kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

গ ল্প

হুসার্ল ও হেইডেগার

অদিতি ফাল্গুনী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৬ মিনিটে



হুসার্ল ও হেইডেগার

অঙ্কন : সারা টিউন

‘আজ তোমাদের পড়াব জার্মান দর্শনে হুসার্ল ও হেইডেগারের দর্শন। এর আগে তাঁদের জীবনী সংক্ষেপে জানা দরকার। এডমন্ড হুসার্ল জন্মেছিলেন সেই সময়কার অস্ট্রিয়ান এম্পায়ারের মাগ্রাভিয়েতে নামে এক শহরে, আজ যেটা চেকোস্লোভাকিয়ার মোরাভিয়ায় অবস্থিত, আজকের চেক প্রজাতন্ত্রের প্রস্তেজভ জায়গাটিতে। ইহুদি পরিবারে জন্ম হলেও ১৮৮৬ সালে হুসার্ল...তাঁর বাবার মৃত্যুর দুই বছরের মাথায় লুথারান চার্চে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন,’ এটুকু বলে একমুহূর্তের জন্য সমরেন্দ্র দেব স্যার চুপ করে যান। তাঁর চুপ করে যাওয়ায় আমরাও সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে যাই। আমাদের মফস্বল শহরের শত বছর বয়সী এই বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের (স্থাপিত : ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ) পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আর নদীর ওপারে রেললাইন থেকে রেলপথের ইস্পাত মর্মরিত শব্দ শোনা যায়। যেন বা হেমন্তের দিনে ঝরে পড়ছে পাতা। আমরা শিহরিত হই এবং সমরেন্দ্র দেব স্যারকে নিয়ে এই শহরের বহুশ্রুত কিংবদন্তিগুলো আমাদের মনে পড়ে। দেশভাগের আগে সাদা ধুতি আর পাঞ্জাবি এবং দেশভাগের পর সাদা পাঞ্জাবি ও পায়জামার এক চির অকৃতদার দর্শনের শিক্ষক। পুরনো দিনের মানুষ বলেন, বাবার শ্রাদ্ধের দশ দিনের মাথায় তাহেরা আক্তার ডলি নামের এক নারীকে বিয়ে করবেন বলে কাজি অফিসের সামনে গেলেও সহপাঠিনী তাহেরা আক্তার ডলিকে তাঁর বাবা ও ভাইয়েরা বাসায় আটকে রেখে এক খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে আক্দ পড়িয়ে দেওয়ায় সমরেন্দ্র দেব স্যার সমরেন্দ্রই থেকে যান। বাকি জীবনটা তাঁর একা মানুষের ঘরে বইয়ের শেলফে পাশ্চাত্য গ্রিক দর্শন, রুশো বা ভলতেয়ার থেকে হেগেলের অ্যান্টি-ডুরিং, ফয়েরবাখ বা কান্টের পাশাপাশি রাজা রামমোহন রায়ের সম্পাদিত ‘সম্বাদ কৌমুদী’ পত্রিকা, যা নাকি স্যারের অ্যাডভোকেট বাবার সংগ্রহে ছিল আর এমনকি ১৮২২ সালে ফারসিতে রামমোহন রায় প্রকাশিত ‘মিরাত-উল-আকবর’ নামে পত্রিকার একটি কাচে বাঁধাই করা কপিতে সতীদাহ রদ ও নারী অধিকারের পক্ষে লেখা রচনা অথবা ভাই গিরীশচন্দ্র সেনের বাংলা অনুবাদে কোরআন, পবিত্র নতুন নিয়মের পাশে ভাগবত কী তা-ও দর্শনের ওপর বই দেখতে পাওয়া যায়। স্যারের বাসায় কখনো সরস্বতী পূজার কি কখনো ঈদে মিলাদুন্নবীর চাঁদা আর কখনো কলেজ পত্রিকার জন্য লেখা চাইতে গিয়ে আমরা তাঁর দুর্মূল্য বই ও পত্রপত্রিকার সংগ্রহ দেখেছি। ঘরে এক বিধবা দিদি আর সমরেন্দ্র দেব স্যারের মা-বাবার সময়ের এক বাজারসরকার স্যারের ঘরবাড়ি গোছগাছ করে রাখেন। তাহেরা আক্তার ডলি বরের সঙ্গে এখন লন্ডনে থাকেন বলেই আমরা জানি।

‘হুসার্ল লিপজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৮ সাল নাগাদ গণিত, পদার্থবিদ্যা ও মহাকাশবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। উইলহেলম ভুন্ডটের দর্শনবিষয়ক বক্তৃতাগুলোও তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ১৮৮৩ সালে ভিয়েনায় পিএইচডি পেলেন আর ১৮৮৭ সালে বিয়ে করলেন মালভিন স্টেইনশেনেইডারকে। পরের পঞ্চাশটি বছর একসঙ্গে সুখী বিবাহিত জীবন কাটে তাঁদের। চারটি ছেলে-মেয়ে হয়।’

...‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা!’

 ‘পিন্ডি না ঢাকা/ঢাকা ঢাকা!’

ক্যাম্পাসে স্লোগান শুরু হয়েছে। ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া ও মেনন গ্রুপ আর ছাত্রলীগ—তিন বড় দল মিলেই ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করছে। আমি, ইশতিয়াক, প্রদীপ—তিনজনই ছটফট করতে থাকি। গতকাল একটি রাস্তার কাগজ-কুড়ানি বাচ্চা পুলিশের গুলিতে নদীর পাশে আমাদের ছোট্ট শহরের ধূলিধূসরিত পার্কে মারা গেছে। আজ তার লাশ নিয়ে বড় মিছিল হবে। কোর্টপাড়া আর প্রেস ক্লাবের সামনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বড় মিছিল হবে। মাস্টার্সের বড় ভাইরা সব মিছিলে নেমে গেছেন এরই মধ্যে। আর অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি বলে বুঝি আমরা নামব না? এখন বুঝি জার্মানির কোন লিপজিগ শহরের এক হুসার্ল সাহেবের জন্ম-মৃত্যু-অধ্যয়ন-বিবাহ-দর্শনের খবর আমাদের ভালো লাগবে?

ঢ্যাঙ্গা ইশতিয়াক আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছটফটে। উঠে পড়ে দাঁড়িয়ে সে বলল, ‘স্যার, আমাদের আজ ছুটি দেন। কাল শহরে একটি বাচ্চা মাউরাদের গুলিতে মারা গেছে। আজ মিছিলে যেতেই হবে।’

‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরীয়সী যেমন সত্য, তেমন ছাত্রানাম অধ্যয়নং তপঃও সত্য। তোমাদের আজ মিছিল কাল মিটিং লেগেই আছে। না যেতেই বা বলি কী করে? ক্লাস শেষ করে যাওয়া যায় না?’

‘তাহলে অনেক দেরি হয়ে যাবে, স্যার’—লালচে ফরসা আর বরাবরের লাজুক শান্ত প্রদীপ স্যারের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই উত্তর দিয়ে দেয়।

‘আচ্ছা, এসো তাহলে!’

আমরা তিনজন উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্লাসের আরো জনা আটেক ছেলে ও দুটি মাত্র মেয়েও উঠে দাঁড়ায়। সবাই বিক্ষুব্ধ আর উত্তেজিত।

‘ক্লাস কি তবে ছুটি দিয়ে দেব?’

‘স্যার, আমি ক্লাস করতে চাই! মহানবী বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীন দেশে হলেও যাও!’ হাত তুলল মাহতাব। এই ছেলেটাকে কেন জানি আমাদের তত পছন্দ হয় না।

“অসাধারণ কোরআনের অনুবাদে...মানে ওই ভাই গিরীশচন্দ্র সেনের অনুবাদে জেনেছি আর জিবরাঈল ফেরেশতা প্রথম যে শব্দ বলেছিলেন মহানবীকে সেটা হলো ‘ইকরা’, পড়ো তোমার প্রভুর নামে।”

‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন? জবাব চাই—জবাব চাই!’

‘গো ব্যাক ইয়াহিয়া—গো ব্যাক ভুট্টো!’

এটা ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। মাত্র সাত দিন আগে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ ৩১০টির মধ্যে ২৯৮টি আসন পেয়েছে। কিন্তু ইয়াহিয়া খান কি আর ক্ষমতা ছাড়বে? এত কষ্ট করে বাঙালি তার নিজের দলকে তো জেতাল। কিন্তু ক্ষমতায় কি আর সে যেতে পারবে?

নিচে কলেজ মাঠ থেকে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন ও মতিয়া এবং ছাত্রলীগের এক বিরল ঐক্যবদ্ধ মিছিল উঠে আসছে কলেজের দোতলা সিঁড়ি বেয়ে।

‘স্যার, আসি?’

আমরা ক্লাসের অধিকাংশই বের হয়ে আসি। তবে সবাই হয়তো শেষ পর্যন্ত মিছিলে যাবে না। মিছিলের ছুতায় কেউ কেউ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখতে বা নদীর পাশে ছোট্ট পার্কটিতে প্রেম করতেও যাবে।

‘যাচ্ছই যখন তাহলে কাল দুপুরের পর আমার রুমে এসো। একটা এক্সট্রা টিউটরিয়াল নিয়ে নেব।’

‘আচ্ছা, স্যার।’

‘স্যার, আমি ক্লাস করব’ মাহতাব বলতে থাকে। মাহতাব ছেলেটা যেন কেমন। এমনিতে মেধাবী। গরিব ঘরের ছেলে হয়ে, মাদরাসায় পড়ে বারো ক্লাসের পর আমাদের মানে জেনারেল লাইনের ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে পরীক্ষায় টিকে, ভর্তি হয়ে ক্লাস করছে। শুরুতে ইংরেজিতে বেশ খারাপ ছিল। তবে দ্রুতই ইমপ্রুভ করছে অনেক। ক্লাসে খুবই মনোযোগী। সবার আগে এসে সবার শেষে যাবে। মন দিয়ে শুনবে সব আর নোট নেবে প্রয়োজনমাফিক। নিয়মিত লাইব্রেরিতে যাওয়া, অনেকটা সময় ধরে পড়া, শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও পড়ালেখা করা—আদর্শ ভালো ছাত্র যেমন হয়। যদিও ও যেন কেমন! পোশাক-আশাকে সাদা সালোয়ার-পায়জামা ও পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। আমরা যখন কথায় কথায় ত্রিশের পঞ্চকবি কি শামসুর রাহমান বা শহীদ কাদরীর কবিতা আবৃত্তি করি, মাহতাব সব প্রশ্নের উত্তরে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বা ‘মাশাল্লাহ’ বলে, যা আজকের বাংলাদেশে আমাদের বৃদ্ধ বয়সে দেখলেও সেই ১৯৭০ সালের পূর্ব পাকিস্তানে একেবারেই ছিল না। এই ছেলেটিকে সমরেন্দ্র দেব স্যার অনেক প্রমোটও করছেন। না করেই বা কি করবেন? বাকি আমরা তো সব ফাঁকিবাজ। কবিতা লেখা বা পড়া, মিছিলে যাওয়া, প্রেম করা—সব কিছুর সময় পাই, শুধু ক্লাসের পড়াটা করার সময় পাই না। ও, আমাদের মাহতাবেরও তো একটি প্রেমিকা আছে। মেয়েটি বোরকা পরে। হ্যাঁ, আজকের বাংলাদেশে আমাদের বৃদ্ধ বয়সে কোনো স্কুল-কলেজে পড়া মেয়ে বোরকা পরছে দেখতে অবাক না হলেও সে সময় একটু অবাক করাই ছিল। আরো অবাক ছিল চারকোনা ঘেরা পর্দায় ঢাকা রিকশায় উঠে ওরা দুজনই চলে যেত ক্যাম্পাস থেকে মূল শহরের একটু ভেতরে কোনো ক্যাফেতে, যেখানে আরো একটি পর্দা দেওয়া কেবিনঘরে বসে ওরা চাপ কাবাব, আলুর চপ, শিঙাড়া, লাচ্ছি কি চা খেত। তবে প্রদীপ আর ইশতিয়াক প্রায়ই বলত, ‘এই, মাহতাব আলীর মতিগতি সুবিধার লাগে না।’

‘কেন রে? মাদরাসার পোশাক পরে বলে? গরিব ঘরের ছেলে বলে মাদরাসায় পড়তে হয়েছে। তাই অমন পোশাক, অমন প্রেমিকা—আমরা যাকে বলি ক্ষ্যাত।’

“উঁহু, মাদরাসা থেকে আমাদের ক্লাসে আরো দুজন এসেছে। রিয়াজ এখন দাড়ি কামিয়ে, আমাদের মতো পোশাক পরলেও হাশেম ইসলামী পোশাকই পরে। কিন্তু ওরা দুজনই তো দেখলাম এই পরশুও ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বলে স্লোগান দিচ্ছে। কিন্তু মাহতাব ছেলেটা আসলেই যেন কেমন। সারা দেশ, বিশেষ করে আমরা স্টুডেন্টরা সব অস্থির হয়ে আছি। এত মিছিল-মিটিং, বক্তৃতা-ভাষণ; ওকে কোনো দিন ছয় দফার পক্ষে কোনো মিটিংয়ে বা মিছিলে দেখেছিস? ও নাকি আলিম পড়ার সময় তমদ্দুন মজলিসের মিটিংয়ে যেত?” প্রদীপ বলে।

অথচ আমাদের সমরেন্দ্র স্যার তো তাকেই সব টিউটরিয়ালে হাইয়েস্ট দিচ্ছে! ইশতিয়াক বলে, ‘বুড়া বয়সে এসে স্যারের কাণ্ডজ্ঞান সব যাচ্ছে।’

‘আসলে স্যার নীতি মেনে চলে কি না। আমরা তো সারা দিন মিছিল-মিটিংয়েই শেষ। ও তো নিয়মিত ক্লাস করে, পড়ে!’

‘এটা কোনো কথা হলো, রেজা? তাই বলে তমদ্দুন মজলিসের মিটিং করা ছেলেকে সমরেন্দ্র স্যার প্রতিটা টিউটরিয়ালে হাইয়েস্ট নাম্বার দেবেন?’ প্রদীপ আর ইশতিয়াক একসঙ্গে ঝাঁজিয়ে ওঠে।

‘স্যার কি সেটা জানেন?’

‘উম্ম্, সেটা ঠিক। এক সন্ধ্যায় চল স্যারের বাসায় যাই! একটু বরং স্যারকে জানাই সব কিছু।’

‘কাল নাকি গত পরশুর সাসপেন্ডেড হওয়া টিউটরিয়াল ক্লাসটা স্যার আবার নেবেন। তারপর সন্ধ্যায় চল যাই।’

 

দুই

মাহতাবকে নিয়ে যা খুশি আমরা বলি না কেন, ক্লাসে গিয়ে ওর সঙ্গে দু-চার কথা বলতেই হয়; যেহেতু এই উত্তপ্ত সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে প্রতিটি ক্লাস একমাত্র সে-ই করতে পারে।

‘কাল কত দূর পর্যন্ত পড়িয়েছিল?’

‘আরে বেশি না, ক্লাসে কেউ তো বলতে গেলে ছিলই না। স্যার খানিকটা পড়িয়ে বললেন আবার পড়াতে হবে। কেউ তো নেই, শুধু শুধু ক্লাস রিপিট করার কষ্ট করতে হবে।’

মাহতাব আমাদের কথার উত্তর শেষ না করতেই যথারীতি সাদা পাজামার ওপর একটি খাদির পাঞ্জাবি পরা সমরেন্দ্র স্যার ক্লাসে ঢুকে পড়েন। স্যারের   কাঁচাপাকা চুল ব্যাক ব্রাশ করা, হাতে একটি পাইপ থাকত সব সময়। পাইপে তামাক টানাটা সে সময় একটা ফ্যাশনই ছিল বোধ করি।

‘কি আন্দোলন-সংগ্রাম সব হয়েছে তো, বিদ্রোহীরা? বিপ্লবীরা?’ স্যার মুচকি হেসে ক্লাস শুরু করেন। ‘এখন যে আবার একটু জার্মান দর্শনে ফিরতে হয়! গতকাল হুসার্ল ও হেইডেগারের দর্শন বিষয়ে মাত্রই পড়ানো শুরু করেছিলাম।’

‘স্যরি স্যার, আর ক্লাস মিস করব না!’

‘তোমরা আবার ক্লাস মিস করবে না?’ স্যার একটু হেসে আবার পড়াতে শুরু করেন। ‘বার্লিনের ফ্রেডেরিখ উইলহেলম ভার্সিটিতে বা আজকের হামবোল্ডট ইউনিভার্সিটিতে হুসার্ল গণিত বিষয়ে পড়েছেন লিওপোল্ড ক্রোনেকারের কাছে। বার্লিনে থমাস মাসারিক এবং পরে ফ্রাঞ্জ ব্রেনটানোর কাছেও দর্শন শিখলেন হুসার্ল। ১৮৮১ সালে ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন আর ১৮৮৩ সালে পেলেন পিএইচডি। ক্যালকুলাসের ভ্যারিয়েশনের ওপর তাঁর পিএইচডি ছিল, বুঝলা? আর তোমরা তো অঙ্ক করতে চাও না!’ সমরেন্দ্র স্যার মুখে একটি জর্দা দেওয়া পান পোরেন। জর্দা দেওয়া পান আর মাঝেমধ্যে পাইপে টান দেওয়া ছাড়া বিশেষ কোনো নেশা স্যারের নেই।

“গণিতে পিএইচডি করেও হুসার্লের শুধু ফিলোসফি পড়ার বাতিক। ভিয়েনায় ফিরে কিছুদিন সামরিক বাহিনীতে কাজ করে আবার ভিয়েনার ভার্সিটিতে ঢুকলেন। পড়লেন দর্শন আর দার্শনিক মনস্তত্ত্ব। এ সময়ই ডেভিড হিউম, জন স্টুয়ার্ট মিল, বার্নার্ড বোলজানো, হারম্যান লোটজের বইপত্রের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। ১৮৮৭ সালে লিখলেন ‘অন দ্য কনসেপ্ট অব নাম্বার’, যা তাঁর প্রথম বড় কাজ ‘ফিলোসফি দের আরিথমেটিকে’র ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।”

‘কী বোরিং ক্লাস—মানে মজার, কিন্তু চারপাশে এখন যা অবস্থা! এখনো অনেক পোস্টার লেখা বাকি।’

আমি-ইশতিয়াক-প্রদীপ ইচ্ছা করেই একদম শেষের বেঞ্চিতে বসেছি। সামনের অনেক ছাত্রের মাথার আড়ালে লুকিয়ে পোস্টার লেখা যায়। পোস্টার লিখতে গেলে মন ভালো হয়ে যায়, ‘বাংলার হিন্দু—বাংলার মুসলমান—বাংলার বৌদ্ধ—বাংলার খ্রিস্টান—আমরা সবাই বাঙালি!’

“১৯০১ সালে হুসার্ল তাঁর বউ-বাচ্চাসহ গেলেন ইউনিভার্সিটি অব গটিংজেনে। সেখানে তিনি এক্সট্রা-অর্ডিনারিয়াস প্রফেসর হিসেবে যোগ দিলেন। ১৯১০ সালে ‘লগোস’ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হলেন। ১৯১২ সালে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ইয়ারবুক ফর ফিলোসফি অ্যান্ড ফেনোমেনোলজিক্যাল রিসার্চ’। এই পত্রিকাতেই ১৯১৩ থেকে ১৯৩০ সাল অবধি হুসার্ল ও তাঁর সাথিরা প্রকাশ করেন অসংখ্য প্রবন্ধ। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় হুসার্ল প্রকাশ করেন তাঁর প্রবন্ধ ‘ইডিন’, যেখানে তিনি বলেছেন যে প্রতিটি বিষয় তাঁর নিজের কাছেই উপস্থাপিত হয় প্রকৃতির অংশ হিসেবে নয়, বরং বিশুদ্ধ চেতনা হিসেবে।”

‘ভোলায় ঘূর্ণিঝড়ে দুর্গতদের ত্রাণ কই?’

‘হুসার্লের এ বক্তব্যকে অবশ্য পরবর্তী সময়ে জাঁ পল সার্ত্রে নাকচ করেছেন।’

‘পূর্ব বাংলার জলোচ্ছ্বাসে—আমার বোনের লাশ ভাসে!’

লাস্ট বেঞ্চিতে বসে আমি-ইশতিয়াক-প্রদীপ সটাসট পোস্টার লিখতে থাকি। সামনের সারিগুলোতে প্রচুর মনোযোগী ছাত্র-ছাত্রী। সমরেন্দ্র স্যারের ক্লাসে বাইরে থেকেও ছাত্র-ছাত্রীরা আসে।

‘পিন্ডি সরকার—ত্রাণ কই? লক্ষ লাশের জবাব চাই!’

‘১৯১৪-এর অক্টোবরে হুসার্লের দুই ছেলেই প্রথম মহাযুদ্ধে লড়াই করতে পশ্চিম ফ্রন্টে গেল এবং পরের বছর এদের একজন ওলফগ্যাং হুসার্ল মারাত্মকভাবে আহত হলো। দুই বছর পর মার্চের ৮ তারিখে ওলফগ্যাং আহত হয়ে মারা গেল। পরের বছর আরেক ছেলে আহত হলেও বেঁচে গেল। তবে হুসার্লের নিজের মা জুলিয়া মারা গেলেন। এর মধ্যেই ১৯১৬ সালে হুসার্লকে ফ্রেইবার্গে অ্যালবার্ট লুডউইগ ভার্সিটিতে বদলি করা হয়, যেখানে তিনি পরিপূর্ণ প্রফেসর বা অধ্যাপক হলেন। এখানে তাঁর দার্শনিক কাজ পেল নতুন মাত্রা। শুরুর কয়েক বছর এডিথ স্টেইন হুসার্লের সহকারী হলেও ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সাল—এই তিন বছর তাঁর সহকারীর দায়িত্ব পালন করলেন মার্টিন হেইডেগার। ১৯২৩ সালে বার্লিন ইউনিভার্সিটি হুসার্লকে চাকরি দিতে চাইলেও তিনি ফ্রেইবার্গেই থেকে গেলেন। ১৯২৬ সালে হেইডেগার তাঁর ‘সেইন আন্ড জেইট’ (বিয়িং অ্যান্ড টাইম) উৎসর্গ করলেন গুরু হুসার্লকে। লিখলেন ‘কৃতজ্ঞ শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্বের সঙ্গে’।

‘হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর—হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর—সংগ্রামী সাথি ও বন্ধুগণ, আজ বিকাল চারটায়—আজ বিকাল চারটায়—পূর্ব বাংলার স্বাধিকার সংগ্রামের প্রশ্নে স্থানীয় ছাত্র ও যুবসমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করতে ঢাকা থেকে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ—হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর...’

বাশার ভাই-ই নিশ্চয়। রিকশায় চড়ে মাইকে গোটা কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে অনুষ্ঠেয় নানা আয়োজনের সংবাদ তিনিই তো দেন।

‘১৯৩৩ সালে জার্মানিতে নয়া নাজি শাসনব্যবস্থা চালু হলে বর্ণবাদী আইন প্রণীত হলো। সে বছরই এপ্রিল মাসে বাদিশ্চে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় হুসার্লকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাসপেন্ড করে। পরের সপ্তাহেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধরনের কাজে তাঁর অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। তবু তাঁরই পরম শিষ্য ও সতীর্থ শিক্ষক হেইডেগার এপ্রিলের ২১-২২ তারিখ নাগাদ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টর নির্বাচিত হন। তিনি যোগ দিলেন নাজি দলে। জুলাই মাসে গোটা জার্মানির একাডেমিক জগতের মুখপাত্র প্রতিষ্ঠান ডয়েশ্চে একাডেমি থেকে হুসার্লকে পদত্যাগ করতে হয়।’

‘হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর—হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর—একটি বিশেষ ঘোষণা—সংগ্রামী সাথি ও বন্ধুগণ, আজ বিকাল চারটায়—আজ বিকাল চারটায়—পূর্ব বাংলার স্বাধিকার সংগ্রামের প্রশ্নে স্থানীয় ছাত্র ও যুবসমাজের সঙ্গে মতবিনিময় করতে ঢাকা থেকে আসছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দ—হ্যালো—রেডি ওয়ান টু থ্রি ফোর...’

‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন? জবাব চাই—জবাব চাই’

‘পিন্ডি না ঢাকা? ঢাকা ঢাকা’

বাশার ভাইয়ের সঙ্গে খোকা নামের ছেলেটিও আছে বোধ হয় রিকশায়। বাশার ভাই যখন ঘোষণা পড়েন, খোকা তখন স্লোগান দেয়। ওদের রিকশায় একটা হ্যান্ড মাইক থাকে। দূর...রক্তে কাঁপন ধরছে। সমরেন্দ্র স্যার এখন কোন দূরদেশের গল্প শোনাচ্ছে কে জানে? তবু, যাক, আজকের ক্লাসটা শেষ করতেই হবে।

‘হুসার্ল অবশ্য এতে দমে গেলেন না। ১৯৩৫-এ প্রাগ এবং ১৯৩৬-এ ভিয়েনায় বক্তৃতা দিলেন। ‘দাই ক্রাইসিস’ নামে প্রবন্ধে ইউরোপের সাংস্কৃতিক সংকট আলোচনা করার পাশাপাশি দর্শনের ইতিহাসে গ্যালিলিও ও দেকাতেসহ কিছু ব্রিটিশ দার্শনিককে নিয়েও আলাপ করেন। আজীবন অরাজনৈতিক হুসার্ল শেষ জীবনে খানিকটা রাজনৈতিক হয়ে উঠলেন। ১৯৩৭-এর শরতে প্লুরিসি রোগে ভুগে মৃত্যু হলো তাঁর। গোটা ফ্রেইবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু গারহাড রিটটার তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দিলেন—নাজি জমানার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে।’

‘হুসার্লের মৃত্যুর পেছনে কি তাহলে নাজি জমানাও একটি বড় কারণ?’ প্রদীপ প্রশ্ন করে। একদম লাস্ট বেঞ্চিতে বসে স্লোগান লিখতে লিখতেই।

‘হয়তো মানসিক অপমান বা পরাজয়বোধ একটি কারণ হয়ে থাকবে। জীবনের শেষ বছরগুলোতে ফ্রেইবার্গ ভার্সিটির লাইব্রেরিও ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি তাঁকে। জীবনের শেষ দিকের লেখাগুলো জার্মানিতে প্রকাশ করতে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল। এমনও শোনা যায় যে তাঁর প্রাক্তন ছাত্র হেইডেগারই হুসার্লকে তাঁর চাকরি শেষ বলে জানান।’

‘হেইডেগার খুবই খারাপ মানুষ ছিল বলা যায়?’

আমাদের শেষ বেঞ্চি থেকে পোস্টার লেখা রেখে এবার দাঁড়িয়ে পড়ে ইশতিয়াক। ফার্স্ট ইয়ারে আমাদের তিনজনের নম্বরই তো ভালো ছিল। নেহাত চারপাশের এই অবস্থায় সেকেন্ড ইয়ারে উঠতে না উঠতে আমরা অনেক বেশি আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িয়ে পড়ছি।

“না, না, হেইডেগারও অনেক বড় দার্শনিক ছিলেন। রাজনৈতিক দর্শন দিয়ে তো ব্যক্তির সব কাজ...একজন শিল্পী, লেখক, কবি বা দার্শনিকের সব কৃতী খারিজ করা যায় না, তাই না? তবে হ্যাঁ, এটা ভাবতে সত্যিই অবাক করা যে ১৯৪১ সালে...হুসার্লের মৃত্যুর কয়েক বছর পর হেইডেগার ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইমে’র পরবর্তী সংস্করণে প্রথম সংস্করণে শিক্ষক হুসার্লের যে নাম দিয়েছিলেন, সেটা মুছে দেন। অবশ্য এর পেছনে প্রকাশকেরও খানিকটা চাপ ছিল। পরবর্তী সংস্করণের ৩৮ নম্বর পৃষ্ঠায় একটি ফুটনোটে অবশ্য হুসার্লের নাম আছে তাঁর উদারতা ও নির্দেশনার জন্য। তার পরও শিক্ষকের নাম তিনি মুছে ফেলতে পারবেন এটা জার্মানির খুব কম দার্শনিকই ভেবেছিলেন।”

‘তারপর, স্যার?’

‘তোমাদের ক্লাসের সময় আজ শেষ হয়ে আসছে। তবু দুজনের দর্শন বিষয়ে আসল আলোচনায়ই যেতে পারলাম না। আসলে গোটা দর্শনের ইতিহাসে এই গুরু-শিষ্যের সম্পর্কও কম আগ্রহোদ্দীপক নয়। আর মিনিট পনেরো পড়াই?’

‘জি স্যার, পড়ান!’

‘সারা জীবন অরাজনৈতিক থাকা হুসার্ল ১৯৩৩ সালের ৪ মে নাজি জার্মানি সম্পর্কে বলেছিলেন : একমাত্র ভবিষ্যৎই সঠিক বিচার করতে পারবে যে ১৯৩৩ সালের জার্মানিতে কারা সত্য ছিল?’

‘তা’...সমরেন্দ্র স্যার চোখের চশমার কাচ মুছতে মুছতে বলেন, ‘বুড়ো ইহুদির মৃত্যুর পর তাঁর রচনাসমগ্রের আনুমানিক ৪০ হাজার পাতা বেলজিয়ামে চোরাচালান হয়ে চলে গেল। অন্যদিকে ফ্রেইবার্গ ভার্সিটিতে রেক্টর হওয়ার দশ দিনের মাথায় হেইডেগার নাজি পার্টিতে যোগ দিলেন। এক বছর পর অবশ্য রেক্টরশিপ থেকে পদত্যাগ আর নাজি পার্টির মিটিংয়ে যাওয়া বন্ধ করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা পর্যন্ত এই পার্টির তিনি সদস্য ছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাজি সম্পৃক্ততার জন্য কয়েক বছর তদন্তের পর ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ফ্রেইবার্গ ভার্সিটিতে তাঁর চাকরি চলে যায়। তবে ১৯৫১ সালে আবার চাকরি ফিরে পেলেন এবং তাঁকে ‘প্রফেসর ইমেরিটাস’ পদবি দেওয়া হয়। গোটা ইহুদি হত্যাযজ্ঞ বিষয়ে তিনি একটি কথাও লেখেননি। বরং ১৯৩১ থেকে ১৯৪১ সাল নাগাদ লেখা ‘কালো নোটবই’-এ কিছু ইহুদিবিদ্বেষী মন্তব্য আছে। এসব বিষয়ে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। হিটলার জার্মানির চ্যান্সেলর হওয়ার পর হেইডেগারের আগে ফ্রেইবার্গ ভার্সিটির রেক্টর ছিলেন যে অধ্যাপক ভন মোল্লেনডফ, তিনি ইহুদিবিদ্বেষী পোস্টার প্রদর্শন করতে রাজি হননি বলে তাঁর জায়গায় হেইডেগারকে নেওয়া হয়। হিটলারের কাছে নাজি রেক্টরদের পাঠানো এক সমর্থনলিপিতে হেইডেগারের স্বাক্ষরও ছিল।

‘তাহলে তো হেইডেগার সত্যিই খুব খারাপ ছিল!’

“সেটা বলা যাবে না। শুরুতে হিটলারের কারিশমায় মুগ্ধ হয়ে এমনকি ইহুদিরাও কেউ কেউ তাঁকে পছন্দ করছিল। পরে অবশ্য দ্রুতই মোহভঙ্গ হয়। তবে ‘বিয়িং অ্যান্ড টাইম’ যিনি লেখেন, তিনি কী করে ইহুদি বা মার্ক্সবাদী ছাত্রদের জন্য সব বৃত্তি বা স্কলারশিপ নিষিদ্ধ করলেন, এটা আসলেই অবাক করা! ১৯৩৩ সালের পর ইহুদি ছাত্রদের পিএইচডি কাজের তত্ত্বাবধায়ক হতেও হাইডেগার অস্বীকার করেন। তবে তিনজন ইহুদি কলিগের চাকরি রক্ষার পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন—সম্ভবত ব্যক্তি সম্পর্কের জায়গা থেকে। তবে নাজিবাদের পক্ষে গ্রিক হেরাক্লিটাসের যুদ্ধই সব কিছুর পিতা আওড়াচ্ছেন কখনো, কখনো বলছেন ‘অভ্যন্তরীণ শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ দরকার।’ ‘সেমিটিক যাযাবর’ বা সোজা বাংলায় ইহুদিদের বিরুদ্ধে লিখছেন কোনো কোনো প্রবন্ধে।”

‘জ্বালো জ্বালো—আগুন জ্বালো!

তোমার আমার ঠিকানা—পদ্মা মেঘনা যমুনা!’

...অতিকায় ম্যামথের মতো প্রকাণ্ড একটি মিছিলের শব্দ এগিয়ে আসে। আছড়ে পড়ে ক্লাস করিডরে।

‘আজ অনেকক্ষণ ভালো ছেলে ছিলাম আমরা। চল, এবার বার হই। এক ঘণ্টার মতো ক্লাস করেছি।’

ইশতিয়াক ফিসফিস করে। সত্যিই এরপর ক্লাসে থাকা যায় না। ত্রিশটি পোস্টার অন্তত সাঁটাতে হবে।

 

তিন

‘সেকেন্ড ইয়ার ফাইনালে তাহলে ক্ষেউত্যা মাহতাবই ফার্স্ট হলো?’

‘সমরেন্দ্র স্যারের পেপারে সে রেকর্ড মার্কস পেয়েছে। দত্ত স্যার, আব্দুল গনি স্যার, হাজারী স্যার—সব খেপে লাল। কাল নাকি টিচারস মিটিংয়ে খুব ঝামেলা হয়েছে। স্যার বলেছেন, তিনি আওয়ামী লীগ-মুসলিম লীগ বোঝেন না। মাহতাব পূর্ব বাংলার স্বাধিকারের পক্ষে কি বিপক্ষে সেটা তাঁর দেখার বিষয় না। যে খাতায় ভালো লিখবে, সব ক্লাসে ঠিকমতো অ্যাটেন্ড করবে, তাকেই তিনি সর্বোচ্চ নম্বর দেবেন।’

‘বুড়ার মাথা খারাপ হইছে। চল, স্যারের বাসায় যাই!’

‘হাহ্, তিনি হুসার্ল আর হেইডেগার পড়ান। দেশের অবস্থা দিন দিন যা আগুন হইতেছে, কবে ওই মাহতাব উনারে কী করে সেইটাই দেখার ইচ্ছা আছে!’

‘একা একা থাকতে থাকতে শেষ বয়সে উনার মাথা নষ্ট হইছে। মাহতাব না রিসেন্টলি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র-যুব সাহিত্য সংঘ পত্রিকায় ফর্রুখ আহমেদের কবিতায় ইসলামী তহজিব-তমদ্দুনের ব্যবহার নিয়ে প্রবন্ধ লিখছে? তা-ও তাকে হাইয়েস্ট নাম্বার দিচ্ছে? রেকর্ড মার্কস?’

‘সমর স্যার আসলে এত সরল-সোজা। উনারে একটু বোঝানো দরকার,’ ইশতিয়াক রাগে গুমগুম করে। তিনজন মিলে উনার বাড়ির দিকে পা বাড়ায়।

পুরনো দিনের বাসা সমরেন্দ্র স্যারদের। একতলা-দোতলা মিলিয়ে অনেক ঘর। এই বাড়ির প্রায় সব শরিকই কেউ সাতচল্লিশ আর কেউ উনিশশ পঁয়ষট্টির পাক-ভারত যুদ্ধের পর চলে গেছেন। স্যারের কাকা-জেঠা-পিসি থেকে শুরু করে কাকাতো-জেঠতুতো ভাই-বোনরা বা পিসতুতো ভাই-বোনরা সবাই ওপারে। মায়ের দিকেরও তা-ই। বাড়িটির জনসংখ্যা কমতে কমতে স্যার নিজে একা, স্যারের বালবিধবা যে দিদিকে ওপারে নিয়ে যাওয়ার সময় কেউ নিয়ে যায়নি, আর স্যারের বাবার বিশ্বস্ততম, প্রিয়তম গৃহভৃত্য দীনবন্ধু আর তিনটা ছাইরঙা বেড়াল। সব মিলিয়ে নিতান্ত কম কি? পাশের বস্তি থেকে লক্ষ্মীর মা নামে এক মহিলা এসে ঘর ঝাঁট দিয়ে আর মুছে, কাপড় কেচে, মসলা বেটে দিয়ে চলে যায়। স্যারের দিদিই এখনো রান্নাবান্না করেন। স্যারের থেকে ইনফ্যাক্ট খুব বেশি বড়ও না। বছর দুয়েকের মাত্র বড় হবেন। তিনি ষোলো বছর বয়সে বিয়ের পর সতেরোতে বিধবা হয়ে নিঃসন্তান অবস্থায় ভাইদের কাছে ফিরে এসেছিলেন। আমরা যখনই স্যারের বাসায় আসি, স্যারের এই সাদা থান পরা দিদিকে দেখতে পাই নিচতলায় মাটির উঠানে, কখনো তুলসীমঞ্চে সাঁঝবাতি দিচ্ছেন, আবার টুকটুক করে কখনো সাদা পাথরের বাটি কি কখনো কাঁসার রেকাবিতেই আমাদের জন্য ফল, সন্দেশ কি বাতাসা নিয়ে বৈঠকখানায় এসে আমাদের সামনে রেখে যাচ্ছেন। আমার বাবা নিজে মুসলিম লীগ করেন বলে মাঝেমধ্যেই বলেন, ‘হাহ্, আজ এই সৌদামিনীরা— ছোটবেলায় ওর সঙ্গে মাঠে আমি খেলেওছি—তোদের খাবার দেয়। মুসলমান এখন ওদের বাড়িতে ঢুকলে কি খাবার খেলে ওদের জাত যায় না। অথচ দেশভাগের আগে ছোটবেলায় সৌদামিনীরা আমাদের সঙ্গে খেলতে এলেও ওদের মা-মাসি-পিসিরা জানলে পরে নাইয়ে দিত। মুসলমানের ছেলেকে ফল-মিষ্টি দিয়ে আবার সেই বাটি নিজের হাতে ভেতরঘরে নিয়ে যাবে...তাতে বামুন-কায়েতের ঘরের মেয়ে হয়ে, বামুন-কায়েতের ঘরের বিধবা হয়ে...চাপে পড়ে সবাই শোধরায়। ঠেলার নাম বাবাজি! কিন্তু তোরা তো সব শেখ মুজিবের পেছনে ছুটছিস।’

‘কিন্তু যে জন্য পাকিস্তান করা, তার কি কিছু পেয়েছেন, আব্বা? আজকে পিন্ডি আর করাচিতে আমার পাটচাষির রক্ত ঘাম করা টাকায় শহর বাড়ে, অথচ ঢাকা যে তিমিরে সেই তিমিরেই থাকে। সোনার বাংলা শ্মশান কেন, আব্বা? এত বড় সাইক্লোন হলো ভোলায়। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে কতটুকু রিলিফ দেওয়া হয়েছে, বলেন তো?’

আব্বা বিরক্ত হন, ‘এই হিন্দুদের ভালো ভালো কথায় ভুলো না তোমরা। শেখ মুজিবের ছয় দফা আন্দোলনকে মদদ দিচ্ছে হিন্দুস্তান। এই সমরেন্দ্ররা আজকে এত নিরীহ, ভালো মানুষের মতো দেখতে। কিন্তু ওর ঠাকুরদা ছিল তল্লাটের বড় জমিদার। তার কথায় বাঘে-গরুতে এক ঘাটে পানি খেত।’

‘কিন্তু জমিদারি তো আর নেই তাদের, আব্বা। বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনে সব তো বাতিল করা হয়েছেই। এখন পাঁচ বছর ধরে চলছে শত্রু সম্পত্তি আইন। এখনো হিন্দুদের শত্রু মনে করা মানে তো ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা। এখন আমাদের শত্রু পশ্চিমারা। মাউরারা।’

আব্বা রাতের খাবারের সময় টেবিলে আমাদের ভাইদের সঙ্গে প্রায়ই নানা আলাপ-আলোচনা করেন। তারপর উঠে দাঁড়ান পরের দিনের আদালতে মামলার ফাইলপত্র পড়ার জন্য। আম্মাকে বলেন, ‘তোমার ছেলে আওয়ামী লীগের কথায় মাথা নষ্ট করে ফেলছে।’

আম্মা আমাদের এঁটো বাসন জড়ো করে নিয়ে যেতে যেতে বলেন, ‘সব তো মাথা নষ্টেরই বংশ!’

আব্বা যে এত কিছু বলেন, অথচ স্যারের বাসায় এলে মনটা কেমন হু হু করে। যেন এক পোড়ো, পরিত্যক্ত আর প্রাণহীন বিশাল বাড়িতে এসে পৌঁছেছি। এই ঘরে শিশু বলতে তিনটা বিড়ালছানা। অকৃতদার এক প্রৌঢ় ও তাঁর চিরবিধবা বড় বোন আর এক বৃদ্ধ ভৃত্য। তবু কোথাও এক শান্ত নীরবতাও আছে এই বাড়িতে।

‘ইশতিয়াক-প্রদীপ-রেজা—ইউ থ্রি মাস্কেটিয়ার্স—ত্রিরত্ন? কী খবর?’

‘স্যার, এমনি এলাম আর কি।’

‘উঁহু, আসলে তোমরা সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে আছ। আমি কেন মাহতাবকে সবচেয়ে বেশি নম্বর দিচ্ছি সে জন্য, তাই না?’

‘ওকে আপনি কী ভেবে এত নম্বর দিলেন, স্যার? আপনি ওর রাজনৈতিক অবস্থান জানেন না?’

‘সত্যিই জানি না। শিক্ষক তো ছাত্রের ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয়, সে দেখতে সুন্দর কি অসুন্দর—এসব দেখবে না। দেখবে শুধু পরীক্ষার খাতায় সে কেমন লিখল, কতটা লিখল।’

‘আমরা তো স্যার দেশের এই অবস্থায় আসলে ঠিকভাবে পড়ায় মন দিতে পারছি না!’ ইশতিয়াক গুমরায়।

‘শোনো, অল্প বয়সের জীবনে নানা কিছু দেখবে তোমরা, আর বিচলিত হবে। এই পূর্ব বাংলায়ই আমি পাকিস্তান আন্দোলন দেখেছি। তখন বাঙালি মুসলিম ভেবেছে বাংলার হিন্দু, বিশেষত বর্ণ হিন্দু তার এক নম্বর শত্রু। সে শত্রুকে দমিত করা গেছে। এখন হয়তো তার মনে হচ্ছে পশ্চিমের মাউরা বা পশ্চিম পাকিস্তানিরা—পাঞ্জাবি বা বিহারি বা উর্দুভাষীরা তার বড় শত্রু। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদকে রিপ্লেস করছে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তা। ঢাকায় ৩রা মার্চ ছাত্ররা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়েছেন। শেখ মুজিব ৭ই মার্চ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন। যদি সেই কল্পনার সোনার বাংলা কখনো সত্যিই প্রতিষ্ঠিতও হয়, তোমাদের কি মনে হয় তোমাদের সব স্বপ্ন পূরণ হবে—এখন যে যে উত্তেজনায় তোমরা কাঁপছ, তার সবই ফলদায়ী হবে?’

‘সে তো অবশ্যই হবে, স্যার!’

স্যারকে কেমন ক্লান্ত দেখাল, ‘যদি বলি সেটাও হবে না? যদি বলি ইতিহাস এক চিরদ্বান্দ্বিক আর ঘূর্ণমান প্রক্রিয়া, যার শেষ বলে কিছু নেই? পরম সত্য বলে কিছু নেই, তবে? আজ যারা পাকিস্তান ভাঙতে চাইছে, তাদেরই একটা অংশের সত্যি সত্যি পাকিস্তান ভাঙলে মনে তো হতেও পারে যে তারা ভুল করেছে?’

‘সেটা কখনোই হওয়ার নয়, স্যার! তেমনটা কখনোই হবে না।’

‘হতেও তো পারে, রেজা। তোমার বাবা তো মুসলিম লীগের মানুষ। তুমি আওয়ামী লীগ করছ। তোমার পরিবারেই আরো দুটি ভাই হয়তো মুসলিম লীগের সমর্থন করছে বা এই মুহূর্তে হয়তো ফ্লোটিং। জানে না কোনটি সমর্থন করবে। কাজেই স্থিরভাবে তো কিছু বলা যাচ্ছে না যে এই ভূখণ্ডে কোনটি মানুষের স্থির চাওয়া—নিশ্চিত চাওয়া!’

‘চল, বের হই’—প্রদীপ বিরক্তির সঙ্গে ফিসফিস করে। সমরেন্দ্র স্যারকে আমাদের এক চিররহস্যময়, সব কোলাহল থেকে দূরের এক মানুষ মনে হয়, যাকে কখনোই ঠিক বোঝা যায় না। না তিনি দত্ত স্যার বা আব্দুল গনি স্যারের মতো আওয়ামী লীগ, না প্রিন্সিপাল কোরেশী স্যারের মতো মুসলিম লীগ, না সুজাত ভদ্র স্যারের মতো বামপন্থী। ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে আমরা স্যারের বাসা থেকে বের হয়ে আসি।

 

চার

‘প্রিয় ইশতিয়াক ও প্রদীপ,

আমার বীর দুই বন্ধু ও ভ্রাতা! লোকমুখে শুনিয়াছি তোমরা দুই বীর বঙ্গসন্তান পিতা-মাতার অশ্রুসজল মিনতি উপেক্ষা করিয়া সীমান্ত পাড়ি দিয়া রণাঙ্গনে সম্মুখ ফ্রন্টে যুদ্ধ করিতেছ। আমি তোমাদের কাপুরুষ বন্ধু। তদুপরি মুসলিম লীগার ও দুঁদে উকিল পিতার সন্তান। পরিবারে একঘরে ও সংখ্যালঘু হইয়া পড়িয়া আছি। পিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রেমিকের সাথে পালাইতে চাওয়া তরুণীকে যেমত গৃহে তালাবদ্ধ রাখা হয়, আমি যুবক ছেলে হইলেও আমার অবস্থাও তদ্রূপ। আমাকে গৃহে সার্বক্ষণিক নজরদারির ভিতর রাখা হইয়াছে। অথবা ইহা আমার অক্ষমের সান্ত্বনা। ভেতরে যথার্থ বীরত্ব থাকিলে তোমাদের ন্যায় স্বদেশের তরে যুদ্ধ করিতে যেকোনো উপায়ে বাহির হইতে পারিতাম।

তবে আজি নিজের কাপুরুষ গাথা গাহিয়া তোমাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটাইতে এই চিঠি লিখিতে বসি নাই। আমাদের বাড়ি হইতে কয়েক হাত সম্মুখেই একটি রাজাকার ক্যাম্প বসানো হইয়াছে। সেইখানে দিন তিনেক আগে সমরেন্দ্র স্যারসহ আমাদের কলেজের আরো তিনজন শিক্ষককে চোখ বাঁধা অবস্থায় আনিয়া ব্রাশফায়ার করা হয়। যে ছাত্ররা এই শিক্ষকদের চক্ষু বন্ধন করিয়া আনিয়াছিল, মাহতাব আলী তাহাদের পুরোভাগে ছিল। সৌদামিনী পিসিকেও গুলি করিয়া হত্যা করা হইয়াছে। স্যারের বাড়িটায় এখন পাকবাহিনী অবস্থান করিতেছে।

...বিশেষ কী লিখিব?

ইতি,

তোমাদের হতভাগ্য, কাপুরুষ বন্ধু রেজা!’

ইশতিয়াক ও প্রদীপকে লেখা চিঠিটি আমি প্রায়ই পড়ি। চিঠিটি ওদের কখনোই আর পোস্ট করা হয়নি। ওরা দুজনই কখনোই ফিরে আসেনি। সীমান্তের ওপারে অথবা দেশের ভেতর কোনো বধ্যভূমিতে ওদের অস্থি-কঙ্কাল পড়ে আছে তা তো আর জানার নয়। আমাদের এই ছোট্ট শহরে স্বাধীনতার পর প্রায় এক বছর অপেক্ষার পর ইশতিয়াকের গায়েবানা জানাজা হয়েছে। প্রদীপের জন্যও বহু বহুদিন অপেক্ষার পর তার শ্রাদ্ধ-শান্তি আয়োজন করেছে তার পরিবার। বহুদিন হয় ছোট্ট শহরটিতে আমি আর যাই না। মাহতাব আলী ওই শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দর্শন বিভাগের প্রধান হিসেবে রিটায়ার করেছে। আর তার বড় ছেলে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়েছে। মেজো ছেলের বউ ক্ষমতাসীন দলের এক বড় নেতার মেয়ে। আমার কি? ঢাকা শহরের কোটি মানুষের ভিড়ে একজন ছারপোকা হিসেবে নিজেকে লুকিয়ে তো অন্তত থাকতে পারি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা