পারছেন না। যেন ঘাড়ের ওপর কয়েক মণ বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে কেউ। সিঁড়ির সর্বোচ্চ ধাপ থেকে ঠাকুর তাঁর জ্যোতির্ময় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তিনি বলছেন, ‘প্রেমকে প্রার্থনা করো, হিংসা পরিহার করো, জগৎ তোমার দিকে আকৃষ্ট হবে।’ শ্বশুর আর বাবা নেমে এসে পরম আদরে তাঁকে হাত ধরে সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। নিত্যরঞ্জনের কানে আসছে স্ত্রী-পুত্র-কন্যার আকুল ক্রন্দন, বড়দার ব্যাকুল ডাক; কিন্তু না, কিছুতেই ঘাড় ফেরাতে পারছেন না তিনি। যেন ঘাড়টা শক্ত হয়ে বরফের মতো জমে গেছে। যেন ঘাড় নয়, কাঁধের ওপর এক অনমনীয় লৌহখণ্ড বহন করছেন।

হাঁটতে হাঁটতে পাবনা মানসিক হাসপাতালের প্রধান ফটকে চলে এসেছেন নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে, এবার ঘুরে আবার আশ্রমের দিকে ফিরবেন। সকালের আলো ফুটতে শুরু করেছে, এসেছে যে আশ্চর্য সকাল, কে তার কতটুকু বোঝে, কে জানে আকাশ ভেঙে এখানেও নির্দয় মৃত্যু নেমে আসে, চোখ অন্ধকার হয়ে যায়, অজ্ঞাতনামা দুর্বৃত্তদের হাতে ঝলসে ওঠে ধারালো রামদা, চাপাতি। নিত্যরঞ্জন সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছেন ঠাকুরের জ্যোতির্ময় মূর্তির দিকে, ঘাড়ের তীব্র তীক্ষ যন্ত্রণা ভোঁতা হয়ে এসেছে। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার কণ্ঠ দূর থেকে আরো দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে। অনিত্য সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে লুটিয়ে পড়ছেন পথের ধুলায়।

পরে আমরা পাবনার সহকারী পুলিশ সুপারের কাছ থেকে জানতে পারি, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত সেবায়েতের ঘাড়ের ডান পাশের অর্ধেক অংশ কেটে গেছে। হত্যাকাণ্ডের ধরন দেখে বোঝা যায়, তাঁকে পেছন থেকে ঘাড়ে কোপ দেওয়া হয়েছে। ঘাড়ে ও মাথায় এমনভাবে কোপানো হয়েছে যে দেখে মনে হয়, খুনিরা তাঁর মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চেয়েছিল।

দিন-তারিখগুলো খুব কাছাকাছি—৫ জুন সুনীল গোমেজ, ৭ জুন অনন্ত গোপাল গাঙ্গুলি আর ১০ জুন ২০১৬ খুন হলেন নিত্যরঞ্জন পাণ্ডে। এ রকম প্রতিটি খুনের পরই হয়তো মহাকালে নিঃশব্দে উচ্চারিত হয় কয়েকটি কঠিন, জটিল ও পুরনো প্রশ্ন। মানুষ মানুষকে খুন করে কেন? কেন মানুষ খুনি হয়? মানুষ কেন খুন হয়? কেন মানুষের রক্তেই রঞ্জিত হয় মানুষের হাত? পৃথিবী কি ক্রমশ এসব নরঘাতক উন্মাদের বিচরণভূমিতেই পরিণত হবে?

 

তিন

১৩ জুন ২০১৬।

অরল্যান্ডোর জনপ্রিয় নাইট ক্লাব ‘পালস’-এ ছুটির দিন শনি-রবিবারে এত ভিড় হয় যে তা সামাল দেওয়া ক্লাব কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। প্রায়ই ক্লাবটিতে যায় ত্রিশ বছর বয়সী এন্ডি। তার পার্টনার রিকার্ডোরও খুব ভালো লাগে ক্লাবটা। উদ্দাম নাচ, গান-বাজনার সঙ্গে বিরতিহীন পানাহার চলে। আরো অনেক প্রেমিক জুটি এসে জড়ো হয়। উইকএন্ডটা ভালোভাবেই আনন্দ-উল্লাসে কেটে যায়।

তখন ক্লাব বন্ধের সময় হয়ে এসেছে। ‘ল্যাটিন নাইটে’র হিস্পানিক হুল্লোড় শেষে সবাই যার যার  পানীয়র গ্লাসে শেষ চুমুক দিচ্ছে। এন্ডি এসেছে বাথরুমে, তলপেটের চাপ কমাতে। তাণ্ডবটা শুরু হলো ঠিক তখনই। এন্ডি ভাবল, গান-বাজনার অংশই হবে হয়তো। শেষ সময়ে জোশ উঠেছে বেশি। হয়তো বাজিই ফোটাচ্ছে কেউ। জিপারটা টেনে বাথরুম থেকে বেরোতে যাবে, তখনই হুড়মুড় করে বাথরুমের দরজায় লুটিয়ে পড়ল কয়েকজন। এন্ডি বস্ফািরিত চোখে দেখল, রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ। প্রথমেই রিকার্ডোর কথা মনে পড়ল এন্ডির। ও ঠিক আছে তো? কিন্তু এত বিশৃঙ্খলার মধ্যে রিকার্ডোর কাছে কিভাবে যাবে সে? এন্ডি একটু পিছিয়ে এসে বাথরুমে লুকিয়ে থাকে। ভয়, আতঙ্ক আর মৃত্যুর আশঙ্কার মধ্যে হঠাৎ মায়ের মুখটা মনে পড়ে এন্ডির। ছোটবেলায় ভয় পেলে মায়ের বুকে মুখ লুকালে যেমন সব ভয় কেটে যেত, এখনো তেমনি মায়ের নরম বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইচ্ছা করছে তার। মনে হচ্ছে, তার স্নেহের স্পর্শ পেলে সব বিপদ কেটে যেত। এন্ডি পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে, লেখে, ‘আই লাভ ইউ মম’—তোমায় ভালোবাসি মা।

রাত দুইটার দিকে কখনোই জেগে থাকেন না এন্ডির মা মিনা জাস্টিস। ডাক্তারের কড়া বারণ। রাত বারোটার দিকেই একগাদা ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়েন তিনি, এক ঘুমে ভোর হয়ে যায়। কিন্তু আজ হঠাৎ কেন যেন ঠিক দুইটায় তাঁর ঘুম ভেঙে গেল, কেমন একটা অজানা অস্বস্তি যেন তাঁকে চেপে ধরেছে। মিনা উঠে বাথরুমে গেলেন, তারপর আবার বিছানায়। বালিশের পাশে সাইলেন্ট করে রাখা মোবাইল ফোনের স্ক্রিন ঠিক এই সময় জ্বলে উঠল, অর্থাৎ কোনো মেসেজ এসেছে। এত রাতে কার মেসেজ? মিনা জাস্টিস কৌতূহলের সঙ্গে ফোনটা নিলেন, তারপর চোখে চশমা লাগিয়ে মেসেজটা পড়লেন। এন্ডি পাঠিয়েছে। মধ্যরাতে ত্রিশ বছর বয়সী ছেলের এমন ভালোবাসা প্রকাশের ধরন দেখে একটা মৃদু হাসি ফুটে উঠল মিনার মুখে। প্রায় দশ বছর হলো মায়ের সঙ্গে আর থাকে না এন্ডি। একটা বেসরকারি সংস্থায় অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাজ করে। টাকা-পয়সা নিশ্চয়ই ভালোই পায়। একটা বহুতল ভবনের অ্যাপার্টমেন্টে থাকে। মিনা শুনেছে, এন্ডির একজন পার্টনার আছে। কোনো মেয়ের প্রতি নয়, বরং একজন ছেলের প্রতি আকৃষ্ট এন্ডি। খবরটা শুনে প্রথমে ভালো লাগেনি মিনার। বুকের মধ্যে ধাক্কার মতো লেগেছে। ‘ঈশ্বর, আমার ছেলের কেন এমন মতিভ্রম হলো?’

কিন্তু পরে বহু কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়েছেন তিনি। যার যার জীবন তার তার, পছন্দও তার। ছেলের পাঠানো খুদে বার্তাটার ওপর আরেকবার চোখ বোলান মিনা। এর উত্তরে কিছু লিখবেন কি না ভাবেন। আর তখনই মোবাইলের স্ক্রিন সংকেত দেয়, আরেকটি মেসেজ এসেছে। এন্ডির মেসেজ। তাতে লেখা, ‘ক্লাবের মধ্যে গুলি চলছে।’

মুহূর্তে মাথাটা গুলিয়ে যায় মিনার। এর মানে কী? দ্রুত ছেলের নাম্বারে ফোন করেন তিনি। কিন্তু ওপাশ থেকে এন্ডির কোনো সাড়া মেলে না। মিনার চোখ থেকে ঘুম টুটে গেছে ততক্ষণে। বুক ধুকধুকানি শুরু হয়ে গেছে। এবার কাঁপা হাতে ছেলেকে বার্তা পাঠান তিনি। ‘আর ইউ ওকে?’—ঠিক আছ তো তুমি?

এক মিনিট পরে এসএমএস এলো এন্ডির।

‘বাথরুমে ফেঁসে আছি।’

‘পালস্। ডাউনটাউন, পুলিশকে খবর দাও।’

এবার আর একটুও দেরি করলেন না মিনা। ৯১১ নম্বরে ফোন করলেন।

পাশাপাশি ছেলেকে এসএমএস পাঠালেন।

‘তুমি এখনো ওখানেই আটকে আছ?’

‘আমি পুলিশকে ফোন করেছি।’

‘উত্তর দাও। আমাকে ফোন করো।’

কোনো উত্তর আসে না। মিনা এখন হতবিহ্বল। এই নিঃশব্দ করুণ মধ্যরাতে গলা ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করছে তাঁর। এরই মধ্যে আবার ছেলের খুদে বার্তা।

‘লোকটা আসছে। আমি এবার মরব।’

লেখাটা পড়লেন মিনা। মনে হলো, বুকের মধ্যে ব্যাপক একটা ধস নামছে। শরীর কাঁপছে থরথর করে। মিনা কোনো রকমে শোয়ার পোশাকটা বদলে উন্মাদিনীর মতো ছুটে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।

এ ঘটনায় যে পঞ্চাশজন নিহত হয়, তাদের নামের তালিকায় নবম নামটি ছিল এন্ডির। এতে আহতও হয় সমসংখ্যক মানুষ। সবখানে শুধু রক্তাক্ত দেহ। মধ্যরাতে ক্লাবে গুলি শুরু হওয়ার প্রায় তিন ঘণ্টা পর সেখানে ঢুকে হামলাকারীকে হত্যা করে পুলিশ। পরে তার পরিচয় জানা যায়। উনত্রিশ বছর বয়সী হামলাকারী ওমর সিদ্দিকী মতিন মার্কিন নাগরিক।   মা-বাবা আফগানিস্তানের। পেশায় বেসরকারি সিকিউরিটি গার্ড মতিন কেমন ছিল? কে তাকে বেশি চেনে? সাংবাদিকদের অনুসন্ধানের উত্তর দিতে এগিয়ে আসে সেতারা ইউসুফি, ওমরের সাবেক স্ত্রী, ২০০৯ সালের মার্চে তাদের বিয়ে হয়েছিল, অনলাইনে আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে মাই স্পেসের ওয়েবসাইটে পরিচিত হওয়ার পর। মাত্র কয়েক মাস টিকেছিল সেই সংসার।

সেতারা বলছিল, ‘দুই বেডের একটা ফ্ল্যাট ছিল আমাদের ফোর্ট পিয়ার্সে। প্রথম দিকে খুব স্বাভাবিকই ছিল সব কিছু, পরে ধীরে ধীরে তার চেহারা পাল্টাতে থাকে। মনে হতো, যেন দুইটা মানুষ বাস করে ওমরের একটা শরীরে। এই হাসিখুশি, আনন্দ-উল্লাসে ভরপুর, আবার এই মুহূর্তের মধ্যেই রাগ। একটা কথা বললে ঘুষি বাগিয়ে তেড়ে আসত মারতে। সামান্য কোনো ছুতায়, লন্ড্রি কেন হলো না, বেসিনে কেন ময়লা? এই সব ছুতা ধরে ভয়ানক হিংস্র হয়ে উঠত ও। উফ্্! সেই সময় ওকে মনে হতো অস্থির আর রগচটা একটা মানুষ, কখনো মনে হতো বুঝি মানসিক ভারসাম্যই হারিয়ে ফেলেছে সে।’ এমনও হয়েছে কখনো কখনো যে সেতারার ঘুম ভেঙেছে মতিনের নির্যাতনে। মতিনকে তখন একটা ‘ভায়োলেন্ট মনস্টার—হিংস্র দানব’ মনে হয়েছে তার। না, তেমন ধার্মিক ছিল না মতিন, তবে খুব স্বাস্থ্যসচেতন ছিল। জিম করতে যেত নিয়মিত।

ওমর মতিন কি সমকামী ছিল? সেতারার সন্দেহ, ভেতরে ভেতরে হয়তো সমকামীপ্রবণতা ছিল। তবে উগ্রপন্থী ইসলামী আদর্শের দিকে ঝোঁক ছিল কি না তা স্পষ্ট নয়।

মতিনের বাবা বরং সেতারার উল্টোটা বলেছেন সবাইকে। বলেছেন, সমকামীবিরোধী মনোভাব ছিল মতিনের। একবার মায়ামিতে দুই পুরুষকে চুমু খেতে দেখে নাকি দারুণ রেগে গিয়েছিল সে।

কিন্তু এরই মধ্যে আইএস যে দাবি করে বসেছে, তাদেরই এক যোদ্ধা অরল্যান্ডোর নাইট ক্লাব পালসে হামলা চালিয়েছে। ওমর নিজেও নাকি বার কয়েক  ৯১১-তে ফোন করে আইএসের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেছিল। যদিও মার্কিন গোয়েন্দারা ওমরের সঙ্গে আইএসের সম্পর্ক নিয়ে সন্দিহান ছিল; বরং তাকে হোম গ্রোন জঙ্গি সন্ত্রাসী বলতেই পছন্দ করেছিল তারা।

ওমর মতিনের দ্বিতীয় স্ত্রী নূর সালমানকে গ্রেপ্তার করা হলো ঘটনার দিন কয়েক পর ক্যালিফোর্নিয়ার ডাবলিন থেকে। অরল্যান্ডোর ঘটনার পরপরই সে তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেকে নিয়ে ফ্লোরিডা থেকে পালিয়ে গিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়ায়। নূর রামাল্লা থেকে আসা ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের মেয়ে, বড় হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার রদেডোতে, মতিনের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয় একটা অনলাইন সাইটে, আর দেখা হয় ক্যালিফোর্নিয়ার একটি মসজিদে, তারপর বিয়ে। আগেই প্রথম স্বামী আবু রাহমার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে নূর স্বীকার করেছে, নাইট ক্লাবে হামলার সময় স্বামীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছিল তার। জিজ্ঞাসাবাদে এও জানা যায়, স্বামীর সঙ্গে নাকি গোলাবারুদ কিনতে গিয়েছিল নূর; যদিও স্বামীকে গে ক্লাবে হামলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছে বলে পুলিশকে জানিয়েছে নূর সালমান। তবু তাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে হামলা সম্পর্কে আগে থেকে জানার পরও তা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না জানানোর দায়ে।

 

চার

এক পাশে ধানক্ষেত, অন্য পাশে লম্বা সরু দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাটক্ষেত, মাঝখানে সরু আলের মতো একটা এবড়োখেবড়ো পথ, সেই কাদামাখা পথ সহজে মাড়ায় না গ্রামের লোক, ঘাসে-জলে ভরা সেই পথে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল মৃতদেহটি। উনিশ-বিশ বছর বয়সী একটা ছেলে, পরনে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর কাদা লেপটানো কালো প্যান্ট, হাত দুটি পেছন থেকে হাতকড়ায় আটকানো। সকালে পুলিশ এসে যখন লাশ ওঠাল, তখন দেখা গেল, তার বুকের বাঁ পাশে গুলির দাগের মতো রক্তাক্ত জখমের চিহ্ন আছে। মিয়ারচর গ্রামের কেউই চেনে না মৃত ছেলেটিকে, আগে কোনো দিন ওকে দেখেছে বলে মনে করতে পারছে না কেউ। তাহলে বোঝা গেল, এই গ্রামের কেউ নয় সে।

আহা রে, এই রোজা-রমজানের দিনে কোথা থেকে এসে এখানে ইঁদুরের মতো মুখ থুবড়ে মরে পড়ে আছে ছেলেটা! কোন মায়ের বুক খালি হয়েছে, কোন বাবার দিলে গর্ত হয়েছে কে জানে! তবে কি পুলিশ জানে তার পরিচয়? জানে সে কে? জানে বৈকি, পুলিশের খাতায় সে তো ভয়ংকর আসামি। মানুষ হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।    মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে যারা কুপিয়ে মারতে চাইছিল, তাদের দলে ছিল সে। দলে মোট তিনজন ছিল তারা।

সেদিন, জুন মাসের ১৫ তারিখ। সকাল থেকে টানা ক্লাস নিয়ে দুপুরে নিজের এক কামরার ঘরে ফিরে এসেছিল রিপন চক্রবর্তী। একা মানুষ, দুটি চাল ফুটিয়ে একটু আলু সিদ্ধ করে লবণ-মরিচ মাখিয়ে খেয়ে বিছানায় একটু গা এলিয়ে দিয়েছিল রিপন। একটু পরেই ব্যাচে ছাত্র পড়ানো শুরু হবে, তার আগে দেহ আর মস্তিষ্ককে খানিকটা বিশ্রাম দেওয়া আর কি, চোখটায় একটু তন্দ্রামতো এসেছিল, সেই তন্দ্রার ঘোরে বহুদিন পর ঠাকুরদাকে স্বপ্ন দেখল রিপন, গৌরনদীতে তাদের বাড়ির উঠানে ধুতি পরা, খালি গা ঠাকুরদা বরিশাইল্যা ভাষায় ছোট্ট রিপনকে ডাকছে, ‘ওম্মে যাইয়ো না, দাদুভাই, তড়াতড়ি মোর কাছে আও দেহি, দেহো কত্ত বড় এউক্কা কাডল আনছি, তুমার লাইগ্যা, তুই দেখবি না দাদু...।’ কিন্তু কে শোনে বুড়ো ঠাকুরদার কথা, ছোট্ট রিপন দৌড়ে পালাচ্ছে খেলার মাঠের দিকে। ঠাকুরদাও শক্ত মাটির ওপর কাঠের ছড়িটা ঠুকতে ঠুকতে দৌড়াচ্ছে তার পেছন পেছন। ঠুকঠুক শব্দ হচ্ছে, তবে শব্দটা আসলে ঠাকুরদার হাতের ছড়ির নয়, শব্দ হচ্ছে দরজায়। ঠুক ঠুক ঠুক। কয়টা বাজে? ছাত্ররা কি তবে পড়তে চলে এসেছে? রিপন চক্রবর্তী গায়ে একটা শার্ট চাপিয়ে তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলে দেয়। অচেনা তিনটা ছেলে দরজায় দাঁড়িয়ে। ওরা কি কলেজের নতুন ছাত্র? তার কাছে পড়তে চায়? নাকি কোনো অঙ্ক ক্লাসে বোঝেনি বলে এখন বুঝতে এসেছে? কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য মুখ খোলার আগেই যেন আচমকা নরক নেমে এলো রিপন চক্রবর্তীর মাথায়, হাতে, ঘাড়ে...রক্তের স্রোতে ডুবে যেতে যেতে অজান্তেই বুঝি মরণচিৎকার বেরিয়ে এসেছিল শিক্ষকের গলা চিরে। আশপাশের মানুষ ছুটে আসার আগেই দুই ঘাতক পালিয়ে গিয়েছিল। জনতার হাতে ধরা পড়েছিল একজন। অল্পবয়সী একটা ছেলে। গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম।

আসলে হকচকিয়ে গিয়েছিল ফাহিম, এটা ছিল তার প্রথম অপারেশন, প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট। পালানোটা তখনো ঠিকমতো আয়ত্ত করতে পারেনি সে। একটা বিধর্মীকে মারতে হবে, শুধু এইটুকু জানানো হয়েছিল তাকে। বিধর্মী কাউকে দেখে নিশ্চয়ই খুব রাগ হবে তার, ঘৃণা হবে খুব, মনের মধ্যে বিন্দুমাত্র দয়ামায়া জাগবে না, কুপিয়ে মেরে ফেলতে বুক কাঁপবে না একটুও, এমনটাই ভেবেছিল ফাহিম। কিন্তু কাজে নেমে হাত ফসকে গিয়েছিল তার। বিধর্মী মানুষটার তীক্ষ করুণ আর্তনাদে হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল সে। সঙ্গের ছেলে দুটি, যাদের সঙ্গে মাত্র আজকে সকালেই প্রথম দেখা হয়েছিল ফাহিমের, ওরা যখন দৌড়ে পালাচ্ছিল, তখন ফাহিম পিছিয়ে পড়েছিল, ওর চোখে সেই অচেনা আহত লোকটার রক্তমাখা ভয়ার্ত মুখটাই ভেসে উঠছিল বারবার। ফাহিমের কেন যেন মনে হচ্ছিল, ওটা অন্য কেউ নয়; বরং তার বাবা গোলাম ফারুক।

১১ জুন সকালবেলা ফাহিম কলেজে যাওয়ার জন্য বেরিয়েছে, যখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হওয়ার পরও আর বাড়ি ফিরে এলো না, তখন ঢাকার দক্ষিণখান থানায় গোলাম ফারুক একটা জিডি করাতে গিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে নিখোঁজ হয়েছে এ কথা জানিয়ে।

পুলিশ জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ছেলের স্বভাব-চরিত্র কেমন? বাসায় কারো সাথে রাগারাগি হইছিল? অভিমান করছে?’

গোলাম ফারুক কী বলবেন ভেবে পান না। রাগারাগি তো হয় নাই। অভিমান করছে কি না তা-ও তো জানে না কেউ। আর বাপের চোখে ছেলের স্বভাব-চরিত্রের দোষ তো ধরা পড়ার কথা নয়।

‘তবে এটা ঠিক, ও খুব চুপচাপ স্বভাবের ছেলে, একা একা থাকত, মসজিদে যাইত নিয়মিত, নামাজ-কালাম পড়ত। খারাপ কিছু তো দেখি নাই। ২০১৪ সালে এসএসসিতে জিপিএ ফাইভ পাইছিল, কলেজেও ঠিকমতোই যাইত, পাড়ার কোনো আড্ডাবাজিতেও কেউ কখনো দেখে নাই তারে...’

থানায় ছেলের একটা এসএমএস দেখিয়েছিল গোলাম ফারুক। মোবাইল ফোনে ফাহিম বাবাকে লিখেছে, ‘বিদেশ চলে গেলাম, এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। আমার জন্য দোয়া কোরো। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’

পুলিশ সাধারণ ডায়েরি করল।

কিন্তু নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পরই জানা গেল, ফাহিম ধরা পড়েছে মাদারীপুরে এক কলেজ শিক্ষককে কুপিয়ে হত্যাচেষ্টার দায়ে। কোথায় ঢাকার দক্ষিণখান আর কোথায় মাদারীপুর। ঢাকায় জন্ম নেওয়া, ঢাকায়ই বড় হওয়া ফাহিম, ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে থাকা মুখচোরা স্বভাবের ভালো ছেলে ফাহিম কিভাবে গেল, কেন, কার সঙ্গে মাদারীপুর গেল? কে তাকে এই নিষ্ঠুর কাজে উদ্বুদ্ধ করল? কোথায় পেল সে ধারালো চাপাতি, কার আদেশে কেনই বা খুন করতে গেল রিপন চক্রবর্তীকে? কত রকম প্রশ্ন বাপের মনে, আত্মীয়-স্বজনের মনে।

কিন্তু সেসব প্রশ্নের উত্তর কি দিয়েছে ফাহিম? পুলিশ তো ফাহিমকে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য মাদারীপুর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পনেরো দিনের রিমান্ডের আবেদন করেছিল। বুকের মধ্যে কালচে নীলের ওপর সাদা রঙে পুলিশ লেখা একটা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, মাথায় পুলিশের ভারী নীল হেলমেট, দুই হাতে হাতকড়া পরা ফাহিমকে দুপাশ থেকে ধরে যখন আদালতে হাজির করা হয় তখন দুপুর। শত শত মানুষ আদালতে, ক্যামেরা হাতে সাংবাদিকরাও আছে। গোলাম ফারুক খবর পেয়ে ঢাকা থেকে মাদারীপুর গিয়েছিলেন ছেলেকে দেখতে। ফাহিমকে দেখে মনে হলো বিরক্ত, একটু যেন হকচকিত, ভীত, তার কপাল কুঁচকে আছে, শ্যামলা মুখে হালকা দাড়ি-গোঁফের রেখা, চোখ তুলে যখন সে তাকাল, মনে হলো, ছোটবেলায় লুকোচুরি খেলতে গিয়ে হঠাৎ হেরে গেলে যেমন রাগ দুঃখ বিরক্তি মেশানো একটা মুখভঙ্গি করত, তেমন হয়ে আছে ওর চেহারাটা।

দশ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলেন ম্যাজিস্ট্রেট। পুলিশ যেমন করে এনেছিল, তেমন করে ফাহিমকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেল জেলহাজতে।

রিমান্ডে কি অনেক মারধর করেছিল ওরা? ওদের প্রশ্নের জবাবে কি সত্যি কথা বলছিল ছেলেটা? সে কি বলেছিল কে বা কারা তাকে এ পথে এনেছে? তাদের নামধাম, পরিচয় কী? বলেছিল, কারা তার রক্তের মধ্যে ঘৃণার বীজ বুনে দিয়েছিল? কেন এই কাজ করতে এসেছিল সে? আর কারা জড়িত এই তৎপরতার সঙ্গে?

পুলিশ বলল, ফাহিম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। পুলিশের গল্পে আরো বলা হলো, ফাহিমকে নিয়ে তারা মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের মিয়ারচর এলাকায় গিয়েছিল। সেখানে ফাহিম পুলিশের কাছ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একই সময় ওই জায়গায় লুকিয়ে থাকা ফাহিমের সহযোগী হিযবুত তাহরীর সদস্যরা পুলিশের ওপর গুলি চালায়। পুলিশও আত্মরক্ষার জন্য পাল্টা গুলি চালালে পুলিশ ও সন্ত্রাসীদের বন্দুকযুদ্ধে ফাহিম নিহত হয়।

 

পাঁচ

ঝিনাইদহ সদর হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে এনে গোসাই শ্যামানন্দ দাশকে মন্দিরের মাটিতেই শুইয়ে রাখা হয়েছিল শ্মশানে নেওয়ার আগ পর্যন্ত, সাদা কাপড় দিয়ে বুক পর্যন্ত ঢাকা, তাঁর কেশবিরল মাথা আর চন্দন দিয়ে নাকে, কপালে রসকলি আঁকা শ্যামবর্ণ মুখটা ঘিরে ছিল গেরুয়া রঙের ঠাকুরের নামাবলি আঁকা উত্তরীয়, তাঁর মৃতদেহ ঘিরে বসে ছিল শাঁখা-সিঁদুর পরা এলাকার সধবারা, মাটি চাপড়ে আহাজারি করছিল সাদা ধুতি পরা এক বিধবা বোন।

শ্রীশ্রী রাধা মদন গোপাল মঠ মন্দিরের কাঠের বেদিতে শ্রী রাধা বিনোদ রাধিকা আর গোপাল বিগ্রহ চুপচাপ দেখছিল সব।

বাটুলের বউ দীপালি রানী কয়েক দফা মূর্ছা যাওয়ার পর একটু থিতু হয়ে বসে নানাজনের কাছে ঘটনা বর্ণনা করছিল, ‘আমি বেরোইছিলাম ভোরবেলায় ক্ষেত থেকে মাষকলাই তুলব বলে, মাষকলাই ছেলে-মেয়েদের আর বাটুলের খুব পছন্দ, মাছের মাথা ভেঙে মাষকলাইয়ের ডাল রান্না করে দিলে দিব্যি অনেক ভাত খেয়ে ফেলা যায়।’ দীপালি চাইছিল, সকাল সকাল কিছু ডাল তুলে এনে পরে ঘরের কাজ করবে, রাস্তায় লোক চলাচল তখনো তেমন করে শুরু হয়নি, শুধু মন্দিরের সামনে রাস্তার পাশে গোসাই বাবাজিকে দেখতে পেল সে, পূজার জন্য ফুল তুলছে। দুই হাত জড়ো করে নমস্কারের মুদ্রা বুকে, কপালে ছোঁয়াল দীপালি, আস্তে আস্তে উচ্চারণ করল, ‘জয় রাধে গোবিন্দ, জয় কৃষ্ণ কৃষ্ণ’। দীপালি পায়ে পায়ে আরো খানিকটা এগোল, রাস্তাটা খালিই ছিল তখন, মনে আছে, হঠাৎ যমদূতের মতো কোথা থেকে কে জানে ভোঁ-ও-ও-ও-ও শব্দ করে একটা মোটরসাইকেল যে উড়ে এসে থামল একেবারে গোসাই বাবাজির গা ঘেঁষে। মোটরসাইকেলে তিনজন ছিল। —একজন চালাচ্ছিল, সে মোটরসাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে বসে রইল, বাকি দুজন নেমেই ইয়া লম্বা দা নাকি ছুরি, দীপালি বলতে পারবে না, বের করে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করল, রক্তের স্রোত নামল রাস্তা বেয়ে, গোসাই চিৎকার করারও সুযোগ পেল না, মাটিতে পড়ে গেল উপুড় হয়ে। চিৎকার বেরোল দীপালির গলা চিরে, ‘ও ভগবান, একি হলো গো, মাইরে ফেলল রে, কে কোতায় আছ গো, দেইখে যাও...’

লোক দুটি এবার দা উঁচিয়ে তেড়ে এলো দীপালির দিকে, ‘চুপ কর, হারামজাদি, তোকেও মেরে ফেলব...’

দীপালি খুব ভয় পেল, বাবাজির মতো এরা যদি তাকেও মেরে ফেলে তখন কী হবে গো ভেবে আতঙ্কে অস্থির হয়ে গেল সে, তারপর কী করবে ঠিক করতে না পেরে হয়তো জীবনরক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিতেই লাফ দিয়ে রাস্তার পাশে মজা পুকুরে নেমে গেল দীপালি রানী। লোকগুলো যেমন হঠাৎ করে এসেছিল, তেমন করেই একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ পেছনে ফেলে মোটরসাইকেল টেনে মাগুরার দিকে উধাও হয়ে গেল।

মানুষই পৃথিবীর একমাত্র প্রাণী, যে সমগোত্রকে হত্যা করতে নিত্যনতুন মারণাস্ত্র তৈরি করে। হত্যা শেষ পর্যন্ত আরো হত্যাকেই আমন্ত্রণ করে আনে। হত্যায় হয়তো রক্ত থাকে, রক্ত কোনো সমাধান আনে না। শুধু হিংসা, বিদ্বেষ, অশান্তি আর মানুষে-মানুষে বিভক্তি ছড়ায়। প্রতিটি খুনের পেছনেই একটি কারণ থাকে, থাকে কোনো জটিল মনস্তত্ত্ব, এই রোগাসক্ত সভ্যতা কি খুন ভালোবাসে? তার কি আছে প্রবল রক্ততৃষ্ণা? কোনো কোনো খুন হয়তো কারো বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ, কোনো কোনো খুন আতঙ্ক তৈরি করে বা আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্যই কোনো কোনো খুন করা হয়। খুনিরা জানে না, আতঙ্ক তৈরি করে হয়তো সাময়িক ফায়দা পাওয়া যায়, মানুষের আনুগত্য পাওয়া যায়; কিন্তু ভালোবাসা পাওয়া যায় না, পাওয়া যায় প্রবল ঘৃণা। সেসব ঘৃণা জগেক কলুষিত করে, আর সবাইকে পরাজিত করে। আরেকজন মানুষকে হত্যা করতে গিয়ে মানুষ নিজেকেই হত্যা করে না? শেষ পর্যন্ত হত্যার এই ধ্বংসলীলার হাত থেকে বাঁচে না পৃথিবীর একটি প্রাণীও।

 

ছয়

‘বিয়ে যেমন জীবনের অংশ, ডিভোর্সও তা-ই। এখানে দুঃখের কিছু নাই, সুখেরও কিছু নাই, বুঝলা আম্মা, আত্মীয়-স্বজন যারা ডিভোর্সের কারণে সমবেদনা জানাতে আসে, তাদের এইটা বলে দিয়ো। মনের মিল হয় নাই, বিয়ে ভেঙে গেছে, আমার ছেলেকে নিয়া আমি ভালো আছি।’ মিতালি বলে তার মাকে।

 

‘তুই কি জানস, ইকরাম ডিভোর্স ফাইনাল করে হজ করতে গেছে? মনে মনে কত দুঃখ পাইছে ছেলেটা...’

‘আমার তো এসব জানার দরকার নাই, আম্মা, আমাকে আমার মতো থাকতে দেও।’

মিতালি বলে। মিতালির মা তবু সাবেক জামাতার জন্য ঘ্যানঘ্যান করে। ‘ফাইয়াদ বাপের স্নেহটা পাইল না, বাপ ছাড়া সন্তান মানুষ করা কত কঠিন!’

‘কঠিন হইলেও অসম্ভব না, আম্মা, পৃথিবীতে পিতৃহীন অনেক মহাপুরুষ আছেন...’

মিতালি মায়ের মুখের ওপর জবাব দেয়। এখন বরং তার নিজেকে মুক্ত, নির্ভার মানুষ মনে হয়। মনে হয়, বেসুরো জীবনে ছন্দ ফিরে এসেছে। দিনের বেলা অফিস আর সপ্তাহে চার দিন সন্ধ্যা বা রাতে একটা টিভি চ্যানেলে খবর পড়া, মিতালির দিনলিপি। কাজের ফাঁকে সৌম্য মাঝেমধ্যে ফোন করে, খোঁজখবর নেয়, বিভিন্ন বিষয়ে তার বুদ্ধিজীবীসুলভ মতামত জানায়।

‘তুই কি আর বিয়েশাদি করবি না? জীবন কি এভাবেই যাবে?’ মা তো বলেই, আত্মীয়-স্বজন বলে, বন্ধু-বান্ধব ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে জানতে চায়। এই প্রশ্নের উত্তর মিতালিও জানে না। সে কোনো অনড় অবস্থানে থাকতে চায় না, যদি পছন্দমতো কাউকে পায়, যে শুধু তাকেই নয়, ফাইয়াদকেও গ্রহণ করবে সমান ভালোবেসে, যে হবে দীপ্যমান, উদার, মানবিক, ইকরামের বিপরীত চরিত্রের কোনো মানুষ, যদি তার সঙ্গে কখনো দেখা হয়, যদি কোনো নবীন ফাল্গুনের দিনে সে মিতালিকে চিনে নেয়, মিতালি সত্যি জানে না তাহলে কী হবে। তবে আপাতত এই জীবনেই শান্তি।

সেদিন ছিল পয়লা জুলাই, শুক্রবার। অফিস বন্ধ। রোজা শুরু হয়েছে। সারা দিন রোজা ছিল মিতালি। ইফতারের পর রেডি হচ্ছিল টিভিতে যাওয়ার জন্য। আজ তার রাতের নিউজ। একটু পরেই হয়তো গাড়ি আসবে তাকে নিতে। মিতালি তার শাড়ি-ব্লাউজ গুছিয়ে রেখে একটুখানি গড়িয়ে নেওয়ার জন্য শুয়েছিল, এ রকম সময় দরজায় কলিংবেল। হয়তো মায়ের কাছে কেউ এসেছে, বুয়া বা দারোয়ান চাচা। মিতালি তাই গা করল না। কিন্তু একটু পরে ফাইয়াদ যখন এসে বলল, ‘বাবা এসেছে। নানুর সঙ্গে কথা বলছে। দেখো আমার জন্য পিত্জা নিয়ে এসেছে।’ তড়াক করে মেজাজটা সপ্তমে উঠে গেল মিতালির।

সব কিছুই তো চুকেবুকে গেছে, এখন আবার কোন মতলবে এসেছে শয়তানটা? ও কি আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দেবে না? মিতালি শক্ত কিছু কথা মনে মনে সাজিয়ে নিয়ে গায়ের কাপড় গুছিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দেখল, ইকরাম চলে গেছে।

‘ফাইয়াদরে দেখতে আসছিল। ছেলের ওপর দাবি আছে না!’

মেয়ের রুদ্রমূর্তির সামনে মিনমিন করে মিতালির মা।

‘প্লিজ আম্মা, তুমি তারে প্রশ্রয় দেওয়া বন্ধ করো। ছেলেকে দেখতে চাইলে নির্দিষ্ট দিনে দেখবে। এ রকম যখন-তখন আসা চলবে না।’

‘ও নাকি ছেলের কাস্টডি চাইয়া মামলা করব।’

মিতালির মা বলেন।

‘কী? বললেই হইল? আমারে যন্ত্রণা না দিলে ওর ভালো লাগে না? করুক মামলা। দেখি মামলা কইরা কী করতে পারে! উফ্্! আবার আমার মাথা ধরে গেল।’

সেই মাথা ব্যথা আর মনভরা তিক্ততা নিয়েই রাত দশটার নিউজ পড়তে টেলিভিশনে গেল মিতালি। মেকআপ নিল। আর খবর পড়তে বসল। ‘আজকে সব ডাল নিউজ আপা’—টক ব্যাকে মিতালির কানে প্রডিউসারের বক্তব্য ভেসে এলো। ওরা ভাবতেও পারেনি, কিছুক্ষণের মধ্যে কত বড় একটা খবর তৈরি হয়ে ডাল ডে-টাকে অন্য রকম দিন বানিয়ে দেবে।

 

সাত

সড়ক নম্বর ৭৯, বাড়ি নম্বর ৫, গুলশান-২, হলি আর্টিজান বেকারি, ঢাকা, বাংলাদেশ।

সামনে ঘাসে ভরা অনেকটা খোলা জায়গা, সবুজ লন, নিরিবিলি মনোরম পরিবেশ আর সুস্বাদু খাবারের কারণে অনেকেই রেস্তোরাঁটি পছন্দ করেন সময় কাটানোর জন্য। দেশীয় অভিজাত মানুষরা যেমন আসেন, তেমনি আসেন বিদেশিরাও।

২০১৬ সালের পয়লা জুলাইয়ের সন্ধ্যাটা ছিল শান্ত, সুন্দর। হালকা, স্নিগ্ধ এলোমেলো হাওয়া বইছিল, বাতাস উষ্ণ ছিল, কেউ তখনো জানত না, তারা ফোটা ঝকঝকে মায়াবী আকাশের আড়ালে কোথাও লুকিয়ে ছিল কালো মেঘের ছায়া।

রেস্তোরাঁগুলো যেমন হয়, ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা মিউজিক বাজে, চামচে চামচে ঠোকাঠুকির টুংটাং শব্দ, পরিচ্ছন্ন ইউনিফর্ম পরা ওয়েটারদের নিঃশব্দ চলাফেরা, ধোঁয়া ওঠা সুস্বাদু খাবারের গন্ধ, টেবিলে টেবিলে কথা বলার মৃদু গুঞ্জন, কখনো নৈঃশব্দ্য ভুলে তরুণ- তরুণীদের হঠাৎ হাসির উচ্ছল শব্দ। সব ঠিকঠাক, স্বাভাবিক, যেমন থাকে প্রতিদিন। সেদিন, পয়লা জুলাই, রাত নটার দিকে, লন আর বসার জায়গাগুলোতে দল বেঁধে বসে আছে জাপানি নাগরিকদের একটা দল। তারা সবাই প্রকৌশলী, ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রো রেলের পরামর্শক হিসেবে এ দেশে এসেছে। একটু দূরে ইতালিয়ান নাগরিকদের অরেকটি দল বসেছে অন্য একটা লম্বা টেবিল ঘিরে, তারা প্রায় সবাই ব্যবসায়ী, বিশেষ করে টেক্সটাইল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, অনেকেই বহু বছর ধরে বাংলাদেশে আছে, অনেকে বেড়াতে এসেছে, কাজ করছে এদেশীয় কোনো কম্পানিতে, তাদের মধ্যে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা সিমোনা মন্টিও ছিলেন, মাতৃত্বের স্বাদ নিতে উন্মুখ সিমোনা কিছুদিনের মধ্যে সন্তান প্রসবের জন্য ইতালির রোমে নিজ দেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ছোট ছোট দলে টেবিল ঘিরে বসেছিল আরো কিছু ভিনদেশি ও বাংলাদেশি নাগরিক।

এই রেস্তোরাঁয়ই একটা টেবিলে দুই বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে এটা-সেটা খেতে খেতে গল্প করছিল ইশরাত আকন্দ। যাঁরা তাকে চেনেন তাঁরা জানেন, ইশরাত এক অন্য রকম হাসিখুশি মেয়ে, যে সব সময় ছোট ছোট বিষয় নিয়ে সুখী থাকত। বন্ধুরা তাকে বলত, কংক্রিটের জঙ্গলে স্নিগ্ধ মমতায় ছেয়ে থাকা সবুজ উদ্যান। ইশরাত উচ্ছল মিষ্টি হাসিতে ভেঙে পড়ে নিজেকে বলত, ‘আই অ্যাম হ্যাপিনেস।’

ফেসবুক স্ট্যাটাসে সব সময় লেখা থাকত, ‘হ্যাপি ডে ফ্রেন্ডস, বি ব্লেসড, বি হ্যাপি। বন্ধুরা সুখী থাকো, সুখী হও।’ সবুজ ভালোবাসত ইশরাত। ছোট্ট একটা কামিনী ফুলের গন্ধ নিয়েও তার উচ্ছ্বাসের অন্ত ছিল না।

ইশরাত লিখত,

‘আমি আজকে খুব সুখী। এটা ছিল দারুণ একটা শুরু, যখন আমি ঘরে ঢুকি। সমস্ত ঘর ভর্তি এমন মিষ্টি নরম সুগন্ধ ছিল। আমি ভেবেছিলাম বুঝি নতুন এয়ার ফ্রেশনার। কিন্তু একটু পরে মনে হলো, গন্ধটা প্রাকৃতিক। খুঁজতে শুরু করলাম। ওমা, দেখি ঘরের কোণে ছোট্ট একটা টবে একটা ছোট্ট সবুজ চারায় সাদা রঙের ফুল ফুটেছে। আরে, এ তো দেখি কামিনী। গত সপ্তাহে মালি এসে ঘরের টবগুলো বদলে দিয়ে গেছিল। তখন খেয়াল করিনি, এমন তো সে সব সময়ই বদলে দেয়। কিন্তু এখন এটা আমার জন্য নিছক একটা চমক শুধু নয়, মনে হলো কাজের প্রতি তার ভালোবাসা আর নিবেদনের প্রকাশ এটা। আহ্্, কী সুখী আমি! আমার চারপাশে এমন আশ্চর্যজনক সব মানুষ।’

ইশরাত পেশায় দক্ষ মানবসম্পদ ব্যবস্থাপক ছিল; কিন্তু তার মনপ্রাণজুড়ে ছিল শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা। গান খুব পছন্দ করত, ‘কী অসাম ভয়েস আপনার!’ গানের শিল্পী শান্তনু বিশ্বাসকে খুঁজে বের করে বলেছিল ইশরাত। বাসায় নিয়ে তাঁকে নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছিল। বলেছিল,

‘শান্তনু দা, আপনার একটা গানে আমি থাকতে চাই, গানটা আমার খুব প্রিয়, দেবেন?’

‘দেব মানে, সে তো আমার গানের জন্য বড় পাওনা, তোমার মতো মডেল শিল্পী কোথায় পাবে?’ শান্তনু বিশ্বাস উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন।

‘তাহলে প্রবঞ্চনা গানটার ভিডিওতে থাকব মডেল হয়ে, বান্টি শুট করবে, ওই যে আপনার ওই গানটা...’

‘নও কাছে, নও দূরে, কেউ কি বেঁধেছে সুর ভুল করে

চোখ বুজে নাও খুঁজে, ভোরের বাগান, ডুবে যাওয়া গান

অঘ্রাণে কোন নাড়ির টানে, যেও না যেও না আছে প্রবঞ্চনা

রোজ যেখানে গান হতো, পদভারে আজও কম্পিত

নদীবিহীন ব্যাকুলতা তোমাকে ঘিরে যত কথা

তোমার যখন দিনের শুরু, তখন আমার রাত্রি রচনা...’

বাঙালিয়ানায় পূর্ণ মায়াময় এক মানবী ছিল ইশরাত, গুলশানে একটা আর্ট গ্যালারি তৈরি করেছিল সে, বেশ গালভরা একটা নামও রেখেছিল সেটার, ইনস্টিটিউট অব এশিয়ান ক্রিয়েটিভস। তরুণ-প্রবীণ চিত্রশিল্পীদের প্রদর্শনী হতো সেখানে। যেদিন প্রথম শিল্পী মুর্তজা বশীরের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হলো, সেদিন কী আনন্দ তার। ফেসবুকে লিখেছে,

‘আই অ্যাম হ্যাপি টুডে বিকজ একজন গ্রেট আর্টিস্টের সঙ্গে দেখা হলো আজ। ৮৩ বছর বয়সের একজন বিনয়ী মহান শিল্পী মুর্তজা বশীর। তিনি শুধু চিত্রশিল্পীই নন, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক। তাঁর অসাধারণ সব কাজের ভক্ত আমি। অসাম।’

হোলি আর্টিজানের আরেকটা টেবিল ঘিরে বসেছে অল্প বয়সী তিন তরুণ-তরুণী। নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় গল্প করছে ওরা, হাসছে। এদের একজন ফারাজ আইয়াজ হোসেন, সঙ্গে তার দুই বন্ধু, একজন লম্বাটে গড়নের, চশমা চোখের অবিন্তা কবীর আর অন্যজন মিষ্টি চেহারার তারুশি জৈন। ওরা তিনজনই আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে একসঙ্গে পড়েছে। স্কুলের পড়া শেষ করে তিনজনই আবার পড়তে গেছে আমেরিকায়। ফারাজ আর অবিন্তা পড়ছে আমেরিকার আটলান্টার এমোরি ইউনিভার্সিটিতে। তারুশি ভারতীয় নাগরিক, কিন্তু বাবা ব্যবসাসূত্রে থাকেন ঢাকায়ই, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল শেষ করে তারুশি ভর্তি হয়েছে আমেরিকার বার্কলে ইউনিভার্সিটিতে। একটা ইন্টার্নশিপ করছিল তারুশি, ঢাকায়ই কাজ। গ্রীষ্মের ছুটিতে ফারাজ আমেরিকা থেকে দেশে ফিরেছিল সপ্তাহখানেক আগে আর অবিন্তা ফিরেছিল মাত্র তিন দিন আগে। সেদিন সেই সন্ধ্যায়, ‘দশটার মধ্যে বাড়িতে ফিরব’ বলে মাকে জানিয়ে বাড়ির কাছেই, হোলি আর্টিজানে এসেছিল অবিন্তা। ফারাজ তার মায়ের ঘরের ভেজানো দরজার কপাট ঠেলে উঁকি দিয়ে ‘মাম্মা, আই অ্যাম লিভিং’ বলে বেরিয়ে এসেছিল। আর তারুশিও এসেছিল সেখানে, স্কুলের বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে, কিছুক্ষণ আড্ডা দিতে। দুদিন পরেই তারুশির দিল্লি যাওয়ার কথা, সেখান থেকে পরিবারের সবাইকে নিয়ে তারা যাবে তাদের আদি বাড়ি ফিরোজাবাদে।

সেই সন্ধ্যায় তখন কারো টেবিলে খাবার দেওয়া হয়েছে, কারো জন্য খাবার তৈরি হচ্ছে। পাস্তার অর্ডার দিয়েছে ইতালিয়ানরা, সঙ্গে বিফ আর চিকেন আইটেম। জাপানিরা হয়তো চাইছে সুইট অ্যান্ড সাওয়ার ফিশ উইথ অনিয়ন অ্যান্ড চিলি সস।

কানাডার একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাহমিদ হাসিব খান বসেছিল লেকের পার ঘেঁষে, অন্য একটি টেবিলে, গোল ছাউনির নিচে, তার বান্ধবী ফাইরুজ আর তাহানাকে নিয়ে। প্রথমে বারান্দায় বসতে চেয়েছিল ওরা; কিন্তু শুধু আইসক্রিম খাবে বলায় ওয়েটার বলল, ‘এখানে বসা যাবে না, লনে বসেন।’

কিছুক্ষণ আগে হাসনাত করিম আর তাঁর স্ত্রী    শারমিনা পারভিন করিম দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকেছেন। টেবিলে মেন্যু দেওয়া হয়েছে। সেটা দেখে খাবারের অর্ডার দিতে যাচ্ছেন মাত্র।

রেস্তোরাঁর বাবুর্চি দেলোয়ার হোসেন তখন গেছেন দোতলায়, ফ্রিজ থেকে মাছ বের করার জন্য। হলি আর্টিজানের কিচেনে ব্যস্ত হাতে কাস্টমারদের জন্য খাবার রেডি করছে শিশির, সেরু আর রিন্টু।

তারা কেউই কল্পনাও করেনি কিছুক্ষণের মধ্যেই এই জায়গায় নরক নেমে আসবে, ঈশ্বরের নাম নিয়ে মাতাল হয়ে উঠবে রক্তপিপাসু উচ্ছৃঙ্খল বীভৎস অন্ধকার। ঠাণ্ডা মাথায় তারা হত্যা করবে মনুষ্যত্ব আর মানবতা।

 

আট

ওরা আগেও দিনের বেলা কয়েকবার এসে জায়গাটা রেকি করে গিয়েছিল। তখন খালি হাতে এসেছিল, আজ তারা তৈরি হয়েই এসেছে পিস্তল, গ্রেনেড, চাপাতিসহ সব দরকারি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে, প্রস্তুতি শেষ করে চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। তাদের রক্তে একটা চাপা উত্তেজনা। মনের মধ্যে এক অচেনা জোশ। বড় ভাই বলেছেন, এই অপারেশন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, সফল তাদের হতেই হবে। কোনো পিছুটান থাকা চলবে না। কোনো মায়া-মমতা, কোনো দয়া দেখানো চলবে না এখানে। মুছে ফেলতে হবে অতীত। মনে রাখতে হবে, তারা নতুন দিনের সৈনিক, নতুন স্বপ্নের বাহক, তাদের হাত ধরেই পরিবর্তন আসবে। বড় কঠিন দায়িত্ব তাদের কাঁধে, সেই দায়িত্ব পালন করতে হলে মনের মধ্যে কোনো দ্বিধা, কোনো ভয়কে স্থান দেওয়া চলবে না। সব কিছু নিষ্ঠুরভাবে শেষ করে দিতে হবে, সামনে যে বাধা আসবে, সব বাধা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। মনে রেখো, এটাই সঠিক পথ, এই পথেই মুক্তি।

ওরা পাঁচজন নিঃসঙ্গ, বিচ্ছিন্ন, ভেঙে পড়া পাঁচ তরুণ নিবরাস ইসলাম, মীর সামি মোবাশ্বির, রোহান ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম আর শফিকুল ইসলাম দুই ভাগে ভাগ হয়ে রাত আটটার দিকে গুলশানের রাস্তায় এসে লাইটপোস্টের অস্পষ্ট আলোর নিচে একই উদ্দেশ্যে একসঙ্গে জড়ো হয়। পেছনে পড়ে থাকে ওদের ফেলে আসা পরিবার, আবাল্য শিক্ষা, ওদের মানবিক বোধ।

তাদের মনে পড়ে গতকালের খুতবার কথা, যেখানে মানিক ভাই বলেছেন, ‘তোমরা হতাশ হবে না। একজনের গুলি শেষ হলে আরেকজন ব্যাকআপ দেবে। মনে রাখবে, আমাদের হারানোর কিছু নেই। অপারেশনের সময় তাড়াহুড়ার দরকার নেই। খুব গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে। যদি কেউ বন্দি হয়ে যাও, তাহলে নিজে নিজেকে শেষ করে দেবে। আর একটা জিনিস মনে রাখবে, হলি আর্টিজানের গেট পর্যন্ত পৌঁছতে পারলেই আমরা সফল। বিশ্ব জেনে যাবে, বাংলাদেশে হামলা হয়েছে। তাই শুধু হামলা হলেই আমরা সফল।’

এভাবেই তাদের পাঁচজনকে অনেক দিন ধরে জানানো হয়েছে, কী করতে হবে। শেখানো হয়েছে, কিভাবে করতে হবে। বোঝানো হয়েছে, পরিণতি কী হবে। ওদের স্বাভাবিক জ্ঞান লুপ্ত হয়েছে, ওদের বিচার-বিবেচনাবোধ হারিয়ে গেছে। ওরা এখন এক অন্ধ মন্ত্রে দীক্ষিত, রক্তে উত্তাল মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, মগজে খুনের নেশা নিয়ে তারা পাঁচজন যেন সর্বনাশের দূত, যেন প্রলয়রূপী ভয়ংকর। ছিমছাম, শান্তিপূর্ণ, মনোরম রাতের বাতাস হঠাৎ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে বন্দুকের গুলি আর গ্রেনেডের বিকট শব্দে।

 

নয়

রাতে যখন প্রথম হলি আর্টিজানে ঢুকল ওরা, জিন্সের প্যান্ট আর কালো গেঞ্জি পরা, কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো কয়েকটা ছেলে। সবার দৌড়াদৌড়ি দেখে সহকারী কুক আকাশের মনে হয়েছিল, বুঝি ভূমিকম্প হচ্ছে। গেস্টরা সব দেয়ালের পেছনে দৌড়াচ্ছে, টেবিলের নিচে লুকাচ্ছে, পালানোর চেষ্টা করছে, গুলির শব্দ হচ্ছে। আকাশও অন্য কিছু না ভেবে সবার সঙ্গে গিয়ে ঢুকল বাথরুমে। রেস্তোরাঁর আরেক কর্মচারী মিরাজ দোতলায় আইসক্রিম বানাচ্ছিল, হঠাৎ একটা শব্দ। মিরাজ ভাবল, হয়তো কোনো ওয়েটারের হাত থেকে গ্লাস পড়ে ভেঙে গেছে। ‘না ভাই, গোলাগুলির শব্দ এইটা, আপনে বুঝতে পারতাছেন না?’ মিরাজের সহকারী জোবায়ের বলল ভীত কণ্ঠে।

তাহমিদ গল্প করছিল বন্ধুদের সঙ্গে, পৌনে ৯টার দিকে, প্রথম বিকট আওয়াজ কানে আসে তাদের। প্রথমে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেয়নি ওরা। কিন্তু একবার, দুবার, তারপর অনবরত গুলি হতে থাকলে নড়েচড়ে বসে ওরা। সতর্ক হয়ে যায়। এরই মধ্যে হাতে বন্দুক আর মুখে ‘আল্লাহু আকবর’ বলে লনে ঢুকে পড়ে ওরা। তাহমিদ, ফাইরুজ আর তাহানা দ্রুত টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর একটা ছেলে দূর থেকে চিৎকার করে জানতে চায়, ‘তোমরা কি মুসলিম?’

ওরা তিনজনই একসঙ্গে বলে ওঠে, ‘জি ভাইয়া, আমরা মুসলমান।’

‘আমরা মুসলমানদের মারতে আসি নাই, কাফেরদের মারতে আসছি।’

এরপর সে বারান্দার দিকে হেঁটে গেলে তাহমিদ আর তার বন্ধুরা আবার লুকিয়ে পড়ে টেবিলের তলায়। ভয়ে তাদের বুক কাঁপতে থাকে।

রেস্তোরাঁয় খেতে আসা অতিথিদের একজন শারমিনা পারভিন করিম পরে বলেছিলেন,

‘আমার মেয়ের জন্মদিন ছিল পয়লা জুলাই। রোজার দিন বাসায় আর ঝামেলা করতে চাইনি। তাই বাসার কাছে বলে আমার স্বামী আমাকে আর বাচ্চাদের নিয়ে হলি আর্টিজানে চলে আসেন। একে তো বাসার কাছে, তার ওপর রেস্টুরেন্টের খাবারের মান খুব ভালো বলেই জানতাম আমরা। সাড়ে আটটার পর বাসা থেকে বেরোই। খাবার অর্ডার করতে যাব, মেন্যু দিয়ে গেছে, সেই মুহূর্তেই গোলাগুলির শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি ওরা আমাদের টেবিলের সামনে। শব্দ শুনে যেটা বুঝলাম, ওরা বাইরে লনে অ্যাটাক করেই ভেতরে এসেছিল। চিৎকার করে আমাদের হেড ডাউন করতে বলল। তোমরা কি মুসলিম? জিজ্ঞেস করল ওরা।’

শারমিনা পারভীন হিজাব পরিহিত ছিলেন, কম্পিত কণ্ঠে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা মুসলিম।’

বাচ্চারা এসব দেখে ভয় পাচ্ছিল। হামলাকারীদের একজন এসে বলল, ‘আপনাদের মারব না, যান, বাচ্চাদের নিয়ে ওই দিকের টেবিলে গিয়ে বসেন। ওদের চোখ-কান ঢেকে মাথা নিচু করে রাখতে বলেন।’

হাসনাত পরিবার তাদের কথামতো ছেলে-মেয়েদের নিয়ে একটা দূরের টেবিলে বসে মাথা নিচু করে রাখল। কিন্তু কানে আসতে থাকল গুলি আর চিৎকারের শব্দ। পাখি মারার মতো শ্যুট করল ওরা। চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে পরে। আগে গুলি করেছে, তারপর কুপিয়েছে। ওদের হাতে তলোয়ারের মতো লম্বা ধারালো অস্ত্র ছিল। রক্তে ভেসে গিয়েছিল রেস্তোরাঁর মেঝে।

তাদের এই নির্মম নিষ্ঠুরতা দেখে রাগে-দুঃখে কাঁপল রেস্তোরাঁর মৃদু আলো, খোলা লনের ওপর জোছনা ছড়ানো চাঁদ দুঃখিত হয়ে মেঘের আড়ালে মুখ লুকাল।

ওদের টার্গেট ছিল মূলত বিদেশি আর অমুসলিমরা। যাদের দেখে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশি আর মুসলিম, তাদের টেবিলে টেবিলে গিয়ে ওরা জিজ্ঞেস করছিল, ‘ধর্ম কী? ইসলাম? সুরা পড়তে পারেন? সুরা ফাতেহা, সুরা ইখলাস, সুরা নাস? বলেন তো দেখি একটা সুরা...’ ধর্ম নিয়ে নানা রকম উপদেশও দিচ্ছিল ওরা। বলছিল, ‘আমরা মুসলমানদের কোনো ক্ষতি করব না, যারা ইহুদি, খ্রিস্টান, যারা আল্লাহর শিরক করে, তাদের আমরা ধ্বংস করব।’

যারা সুরা পড়তে পারল, তাদের রাতে খেতেও দেওয়া হয়। যে নারীরা হিজাব পরা ছিল, তাদের নাকি বাড়তি খাতির করা হয়। তাহলে কি বাংলাদেশি মুসলিম হয়েও ইশরাতকে মরতে হয়েছিল, তার মাথায় কাপড় ছিল না বলে, সে হিজাবধারী ছিল না বলে?

ভেতরে যারা আটকে ছিল, তাদের কেউ কেউ তো ফারাজের গল্পও বলেছিল।

সেই হামলাকারীরা ফারাজের কাছে গিয়ে যখন জানতে পেরেছিল, ফারাজ মুসলিম আর বাংলাদেশি, তখন তারা বলেছিল, ‘তুমি চলে যেতে পারো, ছেড়ে দিচ্ছি তোমাকে...’

‘আর ওরা? আমার বন্ধুরা?’

‘ওদের ছাড়া যাবে না, ওরা বিদেশি নাগরিক, মরতে হবে ওদের।’

‘তাহলে ওদের ছেড়ে আমিও যাব না।’ ফারাজ দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল।

গুলির আওয়াজ শুনে রেস্টুরেন্টের ভীতসন্ত্রস্ত কর্মচারীরা—বাবুর্চি, ক্লিনার আর ওয়েটারদের কয়েকজন পালিয়েছিল দেয়াল টপকে বা পেছনের দরজা দিয়ে। যারা বেরোতে পারেনি, তাদের মধ্যে নয়জন গিয়ে ঢুকেছিল একটা বাথরুমে, বাইরে থেকে ওদের আটকে দিয়েছিল হামলাকারীরা।

টহল পুলিশও এসেছিল গোলাগুলির খবর পেয়ে, সেই রাতে এসআই ফারুক ছিলেন গুলশান এলাকা টহলের দায়িত্বে, চারজনের একটা দল ‘কিলো ৮১’ কল সাইন হিসেবে প্যাট্রলের দায়িত্ব পালন করছিল।

রাত পৌনে নয়টায় প্রথম গুলশানের ওসির ফোন পান ফারুক, ‘কিলো ৮১, কোথায় আছ?’

‘স্যার, গুলশান ২ নম্বর ওয়েস্টিনের পেছনে আছি।’

‘এখনই মুভ করো, গুলশান লেক ভিউ ক্লিনিকের দিকে যাও, দেখো সেখানে কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে।’

গাড়ি রেডিই ছিল। ড্রাইভারকে দ্রুত লেক ভিউ ক্লিনিকের দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।

আবার ওসির ফোন, ‘শোনো ফারুক, ওখানে হেলমেট-লেগ গার্ড ছাড়া কেউ যাবা না।’

‘জি, স্যার।’

ফারুক গাড়িতে বসেই ফোর্সকে বললেন হেলমেট- লেগ গার্ড পরে নিতে। নিজেও গাড়িতে বসেই হেলমেট আর বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরে নিলেন।

হলি আর্টিজানের গেটের কাছে গাড়ি পৌঁছার পরই দেখা গেল, রাস্তায় কে একজন আড়াআড়িভাবে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। গাড়ি থামিয়ে ফারুক তাঁর ফোর্স নিয়ে পড়ে থাকা লোকটাকে টেক আপ করলেন।

কেঁদে উঠল আহত লোকটা, ‘স্যার, আমি জাপানি সাহেবের ড্রাইভার, রানা। ওই হোটেলের ভেতর কারা জানি ঢুকছে, মানুষজনরে গুলি কইরা মারতেছে। আমি দৌড়ায়া এই পর্যন্ত আসছি, আর যাইতে পারতাছি না, আমারে বাঁচান, স্যার।’

ফারুক যখন কনস্টেবলদের নিয়ে রানাকে উদ্ধার করছিলেন, তখনই দেখলেন, চার-পাঁচটা অল্পবয়সী ছেলে দৌড়ে আসছে। ওদের প্রত্যেকের হাতে উদ্যত আর্মস, দুজনের হাতে দুইটা ব্যাগ। ফারুক দেখল, লম্বা একটা ছেলে ব্যাগ থেকে গ্রেনেড বের করে টান দিয়ে পিন খুলছে। বিপদ বুঝে ফারুক চিৎকার করে উঠলেন, ‘ফোর্স, সরে যা।’ তারপর নিজেও শুয়ে ক্রল করে উত্তর দিকের একটা বিল্ডিংয়ের পাশে কাভার নিলেন। ফারুক গড়িয়ে যেতে না যেতেই উড়ে এলো গ্রেনেড। প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো রাস্তায়। দুই কনস্টেবলের গায়ে এসে লাগল স্প্লিন্টার।

এসআই ফারুক বিল্ডিংয়ের আড়াল থেকে শটগান দিয়ে ফায়ার শুরু করলেন। ওপাশ থেকেও দুজন ফায়ার করছে। ফারুক ফায়ার করতে থাকলে ওরা পিছু হটে গেটের ভেতরে ঢুকে দেয়ালের আড়াল থেকে গুলি শুরু করল। ফারুকও দেয়ালের আড়াল নিয়ে থেমে থেমে পাল্টা শটগানের গুলি ছুড়লেন। দুই কনস্টেবলও পজিশন নিয়ে গুলি ছুড়ছিল। এর মধ্যেই হঠাৎ শেষ হয়ে গেল ফারুকের হাতের শটগানের গুলি। ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল ফারুকের। এ অবস্থায় ওরা যদি বেরিয়ে এসে তাঁকে ধরে ফেলে, তখন তো নিরস্ত্র অবস্থায় মারা পড়তে হবে। তখন কী যে হলো মনের মধ্যে, ফারুক জানেন না। তিনি ভাবলেন, হয় আমি মরব, না হয় ওদের মারব। গাড়ির ভেতরে ফোর্সের কাছে থাকা চায়নিজ রাইফেলের কথা মনে পড়ল ফারুকের। চিৎকার করে ড্রাইভারকে ডাকলেন, বললেন, ‘হাতিয়ার দেও।’ ড্রাইভার কথামতো রাইফেলটা ছুড়ে মারলে উঠে দাঁড়িয়ে সমানে গুলি করতে থাকলেন ফারুক। এবার ছেলেগুলো দৌড়ে ভেতরে চলে গেল আর ভেতর থেকে আটকে দিল মেইন গেটটা। ফারুক ওয়্যারলেসে খবর পাঠালেন থানায়। সাহায্য দরকার। ঘটনা সামান্য নয়, এখানে ভয়ংকর অশুভ কিছু ঘটছে। আরো ফোর্স লাগবে।

ইফতার শেষে পুলিশ কন্ট্রোলরুম থেকে সার্বিক পরিস্থিতির খোঁজ রাখছিলেন পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া। তখনই ডিসি গুলশানের ফোন। ‘গুলশানের পরিস্থিতি ভালো নয়, স্যার, রেস্তোরাঁর নাম জেনেছি, হলি আর্টিজান। সম্ভবত ভেতরে বিদেশি নাগরিক আছে। সন্ত্রাসীরাও ভেতরে। আমাদের দুইজন কনস্টেবল ইনজ্যুরড হয়েছে। অতিরিক্ত ফোর্স লাগবে, মনে হচ্ছে সোয়াট কল করতে হবে।’

‘আমি নিজেই আসছি। তোমার যত ফোর্স লাগে, নেও। সম্পূর্ণ রেস্টুরেন্ট কর্ডন করে ফেলো। কোনোভাবেই যেন ক্রিমিনালরা পালাতে না পারে।’

আছাদুজ্জামান মিয়া ফোনে নির্দেশ দিয়ে আর দেরি করলেন না, বাসায় যে পোশাকে ছিলেন, সেই পোশাকেই গাড়িতে উঠে বসলেন। ততক্ষণে ডিবি পুলিশ, র‌্যাব আর গুলশান-বনানী থানার পুলিশ কর্মকর্তারা পৌঁছে গেছেন ঘটনাস্থলে। সে এক শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। সবাই আলোচনা করছেন, কিভাবে কী করা যায়। হলি আর্টিজানের পাশের লেক ভিউ ক্লিনিকের ভেতরে আটকা কয়েকজন, তাঁদের উদ্ধার করে আনা হয়। পুলিশের সদস্যরা নানাভাবে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। মাইকিং করে আত্মসমর্পণ করতে বলা হচ্ছিল।

আছাদুজ্জামান মিয়া বললেন, ‘আমাদের তো রিকভারের জন্য কিছু করতে হবে, যাতে বিদেশিদের মারতে না পারে। লাইভ সেভ করতে হবে।’

পরিকল্পনা হয়, তিনটা দলে ভাগ হয়ে রেস্তোরাঁর তিন গেটে একসঙ্গে অভিযান চালানো হবে। সেই অনুযায়ী এসআই ফারুকসহ আরো কয়েকজন যখন হলি আর্টিজানের মূল গেটের কাছে পৌঁছে গেট খুলতে গেলেন, তখনই হলি আর্টিজানের ভেতর থেকে ছুড়ে মারা হলো বিধ্বংসী গ্রেনেড। বিস্ফোরণের ভয়ানক শব্দের সঙ্গে শোনা গেল গুলির শব্দ। এই হঠাৎ আক্রমণে প্রায় ত্রিশজন পুলিশ সদস্য ছিটকে আসা স্প্লিন্টারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে লুটিয়ে পড়ল রাঁস্তায়। বোমার বিকট শব্দে আছাদুজ্জামান মিয়া পেছনে তাকিয়ে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে কাতরাচ্ছেন একজন অফিসার। তিনি ছিলেন ডিবির এসি রবিউল করিম। আছাদুজ্জামান মিয়ার ঠিক দুই গজ বাঁয়ে ঘুরতে ঘুরতে মাটিতে পড়ে গেলেন বনানী থানার ওসি সালাউদ্দিন খান। এসআই ফারুক তাঁর পা তুলতে পারছিলেন না। তাঁর হাঁটুর বাটি ভেঙে তখন চার-পাঁচ টুকরা হয়ে গেছে, শরীরে বিঁধে গেছে বিশ-পঁচিশটা স্প্লিন্টার। ৭৯ নম্বর সড়কের পূর্ব প্রান্তের রাস্তায় তখন শুধু রক্ত আর রক্ত। আহত পুলিশ কর্মকর্তাদের জখম, শরীর থেকে বেরিয়ে আসা সেই রক্ত ও বারুদের মিলিত গন্ধ একত্র হয়ে রাতের বয়ে যাওয়া হালকা বাতাসকেও যেন স্তম্ভিত করে দিল।

সেই রক্ত আর বারুদের গন্ধ শুঁকে শুঁকে পুলিশের পাশাপাশি খবর সংগ্রহ করতে ঘটনাস্থলে ছুটে এলেন সাংবাদিকরাও।

রায়হানের অফিসে এক সিনিয়র ফটোগ্রাফার বললেন, ‘শুনছ নাকি মিয়া, গুলশানের কোন একটা হাসপাতালে বা হোটেলে সন্ত্রাসীরা হামলা করছে, গুলিগোলার শব্দ নাকি শোনা গেছে।’

রায়হান আর দেরি করল না, মোটরসাইকেলের পেছনে একজন ক্রাইম রিপোর্টারকে বসিয়ে ছুটল গুলশানের দিকে। পুলিশ তখন গুলশানের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে। কী হয়েছে সঠিক খবর পাওয়া যাচ্ছিল না কোথাও। যেন মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছিল সবাই। কয়েকটা টেলিভিশনের সাংবাদিক ঘটনাস্থল থেকে লাইভ সম্প্রচার শুরু করেছিল, দর্শকরা আধো অন্ধকার পর্দায় শুনছিলেন গুলির শব্দ, মানুষের ছোটাছুটি, আর সুনির্দিষ্ট তথ্যবিহীন বিরক্তিকর ধারাবিবরণী। শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে এগারোটার দিকে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ এই সরাসরি সম্প্রচার বন্ধের আহ্বান জানালে টেলিভিশনগুলোতে আর কোনো দৃশ্যের সরাসরি সম্প্রচার হলো না।

রাত দেড়টায় আমেরিকান সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের পক্ষ থেকে রিটা কাট্্জ একটা টুইট পোস্ট করে জানালেন, #আইএস আমাক ক্লেইমড দ্যাট # আইএস কমান্ডোজ অ্যাটাক এ রেস্টুরেন্ট ফ্রিকোয়েন্টেড বাই ফরেনারস ইন ঢাকা # বাংলাদেশ # ঢাকা। ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর নিউজ এজেন্সি আমাক জানিয়েছে, ইসলামিক স্টেটের আইএস জঙ্গিরা ঢাকার রেস্টুরেন্টে হামলা চালিয়েছে।

সারা বিশ্বে এই খবর ছড়িয়ে পড়তে দেরি হলো না।

সারা রাত ধরে হলি আর্টিজান ঘিরে রাখল পুলিশ। রেস্তোরাঁর আশপাশের রাস্তাগুলোতে সাংবাদিক আর গোয়েন্দা সংস্থার মানুষের সঙ্গে উৎকণ্ঠা নিয়ে জেগে থাকল ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্বিগ্ন আত্মীয়-স্বজন।

গোপাল তার বড় ভাই রেস্তোরাঁর বাবুর্চি সমীরের সঙ্গে মোবাইল ফোনে মেসেজ চালাচালি করছিল।

‘কী অবস্থায় আছেন, দাদা?’

‘বাথরুমে আটকে আছি। ওরা বাইরে থেকে দরজা লক করে দিছে।’

‘র‌্যাব সব দেখতেছে। আপনেদের উদ্ধার করে আনবে।’

‘ঠিক আছে। ওরা আমাদের তালা মেরে রাখছে। কিছু বলে নাই।’

‘এখন কেমন আছেন, দাদা?’

‘এখানে খুব কষ্টে আছি। পারলে তাড়াতাড়ি ওয়াল ভাঙো। আমাদের উদ্ধার করো।’

ফারাজের মা সিমিন হোসেন, অবিন্তার মা রুবা আহমেদ সারা রাত থেমে থেমে আসা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি উপেক্ষা করে নির্ঘুম দাঁড়িয়ে রইলেন গুলশানের রাস্তায়, ভয়, অনিশ্চয়তা আর আতঙ্ক নিয়ে, নিজেদের নাড়িছেঁড়া ধন প্রিয় সন্তানের ফিরে আসার অপেক্ষায়।

মালিহার বাবাও ছুটে এসেছিলেন, এসেছিলেন তাহমিদের বাবাও।

জানা যায়, অপারেশন শুরু হবে ভোরের আলো ফোটার পর। অপারেশন করতে সিলেট থেকে সেনা কমান্ডো তলব করা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অপারেশন পরিকল্পনা এগোতে থাকে। সেনাপ্রধান, আইজিপি, র‌্যাব মহাপরিচালকের উপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সভা বসে, সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, অপারেশনের মূল দায়িত্ব পালন করবে সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো ইউনিট, সহায়ক ভূমিকায় থাকবে র্যাব ও পুলিশ।

 

দশ

রেস্তোরাঁর ভেতর গোলমাল শুনে শেফ শিশির সরকার প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো ডাকাত বা সন্ত্রাসীরা ঢুকেছে, টাকা-পয়সা নিয়ে লুটপাট করে চলে যাবে। কিন্তু তাঁর এই ভাবনা যে ভুল ছিল, সেটা তিনি বুঝতে পারলেন, যখন দু-তিন ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার পরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটল না। শিশির আরেক জাপানি নাগরিকের সঙ্গে চিলেকোঠার কোল্ডরুমে লুকিয়ে ছিলেন।

কোল্ডরুমের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া শরীরেও কান পেতে নিচের শব্দ শোনার চেষ্টা করছিলেন শিশির। ‘আল্লাহু আকবর’ চিৎকার আর ফায়ারিংয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল কিছুক্ষণ পর পর। মধ্যরাতের দিকে থেমে গেল সব শব্দ। ঠাণ্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছিল শিশির সরকারের। এরই মধ্যে হঠাৎ খুলে গেল কোল্ডরুমের দরজাটা, সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওদের একজন। হাতে লম্বা বন্দুক।

‘তুমি কি মুসলিম?’ জিজ্ঞেস করল বন্দুকধারী। শিশির মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।

‘যাও, নিচে গিয়ে বসো।’ আদেশ করল বন্দুকধারী।

‘হোয়ার আর ইউ ফ্রম?’ এবার ভীতসন্ত্রস্ত জাপানি লোকটাকে জিজ্ঞেস করল সে।

‘আই অ্যাম জাপানিজ।’ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল জাপানি লোকটা। শুনেই গুলি করল ওরা। মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে গেল বিদেশি লোকটা। চারদিকে শুধু লাশ আর রক্ত। সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল শিশিরের। দুই সহকর্মী—ওয়েটার সবুজ আর শাহরিয়ারের পাশে গিয়ে বসল শিশির।

‘এই, তোমাদের মধ্যে ওয়াই-ফাইয়ের পাসওয়ার্ড কে জানো? যে জানো তাড়াতাড়ি বলো!’

একটা মোবাইল ফোন এগিয়ে দিল লম্বা, দেখতে সুন্দরমতো একটা ছেলে। ‘এই মোবাইলে পাসওয়ার্ড দেও।’ আদেশের সুরে বলল সে। শাহরিয়ার ভয়ে ভয়ে ফোনটা নিয়ে পাসওয়ার্ড দিয়ে দিল। ‘ভেরি গুড।’ খুশি হয়ে উঠল লম্বা ছেলেটা। ফোন কানে নিয়ে কোথায় কোথায় যেন কথা বলল। তারপর লাশের ছবি তুলতে লাগল। চুপচাপ রুমের এক কোনায় বসে দেখল ওরা।

রাত আরো গভীর হলে ছেলেগুলো আবার এলো, ‘এই, তোমাদের মধ্যে বাবুর্চি কে?’

শিশিরকে দেখিয়ে দিল শাহরিয়ার। ‘আসো তুমি আমাদের সঙ্গে, কিচেন কোথায়? কিচেনে চলো।’

শিশিরের সঙ্গে দুজন এসে ঢুকল কিচেনে। ‘তোমাদের এখানে মাছ আছে নাকি? কী মাছ?’

‘সি ফিশ আছে, অন্য সব ধরনের মাছ আছে।’

‘কোরাল মাছ আছে? চিংড়ি মাছ?’

‘আছে।’ শিশির মাথা নেড়ে বলল। ‘দারুণ!’ একটা ছেলে বেশ খুশি খুশি গলায় বলল, ‘এগুলো এবার মসলা দিয়ে ভালো করে ফ্রাই করো।’

শিশির এই কাজে পারদর্শী, প্রতিদিনই তো গেস্টদের জন্য এসবই রান্না করে; কিন্তু আজকে তার হাত কাঁপছে,  কাঁপা কাঁপা হাতেই কোনো রকমে মাছ ভাজা শেষ করল সে। শাহরিয়ার নিচ থেকে এসে খাবারগুলো সাজিয়ে দিল প্লেটে, যেভাবে প্রতিদিন সাজায়।

‘হুম্, রান্না তো ভালোই পারিস।’ ওদের একজন খাবারগুলো দেখে বলে উঠল। ‘এইখানে কাজ করিস কেন? এইখানে তো সব বিদেশিরা আসে। বিদেশিরা কি ভালো? ওরা খারাপ কাজ করে, মদ খায়, গাঁজা খায়, অশ্লীল পোশাক পরে, অশ্লীল কাজকর্ম করে। আমাদের ধর্ম নষ্ট করে।’

আরেকজন কিছু না বলে খাবার ট্রেতে সাজিয়ে নিচে নেমে যায়। যাদের হত্যা করেনি, তাদের খেতে দেয়।

‘চা, কফি কী আছে কর! আর রোজার দিন, তোরা যারা আছিস এখানে, তাদের নিয়ে সেহরি খেয়ে নে।’

লম্বা ছেলেটা বলে।

‘আমার পানি খাইলেই চলবে, ভাই, আর কিছু লাগবে না।’ শাহরিয়ার মুখ ফসকে বলে ফেলে।

‘বেশ বেশ, নে, পানিই খা।’

শাহরিয়ার ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খায়। তারপর জোরে জোরে রোজার নিয়ত পড়ে, ‘নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহির রমজানাল মুবারাকি...’

‘শাব্বাশ!’

ছেলেটা হাসিমুখে অন্যদিকে চলে গেলে নিয়ত পুরোটা শেষ না করেই ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে শাহরিয়ার। শিশির গিয়ে ওর হাত ধরে।

‘এই রাত কখন শেষ হইব, ভাই? আমি আর পারতাছি না...’ শাহরিয়ার কাঁদতে থাকে। ‘ওরা কি শেষ পর্যন্ত বাঁচতে দেবে? নাকি মাইরা ফেলবে?’

তখন ধীরে ধীরে ভোর হচ্ছে। পুবের আকাশে অল্প অল্প করে আলো ফুটে উঠছে, আরেকটা নতুন দিন শুরু হতে যাচ্ছে, ছেলেগুলোর মধ্যে তখন চঞ্চলতা বাড়ে। তারা জোরে জোরে পায়চারি শুরু করে। একজন সবুজকে বলে, ‘যা, বাথরুমে যারা লুকায়া আছে, তাদের ছেড়ে দে! বল, আমরা ওদের মারব না।’

 

এগারো

সকাল সাতটা বিশ মিনিটের দিকে গুলশানের রাস্তায় সেনাবাহিনীর জিপ আসতে শুরু করে। জিপ থেকে অস্ত্র হাতে লাফিয়ে নামছিলেন আর্মির কমান্ডোরা, তাঁদের মাথায় হেলমেট, পায়ে বুট, হাতে আর কাঁধে ঝোলানো রাইফেল। তাঁরা দুটি দলে ভাগ হয়ে রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত ধরে কমান্ডো স্টাইলে হাঁটু গেড়ে এগোতে শুরু করলেন। নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সশব্দে ঘুরতে শুরু করল কামানের বিশাল চাকা। গুলির আওয়াজ আর আকাশ কাঁপানো বিকট শব্দে শুরু হলো প্যারাকমান্ডোর অপারেশন ‘থান্ডারবোল্ট’।

এই অপারেশনের অধিনায়ক লে. কর্নেল এম এম ইমরুল হাসান পয়লা জুলাই ছিলেন ছুটিতে, কয়েক দিন আগে ডেঙ্গু থেকে সেরে উঠেছেন, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু অবকাশ কাটাতে গেছেন হবিগঞ্জের বাহুবলে, রিসোর্ট দ্য প্যালেসে। ঢাকায় যখন হলি আর্টিজানে হামলা হচ্ছে, তখন বাচ্চাদের নিয়ে প্যালেসের ভেতর ওদের নিজস্ব সিনেমা হলে একটা ধুমধাড়াক্কা সিনেমা দেখতে বসেছিলেন তিনি।

ফোনটা এলো তখনই। প্যারাকমান্ডো ব্যাটালিয়নের জীবনটাই এমন, যেকোনো সময় যেকোনো অভিযানের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। ইমরুল হাসানও ঘটনা শুনেই তৈরি হয়ে নিলেন। ফোনে অর্ডার দিয়ে অফিসার আর সৈনিকদের সিলেট আসতে বলে রাত সাড়ে এগারোটায় ফ্যামিলি রেখে তিনি বন বিভাগের গাড়িতে চেপে রওনা দিলেন সিলেটের দিকে। পথে একটা ট্রাকের সঙ্গে অ্যাকসিডেন্ট হলো তাঁকে বহন করা গাড়ির, শেষ পর্যন্ত নানা ঝামেলা শেষে রাত দেড়টায় এসে পৌঁছলেন সিলেট বিমানবন্দরে। এদিকে তাঁর ইউনিফর্ম আর বুট তো আর সঙ্গে করে হবিগঞ্জে নিয়ে যাননি, সেসব ছিল সিলেট ক্যান্টনমেন্টের বাসায়। ইমরুল হাসান তাঁর রানারকে বললেন সেগুলো নিয়ে এয়ারপোর্টে আসতে।

রাত তিনটা নাগাদ ব্যাটালিয়নের সবাই এয়ারপোর্টে এসে পৌঁছলে তিনটা পঁয়ত্রিশে সিলেট থেকে প্লেন ছাড়ল। সবাই উত্তেজনা আর আতঙ্কে স্থির, ভেতরের চাপ সামলে নিতে নীরব। প্লেন কুর্মিটোলায় ল্যান্ড করার পর ব্যাটালিয়ন নিয়ে সোজা ক্যান্টনমেন্টে।

সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং হলো। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও এসে গেছে। অপারেশনাল কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হলো ইমরুল হাসানকে। চিফ অব আর্মি স্টাফ তাঁর কাঁধে হাত রেখে অত্যন্ত আবেগময় কণ্ঠে বললেন, ‘বেস্ট অব লাক।’

সিলেট থাকতেই ফোন করে সাভার থেকে চারটি আর্মড পারসোনাল ক্যারিয়ার এপিসি, স্থানীয় ভাষায় যাকে কামান বলে, তা আনিয়ে রেখেছিলেন কমান্ডো অধিনায়ক। ভোর সাড়ে পাঁচটায় গুলশান গিয়ে দেখেশুনে পুরো পরিস্থিতি যাচাই করেন তিনি। ডিজি র‌্যাব, পুলিশ কমিশনার, হলি আর্টিজানের মালিকের সঙ্গে কথা হয়। সবার সঙ্গে কথা বলেই স্ট্র্যাটেজি ঠিক করে নেন তিনি।

সকাল সাতটা দশ মিনিটে ক্যান্টনমেন্ট থেকে কমান্ডো ট্রুপস রওনা দিল গুলশানের দিকে।

অপারেশন শুরুর আগেই আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুই হাত ওপরে তুলে হলি আর্টিজানের সবুজ লন পেরিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলেন কয়েকজন। তাঁরা ছিলেন হাসনাত করিম, তাঁর স্ত্রী শারমিনা করিম, দুই বাচ্চা শেফা করিম ও রায়হান করিম, একজন আহত জাপানি নাগরিক, তাহমিদ ও তাঁর দুই বান্ধবী ফাইরুজ মালিহা ও তাহানা তাসমিয়া।

খবরটা জেনে, অবস্থা বুঝে, পরিকল্পনা কাটছাঁট করে চারটি এপিসি নিয়ে অপারেশন শুরু করেন ইমরুল হাসান। তিনি জানেন, এসব অপারেশনের ক্ষেত্রে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ থাকে। যেমন—নিজেদের সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে শত্রুদের ধ্বংস করতে হয়। জিম্মিদের জীবিত উদ্ধার করতে হয়। অধিনায়কের নির্দেশ অনুযায়ী প্রথমেই কামান দিয়ে হলি আর্টিজানের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়, তারপর শুরু হয় ফায়ার। ইমরুল হাসান একটা গাড়ির পেছনে কাভার নিয়ে এসএমজির ফায়ার করছিলেন। এমন সময় জিন্স আর গেঞ্জি পরা একটা ছেলে পিস্তল হাতে বেরিয়ে এসে গুলি করার চেষ্টা করে। ইমরুল হাসানের হাতের এসএমজি গর্জে উঠলে সে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লেফটেন্যান্ট কর্নেলের পেছন থেকে এক সৈনিক চিৎকার করে ওঠে, ‘স্যার কাভার, কাভার, গ্রেনেড, গ্রেনেড।’

লেক ভিউ ক্লিনিকের সামনে আরেকটি ছেলে তখন গ্রেনেড ছুড়ে মারার জন্য হাতের হ্যাঁচকা টানে পিন খোলার চেষ্টা করছিল। পরে ছবি দেখে তাকে নিবরাস ইসলাম বলে শনাক্ত করতে পেরেছিলেন ইমরুল হাসান। কিন্তু গ্রেনেডের পিন খোলার আগেই অধিনায়কের এসএমজির গুলির টার্গেট হয় সে। বাকি তিনজন মারা যায় নিচতলায়, কমান্ডো বাহিনীর অন্য সৈনিকদের গুলিতে। অপারেশনের সময় ছিল মাত্র তেরো মিনিট। কমান্ডোদের গ্রেনেড, জঙ্গিদের গ্রেনেড মিলিয়ে পুরো ভবন ততক্ষণে তছনছ হয়ে গেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইমরুল হাসান ভবনটিতে ঢুকে দেখতে পান, বিশটি লাশ বীভৎসভাবে পড়ে আছে। তাঁর মনে হয়, এত নিষ্ঠুর কোনো মানুষ হতে পারে? নারকীয় নৃশংসতায় মানুষগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। কারো হাত-পা কেটেছে। কারো শরীরের মাংস ছেঁচে ফেলেছে।

তেরো মিনিটের অপারেশন শেষে সেনাপ্রধানকে রিপোর্ট করেন প্যারাকমান্ডো অধিনায়ক। তখন সকাল সোয়া আটটা। সেনাপ্রধান এসে জড়িয়ে ধরলেন ইমরুল হাসানকে। দেখতে চাইলেন ভেতরটা। দেখলেনও, যতটা বীভৎসতা সহ্য করা সম্ভব সেভাবে। তেরোজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলো। তারা বেশির ভাগই ছিল হোটেলের কর্মচারী।

 

বারো

২০১৬ সালের ৩ আগস্ট গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ঘটনার প্রায় এক মাস পর গ্রেপ্তার করা হয় হাসনাত করিম আর টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তাহমিদ হাসিব খানকে। তাঁদের নিয়ে প্রথম আলোচনার সূত্রপাত হয় এক কোরিয়ান নাগরিকের গোপনে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর। সেখানে হাসনাত করিম আর তাহমিদকে দেখা যায় হলি আর্টিজানের ছাদে ভোরবেলা জঙ্গিদের সঙ্গে কথা বলছেন, বেশ ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। অনেকে অনুমান করেন, এই হত্যাযজ্ঞের মূল পরিচালক হাসনাত করিম। তাঁর অতীত ইতিহাস এই ধারণাকে আরো পোক্ত করতে সাহায্য করে। জানা যায়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সাবেক অধ্যাপক একসময় হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন; যদিও সংগঠনটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর তিনি আর এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি বলে জানিয়েছেন হাসনাত। তা ছাড়া তারা হাসনাতসহ হলি আর্টিজানে আটকে পড়া আরো ছয়জনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেছিল।

তাহমিদকে নিয়েও সন্দেহ দানা বাঁধে, কারণ হলি আর্টিজান হামলার মাত্র এক দিন আগে কানাডা থেকে দেশে ফেরেন তাহমিদ। এসেই কেন ওই সময়ে দুই বান্ধবীকে নিয়ে আর্টিজানে গেলেন তিনি। এটা কি কাকতালীয়, নাকি হাসনাত আর তাহমিদের সঙ্গে সত্যিই যোগসাজশ ছিল জঙ্গিদের। গোয়েন্দারা তদন্ত করতে গিয়ে খুঁজে পাচ্ছিল নতুন নতুন রহস্য, সামনে আসছিল সব জটিল সমীকরণ।

‘কিভাবে ছাদে গেল হাসনাত আর তাহমিদ, যদি জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া না থাকে!’

‘এত লোককে মারল, তবে ওদের কেন ছেড়ে দিল, যদি জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের ভালো সম্পর্ক না থাকে!’

এই ছিল সাধারণ লোকের প্রশ্ন। রিমান্ডে নিয়ে পুলিশ সেই ধরনের প্রশ্নই করেছিল দুজনকে। আর সেসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই বেরিয়ে আসে আরো অনেক তথ্য।

তাহমিদ, ফাইরুজ, তানহা আর সত্যপ্রকাশ নামের এক বয়স্ক ভদ্রলোককে এনে ওরা বসিয়ে দেয় হাসনাত পরিবারের টেবিলে। একজন আদেশের সুরে বলে, ‘বাইরে ফোন করে তোমাদের আত্মীয়দের জানিয়ে দাও যে তোমরা ভেতরে আছ।’

হাসনাত করিম তাঁর চাচাকে ফোন করেন। ফাইরুজ মালিহা ফোন করে তার বাবাকে, ‘বাবা, আমি ভেতরে আছি, ভালো আছি, আমার জন্য দোয়া করো, বাবা।’ বলে কেঁদে ফেলে ফাইরুজ।

একটা লম্বা ছেলে, পরে যাকে নিবরাস হিসেবে শনাক্ত করা হয়, এসে বসে হাসনাত করিমের টেবিলের সামনে। ওর চেহারাটাই হাসিখুশি ধরনের, বোঝা যায়, ও কথা বলতে পছন্দ করে। অন্যরা যেমন গম্ভীর হয়ে কঠিন মুখে চলাচল করছিল, তেমন নয় ও। নিবরাস একটু ঝুঁকে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি নামাজ পড়েন? ভোট দেন?’

‘নামাজ পড়ি, তবে ভোট দিই না।’ হাসনাত করিম জবাব দিলেন।

‘সুরা আল ফাতিহা তেলাওয়াত করতে পারবেন? করেন তো!’

‘এবার এর বাংলা অর্থ বলেন।’

হাসনাত করিম আরবিটা ঠিকমতো বলতে পারলেও বাংলা অর্থটা ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না। নিবরাস তাতে কিছু বলল না। ফলে এত অস্বস্তির মধ্যেও একটু যেন স্বস্তি পেলেন হাসনাত করিম। একটু পরেই দলনেতা রোহান এসে দাঁড়াল সামনে, জিজ্ঞেস করল, ‘কার ফোনে ইন্টারনেট আছে?’

হাসনাত করিম স্বীকার করলেন, তাঁর ফোনে ইন্টারনেট আছে। ভয়ে ছিলেন তিনি, যদি অস্বীকার করেন আর পরে ধরা পড়ে যান, তাহলে হয়তো ওরা তাঁকে এই অপরাধেই মেরে ফেলবে। এ সময় সবার ফোনই নিয়ে যায় ওরা। কথা বলে কারো সঙ্গে। তখনই সম্ভবত ওপাশ থেকে নির্দেশ আসে সবার মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার। তারপর তারা যা করে, সেটা রীতিমতো অবিশ্বাস্য মনে হয় তাহমিদের কাছে। ছেলেগুলো যেন একেকজন নির্দয় জল্লাদ হয়ে ওঠে, ধারালো চাপাতি দিয়ে প্রতিটি গুলিবিদ্ধ লাশ কোপাতে শুরু করে তারা। চোখে দেখতে না চাইলেও আওয়াজ শুনতে হয়েছে তাদের। এর মধ্যে দু-একজন গুলিবিদ্ধ হয়েও তখনো মারা যাননি। সেই কয়েকজনকে নির্মমভাবে ধারালো ছুরি দিয়ে বারবার আঘাত করেছে ওরা। কুপিয়ে জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। সেই দুর্ভাগাদের মরণচিৎকার কানে এসেছে রেস্তোরাঁয় ওদের দয়ায় টিকে থাকা জীবিতদের। তাহমিদের কানে এখনো বাজে নারীকণ্ঠের ভয়াবহ আর্তনাদ আর চিৎকারের শব্দ। এরপর ফ্লাশ জ্বালিয়ে মৃতদেহের ছবি তোলে ওরা।

রাত বাড়লে বেয়ারাদের ডেকে ওদের টেবিলে খাবার দিতে বলে জঙ্গিরা। বেয়ারারা বেকারি থেকে কেক আর পানি এনে রাখে। সঙ্গে কিছু ভাজা মাছ। কিন্তু ওই নারকীয় পরিবেশে কিছু খাওয়ার রুচি ছিল না ওদের।

‘আপনাদের সেহরি খাওয়া উচিত। মুসলমানরা রোজা রাখে। তাই না?’

সবাই পানি খেল, খারাপ লাগলেও কেক ভেঙে একটু খেল ওরা। মাছ ভাজাও একটুখানি মুখে দিলেন হাসনাত। তারপর মাথা নিচু করে বসে রইলেন টেবিলে।

হাসনাত পুলিশদের জানান, ওরা কিছু অডিও রেকর্ডও বাজিয়ে শোনায় তাঁদের, যেখানে ইসলামিক স্টেটের প্রতি তাদের আনুগত্য ও তাদের বিশ্বাসের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। যার মধ্যে গণতন্ত্র নিয়ে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়। তারা বলছিল যে সিআইএ মুসলিম দেশগুলোতে অনধিকার চর্চা করছে এবং ক্ষমতায় বসাচ্ছে মধ্যপন্থী মডারেট সরকারকে। পক্ষান্তরে তারা সব মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামিক ব্যবস্থা চায়।

একটা কালো ছেলে, মুখে দাড়ি, যাকে পরে সামিহ মোবাশ্বির বলে শনাক্ত করা হয়, সে হাসনাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘আজকের রাতটা অন্য রকম, তাই না? এই রাতের বৈশিষ্ট্য কী জানেন?’

যদিও সেটা শবেকদরের রাত ছিল না, তবু হাসনাতের মনে হয়েছিল, ছেলেটি শবেকদরের রাতের কথাই শুনতে চায়। হাসনাত তা-ই বললেন, ‘এটা শবেকদরের রাত।’

বাইরে তখন রাত শেষ হয়ে ধীরে ধীরে আলো ফুটছিল। টেবিলে বসে মাথা নিচু করে ঝিমাচ্ছিলেন হাসনাত। মনের মধ্যে হাজারো চিন্তা। জঙ্গিরা কি শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখবে, নাকি মেরে ফেলবে? তাদের মনে কী আছে কে জানে? এই সময় এলো রোহান। হাসনাত করিমের কাঁধে টোকা দিয়ে তাঁকে উঠে দাঁড়াতে বলল। তারপর তাহমিদের দিকে ফেরে ও। বলে, ‘তুমিও আসো।’ তাহমিদ প্রথমে না শোনার ভান করে, তারপর ফ্যাচফেচে গলায় জানতে চায়, ‘ভাইয়া, আমি?’

‘হ্যাঁ, চলো আমার সঙ্গে।’

বন্দুকের মুখে রেখে যা বলবে তা-ই তো শুনতে হবে। রোহান বলে, ‘ওপরে আসো। ছাদে।’

তাহমিদকে একটা কালো পিস্তল ধরিয়ে দিল হাতে। তাহমিদ প্রথমে বলে, ‘না ভাইয়া, আমি পারব না।’ কিন্তু রোহান কোনো কথা না বলে ঠাণ্ডা চোখে পিস্তলটা বাড়িয়ে দিলে শেষ পর্যন্ত ওটা হাতে নেয় তাহমিদ।

প্রথমে হাসনাত, তাঁর পেছনে তাহমিদ, তারও পেছনে ছাদে আসে রোহান।

‘যান, ডান দিকে হেঁটে গিয়ে আবার ফিরে আসেন।’

‘এবার পাশের দোতলা বাড়ির দিকে যান।’

‘ওই যে দেখো পুলিশ বসে আছে’ বলে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি হাসে রোহান। ‘ওই ছাদে দেখো স্নাইপারও আছে’, যেন খুব মজা পাচ্ছে, এমনভাবে ঠাট্টার হাসি হাসে রোহান। হাসনাত এই সুযোগে একটু কথা বলার চেষ্টা করে, ‘ইয়ে, মানে আপনাদের প্ল্যান কী? আমাকে কি মেরে ফেলবেন?’

‘ওই যে ওই ছাদেও পুলিশ আছে।’ হাসনাতের কথার উত্তর না দিয়ে দূরের একটা ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল সে। হাসনাত আর তাহমিদ ভয় পাচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে হামলাকারী ভেবে পুলিশ ওদের গুলি করতে পারে, অথবা মন চাইলে রোহানও যেকোনো সময় গুলি করে দিতে পারে।

‘আমাদের না ছাড়লেও অন্তত বাচ্চাদের আর মহিলাদের ছেড়ে দেন।’ অনুনয় করলেন হাসনাত। কিন্তু এর উত্তরে কিছুই বলল না রোহান। ইশারা করে ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার। আসলে হাসনাত আর তাহমিদকে ব্যবহার করে হলি আর্টিজানের আশপাশের পরিস্থিতি দেখছিল রোহান। এই সময়ই রোহানের সঙ্গে তাহমিদ আর হাসনাতের ঘোরাঘুরির ছবি তোলে আশপাশের বাসার বাসিন্দারা।

ছাদ থেকে ফিরে আরো ঘণ্টাখানেক পার হয়ে গেল। একসময় ওপরতলা থেকে অনেকগুলো ফোন নিয়ে নেমে এলো নিবরাস। বলল, ‘যার যে ফোন নিয়ে যাও।’

রোহান বলল, ‘গেট খুলে চলে যাও। ভালো হয়ে থেকো। আর এই যে সত্যপ্রকাশ, এটা কোরআন। পড়ে দেখবেন।’

পরে ছোট গেট খুলে প্রথমে হাসনাত করিম মেয়েকে নিয়ে হেঁটে বেরিয়ে এলেন, পেছনে বেরোল অন্যরা।

 

 

তেরো

...মরতে হবে জানতাম। আসলে আমরা তো অপেক্ষাই করেছিলাম নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য। মৃত্যুভয়? না, মৃত্যুভয়ে ভীত ছিলাম না আমরা। কেননা আমরা জানতাম, মৃত্যু শুধু মৃত্যুকেই ডেকে আনতে পারে। সবাই জানেন, মৃত্যুই মানুষের শেষ গন্তব্য। মৃত্যুভয় নেই আমাদের, কারণ এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর আগেই তো আমরা নিজেদের মৃত ঘোষণা করেছি। তোমরা আমাদের শাস্তি দেওয়ার আগেই আমরা চলে গেছি শাস্তির অতীত কোনো জগতে। তোমাদের আইন বা অস্ত্র আমাদের ধরতে পারবে না, ছুঁতেও পারবে না।

মনে পড়ছে না, আজ কি আমাদের মৃত্যুর পঞ্চম না ষষ্ঠ দিন? নাকি আরো বেশি, হয়তো অনন্তকাল ধরেই মরে পড়ে আছি, এই লাশকাটা ঘরের কাঠের টেবিলে। আমাদের মৃত্যুতে কোথাও কোনো শোক নেই। প্রশ্ন নেই। প্রকাশ্য কোনো ক্রন্দন নেই। এই মৃত্যু কি আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছিল, কিংবা এই জীবন?

এখন তো মনে হচ্ছে, আমাদের জন্মটাই ছিল এক অসুস্থ জন্ম। অসুস্থ পৃথিবীর অসুস্থ একেকজন সন্তান আমরা। কিন্তু যে রকম ওরা বলেছিল, বলেছিল একটা গভীর গর্তের মুখে জীবন নামের রশি ধরে ঝুলে আছি আমরা, নিচে অজগরের মতো হাঁ করে বিকট মুখ খুলে আছে ভয়ংকর কবর, ওপরে মৃত্যু আছে সিংহের রূপ ধরে, আমাদের সামনে একটা মধুর চাক—মানে জীবন, সেই চাকে হাত দিয়ে জীবনের মধু খাচ্ছি। দুনিয়াদারি হচ্ছে সেই মধু। এই মধু ক্ষণস্থায়ী, এসবই প্রলোভন।

আমরা এই জগেক উদ্ধার করতে চাইছিলাম। সমস্ত অন্যায়, অবিচার থেকে। দখলদারি আর বিধর্মীদের ধূর্ত উল্লাসের কাছ থেকে। লুটেরা বিশ্বতন্ত্রের কবল থেকে। নিপীড়নমূলক বিশ্বব্যবস্থা থেকে।

না, আমাদের লাশ কেউ গ্রহণ করতে আসেনি।   মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজন—সবাই অস্বীকার করেছে আমাদের। ঘৃণায়, লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আমরা বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে আছি। পাঁচজন পাশাপাশি। তোমরা বলো, আমরা বেপথে গেছি। কেন গেছি, তা কি জানো? জানো কি, আমাদের মনভাঙা কষ্টের গল্পগুলো?

রোহানের বাবা নিজেকে ব্যর্থ পিতা বলেছেন। বলেছেন, যে রোহান তেলাপোকা দেখে ভয় পেত, সেই রোহান কিভাবে এত বড় খুনি হয়ে উঠল? কিভাবে রোহান হলি আর্টিজানের পুরো ধ্বংসলীলায় নেতৃত্ব দিল? রোহান তো ইংরেজি মাধ্যমের বিখ্যাত স্কুল স্কলাস্টিকায় পড়াশোনা করেছে। আধুনিক চিন্তাচেতনায় বড় হয়েছে। হ্যাঁ, রোহান ধার্মিক ছিল। ছোটবেলা থেকে নানার সঙ্গে মসজিদে যেত, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। কিন্তু কখনো তো ধর্মান্ধতা দেখা যায়নি তার মধ্যে। তাহলে কে ওই সরলমনা ছেলেটাকে বিগড়ে দিল? কে তাকে ছয় মাস আগে বাড়ির বাইরে নিয়ে গেল? কিভাবে জলজ্যান্ত ছেলেটি নিখোঁজ হয়ে গেল?

আর ওই সুন্দর চেহারার লম্বা ছেলেটি? তোমরা কি চেনো ওকে? মা-বাবা যার নাম রেখেছিল নিবরাস ইসলাম। দুই বছর আগে পর্যন্তও নিবরাস ছিল আর দশজন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রের মতোই। ফুটবলপাগল একটা ছেলে, যে বন্ধুদের সঙ্গে প্রাণ খুলে হাসত, মজা করত, নাচত, বিতর্ক করত, ছবি তুলত, সেলফির পর সেলফি তোলা ছিল ওর হবি।

সেই নিবরাস কিভাবে বদলে গেল? কবে থেকে বদলে গেল? এই নিবরাসই তো গত বছর মায়ের ছবি পোস্ট করেছে ফেসবুকে, লিখেছে, ‘তুমি আমার জন্য যা করেছ, সবই আমি ভালোবাসি। তোমার প্রতিটি সমস্যা আমার জন্য। আমার খুব ইচ্ছা করে আমি যদি তোমার পাশে থাকতে পারতাম। তোমাকে এখন আমার খুব প্রয়োজন। আমি তোমাকে ভালোবাসি, আম্মু!’

হায়, সেই ভালোবাসার আম্মুর বুক ছেড়ে নিবরাস এখন পড়ে আছে মর্গে, লাশকাটা ঘরে। কোথায় নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল নিবরাস? কেন সে বেছে নিল চিরবিদায়ের এমন কলঙ্কিত পথ? যে নারীর দিন রঙিন হয়ে উঠত নিবরাসের হাসি দেখলে, যে তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল, তার নাগাল পাওয়ার জন্য ছিল উন্মুখ, সেই নারীর প্রেমও কি তাকে রুখতে পারল না সর্বনাশের পথে হারিয়ে যাওয়া থেকে?

চার মাস আগে কোচিংয়ে যাওয়ার জন্য বনানীর বাসা থেকে বেরিয়েছিল সামিহ। মীর সামিহ্ মোবাশ্বির শান্ত, চুপচাপ স্বভাবের, স্বল্পভাষী ছেলেটি। ‘ছোটবেলা থেকে গেমস খেলতে পছন্দ করত, লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিল। বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর সে কোথায় ছিল, কাদের সঙ্গে ছিল, তা আমরা জানতে পারিনি। সামিহ যে এমন ভয়ংকর একটা কাজ করতে পারে, তা স্বপ্নেও কোনো দিন ভাবতে পারিনি। কোথা থেকে কী হয়ে গেল বুঝতে পারছি না। এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না এটা সামিহ!’ সামিহর বড় ভাই সাদ্দাম মোবাশ্বির বলেছিলেন গণমাধ্যমে।

সামিহর বাবা বারবার হা-হুতাশ করছিলেন, ‘ও আমার ছেলে হতে পারে না। আমি যদি জানতাম ও কোথায় যাচ্ছে, তাহলে জীবন দিয়ে হলেও থামাতাম।’

‘আহা, যখন হারিয়ে গেল আমরা প্রথমে ভাবলাম, সামিহ কারো প্রেমে পড়েছে আর তাকে নিয়ে পালিয়ে গেছে। আবার কখনো মনে হতো, কেউ কি ওকে অপহরণ করল? পুলিশকে তো জানিয়েছি; কিন্তু ওরাও তো কিছু বলতে পারছিল না। হ্যাঁ, মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে ধর্মের ব্যাপারে সামিহর বেশ আগ্রহ ছিল। আমরাও তার ধর্মবিশ্বাসকে নিরুৎসাহ করিনি; বরং ওকে কোরআনের ইংরেজি সংস্করণ কিনে দিয়েছিলাম, যাতে ইসলামের ব্যাপারে কোনো বিকৃত ধারণা না পায়; বরং ইসলাম সম্পর্কে জেনে-বুঝে নিজের বিশ্বাস নিজেই গড়ে তুলতে পারে। মাত্র আঠারো বছর বয়সের একটা ছেলে সামিহ্, এ রকম সিদ্ধান্ত সে নিজে থেকে নেয়নি, নিশ্চয়ই কেউ তাকে প্রভাবিত করেছে। আমি আমার ছেলের হয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই।’

ঘাতক দলের বাকি দুজন—উজ্জ্বল আর পায়েল এসেছিল বগুড়া থেকে। পায়েলের পড়াশোনা মাদরাসা লাইনে আর উজ্জ্বল পড়েছে সাধারণ স্কুল-কলেজে। বাড়িতে দুজনেরই যোগাযোগ কম, সর্বশেষ মাস ছয়েক আগে বাড়ি গিয়েছিল ওরা। দুজনই দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। এমনকি নিজের খরচে সন্তানের লাশ বাড়িতে নেওয়ার সামর্থ্যও নেই তাদের, সরকার যদি নিজের খরচে লাশ পাঠায়, তবে সেটা নিতে রাজি হয়েছিল দুই পরিবার।

‘মোর ছাওয়াল ডান দিকের দাঁতের সারির উপরে আরেকটা ছোট্ট দাঁত ছিল, হাসি দিলে দেখা যাতো, আর ছোডবেলায় সাইকেল চালাতি গে ডান পায়ের বুড়া আঙ্গুল কাটা পড়ছিল...।’ উজ্জ্বলের বাপ ছেলের লাশ শনাক্ত করার জন্য বলেছিলেন পুলিশর্ কর্তাদের।

‘মোর ছাওয়াক মোর বাড়ির কোনাত দাফন করমো; কিন্তু তারে যে ঢাকা থাকি আনমু সেই টেকা কোনে পামু...।’ আহাজারি করে বলেছিলেন উজ্জ্বলের মা, ‘ছোয়াল যা-ই করুক, পেটের ছোয়াল তো, লাশখানা ফেরত চাই গো, যদি সরকার দে যায়...।’

শেষ পর্যন্ত তিন মাস পর মাটি পেল রোহান, নিবরাস, সামিহ, উজ্জ্বল আর পায়েলের মৃতদেহ। আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম জুরাইন কবরস্থানে তাদের লাশগুলো দাফন করে। কর্তৃপক্ষ জানায়, নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ নেওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা না পড়ায় তা আঞ্জুমান মুফিদুলের মাধ্যমে দাফন করা হলো।

পৃথিবীতে কেউ কেউ জেনেশুনে বিষফল তুলে নেয় মুখে, কারো কারো রক্তের ভেতর ঘৃণা, হিংসা, বিদ্বেষ আর বিভক্তির স্রোত বয়ে চলে। রক্ত ঝরে, প্রলয় আসে, আবার সব থিতু হয়ে যায়। অতীত হয়ে যায়। কিন্তু সব ক্ষত শুকায় না, দাগ রেখে যায়। গভীর কষ্টের চিহ্ন স্মৃতি হয়ে থাকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা