kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

উ প ন্যা স

অপরাজিতা

মোস্তফা কামাল

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮৬ মিনিটে



অপরাজিতা

অঙ্কন : ধ্রুব এষ

পূর্ণিমার রাত। মধ্য আকাশে ঝলমলে মায়াবী চাঁদ।

বসন্তে জোছনার রাত যেন অন্য সব রাতের চেয়ে আলাদা। আজ বসন্তের প্রথম দিন। শুরুর দিনেই বসন্ত তার সৌন্দর্য, রূপ-লাবণ্য প্রকৃতিতে জানান দিয়েছে। এ জন্যই বুঝি বসন্তকে ঋতুরাজ বলা হয়।

নীলিমার জীবনে ঋতুরাজের প্রভাব বড্ড বেশি। বসন্তে নীলিমা এক অন্য মানুষে পরিণত হয়। তার ভেতরে অন্য রকম একটা ভালো লাগা কাজ করে। সারাক্ষণ হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে যায় তার। বড় কোনো কষ্টও তাকে কাবু করতে পারে না। বাড়ির বারান্দায় এসেই সে টের পায়, আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে!

দীর্ঘদিন বন্দি থাকার পর মানুষ যেমন মুক্তির স্বাদ পায়, নীলিমা সে রকম স্বাদ পাচ্ছে। বেশ কিছুদিন ধরে নীলিমার মনের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেই ঝড়ে তার টালমাটাল অবস্থা হয়েছে। দমবন্ধকর এক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার করেছে কয়েকটা দিন। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সিদ্ধান্ত নিতে না পারার যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয়েছে সে। অনেক রাত কেটেছে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে। তার ভেতরে কত যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তা কাউকে বুঝতে দেয়নি। যে তার মাকে সব কিছু শেয়ার করে, সেও তার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ আড়াল করেছে। শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকে সেই অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পেয়েছে। অথচ নীলিমা কত গভীরভাবে ভালোবেসেছিল তানজীবকে! তাকে নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল তার! এককথায় সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

কী আশ্চর্য! তাতেও নীলিমার যেন কোনো দুঃখ নেই। কোনো রকম কষ্টও পাচ্ছে না সে। বরং তার মনের মধ্যে ভীষণ একটা ভালো লাগা কাজ করছে। সে চাঁদের আলো গায়ে মেখে ছাদের এমাথা-ওমাথা ঘুরছে। হঠাৎ কী মনে করে যেন দৌড়ে সে বাসায় যায়। ভীষণ উত্ফুল্ল কণ্ঠে মাকে ডাকে, মা মা!

নীলিমার আনন্দ দেখে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মাহমুদা বেগম। এই কিছুক্ষণ আগেও নীলিমা মন খারাপ করে বসে ছিল। কারো সঙ্গে কোনো কথা নেই। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া নেই। ভেতরে ভেতরে কোনো একটা যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সেই নীলিমার আনন্দ দেখে মাহমুদা বেগমের মনও ভালো হয়ে যায়।

ধানমণ্ডিতে নীলিমাদের পাঁচতলা পৈতৃক বাড়ি। নীলিমার দাদা আলিমুল হক ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী। তাঁর একমাত্র সন্তান নাজমুল হক। তিনি তাঁর বাবার রেখে যাওয়া বাড়িতেই থাকেন। বাড়িটা বহুদিনের পুরনো। প্রতিবছর সংস্কারকাজে কিছু টাকা খরচ হয়। এ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই তাঁর। যদিও প্রতি মাসে তিনি দেড় লাখ টাকার মতো ভাড়া পান। বছরে দুইবার মা-বাবার মৃত্যুবার্ষিকীতে মিলাদ মাহফিলে খাওয়াদাওয়া বাবদ কিছু খরচাপাতি হয়। মা-বাবার জন্য খরচ বলতে ওটুকুই। ট্যাক্সসহ অন্যান্য খরচ বাদে লক্ষাধিক টাকা প্রতি মাসে তাঁর ব্যাংকে জমে। তার পরও চাকরির ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত মনোযোগী। তিনি মনে করেন, কাজ ছাড়া কোনো পুরুষ মানুষের বেঁচে থাকা অর্থহীন। মেয়েদের ব্যাপারেও তাঁর উপলব্ধি একই রকম। তিনি মনে করেন, পরগাছা হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। তিনি নীলিমাকে প্রায়ই বলেন, লেখাপড়া শেষ করেছ। এখন চাকরিবাকরিতে ঢোকো। নিজের পায়ে দাঁড়াও। বিয়ের পর স্বামীর বোঝা হয়ে থাকা ঠিক না। আর মেয়েরা লেখাপড়া করে ঘরে বসতে থাকবে কেন? তাহলে এই লেখাপড়ার কী মূল্য?

বাড়ির পাঁচতলায় নীলিমাদের বসবাস। নিচের চার ফ্লোর ভাড়া দেওয়া। বাড়ির দক্ষিণ দিকে দীর্ঘ বারান্দা। দক্ষিণ দিকেই বিশাল বড় মাঠ। সংগত কারণেই আলো-বাতাসে ভরপুর থাকে বাড়িটা। বারান্দায় দাঁড়ালে আকাশটা পুরোপুরি দেখা যায়। মেঘহীন নীল আকাশে থালার মতো ভরা চাঁদ দেখে নীলিমার বুকটা হাহাকার করে ওঠে। চাঁদের আলো কত দিন সে দেখে না! বারান্দায় দাঁড়িয়ে কতক্ষণ সে চাঁদের আলো উপভোগ করে। তারপর সে দৌড়ে বাড়ির ছাদে যায়। চাঁদের আলো গায়ে মেখে আনন্দে ফেটে পড়ে। স্থির দৃষ্টিতে সে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বিষণ্ন মনটা চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

অনেক দিন পর নীলিমাকে হাসিখুশি দেখে মাহমুদা বেগম উত্ফুল্ল। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আবেগের ভঙ্গিতে বললেন, কিরে, মা!

মা, এসো আমার সঙ্গে! জোছনা দেখবে।

নীলিমা এখন যা বলবে তা-ই তিনি শুনবেন। তিনি ওর এই আনন্দের সঙ্গী হবেন। তিনি বেশ আগ্রহের সঙ্গেই বললেন, জোছনা কোথায় দেখব?

ছাদে চলো। অসম্ভব চমৎকার জোছনা। জোছনা দেখলে তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।

আমার মন এরই মধ্যে ভালো হয়ে গেছে।

কেন, মা?

তোর মন ভালো দেখলে আমারও মন ভালো হয়ে যায়।

তাই নাকি, মা!

কেন, তুই বুঝিস না?

কিছু কিছু বুঝি। আর কথা নয়, মা। চলো তো এবার!

নীলিমা মাকে জড়িয়ে ধরে হাঁটতে থাকে। ছাদে পা রেখেই নীলিমা মাকে উদ্দেশ করে বলে, ওই দেখো কত বড় চাঁদ! মন ভালো করা জোছনা!

মাহমুদা বেগম খুশিতে আটখানা। তিনি মহাখুশিতে বললেন, ওয়াও! সত্যিই অসাধারণ! সত্যিই মন ভালো করা জোছনা! তবে জোছনা দেখার চেয়েও বেশি ভালো লাগছে তোকে দেখে।

নীলিমা আবারও ওর মাকে জড়িয়ে ধরে। তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে। ওকে দেখে কী যে ভালো লাগে মাহমুদা বেগমের! তিনি এই আনন্দঘন মুহূর্তটা ধরে রাখতে চান। নীলিমা কেন আজ এতটা উদ্বেলিত, তা বোঝার চেষ্টা করেন। কিছুক্ষণ পর নীলিমাই বলল, জানো মা, আজ আমার আর কোনো দুঃখ নেই, কষ্ট নেই।

বাহ্! তোর কথা শুনে আমার কী যে ভালো লাগছে!

আমি অনেক ভেবেছি। দুঃখকষ্ট পুষে রেখে লাভ নেই। নতুন করে শুরু করতে হবে আমাকে। তুমি আমার জন্য শুধু দোয়া কোরো!

অবশ্যই, মা। তোর জন্য আমি সব সময় দোয়া করি। তুই ভালো থাকবি। অবশ্যই ভালো থাকবি।

মা, তানজীব...

নীলিমা কথা শেষ করতে পারেনি। ওর মুখ থেকে কথা টেনে নিয়ে মাহমুদা বেগম বললেন, কী হয়েছে তানজীবের!

নীলিমা শান্ত ও ধীর ভঙ্গিতে বলল, কিছু হয়নি, মা।

তাহলে!

আগে আমার কথাটা শোনো, মা!

আচ্ছা আচ্ছা, বল।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি...

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মাহমুদা বেগম বললেন, কী সিদ্ধান্ত!

আহা মা, আগে আমার কথা শেষ করি!

স্যরি স্যরি, বল।

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তানজীবকে বিয়ে করব না।

বিস্ময়ে মাহমুদা বেগমের চোখ কপালে উঠল। তিনি কী বলবেন, তা ভেবে পাচ্ছেন না। তানজীবের সঙ্গে নীলিমার প্রায় ছয় বছরের সম্পর্ক। দুজন দুজনকে গভীরভাবে ভালোবাসে। সারাক্ষণ একসঙ্গে ওদের ওঠাবসা। আনুষ্ঠানিকভাবে ওদের বিয়ে না হলেও সব ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে আছে ওরা। সবাই জানে, ওদের বিয়ে হচ্ছে। কী এমন ঘটল ওদের মধ্যে!

মাহমুদা বেগমকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে নীলিমা জানতে চায়, কী হলো, মা? বিস্মিত হয়েছ মনে হচ্ছে!

আচ্ছা, তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে নাকি! তুই কি বুঝে বলছিস; নাকি না বুঝে?

মা, আমি এখনো পাগল হইনি। তবে ওকে বিয়ে করলে অতি অল্পদিনের মধ্যেই পাগল হয়ে যেতাম।

কেন, কী এমন ঘটত যে তুই পাগল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছিস?

নীলিমা ওর মাকে খাটের ওপর বসায়। ও চেয়ার টেনে তার মুখোমুখি বসে। তারপর বলে, মা, তুমি আমাকে বিশ্বাস করো?

অবশ্যই করি।

আমি যে ভবিষ্যৎ রিড করতে পারি, এটা জানো?

তাই নাকি!

কেন, তুমি জানো না?

জানি। তোর অনেক কথাই ফলে। এই! তুই ভবিষ্যতের কথা কেমনে বলিস রে? আমার বংশে কিংবা তোর বাবার বংশে কেউ এমন ছিল কি না তা তো শুনিনি। তুই কার কাছ থেকে এই শক্তি অর্জন করলি?

আমি জানি না, মা। আমার ইনটিউশন বলে। আমার ব্রেনে আগাম মেসেজ দেয়।

আসলেই বিস্ময়কর ব্যাপার! আচ্ছা বল, তানজীবের ব্যাপারে কী মেসেজ পেয়েছিস?

ওর সঙ্গে আমার ম্যাচিং হবে না। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বিয়ের পরই ও ভিন্নরূপে আবির্ভূত হবে।

কী বলিস এসব তুই!

হ্যাঁ মা, সত্যি বলছি।

নীলিমা, তুই পাঁচ-ছয় বছর একটা ছেলের সঙ্গে মিশেছিস। তার সঙ্গে ওঠাবসা করেছিস। সবাই জানে তোরা স্বামী-স্ত্রী। আর এখন বলছিস ওকে বিয়ে করবি না! আমি মানুষকে মুখ দেখাব কেমনে? আমার সমাজ নাই? আমার আত্মীয়-স্বজন নাই?

মা, তুমি রাগ করছ কেন? তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টা করো। আমার মন বলছে, তানজীব হাজব্যান্ড হিসেবে ভালো হবে না। ও হয়তো বন্ধু হিসেবে ভালো। প্রেমিক হিসেবেও ভালো। কিন্তু হাজব্যান্ড হিসেবে নয়।

এসব ঢঙের কথা রাখ তো! আমি তো ওর খারাপ কিছু দেখি না। পাঁচ-ছয় বছর ধরে ওকে দেখে আসছি। আমি ছেলেদের খুব ভালো চিনি, বুঝছিস?

তুমি হয়তো বাবাকে চিনেছ, কিন্তু সব ছেলেকে নয়।

হতে পারে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তুই যখন তানজীবের সঙ্গে মিশতে শুরু করেছিস, তখন কেন মেসেজ পাসনি যে ওর সঙ্গে তোর ভালো ম্যাচিং হবে না! ছয় বছর পর কেন?

মা, তোমাকে কী বলেছি? ও হয়তো বন্ধু বা প্রেমিক হিসেবে অনেক ভালো, স্বামী হিসেবে নয়। এখন যেহেতু বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছে, আমি যখনই ওকে স্বামী হিসেবে ভাবি, তখন মনে হয় একটা ভুল মানুষকে বেছে নিচ্ছি। ও আমার স্বামী হিসেবে পারফেক্ট না। কিছুতেই আমি ওকে স্বামী হিসেবে দাঁড় করাতে পারছি না।

সত্যি বলছিস?

হ্যাঁ মা, সত্যি বলছি। তোমার সঙ্গে মিথ্যা বলব?

না মানে...তুই আবার অন্য কারো প্রেমে পড়িসনি তো!

মা, তুমি আমাকে কী ভাবো? আমি অন্য কারো সঙ্গে প্রেম করলে তুমি জানতে না?

মাহমুদা বেগম পাল্টা প্রশ্ন করলেন, সব কিছু তুই আমাকে বলিস?

অবশ্যই, মা। তোমার কাছে আমি কিছুই গোপন করি না। দেখো, তানজীবের সঙ্গে আমার পাঁচ-ছয় বছরের প্রেম, অথচ আজ ওর বিষয়ে অকপটে সব কথা তোমাকে বললাম।

তা বলেছিস।

বিশ্বাস করো, মা। বাবাকে হয়তো লজ্জায় অনেক কথা বলতে পারি না, কিন্তু তোমাকে সব বলি। পাঁচ-ছয় বছরে তানজীবের সঙ্গে কখন কোথায় কী করেছি, সবই তো তোমাকে বলেছি।

তাহলে এত ফ্রিলি ওর সঙ্গে মিশলি কেন?

ভুল করেছি। ঠিক হয়নি। এখন বুঝতে পারছি। তাই বিয়ে করে আরেকটা ভুল করতে চাই না।

দেখ, আমি সব সময় তোর মতামতকেই গুরুত্ব দিয়েছি। তোর ওপর কোনো দিন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিইনি। কখনো দেবও না। তবে আমার একটা পরামর্শ, তুই আরো চিন্তা কর।

আমি অনেক অনেক ভেবেছি, মা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ভাবনা-চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তাহলে আমাকে আরেকটু খুলে বলবি? ওর কোন সমস্যাটা তোর কাছে বেশি ধরা পড়েছে?

স্বাভাবিকভাবে তুমি বুঝতে পারবে না। ওর ডমিনেটিং ক্যারেক্টার।

এটা তুই ছয় বছরেও ধরতে পারলি না!

ও খুবই বুদ্ধিমান ছেলে। আমাকে বুঝতে দেয়নি। মা, প্লিজ! তুমি বাবাকে বুঝিয়ে বলো। বাবা যেন আবার আমাকে ভুল না বোঝেন।

আমি জানি না তোর বাবার রিঅ্যাকশন কী হবে! তা ছাড়া তানজীবের মা-বাবাকেই বা কিভাবে কথাটা বলবেন? ভীষণ অস্থির লাগছে। চল, বাসায় যাই।

মাহমুদা বেগম আর কোনো কথা বললেন না। তিনি নীলিমাকে নিয়ে বাসায় ফিরে এলেন।

 

নীলিমার বাবা নাজমুল হক ব্র্যাকের বড় কর্মকর্তা। তিনি অত্যন্ত শান্ত টাইপের মানুষ। কারো সাতেপাঁচে নেই। নিজের চাকরি আর পরিবার নিয়েই তাঁর ব্যস্ততা। তাঁর অফিস মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে। ছেলে নফেল পড়ে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে। প্রতিদিন সকালে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে যান তিনি।

মাহমুদা বেগম রান্নাঘরে ঢুকে দেখেন, জরিনা তখনো নাশতা রেডি করতে পারেনি। তিনি নিজে নাশতা তৈরির কাজে হাত লাগাতে লাগাতে বললেন, কিরে জরিনা, এত দেরি হলে চলবে? তোর খালু নাশতা না খেয়েই দৌড় মারবে। নফেলকে সকালে ক্লাস ধরতে হয়।

জরিনা কোনো কথা বলল না। সে তার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। মাহমুদা বেগম দুজনের নাশতা রেডি করে টেবিলে দিলেন। জরিনাকে বললেন চা রেডি করতে। নাজমুল হক ডাইনিংরুমে এসেই তাড়াহুড়া শুরু করলেন। কই, নাশতা হলো?

হুম্, শুরু করো। আমি চা নিয়ে আসছি। নফেল, নফেল!

নফেলও দৌড়ঝাঁপ করে এসে চেয়ার টেনে বসল। মাহমুদা বেগম প্লেট এগিয়ে দিলেন। রুটি আর সবজি দিলেন। ডিম ওমলেট দিলেন। তারপর তিনি নিজের হাতে চা বানিয়ে টেবিলে দিলেন। নফেলকে অতি দ্রুত খেতে দেখে মাহমুদা বেগম বললেন, আস্তে আস্তে খাও। এত তাড়াহুড়ার কিছু নেই। মস্তকে উঠলে কী করবে?

নফেল কিছুটা থেমে আবার সেই একই প্রক্রিয়ায় খাওয়া শুরু করল। মাহমুদা বেগম চোখ টেরিয়ে ছেলের খাওয়া দেখলেন। এবার কিছু বললেন না। নীরবে চা এগিয়ে দিলেন। নফেল চা-ও খায় দ্রুত। গরম চা কিভাবে যে দ্রুত খায়, বুঝতে পারেন না মাহমুদা বেগম।

নাজমুল হকের চা খাওয়া শেষ হওয়ার পর তিনি নফেলের দিকে তাকালেন। নফেল বুঝতে পারল, তাকে উঠতে হবে। সে চা অর্ধেক শেষ করেছে। পুরো শেষ না করেই উঠতে যাচ্ছিল। মাহমুদা বেগম থামিয়ে দিয়ে বললেন, চা-টা শেষ করো, তারপর যাও।

নফেল এবার মুখ খুলল। মা, দেরি হয়ে যাচ্ছে।

মাহমুদা বেগম আর কোনো কথা বললেন না। নফেল তাড়াহুড়া করে নাজমুল হকের সঙ্গে বের হয়ে গেল। তাদের বিদায় দেওয়ার সময় মাহমুদা বেগম বললেন, সাবধানে চলাচল কোরো। রাস্তাঘাটের যা অবস্থা!

বাপ-বেটা চলে যাওয়ার পর মাহমুদা বেগম নীলিমার রুমের দিকে এগিয়ে গেলেন। নীলিমা তখনো গভীর ঘুমে নিমগ্ন। কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর তিনি রান্নাঘরে ঢুকলেন। রান্নাঘরে ঢুকে কিছুক্ষণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। জরিনা বুঝতে পারছে, মাহমুদা বেগম ওর খাওয়া দেখে কিছুটা রেগেছেন। জরিনা মুখের খাবার গিলে এক গ্লাস পানি খায়। তারপর বলে, রাগ কইরেন না, খালা। খিদা লাগছে। কী করমু। আফায় দেখলাম গুমাইতেছে। আপনেগোডা রাইখ্যা দিছি। টেবিলেই আছে। আপনে এখন খাইবেননি, খালা?

তোরে আর রাগ করে কী করব? ক্ষুধা আমারও লেগেছে।

যাউগগা। আল্লায় বাঁচাইছে। আপনে রাগ করলে আর যামু কই?

তুই জগে পানি দে তো। নীলিমার কখন ঘুম ভাঙে! আমিও খেয়ে নিই।

আমি দিতেছি, খালা। আপনে শুরু করেন গা।

মাহমুদা বেগম খাওয়া শুরু করেন। খেতে খেতে নীলিমার কথা ভাবেন। নীলিমার বিষয়টা নিয়ে নাজমুলের সঙ্গে কথা বলা দরকার। কিন্তু কখন বলব? শোনার পর কী যে বলে! নীলিমা কী যে করে না, বুঝি না

 

দুই

সাইফুল আহমেদ মানুষটা অন্য রকম। অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত সততার সঙ্গে সরকারি চাকরি করেছেন। তাঁর কলিগরা যখন ঘুষের মধ্যে হাবুডুবু খেয়েছে, তখন তিনি জোর গলায় বলেছেন, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চাই, দুর্নীতিবাজের ফাঁসি চাই। এসব স্লোগান এ-ফোর সাইজের কাগজে তিনি নিজ হাতে লিখে বিলি করতেন।

সাইফুল সাহেবের কলিগরা তাঁকে নিয়ে হাসাহাসি করতেন। টিপ্পনী কেটে বলতেন, ইস! আমাদের আদর্শবান অফিসার! ঘুষ নাকি খায় না। পায় না তাই খায় না! মানুষে বলে না, সুযোগের অভাবে সৎ! সে রকম অবস্থা আর কি! বেশি সততা দেখালে একদিন ঠিকই ধরিয়ে দেব। টাকার বস্তা বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। তারপর গোয়েন্দাদের দিয়ে ধরা খাওয়াব। তখন বুঝবে কত ধানে কত চাল।

সাইফুল আহমেদের সততার কাছে কোনো ষড়যন্ত্রই হালে পানি পায়নি। সরকারের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে অবসরে যান তিনি। তাঁর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও কেউ লাগাতে পারেনি। ষড়যন্ত্রকারী কলিগদের কারণে হয়তো তিনি সচিব হতে পারেননি, তাতেও তাঁর দুঃখ নেই। তিন ছেলে মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। আর কী! এখন অফুরন্ত সময়। বই পড়ে আর ঘোরাঘুরি করে সময় কাটে তাঁর। মাঝেমধ্যে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে আমেরিকা ও কানাডায় যাতায়াত করেন। তাঁর বড় দুই ছেলে দুই দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। তারা উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ছোট ছেলে তানজীব আহমেদ ঢাকায় তাঁদের সঙ্গে থাকে।

তানজীব পররাষ্ট্র ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পাওয়ার পর সাইফুল আহমেদ ও তাহমিনা আহমেদের আনন্দ আর কে দেখে! তাঁরা দুজনই ছোট ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। এখন তাঁরা বেশ স্বস্তিতে আছেন। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাহমিনা শুরুই করেন ছোট ছেলেকে দিয়ে। জানেন তো, ভাই! আমার ছোট ছেলে তানজীব পররাষ্ট্র ক্যাডার সার্ভিসে ঢুকছে! বুঝলেন তো, ডিপ্লোম্যাটিক সার্ভিস—মানে কূটনৈতিক পেশা। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রদূত। মাশাআল্লাহ! এর চেয়ে আনন্দের ঘটনা আর কী আছে বলেন!

আত্মীয়দের কেউ যদি তানজীবের বিষয়ে কোনো ধরনের নেতিবাচক কথা বলেছে, তার আর রক্ষা নেই। বকাবাজি করে চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করবেন। আর গর্ব করে বলবেন, মুরোদ থাকলে এই রকম সোনার ছেলে একটা বানাও না! সেই মুরোদ তো হবে না! তাহলে শুধু শুধু অন্যের পেছনে কেন লাগো?

অতঃপর সেই আত্মীয়র সঙ্গে কথাবার্তা বলা তো বন্ধই, যোগাযোগও বন্ধ। তাঁর কথা, আমার পরিবারের ভালো দেখলে যে আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের চোখ টাটাবে, তাদের আমার দরকার নেই। তাদের সঙ্গে আমি কোনো সম্পর্কই রাখব না।

তানজীব এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব। শিগগিরই সে ফরেন পোস্টিংয়ে যাবে। তরুণ কূটনীতিক হিসেবে বিদেশে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। অবশ্য পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগদানের পর থেকেই তানজীবের ভাবভঙ্গি পাল্টে যায়। সে নীলিমাকে ভালোবাসে ঠিকই, কিন্তু নীলিমার কোনো কথার গুরুত্ব দেয় না। নীলিমাকে সে অবহেলা-অবজ্ঞা করে। প্রথম প্রথম নীলিমা ভাবত, তানজীব হয়তো ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না এমন নয়। কাজের চাপে কিংবা অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড থাকার কারণে এমনটি হতে পারে।

নীলিমা যখন বুঝল, সচেতনভাবেই তানজীব তাঁকে অবজ্ঞা করে। এমন ভাব করে, যেন তার মতো মেধাবী, তার মতো ভালো অফিসার দ্বিতীয় কেউ নেই। এ নিয়ে নীলিমা দু-একবার কথাও বলেছে তার সঙ্গে। ও বলেছে, আমিও তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছি। আমি ইচ্ছা করলেই বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারি। পরীক্ষা দিলে নিশ্চয়ই আমি খারাপ করব না।

নীলিমার কথা শুনে টিপ্পনী কেটে তানজীব বলে, বিসিএসে লাখ লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেয়। সুযোগ কয়জনে পায়?

তানজীবের কথায় ভীষণ কষ্ট পায় নীলিমা। সেই থেকেই নীলিমার সঙ্গে তানজীবের মনস্তাত্ত্বিক গ্যাপ তৈরি হয়েছে। এখন বিয়ের প্রসঙ্গ এলে নীলিমা আর আগের মতো উৎসাহ দেখায় না। তানজীব বেশ কয়েকবার বলতে চেয়েছে, শিগগিরই তার পোস্টিং হয়ে যাবে। কাজেই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে ফেলা ভালো।

নীলিমা শুনেও না শোনার ভান করে। বিষয়টাতে তানজীবের খটকা লাগে। সে মনে মনে ভাবে, কোনো কারণে নীলিমা আমার ওপর অভিমান করে আছে। তার মান ভাঙাতে হবে।

তানজীব সিদ্ধান্ত নেয়, শুক্রবার বন্ধের দিন নীলিমাকে নিয়ে সে বাইরে ঘুরতে যাবে। বৃহস্পতিবার রাতেই সে নীলিমাকে ফোন করে। তাকে সে ঘুরতে যাওয়ার বিষয়টি জানায়। নীলিমা তার ব্যস্ততার কথা জানায়। সে বলে, আমার পারিবারিক প্রগ্রাম আছে।

নীলিমা প্রথমবারের মতো তানজীবের অফার ফিরিয়ে দিল। আগে কখনোই সে এ রকম কোনো অজুহাত দেখায়নি। তানজীবের সঙ্গে কোথাও যাওয়ার অফার পেলে যত যা-ই থাকুক, সেসব কাজ বাদ দেবে। আজ প্রথম নীলিমার অসম্মতির কথা শুনে তানজীব বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, তোমার পারিবারিক প্রগ্রাম আছে! আমি কি জানতে পারি কী প্রগ্রাম?

না, তুমি জানতে পারো না।

কেন, খুব গোপন কিছু?

যতটুকু বলেছি ততটুকুই থাক। আর বেশি কিছু জানার প্রয়োজন নেই তোমার।

নীলিমা! তুমি এভাবে কেন বলছ? আগে তো তুমি এভাবে কথা বলতে না। তোমার কী হয়েছে বলো তো!

কিছু হয়নি। তোমার কথা শেষ হয়েছে?

তাহলে তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ না?

বললাম তো, আমার পারিবারিক প্রগ্রাম আছে।

ঠিক আছে, আমি তাহলে তোমার পারিবারিক প্রগ্রামে অংশ নিই?

না। তোমার যেতে হবে না।

আগে তো আমি তোমাদের সব পারিবারিক অনুষ্ঠানেই থাকতাম।

আগের কথা বাদ দাও।

কেন, এখন কী হয়েছে?

কিছু হয়নি।

তাহলে এমন কেন করছ?

কেমন করছি? আমি কি অস্বাভাবিক কিছু বলেছি?

হ্যাঁ। তুমি আগে এমনভাবে কথা বলতে না।

সব সময় কি মানুষ এক রকম করে কথা বলে?

শোনো নীলিমা, ছয় বছর ধরে তোমাকে আমি দেখে আসছি। তুমি কখনোই এ রকম ছিলে না। তোমার পরিবর্তনটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। খুব ভালো করেই টের পাচ্ছি।

ঠিক আছে। পেলে ভালো। আমি এখন রাখছি।

তানজীব আরো কিছু কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু সে তা বলার সুযোগ পায়নি। ফোন রেখে দিয়েছে নীলিমা। পরে আবার ফোন করে তানজীব। অনেকক্ষণ ধরে ফোনের রিং বাজতে থাকে। কিন্তু নীলিমা ফোনের রিসিভার তোলেনি।

তানজীব মনে মনে ভাবে, হঠাৎ কী হয়েছে নীলিমার! আমার কোনো কথায় কিংবা আচরণে সে কি খুব কষ্ট পেয়েছে! কষ্ট পেয়ে থাকলে ও আমাকে বলতে পারত! ও তো কখনোই কিছু বলেনি। না বললে কী করে বুঝব? না, আমার কিছুই ভালো লাগছে না। ও আমার ওপর রাগ করে থাকবে, এটা কী করে হয়! আমি কি ওর বাসায় চলে যাব! সরাসরি ওর সঙ্গে কথা বলব! বাসায় গেলে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটিয়ে বসে!

তানজীব নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, কী করতে পারে নীলিমা? ও কি বাসা থেকে আমাকে অপমান করে বের করে দেবে? না না! এসব আমি কী ভাবছি? এতটা অসামাজিক মেয়ে নীলিমা নয়। আর অপমান করলে করুক, আমাকে যেতেই হবে। ওর মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ও কেন আমার সঙ্গে এমন করছে তা জানতে হবে। আমার যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে, তাহলে আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইব। আমি চাই না আমাদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হোক।

তানজীব সারাক্ষণ নীলিমার কথা ভাবে। অন্য কিছুই আর তার মাথায় ঢুকছে না। নীলিমার কথা ভেবে ভেবে সে রাত পার করেছে। দুশ্চিন্তায় একটুও ঘুমাতে পারেনি।

তানজীবের ছটফটানির অবস্থা টের পান তাহমিনা আহমেদ। রাতে তিনি কয়েকবার তানজীবের রুমে এসে বসেন। তার কাছে জানতে চান, কী হয়েছে, বাবা? তুই এমন করছিস কেন? হঠাৎ কেমন যেন নীরব হয়ে গেছিস! হ্যাঁরে বাবা, নীলিমার সঙ্গে কিছু হয়েছে নাকি?

তানজীব আমতা আমতা করে বলে, না মা। তেমন কিছু হয়নি।

তাহলে তোর এত মন খারাপ কেন? আমি কখনোই তোকে এত মন খারাপ করতে দেখিনি।

ঘুম আসছে না।

কেন?

বুঝতে পারছি না।

সেকি! কারণ জানিস না?

কেন জানি ভালো লাগছে না কোনো কিছু।

তাহমিনা আহমেদ ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, লক্ষ্মী বাবা আমার! খুলে বল তো কী হয়েছে।

তানজীব শান্ত গলায় বলে, মা, নীলিমা আমার সঙ্গে রাগ করেছে।

কেন, কী হয়েছে?

জানি না, মা। আমার কোনো কথায় বা আচরণে ওর মন খারাপ হলো কি না তা-ও বুঝতে পারছি না।

কবে থেকে কথা বলে না?

এইতো দু-তিন দিন হলো।

আচ্ছা, তুই একটা কাজ কর। কাল তো তোর অফিস বন্ধ!

হুম্।

কাল তুই ওর সঙ্গে দেখা কর। কেন কথা বলে না তা বোঝার চেষ্টা কর।

আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছি, কিন্তু ওর নাকি কাল পারিবারিক প্রগ্রাম আছে।

সেটা তো থাকতেই পারে। তাহলে শনিবার কর। দেখা না হলে অভিমান ভাঙবে না। তুই আবার ফোন করে ওর কাছ থেকে সময় নে। দূরে কোথাও যা। সামনে তোদের বিয়ে। মান-অভিমান থাকলে দ্রুত মিটিয়ে ফেল।

সেটা বুঝতে পারছি, মা। কিন্তু কিভাবে যে কী করি!

আমি কি কথা বলব?

কার সঙ্গে? নীলিমার সঙ্গে?

হুম্।

ও আবার ব্যাপারটা কিভাবে নেয়!

কিভাবে নেবে? তার সঙ্গে তো কথাবার্তা হয়ই। আমি এমনি ওর ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করব। আর আমাদের বাসায় আসতে বলব। কথা বললে ওর মনোভাবটা বোঝা যাবে।

মা, দেখো আবার হিতে বিপরীত যেন না হয়!

আরে! কেন তা হবে? আমি তো আর জানি না তোদের মধ্যে মান-অভিমান চলছে। আমি সব সময় যে রকম কথা বলি, সে রকমই বলব।

আচ্ছা। তাহলে তুমি কাল ফোনে কথা বোলো।

ঠিক আছে। এখন তাহলে একটু ঘুম দে, বাবা।

আচ্ছা, মা।

তানজীব ঘুমানোর চেষ্টা করে। তাহমিনা আহমেদ নিজেদের রুমে চলে যান। তিনি ছেলের জন্য মনে মনে দোয়া করেন।

সকালে নাশতা সেরে ফোনের সামনে বসলেন তাহমিনা আহমেদ। নীলিমাদের বাসার ফোনে রিং করলেন। ফোন এনগেজড পেলেন। কিছুক্ষণ পর আবার ফোন করলেন। একই অবস্থা, এনগেজড। তাহমিনা আহমেদ বিরক্তির সুরে বলেন, এত সময় ফোন এনগেজড! ঘটনা কী? নীলিমার ভাইটা কী পড়ে যেন! ইউনিভার্সিটিতেই তো পড়ে মনে হয়। ওই ছেলে নিশ্চয়ই প্রেমে পড়েছে। সকালে সবাই যখন ঘুমে, তখন সে টেলিফোনে প্রেম করছে। কিন্তু এখন কি কেউ ল্যান্ডফোনে কথা বলে! মোবাইলের খরচ অনেক কম না! নাকি ফোনটাই নষ্ট?

তাহমিনা আহমেদ বিরক্ত হয়ে উঠে যান। তাঁর বিরক্তি দেখে সাইফুল আহমেদ বলেন, কী হয়েছে? সাতসকালে তুমি এত বিরক্ত...

একজনকে খুব জরুরি দরকার। কিন্তু ফোনে পাচ্ছি না।

সে জন্য এত বিরক্ত হওয়ার কী আছে?

বললাম তো, জরুরি দরকার।

মানুষটা কে?

নীলিমা।

নীলিমা কে?

নীলিমা কে মানে! তুমি চেনো না?

আমি তাকে চিনি!

আরে তানজীবের বন্ধু!

ও, আচ্ছা। তাই বলো! কী হয়েছে নীলিমার?

ওর সঙ্গে জরুরি কথা বলা দরকার।

ওর মোবাইলে ফোন দাও। ল্যান্ডফোন খারাপও তো থাকতে পারে।

ওর নাম্বার আছে কি না! আচ্ছা, দেখি।

তাহমিনা আহমেদ নিজের মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে নীলিমার নাম্বার আছে কি না চেক করলেন। ফোনলিস্টে নীলিমার নাম্বার পেয়ে ফোন করলেন ওই নাম্বারে। এবারও বিরক্তি প্রকাশ করে মোবাইলটা বিছানার ওপর ছুড়ে মারলেন। ব্যাপারটা লক্ষ করে সাইফুল সাহেব বললেন, একি! তুমি এমন করছ কেন?

আর বলো না। নীলিমার মোবাইলটাও বন্ধ!

তাই? আচ্ছা, কী হয়েছে আমাকে বলো তো!

ওদের মধ্যে মান-অভিমান চলছে। কী হয়েছে তা বোঝার জন্য।

ও, আচ্ছা। তুমি একটা কাজ করো। তানজীবকে ওদের বাসায় পাঠিয়ে দাও। ওরা দুজন কথা বললেই সব ঠিক হয়ে যাবে।

তা হবে।

শোনো, তুমি তা-ই করো। আর শুধু শুধু ফোন করে বিরক্ত হওয়ার দরকার নেই।

তাহমিনা আহমেদ কোনো কথা বললেন না। তিনি তানজীবের রুমের দিকে গেলেন। তানজীবকে ডাকলেন। তানজীব তখনো ঘুম থেকে ওঠেনি। তাহমিনা বুঝতে পারলেন, সারা রাত তানজীব ঘুমাতে পারেনি। তিনি আবার নিজের ঘরে গেলেন। সাইফুল আহমেদকে জানালেন, তানজীব ঘুমাচ্ছে।

বিস্ময়ের সঙ্গে সাইফুল আহমেদ বললেন, এখনো ঘুমাচ্ছে?

আরে তুমি জানো না! টেনশনে ও সারা রাত ঘুমাতে পারেনি।

এই বয়সে এ রকম একটু-আধটু হতেই পারে। তুমি চিন্তা কোরো না। ও ঘুম থেকে উঠুক। বিকেলের দিকে না হয় পাঠিয়ে দিয়ো।

তাহমিনা আহমেদ শুনলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, তুমি কি বাজারে যাবে?

কিছু লাগবে?

মাছ, তরিতরকারি কিছু লাগত।

আচ্ছা, যাচ্ছি।

সাইফুল আহমেদ বাজারের উদ্দেশে রওনা হলেন। তাহমিনা আহমেদ তাঁকে বিদায় দিয়ে আবার তানজীবের রুমের দিকে গেলেন। নরম গলায় তাকে ডাকলেন, তানজীব! তানজীব!

 

 

তিন

সকালে নাশতা শেষ করে সবে নিজের ঘরে গিয়ে বসেছেন নাজমুল হক। মাহমুদা বেগম মনে মনে ভাবেন, আজ নাজমুলের মুড ভালো। আজ ওকে নীলিমার বিষয়টা জানাই। তা না হলে ঝামেলা হয়ে যাবে। নীলিমা যেহেতু আপত্তি করছে, সেহেতু আর সামনে এগোনো ঠিক হবে না। নিশ্চয়ই ও বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতেই মাহমুদা বেগম রুমে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে নাজমুল হক বললেন, কি, বাজারে যেতেই হবে?

কেন, অন্য কোনো কাজ আছে?

না। তেমন কিছু নেই।

তাহলে যাও না। কিন্তু তার আগে আমার জরুরি একটা কথা আছে। সময় নিয়ে তোমার শুনতে হবে।

অবশ্যই শুনব। কী কথা বলো তো?

এখন শুনবে, না বাজার থেকে ফিরে এসে শুনবে?

বাজারে যাওয়া মাটি হতে পারে এমন কোনো কথা নয় তো?

মাহমুদা বেগম চিন্তায় পড়লেন। তিনি এখন বলবেন কি না তা নিয়ে ভাবেন। অনেকক্ষণ চিন্তাভাবনার পর বললেন, তুমি যদি পজিটিভলি বিষয়টা নাও, তাহলে মাটি হবে না। আর নেগেটিভলি নিলে হতে পারে।

আমি পজিটিভলি নেওয়ার চেষ্টা করব।

ঠিক তো?

অবশ্যই।

নীলিমার বিষয় নিয়ে আমি তোমাকে কিছু কথা শেয়ার করব। তুমি আগে শুনবে, তারপর যা বলার বলবে। শোনার আগেই উত্তেজিত কিংবা চিন্তিত হবে না।

আচ্ছা, হব না।

মেজাজ খারাপ করবে না।

ঠিক আছে, করব না।

নীলিমা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তানজীবকে বিয়ে করবে না।

মাহমুদা বেগমের কথা শুনে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন নাজমুল হক।

মাহমুদা বেগম বললেন, এই, বলার আগে কী বলেছিলাম? আগে আমি কথাটা শেষ করি, তারপর তুমি তোমার যা প্রতিক্রিয়া জানানোর জানিয়ো।

না, মানে তুমি এসব কী বলছ! নীলিমা বিয়ে করবে না মানে কী!

নীলিমা অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখেছে, তানজীবের সঙ্গে ওর দাম্পত্য জীবন সুখের হবে না।

এত দিন পর ওর এই উপলব্ধি হলো! আগে চিন্তা করেনি কেন? যখন প্রেম করেছিল, তখন খেয়াল ছিল না! না না। এটা হতে পারে না। তুমি ওকে বোঝাও। তানজীব পররাষ্ট্র ক্যাডার সার্ভিসে চাকরি পেয়েছে। সে অবধারিতভাবে রাষ্ট্রদূত হবে। ভাগ্য ভালো হলে পররাষ্ট্রসচিবও হতে পারে। তা ছাড়া ছেলেটার ফ্যামিলি খুব ভালো। আমাদের সমপর্যায়ের ফ্যামিলি।

সব ঠিক আছে। কিন্তু ওর কথা হচ্ছে, তানজীব বন্ধু হিসেবে খুব ভালো, তবে হাজব্যান্ড হিসেবে নয়।

তোমার মেয়ের মাথাটাথা খারাপ নাকি? একটা মানুষকে চেনার জন্য ছয় বছর সময় লাগে?

কী যে বলো! সারা জীবনেও কোনো মানুষকে চেনা যায় না। আমাদের পাশের বাসার শহীদ সাহেবের স্ত্রীর কথা তোমার মনে নেই? ত্রিশ বছর একসঙ্গে সংসার করল, এক খাটে ঘুমাল! তার পরও বেচারা স্ত্রীকে চিনতে পারল না। বুড়াকালে ভদ্রমহিলা বাসার ম্যানেজার ছেলের হাত ধরে চলে গেল! তোমার মেয়ে যে ছয় বছরে ছেলেটাকে চিনতে পেরেছে, এটাই তো ঢের!

এটা কোনো কথা হলো না। তুমি যদি দোষ ধরো, পদে পদেই ধরতে পারবে। আমিও তো ছেলেটাকে দেখে আসছি; আমার চোখে কখনোই খারাপ কিছু পড়েনি। ভদ্র ও বিনয়ী একটা ছেলে...

শোনো, তোমার সামনে সে হয়তো বিনয়ী সেজে থাকে। বিনয় দেখে সব কিছু বিচার করা যায় না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কত কত কর্মকর্তা কাজের মেয়েকে বিয়ে করেছে তা তুমি জানো? নিজের সুন্দরী বউ বিদায় দিয়ে কাজের মেয়েকে বিয়ের খবর পত্রিকায়ও এসেছে।

না না। এসব তোমার ভুল ধারণা। তুমি নীলিমার সঙ্গে কথা বলো। হয়তো দুজনের মধ্যে কোনো বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য হয়েছে। অনেক সময় ক্ষুদ্র ইস্যু থেকেও বড় সমস্যা হয়ে যায়।

আমি নিজেও বোঝার চেষ্টা করেছি। নীলিমাকেও বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু ওর এককথা, তানজীবের অতি ডমিনেটিং টেন্ডেন্সি আমার একেবারে পছন্দ নয়। আর তানজীব নাকি ওকে খুব আন্ডারমাইন্ড করে। এটা তো ঠিক না, তাই না?

আচ্ছা, আমি কি তোমাকে আন্ডারমাইন্ড করি? তানজীবের বাবা একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনিও নিশ্চয়ই তাঁর স্ত্রীকে আন্ডারমাইন্ড করেন না। তাহলে তানজীব কেন করবে?

শোনো, মানুষ ওপরে উঠলে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

তানজীব কী এমন ওপরে উঠেছে?

কী বলো তুমি! ও ফরেন সার্ভিসে ঢুকেছে। আজ বাদে কাল রাষ্ট্রদূত! ওপরে উঠছে না?

তাতে সমস্যা কী? আর এত কিছু চিন্তা করলে তো কোনো ছেলে-মেয়েরই বিয়ে হতো না।

ঠিক আছে, তুমি নীলিমাকে বোঝাও। কিন্তু একটা কথা, কোনোভাবেই মেয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে না।

চাপ সৃষ্টি কেন করব? আমি ওকে যুক্তি দিয়ে বোঝাব। ও যদি মনে করে আমি বেঠিক কিছু বলছি, তাহলে ও মানবে না!

ঠিক আছে, আমি নীলিমাকে ডাকছি। আরেকটা কথা, একেবারে রেগে কথা বলবে না। যা বলার বুঝিয়ে বলবে। ও যেন কোনো রকম কষ্ট না পায়। আর এটাও যেন না হয় যে তোমার কারণেই সে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছে।

ঠিক আছে, তোমার শর্ত মানলাম। নফেলকেও ডাকো। ওরও তো মতামত থাকতে পারে।

ঠিক আছে।

মাহমুদা বেগম দরাজ গলায় নীলিমা আর নফেলকে ডাকেন। নীলিমা, নীলিমা...নফেল, বাবা নফেল...

নীলিমা আর নফেল এক রুমে বসে গল্প করছিল। ওদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলছিল। কে কী করবে, কিভাবে অগ্রসর হবে—সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনায় মশগুল হয়ে ওঠে ওরা। মাহমুদা বেগমের ডাক শুনে দুজনই এগিয়ে আসে। নীলিমা বলে, কী মা, কিছু বলবে?

আমাদের ঘরে আয় তো, কথা বলি।

বিশেষ কোনো ইস্যু? নীলিমা জানতে চাইল।

তোর বাবার একটা ইস্যু আছে।

নফেল বলল, আমিও আসব?

হ্যাঁ, আয়।

মাহমুদা বেগমের সঙ্গে নীলিমা ও নফেল এগিয়ে যায়। নফেল রুমে ঢুকেই বলে, বাবা, খুব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নাকি?

গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছাড়া কি আমরা বসতে পারি না?

অবশ্যই পারি।

নীলিমা, তোমার কী হয়েছে, মামণি?

কেন, বাবা?

শোনো, জীবনটাকে সহজ করলে সহজ, জটিল করলে জটিল। যতটা সহজ করা যায়, ততটাই ভালো থাকা যায়। তুমি নিশ্চয়ই আমার কথা বুঝতে পারছ।

নফেল বলল, বাবা, একটু খুলে বলো না! আমি বুঝতে পারিনি।

তুমিও বুঝবে। আগে নীলিমাকে কথা বলতে দাও। তারপর তুমি বোলো।

নীলিমা আমতা আমতা করে বলল, বাবা, আমি যে কী বলব বুঝতে পারছি না। আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় আমি ইচ্ছা করে জটিল করছি?

না না! তুমি বুঝতে চেষ্টা করো। তোমার জীবনের সিদ্ধান্ত তুমি নিজেই নেবে। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দশবার চিন্তা করো। তোমার ছয় বছরের সম্পর্ক তুমি এককথায় শেষ করে দেবে! বিষয়টা নিয়ে আমাদের সঙ্গে একটু আলোচনা করলে ভালো হয় না?

ভালো হয়। অবশ্যই ভালো হয়। কিন্তু বাবা, আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমিই নেব, এটা ঠিক তো!

অবশ্যই ঠিক।

আমি অনেকভাবে চিন্তাভাবনা করেছি। অনেক ছাড়ও দিয়েছি। কিন্তু কেউ যদি আমাকে ছোট করে কথা বলে, তাহলে তা আমি মানতে পারি না। আমার খুব গায়ে লাগে। তানজীবকে আমিই ভালোবেসেছি। ছয় বছর তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি। সবই ঠিক আছে। এখন যেহেতু বিয়ের প্রসঙ্গ এসেছে এবং সেটাই স্বাভাবিক। আমি ওর ভালো-মন্দগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। সবই ঠিক আছে। কিন্তু ওর একটা ব্যাপার ইদানীং আমি লক্ষ করলাম। ও আমাকে ছোট করে কথা বলে। আমাকে সে অবমূল্যায়ন করে।

তাই?

হ্যাঁ। আমি ভালোবেসেছি বলেই যে ওকে বিয়ে করতে হবে এমন তো নয়! তা ছাড়া আগে ভুল করেছি বলে কি ভুল শোধরাতে পারব না?

পারবে না কেন? অবশ্যই পারবে।

নফেল আগ বাড়িয়ে বলল, বাবা, আপু এমন কিছু করেনি যে ভুল শোধরানো যাবে না।

মাহমুদা বেগম বললেন, তোর বাবা কি বলেছে নাকি যে ভুল শোধরানো যাবে না? বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করলে ক্ষতি কি? তা ছাড়া আমার কাছে তো মনে হয়, তানজীব অনেক ভালো ছেলে। আমাদেরও তো ভুল হতে পারে! আর সংসার যেহেতু নীলিমা করবে, সেহেতু ফাইনাল সিদ্ধান্ত ওর। ও যা বলবে  তা-ই হবে।

কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, বিষয়টা নিয়ে আরেকবার ভাবা উচিত।

বাবা, আমি অনেক ভাবনা-চিন্তা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর এ বিষয় নিয়ে ভাবতে চাই না।

প্লিজ, নীলিমা! তুমি আর কয়েকটা দিন সময় নাও। আমি নিজেও চাই না কেউ তোমাকে ছোট ভাবুক। আন্ডারমাইন্ড করুক। তোমার ভালো থাকা না থাকার ওপর আমাদের ভালো থাকা না থাকা নির্ভর করে। এটা তো তুমি বোঝো?

এ কথা শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে যায় নীলিমা। সে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে, অবশ্যই বাবা। আমার কারণে তোমাদের কোনো টেনশন হোক, সেটা আমি চাই না।

এ সময় কলিংবেল বেজে উঠল। নফেল এগিয়ে গেল দরজা খুলতে। দরজার সামনে তানজীব দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে নফেল বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সে কি তানজীবকে ঘরে আসতে বলবে, নাকি বলবে নীলিমা বাসায় নেই? কিছুই বুঝতে পারছে না নফেল। সে পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে আছে।

 

নীলিমা নিয়মিত গল্প-উপন্যাসসহ বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর সময় তার হাতে বই থাকা চাই। রাতে বই পড়তে না পারলে তার ঘুম আসে না। আজ সে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ হাতে নিয়ে শুয়েছে। অনেকক্ষণ ধরে সে বইটি পড়ে। এরই মধ্যে ওর ঘুম এসে যাওয়ার কথা। কিন্তু ঘুম আসছে না। আজ বারবার শুধু তানজীবের কথা মনে পড়ছে। তানজীব ওর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু সে তানজীবের সঙ্গে দেখা করেনি। নফেল তানজীবকে জানিয়েছে, নীলিমা বাসায় নেই। নফেলকে আগে থেকেই নীলিমা বলে রেখেছিল। তাই সে তানজীবকে বসতেও বলেনি। আগে মানে বিগত ছয় বছরে কখনোই এমনটি হয়নি। তানজীবের কাছে বিষয়টি খটকা লাগে। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে মন খারাপ করে চলে যায়। পরে নফেলের কাছ থেকে এসব জানতে পারে নীলিমা।

তানজীবকে এভাবে ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হয়নি বলে নীলিমার কিছুটা অনুশোচনা হয়। পরক্ষণেই সে ভাবে, তোমাকে শক্ত হতে হবে, নীলিমা! তানজীবকে ভুলে থাকতে হবে। এই মুহূর্তে আবেগকে মাটিচাপা দিতে হবে। কিন্তু ওর কথা আজ এত বেশি মনে পড়ছে কেন! ও আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। আমি ওর জন্যই ঘুমাতে পারছি না। আমাকে ঘুমাতে হবে। আমাকে পারতে হবে। অবশ্যই আমি পারব।

নীলিমা চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। একসময় সে ঘুমের ঘোরে ডুবে যায়। গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে সে দেখে, তানজীব তার বিছানার পাশে বসে তাকে ডাকে। নীলিমা, নীলিমা! আমি তানজীব!

হঠাৎ নীলিমার হাত ধরে তানজীব। তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলার চেষ্টা করে। স্বপ্নের মধ্যেই এসব দেখছে নীলিমা। নীলিমা চিৎকার দিয়ে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে। নীলিমার চিৎকার শুনে মাহমুদা বেগম ছুটে আসেন নীলিমার রুমে। লাইট জ্বালিয়ে মেয়ের কাছে এগিয়ে যান। তাকে জড়িয়ে ধরে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে জানতে চান, কী হয়েছে, মা? ঘুমের ঘোরে কিছু দেখেছিস নাকি?

হ্যাঁ, মা।

তুই টেনশন করিস না তো! তোর বাবা যা বলে বলুক। আমি তোর সঙ্গে আছি। তুই যে সিদ্ধান্ত নিবি, সেটাই ঠিক থাকবে।

নীলিমা নরম গলায় বলে, মা আমার কেন জানি ভয় লাগছে। তুমি এখানে থাকো না!

আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তোর সঙ্গে থাকছি। এবার ঘুমানোর চেষ্টা কর।

মাহমুদা বেগম লাইট অফ করে মেয়ের পাশে শুয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। মায়ের আদর পেয়ে নীলিমার চোখে যেন রাজ্যের ঘুম নেমে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে গভীর ঘুমে ডুবে যায়। মেয়ের কথা ভাবতে ভাবতে মাহমুদা বেগমও ঘুমিয়ে পড়েন।

 

 

চার

তানজীব কঠিন একটা সময় পার করছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। তার মন খারাপের বিষয়টা কাউকে বলতে পারছে না। কোনো কাজেও তার মন বসাতে পারছে না। মোটকথা, কোথাও স্বস্তি পাচ্ছে না। অফিসে এসে ঝিম মেরে বসে থাকে। কোনো ফাইল হয়তো বের করল। ফিতা খুলে যে ফাইলের নোটগুলো দেখবে তা নয়। ওই একটি ফাইল নিয়েই হয়তো কয়েক ঘণ্টা পার করেছে।

অফিসে ফাইলের পর ফাইল জমছে তার। কিন্তু কোনো কাজ এগোচ্ছে না। এর মধ্যে ডিজি সাহেব কয়েকবার ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি বেশ কিছু কাজের ফিরিস্তি দিয়েছেন। কিছু কিছু কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন।

তানজীব দুই কান দিয়ে ডিজি সাহেবের কথা শুনেছে। তিনি কী বলেছেন তা পরক্ষণেই সে ভুলে গেছে। কোনো কিছুই মাথায় নেই। সে রুমে ফিরে এসে বেশ কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে ছিল। তারপর কাজে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কোনোভাবেই মনটাকে বশ করতে পারেনি। উপায়ান্তর না দেখে তানজীব ডিরেক্টর সাহেবের রুমে যায়। তাঁকে সে তার ব্যক্তিগত সমস্যার কথা জানিয়ে ছুটির আবেদন করে।

ডিরেক্টর সাহেব বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, তানজীব, তোমার মাথা ঠিক আছে! দুদিন পর হাই লেভেলের ভিজিট আছে। তুমি এ সময় ছুটি চাও কী করে? কী হয়েছে তোমার?

খুবই ব্যক্তিগত একটা সমস্যা। কিন্তু সমস্যাটা অনেক বড়। এ কারণে আমি কাজে মন বসাতে পারছি না। এ সময় উল্টাপাল্টা কিছু হয়ে গেলে আমার পোস্টিংটা আটকে যাবে। প্লিজ, স্যার! হেল্প মি। আপনি ছাড়া আর কোনো উপায় দেখছি না। ভিজিটের সব কিছুই তো জানেন।

না না। এটা হয় না। ডিজি সাহেবকে কে সামলাবে? তা ছাড়া ফরেন সেক্রেটারি শুনলে একেবারে খেয়ে ফেলবে তোমাকে। এটা কোরো না, প্লিজ!

আমি আসলে কোনো কাজ করতে পারছি না, স্যার। আমার মাথাটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে। আমি স্যার নিজেও বুঝতে পারছি। কিন্তু...

আর কথা বলতে পারছে না তানজীব। দুই চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়ছে। গলায় কথা আটকে যাচ্ছে।

ডিরেক্টর সাহেব তানজীবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার ভেতরে কিসের কষ্ট তা আমি জানি না। চাইলে আমাকে বলতে পারো। আমি তোমার একজন সুহৃদ। আমি তোমার ভালো চাই।

তানজীবের মুখে কোনো কথা নেই। সে চোখ মোছে আর নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে।

তানজীবের কান্না দেখে ডিরেক্টর সাহেবের ভীষণ খারাপ লাগে। তিনি নিজেও বুঝতে পারছেন না, কিভাবে তানজীবকে সান্ত্বনা দেবেন। তিনি শুধু বললেন, আমি তোমার জন্য দোয়া করি। তুমি ভালো থেকো। আর দু-তিন দিন ছুটি কাটাও।

তানজীব ডিরেক্টর সাহেবকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাঁর রুম থেকে বের হয়ে নিজের রুমে যায়। ফাইলপত্র টেবিলে গুছিয়ে রাখে। অফিস থেকে বের হয়ে সে হেঁটে রমনা পার্কে ঢোকে। গাছের নিচে একটা বেঞ্চে বসে। ভাবে নিজেকে নিয়ে। নিজের ভালো-মন্দ, ভুলত্রুটি নিয়ে ভাবে। কিন্তু তার ভাবনাজুড়ে বসবাস করে নীলিমা। নীলিমা কেন আমার সঙ্গে এমন করছে! কী ভুল করেছি আমি! আমার কোনো আচরণে বা কথায় ও কি খুব কষ্ট পেয়েছে! তাহলে ও আমাকে কেন সরাসরি বলল না! ওর সঙ্গে আমার এত বছরের সম্পর্ক! ও আমার এবং আমি ওর ভুলত্রুটি ধরব এবং সেগুলো দুজনেই শুধরে নেব—সেটাই তো সম্পর্ক। তা না হলে সম্পর্ক এগোবে কী করে? আগে অনেকবার এ রকম হয়েছে। আমরা দুজনই দুজনের ভুল ধরিয়ে দিয়েছি। পরে তা আবার উভয়েই শুধরে নিয়েছি। নিশ্চয়ই নীলিমা আমার কোনো কাজে কষ্ট পেয়েছে! আমি ওর কাছে আবার যাব। আমি আমার ভুলভ্রান্তির জন্য ক্ষমা চাইব।

তানজীব হাঁটে। বাদামওয়ালার কাছ থেকে বাদাম কেনে। বাদাম খেতে গিয়েও মুখের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনে। খেতে পারে না। নীলিমার কথা মনে পড়ে। নীলিমা বাদাম খুব পছন্দ করে। ওরা যখন পার্কে ঘুরতে আসত, তখন বাদাম নিয়ে বসত। তানজীব নীলিমাকে বাদাম ছুলে দিত। নীলিমা অত্যন্ত মজা করে খেত। এটা দেখতে ভালো লাগত তানজীবের। নীলিমার জন্য বড্ড খারাপ লাগছে তার। তানজীব যদি আজ অঝোরে কাঁদতে পারত, তাহলে হয়তো বুকের জমাট কষ্টের কিছুটা উপশম হতো। কাঁদার চেষ্টা করেও কাঁদতে পারছে না।

তানজীব মনে মনে ভাবে, এখন নীলিমা কোথায়! ও কি সত্যি সত্যি আমাকে ভুলে গেছে! কেন ভুলে যাবে সে? না না! এটা হতে পারে না। ও আমাকে ভুলতে পারে না। আমি আবার ওর মুখোমুখি দাঁড়াব। আমার কী অন্যায়, সেটা জানতে চাইব। ও যদি অপমান করে করুক। সেই অপমান সহ্য করব।

তানজীব আরো ভাবে, আমরা কত কঠিন সময় পার করে এসেছি। সামনে আমাদের অপার আনন্দের দিন। সেই মুহূর্তে আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে, তা কিছুতেই হতে পারে না।

হঠাৎ হঠাৎ নীলিমার নাম ধরে চিৎকার দিয়ে ওঠে তানজীব। পার্কে ঘুরতে আসা মানুষরা তানজীবকে পাগল ঠাহর করে। তারা ট্যারা চোখে তানজীবের দিকে তাকায়। ঠোঁট উল্টে বলে, লোকটা পাগল নাকি?

লোকজনের এসব মন্তব্য তানজীবের কানেও যায়। সে আর কী বলবে! সে হাঁটে আর বিড়বিড় করে নীলিমার সঙ্গে কথা বলে। যেন সত্যি সত্যিই ওর সঙ্গে নীলিমা হাঁটছে। এ সময় ঢাকা ক্লাবের দিক থেকে রমনা পার্কে ঢোকে এক ভাবের পাগল। লোকটার পরনে লাল পোশাক। মাথায় বিশাল দুটি জট। লম্বা দাড়ি। দাড়িতেও জট ধরেছে। হাতে একতারা। শরীর থেকে ভুসভুস করে গন্ধ বের হচ্ছে। তার পরও কারো কোনো বিকার নেই। তার গান শুনে সবাই তার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখে। সে গলা ছেড়ে গান গায়। আমার বন্ধু রে...কই পাব সখী গো...

গানের ভেতরে ডুবে যায় তানজীব।

নীলিমাদের বাসায় গিয়ে দ্বিতীয়বারও তার দেখা পায়নি তানজীব। এবারও নফেল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে, স্যরি! আপু দেখা করতে পারছে না। আপনি অন্য সময় আসেন।

তানজীব অবাক বিস্ময়ে নফেলের দিকে তাকিয়ে থাকে। নফেল ওকে এভাবে বলতে পারে, তা সে কখনোই ভাবেনি। নফেলকে কষিয়ে একটা চড় দিতে ইচ্ছা করছে তানজীবের। কিন্তু এখন সময় খারাপ। তাই সে মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। নরম গলায় সে বলে, আমার জরুরি কথা আছে। খুব জরুরি।

যতই জরুরি হোক, আমার কিছুই করার নেই। আপনি আপুর সঙ্গে যোগাযোগ করে অন্য সময় আসেন।

নফেলের সঙ্গে তানজীব জোরাজুরি করবে না। জোর করে নীলিমাদের বাসায় সে ঢুকবে না। কিন্তু কেন ওরা সবাই এমন বদলে গেল, তা জানার খুব ইচ্ছা তানজীবের। কার কাছ থেকে জানতে পারবে, তা নিয়ে ভাবে সে। কিছুক্ষণ নীলিমাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর মন খারাপ করে অজানা গন্তব্যের দিকে হাঁটতে শুরু করে।

তানজীব হাঁটে আর ভাবে, এতটা খারাপ সময় আগে কখনো আমার জীবনে আসেনি। কেন বাজে সময়টা আমাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে! আমি তো নীলিমাকে নিয়ে সুখী হতে চেয়েছিলাম!

আমি তো কোনো দিন ওকে ঠকানোর চিন্তা করিনি! ওর সঙ্গে কোনো রকম অসততা কিংবা প্রবঞ্চনাও করিনি। তার পরও কেন আমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে গেল!

তানজীব মনে মনে বলে, হে আমার ভাগ্যবিধাতা! আমি যদি অন্যায় করে থাকি, তাহলে তুমি আমাকে যেকোনো শাস্তি দাও, আমি মাথা পেতে নেব। অন্যায় না করলে আমাকে কেন শাস্তি দেবে?

তানজীব রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখে, এক লোক টিয়া পাখি নিয়ে চটি বিছিয়ে রাস্তার পাশে বসে আছে। তার সামনে অনেকগুলো খাম। সেই খামে ভাগ্যলিপি লেখা। মানুষ তার কাছে এসে ভাগ্য গণনা করাচ্ছে। লোকটাকে ঘিরে আছে কয়েকজন যুবক। তারা দশ টাকা করে দিয়ে ভাগ্য গণনা করাচ্ছে। কেউ বলে, ভাই দেখেন তো আমার শিগগিরই চাকরি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা আছে কি না? কেউ বলে, আমি আমার প্রেমিকাকে পাব তো? ভালো করে দেখেন। আপনার কথা সত্য হইব তো? আবার কেউ বলে, ভাই, আমাগো আর্থিক অবস্থা কবে ভালো হইব? আরেকজন সংশয়ের সঙ্গে বলে, আপনার কথা সত্য হইব তো?

টিয়া পাখিওয়ালা আস্থার সঙ্গে বলে, আরে আমার কথা কেন বলতেছেন? টিয়া পাখির কথা! সত্য না হইয়া উপায় আছে? মাত্র দশ টাকায় টিয়া পাখি আপনার ভূত-ভবিষ্যতের কতা সব ফরফর কইরা বইলা দিব।

লোকটার কথা শুনে দাঁড়িয়ে থাকা অতি উৎসাহী লোকগুলোও বসে পড়ল। তারপর একজন একজন করে ভাগ্য গণনা শুরু করল।

টিয়া পাখিওয়ালা লোকটি লাঠির মাথায় টিয়া পাখিটি বসিয়ে খাম তোলায়। টিয়া ঠোঁট দিয়ে খাম তোলে। সেই খামে ভরা কাগজে ভাগ্যলিপি পড়ে সন্তুষ্ট হয়ে মানুষ চলে যায়। সবগুলো খামেই একই রকম ভালো ভালো কথা লেখা রয়েছে। কেউ কি আর তা খতিয়ে দেখে! কথাগুলো পড়ে মন ভালো হয়। আশা জাগায়। এটাই বড় কথা।

কৌতূহলবশে তানজীবও লোকটির পাশে গিয়ে বসে। সেও দশ টাকা দিয়ে একটি খাম তোলায় টিয়া পাখির ঠোঁট দিয়ে। সেই খামে লেখা আছে, ‘আপনার মানসিক বিপর্যয় অচিরেই কেটে যাবে। প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটবে। আপনি বড় ধরনের একটি সুসংবাদ পাবেন। আপনার বিদেশভ্রমণ শুভ। চাকরিতে উন্নতি করবেন। যাঁরা এখনো চাকরি পাননি, তাঁদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাঁরা ব্যবসায় নেমেছেন, তাঁদের ব্যবসা ভালো যাবে।’

অন্যদের মতো তানজীবের মনটাও ভালো হয়ে গেল। সে আর কোথাও দাঁড়াল না। বাসার উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করল।

পাঁচ

শুক্রবার ছুটির দিন। সকালে নাশতা করেই বাজারে রওনা হলেন নাজমুল হক। এই একটি দিনই নামজুল হক বাজার করার সময় পান। তিনি নিজে বাজার করতে পছন্দ করেন। তা ছাড়া বাজারে গেলে অনেক কিছু জানা যায়। দেশ এবং দেশের মানুষ কেমন আছে, সে সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বাজারের দরদাম দেখে অনেকেই অনেক ধরনের মন্তব্য করে। কেউ প্রধানমন্ত্রীকে, আবার কেউ সরকারকে খোঁচা মেরে কথা বলে। কেউ বা বিরোধী দলকে তুলাধোনা করে। তখন দেশের রাজনীতি সম্পর্কেও সম্যক ধারণা নেওয়া যায়। তবে সুপারশপে গেলে কিন্তু এসব কিছুই আঁচ করা যাবে না। তাই সুপারশপে যান না নাজমুল হক।

মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে ঢুকতে ঢুকতেই নাজমুল হক শুনলেন, বাজারের যে অবস্থা, তাতে মনে হয় আগুন লাগছে! এখন কেন জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে? না না! এইটা ব্যবসায়ীদের কারসাজি!

নাজমুল হক ওই ভদ্রলোকের কাছে জানতে চাইলেন, কিছু বললেন মনে হয়!

আর বলবেন না, ভাই!

এরই মধ্যে নাজমুল সাহেবের দিকে চোখ যায় ভদ্রলোকের। তিনি তাঁকে দেখে বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, আপনারে চেনা চেনা লাগছে। আপনি কি নাজমুল সাব?

জি জি। আপনি আমাকে চেনেন?

দেখি তো! প্রায়ই তো দেখি। আমাকে চিনতে পারছেন? চেনার কথা না। আমি আসলে চেনার লোকও না। অতি সাধারণ মানুষ।

আমরা সবাই সাধারণ। অসাধারণ কেউ না।

আপনি অনেক ওপরের মানুষ। আমি কিছুটা হলেও জানি। শিক্ষিত মানুষ। বড় চাকরি করেন। ধানমণ্ডিতে বাড়ি! তবে আপনার কথা শুনে ভালো লাগল। আমার একটা ভুল ধারণা ছিল। সেইটা ভেঙে গেল।

কী ভুল ধারণা ছিল, ভাই?

আমি ভাবছিলাম, আপনি খুব নাক উঁচা ধরনের মানুষ। এখন দেখলাম, তা না।

হা হা হা। নাজমুল হক হাসলেন।

আবদুল করিম বললেন, সত্য কথা বলে ফেললাম আর কি!

না না, ঠিক আছে।

আমার বাসা মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে।

আপনি অ্যাডভোকেট জব্বার...

উনি আমার বাবা।

ও, আচ্ছা। তাই বলেন। আপনার বাবা একসময় নামকরা উকিল ছিলেন। আপনি কোথায় আছেন?

আমি কোনোমতে বাবার চেম্বারটা টিকিয়ে রাখছি আর কি!

তার মানে আপনি প্র্যাকটিস করেন?

একটু-আধটু।

বাহ! ভালো তো! তারপর, বাজার করলেন?

কিছু করলাম আর কি! যা দাম? বাপ রে বাপ! মাছের বাজারে তো যাওয়াই যায় না।

আপনার গায়েই যদি এত লাগে, তাহলে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা হবে?

আর বলবেন না। অনেক খরচ হয়ে যাচ্ছে। হিসাবছাড়া খরচ যাকে বলে। যাদের আয়-রোজগার কম, তারা যে কী করে চলে!

হুম্। তো, ভালো থাকবেন। আবার দেখা হবে।

আপনিও ভালো থাকবেন। নিশ্চয়ই দেখা হবে।

নাজমুল হক বাজারে ঢুকলেন। তিনি ঢোকামাত্র মাছ বিক্রেতারা ঘিরে ধরল তাঁকে। স্যার, এই আইড়টা নদীর, স্যার। লইয়া যান। মাত্র সাড়ে বারো শ টাকা কেজি, স্যার। ইলিশ নিবেন, স্যার? সাড়ে আঠারো শ কেজি রাখা যাইব, স্যার। পাঙ্গাশটা স্যার একদম তাজা। খুব ভালো মাছ, স্যার। বাইশ শ টাকা কেজি, স্যার। চাষের মাছের দাম অনেক কম, স্যার। ওই মাছ তো আপনে আবার খাইবেন না!

মাছের দরদাম শুনে নাজমুল হকের মাথা গরম হয়ে ওঠে। অনেক কষ্টে তিনি নিজেকে সামাল দেন। তিনি মনে মনে ভাবেন, আমার মাসিক আয় দু-তিন লাখ টাকা। আমার অবস্থা এ রকম হলে অন্য মানুষ কী করবে! রীতিমতো হার্টফেল করবে?

নাজমুল হক অনেক ঘোরাঘুরি করলেন। অনেকে বাজারে এসেই দরদাম না করে বড় বড় মাছ ব্যাগে ভরছেন। কড়কড়া নোট মাছ বিক্রেতার হাতে দিয়ে বলছেন, কাল আরো বড় দুইটা আইড় দিস তো! বাসায় দিয়ে আসতে পারবি?

আরেকজন বললেন, আমাগো ভাই কাঁচা টাকা নাই। অনেক কষ্টের কামাই। কত হইলে দিতে পারবা সেইডা কও।

কইলাম তো, একদাম।

আরেকজন বললেন, দেশটা কই যাইতেছে। কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

নাজমুল হক বাজারের সব মন্তব্য মাথায় নিলেন না। এসব মাথায় নিলে পাগল হয়ে যেতে হবে। তাই তিনি সমস্যাগুলো ঝেড়ে ফেললেন। মাথা ঠাণ্ডা রেখে মাছ, তরিতরকারি, মাংসসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে বাসায় ফিরলেন।

নাজমুল হককে ঘর্মাক্ত দেখে ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা তরমুজের শরবত এগিয়ে দিয়ে মাহমুদা বেগম বললেন—খাও, ভালো লাগবে।

নাজমুল হক গ্লাসে চুমুক দিলেন। পুরো গ্লাস শেষ করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, সত্যিই খুব ভালো লাগল। তোমাকে যে কী বলে ধন্যবাদ জানাব!

কী রান্না করব বলো তো?

চিতল, ছোট মাছ, সবজি আর ডাল। আর চাইলে বেগুন ভর্তাও করতে পারো।

ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি।

আচ্ছা।

মাহমুদা বেগম রান্নাঘরে ঢুকলেন। খুব যত্ন করে রান্নাবান্না করলেন।

প্রতি শুক্রবার চারজনের একসঙ্গে খাওয়া একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে। যে যেখানেই থাকুক, শুক্রবার বাসায় থাকা এক ধরনের কমিটমেন্টের মতো। ব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে খাওয়া হয় না। তাই শুক্রবার দুপুরের খাবার তারা সবাই উপভোগ করে।

আজ খাবার খেতে খেতেই নাজমুল হক কথাটা শুরু করলেন। তিনি নীলিমাকে উদ্দেশ করে বললেন, মা, কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিস বল তো?

কোন বিষয়ে, বাবা?

তানজীবের ব্যাপারে।

তোমাদের তো সিদ্ধান্ত জানিয়েই দিয়েছি, বাবা!

জানিয়ে দিলেই তো সব শেষ হয়ে যায় না, মা। শোন, তানজীবের বাবা আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য পীড়াপীড়ি করছেন। আমি তাঁকে কী বলব? আর তানজীবের নাকি দেশের বাইরে পোস্টিং হয়ে গেছে?

নীলিমা কিছুটা বিরক্তির সঙ্গে বলল, কি জানি। জানি না।

কেন, তানজীব তোকে বলেনি!

নীলিমা কিছু বলার আগেই মাহমুদা বেগম বললেন, ওর সঙ্গে যোগাযোগ থাকলে তো বলবে!

কী বলো! যোগাযোগ নেই!

মাহমুদা বেগম ভাত গিলতে গিলতে বললেন, তুমি বোধ হয় নীলিমার সিদ্ধান্তটি সিরিয়াসলি নাওনি।

নাজমুল হক ভাত মুখে দিতে গিয়েও দেননি। তিনি সবার দিকে তাকালেন। বিশেষ করে নীলিমার চেহারা দেখে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছেন।

আমি তো ভাবছিলাম নীলিমা রিথিংক করবে।

না, বাবা। থিংক-রিথিংক করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর রিভিউ করার সুযোগ নেই। আর আমি এই মুহূর্তে বিয়েও করব না। বিসিএস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বাহ্! খুব ভালো সিদ্ধান্ত। কিন্তু বিসিএস দিলে যে বিয়ে করা যাবে না, তা তো না!

বাবা, থাক না। আপু যেহেতু করতে চাচ্ছে না।

ও চাচ্ছে না মানে কি? ও চাচ্ছিল বলেই তো আমরা তানজীবের বাবার সঙ্গে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শুধু তারিখ চূড়ান্ত করা বাকি ছিল।

না হয়ে হয়তো ভালোই হয়েছে। আপু তার ভুল বুঝতে পেরেছে। বিয়ে হলে তো ভুল শোধরানোর সুযোগই পেত না।

নফেলের কথা মাহমুদা বেগমের পছন্দ হয়েছে। তিনি ছেলের কথার সমর্থনে বললেন, ঠিকই তো! বিয়ের পর সমস্যা হলে ভয়ংকর বিপদে পড়তে হতো না!

নাজমুল হক স্ত্রীকে উদ্দেশ করে বললেন, তাহলে তুমিই তানজীবের বাবাকে ফোন করে বলে দিয়ো। আমি তাঁকে বলতে পারব না।

মাহমুদা বেগম বললেন, ঠিক আছে, তোমার বলতে হবে না। আমিই বলব।

নাজমুল হক আর কোনো কথা বললেন না। তিনি দ্রুত খাওয়া শেষ করে উঠে গেলেন। মাহমুদা বেগম আড়চোখে নাজমুল হকের চলে যাওয়া দেখলেন। তিনি বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন। কিন্তু নীলিমা কিংবা নফেল তা বুঝতে পারল না।

দরজা খুলে বাইরে পা রেখে রীতিমতো চমকে উঠল নীলিমা। দরজার সামনে তানজীবের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি দরজায় কলিংবেল দেবেন বলে হাত বাড়িয়েছিলেন। ঠিক তখনই দরজা খুলল সে। এ রকম একটা পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে তা সে কখনোই ভাবেনি। উপস্থিত বুদ্ধিতে নীলিমার কোনো জুড়ি নেই। সে দ্রুতই সব কিছু সামলে নিল। তানজীবের বাবাকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করল। সে তাঁকে ভেতরে নিয়ে গেল এবং ড্রয়িংরুমে বসিয়ে ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে ওর মাকে ডাকল। মা মা! দেখো কে এসেছেন?

মাহমুদা বেগম দ্রুত এগিয়ে গেলেন ড্রয়িংরুমের দিকে। নীলিমাকে দেখে বললেন, কে রে!

খালু।

বিস্ময়ের সঙ্গে মাহমুদা বেগম বললেন, খালু!

নীলিমা কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, তানজীবের বাবা।

মাহমুদা বেগম মাথার কাপড় টেনে ড্রয়িংরুমে ঢুকে সালাম দিয়ে বললেন, কেমন আছেন, ভাই? আপা ভালো আছে?

জি জি। আমি ভালো আছি। আপাও ভালো আছে। ভাই বাসায় নেই? সাইফুল আহমেদ বললেন।

উনি একটা কাজে বের হয়েছেন। আপনি বসেন। নীলিমা, নীলিমা, চা দে না, মা।

কথা শেষ করে মাহমুদা বেগম নিজেই উঠে দাঁড়ালেন। সাইফুল আহমেদ বললেন, আপনি বসেন না! চা খাওয়াটা জরুরি না। আপনাদের এই দিকে আমার একটা কাজ ছিল। ভাবলাম, ভাই আছেন কি না দেখি। আর আমার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথাও আছে।

খুব ভালো করেছেন। আসলে সবাই এমন ব্যস্ত, কারো সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎই হয় না।

ঠিক বলেছেন, আপা। আমরা কেমন যেন হয়ে গেছি। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত।

জি জি। সম্পর্কটা হয়ে গেছে লোক-দেখানোর মতো। আচ্ছা ভাই, আপনি কী যেন বলতে চেয়েছিলেন!

জি জি। বলব, অবশ্যই বলব। আপা, আপনি তো...

এ সময় নীলিমা চা নিয়ে ড্রয়িংরুমে ঢোকে। সাইফুল আহমেদ কিছু একটা বলতে গিয়েও চুপ করে রইলেন। মাহমুদা বেগম সাইফুল আহমেদের দিকে চা এগিয়ে দিয়ে বলেন, নেন ভাই, চা নেন।

সাইফুল আহমেদ নীলিমাকে উদ্দেশ করে বলেন, মা, তুমি বসো না!

নীলিমা বসল না। সে বলল, আমি আসছি।

নীলিমা চলে যাওয়ার পর মাহমুদা বেগম বললেন, ভাই, কী যেন বলতে চেয়েছিলেন?

সাইফুল আহমেদ পাল্টা প্রশ্ন করলেন, তানজীবের কথা আপনি শুনেছেন তো?

না মানে...কোন বিষয়ে, বলেন তো, ভাই?

ওর তো ব্রাসেলসে থার্ড সেক্রেটারি হিসেবে পোস্টিং হয়েছে। শিগগিরই চলে যেতে হবে। হাই লেভেলের একটা ভিজিট আছে। তার পরই ওকে চলে যেতে হবে।

আচ্ছা আচ্ছা...খুব ভালো খবর!

কেন, তানজীব বলেনি? ওর তো বলার কথা!

মাহমুদা বেগম আমতা আমতা করে বললেন, ছেলেমানুষ! হয়তো ভুলে গেছে।

না না না! এটা ভোলার কথা না। এর মধ্যে ও আপনাদের বাসায় আসেনি?

না তো! খুব শিগগির ওকে দেখিনি।

সেকি! নীলিমার সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ হয়নি?

মাহমুদা বেগম দরাজ গলায় নীলিমাকে ডাকেন। নীলিমা, নীলিমা!

নীলিমা আসেনি। ও মোবাইল ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে। মাহমুদা বেগম উঁকি দিয়ে সেটা দেখলেন। তারপর বললেন, আচ্ছা, বলেন ভাই, আপনি সম্ভবত কিছু একটা বলবেন।

জি জি। আমি ভাইকেও একদিন কথাটা বলেছিলাম। ওদের বিয়ের ব্যাপারটা আর কি! দ্রুত শেষ করা দরকার। আপনারা যে তারিখ বলবেন, সে তারিখেই হবে। বিষয়টা ভাইয়ের সঙ্গে আলাপ করে যদি আমাদের জানাতেন!

জি জি, ভাই। অবশ্যই আপনার ভাই আপনার সঙ্গে কথা বলবেন।

আমি তাহলে আজ উঠি। ভাই এলে বলবেন। আর আপনারা আমাদের বাসায় আসেন না।

আসব, ভাই। আপনিও আপাকে নিয়ে আসেন।

জি। আমি তাহলে আসছি।

মাহমুদা বেগম নীলিমাকে আবারও ডাকলেন। নীলিমা, নীলিমা!

নীলিমা এগিয়ে এসে সাইফুল আহমেদকে বিদায় জানাতে বাড়ির গেট পর্যন্ত যায়। তারপর দ্রুত বাসায় ফিরে গিয়ে মাহমুদা বেগমের কাছে জানতে চায়, তানজীবের বাবা কী বললেন, মা?

মাহমুদা বেগম ভণিতা না করেই বললেন, তোদের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার জন্য তাগাদা দিলেন।

তাই! তুমি কী বলেছ?

আমি বললাম, আপনার ভাই কথা বলবেন। ঠিক বলেছি না?

নীলিমা মাথা নেড়ে জবাব দিল।

 

ছয়

টানা তিন দিন ছুটি কাটানোর পর আজ অফিসে এসেছে তানজীব। অফিসে এসেই পরিচালক ও মহাপরিচালকের সঙ্গে সে দেখা করে। তারপর নিজের রুমে যায়। কোনো কাজ পেন্ডিং আছে কি না দেখে। রুটিন কাজের বাইরে তেমন কোনো কাজ নেই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সফরের সব কাজ পরিচালক সাহেব গুছিয়ে ফেলেছেন। এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকে সই হবে, তা নিয়ে ঘষামাজা চলছে। সেগুলো মহাপরিচালক ও পররাষ্ট্রসচিবই করছেন। নিচের দিকের কাজ তেমন নেই। তানজীবকে রুটিন কাজগুলো সেরে ফেলার জন্য বলা হয়েছে। সে রুমে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। ইউটিউবে রবীন্দ্রসংগীত ছেড়ে দেয়। ‘আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে...’

মনিকা তানজীবের সামনে এসে বসে। মনিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন যোগ দিয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে পরিচয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে। মনিকা তানজীবের চেয়ে দুই বছরের জুনিয়র। ট্রেনিং শেষ করে দূরপ্রাচ্য শাখায় যোগ দিয়েছে। সে কখন এসেছে, তানজীব তা খেয়াল করেনি। হঠাৎ মনিকাকে তার টেবিলের সামনে দেখে চমকে ওঠে সে। বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, আরে তুমি!

আপনার কি মন খারাপ?

না মানে...

কেন, কী হয়েছে বলেন তো!

তেমন কিছু না।

বললেই হলো তেমন কিছু না! অবশ্যই কিছু হয়েছে। মন খারাপ না হলে এই গান কি কেউ শোনে? আপনার মন খারাপ কেন সেটা বলেন?

মন ভালো করার জন্য ছুটি নিলেন, তার পরও মন ভালো হয়নি?

তানজীব না-সূচক মাথা নাড়ে।

আমি আপনার মন ভালো করে দিতে পারি।

কিভাবে?

এমন একটা খবর দেব, যা শুনলে আপনার মন ভালো হয়ে যাবে।

সত্যি?

অবশ্যই।

বলো তো খবরটা কী?

গানের ভলিউমটা কমান।

তানজীব গানের ভলিউম কমিয়ে সোজা হয়ে বসে। আপনার ব্রাসেলসে পোস্টিং হয়েছে তো?

হুম্।

ওখানে আমিও যাচ্ছি।

তাই নাকি?

হ্যাঁ। কী, আপনার মন ভালো হয়নি?

হয়েছে।

আপনি খুশি হয়েছেন?

খুব খুশি হয়েছি। কিন্তু তোমার এত দ্রুত পোস্টিং হয়ে গেল!

ওখানে আরেকজন কর্মকর্তাকে কলব্যাক করা হয়েছে। সেই জায়গায় আমাকে পাঠানো হচ্ছে।

তুমি অনেক লাকি।

হুম্, তা বলতে পারেন। তবে প্রথম পোস্টিং আপনার সঙ্গে পড়ায় আমার ভালো লাগছে।

সত্যিই ভালো লাগছে?

কেন, বিশ্বাস হয় না?

হবে না কেন?

ভালো লাগা শেয়ার করতেই আপনার কাছে এলাম।

আমার মন সত্যিই তুমি ভালো করে দিয়েছ।

আমি জানি, আপনার মন ভালো হবে।

তুমি কফি খাবে?

খেতে পারি। আপনার তাড়া থাকলে পরে আসি?

না না। তাড়া নেই। আসলে আজ তেমন কোনো কাজও নেই। তোমার কী অবস্থা?

আমারও আজ কাজের চাপ কম।

তাহলে বসো। কফি দিতে বলি।

তানজীব রহিমকে ডেকে কফি দিতে বলল। ব্রাসেলসে মনিকার পোস্টিংয়ের কথা শুনে তানজীবের ভীষণ ভালো লাগছে। সে ভালো করে মনিকাকে দেখে। দু-একটি ফাইল এদিক-সেদিক করে। একপর্যায়ে মনিকার কাছে সে জানতে চায়, তুমি কি গান পছন্দ করো?

অবশ্যই।

কার গান বেশি শোনো?

রবীন্দ্র, লালন, আবদুল করিম বেশি শুনি। দেশের গানও আমার খুব প্রিয়।

বাহ্! তুমি তো আমার মতো দেখছি!

তাই? আপনিও কি এসব গানই বেশি শোনেন?

তুমি দেখলে না, মন্ত্রমুগ্ধের মতো রবীন্দ্রসংগীত শুনছিলাম!

দেখলাম তো!

রহিম কফি দিয়ে চলে যায়। তানজীব মনিকাকে অফার করে নিজেও কফিতে চুমুক দেয়। বাহ্! ভালো বানিয়েছে, তাই না?

মনিকা ইতিবাচক মাথা নাড়ে। তারপর বলে, আপনার কফি কি খুব পছন্দ?

হুম্। কফিটা খেলে একটা চাঙ্গা ভাব লাগে।

আমারও তা-ই।

আমার সব কিছুই দেখছি তোমার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে!

হা হা হা! মনিকা হাসল। তানজীবকে সরাসরি কিছু না বলে মনে মনে বলল—যাক, শেষ পর্যন্ত আপনি তাহলে উপলব্ধি করতে পারলেন! আমি যে কত আগে থেকে আপনাকে পছন্দ করি তা যদি টের পেতেন!

তানজীব মনিকাকে উদ্দেশ করে বলল, কিছু বলো!

মনিকা বলল, আপনি কবে যাবেন ঠিক করেছেন?

এখনো করিনি। আমাদের ভিজিটটা শেষ হওয়ার পরই হয়তো যেতে হবে। তোমার কবে যাওয়া হবে?

অর্ডার তো হয়ে গেছে। এখন আমার প্রস্তুতি নিতে যে কয় দিন লাগে। আপনার আপত্তি না থাকলে আমরা একসঙ্গেও যেতে পারি।

আপত্তির কি আছে? এক জায়গায় পোস্টিং।

মনিকা উঠতে উঠতে বলল, তাহলে এই কথাই থাকল!

আচ্ছা। তুমি যাচ্ছ?

এখন যাই? আবার কাল আসব না হয়!

না হয় কেন? অবশ্যই আসবে।

আসতে পারি।

অবশ্যই। ভালো থেকো।

অবশ্যই ভালো থাকব। আপনিও ভালো থাকবেন।

মনিকা চলে গেল। ওর চলে যাওয়া দেখল তানজীব। একদৃষ্টে সে তাকিয়েই রইল।

 

তাহমিনা আহমেদ তানজীবকে অনেকক্ষণ ধরে ডাকছেন। কিন্তু তানজীবের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি ডাকতে ডাকতে তানজীবের রুম পর্যন্ত যান। গিয়ে দেখেন, তানজীব মড়ার মতো শুয়ে আছে। তিনি আরো কাছে গিয়ে তানজীবকে ডাকলেন। হঠাৎ তানজীব লাফিয়ে উঠল। তাহমিনা ছেলের পাশে বসে ওর কাঁধে হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, কী হয়েছে, বাবা? তোর কোনো সমস্যা যাচ্ছে?

তানজীব চুপ করে আছে। সে কিছুই বলে না।

তাহমিনা আহমেদ আবার বলেন, তুই দিন দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছিস। আচ্ছা শোন, তোর পোস্টিংয়ের কথা নীলিমাকে বলিসনি?

বলতে গিয়েছিলাম।

তারপর?

বলা হয়নি।

মানে!

ওকে পাওয়া যায়নি।

সেকি কথা! ওকে বাসায় পাসনি?

না।

তোদের মধ্যে কোনো ভুল-বোঝাবুঝি হয়েছি কি না বল তো?

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। নীলিমা মনে হয় আমাকে এড়িয়ে চলে।

হঠাৎ এড়িয়ে চলার কারণ?

আমি কিছুই বুঝতে পারছি না, মা।

ও! তার মানে এ কারণেই তোর মন খারাপ! আচ্ছা, তুই কোনো ভুল করিসনি তো!

আমার মনে পড়ছে না, মা। আমার জানা মতে আমি কোনো ভুল করিনি। হঠাৎ করেই ও এড়িয়ে চলছে। আমার কাছে ব্যাপারটা রহস্যজনক বলে মনে হয়।

তাহমিনা আহমেদ ছেলের ঘাড়ের ওপর হাত রেখে সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলেন, একেবারে মন খারাপ করবি না। মন খারাপের কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা, আমি কি ওদের বাসায় যাব? ওর সঙ্গে কথা বলি!

দেখো না; আমার কোনো আপত্তি নেই। আর আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি, সে জন্য স্যরি বলতেও আপত্তি নেই। কিন্তু নীলিমা আমার সঙ্গে কোনো কথা বলছে না। কোনো যোগাযোগও রাখছে না। এটাই আমার খারাপ লাগছে।

আচ্ছা, আমি দেখছি। মন খারাপ করিস না তো! তোর মন খারাপ দেখলে আমার ভীষণ অস্বস্তি লাগে।

আমি জানি, মা। সে জন্যই এত দিন কথাটা গোপন রেখেছিলাম, যাতে তুমি কিছুই না জানতে পারো। কিন্তু আমি আর পারছিলাম না।

আমি বুঝতে পারছি। তুই কোনো চিন্তা করিস না, বাবা। আমি সরাসরি নীলিমার সঙ্গে কথা বলব। তোকে কেন সে এত কষ্ট দিচ্ছে, তা আমি জানতে চাইব।

তানজীব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল। সে কিছুই বলল না। তাহমিনা আহমেদ ছেলের রুম থেকে নিজেদের রুমে গেলেন। তিনি মাথার নিচে দুই হাত দিয়ে চিত হয়ে শুয়ে আছেন। নীলিমার কথা ভাবছেন।

 

সাত

নীলিমা বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সে রাত-দিন লেখাপড়া করছে। সপ্তাহে তিন দিন কোচিংয়ে যায়। নিয়মিত চার-পাঁচটা পত্রিকা পড়ে। বিসিএসের বাইরে তার কোনো ভাবনা নেই। সে ভাবে, বিসিএসে ভালো করতে হবে। ফরেন সার্ভিস পেতে হবে। চেষ্টা করলে পারব না, তা কিছুতেই হতে পারে না। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার ডিগ্রি পাস করে যদি বিসিএসে না টিকি, তাহলে এই লেখাপড়ার দাম কি?

নীলিমার অবস্থা দেখে নাজমুল হক ও মাহমুদা বেগম রীতিমতো বিস্মিত। তাঁদের উভয়ের এক প্রশ্ন, কী ব্যাপার? লেখাপড়া শেষ করার পর নীলিমা সিরিয়াস হয়ে উঠল! এই লেখাপড়াটা ইউনিভার্সিটি লাইফে করলে তো ও অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে যেত! ভার্সিটির টিচার হতে পারত! এত ব্রেনি মেয়েটা; প্রেম করে সব এলোমেলো করে ফেলল।

নাজমুল হক মাহমুদা বেগমকে উদ্দেশ করে বললেন, তুমি জানো নাকি কিছু? ঘটনা কী? হঠাৎ তোমার মেয়ে লেখাপড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত!

কিছুই তো বুঝতে পারছি না। কিছু বলেও না।

জিজ্ঞেস করো না।

ও কেন জানি শেয়ার করতে চায় না। আগে সব কিছু আমাকে বলত। পরামর্শ চাইত। এখন কেমন যেন হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, ওর ভেতরে কোনো একটা জেদ কাজ করছে।

কেন, কিসের জেদ?

বুঝতে পারছি না।

জেদটা যদি পজিটিভ হয়, তাহলে জীবন বদলে যাবে।

আমারও তা-ই মনে হয়। ও নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। নিজেকে নিয়ে আগে এত সিরিয়াসলি সে ভাবেনি।

তার মানে ও বিয়ে করবে না?

মনে হয় না। আচ্ছা শোনো, তানজীবের বাবা এসেছিলেন। উনি তো দ্রুত বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য তাগাদা দিয়ে গেলেন।

তাই নাকি? বেশ ভালো খবর। এখন সামাল দাও।

আহা! তুমি সব ব্যাপারে কথা শোনাচ্ছ কেন? তোমার মেয়েকে বলো।

তুমি রাগ করছ কেন?

রাগ করব না! কথায় কথায় তুমি আমাকে দায়ী করো। এটা তোমার একটা সমস্যা। সংসারের কোনো সমস্যা হলেই তা আমার দোষে হয়। তোমার দোষ নেই? তুমি তখন কেন মেয়েকে বলোনি, আগে নিজের পায়ে দাঁড়াও, তারপর যা করার করবে! এত ব্রেনি একটা মেয়ে! সে কি শুধু গৃহিণী হয়ে থাকবে! আমি ওদের জন্য সব কিছু জলাঞ্জলি দিয়েছি বলে আমার মেয়েও তা-ই করবে নাকি?

স্যরি। আমার ভুল হয়ে গেছে। তোমার সঙ্গে কথা বলাই ভুল হয়েছে।

মাহমুদা বেগম নাজমুল হকের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন। তারপর তিনি নিজেকে নিয়ে ভাবেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স করে তিনি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। বিয়ের পরও কিছুকাল শিক্ষকতা করেন। কিন্তু নীলিমার জন্মের পর প্রথমে দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি নেন। নীলিমার বয়স যখন ছয় মাস, তখন আবার কলেজে যাওয়া শুরু করেন। তখন বাসায় মাহমুদা বেগমের শাশুড়ি ছিলেন। তিনিই নীলিমাকে দেখাশোনা করতেন। মাহমুদা বেগমের কপাল মন্দ। এক বছরের মাথায় তাঁর শাশুড়ি মারা গেলেন। তিনি পড়ে গেলেন বিপদে।  আবার কলেজ থেকে দীর্ঘ মেয়াদে ছুটি নিলেন। সেই ছুটির মধ্যেই তাঁর গর্ভে এলো নফেল। নফেলের জন্মের পর পুরোপুরিভাবে চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেন।

মাহমুদা বেগম মনে মনে ভাবতেন, সন্তান মানুষ না হলে চাকরি করে কী হবে? ছেলে-মেয়ে বড় হওয়ার পর তাঁর আর সময় কাটে না। এখন তাঁর মনে হয়, তিনি ভুল করেছেন। যেকোনোভাবে চাকরিটা ধরে রাখা উচিত ছিল। আক্ষেপ করে প্রায়ই বলেন, মেয়ে মাস্টার্স করার পর চিন্তা হলো, ওকে বিয়ে দিতে হবে। কেন? কেন ভাবতে পারি না, মেয়ে চাকরি করবে। নিজের পায়ে দাঁড়াবে। অর্থশক্তি না থাকলে সংসারে মেয়েদের কোনো গুরুত্ব থাকে না। নাজমুল স্বামী হিসেবে অনেক ভালো। সে আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়। তার পরও আমার মনে হয়, মেয়েদের আত্মনির্ভরশীল হওয়া খুব জরুরি।

নাজমুল হক অনেকক্ষণ পর মাহমুদা বেগমের পাশে গিয়ে বসলেন। তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, স্যরি বললাম তো! তার পরও তুমি এভাবে মন খারাপ করে বসে আছ! আসো তো, নীলিমার কাছে যাই। ওকে গিয়ে বলি, ওর সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমরা একমত।

নাজমুল হকের কথা শুনে মাহমুদা বেগমের ভীষণ ভালো লাগল। কিন্তু তিনি তা প্রকাশ করলেন না। তিনি নিজের উচ্ছ্বাস চেপে রেখে বললেন, এটা কি তোমার মনের কথা?

অবশ্যই মনের কথা। তোমার মতো আমিও চাই, নীলিমা নিজের পায়ে দাঁড়াক। বিয়েটাই মানুষের জীবনের সব কিছু নয়। ও যদি সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে, সেটা অনেক বড়।

মাহমুদা বেগম নাজমুল হককে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, চলো, নীলিমার রুমে যাই। ওর সিদ্ধান্তকে আমরা সমর্থন দিয়েছি শুনলে ও যে কী খুশি হবে!

নাজমুল হক ও মাহমুদা বেগম উঠে নীলিমার রুমে গেলেন। নীলিমা তখনো গভীর মনোযোগে লেখাপড়া করছিল। মা-বাবাকে একসঙ্গে দেখে সে বই উল্টে রেখে বলল, আসো আসো। কী ব্যাপার, দুজন একসঙ্গে? কোনো ঘটনা আছে নাকি? বিশেষ কিছু বলবে?

নাজমুল হক ও মাহমুদা বেগম উভয়েই নীলিমার মুখোমুখি বসলেন। তারপর নাজমুল হক বললেন, ঘটনা কিছু না রে! তোকে নিয়ে তোর মা আর আমি কথা বলছিলাম।

কী কথা? আমার বিয়ে নিয়ে?

না না!

তাহলে? আমার ভুলের মাসুল তোমাদের দিতে হবে, এসব নিয়ে?

না, তা-ও না।

তাহলে কী?

আমরা দুজনই অনেক চিন্তাভাবনা করে দেখলাম, তুই বিয়ের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিস তা-ই ঠিক। আমাদের দুজনেরই তোর সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন আছে।

বিস্ময়ের সঙ্গে নীলিমা বলে, সত্যি, মা!

হ্যাঁ রে। তোর সঙ্গে আমরা আছি।

নীলিমা খুশিতে টগবগ। সে লাফিয়ে উঠে মাকে জড়িয়ে ধরল। আনন্দের সঙ্গে বলল, আমি জানতাম তোমাদের সমর্থন আমি পাব। আমার আর কিছুই দরকার নেই, মা। তোমরা আমার সঙ্গে আছ, এরপর আমার আর কী লাগে? আমার জীবনে আর কিছু চাই না, মা। বাবা, তোমরা দেখো, আমি একদিন তোমাদের মুখ উজ্জ্বল করব।

নাজমুল হক মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, তোর আশা-আকাঙ্ক্ষা বিধাতা পূরণ করুক।

মেয়ের আনন্দ দেখে মাহমুদা বেগমের চোখে পানি এলো। তিনি আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছলেন। আর মনে মনে মেয়ের জন্য দোয়া করেন।

 

নীলিমা বিসিএস প্রিলিমিনারিতে পাস করেছে। এতে ওর সাহস অনেকটাই বেড়ে গেছে। ও এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। নিজের ওপর আস্থা বেড়ে গেছে। সামনে লিখিত পরীক্ষা। সে জন্য নীলিমা আরো ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের মতো সে লেখাপড়া করছে। ও আসলে বিসিএসটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। বিসিএসে না টেকা পর্যন্ত ও আর থামবে না।

নীলিমাকে নিয়ে ওর মা-বাবা এবং ওর ছোট ভাইয়ের ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তারাও এখন বলতে শুরু করেছে, নীলিমা পারবে। অবশ্যই পারবে। তারাও ব্যাপকভাবে তাকে উৎসাহ জোগাচ্ছে। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। এতে নীলিমা ভীষণ সন্তুষ্ট। ও আসলে এতটা ভাবেনি। বিপদে পরিবারের সদস্যদের পাশে পাবে—এই আস্থা ওর ছিল। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাপোর্ট ও পাচ্ছে।

এরই মধ্যে একদিন তানজীবের মা এসে হাজির হন নীলিমাদের বাড়িতে। তিনি সরাসরি নীলিমার কাছেই জানতে চান, তানজীবকে সে বিয়ে করবে কি না।

নীলিমা সরাসরি কথাটা আসলে বলতে চায়নি। সে ইশারা-ইঙ্গিতে বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু তাহমিনা আহমেদ নাছোড়বান্দা। তিনি বললেন, নীলিমা মা, আমি কম শিক্ষিত মানুষ তো! তোমার হাইথটের কথা আমি বুঝতে পারছি না।

নীলিমা কিছু বলার আগেই মাহমুদা বেগম এসে বললেন—আপা, ও আসলে এখন পরীক্ষার ঝামেলায় আছে। কয়েক দিন পরে আমরা বসে সিদ্ধান্ত নিই?

মাহমুদা বেগমের কথা শুনে তাহমিনা আহমেদ বিস্মিত। তিনি বিস্ময়ের সঙ্গেই বললেন, কিসের পরীক্ষা!

নীলিমা বিসিএস দিচ্ছে। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা।

তাই নাকি? কই, জানি না তো!

আসলে বিষয়টা আমরা এখনই বলতে চাইনি।

বিসিএস দিচ্ছে দিক। তাই বলে বিয়ে আটকে থাকবে? না না। এটা হতে পারে না। আমার ছেলে আর কত দিন অপেক্ষা করবে?

নীলিমা আর দেরি করল না। ও বলল, অপেক্ষা করার দরকার নেই, খালাম্মা। আপনারা অন্য কোথাও দেখেন। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না।

তাহমিনা আহমেদ বিস্ময়ের দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে আছেন। কী বলবেন তা বুঝতে পারছেন না।

 

আট

তানজীবের বড় দুই ভাই পরিবার-পরিজন নিয়ে দেশে এসেছে। তারা মাসখানেক দেশে থাকবে। তানজীবের বিয়ের অনুষ্ঠান শেষ করে ফিরে যাবে। তানজীবের ভাইপো-ভাইঝিরা মহা উল্লসিত। চাচাকে তারা বরবেশে দেখবে। তার বিয়ে খাবে।

পিচ্চি ভাইঝিটা তো বলে বসল, চাচ্চু চাচ্চু! বিয়ে কী? বিয়ে কিভাবে খায়?

কষ্টের মধ্যেও তানজীবের হাসি পায়। সে হো হো করে হাসে।

পিচ্চি ভাইঝিটা নাছোড়বান্দা। সে চাচ্চুর কাছ থেকে জবাব নিয়েই ছাড়বে। চাচ্চুর হাসি দেখে ভাবল, ব্যাপারটা বুঝি মজার কিছু। জানার জন্য তার আগ্রহ আরো কয়েক গুণ বেড়ে গেল। সে চাচ্চুর গলা আঁকড়ে ধরে বলল, বলো না চাচ্চু, বলো না! বিয়ে কী? বিয়ে কিভাবে খায়?

তানজীব ভাইঝিকে বোঝায়, বিয়ে হচ্ছে একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের লিখিত এবং ধর্মীয় সম্পর্ক। কলেমা পড়িয়ে মাওলানা সাহেব বিয়ে করান। বলতে পারো, এটা একসঙ্গে থাকার সম্পর্ক। বিয়ের সময় যে অনুষ্ঠান করা হয়, সেখানে ভালো ভালো খাওয়াদাওয়া হয়। এ জন্য মানুষ বলে বিয়ে খাওয়া। এবার বুঝতে পারছ?

বিজ্ঞের মতো পিচ্চি মেয়ে মাথা নাড়ে। সে আবার জিজ্ঞেস করে, চাচ্চু, বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকা যায় না।

উঁহু। আমাদের ধর্মমতে বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে থাকা যায় না।

ধর্ম কী, চাচ্চু?

এইতো ফেললা বিপদে!

কেন, বিপদ কেন?

ধর্ম নিয়ে কথা বলা বিপদ না!

পিচ্চি মেয়ে হাসে। হে হে হে!

তানজীব মেয়েটির গাল টিপে দিয়ে আদুরে গলায় বলে, আচ্ছা শোনো, ধর্ম হচ্ছে বিশ্বাস। আমরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করি। আমাদের ধর্মে আছে, কলেমা পড়ে বিয়ে করতে হয়। এবার বুঝেছ?

পিচ্চি মেয়ে বিজ্ঞের মতো মাথা ঝাঁকায়। তানজীব মেয়েটিকে আদর করে নিজের কাজে চলে যায়। বাসায় তাহমিনা আহমেদ তাঁর বড় দুই ছেলে তামিম ও তাহমিদকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। তাঁদের সঙ্গে বউরাও যোগ দেয়। মহা উৎসাহ নিয়ে তারা বৈঠকে বসে। তাদের ধারণা ছিল, তানজীবের বিয়ের প্রস্তুতির বিষয় নিয়ে তিনি আলোচনা করবেন। কার কী দায়িত্ব হবে, তা তিনি জানাবেন। কিন্তু তিনি শুরুতেই যখন বললেন, তানজীবের বিয়েটা আসলে হচ্ছে না, তখন তারা হতাশায় ডুবে গেল।

উদ্বিগ্ন হয়ে তামিম জানতে চাইল, সব কিছু ঠিকঠাক হওয়ার পর বিয়ে কেন হবে না? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে! কারণটা তাহলে কী?

কী বলবেন তাহমিনা আহমেদ! তিনিও আসলে ভালো করে জানেন না এর কারণ। তানজীব যাকে পছন্দ করেছিল, সে কী কারণে যেন বেঁকে বসেছে।

আজব কাণ্ড! তাহমিদ বলল। মা, আমরা একটা কাজ করি। আমরা তানজীবের জন্য মেয়ে দেখি। আমরা যখন এসেছি, ওকে বিয়ে না করিয়ে যাব না। কী বলিস, তামিম?

ঠিক বলেছ, ভাইয়া। আমাদের বাচ্চারা জানে ওর বিয়ে হবে। এখন যদি ওরা শোনে তানজীবের বিয়ে হচ্ছে না, তাহলে কী ভাববে? ওদের খারাপও লাগবে।

তাহমিদের স্ত্রী নওরীন বলল, আমাদেরই তো খারাপ লাগছে। ওরা আরো বেশি মন খারাপ করবে।

তামিমের স্ত্রী নাসরীনও নওরীনের সঙ্গে সহমত পোষণ করল। তামিম বলল, মা, তানজীব কি অফিসে গেছে?

তাহমিনা বললেন, হ্যাঁ।

কখন আসবে?

বিকেলে।

ওর সঙ্গে আমরা সবাই কথা বলি। ওর যদি বিকল্প কোনো চয়েস থেকে থাকে তাহলে বলুক। আর না হয় আমরা ওর জন্য মেয়ে দেখব। ওকে বিয়ে না করিয়ে আমরা যাচ্ছি না।

সবাই তামিমের কথার সঙ্গে একমত পোষণ করল। তাহমিনা আহমেদ বললেন, ঠিক আছে। তোমরা তাহলে ওর সঙ্গে কথা বলো। ও রাজি থাকলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।

রাজি থাকলে মানে! ওকে রাজি হতেই হবে। আমরা এসেছি কি এমনি এমনি নাকি! তামিম বলল।

তাহমিদ বলল, মা, তুমিই চিন্তা করে দেখো, আমরা কি বারবার আসতে পারব? আমাদেরও তো ব্যস্ততা আছে। বাচ্চাদের স্কুল থাকে। তা ছাড়া সবাই একসঙ্গে আসার সুযোগও হয়তো পাব না।

তোমরা কী বলবে, আমি তো সেটা জানি। আচ্ছা, আজ সন্ধ্যায় তোমরা ওর সঙ্গে বসো। ও কী বলে শোনো। তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নাও। তবে ওকে বেশি জোর কোরো না।

নাসরীন বলল, আম্মা, তানজীবকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার আর নওরীনের। ঠিক আছে?

ঠিক আছে। তোমরা রাজি করাতে পারলে তো ভালোই হয়। আমরাও চিন্তামুক্ত হতে পারি।

ব্যস, তাহলে আর কোনো কথা নেই। মা যখন বলেছেন, আমরা সবাই চেষ্টা করি। তামিম বলল।

তাহমিনা আহমেদ উঠতে উঠতে বললেন, আমি যাই। তোমাদের জন্য কী রান্নাবান্না হচ্ছে দেখি।

তামিম বলল, মা, দুই ছেলের বউ থাকতে তোমার চিন্তা করতে হবে না। ওরা দেখবে।

আরে কী বলো! ওরা কত দিন পর আসছে! ভালোমন্দ খাবে না! তোমরা কথা বলো। আমি যাই। আচ্ছা, তোমাদের জন্য চা পাঠাব? কে কে চা খাবে বলো?

এবার নাসরীন বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, আম্মা, আমি সবাইকে চা খাওয়াচ্ছি।

 তাহমিনা আহমেদ চলে গেলেন। তাঁর সঙ্গে নাসরীনও গেল। সে চা বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। বাচ্চারা কেউ খেলছে, কেউ গল্প করছে, কেউ কম্পিউচারে গেম খেলছে। নাসরীন রুমে রুমে গিয়ে কে কী খাবে তা জানতে চাইছে। কিন্তু তার কথায় কেউ কর্ণপাত করল না। সেও আর কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।

এরই মধ্যে তামিম দু-তিনবার নাসরীনকে ডাকল। চায়ের সঙ্গে যেন ঝাল কিছু দেয়, সে জন্য তাকে স্মরণ করিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাসরীন চা-নাশতা নিয়ে তামিমদের সামনে হাজির হলো। কিন্তু সেদিকে কারো নজর নেই। সবাই তখন গল্পে মশগুল!

তানজীব আজ ভীষণ ব্যস্ত। সে ফাইলের মধ্যে ডুবে আছে। একটার পর একটা ফাইল দেখছে, নোট লিখছে আর ফিতা বেঁধে পাশে রাখছে। মনিকা কখন তার রুমে এসেছে, তা সে খেয়াল করেনি। মনিকা তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে ভালো করে দেখছে। একটা মানুষ কাজের মধ্যে কতটা ডুবে থাকতে পারে, তা তানজীবকে না দেখলে বোঝা যায় না।

মনিকা তানজীবের কাজে ব্যাঘাত ঘটাবে কি না তা নিয়ে ভাবে। তানজীব যদি মাইন্ড করে! সে যদি বলে বসে, কাজের সময় কেন এসেছ? সিরিয়াস মানুষরা অনায়াসে এই কথা বলে ফেলতে পারে। তাই বলে সে কফি না খেয়ে চলে যাবে! না না! তা হয় না। এ রকম ভাবনা থেকেই মনিকা মৃদু গলায় বলে, আমি কি আপনার সঙ্গে কফি খেতে পারি?

হঠাৎ মনিকার কণ্ঠস্বর শুনে বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকায় তানজীব। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বলে, তুমি! কখন এসেছ?

এইতো! আপনি যে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন! কিছু বলারই সাহস পাচ্ছিলাম না। কিন্তু আপনার সঙ্গে কফি খাওয়ার লোভটা সামলাতে পারলাম না।

ধন্যবাদ। আমি এখনই দিতে বলছি।

তানজীব তার পিয়নকে ডাকতে উদ্যত হওয়ার মুহূর্তে সে কফি নিয়ে রুমে ঢোকে। তানজীব তাকে কফি দিতে দেখে বিস্ময়ের সঙ্গে বলে, আরে! তুমি বুঝলে কী করে আমি কফির অর্ডার করব?

স্যার, আমি ম্যাডামকে দেখেই কফি বানাইতে গেছি। আমি জানি, ম্যাডামের খুব কফি পছন্দ।

মনিকা হাসল। তারপর পিয়ন ছেলেটাকে ধন্যবাদ দিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, এ জন্যই বলি, ওর হাতের কফি অন্য রকম।

হুম্।

আমি কি আপনার কাজে ব্যাঘাত ঘটালাম?

মোটেই না।

সত্যি?

সত্যি।

আমার সঙ্গে সময় কাটাতে আপনার ভালো লাগে?

লাগে।

সত্যি?

সত্যি।

আমাকে আপনার পছন্দ হয়?

হয়।

সত্যি?

সত্যি।

আমাকে আপনি বিয়ে করবেন?

কী বললে?

আমি যা বলেছি, তা আপনি শুনতে পেয়েছেন।

কী বলছিলে? আবার বলো না!

আমি এক কথা দুইবার বলি না। আর আমি মজা করার জন্য কথাটা বলিনি। সিরিয়াসলি বলেছি।

স্যরি। মনে কিছু কোরো না। আমি তোমাকে রাগাতে চাইনি।

আমি রাগ করিনি। মন খারাপ করেছি। সত্যি করে বলেন তো, আপনি আমার কথা শুনতে পাননি। বুকে হাত দিয়ে বলেন।

হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছি। আমি আসলে তোমাকে নিয়ে ওভাবে চিন্তা করিনি। আজ থেকে ভাবি। চিন্তাভাবনা করে জানাই।

ঠিক আছে। আমি এখন আসি।

তুমি মন খারাপ করে এভাবে চলে গেলে আমি কষ্ট পাব। প্লিজ, মনিকা! তুমি আরেকটু বসো। গল্প করো। তারপর যাও। আমরা বরং আরেকবার কফি খাই।

মনিকা কোনো কথা বলে না। সে চুপ করে বসে আছে। তানজীব তার পিয়নকে ডাকে। সে হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢোকে। তাকে দেখে তানজীব আবার কফি দিতে বলে। পিয়ন ছেলেটা দৌড়ে যায় কফি বানাতে।

তানজীব মনিকার মন ভালো করার জন্য তাকে প্রশংসা করে নানা কথাবার্তা বলে। কখনো কখনো হাসির কথা বলে মনিকাকে হাসানোর চেষ্টা করে। একপর্যায়ে হেসে দিয়ে বলে, সত্যিই, তানজীব ভাই! আপনি পারেনও।

আমার কথায় তোমার মন খারাপ হয়েছে শুনে আমারও খুব খারাপ লেগেছে। আমি চাই না, আমার কথায় কিংবা আচরণে কেউ কষ্ট পাক।

মনিকা কিছু একটা বলতে গিয়েও বলল না। পিয়নকে দেখে সে চুপ করে রইল। পিয়ন কফি দিয়ে চলে গেল। মনিকা কফিতে চুমুক দিয়ে ভীষণ তৃপ্তি অনুভব করল। তানজীব মনিকার চেহারা দেখেই তা বুঝতে পারল। সে নিজেও কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, খুব মজা হয়েছে, তাই না?

হুম্। আমি আসি?

তোমার মন ভালো হয়েছে তো?

মনিকা মাথা নেড়ে সায় দেয়। তানজীব ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। একটা পর্যায়ে তার দৃষ্টি স্থির হয়ে যায়। মনিকা কখন চলে গেছে তা টের পায়নি তানজীব।

 

নয়

নীলিমার বিসিএস পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে। তার ধারণা, সে টিকে যাবে। এত ভালো পরীক্ষা হবে, তা সে নিজেও ভাবেনি। ও ভীষণভাবে উত্ফুল্ল। নীলিমার আনন্দ দেখে ওর পরিবারের সবাই উদ্বেলিত।

মাহমুদা বেগম মেয়ের খুশির খবরে এতটাই উদ্বেলিত যে তিনি নিজের ভেতরে আনন্দ চাপা রাখতে পারলেন না। তিনি জনে জনে মেয়ের বিসিএস পরীক্ষার খবর জানাতে শুরু করলেন। কেউ কেউ অবশ্য তাঁর কথা শুনে টিপ্পনী কেটে বললেন, বাব্বা! রেজাল্ট হাতে না পেতেই এত আনন্দ! রেজাল্ট খারাপ হলে কী হবে?

মানুষের এসব কথায় কান দেন না মাহমুদা বেগম। তিনি যেন হাওয়ায় ভাসছেন। তিনি মনে মনে বলেন, তাঁর মেয়ে অবশ্যই বিসিএসে টিকবে। তাকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। মেয়েটা যে কষ্ট করছে! এর পরও যদি না টেকে, তাহলে বুঝব কপাল মন্দ!

মাহমুদা বেগম মহা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নাজমুল হককে বলেন, তোমাকে বলছিলাম না, নীলিমা নিজের পায়ে দাঁড়াবে। এবার দেখো, সত্যি সত্যিই ও চাকরিতে ঢুকে তার প্রমাণ দেবে।

তুমি তো দেখছি নীলিমার চেয়েও বেশি ফর্মে আছ!

থাকব না! তুমি তো মেয়েটাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য পাগল হয়ে গেছ! আমার মেয়ে এত লেখাপড়া করেছে কি অন্যের বাড়িতে চুলা ঠেলার জন্য?

তুমি ওভাবে চিন্তা করছ কেন? বিয়ের পর মেয়েদের স্বামীর বাড়িই তো নিজের বাড়ি! সেভাবে চিন্তা করো!

কী যে বলো তুমি! টাকা না থাকলে মেয়েরা কত অসহায় তা বোঝো তুমি?

তুমি কি খুব অসহায়?

অসহায় না তো কি? আমার নিজের কিছু করার ক্ষমতা আছে? আমি শখ করে যদি আমার ছেলে-মেয়েকে কিছু দিতে চাই, পারি না। তোমার কাছে হাত পাততে হয়। আমার সব শখ, আহ্লাদ, মনোবাসনা তোমার কাছে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে। আমি চাকরি করলে তোমার কাছে হাত পাততে হতো না।

তার মানে তুমি খুব মনঃকষ্টে আছ! আচ্ছা, এই সংসার তো তোমারই। আমি কি নিজের কাছে কিছু রাখি? সবই তো তোমার হাতে তুলে দিয়েছি।

তোমার টাকা-পয়সা আমি গচ্ছিত রেখেছি বলতে পারো। চাহিবা মাত্র তোমাকে দিতে বাধ্য থাকিব!

নাজমুল হক মাহমুদা বেগমের পাশে গিয়ে বসেন। তাঁকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলেন, মাহমুদা, প্লিজ! তুমি এভাবে চিন্তা কোরো না। তুমি চাইলে আমার সব কিছু তোমার নামে লিখে দেব। তবু তুমি মনে কোরো না, তুমি অসহায়!

আমি কোনো দিন তোমার কাছে কিছু চেয়েছি! শুধু দুই ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ বাবদ যা দরকার, তা-ই নিয়েছি। আমার যেহেতু নিজের কোনো আয় নেই, সেহেতু আমি নিজের থেকে কিছুই করিনি। কিছু খেতে ইচ্ছা করলেও মনকে বুঝিয়েছি, তোমার লোভ সংবরণ করো, মাহমুদা! তোমার নিজের আয় নেই। কাজেই নিজের জন্য খরচ করার অধিকারও তোমার নেই!

মাহমুদা বেগমের কথা শুনে নাজমুল হকের মন ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। তিনি চিন্তাও করেননি, মাহমুদা বিষয়টি নিয়ে এভাবে ভাবেন। তিনি বারবার মাহমুদা বেগমের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আসলে আমারই ভুল হয়েছে। তোমাকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব আমিই দিয়েছিলাম। যদিও তার সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল। দুই সন্তানকে মানুষ করতে হবে। আমাদের দুজনের ব্যস্ততার কাছে ওরা মানুষ না হলে আমাদেরই পস্তাতে হতো।

মাহমুদা বেগম বললেন, মানুষ হতে পারল কই?

আচ্ছা শোনো, নীলিমার কথার বাইরে আমি কিছু করেছি? ও তানজীবকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, আমরা সবাই মিলেই রাজি হয়েছি। এখন আবার বলছে, করবে না। সেটাতেও সবাই মত দিয়েছি। তার পরও আমাকে কেন দোষারোপ করছ?

স্যরি। আমার ভুল হয়ে গেছে। তোমার কোনো দোষ নেই। দোষ আমার নিজের, আমার কপালের!

আবার তুমি নেগেটিভ কথাবার্তাই বলছ! তোমার কোনো ছেলে-মেয়ে বিপথগামী হলে এসব কথা বলতে পারতে! ওরা তো দুজনই মাশাআল্লাহ ভালো করছে। লেখাপড়ায় ভালো করলে চাকরি পাওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার হবে না। বিসিএসে টিকে গেলে তো কথাই নেই!

ভালো করে দোয়া করো। মা-বাবার দোয়া খুব লাগে।

অবশ্যই দোয়া করি, মাহমুদা। তুমি দেখবে, ওরা যখন বড় চাকরিবাকরি করবে, তখন তুমি নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভুলে যাবে। তখন মনে হবে, তুমি যা করেছ, ভালোই করেছ। নিজের ক্যারিয়ার জলাঞ্জলি দিয়ে ছেলে-মেয়েকে মানুষ করেছ। এর চেয়ে বড় তৃপ্তি আর কিছুতে নেই, মাহমুদা। তুমি শুধু শুধু নেগেটিভ চিন্তা করছ। আর শোনো, কালই তুমি রেজিস্ট্রি অফিসে চলো। আমার জমিজমা তোমার নামে লিখে দেব।

এই! তুমি আমাকে কী ভেবেছ, হ্যাঁ! আমি কি লোভী? আমি সম্পত্তি দিয়ে কী করব?

আরে! তোমাকে লোভী কে বলল?

তুমি তোমার সম্পত্তি আমার নামে লিখে দিতে চাও!

এটা তো তোমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রতিদান! আমি খুশি মনেই তোমার নামে লিখে দেব।

কোনো দরকার নেই। তোমার নামে থাকলেও তো আমার সন্তানরা সেগুলো পাবে, তাই না!

অবশ্যই। আমার জীবন আর কয় দিনের?

এভাবে বোলো না তো! তোমার জীবন কয় দিনের মানে কী?

বয়স হয়েছে না!

কী এমন বয়স হয়েছে! এখনো ছেলে-মেয়ের বিয়ে দিলাম না!

দোয়া করো, সব কিছু গুছিয়ে যেন মরতে পারি।

আহা, ওসব কথা রাখো তো! তুমি কি চা খাবে?

শুধু চা?

চায়ের সঙ্গে কী খাবে? আচ্ছা দেখি, কী দেওয়া যায় তোমাকে।

মাহমুদা বেগম হনহন করে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যান। ফ্রিজ খুলে নাশতার জন্য কী আছে তা ভালো করে দেখেন। ছোট শিঙাড়া আর পুরির প্যাকেট পেয়ে তিনি মনে মনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি দ্রুত পুরি-শিঙাড়া ভেজে চাসহ নাজমুল হকের সামনে দেন। বিপুল আগ্রহ নিয়ে গরম শিঙাড়ায় কামড় দেন নাজমুল হক।

বিসিএস লিখিত পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। নীলিমা পাস করেছে। ওর সিরিয়াল পঞ্চাশের মধ্যে। এই খবরে নীলিমার চেয়েও তার মা মাহমুদা বেগম বেশি উত্ফুল্ল। মেয়ের সুখবরটি আত্মীয়-স্বজনকে তো দিয়েছেনই, পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে বাদ রাখেননি। তিনি বেশ গর্বের সঙ্গেই বলেন, বিসিএস পরীক্ষায় টেকা কি চাট্টিখানি কথা! মেয়ের মতো মেয়ে বটে!

নীলিমার জন্যও বিসিএসে টেকা একটা প্রেস্টিজ ইস্যু। বিসিএসে টিকতেই হবে—এমন একটা জেদ চেপেছিল তার। পাস করে সে বুঝিয়ে দিয়েছে, ইচ্ছা করলে সেও পারে। খবরটি যে তানজীবের কানে দিতে হবে। কী করা যায় ভাবে নীলিমা। সে তার বান্ধবী মালতী দেবীর শরণাপন্ন হয়। নীলিমা তাকে জানায়, তানজীব বিসিএস ফরেন সার্ভিসে টিকে যাওয়ার পর আমাকে সে মানুষ বলে গণ্য করত না। আন্ডারমাইন্ড করত। এতে আমার ভীষণ অপমান লাগে। ওর অপমান সহ্য করতে না পেরে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমিও যে ওর চেয়ে কোনো অংশে কম নই, সেই বার্তাটা ওকে দেওয়া দরকার।

মালতী দেবী নীলিমার মনোভাব বুঝতে পারে। সে একদিন তানজীবের মোবাইলে ফোন করে। তাকে সে নীলিমার সুখবরটি দিয়ে বলে, কোনো মানুষকেই ছোট করে দেখতে নেই। অবশ্য সেটাতে অনেক বড় কাজ হয়েছে। তা না হলে হয়তো নীলিমার বিসিএস দেওয়া হতোই না।

মালতীর কথাগুলো শুনে বিস্মিত হয় তানজীব। নীলিমা যে বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তা সে মালতীর কাছেই প্রথম শুনল। নীলিমার সুখবরে সন্তোষ প্রকাশ করে সে বলল, আমি কি নীলিমাকে ছোট করেছি? আমার তো তা মনে হয় না! আমি নিজেও জানি না, ওকে কখন কিভাবে ছোট করেছি। আমি কিন্তু ওর কাছে স্যরিও বলেছি। যা হোক, ওর ভালো হোক, সেটাই আমি চাই। মালতী, আমি আবারও বলছি, আমি সজ্ঞানে নীলিমাকে ছোট করিনি।

মালতী আর কথা বাড়ায়নি। সে ফোন রেখে নীলিমাকে বিষয়টি জানায়। নীলিমা মালতীকে ধন্যবাদ দিয়ে কথা শেষ করে। তবে তানজীবের মনের মধ্যে বিষয়টি বেশ নাড়া দেয়। সে মনে মনে বলে, তার মানে সত্যিই আমি নীলিমাকে কষ্ট দিয়েছি; ওকে আন্ডারমাইন্ড করেছি। আমি এত বড় ভুল কী করে করলাম!

 

দশ

ছুটির দিন ছাড়া তানজীবের সঙ্গে কথা বলার উপায় নেই। তাই তামিম ও তাহমিদ শুক্রবারের জন্য অপেক্ষা করে। শুক্রবার সকালে নাশতা করেই তারা ড্রয়িংরুমে বসে তানজীবের সঙ্গে আলোচনার জন্য। তাদের একটাই কথা, তানজীবের বিকল্প কোনো পাত্রী পছন্দের না থাকলে তারা দেখেশুনে তাকে বিয়ে করাবে। তানজীবের বিয়ের জন্য দ্বিতীয়বার তারা দেশে আসতে পারবে না।

তানজীব মাথা নিচু করে বসে থাকে। কী বলবে তা নিয়ে ভাবে। নীলিমা তাকে বিয়ে করবে না, এটা স্পষ্ট। মনিকা তানজীবকে ভীষণ পছন্দ করে। সে তাকে বিয়ের প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছে। কিন্তু নীলিমাকে ভোলা কি এত সহজ! কী করে ভুলব আমি ওকে! নীলিমাকেই বা রাজি করাব কী করে! আমি কি ভাইয়াকে আরেকবার কথা বলতে বলব? মা-বাবার কথাই সে রাখল না, ভাইয়াদের কথা রাখবে? তাদের কথা না রাখলে তাদের মন খারাপ হবে। আবার রেগেও যেতে পারে। ভাইয়াদের কাছে কি মনিকার কথা বলব? মেয়েটা আমাকে ভীষণ পছন্দ করে। নীলিমার চেয়ে অনেক মেধাবী। অনেক বেশি যোগ্যতা তার। সে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব। নীলিমা সারা জীবন চেষ্টা করলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢুকতে পারবে না। চেহারায় হয়তো নীলিমা ওর চেয়ে এগিয়ে থাকবে। তা ছাড়া সব দিক থেকেই মনিকা এগিয়ে। চেহারা একটা যোগ্যতা বটে! তবে চেহারার চেয়ে বড় হচ্ছে যোগ্যতা।

তানজীব অনেক চিন্তাভাবনার পর বলল, ভাইয়া, মনিকা নামের একটি মেয়ে আমাকে ভীষণ পছন্দ করে। সে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমাদের সঙ্গেই চাকরি করে। আমাদের এক ব্যাচ জুনিয়র। আমার মনে হয় ওর বিষয়টা ভাবা যেতে পারে।

দেখ, পরে আবার নীলিমার জন্য মন খারাপ হবে না তো! তামিম বলল।

মন খারাপ করে কী করব? সে তো আমাকে চায়ই না।

তাহলে নীলিমার বিষয়টি মাথা থেকে পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে হবে। তার কথা কোনো দিন মাথায় আনা যাবে না। মনিকার কাছেও তার বিষয়ে কিছু বলবে না। তাহমিদ বলল।

ঠিক আছে, ভাইয়া। আমি নীলিমার কথা ভুলে যাব।

পারবে তো? নাকি দুদিন পর আবার আমাদের ঝামেলায় ফেলবে? তামিম বলল।

না, ভাইয়া।

মনিকা তোমাকে সত্যি ভালোবাসে তো?

হ্যাঁ।

নীলিমাও তো তোমাকে খুব ভালোবাসত। দীর্ঘদিন তোমরা প্রেম করেছ। বিয়ের সিদ্ধান্ত হওয়ার পরই ঝামেলা পাকাল। তামিম বলল।

আমি বুঝতে পারছি না, ভাইয়া। ওর ব্যাপারটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে।

মনিকার সঙ্গে কত দিনের পরিচয়? তাহমিদ জানতে চাইল।

ইউনিভার্সিটি লাইফ থেকেই চিনি।

কবে থেকে সে তোমাকে ভালোবাসে?

কিছুদিন আগে সে আমাকে জানাল, আমাকে তার ভীষণ পছন্দ।

তাহলে ঠিক আছে। বুঝেশুনেই সে এগিয়েছে। মেয়েটাকে আমরা দেখে আসি? তামিম বলল।

তোমরা দেখতে চাও? মনিকা এই দেখাদেখি যদি পছন্দ না করে!

তাহলে থাক। তোমার যেহেতু পছন্দ, আমাদের কোনো আপত্তি নেই। দেখারও কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা কার সঙ্গে কথা বলে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করব সেটা জানাও। আরেকটা কথা, মা-বাবা কি মনিকার বিষয়ে কিছু জানে?

না।

তাদের জানানো দরকার না?

তানজীব মাথা নেড়ে সায় দেয়।

তাহলে তাদের ডাকি?

এবারও মাথা নেড়ে সায় দেয় তানজীব। তামিম ড্রয়িংরুমে বসেই গলা ছেড়ে সাইফুল আহমেদ ও তাহমিনা আহমেদকে ডাকে। তামিমের ডাক শুনে তাঁরা উভয়েই ড্রয়িংরুমে আসেন। তামিম কোনো ভণিতা না করেই বলতে শুরু করে, বাবা, আমরা তানজীবের বিয়ে ঠিক করেছি।

সাইফুল আহমেদ বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, মানে! নীলিমা কি রাজি হয়েছে?

না না। নীলিমা নয়।

নীলিমা নয়! তাহলে কে?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েই ওর সঙ্গে চাকরি করে। নাম মনিকা।

সাইফুল আহমেদ আবারও বিস্ময়ের সঙ্গে বলেন, মনিকার নাম তো কখনো শুনিনি! তাহমিনা, তুমি শুনেছ?

তাহমিনা ছেলেদের দিকে তাকান। তারা চোখের ইশারায় তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করে। তাহমিনা বুঝতে পেরে বলেন, তানজীব একটু একটু বলছিল।

সাইফুল আহমেদ তানজীবকে উদ্দেশ করে বলেন, নীলিমার সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি কী নিয়ে, তানজীব?

আমি জানি না, বাবা। সে নিজের থেকেই আমাকে এড়িয়ে চলছে।

তাহমিনা আহমেদ বললেন, আমি নিজেও তো ওদের বাসায় গেলাম। ওর আচার-আচরণ ভালো মনে হলো না। তুমিও তো গেছ। তোমার কি মনে হয়েছে সে তানজীবকে বিয়ে করবে?

আমি নিজেও আসলে কনফিউজড। তানজীব বলেছে বলেই তো নীলিমার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম!

স্যরি, বাবা। ভুলটা আমারই। আমি বুঝতে পারিনি এমন হবে।

মনিকার সঙ্গে কি তোমার আগে থেকে জানাশোনা?

হ্যাঁ, বাবা।

সে কি তোমাকে বিয়ে করবে বলে জানিয়েছে?

হ্যাঁ।

মেয়েটার নাম কী যেন বললে?

মনিকা।

মনিকা ওর মা-বাবার সঙ্গে কথা বলে জানিয়েছে?

সেটা ঠিক জানি না।

মনিকার মা-বাবা কী করেন?

তানজীব চুপ করে আছে।

কী হলো, বলো কী করেন?

জানি না।

তোমার পারিবারিক অবস্থা সম্পর্কে মনিকা জানে?

জানে হয়তো।

জানে হয়তো মানে! তোমার কাছে জানতে চায়নি?

না।

তুমি ওর মা-বাবা সম্পর্কেও জানতে চাওনি?

না।

তানজীব!

স্যরি, বাবা।

তোমার কী হয়েছে বলো তো! তুমি যে মেয়েটাকে বিয়ে করবে, পরিবার সম্পর্কে কোনো খোঁজখবর নেবে না! তোমার পরিবার সম্পর্কে তাকে বলবে না?

তাহমিনা বললেন, এসব কথা এখন থাক না। আমরা এখন খোঁজখবর নিই। তানজীব নিজেও নিক। আর ওরা তো বুঝদার, তাই না? ওরা যেহেতু রাজি! আমরা রাজি না হয়ে কী করব!

সাইফুল আহমেদ খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, দেখো কী করবে!

তামিম সাইফুল আহমেদের নিমরাজি অবস্থা দেখে বলল, বাবা, ও ভুল করেছে বলে আমরাও ভুল করব? আমার মনে হয় যত দ্রুত সম্ভব আমরা কাজটা সেরে ফেলি।

তাহমিদও তামিমের সঙ্গে সুর মেলাল। এতে হালে পানি পেল তানজীব।

 

তানজীব সকাল সকাল অফিসে এসেছে। টেবিলে এলোমেলো ফাইলপত্র এক পাশে রেখে অন্যান্য কাগজপত্র গোছগাছ করে পিয়নকে ডাকে। এই, তুমি দেখো তো মনিকা এসেছে কি না। আর শোনো, তোমার কিছু বলার দরকার নেই। দেখে চলে এসো।

পিয়ন ঘাড় কাত করে জবাব দিয়ে চলে যায়। সে মনিকার রুমের সামনে গিয়ে উঁকি দিতেই তাকে দেখে ফেলে মনিকা। সে গলা ছেড়ে ডাক দেয়, এই, শোনো শোনো!

পিয়ন ছেলেটা যাবে কি যাবে না কয়েক মুহূর্ত ভেবেই মনিকার রুমের দিকে পা বাড়ায়। মনিকা তাকে বলে, কী ব্যাপার! স্যার এসেছে? কফি খাওয়াবে?

জি।

ঠিক আছে। তুমি যাও। ভালো করে দুই কাপ কফি বানাও, আমি আসছি।

পিয়ন চলে যায়। সে খুব আগ্রহসহকারে কফি বানায়। এদিকে মনিকার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে তানজীব। কফি খেতে খেতে তার সঙ্গে কথা বলবে। আর বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করবে। কী বলবে, কিভাবে শুরু করবে তা নিয়ে ভাবে তানজীব। মনের মধ্যে কিছুটা সংশয়ও কাজ করে। নীলিমার সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রেম। সেই নীলিমাও বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে গিয়ে ব্যাকফুটে চলে গেল। ভয়টা তার এখানেই। ভয় আর মনিকার মতো মেয়েকে বিয়ে করতে পারার এক অপার আনন্দ তার মনের মধ্যে খেলা করে।

পিয়ন তার সামনে কফি দিয়েছে। কফির গন্ধে তার নাকে সুড়সুড়ি লাগছে। কিন্তু সে চৈতন্যহীন। কিছুক্ষণ পর তার সামনে এসে বসে মনিকা। সে এসেই কফিতে চুমুক দেয়। হঠাৎ তাকে দেখে থতমত খেয়ে তানজীব বলে, আরে, তুমি কখন এলে!

আমি কখন এলাম মানে! আপনি কি ঘোরের মধ্যে আছেন নাকি?

না, মানে...আমি আসলে তোমার কথাই ভাবছিলাম।

কী ভাবছিলেন আমার কথা?

ভাবছিলাম, কিভাবে কিভাবে তোমার সঙ্গে সম্পর্কটা গভীর হয়ে গেল। তোমার প্রতি অন্য রকম একটা ভালো লাগা তৈরি হলো।

ও আচ্ছা, তাই! আপনি আমার কথা ভাবছেন!

সত্যি বলছি। এতক্ষণ তোমার কথাই ভাবছিলাম।

খুব ভালো ব্যাপার তো! আপনি তাহলে আমাকে নিয়ে ভাবেন! শুনে ভালো লাগছে।

মনিকা কফিতে চুমুক দেয়। কফির মগটা তানজীবের হাতে ধরাই ছিল। সে কফিতে চুমুক দিয়ে মগটা টেবিলের ওপর রাখে। আবেগের দৃষ্টিতে মনিকার দিকে তাকায়। মনিকাও তানজীবের দিকে তাকায়। একসময় ওদের দুজনের চোখ একবিন্দুতে মেলে। আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে তানজীব বলে, আমরা কবে বিয়ে করছি?

আপনি আপনার মা-বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন?

হ্যাঁ। আমার দুই ভাইও দেশে এসেছেন। সবাইকেই তোমার বিষয়টা জানিয়েছি।

কী বললেন তাঁরা?

দুই ভাই-ই তোমাকে দেখতে চেয়েছিলেন।

তাই নাকি?

হুম্।

আপনি কী বললেন?

আমি বললাম, দেখার দরকার নেই।

তারপর তাঁরা কী বললেন?

তাঁরা বললেন, ঠিক আছে। তোমার যেহেতু পছন্দ।

আপনার মা-বাবা কী বললেন?

মা কিছু বলেননি। বাবা বললেন, তোমার পরিবার সম্পর্কে আমি কিছু জানি কি না।

কী জবাব দিলেন?

আমি বললাম, না, তেমন কিছু জানি না। তখন বাবা একটু রাগ করলেন।

কী বললেন?

না, সে রকম কিছু না। বললেন আর কি, তুমি কেমন ছেলে, কোনো খোঁজখবর না নিয়েই...

স্যরি, আমি আপনাকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছি।

না না! তুমি কেন স্যরি বলছ? সব ঠিক আছে। তাঁরা কিন্তু আমাদের বিয়ের ব্যাপারে মত দিয়েছেন!

তাই! আমি কিন্তু মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে  পারিনি।

সেকি! তুমি কথা বলোনি?

না। আমি আসলে সাহস পাচ্ছি না। কিভাবে বলব, কী বলব বুঝতে পারছি না।

প্লিজ! তুমি আজই কথা বলো।

আজ? কিভাবে বলব? মা-বাবা তো দেশে নেই। আর এই কথা কি টেলিফোনে বলা যায়?

তাহলে উপায়!

উপায় আর কি! তারা আসুক। এত তাড়াহুড়ার কি আছে?

না, মানে, আমি যে ভাইদের কথা দিয়েছি।

কী কথা দিয়েছেন?

তাঁরা আসলে আমার বিয়ের পারপাসেই দেশে এসেছেন। আর অল্প কিছুদিন তাঁরা দেশে আছেন। তা ছাড়া আমাদের ব্রাসেলসে যাওয়ার তারিখও তো ঠিক হয়ে গেছে! তার আগেই বিয়ে হয়ে গেলে ভালো হয় না!

হুম্। কিন্তু কোনো উপায় নেই। বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে টেলিফোনে কথা বলা সমীচীন মনে করছি না। আমরা আমাদের সময়মতোই ব্রাসেলসে চলে যাই। পরে একসময় আলোচনা করে ঠিক করা যাবে।

হতাশার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তানজীব। এ অবস্থায় সে কী বলবে বুঝতে পারে না। সে চুপ করে আছে। মনিকা চেয়ার থেকে উঠতে উঠতে বলল, আমি এখন যাই। আমার গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ আছে।

তানজীব কোনো কথা বলল না। সে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

 

 

এগারো

অজ্ঞাত কারণে মনিকাও তানজীবকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানায়। বিয়ের সব আয়োজন চূড়ান্ত হওয়ার পর মনিকার কাছ থেকে এমন একটি আঘাত আসবে, তা কল্পনাও করেনি তানজীব। সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। জীবন নিয়ে চরম হতাশায় ভোগে সে।

নীলিমার পর মনিকার বেঁকে বসার কারণ খোঁজে তানজীবের পরিবার। তাদের কাছেও বিষয়টা রহস্যজনক বলে মনে হয়। কিন্তু তারা রহস্যের কোনো কিনারা খুঁজে পায় না। পর পর দুজনের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয় তানজীব। অপমানে, ঘৃণায় মেয়েদের ব্যাপারে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেয় তার ভেতর। মেয়েদের কোনো ভালো খবরেও তার গা জ্বালা ধরে।

অদম্য চেষ্টায় নীলিমা দ্বিতীয় দফায় বিসিএস দিয়ে খুব ভালোভাবে উত্তীর্ণ হয়। পরীক্ষার ফল ভালো হওয়ার কারণে সে পেয়ে যায় পররাষ্ট্র ক্যাডার। নীলিমার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদানের খবরে তানজীব ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠে।

চাকরিজীবনে নানা রকম বাধা-বিপত্তি আর প্রতিহিংসার আগুনে পোড়ে নীলিমা। কিন্তু তাতেও নীলিমার অগ্রযাত্রা কেউ রুখতে পারেনি। মানসিক শক্তির বলে সে এগিয়ে যায়; পেয়ে যায় অপরাজিতার পুরস্কার।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা