kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

ভ্র ম ণ

শ্যানানডোয়া নদীজলে মাছের বোবা দৃষ্টি

মঈনুস সুলতান

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩২ মিনিটে



শ্যানানডোয়া নদীজলে মাছের বোবা দৃষ্টি

শ্যানানডোয়া নদীর বাঁকানো রেখা

শ্যানানডোয়া নদীটির বাঁকানো রেখাকে নিশানা করে অনেকক্ষণ হলো হাইক করছি। রুপালি জলের বঙ্কিম অবয়ব ছোট হতে হতে এমন আকার ধারণ করেছে যে স্রোতের এই স্বচ্ছসলীলা শরীরকে এখন অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের হাতিয়ার বুমেরাংয়ের মতো দেখাচ্ছে। আজকের হাইকে কেন জানি খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তাই দ্রুত বেগে হাঁটি। কোন দিকে যাচ্ছি ঠিক বুঝতে পারি না। আবার ট্রেইলের মানচিত্রওয়ালা বই-পুস্তক ঘাঁটতেও ইচ্ছা হয় না। ঘণ্টা দুয়েক জোর কদমে হেঁটে আমি বেশ খানিকটা উঁচু এলিবেশনে এসেছি, তাই পথ চলতে পরিশ্রম হচ্ছে বিস্তর। সঙ্গে সলিড খাবারদাবার তেমন কিছু নেই, এ কারণে ক্ষুধা পাচ্ছে বারবার। আমার দৃষ্টিপথ থেকে শ্যানানডোয়া নদীটির রুপালি রেখাও হারিয়ে গেছে কিছুক্ষণ হলো। স্পষ্টত আমি ডেব্রা ও নাথানিয়েল দম্পতির ক্যাম্পসাইট থেকে দূরে সরে এসেছি। আড়াই দিন আগে এই দম্পতির নদীতীরের ক্যাম্পসাইটে আমি মেহমান হিসেবে দুই রাত্রি কাটিয়েছি। নাথানিয়েল ভুগছেন মারাত্মক রকমের ক্যান্সারে। ডাক্তার তাঁকে ছয় মাসের মেয়াদ বেঁধে দিলে তাঁর স্ত্রী ডেব্রা তাঁকে নিয়ে এসে তাঁদের প্রিয় নদী শ্যানানডোয়ার কূলে নিবিড় বনানীতে ক্যাম্প করে বসবাস করতে শুরু করেন। অরণ্যের সিগ্ধ ছায়ায় একটি ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে নাথানিয়েল শ্যানানডোয়া নদীর বহতা স্রোতের দিকে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। ডাক্তারের কাছ থেকে ছয় মাসের মেয়াদ পেয়ে তিনি ঘর ছেড়ে ক্যাম্পসাইটে বাস করছেন। এরপর কেটে গেছে সাড়ে সাত মাসের মতো। স্ত্রী ডেব্রা সঙ্গেই আছেন। স্বামীর পরলোকপ্রাপ্তি ঘটলে নদীজলে দেহভস্ম ভাসিয়ে তিনি ঘরে ফিরবেন। দুই রাত্রি কাটিয়ে আমেরিকার বিচিত্র এই দম্পতির নিসর্গছোঁয়া কম্পেনিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম। তাঁদের সঙ্গে আরো দিন কয়েক কাটালে নাথানিয়েলের শারীরিক দুর্যোগে হয়তো আমি ডেব্রাকে সহায়তা করতে পারতাম। মনে হয়, এই যুগলের যাপিত জীবনের কাছাকাছি এসেও স্বেচ্ছায় সরে এলাম। কিন্তু আমি তো হাইকার, অজানা পথে হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে চলে যাওয়াই আমার নিয়তি। কাউকে সঙ্গ দেওয়া বা কোনো সংকটে সহায়তাদান আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত না।

ব্যাকপ্যাকে শুকনো খাবার ও তাঁবু নিয়ে আমি সপ্তাহ তিনেক আগে ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের শ্যানানডোয়া ন্যাশনাল পার্কে যাত্রা শুরু করি। শ্যানানডোয়া নদীর জলরেখাকে ল্যান্ডমার্ক ধরে হাইক করতে করতে অবশেষে নিবিড় অরণ্যানী চষে চলে আসি ব্লুরিজ মাউন্টেনের পশ্চিম পাশে। সপ্তাহখানেক পথ চলার পর আমার ফুড সাপ্লাইয়ে তঙ্গি পড়ে। কিন্তু তখনো হাইকিং ট্রেইলে পথ চলতে গিয়ে দেখা হচ্ছিল অন্য হাইকারদের সঙ্গে। আমি ব্যাকপ্যাকে করে কিছু পণ্য ক্যারি করছি। তো অন্যান্য হাইকারের সঙ্গে আমি এসব পণ্য বার্টার পদ্ধতিতে বিনিময় করে খাবারের সংকুলান করছিলাম। কিন্তু ব্লুরিজ পাহাড়ের কাছে এসে হাইকিং ট্রেইল নির্জন হয়ে পড়ে। সলিড কোনো খাবার প্রায় না খেয়ে, খানিকটা চিনাবাদাম ও চকোলেটের ওপর ভরসা করে আমি দিন দুয়েক হেঁটে অবশেষে এসে পৌঁছি শ্যানানডোয়ার কূলে। ওখানে নাথানিয়েল ও ডেব্রা দম্পতির সান্নিধ্যে দিন দুই কাটাই, আহারাদিও জোটে মন্দ না। এরপর আবার তাঁদের গুডবাই বলে হাইকিং ট্রেইল হিট করলাম। খাবারের নিদারুণ সংকটও পথচলায় ছায়ার মতো আমার সঙ্গী হলো।

হাঁটতে হাঁটতে ক্ষুধা তীব্র হলে ব্যাকপ্যাকের জিপার খুলে খুঁজি, খাবার কিছু পাওয়া যায় কি না। তিনটি হার্সসির চকোলেটবারের সন্ধান পাই। এগুলো নাথানিয়েল ও ডেব্রা দম্পতির কাছ থেকে সৌজন্য হিসেবে পাওয়া। তীব্র ক্ষুধার মুখে চকোলেট চুষতে ইচ্ছা হয় না। বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তেই তাঁদের চমৎকার সান্নিধ্য তীব্রভাবে মনে পড়ে। এই দম্পতির জীবন সম্পর্কে যা জানতে পেরেছি, তা যেন একটি উপন্যাসের খানিক ছেড়ে ছেড়ে মাঝখান থেকে পড়া কয়েকটি পৃষ্ঠা। কী এমন ক্ষতি হতো সারা নভেলটা ধৈর্য ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়ে ফেলতে পারলে?

