kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

উ প ন্যা স

বধ্যভূমিতে বসন্ত বাতাস

সেলিনা হোসেন

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭৩ মিনিটে



বধ্যভূমিতে বসন্ত বাতাস

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

আষাঢ় মাস শুরু হয়েছে মাত্র। দুই দিন পার হয়েছে। আকাশে জমাটবাঁধা ঘন কালো মেঘ নেই। এর পরও বৃষ্টির ঝরে পড়া দেখে যুদ্ধদিনের রুদ্ধশ্বাস মনে হয় আলমতারার। বটগাছের নিচে বসে ও নিজেকে ভেজায়। এত বৃষ্টিতে ভিজলে অসুখ হতে পারে, এমন ভাবনা ওর মাথায় আসে না। প্রবল শূন্যতায় এখন ওর দিনযাপন। ও তাকিয়ে থাকে মেঠো পথ থেকে গড়গড়িয়ে নেমে যাওয়া বৃষ্টির স্রোতের দিকে।

পরক্ষণে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে আলমতারা। দুই হাতে বুক চেপে ধরে। মাথা ঝাঁকায়। চিৎকার করে বলে, এটা তো বৃষ্টির পানি না। এটা রক্তের স্রোত। রক্তের বৃষ্টি। যুদ্ধের সময়ের বর্ষাকাল রক্তের বৃষ্টি ঝরায় পৃথিবীতে। ভেসে আসে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা।’

—হ্যাঁ, আমরা সবাই মিলে রক্ত দেব। আমরা স্বাধীনতা চাই, বঙ্গবন্ধু।

—শত শত মানুষ রক্ত দিয়েছে বলেই তো আমাদের এই বিল আর বিল নাই। এটা একটা বধ্যভূমি। এই বধ্যভূমিতে পোঁতা হয়েছে স্বামী-শ্বশুর আর তিন ভাইকে।

আলমতারা টের পায়, বৃষ্টির তোড় কমেছে। ঝিমিয়ে এসেছে আষাঢ়-ধারা। ও বটগাছের গুঁড়ি দুই হাতে জড়িয়ে ধরে। মাথা ঠেকিয়ে দেয়। জনশূন্য চারপাশে কোনো শব্দ নেই। এমনকি গরু-ছাগলের ডাকও নেই। ভনভন শব্দ করে উড়ে আসছে না ভোমরা। কত শব্দ এবং ভাবনার যা কিছু উৎসব, সব আলমতারার বুকের ভেতরে দপদপ করছে। কেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরের পাটাতন। যুদ্ধদিনের সময় বুকের পাটাতনে আঁচড় পড়ে প্রতিদিন। কখনো ক্ষণে ক্ষণে ঘটে যায় আঁচড়ের তির্যক রেখা। এই আঁচড় সুতার মতো সরু না। এই আঁচড় চওড়া এবং ক্ষতবিক্ষত। অনেকখানি জায়গাজুড়ে দগদগিয়ে থাকে।

আলমতারা দুই হাতে মুখ মোছে। বৃষ্টির ফোঁটা আর মুখের ওপর পড়ছে না। থেমে গেছে বৃষ্টি। রোদ উঠেছে। টুকরো টুকরো কালো মেঘ ভাসছে আকাশে। কিন্তু সেই মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়েনি। বৃষ্টিভেজা উজ্জ্বল একটি দিনের দিকে তাকিয়ে আমলতারা উত্ফুল্ল হয়ে ওঠে। জোরে জোরে বলে, এই সুন্দর দিনই আমার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা—স্বাধীনতা ভেজা কাপড় দুই হাতে চেপে ধরে ও সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়। বিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। পানি টলটল করছে। বর্ষা গেলে পানি শুকিয়ে যাবে। তখন সবুজ হয়ে যাবে বিলের পুরো প্রান্তর। সেদিকে তাকালে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছুঁয়ে যাবে আলমতারাকে। ও গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে বলবে, এটাই আমাদের যুদ্ধদিন।

সবাই এমন করে দেখে না।

শিরীষগাছের নিচে এসে দাঁড়িয়ে সয়ফুলি বেগম বিলের ওপর থেকে ছুটে আসা বাতাস বুকে টেনে বড় করে শ্বাস টানবে। দেখবে চারদিকের এমন অনাবিল সৌন্দর্যের মাঝে কোনো আনন্দ খুঁজে পাওয়া যায় কি না। সবখানি রক্ত আর মৃত্যু।

শাঁখা-সিঁদুর হারানো আরতি রানী বলবে, স্বাধীনতার জন্য সব দিয়েছি। জীবনে আর কিছু চাওয়ার নাই।

সংসারের সব কাজের মাঝে দিনে একবার বিলের ধারে ছুটে আসে সুতপা। মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে বলে, ওগো, তোমার জন্য আমার ভালোবাসার শেষ হবে না কোনো দিন। তোমার জীবন যাওয়া মানে আমার স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার অর্থ বুঝবে তোমার ছেলে-মেয়ে—আনন্দ আর দীপ্তি। কত শখ করে তুমি ওদের নাম রেখেছিলে। বলেছিলে, ওরা আমার জীবনে বেঁচে থাকার ফুল ফোটাবে। সৌরভ ছড়াবে। আলোকিত সন্তান হবে। স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষ হবে।

আলমতারা শুনতে পায় মেরিনা রোজারিওর কণ্ঠস্বর। কাঁদছে—কান্না শেষ করতে পারে না। অনবরত কাঁদতে কাঁদতে ফোঁপায়। একসময় বিলের ধারে বসে পড়ে। বলে, তোমার মাটিতে গজানো ধান থেকে আমরা ভাত খেয়েছি, এখন তুমি শত শত মানুষকে নিজের বুকের ছায়ায় রেখে দিয়েছ। তোমার কি কষ্ট হয়, কান্না পায়, জলাভূমি?

কোথাও কোনো শব্দ নেই।

আলমতারা উঠে দাঁড়ায়। পা বাড়ায় নিজের শূন্য ঘরের দিকে। যেতে হবে অনেকটা পথ। দু-চার পা এগোনোর পর থমকে দাঁড়ায়। যেন প্রবল গুলিবর্ষণে চৌচির হয়ে কেটে যাচ্ছে চারপাশ। চারদিকে মানুষের আর্তনাদ। ঝরে যাচ্ছে জীবন। গড়াচ্ছে রক্ত। এরপর গাদাগাদি করে ফেলা হচ্ছে বিলের মাঝে। মুখ থুবড়ে পড়ে যাচ্ছে সুলায়মান, হরিপদ, নীতেশ, আফজাল, দিলীপ, অসীম, মেসবাহ, মিল্টন, সায়মন, রশীদ, বিকাশ, নির্মল, আশফাক, ধ্রুবজ্যোতি, নিরুপমা, জাকিয়া, সজল, আলবার্ট, বিপ্লব...এমন শত শত। কোনো ধর্ম থেকে কাউকে বাদ রাখেনি ওরা। নির্বিশেষে ব্রাশফায়ার করেছে। বিলজুড়ে পড়ে ছিল কয়েক শ লাশ। মাত্র তিন মাস আগের কথা। আলমতারার বুকের মধ্যে গেঁথে আছে গণহত্যার ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে শিউরে ওঠে ওর শরীর। শুধু কি গণহত্যা? এরপর শুরু হয়েছিল নির্যাতনের ঘটনা। ও নিজেও সামলেছে একসঙ্গে তিনজন পাকিস্তানি সেনাকে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলতে থাকে, একেকজন ইবলিশ। দোজখের শয়তান। সবগুলো হারামখোর।

আলমতারা বুনো ঝোপের কাছে দাঁড়ালে দেখতে পায়, চারদিক থেকে লোকজন বের হচ্ছে। যে যার কাজে ঢুকবে এখন। গ্রামটা ছোট। মানুষজন কম। কিন্তু দুটো বিলকে ঘিরে জড়ো হয় চারদিকের মানুষ। সে জন্যই তো এত বড় একটা কবর হয়েছে এখানে।

উল্টো দিক থেকে তপন এগিয়ে এসে বলে, এই বৃষ্টির মধ্যে কবরের মানুষজনরে মনে করতে আসছেন, তারা আপা?

—জানো তো সবই। আমি তো রোজ আসি এখানে।

তপন দুই হাতে চোখ মুছে বলে, কবর একটা। ভিতরে আছে শত শত মানুষের লাশ।

—সবাই আছে এখানে। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান। ধর্মের বাইরে কবর। ওরা তো ধর্ম দেখে মারে নাই। মারছে মানুষ।

—স্বাধীনতা, স্বাধীনতা।

তপন দুই হাতে চোখ মুছে বলে।

—জয় বাংলা।

আলমতারা বুকের কাছে দুই হাত জড়ো করে বলে।

তপন দুই হাত মাথার ওপর তুলে বলে, এবারের সংগ্রাম—

একঝাঁঁক কাক উড়ে যায় ওদের মাথার ওপর দিয়ে—যেন ওরাই বলে দিচ্ছে, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম—

দুজনে মাথা কাত করে কাকগুলোর উড়ে যাওয়া দেখে। আলমতারা বিড়বিড়িয়ে বলে, সব মানুষকে ওরা মেরে ফেললে বেঁচে থাকবে পশুপাখি—পোকামাকড়। গজাবে নতুন ঘাস, নতুন গাছ।

—না, তারা আপা, মানুষও থাকবে। শুনেছি সারা দেশের মানুষ যুদ্ধ করার জন্য ভারতে গেছে। তারা যুদ্ধে জিতে ফিরে আসবে। আর আমরা দেশের মধ্য থেকে যুদ্ধের দামামা বাজানোর জন্য ঘুরছি।

—তুমি বাড়ি যাও, তারা আপা।

—বাড়ি তো যাবই। স্বাধীন দেশের জন্য ঘরগেরস্তি ঠিক রাখতে হবে না!

—ঠিক বলেছ। আমাদের আর কত দিন লাগবে স্বাধীন হতে?

—বোধ হয় বেশি দিন না। দেশের মানুষ জীবন দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ করছে। আমাদের ঠেকাবে কে? দেখো একটা কবরে শত শত শহীদ।

—তোমার গায়ে আষাঢ়ের বৃষ্টির ঢল নেমেছে।

—এই বৃষ্টি আমাদের চোখের পানি।

—তোমারও?

—হ্যাঁ, আমারও। আমি মরি নাই। কিন্তু যা দেওয়ার তার সব দিয়েছি। শুধু শয়তানদের মুখে লাথি দেওয়ার সুযোগ পাই নাই। ওদের একটারে লাথি মারার পরে আমার জীবন দেব।

—ঠিক, ঠিক। আমিও একশটারে মারব, আপা। তখন এক পা উঁচু করে লাথি দেখায়।

—ঠিক বলেছিস। আমাদের কাছে অস্ত্র নাই তো কি হয়েছে, আমাদের হাত-পা আছে। শক্তি আছে। ওই বটগাছের নিচে বসে থেকে কত দিন বলেছি, তুমি আমাকে শক্তি দাও, বুড়ো বট। যেন নিজের গায়ের বল দিয়ে যুদ্ধদিনের সাহসী মানুষ হতে পারি।

সাহসী মানুষ হও, মানুষ হও।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বিলসহ আশপাশের পুরো এলাকা তোলপাড় করে। ঘরে ঘরে মানুষ কান খাড়া করে শোনে।

শুকনো খড়ির দপদপে আগুনের দিকে তাকিয়ে হাতের খুন্তি ওপরে উঠিয়ে ঘোরায় সুতপা বড়ুয়া। কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতে কাটতে বুক টান করে দাঁড়ায় রঞ্জন গোমেজ। বলে, তোদেরকে শেষ করে ফেলব। এই কুড়োলের কোপ পড়বে তোদের ঘাড়ে-বুকে।

নৌকার গলুইয়ে বসে বৈঠা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে চিৎকার করে নেপাল কুণ্ডু। এই নদীতে তোদের লাশ ভাসিয়ে দেব, শয়তানেরা। বঙ্গোপসাগর দিয়ে ভেসে যাবি অন্য কোথাও। তোদের লাশের ঠাঁই হবে না বাংলার মাটিতে।

গোয়ালে গুরু বাঁধতে বাঁধতে আমজাদ মিয়া বলে, আমার আছে হাজার হাত। সব হাতে একটা করে   দা-কুড়াল-কোদাল-শাবল থাকবে। রেহাই পাবি না তোরা আমার কাছ থেকে।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বরে এমন প্রতিজ্ঞার কথা শুনতে শুনতে হেঁটে যায় আলমতারা। স্বপন অন্যদিকে চলে গেছে। দূর থেকে ওকে গাছের আড়ালে হারিয়ে যেতে দেখলে আমলতারা নিজের ভাবনায় ডুবে যায়। মনে হয় ও নিজে এখন মেরি রোজারিও। ওর বুকের ভেতর থেকে উঠছে শব্দ। কথা বলছে মেরি—প্রভু যিশুর নামে আমার প্রতিজ্ঞা, যারা আমার স্বামীকে বিলের কাদামাটিতে ভরে রেখেছে, তাদের মাথা চাই। শরীর থেকে আলাদা করা মুণ্ডু। এরপর আমাকে শত শত মানুষের কবরে ঢুকিয়ে দিয়ো। যুদ্ধের সময়ের কবরে আমাদের এক যাত্রা।

—আমিও তা-ই চাই, মেরি। আমিও শত শত মানুষের সঙ্গে এক যাত্রার কবরে ঢুকব। আমার লাশ কোথাও পড়ে থাকবে না। আমার কোনো আলাদা কবর হবে না।

থমকে দাঁড়ায় আলমতারা। নিজের কথা মাথায় রেখে দেখতে পায় চারদিকের বিলের জমি সূর্যের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। বর্ষার বাতাসে ভেজা ফুলের সৌরভ ছুঁয়ে আছে। শুনতে পায় আবার অদৃশ্য কণ্ঠ, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, বরিশালের বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ পাকিস্তানি সেনাদের তাড়ায় এখানে এসে আশ্রয় নিত। ধানক্ষেতের সবুজ প্রান্তর মানুষকে ছায়া দিয়েছে। আড়াল করে রেখেছে। অনেক সময় ব্রাশফায়ারের গুলির মুখে প্রাণ দিয়েছে স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখে। বলেছে, তোমরা যুদ্ধদিনের মানুষ হয়ে বাড়িতে যাও। যুদ্ধে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য নিজেকে স্বাধীনতার খুঁটিতে বেঁধে রাখো। মনে করবে যে একমুঠো ভাত মুখে পুরে সেটাও উৎসর্গ করব স্বাধীনতার বেদিমূলে। ফুটে উঠবে শহীদদের আত্মা। যোদ্ধাদের সাহসে। আর শিশুদের বিস্মিত দৃষ্টিতে। ওরা যুদ্ধদিনের স্বদেশকে দেখছে মগ্ন চেতনায়। দেখছে রক্তের নদীতে ভেসে যাওয়া পঙ্খিরাজের চূড়ায়। সেখানে শত শত রক্তিম গোলাপ ওদের বলছে, তোমাদের হাতে তুলে নাও আমাদের। ফুল দিয়ে ঢেকে রাখো বধ্যভূমি।

—বধ্যভূমি কী?

—বধ্যভূমি শত্রুকবলিত দেশে শত শত মানুষকে নিধনের জায়গা। যারা স্বাধীনতার জন্য প্রাণ বাজি রেখে সাহসী হয়ে ওঠে, তাদের সাহসকে ধুলোয় মিলিয়ে দেওয়ার জায়গা। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানুষকে মেরে ফেলে রাখার জায়গা।

আর স্বাধীন দেশে বধ্যভূমি মানে শহীদদের শ্রদ্ধা দেখানোর জায়গা। ফুলে ফুলে ছেয়ে দেওয়ার জায়গা। শহীদদের স্মরণ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জায়গা। বেঁচে থাকা মানুষদের বলতে হয়, তোমরা জীবন দিয়েছিলে বলে আমরা স্বাধীন দেশের মর্যাদার মানুষ। আমাদের জীবনে গৌরবের ফুল ফুটেছে।

বধ্যভূমির ওপর থেকে উড়ে আসে বাতাস। বাতাসের স্নিগ্ধ স্পর্শে আলমতারা দ্রুত পায়ে হেঁটে পৌঁছে যায় বাড়িতে। মাকে দেখে ছুটে আসে নুরিতা।

—মাগো, আপনি বৃষ্টিতে ভিজেছেন কেন?

—মাগো, আমার কাছে এইটা বৃষ্টি না। আমাগো গ্রামের সব মানুষের চোখের পানি।

—আমারও?

নুরিতা দুই হাতে চোখ মুছে মাকে জড়িয়ে ধরে। আলমতারা মেয়েকে বুকে নিয়ে ঘরের বারান্দায় ওঠে। নুরিতা নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, মাগো, বলেন নাই তো বৃষ্টি কি আমারও চোখের পানি?

—হ্যাঁ মাগো, তোমারও চোখের পানি।

—ঠিক মাগো, ঠিক। আমার চোখের পানি শুধু আব্বার জন্য না। আব্বার সঙ্গে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের সবার জন্য। আমি সবার জন্য কাঁদব।

চিৎকার করে কেঁদে ওঠে নুরিতা। কাঁদতে কাঁদতে বারান্দা থেকে উঠানে নামে। পুরো উঠান ঘুরে কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘরে ঢুকে বঁটি নিয়ে বের হয়।

—এই বঁটি দিয়ে শয়তানগুলোকে জবাই করব।

নুরিতা উঠানের কোনায় বসে মাটি খুঁড়তে শুরু করে। আলমতারা মেয়ের কোনো কাজে বাধা দেয় না। ওর বয়স দশ বছর হয়েছে। পড়ালেখার বাইরে ও নিজের মতো করে বড় হোক—এমনই ভাবে আলমতারা। ঘরে ঢুকে ভেজা কাপড় বদলাতে শুরু করলে স্বামীর কথা মনে হয়। তার জন্য বিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। ঘরের মানুষটি মেয়ের জন্ম হলে বলেছিল, আমাদের বেশি পোলাপানের দরকার নাই। একটা মেয়ে দিয়েই আমাদের ঘর ভরে থাকবে। তুমি কি আরো পোলাপান চাও?

—চাই।

সেদিন দুচোখে খুশির আভা ছড়িয়ে আলমতারা স্বামী তাহেরের দিকে তাকিয়ে ছিল। তাহের হেসে বলেছিল, কয়টা চাও?

—পাঁচটা।

—বাব্বা, এত শখ!

তাহেরের প্রবল উচ্ছ্বাসে হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরেছিল ওকে। বলেছিল, বেশি পোলাপান থাকলে ঘর কলকল করবে। ঠিক আছে, তোমার কথাই রাখব। যতগুলো খুশি ততগুলো পোলাপান হবে। দশটা হলে খারাপ কি! সবগুলাকে নিয়ে যাব ধানক্ষেতে। ঘাস কাটবে, চাষবাস করবে। বলবে, বাজান—

—থাক, থাক। আর বলতে হবে না। আমি সবগুলোকে স্কুলে পাঠাব।

—আল্লাহ তোমার সহায় হোন।

এসব ভাবনার মাঝে আলমতারার ভেজা কাপড় ছাড়া হয়। ভেজা কাপড় হাতে নিয়ে পুকুরের পারে এসে দাঁড়ায়। কাপড় ধুতে হবে। নারকেলগাছ দিয়ে বাঁধানো সিঁড়িতে নামার আগে মন ভেঙে যায়। নুরিতার পরে আরো দুটো ছেলে-মেয়ে হয়েছিল। কেউই বাঁচেনি। ছেলেটি জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। মেয়েটি পাঁচ দিন বেঁচেছিল। এরপর আর সন্তান হয়নি। কেন হয়নি তার কোনো কারণ তাদের কাছে নেই। আলমতারা ভেজা কাপড় নিয়ে নারকেলগাছের গুঁড়িতে পা দিয়ে পুকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবে, সন্তান না হওয়ার জন্য ও তো কোনো পিল খায়নি। তাহলে হলো না কেন? ধুৎ, কেন এসব কথা মনে আসে। সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কেঁপে ওঠে শরীর। হিম হয়ে যায়। শয়তানগুলো সেদিন যেভাবে ওকে—। না, আর ভাবতে চায় না ও। ওদের দিয়ে ওর পেট বাঁধেনি। আল্লাহর কাছে হাজার শোকর! একই সঙ্গে ঘটে যায় তাহেরের মৃত্যু। আলমতারা দুই হাতে মুখ ঢাকে। ফুঁপিয়ে কাঁদে।

ছুটে আসে নুরিতা।

—মা, মাগো, কাঁদেন কেন? আব্বার জন্য? আপনার সঙ্গে আমিও কাঁদব।

মায়ের ঘাড়ে মাথা রাখে নুরিতা। দুজনে মিলে কিছুক্ষণ কেঁদে চুপ হয়ে যায়। নুরিতা মায়ের মুখ নিজের দিকে ফিরিয়ে বলে, আমার খিদা পেয়েছে, মাগো।

—কী খাবি?

—পান্তা ভাত। মরিচ পুড়িয়ে খাব। ঘরে তো আর কিছু নাই। আপনি এখন ঠিকমতো রান্না করেন না মা।

আলমতারা চুপ করে থাকে। নুরিতা হাত টেনে ধরে মাকে ওঠাতে চায়। আলমতারা নড়ে না। ভাবে, মেয়েটা তো ঠিকই বলেছে। ওর সামনে থেকে সংসার মুছে গেছে। রান্না-ঘরসংসার ইত্যাদি কোনো কিছু ওকে আর টানে না। একদিন সংসারে ডুবে ছিল, এমন চিন্তাও মুছে যেতে চায়।

—মগো, আমি পান্তা খেতে গেলাম।

নুরিতা মাথার ওপর বঁটি ঘোরাতে ঘোরাতে দৌড়ে চলে যায়। আলমতারা ঘাড় ঘুরিয়ে মেয়ের চলে যাওয়া দেখে। যুদ্ধদিনে মেয়েটি অন্য রকম দৃশ্য তৈরি করেছে। আগে তো কখনো এভাবে দৌড়ায়নি। বাবাকে মেরে ফেলার পরে স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করেছে। বলে, আমার বাড়িতে আব্বা নাই। আমার আর স্কুলও নাই। দেশ যদি স্বাধীন হয়, তাহলে স্কুলে যাব আমি।

আলমতারা মেয়েটির বুদ্ধির জন্য খুশি হয়। ভাবে, মেয়েটার মাথায় আগুন আছে। দেখতেও ফুটফুটে হয়েছে। ডানাকাটা পরি যেন। মেয়েটির কথা ভাবতে ভাবতে আলমতারা দ্রুত পায়ে হেঁটে আসে রান্নাঘরে। দেখতে পায়, নুরিতা মাটির ঘট থেকে একমুঠো শুকনো মরিচ বের করেছে। পাঠখড়ি জড়ো করেছে আগুন জ্বালানোর জন্য। সানকি ভরা পানিতে ভাত ভেসে আছে। মেয়েটা পান্তা খেতে ভালোবাসে। মাঝে মাঝে গরম ভাতে পানি ঢেলে খায়। আলমতারা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে। নুরিতা মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আপনি কি পান্তা ভাত খাবেন?

—খাব, মাগো।

—তাহলে মরিচ পুড়িয়ে দুই সানকি ভাত মাখাই।

—মাখাও। আমি এখানে বসি।

আলমতারা রান্নাঘরের দরজায় বসে পড়ে। ভেজা কাপড়গুলো ধোয়া হয়নি। পুকুরঘাটে রেখে এসেছে। ভাত খেয়ে নুরিতাকে নিয়ে পুকুরে নামবে। মেয়েটি সাঁতার কাটবে। চুলার ভেতরে পাটখড়ির আগুন দাউদাউ জ্বলে ওঠে। চুলায় কড়াই পেতে মরিচ ছেড়ে দেয় নুরিতা। ঝাঁজালো গন্ধে ভরে যায় চারদিক। আলমতারা হাঁচি দিতে শুরু করে। নুরিতার চুলার আগুন নিভে যায় পাঠখড়ি পুড়ে শেষ হলে। ও কড়াই মাটিতে নামিয়ে রেখে মায়ের কাছে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরে বলে, মাগো, পুকুরের ঘাটে চলেন। মুখ ধুবেন।

—লাগবে না।

আলমতারা আঁচল দিয়ে চোখ-মুখ মুছে নেয়। হাঁচি আর হয় না। গলা খাকারি দিয়ে ঝেড়ে ফেলে গলায় জমে থাকা কাশি। নুরিতা তখন পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে দুই সানকি পান্তা মাখিয়ে আনে। মায়ের দিকে সানকি এগিয়ে দিয়ে বলে, খান মা।

নিজে কোলের ওপর সানকি রেখে খেতে শুরু করে। আলমতারার গলায় ভাত আটকে যায়। মেয়ের দিকে তাকিয়ে মাথায় আগুন জ্বলে। মেয়েটি একদিন বড় হবে। ওকে কি রক্ষা করতে পারবে শয়তানদের হাত থেকে? কত দিন চলবে এই যুদ্ধ! আলমতারার মাথা ঝিমঝিম করে। এর মধ্যে শত শত মানুষকে এক কবরে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। দাফন-জানাজা ছাড়া। আলমতারা মুখে ভাত তুলতে পারে না। হাত থেমে থাকে সানকি ভরা ভাত আর পানির মধ্যে। দেখতে পায়, নুরিতা খাওয়া শেষ করেছে। ওর মাথা ঝুঁকে আছে সানকির ওপর। ভাত শেষ হলে চুমুক দিয়ে পানি খেয়ে শেষ করে। শূন্য সানকি মাটিতে রেখে বলে, মাগো, আপনি ভাত খান না কেন?

—খিদা নাই রে।

—জানি তো খিদা আছে। আব্বার কথা মনে হলে খেতে পারেন না। আমি আব্বার কথা মনে রাখি, আবার ভাতও খেতে পারি। জানেন, কেন মাগো?

—না, জানি না তো।

—আমি যুদ্ধ করব। বন্দুক চালাতে শিখব।

—কী বললি? যুদ্ধ করবি?

—হ্যাঁ, যুদ্ধ করব, মাগো। ওরা আব্বাকে গুলি করে মেরেছে। আমি আব্বার মৃত্যুর প্রতিশোধ নেব।

আলমতারা ওর কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। মেয়েটা এমন কিছু ভাবে! এত দিন জানতে পারেনি। আজকে ও বলেছে। আলমতারা হাঁসফাঁস চিন্তা থেকে নিজেকে টেনে তুলে ভাবে, শহীদের মেয়ের তো এমন কথাই বলা দরকার। ওর নিজেরও যুদ্ধের কথা ভাবা দরকার। মুহূর্তে সানকি হাতে নিয়ে গবগবিয়ে পান্তা খেতে শুরু করে আলমতারা।

নুরিতা শব্দ করে হেসে ওঠে। কিছুক্ষণ হেসে বলে, আমার মাও যুদ্ধ করবে। পান্তা খেয়ে মায়ের গায়ে বল হবে। ও লাফ দিয়ে উঠানে নেমে চারদিকে দৌড়ায়। একসময় রান্নাঘরে ঢুকে দেখতে পায়, মায়ের খাওয়া শেষ হয়েছে। মায়ের হাত ধরে বলে, চলেন দেখবেন?

—কী দেখব?

—কবর।

—কবর? কোথায় কবর?

—ওই যে উঠানের ওই পাশে। আমি বঁটি দিয়ে কবর খুঁড়েছি। আসেন দেখবেন।

মায়ের হাত ধরে টান দেয় ও। আলমতারা অনুভব করে, ওর টানে জোর আছে। মেয়েটির গায়ে শক্তি বেড়েছে। মনেও অবশ্যই। সে জন্য যুদ্ধ করার কথা ভাবতে শুরু করেছে। নুরিতা এমন জোরে টান দিচ্ছে যে আলমতারাকে লম্বা করে পা ফেলতে হচ্ছে। মেয়ের এসব দেখে স্বামীর মৃত্যুর কষ্ট বুকে চেপে থাকে না। সেটা বেরিয়ে উড়ে যায় গণকবরের ওপর দিয়ে। নিজেকেই বলে, তোমার মৃত্যু আমাদের বেঁচে থাকার স্বাধীনতা।

তখন ছোট্ট গর্তটির সামনে দাঁড়িয়ে তুলে রাখা মাটি পা দিয়ে চেপে নুরিতা বলে, দেখেন, দেখেন শয়তানদের কবর। মাগো, শয়তানগুলাকে এখানে মাটিচাপা দেব।

—বাড়িতে? বাড়িতে কেন রে, মা?

—এরপর এখানে একটা পায়খানা বানাব। গাঁয়ের মানুষ ওদের কবরের ওপর হাগামুতা করবে।

—কী বললি, মা রে?

—শয়তানদের কবর তো এমনই হবে। আর আমার আব্বাসহ যাদের গর্তে পুঁতেছে, ওই কবরে ফুল দেওয়া হবে। হাজার হাজার ফুল দিয়ে ঢেকে রাখা হবে।

আলমতারা অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটির মাথায় এত কিছু ঢুকেছে। ও একটা খাঁটি মানুষ হবে। আলমতারা দৃষ্টি ফেরাতে পারে না। নুরিতা ফিক করে হেসে বলে, আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন, মাগো?

—বঁটি দিয়ে তো কবর খোঁড়া যায় না, মা রে?

—কেন যাবে না? একশবার যায়। আমি রোজ খুঁড়ে খুঁড়ে এটাকে বড় করব। আমি একাই পারব। কাউকে দরকার নাই।

—এটা তুই সামনে মাঠের ধারে করবি, মা রে। বাড়িতে শয়তান ঢুকবে না। লাশ হয়েও না।

এ কথা শুনে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে নুরিতা। একটু পরে ঘাড় নেড়ে বলে, হ্যাঁ, ঠিক। বাড়িতে শয়তান ঢুকাব না। আপনি এই গর্তের মাটিতে লাথি মারেন, মাগো।

—না, লাথি এখানে না। তুই যখন অন্য জায়গায় খুঁড়বি, সেখানে লাথি মারব। আয়, দুজনে বাড়ির উঠানের গর্ত মাটি দিয়ে ভরিয়ে ফেলি। আমাদের শান্তির বাড়ি এটা। আমরা যুদ্ধ করে এই বাড়িতে শান্তি আনব।

চিৎকার করে কেঁদে ওঠে নুরিতা। কাঁদতে কাঁদতে বলে, এই বাড়িতে আমার আব্বা নাই।

—তোর আব্বা স্বাধীনতার শহীদ।

—ও, আল্লা, আল্লা রে—

কাঁদতে কাঁদতে উঠানের চারদিকে ঘুরতে থাকে নুরিতা। মাথার ওপর উড়ে আসে কাক। জমিয়ে রাখা শুকনো পাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে বেজি। উঠানের মাঝখানে বসে মুখ উঁচু করে তাকিয়ে থাকে নুরিতার দিকে। নুরিতা যেদিকে দৌড়ায়, বেজির মাথা সেদিকে ঘুরে যায়। আলমতারার মনে হয়, এমন দৃশ্য দেখা জীবনে বুঝি একবারই হয়। চোখ বেয়ে পানি গড়ায়। চোখ বন্ধ করতে চায় না আলমতারা। গালের ওপর দুচোখের পানি গড়াতে দেয়। একসময় নুরিতা এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। শয়তানদের জন্য কোথায় কবর খুঁড়ব, দেখান। আমি বঁটি নিয়ে আসছি।

নুরিতা দৌড় দিয়ে রান্নাঘরে যায়। বঁটি হাতে ফিরে এসে মায়ের হাত ধরে বলে, চলেন। চোখের পানি মোছেন না কেন?

শাড়ির আঁচল মায়ের হাতে গুঁজে দেয় নুরিতা। মা চোখ মুছলে হাত ধরে টান দেয়। দুজনে হাঁটতে শুরু করলে বেজিটাও ওদের পেছন পেছন আসে। বাড়ির বাইরে এসে বেজিটার দিকে এগোতে গেলে বেজিটা দৌড় দিয়ে আরেক দিকে চলে যায়। নুরিতা আঙুল তুলে বেজিটাকে ধমকায়।

—তুই কি আমাকে দেখে ভয় পেলি? আমার কাছে তো পাকিস্তানি সেনার মতো বন্দুক নাই। আমি তোকে মারব না রে, বেজি বোন। তুই কাছে আয়, আমি ওদের মতো শয়তান না। মানুষ মেরে ফুর্তি করি না।

আলমতারা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাবার মরণ দেখে মেয়েটা নানা কিছু বুঝতে শিখেছে। ওর চোখ-কান খুলে গেছে। ওর কথায়ও নতুন জোয়ারের ঢেউ লেগেছে। ওর চিন্তার শক্তি বেড়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত তুলে আলমতারা বলে, আল্লা মাবুদ। রহম করো মাবুদ।

একটু পরে বেজিটাকে ধরে মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায় নুরিতা। বলে, ঘরে চলেন, মাগো।

—কবর খুড়বি না?

—না। এই সুন্দর গ্রামে শয়তানদের কবর হবে না। গ্রামটা দোজখ হয়ে যাবে।

—কী বলিস রে, মেয়ে?

—ঠিকই বলেছি, মাগো। আমি সবাইকে বলব, শয়তানদের মেরে ওদের গায়ে থুতু ছিটাব। এরপর নদীতে ফেলে দেব। ওদের লাশ ভেসে চলে যাবে অন্য কোথাও। মাগো, এইটাই ঠিক।

আলমতারা কোনো কথা বলতে পারে না। হাঁ করে তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে। মেয়েটা আজ তাকে বিমূঢ় করে ফেলেছে। যুদ্ধের চার মাস পার হয়েছে। ওর বাবা শহীদ হয়েছে দুই মাস আগে। এর মধ্যে মেয়েটা ধপধপিয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। কত কিছু চিন্তা করতে পারছে। মেয়েটা এখন যেভাবে বেজির লেজ ধরে খেলা করছে, তখন মনে হয় ও এক অবোধ শিশু। বাবার মৃত্যু ওকে অন্য রকম করে দেয়। আলমতারা রাস্তার ধারের ঘাসের ওপর বসে পড়ে। এখন রাস্তায় লোক চলাচল তেমন নেই। অনেক দূরে দু-একজনকে দেখা যাচ্ছে। কেউ এদিকে আসে না। বিভিন্ন রাস্তায় চলে যাচ্ছে। শুনতে পায় মেরি বলছে, তারা বুবু, নুরিতাকে নিয়ে ঘরে যাও। ওর জন্য ভাত-মাছ রান্না করো। ওকে খাওয়ার কষ্ট দিয়ো না। আলমতারা চোখ মুছে বাটিটি নিয়ে মেয়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।

—মাগো, চলো ঘরে যাই।

—আপনি যান। আমি পরে যাব।

—এখানে বসে কী করবি?

—এই যে আমার বোন বেজি আছে। ওর সঙ্গে যুদ্ধের কথা বলব। গাঁয়ের বড় ভাইরা যুদ্ধ করছে। আমরা বুঝি যুদ্ধ করব না!

—বেজি তো কথা বলবে না।

—কথা তো সব আমি বলব। বেজি শুনবে।

—শুনবে, কিন্তু কিছু বুঝবে না।

—বোঝার দরকার নাই। আমি বেজিকে নিয়ে আব্বাসহ শত শত শহীদের কবরে ফুল দিতে যাব।

আলমতারা ধমক দিয়ে বলে, ঘরে চল, নুরিতা। আমি তোকে একা একা বিলের ধারে যেতে দেব না। আয় বলছি।

আলমতারা ওর হাত ধরে হেঁচকা টান দেয়। উল্টে পড়ে গিয়ে ককায় নুরিতা। পরক্ষণে মায়ের হাত থেকে বঁটিটা নিয়ে বলে, এটা দিয়ে আমি যুদ্ধ করব।

—ঘরে চল বলছি। না গেলে মার খাবি। তোর বেজি চলে গেছে।

নুরিতা মাথার ওপর বঁটি ঘোরায়। এরপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, চলেন, ঘরে যাই। ওই যে রমজান চাচা আসছে। আব্বাকে মিলিটারি ধরে নেওয়ার সময় ওই লোকটা না ওদের সঙ্গে ছিল?

—ছিল তো। ও তো একটা শয়তান লোক। চল, ঘরে চল। ওর চেহারা দেখতে চাই না।

—এই বঁটি দিয়ে ওকে আমি খুন করব।

আলমতারা কথা বাড়ায় না। মেয়ের হাত ধরে টেনে দ্রুত বাড়িতে ঢুকে যায়। উঠানে দাঁড়িয়ে দম ফেলে। নুরিতার কথাবার্তা ওকে আতঙ্কিত করেছে। মেয়েটি সবার সঙ্গে এমন করে কথা বললে রমজান মিয়ার মতো যারা আছে তারা ওকে মেরে ফেলতে পারে। বাপের মতো ও কি শত শত মানুষের সঙ্গে গর্তের মধ্যে গাদিয়ে থাকবে! আলমতারা থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে। দেখতে পায়, নুরিতা ঘরের পেছন থেকে পাটখড়ি এনে রান্নাঘরের কোনায় জড়ো করছে। আলমতারা বুঝতে পারে, রান্নার জন্য এত কিছু জড়ো করা! কাছে গিয়ে বলে, তোর জন্য কী রাঁধব রে, মা?

—ঘরে তো কিছু নাই। রাঁধবেন কী? ময়েজ ভাইকে ডাকি, বাজার থেকে মাছ এনে দেবে?

—হ্যাঁ, ময়েজকে বলব। তুই বাড়িতে থাক। আমি দেখি ময়েজ আছে কি না।

—নাগো মা, আপনি ঘরে থাকেন। আমি তো জানি এখন আপনার রান্নার ইচ্ছা হয় না। আমি গেলাম।

এক দৌড়ে বেরিয়ে যায় নুরিতা। রান্নাঘরের দরজায় বসে পড়ে আলমতারা। বুঝতে পারে, মেয়েটি ছোট হলেও বুদ্ধিতে ওর সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে। ওকে এখন আর ছোট ভাবা যাবে না। আলমতারা দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে রাখে। খুবই অবসন্ন বোধ করে। যুদ্ধদিনে গাঁয়ের মানুষেরা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একদল মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা। আরেক দল পাকিস্তানিদের দালাল। এত কিছু ভাবতেই আলমতারার সামনে ভেসে ওঠে রাংতা ও কেতনার বিল। ছোটবেলা থেকে দেখেছে এই বিলের সবুজ ধানক্ষেত। এখন এই বিল মানুষের কবর। একসঙ্গে শত শত মানুষ এক কবরে। রাতে-দিনে একসঙ্গে শত শত মানুষের কবরের ভাবনা ওকে আচ্ছন্ন করে রাখে। মাথা সোজা রাখতে কষ্ট হয়। বুক ভরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ঘুম আসে না ঠিকমতো। কখনো গলায় ভাত আটকে যায়। এই মুহূর্তে ঘাড় সোজা রাখা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মাথা এলিয়ে পড়ছে দেয়ালে। বাঁশের বেড়ার দেয়াল। এমন যুদ্ধদিন পার করার জন্য ঘর ভর্তি মানুষ দরকার। ওর ঘরে মানুষ নেই। তিনজন থেকে দুজন হয়েছে। বুকের ভেতর রুদ্ধশ্বাস। দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আলমতারা রান্নাঘরের দরজার কাছে মাটিতে শুয়ে পড়ে। নিঃশব্দ স্তব্ধতায় পুরো গ্রামটি তার বোজা চোখের পাতায় ভেসে থাকে।

শুনতে পায় রাংতার বিলের কণ্ঠস্বর।

ওদের কেউ বলছে—

আমরা দুই ভাই। আমার নাম রাংতা। ওর নাম কেতনা।

—রাংতা আর কেতনার বিল আমি চিনি। তোমরা আমাকে আর কি চেনাবে?

—আমরা এখন আর বিল নই। এখন বধ্যভূমি।

—তুমি কি বধ্যভূমি চেনো?

—এমন ভূমির কথা আমি শুনিনি। ছোটবেলা থেকে কারো কাছে শুনিনি।

—এখন থেকে শুনবে। দেশ স্বাধীন হলে আরো বেশি শুনবে। মনে রাখো বধ্যভূমি।

—বধ্যভূমি! বধ্যভূমি!

আলমতারা বিড়বিড় করে।

—আমি মনে করি তুমি আমার স্বামীর কবরস্থান।

—না, আমি শুধু কবরস্থান না। শত শত মানুষকে বুকে টেনে নিয়ে আমিও স্বাধীনতার এক ভূমি। এটা আমার গৌরব। আমার গৌরবের সাক্ষী তুমি, আলমতারা বোন।

—আমি এক সাক্ষী না। গাঁয়ের সবাই সাক্ষী। সবার মুখে মুখে ছড়িয়েছে রাংতা আর কেতনার বিলের নাম।

—আমি তো হাজার বছরের বাংলাদেশ। আমার এই গর্ব আছে আমার পানি-মাটি সবটুকু জুড়ে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখন আমি নতুন নামে জেগে উঠব। মানুষ শহীদের আত্মার স্মরণে আমাকে অনেক বড় করে দেখবে, বোন।

আলমতারা মনে মনে বলে, আল্লা মাবুদ।

—আমার বুকের ওপর সেদিন ধানক্ষেত সবুজ রঙে চারদিক আলো করে মাথা দোলাচ্ছিল। সেনা শয়তানগুলো গাঁয়ের মানুষদের তাড়া করেছিল। ওরা সবাই ধানগাছের আড়ালে নিজেদের ঠাঁই নিয়েছিল। ভেবেছিল শয়তানগুলো ওদের খুঁজে পাবে না।

—সবুজ ধানক্ষেত দেখলে আমাদের মন জুড়িয়ে যায়। ধানের শীষে আমাদের প্রাণ ভরে যায়। রাংতার বিল, তুমি আমাদের প্রাণ বাঁচাও। তোমার বিলের পানিতে আমরা কচুরিপানার বেগুনি ফুলে চোখ জুড়িয়ে ফেলি বর্ষাকালে। পানি নেমে গেলে তোমার মাটিতে আমাদের মানুষেরা লাগায় ধানের চারা।

—বোন গো, সেদিন শয়তান সেনারা গুলি ছুড়ে মেরেছে শত শত মানুষ। আমার মাটি লাল হয়ে উঠেছিল শত মানুষের রক্তে। আমার পানিতে সেই রক্ত ভেসে থাকে। আমার বিলের শরীর তোমাদের ইতিহাস হবে বোন গো!

—ইতিহাস। ইতিহাস।

শব্দটি মনে গেঁথে রাখে আলমতারা। চোখ খুলে চারদিকে তাকায়। নিজেকে ধমক দেয়, এখন চোখ বুজে থাকার সময় না। রাত-দিন দুচোখ খোলা রেখে দেখতে হবে স্বাধীনতার যুদ্ধ।

আলমতারা সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, তোমার গায়ে আমি মাথা ঠেকাই, রাংতার বিল, তুমি আমাদের ইতিহাস হয়েছ।

রান্নাঘরের দরজা থেকে নেমে উঠানে দাঁড়াতেই হাতে গুঁড়া চিংড়ির পোঁটলা নিয়ে বাড়িতে ঢোকে নুরিতা। পেছনে ময়েজ। মায়ের সামনে এসে মাছের পোঁটলা নাড়াতে নাড়াতে বলে, ময়েজ ভাই মাছ কিনে দিয়েছে। আপনি উনাকে দুই টাকা দিয়ে দেন, মাগো।

—ময়েজ, বসো বাবা। তোমাকে গুড়-মুড়ি দিই?

—না, না, চাচি। আমি নুরিতাকে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসার জন্য এসেছি।

—মাগো, রমজান মিয়া বলছে, এইটা তো একটা ফুটফুইট্টা মাইয়া।

—আহ্ নুরিতা, থাম।

আলমতারা ধমক দেয় মেয়েকে।

যা, মাছ থুয়ে আয় পাকঘরে।

নুরিতা মাছের পোঁটলা নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে। ময়েজ দুই পা এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, রমজান মিয়া আমাকে বলেছে, মাইয়াটারে পাকিস্তানি সেনার ক্যাম্পে দিয়া আসুম। আমি রমজান মিয়ারে সাবাড় করে এই গেরাম ছেড়ে যাব।

—ও আল্লা রে—

আলমতারা চোখে আঁচলচাপা দেয়।

রান্নাঘর থেকে বঁটি ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে আসে নুরিতা। চেঁচিয়ে বলে, যুদ্ধ যুদ্ধ। ঘুরতে থাকে উঠানের চারদিকে।

ময়েজ আতঙ্কিত দৃষ্টিতে আলমতারার দিকে তাকিয়ে বলে, চাচি, দেখেন দেখেন—সর্বনাশ।

—সর্বনাশ বলিস না, বাজান।

—পাকিস্তানি সেনারা ওকে শেষ করে ফেলবে। তার আগে রমজান মিয়া ওকে জবাই করবে।

—জবাই!

আলমতারা ধপ করে উঠানে বসে পড়ে। দুই হাত মাটিতে রেখে নিজের কাত হয়ে যাওয়া সামলায়। দৌড়ে আসে নুরিতা। উঠানের কোনায় ছুড়ে মারে বঁটি।

—কী হয়েছে, মাগো?

—মাথা ঘুরাচ্ছে।

—চলেন, ঘরে চলেন। শুয়ে থাকবেন।

মায়ের হাত ধরে টানলে আলমতারা উঠে দাঁড়ায়। ময়েজও হাত ধরে। সামনে এগোয় সবাই। বারান্দায় উঠলে ময়েজ বিদায় নেয়।

—আমি যাই, চাচি।

—আয়, বাবা। মেয়েটার দিকে খেয়াল রাখিস।

—চাচি, দেখবেন ও যেন একা একা সবখানে ঘুরে না বেড়ায়।

—আমি ঘুরব। আমি যুদ্ধ করব।

নুরিতা চেঁচিয়ে বলে।

ময়েজ ওর মাথায় হাত রেখে বলে, আমিও যুদ্ধ করব। ইন্ডিয়া গিয়ে ট্রেনিং নেব। আব্বার অসুখের জন্য এত দিন যাইনি। এখন আব্বা ভালো হয়েছে। আমি যাব।

—আমিও আপনার সঙ্গে যাব, ময়েজ ভাই।

—না, তুই এখন যেতে পারবি না। তুই ছোট। এত ছোট মেয়েকে যুদ্ধের ট্রেনিং দেওয়া যাবে না। আমি ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এলে তোকে অনেক কিছু শেখাব। তুই চাচির কাছে থাক।

—আমার ট্রেনিং লাগবে না। যুদ্ধ করার জন্য আমার হাতে বঁটি থাকবে।

—শুধু বঁটি দিয়ে তো যুদ্ধ হবে না।

—কেন হবে না? গলা কাটা তো যাবে।

—নুরিতার অনেক সাহস। চল, তুই আর আমি রাংতার বিলে যাই। আমাদের শহীদদের কাছে। চাচি, আপনি শুয়ে থাকেন।

—চলো, চলো। রাংতার বিলে চলো।

—রান্নাঘরে বঁটি রেখে আয়।

—হ্যাঁ, রেখে আসি। আমার আব্বার কাছে গেলে বঁটি নিয়ে যেতে হবে না। ফুল নিয়ে যেতে হবে। না, ময়েজ ভাই?

—হ্যাঁ, তাই রে।

আলমতারা মেয়ের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। নুরিতা বঁটি রেখে আসে রান্নাঘরে। উঠানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বলে, আমি যাই, মা। আব্বাকে ফুল দিয়ে আসি। আপনি ঘুমান।

কথা শেষ করেই একছুটে বাড়ির বাইরে চলে যায়।

—আমি যাই, চাচি।

—ওকে সামাল দিয়ে রাখিস, বাবা।

আলমতারা ধপ করে বসে পড়ে। যেন দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি শেষ হয়ে গেছে। দেখতে পায় ময়েজ চলে যাচ্ছে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখা বাঁশের খুঁটি থেকে ছুটে আসে হাত। মাটির ওপর রাখলে মনের ভার কেটে যায়। এতক্ষণ মনে হচ্ছিল, গায়ের শক্তি কমে যাচ্ছে। ময়েজকে চলে যেতে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। গেটের সামনে দাঁড়ালে দেখতে পায়, ময়েজের হাত ধরে নুরিতা হেঁটে যাচ্ছে। কখনো লাফাচ্ছে। কখনো হাত ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে রাস্তার পাশ থেকে বুনোফুল ছিঁড়ে জামার কোঁচড়ে নিচ্ছে। একসময় রাস্তার মোড় ঘুরে গেলে ওদের আর দেখা যায় না। আলমতারা ফিরে আসে রান্নাঘরে। ভাত-মাছ রান্নার কাজ করে। রাংতার বিল থেকে ফিরে এলে মেয়েটি ভাত খেতে চাইবে। এটা তো সত্যি, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তার আর রান্নায় মন নেই। ইচ্ছা করে না যত্ন করে কোনো কিছু রান্না করতে। মেয়েটার কথা ভেবে আজ চুলায় ভাতের হাঁড়ি বসায়। শুকনো খড়ি দাউদাউ জ্বলে ওঠে। মেয়েটা আজ ওর সামনে এমন আগুনের মতো জ্বলছে। ও কোথা থেকে এই শক্তি পেল? বাবা শহীদ হওয়ার কারণে কি? আলমতারার সামনে কোনো উত্তর নেই। কোথাও থেকে কোনো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে না। ও একদৃষ্টে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরে বিকেলের ছায়া পড়েছে। সূর্যের আলোর তেজ কমে আসছে। শুধু এই বাড়ি অন্য রকম করে ফেলেছে মেয়েটি। আলমতারা নিজের ভেতর কাঁপুনি অনুভব করে। চুলোয় শুকনো খড়ি গুঁজে দিলে ভাতের হাঁড়িতে বলক ওঠে। টগবগ করে ফুটছে পানি। পানির মৃদু শব্দের সুরেলা ছন্দে আলমতারা নিজের ভেতরে তাড়া অনুভব করে। যুদ্ধকালীন সময় বুঝি এমনই টগবগ করে ফুটছে। এমন ভাবনায় মন খুশিতে ভরে যায়। চুলগুলো পিঠের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে মাছ কাটতে বসে আলমতারা।

এখন শুনতে পায় দরজায় সাইকেলের টুংটাং শব্দ। কেউ এসেছে। মাছ একপাশে রেখে দিয়ে উঠে যায়। গেট খুললে দেখতে পায়, দাঁড়িয়ে আছে দীপেন্দ্রবাবু। আলমতারাকে দেখে বলে, নমস্কার। কেমন আছেন?

—কেমন আছি? আলমতারা প্রশ্নবোধক চিহ্ন কপালে রেখে তাকিয়ে থাকে। মুখে কথা নেই।

—কথা বলছেন না যে?

—এই সাইকেল তো আপনার বন্দুক না?

—বন্দুক। হ্যাঁ বলতে পারেন। কত ধরনের অস্ত্রই তো যুদ্ধের সময় ব্যবহার হয়। আমরা কোনটাকে যে কী বলব তা ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারি না। তবে সাইকেল দিয়ে তো মানুষ মারতে পারব না।

—তা পারবেন না। কিন্তু এই সাইকেলে ঘুরে আপনি বাড়ি বাড়ি যান। মানুষের খোঁজখবর করেন। দরকারমতো সাহায্য করেন।

—এটাই মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার যুদ্ধ। ঘরে ঘরে মানুষকে আমি জরুরি খবর পৌঁছাই। তাদের খবর নিই। অসুস্থ মানুষের জন্য ওষুধ কিনে আনি।

—সাবধানে থাকবেন, দীপেন্দ্রবাবু। আমাদের চারদিকে রাজাকাররা আছে।

—হ্যাঁ, আমি রাজাকারদের চোখে চোখে রাখি। ওদের চোখে রেখেই যুদ্ধের খোঁজখবর রাখি। একদিন যুদ্ধের ইতিহাস তো আমাদের লিখতে হবে।

—আমার স্বামীর নাম...

—সব লিখে রেখেছি। কিভাবে মারা হয়েছে তা-ও লিখেছি। রাংতার বিলের কথাও আছে।

এই বিল তো এখন বধ্যভূমি।

এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে আলমতারা। কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে গেটের সামনে। মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে চিৎকার করে। ধুলায় ভরে যায় পুরো শরীর। দীপেন্দ্রর চোখও জলে ভরে ওঠে। গ্রামের অনেক বাড়িতে এমন দৃশ্য দেখতে হয়। স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই। মানুষ মরণকে উড়িয়ে দিয়ে স্বাধীনতার জন্য জীবন দিচ্ছে। আলমতারার পাশে বসে দীপেন্দ্র বলে, উঠে বসুন, দিদি। আপনার শরীর ধুলোয় ভরে গেছে।

আলমতারা উঠে বসে বলে, ধুলো না। দেশের মাটি।

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, দেশের মাটি।

দীপেন্দ্র দুই হাতে নিজের বুক চাপড়ায়।

তখন প্রবল শব্দে চারদিক কাঁপিয়ে ছড়াতে থাকে গুলির শব্দ। দুজনে দ্রুত বাড়ির ভেতর ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। রান্নাঘরের পেছনে গিয়ে গাছের কাণ্ডের আড়ালে দাঁড়ায়। আলমতারা থরথর করে কাঁপে। চিৎকার করে বলতে থাকে, আমার নুরিতা কই? আমার নুরিতা?

—ও কার সঙ্গে গেছে? কোথায় গেছে?

—ময়েজের সঙ্গে রাংতার বিলে গেছে। শহীদদের কবরে ফুল দিতে গেছে।

—ময়েজের সঙ্গে থাকলে ময়েজ ওকে দেখেশুনে রাখবে। চিন্তা করবেন না।

—আমার মেয়ে, আমার মেয়ে।

আশপাশের ঘর থেকে কেউ কেউ বের হয়ে এসে গাছের কাছে জড়ো হয়। দীপেন্দ্র বলে, আপনারা ওই ডোবায় নেমে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে আড়াল হয়ে থাকেন। ওরা তো দূর থেকে ঘরে আগুন লাগায়। এখন ঘরে থাকা ঠিক হবে না। আমি এখানে দাঁড়িয়ে খেয়াল রাখব। কোন দিক থেকে কে আসে দেখব। আপনারা যান।

চার-পাঁচজন নারী তাদের ছোট ছোট মেয়েকে নিয়ে ডোবার ধারে গিয়ে বসে। গুলির শব্দ ধীরে ধীরে কমে আসছে। হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। সেটা বেশ দূরে। কাছেধারে কেউ নেই। মাঠ-প্রান্তর ফাঁকা হয়ে আছে।

আলমতারা বলে, মনে হয় রাংতার বিলে আবার মানুষ মারা হচ্ছে। ও, আল্লা রে—। আমাদের ধানের জমি রক্তে ভাসে। ও, আল্লা রে—

—হ্যাঁ, আমারও মনে হচ্ছে রাংতা-কেতনার বিল রক্তে ভাসছে। আমি এগোই। সাইকেলটা আপনার উঠানে থাকুক। পরে এসে নিয়ে যাব।

—এখন যাওয়া কি ঠিক হবে? রাজাকারগুলাও তো ওদের পা-চাটা শয়তান।

—আমি বুঝেশুনে হাঁটব। দরকার হলে হামাগুড়ি দেব, যাতে কেউ আমাকে দেখতে না পায়। ধান-পাট ক্ষেতের মাঝ দিয়ে মাথা গুঁজে লুকিয়ে থাকব। এরপর ধস করে উঠে—

কথা শেষ করে না দীপেন্দ্র। মাথার ভেতর সব কিছু কেমন এলোপাতাড়ি ঘুরছে। হাঁটতে শুরু করে দীপেন্দ্র। দেখতে পায় সূর্য পশ্চিম আকাশে চলে গেছে। রোদের তেজ কমে এসেছে। রাস্তার দুই পাশের ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে চারদিকে খেয়াল করে যেতে থাকে। একসময় পাটক্ষেতের ঘন আড়ালে নেমে হামাগুড়ি দিয়ে এগোয়। বেশ খানিকটা আসার পরে দেখতে পায়, পাটক্ষেতের আড়ালে বসে আছে ময়েজ। পাশে নুরিতা। দীপেন্দ্র মৃদুস্বরে ডাকে, ময়েজ।

—দীপেন্দ্রদা, আপনি?

—চল্লিশ-পঞ্চাশজন লোককে দড়ি দিয়ে বেঁধে এনেছে। রাংতার বিলের কাছে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করেছে।

—কোথা থেকে ধরে আনল?

—জানি না। দূর থেকে অনেককে চিনতে পারি না।

—দেখতে পাচ্ছি, ওরা চলে যাচ্ছে।

—আমরা অপেক্ষা করি। ওরা চলে গেলে আমরা সামনে এগোব।

—তাহলে আমিও এখানে অপেক্ষা করি। একসঙ্গে যাব। নুরিতাকে বাড়িতে রেখে আসতে হবে।

—না, আমি বাড়ি যাব না। আমিও আপনাদের সঙ্গে বিলের ধারে যাব।

—বলিস কিরে?

—হ্যাঁ, ঠিকই বলি। আমি যুদ্ধ করব। বঁটি দিয়ে গলা কাটব শয়তানদের।

পাটক্ষেতের ওপর দিয়ে উড়ে যায় নুরিতার কণ্ঠস্বর। দীপেন্দ্র প্রবল বিস্ময়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। এমন একটি সাহসী মেয়ের দীপ্ত চেহারা লাল-সবুজের পতাকা হয়ে ওর সামনে ওড়ে। নাকি ও বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ!

—কাকু, আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন?

—তোমার যুদ্ধ দেখছি।

—ইস্, এটা যদি সত্যি যুদ্ধ হতো!

দীপেন্দ্রর পায়ের কাছে বসে পড়ে নুরিতা। সালাম করে। দীপেন্দ্র ওর মাথায় হাত রেখে বলে, মাগো, চলো তোমাকে বাড়িতে রেখে আসি।

—না, আমি যাব না। ওরা কতজনকে মেরেছে তা আমি দেখব।

কথা শেষ করেই গুনগুনিয়ে কাঁদতে শুরু করে নুরিতা। দীপেন্দ্র কাছে টেনে চোখ মুছিয়ে দিয়ে বলে, আয়, আমরা এগোই।

পাটক্ষেতের আড়াল থেকে বের হয়ে সামনে এগোতেই দেখতে পায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ফ্রান্সিস গোমেজের বাড়ি ধিকিধিকি জ্বলছে। কালো ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে। ছড়াচ্ছে চারদিকে। দীপেন্দ্র চোখ মোছে। ধোঁয়ার ঝাঁজ লাগছে। মিলিটারি চলে গেছে। এদিক-ওদিক থেকে লোকজন বেরিয়ে আসছে। দীপেন্দ্র আর ময়েজ নুরিতার দুই হাত ধরে এগোয়।

ময়েজ বলে, আমরা আগে খ্রিস্টানবাড়িতে যাই। তার পরে বিলের ধারে যাব।

—হ্যাঁ, তা-ই চলো।

তিনজনে ফ্রান্সিসের বাড়ির কাছে এসে দাঁড়ায়। দেখতে পায়, রোজারিও মাঠের দিক থেকে আসছে। দূর থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পাচ্ছিল ওরা। কাছে আসতে আসতে কান্নার বেগ কমে যায়। কাছে এসে দাঁত কিড়মিড়িয়ে বলে, ওকে আমি ছাড়ব না।

—কে? কে?

—শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান খবীর মুন্সির ভাই দবির।

—ও কী করেছে?

—ওকে দেখেছি মিলিটারির সঙ্গে স্পিডবোটে। ওদের পথ দেখিয়ে এনেছে। ওর কাছে এসেই গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলির তোড়ে আমি আর এদিকে আসতে পারিনে। ক্ষেতে কাজ করছিলাম। অবস্থা দেখে লুকিয়ে থাকলাম। পরে দেখলাম, ওরা বাড়িতে আগুন দিয়েছে। স্পিডবোট চলে যেতে দেখে বের হয়ে আসি।

কথা শেষ করে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে রোজারিও। মাটিতে পা দাপায়। দুই হাত ওপরে তুলে চিৎকার করে, প্রতিশোধ! প্রতিশোধ! কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নুরিতা হাত ধরে বলে, কাকু, থামেন।

—আমাদের সামনে এখন অনেক কাজ, রোজারিও ভাই।

—জানি। লাশ কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। চলেন দেখি কতজনকে মেরেছে।

সবাই মিলে এগোয়। দেখতে পায়, বাড়ির কাছাকাছি একটি জায়গায় পনেরোজন গুলিবিদ্ধ মানুষ পড়ে আছে। নুরিতা দৌড়ে গিয়ে পাশে বসে প্রত্যেকের গায়ে-মাথায় হাত বোলায়। রক্তাক্ত হয়ে যায় ওর দুই হাত। ময়েজ ধমক দিয়ে বলে, উঠে আয়, নুরিতা।

ও কারো দিকে তাকায় না। যা করছিল, করে যেতে থাকে। ময়েজ তুলে আনতে গেলে দীপেন্দ্র বাধা দেয়।

—থাক, ওকে করতে দে, ময়েজ। ওর দুই হাতে শহীদের রক্ত লাগিয়েছে। এটাও ওর যুদ্ধ।

—ঠিক ঠিক। আমার যুদ্ধ। আমার যুদ্ধ।

নিজের রক্তাক্ত দুই হাত ঘাসে মুছতে থাকে নুরিতা। ঘাসের পাশের কাঁচা মাটিতে দুই হাত মাটিময় হয়।

—আমার দেশে, আমার দেশ।

নুরিতা দুই হাত ওপরে তুলে রাখে। ময়েজ ওর হাত ধরে বলে, এখন আমরা এই মাটিতে শহীদদের শান্তির ঘুমে শুইয়ে দেব।

—উনাদের যখন শোয়াবেন, তখন আমি আমার মাটিমাখা হাত উনাদের গায়ে ছুঁইয়ে দেব। বলব, আপনারা আমার দেশ। আপনারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। আমিও যুদ্ধ করব। বঁটি দিয়ে ওদের গলা কাটব। দেখবেন, আমি ঠিকই পারব।

দীপেন্দ্র বিস্মিত হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। মেয়েটা মাথায় এত কিছু নিয়ে যুদ্ধ সময়ের একজন। ও আমার ইতিহাসের খাতায় উঠবে। আমি বেঁচে থাকলে ও ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট মানুষ হবে। ওকে আমি ভুলব না।

—কাকু, আপনি কী ভাবছেন? শহীদদের কথা?

—হ্যাঁ, শহীদদের কথা। এখন ওদের জন্য আমাদের অনেক কিছু করতে হবে।

তখন দীপেন্দ্র শুনতে পায়, রোজারিও ওদের ডাকছে। দুজনে নুরিতাকে রেখে রোজারিওর কাছে যায়।

—আমরা শহীদদের রাংতার বিলে নিয়ে যাব। সবাইকে এক জায়গায়। দেশ স্বাধীন হলে ওটা আমাদের গৌরবের জায়গা হবে।

—আমরাও তা-ই মনে করি। আমাদের খাটিয়া বানাতে হবে।

—আমি যাচ্ছি বাঁশ আনতে। দু-তিনটি বাঁশ জোড়া করে বাঁধলেই আমরা শহীদদের মাথায় তুলে নিয়ে যেতে পারব।

 

 

চারদিক থেকে লোকজন আসতে শুরু করেছে। কেউ কেউ কাঁদছে। অনেকে চিৎকার করে পাকিস্তানি সেনাদের আর রাজাকারদের গালাগাল করছে। দীপেন্দ্রর মনে হয়, চারদিকে প্রবল কলরব। এই কলরব যুদ্ধের সাহস। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর। বলছেন, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা। বুক টান করে দাঁড়ালে দীপেন্দ্রর বুকের পাটাতন শক্ত হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরে। দ্বিতীয় কিছু ভাবার সুযোগ নেই। স্বাধীনতা চাই, স্বাধীনতার বাদকদলের কণ্ঠে গীত হবে সোনার বাংলা। ওহ্, যুদ্ধ! দীপেন্দ্র হাত রাখে নুরিতার মাথায়। মেয়েটি হতবিহ্বল হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে। দেখছে মানুষদের।

—কাকু, সবাই কি যুদ্ধ করছে?

—হ্যাঁ, করছে। শহীদদের জন্য ছুটে আসা মানুষরা।

—কাকু, আমিও কবর দিতে যাব।

—হ্যাঁ, যাবি তো।

—ওই যে বাঁশ নিয়ে ময়েজ ভাইয়া আসছে।

—আমরা সবাইকে একে একে নিয়ে যাব কবর দেওয়ার জন্য।

—কাকু, কাকু—

কথা শেষ হয় না নুরিতার। দীপেন্দ্রর পাশে এসে দাঁড়ায় সুমন্ত। বলে, আমার ঘরে চট ছিল, সেগুলো নিয়ে এসেছি।

—ভালো করেছ। চটে বেঁধে দু-তিনজন মিলে ঝুলিয়ে নিয়ে যাব।

—হ্যাঁ, সে জন্যই এনেছি। যাই, একজনকে চটের ওপর ওঠাই।

সুমন্তর সঙ্গে আরো দু-তিনজন এগিয়ে যায়। ঘাসের ওপর গড়িয়ে আসা রক্তের ওপর বিছিয়ে দেয় চট। সবাই মিলে একজনকে চটে তোলে। সেই চট দুই পাশ থেকে ভাঁজ করে গায়ে জড়িয়ে দেয়।

সুমন্ত দাঁড়িয়ে বলে, এখন নিয়ে যেতে পারব।

—বাধা দেয় রোজারিও।

—এখনই না। আমরা সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে যাব। ওই যে একজন চাটাই এনেছে। চলেন আমরা একজনকে চাটাইয়ে তুলি।

তিনটি বাঁশ নিয়ে আসে ময়েজ।

—এগুলো এখন দড়ি দিয়ে বেঁধে খাটিয়া বানাব। একে একে নিয়ে যাব সবাইকে।

—একে একে নেব না। সবাইকে একসঙ্গে নেব। আমি মাদুর এনেছি। মাদুরে ওঠাব একজনকে। ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকলে মাঝখানে একজন মাথা ঠেকিয়ে রাখবে। যেন পড়ে না যায়। আসুন, হাত লাগান।

দীপেন্দ্রর মনে হয়, সবাই বিপুল কর্মযজ্ঞে শামিল হয়েছে। যুদ্ধদিনের ইতিহাস ফুটে উঠছে ওর সামনে। ভরে যাচ্ছে খাতার পৃষ্ঠা। কিছুদিন আগে রাজাকার দুলাল বলেছিল, তোরা পাকিস্তান ভেঙে নতুন দেশ বানাবি। অত সোজা না। জবাই করে কল্লা ঝুলিয়ে রাখব গাছে। কাকে এসে ঠোকরাবে। তারপর মাটিতে ফেলে ফুটবল খেলব। পায়ের নিচে দাবিয়ে রাখব হাজার হাজার কল্লা।

—মুক্তিযোদ্ধারা কি তোকে ছেড়ে দেবে? তোর কল্লা দিয়েও ফুটবল খেলা হবে।

—খবরদার। এমন কথা বললে বাঁচবি না। সরে যা আমার সামনে থেকে। বন্ধু বলে ছেড়ে দিলাম।

—আমি তোর বন্ধু থাকতে চাই না।

—সামনে থেকে সরে যা। নইলে আস্ত রাখব না।

—ভাগ শুয়োরের বাচ্চা। দালালি করার জায়গা পাস না।

স্বপন দাঁতমুখ খিঁচিয়ে কথা বললে হিংস্র হয়ে উঠেছিল দুলাল।

সেদিন সবাই মিলে থামিয়েছিল দুলালকে। এখন দুলাল পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে ক্যাম্পে থাকে। ওদের সঙ্গে মানুষ মারতে যায়। দীপেন্দ্রর এসব কথা ভাবার সময় সামনে তাকিয়ে দেখতে পায় আলমতারা আসছে। চিৎকার করে মেয়েকে ডাকছে।

—নুরিতা, নুরিতা, মাগো তুই কই।

—এইতো আমি এখানে।

আলমতারা দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে মেয়ের কাছে দাঁড়ায়। নুরিতা কয়েক পা সরে গিয়ে দুই হাত ওপরে তুলে বলে—এই দেখেন, আমার হাতে শহীদের রক্ত। এই দেখেন, আমার হাতে দেশের মাটি। আমি এই হাত কোনো দিন ধুব না। আপনি আমাকে ভাত খাইয়ে দেবেন। যত দিন বাঁচব তত দিন খাওয়াতে হবে।

—কী বলিস রে, মা—

কাঁদতে শুরু করে আলমতারা।

দীপেন্দ্র তার দিকে তাকিয়ে থাকে। কান্না কমলে বলে, আপনিও আমাদের সঙ্গে চলেন।

—শহীদের লাশের সঙ্গে আমিও যাব। আমি তো শুধু ঘরের মানুষ না, আমি দেশের মানুষ। আলমতারা আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে থাকে। দীপেন্দ্র কথা বলতে পারে না। ময়েজের কাছে এগিয়ে গিয়ে নিজের ঘাড়ের ওপর খাটিয়া উঠিয়ে নেয়। নুরিতা খাটিয়ার নিচে মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলে, আমি খাটিয়ার নিচ দিয়ে যাব। তাহলে মনে হবে, আমার মাথার ওপর শহীদের লাশ আছে। আমি নিয়ে যাচ্ছি রাংতার বিলে।

—ঠিক আছে, তুই এভাবে আয়। আমাদের সঙ্গে হাঁটতে পারবি তো?

—হ্যাঁ, পারব। না পারলে দৌড়াব।

দীপেন্দ্র ওর কথা শুনে আবার বিস্মিত হয়। মেয়েটার কাছে পরাজয় বলে কিছু নেই। ওকে এভাবে বোঝা দারুণ বিষয়। মেয়েটি মুক্তিযুদ্ধের সময়কে নিজের সবটুকু চেতনা দিয়ে ধারণ করছে। এদের সংখ্যা অনেক আছে বলেই দেশ স্বাধীন হবে। কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।

—মাগো, ময়েজ ভাইয়ার পাশে পাশে হাঁটেন। মনে করেন, আপনিও শহীদের লাশ ঘাড়ে নিয়েছেন।

আলমতারা কথা বলে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। এগিয়ে যাচ্ছে সবাই। আশপাশের সব মানুষ এগিয়ে গেলে আলমতারা হাঁটতে শুরু করে। স্বামীর মৃত্যুর পর নিজেকে সামনে আনার কোনো সুযোগ ছিল না তার। ভয়ে-আতঙ্কে সেদিন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গ্রাম। মিলিটারি চলে গেলে রাংতার বিলে গর্ত করে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছিল সেদিন। জানাজা পড়ে দাফন করা হয়নি শত শত লাশ। আজকের দিনে সাহস করেছে লোকজন। লাশ নিয়ে যাচ্ছে কবর দেওয়ার জন্য। আলমতারার হাঁটার গতি সবার মতো না। অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়ে। ওর পা চলতে চায় না। অন্যদের সামনে নিজের কথা প্রকাশ করেনি। এই পরিবারের মানুষরা মেরিনার পরিবার। আত্মীয়দের মধ্যে কেউ কেউ এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।

—ওহ্ মেরিনা—উচ্চারণ করে কপাল চাপড়ায় আলমতারা। এই লাশের মধ্যে কি মেরিনাও আছে? কাউকে জিজ্ঞেস করার সাহস হয় না। আলমতারা মেরিনার বোনের স্বামীর কথা ভাবে। যোসেফ স্কুলের শিক্ষক ছিল। তাকে অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছে। সেই ঘটনায় যে দু-একজন বেঁচে গিয়েছিল, তাদের কাছে মেরিনা সেই ঘটনার কথা শুনেছে। তার পর থেকে ঠিকমতো পানি খেতে পারত না মেরিনা। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে চোখের জল মুছত। নিজেও দেখেছে আলমতারা। একদিন বাড়িতে এনে পিঠা খেতে দিয়েছিল মেরিনাকে। তারপর পানির গ্লাস হাতে নিয়ে চিৎকার করে কেঁদেছিল। বলেছিল, পেটের খিদায় ভাত খাই। কিন্তু পানির গ্লাস হাতে নিলে—

—ওহ্, আলমতারা দাঁড়িয়ে পড়ে। লাশ নিয়ে চলে যাচ্ছে যারা, তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। পেছনে পড়ে আছে রক্তভূমি। সেই রক্তভূমিতে ডুবে আছে যোসেফের মাথা। চোখ বোজা নয়। জ্বলজ্বল করছে দৃষ্টি। যেন পুরো দৃষ্টিতে দেখে নিচ্ছে নিজের মাতৃভূমি। নাক বন্ধ নয়। নিঃশ্বাস পড়ছে। নিঃশ্বাস উড়ে আসছে রক্ত ছুঁয়ে। যেন বলতে চায়, আমার মরণ নাই। বেঁচে আছি।

আলমতারা আর হাঁটতে পারে না। রাস্তার ধারের গাছের নিচে বসে পড়ে। শুনতে পায় মেরিনার কণ্ঠস্বর, যোসেফ খুব স্বাধীনচেতা লোক ছিল। কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেনি। মাথা উঁচু করে নিজের কথা বলতে সাহস হারাত না। পঁচিশে মার্চের পর থেকেই স্বাধীনতার কথা বলত জোরেশোরে।

একদিন আমাকে বলেছিল, ঠিক করেছি আগামী সপ্তাহে ইন্ডিয়া চলে যাব। ট্রেনিং নেব।

আমি বলেছিলাম, অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার বয়স তোমার নাই।

আমাকে ধমক দিয়ে বলেছিল, এভাবে কথা বলবে না। স্বাধীনতার জন্য সব দায় সবাইকে নিতে হয়। কালকে মহেন্দ্রবাবুর বাড়িতে আমরা বসব। কে কোথায় কী করবে তার প্ল্যানিং করা হবে। এটুকু বলে মেরিনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিল, ওদের এই প্ল্যানিংয়ের বিষয়টি আমার পছন্দ হয়েছিল। আমি সায় দিয়ে বলেছিলাম, এভাবে প্ল্যানিং করলে ভালোই হবে। আমি সংসার গোছানোর কাজ শুরু করব।

—হ্যাঁ, করো। আমি আর এখানে থাকব না। যোসেফ গলা কঠিন করে বলেছিল। তারপর রাতের ভাত খেয়ে মহেন্দ্রবাবুর বাড়িতে গিয়েছিল। কখন ফিরে আসবে, তেমন কোনো ধারণা আমি পাচ্ছিলাম না। ছেলে-মেয়েদের খাইয়েদাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলাম। হারিকেনের মিটিমিটি আলো জ্বালিয়ে আমি বসে ছিলাম ঘরে। অন্য সময় হলে আমি বারান্দায় বসে থাকতাম। গাঁয়ে মিলিটারির হামলার পর থেকে আর বসি না। সেদিন খেয়াল করলাম, রাত বারোটার মতো বেজে গেছে, তখন পর্যন্ত যোসেফ বাড়িতে ফেরে না। খবর নিয়েছি, আশপাশের বাড়ির সবাই গিয়েছে মহেন্দ্রবাবুর বাড়িতে। ভাবতে ভালো লাগছিল যে প্রত্যেকেই যুদ্ধের জন্য কী করবে ভাবছে। কেউ সরাসরি যুদ্ধ করবে, কেউ পেছনে থেকে কাজ করবে—এমন চিন্তা সবার মধ্যে ছিল। সে রাতে আমি ঠিক করেছিলাম বের হব। কী হচ্ছে দেখব। কারণ গাড়ির শব্দ পাচ্ছিলাম। গ্রামে তো মিলিটারির গাড়ি ছাড়া গাড়ি আসার কথা না। তার ওপর এত রাতে। আমি হারিকেনের ওপর গামছা দিয়ে আলো আড়াল করি। তারপর ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সামনের দিকে এগোই। গাছের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে মহেন্দ্রবাবুর বাড়ির দিকে এগোতে থাকি। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারিনি। অনেক দূর থেকে দেখতে পাই, মহেন্দ্রবাবুর বাড়ির চারদিক ঘিরে গুলি চালাতে শুরু করেছে। গুলির শব্দে চৌচির হয়ে যায় মাঠঘাট। আমি মেঠো রাস্তার পাশে খানিকটা নিচু জায়গায় শুয়ে পড়ি। রাজাকাররা বিভিন্ন বাড়িতে ঢুকে লুটপাট করে। তারপর আগুন জ্বালিয়ে দেয়। দাউদাউ আগুনের শিখার আলোয় ভরে যায় চারদিক। আমাকে কেউ দেখতে পারে এই ভয়ে আমি হামাগুড়ি দিয়ে এগোই। বটগাছটার কাছে আসার পর সেই গাছের আড়ালে দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়িতে আসি। দূর থেকে দেখতে পাই, বয়সী মানুষদের মিলিটারির জিপে তোলা হচ্ছে। যোসেফকে তোলা হয়েছিল কি না তখন আমি তা বুঝতে পারিনি। কারণ ওদের ঘর থেকে বেঁধে বের করে বড় রাস্তায় নিয়ে গাড়িতে তোলা হয়েছিল। তারপর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাপ্রভুর মন্দিরের পাশের ধানের জমিতে। জিপ ওখানে পৌঁছার আগেই রাজাকাররা কোদাল দিয়ে বড় গর্ত করে রেখেছিল। জিপ ওখানে পৌঁছলে ওদের নামিয়ে সেই গর্তে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। তারপর গুলি করে ওদের মেরে ফেলা হয়েছিল। অন্যরা সঙ্গে সঙ্গে মরে গেলেও যোসেফ অনেকক্ষণ বেঁচে ছিল। যোসেফ রাজাকারদের কাছে পানি চেয়েছিল। বলেছিল, মরণের আগে আমি জল খেতে চাই। আমার গলা শুকিয়ে গেছে। তোমরা আমাকে একটুখানি জল দাও। কচুপাতা ছিঁড়ে জল নিয়ে এসো।

যোসেফের অনুনয়ে কেউ কর্ণপাত করেনি। উল্টো গাল দিয়েছিল।

—তোর জল খাওয়ার ইচ্ছা মিটিয়ে দেব হারামজাদা। গুলি খেয়ে জল খাওয়ার জ্বালা জুড়োয়নি? বদমাশ একটা। যুদ্ধ করার সাধ মিটিয়ে দিয়েছি। মর, এখন মর।

যোসেফ চিৎকার করে বলেছিল, জল। জল।

—তোকে জল দিচ্ছি, শয়তান।

রাজাকার জব্বার ওর মুখে পেশাব করার জন্য তৈরি হয়। অন্যজন তার গাল চেপে মুখ হাঁ করিয়ে রাখে। জব্বার মুখের মধ্যে পেশাব করতে করতে বলেছিল—পেশাব খা, পেশাব খা। পানির পিয়াস মেটা। গলা এত শুকিয়ে যায় কেন? মরণরে ভয় পাস।

—মরণরে ভয় পাই না। যুদ্ধ করার জন্য বাঁচতে চাই। স্বাধীন দেশে মরতে চাই।

—শালা। তোর বাঁচার সাধ দেখাচ্ছি।

তিন-চারজন রাজাকার কোদাল দিয়ে পেটাতে থাকে যোসেফকে। যোসেফের প্রাণ ফুরিয়ে যায়।

আমি সারা রাত ঘরে বসে ছিলাম। সকালে যোসেফের ছাত্র ডেনিস এসেছিল বাসায়। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, স্যার নেই। স্যার যুদ্ধ করতে পারলেন না। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিলেন। বাড়িতে কান্নার রোল ওঠে।

—স্যার, স্যার, আমার স্যার—বলে চিৎকার করে ডেনিস। বারান্দায় গড়াগড়ি দেয়। একসময় উঠে বসে বলে, স্যারের মৃত্যুর কথা জব্বার আমাকে বলেছে। আমি আপনাকে সব খুলে বলব। আমি সারা দিন থাকব আপনার কাছে।

তারপর যোসেফের মৃত্যুর বর্ণনা ডেনিসের কাছ থেকে শুনেছিল মেরিনা। ডেনিস বাড়ি ফেরার সময় বলেছিল, যেখানে স্যারকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, সেখানে যাচ্ছি। ফুল রেখে আসব কবরের ওপর।

মেরিনা বলছিল, তোকে যেতে হবে না, ডেনিস। ওরা তোকেও মারবে।

—না, আমি যাব না। সব মানুষের জীবনে এমন মৃত্যু হয় না। এ এক মহান মৃত্যু। মহান সময়ের মহান মৃত্যু। চাইলেও এমন মৃত্যু পাব না। আমি যাচ্ছি।

কোনো দিকে না তাকিয়ে হনহন করে হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ওর সঙ্গে মেরিনার আর কখনো দেখা হয়নি। আলমতারাকে মেরিনা বলেছিল, ও হয়তো ইন্ডিয়া চলে গেছে। ওর তো যুদ্ধ করতে হবে। ওর স্যার যুদ্ধে যেতে পারেনি, স্যারের ছাত্ররা তো অবশ্যই যাবে।

মেরিনা এমনই দৃঢ়চেতা ছিল।

এখন ও শহীদদের বহনকারী খাটিয়ায় বধ্যভূমিতে যাচ্ছে। শত শত মানুষের সঙ্গে এককাতারে ঢুকে যাবে।

মেরিনার কথা ভেবে আনমনা হয়ে যায় আলমতারা। মেরিনার সঙ্গে অনেক স্মৃতি আছে। সেসব স্মৃতি মনে করে মেরিনা বেঁচে থাকবে স্মরণে-বরণে। আলমতারা দেখতে পায়, রাংতার বিলে পৌঁছে গেছে সবাই। ও দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে। মেরিনার মুখটা ওর দেখতে হবে। ওকে ছুয়ে দেখতে পারলে বুঝবে স্বাধীনতা লাভ করা কত কঠিন।

কোদাল দিয়ে খোঁড়া হয়েছে গর্ত। একে একে নামানো হচ্ছে। আলমতারা দ্রুত পায়ে কাছে এসে দাঁড়ায়। একসময় দেখতে পায় মেরিনাকে। মুখটা প্রায় ঝলসে গেছে। খুব কাছ থেকে চেনা বলে চিনতে কষ্ট হয়নি আলমতারার। যারা খুব কাছের মানুষ নয়, তারা দেখলে চিনতে পারবে না মেরিনাকে। আলমতারা দুই হাতে মুখ ঢাকে।

—সরেন, সরেন চাচি। সরে দাঁড়ান।

আলমতারা পিছিয়ে যায়। নুরিতা কাছে এসে মৃদু স্বরে ডাকে, মাগো—আলমাতারা মেয়ের মাথায় হাত রাখে। কথা বলে না। মনে হয়, সব কথা ফুরিয়ে গেছে। এত লাশের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাধ্য কি কারো থাকে? কী কথা বলতে হবে, সেটাও জানে না আলমতারা। নিজেকে একদিকে বোকা মনে হয়, অন্যদিকে অসহায়। ওর অসহায়ত্ব পুরো জীবনকে অন্ধকার করে দেয়। উড়ে যায় স্বপ্নের আলোর পাখি। আবার দুই হাতে মুখ ঢাকে আলমতারা। এই দৃশ্য দেখার জীবন উপলব্ধি আগামীর স্মৃতি। এই স্মৃতি নিয়ে যাবে বহুদূর। রাংতার বিলে থাকুক চোখের জল। তোমার কাছে এটুকু জমা রেখে গেলাম। নুরিতা আবার ডাকে, মাগো—

মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে আলমতারা।

—বল মা, কী বলবি।

—মেরিনা মাসি আর কোনো দিন আমাকে বলবে না, তোকে একদিন গির্জায় নিয়ে যাব। তুই আমাদের প্রার্থনা শুনবি।

—এসব কথা থাক, মা।

—কিন্তু আমার তো গির্জায় যাওয়া হলো না। কে আমাকে নিয়ে যাবে?

—যাবে, যাবে, কেউ না কেউ নিয়ে যাবে। মন খারাপ করিস না।

—আমি সুতপা মাসির সঙ্গে প্যাগোডায় যাব, মা।

—হ্যাঁ, যাবি।

—আমি তো কতবার মন্দিরে গিয়েছি। আমি পূজার উৎসবে যাই। আমার খুব আনন্দ হয়। আমি সব ধর্মের অনুষ্ঠানকে নিজের অনুষ্ঠান মনে করব, মাগো।

—হ্যাঁ, করবি। আমিও করি। আমরা সবাই এক দেশের মানুষ। আমাদের একটাই দেশ। আর কথা বলিস না, মা। থাম। সবাইকে কবরে নামানো হয়েছে।

—কবর নাকি, এটা তো গর্ত!

—আহ্! থাম মেয়ে।

নুরিতা মায়ের হাত ছেড়ে অন্যদিকে যায়। আলমতারা দাঁড়িয়ে থাকে। সবাই মিলে মাটিচাপা দিয়ে গর্ত বোজায়। কান্নায় বিদীর্ণ হয় আকাশ-বাতাস। স্বজনদের আহাজারিতে প্লাবিত হয় রাংতা-কেতনার বিল। যেন এক প্রবল বর্ষা নেমে এসেছে। এক অন্য রকম বর্ষা ওদের চারপাশে—অশ্রুজলের বর্ষায় প্লাবিত স্বদেশে জড়ো হয়েছে মানুষ। ওদের সামনে ধর্মের ভেদাভেদ নেই। বধ্যভূমির মাটিতে রক্তের লাল নদী। জোয়ারের মতো বয়ে যাচ্ছে লাল নদীর স্রোত।

বুক উজাড় করে কাঁদে আলমতারা। এই কান্নার সঙ্গে মিশে যায় নিজের শহীদ স্বামী। একসময় হেঁচকি উঠতে শুরু করলে বসে পড়ে খোলা মাঠে। দেখতে পায়, একে-দুইয়ে চলে যাচ্ছে সবাই। যার যেদিকে গন্তব্য সেদিকে। ওরও তো যেতে হবে বাড়িতে। একটু দূরে দীপেন্দ্র, ময়েজ আর নুরিতা বসে আছে। তিনজনই চুপ করে বসে আছে। নাকি কেউ কথা বলছে। আলমতারা দূর থেকে তা বুঝতে পারছে না। একটু পরে মেরিনার বাড়ির দিলীপ এসে ওর সামনে বসে বলে, বাড়ি যাবেন না?

আলমতারা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। উত্তর দেয় না।

—কথা বলছেন না যে?

—এই রাংতার বিল আমার বাড়ি। আমি আর কোথায় যাব?

—এভাবে বললে তো হবে না। আমাদের সবার মনে রাখতে হবে যে এটা আমাদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ। সবাইকে যুদ্ধ করতে হবে। আপনিও করবেন।

—আমি কিভাবে করব?

—মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবেন। ওদের অস্ত্র রাখার দায়িত্ব নেবেন। ভাত রেঁধে খাইয়ে ওদের শরীর ঠিক রাখবেন। খিদায় যেন ওদের মাথা না ঘোরায়।

—আপনি আমাকে উপদেশ দিচ্ছেন কেন, দিলীপ বড়ুয়া? আমি তো এসব করবই। আমি জানি, এসব করা আমার কর্তব্য।

—তাহলে বাড়ি চলেন। আমি আপনাকে বাড়িতে রেখে আসতে চাই। এখানে বসে থাকবেন না। শহীদদের জন্য যা করা দরকার, সবাই তা করেছে। চলেন, ওঠেন। আলমতারা মুখ ফিরিয়ে রাখে। কথা বলে না। দিলীপ বড়ুয়া গলা খেঁকিয়ে বলে, কথা শুনছেন না কেন?

—আচ্ছা, চলেন। আমার মেয়েকে ডাকেন।

—ও দীপেন্দ্র আর ময়েজের সঙ্গে যাবে।

—আপনি আমার পেছনে লেগেছেন কেন?

—আপনাকে সুস্থ থাকতে হবে। আপনার       শক্তি-সাহস আমাদের দরকার।

আলমতারা চোখ বড় করে দিলীপ বড়ুয়ার দিকে তাকায়। খুব অল্প পরিচয় মানুষটির সঙ্গে। তার বউ সুতপার সঙ্গেই যোগাযোগ বেশি। অথচ আজকে লোকটি ওকে যুদ্ধের সাহসী নারী বলছে। একেবারে মাথায় তুলে দিচ্ছে। যেন বলতে চায়—। কী বলতে চায়, এটা আর আলমতারা ভাবতে চায় না। এটুকু বাদ থাকুক। কিন্তু বাদ রাখতে পারে না। দিলীপ বড়ুয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, আমাদের কাউকে যেন মৃত্যুর সময় পানি চেয়ে ওদের পেশাব মুখে নিতে না হয়।

—এই নির্যাতনের জবাব ওদেরকে আমাদের দিতেই হবে। যোসেফের মৃত্যুর এই ঘটনায় আমার মাথায় রাগের আকাশ জমে আছে। আমাদের প্রতিশোধ নিতে হবে। রাজাকারদের একজনের মুখে না একজনের মুখে পেশাব দেব, ভরিয়ে দেব। এরপর ঠেলে দেব মরণগর্তে।

—ও, আল্লা, তা-ই যেন আমরা পারি।

—পারি না, পারতে হবে। চলেন যাই।

—চলেন।

হাঁটতে শুরু করে দুজন।

বাড়িতে এসে আলমতারা উঠোনে দাঁড়িয়ে বলে, আমরা মাথায় বুদ্ধি এসেছে।

—বলেন, কী বুদ্ধি!

—আপনার একটা দল বানান। একজন একজন রাজাকার ধরে আনবেন সময়-সুযোগমতো। তারপর আমার ঘরের পেছনের ডোবার ধারে মারা হবে। সবার আগে মুখে পেশাব করে দেবেন। তারপর হাত-পায়ে, মাথায় ইট বেঁধে ডুবিয়ে দেওয়া হবে। বুঝবে কত ধানে কত চাল।

দিলীপ বডুয়া এই প্রস্তাবের কথা শুনে আলমতারার দিকে তাকিয়ে থাকে। একজন নারীর এমন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত তাকে তাড়িত করে। বলে, সুতপাকে আপনার এখানে আসতে বলব! দুজনে মিলে আরো কিছু চিন্তা করবেন।

—হ্যাঁ, সুতপা এলে তো খুশি হব। কবে পাঠাবেন?

—বাড়িতে গিয়ে দেখি ও কী বলে!

—আচ্ছা, ঠিক আছে। ঘরে খই-মুড়ি আছে, দেই?

—না, এখন আর বসব না। খাওয়ার ইচ্ছা নাই।

—আপনি ময়েজকে বলবেন আমার মেয়েকে বাড়িতে দিয়ে যেতে।

—দীপেন্দ্রকে তো আসতেই হবে। ওর সাইকেল দেখছি।

—হ্যাঁ, সাইকেল রেখে গেছে।

—আমি যাই। দেখা হবে।

চলে যায় দিলীপ বড়ুয়া। পুড়ে যাওয়া বাড়িঘরের ছবি চোখের সামনে ভেসে থাকে আলমতারার। পরক্ষণে ভাবে, ঘরের পেছনের ডোবায় যদি রাজাকারদের লাশ ফেলা হয়, তাহলে কি পাকিস্তানি সেনারা ওকে ছাড়বে? ছাড়বে না। ওকে মারবে। বাড়িঘর পোড়াবে। তাই বলে তো যুদ্ধ বন্ধ রাখা যাবে না। আমরা কিছু না বললে ওদের সাহস বেড়ে যাবে। ওদের সাহস বাড়তে দেওয়া হবে না।

আলমতারা ধুম করে মাটির ওপর পা দাপায়। ক্রোধ ওকে আচ্ছন্ন করে তোলে। ও সাইকেলের কাছে গিয়ে বেলটা জোরে জোরে বাজাতে থাকে। শব্দে বাড়ির ওঠোন ভরে ওঠে। নুরিতার বাবার ইচ্ছা ছিল একটা সাইকেল কেনার। অভাবের সংসারে সেই টাকা জোগাড় হয়নি। যুদ্ধের শুরুতে বলেছিল, একটা সাইকেল থাকলে গ্রামে ঘুরে ঘুরে মানুষের খোঁজখবর করব। মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা বলব।

জীবন দিয়ে সব কিছু করার বাইরে চলে গেল লোকটা। সব দায় ওর ওপর দিয়ে গেছে। প্রায়ই বলত, তারাবানু, তুমি যা পারো তা করবা। কখনো পিছায়ে থাকবা না। যুদ্ধ আমাদের সবার। সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারো পিছিয়ে থাকা চলবে না। পারবে না তুমি?

—পারব, পারব।

সেদিন আবেগে জড়িয়ে ধরেছিল ও।

এই মুহূর্তে সাইকেলে বেলের শব্দ করতে করতে আলমতারা নিজের শক্তি উজ্জীবিত করে। হঠাৎ করে শুনতে পায়, কেউ একজন দরজায় শব্দ করছে। আলমতারা ছুটে গিয়ে দরজা খোলে। ভেবেছে, নুরিতাকে নিয়ে ফিরেছে ওরা। কিন্তু না, দাঁড়িয়ে আছে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আকবর আলী।

—বাড়িতে কে আছে?

—আমি আছি।

—আর কে আছে?

—কেন, জানতে চান কেন? আপনি কেন এসেছেন?

—সাইকেলের বেল বাজায় কে?

—আমি বাজালাম।

—কেন বেল বাজাচ্ছেন?

—স্বামীর কথা মনে করে। পাকিস্তানি সেনারা মেরে ফেলার আগে ও একটি সাইকেল কিনতে চেয়েছিল।

—ঢং দেখানোর জায়গা পাস না, শয়তান মেয়েমানুষ।

দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে কথা বলে আকবর আলী।

—তুই কেন আসছিস আমার বাড়িতে? তোর কল্লা ফালায়ে দেব। দাঁড়া, বঁটি আনি।

—কী বললি? তোর সাহস তো কম না।

আলমতারা একছুটে রান্নাঘরে বঁটি আনতে যায়। আকবর আলীর কথার উত্তর দেয় না। রান্নাঘরের দরজায় বঁটি হাতে আলমতারাকে দেখে দ্রুত পায়ে চলে যায় আকবর আলী। আলমতারা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। দেখতে পায়, দীপেন্দ্র আর ময়েজের সঙ্গে নুরিতা আসছে। দূর থেকে মাকে দেখে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে জড়িয়ে ধরে নুরিতা।

—মাগো, এতজনকে মারা হলো, আপনার হাতে বঁটি কেন?

—একটা শয়তানকে মারতে চেয়েছিলাম।

—মেরেছেন? মেরে কল্লা ফেলেছেন?

—না রে মা, পারিনি। বঁটি আনতে গেলে ও চলে যায়।

—লোকটা কে, মা?

—তুই চিনবি না।

—ময়েজ ভাই চিনবে?

—হ্যাঁ, চিনবে।

—আচ্ছা, ময়েজ ভাই আসুক। আমি ময়েজ ভাইকে নিয়ে লোকটাকে মারতে যাব।

আলমতারা মেয়ের কথার উত্তর দেয় না। তাকিয়ে থাকে দীপেন্দ্র আর ময়েজের এগিয়ে আসার দিকে।

ওরা এগিয়ে এলে দীপেন্দ্র জিজ্ঞেস করে, কী হয়েছে আপনার?

—শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান এসেছিল।

—কেন? ওই শয়তান কী জন্য এসেছিল?

—আমি আপনার সাইকেলে বেল বাজাচ্ছিলাম। শব্দ শুনে এসেছিল। জিজ্ঞেস করেছিল, বেল বাজাচ্ছি কেন?

—সাহস কত! ঝাঁটাপেটা করতেন।

—আমি বঁটি আনার জন্য গেলাম। তখন চলে গেছে।

নুরিতা হাসতে হাসতে বলে, এ জন্য আপনার হাতে বঁটি?

ইস্! এমন যদি হয় যে সবার হাতে একটা করে বঁটি থাকে, তাহলে শয়তানগুলো—

—থাম মা, তুই থাম।

—আমি আমার সাইকেল নিয়ে যাই।

—আমিও যাই।

—আমাদের যুদ্ধ কখন শুরু হবে, ময়েজ ভাই?

—এসব কথা তুই বলবি না, নুরিতা।

—কেন বলব না? আমি সবার সামনে বলব।

বলব—বলব—একশবার বলব।

ও উঠোনে লাফাতে থাকে। চারদিকে ঘুরপাক খায়। একসময় মায়ের হাত থেকে বঁটিটা কেড়ে নিয়ে মাথার ওপর ঘোরায়। বলতে থাকে, আমার যুদ্ধ—আমার যুদ্ধ।

দীপেন্দ্র ও ময়েজের দিকে তাকিয়ে আলমতারা বলে, এই মেয়েকে কেমন করে বাঁচাব?

চুপ করে থাকে দুজন পুরুষ। ওরাও জানে, ও যদি পথেঘাটে কোথাও এসব কথা বলে, তাহলে রাজাকাররা ওকে ছাড়বে না। কেউ না কেউ ওকে ধরে নিয়ে যাবে। নির্যাতন শেষে মেরে সাবাড় করবে।

দীপেন্দ্র কাছে গিয়ে হাত থেকে বঁটিটা নিয়ে বলে, এখন থামো, মা। তোমাকে আমরা বন্দুক চালনা শেখাব। তুমি গুলি দিয়ে শত্রুর বুক ফুটো করবে।

চমকে ওঠে ও।

—অ্যাঁ, আমি বন্দুক চালাতে পারব! কবে শেখাবে কাকু? কবে?

—আমি তোমাকে বলব, কবে। আমরা এখন যাচ্ছি। তুমি ঘরে থাকো। বাইরে বেরোবে না আর।

—আচ্ছা।

ও মাথা নেড়ে সায় দেয়।

দীপেন্দ্র আর ময়েজ চলে যায়। সাইকেলের পেছনে উঠেছে ময়েজ। চারদিকে খোলা প্রান্তর। মেঠো রাস্তায় আর কেউ নেই। সাইকেল আরোহী দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে মা-মেয়ে।

একসময় মায়ের দিকে ঘুরে নুরিতা বলে, আমি সাইকেল চালাতে শিখব।

—সাইকেল চালানোর জন্য তোকে বড় হতে হবে রে, মেয়ে। এই সাইকেল তো তুই পায়ে পাবি না। আমি তো তোকে ছোট সাইকেল কিনে দিতে পারব না।

—কেন পারবেন না? পারতে হবে। আমার আব্বা থাকলে ঠিকই পারত। আব্বা—আব্বা—। দুই হাত ওপরে তুলে বলে, আল্লাহ, আমার আব্বাকে ফিরিয়ে দাও। আমি আব্বাকে চাই। আব্বা, আব্বা—।

—থাম, মা। থাম বলছি।

—হ্যাঁ, থামব তো। আমি তো জানি, আব্বা আর কোনো দিন আসবে না। আমি আর আব্বা ডাকতে পারব না। আমার শুধু আব্বার জন্য কাঁদতে হবে।

আমি কাঁদব। দিনে-রাতে কাঁদব।

—আয়, আমার কোলে আয়।

—আপনি এই গাছের নিচে বসেন। আপনার কোলে বসে আকাশ দেখব। সূর্য মামার ডুবে যাওয়া দেখব।

—আয় রে মা, আয়।

নুরিতা মায়ের কোলে বসে দূর আকাশের দিকে তাকায়। পাখির উড়ে যাওয়া দেখে। আলমতারাও নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে।

দিগন্তবিথারি স্বদেশের মাটিতে সবুজের হাতছানি। এর বিপরীতে এখন যুদ্ধ। স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই। আলমতারা বুকের সঙ্গে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। নুরিতা অবাক হয়।

—মাগো, আমাকে এমন শক্ত করে ধরেছেন কেন?

—তোর কি ব্যথা লাগছে?

—ব্যথা লাগছে না। কিন্তু আপনি আমাকে কখনো এমন করে ধরেননি।

—আমার মনে হচ্ছে, আমার বুক থেকে কেউ তোকে কেড়ে নিচ্ছে।

—ধুৎ, কে আমাকে কেড়ে নেবে। কেউ কেড়ে নিতে এলে আমি বঁটি দিয়ে তার গলা কাটব।

—পাগলি মেয়ে আমার। চল, ঘরে যাই।

—চলেন। আজকে আমি খিচুড়ি খাব। শুধু খিচড়ি। আর কিছু লাগবে না।

মা-মেয়ে আকাশ আর দিগন্ত রেখে ছাদের নিচে আসে। মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, আজ রাতে আমার ঘুম হবে না।

—কেন? তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

—হ্যাঁ, খুব কষ্ট হচ্ছে। কষ্টের চোটে আমার কান্না আসছে না। আমি বুক উজাড় করে কাঁদতে চাই। কত মানুষকে গর্তে ঠেসে রাখা হলো।

—থাক, মা। এসব ভাবিস না।

—কী বলেন, মা। আমাদের রাংতার বিল আজ অন্য রকম ছবি বানিয়েছে। আমি রাংতার বিলে পানি ভরা দেখেছি। ধানের জমি দেখেছি। কিন্তু এমন ছবি দেখিনি, যেটা আজকে দেখলাম।

—তোকে আমি ঘুম পাড়িয়ে দেব, মা।

—কেমন করে? ছড়াগান গাইবেন? ঘুমপাড়ানি মাসিপিসি—। এই গান শুনে আমার ঘুম আসবে না।

—চল, রান্নাঘরে যাই। তোর জন্য খিচুড়ি রাঁধব।

—না, দরকার নাই। রাঁধতে হবে না।

—তাহলে কী খাবি?

—কিছু খাব না। আমার কিছু ভালো লাগছে না।

—রাতে না খেয়ে থাকলে তো ঘুম আসবে না।

—আমার খিদে নেই। আপনি আমাকে খেতে বলবেন না, মা।

—একটু আগে তুই না খিচুড়ি রাঁধতে বললি।

—আহা মাগো, যখন বলেছিলাম তখন আমার মাথায় আকাশের ছবি ছিল। এখন আমার সামনে গর্তে ঢোকানো লাশের ছবি। সেই ছবি মনে করে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। আমি এখন বিছানায় শুয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকব। আর পুড়ে যাওয়া মানুষদের কালো চেহারা—

—থাক আর বলতে হবে না।

—এখন আপনি বলতে মানা করছেন, কিন্তু আমি যদি বেঁচে থাকি, তাহলে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বলব। বলবই তো। বলতেই হবে। না হলে আমার পরে যাদের জন্ম হবে, তারা কেমন করে জানবে।

অলমতারা মেয়ের সঙ্গে আর কথা বাড়ায় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওকে পাকনা বুড়ি বানিয়ে ফেলেছে। বারান্দার বাঁশের খুঁটিতে পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকলে আক্কাছ আলীর কাছে শোনা বড় একটি হত্যার ঘটনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

এলাকাটি ছিল হরহর গ্রামের নন্দীপাড়া। ওই গ্রামের জলাভূমিটি ছিল দুর্গম আর জঙ্গলে ঘেরা। নীরব-নিস্তব্ধ জলাভূমিতে জীবন বাঁচানোর জন্য জড়ো হয়েছিল দুইশজন নারী-পুরুষ আর শিশু। ওরা ধরে নিয়েছিল যে এমন একটি জনমানবশূন্য এলাকা পাকিস্তানি সেনারা খুঁজে পাবে না। এখানে জনমানব থাকতে পারে, এমন ভাবনা ওদের মাথায় আসবে না। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের দালাল রাজাকাররা ঠিকই তাদের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। তারা আশ্রয় নেওয়া লোকদের ঘেরাও করে গুলি চালাতে শুরু করে। বৃষ্টির মতো গুলির মুখে নিরুপায় মানুষরা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। রক্তের স্রোতে ভেসে যায় মাটি। লাশ পড়ে থাকে শুকিয়ে থাকা জলাভূমির এখানে-ওখানে। লাশের কবর দেওয়ার জন্য কেউ যেতে পারেনি ওখানে। রাজাকার কমান্ডার আজম আলী এই গণহত্যার হোতা। পাশের একটি গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে আক্রমণ চালায়। গুলি করে হত্যা করার পাশাপাশি আগুন দিয়ে পোড়াতে থাকে ঘর। নির্বিচার গুলির মুখ থেকে সরতে পারেনি লোকেরা। এই খবর পেয়ে পাশের আধুয়া গ্রামের মানুষরা নিজেদের এলাকায় ওই জঙ্গলঘেরা জায়গায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। জঙ্গলের ভেতরের জলাভূমিতে পানি ছিল না। সবাই মিলে সেখানে নেমে যায়। দুই বছরের শিশু থেকে আশি বছরের মানুষ ছিল ওই দলে। পাকিস্তানি সেনারা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ফিরে যাওয়ার সময় আজম মিয়া জঙ্গলে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের খবর বলে। হিপ-হিপ-হুররে করতে করতে এগিয়ে আসে সেনারা। ছুড়তে শুরু করে গুলি। ঝরতে থাকে মানুষের প্রাণ। তারপর সব লাশ ফেলে রেখে চলে যায়।

আক্কাস আলী সেদিন ওখানে ছিল। গাছের লতাপাতা জড়িয়ে নিজেকে আড়াল করেছিল। গায়ে গুলি লাগেনি। মাটির সঙ্গে মিশে সবার মতো পড়ে থাকার সময়টি এখন তার কাছে এক অন্য রকম সময়। এই সময়কে মাথায় নিয়ে যুদ্ধ করতে যাবে। আলমতারার মনে হয়, ওর নিজেরও দেখা দরকার হরহর গ্রাম। রাজাকাররা এই জলাভূমির নাম দিয়েছে মরার ভিটা। মানুষ মেরেছে আবার তার নাম দিয়েছে। দুইশ লোকের মধ্যে কারো কারো গায়ে গুলি লেগেছে। কিন্তু মরে যায়নি। আক্কাস মিয়া বলেছে, যুদ্ধের সময় ও আর গ্রামে ফিরবে না। আগে দেশ স্বাধীন, পরে নিজের ঠিকানা খোঁজা। একটি বধ্যভূমির খবর দিয়ে চলে গেছে আক্কাস। আলমতারা তাকিয়ে থাকে। নিজের স্বামীর কথা ভেবে মনে করে, দেশের সব বধ্যভূমিই ওর ঠিকানা। ও খুঁজে খুঁজে যাবে সেসব ঠিকানায়, শুধু রাংতার বিল ওর ঠিকানা নয়।

দুই দিন পর মধ্যরাতে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে ধরে নিয়ে আসে দীপেন্দ্র, ময়েজ, খলিল আর রাজ্জাক। গেটের সামনে ওদের দেখে আলমতারা আঁতকে ওঠে।

—এত রাতে? কী হয়েছে?

—শয়তানটাকে ধরে এনেছি। এখন আপনার বাড়ির পেছনে নিয়ে যাব।

—যাও।

—আমার ক্ষতি করলে ভালো হবে না কিন্তু।

—ভালোর বাকি রেখেছেন কি আপনি? পাকিস্তানি সেনাদের দালালি করে রাত-দিন মানুষ মারেন। ঘরে আগুন লাগান।

—বেঈমানদের শাস্তি দেওয়া উচিত। আমার হাত বেঁধে রেখেছিস কেন? শয়তানরা, হাত ছেড়ে দে।

—এত সোজা না। আপনাকে বেড়ানোর জন্য আনিনি।

—তাহলে কেন এনেছিস?

—চলেন ঘরের পেছনে। বুঝবেন কেন এনেছি।

—ওরে শয়তানরা—আকবর আলী পা দাপিয়ে ওঠে।

চারজন শক্ত হাতে তাকে ধরে। হাত মুচড়ে যায়। মাথায় ঘুষি পড়ে। টানতে টানতে নিয়ে যায় বাড়ির পেছনে। জোছনার ম্লান আলো ছাড়া আর কোথাও কোনো আলো নাই। এমনকি প্রদীপও জ্বালানো হয় না। ঘর থেকে বেরিয়ে আসে নুরিতা। রান্নাঘরে গিয়ে বঁটি আনে। আলমতারা বারান্দার কোনায় রাখা দড়ির টুকরো তুলে নেয় হাতে। বাড়ির দরজা বন্ধ করে সবাই মিলে ঘরের পেছনের ডোবার ধারে আসে।

—এখানে এনেছিস কেন আমাকে?

—বুঝিস না, কেন? যত গুনা করেছিস, সেই গুনার শাস্তি দেওয়ার জন্য।

নিশ্চুপ হয়ে যায় আকবর আলী।

নুরিতা পেছন থেকে বঁটি দিয়ে পিঠে আঘাত করে। চেঁচিয়ে বলে, যুদ্ধ, যুদ্ধ। শয়তান মারছি, শয়তান।

আকবর আলী হুড়মুড়িয়ে পড়ে যায়।

নুরিতার হাত থেকে বঁটি নিয়ে মাথায় আঘাত করে দীপেন্দ্র। আলমতারা দা নিয়ে আসে। ময়েজের হাতে দা দিয়ে বলে, মার। আমি কুড়াল নিয়ে আসছি।

দা-বঁটির আঘাতে মাটিতে পড়ে যায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। ততক্ষণে কুড়াল নিয়ে এসে মাথায় আঘাত করলে দুই টুকরা হয়ে যায় মাথা। গলগলিয়ে রক্ত পড়ে ভিজে যায় ডোবার ধার। পুরো শরীর দড়ি দিয়ে বেঁধে ডোবায় ফেলে দিলে পানিতে তলিয়ে যায় লাশ।

—এখন এই রক্ত ধুয়ে ফেলতে হবে।

—দীপেন্দ্র চারদিকে তাকিয়ে বলে, আশপাশের বাড়ির লোকজন কেউ টের পায়নি বোধ হয়। কারণ কেউ বের হয়ে আসেনি। আমরা তাড়াতাড়ি রক্ত ধুয়ে সরে পড়তে চাই।

—যাই, বালতি নিয়ে আসি।

—শুধু একটা বালতি দিয়ে হবে না, আমাদের  হাঁড়ি-পাতিলও আনতে হবে। সবাই মিলে পানি তুলব আর ঝপাঝপ ঢালব।

নুরিতা দৌড়ে গিয়ে রান্নাঘর থেকে ভাতের হাঁড়ি নিয়ে আসে। রক্তের ওপর প্রথম পানি ও ঢালে। আলমতারা বালতি আনলে ময়েজ টেনে নিয়ে পানি তোলে। দীপেন্দ্র একটা নারকেলের বাটি কুড়িয়ে পায় ডোবার ধারে। ওইটুকু বাটি দিয়ে পানি তোলে আর ছড়ায়। অন্যরাও কুড়িয়ে পাওয়া ছোট কৌটা ব্যবহার করে। দ্রুত শেষ হয়ে যায়।

আলমতারা বলে, এখন এইটুকু কাজ থাক। সকালে উঠে আমি দেখব আর কিছু করতে হবে কি না। ভাগ্যিস লোকটার মুখটা তোমরা বেঁধে রেখেছিলে। না হলে ও চিৎকার করে পাড়া মাথায় তুলত।

—সে জন্যই তো ওকে ধরার পরে আমরা সঙ্গে সঙ্গে বাঁধি, যেন বাড়াবাড়ি করতে না পারে। চোখ আর মুখও বাঁধি। ও জানে না, ওকে কোথায় এনেছি।

—থাক, আর কথা না। এখন আমরা সরে পড়ি।

নুরিতা দুই হাত তুলে বলে, এই ডোবা আমরা শয়তানদের লাশ দিয়ে ভরাব। তারপর গোবর দেব। গোবর দিয়ে ঢাকব।

আলমতারা মেয়েকে বুকে টেনে বলে, ঘরে চল। এখন তোর ঘুম আসবে।

 —হ্যাঁ, ঘুম আসবে। আমি নাক ডেকে ঘুমাব।

—আমরা যাই।

সবাই দ্রুত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যায়। আজকে দীপেন্দ্রর সঙ্গে সাইকেল নাই। সবাই এক পথে যায় না। বিভিন্ন দিকে চলে যায়।

আলমতারা বাড়ির দরজা বন্ধ করে।

মেয়ের হাত ধরে ধরে ঢুকে ওকে বিছানায় শোয়ায়। বলে, ঘুম পাচ্ছে?

—হ্যাঁ, পাচ্ছে। ও কাত হয়ে দুই হাঁটু জড়ো করে বুকের কাছে। মধ্যরাত শেষ হয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ পর ভোর হবে। নুরিতা বিড়বিড়িয়ে বলে, সকালে উঠে ডোবার ধারে যাব।

—কী বলছিস, মা?

নুরিতা কথা বলে না।

—ঘুমিয়ে পড়, মা।

—আপনার ঘুম পাচ্ছে না?

—পাচ্ছে রে মা, এখনই ঘুম আসবে। আর কথা বলব না।

 ঘুমিয়ে পড়ে মা-মেয়ে।

 বেশ বেলায় ঘুম ভাঙে দুজনের।

নুরিতা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে, বাইরে রোদ ঝকঝক করছে, মা। বেড়ার ফাঁকফোকরের আলো আজকে অন্য রকম দেখাচ্ছে।

—চল, উঠি।

নুরিতা কথা না বলে লাফ দিয়ে চৌকি থেকে নামে। জানালা খুলে ডোবার দিকে তাকায়। দেখতে পায়, ঘাসে রক্তের রেশ নেই। পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলা ঘাস চকচক করছে। ডোবার পানি স্থির হয়ে আছে। ফেলে দেওয়া লাশের কোনো চিহ্ন নাই। ও মায়ের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে, আজকে আমরা যুদ্ধে জিতেছি। আমাদের বাড়িতে পতাকা উড়িয়ে দিই?

—না রে মা, পতাকা ওড়ালে রাজাকাররা আমাদের মারতে আসবে।

—তাহলে আমি ঘরে ওড়াব, মাগো। ওই কোনায় বেড়ার সঙ্গে লাগিয়ে রাখব। ঘরে কাউকে ঢুকতে দেব না। কেউ দেখবে না। টাঙাই, মাগো?

—আচ্ছা, টাঙা। কোথায় রেখেছিলি?

—আমার ব্যাগে। আমার কাছেই আছে।

নুরিতার পতাকাটি আগে যেভাবে লাঠির সঙ্গে বাঁধা ছিল, সেভাবেই আছে। স্কুলের বইয়ের ব্যাগ খুলে পতাকাটি ঘরের কোনায় বেড়ার সঙ্গে বেঁধে দেয়। আলমতারা দরজা খুললে একঝলক বাতাসের ধাক্কায় দুলে ওঠে পতাকা। পতাকায় হাত রেখে নুরিতা লাফাতে লাফাতে বলে, স্বাধীনতা, আমার স্বাধীনতা।

তখন বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় তিন-চারজন ছেলে। তারা আলমতারাকে জিজ্ঞেস করে, আমরা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানকে খুঁজছি। রাতে বাড়ি ফেরেননি। তিনি তো এই পথে আসা-যাওয়া করেন। আপনি তাঁকে দেখেছেন?

—না তো, আমি কেমন করে দেখব? পাকিস্তানি সেনারা তাকে মেরে ফেলেনি তো?

—খামোশ! এমন কথা বলবি না।

আলমতারা নিশ্চুপ ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে।

—মা, মাগো—বলতে বলতে বারান্দা থেকে লাফিয়ে নামে নুরিতা।

—বাহ্, মাইয়াটা তো খুব ফুটফুইট্যা—

—আপনারা কেন আসছেন?

—আমাদের চেয়ারম্যানকে দেখছিস?

—বুঝিস না চেয়ারম্যান কী?

নুরিতা মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে, না, বুঝি না।

—আয় আমাদের সঙ্গে। তোকে বোঝাব চেয়ারম্যান কী।

একজন শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে।

—না, না, আমি মাকে রেখে কোথাও যাব না। ছাড়েন, ছাড়েন আমাকে।

—দাপাদাপি করবি না। চুপ করে দাঁড়া। তোকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।

—কোথায় যাব?

—আর্মির ক্যাম্পে।

—কেন, কেন ওখানে যাব?

—গেলে বুঝবি, কেন তোকে দরকার।

—ওই শয়তানদের ওখানে আমি যাব না।

—একশবার যাবি। আয়।

ওকে টান দিলে আলমতারা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। চিৎকার করে বলে, আমার মেয়েটার সর্বনাশ করবেন না আপনারা।

—পাকিস্তান রক্ষা করার জন্য আমরা ওদের খুশি রাখতে চাই। আয়। আয় বলছি। নুরিতা মাকে জড়িয়ে ধরে রাখে।

চেঁচিয়ে বলে, আপনারা কি স্বাধীন দেশ চান না?

—মেয়েটা বেশ পাকনা দেখছি? আয়, ওকে হেঁচকা টান দিয়ে মায়ের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয়। আলমতারা ধরতে গেলে ছোরা উঁচু করে ধরে বলে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে কল্লা ফেলে দেব। সর, সরে যা, বেশ্যা মাগি।

—আসেন, যুদ্ধ করি। আমার কাছে দা-বঁটি-শাবল আছে।

—সাহস কত যে যুদ্ধের কথা বলে! এই, তোরা দুজনে মেয়েটাকে নিয়ে ক্যাম্পে যা। আমরা এই মাগিকে শায়েস্তা করব। রাংতার বিলে নিয়ে গিয়ে কুপিয়ে লাশ বানাব। আর এখন বাড়িটা পুড়বে। এটাই ওর শাস্তি। আমাদেরকে যুদ্ধের কথা শোনায়!

বাড়িতে আগুন লাগিয়ে আলমতারাকে টেনে নিয়ে যায় রাজাকাররা। পাকিস্তানি সেনার হাতে ধর্ষিত আলমতারা সেদিন স্বামীর মৃত্যু দেখেছে। আজকে ওর সামনে থেকে মেয়েকে নিয়ে গেল। গত রাতে একজনকে মেরে যুদ্ধের আনন্দ পেয়েছে। এখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সেই আনন্দই উপভোগ করে। দুঃখ একটাই, হাতে কিছু থাকলে এদের একটাকে মেরে শেষ করতে পারত। যদি পারত, তাহলে এটা হতো যুদ্ধদিনের গভীর আনন্দ। এমন ভাবনার মাঝে আলমতারার মাথা টলে ওঠে। ও পড়ে যায়। অন্যরা টানতে টানতে বলে, ঢং দেখাবি না, মাগি। উঠে দাঁড়া।

আলমতারা উঠে দাঁড়ায় না। ওরা সবাই মিলে ওকে জোর করে টেনে তোলে। আবার হাঁটতে শুরু করে আলমতারা। রাংতার বিলের কাছে এসে অবারিত সবুজ প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে বলে, ভালো থাকো আমার প্রিয় ভূমি। স্বাধীনতার শহীদদের বুকে নিয়ে তুমি আমাদের পুণ্যভূমি। জয় পুণ্যভূমি। জয় বাংলা।

—কী বললি? জয় বাংলা?

আলমতারা জয় বাংলা বলে চেঁচাতে থাকে। শব্দ ছড়াতে থাকে প্রান্তরজুড়ে।

একজন ছুরি দিয়ে ওকে কুপিয়ে বলে, মর, মর। তোর মেয়েও মরবে। এখানে এনে ফেলে যাব ওকে।

মাটিতে গড়িয়ে পড়ে আলমতারা। রক্তে রঙিন হয় রাংতার বিলের ভূমি।

ওকে ফেলে রেখে চলে যায় রাজাকার ছেলেরা। দুই দিন পরে ছেলেরা উলঙ্গ নুরিতাকে ফেলে যায় মায়ের লাশের পাশে। ওরা দুজনের লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলেনি। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা লাশের চারদিকে নেমে আসে শকুন। দুই দিন আগে আলমতারাকে খুবলাতে পারেনি। দুই দিনের মাথায় শরীর নরম হয়েছে। ঠোঁটের মাথায় উঠে আসে মাংস।

অন্যদিকে ধারালো ঠোঁটে খুবলে মাংস ওঠায় নুরিতার বালিকা শরীর থেকে। নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত হয়েছে শরীরের নানা অংশ। শকুনের দল নরম পেলব মাংসের টুকরো ঠোঁটে নিয়ে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠে। পাখা ঝাপটায়। ধুলো ওড়ায় বিলের শুকনা মাটি থেকে। এগিয়ে আসে গুটিকয় শিয়াল। শকুনের দলের ফাঁকে এগিয়ে যেতে পারে না। দূরে দাঁড়িয়ে থাকে।

বধ্যভূমিতে পড়ে থাকা মা-মেয়ের লাশ শহীদের আত্মার অমৃত পরশ পায়। কোথাও লাশের পচা গন্ধ নেই। মা-মেয়ের লাশ অমৃতের পরশ নিয়ে সুগন্ধি ছড়ায়।

বধ্যভূমিতে জোর ঝংকার ওঠে।

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর বলতে থাকে, স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে তারা জীবনদানকারী অমৃতের সন্তান। বধ্যভূমিতে অনবরত বইতে থাকবে বসন্ত বাতাস। একদিন এখানে তৈরি হবে শহীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ।

 

দুই দিন ধরে এলাকাজুড়ে গোলাগুলি ছুড়েছে সেনারা। জিপে ঘোরাফেরা করেছে। কিন্তু গুলিবর্ষণে হতাহত করতে পারেনি অনেককে। ওদের আসার খবর টের পেয়ে লোকজন সরে পড়েছে। আলমতারার বাড়ি পুড়তে দেখেও অনেকে সরে পড়েছে। তিন দিনের মাথায় এলাকা নীরব হয়।

দূর থেকে শকুনের ওড়াউড়ি দেখে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসে ডেনিস। কী হয়েছে ভেবে মাথা চক্কর দিতে থাকে। নিজে নিজে বলে, কাতনার বিল, তুই আর কত মানুষ বুকের মধ্যে টেনে নিবি? কাছাকাছি এসে দৌড়াতে শুরু করে।

ময়েজ আর দীপেন্দ্রও সরে থাকার পর বেরিয়ে আসে পাশের গ্রাম থেকে। দুজনে হাত ধরে দৌড়ায়। ওরা ধরে নেয়, আলমতারা আর নুরিতার লাশের ওপর উড়ছে শকুন। দুজন পাশাপাশি দৌড়াতে থাকে। দুই হাতে চোখের জল মোছে। আলমতারার বাড়ি পুড়িয়েছে। তাকে কি আর ছেড়ে দিয়েছে? দুজনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ঠিকমতো দম ফেলতে পারে না। তার পরও পায়ের গতি কমে না।

শকুনের ওড়াউড়ি দেখে সুবোধ বড়ুয়াও বিলের দিকে যেতে শুরু করে। বয়সী মানুষ বলে দ্রুত হাঁটতে পারে না। বুকে হাঁপ ধরে। তার পরও যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি এগোনোর চেষ্টা করে।

অল্পক্ষণে সবাই দেখতে পায়, চারদিক থেকে নারী-পুরুষ, শিশুরা আসছে। সবার আতঙ্ক শকুনের ওড়াউড়ি। কার মাংস ওরা ঠোঁটে তুলে নিচ্ছে? শোনা যায় অদৃশ্য কণ্ঠস্বর।

ডেনিস জিজ্ঞেস করে, তুমি কে কথা বলছ?

—আমি ইতিহাস। আমার পৃষ্ঠায় রচিত হবে যুদ্ধদিনের কথা।

—ইতিহাস, তুমি আমাদের সঙ্গে আছ জানি। আমরা তোমার কাছ থেকে জানব দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া আমাদের যুদ্ধদিনের কথা।

—যাও, তোমরা বিলের কাছে যাও। মাটির নিচে গেঁথে দাও মা-মেয়েকে।

সবাই এসে জড়ো হয় বিলের ধারে। টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে থাকা মা-মেয়েকে দেখে চোখের জলে ভিজে যায় সবাই। কেউ কেউ গণকবরের পাশের মাটি সরিয়ে গর্ত বের করে। অন্যরা লাশের টুকরো টুকরো অংশ কুড়িয়ে ভরে দেয় গর্তে। তারপর মাটিচাপা দেয়।

তখন ছুটে আসে আর্মির জিপ।

এত লোককে একসঙ্গে দেখে শুরু করে ব্রাশফায়ার। মেরে রেখে একসময় চলে যায়। পায়ে গুলি নিয়ে দীপেন্দ্র বেঁচে থাকে। ময়েজও গুলিবিদ্ধ হয়। কিন্তু মরে যায় না। নিঃশ্বাস ফেলে চারদিকে তাকায়। দেখতে পায়, রক্তের স্রোতে থইথই করছে ভূমি। দুজনে নিঃশ্বাস টেনে চোখ বুজে পড়ে থাকে। দীপেন্দ্র কাতর স্বরে বলে, আমরা উঠে দাঁড়াব। হেঁটে যাব।

—আমারও তা-ই মনে হচ্ছে। তুমি আর আমি গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে আছি। অন্যদের সাড়া নেই।

—হ্যাঁ, তোমরা বেঁচে গেছ।

—তুমি কে? কে কথা বলছ?

—আমি বসন্ত বাতাস। একদিন এই দেশ স্বাধীন হবে। আমি সেই স্বপ্ন নিয়ে উড়ে যাই সবখানে।

—বসন্ত বাতাস, তুমি এখন কোথায়?

—আমি সবখানে। আমি আছি দেশজুড়ে। পাকিস্তানি সেনারা লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়ে বধ্যভূমি তৈরি করেছে। হাজার হাজার শহরে-গ্রামে ওরা বধ্যভূমি বানিয়েছে। জীবনদানকারী মানুষের ঠিকানা একটা নয়।

—আমরা জানি। তোমাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ফুল দিয়ে ভরে দেব বধ্যভূমির মাটির পাটাতন। চিরনিদ্রায় তোমরা শান্তিতে থাকো শহীদরা। তোমাদের স্মরণে নির্মিত হবে স্তম্ভ।

তখন রাংতার বিলে ধ্বনিত হয় শত শহীদের কণ্ঠস্বর, আমাদের জন্য তোমরা কেঁদো না। আমাদের মৃত্যু মানে দেশের বসন্ত বাতাস। তোমরা উৎসব করবে। স্বাধীনতার উৎসব।

তাদের মৃত্যু স্বাধীনতার ফুল ফোটাবে। হাজার হাজার বছর ধরে বসন্ত বাতাসে ভরে থাকবে বধ্যভূমির বসুন্ধরা। আমরা গাদাগাদি-ঠাসাঠাসি করে জড়ো হয়ে আছি এখানে—আমাদের মৃত্যু মানে বসন্তের উৎসব দিন। বসন্তের বাতাস একটি ঋতুর বাতাস নয়। সারা বছর ধরে বসন্তের বাতাস বয়ে যাবে দেশজুড়ে।

 

—থামো, থামো। ওই দেখো কে আসছে? কে তুমি?

—আমি পৃথিবী।

—কেন এসেছ এখানে?

—বধ্যভূমির জয়গান গাইতে। বধ্যভূমিতে শেষ ঠিকানার মানুষদের অভিনন্দিত করব। তোমরা জীবন দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্ন ভরিয়ে তুলেছ। তোমাদের মৃত্যু পৃথিবীর মানুষের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশ।

—ওহ্, পৃথিবী! আমি রাংতার বিল আর ও কাতনার বিল। তোমারই একজন।

—হ্যাঁ, তা তো ঠিকই।

—পৃথিবী, তুমি কি সব সময় বধ্যভূমি দেখে বেড়াও?

—হ্যাঁ, দেখতে যাই। স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী মানুষের ঠিকানা দেখতে যাই। আমি অন্য জায়গায়ও যাই। আমার তো হাজার রকম জমিন দেখতে হয়। বন-বাদাড়, নদী, খাল-বিল, জলাভূমি, পাহাড়-পর্বত—

—বুঝেছি, বুঝেছি। দেখতে যাও জলপ্রপাত, হাওর, সাগর—

—হ্যাঁ, সব, সব।

—এই পৃথিবীর বুকে দেশের সীমানা টানা আছে। সব দেশই পৃথিবীর জমিন—

—তুমি এখন থেকে মনে রেখো, তোমার সামনের এই জমিন একসময় রাংতার বিল, কেতনার বিল নামে ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর আমাদের নাম হয়েছে বধ্যভূমি।

—তোমাদের গৌরব বেড়েছে। সে জন্যই আমি পৃথিবী তোমাদের দেখতে এসেছি। আমার বুকে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে। স্বাধীন দেশে আমি তোমাদের কাছে আবার আসব। আমি তোমাদের নিয়ে যাব বিশ্বের মানুষের সামনে।

—তোমাকে আমাদের ভালোবাসা, পৃথিবী। তুমি আমাদের বসন্ত বাতাসের শ্বাস টেনে যাও।

—আমি তোমাদের অভিনন্দন জানাচ্ছি, বধ্যভূমি। তোমরা যুদ্ধ করছ। তোমরা জীবন দিচ্ছ। নতুন রাষ্ট্র তোমাদের বঙ্গবন্ধুর অক্ষয় সাধনা। পূর্ণ করো সাধনার সৌরভ।

প্রবল বেগে ছুটে আসে বাতাস। ঝরা পাতা উড়ে যায় বাতাসের সঙ্গে। বিলের শান্ত জল আন্দোলিত হয়। ধানক্ষেতে মাথা দোলায় সবুজ শস্য।

পৃথিবী চলে যায়।

বধ্যভূমি পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে থাকে। শুনতে পায় পৃথিবীর কণ্ঠস্বর, তোমাদের গৌরবময় অর্জনের জন্য আবারও অভিনন্দন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা