kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

উ প ন্যা স

আইআইপি (ইন্টেলেকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন)

আন্দালিব রাশদী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১০০ মিনিটে



আইআইপি (ইন্টেলেকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন)

অঙ্কন : চঞ্চল

পনেরো মিনিট আগে আইরিন বলেছিল, স্যার, প্লিজ আরেকটু ওয়েট করুন, ওনলি টেন মিনিটস।

আমি তো এখানেই আছি। দশ কেন এক শ দশ মিনিট দেরি করতে হলেও আমার তেমন কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু নুরুর তাড়া আছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের লোকদের সঙ্গে ডিনার করবে। র‌্যাডিসনে। এখান থেকে র‌্যাডিসনে পৌঁছতে আঠারো কি কুড়ি মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। ভিআইপি হওয়ার পরও, পেছনে পুলিশের প্রটেকশন গাড়ি থাকার পরও, গাড়িতে সামনে গানম্যান থাকার পরও কখনো তাঁর এমনকি পৌনে দুই ঘণ্টাও লেগে গেছে। যখন জ্যাম লেগে যায়, গাড়ি-ঘোড়া-মন্ত্রী—সবাই অসহায়।

নুরু মানে নুরুল্লাহ। এ এস এম নুরুল্লাহ। আবু সাদাত মোহাম্মদ নুরুল্লাহ। আমাদের মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী। আমার ক্লাসমেট নুরু নয়। সেই নুরুকে আমরা ডাকতাম নুনু। আমার কথা শুনে কাশফিয়া হাসত। বলত, কী বললেন, নুনু? ধ্যাৎ, আপনারা কী যে! নুনু আবার মানুষের নাম হয় নাকি?

সে আমলে ক্লাসমেট হলেও মেয়েদের আপনি করে বলতে হতো। তুমি বললে কারো অভিযোগ করতে হতো না, যেকোনো শিক্ষক একবার তুমি শুনলেই সুয়োমটো অভিযোগ নিয়ে নিতেন। আমিই বলেছি, কী যে বলেন কাশফিয়া, আপনি কি একজন ওসিকেও মানুষ মনে করেন না? পার্বতীপুরের ওসির নাম সৈয়দ নুনু মিয়া।

আমার ক্লাসমেট নুরু স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের বড়কর্তা হয়েছিল, কাশফিয়াকেই বিয়ে করেছিল। কাশফিয়ার এটা দ্বিতীয় বিয়ে, নুরুর প্রথম। আমাদের কলেজজীবনের ফার্স্ব ইয়ারে যে পাঁচজন মেয়েকে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম, কাশফিয়া তাদের একজন। তার বাবা বাঙালি, কিন্তু মা ছিল পাঞ্জাবি। বাঙালি-পাঞ্জাবি মিশেলের কারণে লজ্জা একটু কম, এ জন্য নুনু কথাটা মুখে নিয়েছে। অন্য চারজনের একজনও উচ্চারণ করেনি।

পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিরা যখন স্বাধীন দেশে ফিরতে শুরু করে, নুরু আসবে আমরা নিশ্চিত ছিলাম, কিন্তু আসেনি। লাহোরে রয়ে গেছে। কাশফিয়াই তাকে আসতে দেয়নি।

আর আবু সাদাত মোহাম্মদ নুরুল্লাহ বহু বছর বেহেশতের প্রলোভনে দাড়ি কাটেনি। এই নুরুল্লাহর ভালো দিক হচ্ছে, লেগে থাকতে জানে। নুরুল্লাহ নির্লজ্জ প্রশংসাও করতে জানে। নুরুল্লাহ যখন মনে করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলছে, তার অল্পসংখ্যক দাড়িতে করতল উল্টো করে আঙুল চালায়।

আমাদের আইরিন একবার সোনালি চেইনের হাতঘড়ি, আরেকবার অ্যানড্রয়েড ফোনের ঘড়ি দেখে বলে, স্যার, ওনলি টেন মিনিটস।

আইরিন এগিয়ে এসে মন্ত্রীকে বলল, স্যার, আপনার সঙ্গে বিটিভি আর পিআইডির ক্যামেরাম্যান থাকে না?

থাকে, যখন অফিশিয়াল প্রগ্রাম থাকে। আজকেরটা তো আমার প্রগ্রাম নয়, তোমাদের প্রগ্রাম, আমি জিন্নাহ ভাইকে হ্যাপি বার্থডে বলতে এসেছি। কেক কখন কাটবে? তাড়াতাড়ি সেরে ফেলো। আমাকে আবার ছুটতে হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের হেড হাগুচি আরাইয়ামা দলবল নিয়ে এসেছেন। স্পেস রিসার্চের জন্য টাকা চেয়েছি। খুবই কিপটে। আমাকে খুব নসিহত করলেন, সেভিংস বাড়াতে হবে। আমিও ছাড়িনি। মুখের ওপর বলে দিলাম, আপনি ফাইভ স্টার হোটেলে না থেকে নবাবপুরের ঘিঞ্জি হোটেলে থাকুন, অনেক টাকা সেভ হবে। আরো কী বলেছি জানো, আপনাদের কারণে আমার খরচ আরো বেড়ে গেছে। আগে দাড়ি ছিল, এখন প্রতিদিন শেভ করতে হয়। শেভিং ফোম, রেজর, আফটার শেভ লোশন—এগুলো তো মাগনা আসে না।

নুরুল্লাহকে নিয়ে সমস্যা আছে, একটা বিষয় ধরিয়ে দিতে পারলেই হয়। অবিরাম বকবক করে যেতে পারে। এমন কোনো অনুষ্ঠান নেই, যেখানে দাড়ি কাটার গল্পটা বলে না।

নতুন সরকার গঠন করা হলে এ এস এম নুরুল্লাহ অর্থমন্ত্রী হবে—এটা জানাই ছিল। শপথ নেওয়ার দিন সকালে প্রেসিডেন্ট (তিনিও তখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেননি, পার্টিপ্রধান হিসেবে তিনিই যে প্রেসিডেন্ট হবেন—এটাও জানা) তাকে ফোন করে বললেন, নুরুল্লাহ, আপনাকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবির সঙ্গে বৈঠক করতে হবে, প্যারিস কনসোর্টিয়ামে ডোনারদের সঙ্গে বসতে হবে। জঙ্গিটঙ্গি এত বেড়ে গেছে, আপনার চেহারার কাউকে দেখলেই ওরা সন্দেহ করবে, ঠিকমতো টাকা-পয়সা ছাড়তে চাইবে না। বুঝতেই পারছেন আমি কী বলতে চাইছি।

নুরুল্লাহ তখন বলল, স্যার, আমার তো ঠিক অভ্যাস নেই। শেভটা কি সেলুনে গিয়ে করাব, না বাড়িতে নিজেই চেষ্টা করব? কোনটা ভালো হবে, স্যার?

প্রেসিডেন্ট বললেন, অভ্যাস না থাকলে নিজে কাটতে গিয়ে চামড়া ছিলে ফেলতে পারেন, কিংবা দু-এক দলা মাংসও উঠে আসতে পারে। সেলুনে না গিয়ে বরং নাপিতটাকে ডাকিয়ে আনুন না, ৫০ টাকা টিপস দিয়ে দেবেন।

নুরুল্লাহ হিসাব করে—৫০ টাকা শেভিং চার্জ, ৫০ টাকা টিপস। ৩৬৫ দিনই যদি এভাবে দাড়ি চাঁছতে হয়, বছরে ৩৬ হাজার ৫০০ টাকা, লিপ ইয়ার হলে আরো ১০০ টাকা বেশি। নুরুল্লাহর এটাই বড় গুণ। বলতে পারত, নবীজির সুন্নত আদায় করতে দাড়ি রেখেছি, কাটা যাবে না। বলেনি। স্যার কী চাইছেন সেটাই মুখ্য। কিন্তু মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর যখন পোর্টফোলিও বণ্টন করা হয়, তাকে অর্থ দেওয়া হলো না। নুরুল্লাহ পেল মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তার বন্ধুরা তাকে চটাতে চেষ্টা করে। বলে, বড় স্যারকে বল, অর্থ না দিলে শপথ নিবি না।

নুরুল্লাহ বলল, স্যার যদি দয়া করে তখনই রাজি হয়ে যান এবং বলেন, ঠিক আছে রেস্ট করুন, শপথ নেওয়ার দরকার নেই, তাহলে তো এটাও যাবে।

তখনই ফোনটা বাজে। রিংটোনটাতে রবীন্দ্রসংগীতের সুর—‘মম চিত্তে নিতি নৃত্যে, কে যে নাচে’। ফোনটা আইরিনের, মেরুন রঙের ফোন।

আইরিন ফিসফিস করে ফোনে কথা বলা শেষ করে সবাইকে আশ্বস্ত করল, এসে গেছেন। খুব কাছাকাছি, আর মাত্র আট কি দশ মিনিট। ওনলি।

নুরুল্লাহ জিজ্ঞেস করল, কে এসে গেছেন?

না, মানে এখনো আসেননি, তবে এসে যাবেন।

নুরুল্লাহ তখন বলল, তা তো বুঝলাম, কিন্তু কে? আর উই ওয়েটিং ফর গদো?

নুরুল্লাহ বুঝিয়ে দিল সে স্যামুয়েল বেকেটের বিখ্যাত নাটকটির নাম জানে, যদিও আমি জানি বইটার পাতা উল্টেও সে দেখেনি।

আইরিন বলল, সে জন্যই কেক কাটা দেরি হচ্ছে। স্যরি স্যার, আপনাকে দেরি করিয়ে দিলাম।

বিরক্ত হয়ে নুরুল্লাহ বলল, আরে ধ্যাৎ। আমি জানতে চাইছি কার জন্য দেরি হচ্ছে? আমার চেয়ে  সিনিয়র কোনো মন্ত্রী নাকি? আমার সিনিয়র তো মাত্র তিনজন—প্রেসিডেন্ট নিজে আর দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট। দুজনই অন্য দলের বড় নেতা ছিলেন, একজন ব্যারিস্টার, অন্যজন প্রিন্সিপাল। ব্যারিস্টার আবদুল গোফরান আর অধ্যক্ষ তমিজ উদ্দিন। একজনের হাতে ধর্ম মন্ত্রণালয়, আর অন্যজনের সমবায়। আমাদের প্রেসিডেন্ট স্যার জানেন কেমন করে ছোটখাটো মন্ত্রণালয় আর বড় বড় পদ দিয়ে অ্যাডজাস্ট করতে হয়। এভাবে তিনি বড় নেতাদের সাইজ করে রাখেন। দল ছেড়ে যাঁরা আমাদের দলে এসেছেন, সময় খারাপ দেখলে তাঁরা যে কেটে পড়বেন, এটা আমাদের প্রেসিডেন্ট বোঝেন। শুধু তাঁরাই কেন, সময় খারাপ হলে নিজের দলের লোকেরাও পাছা দেখাবে।

আমি বলি, নুরুল্লাহ, ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ, এসব শব্দ ব্যবহার করবে না।

বেশ, তাহলে বলি, নিজের দলের লোকেরাও নিতম্ব দেখাবে।

না, বলা যাবে না।

নুরুল্লাহ বলল, স্যারকে কি সম্মুখভাগ দেখানো ঠিক হবে?

আমি বললাম, সেটাও দেখানো যাবে না, বলাও যাবে না।

নুরুল্লাহ বলল, স্যার কিন্তু জানেন, বেঈমানদের নিয়ে তাঁর সংসার। তিনি টেনেটুনে যাঁকে একসময় ভাইস প্রেসিডেন্ট বানিয়েছিলেন, সময় একটু খারাপ টের পেয়ে তিনি স্যারকে ওটা দেখিয়েছেন।

আমি বললাম, ওটা বলা যাবে, কিন্তু ওটা কী বলা যাবে না।

 

 

দুই

আইরিন বলল, স্যার, ওনলি ফিউ মিনিটস। বিটিভির ক্যামেরাম্যান এসে পড়বে। পিআইডির ফটোগ্রাফারও তাঁর সঙ্গে একই গাড়িতে আছেন।

অন্য কয়েকটি চ্যানেলের ক্যামেরাও তো দেখলাম।

আইরিন বলল, স্যার, ঠিকই বলেছেন। জিন্নাহ স্যার মনে করেন বিটিভি আনবিটেবল। সব সরকারের আমলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনের আস্থা সবচেয়ে বেশি বিটিভির ওপর। স্যার তো পনেরো মিনিট আগেই বিটিভি খুলে বসে থাকেন।

মন্ত্রী বলল, তোমার স্টেটমেন্ট কারেক্ট, কিন্তু তুমি জানলে কেমন করে?

জিন্নাহ স্যার বলেছেন, সরকার যাঁরা চালান, তাঁরা গভীর মনোযোগ দিয়ে বিটিভি দেখে থাকেন।

মন্ত্রী বলল, জিন্নাহ ভাইয়ের অবজারভেশন খুব অ্যাকিউরেট। বিটিভির ডিজি জানেন, সরকারের কাজ নিয়ে মসকরা করলে চাকরি নট। সে জন্য দু-এক দিন পর পর তিনি নিজে আটটার সংবাদের স্ক্রিপ্ট চেয়ে বসেন। কোথাও কাভারেজের ঘাটতি মনে হলে আর্কাইভ থেকে ছবিটবি তুলে এনে পুষিয়ে দেন।

এবার আমি বলি, আইরিন, এই বয়সে কি আর ক্যামেরার জন্য অপেক্ষা করা উচিত? গেস্টরা অপেক্ষা করছেন।

আইরিন খানিকটা ধমকের স্বরে আমাকে বলল, তুমি এত বয়স বয়স করো কেন? বয়স আবার কী? এ তো কেবল, আই মিন, জাস্ট আ নাম্বার।

বয়স কেবল একটা সংখ্যা!

নুরুল্লাহ আইরিনের কথাটা পছন্দ করল। বলল, কী যেন তোমার নাম—কথাটা আবার বলো তো শুনি।

এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।

ইয়েস, এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।

স্যার, আমি আইরিন। আইরিন সুজাউদেদৗলা। স্যার, আপনি হয়তো আমার বাবাকে চিনতে পারেন—হাশিম সুজাউদেদৗলা। দৌলা গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন।

মন্ত্রী বলল, শাফিনাজ দৌলার হাজব্যান্ড।

এক্সাক্টলি। আপনি ঠিকই চিনেছেন, স্যার।

তিনি বললেন, ইয়েস, আই রিমেম্বার, শাফিনাজ তাঁর হাজব্যান্ডের জন্য অনেক স্যাক্রিফাইস করেছেন। তিনি না থাকলে তোমার বাবার ব্যবসা লাটে উঠত। স্যরি, তোমার সঙ্গে বলা ঠিক হচ্ছে না—শাফিনাজের কারণেই আমি সে আমলে তোমার বাবার একটা বড় ব্যাংকঋণ রিশিডিউল করিয়ে দিয়েছি। আমি তখন ওই ব্যাংকের চেয়ারম্যান। দেন শি ওয়াজ হেভিলি প্রেগন্যান্ট উইথ আ বেবি। সাত-আট মাস চলছে তখন।

জি স্যার, ওটাই আমাদের সবচেয়ে ছোট বোন নেহরিন। মাঝখানে শারমিন, আমি সবার বড়, আইরিন। স্যার, মা কেমন আছেন আপনি নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন—শি ইজ নাও হুইলচেয়ার বাউন্ড। কিছুটা মেমোরি লস হয়েছে।

মন্ত্রী বলল, আই নো, ইটস আ স্যাড স্টোরি। সুযোগ ও সময় পেলে আমি শাফিনাজের সঙ্গে দেখা করব।

স্যার, আপনি যাবেন!

হুইলচেয়ার বাউন্ড একজন নারীকে তো বলতে পারি না আপনি আসুন। সমস্যা একটাই, আমাদের অপজিশনের নিউজপেপারগুলো কাউকে না কাউকে আমার পেছনে লাগিয়েই রাখবে। আমার ফিজিক্যাল ক্যাপাবিলিটির কথা একটুও বিবেচনায় না নিয়ে একটা বক্স নিউজ করে দেবে : নুরুল্লাহ-শাফিনাজ অনৈতিক সম্পর্ক। আমাকে নিয়ে ফেইক নিউজ পাঠক বেশ খায়।

আইরিন বলে, নিউজ খায়!

নুরুল্লাহ জবাব দেয়, খায় এবং ভবিষ্যতে আরো খাওয়ার জন্য হাঁ করে থাকে।

আমি বললাম, তোমার মতো পতাকাধারী আরো অন্তত দুই ডজন তো আছে, মিডিয়ার কাছে তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। তোমার আছে, কারণ তুমি মহাকাশমন্ত্রী হলেও সাগরের অতলের খবর রাখো, তুমি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে রাখতে জানো। যেকোনো বিষয় নিয়ে তুমি যেভাবে মজা করতে পারো, প্রেসিডেন্ট সাহেব সেটা পছন্দ করেন।

নুরুল্লাহ বলল, মজা কোনটাকে বলছেন, ওটা তো ভাঁড়ামি।

আমি অবাক হয়ে বলি, ওটা যে ভাঁড়ামি, তুমি বোঝো?

কী যে বলেন!

 রাজসভায় একজন গোপাল ভাঁড় রাখতে হয় না, স্যার এখন পাবেন কোথায়? সবাই তো মোসাহেব। আকবর স্যার কিন্তু তাকে ছাড়েননি।

আকবর স্যার?

জি, বাদশাহ আকবর।

আইরিন আমাদের দুজনকেই বলল, আগে একটু কফি দিতে বলি?

নুরুল্লাহ বলল, অবশ্যই, ব্ল্যাক কফি।

 

স্টোরিটা আমিও জানি। এটা দুঃখের। হাশিম সুজাউদেদৗলার ছোট চাচা হাসান আবদুল্লাহর কাছ থেকে শোনা। হাসান ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে আমার ক্লাসমেট। হাশিমের শুভানুধ্যায়ীরাই তাকে প্ররোচিত করেছে—বউটাকে ব্যবসার কাজে লাগা। এত সুন্দর বউ ঘরে বসিয়ে রেখে লাভটা কী? বউ নিয়ে কেবল বিছানায় পড়ে থাকলে ব্যবসার লাল বাতি জ্বলবে।

মন্ত্রী বাকি অংশটা আমাকে শোনায়, হাশিম শাফিনাজকে নিয়ে বেরোতে শুরু করে। শাফিনাজকে জড়তামুক্ত হতে বলে। জোর দিয়ে বলে, পুরুষ মানুষের সঙ্গে শেইক হ্যান্ড করলে হাত পচে যায় না। অবশ্য তখন হাগ করার কালচার শুরু হয়নি। এভাবেই শাফিনাজ এগোয়। শাফিনাজ একটু বেশিই এগোয়। শাফিনাজকে দেখলে যাদের রক্তে দোলা লাগে, এমন দু-একজন তাঁকে এমনও পরামর্শ দেয়—নিজে ব্যবসা শুরু করুন, শুধু হাজব্যান্ডের ব্যবসা প্রমোট করলে নিজে তো আর দাঁড়াতে পারবেন না। তত দিনে শাফিনাজের চেনা মানুষের সংখ্যা হাশিম সুজাউদেদৗলার চেনাজানাদের ছাড়িয়ে যায়।

শাফিনাজ তৃতীয়বার গর্ভবতী হয়ে পড়লে শেয়ারবাজারে মার খাওয়া হাশিম বলেই ওঠে, তোমার পেটে কার বাচ্চা ঠিক করে বলো, এটা আমার নয়।

কী বললে? তুমি একটা ছোটলোক, ইতর!

ঝগড়া ক্রমেই বাড়তে থাকে। হাশিম চাপ দেয়, যাও, খালাস করিয়ে এসো।

শাফিনাজ বলে, ইমপসিবল।

হাশিম বলে, এটা আমার হুকুম। অর্ডার।

শাফিনাজ বলে, হু কেয়ারস? আমি না থাকলে বাড়িঘর সব ক্রোক হয়ে যেত। এমন একটা বাজে লোন রিশিডিউল করানোর তোমার বাবার কিংবা তার বাবারও সাধ্য ছিল না।

হাশিম বলে, সাবধান, বাবা তুলে বলবি না।

শাফিনাজও নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেরে বলল, তোর বাবার একগাদা কুকীর্তির কথা আমি জানি।

আর একটা কথা বললে গুলি করে দেব—বলেই হাশিম পিস্তলের ট্রিগারটা টিপে দিল, মুখ থুবড়ে পড়ে গেল শাফিনাজ। আর হাশিম সুজাউদেদৗলা বিড়বিড় করে বলল—পুলিশ আমার লোম ছিঁড়বে।

তারপর পিস্তলের নলটা নিজের মুখে ঢুকিয়ে ঊর্ধ্বমুখী করে ট্রিগার টিপতেই মাথার অর্ধেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গেল। কার্পেটে রক্ত ও মগজ। হাশিমের মৃত্যুটা নিশ্চিত, কিন্তু শাফিনাজের ব্যাপারটা অস্পষ্ট মনে হওয়ায় অ্যাম্বুল্যান্স ডেকে হাসপাতালে পাঠানো হলো, ডাক্তার নিশ্চিত হলেন গুলিটা শাফিনাজের শরীরের ভেতরের সংবেদনশীল অংশ পাশ কাটিয়ে বগলের কাছ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। তেমনি অক্ষত থাকে তাঁর গর্ভস্থ সন্তান। শাফিনাজের ঢের ভোগান্তি হলেও শেষ পর্যন্ত বেঁচে যান, যথাসময়ে তৃতীয় কন্যাসন্তান নেহরিনের জন্ম হয়। তত দিনে শাফিনাজ নারী উদ্যোক্তার সম্মাননা পান। দু-এক বছরের মধ্যে কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন—সিআইপি হয়ে যাওয়ার কথা। শাফিনাজ ইন্টারন্যাশনাল ওমেনস চেম্বারের ইস্তাম্বুল সামিটে তিন সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গেও ছিলেন। দলনেত্রী ফারকুন্দা মাহতাব তাঁর সৌন্দর্যের প্রশংসাই করেছেন, বলেছেন তিন বাচ্চার মা মনেই হয় না। তবে সাবধান, প্রেসিডেন্ট সাহেবের সামনে পোড়ো না যেন। তিনি আবার সৌন্দর্যের এক নম্বর ভক্ত।

চেম্বারের প্রেসিডেন্ট না দেশের প্রেসিডেন্ট, কার কথা যে বলেছেন ফারকুন্দা মাহতাব খোলাসা করেননি।

আইরিন ও শারমিনের দেহকাঠামো, চোখ, চুলের সাজ প্রায় একই রকম। নেহরিন একটু ভিন্ন কাঠামোর—চুল কোঁকড়ানো, বাঁ চোখ লক্ষ্মীট্যারা। হাশিম সুজাউদেদৗলার মৃত্যুর পর নেহরিনের সম্ভাব্য পিতা হিসেবে দুজনের নাম উঠে এসেছিল—সরকারের ব্যাংকিং ডিভিশনের সেক্রেটারি এসরার ইকবাল আহমেদ, আরেকটি সরকারি ব্যাংকের এমডি হাকিম মোহাম্মদ রওশনুল হক। কিন্তু তাঁদের কারোরই মাথায় কোঁকড়া চুল নেই। তাহলে অন্য কেউ? শাফিনাজের পক্ষে দাঁড়ায় তাঁর দেবর নাসিম সুজাউদেদৗলা। নাসিম তার মেজো ফুফু রোকাইয়া বেগমের ছবি দেখিয়ে বলে, দেখুন, আমার ফুফুরও তো কোঁকড়া চুল। নেহরিন আমার বড় ভাইয়েরই মেয়ে।

নাসিমের দিন-রাতের সেবা এবং বড় ভাইয়ের তিন মেয়েকে চোখে চোখে রাখা শাফিনাজকে মুগ্ধ করে।

নাসিম ভাবিকে বিয়ে করতে চেয়েছে, শাফিনাজই সরে এসেছেন। বলেছেন, বোকা ছেলে, তুমি কেন বুকে গুলি খাওয়া তিন বাচ্চার মাকে বিয়ে করবে? বাজারে আমাকে নিয়ে কত কলঙ্ককথা, এসব কি তোমার গায়েও লাগছে না? গণ্ডারের চামড়া নাকি?

মহাকাশমন্ত্রী এ এস এম নুরুল্লাহ বলল, এবার আমার কাছ থেকে একটু সরে গিয়ে আইরিনকে বলল, কথাটা আগেও শুনেছি, এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার। কিন্তু তোমার মুখে শোনার পর আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, বয়স কোনো ব্যাপার নয়, কেবল একটা সংখ্যা মাত্র। আঠারো যা, একাশিও তা-ই। আটান্ন যা, পঁচাশিও তা-ই।

মহাকাশমন্ত্রী এ এস এম নুরুল্লাহ আমার পাঁচ বছর পর ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেছে। খুব ভালো রেজাল্ট করেছিল, জেলায় হাইয়েস্ট, আমাদের জেলা সমাচার পত্রিকায় কৃতী ছাত্র কলামে তার ছবি ছাপা হয়েছিল, একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারও। বলেছে, বাবা মাদরাসায় দিতে চেয়েছিলেন, মা-ই ঝগড়া-ফ্যাসাদ করে তাকে স্কুলে ধরে রেখেছেন, সে জন্য কৃতজ্ঞতা মায়ের কাছেই। নুরুল্লাহ বলেছিল, সে ডাক্তার হয়ে বিনা পয়সায় দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা করতে চায়।

নুরুল্লাহ বছরখানেক আগে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে আশিতম জন্মবার্ষিকী পালন করল। তার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আমাকে দুই মিনিট বলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, মহাকাশমন্ত্রীর পদটির ওপর যাঁর চোখ পড়ে আছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ অন্তত নুরুল্লাহর মৃত্যু কামনা করবেন না—এটা আমি নিশ্চিত। আমরা নুরুল্লাহর সেঞ্চুরি দেখতে চাই। এক শ বছর বয়সে সে নিশ্চয়ই মন্ত্রী পদে থাকতে চাইবে না। তখন আমি না থাকলেও আপনারা সবাই তাকে আরো বেশি সময় পাবেন। নুরুল্লাহ ফিরে যাবে তার কলেজজীবনের আচরণে, গোপাল ভাঁড়ের মতো আসর জমিয়ে রাখবে। আমি নিজেকে বাদ রাখলাম, কারণ এমনিতেই আমি তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়। আপনারা নিশ্চয়ই তত দিন আমাকে সহ্য করতে চাইবেন না। তা ছাড়া আমার জায়গাটিতে আসার জন্য মুখিয়ে আছেন অন্তত আধডজন বুদ্ধিজীবী। তাঁদেরও তো জায়গা করে দিতে হবে।

তারপর বিড়বিড় করে বলি, যদিও তাদের কেউই বুদ্ধিবৃত্তিতে আমার হাঁটুর কাছেও আসতে পারবে না।

কথাটা এতই আস্তে বলেছি যে আমিই কেবল শুনেছি, অন্য কেউ নয়।

এই আধডজন বুদ্ধিজীবীর একজন এখনো বলেন, বাংলাদেশ সাউথ-ইস্ট এশিয়ার একটি দেশ, একজনের পিএইচডি থিসিস পুরোটাই চুরি করে লেখা এবং তিনি আলবেয়র কামুকে বলেন আলবার্ট ক্যামাস, একজন নারী নির্যাতন মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি। বাকি তিনজনের একজনের স্বামী ব্যাংক লুটে জড়িত ছিলেন আর তিনি নিজে ঘোড়ার মতো চিঁহিচিঁহি শব্দে মনের ভাব প্রকাশ করেন। একজনের স্ত্রী তাঁর একজন ছাত্রের সঙ্গে ভেগে গেছেন এবং তাঁর যৌন অক্ষমতার কথা জনে জনে বলেছেন। অবশিষ্টজন নিতান্তই গোবেচারা, অপজিশনের সাবেক হুইপের বেয়াই।

আমার পর আমি দেখছি কেবলই খাঁ খাঁ শূন্যতা।

 

তিন

বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে যত বড় বড় কথা বলা হোক না কেন, আমি নব্বই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে এটা জোর দিয়েই বলতে পারি—ঝুঁকি কিংবা বিপদ আঁচ করার সঙ্গে সঙ্গে যাঁরা বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের মাথাটা কাছিমের মতো টেনে শক্ত খোলের নিরাপদ আস্তরণের ভেতর নিয়ে আসতে পারেন, তাঁরাই প্রকৃত বুদ্ধিজীবী।

কখন মুখ খুলতে হবে, কতটুকু খুলতে হবে এবং কখন মাথাটা টেনে খোলের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলতে হবে, এটা বোঝা ও চর্চা করতে পারার মধ্যেই বুদ্ধিজীবীর সাফল্য লুকিয়ে আছে। আমি তা বুঝি এবং চর্চা করি। এ জন্যই আমার এত কদর।

পটপরিবর্তনকারী একজন তো রীতিমতো আমার শালা। লুত্ফুন্নেসা বেগমের আপন ফুফাতো ভাই। আমাকে বলেছেও, দুলাভাই, উপদেষ্টা হতে চাইলে বলেন, উপদেষ্টা আর মন্ত্রী একই কথা। আপনি রাজি থাকলে নেক্সট রিশাফলিংয়ের সময় যে তিনটাকে ছেঁটে ফেলব, তাদের যেকোনো একটার পোর্টফোলিও আপনি পেতে পারেন।

লুত্ফুন নেই অনেক বছর। কিন্তু তার দিককার আত্মীয়দের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। আমি যোগাযোগ ছিন্ন করার মানুষ নই, কে কখন কাজে লাগে!

তা ছাড়া লুত্ফুনের ছোট বোন খাইরুন তো ভোলার মতো নারী নয়, আমাকে নিয়ে লুত্ফুনের উদ্বেগের বড় কারণ তার এই আদুরে বোনটি। স্বামীর মৃত্যুর পর খাইরুন পরলোকের চিন্তায় এতটাই বিভোর থাকে যে নিজেকেই আমার প্রত্যাহার করে নিতে হয়।

রবীন্দ্রনাথের মতো কোনো এক প্রশান্ত মহলানবিশকে প্রাইভেট সেক্রেটারি রাখার মতো টাকা আমার ছিল না, আমি নিজেকেই আমার অবৈতনিক প্রাইভেট সেক্রেটারি নিয়োগ করেছি। তাকে দিয়ে চিঠি লেখাই, জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই, কারো সাফল্যে অভিনন্দনবার্তা পাঠাই। এতে আমার সম্পর্কজালের বিস্তার ঘটে।

লুত্ফুন্নেসা বেগমের ফুফাতো ভাই আরো বলল, লুত্ফুন আপা আমাদের ফ্যামিলির জন্য অনেক করেছেন। খুব ভালো সেলাইয়ের কাজ জানতেন। আমার তিন বোনকে ঈদের সময় একই ডিজাইনের কামিজ বানিয়ে দিয়েছেন। সাদা উলের স্লিভলেস সোয়েটার বানিয়ে দিয়েছেন আমাকে। সেই সোয়েটার পরে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসের দুই বছর ক্রিকেট খেলেছি। আপার ঋণ শোধ করার তো আর কোনো উপায় দেখছি না। আপনি যদি উপদেষ্টা হতে রাজি হন, তবু ভাবব একটু তো শোধ করলাম।

আমি তখনই রাজি হইনি। তাকেও এ কথাটা বলেছি, দ্যাটস নট মাই কাপ অব টি।

বুদ্ধিজীবী পরিচয়টা ধরে রাখার জন্য এটুকু স্যাক্রিফাইস তো করতেই হবে। তার পরও বিষয়টা আমার স্ত্রী দিলশাদের কানে দিলাম।

বলল, ঠিকই করেছ, পুরনো শ্বশুরবাড়ি, তাদের কাছ থেকে কিছু না নেওয়াই ভালো। যাকে দিয়ে সম্পর্ক সে-ই যদি না থাকল, অন্যরা তো হিসাবেই আসে না। তা ছাড়া তুমি তো আর চাকরি থেকে রিটায়ার করা সরকারি কবিদের মতো নও, চেয়ার থেকে আউট, লেখা ছাপাও বন্ধ, তাঁদের হাতে অঢেল সময়, এবাড়ি-ওবাড়ি ঘুরতে পারেন। আমার বড় দুলাভাই সরকারের সেক্রেটারি ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পর গুরুত্ব কমে যাওয়ায় ডিপ্রেশনে ভুগতে শুরু করেন, ঘর থেকে বেরিয়ে পারতপক্ষে কোথাও না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আমার আপাই তাঁকে ঠেলে ঠেলে এবাড়ি-ওবাড়ি পাঠাতে থাকেন, তাহলে ডিপ্রেশন কাটবে। নতুন করে বাইরে যেতে যেতে অবস্থাটা এমন দাঁড়াল, একবার টানা পাঁচ দিনই বাড়ির বাইরে। আপাকে বলেছেন, বন্ধুদের সঙ্গে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিনস ঘুরছেন। জায়গার নাম ভুল বলেননি, সঙ্গে কোনো বন্ধু ছিল না, ছিল বড় আপার নতুন সতিন, তুমি তো চেনোই, ওই যে টিভিতে খবর পড়ত—আনিকা নুরুদ্দিন। ডিপ্রেশন এখন শিফট করেছে আপার ওপর। তোমার তো সারা দিনই কাজ, তোমাকে সব অনুষ্ঠানেই ডাকে। তোমার এসবের সময় কোথায়? না বলে দিয়ে খুব ভালো করেছ।

কিন্তু মাঝরাতে দিলশাদ আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে বলল, শোনো, তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

আমি চোখ কচলাতে কচলাতে বলি, এত রাতে?

দিলশাদ বলল, ব্যাপারটা নিয়ে আমি অনেকক্ষণ ধরে ভাবলাম। তোমার আগের বউ লুত্ফুন্নেসা যখন বেঁচে নেই, তার ফুফাতো ভাই আর আমার ফুফাতো ভাই তো একই কথা। তিনি যখন ঋণ শোধ করার একটা সুযোগ চাইছেন, সেই সুযোগটা তোমার দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। আচ্ছা, উপদেষ্টা হলে কি গাড়িতে ফ্ল্যাগ থাকবে?

থাকার তো কথা।

গানম্যান থাকবে?

থাকার তো কথা।

পুলিশের প্রটেকশন কার?

থাকার তো কথা।

বাসা কোথায় হবে? মিন্টো রোডের বাংলোতে, না বেইলি রোডের মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে?

কে জানে।

ফরেন ট্যুর থাকবে না?

থাকার তো কথা।

তোমার কাজের চাপ অনেক বেড়ে যাবে, আই অ্যাম স্যরি।

এই বয়সে এ ধরনের চাপ নিতে পারব না। তা ছাড়া আমার ব্যাকপেইন।

ব্যাকপেইন তো সমস্যা নয়। ফিজিওথেরাপিস্ট সাত দিনেই সারিয়ে দেবে। আর বয়সের কথা বলছ? শোনো জিন্নাহ, মানুষের জীবনে সুযোগ দুবার আসে না।

আমি চুপ করে থাকি।

দিলশাদ বিছানা থেকে নেমে সুইচ টেপে, মধ্যরাতে আমাদের অন্ধকার শোবার ঘর আলোকিত হয়ে ওঠে। আমি তবু চুপ।

একটু কড়া স্বরে দিলশাদ বলে, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?

ঘরের বাইরে যত তর্কবিতর্ক করি না কেন, ঘরের ভেতর আমি পারতপক্ষে মুখ খুলি না। যেকোনো কথা দাম্পত্য শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আমি এমনিতেই শান্তিকামী মানুষ। শান্তিকামী মানুষ কখনো বিপ্লবী হয়ে উঠতে পারে না। আমিও পারিনি।

দিলশাদ তার ম্যানিকিউর করা হাতের নখ দিয়ে পিঠে খোঁচা মেরে বলল, আচ্ছা জিন্নাহ, তোমার শালা কথাটা ঠিক কোন ভাষায় বলেছেন, বলো তো শুনি।

আমাকে চোখ খুলতে হয়। বলি, বাংলায়। তবে কথার মধ্যে নোয়াখালীর অ্যাকসেন্ট ছিল ফোরটিফাইভ পার্সেন্ট। ওদের অরিজিন তো সেখানেই।

দিলশাদ বলল, আমি তা জিজ্ঞেস করিনি। আমি তোমার কাছে জানতে চেয়েছি, তিনি যা বলেছেন, তা কি কথার কথা?

না, মানে কথার কথা হতে যাবে কেন?

তার মানে তুমি বলছ, তিনি আন্তরিকভাবে এই কথাটা বলেছেন?

কোন কথাটা?

আরে একটু আগেই যে বললে ঋণ শোধ করতে চাইছেন, তোমাকে নেক্সট রিশাফলিংয়ের সময় মন্ত্রী করতে চান।

মন্ত্রী না, উপদেষ্টা। অবশ্য একই কথা। আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি ছিল বলে তো মনে হয় না।

দিলশাদ বলল, বেশ, মেনে নিলাম আন্তরিকভাবেই কথাগুলো বলেছেন। কিন্তু যখন তোমাকে কথাগুলো বলেন, তখন কি তিনি ড্রাংক ছিলেন, না সোবার?

ও তখন ড্রিংক করা অবস্থায় ছিল এমন মনে হয়নি কিংবা আগেও তেমন ড্রিংক করত এমনটা আমি শুনিনি। কিন্তু তুমি এসব কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?

কেন জিজ্ঞেস করছি—যদি ড্রাংক অবস্থায় বলে থাকেন তাহলে যত আন্তরিকভাবেই বলুন, ঘোর কেটে যাওয়ার পর কী বলেছেন তা মনে থাকার কথা নয়। পেটে যখন ঠিকমতো মাল পড়ত, কাজী কামরুদ্দিন আমার দুই পায়ের পাতায় চুমো খেত আর দুহাতে পা দুটো আঁকড়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদত আর বলত, আমি একটা অমানুষ। আমাকে ক্ষমা করো দিলু, তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। ঘোর কেটে যাওয়ার পর আমাকে দেখলে চেঁচিয়ে উঠত, হারামজাদি, আমার বাড়িতে তোর কী কাজ? গায়ে হাত তুলত। সে জন্য আমি চাইতাম যত ইচ্ছা ড্রিংক করুক, তাহলে অন্তত আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। বেশ, তুমি যখন বলছ, মেনে নিলাম তোমার সাবেক শালা তখন ড্রাংক ছিলেন না। তার মানে তোমাকে যে রিকোয়েস্ট করেছেন, এটা তাঁর এখনো মনে আছে। তাহলে তো হয়েই গেল। আমার একটা কথা শোনো, আমি বেইলি রোডে মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্টে যেতে চাই না। ওটার স্ট্যাটাস কম। মিন্টো রোডে গাছগাছালি আছে এমন একটা বাড়ি নিয়ো। এখানে কোকিলের ডাক শোনা যায়।

আচ্ছা।

আরেকটা কথা, কোনো মেয়েমানুষ...থাক, এই কথাটা পরে বলব।

আমি বললাম, আমার তো সিকিভাগ ঘুমও হয়নি। বাতিটা নিভিয়ে দাও। ঘুম না হলে দেখছই তো আমার ব্লাড প্রেসার খুব ফ্ল্যাকচুয়েট করে। দিনটা খুব অস্বস্তিতে কাটে।

 

 

চার

কাজী কামরুদ্দিনের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি। ছবি দেখেছি। সুদর্শন এই মানুষটি দেখতে বাংলা সিনেমার নায়ক সৌমিত্র চ্যাটার্জির মতো। দিলশাদের প্রথম হাজব্যান্ড। লিভার সিরোসিসে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি হাসপাতালে মারা গেছেন। ডেড বডি বাংলাদেশে আনা হয়নি। ওখানকার রিভারসাইড মুসলিম গ্রেইভইয়ার্ডে সমাহিত করা হয়েছে। দিলশাদ একা ফিরেছে। কাজী কামরুদ্দিন আমার চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড় ছিলেন। দিলশাদের সঙ্গে আমার বয়সের ব্যবধান এগারো বছর। কাজী কামরুদ্দিনের সঙ্গে দিলশাদের পনেরো কি ষোলো। দেশে ফেরার পর কাজী কামরুদ্দিনের প্রথম পক্ষের দুই ছেলে তাদের নতুন মা ও সেবানকে একটিমাত্র অ্যাপার্টমেন্ট দিয়ে বন্দুকের মুখে বাকি সব লিখিয়ে নিয়েছে। দিলশাদ মুখ খুলতে যাচ্ছিল, দুই ভাই বলল, তাহলে সাড়ে চার বছর বয়সী নাজিবাহকে তুলে নিয়ে ইটখোলার ফার্নেসে ছুড়ে মারবে আর দিলশাদকে ঘাড় ধরে বের করে দেবে। দিলশাদ জানে, ওরা এটাই করবে।

কাজী কামরুদ্দিনের বড় ছেলে কাজী নজরুল কয়েক দিন আগেও জেলে ছিল, জামিনে আছে। এফডিসির একজন এক্সট্রা তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা দিয়েছে।

দিলশাদ বেডরুমের আলো নিভিয়ে দিয়েছে। আমি তখনো চোখ বন্ধ করিনি। অন্ধকারে দিলশাদ আমার চোখের আলো দেখে থাকতে পারে। সে জন্যই ধমকে ওঠে, ঘুমাচ্ছ না কেন। কাল তো তোমার প্রেসার ওঠানামা করবে। তখন তো মেজাজও খারাপ করবে।

ঘুমটা লেগে আসছিল, এমন সময় দিলশাদ বলল, তুমি মিনিস্টার কিংবা অ্যাডভাইজার হলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে নাজিবাহ। বড় গলায় সবাইকে বলবে, আমার বাবার গাড়িতে ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ থাকে। পিস্তলওয়ালা বডিগার্ড থাকে। আমার কোনো চাওয়া নেই। তুমি আমার কাছে সব সময়ই বড়, এমনকি মন্ত্রী কি অ্যাডভাইজার—ওসব না হলেও। শুধু একটা অনুরোধ, কোনো মহিলাকে তোমার পিএস বা এপিএস বা পিএ পদে বসাতে যেয়ো না। বোঝোই তো তুমি লাইমলাইটে থাকলে তোমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুরাই তোমাকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল রটাতে থাকবে। তোমার বুদ্ধিজীবী বন্ধুগুলো তো পর পর তিনটা সেনটেন্স ইংলিশে বলতে গিয়ে হাঁপানি রোগীর মতো হাঁপিয়ে ওঠে। কিন্তু বাংলায় তোমার নিন্দা করার সময় তাদের এনার্জির কোনো ঘাটতি হবে না। নিন্দার ডিকশনারি তাদের মুখস্থ।

 

আমি পাশ ফিরে শুই। দিলশাদ আমার পিঠে হাত ঘষতে ঘষতে জিজ্ঞেস করে, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? তাহলে থাক।

আমি নিশ্চুপ থাকি।

তার পরও দিলশাদ বলে, শপথ অনুষ্ঠানে কী পরবে? স্যুট না পাজামা-পাঞ্জাবি?

এরপর দিলশাদ কী বলেছে আমি সত্যিই শুনিনি। সম্ভবত ঘুমিয়েই পড়েছিলাম।

যখন ঘুম ভাঙে, সকাল ১০টা ছাড়িয়ে গেছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কম ডোজের একটা ট্যাবলেট বহু বছর ধরে খেয়ে আসছি, সঙ্গে রক্ত পাতলা হওয়ার এবং মন্দ প্রকৃতির কোলেস্টেরল ঠেকানোর দুটি ট্যাবলেটও। গত রাতে এতবার প্রেসার ফ্ল্যাকচুয়েশনের কথা বললেও দেখছি সাইড টেবিলে স্ট্রিপখোলা সাদা রঙের তিনটি ট্যাবলেট। তার মানে খাওয়ার জন্য খুলেছিলাম ঠিকই, নিশ্চয় ভুলে গেছি। বাসিমুখে তিনটি ট্যাবলেট দিয়ে দিন শুরু করি। ভয়ে আছি, দিলশাদ না আমাকে সেই প্রতাপশালী শালার সঙ্গে কথা বলতে এখনই বাধ্য করে। আমি ইতস্তত করলে দিলশাদ নিজেই বলবে, জি ভাই, ও রাজি। ভালো মিনিস্ট্রি দেবেন কিন্তু। ওর মতো এমন একটা মানুষ আপনাদের ক্যাবিনেটে নেই।

চাওয়া-পাওয়ার অনেক কথা দিলশাদ নির্দ্বিধায় বলে ফেলতে পারে। কেউ কিছু মনে করলে তার কিছু যায়-আসে না। এমনকি আমার সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কটাও তার সরাসরি কথার ওপর ভিত্তি করেই। বলেছে, আমার জন্য ফাও সহানুভূতি আর কত দেখাবেন, তার চেয়ে আমাকে বিয়ে করে ফেলুন।

আমি বললাম, থ্যাংক ইউ, আমি বলতে সাহস পাচ্ছিলাম না।

ঘুম ভেঙেছিল দেরিতেই, দিলশাদ নিশ্চয়ই টেবিলে নাশতা রেখে গেছে। উঠে গিয়ে দেখলাম নেই, নাশতা টেবিলে নেই। ডাইনিং টেবিলে একটা চিরকুট : জরুরি কাজে বেরোতে হচ্ছে। রাতের কথাগুলো ভুলে যেয়ো না, সুযোগ বারবার আসে না।

আরো প্রায় দেড় ঘণ্টা পর দিলশাদের ফোন— শোনো, একটা খারাপ খবর আছে। ডাওহিল স্কুল থেকে হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট চুমকি আগরওয়ালা ফোন করেছিলেন। বললেন, স্কেটিং করতে গিয়ে নাজিবাহ অ্যাক্সিডেন্ট করেছে, ডান পায়ের ঊরুর হাড়ে মাল্টিপল ফ্র্যাকচার। কার্শিয়াংয়ে চিকিৎসা না করিয়ে অন্তত কলকাতায় নেওয়া উচিত। আমার ইন্ডিয়ান মাল্টিপল ভিসা ছিল। জেট এয়ারের একটা টিকিট পেয়ে গেছি। আমি চললাম। টাকা-পয়সা রেডি রেখো, লাগতে পারে। সুবহানি হুজুরকে এক হাজার টাকা দিয়ে মেয়েটার জন্য কোরআন খতম দিয়ে একটু দোয়া-দরুদ করতে বোলো।

আমি শুধু বললাম, সো স্যাড।

এরপর দিলশাদ নাজিবাহকে নিয়ে কলকাতায় সেরা অর্থোপেডিক হাসপাতালে। আমার সঙ্গে সরকার পাল্টে দেওয়া সেই শালাটির দেখা হয়েছে, কিন্তু আমাকে যে উপদেষ্টা করতে চায়, এ কথা দ্বিতীয়বার আর বলেনি।

আমিই গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলাম, নতুন উপদেষ্টা নেওয়ার কী হলো?

আমার কথার জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করল, দুলাভাই, আপনার কি একবার হার্টের বাইপাস সার্জারি করাতে হয়েছিল?

বাইপাস? আমার! না তো।

তাহলে বোধ হয় অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। তা দেশের অবস্থা কেমন বুঝছেন? মানুষ তো আমাদের অ্যাকসেপ্ট করে নিয়েছে।

অবশ্যই, মানুষের তো কোনো সেকেন্ড চয়েস নেই।

তবে দুলাভাই, আমরা চাই ডেমোক্রেটিক ভ্যালুজগুলো যেন অক্ষত থাকে।

আমি জানি, আপনি হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট। ইউ আর অলসো আ লিডিং ইন্টেলেকচুয়াল অব দ্য কান্ট্রি। আমাদের সব সময় গাইড করবেন কিন্তু।

তিন মাস পর যখন আবার দেখা হলো, বলল, খুব ব্যস্ত। পরে কথা হবে। দুলাভাই, আসবেন কিন্তু। তার প্রায় প্রতিটি বাক্যই শেষ হয় কিন্তু দিয়ে।

এর মধ্যে অধ্যাপক হাসান জামান খান আমাকে নিয়ে যে বইটি লিখেছেন, তাতে আমার সম্পর্কে বলেছেন : মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যখন উপদেষ্টা কিংবা মন্ত্রীর পদে যোগদান করার জন্য চাপাচাপি করা হয়, তিনি মুখের ওপর বলে দেন, আমি পদের জন্য লালায়িত নই। আমি যে কাজ করে থাকি, তা যেকোনো মন্ত্রীর কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এই তথ্যের জোগানদাতা দিলশাদের বড় বোন শামশাদ বানু। এসব কথা হাসান জামান খানকে শামশাদই বলেছে।

 

 

পাঁচ

আমাদের মন্ত্রী খুব অস্থির হয়ে উঠেছে। তা ছাড়া এমনিতেও তো অস্থির প্রকৃতির মানুষ।

বহু বছর আগের ভিনটেজ ক্যামেরা কাঁধে পিআইডির ক্যামেরাম্যান ইকবাল ঘরে ঢুকতেই আইরিন চেঁচিয়ে উঠল, স্যার, বিটিভি এসে গেছে। পিআইডির ক্যামেরাম্যানের পেছন পেছন বিটিভির ক্যামেরাম্যান ঢুকেই তার হাতের ফ্লাশগান টিপে রুমটা আলোকিত করে ফেলল এবং বলল, দেরি হয়ে গেছে। কেক কোথায়? কী কেক? ভ্যানিলা না চকোলেট? আমি আবার ভ্যানিলাটা পছন্দ করি না। আইরিন এবং কয়েকজন শিল্পী হ্যাপি বার্থডে টু ইউ গাইতে শুরু করল, সুর আসুক বা না আসুক, মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রীও তাঁর খড়খড়ে গলা মেলালেন। বেশ লম্বাটে একটা ছুরি আমি কেকের ভেতর বসাতে যাচ্ছি, অমনি বিটিভিসহ বেশ কয়েকটি চ্যানেলের ক্যামেরার আলো জ্বলে ওঠে। আমার এক পাশে মন্ত্রী, এক পাশে আইরিন।

কেকের ভেতর ছুরি ডোবানো অবস্থায় আমাকে সাক্ষাৎকারও দিতে হচ্ছে। প্রথম প্রশ্নটি নারী কণ্ঠের : স্যার, নব্বইতম জন্মদিনে কেমন বোধ করছেন?

মিলান কুন্ডেরা নামের একজন হাঙ্গেরিয়ান লেখককে নকল করে বলে দিলাম, একেবারে শিশুর মতো। আমার বয়স তো আগে কখনো নব্বই ছিল না। কাজেই নব্বই বছর বয়সের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি আমার জানা নেই, আস্তে আস্তে জানব।

এবার পুরুষ কণ্ঠের প্রশ্ন : স্যার, আপনার জীবনের উননব্বইটি বছর কেমন কাটালেন?

বললাম, ভালোতে-মন্দতে মেশানো। তবে ভালোর ভাগটাই বেশি। দুঃখ ছিল, আনন্দও কম ছিল না; আমার সাফল্য যেমন ছিল, আপনারা না জানলেও আমার ব্যর্থতা কোথায় আমি তা জানি।

তাহলে বলুন স্যার, ব্যর্থতা কোথায়?

আমি জানি ব্যর্থতা কোথায়। নিজেকেও সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য বলি, আমি এলএলবি ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল করি।

স্যার, আর কোনো ব্যর্থতা?

এবার মিথ্যাবাদী রাজনীতিবিদের মতো হাসি দিয়ে বললাম, আমি বেঁচে থাকতে এ দেশের সব মানুষকে দারিদ্র্যরেখার ওপরে দেখে যেতে চেয়েছিলাম। এখানটায় বোধ হয় আমি ব্যর্থ হতে যাচ্ছি।

এবার আবার নারী কণ্ঠ, স্যার, আর কোনো ব্যর্থতা? যেমন ধরুন প্রেমে ব্যর্থতা—আপনার সঙ্গে অন্য কোনো নারীর।

আমার আমলে পুরুষ আর নারীর মধ্যেই প্রেম হতো। এ আমলে শুনছি নারীতে-নারীতে, পুরুষে-পুরুষেও প্রেম হয়। ব্যর্থতার কথা বলছি—ব্যর্থতা আছে বলেই তো এর নাম প্রেম।

আমি এই প্রশ্নটার আংশিক জবাব দিতে চাই, আবার খানিকটা এড়াতেও চাই। যে পুরুষের প্রেমের জমা-খরচের খাতায় লাভই বেশি, মানে সাফল্য বেশি, তার জন্য অন্য নারীর আগ্রহ থাকতে পারে, কিন্তু প্রেমসফল পুরুষকে অন্য পুরুষ পছন্দ করে না। কিন্তু প্রেমব্যর্থ পুরুষ অন্য পুরুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকে।

আমি জবাবটা দেওয়ার আগে প্রতিক্রিয়াগুলো বিবেচনা করতে থাকি। আমার স্ত্রী প্রয়াত, কাজেই গৃহশান্তি বিঘ্নিত হবে না। আমার স্কুল-কলেজের ক্লাসমেটদের মধ্যে মাত্র তিনজন বেঁচে আছে : নূর-ই-হাফসা একেবারে বিছানায়, কাউকে চিনতে পারে না; ওবায়দুল হক জায়গিরদার প্রায় দুই মাস ধরে কোমায় আর কে এম সফদর তো ছয় বছর ধরে নিরুদ্দেশ। হয়তো বেঁচে নেই। কিন্তু মৃত্যুর নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত জীবিতই বলতে হবে। আমার তখনকার স্মৃতিকে চ্যালেঞ্জ করার মতো আর কেউ নেই।

সুতরাং বলেই ফেললাম, আমার প্রেমে ব্যর্থতাই বেশি। কিঞ্চিৎ সাফল্যও আছে।

মন্ত্রী সন্দিহান চোখে আমার দিকে তাকায়। নুরুল্লাহ আমার বুদ্ধিবৃত্তিক সাফল্যকে সন্দেহ করছে না, করছে প্রেমের সাফল্য নিয়ে। আমি বিষয়টাকে হালকা করার জন্য বললাম, সফল প্রেমিক কর্মজীবনেও সফল, মন্ত্রী পর্যন্ত হতে পারে; কিন্তু ব্যর্থ প্রেমিক সর্বোচ্চ বুদ্ধিজীবী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

মুখভর্তি কেকের ফাঁক দিয়ে একজন নারী সাংবাদিক জিজ্ঞেস করে, আপনি কি সেই ব্যর্থতার কথা আরেকটু বলবেন? মানে, সেই নারীর বর্তমান অবস্থা কী?

আমি জবাব দিই, আমি জানি না কোন নারীর কথা বলতে বলছ। যদিও বাংলাদেশে নারীর গড় আয়ু পুরুষের চেয়ে দুই বছর বেশি, তার পরও আমার সেই নারীদের কেউ বেঁচে নেই। আমি সবার খোঁজ রাখতে চেষ্টা করেছি। তবে সবই যদি এখানেই বলে ফেলি তাহলে আমার আত্মজীবনী কেউ পড়বে না। মানে কিনবে না। আমার মৃত্যুর পর প্রকাশক তখন আমার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণভরে আমাকে গালাগাল দেবে। সে জন্য বাকিটুকু থাক।

স্যার, আপনার আত্মজীবনী আমরা কবে পাচ্ছি?

লেখা শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত হবে।

লেখা কি শেষ পর্যায়ে?

প্রতিদিনই পুরনো দিনের কিছু কথা নতুন করে মনে পড়ে। সে জন্য শেষ পর্যায়টা আর শেষ হতে চায় না।

তখন আইরিন মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বলে, মিডিয়ার বন্ধুদের সবাইকে ধন্যবাদ। যাঁরা এখনো কেক খাননি, ডান পাশের রুম থেকে কেক নিয়ে নিন। বাঁ পাশের রুমে জিন্নাহ ভাইয়ের প্রিয় কাচ্চি বিরিয়ানি। পার্সেল দেওয়ার কোনো বন্দোবস্ত করা হয়নি। আপনারা অনুগ্রহ করে খেয়ে যাবেন।

আমি যেসব খাবার এখন আর খাই না, আইরিন এককথায় বলে দেয়, এগুলোই আমার প্রিয় খাবার।

নুরুল্লাহ হাঁ করে মেয়েটিকে দেখে। গায়ের রংটা শুধু শাফিনাজের—পরিমিত ফরসা, কিন্তু মুখের গড়নটা অন্য কারো—সুচিত্রা সেনের নয়তো?

নুরুল্লাহ ইশারায় তাকে কাছে ডাকে, শোনো পারভিন, তোমার কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

স্যার, আমার নাম আইরিন।

নুরুল্লাহ বলে, আইরিনও যা, পারভিনও তা-ই। পাকিস্তানি একজন প্লেব্যাক সিঙ্গার আইরিন পারভিন। দারুণ একটা গান ছিল তাঁর কণ্ঠে—‘তুম হি হো মেহেবুব মেরে’; আয়না সিনেমার গান, ছেষট্টি সালের একেবারে সুপারহিট। আহমেদ রুশদীর সঙ্গে ডুয়েট গাইতেন। গানটা যদি না শুনে থাকো...।

বাক্যটি অসমাপ্ত রেখে নুরুল্লাহ বলল, থাক, আইরিন পারভিনের প্রশংসা করেছি, আর কিছু বলতে চাই না, কালই তো কাগজে ছাপা হবে : মন্ত্রিসভায় পাকিস্তানপন্থী আরো একজন।

আইরিন বলে, স্যার, আপনাকে একটুখানি কাচ্চি বিরিয়ানি দিই?

নুরুল্লাহ ঘড়ি দেখে, দেরি হয়ে যাচ্ছে, র‌্যাডিসনেও ডিনার। তার পরও বলল, যদি তুমি আমার সঙ্গে খাও, তাহলে আমি রাজি। জিন্নাহ ভাই কাচ্চি খাবেন না, আমি জানি।

আইরিন অসহায় চোখে আমার দিকে তাকায়। আমি সম্মতি দিই। খাও। এমন সিনিয়র মন্ত্রীর সঙ্গে বসে খেতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার।

আইরিন শরীরসচেতন। প্লেটে হাফ কাচ্চির সিকিটা নিয়ে চামচ দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করল। একটুখানি কেবল মুখে তুলল। ততক্ষণে নুরুল্লাহ ফুল প্লেট ও দুই গ্লাস বোরহানি মেরে দিয়ে বলল, তোমার কথাটা আমি ফিল করতে শুরু করেছি।

আইরিন জানে কোন কথাটা। তবু জিজ্ঞেস করে, কোন কথাটা, স্যার?

এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।

তাইতো, স্যার। একটা সংখ্যা মাত্র।

নুরুল্লাহ বলে, আমি জানি কোনো মেয়েকে তার বয়স কত জিজ্ঞেস করা ঠিক নয়। তবু তোমাকে জিজ্ঞেস করছি আইরিন, তোমার বয়স কত?

আইরিন চটপটে জবাব দেয়, এক থেকে নিরানব্বই পর্যন্ত যেকোনো একটা বেছে নিন, যেটা ভালো লাগে।

নুরুল্লাহ বলল, তাহলে টোয়েন্টিওয়ান?

আইরিন বলল, এটা স্যার আপনার পছন্দ?

নুরুল্লাহ বলল, নব্বই হওয়ায় আমি জিন্নাহ ভাইকে একটা এক্সক্লুসিভ ডিনারে ডাকতে চাই। এক্সক্লুসিভ হলেও তুমি থাকবে।

আইরিন মাথা নুইয়ে ডান হাতের করতলে নিজের বুকের বাঁ পাশটা ছুঁইয়ে বলে, মাই প্লেজার।

ইটস টুও লেট, ইটস টুও লেট—বলতে বলতে নুরুল্লাহ বেরিয়ে যায়। হাগুচি আরাইয়ামার সঙ্গে তার ডিনার। এমনিতে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তার ওপর জাপানি, তার ওপর লোকটা নাকি খচ্চর গোছের।

নুরুল্লাহ একবার আমাকে বলেছে, বাংলাদেশের জন্য জাপান হচ্ছে সবচেয়ে বড় ডোনার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অবশ্য ডঙ্কা বেশি বাজায়। দু-পয়সা দেওয়ার মুরোদ নেই, বাংলাদেশকে গণতন্ত্র শেখায়। কলসি খালি কিনা, বাজে বেশি।

আইরিন টমেটোর জুসের ওপর একটু লবণ ও সাদা গোলমরিচের গুঁড়া ছড়িয়ে আমাকে খেতে দিল। বলল, জিন্নাহ ভাই, আপনার ওপর বেশ ধকল যাচ্ছে, খেয়ে নিন, ডিহাইড্রেশন হওয়া ঠেকাতে তো হবে।

 

ছয়

টমেটোর জুস আধগ্লাসও খাওয়া হয়নি, বেশ বড় আকারের একটা ফুলের ঝুড়ি নিয়ে শামিম আহসান হাজির। ঝুড়ির একপাশে সাদা হরফে টাইপ করা : নব্বইতম জন্মদিনে প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা। শামিম প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেশের সাংস্কৃতিক বিষয়গুলো দেখাশোনা করে—কোন পত্রিকা বাড়াবাড়ি করছে, কোন সম্পাদককে সাইজ করা দরকার, পহেলা বৈশাখ পান্তা-ইলিশ হবে না পান্তা-টেংরা, কোন ভাই একুশে পদক পাবেন, কোন ভাই স্বাধীনতা, বিটিভির প্রাইম টাইম কে পাবেন—এসব বিষয়ের সিদ্ধান্ত শামিম আহসানই দিয়ে থাকে। আর এসব বিষয়ের দুজন মন্ত্রী অবশ্যই আছেন, মন্ত্রীরা আচ্ছা আচ্ছা বলেন।

শামিম আহসান ঘাড় নুইয়ে টেবিলের এপাশে বসে থাকতে দেখে আমাকে ইশারায় কদমবুসি করে এবং সুন্দর করে সাজানো ফুলের ঝুড়ি আমার হাতে তুলে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলে, স্যার, প্রবন্ধটা আপনাকেই লিখতে হবে, কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাহেবের নাতির খতনা উপলক্ষে কবিতাটি কাকে দিয়ে লেখাবেন? এ দায়িত্বটা আপনাকে নিতে হবে।

আমি জিজ্ঞেস করি, নাতিটার বয়স কত?

স্যার, এটা ছোট নাতিটা।

আমি তো আর কবিতা লিখি না, ছড়াকারদের কাউকে বলে দেখি।

না স্যার, নাতি ছোট হতে পারে, একদিন তো বড় হবে। কাজেই আমাদের সরকারের বেনিফিশিয়ারি কোনো কবিকে বলতে পারেন।

এতক্ষণ মোবাইল ফোনে কারো সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলতে থাকা আইরিন ফোন রেখে শামিম আহসান আর আমার আলোচনায় যোগ দেয়। জিজ্ঞেস করে, জিন্নাহ ভাই, কিসের কবিতা?

আমি কার প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি বেমালুম ভুলে গিয়ে বললাম, ‘নুনু কাটার মহাকাব্য’।

মানে? আইরিন বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, কিসের কাব্য?

আমি নুনু কাব্য থেকে ফিরে এসে বলি, এপিক অব সারকামসেশন। প্রেসিডেন্টের নাতির খতনা হবে। এটা তো বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা উপলক্ষ। এ নিয়ে একটা কবিতা, আমাদের নামকরা কবিদের কারো একটা কবিতা দরকার। শামিম বলল, খতনা উপলক্ষে একটা স্যুভেনির বের করবে।

পুরস্কার-টুরস্কার পেয়েছেন এমন কোনো কবি? আইরিনের প্রশ্ন।

আমি বলি, টুরস্কার বলে পুরস্কারটাকে হেলা করছ কেন? পুরস্কার তো একটা প্রতীকী স্বীকৃতি, রাজউকের প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট, চাকরিতে বড় পদ—এসবও তো দেওয়া হয়েছে, এগুলোর অর্থমূল্য অনেক বেশি।

আইরিন বলল, তাই বলে তুমি কাউকে সারকামসেশনের কবিতা লিখতে বলবে?

না আইরিন, আমাকে ঠিক বলতে হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো, এ নিয়ে অন্তত এক ডজন কবিতা লেখা হয়ে গেছে।

একজনই এক ডজন লিখেছেন?

তাহলে বাকিরা কি ঘাস কাটবে? একটা করেই লিখেছে।

এ নিয়ে কেউ কি উপন্যাস লিখবেন না?

এবার শামিম আহসান জবাব দিল, সময় খুব কম। এত অল্প সময়ে কেউ লিখে উঠতে পারবেন না। কাজেই উপন্যাসের ব্যাপারটা থাক।

আইরিন বলল, তাহলে যাকে বলে ছোটগল্প— হইয়াও হইল না শেষ। আ শর্ট স্টোরি অন সারকামসেশন!

শামিম বলল, এটাও ভেবেছি, কিন্তু দেশে তো এখন আর বড়মাপের কোনো ছোটগল্পকার চোখে পড়ছে না।

শামিম বলল, স্যার, প্রেসিডেন্ট সাহেব আপনাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। আপনার অনুমতি না নিয়েই চিঠিটার ফটোকপি প্রেসকে দিয়ে দিয়েছি, কাল খবরের কাগজে থাকবে। চিঠিটা যে আপনাকে দিচ্ছি, এটা ক্যামেরায় থাকুক।

আইরিন বলল, বিটিভি ও অন্যান্য চ্যানেলের লোকজন তো চলে গেছে।

শামিম বলল, সমস্যা নেই।

আমাদের প্রেসিডেন্ট সাহেবের ফ্লু হয়েছে। অফিসে খুব হাঁচি দিচ্ছিলেন, বললেন মাথা ব্যথাও আছে। সেনাবাহিনী থেকে আসা মেডিক্যাল কোরের পার্সোনাল ফিজিশিয়ান অনেকটা জোরজবরদস্তি করে তাঁকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমি প্রেসিডেন্টের প্রেস টিমের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছি। বিটিভিরও আছে।

স্যার তো জানেনই, প্রেসিডেন্টের খুব পছন্দ বিটিভির নিউজ।

আমি বলি, হ্যাঁ, আগের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টরা কেবল বিটিভিই দেখতেন।

শামিম বলল, অবশ্য স্যার, কয়েকটা প্রাইভেট চ্যানেল সরকারের প্রশংসায় বিটিভিকেও ছাড়িয়ে গেছে। কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার তো প্রায়ই স্ক্রিনে এসে প্রেসিডেন্ট সাহেবের চৌদ্দগুষ্ঠির প্রশংসায় গলা ফাটাচ্ছেন। কিন্তু ওগুলোকে তিনি পাত্তাই দিচ্ছেন না।

আমি চিঠিটা খুলে টেবিলে রাখি। বিটিভির ক্যামেরা চিঠির ক্লোজ শট নেয়।

সম্বোধনটা প্রেসিডেন্টের নিজ হাতে লেখা, সবুজ কালিতে।

প্রিয় জিন্নাহ সাহেব।

তার পরের অংশ টাইপ করা। কাগজটা সবুজাভ। এটার নাম ডিও প্যাড, ডেমি অফিশিয়াল প্যাড।

নব্বইতম জন্মদিনে আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনি বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার একজন কীর্তিমান বুদ্ধিজীবী। একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিকের চেতনা নিয়ে আপনি আমাদের জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি সার্বক্ষণিক সমর্থন জানিয়েছেন। প্রকাশ্যে ও গোপনে বিদেশি বুদ্ধিজীবীদের কাছে বিশেষ করে আমাদের ছাত্র ও যুব ফ্রন্টের মানবিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেছেন। আমরা আপনার কাছে ঋণী।

প্রার্থনা করি আপনি শতায়ু হোন, জাতি যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে আপনার জন্মশতবার্ষিকী পালন করবে।

আপনার সুস্বাস্থ্য, জীবন ও মঙ্গল কামনা করি।

তারপর সবুজ কালিতে সই।

সইয়ের নিচে মুদ্রিত—প্রেসিডেন্ট।

 

আমি শামিম আহসানকে বলি, তুমি প্রেসিডেন্টকে আমার কৃতজ্ঞতা জানাবে, তিনি যে এত ব্যস্ত থেকেও আমাকে স্মরণ করেছেন, এটা অনেক বড় ব্যাপার।

শামিম বলল, চিঠিটা সই করার সময় আমি তো সামনেই ছিলাম।

তিনি বললেন, বয়সটা যদি কম হতো তাহলে জিন্নাহ সাহেবকেই আমাদের সংস্কৃতি ও গ্রন্থাগার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতাম। কিন্তু তিনি তো আমাদের নুরুল্লাহর চেয়েও পাঁচ-দশ বছরের বড়।

শামিম এইমাত্র যে কথাগুলো এখন বলল, প্রেসিডেন্ট যে তা বলেননি আমি নিশ্চিত। শামিম প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা ও গুরুত্ব আমার কাছে প্রতিষ্ঠা করতে এসব কথা বলেছে।

আইরিনকে বলি, শামিম আহসানকে কেক দাও।

শামিম আইরিনকে বলে, আপনাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে, কোথায় দেখেছি?

আইরিন বলল, আমি আপনাকে টিভিতে দেখেছি। তখন যদি টিভির ভেতর থেকে আমাকে দেখে থাকেন।

বেশ বলেছেন তো, আপনার গলাটা আবৃত্তির। ও রকম কিছু করেন নাকি, আবৃত্তি, উপস্থাপনা, সঞ্চালনা—এসব?

আইরিনকে একটু আড়াল করতে আমিই জবাব দিই, ওকে চেনা চেনা মনে হয়েছে তাই না? একটি সুন্দরী মেয়েকে যদি পৃথিবী না চেনে, এটা পৃথিবীর দুর্ভাগ্য।

শামিম বলল, ঠিক বলেছেন, স্যার।

পরক্ষণেই আইরিনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ২৭ তারিখে রোশনাই টিভিতে আপনাকে আবৃত্তি করতে হবে। একটা লাইভ প্রগ্রাম হবে। আপনার ফোন নাম্বার দিন, প্রডিউসার কালই যোগাযোগ করবে। প্রেসিডেন্ট সাহেবও অনুষ্ঠানটি দেখবেন। স্যার যদিও সময় পেলে একটু ছবি আঁকতে চেষ্টা করেন, তবু দেখবেন।

আইরিন বলল, মানে আমাকে বলেছেন? আমি আবৃত্তি করব? কী আবৃত্তি করব? কার কবিতা? আমি তো জীবনে কখনো অডিশন টেস্টই দিইনি। কোনো অনুষ্ঠানে আবৃত্তিও করিনি।

আইরিন প্রসঙ্গটা পাল্টাতে চাইছে। আমাকেই বলল, জিন্নাহ ভাই, ফুল নিয়ে অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। আপনাকে হ্যাপি বার্থডে বলবে।

সবাইকে তো আর কাচ্চি খাওয়ানো যাবে না। কিন্তু জন্মদিনের কেকের টুকরা অন্তত দেওয়া যাবে।

হিসাবটা আইরিনের করা। প্রতিবছরের জন্য এক শ গ্রাম হিসাবে নব্বই বছরের জন্য নয় হাজার গ্রাম, মানে নয় কেজি।

যারা কেক খেয়েছে, তাদের অভিব্যক্তি দেখে মনে হয়েছে কেকটা বেশ সুস্বাদু। এই নয় কেজির বাইরেও আছে, যারা আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে, তাদের কেউ কেউ বেশ বড়মাপের কেকও এনেছে। এগুলোও তো অতিথিদের খাওয়াতে হবে।

যাওয়ার সময় শামিম কানে কানে বলল, ভুলবশত একটা পদক আপনাকে দেওয়া হয়নি। আমাদের রিসার্চ উইং সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে, রাষ্ট্রীয় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একটি ছাড়া সব পদকই দেওয়া হয়েছে। একটু দেরিতে হলেও স্বাধীনতা পদকটা এবারই পাচ্ছেন।

আমি বললাম, দেরি করে ভালো করেছ। সবই কম বয়সে পেয়ে গেলে তুমি আর কিসের জন্য প্রতীক্ষা করবে। বেশ তো দিয়ো। একটু খেয়াল রেখো, পদকে সোনাদানার মাপটা যেন ঠিক থাকে। পদক সাপ্লাইয়ের ঠিকাদারও কি তোমাদের কোনো আপনজন নাকি? আমি তো কামড় দিয়েও সোনার টুকরা ভাঙতে পারব না। আইরিন, তোমার কামড়ে কি স্বর্ণপদক ভাঙবে?

আইরিন কিছুক্ষণ থ হয়ে থেকে বলল, আমি স্বর্ণপদকে কামড় বসাতে যাব কেন?

আমি বললাম, এমনিতেই, আমার হয়ে।

 

 

সাত

তখনই আমার ফোনটা বাজে। আমার ফোনের রিংটোন খুব বাজে ধরনের। নুরুল্লাহর ফোন। জিন্নাহ ভাই, অনেকক্ষণ ধরে মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর আটকা পড়ে আছি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকওয়ালাদের বলে দিয়েছি, তোমরা খাওয়া সেরে ফেলো, আমি কাচ্চি ডিনার সেরে বের হয়েছি। আমার সংক্ষিপ্ত মিটিংটা ডিনারের পরে হবে।

আমি বললাম, স্যরি নুরুল্লাহ, আমার কারণে তোমার দেরি হয়ে গেল। টেলিভিশনে চেহারা না দেখালে কি আমার জন্মদিন পালন হতো না? অ্যানিওয়ে, আই অ্যাম স্যরি।

জিন্নাহ ভাই, বিনয় রাখেন। এ রকম চমৎকার একটি মেয়ে আপনার পাশে পাশে থাকছে। এ তো দারুণ এনার্জাইজার। ইউ আর সো লাকি, জিন্নাহ ভাই। বলুন দেখি কী কপাল! আমার চারপাশে যে কয়জন ঘুরঘুর করে তাদের মধ্যে যেটা ইয়াঙ্গেস্ট, সেটাও পাঁচ বছর আগে মেনোপজে গেছে।

শোনো নুরুল্লাহ, ওখানে ফাদার অব দ্য সেশন হলেও এদিকটাতে কেউ আমাকে ব্রাদার ইন ল অব নেশন—জাতির শালাও মনে করে না। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামটার কারণে উনসত্তরের পর থেকে কম বিব্রত হইনি। আমাকে বারবার হিসাব করে দেখাতে হয়েছে আমার জন্ম পাকিস্তান হাসিলেরও বহু বছর আগে, জিন্নাহ সাহেব তখনো এত পরিচিত হয়ে ওঠেননি। আমার বাবা আমার বড় ভাইয়ের নাম রেখেছিলেন মওলানা আবুল কালাম আজাদ, মেজো ভাইয়ের নাম দাদাভাই নওরোজি আর ছোট ভাইয়ের নাম নওয়াব সলিমুল্লাহ বাহাদুর। নামের জন্য তাঁরা সবাই কমবেশি বিব্রত হয়েছেন, আমি ভাই-বোনদের মধ্যে সবার ছোট, বাবা এই নামটাই দিলেন। নিশ্চয়ই তাঁর পছন্দের নাম।

স্যরি জিন্নাহ ভাই, আই উইল কল ইউ এগেইন। প্রেসিডেন্টের এডিসির ফোন, সম্ভবত প্রেসিডেন্ট সাহেব খোঁজ করছেন।

নুরুল্লাহ লাইন ছেড়ে দিতেই আরেকটা ফোন। নারী কণ্ঠ, কী ব্যাপার, এই বয়সে ফোন এতক্ষণ এনগেজড রাখেন ক্যান?

আমি বলি, কে বলছেন প্লিজ?

চিনবেন না ভাই, চিনবেন না। বড় গাছ কখনো ছোট গাছের নাম বলতে পারে না। ছোট গাছ সব বড় গাছের নাম মুখস্থ রাখে। একটু আগে টিভির পর্দার সঙ্গে চোখ লাগিয়ে দেখলাম আপনি জন্মদিনের কেক কাটছেন। কিন্তু আপনার বাবরি চুল কই? আপনার পাশে দেখলাম নুরুল্লাহ ভাইকে, তারও সেই ছাগলা দাড়ি নেই। পাশে একটা সুন্দর মেয়ে—ওটা কি নাতি, না নাতনির মেয়ে?

আমি আবার বলি, অনুগ্রহ করে বলুন আপনি কে?

আমার এত ঠেকা নেই যে আমি কে আপনাকে তা বলতেই হবে।

ও প্রান্তে ভিন্ন এক নারী কণ্ঠ, দুনিয়ার সব মানুষ মইরা গেল, আপনি এখনো বাঁইচা আছেন, জিন্নাহ ভাই? বাঁইচা যখন আছেন, আলহামদুলিল্লাহ, হ্যাপি বার্থডে, আর দশটা বছর কষ্ট কইরা বাঁইচা থাকবেন। আপনি ছাড়া আমার চেনা কোনো মানুষই নব্বই বছর বাঁচেনি। এক শ বছর যদি বাঁচেন, আমি জোরগলায় বলতে পারব—একজন শতবর্ষী মানুষ আমার পরিচিত।

এই নারীকে একটু ভড়কে দেওয়ার জন্যই বললাম, অবশ্য আর দশ বছর যদি আপনি বেঁচে থাকেন?

শুরু হলো তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। বলল, আপনিও জেনে গেছেন আমার সময় শেষ! দিল্লির ধর্মশীলা নারায়ণ সুপার স্পেশালিটি হসপিটালে সাতাশ দিন কাটিয়ে এসেছি। সার্জিক্যাল অনকোলজিস্ট ডাক্তার অ্যান্থনি রাজেশ মিস্ত্রি জবাব দিয়ে দিয়েছেন। হাসতে হাসতে বলেছেন, মন একদম খারাপ করবেন না। আপনি ম্যাক্সিমাম দেড় বছর বাঁচবেন। যা যা শখ আছে মিটিয়ে নিন। ভাইজান, আমার দেড় বছরের নয় মাস দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেছে। ভাইজান, আমি দেখতে না পারি তাতে কি, আপনি এক শ বছর বাঁচুন।

এই নারীর কণ্ঠে ভাইজান সম্বোধন শুনে মনে হলো, আমি তাকে চিনতে পেরেছি।

আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কি টুনটুনি?

কান্নার তোড় আরো বাড়ল। এর মধ্যে বলল, হ্যাপি বার্থডে, ভাইজান। অন্তত এক কুড়ি ফোন করে আপনার নম্বরটা বের করেছি।

আমি জিজ্ঞেস করি, আমার সঙ্গে একটু আগে কে কথা বলল, বুলবুলি? নাকি অন্য কেউ?

হঠাৎ কান্নার গমক থেমে গেল, অন্য কেউ বলতে আপনি কাকে বোঝাতে চেয়েছেন?

মানে তোমাদের বড় আপা টিয়া কি না?

ভাইজান, আপনি টিয়াকে পাবেন কোথায়?

আমার ক্লাসমেট আবদুল গোফরানের ছোট বোন টিয়াই আমার প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী।

টিয়াকে একটি প্রেমপত্রও লিখেছিলাম। টিয়ার বয়স তখন পনেরো-ষোলো, আমি আঠারো হই হই অবস্থায়। বুলবুলি নয়-দশ আর টুনটুনি সাত কি আট। টিয়া সম্ভবত আমার চিঠি লেখার ব্যাপারটি পছন্দ করেনি, কিংবা আমিই সিগন্যাল বুঝতে ভুল করেছি। টিয়াদের বাড়িতেই চিঠি লেখার অপরাধে আমার বিরুদ্ধে সালিস বসে। বামন হয়ে চাঁদ ধরতে চাইছি—এমন একটি অভিযোগ ওঠে। টিয়ার বাবা এখলাসুর রহমান চিৎকার করে বলেন, কান ছিঁড়ে ফেলব, বদমাশ।

টিয়ার ছোট চাচা মোখলেসুর রহমান বলেন, বাচ্চা মানুষ, একটা চিঠিই তো লিখেছে, মেয়েকে তো আর রেপ করেনি, এটা নিয়ে এত হৈচৈ করার কী আছে?

টিয়াদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে আসামিপক্ষে একমাত্র আমি, সেই সালিসে এমনকি টুনটুনিরও ছোট ভাই মোহাইমেন, সাড়ে তিন বছর বয়স, উপস্থিত ছিল।

মোখলেসুর রহমানের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখলাসুর রহমান কষে তাঁর গালে থাপ্পড় বসিয়ে বললেন, রেপ করতে কতক্ষণ? খালি সালোয়ারের ফিতাটা খুলতে পারলেই তো কাজ সেরে দেবে। হারামজাদাকে পুলিশে দিয়ে দাও।

আমার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয়নি। আমাকে কান ধরে উঠবোস করাক, নাকে খত দিতে বলুক, সবার কাছে, এমনকি টুনটুনির কাছেও ক্ষমা চাইতে বলুক, আমি রাজি। আমার একটাই চাওয়া, কথাটা যেন আমার মায়ের কানে না যায়। যদি সালিসে রায় হয় টিয়াকে আমার মা ডাকতে হবে, আমি তাতেও রাজি। তবু আমার বাড়ির কেউ না জানুক।

তিনি আমাকে চরিত্রহীন-বদমাশ যা-ই বলুন, আমি টিয়ার বাবাকেও ধন্যবাদ দিই, আমার অপরাধটি তিনি রাষ্ট্র করে দিতে পারতেন, একটি প্রকাশ্য সালিস বসাতে পারতেন। তিনি আমাকে যে গালই দিন না কেন, বাইরের কোনো মানুষের সামনে করেননি। টিয়াদের বাড়িতে যাঁরা ছিলেন, আমার অপদস্থ হওয়ার বৃত্তান্তটি শুধু তাঁদের জানা। বাইরের একটা লোকও জানতে পারেনি। এমনকি টুনটুনিও তো তার ক্লাসমেটদের বলতে পারত—এই লোকটা আসলে বদমাশ; বলেনি।

আমি টিয়ার চাচা মোখলেসুর রহমানকে অনুনয় করে বলি, আমার পক্ষে কোনো কথা বলে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না। আমি জানি আমি অন্যায় করেছি।

আমার ক্লাসমেট আবদুল গোফরান আমার হেনস্তাতে খুশিই হয়েছে, মেয়ের বড় ভাই হওয়ার মর্যাদা অন্য রকম। সবচেয়ে ছোট আবদুল মোহাইমেন কিছুক্ষণ পর পর একে-ওকে জিজ্ঞেস করেছে, কী হইছে, কী হইছে, বলো না।

বুলবুলি তার কানে কানে কিছু একটা বলেছে, অমনি সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি চুরি করেছ?

সালিসের শুরুতে টিয়ার বাবা এখলাসুর রহমান তাঁর বুকপকেট থেকে একটি নোট বই বের করলেন। নোট বইয়ের ভেতর থেকে চার ভাঁজ করা আমার ছোট্ট চিঠিটা বের করে আমাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি তোমার হাতের লেখা?

আমি জানি, আমারই। তবু চুপ থাকি।

এখলাসুর রহমান গলা ফাটিয়ে চিৎকার করেন, ওই হারামজাদা, এটা কি তোর হাতের লেখা?

আমি বিড়বিড় করে বলি, জি।

তিনিও বিড়বিড় করে বললেন, যদি ভালো ছাত্র হতি, তা-ও একটা কথা ছিল। ছাত্র তো একেবার আবদুল গোফরানের বরাবর।

তিনি ঠিক বলেননি, আমি গোফরানের চেয়ে ভালো ছাত্র।

গোফরান দুই বিষয়ে ফেল করে ক্লাস টেনে উঠেছিল, আমি এক বিষয়ে।

এবার তিনি টিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, হারামজাদা কি তোর গায়ে হাত দিয়েছে, মানে কোথাও ধরেছেটরেছে?

টিয়া বিড়বিড় করে কিছু বলল, যা কেউ শুনল না।

এবার তিনি আমাকে হারামজাদার বাচ্চা সম্বোধন করে বললেন, তুই কি টিয়ার গায়ে হাত দিয়েছিস?

আমি দিই বা না দিই, ভালো করেই জানি, টিয়া যা বলবে তা-ই সত্য ধরা হবে। সুতরাং চুপ করে থাকি।

এই অস্বস্তিকর নীরবতার মধ্যে আবদুল মোহাইমেন বিড়ালের কণ্ঠে মিউমিউ করে ডাকতে থাকে। টুনটুনি ও বুলবুলি খিলখিল করে হেসে ওঠে, হাসি ঠেকাতে টিয়াও মুখ চেপে ধরে।

গায়ে হাত দেওয়ার বিষয়টি এখলাসুর রহমান খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। ছোট ছেলেকে ভয়ংকর ধমক দিয়ে তার বিড়ালের ডাক থামিয়ে দিলেন এবং ফের মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন, ওই হারামজাদার বাচ্চা কি তোর গায়ে হাত দিয়েছে?

টিয়াও বিস্ফোরক কণ্ঠে জবাব দিল, বললাম তো, না।

তারপর আবার অস্বস্তিকর নীরবতা। সাড়ে তিন বছর বয়সী আবদুল মোহাইমেন এবার কুকুরের মতো ঘেউঘেউ করে উঠল। এবার টিয়াসহ সবাই, এমনকি এখলাসুর রহমানও হেসে উঠলেন। নির্বাক কেবল দুজন। আসামি হিসেবে আমি আর সালিসের নীরব দর্শক হিসেবে টিয়াদের মা মায়মুনা বেগম। তিনি একটি কথাও বলেননি। মেয়ের পক্ষেও না, বিপক্ষেও না।

এখলাসুর রহমান এক এক করে কয়েকটি ফরমান জারি করে সালিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।

১. টিয়ার সঙ্গে আসামির কথা বলা চিরদিনের জন্য বন্ধ হইল।

২. আসামির টিয়াদের বাড়িতে আসার অধিকার রহিত হইল।

৩. আসামি টিয়ার ভগিনীদিগের দিকেও কখনো চোখ তুলিয়া তাকাইবে না।

৪. আবদুল গোফরান ক্লাসে আসামির পাশে বসিবে না এবং সর্বত্র তাহাকে এড়াইয়া চলিবে।

৫. এই সালিস সম্পর্কে কোনো পক্ষই বাহিরে কোনো ধরনের আলোচনা করিতে পারিবে না।

৬. টিয়ার মা মায়মুনা বেগম ও চাচা মোখলেসুর রহমান নাবালিকা মেয়েদের কোনো ধরনের আশকারা দেওয়া হইতে বিরত থাকিবে।

ফরমানের পঞ্চম অনুচ্ছেদটি আমাকে অধিকতর বিব্রত হতে এবং পারিবারিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়া থেকে রক্ষা করল। এই অনুচ্ছেদ একই সঙ্গে টিয়ার জন্যও কল্যাণকর, আমার পত্রের প্রসঙ্গ তুলে কেউ তার জন্য আসা বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে দিতে পারবে না।

আমি একবার সবার দিকে তাকিয়ে মাথা যথেষ্ট নিচু করে বললাম, আমি তাহলে যাই, আসসালামু আলাইকুম।

অমনি টিয়ার বাবা এখলাসুর রহমান বলে উঠলেন, তোমরা দেখলে কত বড় হারামজাদা, আবার সালাম দেয়।

আমি যখন চিরদিনের মতো টিয়াদের বাড়ির সীমানা থেকে বেরিয়ে যাই, আমার একদা স্বপ্নের শ্বশুর এখলাসুর রহমানের গলা শুনতে পাই, বদমাশটাকে ধরে জুতাপেটা করার দরকার ছিল, হারামজাদাটা জিন্নাহ সাহেবের পবিত্র নামটাকে পর্যন্ত ডুবিয়ে ছাড়ল। আমাদের জিন্নাহ সাহেব কখনো এমন কুকাম করেছেন? ছিঃ।

 

 

 

আট

সেই টুনটুনি বলল, ভাইজান, আপনি টিয়াকে পাবেন কোথায়?

ভুলটা আমারই। এত দিন তো মানুষ বেঁচে থাকে না, আমিই বরং অনেক বেশি সময় বেঁচে আছি। আরো অনেকের মতো টিয়াও তাহলে বিদায় নিয়েছে!

টুনটুনি বলল, কেন, পেপার পড়েন না? আটাশ বছর আগে নব্বই সালের জুলাই মাসের ২ তারিখে আরাফাত ময়দানে শয়তানকে পাথর ছুড়তে গিয়ে পায়ের তলায় চাপা পড়ে মরে যাওয়া দেড় হাজার মানুষের মধ্যে আমার বড় দুলাভাই নুরুন্নবী মিয়াও ছিলেন। দুলাভাইয়ের লাশ দেখার পর আপাও অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান আর ফেরেনি। দুজনের কারো লাশই আনা হয়নি। জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়েছে। অবশ্য এমন ভাগ্য সবার হয় না।

আমি বারবার বললাম, আই অ্যাম স্যরি। ঘটনাটার কথা জানতাম, কিন্তু টিয়ারাও যে এর মধ্যে থাকতে পারে কখনো মনে হয়নি, কেউ বলেওনি।

টুনটুনি বলে, কেউ আপনাকে বলবে না, আপনি দেশের এক নম্বর পণ্ডিত। আপনার সঙ্গে কথা বলার সাহস কার? বাকি খবরগুলো আমিই দিয়ে দিই, শুনুন। সেদিনের সালিসে যাদের দেখেছেন, আমি আর বুলবুলি ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই। বুলবুলির হাজব্যান্ড মারা গেছে এগারো বছর, থাইরয়েড ক্যান্সারে, ইন্ডিয়ার টাটা মেমোরিয়াল হাসপাতালে। ১৯৭১ সালের ২২ অক্টোবর থেকে আমার হাজব্যান্ড নিরুদ্দেশ। কেউ জানে না কোথায়। যদি মরে গিয়ে থাকে, কে মেরেছে—পাকিস্তানি আর্মি, নাকি মুক্তবাহিনী? নাকি অ্যাকসিডেন্টে মরেছে? কেউ বলেছে, তাবলিগ পার্টির সঙ্গে লাহোর চলে গেছে। তৌহিদুল আনোয়ার সমাজতন্ত্র করা মানুষ, হুজুরদের নিয়ে ঠাট্টা-মসকরা করত। এটা আমার বিশ্বাস হয় না, তৌহিদ তাবলিগ পার্টির সঙ্গে বেরিয়ে গেছে।

আমি আবার বলি, টুনটুনি, আই অ্যাম সো স্যরি।

টুনটুনি বলতে থাকে, আপনার বন্ধু গোফরান পঁচাশি সালে ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। অন দ্য স্পট ডেড, খুব ড্রিংক করত, ভাবি দুই মেয়ে নিয়ে আগেই চলে যায় এক উইং কমান্ডারের সঙ্গে। আবদুল মোহাইমেনের কথা শুনবেন না—বৃত্তি নিয়ে মস্কো গিয়েছিল, ধবধবে সাদা একটা মুসলমান মেয়েকে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি উজবেকিস্তানে চলে যায়, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ না করেই সমরকন্দ শহরের একটি ইসলামী মাদরাসায় শিক্ষকতার কাজ নেয়, কোনো দিনও দেশে ফিরে আসেনি। আট-দশ বছর আগে সেও মারা যায়। আর মোখলেসুর রহমান চাচার ব্যাপারটা তো গল্পের মতো। চাচি আর চাচির পুরনো প্রেমিক মিলে তাঁর গলা টিপে ধরে, একসময় জিহ্বাটা বেরিয়ে আসে।

আমি বলি, আহ্ হা। বিচারটিচার হয়নি।

হয়েছে, টাকা-পয়সা এমন ঢেলেছে যে তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও হয়নি। গল্পটা এখানেই শেষ নয়। চাচির প্রেমিক এফডিসির ভ্যাম্প নুসরাতের সঙ্গে প্রেম শুরু করলে চাচি ধারালো দা দিয়ে দুজনকেই কোপায়। কেউ তখন মারা যায়নি। মামলা-মোকদ্দমাও হয়নি।

আমি বলি, থ্যাংক ইউ, টুনটুনি। অনেক কিছু জানলাম। তোমাদের নম্বরটা সেভ করে রাখছি। এখন আশপাশে অনেক লোক, পরে ফোন দেব।

টুনটুনি বলল, কোথায় থাকি তা-ও তো জিজ্ঞেস করলেন না। শোনেন, আমি খুলনার খালিশপুর থেকে ফোন করেছি। এটা বুলবুলির বাসা। আমি থাকি চিটাগং, পতেঙ্গার কাছে।

আচ্ছা, আচ্ছা, থ্যাংক ইউ। কথা বলব বলে আমি যখন লাইনটা কেটে দিই, ক্রুদ্ধ আইরিন বলল, তুমি কী পেয়েছ বলো তো? মেয়েমানুষ ফোন করলেই এতক্ষণ ধরে কথা বলতে হবে! ছিঃ, মেয়েদের যদি কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু থাকত। নাও, স্যুপটা খাও।

 

ফোনটা তখন আবার বাজে।

আইরিন বলে ওঠে, ইমপসিবল, কোনো মেয়েমানুষের ফোন ধরতে পারবে না।

স্যুপের ঢোক গিলে বলি, আচ্ছা।

ফোন বেজেই চলে, আমি স্ক্রিনে চোখ রাখি : নুরুল্লাহ কলিং।

আমি ইশারায় আইরিনকে দেখাই, কোনো মহিলার ফোন নয়, মন্ত্রী নুরুল্লাহ ফোন করেছে। ধরতেই হবে।

আমি হ্যালো বলতেই শুনলাম, জিন্নাহ ভাই, পৌঁছে গেছি। বলে দিয়েছি ডিনারে বসব না, শুধু কফি খাব। আমি পাশের মিটিং রুমটাতে বসেছি। ওদের ডিনার সারতে আরো মিনিট দশেক লাগবে। ভাবলাম এই ফাঁকে আপনার সঙ্গে আরেকটু কথা বলে নিই।

আমি বলি, হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। ইটস মাই প্লেজার। তুমি সরকারের সবচেয়ে সিনিয়র মন্ত্রী।

সেটাই তো সমস্যা। একটু আগে যে ফোন রেখে দিলাম, সেটা তো মন্ত্রী হওয়ারই খেসারত। ওই যে বললাম, প্রেসিডেন্টের এডিসির ফোন আসছিল। প্রেসিডেন্ট সাহেব কথা বলবেন। শোনেন জিন্নাহ ভাই, ফোন ধরতেই শুনলাম প্রেসিডেন্টের কণ্ঠ, হ্যালো নুরুল্লাহ, আপনি ফুল ভালোবাসেন?

আমি চুপ করে থাকি।

নুরুল্লাহ, শুনতে পাচ্ছেন? প্রেসিডেন্ট বললেন।

জি স্যার, শুনতে পাচ্ছি।

তাহলে বলুন আমি কী বলেছি?

ফুল ভালোবাসি কি না জানতে চেয়েছেন, স্যার।

তাহলে চুপ করে আছেন কেন? জবাব দিন।

সেটাই তো ভাবছিলাম স্যার, আপনার প্রশ্নের কী জবাব দেব। একটা সময় ছিল, ফুল খুবই ভালোবাসতাম। তখন ফুল দেওয়ার এবং নেওয়ার মানুষ ছিল। তারপর একটা দীর্ঘ নিস্পৃহ সময় কাটল। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এমনকি ফুলের মালাও পরিয়ে দেয়। কিন্তু ফুলের ঘ্রাণ পাই না।

প্রেসিডেন্ট বললেন, ও কিছু না। স্মেল ডিস-অর্ডার।

আমি বলি, কী বললেন, স্যার?

একটু মনোযোগ দিয়ে শুনুন : একটা হচ্ছে হাইপোসমিয়া—এটা হচ্ছে ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া; অ্যানোসমিয়া—এটা হচ্ছে ঘ্রাণ নেওয়ার শক্তি একেবারে লোপ পাওয়া, তবে এটা খুব কমই হয়; আরেকটা হচ্ছে প্যারোসমিয়া—এটা হচ্ছে উল্টাপাল্টা ঘ্রাণ পাওয়া; যেমন নাকের কাছে গোলাপ আনলেন, মনে হলো প্রস্রাবের গন্ধ পাচ্ছেন। আরেকটা হচ্ছে প্যান্টোসমিয়া—গন্ধ নেই, তা-ও আপনি আজগুবি সব গন্ধ পাচ্ছেন।

স্যার, আপনার কথায় আমি অবাক হচ্ছি। আপনি যেভাবে বললেন, ইএনটি স্পেশালিস্টরাও তো এভাবে বোঝাতে পারে না।

থ্যাংক ইউ, নুরুল্লাহ। সব মন্ত্রীর সঙ্গে তো আর এসব আলাপ করতে পারি না। আমাদের এক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে যখন শুনলেন, একটা মাইনর অপারেশন হচ্ছে লোকাল অ্যানেসথেসিয়ায়, তিনি খুশিতে ডাক্তারদের বললেন, এ রকম প্যাট্রিয়টিক ডাক্তারই চাই। সব সময় লোকাল অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করবেন, তাতে বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে, ফরেন অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করবেন না। প্রেসিডেন্টের কথা শুনে, জিন্নাহ ভাই, আমি হো হো করে হেসে উঠি। তারপর তাঁকে বলি, সন্ধ্যায় আপনার বার্থডের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, সেখানেই অনেক দিন পর নাকের ব্লক ছুটে গেছে, আমি ফুলের গন্ধ পেতে শুরু করেছি।

প্রেসিডেন্ট বললেন, বিটিভিতে দেখলাম। আপনাকেও দেখলাম কায়েদে আজমের পাশে গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। আশপাশে ফুলও দেখলাম, সুন্দর মেয়েও। যাক, তাহলে আমি ধরে নিতে পারি যে আপনি ফুল ভালোবাসেন।

স্যার, আপনি আসলে কী জানতে চাইছেন ঠিক বুঝতে পারছি না।

তাহলে আপনার প্রিয় কলিগ আমাদের অর্থমন্ত্রী সদরে মওলা নুরুল আজিজ ভ্যাট বসিয়েছেন কেন? সারা দেশে কয় টাকার ফুল বিক্রি হয় আর আপনারা কয় টাকার ভ্যাট পান? এ দেশের যুবশক্তি আমাদের দলেরও শক্তি। তারা প্রেম করে, ফুল বিনিময় করে। তাদের ওপর খড়্গহস্ত হলে তো আপনারা আমাদের পলিটিকসের বারোটা বাজিয়ে দেবেন।

তাহলে অর্থমন্ত্রীকে ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিতে বলি।

অবশ্যই বলবেন, কিন্তু কাজটা করে পলিটিক্যাল বেনিফিট তো আদায় করতে হবে। আপনিও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে থেকে ঘোষণা দিন—এ দেশের তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রেসিডেন্টের ভ্যালেনটাইনস ডের উপহার : ফুলের ব্যবসায় ভ্যাট প্রত্যাহার।

বললাম, স্যার, অসাধারণ আইডিয়া। তবে একটা কথা স্যার, আমরা কিন্তু ফুলের ওপর ভ্যাট আরোপ করিনি। ওরা যখন ক্ষমতায় ছিল, ওরাই করেছে।

প্রেসিডেন্ট বললেন, ওদের কথা রাখুন, ওরাই তো নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছে। না হলে কি ক্ষমতা হারায় নাকি?

তাহলে স্যার, ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়ে কালই সামারি পাঠাতে বলি।

প্রেসিডেন্ট বললেন, রাখুন আপনার সামারি। তার আগে বেশি প্রচারের কোনো পত্রিকাকে একটি স্কুপ নিউজ করিয়ে দেন—ফুলের ওপর ভ্যাট বসানোতে মহামান্য প্রেসিডেন্ট অসন্তুষ্ট।

দি আইডিয়া, স্যার।

নুরুল্লাহ, আপনি কি সত্যি আবার ফুলের ঘ্রাণ পেতে শুরু করেছেন? ফুল দেওয়ার মতো কাউকে চোখে পড়েছে?

জি স্যার।

তাহলে নুরুল্লাহ, আপনি ভালো কোনো ইউরোলজিস্ট ও অনকোলজিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। লক্ষণটা খারাপ, আপনার প্রস্টেট এনলার্জমেন্ট হয়েছে কি না নিশ্চিত হওয়া দরকার। ব্যাপারটা যদি ক্যান্সারাস হয়ে থাকে, সে জন্যই অনকোলজিস্টের কথা বলছি।

বুঝলেন জিন্নাহ ভাই, এটা বলেই তিনি ফোনটা রেখে দিলেন। আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন, জিন্নাহ ভাই?

আমি বলি : লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ার।

তাহলে আমি আপনাকে লাইনগুলো শোনাই। একটু আগেই মনে পড়েছে।

কোন লাইন, কিসের লাইন?

উনিশ বছর বয়সী মেয়েটি যে লাইন শুনিয়েছিল :

ইটস বাট থাই নেইম দ্যাট ইজ মাই এনিমি

দাও আর্ট মাইসেলফ, দো নট আ মন্টেগু

হোয়াটস আ মন্টেগু? ইট ইজ নট নর হ্যান্ড, নর ফুট

নর আর্ম, নর ফেইস, নর এনি আদার পার্ট

বিলঙ্গিং টু আ ম্যান। ও বি সাম আদার নেইম!

হোয়াটস ইন আ নেইম? দ্যাট হুইচ উই কল আ রোজ

বাই এনি আদার নেইম উড স্মেল অ্যাজ সুইট;

নুরুল্লাহ বাকিটাও শেষ করতে চাইছিল, আমি থামিয়ে দিয়ে বলি, বহুদিন পর ভালো কোনো আবৃত্তি শুনলাম। এখন আমার বেশ মনে পড়ছে, ইংলিশ রিসাইটেশনে তুমি তো বরাবরই ফার্স্ট প্রাইজ পেতে।

নুরুল্লাহ বলল, আমাদের অর্থমন্ত্রী হাঁ করে কথা গেলে, কিন্তু শোনে না। কিন্তু প্রেসিডেন্ট জানেন, ও আমার কথা শোনে। জিন্নাহ ভাই, মেয়েটার মুখে লাইনগুলো শুনে আশ্বস্ত হলেন, নামে কিছু এসে যায় না।

এক্সাক্টলি।

শি ইজ আ মেসাইয়া।

মানে?

মেয়েটি মানুষের ত্রাতা, ভগ্ন মানুষকে জাগিয়ে তোলে। তার এক কথায় আমি জেগে উঠেছি—কী অসাধারণ কথা : বয়স কেবল একটি সংখ্যা।

কথাটাকে আমি আমার শরীর ও মনের সঙ্গে অ্যাসিমিলেট করে নিয়েছি। তার পরপর আপনার পাশে বসে থাকতে থাকতে শরীরে কেমন একটা ঝাঁকি খেলাম। আমার ঘ্রাণের ইন্দ্রিয় জেগে উঠল। আমি আপনার জন্য আনা ফুলের ঘ্রাণ পেতে শুরু করলাম। ফুলের গন্ধ এত চমৎকার, এত উপভোগ্য, আগে কখনো বুঝিনি। আচ্ছা জিন্নাহ ভাই, পরে কল দেব। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিম মিটিংরুমে ঢুকে পড়েছে। বাই।

 

নয়

সংস্কৃতি ও গ্রন্থাগারমন্ত্রী ময়ূরাকৃতির একটি পুষ্পস্তবক বানিয়ে নিয়ে এসেছে। এই মন্ত্রী একজন ভদ্রমহিলা, মন্ত্রীদের যেসব অপবাদ এমনকি তাঁদের কাছের মানুষও দিয়ে থাকে, এ রকম কিছু তার নেই। একসময় সেতার বাজাত, উচ্চাঙ্গসংগীত গাইত। রাজনীতির ধারেকাছেও ছিল না, বরং তার খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ স্বামীকে রাজনীতির কারণে ছেড়ে দেওয়ার একাধিক হুমকিও দিয়েছে। কিন্তু ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই নিজেদের দলের ভেতরের আঞ্চলিক ক্ষমতার লড়াইয়ে সাবেক এমপির ভয়ংকর ড্রাগ-আসক্ত পুত্রের গুলিতে নিহত হয়। খুবই বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজটা করিয়েছে। রেহানা শামসুদ্দিনের স্বামীর এই প্রতিদ্বন্দ্বী যখন ওমরাহ পালন করছে, ঘটনাটা তখনকার। ছেলেটা সেদিনই গ্রেপ্তার হয়, সাবেক এমপি ওমরাহ শেষ করে নিজের নির্বাচন এলাকায় পা রেখে প্রথমই বলে, আমার ভাই, আমার রাজনৈতিক কমরেড শামসুদ্দিন চৌধুরীকে যে-ই হত্যা করে থাকুক, তাকে ফাঁসিতেই ঝুলতে হবে।

   সাবেক এমপি একই সঙ্গে দুটি হিসাব করেছে : প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর বিদায় এবং ঘরের ভেতর প্রধান আপদের হাত থেকে রেহাই।

আমার এত কিছু জানার একটাই কারণ, আমার মায়ের জন্ম ওই নির্বাচনী এলাকায়। আগ্রহটা পঁচাত্তর বছর আগে প্রয়াত আমার মায়ের কারণে। মায়ের মৃত্যুর পর দশ বছর তার গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। গত পঁয়ষট্টি বছরে একবারও যাইনি।

সাবেক এমপি মুলকুতুর রহমান মায়ের দিক থেকে আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়। মুলকুত যখন তার দলের উপজেলা ছাত্রী ফ্রন্টের মৌসুমী আক্তারকে বিয়ে করে ফেলল, ড্রাগ-আসক্ত মাতৃহীন ছেলেটি নতুন মা এবং তার বাবা দুজনকেই বেদম পেটাল। ছেলেকে পুলিশে দিতে চাইলে ছেলে হুমকি দিল—মৌসুমী আক্তারের পেটে বাচ্চা এলে মৌসুমীর নাভি বরাবর বাচ্চাকে গুলি করবে। মুলকুতুর রহমান মার খাওয়ার পরও ছেলেকে ঘাঁটায়নি। তারই এক রাজনৈতিক কর্মীকে দিয়ে ছেলের জন্য ড্রাগের সরবরাহ বাড়িয়ে দিল এবং আজীবন পর্যাপ্ত ড্রাগের সরবরাহ নিশ্চিত হবে এমন একটা প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর সে এমপি শামসুদ্দিন চৌধুরীকে গুলি করল। মুলকুতুর রহমান নিশ্চিত হলো, তার এমপি হওয়ার পথে আর কোনো বাধা নেই। ভোটের আগে ভোটাররা রেহানা শামসুদ্দিনকে শোকবস্ত্র পরিয়ে মঞ্চে তুলে দিল আর বলল, বক্তৃতা দেওয়ার দরকার নেই; স্বামীর কথা মনে করে কাঁদলেই হবে। চাইলে এতিম বাচ্চা হিসেবে মেয়েটাকেও মঞ্চে তুলতে পারেন।

রেহানা শামসুদ্দিন এমপি হয়েই থেমে থাকল না, তার সাংস্কৃতিক পরিচিতি প্রেসিডেন্ট জানার পর তাকে প্রথম দফায়ই প্রতিমন্ত্রী করে দিলেন। দুই বছর পর মন্ত্রী পদে পদোন্নতিও দেন। শুরুতে শামসুদ্দিন চৌধুরী হত্যা মামলার আসামি না হলেও রেহানা শামসুদ্দিন শপথ নেওয়ার পর পুলিশ গায়ে পড়ে মুলকুতুর রহমানকে হত্যা মামলায় হুকুমের আসামি বানিয়ে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। আর থানার ওসি কুতুবউদ্দিন বদলির সময় মৌসুমী আক্তারকে দ্বিতীয় স্ত্রী করে চুনারুঘাট চলে যায়।

রেহানা শামসুদ্দিন আমার দিকে পুষ্পস্তবক এগিয়ে দিয়ে বলল, জিন্নাহ ভাই, আমার হাতে আর কিছু নেই, আমার মিনিস্ট্রির আওতায় যে কয়টা পুরস্কার, সবই আপনি পেয়েছেন আমি যোগ দেওয়ার অনেক আগে। আপনার জন্য আমার শুভেচ্ছা ছাড়া আর কিছু যে নেই।

আমি বললাম, রেহানা, তুমি একসময় ঢাকা বেতারে সেতার বাজাতে, কেন একটা রাষ্ট্রীয় পুরস্কার নিচ্ছ না?

নিজের কথা কেমন করে বলি, জিন্নাহ ভাই।

তাহলে পিছিয়ে যাবে। নিজের কথা নিজেরও বলতে হবে, অন্যদের দিয়েও বলাতে হবে।

আইরিন এসে রেহানা শামসুদ্দিনকে বলল, ম্যাডাম, যদি ডাইনিং টেবিলে আসতেন। ডিনার সার্ভ করা হয়েছে।

রেহানা বলল, অনেক ধন্যবাদ। আমি যে সন্ধ্যা ৭টার পর কিছুই খাই না, চা-ও না, শুধু পানি।

রেহানা বলল, শামসুদ্দিনের নামে একটা লাইব্রেরি করেছি। কোনো মন্ত্রীকে দিয়ে নয়, আপনাকে দিয়ে লাইব্রেরির দ্বার উন্মোচন করাতে চাই। আপনি কি রাজি হবেন? আফটার অল আপনার মায়ের জন্মস্থান।

আমি বললাম, রেহানা, তুমি আমার অবস্থা তো দেখছই। আমি কি পারব?

কী যে বলেন, জিন্নাহ ভাই, আমি কি আপনাকে হাঁটিয়ে নেব নাকি? হেলিকপ্টারে যাবেন, লাইব্রেরির পাশেই হাই স্কুলের মাঠে নামবেন।

আমি বললাম, আমার বয়সটাকে তো একটু গুরুত্ব দেবে। আজকাল হঠাৎ করেই রক্তচাপ ওঠানামা করতে থাকে। জার্নিটা রিস্কি হয়ে যেতে পারে। তখন আমাকে নিয়ে তোমরা বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাবে।

আইরিন সামনে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি তোমার বয়স নিয়ে কিছু বলছিলে?

আমি বললাম, কই, না তো।

বেশ, মনে রেখো, বয়স নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই, আবার আহাজারি করারও কিছু নেই।

আবার ফোন বাজে। ওভারসিস কল। আমার চেয়ে ঠিক পনেরো বছরের ছোট। মিথ্যা বলতে বলতে তার স্টক ফুরিয়ে গেছে। সবাই যে তাকে মিথ্যাবাদী মনে করে, এটা সেও জানে। তবু তাকে গুরুত্ব দেয়। কারণ মিথ্যাটা সে সাজিয়ে-গুছিয়ে বলে।

হ্যালো, জিন্নাহ ভাই, হ্যাপি বার্থডে। নাসির উদ্দিন সাহেব ছাড়া আর কেউ সেঞ্চুরি করতে পারেননি। আপনিই একমাত্র ভরসা। আর মাত্র দশটা বছর।

ঠিকই বলেছ, শরাফত। সেঞ্চুরি করতে চাইলে দশ বছর, ডাবল সেঞ্চুরি করতে চাইলে এক শ দশ বছর, ট্রিপল সেঞ্চুরি করতে চাইলে আর মাত্র দু শ দশ বছর আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। শরাফত, আমাকে তোমরা কচ্ছপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামাতে চাও?

জিন্নাহ ভাই, মাথার ওপর তো একটা ছাতা লাগে। আপনি হচ্ছেন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ছাতা। যত দিন ছাতাটা মেলা থাকবে, আমরা তত দিনই আশ্বস্ত থাকব, রোদ-বৃষ্টি আপনি সামলাবেন। কিছুক্ষণ আগেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তিনি বললেন, জিন্নাহ সাহেব তো আমাদের সংস্কৃতির সবচেয়ে শক্ত খুঁটি। ও আচ্ছা, প্রেসিডেন্ট আপনাকে আজ ফোন করেননি?

না তো। তিনি কখনো আমাকে ফোন করেননি।

তাহলে ফোনটা আপনার এনগেজড ছিল। আমাকে বললেন, পার্সোনালি আপনাকে হ্যাপি বার্থডে বলবেন।

আমি বললাম, তার কি দরকার। তিনি এমনিতে অনেক ব্যস্ত। তাঁর অফিসের শামিম আহসান তো প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছাসহ দেখা করে গেছে। সংস্কৃতিমন্ত্রীও এসেছিল।

 শরাফত বলল, শামিম আহসান একটা বড় ফ্রড। প্রেসিডেন্টের নামে ফুল নিয়ে যে এসেছে, এটা সম্ভবত প্রেসিডেন্ট জানেনই না। ওকে বিশ্বাস করবেন না। সে তার প্রয়োজনমতো প্রেসিডেন্টের কান ভারী করে আর প্রেসিডেন্ট তা-ই বিশ্বাস করেন।

আমি বললাম, শরাফত, সে অভিযোগ তো তোমার বিরুদ্ধেও ছিল, তুমিও সেই একই দেশের এজেন্ট।

জিন্নাহ ভাই, সেই অভিযোগ কি আপনার বিরুদ্ধে নেই? এতগুলো পদক-খেতাব—এসব কি এমনিই আপনাকে দিয়েছে?

দেখো শরাফত, মেজাজটা শান্ত রাখতে চাই। তার ওপর আজ আবার জন্মদিন। আমার বয়সের ব্যাপারটাও তো খেয়াল রাখবে।

জিন্নাহ ভাই, করজোড়ে মাফি মাঙ্গি। কিন্তু আজকে সত্যিই কি আপনার জন্মদিন?

মানে তারিখটা কি ঠিক? ২৩ ফেব্রুয়ারি আমি কেকটেক কাটি, মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নেভাই। কিন্তু আসল বার্থডে কবে জানি না। এক দেবেন ঠাকুর ছাড়া নোট বইয়ে কেউ বাচ্চাকাচ্চা জন্মের দিনক্ষণ লিখে রেখেছেন বলে জানা নেই। যেমন—আজ আপনার জন্মদিন হতেও পারে, না-ও হতে পারে। আপনার বয়স আজ নব্বই হতে পারে, একানব্বই হতে পারে, উননব্বইও হতে পারে। আসলে জিন্নাহ ভাই, আমারটা-আপনারটা জন্ম উদ্যাপনের দিন। নাকি ভুল বললাম?

শরাফত, আমি বেশ বুঝতে পারছি, বিনে পয়সায় পাওয়া হুইস্কি তুমি নিশ্চয়ই কয়েক পেগ বেশি মেরে দিয়েছ। ইটস ওকে। তোমার রাগটা যার ওপর, তার সঙ্গেই রাগ ঝাড়ো। আমার মতো ঘরে বসা বুড়ো মানুষকে নিয়ে তুমি এত বিচলিত কেন?

ঘরে বসে থেকেই আপনি খবরদারি-নজরদারি সব করে যাচ্ছেন, আর বাইরে থাকলে তো সুইডেনের নোবেল কমিটিকেও এটা-ওটা ডিকটেট করতেন। নাকি ভুল বললাম?

ঠিক আছে, শরাফত, অন্যদিন কথা হবে।

জিন্নাহ ভাই, প্রেসিডেন্টের দৌহিত্রের খতনা উপলক্ষে যে মেগা স্যুভেনির বেরোবে, আপনিই নাকি সেটার প্রকল্প পরিচালক?

মোটেও না।

জিন্নাহ ভাই, মার্কেটে আপনার ক্রেডিবিলিটি আছে। তা ছাড়া আপনার দাদা ও তাঁর আপন এক ভাই অবিভক্ত বাংলার হাজাম ছিলেন। নাকি ভুল বললাম?

 শরাফত, তুমি ভুল বলার মানুষ নও। কিন্তু কথার শেষে ‘নাকি ভুল বললাম’—এই মুদ্রাদোষটা ত্যাগ করার জন্য একসময় অনেক বড় বড় মানুষ তোমাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন শুনেছি। তুমি মুরব্বিদের মান্য করলে নিজেকে মুদ্রাদোষমুক্ত করতে পারতে।

নিজের মুদ্রাদোষ তো আর নিজের কাছে ধরা পড়ে না। বড় ভাইরা ধরিয়ে দেন; কিছু সংশোধন হয়, কিছু থেকে যায়। এবার, জিন্নাহ ভাই বলুন, আজ যে আপনার জন্মদিন, এর কোনো প্রমাণ আছে?

এই প্রমাণটা তোমার দরকার হয়ে পড়ল কেন?

আপনার পনেরো বছর পর জন্মগ্রহণ করার পর এবং তুলনামূলকভাবে আপনার বাবার চেয়ে আমার বাবা সচ্ছল হওয়ার পরও আমার জন্মদিন ঠিক করে দিয়েছেন স্কুলের হেডমাস্টার, আর আপনারটা ঠিক করলেন কোন দেবেন ঠাকুর?

আমি বললাম, দেখো শরাফত, তুলনামূলক সচ্ছলতা কোনো ইন্ডিকেটর নয়; বরং তুলনামূলক শিক্ষার কথা বলতে পারো। আমার বাবা ফারসি ভাষা পড়তে ও লিখতে পারতেন, তিনি বয়স চল্লিশ পেরোনোর পর হাজামের কাজ করেননি। মুন্সি হিসেবে কাজ করেছেন।

জি জিন্নাহ ভাই, প্রমথনাথ বিশির কেরি সাহেবের সেয়ানা মুন্সিজির কথা মনে পড়ছে। তা ঠিক আছে, আপনার পড়াশোনা তো মাদরাসায়। মানি, আপনি ভালো ছাত্র ছিলেন, বাংলা স্কুলে ভর্তি হয়ে ভালো করেছেন, ইংরেজিতেও ভালো করেছেন, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আজই আপনার নব্বইতম জন্মদিন।

কেন, আজকের দিনটা নিয়ে তোমার কোনো সমস্যা আছে নাকি?

না, জিন্নাহ ভাই, আপনারটা আপনার, আমারটা আমার।

তা ছাড়া, শরাফত, আমি কোনো অদলবদলও করিনি। খুশবন্ত সিংয়ের কথাটাই ধরো না। কাগজে-কলমে তাঁর জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৫, আর তাঁর মা ভীরা বাই আর দাদি লক্ষ্মী বাই জানালেন, তাঁর জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯১৫। নিন্দুকরা বলল, যেহেতু ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট, নিজের জন্মদিনটা মহিমান্বিত করতে খুশবন্ত সিং ১৫ আগস্ট বেছে নিয়েছেন। ভীরা বাই বললেন, আমার ছেলের জন্ম ভারত স্বাধীন হওয়ার বত্রিশ বছর আগে, ভারত যে একদিন স্বাধীন হবে—এটা আমি তখন চিন্তাই করিনি।

থাক জিন্নাহ ভাই, জন্মদিনের কথা থাক। শামিম আহসান বলেছিল, ওই স্যুভেনির প্রজেক্টটা দেবে। আমি কাজও শুরু করেছিলাম। আমি ব্রিটিশ পোয়েট লরিয়েটের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য গাঁটের টাকায় একজন এজেন্টও নিয়োগ করেছি। এজেন্ট বলেছেন, তাকে রাজি করাতে পারবেন।

কী রাজি করাবেন? শরাফত, তোমার কথা আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। পোয়েট লরিয়েট কী করবেন?

শরাফত খোঁচা দিয়ে আমাকে বলল, এই সামান্য ব্যাপারটা আপনার মাথায় ঢুকছে না, অথচ আপনি দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী!

দেখো শরাফত, কখনো দাবি করিনি যে আমি দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী কিংবা বাসে-লঞ্চে-ট্রেনে বিক্রি হওয়া সাধারণ জ্ঞানে চটি বইতেও কোথাও লেখা নেই যে দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীর নাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তবে কত সালে ঠিক মনে নেই, দেশের একটি বড় পত্রিকায় হেডিংটা পড়েছি—শীর্ষ সন্ত্রাসী সুইডেন আসলাম গ্রেপ্তার।

শরাফত বলল, সন্ত্রাসী হলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমা চলে, গ্রেপ্তার করা যায়, কিন্তু বুদ্ধিজীবী হলে গায়ে হাত দেওয়ার সমস্যা আছে। পুলিশও বুদ্ধিজীবীদের পরোয়া করে। এই যেমন ধরুন, মেগা প্রজেক্টটা আপনি তো ওদের কারো মতোই আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিলেন। অথচ আমি...।

অথচ তুমি কী করেছ বলো?

আমি যা করেছি, আপনি তা করতে পারতেন না। ‘অন সারকামসাইজিং প্রেসিডেন্টস গ্র্যান্ড সন’ নামে একটি কবিতা লেখার অনুরোধ পোয়েট লরিয়েটকে পাঠিয়েছি। আমি এটাও বলেছি, কবিতার জন্য টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেন্ট তাকে যে কয়েক পাউন্ড স্টার্লিং দেয়, আমি ঠিক এর দশ গুণ দেব। আপনি বুকে হাত দিয়ে বলুন, জিন্নাহ ভাই, আপনি কি পোয়েট লরিয়েটকে এমন একটা অনুরোধ জানাতে পারতেন?

শরাফত, তুমি ঠিকই ধরেছ, এটা যে আমি করতে পারতাম না, এ সম্পর্কে নিশ্চিত। শুধু নিশ্চিত নই, এ রকম একটা আইডিয়া আমার মাথায়ও আসত না। কিন্তু তোমার মাথায় তো আসার কথা, তুমি জার্মানি, ব্রিটেন আরো কোথায় যেন সাঁইত্রিশ বছর কাটিয়ে দিয়েছ। এখনো এক সপ্তাহ লন্ডনে তো পরের দুই সপ্তাহ এথেন্স, তার পরের সপ্তাহ রোম। বড় বড় কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে তোমার চেনাজানা থাকারই কথা। বাংলা ভাষার বাইরের খুব কম লেখককেই আমি চিনি।

শরাফত বলল, জিন্নাহ ভাই, ঠাট্টা করছেন?

না না, ঠাট্টা হবে কেন, মন থেকেই বলছি। একটা বিষয় জানতে ইচ্ছা করছে, ব্রিটেনের পোয়েট লরিয়েট প্রেসিডেন্টের নাতির খতনা নিয়ে কবিতা লিখতে রাজি হবেন?

কেন হবেন না? সরকারি কবি না? আমাদের কবিদের মতোই তো।

তাহলে শরাফত, তুমি বরং তিনটা কাজ করবে—এই কবিতাটা বাংলায় অনুবাদ করবে আর এর ইলাস্ট্রেশনটাও তুমি নিজের হাতে করে দেবে। ওয়াটার কালার ব্যবহার করবে। অনেক দিন তোমার আঁকা ছবি চোখে পড়ছে না।

জিন্নাহ ভাই, আপনি যে বললেন তিনটি কাজ।

দুটি তো বললামই, আর তিন নম্বরটা একটু বড় কাজ। আমারই লেখার কথা ছিল, কিন্তু হাত এতই কাঁপে যে একটা শব্দের ওপর আরেকটা শব্দ উঠে যায়।

ওসব কথা থাক, শরাফত। তুমি বরং মূল প্রবন্ধটাও লিখে ফেলো।

খতনার ইতিহাসটা একটু বিস্তারিতভাবে লিখো। পিটার রেমনদিনোর ‘হিস্ট্রি অব সারকামসেশন’ বইটা যদি পাও তাহলে লিখতে সুবিধা হবে। ইংরেজিটা একটু পুরনো ধাঁচের, ১৮৯১ সালের বই কি না। আরেকটা কথা, পনেরো হাজার বছর আগেও পুরুষের খতনা হয়েছে—এটা মাথায় রেখো। এইচআইভি-এইডস আসার পর খতনার গুরুত্ব আরো বেড়ে গেছে—ঠিক এ জায়গাটায় নাতিকে সেট করে তোমার লেখা এগিয়ে নেবে। আমার একটা শুধু পরামর্শ, তোমার লেখায় অকারণে নারী-খতনা নিয়ে টানাটানি করতে যেয়ো না। যদি তোমার লেখাটা কাউকে দিয়ে ইংরেজি করাতে পারো তাহলে এটাকে কি-নোট পেপার ধরে একটা আধবেলার সেমিনারও করা যাবে।

এবার বিগলিত হয়ে শরাফত বলল, তাহলে আপনি কী লিখবেন, জিন্নাহ ভাই?

আমি ভিআইপি গোছের কেউ হলে একটা শুভেচ্ছাবাণী দিতে পারতাম। অগত্যা কাউকে দিয়ে আমার নামে স্যুভেনিরের ভূমিকাটাই লেখাতে হবে।

শরাফত আরো বিগলিত হয়ে বলল, বুদ্ধিজীবী হিসেবে আপনিও যদি ভিআইপি না হন, তাহলে তো আমাদের পাত্তাই নেই।

আর বলো না ভাই, আমার গোড়ালির বয়সীরাও শুনি ভিআইপি হয়ে গেছে। যখন সিআইপি, মানে কমার্শিয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন খেতাব দেওয়া শুরু হলো, আমি আইআইপির একটা প্রস্তাব দিয়েছিলাম।

আইআইপি? এটা আবার কী?

ইন্টেলেকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন।

ওয়াল্ডারফুল আইডিয়া। জিন্নাহ ভাই, এটা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। এটা একটা গ্র্যান্ড প্রজেক্ট। আমরা ঠিক করব কে হবে ইন্টেলেকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন। প্রতিবছর নভেম্বরের শেষ দুই সপ্তাহ আপনার সঙ্গে কাটাব। জানুয়ারির প্রথম দিন ডিক্লারেশন হবে।

ঠিক আছে, তুমি খতনা নিয়ে প্রবন্ধটা লিখে শেষ করো। এখন রাখতে হচ্ছে। গেস্টরা বিদায় নিচ্ছেন।

শরাফত বলল, তাহলে আপনাকে রাত এগারোটার পর ফোন দেব।

শরীরটা টায়ার্ড, যদি ঘুমিয়ে না পড়ি ধরব।

 

 

দশ

আইরিন ক্ষুব্ধ। আমাকে দেওয়া থিক স্যুপটা শেষ করিনি। একটার পর একটা ফোন ধরেছি। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সঙ্গে কথাও বলিনি। কানে ফোন, এক হাত বন্ধ, অন্য হাতে ইশারায় ধন্যবাদ ও বিদায় বলেছি।

আইরিন বলল, কাল যদি তোমার একটা দুর্ঘটনা ঘটে, আমি তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারব না, এমনকি কোনো ডাক্তারও ডাকতে দেব না। আজ রাতেই যদি ঘটে, তাহলে কী হবে?

অপরাধীর মতো বলি, আই অ্যাম রিয়েলি স্যরি।

আমার মুখে রিয়েলি স্যরি শোনার পর আইরিন আরো খেপে গেল।

বলল, ইউ আর আ লায়ার। আমার দিকে তোমার কোনো অ্যাটেনশন নেই।

আমি অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে রাখি। শেষ গেস্ট কয়জন বের হওয়ার পর আইরিন দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। মানতেই হবে তারা স্বেচ্ছায় বেরোয়নি, আইরিন অনেকটা আকুতি নিয়ে বলেছে, মানুষটাকে ওষুধ খাওয়াতে হবে। তাহলে আজকের মতো বিদায়।

কিন্তু হঠাৎ কলিংবেল বাজতেই থাকে।

দরজা খুলতেই একসঙ্গে তিনজন ঢোকেন।

বিরোধী দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, অর্গানাইজিং সেক্রেটারি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কালচারাল সেক্রেটারি। প্রথম দুজন পুরুষ, পঞ্চাশোর্ধ্ব এবং তৃতীয়জন নারী, বয়স তিরিশের ঘরে।

আমি ফিসফিস করে বলি, রাগ করো না, আইরিন। এটা একটা পলিটিক্যাল ব্যালান্সের ব্যাপার। আমাকে আরেকটু কথা বলার সুযোগ দাও।

তাদের হাতে মাঝারি আকারের পুষ্পস্তবক, তবে সুন্দর। এটাই সৌজন্য।

আমি চললাম, বলে আইরিন বেরিয়ে গেল। ডাকলাম, শুনল না। ঘরের ভেতরের স্পাইরাল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে।

আমি অপেক্ষমাণ দুজন ওয়েটারের একজনকে বলি, গেস্টদের কিছু খেতে দাও।

যারা খাবার সরবরাহ করেছে, তারাই ওয়েটার দিয়েছে। ভেবেছিলাম তাদের অন্তত একজন বলবে, বেশ রাত হয়ে গেছে, আজ থাক, অন্যদিন এসে খেয়ে যাব।

কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট কালচারাল সেক্রেটারি রেহনুমা আফসারি ওয়েটারকে বলল, এই যে ভাই, অনেকক্ষণ ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে, হেভি ক্ষুধা, সলিড কিছু খেতে দেবেন। সলিড কিছু মানে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, ফ্যাট মেশানো কোনো খাবার।

ওয়েটার বলল, ম্যাডাম, কাচ্চি আছে।

রেহনুমা বলল, ওয়ান্ডারফুল।

রেহনুমা আবার বলল, স্যার, এই প্রথম আমি কারো নব্বইতম জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে এলাম। আমরা ভাগ্যবান আপনাকে এত দিন পেয়েছি।

আমি বললাম, কয়েক দিন আগে গ্যালাপাগোস আইল্যান্ডে একটা কচ্ছপের আড়াইশতম জন্মদিন পালন করা হলো।

রেহনুমা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করা মেয়ে, বিয়েও করেছিল এক ইংরেজ বোহেমিয়ানকে। সেপারেশন চলছে, ডিভোর্সও হয়ে যাবে। রেহনুমার নানা সে যুগের ব্যাংকার তৈয়বউদ্দিন আহম্মদও আমার ক্লাসমেট, ইউনিভার্সিটি জীবনের।

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মির্জা নাথান (একই নামের একজন লেখকও ছিলেন, ‘বাহার-ই-স্থান ই গায়বী’ গ্রন্থের লেখক) বলল, এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে নয়, আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে মুক্ত পরিবেশে আপনার জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন করব।

বয়স বেশি হওয়ার বাড়তি একটা সুবিধা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ বয়োকনিষ্ঠদেরও অবলীলায় তুমি বলা যায়।

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টের কথা শুনে বয়স নিয়ে একটু ঠাট্টা করতে ইচ্ছা করল। বললাম, মির্জা নাথান, তোমাদের (এতক্ষণ আপনি বলার পর এবার তুমি) উদ্যাপনের জন্য আরো দশ বছর বেঁচে থাকতে হবে?

কী যে বলেন, দেখতে দেখতে দশ বছর কেটে যাবে।

আমি বললাম, বেঁচে থাকতে আমার কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু তোমরা এত দিন বাঁচবে তো?

কেবল রেহনুমা খিলখিল করে হেসে উঠল। পুরুষ দুজন সম্ভবত কথার প্যাঁচটা বোঝেনি।

এ সময়ই শামিম আহসানের ফোন। এড়িয়ে যাব, তারও উপায় নেই। আমি হ্যালো বলতেই শামিম বলল, লন্ডন থেকে শরাফত হোসেন তালুকদার তাকে বলেছে, আমি প্রধানমন্ত্রীর নাবালক নাতি সম্পর্কে বাজে মন্তব্য করেছি। আমার যে প্রবন্ধটি লেখার কথা, বিরোধী দলের কাছে ভালো সাজার জন্য শরাফতের হাতে-পায়ে ধরে বলেছি, যেনতেন করে প্রবন্ধটি লিখে দাও। খতনার স্মরণিকা তো আর কেউ পড়বে না, সমস্যা নেই।

তোমার কি মনে হয় শরাফত যা বলেছে সত্য?

আমি বিশ্বাস করছি না, তবু আপনার সঙ্গে চেক করে নিলাম।

আমি তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব।

শামিম আহসানের কথা শোনার পর মনে হলো, শরাফত হোসেন তালুকদারের সঙ্গে আলাপ করাটা ঠিক হয়নি। নিজের ওপর রাগ বাড়ল। কারণ শরাফত এমন করতে পারে আমি জানতাম, তার পরও আইরিনের চোখ-রাঙানি উপেক্ষা করে কথা বলে গেছি।

বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তবু বললাম, তোমাদের নেতাকে আমার ধন্যবাদ দিয়ো।

যদিও আমাকে কেউ দায়িত্ব দেয়নি, তবু বিরোধী দলকে পরামর্শ দিলাম, তোমরা পার্লামেন্ট সেশন অ্যাভয়েড করছ কেন? তোমরা থাকলে ভয়েস রেইজ করতে পারতে। দেখছ না, কিছু ব্ল্যাক ল পাস হয়ে যাচ্ছে?

মেয়েটির কাচ্চি বিরিয়ানি খাওয়ার উচ্ছ্বাস দেখে অপরিণত বুদ্ধির বলে ভাবছিলাম। কিন্তু খুব পাকা রাজনীতিবিদের মতো বলল, করতে দিন, আরো করুক। গভর্নমেন্ট ফর্ম করার পর কালো আইন সবার আগে তাদের ওপরই প্রয়োগ করব। আসলে নিজেরা মার খাওয়ার জন্য কিছু লিগ্যাল টুল আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের ব্ল্যাক ল যত বেশি করবে, তত আমাদের সুবিধা।

রেহনুমার কথা আমার বিষণ্নতা ঘুচিয়ে দিল। আমি বললাম, এটা ঠিক নয়, তোমরা মন্দের প্রতিযোগিতায় কেন নেমেছ, ভালোর প্রতিযোগিতা করো।

রেহনুমা বলল, এ দেশের রাজনীতিতে প্রতিযোগিতা মন্দেরই, অধিকতর মন্দই তার চেয়ে কম মন্দকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসে। গ্রেশামের তত্ত্বে বলে না, ব্যাড মানি ড্রাইভস গুড মানি আউট অব সার্কুলেশন। রাজনীতি এ রকম। ভালোর কম্পিটিশন বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে।

আমি ঢোক গিললাম। ডাহা মিথ্যা কথা। বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে মেয়েটির তাহলে কোনো ধারণাই নেই। তাদের কম্পিটিশনটাই সবচেয়ে নোংরা।

আমি আইরিনকে ডাকলাম, পরিচয় করিয়ে দেব, সে-ই আমার বাড়ির ল্যান্ডলেডি কাম ম্যানেজার কাম কেয়ারটেকার।

 

গোলাম রসুল এসে বলল, আপা দোতলার সোফায় ঘুমিয়ে আছে। রাত পৌনে এগারোটা বাজে। ওয়েটাররা চলে যেতে চাইছে।

এতে কাজ হয়। আবারও জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনজন বেরিয়ে যায়।

অবশিষ্ট খাবার যে অবস্থায় আছে সেভাবেই রেখে ওয়েটারও বিদায় নেয়। কাল এসে খাবারের কনটেইনারগুলো নিয়ে যাবে।

ওয়েটাররা যখন বেরোচ্ছে, আরো একজন গেস্ট, মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী নুরুল্লাহ দ্বিতীয়বারের মতো এলো। আমিই বলি, তুমি আবার এলে?

আমি দেখি তার দুই হাতে দুটি ফুলের তোড়া।

বলল, আসার সময় রাস্তায় জ্যাম ছিল না, একটানে চলে এসেছি। তখন খালি হাতে এসেছিলাম। ভাবলাম আপনাকে একটা আর মেয়েটাকে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে যাই। খুব তাজা ফুল। বুঝলেন, জিন্নাহ ভাই, মেয়েটার কথায় মনে হচ্ছে আমার বয়স পঞ্চাশ বছর কমে গেছে। আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে, বয়স কেবল একটা সংখ্যা, এর বেশি কিছু নয়।

কিন্তু নুরুল্লাহ, এত রাতে কি মেয়েটার এখানে থাকার কথা?

তাহলে সে কোথায় থাকে? তাকে যে তোড়াটা দিতে চাই।

আমি জানি তুমি আমার মতো নব্বই বছর বয়সী কাউকে দেখতে দ্বিতীয়বার আসোনি, তুমি আইরিনকেই দেখতে এসেছ। কোনো অসুবিধা নেই, তুমি দুটি ফুলের তোড়াই তাকে দাও।

সেটা ঠিক হবে না, জিন্নাহ ভাই।

ও কি শাফিনাজের সঙ্গে মগবাজারের বাড়িতে থাকে?

শাফিনাজ এখন ধানমণ্ডি থাকে, সাতের এ-তে।

তাহলে তো দূরে নয়। কিন্তু এত রাতে কি আমার যাওয়া ঠিক হবে?

না, ঠিক হবে না।

তাহলে কী করব?

অপেক্ষা করো, ব্যবস্থা করছি।

আরো একটি ফোন। জামান। গোয়েন্দা সংস্থার অফিসার। জামান বিভিন্ন সময় আসে, ফোন করে। গোয়েন্দা সংস্থাকে সঠিক তথ্য দেওয়াটা জরুরি বলে আমি মনে করি। তথ্যের হেরফের হলে জাতীয় নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে।

স্যার, আপনার আশপাশে কেউ থাকলে কেবল হ্যাঁ বা না-তে জবাব দেবেন। প্রশ্নগুলোর উত্তর যত সংক্ষেপে সম্ভব দেবেন।

আচ্ছা।

আপনার কি আজ জন্মদিন?

হ্যাঁ।

শুভ জন্মদিন, স্যার। আপনার বাসায় কি এখন মহাকাশমন্ত্রী?

হ্যাঁ।

অপজিশনের তিনজন আপনাকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন?

হ্যাঁ।

তাঁরা সাঁইত্রিশ মিনিট আপনার বাসায় ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা হয়েছে কি?

না।

আপনি কি ব্ল্যাক ল নিয়ে এজিটেট করার জন্য তাঁদের পরামর্শ দিয়েছেন? মনে করে দেখুন।

আমি বলে দিই, না।

স্যার, ভুল করছেন। রেহনুমা আফসারি কিন্তু আমাদের প্যারোলে আছে। সরকারি দল থেকে তাকে সংরক্ষিত আসনে এমপি করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কাচ্চি বিরিয়ানি থেকে শুরু করে ব্ল্যাক ল পর্যন্ত ডিসকাশন—সবটার অডিও রেকর্ড পেয়ে গেছি।

শুনে আমি থ হয়ে থাকি। জামান পর পর দুবার বলল, স্যার কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

আপনি কি সত্যিই ওদের লোক?

এবার আর হ্যাঁ ও না-তে নিজেকে সীমিত রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করি, জামান, এবার বলো তুমি কী পেয়েছ? এসব প্রশ্ন করছ কেন?

এদের সিনিয়র ভাইস প্রেডিসেন্ট তো তা-ই বললেন। স্যার, মহাকাশমন্ত্রী কি কোনো কনস্পিরেসিতে জড়িত? থাক স্যার, এটার জবাব এখন দিতে হবে না। তিনি তিনটি ফুলের তোড়া কিনে ছিলেন। র‌্যাডিসনে বিরোধী দলের সেকেন্ড ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কয়েক মিনিট একান্তে কথা বলতে দেখা গেছে এবং তিনি তাঁকে একটি ফুলের তোড়াও দিয়েছেন। আজ থাক স্যার, কাল সুবিধামতো সময়ে আসব। আপনি কনস্পিরেসিতে নেই, আমরা জানি, কিন্তু আপনার মাধ্যমে কিছু নেগোসিয়েশন হচ্ছে বলে আমাদের ধারণা।

আমার বিচলিত হওয়ার কথা। কিন্তু নুরুল্লাহই বিষয়টা সহজ করে দেয়। নুরুল্লাহ বলল, বুঝলেন জিন্নাহ ভাই, স্বৈরাচারী সরকারও সোহাগী স্ত্রীর চেয়ে উত্তম। ওখানে অপজিশনের সেকেন্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট মোবারক হোসেন একটা মিটিং করছিল। হঠাৎ তার স্ত্রী এসে চেঁচামেচি শুরু করল—আজ আমাদের ম্যারেজ ডে, আর তুমি এখনো মিটিং করছ। তারপর টেনেহিঁচড়ে স্বামীকে মিটিং থেকে বের করল। আমি সামনে পড়ে গেলাম। অমনি তার স্ত্রী বলল, নালিশ শোনানোর লোক পেয়েছি।

শোনেন ভাই, আজকে আমার ম্যারেজ ডে। ওর খবর নেই। বাড়িতে এক্সপ্লোসিভ রাখার একটা মামলা দিয়ে ওকে শিকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখুন। কসম খোদার, এবার মোবারকের জামিনের জন্য কামরুন্নেসা যাবে না।

আমি বলি, কামরুন, তোমার রাগ সংবরণ করো। হিন্দু শাস্ত্রে ক্রোধকে বলা হয়েছে চণ্ডাল। তাহলে শোনো, মোবারক ফুল আনার দায়িত্বটা আমাকেই দিয়েছিল, কিন্তু আমার দেরি হয়ে যাওয়ার কারণে তোমার হাজব্যান্ডও লেট করে ফেলল।

একটি তোড়া মোবারককে দিয়ে বললাম, ওয়াইফকে উইশ করো। ফুল পেয়ে কামরুন্নেসার রাগ কমল, মিষ্টি হেসে বলল, মোবারকের বদলে আপনাকে বিয়ে করলেই ভালো ছিল।

আমিও হাসতে হাসতে বললাম, কখনো মোবারককে ছেড়ে দেওয়ার পাকা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললে আমার সঙ্গে যোগাযোগ কোরো। আরেকটা কথা শোনো, বয়স কোনো বাধা নয়, এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার।

শোনেন জিন্নাহ ভাই, মোবারক তো আপনাদের পার্টিতেই ছিল। একবার ইলেকশনে তার বদলে এক টাকা-পয়সাওয়ালা চামড়ার আরতদারকে নমিনেশন দেওয়ায় রাগ করে দল সে ছেড়ে দেয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাস করে, দল আবার তাকে টানলেও তার অভিমানের জয় হয়, অপজিশন মোবারককে লুফে নেয়।

মেজাজটা ঠিক হয়ে যাওয়ার পর কামরুন্নেসা বলল, আপনিও আমাদের সঙ্গে খাবেন। আমি হাতের বাকি দুই তোড়া ফুল দেখিয়ে বললাম, স্পেশাল ডে শুধু তোমাদেরই থাকবে, বয়স বেশি বলে আমাদের থাকবে না? আমার একটা ডেটিং আছে।

কামরুন্নেসা বলেনি, বয়স কেবল একটা সংখ্যা। বলেছে, ইয়াং মেয়েরা বুড়োদের আরো বেশি পছন্দ করে। আর বউ ছাড়া মন্ত্রী পেলে তো কথাই নেই। আমার মতো চোখ-কান খোলা একটা বউ আছে জানার পরও মোবারকের পার্টির অসভ্য মেয়েগুলো পারলে ওকে গিলে খায়। আগে শুধু একচেটিয়া পুরুষদেরই দোষ দিতাম, এখন বেশ বুঝতে পারছি তালি তো এক হাতে বাজে না।

নুরুল্লাহর দ্বিতীয় স্ত্রী প্রয়াত নয়, তার সঙ্গে তালাকও হয়নি, কোনো যোগাযোগও নেই প্রায় কুড়ি বছর। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার তালাক অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, সাধ করে বিয়ে করলেও নবাববাড়ির মেয়ে লালন-পালনের আর্থিক সামর্থ্য তার ছিল না। একটি কন্যাসন্তানসহ তার স্ত্রী নবাবজাদি আশরাফুন্নেসা খানম বাবার বাড়ি ফিরে যায় এবং তার বড় বোন নবাবজাদি মেহেরুন্নেসা খানমের অকালমৃত্যুর পর দুলাভাই শান্তিপুরের মুসলমান জমিদার সৈয়দ হাশিম রেজাকে বিয়ে করে সংসার করতে থাকে। নুরুল্লাহর একমাত্র মেয়েটি বিদেশে পড়াশোনা করার সময় ফরাসিভাষী এক কানাডিয়ানকে বিয়ে করে কুইবেক শহরে বসবাস করতে থাকে। সেই মেয়ের নাম নিস্তার জাহান, সেখানকার একটি ইউনিভার্সিটির প্রক্টর।

এই ঘটনার অনেক বছর পর মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার তিন মাসের মধ্যেই তার চেয়ে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের ছোট, তার পিএ হুসনা বানুকে বিয়ে করে। বিয়ের দ্বিতীয় মাসেই যথেষ্ট অর্থ, স্বর্ণালংকার ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী নিয়ে ভারী বোরকা পরে মিন্টো রোডের বাড়ি ছেড়ে যায়। মন্ত্রী রাশিয়ার চেরনোবিল পরিদর্শন করে ফেরার পর দেখল, ঘর শূন্য। চিঠিও পেল একটি, ‘আমাকে খুঁজিবার চেষ্টা করিবেন না। আমার পেছনে পুলিশ লাগাইবেন না। আমাকে শান্তিতে থাকিতে না দিলে আপনার যৌন অক্ষমতাসহ অন্যান্য বিষয় আমি ফাঁস করিয়া দিব। হুসনা বানু।’

চিঠিতে সত্যিই এসব কথা লেখা ছিল কি না জানি না। বানোয়াট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে একটি চিঠি রেখে যে হুসনা বানু চলে গেছে, তা নুরুল্লাহর মুখেই শুনেছি।

নুরুল্লাহ যখন মোবারকের স্ত্রী কামরুন্নেসাকে বলল, একটা ডেটিং আছে, কামরুন্নেসা জিজ্ঞেস করল, ফুলের তোড়া দুটি কেন? নুরুল্লাহ বলল, যদি ওর বোনটোন থাকে, তা না হলে সম্ভাব্য শাশুড়িকেও দেওয়া যাবে।

নুরুল্লাহর সেই তরুণী স্ত্রী ভারী বোরকা পরে বছর না যেতেই একবার ফিরে এসে তার পা ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করেছে এবং তাকে ধর্মপিতা সম্বোধন করেছে এবং পাঁচ শ টাকার নোট জাল করার মেশিনসহ গ্রেপ্তার হওয়া তার স্বামী জুয়েল মিয়াকে রিমান্ডে নেওয়ার পর যেন বেশি শারীরিক অত্যাচার না করা হয়, সে তদবির করার অনুরোধ জানিয়েছে।

হুসনা বানু মন্ত্রীকে বিয়ে করার সঙ্গে সঙ্গেই চাকরি থেকে ইস্তফা দেয়, এটা নুরুল্লাহর ইচ্ছায়ই করতে হয়েছে। তার মন্ত্রণালয়ের সচিবও তাকে এ পরামর্শই দিয়েছিল।

হুসনা বানু তাকে আরো জানায় যে সে পর পর তিনটি ভুল করেছে। প্রথমত, এত নিচু পদে চাকরি করে এত উঁচু পদের মন্ত্রীকে বিয়ে করা ঠিক হয়নি। দ্বিতীয়ত, বিয়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ চাকরিটা ছেড়ে দেওয়া ঠিক হয়নি। তৃতীয়ত, ভালো করে না জেনেশুনে জুয়েল মিয়াকে বিয়ে করাও ঠিক হয়নি। জুয়েলের একটি কিডনি শতভাগ নষ্ট, কাশির সঙ্গে রক্ত ঝরে, সম্ভবত যক্ষ্মায়ও ভুগছে। আবার টাকা জাল করার মতো দুঃসাহসী কাজও করছে।

নুরুল্লাহ চুপচাপ শুনেছে, কোনো কিছু করবে এমন প্রতিশ্রুতি দেয়নি। সাবেক তরুণী স্ত্রীকে দেখে আবেগপ্রবণ হয়েও ওঠেনি। মন্ত্রীর মতোই আচরণ করেছে। বলেছে, আচ্ছা দেখি।

হুসনা বানুকে আপনি সম্বোধন করে কথা বলেছে। আপনি শুনে হুসনা বানু কিছুক্ষণ থ হয়ে থেকে তাকে স্যার বলতে শুরু করেছে, স্যার জুয়েলকে বাঁচান, নতুবা আমার কিছুই থাকবে না। একেবারে শেষ হয়ে যাব।

 

 

এগারো

হঠাৎ ঘুমভাঙা আইরিন হুড়মুড় করে দোতলা থেকে নেমে আসে। অস্থির ও রাগত স্বরে আমাকে ধমকাতে থাকে—আমি কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম? এখন কটা বাজে? তুমি তো কিছু খাওনি। প্রেসারের ওষুধ? আমি বাসায় যাব কেমন করে?

আমি বললাম, শান্ত হও, আইরিন। নুরুল্লাহ তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাবে। আমি রাতে আর কিছু খাব না, শুধু ওষুধটা দাও। সারা দিন অনেক ধকল গেছে, একটু ঘুমিয়ে ভালো করেছ।

আইরিন বলল, নুরুল্লাহ—মানে মহাকাশমন্ত্রী? স্যারকে কোথায় পাবে?

এসেছে, ওয়াশরুমে।

আইরিন নিজেও ওয়াশরুমে যায়।

আমার আপন আত্মীয়-স্বজন, মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-স্ত্রীর ভাই-বোন—কেউ বেঁচে নেই। বন্ধুরাও সব মৃত। এক-দুজন নির্বাক মৃত্যুশয্যায়। টিয়া নামের একটি মেয়ে আমাকে মাত্র একবার প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু মৃত্যু আমাকে অন্তত তিনবার প্রত্যাখ্যান করেছে। ১৯৬৯ সালে চাঁদপুরে লঞ্চডুবির পর হাতে গোনা যে দু-একজন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসে, আমি তাদের একজন। ১৯৭১-এ মৃতের অভিনয় করে মিরপুর বধ্যভূমি থেকে যে দু-একজন উঠে এসেছে, আমি তাদের একজন। নিকোলাস টোমালিন নামের এক ব্রিটিশ সাংবাদিক আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছিল—আমি কেমন করে বেঁচে গেলাম সেই কাহিনি শুনতে চেয়েছে। আমার বন্ধু বুদ্ধিজীবী কয়েকজন রটিয়েছে, পুরোটাই সাজানো নাটক, ঘাতকদের সঙ্গে জিন্নাহর আঁতাত ছিল।

সর্বশেষ মাস সাতেক আগে টানা দেড় দিন কোমায় থাকার পর আমি হাসিমুখে হাসপাতালের আইসিইউ থেকে বেরিয়ে কেবিনে এসেছি, তিন দিনের মধ্যেই গাঝাড়া দিয়ে ওঠায় সিনিয়র বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই কষ্ট পেয়েছেন। কষ্টই তো, আমি বিদায় নিলে এটার সভাপতি, ওটার চিফ প্যাট্রন, এই কমিটির চেয়ারম্যান, ওই কমিটির আহ্বায়ক—অনেক পদ শূন্য হতো। আমি তাঁদের হতাশ করেছি।

মৃত্যু আমাকে তেমন ভাবায় না বা আমিও মৃত্যুর কথা তেমন ভাবি না। আমার মৃত্যু কারো জীবনকে ভীষণ বিপর্যস্ত করবে—এমন কেউই্ব  নেই। আইরিন একটু কষ্ট পেতে পারে, সাত দিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবার মরদেহ বাড়িতে থাকা অবস্থায় মহাত্মা গান্ধীজি স্ত্রী সহবাস করেছেন। জীবনটা এমনই। কারো জন্য কিছু এসে যায় না, জীবনে নিজের দাবিটাই মুখ্য।

দীর্ঘক্ষণ পর নুরুল্লাহ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে বলল, জিন্নাহ ভাই, কমোডে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ইদানীং কমোডটাকেই মনে হচ্ছে ঘুমের আসল জায়গা।

বললাম, কয়েক দিন আগে তো তোমাকে নিয়ে নিউজও হয়েছে, তুমি ওয়াশরুম থেকে বের হতে বেশি দেরি করায় সৈয়দপুরের ফ্লাইট দেরিতে ছেড়েছে।

ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

হঠাৎ নুরুল্লাহর চোখে পড়ে—ওই তো আইরিন। আনন্দিত ও বিচলিত হয়ে নুরুল্লাহ তার আনা ফুলের তোড়া খুঁজতে থাকে। আমি হাত ইশারায় দেখিয়ে দিই। নুরুল্লাহ ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে আইরিনের দিকে এগিয়ে এসে নার্ভাস প্রেমিকের মতো তোতলাতে থাকে। আমিই বলে দিই, আইরিন, তোমার ওই কথাটা—এজ ইজ জাস্ট আ নাম্বার—আমাদের মন্ত্রীর খুব ভালো লেগেছে—হি ফিলস ফিফটি ইয়ারস ইয়ঙ্গার দ্যান হোয়াট হিজ অ্যাকচুয়াল এজ ইজ।

ইজ ইট! ইজ ইট স্যার! বলে আইরিন তার হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে গলার ওপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে হাগ করল। তারপর এক হাতে ফুলের তোড়াটা নিয়ে নুরুল্লাহকে একটু কাছে টেনে বলল, স্যার, ওদিকে তাকান, কয়েকটা সেলফি তুলে নিই।

নুরুল্লাহ আমাকে যে গোলাপের তোড়াটি দিয়েছিল, সেটাও আইরিনের দিকে এগিয়ে দিলাম। বললাম, তোমার মন্ত্রী স্যার বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাবেন।

আইরিন বলল, আমি কখনো পতাকাঅলা গাড়িতে চড়িনি।

আমি নুরুল্লাহকে বললাম, আমি যে সেঞ্চুরি করব, এটা আইরিন নিশ্চিত। কিন্তু তুমি তো জানো, নব্বই থেকে নিরানব্বই—সবটাই নার্ভাস নাইনটি। যেকোনো সময় আউট হয়ে যেতে পারি। আমার জন্য ভাবার কেউ নেই, আমি যে ভাবব সে রকমও কেউ নেই—ব্যতিক্রম কেবল আইরিন। যদি না থাকি, মেয়েটার বিয়েশাদি না হওয়া পর্যন্ত তুমি একটু খোঁজখবর রেখো। তোমার ওপর বিশ্বাস আছে। এমনকি বিশ্বাস না থাকলেও আমি জানি, এই বয়সে তোমারও তেমন কিছু করার নেই। সুতরাং আইরিন তোমার কাছে নিরাপদই থাকবে।

আইরিন আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে যেতে চাইল, আমি বললাম, বেশ রাত হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাও। আইরিন বলল, প্রমিজ করো, রাতে আর ফোন ধরবে না, ফোনটা সাইলেন্ট মোডে দিয়ে দিচ্ছি। আমি সকালে এসে তোমাকে নাশতা খাইয়ে দেব।

আমি বলি, আচ্ছা। প্রমিজ। গুড নাইট।

হ্যাভ আ নাইস স্লিপ বলে আইরিন বেরিয়ে যায়। আমি দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাই—পৌনে একটা।

নব্বই বছরের টুকরো টুকরো স্মৃতি আমার ঘুমকে ঠেলে দূরে সরাতে থাকে। ফোনটা সাইলেন্ট মোডেই, কিন্তু স্ক্রিনে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটি ওভারসিস কল। বিদেশ থেকে ফোন করেছে, আইরিনের কাছে প্রমিজ করে থাকলেও না ধরাটা ঠিক হবে না। কণ্ঠটি পরিচিতই। বলল, স্যার, লন্ডনের একটি অনলাইন পত্রিকায় একটু আগে আপনাকে নিয়ে একটা নিউজ আপলোড করা হয়েছে। পড়ে শোনাব, স্যার?

শোনাও।

স্যার, শিরোনামটি হচ্ছে : স্বাধীনতা পদক নিয়ে তেলেসমাতি। এবার নিউজটা শোনাচ্ছি : ১৯৭১-এর পর এত কিছু বদলে গেলেও বদলালেন না কেবল একজন বুদ্ধিজীবী। তিনি প্রাণপণে নিজের নাম আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তাঁর নাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। না, তিনি পাকিস্তানের কায়েদে আজম নন, তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী, যাঁর অন্তরে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সগর্বে নিজের নামও বলেন তা-ই। সরকারের ভেতরের একটি মহল এই বুদ্ধিজীবীকে স্বাধীনতা পদক দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। এই অপতৎপরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে ব্রিটেনের বাঙালিরা আগামী রোববার ট্রাফালগার স্কয়ারে তাঁর কুশপুত্তলিকা দাহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রবাসী বুদ্ধিজীবী শরাফত হোসেন তালুকদারকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামে বাংলাদেশে কোনো বুদ্ধিজীবী আছেন বলে তাঁর জানা নেই। সুতরাং এ নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারছেন না।

স্যার, এ ব্যাপারে আপনি কি কিছু বলবেন?

প্রবাসী বুদ্ধিজীবী শরাফত হোসেন তালুকদার যখন চেনেন না, তাহলে আমি নিশ্চিত এই ব্যক্তি আমি নই, অন্য কেউ। শরাফত হোসেন তালুকদার আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন ব্যক্তি। ঘণ্টা তিনেক আগেও তিনি লন্ডন থেকে ফোনে কথা বলেছেন। আমাকে কদমবুসি করছেন এবং আমি সস্নেহে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি—এ রকম একটি ছবি কোথাও প্রকাশিত হয়ে থাকতে পারে। আমি তাঁর দীর্ঘায়ু ও অর্থবহ জীবন কামনা করি।

আর আমার নাম যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। জিন্নাহ পুঞ্জা আমার পিতা নন, আমার জন্ম তারিখও ২৫ ডিসেম্বর নয় এবং ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ আমি মৃত্যুবরণও করিনি। আমি ভিন্ন একজন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আব্রাহাম লিংকন যেদিন নিহত হলেন, সেদিন জন্ম নেওয়া এক আমেরিকান পুত্রসন্তানের নাম রাখা হলো আব্রাহাম লিংকন। শিশুটির মা-বাবার মনে যা-ই থাকুক, নামটির ভার ক্রমেই বেড়ে ওঠা নতুন মানুষটিকে ভারাক্রান্ত করে তুলল। পরিণত বয়সে তিনি বাড়ি থেকে বের হতেন না, তাঁর মনে হতো, বের হলেই সুযোগ বুঝে কোনো জন উইকিস বুথ তাঁকে গুলি করে হত্যা করবে। জিন্নাহ যেহেতু আততায়ীর হাতে নিহত হননি, আমার এ নিয়ে আশঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আমার শৈশবে অবিভক্ত বাংলার মানুষের গড় আয়ু ছিল তিরিশ বছর। আমার তিন তিরিশে নব্বই বছর। এরই মধ্যে এক জীবনেই  তিন মানুষের জীবন অতিবাহিত করেছি। আর কত?

স্বীকার করতেই হবে মা-বাবার রাখা এই নাম নিয়ে আমি বিব্রতই ছিলাম। কিন্তু যখন দেখলাম বাংলাদেশে জিন্নাহ-কাব্য রচয়িতাদের কেউ কেউ বেশ বন্দনাও পাচ্ছেন, আমার নামের বোঝাটার ভার অনেক কমে গেল। অধিকন্তু আমার বিব্রতাবস্থা দেখে আমার এক তরুণ শুভানুধ্যায়ী সেদিন শেকসপিয়ারের জুলিয়েট হয়ে আবৃত্তি করে শোনাল—

হোয়াটস ইন আ নেইম? দ্যাট হুইচ উই কল আ রোজ

বাই এনি আদার নেইম উড স্মেল অ্যাজ সুইট।

আমি নিশ্চিত হলাম, জবাব তো শেকসপিয়ারই দিয়ে গেছেন।

 

 

বারো

পাছে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফোন মিস করি, এই আশঙ্কায় নিঃশব্দ ফোন সশব্দ মোডে ফিরিয়ে আনলাম। কয়েক মাস আগেও কাজটা করতে পারতাম না। আইরিন শিখিয়ে দিয়েছে।

সকালের দিকে ঘুম ভাঙে আইরিনের ফোনে। আমি জিজ্ঞেস করি, তুমি কি এসে গেছ? দরজা খোলেনি?

না, জিন্নাহ ভাই। কী করব বুঝতে পারছি না।

কী করবে মানে? চলে এসো।

আমি এখন নুরুল্লাহ স্যারের বাসায়।

স্যার রাতে নিজের বাসায় ফেরেননি। আমাকে নামিয়ে দিয়ে বাকি রাত আমার মায়ের সঙ্গে গল্প করেছেন। কয়েকবার চা খেয়েছেন। আমি গিয়েই মিনিট দশেকের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছি। সাড়ে ছটার দিকে বুয়াটা নক করল। বলল, মন্ত্রী চলে যাচ্ছেন, মা আমাকে ডেকেছে। কোনোভাবে দাঁতটা ব্রাশ করে নেমে আসি। স্যার বললেন, সারা রাত তোমার মায়ের সঙ্গে গল্প করলাম আর তুমি ঘুমালে। এখন তুমি আমার সঙ্গে চলো, বাসাটা চিনিয়ে দিই, আমার ড্রাইভারই তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাবে।

তাঁর সঙ্গে গাড়িতে যাওয়ার সময় বললেন, তুমি বয়স নিয়ে যে কথাটা বললে, সেটা তোমার মাকেও শুনিয়েছি।

তাঁর বাসায় পৌঁছার পর বললেন, কোথায় খাই, ঘুমাই দেখে যাও।

ফেরার সময় আমি যেমন করে থাকি, তাঁকে হাগ করে নেমে আসতে চাইছি, তিনি আমাকে বেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখতে চাইলেন। তিনি এর বেশি কিছু করতে চাননি। আমাকে জড়িয়ে রাখা অবস্থায় একটা কেমন শব্দ শুনলাম, কর্ক খোলার শব্দের মতো। হঠাৎ মনে হলো, স্যার আমাকে ছেড়ে দিয়েছেন এবং পরক্ষণেই গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে গেছেন। এরপর একেবারে নিশ্চুপ।

আমি বললাম, অতিরিক্ত উত্তেজনা থেকে হার্ট অ্যাটাক হতেও পারে। বললাম বুড়ো বয়সে ফিজিক্যাল রিলেশনশিপের ডিজায়ার থেকেও এটা ঘটতে পারে—উত্তেজনা, তারপর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। বডি কোথায়? মানে নুরুল্লাহর ডেড বডি?

এখনো বাসায়। ভয় লাগছে। তুমি যেভাবে বললে আমিও তা-ই ভেবেছিলাম, কিন্তু কার্পেটের ওপর পড়ে যাওয়ার পরই দেখা গেল কার্পেটটা রক্তে ভিজে উঠেছে।

তার মানে? ওয়াজ হি কিল্ড? দেন হু কিল্ড হিম?

আমি বললাম, আইরিন, মাথা ঠাণ্ডা রেখো। সত্য এবং যৌক্তিক কথা পুলিশকে বোলো।

সকাল আটটা থেকে চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ যাচ্ছে : মহাকাশমন্ত্রী আবু সাদাত মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নিহত। তরুণী আটক। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত মহাকাশমন্ত্রী মূল সংবাদ থেকে পাদটীকায় চলে গেলেন, মুখ্য হয়ে উঠল আটককৃত তরুণী।

কে এই রহস্যময়ী সুন্দরী?

হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যু হোক কি গুলি খেয়ে মৃত্যু, পরিণত বয়সের মৃত্যু নিয়ে কেউ আফসোস করে না। পৃথিবীর আলো-বাতাস, ফুল-পাখি ও সুন্দরী নারী নিশ্চয়ই দেখেছেন, এবার নিশ্চিন্তে নিদ্রায় যেতে পারেন।

আমি দূরের দেয়ালে সাঁটানো ফ্ল্যাট স্ক্রিন এলইডি টিভির চ্যানেল সার্ফ করে যাচ্ছি।

মন্ত্রীর মৃত্যুর সময় রহস্যময় তরুণীর উপস্থিতি তাঁর মৃত্যুকে আরো রহস্যময় করে তুলছে। মন্ত্রীর বাড়ির কেয়ারটেকার বলেছেন, বাড়ি থেকে কোনো কিছুই চুরি বা লুট কিংবা তছরুপ হয়নি, কিংবা চুরির চেষ্টা হয়েছে এমন আলামতও পাওয়া যায়নি।

পুলিশের জেরার মুখে মেয়েটি সম্পূর্ণ নির্বাক রয়েছে।

অন্য একটি চ্যানেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বলছে, দোহা গ্রুপ অব কোম্পানিজের মালিকের জ্যেষ্ঠ কন্যা আইরিন দোহা গ্রেপ্তার।

অন্য একটি চ্যানেল বলছে, অবশেষে সচিবালয় সুন্দরী আইরিন ধরা পড়ল। আইরিন বিভিন্ন বড়মাপের ঠিকাদারের হয়ে মন্ত্রী-সচিব প্রমুখের সঙ্গে মেলামেশা করে মেগা প্রকল্পের কার্যাদেশ বের করে এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণ করে থাকে। তাকে সর্বশেষ সিঙ্গাপুরের ম্যারিনায় একজন গুরুত্বপূর্ণ সচিবের সঙ্গে দেখা গেছে। আইরিনকে পুলিশ হেফাজত থেকে বের করে আনার জন্য প্রভাবশালীদের তৎপরতা শুরু হয়েছে।

আমি আগের চ্যানেলটিতে ফিরে আসি। তাতে বলছে, জল্পনাকল্পনার অবসান হয়েছে। একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, হাশিম সুজাউদেদৗলার কন্যা হিসেবে পরিচিত আইরিন প্রকৃতপক্ষে নিহত মন্ত্রী আবু সাদাত মোহাম্মদ নুরুল্লাহর ঔরসজাত কন্যা। এ নিয়ে হাশিম সুজাউদেদৗলা ও তাঁর স্ত্রী শাফিনাজ দোহার মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। এরই একপর্যায়ে হাশিম সুজাউদেদৗলা পয়েন্ট টুটু বোরের রিভলবার থেকে স্ত্রীকে গুলি করে নিজেও আর্নেস্ট হেমিংওয়ে স্টাইলে মুখের ভেতর নল ঢুকিয়ে ট্রিগার টেপেন এবং মুহূর্তেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

আমার বুঝতে বাকি নেই, সম্ভবত নেহরিনের কাহিনিটা আইরিনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে টেলিভিশনের স্টোরিটা তৈরি করা হয়েছে। তার ওপর নুরুল্লাহকে জড়িয়ে তৈরি গল্পটার যথার্থতা নিয়েও তো প্রশ্ন রয়েছে।

আমি কিছু পরামর্শ দেওয়ার জন্য আইরিনের নম্বরে ফোন করি। বারবার একই কথা শুনি—এই নম্বর বর্তমানে বন্ধ আছে। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন।

আইরিন এসে নাশতা খাওয়াবে—এমনই কথা ছিল। রাতের ঘুম হয়নি, খাওয়া হয়েছে সামান্য, নিত্যরাতের ওষুধ খেয়েছি কি না মনে করতে পারছি না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেললাম, চোখে সব কিছু ঝাপসা দেখতে শুরু করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যেই আর কিছুই দেখতে পেলাম না, আমি সম্ভবত জ্ঞান হারালাম।

আমার পৃথিবী তখন সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউট।

 

তেরো

 

আইরিনের হিসসা

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর গল্পের বাকি অংশটুকু তার পক্ষে শোনানো সম্ভব নয়, না শোনালেও যে গল্পটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এমন নয়। সম্পূর্ণ ব্ল্যাক আউটে কিংবা হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে কিংবা মোহময় এক আলো-আঁধারিতে টেনে নিয়ে গল্পটা শেষ করা যেতে পারে—বাকিটা রয়ে যায় পাঠকের বোঝা হিসেবে—পাঠকের কল্পনাপ্রবণ মন চরিত্র ও কাহিনিকে তার সুবিধামতোএকটি জায়গায় এনে সমাপ্তি টানে।

আমার সামনে উপুড় হয়ে পড়ে আছেন নুরুল্লাহ স্যার। আমি রক্তাক্ত দেহের দিকে তাকাতে পারি না, চোখ বুজে দুই হাঁটুর ভেতর মাথা গুঁজে বসে আছি। আমি যখনই বিপন্ন বোধ করেছি, জিন্নাহ ভাই আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফোনে বিষয়টা আমিই তাঁকে জানিয়েছি। আবার যখন তাঁর ফোন বেজে ওঠে, আমি লাইন কেটে দিই, আবারও কাটি, তারপর ফোনের সুইচ অফ করি। আমি বেশ বুঝতে পারছি, একটি বড় ধরনের খুনের মামলায় আমি জড়িয়ে গেছি। তাঁর শরীর থেকে যে রক্ত ঝরছে, প্রথমে এটা আমার চোখে পড়েনি। আমি নিজেকেই দায়ী করি—এই প্রায় নির্জন বাড়িতে আমাকে আলিঙ্গন করার পর তাঁর শরীরের উত্তেজনা—আরো স্পষ্টভাবে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ারই কথা। সে চাপ সামাল দিতে না পারলে মৃত্যুও ঘটতে পারে। আমাদের এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়, বাংলাদেশ বিমানের ক্যাপ্টেন লন্ডনের হোটেলে তরুণী কেবিন ক্রুর সঙ্গে সহবাসের সময় আরোহী অবস্থায়ই ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন। মারা যান।

 

আমি ফোনের সুইচ বন্ধ করি। কারণ কোনোভাবেই জিন্নাহ ভাইকে এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়াতে চাইনি।

আধঘণ্টার মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেশ কয়েকজন সদস্য হাজির হলেন। একজন বললেন, এটাকে জটিল ও রহস্যময় মামলা বানিয়ে লাভ নেই। যত তাড়াতাড়ি কেসটা ক্লোজ করা যায় ততই ভালো। এ নিয়ে অপজিশনকে মুখ খুলতে দেওয়া যাবে না।

তাঁর অধীন অন্য একজন অফিসার বললেন, জি স্যার, ইউ আর অ্যাবসলিউটলি কারেক্ট।

বড় অফিসার নির্দেশ দিলেন, দেন ক্যারি অন।

সাদা রুমালে পেঁচানো একটি রিভলবার মেঝেতে রেখে জুনিয়র অফিসার আদেশ দিলেন—এই মেয়ে, এটা তুলে ভালো করে হাতে চেপে ধরো।

আমি চুপ করে থাকি।

বড় অফিসার বললেন, এক থেকে দশ পর্যন্ত কাউন্ট করো, এর মধ্যে না তুললে তোমার দুটি অপশন : তুমি মেয়েটির হার্ট বরাবর পয়েন্ট ব্ল্যাংক গুলি করতে পারো অথবা কোনো কিছু কনফেস করাতে চাইলে প্রতিবারে দুটি করে গরম সিদ্ধ ডিম পনেরো মিনিট পর পর ঢোকাতে পারো। গরম ডিম প্রবিষ্ট করানোর কাহিনি আমিও পড়েছি। আমি আদেশ মেনে নিয়ে রিভলবার তুলে ভালো করে চেপে ধরি।

জুনিয়র অফিসার বলল, থ্যাংক ইউ, এতেই হাতের ছাপটা পাওয়া যাবে।

সেই দিনের বাকি অংশ ও রাতের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ বন্দিজীবন যাপন করি। রাত চারটার দিকে ত্রাণকর্তা হয়ে হাজির হন শামিম আহসান।

তিনি ওসিকে ধমক দেন, তোমরা বিছানা-বালিশ দাওনি কেন? চাকরি খোয়াতে চাও? তিনি আমাকে বললেন, চলো এবং পুলিশকে বললেন, একটা ডিফারেন্ট ও ক্রেডিবল স্টোরি বানাও।

শামিম আহসান আমাকে বের করে নিয়েই কোনো হোটেল কক্ষে কিংবা নির্জন স্থানে নিয়ে বলবেন, হা হা হা, কাপড় খোলো সুন্দরী—এমন কিছু করেননি। সাংবাদিক এড়িয়ে টিন্টেড গ্লাসের একটি গাড়িতে আমাকে প্রায় চল্লিশ মিনিট এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে বাসায়ই দিয়ে গেলেন। বললেন, মায়ের কাছে থেকো, আমার কোনো সিগন্যাল না পেলে বের হবে না; জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উঁকিও দেবে না।

সিগন্যাল দেওয়ার জন্য আমাকে পুরোপুরি চার্জ করা একটি মোবাইল ফোন দিয়ে গেলেন এবং বললেন, এটা কল করার জন্য নয়, কেবল রিসিভ করার জন্য।

সেই রাতে টিভির স্ক্রলের কয়েকটি সংবাদ : বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আইসিইউতে। মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী এ এস এম নুরুল্লাহর মৃত্যুর কারণ হার্ট অ্যাটাক। গ্লাসটপ টেবিলের ওপর পড়ে গেলে ভাঙা কাচে কেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ। আইরিন মুক্ত, তাত্ক্ষণিকভাবে এমিরেটসের ফ্লাইটে দেশত্যাগ।

বিস্তারিত খবরে সাংস্কৃতিক সংবাদে শুনি : প্রেসিডেন্টের নাতির খতনা উৎসবের স্যুভেনির সম্পাদনা করবেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী শরাফত হোসেন তালুকদার।

আমি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে দেখতে যেতে চাই। শামিম আহসান বললেন, বেরোলে বিপদে পড়বে। পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হোক, তারপর যেয়ো। আমার পীড়াপীড়িতে তিনি আমাকে বোরকা পরিয়ে বের করেন। তত দিনে তিনি আইসিইউ থেকে কেবিনে এসেছেন।

হাসপাতালে তাঁকে চব্বিশ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ঘোষণা দিয়েছিল মেডিক্যাল বোর্ড। পরে এ সময় চব্বিশ থেকে বাহাত্তর ঘণ্টায় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। জ্ঞান ফেরে ঠিক সত্তরতম ঘণ্টায়। তখনো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে। পঞ্চম দিন মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান প্রফেসর রশিদুজ্জামান বড়লস্কর বললেন, তিনি আগের অবস্থায় ফিরতে পারবেন—এটা আশা করা ঠিক হবে না। মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান ও এমআরআই থেকে আঁচ করা যাচ্ছে, মস্তিষ্কের আঘাত ও অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়ের কারণে তাঁর চলতি স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ বা আংশিক রহিত থাকতে পারে। নবম দিন তাঁকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে কেবিনে শিফট করা হয়। মানুষটা ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন এবং সম্ভবত আমাকে অস্পষ্টভাবে দিলশাদ নামে সম্বোধন করেন।

আমি সাড়া দিই।

আমি তাঁর গা স্পঞ্জ করে দিই। মহাকাশবিষয়ক মন্ত্রী নুরুল্লাহর কথা বলি। আমি জানাই, তাড়াহুড়া করে তাঁর লাশ দাফন করা হয়েছে। বিরোধী দলের সেকেন্ড ভাইস প্রেসিডেন্ট মোবারক হোসেন ও তাঁর স্ত্রী কামরুন্নেসা মৃতের মুখ দেখতে না পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কামরুন্নেসা তাঁর সিল করা কফিন জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করেছেন। হেলিকপ্টারে কফিনটি দিনাজপুর নিয়ে যাওয়া হয় এবং নুরুল্লাহ স্যারদের গ্রামের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিন্নাহ ভাই বললেন, নুরুল্লাহ, নাইনটিন সেভেন্টিথ্রিতে লাহোর কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতালে মারা যায় কাশফিয়া তার স্ত্রী, আমাদের ক্লাসমেট, চিঠি লিখে আমাকে জানিয়েছে।

আমি বললাম, সেই নুরুল্লাহ নন। মন্ত্রী নুরুল্লাহ।

কিসের মন্ত্রী? কোন দেশের? কাশফিয়া দেখতে খুব সুন্দর ছিল। আমরা নুরুকে নুনু ডাকতাম, কাশফিয়া হাসত।

ডিউটি ডাক্তার এসে সতর্ক করে গেলেন, পেশেন্টের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। তাঁকে এক্সাইটেড করা যাবে না। তাঁর পুরনো মেডিক্যাল রেকর্ডগুলো আনিয়ে দিন।

আমি নেকাব পরেই তাঁর বাড়িতে যাই, মেডিক্যাল রেকর্ডের ফোল্ডারটা বের করি। যে টেবিলটাতে নব্বইতম জন্মদিনের বার্থডে কেক কাটা হয়েছিল, তার ওপর আরেকটি ট্রান্সপারেন্ট ফোল্ডার পাই। ফোল্ডারের ওপর মার্কার পেন দিয়ে লেখা ‘খতনা’। আমি খাতা ওল্টাতে থাকি। সবই কবিতা—নুনু কাটা কাব্য। সরকারের পাঁচজন বর্তমান ও সাবেক সচিব-কবির একজন বাদে চারজনই কবিতা পাঠিয়েছেন, যাঁরা কেবলই কবি, অর্থাৎ বেসরকারি কিন্তু সরকারি সুবিধাভোগী কবি, তাঁদের মধ্যে মাত্র তিনজন পাঠিয়েছেন। একজন নারী ঔপন্যাসিকের একটি চিঠি আছে, তিনি দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসটির সমান আকারের নুনু কাটা কাব্য নামের একটি উপন্যাস প্রায় শেষ করে এনেছেন, স্যুভেনিরে তাঁর জন্য যেন স্পেস রাখা হয়। তিনি যে উপন্যাসটি লিখছেন, এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট অবগত রয়েছেন।

আমি মেডিক্যাল রেকর্ডস নিয়ে ফিরে আসি।

ততক্ষণে মেডিক্যাল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়— পেশেন্টের অবস্থা স্টেবল। কাল তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে। সকাল দশটার দিকে সংস্কৃতিমন্ত্রী রেহানা শামসুদ্দিন, মন্ত্রণালয়ের সচিব রণজিৎ পার্থসারথি শর্মা এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক পুষ্পস্তবক ও ট্রফি নিয়ে হাজির হলেন। রেহানা শামসুদ্দিন বললেন, জিন্নাহ ভাই, আপনার সেই প্রস্তাবটা গতকালই প্রেসিডেন্ট অনুমোদন করেছেন এবং প্রথম বছরে জন্য একজনকে—মানে আপনাকেই আইআইপি ঘোষণা করেছেন। আপনি বাংলাদেশের প্রথম আইআইপি—ইন্টেলেকচুয়ালি ইম্পর্ট্যান্ট পারসন।

তিনি কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে মন্ত্রীকে বললেন, শাফিনাজ, তুমি হাঁটতে পারো? গুলিটা কোথায় লেগেছিল?

জিন্নাহ ভাইকে মোটরচালিত হুইলচেয়ারে বসানো হয়। মন্ত্রী, সচিব ও মহাপরিচালকরা তাঁর পেছনে দাঁড়ান। বিটিভির ক্যামেরাম্যান ছবি তোলে। অন্য কোনো চ্যানেল আনা হয়নি।

আমি হুইলচেয়ার ঠেলে ড্রাইভওয়েতে নিয়ে আসি। চেয়ারসহ তাঁকে একটি বিশেষ ধরনের অ্যাম্বুল্যান্সে তুলে দেওয়া হয়। আমি সঙ্গে যাই।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রথম আইআইপি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হুইলচেয়ার জীবনটিও বর্ণাঢ্য। তিনি দীর্ঘদিন হুইলচেয়ারে বসে থেকে এবং আসলে তেমন কিছু লেখালেখি না করেও বাংলা সাহিত্যের অভিভাবক হিসেবে নিজেকে অভিষিক্ত করে রেখেছেন।

আমিও তাঁকে অভিনন্দন জানাই, তিনি জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে? কী চাও?

আমি জিজ্ঞেস করি, আমাকে চিনতে পারছেন না?

তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন, তুমি কে?

আমার চোখ ফেটে কান্না আসে। এই মানুষটির সঙ্গে আমার এত দিনের সম্পর্ক অর্থহীন হয়ে গেল? আমি তাঁর অচেনা!

আমি চোখ মুছে তাঁকে আবার আঁকড়ে ধরি, বিড়বিড় করে বলি, আমি তো আপনাকে চিনি।

তিনি হাঁ করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

আগামী মাসে আমি একুশ হব।

মহাত্মা গান্ধী তাঁর শরীর বিচলিত হয় কি না পরীক্ষা করাতে এবং বিচলিত অবস্থায় নিজেকে শান্ত রাখায় অভ্যস্ত করতে একাধিক দিগম্বর তরুণীকে বিছানায় নিয়ে ঘুমাতেন। জিন্নাহ ভাইয়ের এ ধরনের এক্সপেরিমেন্টের প্রয়োজন ছিল না, কারণ অন্তত একুশ বছর ধরে তিনি নিরুত্তাপ-নিরুত্থান অবস্থায় রয়েছেন। সময়টা আরো বেশি হতে পারে। গত দেড় বছরে অন্তত কুড়িবার আমাকে আঁকড়ে ধরেছেন এবং কিছুক্ষণ পর হাঁপাতে শুরু করেছেন। তাঁর অসামর্থ্যই তাঁকে আমার কাছে নিরাপদ পুরুষে পরিণত করেছে। তা ছাড়া নব্বই বছর বয়সের একজন পুরুষ মানুষের কাছে নিরাপত্তার চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করাও সমীচীন নয়।

মন্তব্য