ক্রমেই ভোঁতা হয়ে আসা ক্ষুধার অনুভূতির ভেতর আমার চলার পথ ভরে ওঠে লালচে হলুদ সব বর্ণাঢ্য ঝরা পাতায়। ট্রেইলে এবার আরেকজন হাইকারের উপস্থিতি দেখতে পেয়ে একটু ভরসা পাই। এই মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তিন দিন আগে ক্যাম্পসাইটের ডকে। তিনি শ্যানানডোয়ার জলে রবারের ডিঙি ভাসিয়ে ক্যামেরা তাক করে ধরেছিলেন। সামান্য হাই-হ্যালোতে জানতে পেরেছিলাম যে তিনি গোধূলির আলোয় জলের সারফেসে ভেসে ওঠা মাছের পতঙ্গ ধরে খাওয়ার ছবি তুলছেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে আমি বাঁক নিয়ে ঘুরে তাঁর দিকে এগিয়ে যাই। কাঁচাপাকা চুল-দাড়িওয়ালা মাঝবয়সী এই মানুষটি মাটিতে হাঁটু গেড়ে ঝরা পাতার ওপর বসে থাকা কোনো কীটের ছবি তুলছেন। জানতে চাই, ‘হেই, ইউ গট সামথিং ইন্টারেস্টিং টু পিকচার অ্যাবাউট?’ তিনি না তাকিয়ে জবাব দেন, ‘ও ইয়েস, কাম ক্লোজ অ্যান্ড টেক আ লুক অ্যাট দ্য ইনসেক্ট।’ বলে তিনি মাথা তুলে আমাকে ইনভাইট করেন। আমি কাছে গিয়ে দেখি, তিনি বিশেষ লেন্স লাগিয়ে এক জোড়া হোবারফ্লাইয়ের মিথুন করার ছবি তুলছেন। আমি কাছে যেতেই পতঙ্গ দুটি পরস্পরের শরীরে প্রবিষ্ট হওয়া হালত থেকে বিযুক্ত হয়ে সরসর করে সরে যেতে থাকে আরেকটি ঝরা পাতার আড়ালে। ছবি তোলা শেষ হতেই এই হাইকার উঠে দাঁড়িয়ে জাপানি কেতায় আমাকে বাও করে বলেন, ‘আর ইউ ইন্টারেস্টেড ইন ইনসেক্টস?’ আমি কপট সম্মতিতে মাথা ঝাঁকালে তিনি প্রীত হয়ে ফের বলেন, ‘তোমার কোনো তাড়া না থাকলে আমার সঙ্গে চলো, একটু খেয়াল করে তাকালে এদিকে পাওয়া যাবে জোড়ায় জোড়ায় মিথুনরত পতঙ্গ।’ আমি তাঁর সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে জানতে চাই, ‘আপনার স্পেশালিটি কি পতঙ্গের ছবি তোলায়?’ তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে জবাব দেন, ‘শুধু ছবি তোলা নয়, আমি যে কাজ করতে চাইছি তা আরো জটিল।

আমি এই ছবিগুলো ব্যবহার করে প্রিন্ট বানাব। এরপর জাপানি কাগজে ছাপ দিয়ে তৈরি করব ছোট্ট ছোট্ট ভিউকার্ড।’ তিনি ফের হাঁটতে শুরু করলে আমি তাঁর সঙ্গে চলতে চলতে জানতে চাই, ‘কার্ড বানানোর কাগজগুলো কি আপনি জাপান থেকে সরাসরি আমদানি করেন?’ মাথা হেলিয়ে জবাব দেন, ‘ও হেল, নো, আমদানির কোনো দরকার পড়ে না। আমার ফার্ম হাউসে আমি পেপার মালবেরির চাষ করছি। এগুলোর বাকল জ্বাল দিয়ে তৈরি করব তোসা ওয়াসি নামের এক ধরনের কাগজ। তোসা ওয়াসি কাগজ দিয়ে তৈরি করা ভিউকার্ড হয় খুবই দৃষ্টিনন্দন।’ আমার কৌতূহল চাগিয়ে ওঠে, ‘কাগজ তৈরির এই ইন্টারেস্টিং কাজ আপনি শিখলেন কোথা থেকে?’ তিনি উত্তরে বলেন, ‘ওয়েল, কিছুদিন আগে আমি আমেরিকান নেভিতে কাজ করতাম। পনেরো বছর সার্ভিস করে মাত্র রিটায়ার করেছি। যে সাবমেরিনে আমি নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টরের তত্ত্বতালাবির কাজে পোস্টেড ছিলাম, তা বছরের বেশির ভাগ সময়ই ডক করা থাকত জাপানের ওকিনাওয়া আইল্যান্ডে।’ আমি এবার জানতে চাই, ‘তা সাবমেরিনের রিঅ্যাক্টর মেরামতে তোসা ওয়াসি কাগজের কোনো দরকার পড়ে কি?’ তিনি মাথাটি হেলিয়ে বলেন, ‘না, তা পড়ে না অবশ্য। তবে একবার ছুটি কাটাতে শিকোকু দ্বীপে বেড়াতে গেলে আমি তোসা ওয়াসি নামের কাগজ তৈরির কলাকৌশল শিখে নিই। জাপানি ভাষায় তোসা হচ্ছে কিংডমের প্রতিশব্দ। শিকোকু দ্বীপ হচ্ছে...ইন আ ট্রু সেন্স...আ কিংডম অব পেপার। সব ধরনের কাগজ তৈরির হেকমত আমি এখনো শিখে উঠতে পারিনি। ভিউকার্ড তৈরির জন্য আমি যে কাগজ পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করেছি তাকে বলা হয় হোসোগামি। আদিকালে এই কাগজ শুধু জাপানের সম্রাট ডেইগোর জন্য তৈরি করা হতো। আমার পরিকল্পনা হচ্ছে, হোসোগামি কাগজে পতঙ্গ-মিথুনের ছাপ দিয়ে নিচে ক্যালিওগ্রাফ করে জুড়ে দেব ধ্রুপদি ধারার একেকটি হাইকুর তিনটি ছোট্ট চরণ। হাউ ডু লাইক মাই আইডিয়া?’

আমি তাঁর প্রশ্নের সরাসরি জবাব না দিয়ে সবুজ পাতার ওপর জড়িয়ে থাকা একটি শুঁয়াপোকার দিকে নির্দেশ করি। প্রজাপতি হয়ে ওঠার দিন কয়েক বাকি আছে, এ ধরনের শুঁয়াপোকাটির নিচে পাতায় শুঁড় তুলে হাঁটছে লোহিতে কালো গোলাকার ফোঁটাওয়ালা মিল্কউইড বিটেল নামের আরেকটি পতঙ্গ। তিনি সাবধানে তাঁর ছবি তুলতে তুলতে বলেন, ‘একই পাতায় এই পতঙ্গ দুটির কালার কন্ট্রাস্ট ছবিতে ভালো আসবে। তবে এ ধরনের পতঙ্গের ছবি তোলার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি খুঁজছি মিথুনরত কীট।’ এই ছবিতে অসুবিধা কী জানতে চাইলে তিনি জবাব দেন, ‘লিসেন, আমি স্ট্রেইট টক করতে ভালোবাসি। এই ছবি দিয়ে প্রিন্ট বানানো যাবে, তবে আমার কালেকশনে যে হাইকুগুলো আছে তার সঙ্গে তা ম্যাচ করবে না।’ আমি এবার প্রশ্ন না করে পারি না, ‘শুধু মিথুনরত পতঙ্গের ছবি তোলা এত জরুরি কেন?’ আমার এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দ্য রিজন ইজ পিওর কমার্শিয়াল। খুব লার্জ স্কেলে আমি ভিউকার্ড প্রডাকশন করছি না। মিলিটারি বা নেভিতে যারা জাপানে কাজ করেছে বা জাপ সংস্কৃতির সঙ্গে যাদের আছে খানিক জানাশোনা, শুধু তারাই আমার কার্ডগুলো কিনবে। তাদের অনেকেই শুনগা নামে জাপানে পরিচিত উডব্লক প্রিন্টের ইরোটিক আর্টের কদরদানি করে থাকে। আমার কার্ডগুলোও হবে শুনগা ধারার। সিস্টেমেটিক্যালি মার্কেট আমি স্টাডি করিনি। তবে আমার ধারণা, পতঙ্গের ইরোটিক এলিমেন্টের জন্য আমার কার্ডগুলোর চড়া দামে কাটতি হবে।’

আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি জঙ্গলের স্যাঁতসেঁতে অঞ্চলে। এদিকে ছড়ানো আছে কিছু বড়সড় ধূসর রক। তার একটির ওপর বসে শুঁড় নাড়াচ্ছে বাদামি রঙের শামুক। আমি তাঁর দিকে ইশারা দিলে তিনি বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘শুট, দিস ইজ আ ড্যাম লোনলি স্নেইল। একেবারে একা একটি শামুকের ছবি তোলা কোনো কাজের কথা নয়। লেটস লুক অ্যান্ড ফাইন্ড আ কাপল।’ শামুকের মিথুনসংক্রান্ত বিষয়-আশয়ে আমি তেমন একটা আগ্রহী নই, তবে তাঁর সঙ্গে আলাপ জমানোর প্রয়োজন আছে। তাঁর রবার ডিঙিতে যদি আমি লিফট পাই, তাহলে যেতে পারব শ্যানানডোয়ার ভাটিতে। বর্তমানে আমার অবস্থান জনপদ থেকে কমসে কম ত্রিশ কিংবা পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে অরণ্যের ভেতরমহলে। তবে শ্যানানডোয়ার ভাটিতে নেমে যেতে পারলে মাইল পাঁচেক হাঁটলেই পাওয়া যাবে আবাসিক এলাকা। তাই খুব কৌতূহলী ভঙ্গিতে ভাব জমানোর প্রয়াসে জানতে চাই, ‘পতঙ্গের বিষয়ে আপনার আগ্রহ হলো কিভাবে?’ জবাবে তিনি জানান, ‘একবার ভ্যাকেশনের সময় আমি পর পর অনেকগুলো সামুরাই যুগের জাপানি কেল্লায় ঘুরে বেড়াই। তাসুইমা নামের কেল্লার চারপাশের বনানীতে আমি জাপানি পর্যটকদের মিথুনরত পতঙ্গের ছবি তুলতে দেখি। পরে বেড়াতে যাই নাগোইয়া, হাইমেজি, শিরো প্রভৃতি দুর্গে। ওখানেও দেখি জোড়ায় জোড়ায় দুরবিন বাগিয়ে নীরবে পতঙ্গের সংগম প্রত্যক্ষ করছে। তাদের কাছ থেকে জানতে পারি যে এই অবলোকনেরও নাকি আছে আফ্রোদিসিয়াক প্রভাব। বিষয়টি তখন থেকে মনে ধরেছিল। নাউ আই অ্যাম ট্রায়িং ইট আউট।’

জোড়া শামুকের সন্ধানে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে আমি এবার মন্তব্য করি, ‘রিটায়ার করে মনে হয় আপনার হাতে প্রচুর সময়?’ তিনি কোনো চিন্তাভাবনা না করেই জবাব দেন, ‘ইয়েস, আই হ্যাভ আ লট অব টাইম। হাতে হিউজ টাইম—বুঝলে, করারও বিশেষ কিছু নেই, আবার একই সঙ্গে আমার নেস্টটিও এম্পটি। নেভির কাজে জাপানে দুই বছরের ট্যুর সেরে ঘরে ফিরে দেখি, অ্যালাস, আমার বিউটিফুল পার্টনার আমাকে ছেড়ে চলে গেছে।’ আমি এবার সরাসরি প্রশ্ন না করে পারি না, ‘সে কি আপনাকে ডিভোর্স দিয়েছে?’ ব্যাবসায়িক ভঙ্গিতে তিনি জবাব দেন, ‘না, কাগজপত্রে আমরা বিবাহিত ছিলাম না, সুতরাং ডিভোর্সের প্রয়োজন পড়েনি। তার সঙ্গে আমার বছর কয়েকের সম্পর্ক, কিন্তু বুঝতে পারিনি সে যে...শি ওয়াজ অল অ্যালং আ গে ওম্যান।’ এবার আমার কৌতূহল চাপা দুষ্কর হয়, ‘হাউ ডু ইউ নো শি ইজ গে নাউ?’ তিনি নিরাসক্ত ভঙ্গিতে জবাব দেন, ‘তার সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টশন যে গে তা জানার জন্য আমাকে খোঁজখবর করতে হয়নি, সে নিজেই ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিয়েছে—কোনো নারী যদি সামাজিকভাবে নিজের গে পরিচিতি তুলে ধরতে লজ্জা পান, তাহলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। সে তাঁদের সেক্সুয়াল সার্ভিস প্রভাইড করবে।’ আমার পরবর্তী প্রশ্ন হয়, ‘তার এই আচরণে আপনি কি খুব বিস্মিত হয়েছেন?’ মাথাটি হেলিয়ে তিনি জবাব দেন,‘ খুব বেশি না, তবে...আই মাস্ট সে আ লিটল বিট সারপ্রাইজড দো! অ্যাজ আ ম্যাটার অব ফ্যাক্ট, ঠিক প্রফেশনালি না হলেও আগে সে কয়েকবার শৌখিনভাবে প্রস্টিটিউশনে জড়িয়েছে। পয়সা উপার্জনের প্রয়োজন তার ছিল না, আমার ধারণা ছিল বেচারি একা, স্রেফ বোরডোম কাটানোর জন্য এসব করছে। বাট দিস গে বিজনেস, কামার্ত মহিলাদের সার্ভিস প্রদান করার ব্যাপারটি আমার কাছে একটু সারপ্রাইজই বটে।’

‘গ্রেট, হেলস বেল, হিয়ার দে আর’, বলে এক্সাইটেড হয়ে তিনি এবার পাতার ওপর সংগমরত এক জোড়া শামুকের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। সাবধানে তাদের ছবি নিতে নিতে তিনি অতঃপর উল্লাস প্রকাশ করেন, ‘আই গট ইউ, রিয়েলি গট ইউ।’ যদিও তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের ইতিবৃত্ত আমি কৌতূহলের সঙ্গে শুনেছি, কিন্তু পতঙ্গের মিথুনের বিষয়ে আমার আদি থেকেই কোনো আগ্রহ নেই। আমি তাঁর সঙ্গে এতক্ষণ হেঁটেছি...ফ্র্যাংকলি স্পিকিং...সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রয়োজনে। ট্রেইলে আমি নিঃসঙ্গ হাঁটছিলাম, তার চেয়ে বড় কথা, প্রচণ্ড ক্ষুধা আমাকে অস্থির করে তুলেছিল। অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে কারো সাক্ষাৎ না পেলে খাবার সংগ্রহ করা যাবে না। তার ওপর যদি তাঁর রবার ডিঙিতে লিফট পাওয়া যায়, তাহলে বিনা শ্রমে অতিক্রম করা যায় অনেকটা পথ। তাই তাঁর সঙ্গে পতঙ্গ, জাপানি কাগজ তৈরির কৌশল ইত্যাদি নিয়ে আলাপ করে আমি পরিবেশ সৃষ্টি করেছি, এবার মূল বিষয় আলোচনা করতে হয়। সুতরাং ‘এক্সিউজ মি’ বলে জানতে চাই, ‘ডু ইউ হ্যাভ এনি এক্সট্রা ফুড?’ তিনি সাদাসাপ্টাভাবে জবাব দেন, ‘নো, নট রিয়েলি। আই হ্যাভ মাই ওউন স্যান্ডুইচ দো, দ্যাটস ইট।’ আমি এবার বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করার জন্য বলি, ‘আই অ্যাম ভেরি ভেরি হাংরি, আমার সঙ্গে ফুড সাপ্লাই সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে। আপনার সঙ্গে কি কোনো কিছুর বিনিময়ে খানিকটা ফুড বার্টার করতে পারি?’ তিনি স্ট্রেটকাট জবাব দেন, ‘নো, অ্যাবসোলিউটলি নট, আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড ইন বার্টার।’ আমি এবার ডেসপারেট হয়ে কিভাবে খানিকটা বেসিক ফুড সংগ্রহ করা যায় তার জন্য সাজেশন চাই। তিনি ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে বলেন, ‘লিসেন, আই ডু স্ট্রেট টক, খাবার সংগ্রহের ব্যাপারে তোমার সামনে খোলা আছে দুটি অপশন। আমার সাজেশন হচ্ছে, তুমি এই অপশনগুলো ট্রাই করে দেখতে পারো।’ আমি অধৈর্য হয়ে বলি, ‘কাইন্ডলি অপশনগুলো ব্যাখ্যা করেন।’ তিনি ঝরা পাতার ওপর থেকে নাম-না-জানা কোনো পতঙ্গের ছবি শুট করতে করতে অন্যমনস্কভাবে বলেন, ‘অপশন নাম্বার ওয়ান হচ্ছে—ট্রেইলে হোমোসেক্সুয়াল কোনো হাইকারের সন্ধান পাওয়া, যে তোমার শরীরের বিনিময়ে খাবার বার্টার করবে।’ তাঁর এ মন্তব্যে আমি ইনসালটেড ফিল করি, তবে রেসপন্স ব্যাক করার আগে তিনি ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে রেখে বলেন, ‘ইফ ইউ আর নট আ গে ম্যান, অপশন বি মাইট বি বেটার ফর ইউ।’ শুনে জানতে চাই, ‘হোয়াট ইজ ইট? অপশন বি-টা আসলে কী?’ বলে আমি তাঁর দিকে তাকালে তিনি ঢেউ-খেলানো পাহাড়ের দিকে ইশারা করেন। ওখানে ফের দেখা দিয়েছে শ্যানানডোয়া নদীর রুপালি রেখা, জলের শরীর যেন বনানীর সবুজ কেটে কেটে উড়ে যাচ্ছে আকাশের দিকে।

তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘গো টু দ্য রিভার, একটু চেষ্টা করলে হয়তো তুমি ধরতে পারবে বড়সড় কোনো মাছ। তাতে খাবার সমস্যার আশু সমাধান হয়ে যেতে পারে।’ ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও আমি তাঁকে পতঙ্গ, জাপানি কাগজ ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার জন্য পোশাকিভাবে ধন্যবাদ জানাই। তিনি কোমর বাঁকিয়ে রীতিমতো মাথা ঝুঁকিয়ে বাও করে বলেন, ‘ওয়াক স্ট্রেট টু শ্যানানডোয়া, ওখানে হয়তো পেয়ে যাবে মজাদার কোনো মাছ। আর মাছ যদি বা না-ই জোটে, ক্যানু নৌকায় বইঠা ফেলা কোনো মাসলম্যান হয়তো পছন্দ করবে তোমার ব্রাউন বডি।’

শ্যানানডোয়ার জলরেখা নিশানা করে অতঃপর হাঁটতে শুরু করি। নদীটিকে কুণ্ডলী খুলে দীর্ঘ ঘাস মাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়া রুপালি এক অজগরের মতো দেখায়। সানগ্লাসে ছলকে যাচ্ছে রোদের বিচ্ছুরণ। ঝকঝকে রোদের ভেতর দিয়ে ঘণ্টাখানেক হাইক করে অবশেষে এসে পৌঁছি শ্যানানডোয়ার কূলে। পারের পায়ে চলা পথে ফুটেছে পর পর অনেক ব্লুবেল বলে বর্ণাঢ্য উজ্জ্বল ফুল। এই ফুলগুলো দেখতে অনেকটা চার্চের ঘণ্টার মতো। দেখতে দেখতে ফুলভারে ঈষৎ নত গাছের সংখ্যা বাড়ে। মাটিতেও পড়ে আছে শত শত তীব্র নীল রঙের ফুলের পাপড়ি। আমি ব্যাকপ্যাক মাটিতে রেখে একটু জিরাই। হামিংবার্ডদের দলছুট একটি ঝাঁক উড়ে এলে মন নিমেষে হয়ে ওঠে পুষ্পরঙিন। খানিক সামনে গিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা একটি গাছের ওপর দাঁড়িয়ে এবার বাইনোকুলারে নদী স্ক্যান করি। এখানে জল অগভীর এবং স্রোত মৃদু। অল্প দূরের বাঁকে পাথুরে এক টিলা চরের দিকে নেমে আসতে আসতে ধূসর রকের জগদ্দলে রূপান্তরিত হয়েছে। তাতে দুপুরের সূর্যালোকে ঝলসাচ্ছে রুপালি আগুন। ঠিক নিচে পানিতে হাঁটু অবধি ভিজিয়ে বড়শিতে মাছ ধরছেন লাল টি-শার্ট পরা একজন মানুষ। আমি এবার ব্যাকপ্যাকটি কাঁধে তুলে নদীর পার বেয়ে সাবধানে নেমে আসি চরে।

ফিশারম্যানের কাছাকাছি আসতে আমার মিনিট বিশেক সময় লাগে। ততক্ষণে তাঁর বড়শিতে ধরা পড়েছে বড়সড় একটি মাছ। তা নিয়ে তিনি এসে ওঠেন চরে ঠেকানো তাঁর নৌকায়। আমি তাঁর কাছে গিয়ে তোয়াজ করে বলি, ‘সুপার্ভ ফিশ। হোয়াট আ ফাইন ক্যাচ...ম্যান।’ তিনি দুই হাতে স্বর্ণালি আভার মাছটি তুলে ধরে বলেন, ‘দিস ইজ জাস্ট আ রিভার বিউটি, ইজন্ট শি গোল্ডেন অ্যান্ড ভেরি প্রিটি?’ আমি আলাপে যোগ দিই, ‘অব কোর্স শি ইজ আ ফাইন রিভার অ্যাঞ্জেল’, বলে আমার প্রশংসাকে গাঢ় করে তুলি। কিন্তু ফিশারম্যান তাঁর কাঁধ ও মাথা যুগপৎ নেতিবাচকভাবে ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘বাট, আই ডোন্ট ওয়ান্ট হার। এই মাছের আমার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি এটাকে এখনই ছেড়ে দিচ্ছি জলে।’ আমি ডেসপারেট হয়ে ‘নো নো, ওয়েট এ সেকেন্ড ম্যান,’ বলে আমি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে জানতে চাই, ‘এ মাছের প্রয়োজন নেই, হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?’ বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘দিস ইজ আ রেড ব্রেস্টেড সানফিশ। আমি খুঁজছি রেইনবো ট্রাউট। সানফিশ দিয়ে আমি কী করব। নো নিড ফর মি টু কিপ ইট।’ আমি এবার বিনীতভাবে অনুরোধ করি, ‘পানিতে ছাড়ার দরকার নেই, মাছটি আমাকে দান করে দিন।’ তিনি খানিক বিভ্রান্ত হয়ে জানতে চান, ‘টেল মি হোয়াই ইউ ওয়ান্ট দিস ফিশ?’ আমি স্ট্রেটকাট জবাব দিই, ‘আই অ্যাম হাংরি, বিলিভ মি, রিয়েলি হাংরি।’ আমার জবাব শুনে তিনি রেগে গিয়ে মাছটি পানিতে ছাড়তে ছাড়তে বলেন, ‘লুক ম্যান, ইউ আর হাংরি, দ্যাট ইজ ইওর প্রবলেম, তোমার সমস্যা মেটানোর জন্য আমি অত্যন্ত রূপবান সানফিশকে নির্মমভাবে হত্যা করব কেন?’

মাছটি জলে ছেড়ে দেওয়ায় আমার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। রেগে গিয়ে বলি, ‘ক্ষুধার্ত হলে মাছ খেতে চাওয়া অপরাধ নাকি?’ তিনি মাথা ডানে-বাঁয়ে দুলিয়ে বলেন, ‘অব কোর্স নট। তোমার ক্ষুধা লেগেছে, মাছ খেতে চাও, ফাইন, হোয়াই নট ক্যাচ আ ফিশ অব ইওর ওউন।’ রেসপন্সে আমি বলি, ‘লিসেন ম্যান, আই অ্যাম আ হাইকার, খাবারের সাপ্লাই শেষ হয়ে গেছে, সঙ্গে বড়শি বা জাল কিছু নেই, মাছ ধরব কিভাবে?’ তিনি এবার বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলেন, ‘ওয়েল, হাইকার হও আর যা-ই হও, আই মাস্ট সে...পথে বেরোনোর সময় ফুড প্ল্যান তুমি চিন্তাভাবনা করে করোনি।’ আমি স্বীকার করি, ‘এটা আমার প্রবলেম। তবে আপনি মাছটা খামাখা জলে ছেড়ে না দিয়ে কোনো কিছুর বিনিময়ে আমাকে দিয়ে দিলেই পারতেন।’ আমার এই মন্তব্যে বিরক্ত হয়ে তিনি বলেন, ‘লুক, আই অ্যাম আ ফিশারম্যান, আমি শুধু রেইনবো ট্রাউট ক্যাচ করে ফিশিং কটেজে স্মোক করি। সানফিশের আমার কোনো প্রয়োজন নেই।’ এবার আমি জানতে চাই, ‘আপনার কটেজে স্মোক করা রেইনবো ট্রাউট আছে কি? কোনো কিছুর বিনিময়ে বার্টার করবেন একটা?’ ফিশারম্যান আমার দিকে চিন্তিতভাবে তাকালে আমি অনুনয় করে ফের বলি, ‘আমার ব্যাকপ্যাকে বার্টার করার অনেক জিনিস আছে, বিনিময় করবেন একটা রেইনবো ট্রাউট?’ ফিশারম্যান আমার অনুরোধকে এবার আমলে এনে বলেন, ‘বিনিময় করার আগে তোমার জিনিসপত্র মনোযোগ দিয়ে দেখতে হবে, এতে একটু সময় লাগবে। আই অ্যাম থার্সটি, ওষুধও খেতে হবে, এক কাজ করো, ব্যাকপ্যাক নিয়ে উঠে পড়ো আমার ক্যানু নৌকায়, কটেজে গিয়ে আমি প্রথমে কোল্ড কিছু খাব, তারপর ধীরেসুস্থে বার্টারের বিষয়-আশয় নিয়ে কথা বলা যাবে। ওকে?’

বইঠার ছলাতছলাত তোড়ে আস্তে-ধীরে ভাসে তাঁর ক্যানু নৌকাটি। শ্যানানডোয়ার বহতা জলের সারফেস এখানে শান্ত। দুই পাশে বৃক্ষরাজির ছায়া পড়ে নদীটিকে অরণ্যের রেখাচিত্রে ভরপুর নিরিবিলি এক প্রদর্শনীর মতো দেখায়। স্রোতের বেগ একটু বাড়তেই ফিশারম্যান হাল ধরে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠেন—‘অহ শ্যানানডোয়া, আই লং টু সি ইউ...।’ কাঠে তৈরি একটি ডকে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না। নদীর তীরে ফিশারম্যানের কাঠের কটেজটি আকারে বেশ বড়সড়। ডেকে এসে উঠতেই নাকে লাগে স্মোক করা ট্রাউট মাছের গন্ধ। ফিশারম্যান ভেতরে গিয়ে ঠাণ্ডা একটি ড্রিংকস নিয়ে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করেন। আমি ফেনা উপচানো সোডাজলের দিকে তাকিয়ে বলি, ‘আপনার কটেজটি তোফা হে, ডেকে বসে নিশ্চয়ই শ্যানানডোয়ার স্রোতোজলের ভেসে যাওয়া রূপ আপনি এনজয় করেন?’ আমার মন্তব্যের কোনো জবাব সঙ্গে সঙ্গে না দিয়ে তিনি ভেতরে গিয়ে নিয়ে আসেন ব্লাড প্রেসার মাপার মেশিন। রঙিন ছাতার নিচে চেয়ারে বসে রক্তচাপ মেপে একটি রাংতার স্ট্রিপ ছিঁড়ে সোডাজল দিয়ে তিনি ট্যাবলেটটি খান। তারপর আস্তে-ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘রিভার-ভিউ আমি অব কোর্স এনজয় করি, আর এ ধরনের একটি কটেজের মালিক হতে পারলে এক্সিলেন্ট হতো। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, আমি রেইনবো ট্রাউট ধরে যাদের সাপ্লাই দিই, তারা আমাকে এই কটেজটি শুধু মাছ ধরার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে। এখানে আরো সপ্তাহখানেক থাকার মেয়াদ আমার আছে। চুক্তি হচ্ছে, মোট দুই শ রেইনবো ট্রাউট ক্যাচ করে তাদের সরবরাহ করব। এগুলো ডেলিকেসি হিসেবে চড়া দামে বিক্রি হবে। এর মধ্যে আমি ক্যাচ করছি মাত্র পঁচাশিটি ট্রাউট। এগুলো স্মোকও করেছি।’ শুনে আমি পজিটিভলি বলি, ‘খুব সুপার্ভ মানের স্মোক হয়েছে হে, আমি সুগন্ধ থেকেই তা বলতে পারি। এ থেকে আমার সঙ্গে শুধু একটি মাছ কোনো কিছুর বিনিময়ে বার্টার করা যায় না?’ তিনি জোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেন, ‘ও হেল নো, তুমি বুঝতে পারছ না আমার হাতে সময় আছে মাত্র এক সপ্তাহ, আর আমাকে ক্যাচ করতে হবে টোটাল এক শ পনেরোটি মাছ। এতগুলো রেইনবো ট্রাউট মাত্র পাঁচ-ছয় দিনে ক্যাচ করা সহজ হবে না।’

ফিশারম্যান এবার রঙিন ছাতার নিচে প্লাস্টিকের চেয়ারে আরাম করে বসে পাইপ ধরালে আমি অধৈর্য হয়ে বলি, ‘অল রাইট, রেইনবো ট্রাউট আপনি বার্টার করবেন না, ঠিক আছে। আপনার কটেজে নিশ্চয়ই খাবারের সাপ্লাই আছে, তা থেকে না হয় কিছু বিনিময় করেন?’ তিনি বিরক্ত হয়ে মন্তব্য করেন, ‘ইউ আর বিকামিং আ লিটল অ্যাগ্রেসিভ, আই ডোন্ট লাইক দিস। কটেজে খাবারের খুব সীমিত সাপ্লাই নিয়ে আমি দিন কাটাচ্ছি, এখান থেকে দোকানপাটের দূরত্ব কমসে কম বত্রিশ-তেত্রিশ মাইল, খাবার বার্টার করার মতো রিস্ক আমি নেব কেন?’ আমার ভেতর ক্রোধ ও হতাশা একসঙ্গে গুমরে ওঠে, ‘ওয়েল, খাবার যদি বার্টার না-ই করবেন তাহলে আমাকে নৌকায় তুলে এখানে এনেছেন কেন?’ আমি অধৈর্য হয়ে এবার প্রশ্ন করলে ফিশারম্যান নিভে যাওয়া পাইপটি টেবিলে রেখে বলেন, ‘ওকে, লেটস কাম টু দ্য পয়েন্ট, শো মি ইওর থিংস, তোমার জিনিসপত্র প্রথমে দেখি, তারপর চিন্তা করব কিভাবে তোমাকে সাহায্য করা যায়।’ আমি বিরক্তি চেপে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করে টেবিলের ওপর আমার পণ্যগুলো রাখি। ফিশারম্যান সুগন্ধি মোমবাতি, ক্রিস্টাল বল ইত্যাদি আগ্রহের সঙ্গে নেড়েচেড়ে দেখে—এগুলো তাঁর কোনো কাজে লাগবে না বলে নাকচ করে দেন। অনুনয়ের স্বরে, ‘প্লিজ বি কাইন্ড, ফাইন্ড সামথিং ইউ লাইক,’ বলে আমি অ্যাপিল করলে ‘হ্যাং অন, হ্যাং অন ফর আ সেকেন্ড, লেট মি টেক আ লুক অ্যাট ইওর ব্যাকপ্যাক,’ বলে তিনি নিজ হাতে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। অবশেষে তাঁর পছন্দ হয়, মশামাছি ও পোকামাকড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি বাগস্প্রে আর আমার ব্যবহার করা টুথপেস্টের টিউব।

বাগস্প্রে ও টুথপেস্টের বিনিময় হিসেবে ফিশারম্যান আমাকে একটি ইনারটিউব ও বড়শি ঘণ্টা তিনেকের জন্য ব্যবহার করতে দেন। তাঁর আইডিয়া হচ্ছে, গাড়ির চাকার ভেতরকার ইনারটিউবের ভেতর শরীর ব্যান্ড করে বসে ভেসে যেতে যেতে বড়শিতে মাছ ধরার চেষ্টা করা। আমি ইতস্তত করছি দেখে তিনি প্লাস্টিকের কাভারের ভেতর পোরা ফিশিং লাইসেন্স দিয়ে বলেন, ‘এটা তুমি পকেটে রাখতে পারো, ভিজে গেলেও অসুবিধা কিছু হবে না। ফ্লোট ইন দ্য ওয়াটার পিসফুলি। অপরাহ্নের রোদে পানি ওয়ার্ম উঠছে, মাছগুলো এবার সারফেসে উঠে আসবে। চেষ্টা করবে ডিপপুলে বড়শি ফেলতে। যেখানে স্রোত কম, পানির রং কালচে সবুজ আর সফেন বুদবুদকে দেখাচ্ছে শান্ত—এ ধরনের ডিপপুলে একটু ট্রাই করলেই পেয়ে যাবে স্মল মাউথ বাস বা ফল ফিশ। চাই কি আজ তোমার কপালে জুটে যেতে পারে গোটা দুই ক্যাটফিশ। গো অ্যাহেড, ম্যান। হোপ ইউ উইল ফাইন্ড আ ফিশ টু ইট।’

চরে এসে আমি বালুতে ইনারটিউব রেখে বসে থাকি কিছুক্ষণ। জিহ্বায় এসিডের অম্লতা টের পাই। তবে সকালে পাঁজরের কাছে ক্ষুধার যে চিনচিনে ব্যথা ছিল তা লোপ পেয়েছে সম্পূর্ণভাবে। খুব লাইট হেডেড লাগে। মনে হয়, রোদে আগুনের ফুলকি উড়ছে। ইচ্ছা হয় বালুতে সটান শুয়ে পড়ি। কিন্তু ঝিমানি এলে পরে হয়তো ইনারটিউব ভাসানোর মতো উদ্যম থাকবে না। ভীষণ উদ্বেগ হয়, যদি বড়শিতে মাছ না লাগে। ক্ষুধাজনিত ব্যথা যে খানিক পর ফিরে আসবে—এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। হেভি ব্যাকপ্যাক ক্যারি করার ফলে হাঁটতে হাঁটতে প্রচুর এনার্জি বার্ন করছি। সুতরাং আমার চাই প্রোটিন রিচ খাবার। মাছ ধরতে ব্যর্থ হলে আমার কাছে প্রোটিন সংগ্রহের বিকল্পই বা কী থাকবে? ফিশারম্যানের কাছ থেকে কোনো খাবার পাওয়া যাবে না। মাছ না পেলে নদীর কূলে কূলে হেঁটে তবে কি অন্য কোনো হাইকার বা নাও-বাইয়ে লোককে ধরার চেষ্টা করব? এখান থেকে জনপদে বেরিয়ে যাওয়াও তো সেই বত্রিশ-তেত্রিশ মাইলের ধাক্কা। কত দিন হলো হাইকিং করছি? আঙুলের আঁকে হিসাব মেলাতে চেষ্টা করি। শ্যানানডোয়ার ন্যাশনাল পার্কে কত তারিখে ঢুকেছি। ব্যাকপ্যাকে খোঁজাখুঁজি করেও ডেটে দাগ দেওয়া ডায়েরির তালাশ পাই না। এই বনানী থেকে যদি কোনোক্রমে বেরোতে পারি, তাহলে যে গ্যারাজে গাড়িটা সারাই করাতে দিয়েছিলাম, তা ফেরত পাব কি? এত দিন আমি জঙ্গলে হাইক করব তা তো তাদের বলিনি। গাড়ি ডেলিভারি নিতে আসছি না দেখে তারা না আবার গাড়িটা জানক হিসেবে ফেলে ঠেলে দেয়।

দুর্ভাবনায় রীতিমতো ডিসফাংশনাল হয়ে যেতে থাকলে হঠাৎ মনে হয়, নিকট ভবিষ্যতে বা আগামী দিনে যদি এটা-সেটা জোগাড় না হয় তাহলে কী হবে? এ ধরনের ভাবনা থেকে মূলত দুশ্চিন্তা হচ্ছে। সুতরাং চেষ্টা করি বর্তমানের প্রতিবেশ বা এই মুহূর্তকে নিয়ে সচেতনভাবে মশগুল হতে। আবহাওয়া বেশ ওয়ার্ম। বালুচর নির্জন, তাই মুহূর্তের স্বাধীনতাকে উপভোগ করার জন্য আমি কাপড়চোপড় খুলে বালুতে গড়াগড়ি দিই। ফিজিক্যালি আরো ফ্রি হওয়ার প্রবণতাকে বিস্তৃত করার জন্য ছেলেমানুষিভাবে পাথর কুড়িয়ে নিয়ে নদীজলে ছুড়ে মারি। কুপপুতকুপপুত শব্দের সঙ্গে লাফিয়ে ওঠে বেশ কয়েকটি রুপালি মাছ। আমি ব্যাকপ্যাক ও জামাকাপড় পাথরের আড়ালে রেখে বক্সার শর্টস পরে ইনারটিউব নিয়ে জলে নামি।

টিউবে আধশোয়া হয়ে মৃদু স্রোতে ভেসে যেতে রিলাক্স লাগে। জলতলের পাথরে তেড়ছা হয়ে পড়া সূর্যালোকে আঁকা হচ্ছে সোনালি সব জ্যামিতিক নকশা। গুচ্ছ গুচ্ছ ছোট মাছ ঘাই মেরে চলে যায় পাথরের আড়ালে। আমি বড়শি ফেলে কিছুক্ষণ বসে থাকি। চৌখুপ্পি নকশা করা পিঠের একটি কচ্ছপ নদীপারের ঘাস থেকে আগ্রহ নিয়ে ঘাড় বাঁকায়। নদীকূলের দীর্ঘ ঘাসে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে সাদা সারস। জলে পা ডুবিয়ে একটি ব্লু হিরন পাখি সচকিত হয়ে আমার দিকে তাকায়। আধডোবা রকে বসে রোদ পোহাচ্ছে মাসকারাত বলে ইঁদুরের মতো দেখতে ছোট্ট কয়েকটি জলপ্রিয় প্রাণী। বার কয়েক রুপালি মাছেরও ঝিলিকপাড়া দেখি, কিন্তু বড়শির টোপে কেউ ঠোকর দিতে আসে না। জল ক্রমেই অগভীর হচ্ছে। ভেসে যেতে যেতে মাঝে মাঝে পাথরের সঙ্গে বাড়ি খাচ্ছে ইনারটিউব। তাতে লাফিয়ে উঠছে সাদা পাথরে রোদ পোহানো লালচে সব ফড়িং।

এক জায়গায় নদীজল এত কম যে দেখি, এক হাইকার ট্রেকিং স্টিকে ভর দিয়ে পানিতে পা ডুবিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে পাড়ি দিচ্ছে শ্যানানডোয়া। আমি তাঁকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে হাঁক পাড়ি, ‘হেই ম্যান, হাউ ইজ লাইফ?’ মানুষটি ঘাড় বাঁকিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচু করে—সময় যে তার খারাপ যাচ্ছে এ রকমের ইঙ্গিত করে। হঠাৎ চোরা স্রোতে আমার ইনারটিউব ভেসে যায় দ্রুত। পার থেকে একটি গাছের পত্রবহুল ডাল নেমে এসেছে লম্বালম্বিভাবে পানির ওপর। সামনে দিয়ে সাঁতার কেটে তাতে লাফ দিয়ে চড়ে বসে ওটার নামে উদবিড়ালজাতীয় একটি প্রাণী। আরো খানিক সামনে গিয়ে দেখি, জলতলের স্বচ্ছ বালুকায় গুটি গুটি পায়ে হাঁটছে কিছু চিংড়ি মাছ। ঠিক তখনই ইনারটিউব গোটা তিনেক আধডোবা পাথরে ঠেকে থেমে যায়। হাত দিয়ে ঠেলাঠেলি করেও আমি টিউবকে ফ্রি করতে পারি না। তাই ডোবা পাথরে পা দিয়ে জলে নামি। ইনারটিউব গভীর জলের দিকে টেনে আনতে গেলে ক্যামেরা, সুইচ আর্মি নাইফ ইত্যাদি রাখা পলিথিনের ব্যাগটি ছিটকে পড়ে পানিতে। ব্যাগ উদ্ধার করতে গিয়ে শ্যাওলায় পা পিছলাই। খানিক কেটে-ছিঁড়ে গেলেও অবশেষে কোনো রকমে উঠে দাঁড়াই। ততক্ষণে ইনারটিউব ফ্রি হয়ে ভেসে যাচ্ছে নাগালের বাইরে। পাথরের ওপর দিয়ে ছুটে যেতে যেতে শামুকের খোলে আবার পা কাটে। কিন্তু আমি বেপরোয়া হয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এক হাতে পলিথিনের ব্যাগ উঁচুতে তুলে ধরে কোনো রকমে অন্য হাতে ইনারটিউবটি পাকড়াই।

আবার ভাসতে গিয়ে মনে জাফলংয়ের পাহাড়ি নদীতে চোরা স্রোতে ভেসে যাওয়ায় ফ্লাশব্যাক হয়। এখানে পানিতে ভেসে যাচ্ছে সাদা ও ময়ূরকণ্ঠী থোকা থোকা হাঁসের পালক। হয়তো উজানে শিয়াল বা কায়োটি শিকার করছে। আরেকটু ভেসে যাই, দেখি—ঝোপ থেকে সবুজ পাতা চিবাতে চিবাতে বেরিয়ে আসছে একটি কালো ভালুক। প্রাণীটি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে চলমান জলস্রোতের দিকে তাকায়। আরেকটি ডিপপুলে আসতেই আমার কপাল ফেরে। ফাতনায় টান পড়ছে, বড়শি ওঠাতেই হাতে চলে আসে আস্ত একটি ট্রাউট মাছ। ছলবলানো মাছটির মুখ থেকে বড়শি খুলতে খুলতে ভাবি, পার থেকে শুকনা কাঠ টুকিয়ে এখনই একে পুড়িয়ে গ্রিল করতে হয়। শরীর বাঁকিয়ে রুপালি ট্রাউটটি ঝাপট দিয়ে ওঠে। আমি দুহাতে মাছটি শক্ত করে বুকে চেপে ধরতে চেষ্টা করি। কিন্তু শ্যাওলামাখা পিছল ট্রাউট ছিটকে পড়ে নদীজলে।

মনঃক্ষুণ্ন হয়ে কিছুদূর অযথা ভেসে যাই। নদী এখানে দুভাগ হয়ে মাঝের চরায় গাছপালা ঝোপঝাড়ে তৈরি করেছে ত্রিভুজাকৃতির দ্বীপ। আমি ইনারটিউব পারে ভিড়িয়ে জলতল স্ক্যান করি। স্রোতে মৃদু মৃদু দুলছে স্টারগ্রাস বলে চারদিকে বিচ্ছুরিত শেপের জলজ গুল্ম। বার্ডকলে সব নির্জনতা চিরে চিরে উড়ছে কালো পালকে তীব্র লাল টিকা দেওয়া রেড উইং ব্ল্যাক বার্ড।

স্টারগ্রাসের গুচ্ছে গুচ্ছে ঘুরে বেড়াচ্ছে শুঁড় নাড়ানো কয়েকটি ক্যাটফিশ। আমি বেইট বদলিয়ে বড়শিতে রবার ওয়ার্মের টোপ পরাই। জলে তা ফেলে একটি পাথরে বসতেই ঝিমানি এসে যায়। ফাতনায় টান পড়তে হাত থেকে ছিটকে যায় বড়শি। লাফ দিয়ে উঠে হ্যাঁচকা টানে তা পানি থেকে তুলি। ডাঙায় তোলা মাছটি ঠিক শনাক্ত করতে পারি না। তবে দুপায়ে চেপে ধরে সুইস আর্মি নাইফ দিয়ে তার রুপালি দেহ বিদ্ধ করি। মুখ থেকে বড়শি খোলামাত্র মাছটি আবার শরীর বাঁকালে কোনো রিস্ক না নিয়ে ডাঙার ভেতর দিকের একটি পাথরে বারবার আছাড় মেরে নিশ্চিত করি তার মৃত্যু। এখানে ডালপালা ও শুকনা পাতা পাওয়া যায় প্রচুর। আগুন জ্বালাতে গিয়ে দেখি, পলিথিনের ব্যাগে কিছু পানি ঢুকে ভিজে গেছে ম্যাচের অবশিষ্ট কাঠিগুলো।

চরে যেখানে ব্যাকপ্যাক রেখে গেছি, ইনারটিউব ভাসিয়ে সেই উজানে ফিরে আসা অসম্ভব। সুতরাং পারের ঝোপঝাড়, বুনোলতা ও পাথর ডিঙিয়ে কোনো রকমে ফিরে আসি। বুটজুতা ভেজাতে চাইনি বলে তা ব্যাকপ্যাকের সঙ্গে চরে রেখে গিয়েছিলাম...অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ আ টোটালি রং ডিসিশন। বুনো কাঁটাঝোপ, শার্প পাথর ও শামুকের খোলে লেগে পা রীতিমতো রক্তাক্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে পা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার সময় নেই। রোদ এখনো বেশ চড়া। তাই একটি পাথরের ওপর ম্যাচের কাঠিগুলো মেলে দিয়ে শুকনা কাঠ, ঝরা পাতা ও ঝোপ থেকে দুটি পাখির বাসা জোগাড় করি।

মিনিট বিশেক অপেক্ষার পর ক্ষুধা তীব্রভাবে জানান দেয়। চেক করে দেখি ম্যাচকাঠি এখনো স্যাঁতসেঁতে। ঠিক তখনই মাথায় সঠিক বুদ্ধি খেলে যায়। ব্যাকপ্যাক থেকে ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করে শুকনা ডালপাতার ওপর রাখা পাখির বাসার দিকে সূর্যালোক তাক করি। একটু সময় লাগে বটে, বারবার ফুঁ দিতে হয় অবশ্য, তবে আগুন জ্বলে। সঙ্গে লবণ নেই, তার পরও পোড়া মাছটি খেতে ভালো লাগে। সম্পূর্ণ মাছ একবারে না খেয়ে মাথাসহ অর্ধেক পাথরের ওপর রাখি—আগামীকাল কাজে লাগবে ভেবে। এবার পায়ের রক্তাক্ত ক্ষতগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা দরকার। জলে ফিরে গিয়ে বালু-মাটি ধুয়ে পরিষ্কার করছি, তখনই পানিতে নিচু হয়ে উড়ে আসা বড়সড় পাখির ছায়া পড়ে। না, সাবধান হওয়ার কোনো সময় পাই না। আমার আর্তচিৎকারের কোনো তোয়াক্কা না করেই ফিশ-ইগলটি ঝাপটা মেরে পাথরের ওপর থেকে তুলে নেয় আধখানা মাছ।

ইনারটিউব ও মাছ ধরার লাইসেন্স ফেরত দিতে এসে দেখি, ডেকের ছাতার নিচে নিস্তেজ হয়ে বসে আছেন ফিশারম্যান। প্রশ্ন করি, ‘বিকেলে রেইনবো ট্রাউট ধরতে যাননি মনে হচ্ছে?’ তিনি ‘নট ফিলিং গুড’ বলে টেবিলের ওপর রাখা ব্লাড প্রেসার মেশিনের পাশে নেবুলাইজারের শট নেওয়ার ইকুইপমেন্ট দেখান। ফিশারম্যানের মৃদু শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। আমি ধন্যবাদ দিতে যাই, তখন তিনি জানতে চান—মোট কয়টি মাছ আমি ধরতে পেরেছি। মাত্র একটি মাছ বড়শিতে লেগেছে শুনে জোরে জোরে দম ফেলতে ফেলতে তিনি ফের বলেন, ‘ইউ আর আ ট্রুলি স্টুপিড হাইকার। তিন ঘণ্টা ইনারটিউবে ভেসে ধরেছ মাত্র একটি মাছ। তোমার তো না খেয়ে থাকা উচিত।’ আমি এই মন্তব্যের কোনো জবাব না দিয়ে ফিশিং কটেজের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি।

শ্যানানডোয়ার কূলে কূলে ঘণ্টাখানেক হেঁটেও তাঁবু খাটানোর মতো কোনো সমতল জমি পাই না। তবে তীরে আরো দু-একটি জনহীন কাঠের কটেজ দেখতে পাই। এক জায়গায় পার ঘেঁষে মাচার মতো করে বানানো একটি কাঠের ডেক। তাতে পাতা দুটি প্লাস্টিকের চেয়ার। বেজায় ক্লান্ত লাগছে, তাই চেয়ারে বসে একটু জিরাই। ডেকের উল্টা দিকে ছড়ানো কোনো পরিবারের ক্যাম্পগ্রাউন্ড। কয়েক দিন আগেও হয়তো তারা এখানে তাঁবু খাটিয়ে থেকে গেছে রাত কয়েক। ফায়ারপিটে পড়ে আছে পোড়া কাঠ ও নেভা ছাই। বিটারসুইট বেরির লতানো ঝোপের তলায় কিছু চকচক করলে উঠে দেখি, একটি বার্বিডল নীল চোখে তাকিয়ে আছে কমলা রঙের গুচ্ছ গুচ্ছ গোটার দিকে। চেয়ারে বসে রেলিংয়ে পা তুলে রিলাক্স হওয়ার চেষ্টা করি। সূর্যের অস্তরাগে নদীজল হয়ে উঠছে গোধূলি রঙিন। স্রোতে একটি মাছ ঝিকিয়ে ওঠে। তখনই আজ আমার বড়শিতে লাগা অচেনা মাছটির কথা মনে পড়ে। সুইস আর্মি নাইফ বেঁধাতে গেলে মনে হয়েছিল, মাছটি বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাকে আছড়ে আছড়ে মেরে ফেলার পর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া জলে ঘাই দিয়ে ভেসে উঠেছিল আরেকটি একই ধরনের মাছ।

আমি শুকনা ডালপালা জড়ো করার পরও ওই মাছকে পারের খুব কাছাকাছি এসে আধভাসা হয়ে লেজ ঝাপটাতে দেখেছি। একটি ভাবনা মাথায় আসে, তবে কি এই বিশেষ প্রজাতির মাছ জোড় বাঁধে? এবং যুগলের একটি বিপন্ন হলে অন্যটি অস্থির হয়ে পড়ে অন্তর্গত সংবেদনে? শুনেছি, ফেঞ্চ অ্যাঞ্জেল বা ক্লাউন প্রজাতির মাছ জোড় বাঁধে, কিন্তু ওগুলো তো সামুদ্রিক? যে মাছটির অর্ধেকটা আমি খেয়েছি, তার একটা ছবি তুলে রাখলে পরবর্তী সময়ে বইপত্র ঘেঁটে দেখা যেত জোড় বাঁধার বিষয়টি সঠিক কি না। মাছের বোবা দৃষ্টি আবার মনে পড়লে উঠে গিয়ে জার্নাল বের করে অসন্ন সন্ধ্যার ম্লান আলোয় বিষয়টি নোট করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা