kalerkantho

সোমবার । ২৬ আগস্ট ২০১৯। ১১ ভাদ্র ১৪২৬। ২৪ জিলহজ ১৪৪০

অ নু বা দ উ প ন্যা স
নোবেলজয়ী টনি মরিসনের উপন্যাস

আ মার্সি

অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৫৮ মিনিটে



আ মার্সি

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

ভয় পাবেন না। আমি যা করেছি, সেটা জানার পরও আমার কাহিনি শুনে আপনি দুঃখ পাবেন না। কথা দিচ্ছি, আমি অন্ধকারে চুপচাপ শুয়ে থাকব। হয়তো একটু কাঁদব। অথবা দু-একবার রক্তের দিকে তাকাব। কিন্তু উঠে দাঁড়ানোর জন্য হাত-পা ছড়াব না। দাঁত পর্যন্ত বের করব না। আমি সবিস্তারে বলছি। আপনি ইচ্ছা করলে আমার কথাগুলোকে একরকম স্বীকারোক্তি বলতে পারেন। তবে এখানকার স্বীকারোক্তির মিল পাবেন শুধু স্বপ্নের ঘটনার সঙ্গে। আরেকটা জিনিসের সঙ্গেও মিল পাবেন—সেটা হলো কেটলি থেকে ওঠা বাষ্পের মধ্যে খেলা করতে দেখা কুকুরের মুখের এক পাশের আদল। আরো একটা জিনিসের কথা ভাবতে পারেন : শস্যদানার খোসা দিয়ে বানানো পুতুল। হয়তো দেখলেন, সেটা একটা তাকের ওপর বাসানো আছে। কিন্তু পরের মুহূর্তে দেখলেন, সেটা রুমের এক কোনায় পড়ে আছে। আসলে কী করে পুতুলটা কোনায় গিয়ে পড়েছে, সেই কারণটা কিন্তু খুব সোজা। এর চেয়ে আরো অদ্ভুত সব ঘটনা অহরহ সবখানে ঘটে যাচ্ছে। সে তো আপনারা জানেনই। আপনারা যে জানেন, তা-ও আমি জানি। একটা প্রশ্ন হলো, এসবের জন্য দায়ী কে? আরেকটা প্রশ্ন হলো, তুমি বুঝতে পারো? একটা ময়ূরী যদি ডিমে তা দিতে না চায়, আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি।

শুরুটার শুরু হয় জুতা দিয়ে। ছোটবেলায় কিছুতেই খালি পায়ে থাকা মানতে পারি না আমি। জুতার জন্য বায়না ধরি। যেকোনো মানুষের জুতা। কাঠফাটা গরমের দিনেও আমার জুতা চাই। এ মিনহা মাই, আমার মা, আমার ওপর রেগে যায়। বলে, আমার সাজগোজের ঢং দেখে তার ভালো লাগে না। হাইহিলের জুতা পরে খারাপ মেয়েছেলেরা। মা বলে, আমি বিপজ্জনক, আমি বেয়াড়া। তবু মা রাগ কিছুটা থামায় একসময়, সেনিওরার বাড়ির ফেলে দেওয়া জুতা পরতে দেয় আমাকে। একটার মাথা খুব চোখা, উঁচু হিল ভেঙে গেছে। ওপরে বকলেসওয়ালা আরেকটা রং চটে ক্ষয় হয়ে গেছে। সে জন্যই লিনা বলে, আমার পা জীবনের কোনো বাস্তব প্রয়োজনে কাজে লাগবে না। কাজে লাগার তুলনায় আমার পা সব সময় এ রকম নরমই থেকে যাবে। যে পা বাস্তব প্রয়োজনে কাজে লাগতে পারে, তার তলা আরো শক্ত হতে হয়। চামড়ার চেয়েও শক্ত। লিনার কথাই ঠিক। লিনা বলে, ফ্লোরেন্স, এটা ১৬৯০ সাল। আজকের দিনের আর কার এ রকম ক্রীতদাসীর হাত আর পর্তুগিজ মহিলার পা আছে? সে জন্যই আমি যখন তোমাকে খুঁজতে বের হই, মিস্ট্রেস আর লিনা আমাকে স্যারের বুটজুতা দেয়। সেই জুতা পুরুষ মানুষের পায়ে লাগে, কোনো মেয়ের পায়ে লাগে না। জুতার ভেতরে তারা খড় আর শস্যের তৈলাক্ত খোসা ভরে দেয়। চিঠিটা আমার মোজার ভেতর লুকিয়ে রাখতে বলে। সিলগালার ঘষা পায়ে লাগলেও সেটা বলার মতো কিছু নয়। আমি পরতে পারি। কিন্তু মিস্ট্রেস চিঠিতে কী লিখেছেন, আমি পড়ি না। লিনা আর সরো পড়তে পারে না। আমাকে যদি কেউ থামায়, তাহলে তাকে এসব কথা কেন বলব তা-ও আমি জানি।

আমার মাথার মধ্যে দুটি বিষয়ের ঘোর লেগে আছে : একটা হলো তোমাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, আরেকটা নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয়। তোমাকে খুঁজে বেড়ানোর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি ভয়, আবার তোমাকে খোঁজার কাজটা সবচেয়ে লোভনীয়ও। তুমি যেদিন হারিয়ে যাও, সেদিন থেকেই স্বপ্ন দেখা শুরু করি, পরিকল্পনা করা শুরু করি : তুমি কোথায় আছ, কী করে তোমার কাছে যাওয়া যায়। ইচ্ছা করে, সাদা পাইন আর বিচগাছের ভেতর দিয়ে পায়ে চলা পথরেখা ধরে দৌড়ে চলে যাই। কিন্তু আবার দমে যাই, কোন দিকে যেতে পারি? কে বলে দেবে আমাকে? এই খামার আর তোমার মাঝখানকার এই তেপান্তরে কারা বাস করে? তারা কি আমাকে সাহায্য করবে, নাকি আমার ক্ষতি করবে? উপত্যকার হাড্ডিহীন ভালুকদের ব্যাপারে কী করা যায়? ভালুকদের কথা মনে আছে? ভালুকরা যখন তাদের চামড়া এদিক-ওদিক দোলায়, তখন মনে হয়, নিচে হাড় বলে কিছু নেই। এদের গায়ের গন্ধ এদের সৌন্দর্যকে আড়াল করে রাখে। আমরাও একসময় পশু ছিলাম; তখন থেকে এদের চোখ আমাদের চেনে। তুমি বলেছ, এ জন্যই এদের চোখের দিকে সরাসরি তাকানো বিপজ্জনক। এভাবে তাকালে তারাও আমাদের ভালোবাসতে, আমাদের সঙ্গে খেলা করতে, আমাদের দিকে দৌড়ে আসতে পারে বলে আমরা ভুল করতে পারি। এভাবে এসেই তারা আমাদের ভয় আর রাগ ফিরিয়ে দিতে পারে। লিনা বলে, বাইরে কোথায় যেন গরুর চেয়েও বড় পাখিরা বাসা বানায়। ওপরের পোশাকের নিচে উজ্জ্বল নীল রঙের নকশা পরে, আবার গোপনে নতুন চাঁদের প্রথম আলোয় নাচে। ভালুক ভালোবাসার ভয় কিংবা গরুর চেয়ে বড় পাখির ভয়ের চেয়ে আমার কাছে বড় ভয় হলো পথহারা রাত।

অন্ধকারে কী করে যে তোমাকে খুঁজে পাব, বুঝতে পারি না। এখন অবশেষে একটা পথ খোলা পেয়েছি মনে হয়। আমি সব কিছু গুছিয়ে ফেলতে পারি। কল্পনায় ছবির মতো দেখতে পাই : আমি তোমার মুখ দেখতে পাব, আমার আঙুল টানতে টানতে নিচের দিকে নামাব। আমি তোমার কাঁধের ওপর নিঃশ্বাস ফেলব, তুলব, ফেলব আবার তুলব। তখন তুমি আমার চুলের ওপর থুতনি রাখবে আবার। ভাবতে ভালো লাগছে, জগত্টা আমাদের সামনে খুলে যাচ্ছে; কিন্তু জগতের নতুনত্ব দেখে আমি ভয়ে কাঁপি। তোমার কাছে যেতে হলে আমার চেনাজানা একমাত্র বাড়ি আর মানুষগুলোকে ছেড়ে যেতে হবে। লিনা বলে, আমার দাঁতের চেহারা দেখে সে বুঝেছে, আমাকে এখানে আনার সময় আমার বয়স সাত কিংবা আট। আমরা বুনো আলুবোখারা সিদ্ধ করি আচার আর কেক বানানোর জন্য। ওই সময় থেকে আটবার আমরা আচার আর কেক বানানোর আলুবোখারা সিদ্ধ করেছি; তার মানে, এখন আমার বয়স ষোলো। এখানে আসার আগে আমি ওকরা কুড়ানোর কাজ করি, তামাকের গোলা ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করি। রাত কাটাই রান্নাঘরের মেঝেতে এ মিনহা মাইয়ের সঙ্গে। আমরা খিস্টধর্মের দীক্ষা পেয়েছি। এই জীবনের পরে আমরা সুখ পেতে পারি, বলেছেন রেভারেন্ড ফাদার। সপ্তাহে এক দিন আমরা লেখাপড়া শিখি। আমাদের ওখান থেকে বের হওয়া নিষেধ। সুতরাং আমরা চারজন জলাভূমির কাছে লুকিয়ে থাকি। আমার মা, আমি, মায়ের ছোট ছেলেটা আর রেভারেন্ড ফাদার। আমাদের লেখাপড়া শেখানো নিষেধ। তবু তিনি আমাদের লেখাপড়া শেখান। সতর্ক থাকেন, কোনো ভার্জিনিয়ান কিংবা কোনো প্রটেস্ট্যান্ট দেখে ফেলে কি না। 

মাটিতে ছবি আঁকার জন্য আমাদের কাঠি আছে, সমান মসৃণ শিলার ওপরে শব্দ লেখার জন্য আমাদের নুড়ি আছে। অক্ষরগুলো মনে এসে যাওয়ার পর আমরা পূর্ণাঙ্গ শব্দ লিখতে পারি। আমার মায়ের চেয়ে সব কিছু দ্রুত শিখতে পারি আমি। মায়ের ছোট ছেলেটা একেবারেই গাধা। স্মৃতি থেকে নাইসিন ক্রিডের অনেক কিছুই আমি লিখতে পারি, একেবারে সব রকমের বিরামচিহ্নসহ। স্বীকারোক্তি বা ঘোষণা আমরা মুখে বলি, লিখি না। এখন যেমন মুখে বলছি। এই সময় পর্যন্ত আসতে আসতে সেগুলোর অনেক কিছুই ভুলে যাই। মুখে কথা বলা আমার পছন্দ। লিনা কথা বলে, পাথর কথা বলে, এমনকি সরোও কথা বলে। সবচেয়ে ভালো লাগে আমার তোমার মুখের কথা। আমাকে এখানে আনার সময় একটা কথাও বলি না। এ মিনহা মাই এবং আমার কাছে কথার যে অর্থ, তার সঙ্গে এখানকার শোনা কথার মিল পাই না। আমি জানি, লিনার কথারও কোনো মিল পাই না। মিস্ট্রেসের কথারও না। ধীরে ধীরে আমার মুখ থেকে দু-একটা করে কথা বের হয়, পাথর থেকে নয়। লিনা বলে, পাথরের ওপর লেখা আমার কথার ভেতর যে অর্থ বের হয়, তাতে সে বুঝতে পারে, আমি মেরিস ল্যান্ড বোঝাচ্ছি। সেখানে নাকি স্যারের ব্যবসা আছে।

সুতরাং আমার মা আর তার ছোট ছেলেটার কবর ওখানেই আছে। কিংবা হয়তো ওরা মনস্থির করেছে, ওখানেই চিরবিশ্রামে থাকবে একসময়। লিনার সঙ্গে ভাঙা স্লেজগাড়ির ওপর শুয়ে থাকা যতটুকু ভালো, বাইরের রান্নাঘরে শুয়ে থাকা ততটুকুও আরামের নয়। গোয়ালঘরের যে অংশটায় আমরা থাকি, শীতের আবহাওয়ায় তার চারপাশে তক্তার ঘের দিয়ে নিই। পশমের নিচে আমরা দুজন একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকি। গরুর লাদির গন্ধ পাই না আমরা। লাদি তো ঠাণ্ডায় জমাট বেঁধে যায়, গন্ধ ছড়ায় না। আর আমরা তো পশমের কাপড়ের একেবারে গভীরে ঢুকে থাকি। গরমের সময় আমাদের দড়ির তৈরি দোলনা-বিছানায় মশা আক্রমণ করলে লিনা গাছের পাতা দিয়ে একটা ঠাণ্ডা জায়গায় ঘুমানোর ব্যবস্থা করে। স্যার যখন গুদামে ঘুমাতে বলেন, তখন দোলনা-বিছানার চেয়ে মাটিতে ঘুমানোও ভালো মনে হয়, এমনকি বৃষ্টি হলেও। সরো আর ফায়ারপ্লেসের কাছে ঘুমায় না।

তোমার কাজে সাহায্য করত উইল আর স্কালি—ওরা এখানে রাতে থাকে না। ওদের মালিক চায় না ওরা এখানে থাকুক। তোমার মনে আছে তো, স্যার যতক্ষণ না বলছেন ততক্ষণ ওরা তোমার কোনো কথা শুনত না। ওরা স্যারের কথা মানতে বাধ্য, কারণ স্যারের জমি ইজারা নেওয়ার বিনিময়ে ওদের দেওয়া হয়েছে স্যারের মালিকানায়। লিনা বলে, কোনো কিছু ত্যাগ না করেই অন্য জিনিস পাওয়ার মতো একটা চালাকির কৌশল জানা আছে স্যারের। আমি জানি, লিনার কথা সত্যি। আমি নিজেই তো সব সময় এ রকমই হতে দেখছি। আমি দেখছি, আমার মা তার ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে চুপ করে শুনছে। স্যারের পাওনা টাকা পুরোটা দিতে পারছে না সেনিওর। স্যার বলছেন, টাকার বদলে মহিলা এবং তার মেয়েকে নিতে পারেন, ছেলেটাকে না। তাহলে ঋণের বাকি টাকা শোধ হয়ে যাবে। এ মিনহা মাই বলছে, না। তার শিশু ছেলেটা এখনো তার বুকের দুধ খায়। সে বলে, মেয়েটাকে নিয়ে যান, আমার মেয়ে। মানে আমাকে নিয়ে আসার কথা বলে। স্যার রাজি হয়ে যান এবং বাকি টাকাটা নিয়ে নেন।

তামাকের পাতা শুকানোর দিন আসতে আসতে একদিন রেভারেন্ড ফাদার আমাকে নিয়ে একটা ফেরিতে ওঠেন, তারপর একটা পালতোলা নৌকায়, তারপর আরেকটা নৌকায়। তাঁর বাক্স, বই আর খাবারের মাঝখানে আমাকে বেঁধে রাখেন। দ্বিতীয় দিন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়ে। ভাগ্য ভালো, আমার গায়ে পাতলা হলেও একটা আলখাল্লা থাকে। রেভারেন্ড ফাদার নৌকার ভেতরেই কোথায় যেন যাওয়ার কথা বলেন। আমাকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যেমন আছি, যেখানে আছি, তেমন এবং সেখানেই যেন থাকি। অন্য কোথাও যেন না যাই। এরপর এক মহিলা আসে। আমাকে আদেশ করে, এই ওঠ! আমি উঠে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সে আমার কাঁধ থেকে আলখাল্লা নিয়ে নেয়। তারপর আমার কাঠের খড়ম জোড়াও নিয়ে নেয়। এরপর সে সোজা হেঁটে চলে যায়। ফিরে এসে সব শোনার পর রেভারেন্ড ফাদার রাগে ফ্যাকাসে লাল হয়ে যান। তিনি নৌকার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজার চেষ্টা করেন—কে এই মহিলা, কোথায় আছে সে। কিন্তু মহিলার কোনো হদিস পান না। তারপর নৌকার ছেঁড়া ন্যাকড়া, এখানে-ওখানে পড়ে থাকা পালের ছেঁড়া টুকরো এনে আমার পা বেঁধে রাখেন। তখন আমি বুঝতে পারি, এখানে পাদ্রিদের অবস্থা সেনিওরের মতো নয়।

রেভারেন্ড ফাদার সাহায্যের কথা বললে এক নাবিক সমুদ্রের পানিতে থুতু ফেলে। যত মানুষ দেখি, তাদের মধ্যে রেভারেন্ড ফাদারই সবচেয়ে দয়াবান। আমি যখন এখানে আসি বুঝতে পারি, এখানকার সব কিছু সম্পর্কে সতর্ক হতেই বলেন তিনি। নরকে চিরজ্বলন্ত আগুনের মধ্যে পাপিষ্ঠরা বুদবুদের মতো ভাসতে থাকে আর পুড়ে কালো হতে থাকে; তবে তার আগে আসে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার অবস্থা। তিনি বলেন, তবে এখানে আগে আসে তুষার। যখন বাড়িঘর আর গাছপালার গায়ে ছুরির ফলার মতো জমাট তুষার ঝুলতে দেখি আর তপ্ত বাতাস আমার মুখ পুড়িয়ে দেয়, তখন আমি নিশ্চিত বুঝতে পারি, আগুনও আসছে। তারপর লিনা আমার দিকে তাকায় আর উষ্ণতার জন্য আমাকে দুই হাতে জাপটে ধরে রাখে। মিস্ট্রেস অন্যদিকে তাকান। সরোও আমাকে দেখে খুশি হয় না। মুখের সামনে এমনভাবে হাত ঝাপটায়, যেন মুখে মাছি বিরক্ত করছে। সরোকে দিন দিন বেশি অচেনা মনে হয়। লিনা বলে, ওর পেটে আবার বাচ্চা এসেছে। ওর বাচ্চার বাবা কে, পরিষ্কার বোঝা যায় না। সরো নিজে থেকে কিছু বলে না। উইল ও স্কালি হাসে; বলে, ওরা সরোর বাচ্চার বাবা নয়। লিনা বলে, সরোর বাচ্চার বাবা স্যার। এ রকম চিন্তা করার কারণ আছে, বলে সে। কারণ সম্পর্কে আমি জিজ্ঞেস করি। লিনা বলে, স্যার একজন পুরুষ মানুষ। মিস্ট্রেস কিছু বলেন না। আমিও বলি না।

 

নুড়ি আর পাথরের ওপর সতর্ক পা ফেলে লোকটা ভেঙে পড়া তরঙ্গের ভেতর দিয়ে তীরের দিকে এগোতে থাকে। কুয়াশা, আটলান্টিক আর উদ্ভিদজীবনের পচা গন্ধ ঢেকে রেখেছে উপকূলের উপরিভাগ। সে কারণে তার চলা ধীর হয়ে যাচ্ছে। কাদার ভেতর তার জুতা নাকানিচুবানি খাচ্ছে, সে দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু তার ছোট ঝুলি আর হাত দেখতে পাচ্ছে না। ঢেউয়ের এলাকাটা পেছনে ফেলে আসার পর যখন তার জুতার তলা শুধু কাদার ভেতর ডুবে যাচ্ছে, এমন একটা অবস্থায় আসার পর ছোট মাস্তুলওয়ালা নৌকার মাঝিদের দিকে হাত নেড়ে বিদায় জানানোর জন্য সে পেছনে ফিরে তাকায়। কিন্তু মাস্তুল কুয়াশার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে বলে সে নিশ্চিত করে বলতে পারে না, নৌকাটা তারা ঘাটে ভিড়িয়ে রেখেছে, নাকি তীরের কোল আলিঙ্গন করার জন্য, জাহাজঘাট আর বন্দরের পর বন্দরে পৌঁছানোর জন্য তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে চলা শুরু করেছে।

হাঁটতে শেখার পর থেকে সে ইংরেজ কুয়াশা দেখে আসছে; এখন সে অনেক দূর উত্তরে অবস্থান করছে। কিন্তু এখানকার কুয়াশা আলাদা : সূর্যের আলোয় পোড়া কুয়াশা এখানকার জগেক ঘন তপ্ত সোনায় পরিণত করেছে। এখানকার কুয়াশার ভেতর ঢোকা মানে সংগ্রাম করতে করতে স্বপ্নের ভেতর ঢোকা। কাদার ভেতর চলতে চলতে পাওয়া যায় জলাঘাসের এলাকা; তখনই সে সতর্কতার সঙ্গে বাঁ দিকে মোড় নেয়। সামনের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ দেখতে পায় কাঠের তক্তার বেড়া, তটের ওপরের দিকের গ্রামের দিকে চলে গেছে পথ। তার নিঃশ্বাস আর পা ফেলার শব্দ ছাড়া চারপাশের চরাচর একেবারে নিস্তব্ধ। শুধু প্রাণবন্ত ওকগাছের দেখা পাওয়ার পর বুঝতে পারে, কুয়াশা হালকা হয়ে আসছে। তখন সে জোর কদমে হাঁটা শুরু করে। নিজের ওপর আগের চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ এসে গেছে। তবে দৃষ্টি আটকে দেওয়ার মতো তরল সোনার কুয়াশা ফেলে এসেছে বলে একটু আফসোসই লাগছে।

ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে থাকে সে। সামনে পেল একটা জরাজীর্ণ গ্রাম। নদীর ধারে দুটি বিশাল আবাদি এলাকার মাঝখানে ঘুমাচ্ছে গ্রামটা। সে যদি ‘জ্যাকব ভার্ক’ লেখা কোনো চিরকুট সরাইখানার ঘোড়ার রক্ষককে দেখাত, তাহলে ঘোড়া নেওয়ার জন্য যে টাকাটা গচ্ছিত রাখতে হতো সেখানে, কিছু পরিমাণে তা ছাড় পেতে পারত। ঘোড়ার পিঠের জিন পাতা খুব একটা জুতের হয়নি। তবে রেজিনা একটা ভালো ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে ওঠার পর আরেকটু ভালো লাগে; তটরেখা বরাবর চিন্তাহীন চিত্তে একটু বেশি জোরেই চলতে থাকে। তারপর সে ঢুকে পড়ে পুরনো লানাপাইয়ের পথে। এই এলাকাটায় সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। সে রেজিনার গতি কমিয়ে দেয়। এই ভূখণ্ডে কে বন্ধু কে শত্রু—বোঝা তার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রায় অর্ধযুগ আগে চুক্তিবদ্ধ এবং মুক্তি পাওয়া মানুষদের মধ্যকার কৃষ্ণাঙ্গ, স্থানীয়, শ্বেতাঙ্গ আর সংকর মানুষরা এখানকার স্থানীয় অভিজাতদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। লড়াইটা বাধিয়েছিল অভিজাতদেরই কিছু ব্যক্তি। এই ‘জনযুদ্ধ’ যখন জল্লাদের চেহারা গ্রহণ করল, তখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নামে বিশৃঙ্খলাকেই প্রশ্রয় দিয়ে নতুন এক জঙ্গল আইন তৈরি হলো। মাঝখান থেকে বিরোধী গোত্রের মানুষদের কচুকাটা করা হয়ে গেছে এবং ক্যারোলাইনার বাসিন্দাদের ভিটাছাড়া করা হয়েছে। নতুন আইনে বলা হলো, কৃষ্ণাঙ্গদের মুক্তি মিলবে না; তারা কোনো রকম জমায়েতে মিলতে পারবে না; তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ভ্রমণ করতে পারবে না; তারা অস্ত্র নিয়ে বের হতে পারবে না। এই আদেশের মাধ্যমে যেকোনো শ্বেতাঙ্গ যখন-তখন যেকোনো অজুহাতে যেকোনো কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করতে পারবে বলে অধিকার দেওয়া হলো। আইনে আরো যোগ করা হলো, কোনো শ্বেতাঙ্গ মালিক তার অধীনস্থ কৃষ্ণাঙ্গকে হত্যা করে কিংবা অঙ্গহানি করে পাওনার শোধ নিতে পারবে। এ আইনের মাধ্যমে সব শ্বেতাঙ্গকে চিরতরে অন্যদের থেকে আলাদা করা হলো এবং তাদের সুরক্ষাও দেওয়া হলো। বিদ্রোহ শুরু হওয়ার আগে এবং বিদ্রোহ চলাকালে অভিজাত সম্প্রদায় এবং শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সব রকম সামাজিক স্বস্তির প্রয়াসকে অভিজাতদের স্বার্থের হাতুরির নিচে গুঁড়া গুঁড়া করে দেওয়া হলো। জ্যাকব ভার্কের দৃষ্টিতে এসব হলো আইনহীনতার আইন।

অল্প কথায় বললে, ১৬৮২ আর ভার্জিনিয়া—এ দুটি বিষয় তখনো একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে। ঈশ্বর, শাসনকর্তা আর নিজস্ব ভূমির স্বার্থে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সঙ্গে তাল রাখা যেকোনো মানুষের জন্যই কঠিন।  জ্যাকব জানে, একা একা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করা তার জন্য অসম্ভব কিছু নয়। বড়জোর অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে রাজহাঁসের দল; কেটে রাখা কোনো গাছের আড়াল থেকে একা একা বিচরণ করা কোনো লোক তার পিস্তল নিয়ে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াতে পারে; কিংবা পালিয়ে আসা কোনো পরিবারের সদস্যরা তাকে দেখে ভয়ে আর্তনাদ করে উঠতে পারে। আবার অস্ত্রধারী কোনো ডাকাত সামনে এসে পড়তে পারে। তখন কয়েক রকমের ধাতব মুদ্রা আর মাত্র একটা ছুরি নিয়ে কিছুই করতে পারবে না; বরং ডাকাতের লাভজনক শিকারে পরিণত হতে হবে। এই আর কি। ব্যক্তিগতভাবে বেশি মাত্রায় বিরক্তিকর হলেও এখানকার চেয়ে কম অনিশ্চিত এলাকায় পৌঁছার জন্য ব্যাকুল হয়ে জ্যাকব তার ঘোটকীকে আরো দ্রুত ছুটে চলার তাগিদ দেয়। এটুকু আসতে আসতে দুবার সে ঘোড়া থেকে নেমেছে।

ঘোড়ার জোড়া পায়ে লাফিয়ে চলার ফলে জ্যাকবের প্রচণ্ড ঘাম ঝরে যাচ্ছে। চোখের ওপরে ঘামের লবণ জড়ো হয়ে গেছে, চুল ঘামে ভিজে ঘাড়ের ওপরে জটা হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে অক্টোবর মাস শুরু হয়ে গেছে। রেজিনার শরীরও ভিজে উঠেছে। নাক দিয়ে ফোঁসফোঁস শব্দ বের হচ্ছে। এদিকটায় মনে হয়, শীত বলে কিছু নেই। বার্বাডোজে থাকার কথা ছিল জ্যাকবের। একসময় বার্বাডোজে যাওয়ার কথা চিন্তা করেছিল সে। অবশ্য ওখানকার তাপমাত্রা নাকি এখানকার চেয়েও ভয়ানক। সে অনেক দিন আগের কথা। আর বাস্তবায়ন করার আগেই সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছিল। জীবনে কোনো দিন দেখা হয়নি এমন এক চাচা ছিলেন; পরিবারের লোকজন তাঁকে ত্যাগ করেছিল। সেই চাচা সম্প্রতি মারা যান এবং জ্যাকবের নামে এক শ বিশ একর জমি দান করে যান। তবে আগে প্রকাশ করেননি। এখানকার আবহাওয়া তাঁর খুব পছন্দের। এখানে চারটা ঋতুর বৈশিষ্ট্য মোটামুটি স্পষ্ট বোঝা যায়। গরম আর মশামাছি বোঝাই এই ঘন কুয়াশা অবশ্য জ্যাকবের মনকে দমাতে পারেনি। তিন রকমের জলাভূমির ওপর দিয়ে তিনটা নৌযানে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে এখন এই লিনেপের পথে কঠিন পরিবেশের ভেতর দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে যেতে হচ্ছে; তবু ভ্রমণটা তার ভালোই লাগছে। সমুদ্রতটের উষ্ণ সোনার এলাকা পার হয়ে আসার পর বনভূমির দেখা পাওয়া গেছে; একেবারে নুহর আমল থেকে কারো হাতের ছোঁয়া পর্যন্ত লাগেনি এই বনভূমিতে। তীররেখা চোখে জল নিয়ে আসার মতো অপূর্ব সুন্দর। খেয়ে বাঁচার জন্য আছে বুনো খাবারের সমারোহ। আসল কথা হলো, এখানে চলতে-ফিরতে যে কষ্ট সহ্য করতে হবে—এটাই তাকে টেনেছে।

সে উপলব্ধি করতে পারে, আগে থেকে জানা যায় না চলার পথে কোন প্রাপ্তিটা পেয়ে যাবে, কে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। জ্যাকবের চিন্তাশক্তি খুব ক্ষিপ্র। ছোট হোক, বড় হোক কোনো সংকটকাল এসে দাঁড়ালে, নতুন কিছু বের করতে হবে, দ্রুত কোনো কাজ করতে হবে—এমন পরিস্থিতি এসে পড়লে তার মুখের ওপর বরং একটা হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো রকমে বসানো জিনের ওপর বসে ঘোড়ার চলার তালে এদিক-ওদিক দোল খেতে খেতে সামনের দিকে চলার সময় তার মুখটা সোজা সামনের দিকে থাকলেও জ্যাকবের দৃষ্টি আসলে চারপাশের সব কিছুর ওপর দিয়ে ভেসে চলে। অনেক দিন আগে থেকে এ অঞ্চল নিবিড়ভাবে দেখা আছে তার—প্রাচীন সুইডিশ জাতির অধীনে ছিল একসময়। পরে যখন সে কম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছে, তখনো দেখেছে। আবার আরো পরে ওলন্দাজদের নিয়ন্ত্রণের সময়ও দেখেছে। এ রকম এলাকা নিয়ে বিভিন্ন শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলাকালে এবং পরবর্তী সময়ে সে বুঝতে পেরেছে, এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই থাকুক না কেন, তাতে কিছু যায়-আসে না। অমুক-তমুক দূরবর্তী উপনিবেশ কে নিয়ন্ত্রণ করেছে সেটা আসলে জ্যাকবের কাছে গুরুত্বের নয়। কিছু কৃষ্ণাঙ্গ এগুলোর আসল মালিক, তবে এসব এলাকার বিশেষ কোনো সীমা পর্যন্ত তারা ছাড়া যেকোনো সময় হয়তো এক বছর দাবি করল কোনো গির্জার কর্তৃপক্ষ; পরে আবার নিয়ন্ত্রণ নিল কোনো কম্পানি কিংবা কোনো রাজকীয় শক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হয়ে গেল এগুলো এবং কোনো পুত্রকে কিংবা অনুগ্রহভাজন কাউকে দান করে দেওয়া হলো। যেহেতু শুধু কোনো জাতির বিক্রির লিখিত বিবরণ ছাড়া ভূমির মালিকানা সব সময় তরল পদার্থের মতো বলেই দেখে এসেছে, সেহেতু কোনো শহর কিংবা দুর্গের নতুন নামকরণের প্রতি নগণ্য দৃষ্টি দিয়েছে জ্যাকব। ফোর্ট অরেঞ্জ, কেপ হেনরি, নাইইউ আমস্টারডাম, উইল্টওয়েক। যেহেতু কোনো শহরের চেয়ে কচ্ছপের আয়ু দীর্ঘ, সেহেতু তার নিজের ভৌগোলিক এলাকায় জ্যাকব লানাপাইয়ের ভেতর দিয়ে সেজাপিক পার হয়ে আলগংকিন থেকে সাসকোয়েহানা চষে বেড়িয়েছে। নৌপথে সাউথ রিভার পার হয়ে সেজাপিক উপসাগরে পড়ার সময় জাহাজ থেকে নেমে একটা গ্রাম খুঁজে পায়, সেখান থেকে ঘোড়ায় চরে কোন পথে কোন দিকে যাওয়া যায়, তার সন্ধান করতে থাকে। পাহাড়ের ঢাল চিনতে হয়েছে, একটা ওকগাছের ঝোপ, পরিত্যক্ত একটা গুহা, পাইন চারার আকস্মিক গন্ধ—এ সব কিছুই প্রয়োজনের চেয়েও বেশি ছিল তার কাছে, অপরিহার্য ছিল। এ রকম একটা অপূর্বনির্ধারিত ভূখণ্ডে জ্যাকব সোজাসুজি বুঝতে পেরেছে, জলাভূমি পাশ কাটিয়ে পাইনের বনভূমি থেকে একবার বের হয়ে আসার সঙ্গেই সে মেরিল্যান্ডে পৌঁছে গেছে; অঞ্চলটা তখন পুরোপুরিই রাজার অধীনে ছিল।

 ব্যক্তিগত মালিকানাধীন দেশটিতে প্রবেশের পর তার অনুভূতি দুই দিক থেকে আসে। উপকূলের এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকা উপনিবেশগুলো নিয়ে বাদ-বিবাদ হয়েছে, কাড়াকাড়ি-মারামারি হয়েছে, বারবার নাম বদল হয়েছে। তাদের ব্যবসাপাতির কারবার ছিল যখন যে জাতি মালিক হয়েছে তার সঙ্গে। অন্যদিকে মেরিল্যান্ড প্রদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বিদেশি বাজারকে সুযোগ দিয়েছে।   মেরিল্যান্ড মূলত আবাদিদের জন্য ভালো, ব্যবসায়ীদের জন্য অধিকতর ভালো আর দালালদের জন্য সবচেয়ে ভালো। সামন্তরাজ শাসিত এই এলাকা একেবারে অন্তর থেকে রোমান। এর শহরগুলোর রাস্তায় যাজকদের সদম্ভ পদচারণ, শহরগুলোর মোড়ে মোড়ে তাদের উপাসনালয়; স্থানীয় মানুষদের বসতির প্রত্যন্ত গ্রামগুলো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে তাদের অশুভ মিশনগুলো। আইন, আদালত, ব্যবসাপাতি—এগুলোতে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। দশ বছর বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ চালকের গাড়িতে চড়ে অতিরিক্ত পোশাক পরা উঁচু হিল পরা মহিলারা। রোমান ক্যাথলিকদের এ রকম ঢিলা চতুর চটকদার কাজকারবার দেখে সে বিরক্ত। পুওর হাউসের বাচ্চাদের কোয়ার্টারের প্রায় সবাই তাদের প্রাথমিক শিক্ষার বই থেকে মুখস্থ করেছে, ‘রোমের ওই ডাহা মাগিকে ধিক! তার সমস্ত নাস্তিকতা নারকীয়; তার পেয়ালার অভিশপ্ত পানীয় কেউ কোরো না পান; তার আদেশ কেউ কোরো না মান্য।’ তার মানে অবশ্য এই নয় যে তাদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করা যাবে না। সে তো অনেক ব্যাবসায়িক কাজকর্মই করেছে তাদের সঙ্গে, বিশেষ করে এখানকার মতো একটা জয়গায়, যেখানে তামাক আর ক্রীতদাস একাকার হয়ে মিশে আছে। একটা মুদ্রা আরেকটার ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত কিংবা আকস্মিক রোগবালাইয়ের শিকার হয়ে যেকোনোটারই পতন হতে পারে। অন্যদের যে কেউই বিপদে পড়তে পারে, শুধু মহাজনের কিছু হবে না।

ঘৃণা লুকিয়ে রাখা না গেলেও একপাশে সরিয়ে রাখতে হয়। এই ভূ-সম্পত্তি নিয়ে তার আগের কাজকর্ম হতো মালিকের কেরানির সঙ্গে পানশালার টুলে বসে। আর এখন যে কারণেই হোক, তাকে আমন্ত্রণ করে আনা হয়েছে, বলা যায়, ডেকে আনা হয়েছে জুবলিও নামের আবাদি এলাকার মালিকের বাড়িতে। এক রবিবারে একজন ভদ্রলোক তার সঙ্গে ডিনার করতে নিমন্ত্রণ করেছেন একজন ব্যবসায়ীকে। সে ভাবতে থাকে, তাহলে তো ঝামেলা আছে। শেষমেশ মশা তাড়িয়ে ঘোড়াকে চমকে দেওয়ার মতো মেটে সাপ এড়িয়ে এগিয়ে আসতে আসতে চোখে পড়ে লোহার বিরাট বিরাট সদর দরজা। সব দরজা পেরিয়ে আসে রেজিনাকে নিয়ে। সে আগে থেকে শুনেছে এই বাড়ির জাঁকজমকপূর্ণ চেহারার কথা। কিন্তু চোখের সামনে যে চেহারা দেখছে, তার জন্য প্রস্তুত ছিল না সে। মধুরঙা পাথরে তৈরি বাড়িটা দেখে মনে হয়, এটা আদালত ভবন। ডান দিকে বহুদূর পর্যন্ত ভেতরের সম্পত্তিগুলো ঘিরে রাখা লোহার বেড়া ছাড়িয়ে হালকা কুয়াশার ছোঁয়া লাগা কোমলতার ভেতর দেখা যায় কোয়ার্টার্সের সারি, সবগুলো সুনসান নীরব, শূন্য।  তামাকপাতার আরামদায়ক সুবাস ফায়ারপ্লেস আর সুরা পরিবেশনকারী নারীর মতো জুবলিওকে সুরভিপ্রলেপে ঢেকে রেখেছে। পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে একটা ইটের তৈরি ছোট প্লাজার সামনে। পথটার ওখানে রয়েছে একটা বারান্দায় প্রবেশের গর্বিত ইঙ্গিত। জ্যাকব থামল সেখানে। একটা ছেলে এগিয়ে এলো। কিছুটা ঋজু ভঙ্গিতে ঘোড়া থেকে নেমে সে ছেলেটার হাতে লাগাম এগিয়ে দিতে দিতে তাকে সতর্ক করে দিয়ে বলল, পানি খাওয়ানো যাবে, অন্য কিছু নয়।

ছেলেটা বলে, জি স্যার। তারপর ঘোড়াটাকে ঘুরিয়ে বাইরের দিকে নিতে নিতে বিড়বিড় করে বলে, নাইস লেডি, নাইস লেডি।

জ্যাকব ভার্ক ইটের সিঁড়িতে তিন কদম উঠে আবার নেমে দাঁড়ায়। বাড়িটার দিকে ভালো করে তাকানোর জন্য নেমেছে সে। কী রকম মূল্যের এই বাড়িটা তা-ও বুঝে দেখা দরকার। দরজার দুই পাশে দুটি প্রশস্ত জানালা। একেকটা জানালায় দুই ডজন কাচ ব্যবহার করা হয়েছে। আরেকটু বেশি প্রশস্ত দ্বিতীয় তলায় আছে আরো পাঁচটা জানালা। জানালাগুলো সূর্যের আলো আটকে দিয়েছে বলে কুয়াশার ওপর পড়ে চকচক করছে। এ রকম বাড়ি জ্যাকব আগে কখনো দেখেনি।

জ্যাকব মাথা থেকে হ্যাট খুলে ফেলল, শার্টের হাতায় চুলের আগা যেখানে পড়েছে, সেখান থেকে ঘাম মুছে ফেলল। ভেজা কলার থেকে আঙুলের ছোঁয়া দিয়ে ঠিক করে নিয়ে আবার সিঁড়ির তিন ধাপ উঠল জ্যাকব। তারপর জুতা রাখার জিনিসটা ঠিক আছে কি না দেখে নিল। জ্যাকব দরজায় টোকা দেওয়ার আগেই একজন বেঁটে লোক দরজা খুলে দিল।

আফটারনুন, স্যার।

লোকটার মাথার ওপর দিয়ে তাকিয়ে রুমটা একটু দেখে নিয়ে জ্যাকব বলল, মি. ওর্তেগার সঙ্গে আমার দেখা করার কথা।

হ্যাঁ, স্যার। আপনার হ্যাট, স্যার? সেনিওর আপনার অপেক্ষায় আছেন। ধন্যবাদ, স্যার। এই দিকে, স্যার।

পায়ের শব্দ, বেশ জোরে শোনা যাচ্ছে, দম্ভ প্রকাশ করার মতো। শব্দের পরই শোনা গেল ডি ওর্তেগার আহ্বান, ঠিক সময়ে এসেছেন। আসুন, জ্যাকব। আসুন। বলতে বলতে সে একটা বারান্দার দিকে এগোতে থাকল।

গুড ডে, স্যার। থ্যাংক ইউ, স্যার। কথাগুলো বলার সময় জ্যাকব ওর্তেগার কোট, মোজা, শৌখিন পরচুলা দেখে বিস্মিত হয়। এখানকার মতো তাপের মধ্যে এসব প্রতীক অলংকার নিশ্চয়ই বিশদ এবং অবিচ্ছেদ্য; ডি ওর্তেগার ত্বক পার্চমেন্টের মতো শুকনো। অথচ জ্যাকবের ঘাম শেষই হচ্ছে না। পকেট থেকে রুমাল বের করার সঙ্গে সঙ্গে জ্যাকব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গেল; তবে বিব্রতকর অবস্থা যতটা রূঢ়, রুমালটা ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাও ততটাই জরুরি।

চারপাশের গুরুগম্ভীর করে সাজানো সব শ্রদ্ধাভাজন বস্তুর মাঝে ছোট টেবিলে বসে জ্যাকব দেখতে পেল, প্রচণ্ড তাপের দিকের জানালাগুলো বন্ধ আছে। জ্যাকব সাসাফ্রাস বিয়ার পান করতে করতে আবহাওয়া সম্পর্কে তার আপ্যায়নকারীর মতামতের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করে গেল। তার এত দূর কষ্ট করে আসার জন্য আপ্যায়নকারী বিনয়ের সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনা করলে জ্যাকব তার কষ্টের বিষয়টি তাচ্ছিল্যে উড়িয়েই দিল। ডি ওর্তেগার কথার মধ্যে বেরিয়ে এলো, সে কাজকর্ম বেশ দ্রুতই শুরু করেছিল। বিপর্যয়ের মধ্যেও পড়েছে সে। ডি ওর্তেগার জাহাজ উপকূল থেকে এক নটিক্যাল মাইল দূরে নোঙর করে রাখা হয়েছে। তার যা যা ক্ষতি হয়েছে, পূরণ করার জন্য আরেকটা জাহাজ এসে ভিড়বে যেকোনো সময়, যেকোনো দিন। তার জাহাজের এক-তৃতীয়াংশ কর্মচারী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। মৃতদেহগুলো উপকূলের খুব কাছে ফেলা হয়েছে বলে লর্ড প্রপ্রাইটরির ম্যাজিস্ট্রেট তার তামাকের পাঁচ হাজার পাউন্ড জরিমানা করেছেন। কারণ হিসেবে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, এতগুলো লাশ তার লোকেরা কুড়িয়ে তুলে পোড়াতে কিংবা কবর দিতে পারত; কিন্তু সেটা করা হয়নি। শেষে তারা বাধ্য হয়ে করেছে অবশ্য। ডি ওর্তেগা জানাল, তারা বর্শা ও জাল কিনে লাশগুলো তুলেছে; একটা খরচের বিষয় বটে। চার চাকার ঠেলাগাড়িতে স্তূপ করে নিচু এলাকায় নিয়ে ফেলতে হয়েছে; সেখানে সামুদ্রিক উদ্ভিদ আর কুমিররা লাশগুলোর সৎকার করেছে।

জ্যাকবের মনে প্রশ্ন জাগে, সে কি লোকসানের হিসাব বাদ দিয়ে তার জাহাজ বার্বাডোজের দিকে রওনা করিয়ে দেয়? তার নিজের মনেই উত্তরটা আসে—না। ডি ওর্তেগা মোটের ওপর অগোছালো এবং তার যাবতীয় রোমান বিশ্বাসের মতোই একগুঁয়ে ও জেদি। আরো এক মাস সে বন্দরে অপেক্ষা করে, লিসবন থেকে একটা প্রেত জাহাজ আসবে এবং সে যাদের হারিয়েছে, যা যা হারিয়েছে, সব পুষিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট পণ্য নিয়ে আসবে। সে অপেক্ষা করে, তার জাহাজের খোলে যতটা ধারণ করতে পারে, তার সবটুকু বোঝাই করে নেবে। বোঝাই করতে করতে একসময় জাহাজটাই ডুবে যায়। শেষে শুধু জাহাজটাই নয়, শুধু আগের পণ্যই নয়; বরং সব কিছুই হারিয়ে ফেলে। শুধু জাহাজের নাবিকদের মধ্যে যাদের হাত-পা বাঁধা ছিল না তারা এবং বিক্রি করা যাবে না এমন চারজন ক্ষোভে ফেটে পড়া অগ্নিচক্ষু অ্যাঙ্গোলিয়ান প্রাণ নিয়ে বাঁচতে সক্ষম হয়। এরই মধ্যে সে যে পরিমাণ ধার করেছিল, সেটা পরিশোধ করার জন্য আরো ঋণ চায় এবং আরো ছয় মাস সময় চায়।

ডিনারে বসে জ্যাকব অসহ্য রকমের বিব্রতকর বিষয় দেখতে পায়। ডিনারের পুরো বিষয়টাই জ্যাকবের কাছে বিরক্তিকর লাগে। লেস কলার আর এমব্রয়ডারির সিল্কের একেবারে বিপরীতে তার যেমন-তেমন পোশাক। টেবিলের নানা সাজের সামনে তার দক্ষ হাতও কেমন আনাড়ি মনে হয়। তার হাতে তখনো রেকুনের রক্তের দাগ খানিকটা লেগে আছে। বিরক্তির বীজ থেকে গজানো গাছ এবার ফুলের মতো ফুটে ওঠে তার মনে। এ রকম একটা ঘুমন্ত বিকেলে তাদের চেয়ে সামাজিক নিম্নস্তরের মাত্র একজন মানুষের জন্য এত আয়োজন কেন? জ্যাকব নিশ্চিত হতে চায়, নিশ্চয়ই উদ্দেশ্যমূলক। ডি ওর্তেগার ইচ্ছাকে গছানোর জন্য এ রকম নাটক মঞ্চায়ন করা হচ্ছে, প্রকারান্তরে তাকে অপমানই করা হচ্ছে, মনে করছে জ্যাকব। খাওয়ার শুরুতে এবং শেষে ধীর লয়ের গানও গাওয়া হলো ক্রুশের বন্দনায়। ডি ওর্তেগার ছেলেরা একেবারে কবরের মতো নীরব। অন্যদিকে তার স্ত্রী একটা কিচিরমিচির করা পাখি, একটার পর একটা অবান্তর সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে যাচ্ছে। যেমন—আপনি তুষারের মধ্যে থাকেন কী করে? তার পর্যবেক্ষণের ধরন প্রচলিত সব ধারণাকে উল্টেপাল্টে দেওয়ার মতো। তার রাজনৈতিক বিচার-বিশ্লেষণী ক্ষমতা যেন পুরুষদের সমান। সম্ভবত তাদের উচ্চারণ কিংবা ইংরেজি ভাষা সম্পর্কে তাদের সংকীর্ণ ধারণার কারণে জ্যাকবের এ রকম মনে হচ্ছে।

জ্যাকব জিজ্ঞেস করে, এরা কি প্রায়ই অসুস্থ থাকে, ম্যাডাম?

আসলে না। এরা এ রকম ভান করে। সবগুলো বদমাশ। পর্তুগালে এ রকম চালাকি করে পার পায়নি।

জ্যাকবের মনে প্রশ্ন, খাবার পরিবেশনকারী মহিলা ইংরেজি বুঝতে পারে নাকি? কিংবা মহিলাকে এরা পর্তুগিজ ভাষায় গালাগাল করে? এ জন্যই সে জিজ্ঞেস করল, এরা কি পর্তুগাল থেকে আসে?

ডি ওর্তেগা বলল, পর্তুগিজই, তবে পর্তুগালের অ্যাঙ্গোলা থেকে। সবচেয়ে চমৎকার, সুন্দর একটা দেশ।

পর্তুগাল?

অ্যাঙ্গোলা। তবে অবশ্য পর্তুগালও অতুলনীয়।

ওর্তেগার স্ত্রী বলল, আমরা ওখানে চার বছর আছি।

পর্তুগালে?

অ্যাঙ্গোলায়। তবে মনে রাখবেন, আমাদের সন্তানরা ওখানে জন্মে না।

তাহলে কি পর্তুগালে?

না, মেরিল্যান্ডে।

আহ্, ইংল্যান্ড!

তাদের সঙ্গে কথাবার্তায় আরো জানা গেল, ডি ওর্তেগার বাবার পেশা ছিল গরু পালন। সে বাবার তৃতীয় সন্তান। উত্তরাধিকারে তেমন কিছুই ছিল না তার। সে অ্যাঙ্গোলা যায়; অ্যাঙ্গোলা তখন দাসভাণ্ডার। জাহাজ বোঝাই করে ব্রাজিলে পাঠানোর জন্য সেখানে যায় সে। তবে বুঝতে পারে, আরো দূরে বিদেশে জাহাজ পাঠাতে পারলে সম্পদের সম্ভাবনা আরো বেশি; আরো দ্রুত লাভ করা যাবে। এক ধরনের পাল চরানোর চেয়ে আরেক ধরনের পাল বোঝাই করার কাজে চলে যাওয়াটা বেশ দ্রুতই করেছিল ডি ওর্তেগা; তার সমৃদ্ধিও ব্যাপক হয়েছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য জ্যাকবের মনে হয়, ডি ওর্তেগা তার এই অপেক্ষাকৃত নতুন জায়গায় খুব একটা জুত করতে পারছে না। তবে কিছুটা সময় টিকে থাকার চেষ্টা করবে সে, তাতে সন্দেহ নেই, এই ডিনারে তাকে আমন্ত্রণের পরিকল্পনা সেটাই প্রমাণ করে।

তাদের সন্তান ছয়জন। দুজন বড়দের সঙ্গে টেবিলে বসে খাওয়ার মতো বড় হয়ে গেছে। পাথরের মতো চুপচাপ ছেলে দুটির একজনের বয়স তেরো, আরেকজনের চৌদ্দ। তারাও বাবার মতো পরচুলা পরেছে, যেন তারা মজলিসি নাচে অংশ নিচ্ছে কিংবা আদালতে এসেছে। তার যেকোনো উত্তরাধিকার নেই, ছেলে কিংবা অন্য রকম কেউ, সে কথা ভেবে মন খারাপ করার কিছু নেই, মনে করে জ্যাকব। তার মেয়ে প্যাটিসিয়ান মৃত দুই ভাইয়ের পথেই চলে গেছে। মোটামুটি সম্মানজনক পরিমাণে যে সম্পদ সংগ্রহ করার আশা সে করছে, সেটা উত্তরাধিকারে ভোগ করার মতো কেউ নেই। অহংকারী, ইন্দ্রিয়পরায়ণ, নিজেদের ছেলেদের চেয়ে তাদের রান্নার সরঞ্জাম আর চীনামাটির বাসনকোসন নিয়ে বেশি গর্বিত। ডি ওর্তেগা এত মারাত্মক ঋণে পড়ে থাকার কারণ খুব পরিষ্কার। ব্যবসার মুনাফা বিনিয়োগ করেছে তুচ্ছ বস্তুর জন্য। অযথা বলে বিবেচিত বস্তু, হাঁটু পর্যন্ত লম্বা সিল্কের মোজা, স্ত্রীর পোশাকে অতিরঞ্জন, দুপুরবেলা মোমবাতি জ্বালানো—এসব করতে করতে কোনো সময়ই লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সেটা জাহাজের ক্ষয়ক্ষতি কিংবা ফসলের ক্ষতি, যা-ই হোক না কেন। এই দম্পতিকে এই পরিবেশে দেখে জ্যাকব খেয়াল করতে পারে, স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে না। শুধু একজন যখন অন্যদিকে তাকাচ্ছে, তখন মাঝেমধ্যে আরেকজন চোরা চোখে তার দিকে তাকাচ্ছে। জ্যাকব বুঝতে পারে না, এই চোরাগোপ্তা উঁকি মারার মধ্যে কী আছে। তবে তার মজা লাগে এদের এই কাণ্ড দেখে। মনে মনে সে দেখতে পায়, এদের কী কী খারাপ পরিণতি হতে পারে, যদিও এখন সে শুধু এদের বেকুবি এবং দুর্বোধ্য কথাবার্তা আর অখাদ্যগুলো সহ্য করে যাচ্ছে। তাদের মুখের ওপরে সরল স্মিত হাসি নেই, আছে বিদ্রুপের হাসি; তারা প্রাণ খুলে হাসছে না, হাসছে চাপা হাসি। সামান্য হলেও জ্যাকব স্বস্তি পেয়েছে খাবার পরিবেশনকারী মহিলার শরীর থেকে পাওয়া লবঙ্গর সুবাসে।

ধনী লোকদের স্ত্রীরা, যারা নিজেরা প্রতিদিন নিত্যনতুন ফ্রক বদল করে অথচ কাজের মানুষদের চটের ছালা পরিয়ে রাখে, তাদের সামনে দু-চারবার যখনই উপস্থিত হতে হয়েছে, জ্যাকব বুঝতে পেরেছে, এসব মহিলার চেয়ে তার নিজের স্ত্রী রেবেকা অনেক মূল্যবান। জীবনে প্রথমবার সে হবু স্ত্রী রেবেকাকে দেখেছিল লম্বা ভ্রমণ শেষে জাহাজ থেকে নামতে। হাতে বিছানাপত্র, দুটি বাক্স আর বড় একটা ব্যাগ নিয়ে ঘাটে ফেলা তক্তার ওপর দিয়ে কষ্ট করে নেমে আসতে দেখেছিল। তখনই সে বুঝেছিল, তার সৌভাগ্য নিয়ে আসছে রেবেকা। রেবেকাকে দেখার আগে সে মনে করেছিল, তার সঙ্গে বিয়ে হতে যে মেয়েটা আসছে, সে হয়তো হাড্ডিসার কেউ হবে, কিংবা দেখতে কুিসত কেউ হবে। এ রকম কাউকে গ্রহণ করার জন্য সে মনে মনে প্রস্তুত ছিল। তার এ রকম মনে করার কারণ হলো, সুশ্রী চেহারার কোনো মেয়ের বিয়ের জন্য তো স্থানীয় কত সুযোগ-সুবিধাই আছে। কিন্তু সেদিন ভিড়ের মধ্যে থেকে তার চিৎকারের জবাব দিল যে মেয়ে, সে তো দেখতে সুডৌল চেহারার, সুন্দর, শক্ত-সমর্থ। জ্যাকবের দীর্ঘ অনুসন্ধান কাজের প্রতিদিনের জন্যই এ রকম একজনের প্রয়োজন ছিল। কারণ প্যাট্রনশিপের দায়িত্ব নেওয়ার কারণেই একজন স্ত্রীর দরকার ছিল তার। অন্য কথায়, তার একজন সঙ্গীর দরকার ছিল। সন্তান ধারণের বয়স হয়েছে, তবে অতিমাত্রায় গির্জার জ্ঞান লাভ করেনি এমন, অনুগত তবে আত্মমর্যাদাহীন নয়, পড়াশোনা জানা তবে অহংকারী নয়, স্বাধীন তবে যত্নবান। সে কোনো রকম বকুনি খেতে রাজি ছিল না। সঙ্গী হিসেবে যে বর্ণনা দেওয়া হলো, সেদিক থেকে রেবেকা একেবারে আদর্শ মেয়ে। তার শরীরের মধ্যে মুখরা হওয়ার কোনো অস্থিই নেই। রাগ করে কখনো সে উঁচু গলায় কথা বলেনি। জ্যাকবের প্রয়োজনীয়তাগুলো নিজের থেকে বুঝে নিয়েছে, কোমল হাতে তার জন্য স্বাদের খাবার তৈরি করেছে, এ রকম একটা সম্পূর্ণ অচেনা দেশে কাজকর্মগুলো সে করেছে উৎসাহ আর নতুনত্বের মেজাজ নিয়ে। এককথায়, সে একটা নীল পাখির মতোই প্রফুল্লচিত্ত। রেবেকা এবং তার দুজন সহযোগী একেবারে সূর্যোদয়ের মতো নির্ভরযোগ্য। খুঁটির মতো শক্ত। তা ছাড়া সময় এবং স্বাস্থ্য তাদের অনুকূলে। জ্যাকবের দৃঢ়বিশ্বাস, রেবেকার আরো সন্তান হবে, কমপক্ষে একটা ছেলে, যে বেঁচে থাকবে, বড় হবে।

ফলার হিসেবে দেওয়া হলো আপেল সস আর এক রকমের বাদাম। রান্না করা মূল খাবারের চেয়ে জ্যাকবের কাছে ফলার একটু ভালো মনে হলো। তারপর ডি ওর্তেগার বাড়িঘর সব ঘুরে দেখার অপরিহার্য প্রস্তাবে ঘুরতে বের হয়ে জ্যাকবের মনটা আরেকটু হালকা হলো। সত্যিই প্রশংসা পাওয়ার মতো একটা এস্টেট তৈরি করেছে সে। কুয়াশা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কাজকর্মের মধ্যে ওস্তাদি আর যত্নের ছোঁয়া পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তামাকের ছাউনিগুলোতে, ওয়াগনগুলোতে, সারিবদ্ধ করে সাজিয়ে রাখা ব্যারেলগুলোতে। কাজের দক্ষতার ছাপ দেখা যাচ্ছে, সুন্দর করে তৈরি করা মাংসের ঘর, দুধের ঘর, লন্ড্রি, বাইরের রান্নাঘর—এসব জায়গায়ও। হোয়াইটওয়াশ প্লাস্টার করা সব শেষের আগের ঘরটা সুন্দর করে মেরামত করা হয়েছে; অন্যগুলোর থেকে একটু আলাদা এবং ক্রীতদাসদের থাকার জায়গার চেয়ে ছোট। জ্যাকবের এখানে আসার কথা, মানে প্রধান বিষয়টাই এ পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। ডি ওর্তেগা এতক্ষণ ধরে মশগুল আছে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরের দুর্ঘটনাগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়ার কাজে। এসব দুর্ঘটনার কারণেই সে ঋণের টাকা শোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু জ্যাকবকে ঋণের টাকা কিভাবে দেওয়া হবে, সে কথাটা আর এখন পর্যন্ত আলোচনায়ই ওঠেনি। তামাকের পোকায় খাওয়া, দাগ পড়া পাতাগুলো পরীক্ষা করতে করতে বোঝা গেল, ঋণ শোধ করার জন্য বাকি কোন জিনিসটা ডি ওর্তেগার আছে। শুধু ক্রীতদাস।

জ্যাকব ‘না’ জবাব দিয়ে দিল। তার ব্যবসা মধ্যম মানের। তার ব্যবসার কাজকর্ম করার জন্য দরকার শুধু তার নিজেকে, অন্য কাউকে দরকার নেই। তা ছাড়া বাড়তি মানুষজন রাখার মতো জায়গা তার নেই। তাদের মালিক হওয়ার দরকারও নেই।

ডি ওর্তেগা বলে উঠল, কী হাস্যকর! আপনি এদের বিক্রি করে দেবেন। বিক্রি করে কত টাকা পাবেন জানেন?

জ্যাকব ভয়ে-বিস্ময়ে চমকে উঠল। তার বিক্রি করার পণ্য তাজা মানুষ নয়।

তার পরও ডি ওর্তেগার চাপাচাপিতে জ্যাকব ধীরে ধীরে ক্রীতদাসদের ছাউনির দিকে এগিয়ে গেল। ডি ওর্তেগা ওদের অর্ধেক দিনের বিশ্রামটা দিল নষ্ট করে। তাদের প্রায় দুই ডজনের বেশিজনকে সোজা এক সারিতে দাঁড়িয়ে যেতে আদেশ করল। রেজিনাকে যে ছেলেটা পানি খাওয়াতে নিয়েছিল, তাকেও দেখা গেল ওদের মধ্যে। ওদের সারির মাঝখান দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে জ্যাকব ওদের সবার দিকে মনোযোগের সঙ্গে তাকাতে লাগল। ওদের প্রত্যেকের মেধা, দুর্বলতা, সম্ভাবনা ইত্যাদি দেখিয়ে দিচ্ছে ডি ওর্তেগা। কিন্তু ওদের গায়ের ক্ষতচিহ্নগুলোর ব্যাপারে কিছুই বলছে না। ওদের ত্বকের ওপর মনে হচ্ছে, কোথাও কোথাও ভুল জায়গায় শিরা-উপশিরা তৈরি করা হয়েছে। এই এলাকায় একটা আইন আছে, কোনো কৃষ্ণাঙ্গ কোনো শ্বেতাঙ্গকে দ্বিতীয়বারের মতো অপমানজনক কিছু করলে কৃষ্ণাঙ্গের মুখে একটা দাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। এ রকম দাগও দেখা যাচ্ছে ডি ওর্তেগার একজন ক্রীতদাসের মুখে। জ্যাকব এবং ডি ওর্তেগাকেও মাঝেমধ্যে সম্ভব হলে দু-একজন বিচার করার সতর্ক দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করছে, বিশেষ করে যখন তারা বুঝতে পারছে, মালিক এবং দর্শনার্থীর দৃষ্টি আপাতত তাদের দিকে নেই। তাদের এই বিষয়টা জ্যাকব খুব কৌশলে চোরা চাহনিতে দেখার চেষ্টা করছে।

হঠাৎ জ্যাকবের পেটের ভেতর গুলিয়ে ওঠে। আসার সময় তামাকের গন্ধ তো ভালোই লেগেছিল; এখন বমির ভাব তৈরি করছে। নাকি অন্য কিছুর গন্ধে এ রকম হচ্ছে? চিনি মেশানো ভাত, টুকরো করে কেটে শুকানো গুড়ের রসে চুবানো শূকরের মাংস, নাকি কোকোর গন্ধ, যেটা লেডি ডি ওর্তেগার মাথা ঝিমঝিম করিয়ে দিয়েছে? কারণ যেটাই হোক না কেন, সে আর এখানে ক্রীতদাসবেষ্টিত হয়ে বেশিক্ষণ থাকতে পারবে না।

পেটের ভেতরের অশান্তি আর নাকের ব্যথায় জর্জরিত জ্যাকবের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। মনে মনে ভাবে, এটা একটা বিপর্যয় ছাড়া আর কিছুই নয়। এ রকম একটা প্রদেশে, যেখানে স্থানীয় ক্যাথলিক ভদ্রলোকের প্রতি অনুগ্রহ দেখাতে আগ্রহী রাজার বিচারকরা তাদের আদালতে মামলা দিলে সে মামলা বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তিহীন থেকেই যাবে। কারণ স্থানীয় এই ব্যক্তির চেয়ে তারা কিছুতেই বেশি অনুগ্রহ দেখাবে না দূরের কোথাকার এক ব্যবসায়ীকে। তার যে ক্ষতিটা হয়ে যাচ্ছে, সেটা তো আর কিছুতেই অন্যভাবে পোষানো যাচ্ছে না। সেটা ভেবেই জ্যাকবের মনের ভেতর সীমাহীন খচখচানি চলছে। তার ক্ষতিটা হচ্ছে আবার ডি ওর্তেগার মতো এ রকম একজন লোকের কারণে। তার সামনে ডি ওর্তেগার দম্ভভরা পা ফেলে হাঁটা প্রচণ্ড অসহ্য লাগে। জ্যাকবের দৃঢ় বিশ্বাস, তার চোয়ালের এ রকম গঠন, নামানো চোখের পাতা—এগুলো যেন ডি ওর্তেগার শারীরিক অযোগ্যতার কিছু লুকিয়ে রাখছে। তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে ক্যাথলিক পরিচয়ের আড়ালে আরো কিছু আছে, নোংরা কিছু, অতিমাত্রায় পাকা। কিন্তু কী করতে পারে সে? হাতে রক্তের দাগ লেগে থাকার মতো একটা দুর্বলতা এখনো মনে হচ্ছে বলে নিজের অবস্থানে জ্যাকবের লজ্জাবোধ হচ্ছে। দেশে তাদের পার্লামেন্ট থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই; অবশ্য তার মনে হয় না যে তাদের কীটপতঙ্গ ধরার মতো ধরা হবে। শুধু ব্যবসার খাতিরে ছাড়া জ্যাকব তাদের সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ের কারো সঙ্গে মেশা কিংবা কোনো রকম সামাজিকতা করতে চায় না।

ডি ওর্তেগা হঠাৎ থেমে গেল। মুখের ওপর চমকে যাওয়া চাহনি মেলে সে বলল, উঁহু, না। আমার স্ত্রী ওকে নিতে দেবে না। ওকে ছাড়া আমার স্ত্রীর চলবেই না। ও আমাদের প্রধান বাবুর্চি। ওর রান্না সবার চেয়ে ভালো।

জ্যাকব আরো একটু এগিয়ে এসে ডি ওর্তেগার লবঙ্গসদৃশ ঘামের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখে বোঝার চেষ্টা করল, রান্না করা ছাড়াও আরো কোনো বিষয় এই মহিলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কি না, যে কারণে ডি ওর্তেগা তাকে হাতছাড়া করতে চাইছে না।

আপনি বলেছেন ‘যেকোনো’। আমি যেকোনো ক্রীতদাসকে বেছে নিতে পারি। আপনার কথার যদি দাম না-ই থাকে, তাহলে শেষ ভরসা হিসেবে আছে আইন।

ডি ওর্তেগা শুধু ভ্রু উঁচু করে তাকাল। শুধু এক পাশের ভ্রু। এমনভাবে তাকাল, যেন তার ভ্রুর ওপর নির্ভর করে আছে একটা সাম্রাজ্য। জ্যাকব বুঝতে পারল, সে নিম্নতর অবস্থানের একজনের কাছ থেকে এ রকম অবিনয়ী হুমকি থেকে উঠে আসার প্রবল চেষ্টা করছে; তবে অন্য উপায়ে এই অপমানের বদলা নিতে হবে। সে চাইছে, এই ব্যবসা এখানেই তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাক। এ জন্য সে নিজের মতো করেই চাইছে সব কিছু।

ডি ওর্তেগা বলল, ঠিক আছে, আরো মহিলা আছে এখানে। অনেক আছে। আপনি তাদের দেখুন। আর এই মহিলার বাচ্চা বুকের দুধ খায়।

জ্যাকব বলল, তাহলে আইনের দ্বারস্থ হতে হবে।

ডি ওর্তেগা হাসল। মামলার রায় তো তার পক্ষেই হবে। আর মামলার রায় হতে হতে অনেক দিন পার হয়ে যাবে। সেটাও তার জন্য সুবিধাজনক হবে।

ডি ওর্তেগা বলল, আপনি আমাকে বিস্ময়ে ফেললেন।

জ্যাকব আর নমনীয় অবস্থায় ফিরে যেতে নারাজ। সে বলল, হয়তো অন্য কোনো অর্থদানকারী আমার চেয়ে সহজে রাজি হবেন আপনার কথায়। কথাগুলো বলার পর ডি ওর্তেগার নাকের পাটা ফুলে ওঠাটা দেখতে দেখতে তার ভালোই লাগে। জ্যাকব বুঝতে পারে, আঘাতটা জুতমতো লেগেছে। ঋণ শোধ না করার ক্ষেত্রে ডি ওর্তেগা সবার কাছে পরিচিতি পেয়ে গেছে। ঋণের জন্য কোনো দালাল খুঁজতে হলে তাকে এখন মেরিল্যান্ডের বাইরে দূরে কোথাও খুঁজতে হয়। কারণ তার পরিচিত বন্ধুজন, স্থানীয় নেতা—সবাইকে সে আগ্রহহীন করে ফেলেছে। তারা সবাই জানে, তাকে ঋণ দিলে বিপর্যয় অনিবার্য। ডি ওর্তেগা ঋণ শোধ করতে অপারগ হবেই। সবাই হিসাবি হয়ে গেছে। সতর্ক হয়ে গেছে।

আপনি মনে হয় আমার অফারের বিষয়টা বুঝতে পারছেন না। আমার ঋণ পুরোপুরি শোধ করার জন্য ক্রীতদাস দিতে চাইছি না। ঋণের কথাটা সম্মানের সঙ্গেই মনে রাখছি। একজন পরিপক্ব ক্রীতদাসের মূল্য অনেক।

আমি যদি তাকে ব্যবহার করতে না পারি, তাহলে তো আর তার কোনো মূল্য নেই।

ব্যবহার করার দরকার কি? বেচে দেবেন!

ভূমি মালিক জ্যাকব ভার্ক বলল, আরে মশাই, আমার ব্যবসা তো পণ্যের আর সোনার। আরো কয়েকটা কথা বলার লোভ সামলাতে না পেরে বলল, তবে আমি বুঝতে পারি, একজন ক্যাথলিকের পক্ষে কোনো কোনো বিষয়ে নিজেকে নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া কতটা কঠিন।

কথাগুলো বলার পর জ্যাকব মনে মনে বলে, সে কি খুব বেশি গূঢ় ভাব দেখাচ্ছে? না, আপাতত সে রকম মনে হচ্ছে না মোটেও। কারণ ডি ওর্তেগার হাত তার কোমরের পেছনের দিকে যাচ্ছে। ডি ওর্তেগার আঙুলগুলো তার কোমরের একটা অস্ত্রের খাপের দিকে এগোতে থাকলে জ্যাকবের দৃষ্টি তার হাতের গতিকেই অনুসরণ করে। রক্ত হিম হয়ে যাওয়া এই ফাঁপরবাজ কি সত্যি সত্যি ঋণ এবং সামাজিক অপমানের হাত থেকে বাঁচার জন্য তার পাওনাদারকে খুন করতে চায়? সে হয়তো মনে করতে পারে, নিজেকে রক্ষার জন্য এ রকম করবে। কিন্তু না, সে তো দেখতে পাবে, তার টাকা-পয়সার থলিও তার অস্ত্রের খাপের মতোই শূন্য। কারণ এভাবেই সে পুরোপুরি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ডি ওর্তেগার কোমল আঙুলগুলো অনুপস্থিত চাকুটাই খুঁজে বেড়াচ্ছে। একজন সাধারণ মানুষের সামনে নিরস্ত্র অভিজাত ব্যক্তির কাপুরুষতা দেখে জ্যাকব চোখ তুলে তাকাল ডি ওর্তেগার দিকে। জ্যাকবের হাসি পাচ্ছে। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সে দরজায় দাঁড়ানো মহিলাকে আরেকবার দেখতে পায়।

ঠিক ওই মুহূর্তে ছোট মেয়েটা মায়ের পেছন থেকে সামনে চলে আসে। তার পায়ে কয়েক গুণ বড় মহিলাদের জুতা। সম্ভবত অধিকারের মতো নতুন করে ফিরে পাওয়া বেপরোয়া মনোভাব আর ভাঙা-ছেঁড়া জুতা থেকে কাঁটাগাছের সরু ডালের মতো বের হয়ে আসা পা দুটি দেখে তার হাসি পায়। ওই মুহূর্তের কমেডি আর এখানে এসে নিজের আশাহীন বিরক্তি তৈরি হওয়ার কারণেও হাসি পায়, একেবারে বুক কাঁপানো হাসি। ছোট ছেলেটাকে কোলে নিয়ে মহিলা তার দিকে এগিয়ে আসার সময়ও তার হাসি থামেনি। মহিলার কণ্ঠ একেবারে ফিসফিসানির মতো মনে হলেও তার কণ্ঠের জোরালো মিনতি স্পষ্ট বোঝা যায়, প্লিজ! সেনিওর, আমাকে নয়, আমার মেয়েকে নিয়ে যান।

জ্যাকব মুখ তুলে মহিলার দিকে তাকাল। শিশুটার বড় জুতা পরা পায়ের থেকে বেশ খানিকটা দূরে। হাসির কারণে তখনো তার মুখ হাঁ করে আছে। জ্যাকবের হাসিটা যেন মহিলার চোখে-মুখে লেগে থাকা ভীতির সামনে আটকে গেছে। শেষে ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে নিভে গেল হাসিটা। মাথা ঝাঁকিয়ে জ্যাকব মনে মনে বলল, ঈশ্বর সহায় হোন, এটা যেন ভয়াবহ দুঃখের কাজ না হয়।

একটু আগের বিব্রতকর অবস্থাটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টায়, নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় ডি ওর্তেগা বলল, কেন নয়, হ্যাঁ। অবশ্যই। ওকে আমিই আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। কথাগুলো বলার সময় নিজের অবস্থান থেকে নেমে এসে সে অনুমোদনের হাসি ছড়িয়ে দেয়।

ডি ওর্তেগাকে জ্যাকব বলল, উত্তর একটাই। তবে মনে মনে বলল, এই বিকল্প থেকে আমার মনে হয়, একজন বড় পুরুষ নিলে ভালো হতো। ভালো করে ভেবে দেখলে রেবেকা হয়তো বাচ্চাই বেশি পছন্দ করবে। সে চাইবে, তার আশপাশে একটা বাচ্চা ঘুরে বেড়াবে। ভয়াবহ রকমের বড় জুতার ভেতর সাঁতার কাটার মতো অবস্থায় দেখা এখানকার এই মেয়েটার বয়স প্যাট্রিসিয়ানের মতোই হবে। খানিকটা মৃত মেয়ের অভাব পূরণ করবে। আবার হয়তো কপালে কোনো মাদি ঘোড়ার লাথি খেয়ে মেয়েটা মারা গেলে রেবেকা খুব বেশি ভেঙে পড়বে না।

ডি ওর্তেগা বলল, এখানে একজন যাজক আছেন। তিনি মেয়েটাকে আপনার কাছে পৌঁছে দেবেন। আপনার পছন্দমতো উপকূলের যেকোনো বন্দরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটা ছোট জাহাজে তুলে দেব।

না, আমি আগেই বলেছি, না।

ঠিক তখনই লবঙ্গর গন্ধওয়ালা মহিলা হঠাৎ চোখ বন্ধ করে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।

তারপর তারা নতুন কাগজপত্র লিখে ফেলল। মেয়েটার সামনের বয়স বিবেচনা করে এবং তিন পিপা পরিমাণ তামাক আর পনেরো ইংলিশ পাউন্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য কমিয়ে এনে পাউন্ডের হিসাবটাই ধার্য করে তারা দুজনই একমত হলো, মেয়েটার মূল্য বিশ স্প্যানিশ মুদ্রা। দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল; ডি ওর্তেগার মুখের ওপর তার স্পষ্ট ছাপ। ওখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য এবং নিজের ভালো অভিমতকে আবারও পুষ্ট করার জন্য ব্যাকুল হয়ে মিস্ট্রেস ডি ওর্তেগা, ছেলে দুটি এবং তাদের বাবাকে বিদায় জানিয়ে দিল। সরু পথটাতে যেতে যেতে রেজিনাকে ঘুরিয়ে নিল এবং দম্পতির দিকে হাত নাড়তে লাগল।

আরেকটু জোরে চলার জন্য রেজিনাকে তাড়া দিতে লাগল জ্যাকব। বেলা পড়ে এসেছে। বাতাস আগের চেয়ে আরো ঠাণ্ডা হয়েছে। জ্যাকবের তাড়া আছে। সূর্য ডোবার আগেই ভার্জিনিয়ায় ঢুকে পড়তে হবে, ভার্জিনিয়ার বেলাভূমি পার হয়ে পার্সির সরাইখানায় পৌঁছতে হবে রাত নামার আগেই। সময়মতো পৌঁছে রাতে ঘুমানোর জন্য একটা বিছানা পাওয়া চাই। নইলে ওরা তিন-চারটা বিছানা এক করে গুছিয়ে ফেলবে। তখন অন্য সাধুদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যেকোনো জায়গায় গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকতে হবে। জ্যাকব ঘোড়ারক্ষকের কাছে রেজিনাকে ফিরিয়ে দিয়ে তার পাওনা শোধ করে দিল। এরপর ধীরে ধীরে জাহাজঘাট এবং পার্সির পানশালার দিকে হাঁটা দিল।

পার্সির পানশালা রবিবার বন্ধ থাকে, তা জ্যাকবের আগেই জানা উচিত ছিল। সুতরাং সব সময় খোলা থাকে এমন একটায় গেল সে। খুব পরিপাটি নয়, অবৈধ এবং রূঢ় ছেলে-ছোকরাদের জন্য খাবার সরবরাহ করে; তবে খাবারের ঘাটতি পড়ে না। তারা কখনো বিরক্তিকর খাবার পরিবেশন করে না। জ্যাকবের দ্বিতীয়বার মদ নেওয়ার সময় একজন বেহালাবাদক আর একজন  বংশীবাদক ঢুকল; তাদের উদ্দেশ্য আনন্দ করা এবং সঙ্গে কিছু পয়সা উপার্জন করা। বাঁশিওয়ালার বাদনক্ষমতা আসলে জ্যাকবের নিজের চেয়ে খুব একটা বেশি আছে বলে মনে হলো না। লোকটার এ রকম পারদর্শিতা দেখে জ্যাকবের ভেতরে প্রাণচাঞ্চল্য জেগে উঠল; সে তাদের গানে অংশ নিতে লাগল।

জ্যাকব একটা টেবিলে বসল। কিন্তু আগে যারা খেয়ে গেছে, তাদের খাবারের অবশিষ্ট এখনো রয়ে গেছে সেই টেবিলে। চারপাশের লোকজন গালগপ্প করছে; তাদের আলাপের প্রধান বস্তু চিনিজাতীয়—মানে রাম। রামের দাম আর চাহিদা এখন তামাকের চেয়েও বেশি। রামের সরবরাহে বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। যে লোকটা ভাবেসাবে মনে হলো কিল-ডেভিল সম্পর্কে, রাম উৎপাদনের কলাকৌশল সম্পর্কে এবং এর উপকারিতা সম্পর্কে অন্য সবার চেয়ে বেশি জানে। গপ্পের আসরে তার কর্তৃত্ব একজন মেয়রের মতো।

চেহারা গাবদাগোবদা, মুখে নানা রকম গর্তের দাগ। তার ভাবেসাবে মনে হচ্ছে, বিচিত্র সব জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা আছে তার। তার মুখের খুব কাছের কোনো জিনিস দেখতে সে অভ্যস্ত নয় মনে হচ্ছে। তার নাম হলো ডাউনিস, পিটার ডাউনিস। একটা কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেকে ডাকা হলো। সে দুই হাতে ছয়টা পানপাত্র নিয়ে হাজির হলো, একেক হাতে তিনটা করে পানপাত্রের হাতল ধরা। পাত্রগুলো সে টেবিলে রাখার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন পাঁচটা নিয়ে নিল। তাড়াতাড়ি সবাই গলায় ঢেলেও দিল। ডাউনিসও নিল একটা। কিন্তু প্রথমবারের সবটুকু পানীয় সে কুলি করে মেঝেতে ফেলে দিল। কারণ হিসেবে সবাইকে বলল, তার এই কাজটা একদিকে নিবেদন, আরেক দিকে বিষ থেকে সতর্কতা।

তাদের একজন বলে উঠল, সেকি! বিষ তো থাকলে থাকবে নিচে, একেবারে তলায়।

ডাউনিস বলল, না, না। বিষ তো ডুবন্ত জীবের মতো, মরার পরে ভেসে ওঠে।

টেবিলের সবার হাসি-তামাশায় যোগ দিল জ্যাকবও। মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল ডাউনিসের মনোমুগ্ধকর গালপপ্প—সবগুলো গল্পই শেষ হচ্ছে বার্বাডোজের নারীদের বিরাট স্তনের প্রাণবন্ত বর্ণনা দিয়ে।

জ্যাকব বলল, আমি একবার ওখানে বসতি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আরে, ওখানকার নারীদের বুক কী রকম?

ডাউনিস বলল, বেশ্যাদের বুকের মতো আরামদায়ক, তবে সাংঘাতিক।

মানে?

ডাউনিস শার্টের হাতায় ঠোঁট মুছে বলল, মানে হলো, ওখানে সব কিছুই প্রচুর এবং পাকা, শুধু জীবন ছাড়া। মানুষের জীবন ওখানে সংক্ষিপ্ত, খুব ছোট। ছয় মাস, আঠারো মাস—বলেই সে বিদায় জানানোর মতো করে আঙুল নাড়াল।

তাহলে সামলায় কিভাবে? সব সময় তো বিশৃঙ্খলা লেগেই থাকে। জ্যাকব আসলে জুবলিওর সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক এবং বার্বাডোজের অখণ্ড শ্রমিকদের মাঝের পার্থক্যের কথাটাই ভাবছে।

মোটেই না, ডাউনিস হেসে বলল। শ্রমিকের জোগান তারা সব সময়ই পায়, জাহাজে করে আনতেই থাকে। জ্বালানি কাঠের মতো, যেগুলো পোড়ানো হলো, সেগুলোর জায়গায় নতুন কাঠের জোগান দেওয়া হলো। আর ভুলে যাওয়া যাবে না, সেখানে মানুষের জন্ম তো অবিরত হচ্ছেই। বর্ণসংকর, মিশ্র ইউরোপীয়-আফ্রিকান, জাম্বো, মেসটিজো, লোবো, চিনো, কয়োটদের নিয়ে একটা জগাখিচুড়ি পাকানোর জায়গা, ডাউনিস বার্বাডোজে পয়দা হওয়া মানুষদের শ্রেণি গুনতে গুনতে বুড়ো আঙুল দিয়ে অন্যান্য আঙুল ছুঁয়ে চলল।

জ্যাকব বিপরীত যুক্তি দেখিয়ে বলল, তবু ঝুঁকি অনেক বেশি। শুনেছি, মহামারিতে গোটা তালুক উজাড় হয়ে যায়। শ্রমিকসংখ্যা আস্তে আস্তে একেবারে কমে গেলে, জাহাজে করে আনা শ্রমিকদের সংখ্যাও ধীরে ধীরে আগের চেয়ে কমে গেলে তখন কী হবে?

গোটা জাহাজকেই যেন হাত দিয়ে টেনে আনছে—এমন ভঙ্গিতে ডাউনিস বলল, শ্রমিকের সংখ্যা কমে যাবে কেন? একজন ইংরেজ আবাদি ক্রীতদাস কিনতে যতটা আগ্রহী, আফ্রিকার লোকেরা ওলন্দাজদের কাছে ক্রীতদাস বিক্রি করতে ততটাই আগ্রহী। রামরাজত্ব। রামের ব্যবসা কে করছে সেটা বড় কথা নয়। আইন? আরে আইন কী? তাহলে শুনুন। ম্যাসাচুসেটস এরই মধ্যে রাম বিক্রির বিরুদ্ধে আইন চালু করার চেষ্টা করেছে। এক ড্রাম পর্যন্ত বেচা থামাতে পারেনি। উত্তরাঞ্চলের উপনিবেশগুলোতে ঝোলা গুড় বিক্রি আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে চলছে। একেবারে প্রস্তুত মুনাফা। পশম, তামাক, কাঠ—সব কিছুর চেয়েই দ্রুত মুনাফা পাওয়া যায় গুড় বিক্রি করে। শুধু সোনাদানার বিক্রি ছাড়া আর কিছুতে এত তাড়াতাড়ি  মুনাফা পাওয়া যায় না, এ আমি গুনে বলে দিতে পারি। জ্বালানি যতক্ষণ আবার জোগান দেওয়া যাবে, ভাটি ফুলেফেঁপে উঠবে, টাকাও স্তূপে পরিণত হবে। কিল-ডেভিল, চিনি—এগুলোর জোগান কখনো কমবে না ওখানে। এক জীবনে শেষ না হওয়ার মতো ব্যবসা।

জ্যাকব বলল, ব্যবসাটা মানের দিক থেকে নীচু। কঠিনও তো।

বিষয়টা অন্যভাবেও তো দেখা যেতে পারে। যেমন—পশমের জন্য আপনাকে পশু শিকার করতে হবে, পশু হত্যা করতে হবে, চামড়া ছাড়াতে হবে, পরিবহন করতে হবে, এমনকি স্থানীয়দের মোকাবেলাও করা লাগতে পারে। তামাকের দরকার প্রকৃতি; ফসল ফলানো, শুকানো, প্যাকেট করা, গোছানো ইত্যাদি করা লাগে। তবে সবচেয়ে বেশি দরকার সতেজ মাটি। আর চিনি? রাম? আখ বড় হতে থাকে। আপনি ইচ্ছা করলে থামাতেও পারবেন না। আখের জমির মাটি কখনো শেষ হয় না। শুধু কাটতে হবে, রস রান্না করতে হবে, তারপর জাহাজে তুলে দেওয়া—কথাগুলো বলে ডাউনিস দুহাতে তালি বাজিয়ে দেয়।

এতটাই সোজা, না?

কমবেশি সে রকমই। তবে কথা হচ্ছে, বিনিয়োগ খোয়া যাবে না। একেবারেই না। কখনোই না। ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নেই। বিবর কিংবা শিয়ালের আক্রমণ নেই। মাঝখানে এসে হস্তক্ষেপ করার মতো যুদ্ধবাজিও নেই। সব সময় প্রচুর ফসল পাওয়া যায়। ক্রীতদাস দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ আছে। সব সময়ই আছে, একই রকম। ক্রেতারাও ফসল কিনতে আগ্রহী। স্বর্গীয় উৎপাদন। কারখানা থেকে বোস্টন পর্যন্ত পৌঁছতে এক মাসের মধ্যে পঞ্চাশ পাউন্ড বিনিয়োগ করলে যে কেউ পাঁচ গুণ লাভ করতে পারে। চিন্তা করে দেখুন, প্রতি মাসে বিনিয়োগের পাঁচ গুণ লাভ। একেবারে নিশ্চিত।

জ্যাকব না হেসে পারল না। কথা বলার এ রকম ধরন সে চিনতে পেরেছে; সব দ্বিধা-লজ্জা ত্যাগ করে ফেরিওয়ালা দালাল হয়েছে। সব যুক্তির দ্বার বন্ধ করে দিয়ে দ্রুত মুনাফার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এতক্ষণ ধরে দেখা ডাউনিসের পানীয়র প্রতি আপাতত অনাগ্রহ এবং পোশাক দেখে জ্যাকবের সন্দেহ হয়, সে যেসব সহজ মুনাফার গালগপ্প করছে, নিজে সেগুলো তুলতে পারেনি।

তার পরও জ্যাকব মনে মনে ঠিক করে, ভেবে দেখা যেতে পারে।

ঝিনুক, বাছুরের মাংস, লম্বা হলুদ এক ধরনের সবজিমূল, বসা-পুডিং—এসব দিয়ে ধীরগতির খাওয়াদাওয়ার সময়ই বুঝতে পারে, মুখের রুচি তাহলে ফিরে এসেছে। খাওয়া শেষ করে দেখতে পায়, ঘুমানোর মতো জায়গা খানিক পাওয়া যাচ্ছে; তবে শোয়ার মতো ফাঁকা জায়গাটায় আরো একজন মানুষের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা আছে। বাইরে একটু হাঁটাহাঁটি করতে বের হতেই সারা দিনের সব কাজকর্মের কথা মনে পড়ে গেল জ্যাকবের; একটা হাতাশার দিন, পাওনার টাকার অংশ হিসেবে মেয়েটাকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে সে, একটা অপমানজনক ঘটনা। সে বুঝতে পারে, ডি ওর্তেগার কাছ থেকে আর একটা ফুটো পয়সাও পাওয়া যাবে না। তখন ডি ওর্তেগার বিরুদ্ধে মামলা করলে জিতে আসা যাবে। পাওনা টাকার বদলে একটা বাচ্চাকে নিতে কেউ বাধ্য করতে পারবে না তখন। সে জানে, রেবেকা এই মেয়েটাকে পেলে খুশি হতে পারে বলে নিজেকে বোঝানোর যে চেষ্টা সে করেছে, তার কারণ নিহিত আছে অন্যখানে। ছোটবেলা থেকে সে দেখে এসেছে, এই জগতে মানুষের আশ্রয়হীন এতিম বাচ্চা আর পশুদের বাচ্চার জন্য অপরিচিত লোকের উদারতা ছাড়া কোনো ভালো জায়গা নেই। এমনকি যদিও তাদের কোনো কিছুর বিনিময়ে বদল করা হয়, কারো কাছে দিয়ে দেওয়া হয়, নবিশ হিসেবে কাজ শেখানো হয়, বিক্রি করে দেওয়া হয়, একটার সঙ্গে আরেকটার বদল করা হয়, লোভ দেখিয়ে বিপথে নেওয়া হয়, খাবারের লোভ দেখিয়ে বিপদে ফেলা হয়, আশ্রয়ের কথা বলে কাজ করিয়ে নেওয়া হয় কিংবা চুরি করা হয়, তবু তারা শুধু বড়দের নিয়ন্ত্রণে থাকলে কম ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

সে শুনেছে, তার মা সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা গেছে। তার কোনো সামাজিক গুরুত্ব ছিল না। তার বাবা এসেছিল আমস্টারডাম থেকে। তাকে শুধু একটা নামই দিয়ে গেছে, যে নামটার মধ্যে আছে কৌতুকের সুযোগ। বাবা ফেলে গেছে একটা গভীর সন্দেহের মধ্যেও। ইংরেজের ওপর ওলন্দাজ যে লজ্জা রেখে গেছে, তার প্রমাণ সবখানে, বিশেষ করে একটা আইনি প্রতিষ্ঠানে হরকরা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগের সময়টায় যখন সে একটা দরিদ্রাশ্রমে থাকত, তখন খুব বেশি মাত্রায় টের পেয়েছে সেই লজ্জা। হরকরার কাজ করার জন্য পড়াশোনা জানার দরকার ছিল। শেষে কম্পানি তাকে চুক্তিতে নিয়োগ দেয়। জন্মসূত্রে কপর্দকহীন হওয়া এবং খোদ জন্মের মধ্যেই লজ্জা বয়ে বেড়ানোর হতাশা থেকে মুক্তি মেলে উত্তরাধিকারে পাওয়া জমিতে। তবু এতিম আর রাস্তাঘাটে ঘুরে বেড়ানোদের জন্য তার মনের মধ্যে অস্থির এক রকম খচখচানিবোধ পুষে রেখেছে জ্যাকব। হাটে-বাজারে, অলিগলিতে এবং তার চষে বেড়ানো সব বন্দরে পাওয়া ওদের এবং তার নিজের উপচে পড়া দুঃখের কথা বারবার স্মরণে আসে।

যখন কম্পানির তরফে একজন ছোটখাটো ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করত এবং পাশাপাশি পশম ও কাঠের ব্যবসা করত, তখনই সে জানতে পারে তার উত্তরাধিকারের প্রসঙ্গটা। সুখের স্বপ্ন দেখতে থাকে, নিজেকে একজন জমির মালিক কৃষক ভাবতে থাকে। তারপর আর সিদ্ধান্ত বদল করে না সে। একজন স্ত্রীর নিশ্চয়তা বিধান করে, স্ত্রীকে সহযোগিতা দিতে পারে এমন একজনের ব্যবস্থা করে, গাছপালা রোপণ করে, বাড়ি তৈরি করে এবং তার চারপাশের মানুষদের প্রতি উদারতা দেখায়। সে যে দুজন পুরুষ কর্মীকে মাঝেমধ্যে কাজে লাগায়, তাদের মধ্যে হুমকি হওয়ার মতো কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। আরেকজন হলো এক দশক আগের কোঁকড়া চুলের ওই মেয়েটা, যাকে সবাই সরো নামে ডাকে। এদের দুজনকে পাওয়ার বিষয়কেই উদ্ধার বলা যেতে পারে। শুধু লিনাকেই পুরোপুরি এবং ইচ্ছা করে সচেতনে কেনা হয়েছে। অবশ্য সে সময় সে বাচ্চা ছিল না, পুরোপুরি একজন নারী ছিল।

রাতের উষ্ণ বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে যত দূর সম্ভব এগিয়ে যেতে থাকে জ্যাকব। একসময় পানশালার আলোগুলো অলংকারের ছোট পাথরের মতো অন্ধকারের বুকে জ্বলজ্বল করছে বলে মনে হয়; পানোন্মত্ত মানুষদের কণ্ঠও তটে ভেঙে পড়া ঢেউয়ের মৃদু রেশমি শব্দের ভেতর হারিয়ে যায়। আকাশটা তার ভোরের আগুনের কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে এবং আকাশটাকে কৌশলে রেজিনার চামড়ার মতো একটা মসৃণ এবং কালো পটভূমিতে ঠাণ্ডা তারাদের মধ্যে ভুলিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পানির ওপর পড়া তারাদের ফোঁটা ফোঁটা আলোর দিকে তাকিয়ে থেকে নিচু হয়ে পানিতে হাত রাখে জ্যাকব। হাতের তালুর নিচ দিয়ে বালুর স্রোত বয়ে যায়। তার কবজি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই ঢেউয়ের শিশুগুলো মরে যায়, শার্টের হাতার সামনের অংশ ভিজিয়ে দিয়ে যায়। আস্তে আস্তে সারা দিনের সব ধুলাবালি ধুয়ে যায়, রেকুনের সামান্য রক্তের দাগও। সরাইখানায় ফেরার পথে তার সামনে আর কিছুই থাকে না। শুধু তাপটা রয়ে যায়; সোনালি কিংবা ধূসর কোনো রকম কুয়াশাই আর নেই।

গরম কিছুতেই শেষ হলো না। তার পাশে শুয়ে থাকা লোকটা ঘুমের মধ্যে খুব নড়াচড়া করল। তবে জ্যাকবের ভালো ঘুম হলো। ঘুম ভালো হওয়ার কারণ সম্ভবত তার স্বপ্নের ভেতরে দেখা বাড়িটা, জাঁকজমকপূর্ণ আর বিশাল, অনেকগুলো রুম। কুয়াশা ছাড়িয়ে একটা পাহাড়ের ওপর অবস্থিত।

তুমি না বলে চলে যাওয়ার পর গ্রীষ্ম চলে যায়; শরৎ চলে যায়; তারপর শীত মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গেই ফিরে আসে বালা-মসিবত। আগে সরোর যেমন অসুখ হয়েছিল তেমন নয়, এবার অসুখ হয় স্যারের। এবার তিনি ফিরে আসার পরই মনে হয়, তিনি আর আগের মতো নেই। বদলে গেছেন, ধীরস্থির, কিছুতেই তাঁকে খুশি করা যায় না। মিস্ট্রেসের সঙ্গে মেজাজ খারাপ করে কথা বলেন। সব সময় তাঁর খুব গা ঘামে। সব সময় আপেলের রস খেতে চান। সবাই বিশ্বাস করে, তাঁর ফোসকাগুলো আর সরোর পুরনো অসুখের মতো সারবে না। সারা রাত বমি করেন, সারা দিন খিস্তি ঝাড়েন। তারপর একসময় এত দুর্বল হয়ে পড়েন, বমি করা কিংবা খিস্তি ঝাড়া—কোনোটাই করতে পারেন না। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, তিনি তো আমাদের মতো কাজের লোকদের নিয়েছেন জেনেশুনে, আমরা সবাই হামের আক্রমণ কাটিয়ে উঠেছি। তাহলে তাঁর এমন অসুখ হলো কেন?  আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যদিও বাড়িটার কাজ শেষ হয়নি, তোমার লোহার কাজ দেখতে দারুণ হয়েছে। গেটের মুকুটের ওপর বানানো চকচকে সাপ দুটি এখনো ঠোঁট দিয়ে চুমু দিয়ে যায়। উইল আর স্কালি চলে গেছে, আর আসেনি। আমরা নারীরাই একটা কম্বলের চার কোনা ধরে যখন তাঁকে নিয়ে যাই, তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে থাকেন। তাঁর মুখটা হাঁ করা। সেই ঘুম থেকে আর জাগেন না। চেরিগাছের কাঠ দিয়ে তিনি মেঝে বানিয়েছেন। সেই মেঝেতে তাঁকে শোয়ানো হয়। চেরি কাঠের গন্ধ শোঁকার জন্য তিনি একটা মিনিটও জীবিত আছেন কি না মিস্ট্রেস কিংবা আমরা কেউই বুঝতে পারি না। আমরা একা হয়ে যাই। তাঁর দাফন করার জন্য কিংবা শোক করার জন্য আমরা ছাড়া আর কেউ থাকে না। উইল আর স্কালি গোপনে এসে তাঁর কবরটা খুঁড়ে দিয়ে যেতে পারত। তাদের সরে থাকতে সতর্ক করা হয়। আমার মনে হয় না, তারা সরে থাকতে চায়। আমার মনে হয়, মালিকের অসুখের কারণেই তারা আসতে চায় না। উপপুরোহিত তাঁর একজন বন্ধু মানুষ, সরোকে পছন্দ করেন। তবু আসেন না। গির্জার নিয়মিত উপাসকদের কেউই আসে না। তাঁর সন্তানদের পাশে তাঁকে সমাহিত না করা পর্যন্ত এ নিয়ে আমরা কেউ উচ্চবাচ্য করি না।

আকাশে সূর্যের আলো কিংবা চাঁদের জোছনা যা-ই থাকুক না কেন, তার নিচে তোমাকে পেছন থেকে দেখতে কেমন লাগে তুমি জানো না। আমি ওখানেই মগ্ন থাকি। আমার হাত, আমার চোখ, আমার মুখ—সব ওখানে থাকে। তোমার এই সৌন্দর্য প্রথম দেখি তুমি যখন হাপরের আগুন জ্বালাও। তোমার পিঠ বরাবর পানির চকচকে ধারা নেমে যায়; আমার ভেতরে শিহরণ জাগে। ইচ্ছা করে, তোমার পিঠ আমার জিব দিয়ে চেটে দিই।  আমার অস্তিত্বজুড়ে শুধু তুমি। তুমি ছাড়া কিছু নেই। আমার পেট নয়, চোখই সবচেয়ে ক্ষুধার্ত অঙ্গ। তোমার চলাচল দেখার মতো যথেষ্ট সময় আর পাওয়া যাবে না। লোহার ওপর আঘাত করার সময় তোমার হাত ওপরে উঠে যায়। তুমি এক হাঁটুর ওপর ভর করে বসে পড়ো। তুমি নিচু হও। প্রথমে লোহার ওপর পানি ঢালো, তারপর নিজের গলায় ঢেলে দাও। এ জন্য তোমার কাজ খানিকটা থামাও। আমি যে এই জগত্সংসারে আছি, সেটা তুমি জানার আগেই আমি তোমার জন্য মরে গেছি। আমার পা থেমে যায়। পায়ের শব্দ হয় না। আমার হৃৎপিণ্ড প্রসারিত হতে থাকে, যেন টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

রাত নেমে আসে। আমি একটা মোমবাতি চুরি করে নিয়ে আসি। একটা পাত্রে কয়লা নিয়ে আসি জ্বালানোর জন্য। তোমাকে আরো দেখার জন্য। আগুন জ্বালানোর পর হাত দিয়ে আগুনের শিখা আড়াল করার চেষ্টা করি। তোমার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। অনেকক্ষণ ধরে দেখতেই থাকি। পুরোপুরি বেখেয়াল। আগুনের আঁচে আমার তালু পুড়ে যায়। মনে হয়, তুমি যদি জেগে উঠে দেখো আমি তোমাকে দেখছি, তাহলে আমি মরেই যাব। আমি পালিয়ে যাই। আমি জানতেই পারি না, আমাকে তুমি এই অবস্থায় দেখে ফেলেছ। শেষে যখন আমাদের চার চোখের মিলন হয়, আমি মরে যাই না। প্রথমবারের মতো আমি জীবন্ত বোধ করি।

আমার ভালো লাগে। আমার কাছে একটা শুভ লক্ষণ মনে হলেও লিনা আমাকে অনেক কিছু থেকে সাবধান করে। বলে, তুই যদি নিজের মতো ঠিক না থাকিস, আমি কিন্তু তোর সঙ্গে থাকব না। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসতে হয়। আমি ঘোড়া চালাতে পারি না। সুতরাং আমাকে পরের দিনের ঘোড়ার গাড়ির জন্য ফিরে আসতে হয়। দু-চারজন মানুষ আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের দিকে তাকায়। কিন্তু কথা বলে না। আমরা মেয়েমানুষ। এ জন্য তাদের আর ভয় নেই। লিনাকে তারা চেনে। কিন্তু এমনভাবে তাকায়, যেন আমরা অচেনা মেয়েমানুষ। আমরা অপেক্ষা করতেই থাকি। অপেক্ষা করতে করতে আমার কাছে রাখা রুটি আর কডমাছ খেয়ে শেষ করে ফেলি। সবগুলো কড খেয়ে ফেলি। লিনা হাত দিয়ে মাথা চেপে বসে থাকে। তার কনুই হাঁটুর ওপরে। লিনা বিরক্তি প্রকাশ করে। সুতরাং আমি ছাগলওয়ালার হ্যাটের কথা ভাবতে থাকি।

বাতাস খুব ঠাণ্ডা। তুষারের গন্ধ পাই। শেষমেশ ওয়াগনটা আসে। আমি উঠে পড়ি। চালক আমাকে উঠতে সাহায্য করে। তার হাতটা আমার পিঠের ওপর অনেকক্ষণ পড়ে থাকে। আমি লজ্জা পাই। নে ভাইদের বাদ দিলে আমরা মোট সাতজন। বসন্তের তুষার দেখে শুধু ঘোড়াগুলোই ভয় পেয়েছে তা নয়। ঘোড়াগুলোর পেছনের পাশ কাঁপতে থাকে। তাদের কেশর ঝাঁকি খায়। তুষার পতনের সময় আমরাও ভয় পেয়ে যাই, তবে চুপ করে বসে থাকি। আমাদের চাদরের ওপর, আমাদের হ্যাটের ওপর তুষার পড়ে। শুধু এই ছেলেটার আর আমার পা ঢাকার মতো এক টুকরো ন্যাকড়া পর্যন্ত নেই।

গাছের পাতার ওপর আকস্মিক তুষারপাত সুন্দর লাগছে। তুষার দীর্ঘক্ষণ থাকলে মাটির ওপর পশুদের পায়ের দাগ স্পষ্ট দেখা যায়, মানুষের জন্য তাদের শিকার করা সহজ হয়। এবারের তুষারও মনে হয় দীর্ঘ হবে। মানুষ তুষারপাতে খুশি হয়। স্যার বলেন, তুষার পড়লে কেউই না খেয়ে থাকে না। তবে এবারের তুষার বেশিদিন থাকবে না, যতই ঘন, ভারী আর ভেজা হোক না কেন। আমার স্কার্টের মধ্যে পা গুটিয়ে এনেছি, গরম করার জন্য নয়, চিঠিটা ভালো করে রাখার জন্য। রুটি বাঁধা পোঁটলাটা আমার কোলের মধ্যে আটকে রেখেছি।

তোমার কাছে আসার পথটা মিস্ট্রেস আমাকে একেবারে মুখস্থ করিয়ে দিয়েছেন। পোস্ট রোড ধরে উত্তর দিকে যাওয়া নে ভাইদের ওয়াগনে উঠব সকালে। একটা পানশালায় একবার থামার পর ওয়াগনটা একটা জায়গায় আসবে, যেটার নাম তিনি বলেন হার্টকিল। দুপুরের পর ঠিক ওখানেই আমি নামব। তারপর বাঁয়ে পশ্চিম দিকে আবেনাকি পথ ধরে হাঁটা দেব। আমি জিজ্ঞেস করি, তোমরা কি কোনো প্রিয়জন পেছনে ফেলে যাচ্ছ? সবাই আমার দিকে তাকায়। একজন বলে, বেকুব একটা। আমার সামনে বসা এক মহিলা বলে, বয়স অল্প তো। আরেকজন পুরুষও তা-ই বলে। আরেক মহিলা উঁচু গলায় বলে, বাদ দাও এর কথা। বেশ জোরেই শোনা যায় তার কথা। চালক চিৎকার করে বলে, পেছনে গিয়ে ঠিকমতো বসেন তো! আমাকে যে লোকটা বেকুব বলেছে, সে মাথা নিচু করে পায়ের গোড়ালি চুলকাতে থাকে। বেশ অনেকক্ষণ ধরেই চুলকায়। অন্যরা তখন কাশি দেয় কিংবা পাটাতনে জুতা ঘষতে থাকে, যেন চালকের হুকুমের প্রতিবাদ জানাচ্ছে। আমার পাশের মহিলা ফিসফিস করে বলে, ট্যানারিতে কফিন নেই, শুধু এসিডে তাড়াতাড়ি মৃত্যু হয়।

পানশালায় থামার পর দেখতে পাই, সেখানে আলো নেই। প্রথমে আমি খেয়াল করতে পারি না। আমাদের একজন যখন বিষয়টা বলে ফেলে, তখন অন্য সবাই বুঝতে পারি। গাছপালার ভেতর দিয়ে একটা আলো মিটিমিট করে জ্বলছে। নে ভাইয়েরা ভেতরে ঢোকে। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। তারা ঘোড়াগুলোকে আর আমাদের পানি খাওয়ানোর জন্য বাইরে আসে। আবার ভেতরে চলে যায়। এরপর আবার হাতাহাতির শব্দ শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখি, তাদের পায়ে লাগানো দড়ি খুলে ওয়াগনের পাটাতনে পড়ছে। তুষার শেষ হয়ে গেছে। সূর্য ডুবে গেছে। নীরবে ছয়জন নেমে পড়ে। পুরুষগুলো মহিলাদের জাপটে ধরে নামায়। ছেলেটা একা একা লাফিয়ে নামে। তিনজন মহিলা আমার দিকে এগিয়ে আসে। আমিও লাফ দিয়ে নামি। আমরা যেদিক থেকে এসেছি, সেদিকে হাঁটা দেয় তারা। রাস্তার পাশে গাছের নিচে আশ্রয় পাওয়ার জন্য তারা জোরে জোরে পা চালায়। আমি তাদের অনুসরণ করি না। আমার বুকের ভেতর একটা ঠাণ্ডা পাথর জমাট হয়ে আছে। আমি তোমাকে খুঁজে পাওয়ার কাজটাই বেছে নিই। আমি গাছপালার ভেতর দিয়ে পশ্চিম দিকে হাঁটা দিই। আমি যা চাই সব আছে পশ্চিম দিকে। তোমাকে। তোমার কথা। তুমি যে ওষুধ জানো, সেটা মিস্ট্রেসকে সারিয়ে তুলবে। আমার যা যা বলার আছে, তোমাকে শুনতে হবে। আমার সঙ্গে তোমাকে আসতে হবে। আমাকে শুধু পশ্চিম দিকে যেতে হবে। এক দিন? দুই রাত?

রাস্তা বরাবর আখরোটগাছের ভেতর দিয়ে হাঁটছি আমি। কিছু কিছু গাছ নতুন পাতা বের করেই ফেলেছিল। তুষারপাত হওয়ার কারণে চুপ হয়ে গেছে। তুষার গলার সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করছে। বোকা গাছগুলো তাদের শুকনো মটরদানার মতো কুঁড়ি মাটিতে পড়ে যেতে দিয়েছে। আমি এখন উত্তর দিকে যাচ্ছি, যেখানে কচি চারাগুলো মাটির দিকে নুয়ে আছে আর এইমাত্র গজানো চারাগুলো সোজা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর তোমার কাছে পশ্চিম দিকে যাব। আমি তাড়াহুড়ার ওপর আছি; সূর্যের আলো নিভে আসার আগেই পৌঁছতে হবে। এখানকার মাটি একেবারে খাড়া হয়ে নিচের নিকে নেমেছে। নিচে নামা ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। কঠিন চেষ্টা করেও রাস্তা হারিয়েই ফেলেছি। পায়ের তলার মাটি সবখানেই ঢালু। মাটির ওপর তুষার পড়ে আছে। পা পিছলে যাচ্ছে, তুষারের ওপর পায়ের দাগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আকাশের রং এখন কিশমিশের মতো। আরো সামনের দিকে যাব কি না ভাবছি। যাওয়া কি উচিত হবে? আমি যেহেতু জন্তুটার গন্ধ পাচ্ছি, সেও আমার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে নিশ্চয়ই। তবে গন্ধটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়। আমার মনে হয়, একটা গাছে উঠে পড়াই ভালো। এ রকম কোনো গাছ আশ্রয়ের জন্য যথেষ্ট; তবে উঠতে গা ছিলে যায়, কষ্ট করতে হয়। ডাল দুলতে থাকে, তবে ভাঙে না।  ডালগুলো ক্যাঁচক্যাঁচ করে, বাঁকা হয়ে যায়। আজ রাতের জন্য পরিকল্পনাটা খুব ভালো হয়নি। লিনার প্রয়োজন এখন বুঝতে পারছি—বনবাদাড়ে কিভাবে আশ্রয় পাওয়া যায় বলতে পারত।

উৎসবমুখর পরিবেশ, সংশ্লিষ্ট সবার অস্থির সন্তুষ্টি লিনাকে তেমন আকর্ষণ করল না। বাড়িটার ভেতর সে প্রবেশ করেনি। নিকটে পর্যন্ত যায়নি। স্যারের তৃতীয় এবং সম্ভবত সর্বশেষ বাড়ি এটা। এ রকম একটা বাড়ি তৈরি করতেই হবে—এমন একটা জোর ছিল তাঁর দিক থেকে। এটা বানানোর কারণে সূর্যের আলো আড়াল হয়ে গেছে খানিক, পঞ্চাশটা গাছ নিধন করতে হয়েছে।

আর এখন তো তিনি মরেই গেছেন; বাড়ির রুমে রুমে চিরদিন তিনি ঘুরে বেড়াবেন। তাঁর প্রথম বাড়িটা তৈরি করেছিলেন কাঁচা কাঠ দিয়ে; মেঝে ছিল কাঁচা মাটির। লিনার জন্ম হয়েছিল বাকলের মেঝেওয়ালা একটা বাড়িতে। স্যারের প্রথম বাড়িটা সেই বাড়ি থেকেও দুর্বল ছিল। তাঁর দ্বিতীয় বাড়িটা সেটির চেয়ে অনেক শক্ত। দ্বিতীয়টার মেঝে তৈরি করার জন্য প্রথমটা ভেঙে সেখান থেকে কাঠ বের করেছিলেন। দ্বিতীয়টা বানিয়েছিলেন চার রুমের, সঙ্গে চমৎকার ফায়ারপ্লেস, শক্ত ঝাঁপওয়ালা সুন্দর জানালা। তৃতীয় বাড়ি তৈরি করার কোনো দরকারই ছিল না। তবু যখন থাকার কিংবা উত্তরাধিকারী হওয়ার মতো কোনো সন্তানই তাঁর নেই, সে রকম একটা সময়ে তিনি আরেকটা আরো বড় গেটওয়ালা দোতলা বাড়ি বানানোর তাড়না বোধ করলেন। মিস্ট্রেস দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে লিনাকে গোপনে বলেছিলেন, বাড়ি তৈরি করার মাধ্যমে স্যার নাকি কৃষিজমিতে থিতু হতে পারবেন, আগের চেয়ে বেশি মাত্রায়।

ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁর পকেট ভরতে পারে। তবে আমাদের বিয়ের সময় সে কৃষিকাজেই সন্তুষ্ট ছিল। হাঁসের পালক তুলতে তুলতে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

বাড়ি তৈরির সময় মিস্ট্রেস অবশ্য হাসি লুকিয়ে রাখেননি। উইলার্ড, স্কালি, কামলা, ডেলিভারিম্যান—সবার মতো তিনিও খুশি হয়েছিলেন। সবার জন্য রান্না করেছেন, যেন ফসল তোলার মৌসুম চলছে। বোকা সরো খুশিতে সব সময় হাঁ করেই থাকত; কামারশালায় কাজ করত যারা, তারাও হাসত। বাতাসে ফণীমনসা যেমন অনড় থাকে, তেমন চুপচাপ থাকত ফ্লোরেন্স। আর স্যার, তাকে তো মিস্ট্রেস এর আগে কখনো এত হাসিখুশি দেখেননি। মারা গেছে যে দুই ছেলে, তাদের জন্মের সময়, মেয়ের সঙ্গে কাটানো আনন্দের সময় কিংবা ব্যাবসায়িক সাফল্য নিয়ে তিনি যে বড় বড় গালপপ্প করতেন, তখনো এতটা হাসিখুশি দেখা যায়নি তাঁকে। হঠাৎ করে এমন পরিবর্তন হয়েছে তা নয়, তবে পরিবর্তনটা ছিল গভীর। শেষের কয়েক বছর তিনি গম্ভীর হয়ে থাকতেন, আগের চেয়ে কম বিনয়ী মনে হতো। কিন্তু তিনি যখন গাছ কেটে সেখানে নিজের জন্য লৌকিক একটা ইমারত বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন থেকে প্রতিটা জাগ্রত মুহূর্তে আনন্দমুখর থাকতেন।

তাদের অনুমতি না নিয়ে এতগুলো গাছ কেটে ফেলার কাজ নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছে। নিশ্চয়ই সে রকমই ঘটেছে। বাড়ির কাজ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে—এমন সময় তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। একসময় তারা তাকে ভয়ে ত্রস্ত করেছে, পরে উদ্ধার করেছে। এবার তাকে বিমূঢ় করা হলো। তার খুব জানতে ইচ্ছা করে, একটা ভালোবাসা-প্রতিবন্ধী মেয়েকে মিস্ট্রেস কেন যে কামারকে খুঁজে বের করতে পাঠালেন। ওর গর্ব আস্তে আস্তে নিরত করা যেত না? একজন অ্যানাব্যাপ্টিস্টকে খুঁজে নিলে হতো না? উপপুরোহিত তো আসার জন্য একপায়ে খাড়া থাকতেন। বেচারা ফ্লোরেন্স! ওকে যদি কেউ চুরি করে নিয়ে না যায়, ওকে যদি কেউ মেরে না ফেলে, ও যদি লোকটাকে নিরাপদ অবস্থায় পেয়েও যায়, ও তো ফিরে আসবে না। কেন আসবে? লিনা নিজে তো দেখেছে; প্রথমে হালকা আনন্দ নিয়ে দেখেছে, তারপর ক্রমবর্ধমান বিপন্ন দুশ্চিন্তা নিয়ে দেখেছে, স্যারের এই বেকুবি বাড়িটাতে কাজ করার জন্য যেদিন সকালবেলা কামার লোকটা এলো, তখনই ওর মধ্যে প্রেমের গদগদ অবস্থা দেখেছে লিনা। লোকটা যখন ঘোড়া থেকে নেমে তার হ্যাট খুলে জিজ্ঞেস করল এটা ভার্কদের বাড়ি কি না, তখন চমকিত হরিণীর মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ফ্লোরেন্স।

হায় ঈশ্বর! তিনি বিড়বিড় করে বললেন। নিচের ঠোঁট উঁচু করে ফুঁ দিয়ে কপালের ওপর থেকে চুল সরালেন। বললেন, এখানে একটু দাঁড়াও।

 যখন অ্যাপ্রনে হাত মুছতে মুছতে মিস্ট্রেস ফিরে এলেন, লোকটা আবারও তার হ্যাট খুলল। সে সরাসরি মিস্ট্রেসের চোখের দিকে তাকাল। একবারও পলক না ফেলে তাকিয়ে রইল। লোকটা যেহেতু লম্বা, সে দৃষ্টি নিচু করে মিস্ট্রেসের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুটা ট্যারা এবং ভেড়ার চোখের মতো হলুদ চোখে। তাহলে লিনা এত দিন যা শুনেছে তা কি সত্যি নয়? সে শুনেছে, শুধু শিশু এবং প্রিয়জনরা চোখের দিকে তাকাতে পারে। অন্যদের জন্য এটা অসম্মানের কিংবা হুমকির মতো। আগুনে তার গ্রাম পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর তাকে যে শহরে নেওয়া হয়েছিল, লিনা সেখানে দেখেছে, কোনো আফ্রিকান এ রকম অপরাধ করলে আইনত তার চাবুকের আঘাত প্রাপ্য। এ এক গভীর দুর্বোধ্য ধাঁধা। ইউরোপের লোকেরা কোনো মাকে কোপ দিয়ে কেটে ফেলতে পারে, কোনো বুড়ো মানুষের মুখে চমরের ডাকের চেয়েও জোরের শব্দে তবক দিয়ে আঘাত করতে পারে। কিন্তু ইউরোপের বাইরের কেউ তাদের চোখের দিকে তাকালেই রেগে আগুন হবে। একদিকে তারা কারো বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিতে পারে, আবার অন্যদিকে খাবার দিতে পারে, যত্ন নিতে পারে এবং আশীর্বাদও করতে পারে।

অনেক দিন আগের কথা। লিনার বয়স যদি বেশি হয়ে থাকত, যদি সে ক্ষত সারানোর বিদ্যা জেনে থাকত, তাহলে তার পরিবারের মানুষদের এবং যারা তাদের চারপাশে মৃত্যুমুখে পড়েছে, তাদের ব্যথা-বেদনা দূর করতে পারত। শরের মাদুরে, হ্রদের তীরে ঢেউয়ের মধ্যে, গ্রামের মধ্যে কিংবা দূর বনের পথের ওপরে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থেকে তারা মরেছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক হলো, কম্বলের মধ্যে যারা ছিল, তাদের অবস্থা সহ্য করা কঠিন ছিল, তাদের ফেলে যাওয়াও অসম্ভব ছিল। প্রথমে নীরব হয়ে পড়েছে শিশুরা। শিশুদের মায়েরা মাটি দিয়ে তাদের হাড়হাড্ডি ঢেকে দিলেও তারা নিজেরাও অনেক ঘাম ঝরিয়ে ভুট্টার রেশমি সুতার মতো দুর্বল হয়ে পড়েছে। প্রথমে লিনা এবং দুটি ছোট ছেলে কাক তাড়িয়েছে। কিন্তু অন্য পাখিগুলোর সঙ্গে তারা পেরে ওঠেনি। দুপুরের দিকে নীল ইউনিফর্ম পরা লোকজন আসে। ন্যাকড়া দিয়ে তাদের মুখ বাঁধা। লিনা বুঝতে পারে, তাদের গ্রাম উজাড় করে দেওয়া মৃত্যুর খবর বাইরের জগতেও পৌঁছে গেছে তাহলে। মৃতদেহগুলোর এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা টুকরাগুলো খেতে থাকা কাক-শকুনদের দিকে একনজর তাকিয়ে নেকড়েগুলোকে গুলি করে মেরে গ্রামের চারপাশে আগুন ধরিয়ে দিল সৈনিকরা। তখনই লিনার উদ্ধার হওয়ার আশাটা মাটি হয়ে গেল। গলিত শবখেকোরা যখন উড়ে গেল লিনা বুঝতে পারল না, লুকিয়ে থাকবে, নাকি গুলি খাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে বের হয়ে পড়বে। কিন্তু ডালের আড়াল থেকে ছেলেগুলো আর্তনাদ করে ওঠে। তারা ‘কামে মেস পেটিটস, কামে’ বলে লাফিয়ে পড়ে। লোকগুলো তাদের বাহু ধরে ফেলে। লোকগুলো যদি বুঝতে পারত, বেঁচে যাওয়া ছেলেগুলো থেকে তাদের সংক্রমণ হতে পারে, তাহলে তারা এদের উদ্ধার করত না; তারা তো সত্যিকারের সৈনিক। সত্যিকারের সৈনিকরা ছোট বাচ্চাদের জবাই করে মারে না।

ছেলেগুলোকে তারা কোথায় নিয়ে গেছে, লিনা জানে না। তবে তাকে নেওয়া হয়েছিল সদয় প্রেসবিটারিয়ানদের সঙ্গে বসবাসের জন্য। তারা ওকে পেয়ে খুশিই হয়। তারা বলে, তারা স্থানীয় নারীদের পছন্দ করে। কারণ এরা তাদের মতোই পরিশ্রম করতে পারে। কিন্তু তারা স্থানীয় পুরুষদের অপছন্দ করে। কেননা তারা অভিজাত লোকদের মতো সারা দিন শুধু মাছ ধরে আর পশু শিকার করে। ভূমিহীন অভিজাত তারা। সুতরাং গির্জার লোকেরা হয়তো শুধু প্রার্থনা করে থাকতে পারত, লিনার জন্মস্থানের লোকেরা যেন মরার আগে বুঝতে পারে, তাদের ওপর যে গজব নাজিল হয়েছে, সেটা শুধু ঈশ্বরের বিরক্তির প্রথম ইঙ্গিত। মানে তাঁর তরফ থেকে অভিশাপের সাতটা শিশির মধ্যে শুধু একটা থেকে অভিশাপ বের করা হয়েছে। এ রকম সর্বশেষ অভিশাপ হবে যখন তিনি স্বয়ং আবির্ভূত হবেন এবং নতুন জেরুজালেমের জন্ম হবে। এরপর তারা তার নাম রাখে মেসালিনা। অবশ্য সংক্ষেপ করে ডাকা হয় লিনা বলে। লিনার সামান্য আশার লক্ষণ একটা। আশ্রয়হারা হওয়ার ভয়ে এবং পরিবার হারানোর অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জগত্সংসারে একা হয়ে যাওয়ার ভয়ে ভীত হয়ে লিনা বিধর্মী অবস্থার কথা স্বীকার করে এবং নিজেকে এই যোগ্য লোকদের দ্বারা পবিত্র হওয়ার সুযোগের ওপর ছেড়ে দেয়। সে শিখতে থাকে, দিগম্বর হয়ে নদীতে গোসল করা পাপ; চেরি ফলের ভারে নুয়ে পড়া ডাল থেকে চেরি তোলা মানে চুরি করা; আঙুল দিয়ে ভুট্টার জাউ খাওয়া নীতিগর্হিত কাজ; ঈশ্বর সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করেন আলস্য। 

স্যারের ঘরের কাঁচা মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার সময় খুব সাবধানে কাজ করতে হতো; ঘরের এক কোনায় একটা মুরগি ডিম পাড়ার জায়গা বানিয়েছিল; একাকী মুরগিটা ছিল প্রচণ্ড রাগী। কাছে এগিয়ে গেলে ঠোকর দিয়ে আঘাত করতে আসত। তখনই একদিন সে সিদ্ধান্ত নেয়, তার মা যন্ত্রণায় মারা যাওয়ার সময় তাকে যা যা শিখিয়ে গিয়েছিল, সেগুলো একসঙ্গে জোড়া দিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবে। স্মৃতি এবং তার নিজের উৎসগুলোর ওপর নির্ভর করে সে অবহেলিত আচার-অনুষ্ঠানকে একাত্ম করে, ইউরোপীয় চিকিৎসাবিদ্যার সঙ্গে স্থানীয়দের ঔষধি জ্ঞান যোগ করেছে, বাইবেলের কাহিনির সঙ্গে প্রচলিত গল্প-কাহিনির সংযোগ ঘটিয়েছে এবং জীবনের অভিজ্ঞতায় পাওয়া অনেক কিছুর লুক্কায়িত অর্থ বের করেছে অথবা নিজে থেকে তৈরি করেছে। অন্য কথায়, জীবনে চলার একটা পথ পেয়েছে এভাবে। গ্রামে তার জন্য আরাম-আয়েশ কিংবা ভরসার কোনো জায়গা ছিল না। স্যার সেখানে ছিলেন কিংবা বলা যায়, ছিলেন না। সে যদি সন্ন্যাসীদের মতো অভ্যাস গড়ে তুলতে না পারত কিংবা প্রকৃতিতে চরে বেড়ানো জীবের মতো হতে না পারত, তাহলে একাকিত্বের চাপেই মরে যেত। সে পাখিদের ডাক নকল করতে পারত; গাছপালার সঙ্গে গল্প করতে পারত; গরু-বাছুরদের গান শোনাতে পারত এবং বৃষ্টির সঙ্গেও কথা বলতে পারত। তার পরিবারের সবাই মারা গেছে; কিন্তু সে বেঁচে আছে—এ লজ্জা তার প্রতিজ্ঞার সঙ্গে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে গেছে। সে প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার কাঙ্ক্ষিত কাউকে ছেড়ে যাবে না কখনো, তার সঙ্গে প্রতারণাও করবে না। স্মৃতির ভেতরের মরা মানুষদের গ্রামটা আস্তে আস্তে ছাইয়ে পরিণত হয়ে গেছে। মৃতদের জায়গায় একটা একক প্রতিমূর্তি তৈরি হয়েছে—আগুন। কত দ্রুত! গ্রামের মানুষরা যা যা তৈরি করেছিল, সেখানে জীবন বলতে যা ছিল, তার সবটাই কী দ্রুততায়, কী রকম উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে খেয়ে ফেলল আগুনে। সব কিছু নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে গেল, সৌন্দর্যের মধ্যেও অপযশকর! সামান্য চুলার সামনে কিংবা পানি ফোটানোর জন্য আগুন জ্বালাতে গেলেও তার ভেতরে উত্তেজনার এক রকম মেদুর ব্যথা মোচড় দিয়ে ওঠে।

তার হবু স্ত্রীর জন্য অপেক্ষা করার দিনগুলোতে স্যার একেবারে হারিকেনের গতি নিয়ে কাজ করেন। খোদ প্রকৃতিকেই নিজের নিয়ন্ত্রণের অধীন করার চেষ্টা করতে থাকেন। মাঠে কিংবা গাছপালার মধ্যে যখন যেখানে লিনা স্যারের জন্য খাবার নিয়ে হাজির হয়েছে, দেখেছে তিনি কাজ করতে করতে মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, যেন জমি তাঁর ইচ্ছামতো ফসল দিচ্ছে না বলে হতাশা ব্যক্ত করছেন। তাঁরা দুজন একসঙ্গেই হাঁস-মুরগি পালনের চেষ্টা করেছেন, যেগুলো দিয়ে শুরু করেছেন, সেগুলোর অবস্থা ভালো করে দেখেছেন। একসঙ্গেই শস্য ও শাকসবজি রোপণ করেছেন। লিনার পরামর্শ মোতাবেক তিনি শস্যগাছের মাঝখানে স্কোয়াশ চাষ করতেও রাজি হননি। তিনি স্বীকার করেছেন, লতাগাছগুলো আগাছা দূরে রাখতে সাহায্য করে; তবু তিনি মনে করেছেন, দেখতে কেমন অগোছালো লাগে। সুতরাং বাদ। তার পরও বলা যায়, তিনি পশুপালন এবং নির্মাণকাজে পারদর্শী ছিলেন।

তখনকার জীবনটা ছিল একেবারেই বেগারি জীবন। স্যারের স্ত্রী আসার আগের দিনগুলোতে আবহাওয়া বিপজ্জনক না হলে লিনা মুরগিগুলোর বাসা তৈরি করে দিত। শেষে তিনি এক দিনে একটা গোয়াল তৈরি করে ফেললেন। তখনকার পুরো সময়টায় ‘ইয়েস, স্যার’ ছাড়া বড়জোর পঞ্চাশটা শব্দ উচ্চারণ করেছে। জগতের মৃত্যুর আগের সে ছয় বছর যদি লিনা একেবারে মুছে না ফেলত, তাহলে তো নিঃসঙ্গতা, অনুশোচনা এবং প্রচণ্ড ক্রোধের আক্রমণে সে নিঃশেষ হয়ে যেত। এ ছাড়া ছিল জন্ম-মৃত্যু আর ভক্তি-শ্রদ্ধা জানানোর উৎসব। একটা একটা করে বাছাই করে সে বাকিগুলো বাতিল করে দিয়েছে। এভাবেই তৈরি হয়েছে তার ভেতরের সত্তা, বাইরের অবয়ব। মিস্ট্রেস আসার সময় হতে হতে তার নিজেকে তৈরির কাজ প্রায় নিখুঁতভাবে শেষ হয়ে গেছে। দ্রুতই অপ্রতিরোধ্য হয়েছে।

মিস্ট্রেসের বালিশের তলায় লিনা জাদুটোনা দেওয়া নুড়ি রেখে দিয়েছে; পুদিনাপাতা দিয়ে তার রুম সতেজ রাখার চেষ্টা করেছে; মিস্ট্রেসের শরীরের বদ আত্মার আছর ছাড়াতে ঘাওয়ালা মুখের ভেতর অ্যাঞ্জেলিকার শিকড়ের রস চিপে দিয়েছে। তার জানা সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক প্রয়োগ করেছে—ডেভিলস বিট, মাগওয়ার্ট, সেন্ট জনের ওয়ার্ট, কুমারীর চুল, গেঁড়ি-শামুক ইত্যাদি। এ ছাড়া সে পানি ফুটিয়ে সাবধানে চামচে করে মিস্ট্রেসের দাঁতের ফাঁকে ঢেলে দিয়েছে। একবার মনে করেছে, প্রেসবিটারিয়ানদের কাছ থেকে শেখা কোনো কোনো প্রার্থনা বারবার করবে; কিন্তু কেউই স্যারকে বাঁচাতে আসেনি বলে সেও পরিকল্পনাটা বাদ দিয়েছে। স্যারের চলে যাওয়াটা খুব দ্রুত হয়ে গেছে। মিস্ট্রেসের কাছে প্রথমে চিৎকার করে বললেন, তারপর ফিসফিস করে বললেন তাকে তৃতীয় বাড়িটাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সবচেয়ে বড় বাড়িটা এখন ফাঁকা পড়ে আছে।

সে একটা মেয়েকে মহিলায় পরিণত করেছে এবং আরেকটা মেয়ের জীবন বাঁচিয়েছে। ক্রুদ্ধ চোখের সরো। তার দাঁতের রং কালো; পশমের মতো চুলে চিরুনির আঁচড় পড়েনি। চুলের রং অস্তগামী সূর্যের আভার মতো। স্যার ওকে কিনে আনেননি, গ্রহণ করেছেন মাত্র। সে স্যারের বাড়ির কাজে যোগ দিয়েছে লিনার পরে, তবে ফ্লোরেন্সের আগে। তিমিরা তাকে তীরে এনে ফেলেছে—শুধু এই স্মৃতি ছাড়া অতীত জীবনের কোনো স্মৃতিই মনে নেই সরোর।

তার এই কাহিনি শুনে মিস্ট্রেস বলেন, তিমি ওকে তীরে নিয়ে আসেনি, মোটেই না। মোহক কান্ট্রিতে নর্থ রিভারে পানির ভেতর দিয়ে ডুবতে-ভাসতে থাকা অর্ধমৃত অবস্থায় করাতির দুটি অল্পবয়সী ছেলে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। তারা ওর গায়ে একটা কম্বল চাপায়, তারপর তীরে তাদের বাবার কাছে নিয়ে আসে; ওখানে ও শুয়ে থাকে। বলা হয়, ও নাকি একটা ভাঙা জাহাজে একা একাই বাস করছিল। প্রথমে ওকে দেখে তারা মনে করেছিল, ও একটা ছেলে।

তখন তো বলেইনি, আর অন্য সময়ও বলেনি, ওখানে কিভাবে এসেছে কিংবা আগে কোথায় ছিল। করাতির স্ত্রী ওর নাম রেখেছেন সরো; লিনার মনে হয়, যুক্তিসংগত নামই হয়েছে। বেকুব মেয়েটা এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াত, যখন-তখন হারিয়ে যেত; একটা শীতের মৌসুমজুড়ে ওকে খাওয়ানোর পর তিনি দেখলেন, মেয়েটা কোনো কাজ জানে না, আর কাজ করার চেষ্টা তার আরো কম। এই বিষণ্ন মেয়েটার প্রতি তার ছেলেরা খুব নিবিড় মনোযোগ দিচ্ছে, দেখে মহিলা তাঁর স্বামীকে বললেন, এই ঝামেলা দূর করো। তিনি স্ত্রীর কথা অনুযায়ী তাঁর এক ক্রেতাকে অনুরোধ করলেন সরোকে নিয়ে যেতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, স্যারের দ্বারা এই মেয়েটির কোনো ক্ষতি হবে না। স্যারের ঘোড়ার পিছে পিছে বাড়িতে মেয়েটিকে আসতে দেখে, মিস্ট্রেস তার বিরক্তি প্রায় গোপন করলেন না। তবে তিনি স্বীকার করলেন, এখানে মেয়েটাকে কাজে লাগানো যাবে। প্রেসবিটারিয়ানদের কাছ থেকে লিনাকে স্যার যখন কিনে আনেন, তখন তার বয়স ছিল চৌদ্দ, তবে বেশ উঁচু-লম্বা। শহরের প্রিন্টারদের ওখানে দেওয়া বিজ্ঞাপনটা তিনি ভালো করে দেখেছিলেন, ‘একজন সম্ভাব্য মহিলা, যার গুটিবসন্ত আর হাম হয়ে গেছে..., ৯ বছর বয়সী একজন সম্ভাব্য নিগ্রো..., রান্নাবান্নার কাজে পারদর্শী একটা মেয়ে কিংবা একজন মহিলা, ভালো ইংরেজি বলতে পারে, গায়ের রং হলুদ-কালোর মাঝামাঝি..., পাঁচ বছরের কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন শ্বেতাঙ্গ মহিলা, গ্রামাঞ্চলের কাজকর্ম বোঝার ক্ষমতা আছে, একটা সন্তান, বয়স দুই বছরের ওপরে..., সংকর পুরুষ, মুখে বসন্তের দাগ আছে, সৎ, নরম স্বভাবের, ধীরস্থির..., শ্বেতাঙ্গ বালক, কাজকর্ম করতে সক্ষম..., ঘোড়ার গাড়ি চালাতে সক্ষম একজন চাকর দরকার, কৃষ্ণাঙ্গ কিংবা শ্বেতাঙ্গ যেকোনো রকম হলেই চলবে.., ধীরস্থির এবং দূরদর্শী মহিলা যিনি..., সম্ভাব্য নারী, শ্বেতাঙ্গ, বয়স ২৯ বছর, পেটে বাচ্চা..., স্বাস্থ্যবতী ডয়েচ মহিলা, ভাড়ার জন্য..., নাদুসনুদুস স্বাস্থ্যবতী, স্বাস্থ্যবতী শক্ত-সমর্থ, শক্ত-সমর্থ স্বাস্থ্যবতী, সম্ভাব্য ধীরস্থির, ধীরস্থির... ধীরস্থির...। শেষ পর্যন্ত তিনি পড়েন, ‘পরিশ্রমী মহিলা, খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত, গৃহস্থালির সব কাজ করতে সক্ষম, জিনিসপত্র কিংবা ধাতুমুদ্রায় বিনিময়যোগ্য।’

যেহেতু তখনো তিনি অবিবাহিত, নতুন বউয়ের আগমনের অপেক্ষায়, সেহেতু তাঁর জমির কাজে সাহায্য করার মতো এ রকম একজন নারী কর্মী দরকার ছিল। তত দিনে লিনার চোখের ফোলা কমে গেছে; মুখ, বাহু এবং পায়ের ওপরের চাবুকের কাটা দাগ সেরে গেছে, চোখে পড়ে না প্রায়। লিনাকে তাদের দেওয়া নামের মধ্যে তাদের দূরদৃষ্টির কথা স্মরণ করে প্রেসবিটারিয়ানরা কখনো তাকে জিজ্ঞেস করেনি, তার কী হয়েছিল; তাদের বলার তেমন দরকারও ছিল না। আইনের কাছে ভরসা করার মতো তার সুযোগ ছিল না, বংশনাম কিংবা পদবিও ছিল না। আর কোনো ইউরোপীয় ব্যক্তির বিপরীতে তার কথা কেউ শুনবে না—স্বাভাবিক। তারা শুধু বিজ্ঞাপন ছাপার কাজ যিনি করেছিলেন তাঁর সঙ্গে বিজ্ঞাপনে উল্লিখিত কথাগুলো সম্পর্কে কথা বলতে পারত। মানে, ‘পরিশ্রমী নারী’ সম্পর্কে।

ইউরোপীয় স্ত্রী গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের দুজনের মধ্যে শত্রুতা শুরু হয়ে যায়। সংসারে আগে থেকে দায়িত্বে থাকা লিনার মতো অল্পবয়সী একজন নারীর স্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্য নতুন বউয়ের বিরক্তির কারণ। অন্যদিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়া ইউরোপীয় বউয়ের তরফ থেকে আসন্ন কর্তৃত্বের আশঙ্কা লিনার মনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। তবু এই শত্রুতা এ রকম একটা বুনো জীবনে মোটেই কাজে লাগে না। সুতরাং সেটা শুরু হতে হতেই শেষ হয়ে যায়। লিনার হাতেই মিস্ট্রেসের প্রথম সন্তানের জন্ম হয়। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই তাদের দুজনের মধ্যকার চাপা নীরবতা উবে যায়। এ রকম একটা জায়গায় একজনের ওপর আরেকজনকে নির্ভর করতেই হয়; এখানে প্রতারণামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া তারা একে অপরের সঙ্গী হয়ে যায়। ক্রমেই তারা আবিষ্কার করে, তাদের মধ্যে মর্যাদার বোধ ছাড়াও আরো অনেক চমৎকার কিছু আছে। রেবেকা তার নিজের ভুলত্রুটিগুলো হেসেই উড়িয়ে দিলেন। লিনা যখন দেখতে পেল, খড়ের মধ্যে রাখা বেরিগুলো পচে যাচ্ছে, সে কথা সে ভুলেই গেছে, তখন সে নিজের কপাল চাপড়াল। তারা দুজন বন্ধু হয়ে গেল। শুধু এ জন্য নয় যে একজনের বাহু থেকে বোলতার হুল তুলতে আরেকজনকে অবশ্যই দরকার; শুধু এ জন্য নয় যে একটা গরুকে বেড়ার কাছ থেকে টেনে সরানোর জন্য দুজনের দরকার; শুধু এ জন্য নয় যে একজন গরুর মাথা ধরবে, আরেকজন পেছনের পাশটা বেঁধে ফেলবে। বেশির ভাগ সময় দুজনের কেউই ভালো করে জানত না, তারা কী কাজটা করছে, কিভাবে সে কাজটা করা সম্ভব। তার মিস্ট্রেসের কাছে কৃষিকাজ যতটা পরিশ্রমের, তার চেয়ে বেশি অভিযানের। লিনার মনে আছে, তারপর স্যারের কাছ থেকে মিস্ট্রেস আরো সুখ পেতে থাকেন। এরপর তাঁদের মেয়ে প্যাট্রিসিয়ানের জন্ম হয়। দুজনই পর পর দুটি ছেলে হারানোর ব্যথা কিছুটা ভুলে যান মেয়ের জন্মের পর। ছেলে দুটির জন্ম লিনার হাতেই, মৃত্যুর পর দাফনও হয়েছে লিনার হাতেই। এরপর যখন স্যার সরোকে নিয়ে এলেন, তখন বাড়ির দুজন মহিলাই বিষণ্নতায় একাত্ম।

মিস্ট্রেস শুধু সেলাইয়ের কাজটাই ভালো জানতেন এবং পছন্দও করতেন। সে কাজটাই তিনি সরোকে শেখানো শুরু করলেন। লিনা শুধু দেখল, কিছু বলল না। সরোর ঘুরে বেড়ানো থামানোর জন্য স্যার তাকে সব ঋতুতে ফায়ারপ্লেসের পাশে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। এ রকম আরাম সম্পর্কে লিনার সন্দেহ জাগল, তবে ঈর্ষা বোধ করল না, এমনকি খারাপ আবহাওয়ার সময়ও নয়। হাজারখানেক বছর ধরে লিনার জন্মস্থানের মানুষরা আশ্রয়ের নগর তৈরি করেছে। ইউরোপের যমদের পদচারণ সেসব জায়গায় না পড়লে তারা হয়তো আরো হাজারখানেক বছর ধরে এ রকম নগর তৈরি করত। যেমনটি দেখা গেছে, সর্দারের মৃত্যু হয়েছে অন্যায়ভাবে। ইউরোপের লোকরা পালিয়ে যায়নি, মরেও শেষ হয়নি। সুতরাং স্যার ও মিস্ট্রেসের বিচারবুদ্ধির ওপর ভরসা করতে পারলেও তাঁদের প্রবৃত্তির ওপর এতটা বিশ্বাস করতে পারেনি লিনা। তাঁদের সত্যিকারের বোধশক্তি থাকলে তাঁরা সরোকে এত কাছে ঘেঁষতে দিতেন না।

সঙ্গী হিসেবে সরো খুব কঠিন একটা মেয়ে। এই তো সকালবেলা খুব জরুরি প্রয়োজনেই তাকে দুধ দোহনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সরো জানাল, তার পেটে বাচ্চা থাকার কারণে টুলে ঠিকমতো বসতে পারেনি, ওলান ঠিকমতো ধরতে পারেনি। সুতরাং গাভিটা লাথি মেরেছে। তারপর লিনা মিস্ট্রেসের অসুখের দেখাশোনা বাদ দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল বকনাটাকে দেখতে—প্রথমে খানিক কথা বলে নিল, তারপর গুনগুন গান, তারপর তালুতে সর মেখে আস্তে আস্তে কোমল বোঁটায় দোল দিতে থাকে। দুধের ধারা মাঝে মাঝে আসে, মাঝে মাঝে আসে না; গাভির স্বস্তি না এলে দুধ বের হয় না। সুতরাং এলোমেলো চেষ্টা করে লাভ নেই। শেষ পর্যন্ত কৌশলে গাভিটাকেই আরাম দিতে পারলে কাজ হয়। লিনা দৌড়ে আবার ঘরের ভেতর চলে গেল। মিস্ট্রেসের সামনে সরোকে একা একা রেখে গেলে ভালো কিছু হওয়ার কথাই না। আর এখন যেহেতু তার পেট ভারী হয়ে আছে, সে এখন অন্য সময়ের চেয়েও অনির্ভরযোগ্য।  লিনার গ্রামে এ রকম একটা লোক ছিল। তার ভাষা এবং অন্য সব বিষয়ের মতো ওই লোকটার নামও ভুলে গেছে লিনা। লিনা নিশ্চিত, মিস্ট্রেসের ছেলেদের অকালমৃত্যুর কারণ সরোর ভেতরকার অভিশাপ। দ্বিতীয় শিশুটার মৃত্যুর পর লিনা মিস্ট্রেসকে বিপদটা সম্পর্কে না জানিয়ে পারে না। স্যারের ফিরে আসার আগে আগে তারা কিমা বানানোর মাংস তৈরি করছিল। সকাল থেকে ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ হচ্ছিল পায়াগুলো, এখন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তাদের বিচ্ছিন্ন পাগুলো টেবিলে পড়ে আছে, যেন চর্বি আর কোমলাস্থির সঙ্গে সিদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় আছে।

লিনা বলল, কিছু কিছু মানুষ ইচ্ছা করেই অশুভ কাজ করে; কিছু মানুষ এড়াতে পারে না বলে করে।

মিস্ট্রেস মুখ তুলে তাকালেন, কী বলতে চাও?

আপনার ছেলে জন জ্যাকব, সে মারা গেছে সরো আসার পরে।

শোনো, লিনা। পুরনো দুঃখ আর তাজা কোরো না। আমার বাচ্চা মারা গেছে জ্বরে।

কিন্তু প্যাট্রিসিয়ানও অসুস্থ হলো; সেও তো আর...।

আমি তো বলছি, চুপ থাকো। আমার ছেলে আমার কোলে মারা গেছে, ব্যস। অসভ্য ফালতু প্যাচাল এখানে যোগ না করলেই ভালো। তার সব শিশুর দাঁত ওঠার সময়কার শারীরিক দুর্বলতার কথা বর্ণনা করলেন মিস্ট্রেস। মাংসে কোপ দেওয়ার সঙ্গে কথা বলছিলেন বলে তাঁর কণ্ঠ বেশ শক্ত শোনাচ্ছিল। তারপর কিশমিশ, আপেলের টুকরো, আদা, চিনি এবং লবণের মধ্যে নাড়া দিলেন মাংসের টুকরাগুলো। লিনা একটা বড় বয়াম ঠেলে আরো কাছে এগিয়ে দিল। তারপর দুজনে চামচে করে মিশ্রণটা বয়ামের মধ্যে রাখতে লাগল। লিনা বয়ামের একেবারে মুখ পর্যন্ত ব্র্যান্ডি দিয়ে ভরে মুখ আটকে দিল। চার সপ্তাহ বা তার একটু বেশি সময় বাইরে রাখলে ওপরে শক্ত স্তর তৈরি হয়ে যাবে। ক্রিসমাসের সময় খাওয়া যাবে। ততক্ষণে মিস্ট্রেস ছোট করে কাটা বাছুরের মগজ আর কলিজা আগে থেকে ফুটিয়ে রাখা পানির পাত্রে ফেললেন। মাখনের সঙ্গে ভাজা আর ডিমের টুকরার সঙ্গে সাজিয়ে রাখা এ রকম রাতের খাবার বেশ চমৎকার একটা বিষয় হবে।

সরো এখন আগের চেয়ে আরো অনির্ভরযোগ্য; ঘাস-লতাপাতার সঙ্গে কথা বলার জন্য সে আরো বেশি ঘুরে বেড়ায়। আবারও তার পেটে বাচ্চা; আবারও কুমারীর সন্তান প্রসব হবে। দুর্ভাগ্য হলেও এবারের বাচ্চাটা হয়তো মারা যাবে না। কিন্তু যদি মিস্ট্রেস মারা যান, তাহলে কী হবে? কার কাছে যাবে তারা? যদিও ব্যাপ্টিস্টরা স্যারের দ্বিতীয় বাড়িটা এবং বাইরের ঘরগুলো তৈরির সময় স্বেচ্ছায় সাহায্য করেছিল, যদিও বেড়া হিসেবে কাজে লাগানোর জন্য সাদা পাইনগাছগুলো কাটার সময়ও তারা সহায়তা করেছিল, তবু তাদের এবং স্যারের পরিবারের মধ্যে এক রকম ঠাণ্ডা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এ রকম সম্পর্কের একটা কারণ হতে পারে, তাদের প্রতি মিস্ট্রেসের ঘৃণা। তারা মিস্ট্রেসের সন্তানদের স্বর্গে পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে। লিনার মনে হয়, আরেকটা কারণ হলো, তারা সরোর ওত পেতে থাকা নিয়ে ভয় পেত। অনেক দিন আগে ব্যাপ্টিস্টরা হয়তো এক জোড়া স্যামন মাছ এনেছে কিংবা মিস্ট্রেসের শিশুসন্তানের জন্য প্রয়োজন নেই এমন কোনো দোলনা এনেছে। অবশ্য এখন ব্যাপ্টিস্ট কিংবা অন্যরা কেউই আর বসন্ত আক্রান্ত বাড়িতে আসবে না। উইলার্ড কিংবা স্কালিও আসেনি। বিষয়টা নিয়ে দুঃখ পাওয়ার কথা নয়, তবু পেয়েছে লিনা। কারণ মোটের ওপর দুজনই তো ইউরোপীয়। উইলার্ডেরও বয়স বাড়ছিল, তবু তাকে কাজ করেই যেতে হচ্ছিল। সে বলত, তার দাসত্বের সাত বছরের মেয়াদ আসলে বিশ বছরও ছাড়িয়ে গেছে। যেসব দুষ্টুমির কারণে তার দাসত্বের মেয়াদ বেড়েছে বলে বলা হয়েছে, সেসব সে কবেই ভুলে গেছে। এ রকম একটার কথা মনে আছে—রাম সম্পর্কিত। অন্যগুলো হতে পারে তার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা। তার চেয়ে বয়সে ছোট স্কালি। চেহারা একটু হালকা, পিঠে হালকা দাগ আছে। স্কালিরও পরিকল্পনা ছিল। তার মায়ের চুক্তি পূরণের জন্য তাকে কাজ করতে হচ্ছিল। সত্যিই সেও জানত না, তার দাসত্বের মেয়াদ আসলে কবে শেষ হবে। তবে লিনা কিংবা উইলার্ডের মতো করে না হলেও স্কালি তার দাসত্ব নিয়ে গর্ব করে বলত, মৃত্যুর আগে তার দাসত্ব শেষ হবে। তার মাকে উপনিবেশগুলোতে পাঠানো হয়েছিল কথিত ‘কামুকতা’ এবং ‘অবাধ্যতা’র কারণে। স্কালির মতে, এসব দোষের কোনোটাই মায়ের মৃত্যুর সময়ও শোধ হয়নি। মায়ের মৃত্যুর পর দাসত্বের ঋণের দায় বর্তায় ছেলের ওপর। তারপর একটা লোক আসে; স্কালির বাবা বলে দাবি করে। সে ঋণের কিছুটা শোধ করে এবং আরো কিছু পরিমাণে অর্থের জোগান করার জন্য স্কালির বর্তমান মালিকের কাছে তাকে ইজারা দেয়। জানা যায়, এই ইজারার মেয়াদ শিগগিরই শেষ হবে; কিন্তু স্কালি জানে না, কবে। তার জানার অধিকার নেই। একটা আইনি দলিলে নাকি এ রকম কথা বলা আছে, সে লিনাকে বলেছে। লিনার অনুমান, স্কালি সে দলিলটা দেখেনি; দেখে থাকলেও ভুলে গেছে। সে নিশ্চিতভাবে শুধু জানে, স্বাধীনতার মূল্য একটা ঘোড়া কেনার সমতুল্য কিংবা তাকে ব্যবসায় বসানোর মতো যথেষ্ট। তখনই লিনার মনে প্রশ্ন এসেছে, কিসের ব্যবসা? লিনা মনে করে, স্বাধীনতার সেই গৌরবময় দিন যদি শিগগিরই না আসে, তাহলে স্কালিও পালিয়ে যাবে। পালিয়ে গেলে উইলার্ডের মতো সেও নিজের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবে। লিনা জানত, উইলার্ডের সঙ্গে শুতে স্কালির কোনো আপত্তি দেখা যায়নি, মানে শোয়া যখন ঘুম ছাড়া অন্য উদ্দেশ্যে। স্যারের নির্ভর করার মতো কোনো ছেলে নেই, আত্মীয় নেই; তার সম্পত্তি দেখার কোনো পুরুষ মানুষ নেই। অবস্থাটা এখনো পরিষ্কার—বিলাপরত দুজনের মধ্যে একজন বিছানায়, আরেকজনের পেটে বাচ্চা; অন্যদিকে প্রেমাক্রান্ত একটা মেয়ে বাইরে বাইরে ঘুরছে। আর একজন হলো সে নিজে, সে কোনো কিছু সম্পর্কেই নিশ্চিত নয়, আকাশে চাঁদ উঠবে কি না সে সম্পর্কেও নিশ্চিত নয় সে।

মিস, মারা যাবেন না। আপনি মারা যাবেন না। লিনা নিজে, সরো, একটা নবজাতক এবং হতে পারে ফ্লোরেন্স—এরা তিন নারী এবং একটা শিশু মালিকহীন হয়ে যাবে। তারা সবাই নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে। যে কেউ যেমন খুশি ব্যবহার করতে পারে তাদের। তাদের কারোই উত্তরাধিকার বলে কোনো কিছু পাওয়ার অধিকার নেই। তারা কোনো গির্জার সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট নয়, গির্জার কোনো বইতে তাদের রেকর্ড নেই। মিস্ট্রেসের মৃত্যুর পর তারা যদি এখানে থেকে যায়, তাহলে নারী এবং অবৈধ হওয়ায় তারা হয়ে পড়বে পরাধিকার প্রবেশক, অন্যের জমি অবৈধভাবে দখলকারী। যে কেউ তাদের কিনতে, ভাড়া করতে, অপমান করতে, অপহরণ করতে, নির্বাসনে পাঠাতে পারে। জমির দাবি করে বসতে পারে ব্যাপ্টিস্টরা; কিংবা নিলামেও নিতে পারে। এই ছোট ঘনিষ্ঠ পরিবারে থাকার কথা চিন্তা করে মনে মনে কত সুখ পেয়েছে লিনা। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছে, কী অলীক তার স্বপ্ন। স্যার এবং মিস্ট্রেস বিশ্বাস করতেন, সন্তান না থাকলেও তাঁরা সৎ ও মুক্তচিন্তার জীবন যাপন করতে পারবেন; কিন্তু এখন তাঁদের সব পরিশ্রমের যোগফল দাঁড়াচ্ছে একটা চাতকের বাসার চেয়েও কম। সবাইকে ছেড়ে এসে তাঁরা স্বার্থপর গোপনীয়তা তৈরি করেছেন; তাঁরা এভাবেই নিজেদের সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আশ্রয় ও সান্ত্বনা হারিয়েছেন। ব্যাপ্টিস্টদের, প্রেসবিটারিয়ানদের, বাহিনীর লোকদের, পরিবার ইত্যাদি বাইরে বিচরণকারীদের দরকার। শুধু অহংকারের কারণেই তাঁরা মনে করেছেন, নিজেরা ছাড়া আর কাউকে দরকার হবে না তাঁদের। নিজেদের মতো করে জীবন সাজাতে পারবেন তাঁরা।

ছোট জানালার ঢেউ-খেলানো কাচের ভেতর দিয়ে লিনা তাকাল। জানালার কাচের ভেতর দিয়ে প্রেমবিলাসী সূর্যটা নরম হলুদ আলো ফেলছে মিস্ট্রেসের বিছানার কোনায়। বাইরে দূরে ওই দিকে পায়ে চলা পথের ভেতর দিয়ে বিচবন দেখা যাচ্ছে। অন্য সময়ের মতো লিনা এখনো গাছগুলোর সঙ্গে কথা বলা শুরু করল।

লিনা ফিসফিস করে বলল, তোমরা আর আমি এই জমিনের বাসিন্দা। কিন্তু তোমরা মুক্ত, আমি নির্বাসিত।

তার মিস্ট্রেস বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। লিনাকে অথবা নিজেকে বলছেন কোনো গল্প কিংবা খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা, তাঁর দ্রুত চোখ নাড়ানো দেখে সে রকমই মনে হয়। তাঁর মুখের ভেতর ঘায়ের রেখা, সেখানে তিনি তাঁর অকেজো জিহ্বা নাড়াচ্ছেন। কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে চান তিনি? ব্যান্ডেজের কাপড়ে মোড়ানো হাত উঁচু করে ইশারা করেন; লিনা ফিরে দেখার চেষ্টা করে, তাঁর দৃষ্টি আসলে কোথায় গেছে। একটা ট্রাংকের দিকে; এখানে তিনি ছোটখাটো সুন্দর জিনিসপত্র রাখেন।

মিস্ট্রেস বললেন, আমাকে দাও।

লিনা আয়নাটা তুলল; তবে মনে মনে বলল, না। প্লিজ! আয়নার ভেতর তাকাবেন না। এমনকি ভালো হয়ে যাওয়ার পরও তাকাবেন না, পাছে প্রতিবিম্বটা আপনার আত্মাকেই পান করে ফেলবে।

মিস্ট্রেস বললেন, তাড়াতাড়ি! তাঁর কণ্ঠে বাচ্চাদের অনুনয় ঝরে পড়ছে।

তাঁর আদেশ অমান্য করা যায় না বলেই মিস্ট্রেসের কাছে আয়নাটা নিয়ে এলো লিনা।

তিনি আয়নাটা তাঁর দস্তানা মোড়ানো হাতের মধ্যে নিলেন। লিনা নিশ্চিত, মিস্ট্রেস এখন মারা যাবেন। এই নিশ্চয়তা তার নিজের জন্যও মৃত্যুই। কারণ তার জীবন, তার সব কিছুই তো নির্ভর করছে মিস্ট্রেসের টিকে থাকার ওপর। আর মিস্ট্রেসের টিকে থাকা নির্ভর করছে ফ্লোরেন্সের সফলতার ওপর।

ফ্লোরেন্সকে তুষারের মধ্যে কাঁপতে দেখার সময়ই তার জন্য প্রচণ্ড ভালোবাসা তৈরি হয় লিনার মনে। ত্রস্ত লম্বা গ্রীবা, মেয়ে সপ্তাহখানেক কোনো কথাই বলেনি। তারপর যখন বলেছে, তার হালকা, সুরেলা কণ্ঠ শুনতে খুব চমৎকার লেগেছে। লিনার ভেতরে খুব হালকা হলেও সার্বক্ষণিকভাবে বাড়ি বা পরিবারের জন্য একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল, যেখানে কারোই এককভাবে কোনো কিছু থাকবে না, আবার প্রত্যেকেরই সব কিছু থাকবে। তার সেই আকাঙ্ক্ষাটা ফ্লোরেন্স কিছুটা প্রশমিত করেছে। নিজের ঊষরতাই হয়তো তার নিষ্ঠা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সব সময় ফ্লোরেন্সকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে, সরোর মতো খুব স্বাভাবিক ছোঁয়াচে থেকে সব সময় তাকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে। একজন স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ যে ফাটল, যে ভাঙন তৈরি করতে যাচ্ছে, সেটার অশুভ লক্ষণ শুধু লিনাই দেখতে পেল। যাওয়ার আগে লোকটা ফ্লোরেন্সকে বিদায় জানানোর কষ্টটুকুও করেনি। তবু ফ্লোরেন্স টের পায়নি, লোকটা তাকে গুরুত্ব দেয়নি। তার মানে, এরই মধ্যে সে ফ্লোরেন্সের মাথা খারাপ করে ফেলেছে। তাকে সতর্ক করার জন্য লিনা যখন বলল, তার গাছের অনেক পাতার মধ্যে একটি মাত্র পাতা তুমি, তখন ফ্লোরেন্স মাথা ঝাঁকিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, উঁহু, আমিই তার গাছ। লিনা হয়তো একটা পরিবর্তন আশা করতে পারে; কিন্তু সেটাই শেষ নয়, তা-ও জানে সে।

তার নিজের স্থানান্তরের সময়কার সত্তার একটা ভীরু লাজুক শান্ত রূপ হলো ফ্লোরেন্স। ধ্বংসের আগে। পাপের আগে। পুরুষদের আগমনের আগে। লিনা প্যাট্রিসিয়ানের প্রতি তার স্নেহ-ভালোবাসা জানানোর ব্যাপারে মিস্ট্রেসের সঙ্গে তো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সব সময় প্যাট্রিসিয়ানের ওপর ছায়া বিছিয়ে রাখত সে। আর প্যাট্রিসিয়ানের মৃত্যুর পরপরই এসেছে ফ্লোরেন্স। এই মেয়েটা তো তার নিজের হয়ে যেতে পারত। হবে, এ রকমই সে আশাও করেছে। অশোধনীয় সরোর একেবারে বিপরীত হবে ফ্লোরেন্স, জানত লিনা। ফ্লোরেন্স পড়তে পারে, লিখতে পারে। কোনো কাজ শেষ করার জন্য তাকে বারবার বলতে হয় না। বরাবরই তাকে বিশ্বাস করা যায়। এমনকি সামান্য স্নেহের পরশে সে গভীরভাবে কৃতজ্ঞ থাকে। মাথায় হাত বুলিয়ে একটু আদর করে দিলে, তার কাজের প্রশংসায় একটু অনুমোদনের হাসি দিলেই সে কৃতজ্ঞ হয়ে যায়। ঘুমানোর সময় তারা অনেক স্মরণীয় রাত কাটিয়েছে। তখন ফ্লোরেন্স নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের সঙ্গে লিনার গল্প শুনেছে। গল্পে সে শুনেছে, বদ লোকেরা তাদের নিষ্ঠ-ভক্ত স্ত্রীদের মাথা কাটে; কার্ডিনালরা শিশুদের আত্মাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সময় নিজেই তার বাল্যকাল পার করছে শুধু। আরো কিছু গল্পে শুনেছে মায়েদের কথা, যারা তাদের সন্তানদের বাঁচাতে নেকড়ের সঙ্গে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে। গল্পের শেষে দুজনের মধ্যে ফিসফিস করে বলা একান্ত প্রিয় কিছু কথাবার্তা হতো। মনে হতেই স্মৃতিকাতরতায় বুক ভেঙে যেতে চায় লিনার।

ফ্লোরেন্স দীর্ঘশ্বাস ফেলত। লিনার কাঁধের ওপর মাথা। ঘুম এলে ফ্লোরেন্সের মুখের ওপর হাসি লেগে থাকত। মাতৃত্বের ক্ষুধা, মা হওয়ার এবং মা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এই ক্ষুধা একটা বাসনা থেকে ছড়িয়ে পড়ে; সেই বাসনাটা রয়ে যায় তাদের অস্থিমজ্জায়। ফ্লোরেন্স বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব কিছু দ্রুত শিখতে পারে, আরো জানার ব্যাকুলতা থাকে তার মধ্যে। কামারকে পাওয়া পর্যন্ত থাকলে ঠিকই ছিল, যদি তাকে পূজা করার মতো পর্যায়ে না নামত সে।

আয়নায় তার মুখের দিকে তাকিয়ে মিস্ট্রেস বিছানা থেকে তাকে সরানোর কথা বললেন, বেশ জোর দিয়ে বললেন। লিনা তার বেপরোয়া অনুরোধের ব্যাপারটাকে দুর্ভাগ্য মনে করে চোখ বন্ধ করে রুম থেকে বের হয়ে গেল। বাইরে অনেক কাজ পড়ে আছে; তারপর সচরাচর যা হয়—সরোকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। পেটে বাচ্চা থাকুক আর না থাকুক, সে তো কমপক্ষে গোয়াল থেকে গোবর পরিষ্কার করতে পারত। লিনা গোয়ালে ঢুকে ভাঙা স্লেজগাড়িটা দেখতে পেল। শীতের সময় ফ্লোরেন্স এবং সে এখানে ঘুমাত। ঘাসের ডগা থেকে বিছানা পর্যন্ত মাকড়সার জাল ছড়িয়ে আছে দেখে লিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর দম আটকে রাখে। দশ বছর আগে খরগোশের চামড়া দিয়ে ফ্লোরেন্সের জন্য এক জোড়া জুতা বানিয়ে দিয়েছিল সে। জুতা জোড়া নিঃসঙ্গ হয়ে, কফিনের মতো খালি হয়ে পড়ে আছে স্লেজগাড়ির নিচে। মানসিকভাবে কাতর হয়ে সে গোয়াল থেকে বের হয়; তবে দরজার কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে খানিক। কোথায় যাওয়া যায়? মিস্ট্রেস ক্ষতিকর আত্মাকে প্রলুব্ধ করতে চাইছেন; তাঁর এই আত্মকরুণা সহ্য করতে পারবে না লিনা। সুতরাং সে মনস্থির করে, নদীর ধারে সরোকে খুঁজতে যাওয়া যায়। সরো ওখানে প্রায়ই তার মৃত শিশুর সঙ্গে কথা বলতে যায়।

বিদায়ি সূর্যের আলোয় নদীর পানি জ্বলজ্বল করছে। সূর্যটাকে নববধূর মতো লাগছে, বিয়ের আসর ছাড়তে অনিচ্ছুক নববধূ আস্তে আস্তে বিদায় নিচ্ছে। কোনোখানে সরোর চিহ্নমাত্র নেই। তবে লিনা আগুনের একটা স্বাদু গন্ধ পায়; যেদিক থেকে আসছে, সেদিকে এগোয়। ধোঁয়ার গন্ধের দিকে সতর্ক পা ফেলে এগোয়। শিগগিরই সে কয়েকজনের চাপা, ইচ্ছাকৃত সতর্ক কণ্ঠ শুনতে পায়। সতর্ক পায়ে আরো এক শ গজের মতো এগিয়ে গিয়ে দেখতে পায়, মাটিতে খাল করে আগুন জ্বালানো হয়েছে; সে আগুনের পাশে কয়েকজন মানুষের অবয়ব। একটা ছেলে আর কয়েকজন বয়স্ক মানুষ দুটি হথর্নগাছের নিচে শীতের সবুজ ক্যাম্প করেছে। একটা লোক ঘুমিয়ে পড়েছে; আরেকজন তার পাশে ঝিমাচ্ছে। তাদের মধ্যে তিনজন নারী আছে; দুজন ইউরোপীয়। খাবারদাবারের পর সব কিছু গোছগাছ করছে, বাদামের খোসা, ভুট্টার খোসা ইত্যাদি। আরো খানিকটা কাছে আসতে আসতে লিনার মনে হয়, এদের কাছে কোনো অস্ত্রপাতি নেই। ঝামেলাও পাকাবে না। লিনাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তারা লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। শুধু ঘুমন্ত লোকটা ছাড়া সবাই। লিনা তাদের চিনতে পারে। ফ্লোরেন্স যে ওয়াগনে গেছে, এরাও সেটাতেই উঠেছিল। লিনা আতঙ্কে ডুবে যায়। কী হয়েছে তাদের?

লোকটা বলে, শুভ সন্ধ্যা।

লিনাও বলে, শুভ সন্ধ্যা।

আপনি এখানকার স্থানীয়, ম্যাম? এই জায়গাটা আপনার?

না। তবে আপনাদের স্বাগত।

ঠিক আছে, ধন্যবাদ। তবে আমরা এখানে আপাতত থাকব না। এবার তার মধ্যে স্বস্তির ভাব ফিরে আসে, অন্যদের মধ্যেও।

লিনা বলে, আপনাদের চিনতে পেরেছি। হার্টকিলে যাওয়ার জন্য ওয়াগনে উঠেছিলেন আপনারা।

লিনার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কী বলা যায় খুঁজতে থাকে তারা। কিছুক্ষণ নীরবতা বিরাজ করে।

লিনা আবার বলে, আপনাদের সঙ্গে একটা মেয়ে ছিল। আমি ওকে ওয়াগনে তুলে দিয়েছিলাম।

লোকটা বলে, হ্যাঁ, একটা মেয়ে ছিল।

তার কী হয়েছে?

নারী দুজন মাথা ঝাঁকায়, কাঁধ ঝাঁকায়। একজন বলে, সে ওয়াগন থেকে নেমে চলে গেছে।

লিনা গলার নিচে হাত রাখে, নেমে গেল? কেন?

বলতে পারছি না। সে বনের দিকে চলে গেছে, আমার বিশ্বাস।

একা একা?

আমরা তাকে আমাদের সঙ্গে আসতে বলেছিলাম। সে রাজি হলো না। মনে হয়, তার তাড়া ছিল।

কোথায়? সে ওয়াগন থেকে নেমেছে কোথায়?

আমরা যেখানে নেমেছি, পানশালার কাছে।

ও আচ্ছা, লিনা বলল। সে আসলে কিছু বোঝেনি। তবে বুঝেছে, চাপাচাপি না করাই ভালো। লিনা বলে, আপনাদের জন্য কিছু আনব? খামারটা কাছেই।

বুঝতে পারছি, তবে আমাদের কিছু লাগবে না। ধন্যবাদ। আমরা রাতেই যাত্রা করি।

ঘুমন্ত লোকটা এবার জেগে ওঠে, লিনার দিকে সতর্ক চোখে তাকিয়ে থাকে। অন্য লোকটা একাগ্রচিত্তে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে। তাদের সব কিছু গোছানো হয়ে গেলে ইউরোপীয় নারী দুজনের একজন সবাইকে উদ্দেশ করে বলে, আমাদের এখন রওনা হয়ে যাওয়াই ভালো। নইলে সে আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না।

 

অন্য সবাই তার কথায় একমত হয়ে যায়, আর কিছু বলে না। তারা নদীর দিকে যাওয়া শুরু করে।

লিনা বলে, বিদায়।

বিদায়, আপনার মঙ্গল হোক।

প্রথম লোকটা ফিরে তাকিয়ে লিনাকে বলে, আপনি আমাদের দেখেননি, তাই না, ম্যাম?

না, আগে কখনো দেখিনি।

আঙুলের ডগায় হ্যাট ছুঁয়ে লোকটা বলে, আপনার অনেক দয়া।

হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে ফিরে আসার সময় কষ্ট করে হলেও লিনা নতুন বাড়িটার দিকে ফিরে না তাকানোর চেষ্টা করে। ফ্লোরেন্সের খারাপ কিছু হয়নি ভেবে কিছুটা স্বস্তি পায়। কিন্তু খারাপ কিছু হতে পারে—এমন আশঙ্কায় আরো বেশি ভয় পায়। পালিয়ে যাওয়াদের একটা উদ্দেশ্য থাকে; ফ্লোরেন্সের তো আরেকটা। বাড়িতে না ঢুকে লিনা হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার দিকে এগোয়, এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে, আসন্ন আবহাওয়ার গন্ধ শোঁকার জন্য মাথা ওপরের দিকে ওঠায়। অন্য সময়ের মতোই বসন্ত প্রাণোচ্ছল। পাঁচ দিন আগে যে বৃষ্টির ঘ্রাণ পেয়েছিল, সেটা বেশ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল, অন্য সময়ের চেয়ে ঘনও ছিল। মনে হয়, লম্বা আর ঘন হয়ে নামা বৃষ্টিই স্যারের মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছিল। তারপর এক দিনের তাপ আর উজ্জ্বল সূর্যালোক গাছের পাতায় ফ্যাকাসে সবুজ কুয়াশা নিয়ে আসে। এরপর আসে আকস্মিক তুষার; তখন লিনা আতঙ্কিত হয়ে যায়, এর মধ্যেই ফ্লোরেন্সকে ভ্রমণে যেতে হবে। এখন যেহেতু জানতে পেরেছে, ফ্লোরেন্স দৃঢ়তার সঙ্গে তার কাজে এগিয়ে গেছে, সেহেতু লিনা আকাশের অবস্থা আর বাতাসের গতি বোঝার চেষ্টা করে। তাহলে বুঝতে পারবে, কেমন আবহাওয়া আছে সামনে। শান্ত থাকবে, সে নিশ্চিত হতে চায়। বসন্ত ঠিকমতো শুরু হতে হতে কিছুদিন যাবে। নিজের কাছ থেকেই ভরসা পেয়ে মিস্ট্রেসের রুমের দিকে যায় লিনা। দেখে, তিনি বিড়বিড় করে কী যেন বলছেন। আরো আত্মকরুণা? না। এবার আর নিজের মুখের কাছে ক্ষমা চাইছেন না। বিস্ময়ের কথা হলো, এখন তিনি প্রার্থনা করছেন। লিনা মনে মনে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়, তাহলে শেষনিঃশ্বাস হলো এক প্রধান সৃষ্টিকর্তা, মহান মন-পরিবর্তনকারী, মহান হৃদয়সংগ্রাহক। শেষ মুহূর্তের নিঃশ্বাসের সঙ্গে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তই অনির্ভরযোগ্য এবং হিংস্র। সংকটের কালে সাধারণত যুক্তি আসে না। তবু ফ্লোরেন্সের কী হতে পারে? সব কিছু হঠাৎ বদলে যাওয়ার মুহূর্তে সে কী করছে, খেয়াল থাকবে তার। একসময় যে পথে অন্যরা গোপনে এগিয়েছে, সে পথটাই নিজের জন্য বেছে নিয়ে এগোবে। সঠিকভাবে, সাহসের সঙ্গেই এগোবে। কিন্তু সে কি একা একা পারবে? তার কাছে স্যারের বুট জোড়া আছে, চিঠি আছে, খাবার আছে; আর আছে কামারের সঙ্গে দেখা করার বেপরোয়া সনির্বন্ধ বোধ। কিন্তু সে কি কামারকে নিয়ে, কামারকে অনুসরণ করে কিংবা কামারকে ছাড়াই ফিরে আসবে? নাকি ফ্লোরেন্স আদৌ আসবেই না?

 

 

রাতের শরীর ঘন। কোথাও একটা তারা দেখা যাচ্ছে না। তবে হঠাৎ মনে হচ্ছে, চাঁদ ভেসে চলেছে। ত্বকের ওপর সুচের খোঁচার মতো অনুভূতি অনবরত চলছে, বিরতিহীন। আমি পাইনগাছ থেকে নেমে আসি। আরো ভালো একটা আশ্রয় খুঁজি। চাঁদের আলোয় মাঝখানে ফোকরওয়ালা একটা গুঁড়ি দেখতে পাই। খুশি হই। কিন্তু পিঁপড়ের দখলে গুঁড়ির ওপরটা ঢেউ খেলে যাচ্ছে। আমি সতর্ক হয়ে আছি, সাপ চলে না আসে। গাছের নিচে, মাটিতে আরাম করতে আসতে পারে। লিনার মুখে শুনেছি, সাপরা নাকি মানুষকে এমনি এমনি কামড় দেয় না, মানুষকে আস্ত গিলেও খায় না। আমি চুপচাপ শুয়ে পানির কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করি। অন্য একটা রাতের কথা, অন্য একটা ভেজা ভেজা জায়গার কথা মনে আসে আমার। তবে তখন চলছে গ্রীষ্মকাল। মাটি তুষারের কারণে ভেজা না, শিশিরে ভেজা। তুমি আমাকে লোহা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন জিনিসের কথা বলছ। মাটির উপরিভাগের একেবারে কাছে আকরিক পেয়ে তুমি কত খুশি। তোমার মধ্যে ধাতুকে বিভিন্ন বস্তুর আকার দানের গর্ব। তোমার বাবাও এই কাজ করতেন। তাঁর বাবাও করতেন। এভাবে হাজার বছর ধরে চলে আসছে তোমাদের এই পেশা। উইপোকার ঢিবি থেকে হাপর বানিয়ে। তোমার পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে চলে আসা এ রকম একটা কথা তুমি জানো। আমি মনে করি, প্যাঁচারা আমাকে আশীর্বাদ করে; কারণ আমি এখন আসছি। আমি তোমার কাছে আসছি।

লিনা বলে, কিছু কিছু আত্মা আছে, যারা যোদ্ধাদের আর শিকারিদের দেখাশোনা করে। অন্য আত্মারা কুমারীদের আর মায়েদের দেখাশোনা করে। আমি তো তাদের কারো মতো নই। রেভারেন্ড ফাদার বলেন, স্বধর্মীয় মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো সবচেয়ে বড় আশা, তারপর হলো প্রার্থনা। এখানে কাছাকাছি কোথাও সে রকম কোনো যোগাযোগ নেই। কুমারী মাতার সঙ্গে কথা বলতে গেলে আমার লজ্জা লাগে। আমি তার কাছে যা যা চাই, সেগুলো তো তার পছন্দের নয়। আমার মনে হয়, মিস্ট্রেসেরও এ বিষয়ে বলার মতো কিছু নেই। তিনি ব্যাপ্টিস্টদের এড়িয়ে চলেন। গ্রামের যে নারীরা মিটিং হাউসে যায়, তাদেরও এড়িয়ে চলেন তিনি। মিস্ট্রেস, সরো এবং আমি যখন দুটি বাছুর বিক্রি করতে যাই, তখনো তাদের আচরণে তিনি বিরক্ত হন। লিনা তাকে জিজ্ঞেস করে, সে মিস্ট্রেসের মৃত মেয়ের জুতা জোড়া আমাকে দিতে পারে কি না। কালো জুতা জোড়ার একেকটাতে ছয়টা করে বোতাম আছে। মিস্ট্রেস জুতা দেওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু আমাকে তাঁর মেয়ের জুতা পায়ে দেখে হঠাৎ তিনি তুষারের ওপর বসে পড়েন, কাঁদতে থাকেন। স্যার এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরে তুলে ঘরে নিয়ে যান।

আমি কাঁদি না। এমনকি মহিলা যখন আমার আলখাল্লা কেড়ে নেয়, আমার জুতা কেড়ে নেয়, নৌকায় আমি যখন ঠাণ্ডায় জমে যাই, তখনো আমার চোখে অশ্রু আসে না।

এসব বিষয় আমার মনে দুঃখ আনে বলে আমি তোমার কথা ভাবি। তুমি যেভাবে বলো, জগতে তোমার কাজ কত শক্ত, কত সুন্দর। আমার মনে হয়, তুমিও তোমার কাজের মতোই। আমার কোনো পবিত্র আত্মার দরকার নেই। অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা প্রার্থনারও দরকার নেই আমার। আমার শুধু তোমাকে দরকার। তুমিই আমার সব। কেননা তুমি বলো, তুমি নিউ আমস্টারডামের একজন মুক্ত মানুষ। তুমি উইল কিংবা স্কালির মতো নও; তুমি স্যারের মতো মুক্ত। মুক্ত হওয়ার অনুভূতি কেমন আমি জানি না। মুক্ত থাকা কিংবা না থাকার অর্থ কী, তা-ও জানি না। তবে আমার একটা স্মৃতি আছে। স্যারের গেটে কাজ শেষ হওয়ার পর তোমাকে অনেকক্ষণ না দেখতে পেয়ে তোমাকে খুঁজতে এখানে-ওখানে কিছু সময় ঘুরে বেড়াই। নতুন বাড়ির পেছনে, মাটির ঢিবির পেছনে, তার পেছনে পাহাড়ের ওপর—কত জায়গায় খুঁজি তোমাকে! দেবদারুগাছের সারির নিচ দিয়ে চলে যাওয়া একটা পথ দেখতে পাই; ওই পথেও নেমে পড়ি। আমার বাঁ দিকে একটা পাহাড়। অনেক উঁচু। পাহাড়ের ওপর উঠে দেখি, অনেক লাল ফুল। এ রকম ফুল আগে কখনো দেখিনি। ফুলের পাতাগুলো সবখানে কুঁকড়ে গেছে। ফুলগুলো থেকে মিষ্টি গন্ধ আসে। কয়েকটা ফুল নেওয়ার জন্য হাত বাড়াই। তখনই পেছনে শব্দ শুনতে পাই। চোখ ফিরিয়ে দেখি একটা হরিণ শিলার পথ বেয়ে উঠছে। বিশাল। কী চমৎকার দেখতে! এই যে হরিণ—এদের মতো আরো কত কী ইচ্ছামতো দেখার জন্য আমি মুক্ত! এই মুক্তি নিয়ে আমার একটু ভয়ও হয়। মানুষ মুক্ত হলে কি এ রকমই লাগে? এ অবস্থা আমার ভালো লাগে না। আমি তোমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মুক্ত থাকতে চাই না। কারণ আমি তোমার সঙ্গে থাকলেই প্রাণবন্ত থাকি। হরিণটাকে গুড মর্নিং বলার সঙ্গে সঙ্গে অন্যদিকে চলে যায়।

 

 

কত দিন লাগবে, আর ও কি হারিয়ে যাবে, সে কি ওখানে আছে, সে কি ওর সঙ্গে আসবে, কোনো ভবঘুরে ওকে ধর্ষণ করবে না তো? ওর জুতার দরকার ছিল, ভালো জুতার। জোড়াতালি দিয়ে বানানো জুতা পরে থাকত ও। শুধু লিনা যখন ওর জন্য এ রকম জুতা তৈরি করে দেয়, তখনই শুধু একটা কথা বলেছিল।

রেবেকার চিন্তা-ভাবনা একটার মধ্যে আরেকটা ঢুকে যায়; ঘটনাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা গুলিয়ে যায়; সময়ও তাই। শুধু মানুষগুলো একজনের সঙ্গে আরেকজন মিশে যায় না। নির্বিচারে বিশ্বাস করা এ রকম অবস্থা সহ্য করা কষ্টকর; হাড্ডি থেকে চামড়া তুলে ফেলার অসহ্য তাড়না থামে শুধু, যখন তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এই অচেতনতাকে ঘুম বলা যায় না। কারণ স্বপ্নের ভেতরে থাকা তো জেগে থাকার মতোই।

এখানে আসতে আমি ছয় সপ্তাহ অপরিচিত মানুষদের মধ্যে প্রস্রাব-পায়খানা পর্যন্ত করেছি।

এ কথা সে লিনাকে বহুবার বলেছে। শুধু লিনার বোধ-বুদ্ধিতেই সে আস্থা রাখতে পারে, লিনার বিচারক্ষমতারও মূল্যায়ন করে। এমনকি এখন, বসন্তের এই রাতের গভীর নীলিমায় লিনা তার মিস্ট্রেসের চেয়েও কম ঘুমায়, ফিসফিস করে কথা বলে, বিছানার চারপাশে পালক লাগানো একটা লাঠি অনবরত বাড়ি মারতে থাকে।

লিনা হাতের লাঠিটা নামিয়ে বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসেছে। রেবেকা লিনার দিকে তাকিয়ে থাকে।

রেবেকা বলে, আমি তোমাকে চিনি। মনে হয়, সে হাসছিল। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারে না। অন্যদের মুখও মাঝে মাঝে চোখের সামনে ভাসে, আবার চলেও যায়। তার মেয়ে, যে নাবিকটা তার বাক্সগুলো ভালো করে বেঁধে দিয়েছিলেন এবং বহন করতে সাহায্য করেছিলেন; ফাঁসিকাষ্ঠের লোকটাও। না। এই মুখটা ছিল বাস্তবের। সে চিন্তাগ্রস্ত চোখগুলো চিনতে পারে; তামাটে ত্বকের কথাও মনে আসে। তার এমন একমাত্র বন্ধুর কথা কী করে ভুলবে? পরিষ্কার করে মনে পড়ার এই মুহূর্তটাকে নিশ্চিত করার জন্য সে কথা বলে—লিনা, তোমার মনে আছে? আমাদের একটাও ফায়ারপ্লেস ছিল না। তখন শীতের সময়। প্রচণ্ড শীত। আমি তো মনে করেছিলাম, সে কথা বলতে পারে না, কানে শোনে না। তোমার মনে আছে তো। আঠালো রক্তের দাগ। কখনোই একেবারে শেষ হয় না...। তার কণ্ঠ তীব্র শোনায়, যেন গোপন কোনো কথা বলল।

তাকে পানির জীবন, পানিতে ভাসমান জীবন, পানি সম্পর্কিত জীবনের জন্য প্রস্তুত করার মতো জগতে তেমন কিছুই ছিল না। পানির জন্য বেপরোয়া হলেও পানিতে বিতৃষ্ণাও ছিল তার। পানির দিকে তাকিয়ে মোহগ্রস্ত হলেও পানি দেখেই একঘেয়েও লাগে, বিশেষ করে দুপুরের সময় যখন মহিলাদের আরো এক ঘণ্টা ডেকের ওপর থাকার অনুমতি দেওয়া হতো। তখন সে সমুদ্রকে উদ্দেশ করে কথা বলত, শান্ত থাকো, আমাকে প্রচণ্ড বেগে ছুড়ে ফেলো না। না, না। চলতে থাকো। আমাকে আন্দোলিত করো। বিশ্বাস করো, আমি তোমার গোপন কথাগুলো গোপনই রাখব। তোমার গন্ধটা মাসিকের টাটকা রক্তের মতো। তোমার অধীনস্থ ভূমণ্ডল এবং স্থলভাগ হলো তোমার মনোরঞ্জনের একটা অনুচিন্তা। তোমার নিচের জগৎ কবরস্থান ও স্বর্গ।

জাহাজ থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তার নির্ভেজাল স্বামীভাগ্য রেবেকাকে তাক লাগিয়ে দেয়। রেবেকা তখন ষোলো বছর বয়স পার করা মেয়ে। বুঝতে পারে, মেয়ের জাহাজভাড়া দিতে পারে এবং মেয়েকে খাওয়ানোর দায় থেকে তাকে মুক্তি দিতে পারে এমন যেকোনো ব্যক্তির কাছে তাকে পাঠাতে পারেন বাবা। বাবা নৌযানে কাজ করা মানুষ; তাঁর সহকর্মীদের কাছ থেকে সব রকমের খোঁজখবর সহজেই পেতে পারতেন। এক জাহাজের অফিসারের কাছ থেকে পাওয়া খবর জানালেন এক নাবিক, স্বাস্থ্যবতী, সতী এবং ভ্রমণ করতে রাজি আছে এমন একজন পাত্রী চাওয়া হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাঁর বড় মেয়েকে পাঠানোর ব্যবস্থা করলেন। তাঁর বড় মেয়ে রেবেকা একগুঁয়ে। সব কিছু নিয়ে তার প্রশ্নের শেষ নেই। সব সময় মুখে বিদ্রোহের ঝাঁজ। কিন্তু মেয়েকে এভাবে ‘বিক্রি’ করায় আপত্তি রেবেকার মায়ের। কারণ হবু জামাই তো ভরণ-পোষণ, পোশাকাদি এবং অন্যান্য জিনিসের ‘ব্যয় পরিশোধ’ করার ওপর জোর দিয়েছে। তাঁর মেয়েকে ভালোবাসা দেবে কি না বলেনি, তাঁর মেয়েকে কতটা প্রয়োজন, তা-ও বলেনি। না বলার কারণটা হলো, হবু জামাই তো পৌত্তলিক, থাকে বর্বরদের সঙ্গে। মায়ের কাছ থেকে ধর্ম সম্পর্কে যতটা শিখেছে, তাতে ধর্ম হলো একটা শিখা; এটাকে জ্বালানো হয় অদ্ভুত রকমের ঘৃণা দিয়ে। তার মা-বাবা একে অপরের সঙ্গে এবং সন্তানদের সঙ্গে আচার-আচরণ করেছেন উজ্জ্বল ঔদাসীন্যে। আর ভেতরের আগুনটা রেখে দিয়েছেন ধর্মীয় বিষয়াদির জন্য। অচেনা কোনো মানুষের সঙ্গে একফোঁটা উদারতা মনের ভেতরের শিখায় তরল জ্বালানি ঢেলে দেওয়ার হুমকির মতো ছিল। রেবেকার ঈশ্বরজ্ঞান ছিল ভাসা ভাসা; তার কাছে ঈশ্বর মানে একজন বড় আকারের রাজা। স্বামীর বাড়িতে পৌঁছে রেবেকা যখন দেখল, তাদের দুজনের জন্য এক রুমের একটা ঘর তৈরি করেছে তার স্বামী এবং সেই রুমের পাশে বাইরে অপেক্ষমাণ আছে লিনার মতো একটা মেয়ে, তখন সে রাত্রিবেলা ঘরের দরজার খিল খুব শক্ত করে আটকে রাখল, যাতে এই চিকন কালো চুলের অস্বাভাবিক ত্বকের মেয়ে কাছেপিঠে কোথাও ঘুমাতে না পারে। লিনার বয়স তখন চৌদ্দ বছরের মতো; মুখের গড়ন পাথরের মতো। তাদের দুজনের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হতে সময় লেগেছিল। কারণ হতে পারে, দুজনই পরিবারবিচ্ছিন্ন, একাকী কিংবা দুজনই একজন মানুষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় ছিল, কিংবা এও হতে পারে, দুজনই কৃষিকাজ সম্পর্কে বেপরোয়া রকমের অজ্ঞ ছিল। তারা একজন আরেকজনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। একসঙ্গে কাজ করতে করতে তাদের মধ্যে মৌন মৈত্রী তৈরি হয়ে যায়; দুজনে যুগল হয়ে ওঠে। 

তার জন্ম যে শহরে, সেখানে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি, ছুরি নিয়ে আক্রমণ, অপহরণ—এসব এতটাই স্বাভাবিক ছিল যে নতুন অদেখা জগতে তাকে কেউ জবাই করে হত্যা করে ফেলবে—এমন সতর্কবাণী বড়জোর খারাপ আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মতো। জাহাজ থেকে যে বছর এখানে এলো, সে বছরই স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে নতুন বসতি স্থাপনকারীদের একটা ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল, তবে সেটা ঘটেছিল তার স্বামীর বাড়ি থেকে দুই শ মাইল দূরে এবং যুদ্ধের খবরটা তার কানে আসার আগেই শেষ হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে মানুষের সঙ্গে মানুষের, তীরের বিপরীতে পাউডারের, কুড়ালের বিপরীতে আগুনের বাধার কথা শুনেছে সে। তবে ছোটবেলা থেকে যে রক্ত সে দেখেছে, তার তুলনায় এগুলো কিছুই না। মানুষের তরতাজা নাড়িভুঁড়ি হোতার চোখের সামনে দড়াম করে বালতিতে ফেলা, তারপর টেমসের পানিতে ছুড়ে মারা দেখেছে; হারানো ধড়ের জন্য হাতের কাটা আঙুল তড়পাতে দেখেছে; বদলা খুনের দায়ে ধরা পড়া মহিলার চুল লকলকে আগুনে পুড়তে দেখেছে। এসবের তুলনায় জাহাজডুবিতে কিংবা টাঙ্গির কোপে মৃত্যু তো একেবারেই বিবর্ণ ব্যাপার। নিয়মিত শত্রুপক্ষের কারো অঙ্গহানি করার ঘটনা আশপাশে অন্য সব বসতি স্থাপনকারী পরিবারের লোকেরা একসময় শুনেছে, তবে সেগুলো সম্পর্কে সে কিছু জানে না। চাগিয়ে ওঠা যুদ্ধ, অপহরণ কিংবা ভেস্তে যাওয়া শান্তির কথা সে যখন শুনেছে, তখন অন্যদের কাছে সেসব নিয়ে কোনো কথা সে বলেনি। রেবেকার এখনো মনে আছে, ফাঁসির উৎসব বন্ধ করে দেওয়ার পর তার মা-বাবা হতাশ হয়েছিলেন। সহজে নমনীয় হওয়া নৃপতির প্রতি তাঁদের প্রচণ্ড রোষের কথাও মনে আছে তার। ক্রমাগত যুক্তিতর্ক আর রাগান্বিত শত্রুতাবোঝাই একটা কুঠুরিতে থাকা, সেখানে নিজেদের মতো নয় এমন যেকোনো ব্যক্তির প্রতি গোমড়ামুখো অননুমোদন ঝাড়া—এসব দেখেশুনে মুক্তির জন্য, পালিয়ে বাঁচার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল সে, যেকোনো রকম মুক্তি।

দমবন্ধ অবস্থা থেকে কোনো রকম একটা প্রাথমিক উদ্ধার পেয়েছিল, ভালো থাকার সম্ভাবনাও খানিক পেয়েছিল গির্জার স্কুলে; গৃহস্থালির কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এমন চারজনকে বাছাই করা হয়েছিল। তাকে নেওয়ার জন্য এক বাড়ির লোকেরা রাজি হলো। কিন্তু বাড়ির কর্তার হাত থেকে বাঁচার জন্য দরজার আড়ালে লুকানোর দরকার হয়েছিল। সেখানে মাত্র চার দিন ছিল রেবেকা। তারপর আর তাকে কেউ নিতে চায়নি। তারপর এলো সেই বড় মুক্তি। তার বাবা খবর পেলেন, একজন লোক যৌতুক চায় না; বরং স্বাস্থ্যবতী বউ চায়। শিগগিরই জবাই হয়ে যাওয়া সম্পর্কিত সতর্কতা আর বিবাহিত জীবনের সুখের সম্ভাবনা—এ দুটির কোনোটায়ই তার আশঙ্কা কিংবা আস্থা ছিল না। টাকা ছিল না বলে জিনিসপত্র ফেরি করে বেড়ানো, দোকান দেওয়া, থাকা-খাওয়ার বিনিময়ে নবিশি কিংবা সমাজের উঁচুতলার জন্য সন্ন্যাসিনী হওয়া—এসব বাতিল হয়ে গেল। তার সামনে খোলা রইল ঝি-চাকরানির কাজ, গণিকাবৃত্তি এবং স্ত্রী হওয়া। সুতরাং দূরদেশের অচেনা স্বামীকে বিয়ে করার মধ্যে কিছু স্পষ্ট সুবিধা আছে। যে মা তার নিজের বাড়ির বাইরে কখনো খুব একটা বের হননি, সেই মায়ের কাছ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। তার ভাইদের বড় করতে রেবেকা মা-বাবাকে সাহায্য করেছে। তারা দিন-রাত বাবার সঙ্গে কাজ করে আর বাবার কাছ থেকে শিখে ফেলেছে, কিভাবে বড় বোনকে পাত্তা না দিয়ে চলা যায়। এই ভাইদের থেকেও দূরে থাকা যাবে। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, মাতাল কিংবা সজ্ঞান যেকোনো পুরুষের লালসাপূর্ণ চাহনি আর নিষ্ঠুর হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এসব পুরুষের লালসা কিংবা নিষ্ঠুরতায় আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচা যাবে। আমেরিকা যতই বিপজ্জনক হোক না কেন, তার জন্মস্থানের চেয়ে তো বেশি খারাপ হবে না।

জ্যাকবের এখানে বসবাস শুরু করার পর প্রথম দিকে সাত মাইল দূরের এক গির্জায় গেছে রেবেকা। সেখানে গ্রামের কয়েকজন সন্দেহজনক লোকের সঙ্গে দেখা হয়। সমাজের বড় একটা অংশ থেকে তারা নিজেদের আলাদা করে রেখেছে। উদ্দেশ্য, তারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের আরো বেশি পবিত্র ধর্ম পালন করবে। তাদের মতে, এ ধর্মই বেশি সত্যি এবং ঈশ্বরের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। তাদের সঙ্গে কথাবার্তা বেশ মৃদু স্বরেই বলেছে। মিটিং হাউসে সবার সঙ্গে অমায়িক ব্যবহার করেছে। তাদের বিশ্বাসের কথা তার সামনে ব্যাখ্যা করার সময় রেবেকা বিস্ময়ে কিংবা অবিশ্বাসে চোখ কপালে তোলেনি। কিন্তু তারা যখন রেবেকার অপরূপ সুন্দর প্রথম সন্তানের নামকরণে অপারগতা প্রকাশ করে, তখনই শুধু সে নিজেকে তাদের দিক থেকে গুটিয়ে নেয়। তার বিশ্বাস তো দুর্বল ছিল, তাদের তরফ থেকে তার শিশুকন্যার আত্মাকে আদি সর্বনাশ থেকে রক্ষা না করার তো কোনো অজুহাত থাকার কথা নয়।

লিনার সংসর্গে থাকতে থাকতে তার শোচনীয় অবস্থাকে চুইয়ে শেষ হতে দিয়েছে রেবেকা।

বুঝলে লিনা, কামিজ ছেঁড়ার জন্য আমি ওকে বকা দিয়েছিলাম। ওর সম্পর্কে আরো মনে আসছে—ও তুষারের মধ্যে শুয়ে আছে। ওর ছোট মাথাটা ডিমের মতো ফেটে গেছে।

প্রার্থনার মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত দুঃখের কথা উল্লেখ করতে গেলে সে বিব্রত বোধ করত। দুঃখের প্রসঙ্গে সে ধৈর্য-সহ্য বজায় রাখতে চাইত। ঈশ্বর তাকে দেখছেন জেনেও সে ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক, সে কথা ঈশ্বরকে জানতে দিতে চায়নি। কিন্তু রেবেকা তো চারটা স্বাস্থ্যবান শিশুর জন্ম দিয়েছে। দেখেছে, তিন সন্তান আলাদা বয়সে কোনো না কোনো অসুখের কাছে হার মেনেছে। তারপর তার প্রথম সন্তান প্যাট্রিসিয়ানের অবস্থা দেখেছে—মেয়েটার বয়স পাঁচ বছর হয়েছিল। মেয়েটাকে পেয়ে আশাতীত আনন্দ পেয়েছিল সে। মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যাওয়ার আগে দুই দিন তার কোলেই ছিল মেয়েটা। তারপর মেয়েটাকে দুইবার দাফন করা হয়েছে। প্রথমবার একটা পশমের কফিনে; কারণ জ্যাকব যে ছোট বাক্সটা বানিয়েছিল, সেটা মাটিতে রাখা যাচ্ছিল না। সুতরাং সেটার ভেতরে ঠাণ্ডায় জমে যেতেই দিতে হলো মেয়েটাকে। দ্বিতীয়বার বসন্তের শেষের দিকে ওর ভাইদের কাছে মেয়েটাকে দাফন করার সুযোগ পেল তারা। অ্যানাব্যাপ্টিস্টরা এসেছিল দাফনে অংশ নিতে। দুর্বল শরীরে ফুসকুড়ি ওঠা শুরু হওয়ার কারণে জ্যাকবের মৃত্যুর পর পুরো একটা দিনও পেল না। তার দুঃখ দুর্ভিক্ষের সময়ের খড়ের মতো ছোট করে কাটা। তার নিজের মৃত্যুর কথাও ভাবতে হবে; ছাদের ওপর ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পায়; জামা গায়ে ঘোড়ার ওপর বসে থাকতে দেখে। গলে যাওয়ার জন্য রাখা পশমের নিচে অপেক্ষমাণ কফিনের ভেতর কখনো তাকায়নি রেবেকা। তবে শেষে যখন মাটি নরম হয়ে আসে, জ্যাকব কোদাল দিয়ে মাটি তোলার মতো শক্তি ফিরে পায় এবং তারা কফিন নিচে নামায়, তখন রেবেকা নিজের দুই কনুই ধরে মাটিতে বসে পড়ে, ভেজা মাটির কথা খেয়াল থাকে না। নিচে পড়তে থাকা প্রতিটা ঢেলার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। সারা দিন সারা রাত সে ওখানেই থাকল। ওখান থেক তাকে কেউ তুলতে পারল না। না জ্যাকব, না লিনা, কিংবা সরো। গির্জার ভিন্নমতাবলম্বী যাজকও পারলেন না। কারণ তিনি এবং তাঁর লোকেরাই তো রেবেকার সন্তানদের মুক্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন। তাঁরা রেবেকাকে ছুঁতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে রাগে গজগজ করে উঠল। তার কাঁধ থেকে কম্বলটাও ছুড়ে ফেলে দিল। ব্যর্থতায় মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বিড়বিড় করে ঈশ্বরের কাছে তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে করতে রেবেকাকে একা রেখে চলে গেলেন তাঁরা। ভোরের দিকে হালকা তুষারপাতের ভেতর লিনা এলো, কবরের ওপর সুগন্ধি পাতার সঙ্গে খাবার আর অলংকারাদি সাজিয়ে রাখল। লিনা রেবেকাকে বলল, তার ছেলেরা এবং প্যাট্রিসিয়ান আকাশের তারা কিংবা ওই রকম প্রিয় কিছুতে রূপ নিয়েছে—হলুদ-নীল পাখি, দৌড়াদৌড়ি করে খেলা করা শিয়াল কিংবা আকাশের কোনায় জমা হওয়া গোলাপি মেঘ হয়ে গেছে। এগুলো পৌত্তলিক বিষয়।

আমার মনে হয় না, ঈশ্বর আমাদের চেনেন না। মনে হয়, আমাদের চিনলে তিনি আমাদের পছন্দ করতেন। তবে আমার মনে হয়, তিনি আমাদের সম্পর্কে কিছু জানেন না।

কিন্তু মিস, তিনিই তো আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাই না?

হ্যাঁ, তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনিই ময়ূরদেরও সৃষ্টি করেছেন। সেটাই কঠিন কাজ।

আহা মিস, আমরা কথা বলি, গান গাই। ময়ূররা তো এসব পারে না।

আমাদের প্রয়োজন হয় বলেই এসব করি। ময়ূরদের এসব প্রয়োজন হয় না। আমাদের আর কী আছে?

চিন্তাশক্তি আছে। হাত আছে, হাত দিয়ে আমরা কত কিছু বানাই।

সব ঠিক আছে। কিন্তু সেগুলো তো আমাদের কাজ, ঈশ্বরের কাজ নয়। জগতে তিনি অন্য কিছু করছেন। আমাদের কথা তাঁর মনে থাকে না।

তিনি যদি আমাদের ওপর নজর না রাখেন, তাহলে তিনি করছেনটা কী?

প্রভুই জানেন।

ছোট ছোট দুষ্ট মেয়েরা আস্তাবলের পেছনে লুকিয়ে কথা বলার বিপদটাকেই উপভোগ করার সময় যেমন হাসে, এরা দুজনও সে রকম ফোতফোত শব্দে হাসতে লাগল। রেবেকা বুঝতে পারল না, প্যাট্রিসিয়ানের ঘোড়ার খুরের আঘাতের দুর্ঘটনাটা আসলে ঈশ্বরের তরফ থেকে বকুনি, নাকি এখনো জানা যায়নি এমন কিছু।

এখন এখানে তার বিছানায় তার কর্মী অসাড় হাত দুটি কাপড় দিয়ে মোড়ানো আছে, যাতে খামচে খামচে নিজের শরীর রক্তাক্ত করে না ফেলে। সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে না, সে মুখে কথা বলছে, নাকি শুধু নীরবে চিন্তা করে যাচ্ছে।

আমি টবের মধ্যে পায়খানা করেছি...। চারপাশে অপরিচিত মানুষ...।

মাঝে মাঝে ওরা তার বিছানার পাশে এসে ঘোরাঘুরি করে। ওরা প্রথমে অপরিচিত হলেও পরে পরিবারের মানুষদের মতো হয়ে যায়। সমুদ্র ভ্রমণে এমনই হয়। তার এই অবস্থাটা কি জ্বরের প্রকোপ, নাকি লিনার ওষুধের জের? কিন্তু ওরা আসছে, গল্পগুজব করছে, পরামর্শ দিচ্ছে, হাসছে কিংবা শুধুই করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

অ্যাঞ্জেলাস জাহাজে আরো সাতজন মহিলা ছিল। জাহাজে ওঠার অপেক্ষায় থাকার সময় তারা বাতাসের দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে ছিল, সমুদ্রের দিক থেকে বন্দরের দিকে ধেয়ে আসা বাতাস। বাক্সপেটরা, নায়েব-নাজির, ওপরের ডেকের যাত্রী, ঠেলা, ঘোড়া, প্রহরী, ঝুলি, কান্নারত শিশু—এসবের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা শীতে থরথর করে কাঁপছিল। শেষে যখন নিচের ডেকের যাত্রীদের ডাক পড়ে; তাদের নাম, নিজের দেশ, পেশা রেকর্ড করা হয়; তখনই বোঝা যায়, তাদের মধ্যে চারজন বলে, তারা চাকরানির কাজ করতে যাচ্ছে। তাদের পুরুষ যাত্রীদের থেকে এবং ওপরের শ্রেণির মহিলাদের থেকে আলাদা করা হয়। নিচের দিকে পশু রাখার জায়গার পাশের একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাদের।  আলো-বাতাস আসার একমাত্র পথ ডেকের যে ফাঁক দিয়ে মালপত্র নামানো-ওঠানো হয় সেটা। বর্জ্য ফেলার জায়গা সিডারের পিপার পাশে রাখা। দড়ির মাথায় একটা ঝুড়ি বেঁধে তাদের জন্য খাবার দেওয়া হতো; খাবার নামানো হয়ে গেলে ঝুড়িটা আবার ওপরে তুলে নিয়ে যেত। পাঁচ ফুটের বেশি উঁচু হলেই মাথা নিচু করে চলাচল করতে হতো। নিজেদের জায়গাটুকু যার যার মতো করে ঘিরে নেওয়ার পরে রাস্তার ভবঘুরেদের মতো হামাগুড়ি দেওয়া ছিল আরো নিরাপদ। একসময় তারা নিজ নিজ পরিচয় একে অন্যের কাছে প্রকাশ করে, তবে তার আগেই তাদের ব্যাগপত্রের বহর, কাপড়চোপড়, মুখের কথা, দেহভঙ্গি ইত্যাদি থেকে তাদের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের একজনের নাম অ্যান। তার কারণে পরিবারের নাম নষ্ট হতে পারে বলে পরিবারের লোকজন তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। জুডিথ আর লিডিয়া—এরা দুজন গণিকা। তাদের আদেশ দেওয়া হয়েছে, হয় তারা জেলে যাবে, নয়তো নির্বাসনে। লিডিয়ার সঙ্গে আছে তার দশ বছর বয়সী তস্কর মেয়ে প্যাটি। আরেকজনের নাম এলিজাবেথ। এলিজাবেথ নাকি একজন গুরুত্বপূর্ণ কম্পানির দালালের মেয়ে। আরেকজনের নাম আবিগাইল; তাকে তাড়াতাড়িই ক্যাপ্টেনের কেবিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজনের নাম ডরোথিয়া। সে পেশায় পকেটমার। তার শাস্তিও গণিকা দুজনের মতো। তাদের মধ্যে শুধু রেবেকা আলাদা। তার ভাড়ার খরচ পর্যন্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে যাচ্ছে বিয়েশাদি করে সংসার করতে। পকেটমার এবং গণিকা দুজনের জাহাজভাড়া এবং অন্যান্য খরচ পরিশোধ করতে হবে অনেক বছর বিনা মূল্যে শ্রম দিয়ে। বাকিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা আত্মীয়-স্বজন কিংবা কারিগররা তাদের ভাড়া দেবে। শুধু রেবেকাই সবার থেকে আলাদা, অন্যদের কোনো শ্রেণিতে পড়ে না। অচেনা-অজানা দেশে অচেনা একজনের সঙ্গে পরিণয়ে আবদ্ধ হতে একা একা ভ্রমণে বের হয়েছে বলে রেবেকা নিজের নাজুক নারীত্ব নিয়ে ভয় পেয়ে থাকলে এই নারীরাই রেবেকার ভুল ভয় ভাঙিয়ে দিয়েছে। তার মায়ের তরফ থেকে প্রকাশ করা আশঙ্কাজাত রাতের প্রজাপতি তার বুকের ভেতর পাখা ঝাপটালে এসব নির্বাসিত, বিতাড়িত নারীদের সঙ্গই তার আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছে। ডরোথিয়ার সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে যায় রেবেকার। সে রেবেকাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। অতিরঞ্জিত দীর্ঘশ্বাস আর হালকা খিস্তি ঝাড়তে ঝাড়তে তারা নিজেদের জনিসপত্র খুঁজে নেয় এবং চৌকাঠের চেয়ে বড় হবে না এতটুকু জায়গা একান্ত করে নেয়। সরাসরি প্রশ্নের জবাবে রেবেকাকে বলতেই হয়, তার এই যাত্রা হলো বিয়ের উদ্দেশ্যে যাওয়া। আর এটাই তার প্রথম বিয়ে হবে। এত বড় একটা খবরে ডরোথিয়া জোরে জোরে হাসতে থাকে এবং আশপাশের সবাই শুনতে পায় তেমন উচ্চকণ্ঠে বলে ওঠে, একজন কুমারী পাওয়া গেছে! জুডি, শুনছিস? আমাদের মধ্যে একজনের যোনি এখনো আসল স্বাদ পায়নি।

জুডিথ বলে, না রে, আরেকজন আছে, প্যাটি। ওকে নিয়ে এখানে মোট দুজন। ছোট মেয়েটার দিকে চোখ টিপে হাসে। মেয়েটাকে বলে, সস্তায় বিকিয়ে দিস না রে।

লিডিয়া বলে ওঠে, ওর বয়স দশ বছর। তোরা আমাকে কেমন মা মনে করিস?

দুই বছর পরে আমরা উত্তর দেব।

তাদের তিনজনের হাসি বেশ জোরেই চলে। শেষে অ্যান বলে ওঠে, অনেক হয়েছে, প্লিজ! অমার্জিত কথাবার্তা শুনতে ভাল্লাগে না।

জুডিথ জিজ্ঞেস করে, অমার্জিত কথা ভাল্লাগে না, কিন্তু অমার্জিত আচরণ?

সেটাও খারাপ লাগে।

জায়গামতো ঠিক বসে যাওয়ার পরে তাদের পাশেরজনদের খবর নেওয়া দরকার। জুতা খুলে ডরোথিয়া মোজার ভেতর পা নাড়াচাড়া করতে থাকে। তারপর সতর্কতার সঙ্গে ওপরে টেনে তুলে ক্ষয়ে যাওয়া পশমি জিনিসটা ভাঁজ করে রাখে। জুতা বদল করে সে অ্যানের দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে, তোর পরিবার কি তোর আচরণের কারণেই বাড়ির বাইরে এই সমুদ্রযাত্রায় পাঠিয়েছে?

প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করার সময় সে নিজেকে নিষ্পাপ অবস্থায় দেখানোর ভান করে। অ্যানের দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে।

অ্যান বলে, আমার চাচা-চাচির কাছে বেড়াতে যাচ্ছি।

ওপরের খোলা ঢাকনা দিয়ে আসা আলোটা আরেকটু বেশি হলে তার গণ্ডের তীব্র লাল আভা দেখতে পেত সবাই।

লিডিয়া হাসতে হাসতে বলে, মনে হয় তাদের জন্য উপহারও নিয়ে যাচ্ছিস!

ডরোথিয়া দুহাত এক করে দোলনার মতো দোলাতে থাকে, ওঁয়া, ওঁয়া, ওঁয়া, ওঁয়া।

তোরা সব গরু!

সবাই জোরে জোরে হাসতে থাকে। একটা তক্তার বেড়া দিয়ে আলাদা করা আছে গরু, ছাগল ইত্যাদি পশুর এলাকা। তাদের হাসির শব্দ শুনে পশুগুলোও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। পাহারায় থাকা একজন নাবিক তাদের মাথার ওপর আলো আসার ফাঁকটা বন্ধ করে দেয়।

পুরোপুরি অন্ধকারে নিমজ্জিত হওয়ার কারণে তাদের কেউ একজন চিৎকার করে খিস্তি ঝাড়ে, জাউরার বাচ্চা! ডরোথিয়া ও লিডিয়া হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়ে হাতড়ে একমাত্র বাতিটা খুঁজে বের করে। জ্বালানোর পর বাতির আলো তাদের কাছাকাছি নিয়ে আসে।

প্যাটি জিজ্ঞেস করে, মিস আবিগাইল কোথায়? জাহাজে ওঠার আগে থেকেই আবিগাইলকে তার ভালো লেগে গেছে।

তার মা বলল, ক্যাপ্টেনের পছন্দের মানুষ।

ডরোথিয়া বিড়বিড় করে বলল, ভাগ্যবতী খানকি!

মুখ সামলে নে। তুই তো লোকটাকে দেখিসনি।

ডরোথিয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, না। তবে অনুমানে বুঝতে পারি, তার টেবিলে ভালো ভালো খাবারদাবার আছে। বেরি, মদ, মাটন, পেস্ট্রি...।

নিশ্চয়ই অত্যাচারী। বাদ দে। ওকে বাধা হিসেবে রাখবে। মাগি হয়তো আমাদের জন্য কিছু পাঠাবে। কিন্তু লোকটা তো ওকে চোখের আড়াল হতে দেবে না। শুয়োরের বাচ্চা!

 একেবারে সরাসরি ওলান থেকে দুধ খাবে; মাঝখানে দুধের ওপর ময়লা কিংবা মাছি পড়তে দেবে না। একেবারে ছাপমারা মাখন খাবে।

বাদ দে না!

রেবেকা বলে, আমার কাছে পনির আছে। কথাগুলো বলার পর তার মনে হয়, তার কণ্ঠটা কেমন শিশুদের কণ্ঠের মতো শোনাচ্ছে। তারপর বলে, বিস্কুটও আছে।

সবাই এবার রেবেকার দিকে তাকায়। একজন সুর করে বলে ওঠে, বাহ্, ভালো তো! তাহলে চা হয়ে যাক!

বাতিটা এবার ফোত করে নিভে গিয়ে সবাইকে গাঢ় অন্ধকারে ডুবিয়ে দেওয়ার ভয় দেখায়। এ রকম অন্ধকার শুধু জাহাজে চলাচলকারীরাই চেনে। জাহাজ সব সময় এপাশ-ওপাশে কাত হচ্ছে—তাদের অবস্থা সে রকমই। চেষ্টা করতে হয়, টব পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই যেন বমি না হয়ে যায়; সেখানে আবার পায়ের চেয়ে হাঁটুর ওপর ভর করে যাওয়াই নিরাপদ। সব কিছু সহনীয় হয়ে যেত, যদি এক বিঘত পরিমাণ আলোর ব্যবস্থা থাকত।

মহিলারা সবাই অবলীলায় সুড়সুড় করে রেবেকার কাছাকাছি চলে আসে। তাদের মধ্যে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে এ রকম একটা ধারণা ছড়িয়ে যায়, তারা যা যা ভাবছে, সেসব আসলে সৌন্দর্যে সেরা রমণীদের কথা। একটা বাক্সের ওপর জুডিথ তার শালটা বিছিয়ে দেয়। এলিজাবেথ তার ট্রাংক থেকে কেটলি আর একসেট চামচ বের করে আনে। হরেক রকমের কাপও আনে—পিউটারের, টিনের, মাটির। লিডিয়া হাতের তালু দিয়ে বাতির আগুন বাতাস থেকে আড়াল করে আগুনের ওপর কেটলি ধরে পানি গরম করে। তাদের কারো কাছেই চায়ের পাতি নেই, সেটা কোনো বিস্ময়ের ব্যাপারই না। জুডিথ ও ডরোথিয়ার কাছে রাম আছে, তাদের পোঁটলার মধ্যে রাখা আছে। শালের মাঝখানে রেবেকা পনির রাখে আর চারপাশে রাখে বিস্কুট। সেগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে দেয় অ্যান। নীরবে নিঃশ্বাস ফেলে তারা কুসুমগরম স্বাদের পানিতে চুমুক দেয় আর বাসি বিস্কুটের ওপরের পরত সরিয়ে মজা করে কামড় বসায়। প্যাটি বসেছে তার মায়ের কোলে। আর লিডিয়া এক হাতে কাপ ধরে আরেক হাতে মেয়ের মাথার চুলে আদর করে দেয়। রেবেকার স্পষ্ট মনে পড়ছে, দশ বছরের প্যাটিসহ সবাই তাদের কনিষ্ঠ আঙুল তুলে অল্প জায়গার মধ্যে পরিসর তৈরি করে নিয়েছে। রেবেকার মনে পড়ে যাচ্ছে, সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাত তাদের নীরবতাকে যেন আরো বড় করে তুলত। তার নিজের মনের অবস্থা থেকে যেমনটা বুঝেছিল, তারা সবাই পেছনে ফেলে আসা সব কিছু আর সামনে প্রত্যাশিত সব কিছুকেই ওই সময়ের জন্য আপাতত মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।

জাহাজ থেকে নামার সময় তাদের মধ্যে কেউ এমন ভান করে না যে আবার দেখা হবে। তারা জানে, আর কখনো দেখা হবে না। সুতরাং তাদের বিদায় পর্ব সংক্ষিপ্ত হয়, কোনো রকম আবেগী নাটক থাকে না। যার যার জিনিসপত্র গোছানোয় ব্যস্ত থাকে। আরো ব্যস্ত থাকে ভিড়ের মধ্যে তাদের ভবিষ্যৎ খুঁজতে। সত্যিই তাদের আর কখনো দেখা হয়নি। শুধু রেবেকা তার স্মৃতি থেকে রোগশয্যার পাশে ডেকে এনেছে তাদের।

রেবেকার কল্পনায় দেখা জ্যাকবের চেয়ে বাস্তবের জ্যাকব অনেক লম্বা। অন্য যাদের সে দেখে, তারা সবাই খাটো, গাট্টাগোট্টা চেহারার হলেও খাটো। রেবেকার মুখ ছুঁয়ে, হাসিমুখে মি. ভার্ক (তাকে জ্যাকব ডাকা শুরু করতে অনেক সময় পার করতে হয় রেবেকার।) তার ব্যাগগুলো নিয়ে নেয়।

তুমি হ্যাট খুলে হাসলে, অনেকক্ষণ ধরে হাসলে তুমি। রেবেকা মনে করে, তার নতুন স্বামীর আকর্ণ হাসির পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাগুলো বলছে। কিন্তু তাদের প্রথম দেখার দৃশ্যে প্রবেশ করার মুহূর্তে রেবেকার মুখের ভেতর শুকনো জিহ্বা নড়াচড়া করতেই তো পারেনি ভালো করে। জ্যাকবের দারুণ স্বস্তি আর তৃপ্তি দেখে তখন রেবেকার মনে হয়েছিল, অবশেষে রেবেকার সঙ্গে দেখা হওয়াটাই বুঝি জ্যাকবের সারা জীবনের অর্জন। কয়েক সপ্তাহের সমুদ্রভ্রমণের পর স্থলভাগে এসেও এখানকার নতুন নীরবতা অনুভব করতে করতে জ্যাকবের পেছনে কাঠের তৈরি পায়ে চলা পথে হাঁটার সময় রেবেকা ফ্রকটা খানিক ছিঁড়ে ফেলে। জ্যাকব পেছনের দিকে তাকায়নি বলে দেখতেও পায়নি। এক হাতের মুঠিতে ছেঁড়া অংশ ধরে আরেক হাতে ভাঁজ করা বিছানাপত্র নিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে ওয়াগনের দিকে এগোয়। ওয়াগনে ওঠার সময় তার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় জ্যাকব। কিন্তু রেবেকা জ্যাকবের হাত ধরে না। জ্যাকবের তরফ থেকে অতিরিক্ত প্রশ্রয় আশা করে না রেবেকা। জ্যাকব দিতে চেষ্টা করলেও সে গ্রহণ করবে না—এটা একেবারে পাকা কথা। তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে যেসব কাজকর্ম করতে হবে, সেগুলো তারা সমান ভাগে করবে।

কফিহাউসের দরজার পাশে লেখা ‘ভেতরে বিবাহ সম্পন্ন করা হয়’। নিচে ছোট ছোট অক্ষরে কবিতার মতো লেখা আছে; তাতে সতর্কতা এবং বিজ্ঞাপনী সুর—দুটোই আছে, ‘লাগামহীন লালসা মায়ের পেটে থাকতেই পাপের শুরু’। যাজক মশাই বয়স্ক, তবে মিতাচারী মনে হলো না। যা-ই হোক, কাজে বেশ তৎপর। কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা ওয়াগনে ফিরে আসে। সুন্দর নতুন জীবনের কল্পনায় মশগুল তাদের মন।

রেবেকা দেখে, জ্যাকব বেশ লাজুক স্বভাবের। সুতরাং সে মনে হয় চিলেকোঠার এক রুমে আটজন থাকার অভিজ্ঞতা পায়নি। ভোরবেলায় ফেরিওয়ালাদের চিৎকারের মতো আবেগের কান্নাকাটির সঙ্গেও তেমন একটা পরিচিত নয়। ডরোথিয়া যেমন বর্ণনা করেছে, তেমন কোনো অভিজ্ঞতা কিংবা যে অ্যাক্রোবেটিক নাচের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে লিডিয়া শিস বাজায় কিংবা তার মা-বাবার ক্ষুব্ধ এবং ত্বরিত মিলনের মতো কোনো অভিজ্ঞতাই নেই জ্যাকবের। তবু তাড়না যতটা ততটা সমর্পিত হতে চায় না রেবেকা।

রেবেকাকে জ্যাকব ‘আমার উত্তর আকাশের তারা’ ডাকত।

তারা সংসারে থিতু হয় দুজন দুজনকে জানার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। একজন আরেকজনকে অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে, আগের অনেক অভ্যাস বদল করেছে, নতুন অভ্যাস গড়ে তুলেছে, মতানৈক্যও হয়েছে, তবে মেজাজ খারাপ করেনি কেউই। একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করেছে, অনেক দিন একসঙ্গে থাকার মধ্য দিয়ে একজন আরেকজনের সঙ্গে নীরবে যে কথোপকথন চালাতে পারে, সেটাও তাদের মধ্যে চলেছে। রেবেকার মা ধর্মীয় যেসব দুর্বলতায় বিরক্ত হয়েছেন, সেগুলোতে জ্যাকবের কোনো আগ্রহ তৈরি হয়নি। জ্যাকব সব সময় প্রভাবমুক্ত থেকেছে, গ্রামের গির্জার জমায়েতে অংশগ্রহণের সব চাপ সহ্য করেছে, তবে রেবেকা ইচ্ছা করলে সেখানে যোগ দিতে পারে কিংবা সেখান থেকে অনেক কিছু বিশ্বাস করাও শুরু করতে পারে—এমন একটা স্বাধীনতাও জ্যাকব তাকে দিয়েছে। কয়েকবার যোগ দেওয়ার পর রেবেকা আর যেতে চায়নি; তাতেও জ্যাকব যথারীতি তুষ্ট থেকেছে। তারা দুজন একে অপরের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে চলেছে। তাদের পরিপূর্ণতায় বাইরের আর কাউকে দরকার হয়নি। কিংবা সে রকমই তারা বিশ্বাস করে এসেছে। কারণ তখন জানা ছিল, ছেলে-মেয়ে হবে তাদের; হয়েছেও। প্যাট্রিসিয়ানের জন্মের পর প্রতিবারই এমন হয়েছে যে সন্তান পালনের অভিজ্ঞতাটাই ভুলে গেছে, দুধ ছাড়ানোর আগেই তো তারা মারা গেছে। স্তন থেকে সব সময় দুধ চোয়াতে পারে, কিংবা স্তনের বোঁটা অকালেই শক্ত হয়ে যেতে পারে, আবার অন্তর্বাসের তুলনায় বেশি নরম হয়ে যেতে পারে—এসব কথা সে ভুলেই গেছে। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত যাত্রাটা কত দ্রুত হতে পারে, তা-ও ভুলে গেছে।

ছেলেদের মৃত্যু হয়েছে। বছরের পর বছর পার হয়ে গেছে বলে জ্যাকবেরও ধারণা স্থির হয়েছে, কৃষিকাজ টিকে থাকার জন্য সহায়ক হতে পারে; কিন্তু লাভজনক নয়। সে ব্যবসাপাতির কাজ শুরু করে, ঘোরাঘুরির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে বাইরে থেকে তার ফিরে আসা ছিল আনন্দের। চমৎকার সব জায়গা ঘুরে নতুন নতুন খবর নিয়ে আসত। মানুষের মারাত্মক ক্ষোভ সম্পর্কিত খবর একবার এনেছিল। একজন ভিন্নমতাবলম্বী যাজক ঘোড়ায় চড়ে যাচ্ছিলেন, স্থানীয় উপজাতি যোদ্ধারা গুলি করে ফেলে দেয় তাঁকে। একবার এক দোকানে সে রেশমের বল্টু দেখেছে। সেগুলোর রং এত সুন্দর, শুধু প্রকৃতিতে ছাড়া আর কোথাও এমনটি দেখেনি সে। আরেকবার দেখে, এক ডাকাতকে একটা তক্তার সঙ্গে বেঁধে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; যারা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, তাদের সে গোটা তিনেক ভাষায় গালি দিচ্ছে। জ্যাকবের ভ্রমণের গল্পগুলো রেবেকার ভেতরে উত্তেজনা তৈরি করত; বাইরের উল্টাপাল্টা জগতে তার মতো মানুষের জন্য কত রকমের হুমকি আছে—এই ধারণাটা জ্যাকবের গল্প শুনে আরো তীব্র হতো। তবে এটাও মনে হতো, তাকে ওই সব হুমকি থেকে সুরক্ষা দিতে পারে শুধু জ্যাকব। মাঝে মাঝে তার জন্য অল্পবয়সী অনভিজ্ঞ কাজের মানুষ নিয়ে আসত; আবার অনেক উপহারও নিয়ে আসত। বিছানায় চুল দেখে জ্যাকব খুব নকশা করা হেয়ারব্রাশ নিয়ে এলো। এখানে একটা হ্যাট পড়ে থাকে, ওখানে একটা লেস কলার পড়ে থাকে। কোথাও চার গজ রেশমি কাপড় পড়ে থাকে। রেবেকা এসব ভাবতে ভাবতে প্রসঙ্গগুলো গিলে ফেলে হাসতে থাকে। একবার শেষ পর্যন্ত জ্যাকবকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, এসব টাকা আসে কোথা থেকে? উত্তরে জ্যাকব বলেছিল, নতুন কাজকর্ম থেকে। তারপর তখনই রেবেকার হাতে তুলে দেয় রুপার বাঁধানো একটা আয়না। এ রকম একটা কৃষিনির্ভর পরিবারে এসব অকেজো সম্পদের প্যাকেট খোলার সময় জ্যাকবের চোখে এ রকম আনন্দের ঝিলিক দেখে রেবেকা। তখনই তার বোঝা উচিত ছিল, শিগগিরই তাদের একটা উঁচু জায়গার পাদদেশে বেশ অনেকখানি জায়গা থেকে গাছপালা কেটে সাফ করার জন্য লোকজন ভাড়া করে নিয়ে আসবে জ্যাকব। একটা নতুন বাড়ি তৈরি করতে যাচ্ছে সে। সে বাড়িটা কোনো কৃষকের কিংবা ব্যবসায়ীর জন্য মানানসই হবে না, হবে একজন জমিদারের জন্য।

রেবেকা মনে মনে বলে, আমরা তো সাধারণ মানুষ হিসেবে ভালো অবস্থায়ই আছি। এ রকম একটা জায়গায় এ অবস্থায় থাকাটা শুধু যথেষ্ট নয়, সৌভাগ্যের এবং গর্ব করার মতো।

রেবেকা বলল, আমাদের আরেকটা বাড়ির দরকার নেই। এত বড় বাড়ির তো নয়ই। সে জ্যাকবের দাড়ি কামিয়ে দিচ্ছিল। শেষ করার সময় কথাগুলো বলল।

 

 

শুধু প্রয়োজনই তো সব কিছু নয়, বউ।

তাহলে বলো দেখি কী, রেবেকা ব্লেড থেকে ফেনার সর্বশেষ দলাটুকু পরিষ্কার করতে করতে বলল।

মানুষ শুধু নিজেকেই রেখে যেতে পারে।

জ্যাকব, একজন মানুষ মানে তার নাম-সুনাম।

আমাকে বুঝতে পেরেছ। আমি বাড়িটা তৈরি করব। রেবেকার হাত থেকে কাপড়টা নিয়ে থুতনি পরিষ্কার করল জ্যাকব।

সুতরাং শুরু হয়ে গেল কাজকর্ম। মানুষজন, হাতগাড়ি, কামার, তক্তা, পাকানো সুতা, পিচের পাত্র, হাতুড়ি এলো; ঘোড়া এলো কয়েকটা। একটা ঘোড়া তার মেয়ের মাথায় একদিন লাথিও দিল। বাড়ি তৈরির জ্বর এতই প্রবল হলো যে রেবেকা শরীরের আসল জ্বরই টের পেল না; সে জ্বরেই জ্যাকবকে কবরে নিয়ে গেল। জ্যাকব অসুখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাপ্টিস্টদের কাছে খবর চলে গেল এবং খামারের কেউ, বিশেষ করে সরো, যেন তাদের কাছে না যায়—এমন আদেশ দিয়ে দিল তারা। শ্রমিকরা তাদের অস্ত্রপাতি এবং ঘোড়াগুলো নিয়ে চলে গেল। কামার অনেক আগেই চলে গেছে। তার কাজ চোখ-ধাঁধানো অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল, যেন স্বর্গের তোরণ। জ্যাকবের কথামতো কাজ করল রেবেকা। মহিলাদের সবাইকে ডেকে জ্যাকবকে বিছানা থেকে কষ্ট করে তুলে একটা কম্বলের ওপর নামাল। জ্যাকব অনবরত বলতে লাগল—তাড়াতাড়ি করো, তাড়াতাড়ি। তার নিজের পেশির শক্তি হারানোর ফলে জ্যাকব মরার আগেই মড়ার মতো ভারী হয়ে গেছে। বসন্তের ঠাণ্ডা বৃষ্টির মধ্যেই তাকে ধরাধরি করে তুলে নিল সবাই। তাদের স্কার্ট কাদায় মাথামাখি হয়ে গেল, গা থেকে শাল গেল খুলে, মাথার ক্যাপ ভিজে চাঁদি পর্যন্ত বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ল। তারপর আবার গেটের কাছে বাধল আরেক সমস্যা। জ্যাকবকে কাদার মধ্যেই নামিয়ে রেখে দুজন গেল গেট খুলে দিতে। বৃষ্টির পানি জ্যাকবের মুখের ওপর পড়ছে দেখে রেবেকা নিজের মুখটা দিয়ে বৃৃষ্টির পানি ঠেকাল। তার অন্তর্বাসের সবচেয়ে শুকনো অংশ দিয়ে খুব সতর্কতায় জ্যাকবের মুখ মুছিয়ে দিল, যেন তার বসন্তের গুটি গলে না যায়, সে ব্যথা না পায়। শেষে তারা বাড়ির বড় একটা হলরুমে ঢুকে পড়ল। জানালা বানানোর জন্য রাখা খোলা জায়গা দিয়ে বৃষ্টির ছাঁট আসছে দেখে তারা অনেকটা আড়ালে নামাল জ্যাকবকে। রেবেকা নিচু হয়ে জ্যাকবকে জিজ্ঞেস করল, সে একটু সিডার পান করবে কি না। জ্যাকব শুধু ঠোঁট নাড়াতে পারল, কোনো শব্দ বের হলো না। তার দৃষ্টি রেবেকাকে ছাড়িয়ে কার দিকে বা কিসের দিকে যেন চলে গিয়ে স্থির হয়ে রইল। রেবেকা জ্যাকবের চোখ দুটি বন্ধ করে দিল। তারা চারজন—লিনা, সরো, ফ্লোরেন্স ও সে নিজে মেঝের তক্তার ওপর বসে পড়ল। প্রত্যেকেই মনে করল, অন্যরা কাঁদছে কিংবা তাদের কপোলের ওপর দেখা যাচ্ছে বৃষ্টির ফোঁটা।

রেবেকার সন্দেহ হতে লাগল, সেও আক্রান্ত হবে। তার মা-বাবার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ মহামারিতে মারা যায়নি। তারা গর্ব করে বলত, তাদের বাড়ির দরজায় কখনো লাল ক্রস চিহ্ন আঁকা হয়নি। তারা দেখেছে, শত শত কুকুর জবাই করে মারা হয়েছে, ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ তুলে মৃতদেহবোঝাই গাড়ির চলে যাওয়া দেখেছে। সুতরাং জাহাজে করে এই পরিষ্কার জগতে, এই সতেজ নিউ ইংল্যান্ডে এসে একজন তরতাজা শক্ত-সমর্থ মানুষকে বিয়ে করে তার মৃত্যুর পর চমৎকার বসন্তের রাতে পচা শরীরে বিছানায় পড়ে থাকা একটা হাস্যকর ব্যাপার। শয়তান, তোমাকে অভিনন্দন। জাহাজ তীরে ভেড়ানোর পর তাদের এলোপাতাড়িভাবে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার সময় এ কথাই বলত পকেটমার।

এলিজাবেথ বলত, ঈশ্বরনিন্দার পাপ হচ্ছে।

ডরোথিয়া বলত, সত্য।

এখন তারা দরজায় ঘুরঘুর করছে কিংবা বিছানার পাশে বসে আছে।

জুডিথ বলে, আমি মরে গেছি। অভিজ্ঞতা খুব খারাপ না।

ওকে এ কথা বলিস না। সে এক বিকট অভিজ্ঞতা।

ওর কথা শুনো না। ও এখন এক ভিন্নমতাবলম্বী যাজকের স্ত্রী।

তোমরা চা খাবে?

আমি এক নাবিককে বিয়ে করেছি। সুতরাং আমি সব সময় একা।

ও স্বামীর উপার্জন বাড়ানোর জন্য নিজেও রোজগার করে। জিজ্ঞেস করো, কিভাবে।

এসবের বিরুদ্ধে আইন আছে।

অবশ্যই। তবে প্রয়োজন না হলে তারা আইন প্রয়োগ করত না।

শোনো, আমার কী হয়েছিল বলি। এই লোকটার সঙ্গে আমার দেখা...। জাহাজে যেভাবে কথা বলত তারা, এখানেও তেমন একজনের কণ্ঠের বিপরীতে আরেকজনের কণ্ঠ থেকে শব্দ বের হচ্ছে। তারা এসেছে রেবেকার দুঃখ লাঘব করতে; কিন্তু রেবেকার স্বপ্নে আসা অন্যদের মতো এরাও নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত বেশি। তবু তাদের গল্প এবং মন্তব্যগুলো শুনে রেবেকার মন চলে যায় অন্যদের জীবনের দিকে। কিছুক্ষণ নিজেকে ভুলে থাকার সুযোগ পায়। তিনি শোচনীয় অবস্থায় পড়েছিলেন; শরীরে যন্ত্রণা, মনেও হতাশা। তারা নিজেদের কথা বলে গেছে তার সামনে। যখন তাঁর আরো খারাপ লাগে, ঈশ্বর তাঁর প্রতি সাড়া দিয়ে বলেন, নিজের কাছে তোমার পরিচয় কী? আমাকে প্রশ্ন করছ? তাহলে আমি কে, আমি কী কী জানি, সেসব জানানোর জন্য আমি ইঙ্গিতে উত্তর দিচ্ছি। একমুহূর্তের জন্য তার নিজের মতো আত্মমগ্ন মনুষ্যজীবের চিন্তা-ভাবনা কতটা নাজুক এবং বিপথগামী, তা জানার জন্য জবের নিশ্চয়ই প্রচণ্ড ইচ্ছা জাগে। শেষ পর্যন্ত স্বর্গীয় জ্ঞানের মধ্যে দৃষ্টি ফেলার চেয়ে প্রভুর মনোযোগ আকর্ষণ করাই বেশি গুরুত্বের মনে হয়। রেবেকাও দৃঢ়ভাবে মনে করে, জব সেটাই চেয়েছিলেন।

কিন্তু জব তো একজন মানুষ ছিলেন। মানুষের কাছে অদৃশ্যমানতা অসহ্য। একজন মহিলা জব কি প্রশ্ন কি আরজি পেশ করার সাহস করতে পারে? আর যদি সে এ রকম কোনো প্রশ্ন তুলে থাকে এবং ঈশ্বর যদি দয়া করে তাকে ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন সে কতটা দুর্বল এবং অজ্ঞ, তাহলে সে সম্পর্কিত বার্তা কোথায়? যে বার্তা পেয়ে জব নিজের তুচ্ছতা বুঝতে পারেন এবং আনুগত্য ফিরিয়ে আনেন, সেটাই একজন মহিলা জব তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জানতে এবং শুনতে চেয়েছেন। না। প্রশান্তি না পাওয়ার চেয়ে মিথ্যা প্রবোধ পাওয়াও ভালো, মনে করে রেবেকা। এরপর তার জাহাজের সহযাত্রীদের কথা শুনতে থাকে আবার।

লোকটা আমাকে ছুরি মেরেছিল। সারা গায়ে রক্ত। নিজের কোমর জড়িয়ে ধরে মনে মনে বললাম, না। জ্ঞান হারানো যাবে না, মেয়ে। একটানা...

জাহাজের সহযাত্রী নারীরা মিলিয়ে যাওয়ার পরে আসে আকাশের চাঁদ। দেখতে অবিকল একজন চিন্তিত বন্ধুর মতো। আর আকাশটা কোনো ভদ্রমহিলার বলনাচের গাউন। তার বিছানার পায়ের কাছে মেঝেতে শুয়ে আছে লিনা, হালকা নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে। জ্যাকব মারা যাওয়ার অনেক আগে যে ফাঁকা এবং মুক্ত জায়গাটা তার কাছে রোমাঞ্চকর মনে হয়েছিল, সেটাই কেমন শূন্য হয়ে গেছে। আক্রমণাত্মক, জবরদস্তিমূলক অনুপস্থিতি জেঁকে বসেছে। একাকিত্বের কুটিলতা সে বুঝতে পারে। রঙের বিভীষিকা, নীরবতার গর্জন, পরিচিত সাধারণ জিনিসের নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকার ভীতি—এসব। আবার যখন জ্যাকব দূরে কোথাও থাকত; যখন প্যাট্রিসিয়ান কিংবা লিনা কেউই যথেষ্ট ছিল না; স্থানীয় ব্যাপ্টিস্টদের কথার বিষয়বস্তু তাদের বেড়ার গণ্ডি ছাড়াতে না পারলেও স্বর্গ পর্যন্ত পৌঁছে যেত; কিন্তু রেবেকার শুধু বিরক্তই লাগত। সে সময়ও একাকিত্ব ছিল। গির্জায় দেখা মহিলাদের তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতো না। তারা মনে করত, তারা নিষ্পাপ এবং নিরাপদ। কারণ তারা গির্জায় নিয়মিত। তুষারের মতো ভাসতে ভাসতে নীরবতা ছড়িয়ে পড়তে লাগল তার মাথা-কাঁধের চারপাশে, ছড়িয়ে পড়তে লাগল বাতাসতাড়িত তবে শান্ত পাতাদের দিকে, ঝুলন্ত কাউবেল ফুলের দিকে, আশপাশে কোথাও রান্নার কাঠ কাটতে থাকা লিনার কুড়ালের শব্দের দিকে। তখন তার ত্বকের ওপর রক্তিম আভা চলে আসত, তারপর ঠাণ্ডা মনে হতো। শব্দ ফিরে আসত শেষে। কিন্তু একাকিত্ব চলতেই থাকত দিনের পর দিন। একাকিত্বের মধ্যেই জ্যাকব এসে হাজির হতো।

ঘোড়া চালিয়ে এসে হাঁক দিত জ্যাকব—কই, আমার তারা কই?

এই তো এখানে, উত্তর আকাশে—এই বলে সাড়া দিত রেবেকা। কাপড়ের চোঙের মতো পাকানো একটা রোল ফেলত রেবেকার পায়ের কাছে কিংবা এক প্যাকেট সুচ দিত তার হাতে। সবচেয়ে মনে রাখার মতো দৃশ্যটা হলো, জ্যাকব যখন তার পাইপ বের করত তখন। গানের পাখিরা বিব্রত হয়ে যেত। কারণ তারা তো মনে করত, গোধূলির মালিক তারাই। তখনো বেঁচে আছে এ রকম কোনো বাচ্চা ছেলে রেবেকার কোলে; প্যাট্রিসিয়ান হয়তো মেঝেতে, বাবার ডাক শুনে মুখ হাঁ হয়ে যেত, চোখ চকচক করে উঠত। বাগান কিংবা রাখাল হয়তো তাকে আগে দেখেনি কিংবা হয়তো চিনত না। তার সঙ্গে কাটানো নিঃসঙ্গতার জীবন গির্জার সঙ্গে সম্পর্কহীন হচ্ছিল হয়তো; কিন্তু সে জীবনের জন্য খুব বেশি মূল্য দিতে হয়নি।

পরিপূর্ণ সস্তুষ্টি নিয়ে একবার তার উদারতার লাগাম টেনেছিল। এই উদারতা মানে অতিরিক্ত সচ্ছলতা। এ রকম উদারতা দিয়েই সে লিনার প্রতি করুণা দেখাত।

লিনা, পুরুষ মানুষকে ভালো করে চেনোনি, তাই না?

গোসল করতে গিয়ে নদীর ধারে বসেছিল তারা। লিনার হাতে ধরা রেবেকার শিশুছেলে। শিশুটার খিলখিল হাসি শোনার জন্য লিনা তার পিঠে পানি ঢালছে। আগস্ট মাসের পুড়িয়ে দেওয়া তাপে নদীতে গোসল করতে গিয়েছিল তারা। নদীর ওই জায়গাটা সহজে চোখে পড়ে না কারো। একেবারে তীর ঘেঁষে ছোট কোনো ডিঙি গেলে বোঝা যেত যে ওখানে কেউ আছে। এমনকি মাছির ঝাঁক এবং শয়তান মশারাও ওখানে যেত না। তারপর শিশুটাকে কাঁধের ওপর রেখে জলের ধারা ঢালতে লাগল তার পিঠে।

চিনেছি কি না, জিজ্ঞেস করছেন, মিস?

আমার কথা তো বুঝতে পেরেছ, লিনা?

পারছি।

ভালো করে?

সেই মুহূর্তে প্যাট্রিসিয়ান আঙুল তুলে একদিকে দেখিয়ে তীব্র চিৎকার দেয়, ওই দ্যাখো!

লিনা ফিসফিস করে বলে, স্স্স্স্, চুপ থাকো। ওরা ভয় পাবে।

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়েই গেছে। শিয়াল ও তার বাচ্চারা অন্যখানে পানি খেতে চলে যায়।

এবার রেবেকা আবার জিজ্ঞেস করে, চিনেছ? কমপক্ষে একবার?

একবার।

তারপর?

ভালো নয়। অভিজ্ঞতা ভালো নয়, মিস।

কেন ভালো নয়?

আমি সব সময় পেছনে থাকব। আমি সব কিছু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখব। আমি মার খাব না। না।

শিশুটাকে মায়ের কাছে দিয়ে লিনা রাজবেরিগাছের ঝোপের দিকে গেল। ওখানে তার কামিজ ঝুলিয়ে রেখেছে। কাপড় পরে এসে এক হাতে ধোয়া কাপড়চোপড় নিয়ে অন্য হাত বাড়িয়ে দিল প্যাট্রিসিয়ানের দিকে। ওই ছেলেটা তার সব সন্তানের মধ্যে বেশি বাপভক্ত ছিল, মনে আছে। সেদিনের কথা ভাবতে ভাবতে রেবেকা স্মৃতির গন্ধ নেয়; তার অলৌকিক সৌভাগ্য। বউ পেটানো তখন খুব সাধারণ ব্যাপার ছিল, সে জানত। অবশ্য রাত নয়টার পরে নয়। বিধি-নিষেধ যত ছিল, সব স্ত্রীদের ওপর। লিনার প্রেমিক কি স্থানীয় আদিবাসী ছিল? সম্ভবত না। ধনী কেউ ছিল? নাকি সাধারণ সৈনিক কিংবা নাবিক? রেবেকার সন্দেহ হয়, লোকটা ধনী কেউ ছিল; কারণ নাবিকদের কারো কারো দয়ার কথা সে শুনেছে।

বিছানায় পড়ে থাকার কারণে তার প্রশ্নটা দিক পরিবর্তন করে তার দিকেই ফিরে আসে—আর আমি? আমি দেখতে কেমন হয়ে গেছি? আমার চোখের ভেতর এখন কী দেখা যায়? কঙ্কালের মাথা আর আড়াআড়ি জোড়া হাড্ডি হয়ে গেছি? রাগ-ক্ষোভ? আত্মসমর্পণ? সব কিছু এখনই তার জানতে ইচ্ছা করে। তার আয়নাটা চাই। জ্যাকব একবার তাকে একটা আয়না উপহার দিয়েছিল। সে আবার কাপড়ে মুড়িয়ে তার আলমারির ভেতর রেখে দিয়েছিল। তাকে বোঝাতে খানিক সময় লাগে, তবে অবশেষে লিনা যখন বুঝতে পারে এবং তার দুই হাতের তালুর মাঝে আয়নাটা রেখে দেয় তখন রেবেকা আঁতকে ওঠে, দুঃখিত। খুবই দুঃখিত! চোখের ভ্রু তার কাছে স্মৃতি। আগুনের শিখার মতো কুঁড়ির রং ফিরে আসে তার ফ্যাকাসে গোলাপি কপোলে। সারা মুখে তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে হালকা গতিতে ঘুরে বেড়ায়। নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাছে তার মিনতি—চোখ, প্রিয় চোখ, মাফ করো! নাক, হতভাগা মুখ, হতভাগা মিষ্টিমুখ, আমি দুঃখিত! বিশ্বাস করো, ত্বক, আমি অবশ্যই ক্ষমা চাই! প্লিজ, আমাকে ক্ষমা করো!

তার কাছ থেকে আয়নাটা কেড়ে নিতে অপারগ লিনা অনুনয় করে বলে, মিস, অনেক হয়েছে! আর না।

রেবেকা তার কথা শোনে না। আয়নাটা আঁকড়ে ধরে রাখে।

আহা, কী সময় ছিল তখন! কত সুখী ছিল রেবেকা! কত সুস্থ-সবল ছিল! জ্যাকব তখন বাড়িতে। নতুন বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করছে। সন্ধ্যাবেলায় ক্লান্ত জ্যাকবের মাথায় চুল তুলে দিত সে। সকালবেলা আবার বেঁধে দিত। জ্যাকবের খাওয়ার রুচিটা তার খুব ভালো লাগত। তার রান্না নিয়ে জ্যাকবের অনেক প্রশংসা ছিল। কামার শুধু তাকে ও জ্যাকবকে ছাড়া সবাইকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। তবে সে তাদের দুজনকে বিপত্সংকুল সমুদ্রে নোঙরের মতো স্থির অবস্থায় ধরে রেখেছিল। লিনা তাকে ভয় করত। সরো কুকুরের মতো কৃতজ্ঞ ছিল তার প্রতি। আর ফ্লোরেন্স, হতভাগা ফ্লোরেন্স একেবারে ধরাশায়ী হয়ে গেল তার সামনে। ওদের তিনজনের মধ্যে শুধু ফ্লোরেন্সকেই কামারের কাছে পাঠানো যেত। কারণ লিনা যেতেই চাইত না তার রোগী ফেলে। তার চেয়েও বড় কথা, সে কামারকে ঘৃণা করত। আর পেটে বাচ্চা নিয়ে বেকুব সরোর তো যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। ফ্লোরেন্সের ওপরই রেবেকার বিশ্বাস ছিল। কারণ সে দক্ষ, তার সফল হওয়ার কারণও ছিল। ফ্লোরেন্সের প্রতি রেবেকার অনেক স্নেহও ছিল, যদিও সেটা জাগতে অনেক সময় লেগেছে। জ্যাকব মনে করেছিল, আমাকে প্যাট্রিসিয়ানের বয়সী একটা মেয়ে দিলে আমি খুশি হব। আসল কথা হলো, এ রকম কাজ করা মানে মৃত মেয়েটাকেই খাটো করে ফেলা। অন্য কাউকে দিয়ে আগেরজনের জায়গা পূরণ করা যায় না, সেই চেষ্টা করাও উচিত নয়। সুতরাং মেয়েটাকে আনার পর রেবেকা তার দিকে খুব একটা নজরই দেয়নি। আর দরকারও পড়েনি। কারণ পরে লিনা মেয়েটাকে পুরোপুরি তার নিজের স্নেহের পাখার নিচে আশ্রয় দিয়ে ফেলেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রেবেকাও নরম হয়েছে, তার কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার জন্য ফ্লোরেন্স ব্যাকুল থেকেছে, সেটা দেখে তার ভালোও লেগেছে, ‘ভালো হয়েছে’, ‘সুন্দর হয়েছে’—এ রকম শুনতে চাইত মেয়েটা। যত অল্পই হোক, তাকে অনুগ্রহ করলেই ফ্লোরেন্স খরগোশের জাবর কাটার মতো করত। জ্যাকব বলেছিল, মেয়েটার মায়ের তাকে কাজে লাগানোর মতো সুযোগ নেই; মেয়েটাকে পছন্দ করার ক্ষেত্রে সেটাই মনে রেখেছে রেবেকা। ফ্লোরেন্সকে পাঠানোর কারণ হিসেবে রেবেকার মনে হয়েছে, কামার এখানে থাকতে তার প্রতি মেয়েটার একটা টান তৈরি হয়েছিল। যেকোনো অজুহাতে কামারের কাছে দৌড়ে চলে যেত, তার খাবার সময়মতো তার সামনে হাজির করার জন্য তটস্থ থাকত। লিনার ক্রুদ্ধ দৃষ্টি আর ফ্লোরেন্সের হাসিখুশি ভাবের প্রতি জ্যাকব তেমন গুরুত্বই দেয়নি। বলেছে, কামার কাজ শেষ হলে শিগগিরই চলে যাবে। ওকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। তা ছাড়া ওর কাজের গুণ ছিল, একটা মেয়ে ওকে দেখে পাগল হয়ে গেছে বলে ওকে চলে যেতে দেওয়া যায় না। জ্যাকবের কথাই ঠিক, কামারের গুণ পরিমাপ করার মতো নয়; সে সরোর ওপর অসুখের যে আক্রমণই হোক না কেন, তাকে তো সারিয়ে তুলেছে কামার। হে ঈশ্বর! সে যেন আরো একবার তার অলৌকিক ক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারে। ফ্লোরেন্স যেন তাকে বুঝিয়ে রাজি করাতে পারে। তারা ফ্লোরেন্সের পা ভালো করে সাজিয়ে দিয়েছে জ্যাকবের জুতা দিয়ে। ভেতরে একটা চিঠি দিয়ে দেওয়া হয়েছে ওর কাজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য। কিভাবে কোন পথে যেতে হবে, সব ঠিকমতো বলে দেওয়া হয়েছে।

সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সন্তানহীনতার দুঃখ, নিঃসঙ্গতার আকস্মিক আবির্ভাব একসময় তুষারপাতের মতো মিলিয়ে গেছে। যেমন—জগতে বড় হওয়ার জন্য জ্যাকবের যে দৃঢ়সংকল্প একসময় তার কাছে বিরক্তিকর মনে হলেও পরে ঠিক হয়ে গেছে। সে বুঝেছে, বেশি সম্পদ পাওয়ার সন্তুষ্টিটা আসলে লোভ নয়। তাদের মধ্যেও লোভ ছিল না। সম্পদ অর্জনের প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকাটাই আনন্দের। সত্য যা-ই হোক, জ্যাকবকে যতটাই তাড়িত মনে হোক, জ্যাকব আসলে সেই আনন্দটাই পেতে চেয়েছিল। সঙ্গে তাকেও নিয়েছিল। বিছানায় শুয়ে একজন আরেকজনের নিঃশ্বাস টের পেত, ঘুমের মধ্যেও রেবেকাকে কাছে টানত। তারপর হঠাৎ করেই জ্যাকব অনুপস্থিত হয়ে গেল।

তাহলে কি আনাবাপ্টিস্টদের কথাই ঠিক? সুখ কি তাহলে শয়তানের প্রলোভন, প্রতারণার বস্তু? তার দুর্বল অনুরুক্তি কি তাহলে একটা টোপ মাত্র? তার একগুঁয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতা কি ডাহা ঈশ্বরনিন্দার পাপ? সে জন্যই কি তার তৃপ্তির উঁচু বাসায়ও মৃত্যু উঁকি দিয়ে দেখে মুচকি হেসেছে? ঠিক আছে, তার জাহাজের সহযাত্রীরা তো মনে হলো, সব কিছু মেনে নিয়ে চলতে পেরেছে। তার সঙ্গে তারা যে দেখা করতে এসেছিল, তাতে বোঝা গেছে, জীবন তাদের যা যা দিয়েছে, যেসব বাধার সম্মুখীন তারা হয়েছে, সব পরিস্থিতি নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী পরিচালনা করেছে, নিজেদের কল্পনার ওপর আস্থা রেখেছে। ব্যাপ্টিস্ট মহিলাদের বিশ্বাস অন্যখানে।  রেবেকার জাহাজের সহযাত্রীরা যা যা দেখে উত্তেজনা ও চ্যালেঞ্জ পেয়েছে, সেসব দেখে ব্যাপ্টিস্ট মহিলারা ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এক দলের বিশ্বাস হলো, অন্য দল যা যা করছে সবই বিজ্জনকভাবে, গভীরভাবে ত্রুটিপূর্ণ। বিশ্বাসের প্রসঙ্গে এক দলের সঙ্গে আরেক দলের কোনো মিল নেই। তবে একটা প্রসঙ্গে তাদের সব কিছুতেই মিল আছে। বিষয়টি হলো পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া প্রতিশ্রুতি ও হুমকি। উভয় দলই একমত যে এখানেই নিরাপত্তা, এখানেই ঝুঁকি। এ প্রসঙ্গে দুই দলের মধ্যে আপস হয়েছে। লিনার মতো যারা পুরুষদের হাতে মুক্তি ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তারা আর তাদের সঙ্গে নেই। সরোর মতো যারা আপাতত অন্য মহিলাদের কাছ থেকে কোনো জ্ঞান-গরিমা পায়নি, তারা পুরুষের খেলনা হয়েছে। যারা তার জাহাজের সহযাত্রীদের মতো, তারা পুরুষের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছে। যারা ধার্মিক, তারা পুরুষের প্রতি অনুগত থেকেছে। আর তার মতো অল্পসংখ্যক নারী পারস্পরিক ভালোবাসার সম্পর্কের পর যখন পুরুষ চলে গেছে, তখন শিশুদের মতো হয়ে গেছে। পুরুষের মর্যাদা ছাড়া, পুরুষের সহায়তা ছাড়া, পরিবারের কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সমর্থন ছাড়া তো একজন বিধবা নারী বাস্তব অর্থে অবৈধ। কিন্তু নিয়মটা কি এমন হওয়াই উচিত নয়? আদম আগে, হাওয়া পরে। আর নারীর ভূমিকা সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দিলে আইনের আশ্রয় থেকে তাকেই প্রথমে বহিষ্কার করা হবে?

এগুলোর কোনোটাতেই অ্যানাব্যাপ্টিস্টদের কোনো রকম দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। জ্যাকবের মতোই আদম ছিলেন ভালো মানুষ। তবে অমিলটা হলো, আদমকে তাড়না দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গিনী; তাঁকে অধঃপাতে নামিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গিনী। জ্যাকব ও রেবেকা বুঝতে পেরেছিল, গ্রহণযোগ্য আচরণ ও নীতিমান চিন্তার সীমারেখা আছে। অন্য কথায়, পাপের পর্যায়। সংখ্যালঘু জাতের মানুষ, যেমন স্থানীয় আদিবাসী ও আফ্রিকান—তাদের ক্ষমা পাওয়ার অধিকার আছে; কিন্তু স্বর্গে প্রবেশাধিকার নেই। তাদের নিজের বাগান তাদের কাছে যেমন পরিচিত, স্বর্গও তাদের কাছে তেমনি আন্তরিকভাবে জানাশোনা। পরকাল দিব্যজগতের চেয়ে বেশি কিছু; রোমাঞ্চে ভরা। চব্বিশ ঘণ্টার প্রার্থনাগীতের নীল ও সোনালি স্বর্গ নয়; বরং অভিযানসুলভ বাস্তব জীবন, সেখানে সব চাওয়া নিখুঁত এবং নিখুঁতভাবেই সেগুলো পূর্ণ করা হবে। গির্জার যে মহিলাদের সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, তারা স্বর্গের বর্ণনা কিভাবে দিয়েছিল? গান-বাজনা থাকবে, ভোজ-উৎসব থাকবে, পিকনিক থাকবে, হেরাইড থাকবে। আনন্দ-ফুর্তি করে বেড়ানো যাবে। স্বপ্ন বাস্তব হয়ে যাবে। আর সম্ভবত যদি কেউ সত্যিই তার অঙ্গীকার রক্ষা করে চলে, ধর্মের প্রতি একনিষ্ঠভাবে আন্তরিক থাকে, তাহলে ঈশ্বর তার প্রতি দয়াবান হন, তাকে সন্তান দিয়ে থাকেন; যদিও ব্যাপ্টিজমের পরিপূর্ণ অবগাহনের জন্য এবং তার জগতে প্রবেশের জন্য খুব ছোট হয়ে থাকতে পারে সে সন্তানরা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়। অনেক সময় থাকবে সব কিছু করার। যারা পাপমুক্ত, তাদের সঙ্গে কথা বলা যাবে, হাসাহাসি করা যাবে।

ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত রেকেবা আর ভাবতে পারে না, শুধু বিশ্বাস করে চলে। মুখের ভেতরে তার জিহ্বা পথহারা কোনো প্রাণীর মতো আচরণ করে। যদিও সে বুঝতে পারে, তার ভাবনাগুলো অগোছালো। তার মন বলে, কোথাও কোনো দুর্বোধ্যতা নেই, সব পরিষ্কার। জ্যাকব এবং সে এসব বিষয় নিয়ে একসময় কথা বলতে পারত—ভাবতেই জ্যাকবকে হারানোর বেদনা অসহ্য হয়ে যায়। জ্যাকবের মনের ভাব কিংবা স্বভাব, যা-ই হোক না কেন, সঙ্গী বলতে যা বোঝায়, সে ঠিক তা-ই ছিল।

এখন কাজের লোকজন ছাড়া আর কেউ নেই। সবচেয়ে ভালো স্বামী হওয়ার যোগ্যতা যার ছিল, সে চলে গেছে। তার পেছনে ফেলে যাওয়া নারীরাই তাকে দাফন করেছে। ছেলে-মেয়েরা গোলাপি রঙে রঞ্জিত মেঘ হয়ে গেছে। সরো ধীরগতির বুদ্ধির মেয়ে, প্রেত জাহাজে থেকে তার পোড়-খাওয়া অভিজ্ঞতা হয়েছে; সে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত, যদি আমি মারা যাই। এ রকম ভাবাই স্বাভাবিক। শুধু লিনা অপরিবর্তিত-অটল মনোভাব বজায় রেখেছে, যেন সে দুঃখজনক সব কিছুর অভিজ্ঞতা আগে থেকেই পেয়ে গেছে। জ্যাকবের বাইরে ঘুরে বেড়ানোর দ্বিতীয় বছরে অসময়ের প্রবল তুষারঝড়ের কারণে তার ফিরতে দেরি হচ্ছিল। ঘরের মধ্যে দুই দিন আটকে থেকে না খেয়ে মরার অবস্থা হয়েছিল রেবেকা, লিনা ও প্যাট্রিসিয়ানের। হাঁটাচলার মতো পথ কিংবা রাস্তা পাওয়া একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কাঁচা মেঝেতে সামান্য শুকনো গোবরের আগুন বারবার ফোতফোত করে নিভে যাওয়ার উপক্রম হয়। ওই সামান্য আগুনের আঁচ থাকলেও ঠাণ্ডায় প্যাট্রিসিয়ান নীল হয়ে যায়। এই লিনা তখন পশুর চামড়ায় সারা গা ঢেকে একটা ঝুড়ি আর একটা কুড়াল নিয়ে বের হয়। ঊরু সমান উঁচু তুষারপাত আর আতঙ্কে গ্রাস করার মতো বাতাস মোকাবেলা করে লিনা নদীর দিকে এগোতে থাকে। নদীর জমাট বরফ ভেঙে নিচে পড়ে থাকা স্যামন মাছ কুড়িয়ে নিয়ে আসে তাদের খাওয়ানোর জন্য। যতগুলো পারে ঝুড়ি বোঝাই করে নিয়ে আসে। ঝুড়ির হাতল বাঁধে তার বেণির সঙ্গে, যাতে ফেরার সময় তার হাত জমে না যায়।

এই হলো লিনা। নাকি ঈশ্বরেরই আরেকটা রূপ? এখানে সব হারানোর খাদে পড়ে থেকে রেবেকা ভাবতে থাকে, এই দেশে তার ভ্রমণ, তার পরিবারের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, তার গোটা জীবন—এগুলো আসলে তার গুপ্ত তথ্য পাওয়ার গন্তব্যে পৌঁছানোর একেকটা স্টেশন। নাকি সমূহ সর্বনাশপ্রাপ্তির পথ? সে কিভাবে জানবে? আর এখন মৃত্যু তার নাম ধরে ডাকছে। কার কাছে সাহায্য চাইবে? কামারের কাছে? নাকি ফ্লোরেন্সের কাছে?

কামারের কাছে যেতে কত দিন লাগবে? তাকে কি সেখানে পাওয়া যাবে? ফ্লোরেন্স কি হারিয়ে যাবে? কেউ কি ওকে আক্রমণ করতে পারে? ও কি ফিরে আসবে? কামার কি আদৌ আসবে? নাকি নাজাতের জন্য খুব বেশি দেরি হয়ে গেছে?

 

 

আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আবার একটু শব্দ শুনেই জেগে উঠি। তারপর স্বপ্ন দেখি, সব গাছ হেঁটে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি জানি, আমি স্বপ্ন দেখছি। কারণ গাছগুলো সব পাতাবোঝাই, ফলবোঝাই। গাছগুলো কী চায়, জানি না। আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়? আমাকে ছুঁয়ে দেখতে চায়? একটা গাছ আমার দিকে নিচু হয়ে আসে। আমার মুখের ভেতর একরকম আর্তনাদ তৈরি হয়ে যায়; আমি জেগে উঠি। তারপর দেখতে পাই, গাছগুলো তো বাস্তবের গাছ থেকে আলাদা নয়। গাছগুলো তো চেরি ফলে বোঝাই নয়, আমার দিকে ঝুঁকেও পড়েনি। এই স্বপ্নটা তো খানিক ভালোই। এর চেয়ে খারাপ স্বপ্ন হলো, এ মিনহা মাইকে তার শিশুছেলের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা। ওই সব স্বপ্নে মহিলা আমাকে কিছু বলতে চায়। আমার দিকে চোখ বাড়িয়ে দিয়ে তাকিয়ে থাকে। মুখে কী যেন বলতে থাকে। তার দিক থেকে আমি মুখ ফিরিয়ে রাখি। আমার ঘুম এরপর গভীর হয়ে আসে।

পাখির গান নয়, সূর্যের আলোর পরশে আমার ঘুম ভাঙে। এখন আর একটুও তুষার নেই। নিজেকে স্বস্তিতে রাখাই এখন আমার বড় সমস্যা। তারপর আমি হাঁটতে থাকি। মনে হতে পারে, আমি উত্তরে যাচ্ছি; কিন্তু আমি আসলে পশ্চিমে যাচ্ছি। না, উত্তরেই যাচ্ছি। হাঁটতে হাঁটতে এক জায়গায় এসে দেখতে পাই, আর সামনে এগোতে পারছি না; লতাগুল্মের ঝোপঝাড় আমার পথ আটকে দিচ্ছে। আমাকে যেতেই দিচ্ছে না। কাঁটাগাছের ঝোপ কচি কচি চারাগাছের মধ্যে ঘন হয়ে ছড়িয়ে আছে, লম্বায় আমার কোমর সমান। অনেকক্ষণ ধরে জোর খাটিয়ে আমি সামনের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করি। একসময় বুঝতে পারি, ভালোই হয়েছে; হঠাৎ সামনে দেখি ঘাসের খোলা তৃণভূমি। ঘন, গভীর, ভেড়ার লোমের মতো নরম। নিচু হয়ে ঘাস ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করি। তখনই মনে পড়ে যায়, লিনা কিভাবে আমার চুল এলোমেলো করে দিয়ে আনন্দ পায়। লিনা হাসতে হাসতে বলে, আমার চুলেই নাকি প্রমাণ করে, আমি সত্যি একটা ভেড়া। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, আর তুমি? লিনা বলে, ও একটা ঘোড়া। বলেই ওর ঘোড়ার কেশরের মতো চুলে ঝাঁকি মারে। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তারা আমার কাছাকাছি চলে আসে। আমার চারপাশে ঘোরে। ঘুরতে ঘুরতে হাসে। ভয়ে আমি কাঁপছি। তাদের সবার পায়ে নরম জুতা। কিন্তু তাদের ঘোড়ার পায়ে নাল পরানো নেই। ছেলেগুলোর আর ঘোড়াগুলোর সবারই কেশর লিনার চুলের মতো লম্বা। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলে, হাসাহাসি করে। কিন্তু আমি তাদের ভাষা বুঝি না। তাদের একজন নিজের মুখের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দেয়। একবার ঢোকায়, আবার বের করে। এ রকম করতে থাকে সে। অন্যরা আরো হাসতে থাকে। আমি ভয়ে অসহায় হয়ে হাঁটু মুড়ে পড়ে যাই। সে ঘোড়া থেকে নেমে পড়ে, আরো কাছে চলে আসে। তার চুলের সুগন্ধ টের পাই আমি। তার চোখ একটু তেরছা, লিনার চোখের মতো বড় নয়, গোল গোল নয়। বুকের সঙ্গে ঝুলতে থাকা একটা রশি থেকে একটা ঝুলি ছাড়িয়ে আনতে আনতে সে দাঁত কেলিয়ে হাসে। সে আমার দিকে এগিয়ে ধরে, যাতে আমি ওটার ভেতর থেকে পড়া পানি পান করতে পারি। কিন্তু ভয়ে কাঁপতে থাকার কারণে আমি পারি না। সে নিজে ওখান থেকে খানিকটা পানি পান করে। তারপর আমার দিকে এগিয়ে দেয়। আমি পানি চাই। পানির তৃষ্ণায় আমি মরে যাচ্ছি। কিন্তু নড়তেই পারছি না। আমি শুধু আমার মুখটা বড় করে হাঁ করতে পারি। সে আরো এগিয়ে এসে আমার মুখে পানি ঢেলে দেয়। আমি এভাবেই পানি পান করতে পারি। আমাকে পানি পান করানো ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে থেকে আমার থুতনি মোছা দেখে। তারপর পানির পাত্রটা তার কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। এরপর সে তার কোমরের বেল্টে হাত দিয়ে একটা কালো ফিতা বের করে আনে। দাঁত দিয়ে কামড় দিয়ে ধরার মতো ভাব করে জিনিসটা আমাকে দিয়ে দেয় সে। জিনিসটা দেখতে চামড়ার মতো। তবে আমি জিনিসটা নিই। খুব দ্রুত সে উঠে পড়ে এবং লাফিয়ে ঘোড়ায় চড়ে বসে। আমি ঘাবড়ে যাই।

কালো ফিতাটা জিহ্বায় ছুঁয়ে দেখি, সত্যিই তো, চামড়া। লবণাক্ত আর মসলার মতো সুগন্ধওয়ালা জিনিসটা থেকেও তোমার পছন্দের মেয়েটা ভালো লাগার কিছু পেয়ে থাকতে পারে।

ওই ছেলেগুলোর ঘোড়ার খুরের চিহ্ন দেখে দেখে বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করি আমি। গরমের ভাব শুরু হয়েছে। গরম আস্তে আস্তে বাড়ছে। তবু ঠাণ্ডা শিশিরে ভিজে আছে মাটি। ভেজা মাটিতে কেমন লাগে ইচ্ছা করেই মনে করতে চাই না। তার চেয়ে বরং শুকনো বড় বড় ঘাসের ভেতরে দেখা জোনাকির কথা স্মরণ করার চেষ্টা করি। আকাশে এত এত তারা! মনে হচ্ছে দিনের বেলা। তুমি আমার মুখের ওপর তোমার হাত চাপা দিয়ে রাখো, যাতে আমার আনন্দের শব্দে মুরগিগুলোর ঘুম ভেঙে না যায়। নীরব। একেবারেই নীরব। অন্য কেউ নিশ্চয়ই জানে না। কিন্তু লিনা ঠিকই টের পায়। লিনা আমাকে সাবধান হতে বলে। আমরা দোল-বিছানায় শুয়ে আছি। আমি তো সবে তোমার কাছ থেকে এসেছি। তুমি পাপবোধে অস্বস্তিতে পড়েছ, হয়তো এ রকম অনুভূতি আরো হবে তোমার। আমি লিনার কাছে অর্থ জিজ্ঞেস করি। সে বলে, এখানে একজন বেকুব আছে; বেকুবটা সে নিজে নয়। সুতরাং সতর্ক হতে বলে। আমার এত ঘুম পায়, আমি ওর কথায় সায় দিতে পারি না, দিতে চাইও না। আমি ওর মুখে রামের কথা শুনতে শুনতেই ঘুমে তলিয়ে যাই। আমি নিজেই বলেছিলাম রামের কথা। প্রথমবার শুধু রামের কথাই বলেছিলাম; কারণ তার মতো একজন শিক্ষা-দীক্ষাওয়ালা মানুষ, এ রকম সামাজিক অবস্থানে থাকা মানুষ তো নেশার ঘোরে না পড়লে নিজেকে এতটা অসম্মানের জায়গায় নামাতে পারে না। ও আরো বলে, আমি বুঝতে পারি। আমি গোপনীয়তার প্রয়োজন বুঝি। সে জন্যই সে বাড়িতে এলে কখনোই আমি তার চোখের দিকে তাকাই না। আমি শুধু খেয়াল করে দেখার চেষ্টা করি, তার মুখে স্ট্র আছে কি না। ও আরো বলে, আমি আরেকটা জিনিস দেখার চেষ্টা করি। বাড়ির গেটের কবজায় সে একটা কাঠি রাখে কি না। কাঠিটা হলো, রাতে আমাদের দেখা হওয়ার ইঙ্গিত। ওর এ রকম কথা শুনে আমার ঘুম ঘুম ভাব কেটে যায়। আমি উঠে বসি। দোলনা বিছানার ওপর আমার পা ঝুলিয়ে দিই। বিছানার দড়ি ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে, এদিক-ওদিক দোল খায়। ওর কণ্ঠে কিছু একটা আছে; আমার মনটা খচখচ করে। পুরনো দিনের কিছু একটা। নিষ্ঠুর কিছু। ভেতরটা কেটে কেটে যায়। আমি ওর মুখের দিকে তাকাই। তারাদের উজ্জ্বল আলো, চাঁদের আলোর দ্যুতি ওর মুখ দেখার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু কোনোটাই ওর মুখের প্রকাশভঙ্গি দেখার জন্য যথেষ্ট নয়। ওর চুলের বেণি খুলে গেছে; দু-চার গোছা চুল দোলনা বিছানার বুনন ভেদ করে ছড়িয়ে গেছে। ও বলে, ওর কোনো গোত্র নেই; ও নাকি ইউরোপের শাসনাধীন। তারপর বলে, দ্বিতীয়বার থেকে নাকি আর রামের দরকার হয়নি। ও আমাকে বলে, আমার বয়স এখন চৌদ্দ। সুতরাং আমাকে সাবধানে চলতে হবে। ও যেমন বলে, আমি সেভাবেই চলি।

ও আমাকে বলে, শোন, আমি যখন তোর বয়সী ছিলাম, তখন আমার একমাত্র ক্ষুধা ছিল শরীর। পুরুষ মানুষের দুই ধরনের ক্ষুধা থাকে। যে লালন-পালন করে, সে ভোগও করে। আমাকে বল তো, এখানে ওর কাজ যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন কী হবে? আমার মনে হয়, ও বলতে চাইছে, ও কি তোকে ওর সঙ্গে নিয়ে যাবে?

আমি এটা নিয়ে ভাবি না। তখন ভাবিনি, এখনো না। আমি জানি, তুমি আমাকে চুরি করে নিয়ে যেতে পারবে না, বিয়ে দিতেও পারবে না। কোনোটাই আইন মানবে না। আমি শুধু জানি, তুমি গেলে আমিও যাব; মিস্ট্রেস আমাকে তোমার কাছে পাঠালে সোজা চলে যাব। কোনো কাজে বাইরে আসা মানে পালিয়ে যাওয়া নয়।

এই সব ভাবছি বলেই হাঁটতে পারছি, নইলে ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়তে হতো। ঘুমিয়েও পড়তাম মাটিতে। প্রচণ্ড ক্লান্তি লাগছে। পানির পিপাসাও লাগছে খুব।

আমি একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি—এখানে গাছগুলোর মাঝে অনেকগুলো গরু ঘাস খাচ্ছে। এখানে গাছপালার মধ্যে গরু আছে, মানে আশপাশে কোথাও খামার কিংবা গ্রাম আছে। মিস্ট্রেস কিংবা স্যার কেউই এভাবে তাঁদের বাড়ির গরুগুলোকে এত দূরে ছেড়ে দেবেন না। তাঁদের গরুর ঘাসের এলাকার চারপাশে বেড়া দিয়েছেন, যাতে গরুর গোবর দিয়ে সার বানাতে পারেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ঝগড়া-ফ্যাসাদও এড়াতে চান তাঁরা। মিস্ট্রেস বলেন, স্যারও বলেন, ঘাস একসময় ফুরিয়ে যাবে। তখন তাঁকে অন্য কোনো কাজও খুঁজতে হবে। কারণ এখানে শুধু খামারের কাজে পোষাবে না। শিকারি বন্য প্রাণী না হলেও কালো মাছি খামারি কাজকর্মের সব স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারে। কৃষিখামার এখানে টিকবে কি টিকবে না সেটা নির্ভর করে পতঙ্গের ইচ্ছার ওপর আর আবহাওয়ার খেয়ালের ওপর।

পায়ে চলা এক পথ দেখতে পেয়ে সেটা ধরেই এগিয়ে যেতে থাকি। কারখানার একটা চাকা ছোট স্রোতস্বিনীর ওপর ঝুলে আছে; সেটা পার হয়ে সামনে একটা সরু সেতু দেখতে পাই। চাকার ক্যাঁচক্যাঁচ আর পানির বয়ে যাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই এখানে। আশপাশে দু-চারটি মুরগি ঝিমাতে দেখি; কুকুর মনে হয় নিষিদ্ধ এখানে। স্রোতস্বিনীর ধার বেয়ে নেমে গিয়ে বিড়ালের মতো জিহ্বা দিয়ে পানি খাই। মোমের মতো স্বাদ এখানকার পানির। প্রতি চুমুকে পানির সঙ্গে খড়ের টুকরা ঢুকে যেতে চায় গলায়। আমি থু থু করে ফেলে দিই টুকরাগুলো। তারপর আবার পায়ে চলা ওই পথে এগোই। আমার একটা আশ্রয়ের দরকার। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে। দুটি কুটির দেখতে পাচ্ছি। দুটিরই জানালা আছে। কিন্তু কোনোটার ভেতরেই আলো দেখা যাচ্ছে না। ছোটখাটো গোলাবাড়ির মতো কিছু বৈশিষ্ট্য আছে এগুলোর। সে রকম গোলাবাড়িতে শুধু দরজা দিয়ে দিনের আলো ঢুকতে পারে। কিন্তু দরজাগুলোও তো বন্ধ। আশপাশে কোথাও থেকে রান্নার ধোঁয়ার গন্ধও আসছে না। প্রথমে মনে হয়, সবাই কোথাও পালিয়ে গেছে। তারপর গ্রামের ওই পারে পাহাড়ের ওপর একটা গির্জার চূড়া দেখতে পাই। আমি নিশ্চিত, সবাই সন্ধ্যার প্রার্থনায় গেছে। মনে মনে ঠিক করি, সবচেয়ে বড় বাড়ির দরজায় টোকা দেব; ভেতরে নিশ্চয়ই চাকরজাতীয় কেউ আছে। বাড়িটার দিকে যেতে যেতে পেছনের দিকে তাকিয়ে দেখি, আরো দূরে একটা বাড়িতে আলো জ্বলছে। গ্রামের মধ্যে একটিমাত্র আলো-জ্বলা বাড়ি এটা। সুতরাং এই বাড়ির দিকেই যাই। হাঁটার সময় পায়ের নিচে পাথরের কারণে সমস্যা হয়; জুতার তলায় শক্ত করে লাগানো গালার ওপর জোরে জোরে পাথরের ঘষা লাগছে। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। খুব নরম বৃষ্টি। সাইকামোরের ঝোপঝাড় পার হয়ে আসছে বৃষ্টি; মিষ্টি গন্ধ থাকার কথা বৃষ্টিতে। কিন্তু না, তেমন তো নেই; বরং পোড়া পোড়া গন্ধ লাগছে। হাঁস-মুরগি পোড়ানোর সময় ত্বকের ওপরকার মোটা মোটা লোমপোড়া গন্ধ যেমন, সে রকম পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।

আমি দরজায় টোকা দেওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একজন মহিলা দরজা খুলে দেন। মহিলা মিস্ট্রেস কিংবা লিনার চেয়েও লম্বা। তাঁর চোখ সবুজ। তাঁর শরীরের বাকিটা হলো একটা বাদামি ফ্রক আর একটা সাদা ক্যাপ। ক্যাপটার প্রান্তে দেখা যাচ্ছে লাল চুল। মহিলার মনে সন্দেহ। হাত, হাতের তালু সামনের দিকে এমনভাবে এগিয়ে ধরা, যেন আমি জোর করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, আমাকে কে পাঠিয়েছে। আমি বলি, প্লিজ! শোনেন। আমি একা। আমাকে কেউ পাঠায়নি। একটু থাকার জায়গা খুঁজতে এসেছি। তিনি আমার পেছনের দিকে, ডানে, বাঁয়ে তাকান। জিজ্ঞেস করেন, আমাকে দেখে রাখার মতো কোনো সঙ্গী নেই? আমি বলি, না, ম্যাডাম। চোখ সরু করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন, আমি আসলেই এই জগতের কেউ, নাকি অন্য কোনো জগৎ থেকে এসেছি। তাঁর মুখটা খুব শক্ত দেখাচ্ছে। আমি বলি, ম্যাডাম, আমি এই জগতেরই মানুষ। অন্য কোনো জগতের কথা আমি জানি না। তারপর জিজ্ঞেস করেন, আমি খ্রিস্টান, নাকি কাফের। আমি বলি, আমি কখনোই কাফের নই। আমি নিজের সম্পর্কে জোর দিয়েই বলতে পারি, অবশ্য আমার বাবা কাফের ছিল কি না জানি না।

মহিলা আমাকে তাঁর নাম বলেন—উইডো ইলিং, তবে আমার নাম জিজ্ঞেস করেন না। তিনি বলেন, কিছু মনে কোরো না; এখানে বিপদ আছে খানিক। আমি জিজ্ঞেস করি, কী বিপদ? তিনি বলেন, অশুভ। তবে তুমি কিছু মনে কোরো না।

আমি ধীরে ধীরে খাওয়ার চেষ্টা করি, পারি না। চমৎকার উষ্ণ যবের জাউয়ের মধ্যে রুটি ডুবিয়ে খাওয়ার সময় মাথা তুলে তাকাই না পর্যন্ত। ইলিং হাতায় করে আমার বাটিতে আরো দেওয়ার সময় শুধু ধন্যবাদ কথাটা বলতে পারি। তিনি আমার পাতে একপাশে এক মুঠো কিশমিশও রেখে দেন। রুমটার আকার খুব ছোট নয়। রুমের মধ্যে ফায়ারপ্লেস, টেবিল, টুল, ঘুমানোর দুটি জায়গা আছে। একটা বাক্স-বিছানা, আরেকটা খড়ের গদির বিছানা। অন্যদিকে যাওয়ার দুটি দরজা বন্ধ। পেছনের দিকে জিনিসপত্র রাখার মতো ছোট একটা এলাকা, অনেকটা কোটরের মতো। ওখানে জগ, বাটি ইত্যাদি রাখা আছে। আমার ক্ষুধা মোটামুটি শান্ত হয়ে আসার পর একপাশে তাকিয়ে দেখি, বাক্স-বিছানায় খড়ের মধ্যে শুয়ে আছে একটা মেয়ে। তার মাথার নিচে একটা চাদর ভাঁজ করে রাখা হয়েছে। তার একটা চোখ এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতে পারে; আরেকটা একেবারে স্থির। স্থির চোখটা অনেকটা মাদি নেকড়ের চোখের মতো। দুটিই কয়লার মতো কালো, তার মায়ের চোখের মতো নয়। মনে হয়, তার সঙ্গে কথা বলা শুরু করা আমার ঠিক হবে না। আমি নীরবে খেতে থাকি। অপেক্ষায় থাকি, মেয়েটার মা অথবা সে নিজে কিছু বলুক। মেয়েটার পায়ের দিকে একটা ঝুড়ি। ঝুড়িতে শোয়ানো আছে একটা শিশু। প্রচণ্ড দুর্বল শিশুটা মাথা তুলতে কিংবা কোনো শব্দ করতে পারছে না। শেষ কিশমিশটা পর্যন্ত খাওয়া শেষ হয়ে এলে ইলিং জিজ্ঞেস করেন, আমার এই একাকী যাত্রার কারণ কী। আমি বলি, আমার মিস্ট্রেস আমাকে একটা কাজে পাঠিয়েছেন। তিনি ঠোঁট নিচের দিকে নামিয়ে বলেন, এই এলাকায় কোনো মেয়েমানুষকে এভাবে একা একা ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকির কাজ। আমি বলি, আমার মিস্ট্রেস খুব অসুস্থ, মরণাপন্ন। আমার এই কাজটা তাঁকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। আমার কথা শুনে তিনি ঠোঁট উল্টে ফায়ারপ্লেসের দিকে তাকিয়ে থাকেন। এরপর বলেন, মনে হয়, প্রথম মৃত্যু থেকে নয়, দ্বিতীয় মৃত্যু থেকে।

আমি তাঁর কথা বুঝতে পারি না। আমি তো জানি, মৃত্যু একবারই হয়, দুবার নয়। মৃত্যুর পরে অনেক জীবন থাকে। দিনের বেলার প্যাঁচার কথা মনে আছে? আমরা ঠিকই জানি, দিনের বেলার প্যাঁচা কারা। তুমি জানো, ধূসর রঙেরটা তোমার বাবা। মনে হয়, আমি জানি অন্যগুলো কারা হতে পারে।

খড়ের বিছানায় শুয়ে থাকা মেয়েটা কনুইয়ের ওপর ভর করে মাথা তোলে। বলে, আমরা এখানে এসেছি ওই রকম মরা মরতে। তার কণ্ঠ পুরুষ মানুষের কণ্ঠের মতো ভরাট। অবশ্য তার চেহারা দেখে মনে হয়, সে আমার সমবয়সী। মেয়েটার কথায় ইলিং কিছু বলেন না। আমিও তাঁর চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে চাই না। কোনো রকম পিটুনিতে কাজ হবে না। আমার পায়ের মাংস একেবারে শেষ হয়ে গেছে। তারপর উঠে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সে টেবিলের কাছে আসে; টেবিলে বাতি জ্বলছে। কোমর পর্যন্ত পা উঁচু করে স্কার্ট তুলে দেখায়। আমি দেখি, তার কাটা জায়গা থেকে জমাট রক্ত নিচের দিকে ঝুলে আছে। তার ফ্যাকাসে ত্বকের ওপর আলো পড়ে মনে হচ্ছে, তার কাটা জায়গাটা প্রাণবন্ত অলংকারের রূপ নিয়েছে।

তাকে দেখিয়ে বিধবা বলেন, আমার মেয়ে জেন। চাবুকের আঘাত ওর জীবন বাঁচাতে পারে।

বিধবা ইলিং বলেন, দেরি হয়ে গেছে। সকালের আগে আর ওরা আসবে না। তিনি শাটার বন্ধ করেন, বাতি নিভিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে খড়ের বিছানায় চলে আসেন। জেনও তার খড়ের গদিতে ফিরে আসে। ইলিং ফিসফিস করে প্রার্থনা করেন। এই ঘরের অন্ধকার গরুর গোয়ালের চেয়ে এবং বনের চেয়েও বেশি ঘন। কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে একটু চাদের আলোও আসছে না। আমি অসুস্থ শিশুটা আর ফায়ারপ্লেসের কাছে শুই। মা-মেয়ের কথার টুকরো টুকরো অংশ আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ নীরবতা থাকে। তারপর আবার তাদের কথা চলে। কে কোন কথাটা বলছে আমি বুঝতে পারি। শুধু কথা কোন দিক থেকে আসছে সেটা নয়, কথার ধরন থেকেও বুঝতে পারি। ইলিংয়ের কথা বলা তাঁর মেয়ের থেকে আলাদা, কিছুটা গানের মতো করে। জেন বলে, তাহলে আমি কী করে প্রমাণ করব আমি অশুভ পিশাচ নই? তার মা বলেন, চুপ থাক, ওরাই সিদ্ধান্ত নেবে। নীরবতা। নীরবতা চলতে থাকে। তারপর আবার থেকে থেকে তারা কথা বলে, তারা আসলে আমাদের ঘাসের জমিটাই কেড়ে নিতে চায়, মা। তাহলে আমাকে কেন নয়? তারপর তোমাকে ধরতে পারে। কম করে হলেও দুজন বলেছে, তারা নাকি ব্ল্যাকম্যানকে আসতে দেখেছে। আর সে...। ইলিং থেমে যান। তারপর অনেকক্ষণ আর কোনো কথা হয় না। কিছুক্ষণ পরে আবার বলেন, সকাল আসছে; আমরা তখন জানতে পারব। জেন বলে, তারা আমাকে বাঁচতে দেবে। তারা দুজন দুজনের সঙ্গে দ্রুত কথা বলে, তাদের জানাটা তাদের কাছে। কিন্তু সত্যটা তো আমি জানি। সত্যটা ঈশ্বর জানেন। তাহলে মরণশীল মানুষ কেন আমার বিচার করবে? তুমি স্পেনের মানুষের মতো কথা বলো। শোনো, প্লিজ! শোনো। স্থির থাকো তুমি। নইলে ঈশ্বর তোমার কথা শুনতে পাবেন। তিনি আমাকে ছেড়ে যাবেন না। আমিও তাঁকে ত্যাগ করব না। তার পরও তোমরা আমার শরীর থেকে রক্ত ঝরালে। আর কতবার তোমাদের শুনতে হবে, পিশাচের গা থেকে রক্ত বের হয় না? তুমি তো আমাকে এসব কথা কখনো বলোনি। এগুলো জানা দরকার। আমার মা যদি না মরে থাকে, তাহলে সেও আমাকে এগুলো শেখাতে পারে।

আমার বিশ্বাস, শুধু আমিই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম থেকে জাগার সঙ্গে সঙ্গে আমার লজ্জা লাগে। কারণ বাইরে বাড়ির পশুগুলো ডাকাডাকি শুরু করেছে। তার মায়ের সেবা করার জন্য যখন ইলিং শিশুটাকে কোলে তুলে বাইরে নিয়ে যান, সে খুব ক্ষীণ স্বরে ব্যা ব্যা শব্দে কান্না করতে থাকে। ফিরে আসার সময় তিনি দুটির শাটার খুলে দেন, দরজাটাও খুলে রাখেন। দুটি রাজহাঁস হেলেদুলে ভেতরে আসে। পেছনে পেছনে খুব শক্ত পায়ে আসে একটা মুরগি। ছোটখাটো এটা-ওটা খাওয়ার লোভে জানালার ভেতর উড়ে এসে ঢোকে আরেকটা মুরগি। শণের তৈরি পর্দার পেছনের কমোড ব্যবহারের জন্য আমি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানাই। ওখান থেকে ফিরে এসে দেখি, জেন দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে আছে। তার মা জেনের ক্ষত জায়গাটা ঠিক করে দিচ্ছেন।

ঘন দুধের তৈরি ক্ল্যাবার আর রুটির নাশতার টেবিলে বিধবা এবং তাঁর মেয়ে জেন দুই হাত একসঙ্গে জড়ো করে মাথা নিচু করে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করে। আমিও তাদের মতো করার চেষ্টা করি। সকালে আর রাতে করার জন্য রেভারেন্ড ফাদার যে প্রার্থনা শিখিয়ে দিয়েছিলেন এবং আমার মা আমাকে নিয়ে বারবার করত যে প্রার্থনা, সেটাই মনে মনে করার চেষ্টা করি, পিটার নেস্টার...। শেষে আমার হাত তুলে কপালে ছোঁয়ানোর চেষ্টা করতেই জেনের নজরে পড়ে যাই। সে ঠোঁট ওল্টায়। মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝায়—না, হচ্ছে না। সুতরাং আমি ভান করি, আমি ক্যাপ ঠিক করছিলাম। বিধবা ইলিং ক্ল্যাবারের ওপর আচার দেন চামচে করে। আমরা দুজন খেতে থাকি। কিছুক্ষণ পর জেন আর খেতে চায় না। সুতরাং বাকি খাবার আমরা দুজন খেতে থাকি। কিছুক্ষণ পর ইলিং ফায়ারপ্লেসের কাছে গিয়ে একটা কেটলি আগুনের ওপর ঝুলিয়ে দেন। পাশের একটা ছোট জায়গায় একটা বেঞ্চের ওপর বসানো আছে একটা পানির বেসিন। টেবিল থেকে থালাবাসন, চামচ-বাটি আমি বেসিনের কাছে নিয়ে যাই। ফায়ারপ্লেসের ওপর ঝোলানো কেটলির পানি ফুটতে শুরু করেছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি, পানির বাষ্প সামনের পাথরের ওপর বিভিন্ন আকার তৈরি করছে। একটা আকার দেখতে অবিকল একটা কুকুরের মুখের মতো।

আমরা সবাই বাইরের পথে মানুষের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাই। আমি এখনো বেসিনের কাছে ব্যস্ত আছি। কারা ভেতরে ঢুকছে দেখি না, তবে তাদের কথাবার্তা শুনতে পাই। জেনের মা আগন্তুকদের বসতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তারা বসে না। একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা যায়—এবারই প্রাথমিক পর্যায়ে হলেও সাক্ষী কিন্তু কয়েকজন। তার কথার মাঝখানেই ইলিং শুরু করেন, তাঁর মেয়ের চোখ টেরা। ঈশ্বর এভাবেই তৈরি করেছেন। তার চোখের বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, দ্যাখেন, দ্যাখেন ওর পায়ের ক্ষতটা। ঈশ্বরের সৃষ্ট জীবের শরীর থেকে রক্ত বের হয়। আমাদের শরীর থেকে রক্ত বের হয়; পিশাচের শরীর থেকে তো রক্ত বের হয় না।

আমি রুমের ভেতর এগিয়ে যাই। একজন পুরুষ, তিনজন মহিলা আর একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটাকে দেখে আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। আমার মা যখন আমাকে দিয়ে দিয়েছিল, তখন আমার বয়স এ রকমই ছিল। আর্তনাদ করে কাঁদতে কাঁদতে সে যখন একজন মহিলার স্কার্টের আড়ালে লুকিয়ে ছিল, তখন দেখতে কত সুন্দর ছিল সে। এরপর আগন্তুকরা সবাই আমার দিকে তাকায়। মহিলারা বিস্ময়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে। পুরুষ লোকটার হাতের লাঠিটা মেঝেতে পড়ে ঝনাত্ঝনাৎ শব্দ তোলে। শব্দ শুনে একটা মুরগি কককক করে চিৎকার করে পাখা ঝাপটায়। লাঠিটা তুলে আমার দিকে ইঙ্গিত করে জিজ্ঞেস করে, এ কে? মহিলাদের একজন চোখ ঢেকে বলে ওঠে, ঈশ্বর আমাদের রক্ষা করো! ছোট মেয়েটা আর্তনাদ করে ওঠে এবং সামনে-পেছনে লাফাতে থাকে। বিধবা ইলিং দুই হাত ঝাঁকিয়ে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে বলেন, সে আমাদের মেহমান। রাতে আশ্রয়ের জন্য এসেছিল। আমরা তাকে আশ্রয় দিয়েছি। আশ্রয় না দিয়ে, খেতে না দিয়ে ফিরিয়ে দিই কী করে? পুরুষটা জিজ্ঞেস করে, কোন রাতে? ইলিং বলেন, এই তো গত রাতে। একজন মহিলা বলে, জীবনে আমি কোনো দিন এত কালো মানুষ দেখিনি। আরেকজন বলে, আমি দেখেছি। এই মেয়েটাও অন্যদের মতোই কালো। সে আফ্রিকার। আফ্রিকার এবং আরো কিছু ব্যাপার-বিষয় আছে নিশ্চয়ই তার। প্রথম মহিলা বলে, এই যে, এই শিশুটার দিকে তাকাও। তার পাশেই কাঁপতে থাকা বিলাপ করতে থাকা বাচ্চাটাকে দেখায় সে। ওর কান্না শোনো, ওর কান্না শোনো। আরেকজন বলে, তাহলে তো সত্যিই। ব্ল্যাকম্যান আমাদের মধ্যেই আছে। আর এটাই তার গোলাম। ছোট মেয়েটাকে কিছুতেই শান্ত করা যায় না। যে মহিলার স্কার্ট ধরে আছে মেয়েটা, সে তাকে বাইরে নিয়ে যায়। বাইরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে শান্ত হয়ে যায়। এদের কাণ্ডকারখানার কিছু বুঝতে পারছি না। তবে বুঝতে পারছি, আমি বিপদে পড়ে গেছি। কেটলির পানি থেকে ওঠা বাষ্পের মধ্যে দেখা কুকুরের মুখ আমাকে এ রকম ইঙ্গিত দিয়েছে। আমার একমাত্র রক্ষাকবচ হলো মিস্ট্রেস। আমি চিৎকার করে বলি, দাঁড়ান। আমি চিৎকার করে বলি, প্লিজ, স্যার! আমার মনে হয়, আমি কথা বলতে পারি দেখে তারা বিস্মিত হয়ে গেছে। এরপর আমি কিছুটা শান্ত কণ্ঠে বলি, আমার কাছে চিঠি আছে, দেখাচ্ছি। চিঠি দেখেই বুঝবেন, আমি কারো গোলাম নই। আমি শুধু আমার মিস্ট্রেসের গোলাম। যত দ্রুত পারি আমি বুট খুলে মোজার ভাঁজ নিচের দিকে নামিয়ে আনি। মহিলারা আরো বড় করে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। পুরুষটা অন্যদিকে মুখ ফেরায়। তারপর আস্তে আস্তে ফিরে তাকায় আমার দিকে। আমি মিস্ট্রেসের চিঠিটা বের করে এনে এগিয়ে ধরি। কিন্তু কেউ ছুঁয়ে দেখতেও রাজি নয়। পুরুষটা আমাকে চিঠিটা টেবিলে রাখতে বলে। তবে চিঠির গালা খুলতে ভয় পায় সে। সে ইলিংকে খুলতে বলে। ইলিং আঙুলের চাপে মোম সরিয়ে খুলে ফেলেন। খোলার পর কাগজটা ছড়িয়ে ধরে। পুরু হওয়ার কারণে কাগজটা সোজা থাকতে চায় না। জেনও তার বিছানা থেকে চিঠির দিকে তাকায়। সবাই কাগজটা উল্টেপাল্টে দেখে। তার মানে বোঝা যায়, পুরুষ লোকটা ছাড়া আর কেউ পড়তে পারে না। হাতের লাঠিটা দিয়ে চিঠিটা উল্টে ঠিক করে দিয়ে কাগজের মাথাটা এমনভাবে ধরে যেন চিঠিটা উড়ে যেতে পারে, কিংবা আগুন না হয়েই ছাই হয়ে উড়ে যেতে পারে তার চোখের সামনেই। অনেকটা নিচু হয়ে চিঠিটা খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে সে। তারপর তুলে নিয়ে জোরে পড়া শুরু করে দেয়—

যে মেয়েটার হাতে চিঠি দেওয়া হলো, এই চিঠির স্বাক্ষরকারী মিল্টনের মিস্ট্রেস রেবেকা ভার্ক দায়িত্ব নিয়ে তার সম্পর্কে সত্যতা জানাচ্ছে। মেয়েটার মালিক আমি। তার শনাক্তকারী চিহ্ন হলো তার বাঁ হাতের তালুতে পোড়া দাগ। আশা করি, তার নিরাপদ গমনের শিষ্টাচারটুকু দেখাতে দ্বিধা করবেন না। তার দায়িত্ব্ব পালনের সময় তাকে আটকে রাখবেন না। এই জগতে আমাদের জীবন, আমার জীবন পুরোপুরি নির্ভর করছে তার দ্রুত প্রত্যাবর্তনের ওপর।

স্বাক্ষর

মিস্ট্রেস রেবেকা ভার্ক, মিল্টন

১৮ মে ১৬৯০

 

শুধু জেনের কাছ থেকে হালকা একটু শব্দ ছাড়া আর কারো কাছ থেকে কোনো শব্দ আসে না। সব নীরব। লোকটা আমার দিকে তাকায়, আবার চিঠিটার দিকে। আমার দিকে আবার ফিরে তাকায়, চিঠিটার দিকেও আবার। আবারও আমার দিকে তাকায়, আবারও চিঠির দিকে। জেনের মা বলেন, শোনেন। লোকটা তাঁর কথায় পাত্তা দেয় না। সে দুজন মহিলার দিকে ফিরে ফিসফিস করে কী যেন বলে। তারা আমাকে একটা ভাঁড়ারঘরের দরজার দিকে যেতে ইঙ্গিত করে। ওখানে তারা আমাকে গাড়ি, বাক্সপেটরা, চরকার চাকা—এসবের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার কাপড় খুলে ফেলতে বলে। আমাকে না ছুঁয়ে শুধু মুখে আদেশ দিয়ে যায় কী কী করতে হবে। আমার দাঁত দেখাতে বলে, জিহ্বা দেখাতে বলে। আমার হাতের তালুতে মোমের আগুনে যেখানে পুড়ে গিয়েছিল, যেখানে ঠাণ্ডা করার জন্য তুমি চুমু খেয়েছিল, ওই জায়গাটা দেখে কেমন ঠোঁট ওল্টায় তারা। আমার বাহুর নিচে তাকায়, আমার ঊরুসন্ধির দিকে তাকায়। আরো ভালো পরীক্ষা করে দেখার জন্য তারা আমার চারপাশে ঘোরে। আমার পা দেখার জন্য নিচু হয়ে আসে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার অধীনে উদোম শরীরে আমি শুধু তাদের চোখের ভেতর কী আছে দেখার চেষ্টা করি। ঘৃণা, ভয়, অবজ্ঞা—কিছুই নেই তাদের দৃষ্টিতে। আমাকে, আমার শরীরকে তারা দেখছে দূরত্বের চাহনিতে। কিছুই যেন চিনতে পারছে না। চাড়ি থেকে পানি খাওয়ার সময় শুয়োর আমার দিকে মুখ তুলে তাকালে সে চাহনিতেও খানিকটা চেনাজানা ভাব থাকে। তুমি যে বলো, ভালুকের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে নেই, নইলে তারা তোমাকে ভালোবাসার জন্য, তোমার সঙ্গে খেলা করার জন্য এগিয়ে আসবে। মহিলারা আমাকে এড়ানোর জন্য আমার চোখ থেকে অন্যদিকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নেয়। শেষে তারা আমাকে পোশাক পরে, দরজা বন্ধ করে রুম থেকে বের হতে বলে। আমি কাপড় পরে নিই। কলহের শব্দ শুনতে পাই। ছোট মেয়েটা ফিরে এসেছে। এখন আর কাঁদছে না। তবে বলছে, আমার ভয় করে, আমার ভয় করে। একজন মহিলা বলে, শয়তানও তো চিঠি লিখতে পারে। আরেকজন বলে, লুসিফার কিন্তু অনেক কূটকৌশল জানে, প্রতারণা জানে। বিধবা বলেন, কিন্তু একটা মেয়ের জীবন তো বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পুরুষ লোকটা ধমক দিয়ে বলে, তাহলে প্রভু শাস্তি দেবেন কাকে? সে আরো বলে, আমরা এই ঘটনা অন্যদেরও বলব।

ফিরে এসে বলেন, তারা নিজেদের মধ্যে আরো আলোচনা করতে সময় চায়। চিঠিটার জন্য তিনি আশায় বুক বাঁধেন। জেন হাসতে থাকে। ইলিং প্রার্থনায় বসেন। অনেকক্ষণ ধরে প্রার্থনা করেন। শেষে উঠে বলেন, আমার একজনের সঙ্গে দেখা করা দরকার। তার সাক্ষ্য, তার সাহায্য দরকার আমার।

জেন জিজ্ঞেস করে, কে সে?

তার মা উত্তর দেন, শেরিফ।

জেন মায়ের পেছন থেকে মুখ বাঁকা করার ভঙ্গি করে। তারপর ওখান থেকে চলে যায়।

জেনের পায়ের পরিচর্যা করা দেখে আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে থাকি। বেলা অনেক হয়ে গেছে। কিন্তু জেনের মা ফিরছেন না। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি। ধীরে ধীরে সূর্যটা ঢলে পড়ে। জেন হাঁসের ডিম সিদ্ধ করে। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে ডিম একটা চার কোনাকার কাপড়ের টুকরোয় বাঁধে। একটা কম্বল ভাঁজ করে আমার হাতে দেয়। এক আঙুলের ইশারায় আমাকে তাকে অনুসরণ করতে বলে। আমরা বাড়ি থেকে বের হই। পেছনের দিকে দ্রুত ছুটতে থাকি। আমাদের পায়ের আওয়াজে আশপাশ থেকে  হাঁস-মুরগিরা ডাকতে ডাকতে উড়ে পালায়। আমরা ঘাসের জমিন পার হয়ে দৌড়াতে থাকি। একটা ছাগী আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাঁঠাটা তাকায় না। একটা অশুভ লক্ষণ। বেড়ার পাতের ফাঁকে গা ঘষা দিয়ে আমরা বনবাদাড়ের ভেতর ঢুকে পড়ি। এবার আমরা হাঁটি, আস্তে আস্তে। জেন আগে আগে চলে। সবটুকু আলো গাছের ছায়ার ভেতর ঢেলে দিয়ে সূর্যটা শূন্য হয়ে যায়। পাখিরা, ছোট ছোট জীবজন্তুরা তাদের খাবার খায়, একে অন্যকে ডাকে।

আমরা একটা ছোট নদীর কাছে আসি। নদীর বেশির ভাগই শুকনো, বাকিটা কাদাময়। জেন আমাকে হাতে দিয়ে দেয় সিদ্ধ ডিমের পোঁটলাটা। জেন আমার সামনে যাওয়ার পথ দেখায়, আমাকে পোস্টরোড পর্যন্ত নিয়ে যাবে—পায়ে চলা যে পথটা, সেটা কত দূরে, কোথায়। যে গ্রামে তুমি আছ বলে আমি আশা করে আছি, সেখানে নিয়ে যাবে পোস্টরোডটাই। আমি ধন্যবাদ বলে চুমু দেওয়ার জন্য জেনের হাতটা তুলি। জেন বলে, না। ধন্যবাদ তোমারই পাওনা। তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি আমি। তোমাকে দেখে ওরা আমার কথা ভুলে গেছে। জেন আমার কপালে চুমু দেয়। নদীর নিচের দিকে আমার নেমে যাওয়া দেখে। আমি ফিরে তাকাই জেনের দিকে। আমি জেনকে জিজ্ঞেস করি, তুমি কি সত্যিই পিশাচ? তার দুষ্ট চোখটা স্থির হয়ে থাকে। জেন হাসে। বলে, হ্যাঁ। অবশ্যই আমি পিশাচ। এবার যাও।

আমি একা একাই হেঁটে যাই। আমার সঙ্গী শুধু কয়েকটা চোখ। ওই চোখগুলো আমাকে মানুষ হিসেবে চিনতে পারে না, ওই চোখগুলো আমাকে পরীক্ষা করে দেখে, আমার লেজ আছে নাকি, অতিরিক্ত একটা স্তন আছে নাকি; আমার দুই পায়ের ফাঁকে লোকটার চাবুক। তাদের বিস্ময়ভরা চোখ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, আমার নাভি ঠিক জায়গায় আছে কি না, আমার পা দুটি কুকুরের সামনের পায়ের মতো বাঁকা হয় কি না। তারা দেখতে চায়, আমার জিহ্বা সাপের জিহ্বার মতো ফাড়া নাকি, আমার দাঁতগুলো তাদের চিবিয়ে খাওয়ার জন্য চোখা নাকি। দেখতে চায়, আমি অন্ধকার থেকে হঠাৎ বের হয়ে এসে কামড় দিই কি না। ভেতরে ভেতরে আমি সংকুচিত হয়ে যাই। নদীর তলার দিক থেকে ওপরের দিকে উঠতে উঠতে মনে হয়, পারের গাছগুলো আমাকে দেখছে। আমি আর আগের মতো নেই। আমার প্রতি পদক্ষেপে কী যেন হারিয়ে ফেলছি। ভেতরের স্রোতটা আমি টের পাই। মূল্যবান কী যেন আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি। চিঠিটার কারণে আমি মিস্ট্রেসের অধীনে আছি, আইনের অধীনে আছি। চিঠিটা না থাকলে আমি দলছাড়া এক বাছুর, খোলসছাড়া এক কচ্ছপ, কোনো রকম জাদুকরী শক্তিরহিত এক গোলাম, যার সঙ্গে আছে জন্মমুহূর্তের অন্ধকার। বাইরের অন্ধকারটা এ রকম; কিন্তু ভেতরের অন্ধকার ছোট, পালকওয়ালা, দাঁতাল। আমার মা কি এটাকেই চেনে? সে কেন আমাকে ছাড়া জীবন বেছে নেয়? এ মিনহা মাই এবং আমি শুধু বাইরের অন্ধকার ভাগ করে নিই না, এটা কি আমার একার মৃত্যু? থাবাওয়ালা পালকওয়ালা জিনিসটা কি আমার ভেতরের জীবন? তুমি আমাকে বলে দিয়ো। তোমারও বাইরের অন্ধকার আছে। তোমাকে যখন দেখি, তোমাতে যখন হারাই, আমি বুঝতে পারি, আমি বেঁচে আছি। আগে সব সময় ভয় পেতাম। এখন আগের মতো নয়, হঠাৎ হঠাৎ পাই। এখন আর আমার কোনো কিছুতে ভয় নেই। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে, পেছনে ফেলে যাচ্ছে অন্ধকার। আমি নিজেও তো অন্ধকার। আমরা অন্ধকার। অন্ধকারই আমার বাড়ি।

টুইন যত দিন তার আসল নাম ব্যবহার করেছে, তত দিন অন্যরা তাকে সরো বলে ডাকলে কিছু মনে করেনি। গুলিয়ে ফেলা খুব সহজ। মাঝে মাঝে গৃহিণী, মাঝে মাঝে করাতকলের মালিক, মাঝে মাঝে তাদের ছেলেদের দরকার হতো তাকে। অন্য সময় কথা বলতে, হাঁটতে কিংবা খেলতে টুইন সঙ্গ চাইত। দুটি নাম থাকা সুবিধাজনক। কারণ টুইনকে অন্য কেউ দেখতে পেত না। সুতরাং জোরে জোরে ডলে কাপড় পরিষ্কার করার সময় কিংবা রাজহাঁস চরানোর সময় ক্যাপ্টেনের ব্যবহার করা নামটা শুনতে পেলে সে বুঝতে পারত, টুইনকে চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু কেউ সরো নামটা উচ্চারণ করলে সে বুঝতে পারত, কাকে চাওয়া হচ্ছে, কী চাওয়া হচ্ছে। অবশ্য তার কাছে প্রিয় ব্যাপারটা ছিল, যখন টুইন কারখানার দরজা থেকে ডাক দিত কিংবা তার কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলে উঠত, তখন সে হাতের কাজ ফেলে নিজের আরেক সত্তার পিছে ছুটত।

লুট হয়ে যাওয়া জাহাজে সার্জনের দোল-বিছানার নিচে তাদের প্রথম দেখা। অন্য সবাই কোথাও চলে গেছে অথবা ডুবে মরেছে। তারও এ রকম কিছু একটা হতে পারত, যদি সে আফিম খেয়ে জাহাজের অস্ত্রোপচারের ঘরে ঘুমে ডুবে না থাকত। তাকে ওখানে নেওয়া হয়েছিল তার ঘাড়ের একটা ফোড়া কাটার জন্য। সার্জন সাহেব বলেছিলেন, আফিমের মিশ্রণটা খেলে তার ব্যথা কমে যাবে। সুতরাং জাহাজ যখন ডুবে যায়, সে টের পায়নি। আর যদি জাহাজে কাজ করার কেউ এবং যাত্রীদের কেউ বেঁচেও থাকে এবং পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সে সম্পর্কেও তার বলার ক্ষমতা নেই। তার শুধু মনে আছে, দোল-বিছানা থেকে পড়ে গিয়ে জেগে উঠে দেখেছে সে একেবারেই একা। তার বাবা ক্যাপ্টেন কোথাও নেই।

সরো জেগে উঠে দেখল, তার গায়ে অন্য কোনো কাপড় নেই, গায়ের ওপর শুধু একটা কম্বল ছড়িয়ে দেওয়া আছে। কপালের ওপর ভেজা উষ্ণ এক টুকরো কাপড়। চারপাশ থেকে কারখানার কাঠের গন্ধ আসছে। সাদা চুলের এক মহিলা তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

মাথা ঝাঁকিয়ে মহিলা বললেন, কী দৃশ্য একটা! কী ভয়ানক দৃশ্য তুমি! তবু একটা মেয়ে হয়ে তুমি তো বেশ শক্ত আছ, মনে হচ্ছে। কম্বলটা তার থুতনি পর্যন্ত টেনে দিলেন মহিলা। মহিলা বললেন, আমরা তোমার কাপড়চোপড় দেখে তোমাকে একটা ছেলে মনে করেছিলাম। যা-ই হোক, বেঁচে তো আছ।

ভালো খবর বটে। কারণ সরো ভেবেছিল, টুইন তার খড়ের গদির কাছে আসার আগে সে হয়তো দুহাতে মুখ ধরে দাঁত কেলিয়ে হাসছিল। আরাম বোধ করে সরো আবার ঘুমিয়ে পড়ল। তবে এখন আরো আরামের ঘুম হচ্ছে। কারণ তার কোলের কাছে আছে টুইন।

পরদিন সকালে তার ঘুম ভাঙল করাতের গরগর শব্দে আর কাঠের ফালির কড়া গন্ধে। করাতির বউ একটা পুরুষ মানুষের শার্ট আর বালক বয়সী কারো পাজামা নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, এখনকার জন্য এগুলোতে কাজ হবে। পরে তোমার জন্য আরো মানানসই কিছু বানিয়ে দেব। এ রকম পোশাক গ্রামে কারো কাছ থেকে ধার করার মতো নেই। আর আপাতত কিছু সময়ের জন্য জুতা ছাড়াই থাকতে হবে।

আগের চেয়ে মনের ভেতরটা হালকা লাগে। চপলা সরো ছেলেদের শুকনো পোশাক পরে নিল। তারপর ছুটল খাবারের গন্ধ কোন দিক থেকে আসছে দেখতে। দারুণ নাশতা করার পর বিভিন্ন বিষয়ের নাম মনে করতে সচেতন হয়ে উঠল; কিন্তু বলতে পারল না। যখন তার নাম জিজ্ঞেস করা হলো, টুইন বলল, না। নাম বলা যাবে না। সুতরাং সরো কাঁধ ঝাঁকি দিয়েই কিছু না বলার কৌশলটা শিখে ফেলল। বেশ তো, আরো যা যা মনে আসছে না কিংবা বলতে চাইছে না, তেমন কিছু জিজ্ঞেস করলেই সে কাঁধ ঝাঁকি দিতে লাগল।

যেমন, কোথায় থাকো?

জাহাজে।

ঠিক আছে। কিন্তু সব সময় তো নয়, তাই না?

সব সময়।

তোমার পরিবারের লোকেরা কোথায়?

কাঁধ ঝাঁকি।

জাহাজে আর কারা ছিল?

শঙ্খচিল।

কারা, মেয়েমানুষ?

কাঁধ ঝাঁকি।

ক্যাপ্টেন কে ছিলেন?

কাঁধ ঝাঁকি।

ঠিক আছে, তুমি স্থলে এলে কী করে?

মৎসকন্যারা, মানে তিমিরা।

তখনই করাতির স্ত্রী তার নাম রাখলেন। পরের দিন তিনি সরোকে চটের কামিজ পরতে দিলেন; তার অবিশ্বাস্য এবং কিছুটা ভয়-জাগানিয়া চুল ঢাকার জন্য দিলেন একটা পরিষ্কার ক্যাপ। এগুলো দিয়ে রাজহাঁসগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে বললেন। তাদের সামনে শস্যদানা ছিটিয়ে দেওয়া, সবগুলোকে একসঙ্গে করে পানিতে নিয়ে যাওয়া এবং বেশিদূর যেন চলে না যায় সেদিকে নজর রাখার কাজ দিলেন। শক্ত মাটির ওপর খালি পায়ে তাল ঠিক রাখা সরোর জন্য কষ্টকর; পুকুরের ধারে প্রথম দিন এটা-ওটার সঙ্গে বারবার হোঁচট খেতে খেতে, বেভুল পা ফেলতে ফেলতে প্রাণ যায় অবস্থা তার। তার ওপর দুটি বাচ্চাকে একটা কুকুর আক্রমণ করলে সেও এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। এত সব ঝামেলা সামলে সবগুলোকে আবার জড়ো করতে করতে তার বেলা শেষ। আরো কয়েক দিন সে এই কাজ করল। তারপর করাতির গিন্নি হাত তুলে বোঝালেন, অনেক হয়েছে; তাকে সাধারণ ধোয়ামোছার কাজে লাগালেন। কোনোটাই অবশ্য সন্তোষজনক মনে হলো না।

করাতির গিন্নি তাকে বললেন, এটা হলো মাসিকের রক্ত। সব নারীকেই এই ঝামেলা সহ্য করতে হয়। সরো তার কথা বিশ্বাস করল, পরের মাস এবং তার পরের মাস পর্যন্ত। কিন্তু তার পরের মাসে আর রক্ত দেখা গেল না। টুইন আর সরো এ বিষয়ে কথা বলল—তক্তার গাদার পেছনে করাতির ছেলেদের সঙ্গে বারবার দেখা করতে যাওয়ার ফল নাকি এটা? গিন্নি যা বলছেন, সেটা মনে হয় ঠিক নয়। তিনি বলেছেন, স্বাভাবিক রক্তের উৎস ভেতরের দিকে; কিন্তু তার তো ব্যথা হচ্ছে দুই পায়ের সংযোগের বাইরের দিকে। করাতি যখন স্যারকে সরোকে নিয়ে যাওয়ার কথা বললেন, তখনো ব্যথাটা চলছেই। তিনি বললেন, তাঁর স্ত্রী নাকি আর রাখতে পারছেন না সরোকে।

স্যার জিজ্ঞেস করলেন, সরো কোথায়?

তখনই সরোকে কারখানায় নিয়ে আসা হলো।

বয়স কত?

করাতি প্রশ্নবোধক মাথা ঝাঁকালে সরো কথা বলে উঠল, আমার মনে হয়, এখন আমার এগারো।

স্যার ঘোঁত করে শব্দ করলেন।

করাতি বললেন, ওর নাম নিয়ে ভাববেন না। আপনি যা খুশি একটা নাম দিয়ে নেবেন। আমার স্ত্রী ওকে সরো বলে ডাকে। কারণ ওকে তো ফেলে যাওয়া হয়েছে। দেখতেই পাচ্ছেন, ওর চেহারায় সংকর ভাব আছে। সে যা-ই হোক, ও কাজ করবে মুখ বুজে।

তার কথা বলার সময় সরো তাঁর মুখের এক পাশে হাসি দেখতে পেল।

সে স্যারের ঘোড়ার পিঠে তাঁর পেছনে বসে মাইলকে মাইল পথ পাড়ি দিল মাত্র এক জায়গায় থেমে। জীবনে এবারই প্রথম ঘোড়ার পিঠে দুই পা দুই দিকে ছড়িয়ে বসেছে বলে ব্যথায় চোখে জল এসে গেল সরোর। এপাশে-ওপাশে দোল খেতে খেতে, ওপরে-নিচে লাফাতে লাফাতে পেছন থেকে স্যারের কোটের সঙ্গে লেপ্টে থেকেও ভয় পায়, দুই হাত ওপরে তোলে। স্যার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরেন, সরোকে ধরে নিচে নামান। তিনি ঘোড়ার খুরের মতো দেখতে এক ধরনের ফুলের পাতা দিয়ে কোট পরিষ্কার করেন। তখন সরো বিশ্রাম নেয়। সরো স্যারের পানির পাত্রটা হাতে নিয়ে একবার মুখে দিতেই পেটের ভেতরে যা কিছু ছিল সবসহ বমি হয়ে বের হয়ে যায়।

স্যার শুধু বিড়বিড় করে বলেন, সরো, সত্যিই...।

স্যারের আবাদি জমির কাছে আসার পর সরো কৃতজ্ঞতা বোধ করতে থাকে। তিনি সরোকে ধরে নিচে নামিয়ে দেন; বাকি পথটুকু সে হেঁটে এগোয়। কয়েক ফার্লং এগিয়ে গিয়েই তিনি পেছনে ফিরে দেখেন, নিশ্চিত হতে চান সরো ঠিকমতো আসতে পারছে কি না, সরো পড়ে গেল কি না, আবার অসুস্থ বোধ করছে কি না।

স্যারের জমির কাছে আসতেই টুইন মুচকি হাসে আর হাততালি দেয়। সারাটা পথ স্যারের পেছনে বসে আসতে আসতে চারপাশে ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছে; বমি বমি ভাব আর ব্যথা না থাকলে তার সে ভয়টা যেন আরো বেশি হতো। মাইলের পর মাইল জাহাজের কালো কালো মাস্তুলের মতো মাথা উঁচু করে আছে হেমলকগাছ; গির্জার পাইনগাছ পেছনে ফেলে আসার সময় দেখেছে, ঘোড়ার লম্বা শরীরের ওপর, তাদের মাথার ওপর পাইনগাছের ঘন ছায়া পড়েছে। মিস্ট্রেস এবং লিনার মুখের গঠন করাতির বউয়ের মতো নয়; এদের নাম ছোট এবং সোজা। মিস্ট্রেসের ত্বকের রং ডিমের সাদা অংশের মতো; আর লিনার রং ডিমের খোসার মতো বাদামি। খাবার কিংবা বিশ্রাম—সব কিছুর আগে লিনা সরোর চুল ধুয়ে ফেলার কথা জোর দিয়ে বলল। সরোর ক্যাপের নিচে শুধু কচি ফেঁকড়া আর খড়কুটো নয়, উকুন আছে বলেও আশঙ্কা লিনার। লিনার ভয় পাওয়া দেখে বিস্মিত হলো সরো—ডাঁশ, মাছিসহ আরো কত রকমের পরজীবী মানুষের শরীরে থাকে; সেগুলোকে বিরক্তিকর মনে হতে পারে; সেগুলোকে বিপদ মনে করার কি আছে? কিন্তু লিনার চিন্তা ভিন্ন। সে সরোর চুল ধোয়ার পরে তার সারা শরীর দুবার ভালো করে ঘষে পরিষ্কার করে দিয়ে তারপর ঘরে ঢুকতে দিল। আবার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করতে করতে ডানে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে একটা ন্যাকড়ায় লবণ দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করতে বলল।

প্যাট্রিসিয়ানের হাত ধরে সবাইকে শুনিয়ে স্যার ঘোষণা দিলেন, রাতের বেলা এই মেয়েটাকে ঘরের মধ্যে রাখতে হবে। মিস্ট্রেস কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আমাকে বলা হয়েছে, সে নাকি বাইরে ঘুরে বেড়ায়।

প্রথম রাতের কঠিন ঠাণ্ডায় ফায়ারপ্লেসের কাছে একটা মাদুরের ওপর শুয়ে একবার ঘুমায়, একবার জাগে, একবার ঘুমায়, একবার জাগে—এভাবে রাত কাটাতে লাগল। ঢেউয়ের ওপর হাজার হাজার পুরুষের হেঁটে যাওয়া আর নির্বাক কণ্ঠের গানের বর্ণনা দিয়ে টুইন তাকে বারবার ঘুম পাড়িয়েও দিল। টুইন বর্ণনা দিয়ে চলল, কিভাবে তাদের দাঁত তাদের পায়ের তলার ফেনিল সমুদ্রতরঙ্গের চেয়েও বেশি চকচক করে; কিভাবে আকাশ কালো হয়ে সন্ধ্যা নামার পর চাঁদ উঠলে তাদের রাতের মতো কালো ত্বক রুপালি রং ধারণ করে; কিভাবে পাকা, দো-আঁশ মাটির গন্ধে নাবিকদের চোখ চকচক করে ওঠে আর সমুদ্রে বিচরণকারীদের চোখে জল আসে। টুইনের কণ্ঠের সান্ত্বনায় আর তার শরীরের নিচের অংশে লিনার ছড়িয়ে দেওয়া প্রাণিজ চর্বির কল্যাণে সরো মিষ্টি ঘুমে ডুবে যায়; কত মাস পরে এত আরামে ঘুম দিল সরো।

তবু প্রথম সকালে নাশতা মুখে দিয়েই ফেলে দিল সরো। মিস্ট্রেস তাকে ইয়ারো চা খেতে দিলেন। তারপর তাকে সবজির বাগানে কাজে লাগিয়ে দিলেন। মৌসুম শেষের শালগম মাটি থেকে টান দিয়ে তোলার সময় সে অনেক দূরে জমিতে স্যারের শিলা ভাঙার শব্দ শুনতে পায়। বাগানের কোনায় বসে একটা হলুদ আপেল খেতে খেতে প্যাট্রিসিয়ান সরোর কাজ করা দেখতে থাকে। সরো হাত ইশারা করে; প্যাট্রিসিয়ানও হাত নেড়ে ইশারায় সাড়া দেয়। লিনা এসে ছোঁ মেরে ছোট মেয়েটাকে ওখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। তখন থেকেই সরো না বুঝলেও টুইন বুঝে যায়, স্যার এবং মিস্ট্রেস যেগুলো দেখভাল করেন না, সেগুলো সবই দেখাশোনা করে, শাসন করে লিনা। লিনা নিজে উপস্থিত না থাকলেও তার চোখ সবখানে থাকে। ভোরে মোরগ ডাকার আগেই লিনা ঘুম থেকে উঠে পড়ে, অন্ধকার থাকতেই ঘরে ঢোকে, তার চামড়ার জুতার ডগা দিয়ে ঠেলা মারে ঘুমন্ত সরোকে, কয়লার আগুন উসকে দিতে দিতে আরো কিছুক্ষণ থাকে ঘরের ভেতরে। ঝুড়িগুলো পরীক্ষা করে দেখে, কলসি আর পাত্রগুলোর ঢাকনা ঠিক করে রাখে। সে ভাঁড়ারও পরীক্ষা করে মনে হয়। টুইন বলে, না। সে আসলে দেখতে চায়, তুই খাবার চুরি করেছিস কি না।

লিনা সরোর সঙ্গে খুব কম কথা বলে, এমনকি গুড মর্নিং কথাটাও বলে না। যখন কোনো অতি জরুরি কথা থাকে, তখন বলে। সুতরাং লিনাই সরোকে বলে, সে পোয়াতি হয়েছে। সরোর হাতের কাছ থেকে এক ঝুড়ি জই সরিয়ে রেখেছে লিনা। সরাসরি সরোর চোখের ভেতরে তাকিয়ে লিনা বলে, এই ছেমরি, তুই জানিস তোর পেটে বাচ্চা?

সরোর মুখটা নিচে নেমে আসে। তবে পরের মুহূর্তেই খুশিতে মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে—এত দিনে তার একজন আপনজন পেতে যাচ্ছে, তার নিজের মানুষ হবে, তার পেটের ভেতরেই বাড়ছে।

সে লিনাকে জিজ্ঞেস করে, কী করব আমি?

লিনা শুধু তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঝুড়িটা তার কাঁখে তুলে নিয়ে হাঁটা দেয়। মিস্ট্রেস সরোর বিষয়টা টের পেলেও তিনি হয়তো বলতেন না। কারণ তাঁর নিজের পেটেও বাচ্চা। সরোর বাচ্চা সময়ের আগেই জন্ম নেয়; লিনা বলে, এত আগে জন্মালে বাচ্চা বাঁচে না। মিস্ট্রেস একটা স্বাস্থ্যবান ছেলে জন্ম দেন। সবাই খুশিতে মেতে থাকে তাঁর ছেলেকে নিয়ে, তবে ছয় মাস মাত্র। বাড়ির পেছনের উঁচু জায়গাটায় ছেলটাকে তার মৃত ভাইয়ের পাশে দাফন করা হয়। তার জন্য সবাই প্রার্থনা করে। যদিও সরো বলে, তার বাচ্চাকে জন্মের সময় হাই তুলতে দেখেছে সে, তবু লিনা বাচ্চাটাকে একটা চটের ন্যাকড়ায় জড়িয়ে নিয়ে গিয়ে স্রোতস্বিনীর প্রশস্ত অংশে ভাসিয়ে দেয়, বিবরদের বাঁধ থেকে অনেক দূরে, নিচের দিকে। সরোর বাচ্চাটার কোনো নাম দেওয়া হয় না। সরো কান্নাকাটি করে, তবে টুইন তাকে কাঁদতে নিষেধ করে। সে বলে, আমি সব সময় তোর সঙ্গেই আছি। সেটা একটা সান্ত্বনা শুধু। তবে সরো কল্পনায় দেখতে পায়, লিনার হাতের তালুতে তার শিশুবাচ্চার নিঃশ্বাসে পানি ঢুকছে। এই চিত্র তার মন থেকে সহজে যায় না। কথা বলার কাউকে না পেয়ে সে টুইনের ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। টুইন সঙ্গে থাকে বলে সরোর আর কোনো বন্ধুর দরকার হয়নি, কারো সঙ্গে কথা বলারও দরকার হয়নি। যদিও তাকে ঘরের ভেতরে থাকতে দেওয়া হয়েছে, তবু শোনার মতো আরো গল্প থেকে যায়। দিনের বেলা বাইরে ঘোরার জন্য, বনের মধ্যে চুপ করে লুকিয়ে বসে থাকার জন্য তারা দুজন চুপি চুপি বের হয়ে পড়তে পারে। উপপুরোহিত তাকে চেরি ফল দিয়েছেন, আখরোট দিয়েছেন। একবার তিনি সরোকে একটা দোপাট্টা দিয়েছেন। সরো সেটায় পাথর বেঁধে স্রোতস্বিনীর জলে ছুড়ে ফেলেছে। কারণ সে জানত, এতে লিনার রাগ বাড়বে তার ওপর, মিস্ট্রেস সতর্ক হবেন। যদিও মিস্ট্রেসের আরেকটা ছেলেবাচ্চা মারা যায়, প্যাট্রিসিয়ানের স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কিছুদিনের মধ্যে লিনা বোঝার চেষ্টা করে, মিস্ট্রেসের ছেলেদের মৃত্যুর জন্য সরোর কোনো দোষ নেই। তবে একটা ঘোড়া লাথি দিয়ে প্যাট্রিসিয়ানের মাথার চাঁদি ফাটিয়ে দেয়। তখনই আবার লিনার ধারণা বদলে যায়।

তারপর আসে ফ্লোরেন্স।

তারপর আসে কামার। দুবার আসে সে।

কঠিন শীতের মৌসুমে আসে ফ্লোরেন্স। নতুন মেয়েটাকে দেখে সরো কৌতূহলী হয়, খুশি হয়। ছোট মেয়েটার একটা বেণি ছুঁয়ে দেখার জন্য মৃদু হেসে তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সরো। ঠিক তখনই একেবারে সরোর মুখের কাছে মুখ নিয়ে টুইন তাকে থামিয়ে দিয়ে চিৎকার করে বলে—না, না। ছুঁবি না। সরো টুইনের ঈর্ষা বুঝতে পারে। তার মুখটা সরিয়েও নেয়। কিন্তু একটু দেরিই হয়ে যায়। লিনা দেখে ফেলে। নিজের গা থেকে চাদর খুলে মেয়েটার গায়ে জড়িয়ে দিয়ে তাকে কোলে তুলে নিয়ে গোয়ালঘরে ঢুকে পড়ে। তখন থেকে মেয়েটা লিনার হয়ে যায়। তারা ঘুমায় একসঙ্গে, গোসল করে একসঙ্গে, খায় একসঙ্গে। লিনা মেয়েটার জন্য জামাকাপড় তৈরি করে দেয়, খরগোশের চামড়া দিয়ে ছোট ছোট জুতা তৈরি করে দেয়। সরো যখনই মেয়েটার ধারেকাছে এগিয়ে যায়, লিনা ধমক দিয়ে বলে—যা, ভাগ! কিংবা খুব জরুরি ভিত্তিতে তাড়াতাড়ি করতে হবে এমন কোনো কাজে পাঠিয়ে দেয়। সরোর প্রতি নিজের চোখে যে অবিশ্বাস চকচক করে, সেটা সবার চোখেই নিশ্চিতভাবে থাকে, সেটাই চায় লিনা। লিনা তার বাচ্চা প্রসবের সময় সহায়তা করেছে; কিন্তু সরো কিছুতেই ভুলতে পারে না, তার বাচ্চা পৃথিবীর সব জলাশয়ে প্রতিদিন-প্রতিরাতে নিঃশ্বাসে বাতাস নিতে পারছে না, পানি নিচ্ছে। সরোকে প্যাট্রিসিয়ানের কাছ থেকে দূরে রাখা হতো, ফ্লোরেন্সের কাছ থেকেও দূরে রাখা হয়। তার পরও সবার প্রতি তার আচার-আচরণ আগের মতোই থাকে—টুইন ছাড়া সবার সঙ্গেই পরিষ্কার প্রশান্ত উদাসীন সে।

অনেক বছর পর যখন কামার আসে, তাদের বাড়ির আবহাওয়া বদলে যায়। টুইন প্রথমে খেয়াল করে, সে বলে লিনা ভীত হয়ে পড়েছে। লিনা মিস্ট্রেসকে সতর্ক করার চেষ্টাও করে। কিন্তু তার সতর্কতায় কোনো কাজ হয় না। মিস্ট্রেস তার কথায় কান দেন না। স্যার তখন বাড়িতে, বাইরের কোনো ভ্রমণে যাচ্ছেন না। সব সময় নতুন বাড়ির কাজে ব্যস্ত। মালপত্র আনা তদারকি করছেন, এক কোনা থেকে আরেক কোনা পর্যন্ত দড়ি টাঙিয়ে মাপজোখ করছেন, গেটের নকশা নিয়ে কামারের সঙ্গে নিবিড় আলোচনা করছেন। লিনা ভয়ে মরে যাচ্ছে; মিস্ট্রেস ফুরফুরে মনে গুনগুন করে সুর আওড়াচ্ছেন। স্যারও খুব উত্ফুল্ল মনে আছেন। অবশ্য মন সবচেয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে ফ্লোরেন্সের।

না সরো, না টুইন সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কামারকে কোন দৃষ্টিতে দেখা যায়। দেখে তো মনে হয়, অন্যদের ওপর তার কী প্রতিক্রিয়া পড়েছে, সে বিষয়ে সে একেবারেই উদাসীন। লিনা যে তার মধ্যে বিপদ দেখতে পেয়েছে, সে কি আসলেই তেমন একটা বিপদ? নাকি লিনা ঈর্ষায় জ্বলছে? সে কি স্যারের বাড়ি তৈরির নিখুঁত সঙ্গী, নাকি ফ্লোরেন্সের ওপর একটা অভিশাপ সে? তার কারণে তো ফ্লোরেন্সের খোলামেলা আচরণের মধ্যে চোর চোর ভাব এসে গেছে। তাদের তখনো মনস্থির করা বাকি আছে, যখন একদিন সরো স্রোতস্বিনী থেকে বালতিতে করে পানি আনার সময় নতুন বাড়ি তৈরির সরঞ্জামের কাছে এসে হঠাৎ পড়ে যায়, সারা গা জ্বলতে থাকে, কাঁপতে থাকে।  সরো ব্যথায় কয়েকবার খিঁচুনি দিতে থাকে। মহিলারা বাতাসে বিব্রত বোধ করে দাঁত-ঠোঁট আটকে বাতাস টানে। স্যার ঠোঁট ওল্টান, তখন কামার একটা চাকু গরম করে সরোর একটা ফুলে ওঠা জায়গা কেটে ফেলে। সবাই নীরবে দেখে, কামার কাটা জায়গা থেকে আঙুলে একফোঁটা রক্ত নিয়ে সরোর দুই ঠোঁটের মাঝখানে ছেড়ে দেয়। সবাই সিদ্ধান্ত নেয়, তাকে আর ঘরের মধ্যে নেওয়া যাবে না। সুতরাং সরো গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে দোল-বিছানায় শুয়ে থাকে সারা দিন, সারা রাত। খাবার কিংবা পানি সব নিষিদ্ধ। মহিলারা পালাক্রমে তাকে বাতাস করতে লাগল। তাদের অবিরাম বাতাস নিয়ে আসে পালতোলার বাতাস, ক্যাপ্টেন, তার হাতে ধরা হালের হাতল। ক্যাপ্টেনকে দেখার আগেই সরো ক্যাপ্টেনের হাসি শুনতে পায়। তার মনে হতে থাকে, আর্তনাদগুলো শঙ্খচিলদের। নিজের চেহারায়, নিজের রঙে ফিরে আসার পর নিজের চোখে দেখতে পায়, বায়বীয় মেঘগুলো বড়জোর সুতার মতো হয়ে দূরে কোথাও ভেসে যাচ্ছে।

অবিকল তার মুখের মতো মুখ মেয়েটার। সে বলল, আমি এখানে। আমি সব সময় এখানে।

টুইন কাছে থাকলে তার ভয় কমে যায়। দুজন মিলে কাত হয়ে থাকা নীরব জাহাজটা খুঁজতে থাকে। ধীরে, খুব ধীরে। এখানে উঁকি দিয়ে, ওখানে কান পেতে খুঁজতে থাকে। কিন্তু শুধু একটা ছোট বোনেট ছাড়া আর কিছু পায় না। শঙ্খচিলগুলো একটা ঘোড়ার বাচ্চার দেহাবশেষে ঠোকর দিতে থাকে।

চলমান পাখার নিচেও ঘেমে ওঠে সরোর শরীর। তখন মনে পড়ে যায় জাহাজে দিনের পর দিন ঠাণ্ডায় জমে যাওয়ার স্মৃতি। বরফের মতো ঠাণ্ডা বাতাস ছাড়া আর কিছুর নড়াচড়া নেই। জাহাজের পেছনের দিকে সমুদ্র, সামনে শিলাময় তট, নিচে পাহাড়ের মতো পাথরের চূড়া আর ঝাড়গুল্ম। তীরের উদ্দেশে জাহাজ ত্যাগ করার সময় সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। টুইনই শুধু সম্ভব করেছে জাহাজ থেকে তার নেমে আসা। মাটিতে নেমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এখানকার নীচ, কঠিন, ঘন আর ঘৃণ্য অবস্থা দেখে সে প্রচণ্ড হতাশ হয়, আতঙ্কিত হয়। তখনই শুধু সে বুঝতে পারে, ক্যাপ্টেন কেন তাকে শুধু জাহাজেই রাখতে চেয়েছিলেন। ক্যাপ্টেন তাকে শুধু মেয়ে হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের একজন নাবিক হিসেবে বড় করছিলেন। গায়ে-গতরে ময়লা, পরনে পাজামা, একটা গুণ নিয়েই সে বুনো এবং বিনয়ীও—পালের কাপড় জোড়াতালি দেওয়া, সেলাই করা।

সরোকে জোর করে শুকনো খাবার খাওয়ানো হবে, নাকি তরল, এ নিয়ে কামারের সঙ্গে বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন মিস্ট্রেস এবং লিনা। কামার তার নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। সে জোর দিয়ে বলে, ওকে কোনো খাবারই দেওয়া যাবে না। তপ্ত ছুরি আর রক্ত ওষুধের প্রসঙ্গ তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেই তারা আপাতত ক্ষান্ত দেয়। তৃতীয় দিনের শেষে সরোর জ্বর কমে আসে, সে পানি চায়। একটা শুকনো লাউয়ের খোলে করে সরো যখন পানি খায়, কামার তার মাথাটা ধরে রাখে। সরো দ্রুতই বলে, তার ক্ষুধা পেয়েছে। কামারের যত্নে আর ফ্লোরেন্সের সেবায় সরোর ফোড়াগুলো আস্তে আস্তে শুকিয়ে আসে। ফোসকার মতো দাগগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়,  শরীরের শক্তি ফিরে আসে। এবার তাদের বিচারবোধ পরিষ্কার হয়ে আসে—কামার একজন ত্রাতা। তবু লিনা সত্যি সত্যি বিশ্রী রকমের ব্যবহার করে। ফ্লোরেন্সকে রোগীর কাছ থেকে এবং চিকিৎসকের কাছ থেকেও দূরে সরিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। লিনা গজগজ করে বলতে থাকে, সে ছোটবেলায় এই রোগ দেখেছে। এ রোগ ছত্রাকের মতো তাদের সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু সে খোদ ফ্লোরেন্সের কাছেই হেরে যায়। সরো সেরে ওঠার সময় আসতে আসতেই একটা ভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয় ফ্লোরেন্স, আরো বেশি দীর্ঘস্থায়ী, মারাত্মক এই রোগ।

একদিন বনের ধারে তৃণভূমিতে শুয়ে টুইনের মুখে তার একটা প্রিয় গল্প শুনছিল সরো—একদল মৎস্যকন্যার গল্প; তাদের চোখের জায়গায় এক জোড়া করে মুক্তা, সবুজ কালো সামুদ্রিক শৈবাল তাদের চুলের গোছা; একজন আরেকজনের পিছে পিছে ছুটে বেড়ায়; একদল তিমির পিঠে তারা ঘুরে বেড়ায়। ঠিক ওই মুহূর্তে সরোর চোখে পড়ে একটা দৃশ্য। কামার আর ফ্লোরেন্স সাপের মতো জোড়া লেগে গেছে। টুইন গল্পের একটা জায়গায় এসেছে, যেখানে তিমিদের দলের পেছনে তৈরি হওয়া জলের রেখা দেখে উত্তেজিত হয়ে সামুদ্রিক পাখিরা উল্কার বেগে যোগ দিচ্ছে মৎসকন্যাদের ছুটে চলার আনন্দ অভিযানে। তখনই সরো একটা আঙুল তার ঠোঁটে ঠেকিয়ে আরেকটা দিয়ে সামনের দিকে দেখায়। গল্প বলা বাদ দিয়ে টুইনও তাকায়। কামার আর ফ্লোরেন্স তো দোল খাচ্ছে; ডাক আসা মাদি পশুর মতো পুরুষের ওজন আর চাপের নিচে সমর্পণের ভঙ্গিতে চুপ করে নেই ফ্লোরেন্স। তার সঙ্গী ধীরগতিতে আরামে কাজ সেরেছে; আরেকবার গির্জায় হেলান দিয়ে বসার মতো বেঞ্চে, সেবার খুব তাড়াতাড়ি শেষ করতে হয়েছিল। আর এখানকার নারী নিজেকে ছড়িয়ে দিয়ে পায়ের গোড়ালি দিয়ে লাথি মারছে, ডানে বাঁয়ে, এদিক-ওদিক মাথা ঘুরিয়ে চাবুকের মতো বাড়ি মারছে। এ তো নাচ হচ্ছে! ফ্লোরেন্স একবার চিত হচ্ছে, আবার কামারের ওপর উপুড় হচ্ছে, গড়াগড়ি দিচ্ছে, শরীর মোচড়াচ্ছে। কামার ফ্লোরেন্সকে ওপরে তুলে গাছের সঙ্গে চেপে ধরেছে। ফ্লোরেন্সের মাথা বাঁকা হয়ে নেমে এসেছে কামারের কাঁধের ওপর। নাচ চলছে, নাচ। একবার অনুভূমিক, আরেকবার খাড়া।

দৃশ্যের শেষ পর্যন্ত দেখল সরো। বুড়ো মানুষরা যেমন হোঁচট খায়, সে রকম ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ায় তারা কাপড় পরে নেয়। সব শেষে কামার ফ্লোরেন্সের চুল ধরে টান দিয়ে আরো কাছে নিয়ে এসে তার মুখটা ফ্লোরেন্সের মুখে রেখে চুমু খায়। তারপর দুজন দুদিকে চলে যায়। সরোর বিস্ময় লাগে। তার বেলায় তো কেউই তার মুখে চুমু খায়নি। কখনোই না।

স্যারের মৃত্যুর পরপরই মিস্ট্রেস অসুখে পড়েন। খুব স্বাভাবিক, কামারকে ডেকে আনতে হবে। কামার আসে, একাই আসে। ঘোড়া থেকে নামার আগে সে নতুন বিশাল বাড়িটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। ঘোড়ার লাগামটা সরোর হাতে দেওয়ার আগে সে সরোর পেটের দিকে তাকায়, তারপর চোখের দিকে। লিনার দিকে ফিরে কামার বলে, আমাকে উনার কাছে নিয়ে চলেন।

ভারী পেট নিয়ে যতটা তাড়াতাড়ি পারা যায়, সরো ঘোড়াটা বেঁধে রেখেই ফিরতে থাকে। তারপর তিনজনে একসঙ্গেই বাড়ির ভেতর ঢুকতে থাকে। কামার খানিক থামে, গন্ধ টের পেয়ে জ্বাল দেওয়া মাগওয়ার্ট এবং লিনার অন্যান্য গাঁজনের পাতিলের ভেতর তাকিয়ে দেখে।

উনি কত দিন বিছানায় আছেন?

পাঁচ দিন। লিনা উত্তর দেয়।

ঘোঁত করে একটা শব্দ করে সে মিস্ট্রেসের শোয়ার ঘরে ঢোকে। রোগীর বিছানার পাশে বসে সে; লিনা ও সরো দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে।

মিস্ট্রেস ফিসফিস করে বলেন, আসার জন্য ধন্যবাদ। তুমি কি আমাকেও আমার রক্ত পান করাবে। মনে হচ্ছে, একফোঁটা রক্তও বিশুদ্ধ নেই আমার শরীরে, সবটুকুই আক্রান্ত হয়ে গেছে।

কামার হেসে মিস্ট্রেসের মুখে হালকা টোকা দেয়।

আমি কি মরণাপন্ন হয়ে পড়েছি?

কামার মাথা ঝাঁকায়, না। আপনি না। আপনার অসুখই মরে গেছে।

মিস্ট্রেস চোখ বন্ধ করেন। যখন চোখ খোলেন, দেখা যায় তাঁর চোখ ভেজা। হাতের ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতের পেছন পাশ দিয়ে অশ্রু মোছেন। তিনি কামারকে বারবার ধন্যবাদ দেন। লিনাকে তাঁর কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে বলেন। কামার রুমের বাইরে আসার সময় লিনা তার পিছে পিছে আসে। সরোও আসে, তবে তার আগে সে শেষবারের মতো পেছনে ফিরে তাকায়। সরো তাকিয়ে থেকে আরো দেখতে পায়, কামড় দিয়ে হাতের ব্যান্ডেজ ঢিলা করে দুই হাতের তালু এক করেছেন। এই রুমে সাধারণত সরোর প্রবেশ নিষিদ্ধ, চারপাশে নজর ফেলে বালিশের ভেজা ভেজা গায়ে মিস্ট্রেসের চুলের থোকা লেগে আছে দেখতে পায়। তাঁর ফ্যাকাসে পায়ের তলাটা কেমন অসহায়ের মতো লাগছে, তাঁর রাতপোশাকের প্রান্ত থেকে বেখাপ্পা অবস্থায় বের হয়ে আছে পা। হাঁটুর ওপর মাথা রেখে বসেছেন। মনে হচ্ছে, জগতে তাঁর কেউ নেই। সরো বুঝতে পারে, চাকরবাকর যতই থাকুক, তাতে কী আসে-যায়। যেভাবেই হোক, তাদের যত্ন আর নিষ্ঠা মিস্ট্রেসকে কিছু দিতে পারছে না। সুতরাং মিস্ট্রেসের কেউ নেই, একেবারেই কেউ নেই। শুধু একজন আছেন, যাঁর কাছে তিনি ফিসফিস করে বলেন, ধন্যবাদ, প্রভু। আমাকে বাঁচানোর জন্য যে করুণা দেখিয়েছ, তার জন্য ধন্যবাদ।

সরো পা টিপে টিপে উঠানে চলে আসে। পাইনের গন্ধভরা বাতাস অসুখের রুমের গন্ধ দূর করে দিচ্ছে। কোথায় যেন কাঠঠোকরা কাঠ ঠোকরাচ্ছে। মুলার ক্ষেতে খরগোশরা আসছে দেখে সরোর ইচ্ছা করে, খরগোশগুলোকে ধাওয়া করে। কিন্তু নিজের ভারী শরীরের কারণে সে ক্লান্ত; শেষে বাদ দেয়। তার চেয়ে বরং নতুন বাড়িটার ছায়ায় ঘাসের ওপর বসে পড়ে, স্ফীত পেটের ভেতর নড়াচড়া করা বাচ্চাটাকে হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। মাথার ওপরে পাশে রান্নাঘরের জানালায় ছুরি, চামচ, কাপ-প্লেটের শব্দ শুনতে পায়; খাবার খেতে বসেছে। সরো জানে, লিনাও ওখানে আছে। কিন্তু চেয়ারের শব্দে কামারের উঠে পড়ার আগ পর্যন্ত লিনা কিছুই বলছে না, জানে সে। তারপর যে প্রশ্নগুলো মিস্ট্রেস জিজ্ঞেস করেননি, সেগুলো জিজ্ঞেস করে লিনা।

ও কোথায় আছে? ও ভালো আছে তো?

অবশ্যই।

ও কখন ফিরে আসবে? কে ওকে নিয়ে আসবে?

কামার কথা বলে না। দীর্ঘ নীরবতা, লিনার পক্ষে সহ্য করা কঠিন।

চার দিন হয়ে গেছে। তুমি ওকে জোর করে আটকে রাখতে পারো না।

জোর করে আটকে রাখব কেন?

তাহলে? বলো আমাকে!

সুবিধামতো সময়ে চলে আসবে।

আবার নীরবতা।

রাতে এখানে থাকবে তুমি?

খানিকটা থাকতে পারি। খেতে দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

এ কথা বলার পর সে উঠে পড়ে। সরোকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় তার হাসির জবাবে একটু হাসে। তারপর নতুন বাড়ির দিকে উঠে যায়, লোহার কাজকর্ম পরখ করে দেখে, এখানে একটু বাঁকা জায়গায়, ওখানে একটু জোড়ায়, তারপর ছোট ছোট পরতের ওপরকার গিলটি করা পরীক্ষা করে দেখে। তারপর সে স্যারের কবরের সামনে হ্যাট খুলে নীরবে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ পর ফাঁকা নতুন বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

সূর্যোদয় পর্যন্ত আর অপেক্ষা করে না সে। অস্বস্তিতে থাকা নির্ঘুম সরো দরজায় দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখে; ঘোড়ায় চড়ে ভোরের পূর্বলগ্নের অন্ধকারে বাচ্চা ঘোড়ার মতো শান্ত, হৃষ্টচিত্তে চলে যাচ্ছে সে। তাহলে পরিষ্কার বোঝা গেল, লিনা হতাশায়ই ডুবে রইল। তার মনের ভেতর যে প্রশ্ন শিকড় গেড়েছে, তার ছায়া দেখা যাচ্ছে তার চোখে। ফ্লোরেন্সের তাহলে কী হচ্ছে? ও কি ফিরে আসছে? কামারের কথা কি সত্যি? তার কোমল মন আর অসুখ সারানোর ক্ষমতা সত্ত্বেও তার সম্পর্কে সরো কি তাহলে ভুল ধারণায় ছিল এত দিন? তার মানে লিনার কথাই কি শুরু থেকে এ পর্যন্ত ঠিক? আসন্ন মাতৃত্বের গভীর অন্তর্দৃষ্টির আলোয় আলোকিত সরোর সন্দেহ যায় না। তার নিজের রক্ত আর সিরকা দিয়ে লোকটা তার জীবন বাঁচিয়েছে, মিস্ট্রেসের অবস্থাও সঠিকভাবে ধরতে পেরেছে এবং ক্ষতচিহ্ন কমানোর জন্য কী কী লাগবে বাতলে দিয়েছে। তার নিজের এবং ফ্লোরেন্সের মাঝে যে-ই আসুক না কেন, লিনা তাকে সতর্ক দৃষ্টিতে দেখেছে। মিস্ট্রেসের প্রয়োজনীয় জিনিস জোগাড় করা আর ফ্লোরেন্সের পথের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া লিনার আর কিছুতে ব্যয় করার মতো সময় নেই, ইচ্ছাও নেই। সরো নিজে নিচু হতে পারে না, ভারী কিছু তুলতে পারে না, এক শ গজ হেঁটে গেলেও হাঁপাতে হয়। সে জন্য সরো মনে করে, ক্ষেতের যে অবস্থা চলছে, তার জন্য সে নিজেও দায়ী। মাত্র দশ দিনের অবহেলা আর পতনের চিহ্ন সবখানে। সুতরাং মে মাসের এক ঠাণ্ডা দিনের নীরব বিকেলে কর্তনরেখার মতো গুটিবসন্তের দাগে ভরা শরীরের সরোর পানিভাঙা শুরু হয়। তার ভেতরে আটকে থাকা আতঙ্কের জন্তুগুলো যেন এইমাত্র ছাড়া পেয়ে গেছে। মিস্ট্রেসের অবস্থা ভালো নেই, তিনি সাহায্য করতে পারছেন না। লিনার হাই তোলার দৃশ্য মনে পড়ে যাওয়ায় সরো বুঝেছে, তার ওপরও ভরসা করা যাচ্ছে না। গ্রামেও তার ঢোকা নিষেধ। তাহলে সামনে আর কোনো পথ নেই। কী করা যায়, কোথায় যাওয়া যায় জিজ্ঞেস করার জন্য টুইনের কথা মনে করে। টুইনও অনুপস্থিত। অজানা কোনো কারণে নীরব হয়ে আছে কিংবা হিংস্র হয়ে উঠেছে। উইল ও স্কালি তাদের মাছ ধরার ভেলায় আছে মনে করে সরো প্রথম ব্যথা ওঠার মুহূর্তেই একটা ছুরি আর একটা কম্বল নিয়ে নদীর ধারের দিকে রওনা দেয়। মাঝেমধ্যে ব্যথায় চিৎকার করে, মাঝেমধ্যে খানিকটা ঘুমিয়ে নিয়ে নদীর ধারেই অপেক্ষা করে সে। তারপর শরীর ছিঁড়ে ফেলার মতো, নিঃশ্বাস আটকে দেওয়ার মতো পরবর্তী বর্বর আক্রমণটা আসে। তারপর মনে হয়, মিনিট, ঘণ্টা, এমনকি দিনও মনে হয় পার হয়ে যায়; সরোর কিছু পরিষ্কার মনে থাকে না। তার চিৎকার শুনে পুরুষ দুজন ভেলা বেয়ে নদীর কিনারে আসে। যেকোনো প্রাণীর বাচ্চা প্রসবের ঘটনা তারা যত দ্রুত বুঝতে পারে, তত দ্রুতই সরোর বিষয়টাও বুঝে ফেলে। প্রথমে একটু সময় লাগে তাদের। মনে করে, বাচ্চাটা আগে বাঁচাতে হবে। তারপর কাজে লেগে যায়। পানির কিনারে হাঁটু মুড়ে বসে সরোর দুই পায়ের মাঝে আটকে থাকা ছোট্ট শরীরটা ধরে একবার টান দেয়, আবার একটু থামে; সরোও শক্তি প্রয়োগ করে। সরোর রক্ত ঝরে পানিতে মিশে গেলে ছোট ছোট কড মাছও আকৃষ্ট হয়। মেয়েশিশুটা কেঁদে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে স্কালি নাড়ি কেটে সরোর হাতে দেয়। সরো গা মুছে দেয়, মুখ, কান এবং তখনো বন্ধ থাকা চোখে আদর করে দিতে থাকে। পুরুষ দুজন তাদের সাফল্যে নিজেদের অভিনন্দন জানায়। সরো এবং তার শিশুকে বাড়িতে পৌঁছে দিতে চায়। সরো বারবার ধন্যবাদ দেয় তাদের। তবে আপাতত যেতে চায় না; খানিক বিশ্রাম নিতে চায়। তারপর একাই যাবে। উইলার্ড স্কালির মাথায় চাটি মেরে হেসে ওঠে, আমরা ভালো ধাত্রী হয়ে গেছি, বলতেই পারি।

তাতে কোনো সন্দেহ নেই, বলে স্কালি। তারা পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে ভেলার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।

শরীর থেকে জন্ম-পরবর্তী বর্জ্য বের হয়ে যাওয়ার পর সরো শিশুকন্যাকে কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে কয়েক ঘণ্টা কাটায় ঝিমুনি আর জাগরণের মাঝে। সূর্যাস্তের আগে কান্না শুনে জেগে উঠে দুটি স্তনই চেপে চেপে দুধ বের করার চেষ্টা করে। তবে শুধু একটা থেকে বের হয়। সারা জীবনই সে পুরুষদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়ে এসেছে—ক্যাপ্টেন, করাতির দুই ছেলে, স্যার আর এবার স্কালি ও উইল। তবু তার মনে হয়, এবার সে নিজে থেকেও কিছু একটা করেছে, বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। মেয়ের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কারণে টুইনের অনুপস্থিতি তার মনে পড়ে না। তখনই মনে পড়ে, তার মেয়ের কী নাম রাখতে হবে, নিজেরও নাম রাখতে হবে।

দুটি দিন চলে গেল। লিনা একেবারে শান্ত থাকার মধ্য দিয়ে সরোর প্রতি তার ঘৃণা এবং ফ্লোরেন্সের জন্য দুশ্চিন্তা চাপা দিয়ে রাখল। সরোর শিশুকন্যা সম্পর্কে মিস্ট্রেস কিছু বললেন না। তবে বাইবেল আনতে বললেন এবং নতুন বাড়িতে কেউ যেন না ঢোকে, বললেন। মাতৃত্বের নতুন মর্যাদার বৈধতা পেয়ে সরো সাহস নিয়ে মিস্ট্রেসের সামনে কথা বলতে পারে, আপনি তো মরতে বসেছিলেন; ভাগ্যিস আপনাকে সহায়তা করতে কামার এসেছিল। মিস্ট্রেস সরোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মিস্ট্রেস বললেন, ও কথা বোলো না। শুধু ঈশ্বর মানুষকে রোগমুক্ত করতে পারেন। কোনো মানুষের সে ক্ষমতা নেই।

তাদের সবার মধ্যে সব সময়ই কোনো না কোনো ঝামেলা ছিল। এখন আর সেগুলো নেই। প্রত্যেকেই নিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নিজ নিজ জগতে নিজস্ব চিন্তার জাল বুনছে; সেখানে অন্য কারো আনাগোনা নেই। ফ্লোরেন্সের অনুপস্থিতিতে তারা যেন একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

টুইন আর কোথাও নেই। তার কথা একজনই মাত্র জানত। সেও আর টুইনের অনুপস্থিতি টের পাচ্ছে না। সরোর নিজেরও ঘুরে বেড়ানো শেষ হয়ে গেছে। এখন সে নিয়মমতো কাজকর্ম করে। তার মেয়ের প্রয়োজনমতো কাজ করে। অন্যের নালিশের প্রতি কান নেই তার। তার মেয়ের চোখের ভেতর তাকিয়ে শীতের সমুদ্রের ধূসর চিকচিকে দ্যুতি দেখেছে। দেখেছে, যখন একটা জাহাজ তীর ঘেঁষে ভেসে চলেছে। সরো মেয়েকে বলে, আমি তোমার মা। আমার নাম কমপ্লিট।

 

দীর্ঘ সময় ধরে এত দূর আসা অনেক কঠিন কাজ। তবে তোমার উঠান, তোমার কামারশালা, তোমার ছোট কুটির চোখের সামনে দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমার কষ্ট দূর হয়ে গেছে। তোমার আনন্দদায়ক হাসি, তোমার বাহুতে ধরা অবস্থায় তোমার কাঁধের মিষ্টি স্বাদ আর এই জীবনে কখনো পাব না, ভয় ছিল। ভয়টা নেই আর। আগুন আর ছাইয়ের গন্ধ আমাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দেয়। তবে তোমার চোখের ঝিলিক দেখে আমার হৃদয় নাচতে শুরু করে। তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করো, কিভাবে এলাম, কতক্ষণ লাগল; আমার কাপড়ের অবস্থা দেখে, আমার সারা গায়ে আঁচড় দেখে হাসো। তুমি তোমার কাছে আমার আসার কারণ জিজ্ঞেস করায় আমি উত্তর দিই; কিন্তু উত্তর শুনে তাচ্ছিল্যে ঠোঁট ওল্টাও তুমি। আমরা কাজের কথায় আসি; তুমি যা বলো, আমি সম্মত হই। অন্য কোনো উপায় নেই। তুমি বলো, দেরি না করে মিস্ট্রেসের উদ্দেশে রওনা হতে চাইছ, তবে একা। আমাকে এখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে বলো। আমি তোমার সঙ্গে যেতে পারি না। কারণ তুমি একা গেলে তাড়াতাড়ি যেতে পারবে। আরেকটা কারণের কথাও তুমি বলো। যেদিকে তাকাও, আমিও সেদিকে তাকাই।

এ রকম ঘটনা আরো দুবার ঘটেছে। প্রথমবার আমার মায়ের পরনের কাপড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে তার হাত খুঁজছিলাম। কিন্তু সেই হাতটা দিয়ে তার ছোট ছেলেটাকে ধরে ছিল মা। দ্বিতীয়বার ছোট একটা মেয়ে তার মায়ের স্কার্টের আড়ালে লুকিয়ে আর্তনাদ করছিল, স্কার্ট শক্ত করে ধরে রেখেছিল। কিন্তু দুবারই বিপদ ছিল এবং আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমি একটা ছোট ছেলেকে দেখতে পাচ্ছি; তার হাতে শস্যের খোসা দিয়ে তৈরি খেলনা। তুমি ছেলেটার দিকে আঙুল এগিয়ে দিলে সে তোমার আঙুল ধরে। তুমি বলো, এই ছেলেটার জন্যই আমাকে নিতে পারছ না তোমার সঙ্গে। তুমি বলছ, ছেলেটার নাম মালায়েক। তাকে একা ফেলে রেখে যাওয়া যাবে না। তাকে কুড়িয়ে পেয়েছ। ছেলেটার বাবা ঘোড়ার লাগামের ওপর উবু হয়ে ছিল; ঘোড়াটা চলতে চলতে একসময় থেমে ঘাস খাওয়া শুরু করে। গ্রামের লোকজন এসে দেখে, লোকটা মারা গেছে। মৃত লোকটা কে, কেউ জানে না। তুমি ছেলেটাকে গ্রহণ করেছ। তুমি ছেলেটাকে নিজের করে নিতে চাইছ—এ কথা ভাবতেই আমার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।

ছেলেটা তোমার কাছে এগিয়ে আসছে দেখে আমার দুশ্চিন্তা হয়। তুমি আঙুল এগিয়ে দিচ্ছ, সে কী সুন্দর করে তোমার আঙুল ধরছে, যেন আমার ভেতরে তোমার ভবিষ্যৎ নয়, ছেলেটাই তোমার ভবিষ্যৎ। তুমি ছেলেটাকে উঠানে খেলতে যাওয়ার কথা বলায় তার চোখে যে আনন্দ দেখলাম, সেটা আমার পছন্দ হচ্ছে না। তবে তুমি আমার মুখ থেকে, হাত থেকে ভ্রমণের দাগ ধুয়ে দাও, আমাকে স্টু খেতে দাও। খরগোশের মাংসের টুকরোগুলো বেশ পুরু আর নরম। আমার ক্ষুধা প্রচণ্ড। আমি খুব বেশি খেতে পারি না। আমি এখানে থেকে যেতে চাই। মিস্ট্রেসের চিকিৎসা দিয়ে তুমি ফিরে আসবে। তিনি সেরে উঠুন আর মারা যান—একটা কিছু হবে। তবে আমি এখানে তোমার সঙ্গে থেকে যাব। তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না, কখনো না। আমাকে এখান থেকে বের করে দেওয়া যাবে না। আমি ছোট বলে আমার জুতা কেড়ে নেওয়া হবে। আমি দুর্বল বলে, আমি ভয়ে পড়ে যাই বলে আমাকে ঘিরে কেউ ছাগল-ভেড়ার মতো ব্যা ব্যা করে তাচ্ছিল্য করবে, তা হবে না। কেউ আমার পেছনে হাত দিয়ে দেখতে আসবে না। আমাকে দেখেই চিৎকার করে উঠবে না কেউ। আমি তো কখনোই তোমাকে আমার শরীর পাওয়া থেকে বঞ্চিত করতে পারি না।

চলে যাওয়ার সময় তুমি আমাকে কাছে টানো না, আমার মুখে চুমু খাও না, তবু আমি চুপচাপই থাকি। ঘোড়ায় উঠে আমাকে শিমগাছের চারায় পানি দেওয়ার কথা বলো, ডিমগুলো তুলে রাখতে বলো। ডিম তুলতে গিয়ে দেখি, মুরগিগুলো ডিম পাড়েনি। সুতরাং বুঝতে পারি, এ মিনহা মাই আসছে শিগগিরই। মালায়েক ছেলেটা আমার কাছেই আছে। দরজার পেছনে তুমি যেখানে ঘুমাও, সেখানে মালায়েকও ঘুমায়। তুমি খুব তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে, জেনে আমি চুপচাপ শান্ত থাকি। তার ছোট ছেলেটার হাত ধরে আছে সে। তার পকেটে আমার জুতা। অন্য সব সময়ের মতো এখনো আমাকে কী যেন বলতে চায়। আমি তাকে চলে যেতে বলি। সে চলে যাওয়ার পর হালকা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ শুনি। বুঝতে পারি বিছানায় মালায়েকের নড়াচড়ার শব্দ। বিস্ময়ভরা বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে; ঠাণ্ডা লেগেছে নিশ্চয়ই। আমি উঠে এসে জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? মালায়েক, কী হয়েছে? সে নীরবে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু তার চোখের ঘৃণা সরব মনে হয়। সে চায়, আমি চলে যাই। ভেতর থেকে আমি চুম্বকের মতো টান অনুভব করি। এখান থেকে আমাকে বের করে দেওয়া যাবে না।

আমি একটা স্বপ্ন দেখি—নরম ঘাস আর সাদা ক্লোভার ঘাসের মধ্য দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। একটা মিষ্টি গন্ধ পাই। ভালো করে বোঝার জন্য আরো নিচু হই। কিন্তু গন্ধটা মিলিয়ে যায়। দেখতে পাই, আমি একটা হ্রদের কিনারে আছি। পানির নীল রং আকাশের চেয়েও বেশি নীল। লিনার জপমালার চেয়ে কিংবা পিচকারির মাথার চেয়েও বেশি নীল। দেখতে ভালো লাগে। আমি দৃষ্টি সরাই না। ইচ্ছা করে মুখ ডুবিয়ে দিই। কিন্তু আমার দ্বিধা লাগছে কেন? আমার ভালো লাগার এত সুন্দর নীল পেতে আমি দ্বিধান্বিত হচ্ছি কেন? পানির ভেতর আমার মুখের ছায়া পড়েনি বুঝতে পেরে ভয় পেয়ে যাই। আমার মুখের ছায়া যেখানে পড়ার কথা, সেখানে কিছুই নেই। পানিতে আঙুল ডুবিয়ে বুঝতে পারি, পানি গোলাকারে ঘুরছে। মুখ আরো নিচু করে পান করার মতো কাছে নিই, নিজের ছায়ায় চুমুও খাওয়া যেত। কিন্তু আমার ছায়া তো নেই পানিতে। ছায়া কোথায় লুকিয়েছে? কেন এমন হচ্ছে? একটু পর দেখি, জেন আমার পাশে আমার মতো নিচু হয়ে আছে পানির খুব কাছে। সেও পানির দিকে তাকিয়ে আছে। জেন বলে, আহ্, কী চমৎকার! নড়াচড়া কোরো না। পেয়ে যাবে। আমি জিজ্ঞেস করি, কোথায়? কোথায় আমার ছায়া? কিন্তু দেখি, জেন আর নেই আমার পাশে। ঘুম ভেঙে যায়। জেগে উঠে দেখি, তোমার ছোট খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে এ মিনহা মাই। এবার তার ছোট ছেলেটা হলো মালায়েক। মালায়েক তার হাত ধরে আছে। মহিলা ঠোঁট নেড়ে কী যেন বলতে চাইছে। সে মালায়েকের হাত ধরে আছে। আমি তোমার কম্বলের নিচে মুখ লুকাই।

আমি জানি, তুমি আসবে। কিন্তু সকাল হয়ে গেলেও তুমি আসো না। মালায়েক আর আমি সারা দিন অপেক্ষা করি। মালায়েক আমার থেকে যতটা পারে দূরে দূরে থাকে। আমি ভেতরে থাকি, মাঝে মাঝে বাগানে থাকি। চুপচাপ থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু ভেতরে ভেতরে এলোমেলো লাগে। কী করে এভাবে থাকা যায়, বুঝতে পারি না। সে রাতে স্বপ্ন দেখি না। এ মিনহা মাইও আসে না। তোমার বিছানায় শুয়ে থাকি আমি। বাতাস বয়ে যাওয়ার সঙ্গে আমার হৃৎপিণ্ডের শব্দও শুনি। বাতাসের চেয়েও জোরে শব্দ হয় আমার হৃৎপিণ্ডে।

সকালে দেখি, ছেলেটা এখানে নেই। আমি দুজনের জন্যই জাউ রান্না করি। আবার দেখি গলির মাথায় দাঁড়িয়ে আছে; তার হাতে সেই শস্যের খোসা দিয়ে তৈরি খেলনাটা। তুমি যেখান থেকে ঘোড়ায় উঠেছ, সেখানটায় তাকিয়ে আছে। ছেলেটা হঠাৎ যখন আমার দিকে তাকায়, তখনই দেখতে পাই বিধবা ইলিংয়ের কেটলি থেকে ওঠা বাষ্পের মধ্যে দেখা কুকুরের মুখের আদল। তখন আমি এই দৃশ্যের পরিপূর্ণ অর্থ বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন পারি। আমি এখন নিজেকে সুরক্ষা দিতে পারি। না হলে নিজেকে রক্ষা করার সব বুদ্ধি হারিয়ে ফেলতাম। প্রথমে দেখি, স্যারের বুট জোড়া নেই। চারপাশে, সবখানে খুঁজি—কুটিরের ভেতরে, কামারশালায়, কয়লার মধ্যে। আমার পায়ে ব্যথা পাই। তবু খুঁজি। টুকরো টুকরো ধাতব কিছু পায়ে বিঁধে পড়ে। ব্যথা পাই। দেখি, বাগানের ভেতর থেকে একটা সাপ চৌকাঠের দিকে এগিয়ে আসছে। সাপটার ধীরগতিতে এগিয়ে আসা দেখি। সূর্যের আলোয় টিকতে পারে না, মরে যায়। আমি তোমার নেহাই ছুঁয়ে দেখি, ঠাণ্ডা ঘষা খেয়ে খেয়ে মসৃণ হয়েছে; তবে নেহাইয়ের প্রাণ তো তাপ। তাপের জন্য হাহাকার করছে নেহাই। আমি আর স্যারের বুট খুঁজে পাই না। খুব সতর্ক পায়ে ধীরে ধীরে কুটিরে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি।

ছেলেটা গলির মুখ থেকে ভেতরে আসে। কিন্তু খায় না, কথাও বলে না। টেবিলের দুই প্রান্ত থেকে দুজনই একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকি। তার চোখের পলক পড়ে না। আমারও পড়ে না। আমি জানি, সে স্যারের বুট চুরি করেছে। বুট জোড়ার মালিক আমি। তার আঙুলগুলো খেলনাটাকে আঁকড়ে ধরে আছে। আমি বুঝতে পারি, তার শক্তি খেলনাটায়ই। খেলনাটা কেড়ে নিয়ে উঁচু একটা তাকের ওপর রেখে দিই। কান্না শুরু করে দেয় সে। একটানা কান্না। চোখ থেকে অশ্রুর বন্যা বেয়ে নামে। কিছুতেই থামে না। একটা ঘোড়ার গাড়ি চলে যায়। গাড়ির ভেতরের যুগল শুধু তাকিয়ে দেখে, হাত নাড়ায় না, থামেও না। শেষে একসময় ছেলেটা কান্না থামায়। আমি ভেতরে যাই। খেলনাটা তো তাকের ওপর নেই। এক কোনায় পড়ে আছে, অনাদরে পড়ে থাকা অবাঞ্ছিত শিশুর মতো। কিংবা সে রকম না-ও হতে পারে। হয়তো খেলনাটাই ওখানে লুকিয়ে আছে। আমার কাছ থেকে লুকিয়ে আছে। ভয় পেয়ে লুকিয়ে আছে। কোন অর্থটা আসলে সত্যি? টেবিল থেকে জাউ চুইয়ে পড়ছে। টুলটা কাত হয়ে পড়ে আছে। আমাকে দেখে ছেলেটা আবার কান্না শুরু করে। তখনই আমি তাকে জড়িয়ে ধরি। আমি তার কান্না থামানোর চেষ্টা করি। সে জন্যই তার হাত ধরি। তাকে থামানোর জন্য, তার কান্না থামানোর জন্য। তখনই হালকা একটা মটমট শব্দ শুনি। জংলি হাঁসের বুকের পাশের উষ্ণ নরম পাখনা টান দিয়ে ছেঁড়ার সময় যেমন হালকা শব্দ হয়, তার চেয়ে জোরে নয়। এবার কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছেলেটা। টেবিলের কোনার সঙ্গে লেগে মুখ থেকে অল্প একটু রক্ত বের হয়। বাইরে যখন তোমার গলার আওয়াজ শুনতে পাই, তখনই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তোমার ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনি না, শুধু তোমার কণ্ঠ শুনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারি, তোমার কাছে আমার মূল্য ফুরিয়ে গেছে। কারণ তোমার মুখে আমার নাম নয়, মালায়েকের নাম শুনি। তুমি ডাকতে থাকো—মালায়েক, মালায়েক।

মালায়েককে মেঝেতে এভাবে পড়ে থাকতে দেখে, তার মুখে সামান্য রক্ত দেখে তোমার চেহারা বদলে যায়। তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দাও। চিৎকার করে বলো, কী করছ এসব? দয়ামায়া নেই তোমার? তুমি ছেলেটাকে মমতার হাতে ওঠাও। ছেলেটার হাতের বাঁকা অবস্থা দেখে তুমি আবার চিৎকার দিয়ে ওঠো। ছেলেটা একবার চোখ মেলে তাকায়, তুমি তার হাতটা টান দিয়ে ঠিক করো বলে আবার জ্ঞান হারায়। হ্যাঁ, রক্ত। অল্প একটু। কিন্তু রক্ত যখন বের হয়েছে, তুমি তখন এখানে ছিলে না। তুমি কী করে ভাবলে, আমার কারণেই রক্ত বের হয়েছে? সত্য সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে কেন আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে? ছেলেটাকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে কিছু জিজ্ঞেস না করেই তুমি বিশ্বাস করলে, আমিই দোষ করেছি। প্রথমে ধাক্কা খেয়ে পড়লাম। তারপর তোমার হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে আমার মুখে আঘাত করলে। মেঝেতে পড়ে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে যাই আমি। আর কোনো প্রশ্ন নয়। তুমি প্রথমে ছেলেটাকে নাম ধরে ডাকো। তারপর তার খেলনাটা তার কাছে দিয়ে ওখানেই শুয়ে থাকতে দাও। এরপর আমার কাছে আসো। তোমার চোখে আর কোনো দীপ্তি নেই। তোমার ঘাড়ে রোপ পাম্প। আমি হেরে গেছি। আমাকে আঘাত করে ফেলে দেওয়ার পরও তোমার মুখে দুঃখ প্রকাশ নেই। আমাকে যেখানে আঘাত করেছ, সেখানে কোমল আঙুলের পরশ পর্যন্ত নেই। আমি ব্যথায় কুঁকড়ে যাই। আমি অনড় হয়ে পড়ে থাকি।

তুমি আমাকে বলো, তোমার মিস্ট্রেস ভালো হয়ে যাবেন। আমাকে তাঁর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য নাকি লোক ভাড়া করবে তুমি। তোমার কাছ থেকে দূরে রাখতে চাও। এরপর তোমার মুখে বলা প্রতিটা কথাই আমাকে চাবুক মারে।

জিজ্ঞেস করি, আমাকে মেরে ফেলতে চাও কেন?

আমি চাই, তুমি চলে যাও।

আমার কথাগুলো বলার সুযোগ দাও।

না। এখনই তোমাকে যেতে হবে।

কেন? কেন?

কারণ তুমি একজন ক্রীতদাসী।

কী?

কী বলেছি, শুনেছ তুমি।

স্যার আমাকে ক্রীতদাসী বানিয়েছেন।

আমি সেটা মনে করি না।

তাহলে কে?

তুমি নিজেই।

কী বলতে চাও? স্যার আমাকে কিনে এনেছেন বলেই আমি ক্রীতদাসী।

না। তুমি নিজেই ক্রীতদাসী হয়েছ।

কিভাবে?

তোমার মাথায় কিছু নেই, তোমার শরীর বুনো।

আমি তোমাকে ভালোবাসি।

একজন ক্রীতদাসী সেটাই করবে।

আমি শুধু তোমার অধীনে আছি, আর কারো না।

নিজের অধীনে থাকো, মহিলা। তুমি ছেলেটাকে মেরেই ফেলেছিলে প্রায়।

না, শোনো। তুমিই আমাকে ব্যথা দিলে।

তুমি একটা ঊষর প্রান্তর ছাড়া আর কিছু নও। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। তোমার মন নেই।

তোমার মুখ থেকে মন নেই মন নেই—কথাগুলো অনেকক্ষণ ধরে বের হতে থাকে। তারপর আবার জোরে জোরে হাসতে হাসতে বলো, আমি ইচ্ছা করে ক্রীতদাসীর জীবন বেছে নিয়েছি।

আমি নত হয়ে তোমার কাছে এগিয়ে যাই। হামাগুড়ি দিয়ে তোমার কাছে গেলে তুমি পেছনে ফিরে যেতে যেতে বলো, দূর হও আমার চোখের সামনে থেকে!

আমি প্রচণ্ড দুঃখ পাই। তুমি বলতে চাইছ, তোমার কাছে আমার কোনোই মূল্য নেই? তোমার জগতে আমার কোনো গুরুত্ব নেই? হ্রদের পানিতে আমার মুখের ছায়া পড়েনি। তুমি সে মুখে আঘাত করলে? আমি বাইরে জীবিত থাকলেও মরমে মরে গেছি। না। আর আগের মতো হবে না। আমি বাঁচার শক্তি ফিরে পাব। আমি নিজেকে মেলে ধরি। হাতুড়িটা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত নখরেই আঁচড়ে যাই।

 

 

তার সুন্দর বাড়িটা দেখার জন্য জ্যাকব ভার্ক কবর থেকে উঠে এসেছেন।

উইলার্ড বলে, কবর থেকে তাঁর উঠে আসারই কথা।

তার সঙ্গে একমত হয় স্কালি, আমিও নিশ্চিত। তাঁর উঠে আসারই কথা।

বাড়িটা তো তখনো এলাকার মধ্যে সবচেয়ে আলিশান চেহারার বাড়ি। তাহলে সেখানে চিরকালের জন্য থেকে যাওয়ার ইচ্ছা তো হতেই পারে। ছায়াটা প্রথম দেখার পর স্কালি নিশ্চিত হতে পারে না, সেটা জ্যাকব ভার্কেরই কি না। তবে সে মনে করে, সতর্ক পায়ে এগিয়ে গিয়ে আরো কাছ থেকে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে উইলার্ড আবার প্রেতাত্মা সম্পর্কে স্কালির চেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে; ঘুরে বেড়ানো আত্মাদের বিরক্ত করার ফলাফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কে সাবধান করে দেয় স্কালিকে। রাতের পর রাত তারা দেখতে থাকে। তারপর নিজেদেরই বোঝায়, এখানে জ্যাকব ভার্ক ছাড়া আর কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে না। এ বাড়িতে আর কেউ থাকেনি। তা ছাড়া মিস্ট্রেস তো নিষেধ করে দিয়েছেন, আর কেউ এখানে প্রবেশ করতে পারবে না। মিস্ট্রেসের নিষেধ করার কারণ না বুঝলেও তাঁর আদেশ তারা শ্রদ্ধার সঙ্গে মেনে চলে।

ঘনিষ্ঠ পরিবার বলতে যা বোঝে, সেটাই এখানকার এই খামারে অনেক বছর ধরে তৈরি হয়েছে বলে মনে করে তারা। ভালো মনের দম্পতি, তারা হলো মাতা-পিতা; তিনজন কাজের মেয়ে, তারা হলো তিন বোন; আর তারা দুজন হলো সহায়ক দুই পুত্র। প্রত্যেক সদস্যই তাদের ওপর নির্ভরশীল। কেউই নিষ্ঠুর নয়, সবাই দয়াময়, দয়াময়ী। বিশেষ করে বাড়ির কর্তা, তিনি তাদের কমবেশি অনুপস্থিত মালিকের মতো ছিলেন না। তিনি কখনো তাদের গালাগাল করেননি। কোনো রকম হুমকি-ধমকি দেননি। এমনকি তিনি ক্রিসমাসটাইডে তাদের উপহার দিয়েছেন; একবার সরাসরি তাঁর বোতল থেকে উইলার্ডকে খানিক সুরা পান করতে দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে তারা দুঃখ পেয়েছে; বসন্ত আক্রান্ত বাড়িটা ছেড়ে চলে যাওয়ার আদেশ দিয়েছে তাদের মালিক; কিন্তু তারা সে আদেশ মানেনি। এমনকি তারা স্বেচ্ছায় চূড়ান্ত না হলেও সর্বশেষ কবর খুঁড়েছে, যেটা মিস্ট্রেসের দরকার হতে পারে ভেবেছিল। ঢেলে দেওয়া বৃষ্টির মধ্যে তারা পাঁচ ফুট মাটি খুঁড়ে তুলেছে, তাড়াহুড়া করে মৃতদেহটা নামিয়েছে, যাতে পুরোটা পানিতে ভরে না যায়। এখন তেরো দিন পরই মৃতদেহটা কবর থেকে উঠে এসেছে, কবর ছেড়ে এসেছে। এভাবেই তো তিনি কয়েক সপ্তাহের ভ্রমণ শেষে বাড়িতে ফিরে আসতেন। জীবিতাবস্থায় তারা তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেনি, তাঁর মুখের আদল স্পষ্ট মনে নেই। কিন্তু তাঁর ভৌতিক চেহারার ঝিলিক দেখেছে। তাঁর দেহের আভা মাঝরাতের দিকে ছড়াতে শুরু করে, কিছুক্ষণের জন্য দোতলায় ভাসতে থাকে, তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়। মালিক জ্যাকব ভার্ক নিজের বাড়িতে ঘোরাঘুরি করে সন্তুষ্ট আছেন, অন্য কোথাও গিয়ে কাউকে ভয় দেখাচ্ছেন না, কারো ঘাড় মটকাচ্ছেন না বলে উইলার্ড মনে করে, এখানে থেকে মিস্ট্রেসের কাজকর্মে সহায়তা করা এবং খামারের যত্ন করা তাদের জন্য সঠিক ও নিরাপদ। ক্ষেতের যত্ন নিয়ে প্রস্তুত করতে হবে। কারণ মিস্ট্রেস অসুস্থ হওয়ার পর খুব একটা পরিষ্কার-পচ্ছিন্ন করা হয়নি। জুন মাস প্রায় এসে গেল, অথচ একবারও লাঙল দেওয়া হয়নি জমিতে। মিস্ট্রেস তাদের যে পয়সা দিয়েছেন, সেটাই তাদের জীবনের প্রথম টাকা। কাজকে তারা দায়িত্ব থেকে নিষ্ঠায় উন্নীত করেছে বলেই তাদের প্রাপ্য করুণা হয়ে গেছে উপকার।

অনেক কাজ করতে হবে। কারণ মহিলারা আগে কখনো এমন বেখেয়াল কিংবা ধীরগতির ছিল না। কামারের চিকিৎসায় মিস্ট্রেসের সেরে ওঠার আগে ও পরে এবং ফ্লোরেন্স মেয়েটা আগের জায়গায় ফিরে যাওয়ার পরে সবখানে কেমন যেন একটা ভারী পর্দা পড়ে গেছে। তবু উইলার্ড বলে, লিনা আগের মতোই সযত্নে, ধীরেসুস্থে কাজ করে যাচ্ছে। তবে স্কালি দ্বিমত পোষণ করে বলে, লিনা উত্তেজনায় ফুটছে। স্কালি আরো বলে, সে এত বছর ধরে লিনাকে দেখে আসছে, নদীতে লিনার গোসল করার সময় গোপনে দেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় করেছে। তার পাছার মুক্ত দৃশ্য, ওই রকম কোমর, সিরাপ রঙের স্তন হয়তো আগের মতো নেই। তবে অন্য কোথাও দেখেনি, এমন একটা আকর্ষণ লিনার শরীরে দেখেছে সে। নারীর অঙ্গে খোলা চুল, পুরাই আক্রমণাত্মক, লোভনীয়, ডাকিনিবিদ্যার মতো কালো। লিনার পিঠের ওপর পড়ে থাকা কিংবা এপাশ-ওপাশ দুলতে থাকা চুলের চেহারা দেখা একটা গোপন আনন্দ। এখন আর সে রকম নেই। তাকে গোসল করার সময় যখনই দেখেছে, স্কালির মনে হয়েছে, লিনা এখনই ফেটে পড়বে।

উইলার্ড বলল, মিস্ট্রেসও বদলে গেছেন। রোগ-শোকের ধকল তো দিনের আলোর মতো পরিষ্কার দেখা যায়। তাঁর চুলও খাড়া খাড়া ছিল; ক্যাপ পরতে সমস্যা হতো। এখন সেই চুল বিবর্ণ সুতার মতো কপালের নিচে পড়ে থাকে; তাঁর নতুন কর্কশ চেহারায় বিষণ্নতা আরো বাড়িয়ে দেয়। অসুখ থেকে ওঠার পর কথা বলার ভেতর দিয়ে যতটুকু সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। আগে যেসব কঠিন কাজ আনন্দের সঙ্গে করতেন, সেগুলো এড়িয়ে চলছেন। তিনি কাপড়চোপড় ইস্ত্রি করেন না, কোনো গাছপালা রোপণ করেন না, আগাছা সাফ করেন না; শুধু রান্না আর সেলাই-ফোঁড়াই করেন। অন্য কাজের মধ্যে বাইবেল পড়ে অথবা গ্রামের ভেতর থেকে কেউ এলে তাকে আপ্যায়ন করে সময় কাটে তাঁর।

আমার মনে হয়, তিনি আবার বিয়ে করবেন, শিগগিরই। উইলার্ড বলে।

তাড়াতাড়ি কেন?

তিনি তো একজন মহিলা মানুষ। ক্ষেত-খামার সামলাবেন কী করে।

কাকে বিয়ে করবেন?

উইলার্ড চোখ বন্ধ করে, গ্রামেরই কাউকে হয়তো। উপপুরোহিতের বন্ধুত্বপূর্ণ চালচলনের কথা মনে করে উইলার্ড কাশির শব্দে হাসে।

সরোর পরিবর্তনটা তাদের কাছে ইতিবাচক মনে হয়। সে আর আগের মতো মাথাঘোলা নেই। কাজকর্ম গোছানোর ক্ষমতা হয়েছে। তবে যে কাজই করুক, আগে তার মেয়েকে দেখতে হবে। ডিম ঘরে আনা, দেরিতে দুধ দোহন করা, ক্ষেতের যেকোনো কাজই ফেলে চলে আসে, যদি একবার তার মেয়ের একটু কান্না শোনে। যেখানেই কাজ করে, মেয়েকে আশপাশেই রাখে। সরোর বাচ্চা প্রসবের সময় তাকে সহায়তা করার সুবাদে তারা ধর্মপিতার মর্যাদায় উঠতে চায়, সরো প্রয়োজনের সময় তার মেয়েকে দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেও তারা রাজি, তবে সরো রাজি হয় না। কারণ সে তাদের বিশ্বাস করে না, কিংবা বিশ্বাস করলেও নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার তাগিদেই সে তাদের কথায় রাজি হয় না।

সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায় ফ্লোরেন্সের মধ্যে। তাদের চেনা নম্র-ভদ্র মেয়েটা বন্য স্বভাবের হয়ে গেছে। মিস্ট্রেসের অসুখ দেখে কামার ফিরে যাওয়ার দুই দিনের মাথায় তারা প্রথম দেখে ফ্লোরেন্সকে, রাস্তা দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে আসছে। তাকে জীবন্ত মানুষ বলে চিনতে খানিক সময় লাগে তাদের। প্রথম কারণ, তার সারা গা রক্ত আর কাদায় মাখামাখি। দ্বিতীয় কারণ হলো, সে সরাসরি তাদের পাশ দিয়েই চলে গেল; কিন্তু তাদের দিকে তাকাল না, তার পদক্ষেপও একটু এদিক-ওদিক হলো না। সাধারণত রাস্তার ধারের গাছপালার আড়াল থেকে হঠাৎ দুজন মানুষ বের হয়ে এলে যে কেউই চমকে যাবে খানিক। কিন্তু ফ্লোরেন্সের মধ্যে তেমন ভাবান্তর দেখা গেল না। তখনো তারা দুজন হাঁপাচ্ছে, অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে, তখনো তারা ভয়ের মধ্যেই আছে; শেষে তারাই বরং ফ্লোরেন্সের পথ থেকে লাফ দিয়ে সরে দাঁড়াল। তাদের ভীত মনের কাছে যেকোনো কিছু অন্য কিছু হয়ে যেতে পারে। তাদের তত্ত্বাবধানে থাকা গবাদি পশুর কাছে প্রাণপণে দৌড়ে ফিরে আসছিল তারা, শূকরগুলো যেন ছোটগুলোকে না খেয়ে ফেলে। একটা অপমানিত ভালুকের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য তারা সকালের অনেকটা সময় লুকিয়ে থেকে পার করেছে। দুজনই জানত, বন-জঙ্গলে এক ফুঁ ধোঁয়া কী ভয়ানক কাণ্ড ঘটিয়ে দিতে পারে। গন্ধ একটা মারাত্মক বিষয়। মুহূর্তের মধ্যে পালানো, আক্রমণ করা, লুকিয়ে থাকা কিংবা অনুসন্ধান করার সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, এই ভালুকের ক্ষেত্রে যা হলো। লরেল ঝোপে তিতিরের বাসা, ঝোপের ভেতর যখন সামান্য মটমট শব্দ হয়েছে, তখনই উইলার্ড দাঁড়িয়ে পড়ে স্কালিকে ইশারায় চুপ করতে বলেছে। স্কালিও তার ছুরিতে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। একমুহূর্ত ভয়াবহ নীরবতা। কোথাও একটা পাখির আওয়াজ নেই, খরগোশের ঠকঠক শব্দ নেই। তার পরই মনে হলো, গন্ধটা তাদের ওপর দিয়ে পানির মতো প্রবাহিত হচ্ছে। ঠিক তখনই ভালুকটা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে লরেলের ঝোপ ভেঙেচুরে তেড়ে এলো। বোঝা যাচ্ছিল না, ভালুকটা তাদের দুজনের কাকে বেছে নেবে। দুজন দুদিকে ছুট লাগাল। যার যার মতো দুজনই মনে করল, সে সঠিক পথেই দৌড়াচ্ছে। এদিকে স্কালির মনে হলো, তপ্ত নিঃশ্বাস টের পাচ্ছে তার ঘাড়ের ওপর। লাফ দিয়ে সবচেয়ে নিচু ডালটা ধরে ঝুলে রইল। বেকুবের কাজ। ভালুক তো গাছে উঠতে পারে। শুধু টান হয়ে দাঁড়ালেও ভালুকটা তার নাগাল পাবে। শক্ত করে তার একটা পা ধরবে আর মুখের ভেতর নিয়ে মচমচ করে খাবে। স্কালি প্রচণ্ড রকমের ভীত নয় বলে কমপক্ষে একবার প্রতিরক্ষার শক্ত চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে কাজ না হলে আলাদা কথা। চেষ্টা তো করতে হবে। টান দিয়ে চাকুটা বের করে খুব ভালো করে লক্ষ্য ঠিক না করেই নিচে টলটলায়মান বিশাল কালো জন্তুটার মাথায় বসিয়ে দিল। একবারের জন্য হলেও বেপরোয়া বুদ্ধিটা কাজে লাগল। মাথার একপাশে লেগে ছুরিটার ধারালো পাশ ভালুকের চোখের ভেতর সুচের মতো বিঁধে গেল। ভয়ানক আওয়াজ তুলে গাছের বাকল আঁচড়ে মাটিতে ধপাস করে পড়ল ভালুকটা। একেবারে কুকুর চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে ঘেউঘেউ করলেও এতটা রাগিয়ে দিতে পারত না ভালুকটাকে। দাঁত খিঁচিয়ে সোজা হয়ে উঠে চোখে বিঁধে থাকা ছুরিটার ওপর থাবা মারতে লাগল। শেষে একসময় পড়ে গেল ছুরিটা। তারপর চার হাত-পায়ের ওপর ভর করে কাঁধ এদিক-ওদিক গড়াতে লাগল, মাথা এপাশে-ওপাশে বাড়ি মারতে লাগল। স্কালির মনে হলো, অনেকক্ষণ পর ভালুকটার একটা বাচ্চার ঘোঁতঘোঁত শব্দ শোনা গেল। ভালুকটার স্বাভাবিক ক্ষীণ দৃষ্টি আঘাত পাওয়ার পর আরো ক্ষীণ হয়ে গেছে। উইলার্ড ও স্কালি অপেক্ষা করতে লাগল, একজন শিকারের ভালুকের মতো গাছের ওপর, আরেকজন শিলাখণ্ডের আড়ালে লুকিয়ে। দুজনেরই আশঙ্কা, ভালুকটা ফিরে আসতে পারে। যখন মনে হলো, জন্তুটা আর ফিরে আসবে না, তখন সতর্কতার সঙ্গে পশমের গন্ধ শুঁকে, ঘোঁতঘোঁত শব্দ আর আসছে কি না, আরেকটার নড়াচড়া দেখা যায় কি না কিংবা পাখিদের সতর্কতামূলক ডাক শোনা যায় কি না—এসব ভালো করে দেখে তারপর দুজনই তাদের লুকিয়ে থাকা অবস্থা থেকে বের হয়ে এলো। তবে ধীরে, খুব ধীরে। তারপর একটু দেরি না করে দৌড় শুরু করল।

বালক উইলার্ড বন্ডকে বিক্রি করা হয়েছিল ভার্জিনিয়ার একজন চাষির কাছে। শুনেছিল, তার একুশ বছর বয়স হলে মুক্তি পাবে। কিন্তু আরো তিন বছর যোগ করা হলো চুরি করা কিংবা কাউকে যেকোনো রকম আক্রমণ করার মতো কথিত নিয়ম ভঙ্গের অপরাধে। তারপর আরো উত্তরের এক গমচাষির কাছে আবার ইজারা দেওয়া হলো। দুই বছর ঠিকমতো ফসল তোলার পর গমের ফলন নষ্ট হয়ে গেল। মালিক লোকটা তার সম্পদ বিনিয়োগ করল মিশ্র পশুসম্পদে। শেষমেশ পশুচারণের জন্য যেহেতু বেশি জমি দরকার, মালিক তার প্রতিবেশী জ্যাকব ভার্কের সঙ্গে পরিশ্রমের জন্য জমির ব্যবসা শুরু করল। তার পরও একজন মানুষের পক্ষে এতগুলো পশুর দেখাশোনা করা কঠিন হয়ে গেল। আরেকটা কাজের ছেলের দরকার হয়ে পড়ল।

স্কালির আসার আগে উইলার্ড কঠিন এবং একাকিত্বের সময় পার করেছে গবাদি পশুর জাবর কাটা আর যৌনক্রিয়া দেখে। ভার্জিনিয়ার কঠিন তবে সন্তোষজনক সময়ের কথা স্মরণে এলে এগুলোই তার একমাত্র সান্ত্বনা। সে সময়ের কাজ খুব কঠিন হলেও দিনগুলো একেবারে ম্যাড়মেড়ে ছিল না, তার একাকিত্ব ছিল না। স্কালির আগমন ছিল স্বস্তিদায়ক, আনন্দদায়ক। তাদের দায়িত্ব মাঝেমধ্যে ভার্ক পরিবার পর্যন্ত বর্ধিত হতে থাকলে সেখানকার মানুষদের সঙ্গে ভালো সহজ সম্পর্ক তৈরি হয়। এর পর থেকে উইলার্ড অতিরিক্ত পানীয়র প্রভাবে খারাপ আচরণ করেনি খুব একটা। প্রথম দিকে তার কাজের জায়গা থেকে দুইবার পালিয়েছে, দুবারই কোনো পানশালার আঙিনা থেকে ধরা পড়েছে এবং তার দাসত্বের মেয়াদ যথারীতি বেড়েছে।

তার সামাজিক জীবনে আরো বড় পরিবর্তন এসেছে, যখন ভার্ক সাহেব নতুন বড় বাড়িটা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবারও সে একদল দক্ষ ও অদক্ষ মানুষের সঙ্গে এক হয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে; তাদের কাজের আনন্দ আরো বেড়েছে কামার আসার পরে। বাড়িটা এবং এর চৌহদ্দি শুধু বড়, তা-ই নয়; বাড়ির গেটটাও দৃষ্টিনন্দন। স্যার চেয়েছিলেন, দুটি প্যানেলেই কাল্পনিক কারুকাজ করা হোক। তবে কামার তাঁকে সে সিদ্ধান্ত বাতিল করতে অনুরোধ করে। ফলাফল দাঁড়াল, তিন ফুট উঁচু খাড়া শিক; সেগুলোর মাথার ওপর একটা পিরামিডের অবয়ব। লোহার শিকগুলো গেটের সঙ্গে চমৎকারভাবে লাগানো হয়েছে এবং গেটের দুই পাশের মাথার ওপরই ঘন লতার নকশা তৈরি করা হয়েছে। তার তো সে রকমই মনে হয়। আরো কাছে গিয়ে ভালো করে দেখার পর বুঝতে পারে, লতাগুলো আসলে সাপ। পার্থক্য হলো, সাপের মাথা না হয়ে সেখানে ফুল ফুটেছে। গেট খোলার সময় দুই পাশের পাপড়িগুলো আলাদা হয়ে যায়। আবার বন্ধ করলে এক হয়ে যায়।

কামারকে এবং তার কাজের দক্ষতাকে তার ভালো লাগে। একটা দৃশ্য তার স্পষ্ট মনে আছে—ভার্কের হাত থেকে কামারের হাতে টাকা দেওয়ার দৃশ্য। রুপার মুদ্রার দ্যুতি যেমন ভোলার নয়, ঝনঝন শব্দও তেমন ভোলার নয়। সে জানত, রামের ব্যবসার বিনিয়োগ থেকে ভার্ক সাহেব বড়লোক হয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু নির্মাণকাজের সরঞ্জাম যারা সরবরাহ করে, তারা যেমন টাকা পায়, কামারও তেমন টাকা পাচ্ছে। ভার্জিনিয়ায় যাদের সঙ্গে কাজ করত উইলার্ড, তারা তো টাকা পেত না। কিন্তু কামার টাকা পাচ্ছে—এই বিষয়টা তার মাথা আউলা করে দেয়। সে স্কালির মনেও সাহস দেয়, দুজনই কামারের কোনো অনুরোধমতো কাজ করা বাদ দেয়। চুক্তিবদ্ধ শ্রম থেকে তাদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো কোনো আইন নেই। তবু কামারের নিজস্ব ব্যক্তিগুণের কারণেই তার তরফ থেকে মি. সম্বোধনটা উইলার্ডের ভালো লাগে। উইলার্ড এবার বুঝতে পারে, ফ্লোরেন্স মেয়েটা কেন এই লোকটার টানে বেকুবের মতো আটকে গেছে। রাতের খাবারের পর জঙ্গলের দিকে মজা করতে বের হলে সে নিশ্চয়ই মেয়েটাকে মিস অথবা লেডি বলে সম্বোধন করেছে। মনে হয়, তাতেই মেয়েটা উত্তেজনা অনুভব করেছে, যদি মেয়েটার কামারের দাঁত কেলানো হাসি ছাড়া আরো কিছু দরকার হয়ে থাকে।

উইলার্ড স্কালিকে জানায়, জন্মের পর এ রকম কোথাও দেখিনি। মেয়েটাকে সে যখন যেখানে খুশি নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটাও চোখের সামনে তাকে না দেখলেই মাদি নেকড়ের মতো তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছে। কামার দু-এক দিনের জন্য তার চুল্লি থেকে পোড়ানো আকরিক আনতে গেলে মেয়েটা তার ফিরে না আসা পর্যন্ত মুখ গোমড়া করে থাকে। তখন সরোকে দেখায় বন্ধুসভার সদস্যের মতো।

ফ্লোরেন্সের চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের বড় স্কালি। তার চালচলনের আকস্মিক পরিবর্তন দেখে উইলার্ড যতটা বিহ্বল হয়, স্কালি ততটা হয় না। মানুষের চরিত্র বোঝার ব্যাপারে স্কালি নিজেকে বিচক্ষণ বিচারক মনে করে। অন্যদের অন্তরের কথা বোঝার নিশ্চিত একটা প্রবৃত্তি তার আছে। উইলার্ড মানুষকে বাইরের চেহারা দেখে বিচার করে; স্কালি ঢুকে পড়তে পারে গভীরে। যদিও সে লিনার উন্মুক্ত শরীর দেখতে পছন্দ করে, তবু সে লিনার মধ্যে এক ধরনের পবিত্রতা দেখতে পায়। তার বিশ্বাস, লিনার আনুগত্য মিস্ট্রেস কিংবা ফ্লোরেন্সের প্রতি আত্মনিবেদন নয়; এটা নিজের মূল্য বোঝানোর একটা লক্ষণ মাত্র। একরকম প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা। সম্ভবত নিজের সম্মান বজায় রাখাও বলা যায়। সরোর কথা বলে মজা করার সময় উইলার্ডের কথার পরিপ্রেক্ষিতে স্কালি বলে, তার মতে তিনজন নারীর মধ্যে সবার ওপরে রাখা যায় সরোকেই। যদি তার প্রলুব্ধ করার ইচ্ছা থাকত, তাহলে সে সরোকেই করত। তার চোখে ভীত হরিণীর চাহনি, তবে জটিল এবং দূরবর্তী। ধোঁয়াটে ধূসর রঙের পলকহীন চোখে তার অপার অপেক্ষা; তার চাহনি শূন্য নয়। তার এই অপেক্ষমাণ চাহনি নিয়েই লিনার যত ভয় ছিল। শুধু স্কালি ছাড়া অন্য সবাই সরোকে বোকা মনে করে। কারণ সে একা থাকার সময়ও জোরে জোরে কথা বলে। একা একা কথা কে বলে না? একা একা কাজ করার সময় মিস্ট্রেস নিজেকে নানা রকম নির্দেশনা দেন। লিনা পাখিদের উপদেশ দেয়। সরো নিজের অবস্থান সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত। তাকে ‘অন্যদের থেকে আলাদা’ মনে করা মানে তার ত্বরিত অবগতিকেই অবজ্ঞা করা। তার গোপনীয়তা তাকে সুরক্ষা দিয়েছে। সহজে কারো সঙ্গে জড়ানোর মানসিকতা তার একটা গুণ। পেটে বাচ্চা আসার পর তার দ্যুতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সময় হলে সে ঠিকই বুঝতে পারে, কোথায় যেতে হবে, কাদের কাছে যেতে হবে।

অন্যদিকে স্কালির যদি ধর্ষণের ইচ্ছা থাকত, তাহলে ফ্লোরেন্সই হতো তার শিকার। তার ভেতরে সহজেই চোখে পড়ার মতো কয়েকটা বৈশিষ্ট্যের সমাহার দেখা দেখা যায়—অরক্ষিত অবস্থা, খুশি হওয়ার ও করার ব্যাকুলতা এবং সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো হলো, অন্যের হীন আচরণের জন্য নিজেকে দায়ী করার প্রবণতা। তবে সত্যি, তার এখনকার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, সেই বৈশিষ্ট্যগুলো আর তার মধ্যে নেই। রাস্তা দিয়ে সৈনিক কিংবা পেতনির মতো হনহন করে চলে যেতে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই স্কালি বুঝে গেছে, সে এখন অস্পৃশ্য। তাকে আর ধর্ষণ করা যাবে না—এই ধারণাটা তার ব্যক্তিগত নয়। গোপনে লিনার শরীর দেখার আচ্ছন্নতা ছাড়া স্কালির মধ্যে নারী সম্পর্কে আর কোনো ইন্দ্রিয়জ বাসনা ছিল না। অনেক আগে শুধু পুরুষের জগৎ সম্পর্কে জানত সে। যেদিন সে কামারকে প্রথম দেখে, সেদিনই বুঝে যায়, ফ্লোরেন্সের ওপর তার কী প্রভাব পড়তে যাচ্ছে। কাজেই ফ্লোরেন্সের ‘সব সময় আমাকে নাও’ মনোভাব থেকে ‘আমাকে ছোঁবে না’ মানসিকতায় পরিবর্তনটা স্কালির কাছে স্বাভাবিক মনে হয়, আগে থেকে সে অনুমান করেছিল এটাই।

আর মিস্ট্রেস সম্পর্কে স্কালির মতামত উইলার্ডের মতামতের চেয়ে কম উদার। সে মিস্ট্রেসকে অপছন্দ করে তা-ও না, তবে মালিকের মৃত্যুর পর এবং তার নিজের অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার পর তার আচরণ দেখে স্কালির মনে হয়নি, এটা শুধু তার খারাপ স্বাস্থ্য এবং শোকের প্রভাব। মিস্ট্রেস সময় কাটান ঘড়ির কাঁটার আনন্দে। তিনি অনুতপ্ত, পবিত্র এবং সাধারণ। তার মানে, তাঁর ধার্মিকতার আড়ালে নিষ্ঠুরতা না হলেও ঠাণ্ডা কিছু একটা আছে। বিশাল বাড়িটায় তিনি উঠতে চান না; অথচ এই বাড়ি তৈরি করার সময় তিনি খুশিই ছিলেন। তার মানে, তাঁর বর্তমানের এই সিদ্ধান্তটা তাঁর নিজের এবং অন্যদের ওপর একটা শাস্তি, বিশেষ করে তাঁর মৃত স্বামীর ওপর। যে কাজটা স্বামী-স্ত্রী দুজনই উপভোগ করেছেন, এমনকি বলা যায়, উদ্‌যাপন করেছেন—সেটাই এখন তিনি অপছন্দ করছেন তৃতীয় ও সপ্তম পাপ হিসেবে। জীবনে স্বামীকে যতই ভালোবেসে থাকুন, তাঁর অনুপস্থিতি রেবেকাকে একেবারে দুমড়েমুচড়ে দিয়ে গেছে। সামান্য হলেও প্রতিহিংসা প্রকাশ করার উপায় না খুঁজে পারেন না; তাঁকে দেখাতে হবে, তিনি কতটা কষ্টে আছেন, রেগে আছেন।

মানুষের নির্বুদ্ধিতা উইলার্ড যতটা দেখেছে, স্কালি তার চেয়ে বেশিই দেখেছে তার বাইশ বছরের জীবনে। প্রটেস্ট্যান্ট গির্জার একজন সহকারী পাদ্রি স্কালির বারো বছর বয়সে তাকে জ্ঞান দান করেছিলেন, ভালোবাসা দেখিয়েছিলেন এবং শেষে তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও রেছিলেন। তার মা একটা পানশালায় কাজ করত। সেখানে আবার ধর্মসভারও আয়োজন করা হতো। তার মৃত্যুর পর তার তথাকথিত বাবা সেখানেই এক সভায় তাকে ইজারা দিয়ে দেয়। পানশালার রক্ষক মহিলা দাবি করে, তার ঋণ শোধ করতে স্কালির আরো তিন বছর শ্রম দিতে হবে। তবে তখনই তার ‘বাবা’ আসে, বাকি ঋণ শোধ করে দেয় এবং দুই পিপা স্প্যানিশ মদের সঙ্গে স্কালির শ্রম বিক্রি করে দেয় ধর্মসভার কাছে।

 

 

স্কালি পাদ্রির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাকে দোষারোপ করেনি। এমনকি তারপর যে তাকে নির্দয়ভাবে মারা হয়েছে, সে জন্যও কিছু বলেনি। কারণ ছেলেটার কামুক দৃষ্টিতে তাদের ধরা পড়ার পরিস্থিতিটা উল্টে দিতে হয়েছিল সহকারী পাদ্রিকে। না হলে পাদ্রির পদবি চলে যেত, তার শাস্তিও হয়ে যেতে পারত। মুরব্বিরা একমত হয়, স্কালির বয়স অল্প; তাকে স্থায়ীভাবে অশোধ্য ঘোষণা করা যাচ্ছে না। শেষে তাকে এক জমির মালিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারা আশা করে, ছেলেটা তার অভ্যাস বদলাবে। কিংবা এখানে কমপক্ষে সে অন্যদের নষ্ট করতে পারবে না। ওই এলাকায় পৌঁছানোর পরই স্কালি মনস্থির করে, পালিয়ে যাবে। কিন্তু তার পৌঁছানোর তৃতীয় দিন শীতের প্রচণ্ড ঝড় শুরু হয়ে যায়; এলাকার সব কিছু তিন ফুট পুরু তুষারে ঢাকা পড়ে। গরু-বাছুর দাঁড়ানো অবস্থায়ই মারা যায়। তুষার জড়ানো হরবোলা পাখি গাছের ডালে ঝুলতে থাকে। যেগুলো তারা বাঁচাতে পারে না, সেগুলো ওভাবেই রেখে উইলার্ড এবং সে গরু-ভেড়াগুলোর মধ্যেই ঘুমায়। পশুদের শরীরের ওম এবং তাদের দুজনের শরীরের নৈকট্য ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচায়। স্কালি পালানোর সিদ্ধান্ত বাতিল করে; উইলার্ডও এভাবে থাকতে আপত্তি করে না।

বছর যত গড়াতে থাকে, স্কালি ধৈর্য ধারণ করতে করতেও মানসিকভাবে অস্থির থেকে যায়, এমনকি তার আশাগুলো ক্রমান্বয়ে ফিকে হয়ে এলেও সে এ রকমই থাকে। জ্যাকব ভার্ক মারা যাওয়ার পর তাঁর স্ত্রী স্কালি ও উইলার্ডের ওপর এতটাই নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন যে, তিনি তাদের কাজের বিনিময়ে টাকা দেওয়া শুরু করলেন। চার মাসে তার জমা হয়ে যায় ষোলো শিলিং। চার পাউন্ড কিংবা তার চেয়ে কম দামেই একটা ঘোড়া পাওয়া যেতে পারে। পণ্য, শস্য কিংবা পঁচিশ (নাকি দশ?) মুদ্রায় মুক্তির টাকা যোগ করলে এত বছরের মজুর খাটার বিনিময়ে ঘোড়া কেনার সামর্থ্য হয়ে যাবে। শুধু খাবার আর প্রেম অন্বেষণ করে জীবন কাটাতে চায় না সে। এত দিন পর্যন্ত সে এমন কিছু করেনি, যাতে মিস্ট্রেস ভার্ক বিরক্ত হন কিংবা তাকে কাজ থেকে বাতিল করে দেন। মিস্ট্রেসের তাড়াতাড়িই বিয়ে হয়ে যাবে বলে উইলার্ড যে ভবিষ্যদ্বাণী করে, তাতে স্কালি চমকে যায়। তার নতুন স্বামী হয়তো চাষাবাদের সব কিছু নতুন করে সাজাবে; নতুন বিন্যাসে তাকে বাদও দেওয়া হতে পারে। নারীদের মধ্যে নারীদের জন্য কাজ করতে পেরে উইলার্ড ও স্কালি সুবিধা পেয়েছে। অবশ্য আরো অনেক মহিলাই কাজ করে; তারা যতই পরিশ্রমী হোক না কেন, তারা কেউ তো ষাট ফুট উঁচু গাছ কাটেনি, গবাদি পশুর খোঁয়াড় তৈরি করেনি, জিন মেরামত করেনি, গরু জবাই করেনি বা কসাইয়ের কাজ করেনি, ঘোড়ার পায়ে নাল পরায়নি, শিকার করেনি। সুতরাং সে যখন থেকে মিস্ট্রেসের চোখে অসন্তোষ দেখেছে, তখন থেকেই তিনি খুশি থাকেন—এমন কাজই করেছে। যখন তিনি সরোকে মার দিয়েছেন, লিনার দোল-বিছানা খুলে ফেলেছেন, ফ্লোরেন্সকে বিক্রি করে দেওয়ার বিজ্ঞাপন দিয়েছেন, তখন সে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেছে; কিন্তু মুখে কিছু বলেনি। কারণ দুটো—প্রথমত, এটা তার নিজের জায়গা নয়, দ্বিতীয়ত, সে দাসত্ব থেকে চিরতরে মুক্তি চায়। আর মুক্তির জন্য টাকা হলো একটা জামিন। তবু গোপনে যখন সম্ভব হয়েছে, মিস্ট্রেসের দেওয়া আঘাতের ক্ষত প্রশমন করার চেষ্টা করেছে সে। সরোর শিশু মেয়েটার জন্য ভেড়ার চামড়া দিয়ে দাগটানা একটা ছোট বাক্স তৈরি করে দিয়েছে। গ্রামের মধ্যে যে বিজ্ঞাপনগুলো ছিল, সেগুলো ছিঁড়ে ফেলেছে। তবে প্রটেস্ট্যান্টদের প্রার্থনাসভায় যেটা দেওয়া হয়েছিল, সেটা রয়ে গেছে, ছিঁড়তে পারেনি। অন্যদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে যতটা সফল মনে হয়, লিনার বেলায় ততটা মনে হয় না। তার কাছে ভিড়তে পারে না সহজে। লিনা নিজে থেকে কিছু চায় না, কিছু দিলেও নিতে অনীহা। শূকরের মাথার আকৃতির যে পনিরটা সে এবং উইলার্ড বানিয়ে লিনাকে দিয়েছিল, সেটা কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় পড়েই আছে যন্ত্রাপাতি রাখার ছাউনিতে; লিনা এখন ওখানেই থাকে।

সবার এমন তছনছ অবস্থা হয়েছে জ্যাকবের মৃত্যুতে। পুরুষের অধীনে থাকা নারীর দাসত্বের পরিণতি কিংবা সোজা পুরুষবিবর্জিত নারীর পরিণতি হলো এই। স্কালির সেটাই মনে হয়। কার মনে কী আছে, তার কোনো প্রমাণ স্কালির কাছে নেই। কিন্তু তার নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে সে নিশ্চিত, বিশ্বাসঘাতকতাই হলো এই সময়ের বিষ।

দুঃখজনক।

একসময় তারা মনে করত, তারা এক পরিবার। কারণ বিচ্ছিন্নতা থেকেই তারা সবাই সবার সঙ্গ তৈরি করেছিল। তবে তারা যে মনে করত একটা পরিবার তৈরি করেছে, সে পরিবারটা ছিল অলীক। যে যা-ই পছন্দ করুক, অন্বেষণ করে বেড়াক কিংবা কোনো কিছু থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করুক না কেন, তাদের ভবিষ্যৎ ছিল আলাদা, যার যার অনুমানের ভেতর। একটা কথা সত্যি ছিল—শুধু সাহসই যথেষ্ট নয়। রক্তের সম্পর্ক ছাড়া সে দূর দিগন্তেও তাদের ঐক্যবদ্ধ করার মতো তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছে না। তা সত্ত্বেও সহকারী পাদ্রির মুখে শোনা দুনিয়া সৃষ্টির আগের অবস্থার বর্ণনা স্কালির মনে পড়ছে—ঘন কালো পদার্থ, সেটা সম্পর্কে কিছু জানা সম্ভব নয়, সৃষ্ট হওয়ার পূর্বমুহূর্তের বেদনার মধ্যে আছে।

তাদের দুজনের মজুরি কামারের একার অর্থের সমান নয়। তবু স্কালি ও মি. বন্ডের ভবিষ্যৎ কল্পনার জন্য যথেষ্ট।

 

 

সারা রাত হেঁটে চলি, একা একা। স্যারের জুতা ছাড়া হাঁটা কঠিন। জুতা পরে নদীর শুকনো পাথুরে বুকে হেঁটে যেতে পেরেছি, আরো দ্রুত হেঁটেছি বনের ভেতর দিয়ে, বিছুটির ঝোপবোঝাই পাহাড় বেয়ে নামার সময়ও দ্রুত হেঁটেছি। যা বুঝতে পারতাম, দেখতে পারতাম—সব এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। বাষ্পের ভেতর দেখা কুকুরের মুখ, বাগানের সাপ—এগুলোর আর কোনো মানে নেই। তবে তোমাকে হারানোর পর আমার পথ পরিষ্কার। ভেবেছি, তুমি আমাকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করবে, তুমি আমার জীবন। যারা আমাকে ছুড়ে ফেলার জন্য খুব কাছ থেকে দেখেছে, তাদের থেকেও তুমি আমাকে নিরাপদে রাখবে। যারা বিশ্বাস করে, আমার ওপর মালিকানা আছে এবং আমাকে শাসন করে, তাদের থেকেও রক্ষা করবে তুমি। তোমার কাছে আমার কোনো মূল্যই নেই। তুমি বলো, আমি ঊষর প্রান্তর। হয়তো তা-ই। তোমার মুখে, তোমার চোখে কাঁপন কিসের? তুমি কি ভয় পাও? ভয় পাওয়ারই কথা তোমার। তোমার পর্যন্ত পৌঁছনোর আগে হাতুড়িটা অনেকবার শূন্যে আঘাত করতে থাকে। ধস্তাধস্তি করে হাতুড়িটা আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ছুড়ে ফেললে তুমি। অনেকক্ষণ ধরে চলে আমাদের দ্বন্দ্ব। দাঁত বের করে কামড় দিয়ে ফালা ফালা করে দেওয়ার চেষ্টা করি আমি। মালায়েক আর্তনাদ করতে থাকে। তুমি আমার হাত টেনে পেছনে নিয়ে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করো। আমি মোচড় দিয়ে তোমার হাত থেকে বের হয়ে পড়ি। খুব কাছেই সাঁড়াশি দেখতে পাই। আমি এদিক-ওদিক হেলেদুলে হাঁটতে থাকি। তোমাকে খোঁড়াতে দেখে, রক্তাক্ত দেখে আমি দৌড় শুরু করি। তারপর হাঁটি, তারপর ভাসতে ভাসতে চলি। গভীর শীতের নদীতীরের তুষার পা কেটে দিতে চায়। আমার জুতা নেই। আমার হৃত্স্পন্দন দ্রুত শোনা যায় না। আমার বাড়ি নেই, ভবিষ্যৎ নেই। দিনভর হাঁটি, রাতভর হাঁটি আমি। এখনকার মতো পালক গোটানোর সময় হয়েছে।

তিন মাস হয়ে গেল তোমার কাছ থেকে চলে এসেছি। গাছের পাতার রং এত লাল, এতটা পিতলের মতো হয় আগে দেখিনি। পাতার রং চোখে লাগে বলে দৃষ্টিতে স্বস্তি পাওয়ার জন্য গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে আকাশের দিকে তাকাই। আকাশকে অলংকারে সাজানোর জন্য দিনের আলো রাতের তারাদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়; ঘুমন্ত লিনাকে রেখে আমি উঠে চলে আসি এই রুমটাতে।

যদি তুমি বেঁচে থাকো কিংবা সেরে ওঠো, তাহলে আমার কথা বোঝার জন্য তোমাকে নতজানু হতেই হবে, কোথাও কোথাও একেবারে হামাগুড়ি দিতে হবে। এই কষ্টটুকু দেওয়ার জন্য ক্ষমা চাই। মাঝেমধ্যে আঙুলের ডগা দ্রুত পিছলে যায়; শব্দের গঠন বিন্যাস মানে না। রেভারেন্ড ফাদার এটা পছন্দ করতেন না। তিনি আমাদের আঙুলে টোকা দিয়ে হালকা বকুনি দিয়ে বারবার লেখাতেন। শুরুতে যখন এই রুমে আসি, আমার মনে হয়, আমার কথাগুলো নিশ্চয়ই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অশ্রু ঝরাবে আমার চোখ থেকে। কিন্তু আমার ধারণা তো ঠিক হয় না। আমার চোখ শুকনোই থেকে যায়। বাতির আলো নিভে গেলে আমার কথা বলাও থামিয়ে দিই। তারপর আমার কথাগুলোর মধ্যেই আমি ঘুমিয়ে পড়ি। স্বপ্নহীন ঘুমের মধ্যে আমার কথা বলা চলতে থাকে। যখন জেগে উঠি, দেখি, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি কাজকর্ম করার জন্য এই রুম থেকে চলে যাই। কাজকর্মগুলোর কোনো অর্থ হয় না। যেমন আমরা শোবার ঘরের মলমূত্রের পাত্র পরিষ্কার করি; কিন্তু সেটা ব্যবহার করতে পারি না। তৃণভূমিতে কবরের জন্য আমরা লম্বা লম্বা ক্রুশ বানাই, আবার সরিয়ে ফেলি, কেটে খাটো করি এবং আবার পুঁতে রাখি। স্যারের মারা যাওয়ার জায়গাটা আমরা ধুয়ে পরিষ্কার করি; কিন্তু এই বাড়ির কোথাও আমাদের আসা যাবে না। জোরালো বাতাসের সঙ্গে সব রকম ছোট ছোট জীব জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে। শীতের ঠাণ্ডার কামড় সহ্য করি। আমাদের কবরে পাঠানোর তর সইছে না শীতের। শীত একটা শিশুর কী করতে পারে, তা-ও তার মনে নেই। তিনি অসুখ থেকে সেরে উঠেছেন; কিন্তু তিনি ভালো নেই।  তাঁর মুখে আর হাসি নেই। তাঁর চোখ এখন কী কী যেন খুঁজে বেড়ায়। যা দেখেন, কিছুই পছন্দ হয় না। তাঁর পোশাক এখন কালো এবং অনুজ্জ্বল রঙের; তিনি আগের চেয়ে বেশি প্রার্থনা করেন। লিনা, সরো, সরোর মেয়ে এবং আমাকে—আমাদের সবাইকে তিনি হয় গোয়ালে, নয়তো ইট দড়ি যন্ত্রপাতি আর নির্মাণের বর্জ্য রাখার ছাউনিতে থাকতে বাধ্য করেছেন। তিনি বলেছেন, বাইরে থাকা বর্বরদের কাজ। সুতরাং লিনা ও আমার জন্য গাছের নিচে  দোল-বিছানা আর চলবে না, সুন্দর আবহাওয়ায়ও না। আর সরো এবং তার শিশু মেয়ের জন্য ফায়ারপ্লেসের সুবিধা দেওয়া যাবে না। কারণ সরোর মেয়েকে তিনি পছন্দ করেন না। নিচতলার যে রুমে স্যার মারা গেছেন, সেই রুমের দরজার পেছনে এক রাতে তুষারের মতো ঠাণ্ডা বৃষ্টির মধ্যে সরো মেয়েকে নিয়ে আশ্রয় নেয়। বুঝতে পেরে তিনি সরোকে অনেকগুলো   চড়-থাপ্পড় মারেন। তিনি বোধ হয় জানেন না, প্রতি রাতেই আমি এই রুমে থাকি। জানতে পারলে তিনি আমাকে চাবুক মারবেন। তাঁর ধর্মীয় নিয়মে সেটাই দাবি করে। গির্জায় যাওয়ার কারণে তিনি বদলে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার মনে হয় না, গির্জা থেকে তাঁকে এমন আচরণ করতে বলা হচ্ছে। এসব তাঁর নিজের আইন। তিনি আর আগের মতো নেই। স্কালি আর উইলার্ড বলেছে, তিনি নাকি আমাকে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। লিনাকে নয়, সরোকেও বিক্রি করার কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ তাকে নিতে চায় না। সরো একজন মা। এর বেশি কিছু নেই; কমও নেই। শিশু মেয়ের প্রতি সরোর আত্মনিবেদন দেখে আমার ভালো লাগে। তাকে আর সরো বলে ডাকবে না কেউ। সে নাম বদলে ফেলেছে, পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও করছে। সরো আমাকে সঙ্গে নিতে চায়। কিন্তু আমার যে এখানে একটা কাজ শেষ করতে হবে। লিনার প্রতি মিস্ট্রেস আরো খারাপ আচরণ করছেন। গির্জায় যাওয়ার জন্য লিনাকে তাঁর দরকার। আবহাওয়া যতই খারাপ হোক, সারাক্ষণ লিনাকে রাস্তায়ই অপেক্ষা করতে হয়; তার তো গির্জার ভেতরে যাওয়ার অধিকার নেই। লিনার নদীতে গোসল করতে যাওয়ার অধিকারও নেই আর। চাষাবাদ সব তাকে একাই করতে হচ্ছে। একসময় তারা দুজন একসঙ্গে বাগানে কাজ করার সময় কত হাসাহাসি করত; এখন আর সেই হাসির শব্দ শুনি না। তোমার ব্যাপারে প্রথম দিকে লিনা আমাকে সতর্ক করতে চেয়েছিল, সে কথা এখন আমাকে বলতে চায়, মনে করিয়ে দিতে চায়। কিন্তু যে কারণে সে আমাকে সতর্ক করতে চেয়েছিল, সে কারণটাই তার সতর্কীকরণের কাজটা অযৌক্তিক বানিয়ে ফেলে। একটা কথা মনে পড়ছে, স্যার বেঁচে থাকা অবস্থায় তুমি আমাকে বলেছিলে—দাসরা মুক্ত মানুষের চেয়ে বেশি মুক্ত। একজন হলো গাধার চামড়া গায়ে দেওয়া একটা সিংহ, আরেকজন হলো সিংহের চামড়ার নিচে গাধা। আমি জানি, আমার শুরু হয়েছে জেনদের ঘরের ছোট রুমের আড়াল থেকে। আমি জানি, শিকারি পাখির নখর তোমার ওপর নেমে এসেছিল। কারণ তুমি আমাকে যেভাবে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেছ, তোমাকেও ওই নখরগুলো ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছে, আমি থামাতে পারিনি। আরেকটা কথা বলার আছে, পুরুষ সিংহ মনে করে, তার কেশরই সব। কিন্তু সিংহী তা মনে করে না। কথাটা আমি জেনের কাছ থেকে শুনেছিলাম। রক্তাক্ত পা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। সে ঝুঁকি নিয়েছে। তুমি যে কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছ, তাকে রক্ষা করার জন্য সব রকম ঝুঁকি নিয়েছে জেন।

এই রুমে আর জায়গা নেই। আমার কথাগুলো মেঝে ছেয়ে ফেলেছে। এখন থেকে আমার কথা শুনতে হলে তোমাকে দাঁড়াতে হবে। দেয়ালে সমস্যা তৈরি করে। বাতির আলো খুব ক্ষীণ, ভালো কিছু দেখা যায় না। আমি এক হাতে বাতি ধরে আছি, আরেক হাতে চিঠি খোদাই করছি। আমার হাত ব্যথা করছে। কিন্তু তোমাকে আমার কথা বলতেই হবে। তুমি ছাড়া আর কাউকে বলতে পারব না এসব। আমি দরজার কাছে এখন, প্রায় শেষ করে ফেলেছি। আমার কথা বলা যখন শেষ হবে, তখন রাতের বেলা আমি কী করব? স্বপ্ন আসবে না আর। হঠাৎ মনে পড়ছে, তুমি তো আমার কথা পড়বে না। কিন্তু আমার কথার চিঠি পড়বে না। কিভাবে পড়তে হবে, তোমার জানার দরকার নেই। হতে পারে, তুমি একদিন জানবে। যদি জানতে পারো, তাহলে এই খামারে, এই বাড়িতে চলে এসো। তুমি আমার কথাগুলো না পড়লে কেউ পড়বে না। খুব নিকটে এবং একেবারে খোলা এই সতর্ক শব্দগুলো, নিজেদের মধ্যেই কথা বলবে। সম্ভবত এই শব্দগুলোর বাতাস দরকার; বাতাস আছে বাইরের জগতে। ওপরের দিকে উড়ে যাবে, তারপর পড়তে থাকবে, ছাইয়ের মতো পড়তে থাকবে বাসন্তীকুসুম আর ম্যালো ফুলের জমিনে, নীলকান্তমণি হ্রদের ওপরে, চিরন্তন হেমলকের এলাকা ছাড়িয়ে, রংধনু-কাটা মেঘের ভেতর দিয়ে পড়তে পড়তে মাটির বুকে সুরভি ছড়াবে। লিনা সহায়তা করবে। সে এই বাড়িটাতে বিভীষিকা দেখে। তাকে মিস্ট্রেসেরও দরকার। আমি জানি, সে আগুন পছন্দ করে।

দেখতে পাচ্ছ? তোমার কথাই ঠিক। এ মিনহা মাই। আমি ঊষর প্রান্তর হয়ে গেছি। কিন্তু আমি ফ্লোরেন্সই আছি। পুরোপুরি। ক্ষমাবঞ্চিত। ক্ষমাহীন। বিবেকহীন, সোনা। একটুও নেই বিবেক। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? দাস। শেষে আমি মুক্ত।

আমার ভেতরে একটা দুঃখ বয়ে বেড়াতেই হবে—আমার মা এই মুহূর্তে আমাকে কী বলছে, আমি জানতে পারছি না। আমি তাকে কী বলতে চাই, তা-ও সে জানতে পারছে না। মাই, তুমি খুশি হতে পারো। আমার পায়ের তলা এখন সাইপোশের মতো শক্ত।

 

 

ওরা কেউই তোমার ভাইকে নেবে না। আমি ওদের রুচি সম্পর্কে জানি। অন্য যেকোনো সাধারণ জিনিসের চেয়ে স্তনে ওদের বেশি আকর্ষণ। তোমার স্তন খুব তাড়াতাড়ি বড় হচ্ছে। তোমার ছোট মেয়েলি বুক ঢেকে রাখার কাপড় তোমার স্তনের ওপর বিরক্তিকর মনে হওয়ার কথা। ওরা তোমার স্তনের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি ওদের তাকিয়ে থাকা দেখেছি। আমাদের থাকার এলাকার ছেলেদের একজন ফিগো। তার কাছে তোমাকে দিলেও কোনো লাভ হতো না। ফিগোর কথা তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই। ঘোড়া নিয়ে ঘুরে বেড়ানো কয়েকজনের মধ্যে ও ছিল সবচেয়ে শান্তশিষ্ট। উঠানে তোমার সঙ্গে খেলত ফিগো। আমি ওর জন্য রুটির উপরিভাগ আর মিষ্টি রুটি রেখে দিতাম, অন্যদের জন্য নিয়ে যাবে। ওর মা বেস আমার ইচ্ছার কথা জানত। একমত ছিল সেও। আমি যেমন তোমাকে দেখে রাখতাম, সেও ফিগোকে বাজপাখির মতো চোখে চোখে রাখত। কিন্তু তাতে দীর্ঘস্থায়ী ভালো কিছু আনতে পারেনি, সোনা। সুরক্ষার কোনো পথই ছিল না। একটাও না। জুতার জন্য তোমার দুর্বলতা ছিল বলে আরো ছিল না। মনে হতো, তুমি যেন তাড়াতাড়ি করে তোমার স্তন বড় করে তুলছ; বয়স্ক দুজন বিবাহিত নারী-পুরুষের ঠোঁটও যেন দ্রুত আরো বেশি নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে।

আমার কথা বিশ্বাস করো। তোমাকে রক্ষা করার কোনো উপায়ই ছিল না। ধর্মশিক্ষার ভেতরেও তেমন কিছু ছিল না, যার অজুহাতে তাদের ‘না’ বলা যায়। আমি রেভারেন্ড ফাদারকে বলার চেষ্টা করেছি। আশা করেছিলাম, আমরা পড়া শিখলে তুমি একটা পথ বেছে নিতে পারবে। রেভারেন্ড ফাদারের মনে দয়ামায়া ছিল, সাহস ছিল। তিনি বলেছিলেন, ঈশ্বরও সেটাই চান। ওরা তাঁকে জরিমানা করলে, বন্দি করে রাখলে কিংবা বন্দুক নিয়ে তাড়া করলেও কিছু যায়-আসে না, তিনি আমাদের পড়াবেন। অন্য যে পাদ্রিরা আমাদের পড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে এ রকম খারাপ আচরণ করেছিল তারা। তিনি বলেছিলেন, আমরা পড়াশোনা শিখতে পারলে ঈশ্বরকে আরো বেশি ভালোবাসতে পারব। আমি অবশ্য অত কিছু জুঝি না; আমি শুধু জানি, পড়াশোনার মধ্যে জাদু আছে।

সাদা চুলওয়ালা লম্বা লোকটা যেদিন খেতে এলেন, আমি বুঝেছিলাম, খাবারগুলো তিনি ঘৃণা করেন। তাঁর চোখ দেখে আমি বুঝেছিলাম, সেনিওর, সেনিওরা কিংবা তাঁদের ছেলেদের কথা তিনি বিশ্বাস করছেন না। তাঁর মনমানসিকতা আলাদা মনে হলো। তাঁর দেশ এখান থেকে অনেক দূরে। তাঁর মনের মধ্যে পাশবিক কিছু নেই। সেনিওর আমার দিকে যে দৃষ্টিতে তাকান, তাঁর চোখে সেই দৃষ্টি দেখিনি। তিনি কিছুই চাননি।

তোমার বাবা কে আমি জানি না। অন্ধকারে তাদের কাউকে আমি ভালো করে দেখতে পাইনি। তারা এসে বেসসহ আমাদের তিনজনকে একটা ছাউনিতে নিয়ে যায়। পিপার ওপর বসা মানুষের ছায়া দেখতে পাই। আমাদের নিয়ে যাওয়ার পর তারা উঠে দাঁড়ায়। তারা বলে, তাদের বলা হয়েছে আমাদের তুলে নিয়ে যেতে। রক্ষা পাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই নেই। এখানে নারী হওয়া মানে শরীরের উন্মুক্ত ঘা হয়ে থাকা। সেই ঘা কখনো শুকায় না। একবার যদি কেটেই যায়, সেখানে পচে পুঁজ হবেই।

আমাদের পরিবারগুলোর রাজা আর অন্য রাজার মধ্যে অনেক দিন ধরে অপমানজনক কথাবার্তা চলাচল করছিল। আমার মনে হয়, গবাদি পশু, নারী, পানি, ফসল—এদের ওপরে যত বেশি অমর্যাদা চাপানো যায়, পুরুষদের ফুলেফেঁপে ওঠা তত দ্রুত হয়। শেষমেশ সব কিছুর মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং তাদের পরিবারের লোকেরা আমাদের থাকার জায়গা পুড়িয়ে দেয়। যাদের মারতে পারে না এবং আপাতত বেচতে পারে না, তাদের জড়ো করে নিয়ে যায়। আমাদের লতা দিয়ে একজনের সঙ্গে আরেকজনকে বেঁধে নিয়ে যায়, চারবার হাতবদল হয়। প্রতিবারই আগের চেয়ে ভালো ব্যবসা করে তারা, পরেরবার আরো বাছাই করা হয় আমাদের ভেতর থেকে। আগের চেয়ে আরো বেশি মারা যায় আমাদের নারীরা। আমাদের সংখ্যা আরো বাড়ে কিংবা আরো কমে। শেষে আমাদের সত্তর কিংবা একশজনের দলকে একটা খোঁয়াড়ে আটকে রাখা হয়। সেখানে কিছু মানুষকে দেখে জীবিত না মৃত বুঝতে পারি না আমরা। তাদের ত্বক দেখে আমাদের এ রকম বিভ্রম হয়। যারা আমাদের পাহারা দেয়, আমাদের বিক্রি করার কাজ করে, তাদের গায়ের রংও কালো। তাদের দুজনের মাথায় হ্যাট, গলায় অদ্ভুত রকমের কাপড় পেঁচানো। তারা আমাদের ভরসা দিয়ে বলে, সাদা ত্বকের লোকেরা আমাদের খেয়ে ফেলতে চায় না। তবু সব রকমের দুর্ভোগ চলতে থাকে। মাঝেমধ্যে আমরা গান গাই। আমাদের কেউ কেউ লড়াই করে। আমরা বেশির ভাগ ঘুমাই অথবা কান্নাকাটি করি। তারপর সাদা লোকেরা আমাদের ভাগ করে ডিঙিতে তোলে। আমরা একটা বাড়িতে আসি, যেটা সমুদ্রে ভাসে। নদী কিংবা সমুদ্র—সব পানিতেই হাঙর। সাদা লোকেরা আমাদের যেভাবে পাহারায় রাখে, পানির হাঙরগুলোও সেভাবেই খুশি হয়ে অপেক্ষায় থাকে—এখানে অনেক খাবার পাবে।

চারপাশে ঘুরঘুর করা হাঙরদের ডাকি আমি; কিন্তু হাঙরগুলো আমাকে এড়িয়ে যায়। মনে হয় জানে, আমার ঘাড়ে, কোমরে, পায়ের গোড়ালিতে লাগানো শিকলের চেয়ে আমি তাদের দাঁতকেই বেশি পছন্দ করি। ডিঙি কাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কয়েকজন ঝাঁপিয়ে পড়ে, আরো কয়েকজনকে হাঙররাই টেনে নামায়। আমরা আর ওদের রক্তের চিহ্নও দেখি না। আমরা যারা জীবিত থাকি, তাদের আবার পাহারায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তারপর আমাদের সমুদ্রে ভাসমান বাড়িটায় তোলা হয়। ওখানে প্রথম ইঁদুর দেখি। আমরা মরে যাওয়া পথ বের করতে পারি না। আমাদের কেউ কেউ চেষ্টা করে, কেউ কেউ তেল জড়ানো গাছ-আলু না খেয়ে উপোস থাকে, শেষে মারা যায়। আমাদের কেউ কেউ গলায় কাপড় পেঁচিয়ে আত্মত্যার চেষ্টা করে।  রাতদিন অনুসরণ করা হাঙরদের কাছে তাদের মৃতদেহ ফেলে দেওয়া হয়। আমি জানি, আমাদের চাবুক মেরে তারা আনন্দ পায়। কিন্তু তাদের নিজেদের মধ্যেও কাউকে কাউকে চাবুক মেরে অন্যরা আনন্দ পায়। এখানে নিয়মের চেয়ে বরং অনিয়মের রাজত্ব চলে। কে মরে, কে বাঁচে তার ঠিক নেই। অন্ধকারের ভয়াবহ অবস্থায় কে বিলাপ করছে, কে চিৎকার করে কাঁদছে—কেউ বলতে পারে না। নিজের বর্জ্যের মধ্যে বেঁচে থাকা এক কথা, অন্যের বর্জ্যের মধ্যে বেঁচে থাকা আরেক কথা।

মানুষের মুখে বার্বাডোজ নামটা শুনলাম। কেউ কেউ চেষ্টা করে আত্মহত্যা করেছে। আমি চেষ্টা করেও কেন পারলাম না—বহুবার এ রকম বিমূঢ় ভাবনায় পড়েছি। আত্মহত্যা করার জন্য কিনার পেরিয়ে পানিতে পড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। মন এক রকম পরিকল্পনা করে; শরীরের অন্য রকম ইচ্ছা থাকে। বার্বাডোজে এসে আমার স্বস্তি লাগে; মুক্ত বাতাস, মাথার ওপর বাড়ির রঙের আকাশটার দিকে তাকিয়ে আমি মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। গাদাগাদি হয়ে থাকা মানুষের গা থেকে ওঠা বাষ্পের মধ্যে ছিলাম। এখন সূর্যের পরিচিত তাপের জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করছি। পায়ের তলার মাটির জন্য কৃতজ্ঞতা। খোঁয়াড়ের অতিরিক্তসংখ্যক মানুষের মধ্যে থাকার কথাটা আর মনেই করতে চাইছি না। কার্গোর খোলের চেয়েও ছোট ছিল খোঁয়াড়টা। একজন একজন করে আমাদের লাফ দিতে, নিচু হতে এবং আমাদের মুখ হাঁ করতে বলা হতো। এসব কাজে শিশুরা ছিল সবচেয়ে ভালো। হাতি পা সরিয়ে নেওয়ার পর পায়ের নিচের ঘাস যেমন মাথা তোলে, এই শিশুরাও তেমন লাফিয়ে জীবনটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। অনেক দিন আগেই তারা কান্না ভুলে গেছে। এখন বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকে ক্ষমতাওয়ালা মানুষদের খুশি করার জন্য, নিজেদের সক্ষমতা জানানোর জন্য এবং বেঁচে থাকার যোগ্যতা দেখানোর জন্য। কী রকম অস্বাভাবিক তাদের অস্তিত্বের লড়াই। বড় বড় দাঁতওয়ালা একদল লোক চাবুকের আংটার ভেতর আঙুল ঘোরাচ্ছে। ব্যগ্র কামনায় আরক্তিম মানুষের মুখ। কিংবা যেমন জেনেছি, স্থলভাগের জীবনে নিঃশেষ হওয়ার পরও আমাদের নিয়ে আসা হয় এখানে, ফসল তোলার সময় কাজ করানোর জন্য। সাপ, বড় বড় পশমওয়ালা মাকড়সা, গিরগিটি—যেগুলোকে এখানে গেটর বলা হয়—এসবের মধ্যে কাজ করতে হতো। একবার আখক্ষেতে কাজ করার সময় গরমে প্রচণ্ড ঘাম হচ্ছিল আমার; আমাকে একটা খোলা চত্বরে নিয়ে বসানো হলো। তখনই জানলাম, আমাকে আমার দেশ থেকে আনা হয়নি, আমার পরিবার থেকেও নয়। জানলাম, আমি নেগ্রিটা। ভাষা, পোশাক, দেব-দেবতা, নাচ, অভ্যাস, সাজ, গান—সব কিছুরই মিশ্রণ আমার ত্বকের রঙের সঙ্গে। সুতরাং গায়ের রং কালো হওয়ার কারণেই সেনিওর আমাকে কিনে নিয়েছিল, আখক্ষেত থেকে তুলে নিয়ে জাহাজে করে বহুদূর—উত্তরে আমাকে তার তামাকের ক্ষেতে কাজ করতে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন একটা আশা ছিল। কিন্তু প্রথমত, শুধু সংগমের জন্য আমাদের ব্যবহার করা হয়। আমাকে, বেসকে এবং আরেকজনকে সেই ছাউনির নিচে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের তুলে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব্ব দেওয়া হয়েছিল যাদের, পরে তারা ক্ষমা চায়। পরে কর্মিসর্দার আমাদের প্রত্যেককে একটা কমলা দেয়। তারপর যা হওয়ার তা তো ভালোই। দুবারই ভালো হয়েছে—ফলাফল তুমি এবং তোমার ভাই। কিন্তু তারপর আসে সেনিওর এবং তার স্ত্রীর কথা। রেভারেন্ড ফাদারকে আমার কথা বলার চেষ্টা করি। কিন্তু লজ্জায় আমার কথাগুলোর আর কোনো অর্থ আসতে চায় না। তিনি বুঝতে পারেন না কিংবা বিশ্বাস করতে পারেন না। তিনি আমাকে হতাশ না হতে, দুর্বল না হতে পরামর্শ দেন। সর্বান্তঃকরণে ঈশ্বরকে এবং যিশুকে ভালোবাসতে উপদেশ দেন। বিচারের দিনে আমার মুক্তি মিলবে, সেই মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতে বলেন। যে যা-ই বলুক না কেন, আমি আত্মাহীন পশু নই, আমি অভিশাপ নই। তিনি আরো বলেন, প্রটেস্ট্যান্টরাই ভুল করেছে, পাপ করেছে। যদি মনে ও কাজে নিষ্পাপ থাকি, তাহলে এই দুঃখভরা জীবন-উপত্যকা থেকে চিরন্তন একটা জায়গায় আমাকে স্বাগত জানানো হবে। আমিন।

কিন্তু তুমি একটা খারাপ মহিলার জুতা চেয়েছিলে। তোমার বুকে জড়ানো একটা কাপড় ভালো কিছু আনতে পারেনি তোমার জন্য। সেনিওরের চোখ আটকে যায় তোমার ওপর। খাবারের পর লম্বা লোকটা আমাদের থাকার এলাকায় সেনিওরের সঙ্গে হেঁটে দেখতে আসেন। পাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে গান গাইছিলাম; একটা সবুজ পাখির গান—বানর তার ডিম ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে; আর পাখিটা লড়াই করতে করতে মারা যাচ্ছে। আমি তাদের কথাবার্তার শব্দ শুনতে পেয়ে তোমাকে আর তোমার ভাইকে তাদের দৃষ্টির সীমায় নিয়ে আসি।

তখন ভাবলাম একটা সুযোগ। সুরক্ষা দেওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু মানুষের মধ্যে তো ভিন্নতা আছে। ওই জুতা পরে তুমি দাঁড়ালে এবং লম্বা লোকটা বললেন, ঋণের টাকার বদলে তিনি আমাকে নিতে চান। আমি জানতাম, সেনিওর সেটা হতে দেবে না। আমাকে না, তোমাকে নেওয়ার কথা বললাম। আমি বললাম, আমার মেয়েকে নিয়ে যান। কারণ আমি দেখলাম, লম্বা লোকটা তোমার দিকে তাকিয়েছেন, তিনি একটা মানবশিশুকে দেখছেন, আটটা জিনিসের মধ্যে একটা হিসাবে নয়। একটা অলৌকিক কিছু ঘটতে পারে, আশা করে আমি তাঁর সামনে নতজানু হলাম। তিনি হ্যাঁ বললেন।

এটা অলৌকিক কিছু নয়। ঈশ্বরের দান। একটা করুণা। একজন মানুষ এই করুণা দেখিয়েছেন। আমি নতজানু হয়েই রইলাম। ধুলার মধ্যে হাঁটু মুড়ে রইলাম। প্রতি রাতে প্রতিদিন ওখানেই আমার মনটা পড়ে থাকবে, যত দিন পর্যন্ত না তুমি আমি যা জানি, আমি যা বলতে চাই, তা বুঝতে পারো। অন্যকে অধিকার দেওয়া কঠিন কাজ; অন্যের অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা অন্যায়; তোমার ওপর অন্যকে অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া খারাপ কাজ।

আহা, আমার ফ্লোরেন্স! আমার সোনা! এ টুয়া মাইয়ের কথা শোনো!

মন্তব্য