kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

গ ল্প

অন্য ভুবন

হরিশংকর জলদাস

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



অন্য ভুবন

অঙ্কন : মারুফ রহমান

মিস্টার জিম মারা গেল। শিয়রে বসে মৃদুল কাঁদছে। অঝোর ধারায় নয়। নীরবে। ভেতরে ভেতরে। চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে—ভেতরটায় খুব ভাঙচুর হচ্ছে মৃদুলের। মিস্টার জিম মৃদুলের কেউ নয়, আবার অনেক কিছুও।

মিস্টার জিম মানুষ নয়, ডগ। জার্মান শেফার্ড। তাকে কুকুর বলা যাবে না, কুত্তা তো নয়-ই। জার্মান কুকুরের নাম জিম কেন, রুডলফ নয় কেন, নিদেনপক্ষে হিটলার, এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি নন মনোজবাবু। শুধু বলেছিলেন, ‘খবরদার মৃদুল, কখনো জিমকে কুকুর বা কুত্তা বলে ডাকবে না। বনেদি ডগ, দামিও। যতই অন্যায় করুক, চোখ রাঙাবি না কখনো।’

মৃদুল মনোজবাবুদের বাজার সরকার কাম ক্লিনার কাম গার্ডেনার কাম ডগের লালন-পালনকারী কাম ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রথম দিন চাকরিতে যোগদান করার পর মনোজবাবু কথাগুলো বলেছিলেন। একটু দম নিয়ে মনোজবাবু আরো বলেছিলেন, ‘অন্য কাজে ঢিলা দাও, মাফ করব। কিন্তু জিমের যত্নে কোনো গাফিলতি বরদাশত করব না।’

মৃদুলের কিছু বলার থাকলেও বলার সাহস করেনি সেদিন। বেঁচে থাকার জন্য এবং বাঁচিয়ে রাখার জন্য চাকরিটা ভীষণ প্রয়োজন তার।

রাউজানের দিকে বাড়ি মৃদুলের। গ্রামের নাম ডাবুয়া বা কাঞ্চনা। ভিটেয় আগে বাড়ি ছিল। শক্তপোক্ত। বেড়ার ঘর, টিনের ছাউনি। বাড়ির পাশে জমিও ছিল, গণ্ডা কয়েক। বউটাকে অসুখে ধরল, হাঁপানি। শীতে-গ্রীষ্মে খুল্লুত খুল্লত, ওয়াক থু। ঘরে দু-দুটো মেয়ে—পাঁচ, আট। কপালের লিখন বলে মেনে নিয়েছিল মৃদুল। চাষের ধানে ছয় মাস চলে। অন্য ছয় মাস রিকশাটানা, বাজারে তরিতরকারি নিয়ে বসা। চলে যাচ্ছিল কোনো রকমে। লাউয়ের ডগার মতো মেয়েগুলো বাড়ছিল। ছয় বছর পর বড় মেয়ে সুতপা গায়ে-গতরে যুবতী হয়ে গেল। ঘর আসে, মৃদুল ফেরায়। এক-দুই-তিন-চার। বউ বলে, ‘আর কত ফেরাবে? মেয়ের বিয়ে দেওয়া দরকার।’ মৃদুল বলে, ‘ছোট মেয়ে।’ খুক খুক কেশে বউ বলে, ‘মেয়ের দিকে চোখ মেলে দেখো। সুতপা বিবাহযোগ্য হয়ে গেছে।’ মৃদুল মেয়ের দিকে চোখ মেলে তাকায়। মনে মনে বলে, ‘সত্যিই তো! সুতপা এত বড় হয়ে গেছে!’ সিদ্ধান্ত নেয়—ঘর আর ফেরাবে না। ঘর-বর মিলে গেল। পাশের গায়ের সুরঞ্জনবাবুর বড় ছেলে বরঘাটার আগায় মুদির দোকান চালায়। সুরঞ্জনবাবুর খাঁই বেশি। জমি বেচে মৃদুল সুরঞ্জনবাবুর খাঁই মেটাল। একদিন সুতপা বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে চলে গেল। সুরঞ্জনবাবুর খাঁই মেটাতে গিয়ে মৃদুল খাইয়ে পড়ে গেল। জমি হারিয়ে মৃদুল বেকায়দায় পড়ে। দুই বেলা অন্ন জোগাড় করা দায় হয়ে গেল মৃদুলের। মেরামতের অভাবে ঘরগুলোরও জীর্ণদশা।

বাজারে তপনের সঙ্গে দেখা হলো মৃদুলের, এক বিকেলে। তপন শহরে এক ব্যবসায়ীর কার চালায়। বউ-সন্তান নিয়ে থাকেও শহরে। মাঝে মাঝে বুড়ো মা-বাপকে দেখতে আসে, গাঁয়ে। সেই সুবাদে মৃদুলের সঙ্গে তপনের দেখা।

কী মৃদুলদা, স্বাস্থ্য এ রকম হয়েছে কেন? তপন জিজ্ঞেস করে।

মৃদুল কেন জানি চুপ মেরে যায়। এই সময় তপন আবার বলে, কী রকম স্বাস্থ্য ছিল! এখন শুকিয়ে কাঠ। তা দাদা, ব্যাপারটা কি একটু খুলে বলবে?

চোখ দুটো হঠাৎ করে ভিজে উঠল। বাঁ হাতের তালু দিয়ে চোখ ঢাকল মৃদুল। তখন খপ করে মৃদুলের ডান হাতটা ধরে ফেলল। বাজারের একটেরে টেনে নিয়ে গেল। দরদি গলায় বলল, কী হয়েছে তোমার?

মৃদুল চুরমেরে গলায় বলল, ‘বড় অভাব রে তপন, বড় অভাব।’ বুক চিরে একটা শ্বাস বেরিয়ে এলো মৃদুলের। ‘দুই বেলা খাওয়া জোটে না। ছোট মেয়েটা না খেয়ে না খেয়ে হাড়গিলা হয়ে গেছে। তোর বউদির কথা না-ই বললাম।’ আবেগে তুমি থেকে তুই-তে নেমে এলো মৃদুল।

একটু করে কী যেন ভাবল তপন। চোখ দুটোকে করুণ করে বলল, চাকরি করবে তুমি? শহরে?

চাকরি! তাহলে তো বেঁচে যাই রে ভাই! বউ-মেয়েটাকে বাঁচিয়ে রাখার সুযোগটা করে দাও তপন। তোমার কাছে ঋণী থাকব আজীবন। মৃদুলের কথায় কাকুতি ঝরে পড়ল।

আহ্ মৃদুলদা, তুমি এ রকম উতলা হচ্ছ কেন? একজনের অছিলায় আরেকজনের উপকার হয়। তোমার চাকরি তুমি করবে, আমি উপলক্ষ মাত্র। মৃদুলের দিকে গভীর চোখে তাকাল তপন। এরপর বলল, তবে চাকরিটা...।

কথা শেষ করতে দিল না মৃদুল। বলল, তবে কী!

কঠিন। বড় কঠিন চাকরি দাদা। বলল তপন।

ব্যাগ্র কণ্ঠে মৃদুল বলল, চাকরি না শুধু, গোলামি করতেও রাজি আমি।

ওই গোলামিই করতে হবে তোমায়। বলে তপন।

পরিবারের ভাত-কাপড়ের বিনিময়ে যদি তা-ই করতে হয়, করব। তা কাজটা কী? জানতে চায় মৃদুল।

তপন মৃদু একটু হাসে। বলে, আমার মুখ থেকে না শুনে, নিজের কানে শোনো।

তা না হয় হলো। কিন্তু কাজটা কোথায়?

বললাম তো একটু আগে। শহরে।

শহরের কোথায়?

আমি যে বাড়ির গাড়ি চালাই, সেই বাড়িতে।

তাহলে তো ভাই ভরসা পাই! তুমি থাকলে আমার তো কোনো অসুবিধা হবে না।

সে ভরসা কোরো না। তোমার চাকরি তুমি করবে। আমার কোনো দায় নেই। তপনের কথাটা মৃদুলের কানে রূঢ় ঠেকল। মনটা খচ খচ করে উঠল। গ্রামীণ সরলতায় খচখচানিটা উড়িয়ে দিয়ে মৃদুল বলল, ও রকম করে বলছ কেন তপন? বিপদের সময় আমার পাশে না দাঁড়িয়ে পারবে তুমি? আমরা তো এক গ্রামেরই মানুষ, নাকি?

তপন আর কী বলবে, চুপ করে থাকল।

মৃদুল বলল, কখন নিয়ে যাবে আমাকে?

পরশু দিন সকালে তৈরি থেকো। ডেকে নেব।

তপন মৃদুলকে মনোজবাবুর বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। বাড়ি দেখে তো মৃদুল অবাক! এত সুন্দর বাড়ি!

মনোজবাবুর বাড়িটা নন্দনকাননে। বৌদ্ধমন্দিরের গা ঘেঁষেই বাড়িটা। দ্বিতল বাড়ি। ঢুকতেই কাঁঠালচাঁপার গাছ। বাগানের দক্ষিণ ঘেঁষে জিমের বাড়ি। টিনের ছাউনি। গ্রিল দেওয়া বারান্দা। শোয়াশুয়িতে দিগদারি ধরলে বারান্দার আরামকেদারায় গা এলিয়ে দেয় মিস্টার জিম। আরামকেদারাটা সেগুন কাঠের। রাঙামাটির এক বন্ধুকে দিয়ে বানিয়ে এনেছেন মনোজবাবু। বেডরুমে বিছানা পাতা। বিকেলের দিকে বাগানে ছেড়ে দেওয়া হয় জিমকে। গম্ভীর চালে এধার-ওধার পায়চারি করে জিম।

মাঝে মাঝে জিমের সঙ্গে বল খেলে মৃদুল। মাঝারি সাইজের প্লাস্টিকের একটা বল ছুড়ে দেয় জিমের দিকে। জিম ডান পায়ে লাথি মারে। বলটা গড়িয়ে মৃদুলের দিকে আসে। হাতে তুলে নিয়ে বলটি আবার ছুড়ে দেয়। জিমের বলে মৃদুলের পা ছোঁয়ানো নিষেধ। সে রকমই বলেছিলেন মনোজবাবু, প্রথম দিন।

বলেছিলেন, তপন, যাকে নিয়ে এসেছ পারবে তো সে এ বাড়ির সব কাজ করতে?

তপন গদগদ হয়ে বলেছিল, পারবে স্যার।

না, যে রকম শরীর দেখছি, জোরে ফুঁ দিলে উড়ে যাওয়ার শরীর! বাড়ির কাজ তো আর একটা না। শুধু জিমকে দেখাশোনার কাজ হলে কথা ছিল। জিম ছাড়াও বাজার সদাই করা, ঘরবাড়ি ঝাড়পোছ করা—এ তো আর কম কাজ নয়!

প্রায় গলবস্ত্র হয়ে মৃদুল বলেছিল, পারব আমি স্যার। সব কাজ করতে পারব। স্যার ডাকার জন্য মৃদুলকে যে শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা নয়। তপনের ‘স্যার’ সম্বোধন শুনে তারও মনে হয়েছে ‘স্যার’ ডাকলে বুঝি মনোজবাবু খুশি হবেন।

খুশি হয়েছিলেনও মনোজবাবু। কোঁচকানো কপালটা সমতল করে বলেছিলেন, ঠিক আছে, থাকো তুমি। কাজ করো। দেখি তোমার কাজের ধরন। ভালো লাগলে পার্মামেন্ট হয়ে গেলে। না লাগলে চাকরি নট।

মাসিক সাত হাজার টাকা বেতন নির্ধারিত হয়েছিল মৃদুলের। থাকা-খাওয়া ফ্রি। জিমের বাড়ির পাশ ঘেঁষে মনোজবাবুর বসতবাড়ির কার্নিশ। ওই কার্নিশ থেকে একটা একচালা নামানো হয়েছে। ওই একচালার নিচে থাকবে মৃদুল। খাওয়াদাওয়া মূল বাড়িতে। মনোজবাবু ধনী লোক। নিজে হিল্লিদিল্লি করেন। স্ত্রী অধ্যাপক। শহরের নামকরা কলেজে ইংরেজি পড়ান। চলনে-বলনে ইংরেজিয়ানা। স্বামী মৃদুলকে ‘তুমি’ বললেও স্ত্রী ‘তুমি’ বলতে নারাজ। ‘তুই’তে তার সব স্বাচ্ছন্দ্য।

সকালে বাজারের থলে ধরিয়ে দিয়ে সোনালি দেবী বলেন, বাজারে যা মৃদুল। এক পোয়া বাগদা চিংড়ি, ঢেঁরস এক পোয়া, লইট্যা পেলে আধা কেজি নিবি। আলু আনবি কেজি দুয়েক। খবরদার, আলুগুলো নিজে  বেছে নিবি। যা বজ্জাত আলুওয়ালারা! তোর মতো বোকাকে পেলে তো ওদের পোয়া বারো! এখন যে পোয়া-সেরের যুগ নয়, ভুলে যান মনোজগিন্নি।

বোকা—গালিটা নীরবে সহ্য করে মৃদুল। সোনালি দেবী যে তার চেয়ে অনেক বছরের ছোট—মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিতে ইচ্ছে করে বড়। কিন্তু মুখে কিছু বলে না মৃদুল। এদের টাকা দিয়েই তো বউ-মেয়েটির দু’বেলার খাবার জুটছে!

ড্রইংরুমে বসা পেপার থেকে মুখ তুলে মনোজবাবু বলেন, কী বলছি শুনছ, মৃদুলকে জিজেস করো জিমের বিছানাপাতি পরিষ্কারটরিষ্কার করেছে কি না?

অনুচ্চস্বরে মৃদুল বলে, করেছি স্যার।

খুব ভোরে ওঠে মৃদুল। পাতা কুড়িয়ে, ঝাঁট দিয়ে বাগানটা পরিষ্কার করে। এরপর জিমের গু-মুতে হাত দেয়। এগুলো হয়ে গেলে জিমের বিছানা, আরামকেদারা ঝেড়ে মোছে। আজকেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

কাজের মেয়ে লতিকার রংঢঙের শেষ নেই। নাম লতা হলে কী হবে, মোটেই পাতলা নয় লতিকা। পৃথুলা। নড়তে-চড়তে ছয় মাস লাগে। থলথলে শরীর নিয়ে রান্নাঘর সামলায়। ডুপ্লেক্সের সিঁড়িসমেত একতলা-দোতলা ঝাড়ু দেওয়ার দায়িত্ব লতিকার হলেও লতিকা ঝাঁট দেয় না। বলে, আমার অনেক কাজ, মৃদুলদা ঝাড়ুটা দিও। বাড়তি একটা রুটি সকালের নাশতার টিনের প্লেটে গুঁজে দিতে দিতে বলে লতিকা। মৃদুলের জন্য সকালের নাশতা বরাদ্দ দুটি আটার রুটি, এক চিমটে আলু ভাজি আর ভাঙা কাপে ঘোলা একটু চা। বাড়তি রুটিটা মৃদুলের কাছে বড় লোভনীয়।

নাশতা তৈরি হলে লতিকা ওপর দিকে মুখ তুলে ডাক পাড়ে—মা, বাবা, নাশতা রেডি। আপনারা নেমে আসুন। মনোজবাবু আর সোনালি দেবী দোতলায় থাকেন। লতিকার ডাক শুনে অভ্যন্তরীণ সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন তাঁরা। লতিকার উচ্চারণ সুন্দর। উচ্চারণে মুগ্ধ তাঁরা। কিন্তু লতিকার ভেতরে যে উচাটন! লতিকা স্বামী পরিত্যক্তা। বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরেও বাচ্চা হয়নি লতিকার। বাঁজার কারণে, না স্থূলতার কারণে স্বামী তাকে ত্যাগ করেছে, কেউ জানে না। এ ঘাটে ও ঘাটে ভাসতে ভাসতে মনোজবাবুদের বাড়িতে এসে জুটেছে একদা। লতিকার মনে বড় আশ্রয়হীনতার ভয়। এ বাড়ি হারালে কোথায় যাবে সে—এই ভয়ে ত্রস্ত থাকে সে। মন জোগানোর জন্য তাই তো মা-বাবা ডাকা। শুধু তা-ই নয়, বাগানে গিয়ে জিমের গায়েও মাঝে মাঝে হাত বোলায় লতিকা। জানে—জিমের আদর। লতিকার এই আদরের দৃশ্যটি এক বিকেলে মনোজবাবুর চোখে পড়ল। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ব্যালকনিটা মসলাবাগানের ওপর। কখনো জিমকে আদর করতে ইচ্ছা করলে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান মনোজবাবু। ডাক দেন, জিম, মি-স্টার জিম। লুক অ্যাট মি। চুক চুক চুক। সেই বিকেলেও তা-ই করতে এসেছিলেন। এসেই চোখ পড়েছিল লতিকার ওপর। লতিকা তখন জিম-সোহাগে মগ্ন।

মনোজবাবু চাপা কণ্ঠে ডাকলেন, ‘সোনালি’।

ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। মনোজবাবু একটু আগে জিমকে যে কণ্ঠে ডাকার চিন্তা করেছিলেন, ওই কণ্ঠেই ডাকলেন, ‘সোনা-লি’।

শ্লথ পায়ে সোনালি বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসেন। কামিজ পরেছেন তিনি। ওড়না নেই। সোনালির চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। এর পরও চাবুক-শরীর তাঁর। সোনালির যে একটা সন্তান আছে এবং সে সন্তান যে কুড়ি পেরোনো, সোনালির শরীর দেখে বোঝা যায় না। উন্নত উরস। লোভনীয়। একটু আগে উতলা হয়েছিলেন মনোজবাবু। হাত বাড়িয়েছিলেন সোনালির দিকে। সোনালিও একটু-আধটু সাড়া দিচ্ছিলেন। এমন হয় ওঁদের। কখনো কখনো বিকেলে নৌকা ভাসান মনোজ সেন। রাতের শোধ দিনে তোলেন। মনোজ সেনের বয়স পঞ্চাশ হলে কী হবে, সোনালির শরীর এখনো তাঁকে বাসর রাতের মতো ব্যাকুল করে। আজও তা-ই হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে হঠাৎ বেঁকে বসলেন সোনালি। বললেন, আজ নয়। বলে পাশ ফিরলেন।

মনোজ সেনের মনটা ভারী হয়ে গেল। একবার ভাবলেন—জোরজবরদস্তি করবেন, আবার ভাবলেন—তা কেন! সোনালি তো তাঁরই। আজ না হয় কাল হবে।

এই সময় আচমকা জিমের কথা মনে পড়ল মনোজবাবুর। জিমকে দেখলে তাঁর ভারী মন হালকা হয়ে যাবে—ভেবে বিছানা ছাড়লেন তিনি। এরপর ব্যালকনিতে দাঁড়ানো। লতিকা-জিমের সোহাগ জড়ানো দৃশ্য দেখে সোনালিকে না ডেকে পারলেন না মনোজবাবু। একটু আগের অভিমান ভুলে ডাকলেন—সোনালি।

সোনালি মনোজ সেনের পাশে এসে দাঁড়ালেন। আধখোলা চোখে মনোজের দিকে তাকালেন, মনোজবাবু মুখে কিছু বললেন না। শুধু তর্জনীটা নিচের দিকে বাড়ালেন।

লতিকা তখন আদরে ব্যস্ত। জিম দাঁড়ানো। আদরে চোখে লাস্য। লতিকার হাত মাথার দিক থেকে পিঠ বেয়ে পেছনের দিকে নামছে। কখনো কখনো হাত নেমে আসছে জিমের পেটে। জিমের শরীর টান টান। জিহ্বা সামান্য বের করা। আহারে শ্যামল, তুমি এখন কোথায়। আমাকে ছাড়া তুমি শান্তি পাচ্ছ শ্যামল? আমি মোটা—তার জন্য তো আমি দায়ী নই। মোটা মেয়েরও তো শরীর আছে, মন আছে। মনে লোভ-আকুতিও আছে। তুমি আমার সেই আকুতির কোনো দাম দিলে না। শ্যামল। এই যে জিমকে আমি আদর করছি, এই আদরটা তো তোমারই প্রাপ্য ছিল শ্যামল। আদর থেকে নিজে বঞ্চিত হলে, আমাকেও বঞ্চিত করে গেলে গো! অর্ধ নিমীলিত চোখে এসব কথা লতিকা ভাবছে আর জিমকে আদর করে যাচ্ছে।

মনোজবাবু মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন, কী ভাবছ?

ভাবছি এই লতিকাটা কী করছে! অস্বস্তি জড়ানো কণ্ঠে বলেন সোনালি।

আদর করছে। মনোজবাবু বলেন।

এই ভাবে! অবাক কণ্ঠ সোনালির।

এবার তরল কণ্ঠে অনুচ্চ স্বরে হেসে ওঠেন মনোজ সেন। বলেন, শিখে নাও।

কী শিখে নেব! কী শিখে নেব অ্যাঁ! বলতে বলতে মনোজের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন সোনালি। মনোজের গালে-গলায়-বুকে কী রকম করে যেন দুই হাতের আঙুল দিয়ে আঁচড়াতে লাগলেন। এ আঁচড়ানোতে কোনো ব্যথা পেলেন না মনোজ, নিজের মধ্যে কিসের একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেল তাঁর। দুই হাত দিয়ে সোনালির শরীরটাকে জাপটে ধরলেন তিনি। বুকের কাছ বরাবর সোনালিকে চেপে ধরে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলেন মনোজ।

মনোজবাবুদের বাড়িতে দুই ধরনের ভাত রাঁধা হয়, তরকারিও। মোটা চালের ভাত আর চিনিগুঁড়া চালের ভাত। বাগদা চিংড়ি, ইলিশ, লাক্ষা, রূপচাঁদা, মুরগি, খাসি আর আলু-পটোল-কুমড়া-সজনে ডাঁটা-বেগুন ভর্তা-খেসারি ডাল। মোটা ভাত মৃদুল-লতিকার জন্য। চিকন ভাত মনোজ দম্পতি ও জিমের জন্য। আলু-পটোলের তরকারি দিয়ে মৃদুলরা পেট ভরায়। উন্নত তরকারিগুলো মনোজবাবুদের খাওয়া শেষে পরের বেলার জন্য ফ্রিজে তুলে রাখা হয়। ভাতও যখন ইচ্ছা খেতে পারে না মৃদুলরা। মনোজ-সোনালি ডাইনিং টেবিলে খেয়ে উঠে যাওয়ার পর রান্নাঘরের মেঝেতে পাত পাতে মৃদুলরা। উদরে তখন খিদের আগুন। কচু-ঘেঁচুর তরকারিও তখন অমৃত সমান।

জিমের জন্য মাংস কিনে আনা হয়। মুরগির মাংসই প্রিয় জিমের। আস্ত মুরগিকে ছোট ছোট টুকরা করতে বসে মৃদুল। মাংস কাটতে কাটতে ভাবে—আহা রে জিম, তুই ক-ত ভাগ্যবান! তোর জন্য মুরগির মাংস আর চিনিগুঁড়া। আর আমার জন্য...। মৃদুল না হয়ে যদি জিম হয়ে জন্মাতাম! হায় ভগবান, তুমি আমাকে মানুষের ঘরে পাঠিয়েছ, তার জন্য তোমাকে হাজারো প্রণাম। কিন্তু ঈশ্বর, আমাকে গরিব ঘরে পাঠালে কেন? আজ যদি আমাকে মানুষ না করে কুত্তা করতে, এই জিমের মতো কুত্তা বানাতে ভগবান, তাহলে এই রকম মাংস খেতে পারতাম, চিকন চালের ভাত খেতে পারতাম। সুন্দর বিছানা থাকত আমার, মাথার ওপর ফ্যান ঘুরত। অলসভাবে পায়চারি করার উঠান পেতাম। মাঝেমধ্যে একটু-আধটু ঘেউ করে উঠতে হতো শুধু, আর মালিকের আদরের চুক চুক করার জবাবে সামান্য লেজ নাড়া। কুকুর তুমি করলে না আমায় ভগবান। করলে কুকুরের সেবক।

জিমের ভাত মৃদুলকেই রাঁধতে হয়। ভাত রাঁধার বিশেষ প্রক্রিয়া আছে। চাল ধুয়ে হলুদ দিয়ে মাখতে হয়। এরপর গরম ঘিয়ে চালগুলো টেলে নিতে হয়। এরপর জল। জল-চালে এক চিমটি মসলা। ভুর ভুর সুঘ্রাণ। বুক ভরে শ্বাস টানে মৃদুল—আহ্, কী সুগন্ধ! ভাত আধা সিদ্ধ হলে কুচি মাংস ছেড়ে দেওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাস মাতোয়ারা।

দামি সিলভারের থালায় ভাত বাড়তে বাড়তে মৃদুলের জিভ লালায় ভরে ওঠে। চোখ দুটো ঘোর ঘোর। যেন মাংসসহ ভাত চিবোচ্ছে মৃদুল।

জিমকে ভালোবাসতে শুরু করে মৃদুল। মাসের প্রথম দিকে দুই দিনের ছুটি পায় সে। বেতন নিয়ে বাড়ি যায়। রোগা বউয়ের সান্নিধ্য পায়। বড় মেয়ের খোঁজখবর নেয়, ছোট মেয়েকে পড়াশোনার কথা জিজ্ঞেস করে। এই সময়েও হঠাৎ হঠাৎ তার জিমের কথা মনে পড়ে। জিমকে আজ স্নান করাল কে? তার বিছানাপাতি কে গোছাল? জিম ঠিকঠাকমতো খেতে পাচ্ছে তো!

মনোজবাবুদের বাড়িতে ফিরে জিমের পাশে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে ঠিক ওই কথাগুলোই জিজ্ঞেস করে মৃদুল। বলে, কোনো অসুখবিসুখ করেনি তো তোর জিম? ভালো তো ছিলি? তোকে খেতে দিল কে? কার রান্না খেলি তুই এ দুই দিন। মনোজবাবুর প্রথম দিনের খবরদারি তখন মৃদুলের মনে থাকে না। জিমকে ‘তুই’ করে বলার মধ্য দিয়ে যে হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা প্রকাশ পায়! আপনজনকে কেউ তুমি করে বলে? ‘তুমি’ যে অনেক দূরের গো!

মৃদুলের কোনো ছেলে নেই। অতি চাপা অথচ তীব্র একটা বোধ মৃদুলের মধ্যে কাজ করে। জিমের কাছে এলে সেই তীব্র অনুভূতির দরজাটা আপনাতেই খুলে যায়। সে পরম মমতায় জিমের মাথায়-গায়ে হাত বোলায়। জিমের মুখ দিয়ে কুঁই কুঁই আওয়াজ বেরিয়ে আসে। মৃদুল সেই কুঁই কুঁইয়ের তরজমা করে—বাবা, বাবা। মৃদুল তখন আর মনোজবাবুদের চাকর থাকে না, জিমের মলমূত্র সাফাইকারী থাকে না। সে হয়ে যায় পুত্রসন্তানের বাপ, জিমের পিতা।

সেই জিম এক রাতে মারা গেল। খেতে চায়নি জিম, সে রাতে। খাবারের থালা সামনে রাখলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মৃদুল বলেছে, খা বাপ, খা। তোকে খাইয়েদাইয়ে তবে তো আমি খেতে যাব রে বাপ। এর পরও থালার দিকে মুখ ঘোরায়নি জিম।

মৃদুল বলেছে, আমার ওপর রাগ করেছিস জিম? আমি তো তোকে কোনো দুঃখ দিইনি রে বাপ। জিম, তুই যদি না খাস, স্যার আমাকে ছেড়ে কথা বলবেন না। বলবেন, তুই হারামজাদা, ভাতগুলো যত্ন করে রাঁধিস নাই। নইলে কেন জিম খেতে চাইছে না? বল জিম, তোর জন্য গালি খেলে ঠিক হবে? জিমের গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে কথাগুলো বলে গেল মৃদুল।

জিম কী বুঝল কে জানে। ভাতের থালায় মুখ বসাল। গভীর রাতে জিমের যন্ত্রণা শুরু হয়েছিল। প্রথমে কুঁই কুঁই, এরপর ঘেউ ঘেউ। মাঝেমধ্যে এ রকম করে জিম। মনোজবাবু ভাবেন—সঙ্গিনী নেই তো, তাই জিম এ রকম উতলা হয়। আজও তাই ভাবলেন।

মৃদুলকে কাল ঘুমে পেয়ে বসেছিল। না হলে জিমের কাতরধ্বনি সে শুনতে পেল না কেন? গোটা দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত ছিল মৃদুল। সকালে উঠে দেখে—জিম বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। মুখটা তার সামান্য হাঁ-করা।

কাছে গিয়ে মৃদুল ডাকল, জিম, এ্যাই জিম।

কোলে করে এনে উঠানে শুইয়ে দিয়েছে জিমকে। মৃদুল প্রথমে হতভম্ব। এরপর গলাফাটা চিৎকার, স্যার, স্যার গো—!

জিমের মাথার পাশে মাটিতে লেপ্টা মেরে বসে মৃদুল কেঁদে যাচ্ছে। অদূরে লতিকা দাঁড়িয়ে। তার চোখে আঁচল চাপা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা