kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

র হ স্য উ প ন্যা স

জানালা

শেখ আবদুল হাকিম

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১২৬ মিনিটে



জানালা

অঙ্কন : মানব

আমি ওদের নাম জানি না। আমি কখনো ওদের গলা শুনিনি। ঠিকঠাক যদি বলতে হয়, আমি ওদেরকে ওদের চেহারায়ও চিনি না, কারণ ওদের মুখ দূর থেকে এত ছোট লাগে যে নাক-চোখ বা আর কিছুর বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার বোঝা যায় না। অথচ তার পরও চেষ্টা করলে ওদের আসা-যাওয়ার একটা সময়সূচি, দৈনন্দিন অভ্যাস, কে কখন ঘুম থেকে ওঠে, কার আগে কে শুতে যায়, সপ্তাহে কদিন প্রেম করে, নাকি একেবারেই করে না—সবই আমি লিখে রাখতে পারতাম। ওদের আমি আমার ছোট্ট এবং পুরনো একটা দোতলা বাড়ির পেছনের জানালা দিয়ে দেখতে পাই। একেবারে গাঘেঁষা নয় বটে, তবে ওরা আমার প্রতিবেশী। ওদের আমি শুধু আমার পেছনের জানালা দিয়েই দেখতে পাই। আমাকেও কি ওরা...? না, ওরা আমাকে দেখতে পায় না। এমনকি ওরা যদি কখনো আমার জানালার দিকে সরাসরি তাকায়ও, তা-ও আমাকে দেখত পাবে না; কিন্তু আমি পাব। তার কারণ, আমার এটা ঠিক জানালা নয়, আকারে এটা এত ছোট যে জানালা না বলে ঘুলঘুলি বললেও চলে, তার ওপর আবার জাফরি বসানো।

তবে তার মানে এই নয় যে দিনের বেলা আমি অন্ধকারে বসে থাকি। ঘরে যথেষ্ট আলো আসে ঝুলবারান্দা থেকে। বড় বারান্দা ওটা, দরজা প্রায় সময় খোলাই থাকে। তবে না, ওই বারান্দা থেকে বা বারান্দা দিয়ে ওদের আমি দেখি না, দেখি এই একটা জানালা দিয়েই। কি? হ্যাঁ, মানি এটাকে অন্য কারো ব্যক্তিগত জীবনে খানিকটা উঁকি মারা বলা যায় বৈকি, এমনকি অনেকে হয়তো ওদের প্রতি আমার এই মনোযোগকে পিপিং টমের লেগে থাকা বলে ব্যঙ্গও করতে পারে। কিন্তু সত্যি বলছি, সে জন্য আমি দায়ী নই, এবং কারো ব্যক্তিগত কিছু দেখার আইডিয়াও আমার মাথায় ছিল না। আইডিয়াটা হলো, নির্দিষ্ট ওই কিছুটা সময় আমার নড়াচড়া আক্ষরিক অর্থেই খুব সীমিত ছিল। আমি ওই জানালা থেকে বিছানায় আসতে পারতাম, যেতে পারতাম বিছানা থেকে জানালার সামনে—ব্যস, এটুকুই। অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের দিকে আমার এই বেডরুম, আর ওই জানালা হলো বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে আমার একমাত্র যোগাযোগ। ঝুলবারান্দা যেটা আছে, সেটা আমার কাজের লোক নসিব প্রায় সময় খুলেও রাখে, তবে আমার বিছানা থেকে কোনাকুনি হওয়ায় ওই পথে বাইরের জগৎ আমি দেখতে পাই না। রাতে আমি আলো নিভিয়ে বসে থাকি, তা না হলে আশপাশের খালি প্লটে যত পোকামাকড় আছে, সব ঘরের ভেতর ঢুকে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। রাতে আমি ঘুমাতে পারি না। হ্যাঁ, এটাকে আমার একটা রোগও বলা যায়। এর কারণ, কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রচুর ব্যায়াম করতাম আমি; কিন্তু এখন করতে পারি না। কাজেই আমাকে ঘুমাতে না দিয়ে আমার ওপর ঝাল মেটাচ্ছে শরীর। একঘেয়েমি দূর করার জন্য অনেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে, একসময় আমারও সেটা ছিল, প্রচুর বই কিনতাম আর পড়তাম; কিন্তু এখন সেই অভ্যাসটা নেই। এখন আমি বই কিনি না। কিনি না পড়ার নেশা কেটে গেছে বলে। কাজেই বইয়ের আশ্রয় থেকেও আমি বঞ্চিত। তাহলে বলুন, কী করব আমি? চোখ দুটি শক্তভাবে বন্ধ করে বসে থাকব ওখানে?

 ঘর বা বাড়ি একটা আশ্রয়, আবার বাসিন্দাদের প্রাইভেসি রক্ষার একটা মাধ্যমও। একজন যদি তাদের বাড়ির জানালা খোলা রাখে, আরেকজন যদি নিজেদের বাড়ির জানালা থেকে তাদের জানালায় তাকায়, সেটা কি কারো প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা হবে? এর উত্তর এ রকম হতে পারে : জানালা খোলা রাখা মানে তুমি প্রকাশ্যে রয়েছ, তুমি প্রাইভেসি রক্ষা করতে চাইছ না, কাজেই কেউ তোমাদের দিকে তাকালে কারো কিছু বলার নেই। তোমার কাজকর্ম যদি প্রাইভেট হয়, জানালাটা বন্ধ করে রাখো।

একটু শুনুন আমি কাদের দেখি, আর ওদের দেখে আমার কী অনুভূতি হয়। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ধরি ওদের, সরাসরি তিনতলার একটা দালানের দিকে তাকাই। আমার জানালা বা ঘুলঘুলি চৌকো। ওখানে একটা নার্ভাস টাইপের দম্পতি থাকে, একেবারে কম বয়সের, মাত্র বিয়ে করেছে। আমার ধারণা, যদি এক রাত বাড়িতে থাকতে হয় ওদের, স্রেফ মারা যাবে ওরা। যাওয়ার জন্য এত ব্যগ্র আর ব্যস্ত হয়ে থাকে, যেখানেই ওরা যাক, আলো নেভানোর কথা কক্ষনো কারো মনে থাকে না। আমি যত দিন ধরে নজর রাখছি, তার মধ্যে এক দিনও এই ভুল করতে ভুল হয়নি ওদের। তবে পুরোপুরি যে ভুলে যায়, তা-ও নয়। ওদের এই আচরণকে আমি বিলম্বিত অ্যাকশন বলে চিনতে শিখেছি, আপনিও সেটা দেখতে পাবেন। এই ধরুন মিনিট পাঁচেকের মধ্যে পড়িমরি করে ফিরে আসবে ছেলেটা, সম্ভবত সেই মেইন রোড থেকে, ছোটাছুটি করে সব কটা সুইচ অফ করবে। তারপর অন্ধকারে বেরোনোর সময় কিছু একটার সঙ্গে পা বাধিয়ে আছাড় খাবে। ওরা দুজন আমাকে বেশ হাসির খোরাক জোগায়, বুঝলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখি, ওরা ফেরে একেবারে সেই ভোরবেলা, তখনো ভালো করে আলো ফোটে না। ফিরেই যেখানে যত আলো আছে, সব জ্বেলে দেবে ওরা, হাত-মুখ ধোবে, খুলে দেবে যদি কোনো জানালা বন্ধ থাকে। দিনটা যদি শুক্রবার হয়, ওদিকে আমি ভুলেও তাকাই না। কেন, আপনি বুঝে নিন। তাকালে জাফরির ফাঁক দিয়ে আমি ওদের বিছানাটা দেখতে পাই।

পরের দালান। অবস্থানের কারণে ওই বাড়ির জানালাগুলো একটু সরু লাগে আমার চোখে। ওখানে একটা নির্দিষ্ট আলো আছে, যেটা সব সময় প্রতি রাতে নিভে যায়। এটার ভেতর একটা ব্যাপার আছে, যা আমাকে একটু বিষণ্ন করে তোলে। ওখানে এক মহিলা থাকে, নিজের এক শিশুসন্তান নিয়ে। স্বামী মারা গেছে নাকি ওদের একা ফেলে চলে গেছে, কে জানে। হয়তো খুব বেশি মারধর করত, তাই বাচ্চাটাকে নিয়ে চলে এসেছে মা। আমি কিছুই জানি না। এটা নন্দীপাড়া/দক্ষিণগাঁওয়ের পেছন দিক, কিছুটা নামা জায়গা, রাস্তা ভালো নয়, দোকানে দোকানে গোপনে গাঁজা বিক্রি হয়, অশিক্ষিত খেটে খাওয়া লোকজন আর খুদে দোকান মালিকরা জামাতের সমর্থনে প্রচারণা চালায়, গায়ক-গায়িকা আর অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিরুদ্ধে কোনো মৌলভি সাহেব দোজখের কী রকম ভয় দেখিয়েছেন, ভিড় করে সেসব ইউটিউবে দেখে, এ রকম একটা নোংরা পরিবেশের ভেতর কঙ্কালসদৃশ বহুতল ভবন তৈরি করে সস্তায় ভাড়া দেওয়া শুরু হয়েছে। এই মহিলা সে রকম দুই কামরার একটা ফ্ল্যাট নিয়ে ওখানে থাকে। আমি তাকে দেখতে পাই নিজের ছোট্ট মেয়েকে বিছানায় শোয়াচ্ছে, তারপর এক বিষণ্ন আর অতৃপ্ত ভঙ্গিতে ঝুঁকে চুমো খাচ্ছে। আলো থেকে ওকে আড়াল করার জন্য রশিতে কাপড় ঝোলায় মা, মেয়ের চোখ আর মুখ রং দিয়ে আঁকতে বসে। এরপর বাইরে বেরোয় সে, তার আগে নয়। তার ফিরতে ফিরতে রোজই রাত প্রায় শেষ হয়ে আসে। একদিন আমি তখনো জেগে ছিলাম, ওদিকে চোখ পড়তে দেখলাম, দুই হাত দিয়ে মাথা ঢেকে ওখানে অনড় বসে আছে। দৃশ্যটার মধ্যে এমন কিছু ছিল, আমার বুকটা ব্যথায় টনটন করে উঠেছিল।

তৃতীয় দালানটা এমন অ্যাঙ্গলে তৈরি, ওটার কোনো জানালা দিয়েই ভেতরের কিছু আমি দেখতে পাই না, ওগুলোকে আমার স্রেফ চেরা দাগের মতো লাগে। এবার ধরা যাক আমার জানালার সরাসরি সামনের দালানকে। বাকিগুলোর চেয়ে এটা একটু হয়তো বেশি দূরে, তবে মুখোমুখি হওয়ায় এই দালানের সব কটা জানালা পুরোপুরি দেখতে পাই, জানালার সামনে কেউ থাকলেও তাদের তাই দেখতে পাই। তবে উল্টোটা সত্যি নয়। অর্থাৎ ওই দালানের লোকজন এদিকে তাকালে আমার জাফরিকাটা জানালা দেখতে পেলেও আমাকে কিন্তু দেখতে পাবে না। এই সুবিধাটা একা শুধু আমি পাচ্ছি।

ওটা একটা সাদামাটা ভবন। খুব বেশি না হলেও পুরনো। বাইরেটা কখনোই প্লাস্টার করা হয়নি। ইদানীং মিস্ত্রিরা আবার কাজে হাত দিয়েছে। হয়তো টাকা-পয়সার প্রবাহ মন্থর কিংবা অনিয়মিত, তাই দেখা যায় কদিন কাজ হলো আবার কদিন হলো না। বেশ তাড়াহুড়া করে মাচা বাঁধা হলো, নিচে থেকে একতলা আর দোতলার বাইরেটা প্লাস্টারও করা হলো, তারপর ফের কাজ বন্ধ। এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। ভাড়াটেদের তুলে দেওয়া হয়নি, তাহলে যে মাসিক আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের অসুবিধার মধ্যে ফেলে নিচের ফ্লোর মেরামতের কাজ চলছে, ওপরে কয়েকটা নতুন ফ্লোরও তৈরি করা হচ্ছে। আমি খেয়াল করেছি, প্রতিবার একটা করে ফ্লোরের কাজ শেষ করছে তারা।

এই ভবনের পেছন দিকের মোট সাতটা ফ্ল্যাট আমি দেখতে পাই, তার মধ্যে সবচেয়ে ওপরের ফ্ল্যাট এরই মধ্যে তৈরি করা হয়ে গেছে। তৈরি শেষ হলেও এখনো ভাড়া দেওয়া হয়নি। মিস্ত্রিরা এখন ষষ্ঠতলায় কাজ করছে, ইট ভাঙার মেশিন, করাত আর হাতুড়ির আওয়াজে গোটা পাড়ার বাসিন্দাদের দিনের আরাম হারাম হয়ে যাচ্ছে, তবু মুখ বুজে সবাইকে সব সহ্য করতে হচ্ছে।

ওটার সরাসরি নিচের তলার ফ্ল্যাটে যারা থাকে, তাদের জন্য আমার খারাপ লাগে। ভেবে অবাক লাগে, ওদের মাথার ওপর সারাটা দিন যে বিকট শব্দের বিস্ফোরণ ঘটছে, সেটা তারা সহ্য করছে কিভাবে? তার ওপর ওই ফ্ল্যাটে যে বউটা থাকে, তার শরীর-স্বাস্থ্য খুব খারাপ; সম্ভবত কঠিন কোনো রোগে ভুগছে। এত দূর থেকেও সেটা আমি বুঝতে পারি তার নড়াচড়ার মধ্যে এক ধরনের জড়তা লক্ষ করে। তার কোনো সাজগোজ নেই; সম্ভবত গোসল করে না, কাপড়ও পাল্টায় না। গায়ে তাকে আমি সব সময় একটা চাদর জড়িয়ে রাখতে দেখি। তার কি জ্বর? কেমন জ্বর যে একবারও ছাড়ে না?

মেয়েটাকে মাঝেমধ্যে আমি জানালার সামনে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখি। জানালায় গরাদ নেই, ফ্রেমে আটকানো শুধু কাচ, কখনোসখনো ওই কাচ সরিয়ে বাইরেও তাকায় মেয়েটা; কিন্তু তাকালে কি হবে, তার সেই চোখে প্রাণ থাকে না, শুধু তাকিয়েই থাকে, কিছু দেখতে চায় বলে মনে হয় না। আচ্ছা, তার স্বামী কি তাকে ভালোবাসে না? যদি বাসে, তাহলে স্ত্রীকে ডাক্তার দেখায় না কেন? আমার মতো তৃতীয় পক্ষ এ রকম কিছু ভাবতেই পারে, যেহেতু ভাবাটা সহজ; কিন্তু ওদের যদি সামর্থ্য না থাকে?

লোকটার আচরণই বলে দেয়, তার কাজ নেই। আগে হয়তো ছিল, এখন বেকার। প্রায়ই দেখতে পাই, অনেক রাত পর্যন্ত তাদের বেডরুমে আলো জ্বলছে, যেন অসুস্থ বউটা খুব কষ্ট পাচ্ছে, বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছে, আর স্বামী তার হাত ধরে পাশে বসে আছে বা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এসব আমার নিছক কল্পনাই, জানালায় পর্দা থাকায় ভেতরের কিছু আমি দেখতে পাই না। এবং তারপর, একটা বিশেষ রাতে, নিশ্চয়ই বেচারাকে সারা রাত জেগে বসে থাকতে হলো, কারণ দিনের আলো না ফোটা পর্যন্ত ওটা নিভল না। ব্যাপারটা এমন নয় যে পুরোটা সময় আমিও জেগে ছিলাম, জেগে জেগে হিসাব রেখেছি, কখন ওদের আলো জ্বলল আর কখন নিভল। সে রাতে আমি রাত ঠিক তিনটার সময় জানালার সামনে থেকে সরে বিছানায় চলে গেছি। ভাবছি, চেষ্টা করে দেখি একটু যদি ঘুমাতে পারি, ওদের শোবার ঘরের আলো তখনো জ্বলছিল। কিন্তু ঘুম আমার আসেনি। অগত্যা ভোরের দিকে আবার জানালার সামনে এসেছি আমি। এসে দেখি, ওদের জানালার ভেতর তখনো ম্লান আলো জ্বলছে।

এর কয়েক মুহূর্ত পর, দিনের আলো যখন উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে, পর্দার ফাঁকগুলো নিষ্প্রভ হয়ে যেতে দেখলাম। এর খানিক পর, ওই কামরার জানালার পর্দা নয়, অন্য এক কামরার পর্দা সরে যেতে দেখলাম—সবগুলো জানালার পর্দাই টানা ছিল—ওখানে দাঁড়িয়ে বাইরে চোখ বোলাচ্ছে মেয়েটার স্বামী।

লোকটার হাতে সিগারেট আছে। সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি না, তবে নার্ভাস ভঙ্গির দ্রুত ছোট ছোট ঝাঁকি আমাকে আন্দাজ করতে দিল—সে তার হাতটা মুখে তুলছে, আর দেখতে পেলাম, যখনই তা তুলছে, তার কপাল আর মাথায় আলোর আভা ফুটছে। স্ত্রীকে নিয়ে উদ্বিগ্ন, মনে করলাম। লোকটার মনের অবস্থা কেমন বুঝতে পেরে খারাপ লাগল আমার। এই অস্থিরতার জন্য তাকে দোষ দেওয়া যায় না। স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে যেকোনো স্বামী এ রকম আচরণ করবে। বউটা সম্ভবত এইমাত্র ঘুমিয়ে পড়েছে, সারাটা রাত কষ্ট পাওয়ার পর। কিন্তু এখন থেকে    দু-তিন ঘণ্টা পর আবার চালু হবে ইট ভাঙার মেশিন, করাতের কর্কশ কাঠ কাটা আর হাতুড়ির পেরেক ঠোকা, সঙ্গে থাকবে মিস্ত্রি আর জোগালিদের চেঁচামেচি। না না, আমি জানি এটা আমার কোনো বিষয় নয়, নিজেকে আমি বললাম, তবে ওই লোকের কিন্তু সত্যি সত্যি ওখান থেকে বউকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত। আমাকে যদি অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে সমস্যায় পড়তে হতো...

আমার চিন্তায় বাধা পড়ল। লোকটা সামনের দিকে ঝুঁকে সামান্য বেরিয়ে এসেছে, হয়তো জানালার ফ্রেম থেকে ইঞ্চিখানেক বাইরে। তার চোখের দৃষ্টিতে একটা সতর্কতা লক্ষ করলাম, যেন খুব মনোযোগ দিয়ে তার সামনের সবগুলো বাড়ির পেছন দিক পরীক্ষা করছে। মাত্র রোদ উঠছে, এত সকালে এ রকম খুঁটিয়ে কী দেখার থাকতে পারে তার? আপনি কিন্তু বুঝতে পারবেন, এমনকি খানিক দূর থেকেও, কোনো লোক যদি নির্দিষ্ট কিছুর দিকে তাকায়। সে তার মাথাটা যেভাবে রেখেছে, মানে তার ওই বিশেষ ভঙ্গিটার মধ্যে কিছু একটা রয়েছে। তার পরও দেখতে পেলাম যে সে তার দৃষ্টি একটা নির্দিষ্ট পয়েন্টে স্থির রাখেনি; বরং ধীর ও সাবধানী ভঙ্গিতে এক দিক থেকে আরেক দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সরাসরি তার উল্টো দিকের বহুতল ভবনগুলোর ওপর, আমি যে দালানে থাকি, সেটা থেকে শুরু করে। তার দৃষ্টি যখন শেষ দালানে পৌঁছল, মনে মনে ধরে নিলাম, আবার সেটা ফিরে আসবে আমার দালানের ওপর। ঠিক তা-ই। যখন দেখলাম, আগের মতোই তার সতর্ক, অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরে আসছে, জানালার সামনে থেকে ঘরের ভেতর কয়েক গজ পিছিয়ে এলাম আমি, যাতে তার দৃষ্টি আমাকে দেখতে না পেয়ে ফিরে যায়। আমি চাই না লোকটা জানুক তার ওপর আমি নজর রাখছি বা তাদের নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি। আমার জানালায়ও রোদ ঠেকানোর জন্য মোটা নীল কাপড়ের পর্দা আছে, আমি সেই পর্দার ফাঁক দিয়ে এতক্ষণ দেখছিলাম তাকে। যা-ই হোক, আমি পিছিয়ে আসায় পর্দার ফাঁক দিয়ে সে আমাকে দেখতে পাবে না, জাফরির ভেতর দিয়ে সরাসরি তাকালেও।

কয়েক সেকেন্ড পর আমি যখন আবার আমার পুরনো জায়গায় ফিরে গেলাম, দেখলাম তার জানালায় নেই সে। তবে আরো দুটি জানালার পর্দা সরিয়েছে। বাকি আছে শুধু বেডরুমের জানালা থেকে পর্দা সরানো। আমি যেন আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভাবছি, অর্ধবৃত্তাকার একটা জায়গার ওপর দাঁড়ানো কয়েকটা বাড়ির পেছন দিকে কী এমন থাকতে পারে যে ওই লোক ওই রকম অদ্ভুত, সতর্ক এবং বেশ সময় নিয়ে কিছু খুঁজল। কিছু খুঁজছিলই তো, নাকি আমার ভুল হচ্ছে? আচ্ছা, তার দেখার কী থাকতে পারে? দালানগুলোর পেছন দিকে থাকার মধ্যে আছে শুধু জানালা। বাসিন্দাদের জানালায় কী খুঁজতে পারে পাড়ার একজন লোক? এত সকালে আমি বাদে মনে হয় আর কেউ তাদের জানালায় নেই। এত সকাল সকাল ঘুম থেকেই বা কজন ওঠে। যা-ই হোক,   ভাবলাম, ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়, অবশ্যই। এটাকে স্রেফ ছোট একটা উদ্ভট ব্যাপার বলা যায়, যেটা স্ত্রীকে নিয়ে তার উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তার সঙ্গে যায় না। আপনি যখন উদ্বেগে বা দুশ্চিন্তায় থাকবেন, আপনার ভেতরটা তখন অন্যমনস্ক থাকবে, আপনার দৃষ্টি থেকে প্রখর ভাব অদৃশ্য হয়ে যাবে, আপনি চোখ বোলাবেন; কিন্তু সেভাবে সব দেখতে পাবেন না, আপনাকে দেখে মনে হবে, আপনি শূন্যে তাকিয়ে আছেন। আপনি যখন একটা অর্ধবৃত্ত জায়গার সবগুলো জানালা এক এক করে খুঁটিয়ে দেখবেন, তখন ধরা পড়ে যাবে আপনার ভেতর নিবিষ্টতা বা অন্যমনস্কতা বলে কিছু নেই, আছে বাইরের দিকে আকর্ষণ। একটা আরেকটার সঙ্গে যায় না। এ ধরনের অমিলকে তুচ্ছজ্ঞান করা হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। শুধু আমার মতো একজন লোক ছাড়া, যে পুরোপুরি অলস হয়ে শুধু বসে আছে, যার অবস্থা নেই কাজ তো খই ভাজ—আর কারো চোখে ধরাই পড়বে না।

 ছোট্ট এই ঘটনার পর ফ্ল্যাটটা নিষ্প্রাণ হয়ে থাকল, ওটার প্রতিটি জানালা দেখে তেমনটাই বোঝা গেল আর কি। লোকটা হয় ফ্ল্যাট ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে, তা না হলে নিজেও শুয়ে পড়েছে। তিনটি জানালার পর্দা আংশিক সরানো, শুধু বেডরুম ঢেকে রাখা পর্দা পুরোটাই টানা থাকল। আমার কাজের লোক নসিব এলো খবরের কাগজ, এক জোড়া ডিম পোচ আর এক ফ্লাস্ক চা নিয়ে। যাক, আপাতত সময় পার করার একটা ব্যবস্থা হলো। সঙ্গে করে একটা দুঃসংবাদও নিয়ে এলো সে, আজ এই খানিক আগে খিলগাঁও লেভেলক্রসিংয়ের কাছে বাসচাপায় মারা পড়েছে তেরো বছরের এক স্কুলছাত্রী। ডিম-চা বিস্বাদ লাগল। সব প্রাণই অমূল্য, তবে যখন কোনো শিক্ষার্থী গাড়ির চাপায় মারা যায়, নিজেকে আমার তখন ব্যর্থ এবং অভাগা একজন বলে মনে হয়। যার যা খুশি বলে বলুক, তাদের কথা আংশিক সত্যও হতে পারে, তবে আমার মনে হয় দুটি মূল সমস্যায় আমরা ভুগছি : এক. গোটা জাতিকে শিক্ষিত করা সম্ভব হয়নি; দুই. দেশের মানুষ চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার। শুধু শিক্ষিত ড্রাইভারদের লাইসেন্স দিয়ে এবং দক্ষ ড্রাইভারদের মাসিক বেতন এখনই এক লাখ করে দিয়ে দেখা যেতে পারে সড়ক দুর্ঘটনা কতটুকু কমে। যা-ই হোক, লোকজনের জানালার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে খবরের কাগজের ওপর চোখ রাখলাম আমি।

সারাটা সকাল তেরছা ভঙ্গিতে আমাদের জানালায় রোদ থাকল, দুপুরের পর থেকে সেটা চলে গেল উল্টো দিকের দালানগুলোর গায়ে। একসময় দুই দিক থেকেই ধীরে ধীরে কমতে লাগল, তারপর দেখতে দেখতে আবার সন্ধ্যা নামল, আরেকটা দিন পার হলো।

এক এক করে আলোকিত হচ্ছে চারদিকের প্রতিটি চৌকো আকৃতি, তার কিছু আমি দেখতে পাচ্ছি, আবার কিছু আমার দৃষ্টিপথের আড়ালে থেকে যাচ্ছে। এদিক-সেদিক থেকে নিত্যদিনের চেনা সব শব্দ ভেসে আসছে, হঠাৎ কেউ জোরে রেডিও ছাড়ল, পাশের রোড থেকে কেউ একজন চেঁচাল, ‘অ্যাই খালি, খাড়াও!’ একটা কুকুরের বিকট কান্না দূরে সরে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই কেউ খুব জোরে মেরেছে। একটু কান পাতলে আরো বোঝা যাবে, এ রকম আরো অনেক শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে গৃহিণীদের বাসন-পেয়ালা মাজার আওয়াজ।

 ছোট ছোট অভ্যাসের সমষ্টি, যেগুলো মানুষের জীবন, নিজে থেকেই ভাঁজ খুলছে। এসব ওদের অনেক শক্ত করে বেঁধে রেখেছে—কোনো আইন, পুলিশ বা জেলারের সাধ্য নেই এত শক্ত বাঁধন তৈরি করতে পারে; অথচ সবাই তারা নিজেদের মুক্ত-স্বাধীন বলে মনে করে। সেই নার্ভাস দম্পতি, সম্ভবত পেশাদার নৃত্য ও সংগীতশিল্পী, কোনো হোটেলের ডান্স ফ্লোরে কিংবা কোনো খোলা মঞ্চে রাত্রিকালীন শো করতে বেরোল, আলো নেভাতে ভুলে গেছে, খানিক পরই ছুুটতে ছুটতে ফিরে এলো ছেলেটা, থাবা মারার ভঙ্গিতে একের পর এক সুইচ অফ করল—ভোরের আলো ফোটার আগে পর্যন্ত তাদের এই আস্তানা অন্ধকার থাকবে। নিঃসঙ্গ মহিলা তার বাচ্চা মেয়েকে বিছানায় শোয়াল, শোকে কাতর একটা ভাব নিয়ে ঝুঁকল ওর দিকে, বিশাল হতাশা নিয়ে শিরদাঁড়া বাঁকা করে বসল মেয়ের মুখ লালচে করতে। আমি তার কান্না শুনতে পাচ্ছি না, সে হয়তো কাঁদছেও না...নিজের গালে চড় মারতে ইচ্ছা হলো—কী করে ভাবতে পারলাম যে মেয়েটা কাঁদছে না? না-ই বা শুনতে পেলাম, তবু আমার জানা উচিত যে সে কাঁদছে।

পাঁচতলার ফ্ল্যাট, লম্বা সাইড রোডের ডান দিকের দালান; চারটি জানালার মধ্যে তিনটি জানালার পর্দা নতুন করে টানা হয়েছে, আর চতুর্থ জানালার পর্দা যেমন পুরোপুরি টানা ছিল, তেমনই থাকল সারাটা দিন। এ ব্যাপারে সচেতন ছিলাম না, কারণ বিশেষ করে ওদিকটা খেয়াল করিনি বা ভাবিওনি। খেয়াল করলাম এতক্ষণে। সারা দিনে আমার দৃষ্টি ওই জানালাগুলোর ওপর পড়েছে, তবে আমার চিন্তার বিষয় ছিল অন্য কিছু। শেষ কামরায়, জানালার পর্দার ভেতর, হঠাৎ করে আলো জ্বলে ওঠায় সেদিকে তাকালাম। ওটা ওদের কিচেন। ওদিকে তাকিয়ে থাকার সময় উপলব্ধি করলাম, পর্দাগুলো আজ সারা দিন তোলা বা সরানো হয়নি। এক চিন্তার সূত্র ধরে আরেক চিন্তা চলে এলো, এটাও সারা দিন আমি খেয়াল করিনি। সেটা হলো, আজ একবারও আমি বউটাকে দেখতে পাইনি। একমুহূর্ত আগের কথা বাদ দিলে, আজ আমি ওই জানালাগুলোর ভেতর প্রাণের কোনো আভাস দেখতে পাইনি।

লোকটা বাইরে থেকে ঘরে ফিরল। ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজাটা কিচেনের উল্টো দিকে, জানালার কাছ থেকে দূরে। দেখলাম, টাই পরে রয়েছে। তাতেই বুঝলাম, বাইরে থেকে এইমাত্র ফিরেছে। সাধারণত বউই তার টাই খুলে দেয়; কিন্তু আজ মেয়েটাকে দেখলাম না। সে নিজেও খুলছে না ওটা। ঠিক স্বাভাবিক বলে মানতে পারছি না। তার আচরণ যেন বলতে চাইছে, বাড়িতে এমন কেউ নেই যে টাই খোলা বা না খোলার মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে। গলায় শৌখিন ফাঁস নিয়ে হাঁটাচলা করছে, বউটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তাকে আমি আরেকটা কাজ করতে দেখলাম, মাথার পেছনে হাত ঘষল বার দুয়েক। ওঠা ঠিক ঘাম মোছার ভঙ্গি নয়, আমি জানি। সম্ভবত দুশ্চিন্তায় দিশাহারা বোধ করার আভাস কিংবা হয়রানির শিকার হওয়ার ইঙ্গিত। ঘরের ভেতর গরম লাগলে প্রথমেই তো টাইটা খোলা দরকার, গায়ে বাতাস লাগার পথে ওটা একটা বাধা না?

 বউটা আসছে না। এটা ব্যতিক্রম। একটা খুব মজবুত বন্ধনের লঙ্ঘন, যে বন্ধন আমাদের সবাইকে এক শিকলে বেঁধে রেখেছে। তার মানে লোকটা নিজে লক খুলে ফ্ল্যাটে ঢুকেছে। স্ত্রী তাহলে সত্যি অনেক অসুস্থ। এতটাই যে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। যে ঘরে তার শুয়ে থাকার কথা, ওটার জানালায় পর্দা থাকায় ভেতরটা দেখতে পাচ্ছি না, কাজেই কী অবস্থায় আছে কে জানে।

মেয়েটার কথা ভেবেই ওদিকে চোখ রাখছি।

ফ্ল্যাটে ফিরে লোকটা কিন্তু কিছু করছে না। তার এই কিছু না করাটা মোটেও স্বাভাবিক নয়। স্ত্রী যদি এতটা অসুস্থ হয় যে স্বামী কাজ থেকে ফিরলে উঠে গিয়ে দরজা খুলতে পারে না, তাহলে স্বামীর কাছ থেকে সবাই আশা করবে বাড়িতে ঢুকে সরাসরি স্ত্রীর কাছে যাবে সে, জানবে কেমন আছে মেয়েটা। কিন্তু এই লোক কী এক অজ্ঞাত কারণে তা করছে না? বেডরুম থেকে দুই কামরা দূরে রয়েছে। আমার প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না, তাই আমি বিস্মিত হচ্ছি। লোকটা যেখানে ছিল সেখানেই রয়েছে। ব্যাপারটা আমার কাছে দুর্বোধ্য হয়ে উঠছে। আজব কাণ্ড না, নিজের স্ত্রীর কাছে লোকটার না যাওয়াটা? সে অন্তত বেডরুমের দরজা পর্যন্ত যেতে পারে, ভেতরে তাকিয়ে অন্তত দেখুক কেমন আছে অসুস্থ মানুষটা, কী করছে।

হতে পারে বউটা ঘুমাচ্ছে, লোকটা তাকে বিরক্ত করতে চাইছে না। কিন্তু তারপর ভাবলাম, বউ ঘুমাচ্ছে কি না তা জানল কিভাবে? কেউ ঘুমাচ্ছে কি না জানতে হলে তার কাছে যেতে হবে না? নাকি স্ত্রীর নাম ধরে ডেকেছে? যদি ডেকে থাকে, এত দূর থেকে আমার শুনতে পাওয়ার কথা নয়। ডেকে সাড়া না পাওয়ায় ভেবেছে ঘুমাচ্ছে?

কামরার মাঝখান থেকে জানালার দিকে এগিয়ে এলো লোকটা, ওখানে দাঁড়িয়ে বাইরেটা দেখছে, যেমন আজ সকালে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে সকালের মতো তার দৃষ্টিতে কোনো সতর্কতা নেই, নেই অনুসন্ধানী ভাব। সে তাকিয়ে আছে, তবে যেন কিছু দেখতে পাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ হলো নসিব আমার ট্রে নিয়ে চলে গেছে, আমার ঘরের আলো নেভানো। জাফরি লাগানো জানালার সামনে থেকে আমি সরছি না। কারণ জানি ওই লোক এদিকে সরাসরি তাকালেও অন্ধকার জানালায় আমাকে দেখতে পাবে না। কয়েক মিনিট অনড় দাঁড়িয়ে থাকল ওখানে। আচরণই বলে দিচ্ছে খুব চিন্তিত। যেন খুব বড় সংকটে পড়েছে। চিন্তা করছে, কিভাবে সমাধান করা যায়।

লোকটা স্ত্রীর কথা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে, নিজেকে বললাম। এ রকম অবস্থায় সব লোকই চিন্তায় পড়ে যাবে। দুনিয়াজুড়ে খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। তবে অদ্ভুতই বলতে হবে যে তাকে ওই রকম অন্ধকারে রেখে দিয়েছে। যাকে নিয়ে এত দুশ্চিন্তা, তাকে কেউ একা ফেলে রাখে? এবার আমার রাগ হচ্ছে। কী আশ্চর্য, বউটার কাছে সে যাচ্ছে না কেন! যে ব্যক্তি স্ত্রীর স্বাস্থ্য সমস্যা বা রোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন, বাড়ি ফিরে তাকে একবার দেখতে যাবে না? এটা কেমন কথা!

এখানেও একটা তুচ্ছ বিচ্যুতি দেখতে পাচ্ছি আমি। তুচ্ছ হলেও গুরুত্বপূর্ণ নয় বলি কী করে! মনের ভেতর উদ্দেশ্য যেমন হওয়া উচিত, বাইরের আচরণ তার সঙ্গে মিলছে না। এবং আমার তাকিয়ে থাকার সময়ই আবার সেই বিচিত্র দৃশ্যটা নতুন করে সৃষ্টি হতে দেখলাম আমি, যেটা আজ ভোর হওয়ার সময় দেখতে পেয়েছিলাম। আসলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে এখানে। অকস্মাৎ সচেতন হয়ে ওঠায় লোকটার মাথা ঝট করে উঁচু হলো, এবং আমাদের দালানটাকে স্টার্টিং পয়েন্ট ধরে মন্থরগতিতে এই দিকের প্রতিটি বাড়ির ওপর চোখ বোলাতে শুরু করেছে। এটা ঠিক যে এবার আলোটা তার পেছনে; তার পরও তার ওপর যথেষ্ট আলো পড়ছে, যাতে আমি তার মাথার গতিবিধি দেখতে ও বুঝতে পারি, ধীরে ধীরে এক দিক থেকে আরেক দিকে সরে যাচ্ছে সেটা। আমি স্থির পাথর হয়ে থাকলাম। দেখলাম, আমাকে পাশ কাটিয়ে গেল তাঁর দৃষ্টি। জানি নড়াচড়া চোখে ধরা পড়ে যায়।

অন্য সব বাড়ির পেছনের জানালায় কী খুঁজছে ওই লোক? এদিকে তার এত আগ্রহ কেন? ব্যাপারটা নিয়ে আমি যে খুব সিরিয়াস হয়ে উঠছি, তা অবশ্য নয়। তবে ওই ফ্ল্যাটের প্রতিটি জানালার ওপর আমার কড়া নজর আছে। আর বেশি ভাবতে ইচ্ছা করছে না। বুঝতে পারছি, আমার ভেতর একটা নির্লিপ্ত ভাব চলে আসছে। তবে চিন্তাটা একপর্যায়ে ঘুরেফিরে আমাকেই প্রায় অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে ফেলল। ওই লোক এবাড়ি-সেবাড়ির জানালায় কী খুঁজছে সেটা তার ব্যাপার, তা নিয়ে আমার এত মাথা ঘামানোর কি আছে? আমিই বা কেন লোকজনের জানালার ভেতর তাকাই? আমি কেন ওই লোকের গতিবিধি, নড়াচড়া, অভ্যাস আর আচরণ লক্ষ করছি? অন্য লোকদের জানালায় তাকিয়ে সে যদি মন্দ কাজ করে থাকে, আমিও তাহলে তার জানালায় তাকিয়ে থেকে ভালো কাজ করিনি।

গুরুত্বপূর্ণ একটা পার্থক্য আমার দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। আমি কোনো বিষয়ে উদ্বিগ্ন নই; কিন্তু সে উদ্বিগ্ন বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

সব জানালার পর্দা আবার টেনে দেওয়া হলো। পর্দার ভেতর আলো আগের মতোই জ্বলতে থাকল। তবে যে ঘরের পর্দা সব সময় টানা, সেটায় কোনো আলো জ্বালা হয়নি; আগের মতোই অন্ধকার হয়ে আছে।

সময় বয়ে চলেছে। কতটুকু সময় পার হলো বলা মুশকিল—পৌনে এক ঘণ্টা, বিশ মিনিট। পেছনের উঠানে একটা ঝিঁঝি পোকা ডেকে উঠল, শুরু করার পর আর থামছে না। রাতে নিজের আস্তানায় ফেরার আগে আমার আর কিছু লাগবে কি না জানতে এলো নসিব। আমি মাথা নাড়লাম। তার পরও প্রশ্ন করছে দেখে বিরক্ত হলাম। বললাম, তুমি যেতে পারো, আমার আর কিছু লাগবে না। সে ওখানে চোখ নিচু করে তিন সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর ধরা যায় কি যায় না এত অল্প মাথা নাড়ল। ভাবটা এমন—কী যেন তার পছন্দ হচ্ছে না।

কাজেই আমাকে জিজ্ঞেস করতে হলো, ‘কী ব্যাপার তোমার?’

‘আপনে স্যার জানেন এইডার কী মাইনে?’

‘মানে? কিসের মানে, নসিব? কী বলছ তুমি?’

‘আমার বুড়ি মা আমারে কয়া গ্যাছে। আর আমার মায়ে জীবনেও আমার লগে কুনো সময় মিথ্যা কয় নাই। যদি জিগান, আমিও আমার জীবনে এই ব্যাপারডা কহনও মিথ্যা হইতে দেহি নাই।’

‘কিসের কথা বলছ তুমি? ঝিঁঝি পোকা?’

‘যহনই আপনে দ্যাখবেন ওগুলা ডাকাডাকি করতাছে, মনে করবেন ওইডা মরণের সিগন্যাল দিতাছে—কাছাকাছি কেউ মরব।’

হাত ঝাঁকিয়ে তাকে আমি দূর হয়ে যেতে বললাম, ‘শোনো নসিব, এ রকম আজেবাজে কথা বলে তুমি আমার মেজাজাটা গরম করে দিয়ো না। ওই ঝিঁঝিরা এখানে কোথাও নেই, কাজেই তোমার ভয় পাওয়ারও কিছু নেই।’

কামরা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে নসিব, গোঁয়ারের মতো বিড়বিড় করছে আপন মনে, ‘এইহানে নাই তো কি অইছে, লগ দিয়াই আছে কুনোহানে।’

ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা ঠেলে দিয়ে গেল সে, আর আমি একা অন্ধকারে বসে থাকলাম।

আজ রাতে ভাপসা গরম পড়েছে, প্রায় কাল রাতের মতোই। খোলা জানালার সামনে বসে আছি, তার পরও হাঁসফাঁস করছি, ফুসফুস যেন যথেষ্ট তাজা বাতাস পাচ্ছে না। জানালা আর ঝুলবারান্দার দরজা খোলা রাখা সত্ত্বেও আমার যদি এই অবস্থা হয়, ওই বউ আর তার স্বামীর তাহলে ফ্ল্যাটের ভেতর কী অবস্থা হচ্ছে, পর্দা টেনে দিয়ে সবগুলো জানালার বাতাস চলাচল বন্ধ রাখার পর?

তারপর হঠাৎ করে, ঠিক যখন গোটা ব্যাপারটা নিয়ে আমার মাথার ভেতর অলস জল্পনাকল্পনা একটা স্থির বিন্দুতে পৌঁছতে যাচ্ছে, স্ফটিকের মতো জমাট বাঁধতে শুরু করেছে সন্দেহের মতো কিছু একটা, তখনই একটা জানালার পর্দা সরে গেল আবার।

তাকে আমি মাঝখানের জানালায় দেখতে পেলাম, ওটা তাদের বৈঠকখানা। এরই মধ্যে সে টাই খুলেছে, শার্ট খুলেছে, শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি পরে থাকায় হাত আর কাঁধ খোলা দেখতে পাচ্ছি। ভাপসা গরমের আঁচ তারও তাহলে লাগছে। যার গরম লাগছে, সে ভাববে না তার অসুস্থ স্ত্রীও খুব কষ্ট পাচ্ছে? তার খবর নেবে না? তার সেবাযত্ন করবে না? হয়তো করেছে, পর্দার আড়াল থাকায় আমি দেখতে পাইনি। করলে করেছে অন্ধকারে। ওদের বেডরুমে আলো জ্বলেনি। অন্ধকারে কেন?

প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি কী করছে লোকটা। তার হাতের নড়াচড়া উঁচু-নিচু হচ্ছে, মাঝেমধ্যে একটু ঝুঁকে কী যেন তুলছে, আবার সিধা হয়ে এক দিক থেকে আরেক দিকে নিয়ে যাচ্ছে সেসব। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে কাজটা করছে সে, তবে আমার দৃষ্টিপথের বাইরের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে তাকে, আবার একটু পরই শরীরটা সিধা হয়ে গেলে আবার আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি। এটা চলছে অনিয়মিত বিরতি নিয়ে, প্রায় কোনো ট্রেনিং গ্রহণ বা ব্যায়াম করার কায়দায়, পার্থক্য শুধু নিচু আর উঁচু হওয়ার সময়ের মধ্যে তারতম্য ঘটছে, কখনো সে অনেকক্ষণ নিচু হয়ে থাকছে, কখনো নিচু হয়েই আবার তখনই সিধা হচ্ছে, আবার কখনো দু-তিনবার দ্রুত নিচু আর উঁচু হলো। তার সামনে কালো রঙের চওড়া আর ইংরেজি অক্ষর ভি আকৃতির একটা রেলিং রয়েছে, সেটাই তাকে জানালার কাছ থেকে আলাদা করে রেখেছে। জিনিসটা যা-ই হোক, ওটার শুধু খানিক ওপরের অংশ দেখতে পাচ্ছি আমি, জানালার গোবরাট বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমার দৃষ্টিপথে। অন্য সময় ওখানে আমি দেখিনি, বুঝতে পারছি না কী হতে পারে ওটা।

জানালার পর্দা সরানোর পর এ-ই প্রথম হঠাৎ করে ওখান থেকে সরে আসতে দেখলাম লোকটাকে, ঘুরে জানালার সামনের দিকে চলে এলো, কামরার আরেক দিকে এসে নিচু হলো, সিধা হলো তখনই, হাত ভর্তি রঙিন কাপড়চোপড় বা ওই রকম কিছু হবে, অনেকটা যেন ত্রিভুজ আকৃতির পতাকার মতো দেখতে, দূরত্বের কারণে আমি নিশ্চিত হতে পারলাম না। আবার     ভি-র পেছনে চলে গেল সে, হাতের ওগুলো ওটার ওপর নামিয়ে রাখল। একটু পর আবার আগের মতো নিচু হলো, এবার অনেকটা সময় ওভাবেই থাকল।

 যে ‘পতাকা’গুলো ভি-র ওপর রাখা হয়েছে, সেগুলো আমার চোখের সামনে রং বদলাতে শুরু করল। চোখে আমি খুব ভালো দেখি। এই ওগুলোকে আমি সাদা দেখলাম, পরমুহূর্তে লাল হয়ে গেল, তার পরই হলো নীল।

এতক্ষণে আমি ধরতে পারলাম ব্যাপারটা। ওগুলো পতাকা নয়, মেয়েদের পোশাক, আর ওই লোক স্তূপ করে রাখা পোশাক প্রতিবার সবচেয়ে ওপরেরটা নিজের দিকে তুলে নিচ্ছে। হঠাৎ করে সবগুলো নাই হয়ে গেল, ভি-কে আবার কালো আর ফাঁকা দেখাচ্ছে, এবং ওই লোকের ধড়টাও আমার দৃষ্টিপথে উঠে এলো। জিনিসটা কী এখন আমি বুঝতে পারছি; এ-ও বুঝতে পারছি, এতক্ষণ ধরে কী করছিল সে। পোশাকগুলোই বলে দিল আমাকে। আর লোকটা আমাকে নিশ্চিত করল। সে তার হাত দুটি ভি-র দুই মাথা পর্যন্ত লম্বা করল, আমি তাকে শক্তি খাটাতে দেখলাম, যেন চাপ দিচ্ছে, তারপর হঠাৎ করে ভাঁজ হয়ে গেল ওই ভি, হয়ে উঠল একটা কিউবওয়েজ। তারপর সে তার শরীরের পুরো ওপরের অংশকে দিয়ে ঢেউ খেলানোর ভঙ্গি করল, ওয়েজটা এক দিকে সরে অদৃশ্য হয়ে গেল। ট্রাংকটা এখন কালো ফিতা আর ধাতব পাত দিয়ে জড়ানো এবং সুরক্ষিত।

একটা ট্রাংক ভরছিল লোকটা। অনেক বড় এবং খাড়া ধরনের ট্রাংক, তাতে সে তার স্ত্রীর জিনিসপত্র রাখছিল।

এখন ওই লোক কিচেনে চলে এলো, ভেতরে ঢোকার পর স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল একমুহূর্ত। আমি তাকে একবার না, বেশ কয়েকবার কপালে হাত চালাতে দেখলাম, তারপর সেই হাত বাতাসে ঝাঁকাল, যেন ঘাম ঝরাচ্ছে। হ্যাঁ, এ রকম একটা রাতে খাটুনির কাজ করলে গরম তো লাগবেই। তারপর দেয়ালের ওপরের দিকে হাত তুলে কিছু একটা নামাল বা বের করল। যেহেতু কিচেনে রয়েছে, আর তার হাতে আমি একটা কালো রঙের বোতল দেখতে পেলাম। ভাবলাম, লোকটা মনে হয় মাঝেমধ্যে মদটদ খায়। এরপর আমি তাকে দ্রুত বার কয়েক মুখে হাত তুলতে দেখলাম। তাহলে আমার ধারণাই সত্যি, স্ত্রীর জিনিসপত্র বড় একটা ট্রাংকে ভরার পর ক্লান্ত বোধ করছে লোকটা, তাই দু-এক ঢোক হুইস্কি খেয়ে চাঙ্গা হতে চাইছে। কেউ যদি তার বাড়িতে মদ রাখে, সেটা তার ব্যাপার, অবশ্যই। অনেকেই রাখে, তাদের মধ্যে আমিও একজন। বাড়িতে মদ রাখার মানে এ রকম না-ও হতে পারে যে সে ওটা খায়। এই যেমন আমি, আজ বিশ বছর হয়ে গেল মদ স্পর্শ করি না, তবে বাড়িতে দু-এক বোতল রাখতে হয় কিছু বন্ধু-বান্ধব আর অতিথির কথা ভেবে। তারা আশা করে, আমার বাড়িতে এলে এক-আধটু গলা ভেজাতে পারবে। লোকটার প্রতি সহানুভূতি জাগল, একটা ট্রাংক ভরা সত্যি খুব পরিশ্রমের কাজ। তবে সরাসরি বোতল থেকে না খেয়ে গ্লাসে ঢেলে, তারপর পানি বা বরফ মিশিয়ে খাওয়া উচিত ছিল।

যা-ই হোক, আবার লোকটা জানালার কাছাকাছি এলো, তবে দাঁড়িয়েছে জানালার মুখোমুখি নয়, একপাশ হয়ে, যাতে শুধু তার মাথা আর কাঁধের সরু একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। সে তাকিয়ে আছে জানালার বাইরে, আবার সেই সতর্ক ভঙ্গিতে তার উল্টো পাশের বাড়িগুলোর প্রতিটি চৌকো জানালা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে। প্রায় সব জানালাই এখন অন্ধকার, ঘরের আলো নেভানো। লোকটা সব সময় বাঁ দিক থেকে শুরু করে, সেখান থেকে ধীরে ধীরে ডান দিকে এগোয় তার দৃষ্টি।

তাকে আমি একই সন্ধ্যায় এটা দ্বিতীয়বার করতে দেখলাম। তারপর ভোর হতে একবার, সব মিলিয়ে তিনবার। মনে মনে হাসলাম। আপনার এ রকম মনে হতেই পারে—কোনো একটা ব্যাপারে লোকটা অপরাধবোধে ভুগছে। আসলে হয়তো কিছুই না, এখানে অস্বাভাবিক বা চমকে ওঠার মতো কিছু ঘটছে না, এ আসলে লোকটার অভ্যাস। এ রকম কত উদ্ভট বা বিচিত্র অভ্যাস মানুষের থাকে। সে হয়তো জানেই না যে এটা সে একটা অস্বাভাবিক কাজ করছে, এটার কারণে লোকজন তাকে ভুল বুঝতে পারে। স্বীকার করতে কুণ্ঠা নেই যে এ রকম দু-একটা বাজে অভ্যাস আমারও আছে। আসলে বোধ হয় সবারই থাকে।

লোকটা আবার কামরার ভেতর দিকে ফিরে গেল, এক সেকেন্ড পর অন্ধকার হয়ে গেল সেটা। পাশের ঘরে তার আকৃতি দেখতে পেলাম, জানালার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। এটা ওদের বৈঠকখানা। এবার সেটার আলোও নিভল। এটা আমাকে বিস্মিত করল না যে তৃতীয় কামরায়, পর্দা টানা বেডরুমে ঢোকার সময় ওখানের আলোটা জ্বালল না সে। স্ত্রীকে তার বিরক্ত করতে না চাওয়ার কারণ আছে, অবশ্যই—বিশেষ করে কাল তাকে যদি স্বাস্থ্যগত কারণে অন্য কোথাও চলে যেতে হয়, যেমনটা ট্রাংকে জিনিসপত্র ভরার সময় বোঝা গেছে। বউটার আসলে প্রচুর বিশ্রাম দরকার, যাত্রা শুরু করার আগে। বিবেচক স্বামী যদি অন্ধকারে বিছানায় উঠে সাবধানে স্ত্রীর পাশে শুয়ে পড়ে, এটা ব্যাখ্যা করা সহজ, তা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলবে না।

তবে আমাকে বিস্মিত করল, কিছু সময় পরে যখন বৈঠকখানায় দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বলতে দেখলাম। ওখানে নিশ্চয়ই শুয়ে আছে সে, সোফা বা আর কিছুতে লম্বা হয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। লোকটা আসলে বেডরুমে যায়ইনি, ওটার কাছ থেকে পুরোপুরি দূরে সরে থাকছে। এটা আমাকে ধাঁধায় ফেলে দিল, সত্যি বলছি। স্ত্রীর প্রতি তার এই প্রকৃতির দরদ যেন খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে না?

দশ মিনিট কিংবা আরো খানিক পর আরেকবার দিয়াশলাই জ্বালা হলো, সেটাও বৈঠকখানার জানালার কাছে। লোকটা ঘুমাতে পারছে না।

রাতটা আমাদের দুজনের ওপরই বেশ গরম মেজাজ নিয়ে চেপে বসল, একজন পেছনের জানালায় কৌতূহলে টইটম্বুর মধ্যবয়স্ক লোক; অপরজন তরুণ, চেইন স্মোকার, পাঁচতলা ফ্ল্যাটের বৈঠকখানায়, যে ব্যক্তির আচরণ অনেক প্রশ্ন তৈরি করছে; কিন্তু কোনোটারই উত্তর মিলছে না। কোথাও কোনো শব্দ হচ্ছে না, মাঝেমধ্যে শুধু ঝিঁঝি পোকারা ডাকাডাকি করছে।

আমি আবার আমার জানালায় ফিরলাম সকালের প্রথম রোদ ফুটতে না ফুটতে। ওই লোকের জন্য নয়। আমার বিছানার তোশক গরম কয়লার মতো লাগছিল। কাজে এসে আমাকে ওখানেই দেখতে পেল নসিব। ‘আপনে স্যার নিজের বিপদ ডাইকা আনতাছেন,’ বলল সে। আর কিছু না বলায় মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম ওকে।

 

প্রথমে কিছুক্ষণ আমার উল্টো দিকের ফ্ল্যাটে প্রাণের কোনো চিহ্ন খুঁজে পেলাম না। তারপর আচমকা বৈঠকখানার নিচে থেকে, যে জায়গা আমার দৃষ্টিপথে নেই, সেখান থেকে মাথা তুলল—অর্থাৎ উঠে বসল। তার মানে আমার ধারণাই ঠিক, রাতটা ওখানে কাটিয়েছে সে, সোফায় কিংবা ইজি চেয়ারে শুয়ে। এখন, এবার, স্বামী হিসেবে সে তার অবশ্যপালনীয় কর্তব্য নির্ঘাত পালন করবে; এখনই বেডরুমে ঢুকবে স্ত্রী কেমন আছে দেখতে, জানার চেষ্টা করবে, তার অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো কি না। এটা স্বাভাবিক এবং সাধারণ মানবিকতা। স্ত্রীর কাছে যায়নি সে, আমি যতটুকু হিসাব করতে পারছি, দুই রাত আগে থেকে।

কিন্তু আমাকে হতাশ করে দিয়ে আজও লোকটা তার স্ত্রীর কাছে গেল না। সে নতুন করে লুঙ্গি বাঁধল কোমরে, গেঞ্জি পরল, গেঞ্জির ওপর টি-শার্ট পরল, তারপর বেডরুমের উল্টো দিকে পা বাড়াল। আমার জানা আছে, ওদিকটা তাদের ফ্ল্যাটের প্রবেশপথ।  ভাবলাম, দরজায় কেউ এসেছে, নক বা কলিংবেল শুনে কাপড় পরল, এখন যাচ্ছে দরজা খুলতে।

ঠিক ভেবেছি। একমুহূর্ত পর আবার তাকে ফিরে আসতে দেখলাম, সঙ্গে লেদার অ্যাপ্রন পরা দুজন লোক। ঢাকা শহরে আজকাল নানা ধরনের সার্ভিস পাওয়া যায়, ফোন বা ই-মেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে কার কী দরকার বলে দিলেই কম্পানি থেকে লোকজন এসে কাজটা করে দেবে। আবিষ্কার আর উদ্ভাবন করার ক্ষমতা থাকায় মানুষ নিজের জীবনকে অনেক সহজ করে নিতে পারছে। আমি তাকে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, আর লোক দুজন ভারী ট্রাংকটাকে ধরাধরি করে ফ্ল্যাট থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম, কিভাবে ফ্ল্যাট থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। না বোঝার কিছু নেই, কারণ লোকগুলো এইমাত্র যেদিক থেকে এসেছে, ট্রাংক নিয়ে সেদিকেই যাচ্ছে। বাড়ির কর্তা অবশ্য শুধু দাঁড়িয়ে থাকল না, লোক দুজনের দিকে ঝুঁকে থাকল সারাক্ষণ, থেকে থেকে লাফ দিয়ে এদিকে সরছে, ওদিকে সরছে। তার মধ্যে যেন একটা ব্যাকুল ভাব বা সংশয় কাজ করছে।

তিনজনই তারা আমার চোখের আড়ালে সরে গেল। বেশ কিছুটা সময় পার হলো, তারপর একা ফিরে এলো লোকটা। দেখলাম, সে তার মাথায় হাত চালাচ্ছে, যেন তারা নয়, সে-ই প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ঘেমে গেছে।

আচ্ছা, সে তাহলে স্ত্রীর ট্রাংক অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দিল, মেয়েটা যেখানে বিশ্রাম বা চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে। এটা নিয়ে কিছু বলার নেই।

আবার তাকে দেয়ালের ওপর দিকে হাত তুলতে দেখলাম, এবারও ওখান থেকে কিছু একটা নিল। ও আচ্ছা, হাতে আবার সেই বোতল দেখতে পাচ্ছি। ফের মদ খাওয়ার দরকার পড়ল? দুবার, তিনবার হাত তুলতে দেখলাম তাকে, সরাসরি বোতল থেকে, মানে নির্জলা পান করছে। আপন মনে বললাম, একটু বোকা বোকা লাগছে নিজেকে : হ্যাঁ, কিন্তু এবার তো তাকে কোনো ট্রাংক ভরতে হয়নি। ট্রাংক তো কাল রাত থেকে ভরা অবস্থায় পড়ে ছিল ওখানে। খাটাখাটুনির কাজটা তাহলে এলো কোত্থেকে? শুধু ঘাম হলে তো কেউ মদে আশ্রয় খোঁজে না। তাহলে?

এখন, এতগুলো ঘণ্টা পর, অবশেষে সে তার স্ত্রীর কাছে যাচ্ছে। আমি জানালায় তার কাঠামোর ওপরের অংশ দেখলাম—বৈঠকখানা হয়ে বেডরুমের দিকে চলে গেল। সেও বেডরুমে ঢুকল, তিন সেকেন্ড পর ওই ঘরের জানালা থেকে পর্দাও সরল, যেটা এই কদিন সব সময় টাঙানো ছিল। তারপর সে তার মাথা ঘোরাল, নিজের পেছনে চোখ বোলাচ্ছে। তার এই চোখ বোলানো বা তাকানোর মধ্যে বিশেষ একটা ধরন আছে, যেটা এত দূর থেকে দেখা সত্ত্বেও আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না। সে নির্দিষ্ট একটা দিকে তাকায়নি, মানুষ যেভাবে কোনো ব্যক্তির দিকে তাকায়। তাকাল এক দিক থেকে আরেক দিক পর্যন্ত, ওপর থেকে নিচে, এবং চারদিকে, যেভাবে মানুষ তাকায়—খালি একটা কামরায়।

তাকে এক পা পিছু হটতে দেখলাম, সামনের দিকে সামান্য একটু ঝুঁকল, কিছু একটা ধরে ওপরে তুলছে, হাতের পেশি শক্ত হলো। তারপর দেখতে পেলাম ওগুলো খালি—তার মানে কেউ ওগুলোর ওপর শুয়ে নেই—খাটের তোশক আর গদি। বিছানার পায়ের দিকটায় দুই ভাঁজ করে রেখে দিল। এর একটু পর দ্বিতীয় বিছানার তোশক আর গদিও একইভাবে ভাঁজ করা হলো।

বউটা তাহলে ওখানে নেই। বা ছিলও না।

ডিলেইড অ্যাকশন বলে একটা কথা আছে ইংরেজিতে। আজ আমি বুঝলাম সেটার কী মানে। দুই দিন ধরে আকৃতি-আদলবিহীন একটা অস্বস্তি, কোনো কাঠামো ছাড়াই একটা সন্দেহ, জানি না কী নাম দেব সেটার, আমার মনের আনাচকানাচে ভেসে বেড়াচ্ছিল, একটা পোকার মতো, কোথাও বসার জন্য জায়গা খুঁজছে। দু-একবার এ রকমও হয়েছে যে কোথাও বসার জন্য তৈরি হয়েছে ওটা, এখন বসতে যাচ্ছে; কিন্তু সামান্য আশ্বস্ত করার মতো কিছু ঘটে গেল, যেমন দীর্ঘ সময় প্রতিটি জানালায় পর্দা দেওয়া থাকলেও হঠাৎ সেগুলো সরে গেল, তাতে ওই পোকাটার আর বসা হলো না, আবার সে লক্ষ্যহীন উড়ে বেড়াতে লাগল, আর স্থির হয়ে কোথাও বসতে না পারায় আমিও ওটাকে চিনতে পারলাম না। যোগসূত্রটা সব সময় ওখানে ছিল, অপেক্ষা করছিল কখন গ্রহণ করা হবে। এখন, কোনো কারণে, সে যখন খালি তোশক ওল্টাচ্ছে—পোকাটা বসল! যোগসূত্রটা বিস্তৃত হলো কিংবা বিস্ফোরিত হলো, যেভাবেই আপনি বর্ণনা করুন, মূল বিষয় হলো, ওই বিস্তৃতি বা বিস্ফোরণ একটা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নিশ্চিত করল আমাকে।

অন্য ভাষায়, আমার মনের যুক্তিবাদী অংশটা অবচেতনের তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল। দেরিতে বুঝতে পারা। এখন একটা অন্যটাকে ধরতে পেরেছে। এবং দুটির এক হওয়ার মুহূর্তে একটা মেসেজ স্ফুলিঙ্গের মতো ছিটকে বেরিয়ে এলো : ওই লোক মেয়েটাকে নিয়ে কিছু করেছে।

চোখ নামিয়ে নিজের হাতের দিকে তাকালাম, দেখলাম আমার হাত মালাইচাকির সঙ্গে এক হয়ে গেছে, চেপে ধরাটা এত শক্ত। আঙুলগুলো ছাড়ানোর জন্য জোর খাটাতে হলো আমাকে। নিজেকে বললাম, বারবার, একেবারে তাড়াহুড়া করবে না, সাবধান হও, যা কিছু করার সবই খুব ধীরে। প্রথম কথা—যেটা মনে রাখতে হবে, তুমি কিছু দেখোনি। দ্বিতীয় যে কথাটা ভুললে চলবে না, তুমি কিছু জানো না। তোমার কাছে শুধু একটা নেগেটিভ প্রুফ আছে যে বউটাকে আর দেখতে পাচ্ছ না।

কিচেনের ভেতর দাঁড়িয়ে রয়েছে নসিব, আমার দিকে তাকিয়ে কী যেন চিন্তা করছিল। আমি সেদিকে ফিরতে চোখাচুখি হলো। সে বলল, ‘কাল রাইতে আপনে তো দেখতাছি কিছুই প্যাটে দেন নাই। হেই লাইগাই আপনেরে কাগুজের লাহান বেরঙা লাগতাছে।’

আমার অনুভূতিও প্রায় সে রকম। মুখ থেকে রক্ত যখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও নেমে যায়, তখন মৃদু সুঁই বেঁধার মতো একটা অনুভূতি হয় ওখানে। যা-ই হোক, এখনকার জরুরি কাজ হলো আমার আশপাশ থেকে ওকে বিদায় করা, আমি যাতে নিজেকে স্বাধীন আর স্বচ্ছন্দ দেখতে পাই এবং বিনা বাধায় চিন্তা করতে পারি। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে এটাই সবচেয়ে আগে দরকার আমার। ‘নসিব, তোমাকে এখনই একবার একটু বাইরে যেতে হবে...’

‘ক্যান?’ আমাকে শেষ করতে না দিয়ে প্রশ্ন করে বসল সে। ‘ঠিক আছে, যামু নে, তার আগে আমারে ঘরের কামগুলা সাইরা লইতে দেন।’

‘এই, চুপ করো। আমাকে আগে শেষ করতে দাও।’

‘জে, স্যার।’

‘ওই যে বিল্ডিংটা, ওদিকে, ওটা কোন রাস্তায়, বলতে পারবে তুমি?’ কিচেন থেকে বেরিয়ে আমার শোবার ঘরে ঢুকছে সে। ‘বারান্দায় বেরিয়ো না।’ মানা করলাম তাকে। ‘আমি কোন বাড়িটার কথা বলছি তুমি বুঝতে পারছ। বারান্দায় বেরিয়ে ওটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকার দরকার নেই।’

‘সবতে কয় চৌরাস্তা, রাস্তার নাম দেলওয়ার ইভিনিউ না কী জানি কয়।’ বলে ঘাড় চুলকাতে লাগল নসিব, ভাবটা যেন আমার অনেক বড় উপকার করল।

‘হুম্। আমার জানা ছিল, তার পরও নিশ্চিত হয়ে নিলাম। যাও, বাড়িটার সামনে থেকে একবার ঘুরে এসো। ওই দালানের নম্বরটা মুখস্থ করবে তুমি, ফিরে এসে আমাকে যাতে ঠিকঠাক বলতে পারো। ঠিক আছে?’

যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াচ্ছে নসিব, জানতে চাইল, ‘এইডা জাইনা আপনার কাম কী?’

‘সেটা তোমাকে আমার বলতে হবে?’ ধমক দিইনি, শান্ত ও দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছি। তাতেই কাজ হলো, আর কোনো কথা তো বললই না, এমনকি আমার দিকে আর তাকালও না। যখন দেখলাম দরজার কবাট ঠেলে দিচ্ছে, তখন আবার বললাম, ‘কাজটা করতে তোমাকে যখন যেতেই হচ্ছে, তাহলে আরেকটা কাজ করে এসো। ধাপ কটা টপকে ওই দালানের ভেতর ঢুকবে তুমি, দেখবে সিঁড়ির একপাশের দেয়ালে একটা বোর্ড আছে। ওই বোর্ডে লেখা আছে—কয়তলার কোন দিকে কে থাকে, নামসহ। তোমাকে জানতে হবে পাঁচতলার পেছন দিকের ফ্ল্যাট যিনি ভাড়া নিয়েছেন তাঁর নাম। সাবধান কিন্তু, ভুল নাম এনে দিয়ো না। আরেকটা কথা, কাজটা করার সময় কেউ যেন তোমাকে দেখে না ফেলে।’

নসিব এরপর যা বলল, অন্য কোনো সময় হলে রেগে যেতাম আমি। কিন্তু ওর সাহায্য খুব দরকার আমার, কাজেই ওর ওপর রাগ করাটা বোকামি হবে ভেবে চুপ করে থাকলাম।

কামরায় ফিরে এসে নসিব বলল, ‘স্যার, এতক্ষণ ধইরা আপনে আমারে কী কইলেন, আমি তো কিছুই বুজলাম না। ফিততে কন।’

বলেছি, রাগলাম না। ভুল বলেছি। বেশ ভালো রাগই হলো আমার, তবে চেপে রাখলাম। কী করতে হবে আবার তাকে আমার বুঝিয়ে বলতে হলো।

বিড়বিড় করতে করতে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে, শুনে মনে হলো—এ রকম কিছু বলল, ‘হারা দিন শুইয়ে-বইসে থাওন ছাড়া যার কুনো কাম নাই, হের মাতায় তো এগুলানই আইব-যাইব...।’ দরজা বন্ধ হলো, আমিও নড়েচড়ে বসে চিন্তার জগতে ঢুকলাম।

 নিজেকে আমি প্রশ্ন করলাম : এটা-সেটা ধরে নিয়ে বিরাট দৈত্যাকার ঠিক কী জিনিস দাঁড় করাতে চাইছ তুমি? এসো দেখি কী কী আছে তোমার। থাকার মধ্যে আছে ছোটখাটো কটা জিনিস, যেগুলো মেকানিজমের সঙ্গে যায় না, কোথাও কী এক-আধটু ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। (১) প্রথম দিন ওই ফ্ল্যাটের সব আলো সারা রাতই জ্বালানো ছিল। (২) লোকটা সাধারণত যে সময় বাড়ি ফেরে, দ্বিতীয় রাতে তার চেয়ে অনেক পরে ফিরেছে। (৩) সে তার টাই খোলেনি। (৪) স্বামীকে দরজা খুলে দিতে আসেনি বউটা, বা তার সঙ্গে সঙ্গে বেডরুম থেকেও বেরিয়ে আসেনি—যে রাতে সন্ধে থেকে ভোর পর্যন্ত সব আলো জ্বলেছে, সেদিন সন্ধে থেকেই মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছে না। (৫) স্ত্রীর ট্রাংকে স্ত্রীর জিনিসপত্র ভরার কাজ শেষ করার পর মদ খেয়েছে লোকটা। কিন্তু পরদিন সকালেও নির্জলা মদ খেতে দেখা গেছে তাকে, স্ত্রীর ট্রাংক লোক মারফত কোথাও পাঠিয়ে দেওয়ার পর। (৬) লোকটা ভেতরে ভেতরে গভীর উদ্বেগের মধ্যে আছে, মনে একবিন্দু শান্তি নেই, সব সময় অন্যমনস্ক, অথচ এগুলো চাপা দিয়ে একটা অস্বাভাবিক এবং অন্য রকম দুশ্চিন্তা তার বাইরের চেহারায় ফুটে উঠতে দেখা গেছে, যখন সে জানালা দিয়ে বাড়ির পেছন দিকে তাকায়। (৭) বৈঠকখানায় ঘুমিয়েছে সে, বেডরুমের ধারেকাছেও যায়নি, ট্রাংকটা পাঠিয়ে দেওয়ার আগের রাতে।

বেশ, ভালো। প্রথম রাতে বউটা যদি অসুস্থ থেকে থাকে, এবং স্বামীটা যদি তাকে বিশ্রাম নিতে বা চিকিৎসা নিতে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে আপনা-আপনি এই পয়েন্টগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে—১, ২, ৩ ও ৪। এর ফলে ৫ আর ৬ পুরোপুরি গুরুত্ব হারায়, এবং এই দুটি পয়েন্টে ওই লোকের আচরণ কোনো ধরনের ক্রাইমের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ৭ নম্বর পয়েন্টে এসে শক্ত ধাক্কা খেতে হলো।

প্রথম রাতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর যদি দেরি না করে ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে মেয়েটা, তাহলে কাল রাতে কেন বেডরুমে শোবে না লোকটা? ভাবাবেগ? বিশ্বাস করা কঠিন। একটা কামরায় দুটি খুব ভালো বিছানা রয়েছে, আরেক কামরায় রয়েছে শুধু একটা সোফা কিংবা আরামদায়ক নয় এমন ইজি চেয়ার। কেন সে নিজেদের বেডরুম বাদ দিয়ে ওখানে রাত কাটাল, পুরনো দৃশ্যটা যদি এরই মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গিয়ে থাকে? শুধু এই কারণে যে স্ত্রীকে মিস করছিল, এবং নিঃসঙ্গ বোধ করছিল? পরিণত একজন মানুষ এ রকম আচরণ করে না। ঠিক আছে, বউটা তাহলে এখনো ওখানে আছে।

ঠিক এই সময় ফিরে এলো নসিব, বলল, ‘বিল্ডিংডার নাম্বার পাঁচশত পঁচিশ, দেলওয়ার ইভিনিউ, চাইরতালার পিছন দিক। ওহানে লিখা আছে জনাব মোস্তাক আলি।’

‘শ্শ্শ্।’ চুপ করিয়ে দিলাম তাকে, হাতের ইঙ্গিতে বেরিয়ে যেতে বললাম আমার কামরা থেকে।

‘পয়লা কইলেন চাই, অহন কইতাছেন চাই না।’ দার্শনিক একটা ভাব নিয়ে বিড়বিড় করতে করতে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল নসিব। তাকে এখন নিজের কাজে ব্যস্ত থাকতে হবে বলে দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে গেল।

আমি আবার আমার খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করলাম। কিন্তু বউটা যদি এখনো ওখানে থাকে, যদি ধরে নিই কাল রাতে ওই বেডরুমে শুয়েছে সে, তাহলে তো তার গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠে না, কারণ আজ আমি তাকে চলে যেতে দেখিনি। কাল খুব ভোরে হলে আলাদা কথা, তখন আমি জানালার সামনে ছিলাম না, কাজেই কিছু দেখার সুযোগ আমার হয়নি। আমার মনে আছে, কয়েকটা ঘণ্টা পাহারায় থাকতে পারিনি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আজ সকালে আমার ঘুম ভেঙে গেছে ওই লোকেরও ঘুম ভাঙার আগে। কিছুক্ষণ হলো, জানালায় বসে ছিলাম। এই সময় আমি তাকে সোফা বা ইজি চেয়ার থেকে মাথা তুলতে দেখেছি।

মেয়েটা যদি চলে গিয়ে থাকে, তাহলে তাকে যেতে হয়েছে গতকাল সকালে। তাহলে লোকটা তাদের বেডরুমের জানালার পর্দা সরায়নি কেন? তোশক আর গদিও নাড়াচাড়া করল আজ, আরো আগে কেন করেনি? সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কাল রাতে বেডরুম থেকে কী কারণে দূরে সরে ছিল সে? এটাই হলো প্রমাণ যে বউটা ফ্ল্যাট ছেড়ে কোথাও যায়নি, এখনো ওখানে আছে। তারপর আজ, ট্রাংকটা চলে যাওয়ার পরপরই, বেডরুমে ঢুকল সে, জানালার পর্দা সরাল, বিছানার তোশক আর গদি ওল্টাল, যা থেকে বোঝা গেল, মেয়েটা ওখানে ছিল না। জটিল একটা ধাঁধার মতো লাগছে ব্যাপারটা।

না, তা-ও নয়। ট্রাংক চলে যাওয়ার পরপরই...

ট্রাংকটা।

ওটাই রহস্যের চাবিকাঠি।

চারদিকে ভালো করে তাকালাম এটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য যে আমার আর নসিবের মাঝখানে দরজাটা আঁট করে লাগানো কি না। হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ল্যান্ডফোনটা ধরার পরও ইতস্তত করছি। ঢিল ছোড়ার আগে আমার কি আরেকটু চিন্তা করা দরকার? কথাটা আমি যেকোনো মানুষকে বলতে পারব না, আমার চেনাজানার মধ্যে বলার মতো মানুষ একজনই আছে—কাজী আসাদ। আসাদ ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চে চাকরি করে, হোমিসাইড ডিভিশনে আছে। অন্তত শেষবার তার সঙ্গে যখন আলাপ হয়েছিল, তখন তা-ই ছিল। তাকেই আমার পেতে হবে, অন্য কাউকে নয়। সে যদি চাকরি ছেড়ে দিয়ে থাকে, বা আমাকে গুরুত্বের সঙ্গে না নেয়, তাহলে অজ্ঞাতনামা হিসেবে পুলিশকে ফোন করে নিজের কর্তব্য যতটুকু সাধ্য সারব, তার বেশি কিছু করতে পারব না—সোজা কথা। পুলিশ কর্মকর্তারা হরদম আসবেন, যাবেন, আমাকে এক হাজার একটা প্রশ্ন করবেন, বলবেন চলুন শনাক্ত করতে হবে, সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার জন্য তৈরি থাকবেন—নো, নেভার। যতটুকু জড়িয়েছি তার বেশি জড়াতে চাই না আমি। আমি চাইছি মাছটা ধরা পড়ুক, কিন্তু পানিতে না নেমে।

প্রথমবার রিং হলো; কিন্তু ফোন ধরল না আসাদ। দশ মিনিট পর আবার করলাম। বলা হলো, আমি যাকে ফোন করেছি সে ব্যস্ত। আরো দশ মিনিট পর আবার ডায়াল করলাম। এবার পেলাম ওকে।

‘শোন রে, আসাদ? আমি নুরুল ইসলাম...’

‘নুরুল? এই ব্যাটা আমি তো মাত্র একজন নুরুলকেই চিনি, বাষট্টি বছর ধরে যার কোনো খবর পাই না, তুই কি সেই অভাগা?’ বেশ বুঝতে পারলাম, তার ভেতর আগ্রহ আর উত্তেজনা তরতর করে বাড়ছে।

‘এসব নিয়ে পরে কথা বলা যাবে। এখন যেটা চাইছি, আমি বলি, তুই লেখ—একটা নাম আর ঠিকানা। তুই তৈরি তো? মোস্তাক আলি, ৫২৫ দেলওয়ার এভিনিউ, নন্দীপাড়া, মাদারটেক, বাসাবো। পাঁচতলা, পেছন দিক। লিখেছিস?’

‘পাঁচতলা, পেছন দিক। হ্যাঁ। এটা কী জন্য?’

‘তদন্ত। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে যদি খুঁড়তে শুরু করিস, ওখানে তুই একটা হত্যাকাণ্ড আবিষ্কার করবি। যতটুকু দেওয়ার দিয়েছি, আরো কিছু পাওয়ার আশায় কল করবি না—এটা আমার স্রেফ একটা শক্ত বিশ্বাস। ওখানে এক লোক আর তার স্ত্রী বসবাস করছিল, এই দুদিন আগে পর্যন্ত। এখন সেখানে শুধু লোকটা আছে। আজ সকালে সে তার স্ত্রীর ট্রাংক লোক মারফত কোথাও পাঠিয়ে দিয়েছে। তুই যদি এমন কাউকে খুঁজে পাস যে নিজের চোখে মেয়েটাকে নিজে থেকে ওই দালান থেকে বেরিয়ে যেতে দেখেছে...’

গলা চড়িয়ে কথাগুলো বলার সময় মাথায় থাকল যে এসব আমি একজন অভিজ্ঞ ডিটেকটিভকে বলছি, এমনকি আমার নিজের কাছেও মনে হলো ভঙ্গুর, ঠুনকো, একেবারেই ধোপে টেকার মতো নয়।

আসাদকে আমি বলতে শুনলাম, ‘বেশ, কিন্তু...’ তারপর তাকে যেভাবে দেওয়া হয়েছে সেভাবেই ব্যাপারটা গ্রহণ করল সে। তার কারণ, সোর্সটা আমি।

আমি এমনকি আমার জানালাকেও এতটুকু জড়াইনি। এটুকু আমি আসাদের সঙ্গে করতে পারি, জানি করে পারও পাব, কারণ সে আমাকে বহু বছর ধরে চেনে, আমার ওপর নির্ভর করা নিয়ে তার মনে কোনো প্রশ্ন জাগবে না। আমি চাই না, এই ভাপসা গরমের মধ্যে আমার ঘরে ঢুকে পড়ুক একঝাঁক পুলিশ আর ডিটেকটিভ, তারপর পালা করে ওই লোকের জানালায় নজর রাখতে বসে যাক। ওদের যা করার ওরা সামনের দিক থেকে করুক।

‘ঠিক আছে, দেখা যাক কতটুকু কী করতে পারি আমরা।’ বলল আসাদ। ‘যদি কিছু জানানোর থাকে, সময়মতোই তুই তা জানতে পারবি।’

‘গুড’ বলে লাইন কেটে দিলাম, চেয়ারে হেলান দিয়ে আবার শুরু করলাম নজর রাখার কাজ। এখন স্রেফ অপেক্ষার পালা, পুলিশি তৎপরতা শুরু হতে বেশ অনেকটা সময় লাগবে।

আমার এই আসনকে স্টেডিয়াম বা রেসকোর্সের সবচেয়ে ভালো বসার জায়গার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে—একটা গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড সিট। না, বরং বলা উচিত উল্টো করা একটা গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড সিট। আমি শুধু দৃশ্যগুলো দেখতে পাব পেছন থেকে, সামনে থেকে নয়। কাজী আসাদ নিজে আসবে কি না, এলে কিভাবে কী করবে, তার কিছুই আমি দেখতে পাব না। আসলে আমি দেখতে পাব শুধু রেজাল্ট, যখন বা যদি কিছু আদৌ তৈরি হয়।

পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা কিছুই ঘটল না। পুলিশের তৎপরতা সব সময় অদৃশ্য থাকে বলে জানি, আর সেটাই হওয়া উচিত। প্রথমে, নামেমাত্র হলেও, ফিল্ড ওয়ার্ক দরকার হবে ওদের। নাম আর ঠিকানা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার ব্যাপার আছে। লোকটার পরিচয় জানার ব্যাপার আছে। এলাকার সোর্সকে সঙ্গে রাখতে হতে পারে।

ওদিকে পাঁচতলার জানালায় মানুষের মূর্তিটা এখন পর্যন্ত আমার দৃষ্টিপথেই রয়েছে, একা, এবং কেউ তাকে বিরক্ত করছে না। লোকটা বাইরে বেরোচ্ছে না। ব্যাপারটা আমাকে বিস্মিত করছে। তবে তার মধ্যে একটা অস্থিরতা শুরু হয়েছে, কী কারণে বলতে পারব না, এক কামরা থেকে আরেক কামরায় আসা-যাওয়া করছে, এক জায়গায় কোথাও বেশিক্ষণ বসছে না। তবে আবার ফ্ল্যাট ছেড়ে কোথাও যাচ্ছেও না।

একবার তাকে আমি খেতে দেখলাম। সে জন্য তাকে বসতে হলো। আরেকবার দেখলাম, দাড়ি কামাচ্ছে। একসময় এমনকি খবরের কাগজও পড়ার চেষ্টা করতে দেখলাম, তবে চেষ্টাটা সফল হলো বলে মনে হয় না, একটু পরই রেখে দিল সেটা।

আমি জানি, ছোট ছোট সব অদৃশ্য চাকা তাকে ঘিরে ঘুরতে শুরু করেছে। এখনো ছোট আর অক্ষতিকর, প্রাথমিক অবস্থায়। মনে প্রশ্ন জাগল, তার যদি জানা থাকত কী ঘটতে চলেছে, তাহলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতো? সে কি শান্ত আর স্থির থাকত, নাকি পালানোর চেষ্টা করত? সেটা তার অপরাধবোধের ওপর নির্ভর না-ও করতে পারে। নির্ভর করবে নিজেকে কতটা নিরাপদ বা ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে মনে করছে। আমি ওদের বোকা বানাতে পারব, এই বিশ্বাসের বড় একটা ভূমিকা থাকবে। তার অপরাধ সম্পর্কে আমি তো আগেই নিশ্চিত হয়েছি, তা না হলে যে পদক্ষেপ নিয়েছি, সেটা নিতাম না।

বিকেল তিনটায় আমার ফোন বাজল। আসাদ কল করেছে। ‘নুরুল? শোন, মানে আমি জানি না। তুই কি আরেকটু বলতে পারবি, ওই রকম ন্যাড়া ধরনের বিবৃতি বাদে?’

‘কেন?’ আমি বেড়া তৈরি করলাম। ‘তা আমাকে কেন বলতে হবে?’

‘তদন্ত করতে ওখানে এক লোককে পাঠানো হয়েছে। এইমাত্র আমি তার রিপোর্ট পেলাম। ওই বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার ছাড়াও কয়েকজন প্রতিবেশী একমত হয়ে জানিয়েছে, ওই ফ্ল্যাটের মহিলা তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন—সেটা গতকাল খুব ভোরের ঘটনা।’

‘এক মিনিট। ওদের কেউ কি মহিলাকে নিজের চোখে চলে যেতে দেখেছে? তোর লোকের ভাষ্য কী বলে?’

‘না।’

‘তাহলে তুই যে বিবৃতি পেয়েছিস, সেটা সেকেন্ড হ্যান্ড ভার্সন এবং সেটা তোর ওই লোকের দ্বারা সমর্থিতও নয়। প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ বলা যাচ্ছে না।’

‘তার সঙ্গে ওদের দেখা হয়েছে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে ফেরার সময়। টিকিট কেটে স্ত্রীকে ট্রেনে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরে আসছিল।’

‘তার পরও এটা অসমর্থিত তথ্য, সত্যি কি না জানা যাচ্ছে না। মহিলাকে চাক্ষুষ বিল্ডিং থেকে বেরোতে দেখেছে বা ট্রেনে চড়তে দেখেছে, এমন প্রত্যক্ষদর্শী পেতে হবে তোকে।’

‘সে রকম কেউ হয়তো নেই, কাজেই কাউকে পাওয়া যাবে না। কমলাপুরে আমি লোক পাঠিয়েছি, কাউন্টারে খোঁজ নেবে সে, যদি সম্ভব হয় তাহলে জানার চেষ্টা করবে—একা কোনো মহিলার জন্য কোনো সিট রিজার্ভ করা হয়েছে কি না। লোকটারও চেহারার বর্ণনা দেবে সে। টিকিট বিক্রির সময় কাউন্টারের কারো মনে থাকতে পারে। অত ভোরে তাকে তো লোকের চোখে লাগবে।’

‘গুড। আমি খুশি। আর ওই লোক? সে কী করছে খবর রাখছিস কি?’

‘অবশ্যই তাকে আমরা নজরদারির মধ্যে রেখেছি। কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, সব আমরা জানতে পারব। প্রথম সুযোগ পাওয়া মাত্র তাদের ফ্ল্যাট সার্চ করা হবে, সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’

আমার অনুভূতি বলছে, যতই তল্লাশি করা হোক, ওখানে কিছু পাওয়া যাবে না। ওই লোক অত বোকা নয় যে নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণগুলো বাড়িতে রেখে দেবে।

আসাদকে আমি বললাম, ‘শোন ভাই, তুই আমার কাছ থেকে এর বেশি কিছু আশা করবি না। গোটা ব্যাপারটা আমি তোর কোলের ওপর ফেলে দিয়েছি। আমার যা যা দেওয়ার ছিল, সব দেওয়া হয়ে গেছে। একটা নাম, একটা ঠিকানা, একটা মত।’

‘হ্যাঁ, ঠিক আছে। আর আমিও এর আগে তোর মতের খুব বেশি মূল্য দিয়েছি, কিন্তু এখন, নুরুল...’ ‘তার মানে এখন তুই আর আমার মতের মূল্য দিচ্ছিস না? এই কথা বলতে চাইছিস?’

‘একেবারেই না, আর তুইও সেটা জানিস। তবে বাস্তবতা হলো, আমরা এখন পর্যন্ত এমন কিছু পাইনি, যা দেখে বুঝতে পারব, তোর মতের তাৎপর্য আছে।’

‘বুঝতে হলে তোদের হয়তো তদন্তটা আরো এগিয়ে নিতে হবে। খুব বেশি সময় তো এখনো পার হয়নি। এটা নিয়ে একটু লেগে থাক, তারপর দেখ কী হয়।’

‘হ্যাঁ, সেটা করার কথাই ভেবেছি আমি। অবশ্যই লেগে থাকব আমরা। ঠিক আছে, দেখা যাক। আমি তোকে পরে জানাব।’

আরো এক-দেড় ঘণ্টা পার হলো। এবার সূর্য ডুববে। লোকটাকে দেখলাম, বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্যান্ট পরল, ইন করে শার্ট পরল, গলায় টাই বাঁধল। প্যান্টের পকেটে হাত ভরে এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। কে জানে, হয়তো হাতে সোনার গয়না নাড়াচাড়া করছে। আমার ভেতর একটা অদ্ভুত ধরনের চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। কারণ জানি লোকটা ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশের লোকজন ঢুকে পড়বে ওখানে। শুধু যে উত্তেজিত হচ্ছি তা না, আমার ভেতর একটা গাম্ভীর্যও চলে এসেছে। লোকটা চারদিকে চোখ বোলাচ্ছে দেখে ভাবলাম, ব্রাদার, তোমার যদি কিছু গোপন করার থাকে তো এখনই সেটা লুকানোর শেষ সময়।

চলে গেল সে। ফ্ল্যাটের ভেতর নেমে এলো শূন্যতায় ভরা রুদ্ধশ্বাস বিরতি, যেটা অনেক ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে। এখন আমাদের দালানে আগুন লাগার অ্যালার্ম বেজে উঠলেও ওই জানালাগুলো থেকে আমার চোখ দুটো কেউ সরাতে পারবে না। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি, কখন পুলিশের লোক ঢুকবে ওখানে। লোকটা চলে যাওয়ার পর এক কি দেড় মিনিট মাত্র পার হয়েছে, এই সময় একটা দরজা একটু ফাঁক হলো। এই দরজা দিয়েই বেরিয়ে গেছে লোকটা। একটু একটু করে আরো খুলল দরজার কবাট, একজনের পেছনে আরেকজন, মোট দুজন লোক ঢুকল, দুজনই সাদা পোশাকে। যাক, পৌঁছে গেছে ওরা। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল তাদের একজন। তারপর তারা আলাদা হয়ে গেল, এবং যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠল। একজন ঢুকল বেডরুমে, একজন কিচেনে, কাজ করতে করতে পরস্পরের দিকে এগোচ্ছে।

যেভাবে তল্লাশি করা হয়, দক্ষতার সঙ্গে সেভাবেই তা করা হলো। কাজটা তারা শেষ করল, দুজন এক জায়গায় চলে এসে পরস্পরের দিকে হতাশ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে, অর্থাৎ সন্দেহ করার মতো কিছুই তারা পায়নি, এই সময় দুজনকেই প্রায় চমকে উঠতে দেখলাম। একজন তার পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে দেখল। ফ্ল্যাটের লোকটা ফিরে আসছে, এ সম্ভবত তারই ওয়ার্নিং কল। মোবাইল পকেটে ভরতে ভরতে ফ্ল্যাট ছেড়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ল তারা।

তবে আমি কিন্তু আচমকা হতাশ হইনি, আমার ধারণা ছিল, এ রকম কিছু একটা ঘটবে। আমার নিজের অনুমান ছিল, পুলিশ ওখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাবে না, যেটা দিয়ে ওই লোকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দাঁড় করানো যাবে। এমনকি কঠিন জেরার মুখে পড়তে হতে পারে, এমন কোনো ভুল ওই লোকের করার কথা নয়। অত্যন্ত সতর্ক লোক, কী করছে না করছে তা খুব ভালো করে জানে। তার ধারণা, সবগুলো দিক কাভার করা আছে তার, কাজেই ফেঁসে যাওয়ার কোনো ভয় নেই। আসল জিনিসটা তো ছিল ওই ট্রাংকে, সেটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এক হাতের ভাঁজে অনেক বাদামি কাগজের ব্যাগ নিয়ে ফ্ল্যাটে ফিরল লোকটা। চোখ সরু করে চেয়ে থেকে তার হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছি, জানা দরকার তার অনুপস্থিতিতে ঘরে লোকজন আসার ব্যাপারটা ধরতে পারছে কি না। হাঁটাচলায় আড়ষ্ট কোনো ভাব দেখছি না, হঠাৎ কোথাও থেমে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেও না, অর্থাৎ কিছু সন্দেহ করছে না। সাদা পোশাকে পেশাদার লোক ছিল ওরা।

বাকি রাত ফ্ল্যাটেই থাকল লোকটা। গ্যাঁট হয়ে বসে আছে, নিরাপদে এবং শান্তিতে। যেন সে রকম কোনো ইচ্ছা নেই, হঠাৎ খেয়াল হয়েছে মাত্র, এ রকম একটা ভাব নিয়ে গ্লাসে মদ ঢেলে দুই ঢোক খেল। ঘরে আলো জ্বলছে, বসে আছে জানালার ধারে, কাজেই আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি; দেখতে পাচ্ছি তার হাত খানিক পর পর মুখের কাছে উঠছে আর নামছে। খাচ্ছে ঠিকই, তবে খুব বেশি নয়। আপাতদৃষ্টিতে সব কিছু নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে, টেনশন এখন খুব কম, বিশেষ করে এখন যেহেতু ট্রাংকটা পাঠিয়ে দেওয়া গেছে।

রাত জেগে তার ওপর চোখ রাখছি, ভাবছিও তার কথাই : লোকটা ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে না কেন? তার সম্পর্কে আমার ধারণা যদি সত্যি হয়, এবং আমি জানি সত্যি, এত বড় একটা ক্রাইম যেখানে ঘটিয়েছে সে, সেই অকুস্থলে কী কারণে পড়ে আছে? এটার সহজ আর স্বাভাবিক উত্তর, সে জানে না তার পেছনে লোক লেগেছে। এটা তার মনে হচ্ছে না যে কোনো রকম তাড়াহুড়া করার দরকার আছে। বরং বেশি তাড়াতাড়ি কেটে পড়লে, বউ চলে যাওয়ার পরপরই, সেটা হয়ে উঠতে পারে কিছুটা সময় এখানে থেকে যাওয়ার চেয়ে বেশি বিপজ্জনক। আবার নিজেকে মনে করিয়ে দিলাম, লোকটা যা করছে ভেবেচিন্তেই করছে, তাকে বোকা মনে করা উচিত হবে না।

রাত দীর্ঘ হচ্ছে। আমি এখানে বসে অপেক্ষা করছি, কখন ফোন করবে আসাদ। জানি এখনো সময় হয়নি, আরো বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু আমাকে চমকে দিয়ে ফোন একটা এলো। তাড়াতাড়ি রিসিভার তুললাম, দেখলাম আসাদই কল করেছে।

একদিকে আসাদ ফোন করেছে, আর ওদিকে দেখতে পাচ্ছি ফ্ল্যাটের ওই লোক ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিচেনে ছিল সে, সম্ভবত একটা টুল বা চেয়ারে বসে চুমুক দিচ্ছিল গ্লাসে। এবার সে সিধা হলো, আলো নেভাল কিচেনের। ওখান থেকে বেরিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকতে দেখলাম তাকে, আলো জ্বলল ওখানে। বেল্টের নিচে থেকে টেনে শার্টের কিনারা বের করতে দেখলাম। আমার চোখ তার ওপর, আর আমার কানে আসাদের গলা। ত্রিভুজ আয়োজন।

‘হ্যালো, নুরুল? শোন, এক্কেবারে কিচ্ছু না। ভদ্রলোকের অনুপস্থিতিতে ফ্ল্যাটটা আমরা সার্চ করেছি...’

‘সার্চ করেছিস আমি জানি, আমি দেখেছি’—কথাটা বলিনি, তবে বলে ফেলতে যাচ্ছিলাম। সময়মতো নিজেকে সামলে নিতে পেরেছি।

‘...কিন্তু সন্দেহ করার মতো কিছুই পাওয়া যায়নি...।’ আসাদ থামল, ভঙ্গিটা এমন, যেন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে যাচ্ছে। আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি কী বলে শোনার জন্য।

‘বিল্ডিংয়ের নিচে, লেটারবক্সে, আমরা একটা পোস্টকার্ড পেয়েছি, যেটা ওই ব্যক্তির নামে, মানে মোস্তাক আলির নামে পাঠানো হয়েছে। লেটারবক্সে তালা দেওয়া ছিল, কাছেপিঠে বিল্ডিংয়ের কেয়ারটেকার লোকটাকেও পাওয়া যাচ্ছিল না, অগত্যা পিন বাঁকা করে ওটাকে লেটারবক্স থেকে বের করা হয়েছে।’

‘পোস্টকার্ড? এই যুগে? মানুষ এখনো চিঠি লিখছে, ডাকবাক্সে ফেলার জন্য?’ আমি সত্যি হতভম্ব।

‘চিঠি নয়, পোস্টকার্ড।’

‘ওই একই জিনিস।’

‘হ্যাঁ, চিঠি লেখার অভ্যাস এখনো কিছু মানুষের মধ্যে আছে, শুধু তুই খবর রাখিস না।’

‘এবং?’

“ওই পোস্টকার্ড তাঁকে পাঠিয়েছেন তাঁর স্ত্রী, মিসেস চামেলি মোস্তাক, কুমিল্লার কোনো এক সীমান্তসংলগ্ন গ্রাম থেকে, এবং সেটা লেখা হয়েছে মাত্র গতকাল। পোস্টকার্ডে যে মেসেজ পাওয়া গেছে, সেটা আমরা কপি করেছি। পড়ছি শোন, ‘চিন্তা কোরো না, ঠিকঠাকমতো পৌঁছেছি। এখানে আসতে না আসতে আগের চেয়ে একটু ভালো বোধ করছি। নিজের যত্ন নিয়ো। দোয়া করি ভালো থেকো। তোমার চামেলি।’”

আমি বললাম, নিচু গলায়, তবে জেদের সুরে, ‘তুই বললি, ওটা লেখা হয়েছে মাত্র গতকাল। তোর কাছে তার কোনো প্রমাণ আছে? ওটায় পোস্টমার্ক ডেট কী, দেখেছিস?’

আসাদ তার টনসিলের কাছাকাছি কোথাও কিছু শব্দ তৈরি করল, যেগুলো বিতৃষ্ণা ছাড়া উৎপন্ন হয় না। ওটাকে লক্ষ করে নয়, আমাকে লক্ষ করে। ‘পোস্টমার্ক ঝাপসা পেয়েছি আমরা। যেভাবেই হোক, ওটার একটা কোণ ভিজে গিয়েছিল, ফলে কলমের কালি লেপ্টে গেছে।’

 

‘সবটুকু ঝাপসা?’

‘শুধু বছরটা।’ আসাদ বলল, ‘কোন মাস, আর দিনের কোন সময়, এগুলো পড়া যাচ্ছে। আগস্ট মাস, সন্ধের দিকে পোস্ট করা হয়েছে।’

এবার আমার গলার ভেতর বিতৃষ্ণার বাহক তৈরি হলো। ‘আগস্ট, সন্ধের দিকে...কিন্তু বছর? ১৭, ১৮, নাকি ১৯? তোদের কাছে এরও কোনো প্রমাণ নেই যে ওই পোস্টকার্ড ওখানে কিভাবে এলো, পোস্ট অফিস থেকে একজন ডাকপিয়ন এসে লেটারবক্সে রেখে গেছে, নাকি কোনো দেরাজ থেকে পুরনো একটা পোস্টকার্ড তুলে এনে ওখানে রেখে গেছে মহিলার স্বামী, পানি দিয়ে কিছু তথ্য ঝাপসা করে দিয়ে?’

‘বাদ দে, নুরুল।’ জবাবে বলল আসাদ। ‘বাড়াবাড়ি বলে একটা ব্যাপার আছে, ওটাকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না।’

‘কী বলতে চাইছিস, বল তো? তোর সত্যি সত্যি মনে হচ্ছে আমি বাড়াবাড়ি করছি?’

আমি যতই সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করি না কেন,

আসাদ তাতে পানি ঢেলে দিচ্ছে। আমার প্রশ্নের উত্তর দিল না, স্রেফ চুপ করে থাকল। আমি চিন্তা করছি, আর আসাদ বোধ হয় চাইছেও তা-ই যে আমি মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করি। কিন্তু চিন্তা করা হলো না আমার। কারণ আমার চোখ তো রয়েছে উল্টো দিকের বহুতল ভবনের ওই ফ্ল্যাটের ভেতর, মোস্তাক আলির ওপর। আমার তরফ থেকে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে শুনে আমি যতই আসাদের ওপর বিরক্ত হই বা চোটপাট দেখাই না কেন, সত্যি কথা বলতে কি, পোস্টকার্ডের কথাটা শুনে আমি একটা ঝাঁকি খেয়েছি, প্রকাশ্যে আমি সেটা স্বীকার করি বা না করি। যা-ই হোক, আমি ওই লোকের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। শার্টটা গা থেকে খোলার পরপরই আলো নিভিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু বেডরুমের আলো জ্বলল না। বৈঠকখানায় দিয়াশলাইয়ের একটা কাঠি জ্বলল, জানালার একেবারে নিচের দিকে, সে সম্ভবত ইজি চেয়ারে কিংবা সোফায় বসেছে।

বেডরুমে দুটি খালি বিছানা থাকা সত্ত্বেও লোকটা বৈঠকখানার চেয়ার বা সোফায় শুয়ে রাত কাটাবে।

‘আসাদ’, ঠাণ্ডা গলায় ওকে বললাম, ‘অন্য কোনো গ্রহ থেকে কি পোস্টকার্ড উদ্ধার করেছিস, আমার তাতে কোনো আগ্রহ নেই। আমার কথা বুঝতে পারছিস কি না? এটা আমি একেবারে গ্রাহ্যই করতে চাইছি না। আর আমি শুধু তোকে এই একটা কথা মনে রাখতে বলছি, ওই লোক তার স্ত্রীকে নিয়ে কিছু করেছে! এখানে কিছু করেছে মানে তাকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে। ওই ট্রাংক, যেটা ওই ফ্ল্যাট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, ওটা খুঁজে বের কর তোরা। তারপর খোল, দেখবি, তোরা ওই মহিলাকে পেয়ে গেছিস।’

উত্তরে আসাদ কী বলবে আমি জানি না, জানার খুব একটা ইচ্ছাও নেই, ফোন কেটে দিলাম তাই। কাটার পর আড়ষ্ট হয়ে আছি, রিসিভারের ওপর চোখ, জানি আসাদ ফোন করতে পারে। তবে না, তার ফোন এলো না। আর আসাদের ফোন না আসার মানে, আমি ধরে নিতে পারি, আমার সাজেশন হালকাভাবে নেয়নি সে। এতক্ষণে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়ে গেছে, যাও, বাক্সটার খোঁজ করো, পেলে খুলে দেখো কী আছে ভেতরে।

জানালার পাশে সারা রাত বসে থাকলাম, আমি যেন একটা লাশ পাহারা দিচ্ছি। আগেই একবার দিয়াশলাই জ্বলতে দেখেছি, ওই রকম আরো দুবার জ্বলতে দেখলাম, এই ধরুন আধাঘণ্টা করে ব্যবধান রেখে। ব্যস, আর কিছু না। কাজেই লোকটা সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছে ওখানে। কিংবা তা না-ও হতে পারে। তবে আমারও ঘুম দরকার, কমবেশি যা-ই হোক। চোখ বুজতে একটু পরই ঘুমিয়ে পড়লাম। সেটা ভাঙল সূর্য ওঠার কাছাকাছি সময়ে। আমার মনে আর মাথায় আবার ওই লোক চলে এলো, সে-ই যেন এখন আমার একমাত্র কাজ। ভাবলাম, যা-ই তাকে করতে হোক না কেন, সেটা সে অন্ধকারের ভেতর করেছে, দিনের আলো ফোটার জন্য অপেক্ষা করেনি। কাজেই আমার খুব বেশি কিছু দেখার আছে বলে মনে হয় না। অন্তত আপাতত।

কথা বলার কেউ নেই, আমি একা মানুষ, তাই নিজের সঙ্গে আলাপ করি। প্রশ্ন করলাম, রাতের অন্ধকারে কী কাজ করতে পারে লোকটা? কেন আমি ভাবছি রাতে করবে বলে কোনো কাজ রেখে দিয়েছিল সে? না, অনেক ভেবেও আমি তার কোনো কাজ খুঁজে পেলাম না, যেটা সে রাতে করবে বলে রেখে দিয়েছিল, আর রাতেই করেছে।

রাতে যদি তার যা করার করা হয়ে গিয়ে থাকে, দিনের বেলা তার হাতে সে রকম কিছু নেই। এত সকাল সকাল পুলিশের তরফ থেকেও কিছু ঘটবে বলে মনে হয় না। আমাকে আসলে ধৈর্যের সঙ্গে গ্যাঁট হয়ে বসে থাকতে হবে, সময়কে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দিয়ে।

মনে হলো যেন পাঁচ মিনিট পর নসিব ঘরে ঢুকে আমাকে একবার ছুঁল, আসলে সময়টা এখন মধ্যদুপুর। বিরক্ত বোধ করলাম, তাকে বললাম, ‘এটা কী রকম আক্কেল তোমার, নসিব? দরজার গায়ে নোটটা তুমি দেখোনি, লিখে রেখেছি তোমার কাজ শেষ হয়ে গেলেও আমার ঘুম ভাঙাবে না?’

নসিব দেখলাম হাসি চেপে রেখেছে। ‘কী কন, স্যার! আমার এত সাহস অইবনি যে মানা করলেও আপনের ঘুম ভাঙামু। আপনের এক বন্ধু আইছেন, ইন্সপিক্টার আসাদ সাব। তিনিই তো কইলেন...’

সচকিত হতে হলো। আসাদ দেখছি নিজে চলে এসেছে। ডাকতে হলো না, আমার ঘরে ঢুকে পড়ল আসাদ। তার চেহারাই অনেক কথা বলছে। আমার প্রতি একবিন্দু খুশি নয়। কিন্তু কেন?

নসিবকে এখান থেকে সরানো দরকার, তাই তাকে বললাম, ‘কিচেনে যাও, নসিব, দেখো অতিথির জন্য কি নাশতার ব্যবস্থা করতে পারো।’

আসাদও নসিবের বিদায় হওয়ার অপেক্ষায় ছিল, সে কামরা থেকে বেরিয়ে যেতেই কঠিন আর নীরস গলায় বলল, ‘নুরুল, একটু ব্যাখ্যা করে বলবি তুই, আমাকে এ রকম বিড়ম্বনার মধ্যে ফেলার পেছনে ঠিক কী উদ্দেশ্য ছিল তোর? নিজেকে আমি বিরাট বোকা বানাতে পেরেছি, আর সে জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ পাওনা হয়েছে তোর। বুনো হাঁস ধরার জন্য আমি আমার লোকজনকে চারদিকে দৌড় খাটাচ্ছি। ভাগ্যটা আমার নেহাতই ভালো যে আরো অনেক কিছু করার থাকলেও সেসব আমি করিনি। ভাগ্যিস জেরা করার জন্য লোকটাকে আমি অফিসে ডেকে আনিনি, তাহলে তো...’

এখানে ওকে বাধা দিলাম, শুকনো গলায়, ‘ও, আচ্ছা, তার কোনো প্রয়োজন আছে বলে তোর মনে হয়নি?’

আমার দিকে এমন এক দৃষ্টিতে তাকাল সে, উত্তরটা পাওয়া হয়ে গেল। ‘ডিপার্টমেন্টে আমি একা নই, তোর সেটা বোঝা উচিত। আমি ছোট একজন অফিসার, আমার ওপর আরো অনেক বড় বড় অফিসার আছেন, তাঁদের কাছে আমাকে আমার অ্যাকশনের জন্য জবাবদিহি করতে হয়।’

‘কী হয়েছে, সেটা এখন বল।’

‘আগে শোন, আমি কী ফলস পজিশনে পড়েছি। তোর কথা শুনে দুজন লোককে কুমিল্লার সীমান্ত এলাকায় পাঠাতে হয়েছে আমাকে। তাদের আধাবেলা থাকতে হয়েছে ট্রেনে, তারপর নসিমনে চড়ে আরো অনেক ভেতরে ঢুকতে হয়েছে। ওদের পেছনে খরচ হয়েছে অনেক টাকা। কিন্তু ফলাফল?’

ফলাফল তো আসাদের জানার কথা, তাই না? অথচ চোখে প্রশ্ন নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে।

জানতে চাইলাম, ‘ট্রাংকটা তাহলে তোরা পেয়েছিস?’

‘না পাওয়ার তো কোনো কারণ নেই।’ আসাদের গলায় রাজ্যের বিরক্তি আর ঝাঁজ। ‘ওই ভদ্রলোক ওটা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে গ্রামে পাঠিয়েছেন।’

‘তোদের লোকেরা সেটা খুলেছে?’

‘কুরিয়ার সার্ভিসের অফিস কুমিল্লা শহরে, ট্রাংকটা সেখানেই ছিল, তখনো তারা ডেলিভারি দেয়নি। আমরা যোগাযোগ করতে তারা জানাল, আরো অন্তত দুই দিনে সেটা ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হবে না, কারণ হঠাৎ করে তারা লোকবলের সমস্যায় পড়েছে। তবে পুলিশ যদি ট্রাংকের চাবি নিয়ে তাদের অফিসে আসে, তাহলে ট্রাংক খুলে দেখতে পারে ভেতরে কী আছে। সেটাই করতে বাধ্য হয়েছি আমরা। ওই ভদ্রলোকের স্ত্রী লোকমুখে কিছু শুনে থাকবেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তিনি স্বেচ্ছায় আমাদের লোকজনের সঙ্গে কুমিল্লা শহরে আসতে রাজি হয়েছেন। এসেছেনও এবং নিজের কাছে থাকা চাবি দিয়ে নিজের ট্রাংক খুলেছেন, পুলিশের সামনে!’

‘তারপর?’ নিজের অজান্তে প্রশ্ন করে ফেলেছি।

‘তারপর ঘোড়ার ডিম আর তোর মাথার মুণ্ড! ভেতরে ওই মহিলার কাপড়চোপড় ছাড়া আর কিছু নেই।’

আমি পাথর হয়ে গেলাম।

আমার দিকে যে দৃষ্টিতে আসাদ তাকাল, পুরনো কোনো বন্ধুর কাছ থেকে খুব কম মানুষই এ রকম দৃষ্টি আশা করে। ‘তোর নাশতা তুই খা, আমি তোর এখানে এক গ্লাস পানি পর্যন্ত খেতে পারব বলে মনে হচ্ছে না।’ ঘুরে দরজার কাছে পৌঁছে গেল।

‘আসাদ, শোন...’

চৌকাঠের ওখানে পৌঁছে ঘুরল আসাদ, একটা রাইফেলের মতো আড়ষ্ট। ‘আয়, পুরো ব্যাপারটা আমরা ভুলে যাই, ঠিক আছে? তুই আমাকে আর আমি তোকে ক্ষমা করে দিই, আয়। আর কখনো কোনো কাজের কথা বলে আমাকে দয়া করে জ্বালাবি না, তাহলেই হবে। তোকে আমি আগে যেভাবে চিনতাম, এখন আর তুই ঠিক সেই মানুষটা না। আর আমি, কিছুটা অভাবে ভুগছি, কিছুটা পারিবারিক অশান্তিতে আছি, সব কিছুতে সময়ের অভাব যোগ হচ্ছে, যোগ হচ্ছে মেজাজের অভাব। ভব্যিষ্যতে তুই যদি আমাকে কখনো ফোন করতে চাস, আমি খুশি মনে তোকে আমার বাড়ির নম্বর দেব।’

তার পেছনে ঘরের দরজা যেন একটা গোঙানোর শব্দের সঙ্গে বন্ধ হলো।

আসাদ ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর অন্তত দশ মিনিট ধরে অনুভব করলাম, আমার মন অসাড় হয়ে গেছে, আর কী দিয়ে যেন সেটাকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে, তারপর নিজেকে মুক্ত করার জন্য মোচড় খেতে শুরু করল। জাহান্নামে যাক পুলিশ। তুই ব্যাটা আসাদও দূরে সরে থাক, যা। আমি ওদের কাছে প্রমাণ করতে পারব না হয়তো; কিন্তু নিজের কাছে ব্যাপারটা আমি অবশ্যই প্রমাণ করতে পারব—একভাবে না হলে আরেকভাবে, এবং সেটাই হবে সত্য, বাস্তবে যা ঘটেছে। আর তা যদি না পারি, আমার যদি কোথাও ভুল হয়...জীবনে কখনো আর অন্যের জানালার দিকে আমি ভুলেও তাকাব না, নিজের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করব। ঘটনাটা যেখানে এসে থেমেছে, এই থামা আমি মেনে নিতে পারি না। ওদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য নিজের কাছে ওই লোকের অস্ত্র আছে। কিন্তু আমাকে বোকা বানানোর কথা ভাবেনি সে। কারণ আমার অস্তিত্ব আর অবস্থান সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। কাজেই আমাকে ঠেকানোর কোনো অস্ত্র রাখেনি মোস্তাক আলি। তার পেছনটা ছিল নিরাবরণ, আমার বিরুদ্ধে অরক্ষিত।

পাঁচ মিনিট পর নসিবকে ডেকে নিলাম। ‘তোমার মনে আছে, দুই বছর আগে আমরা যখন লঞ্চে চড়ে সুন্দরবন দেখতে গিয়েছিলাম, তখন একটা বাইনোকুলার কেনা হয়েছিল? মানে, দুরবিন? সেটা এখন আমার দরকার, যাও নিয়ে এসো।’

নিচতলার বন্ধ একটা ঘরের তালা খুলে কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজি করতে হলো নসিবকে, তবে আমার হাতে সেটা নিয়ে এসে দিতে পারল, ওটার গায়ে শার্টের প্রান্ত ঘষছে, ফুঁ দিয়ে ধুলা ওড়াচ্ছে। দুরবিন টেবিলে নামিয়ে রেখে আসল কাজটা সারছি। এক টুকরো কাগজ আর কলম নিলাম, তাতে পাঁচটা শব্দ লিখলাম : ‘মেয়েটাকে নিয়ে কী করেছেন আপনি?’

ওই কাগজ একটা খামে ভরলাম, আঠা দিয়ে বন্ধ করলাম খাম, খামের ওপর কিছু লিখলাম না। নসিবকে আবার ডাকতে হলো। তাকে আসতে বললাম, ‘আমি তোমাকে দিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাতে চাইছি। আমার কথা মন দিয়ে শোনো। আমি চাই কাজটা তুমি করবে ঠিক আমি যেভাবে বলব সেভাবে, এবং চুপি চুপি। এই নাও, খামটা ধরো। এটা নিয়ে তুমি ৫২৫ নম্বর বিল্ডিংয়ে যাবে। সিঁড়ি বেয়ে পাঁচতলায় উঠবে, থামবে পেছন দিকের ফ্ল্যাটের সদর দরজার সামনে। এই খাম তুমি দরজার তলার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে দেবে। পাঁচতলায় ওঠার পর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের কাজ এটা, কারো চোখে ধরা না পড়ে সারতে হবে। তুমি যথেষ্ট চটপটে, অন্তত তা-ই ছিলে বলে জানি আমি। এখন ভবিষ্যৎই জানে তুমি ধরা পড়ে যাও কি না। কাজটা শেষ করে তুমি আশপাশে তাকিয়ে আরেকবার দেখে নেবে কেউ কোথাও নেই, তারপর তুমি মোস্তাক আলির কলিংবেলের বোতামে একবার চাপ দেবে। তারপর ওখানে তুমি আর দাঁড়াবে না, দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসবে—ওই ফ্ল্যাটের লোক দরজা খোলার আগেই। বেল শুনে দরজার দিকে তাকাবে সে, খামটা তখন দেখতে পাবে।’

চোখ তুলে তাকাতে দেখতে পেলাম, নসিবের মুখ হাঁ হয়ে যাচ্ছে।

‘আর শোনো, এটা নিয়ে আমাকে তুমি কোনো প্রশ্ন কোরো না, বুঝতে পারছ? আমি কারো সঙ্গে ঠাট্টা করছি না।’

নসিব চলে গেল, আমিও দুরবিন হাতে নিয়ে তৈরি হলাম।

এক কি দুই মিনিট পর ওই লোককে আমি ঠিক ফোকাসে নিয়ে আসতে পারলাম। একটা মুখ লাফ দিয়ে উঠল, আমি আসলে এবারই সত্যিকার অর্থে দেখতে পাচ্ছি তাকে, মানে তার আসল চেহারা আমার চোখে হুবহু ধরা পড়ছে। তার মাথায় একরাশ চুল। সাধারণ চেহারা। তবে নড়াচড়ার মধ্যে সামান্য দৃঢ় একটা ভাব আছে, নাকি আড়ষ্টতার কারণে ওই রকম মনে হচ্ছে? লোকটা মোটা নয়, তবে পেশিবহুল। তাকে আমি কখনো ব্যায়াম করতে দেখিনি, অথচ শুধু নিয়মিত ব্যায়াম করলেই ওই রকম পেশিবহুল হতে পারে কেউ। বাড়িতে হয়তো ব্যায়াম করে না; কিন্তু খোঁজ নিলে ঠিক জানা যাবে পাড়ার জিমে নিয়মিত দেখা যায় তাকে।

পাঁচ মিনিট কাটল। এই সময় তার মাথা ঝট করে ঘুরে গেল, এক পাশ থেকে আরেক পাশে। তার মানে, দরজার ফাঁক দিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতর খাম ঢুকিয়ে দিয়ে নিরাপদে নিচে নেমে এসেছে নসিব, তারপর চাপ দিয়েছে বেলের বোতামে।

ফ্ল্যাটের সামনের দরজার দিকে হাঁটছে লোকটা, আমি তার মাথার পেছনটা দেখতে পাচ্ছি। চোখে সাঁটা দুরবিন তাকে অনুসরণ করে পুরোটা পথ পার হয়ে পৌঁছল পেছন দিকে—এটা সেই জায়গা, দৃষ্টিপথে থাকা সত্ত্বেও আমার দৃষ্টিশক্তি অতটা ভালো না হওয়ায়, আর ওখানে আলো খুব কম হওয়ায় আমি এর আগে প্রায় কিছুই দেখতে পেতাম না।

দরজার দিকে এগোনোর সময় খামটা সে অবশ্যই দেখতে পেল; কিন্তু তুলল না, প্রথমে দরজা খুলে বাইরে তাকাল। ল্যান্ডিংয়ে কেউ নেই দেখে বন্ধ করল দরজা। ঝুঁকতে দেখলাম, সিধা হতে দেখলাম, এখন তার হাতে আমার খামটা দেখতে পাচ্ছি। দেখতে পাচ্ছি কে পাঠিয়েছে, জিনিসটা কোত্থেকে এলো জানার চেষ্টায় বারবার উল্টেপাল্টে দেখছে সে।

ওখান থেকে সরে এলো; কিন্তু খেয়াল করলাম, সরে আসার সময় ঘাড় ফিরিয়ে এক কি দুবার দরজার দিকে তাকাল, এগিয়ে আসছে জানালার দিকে। সে যেন ভাবছে, আবার কেউ বেল বাজাবে কি না। তাহলে কি দরজাটা বিপজ্জনক, এ রকম একটা চিন্তা ঢুকেছে তার মাথায়, তাই ওটার কাছ থেকে নিরাপদে সরে আসতে চাইছে? তার জানা নেই পরিস্থিতি সে যা ভাবছে ঠিক তার উল্টোটা সত্যি। মোস্তাক আলি, তুমি ভায়া নিজের ঘরগুলোর যত ভেতর দিকে চলে আসছ, পিছু হটে তত বেশি বিপদের ভেতর ঢুকছ।

গায়ে কোথাও কিছু লেখা নেই দেখে খামটা এবার ছিঁড়ল। এখন পড়ছে লেখাটা। ওরে আল্লাহ রে, কী মনোযোগ দিয়ে আমি তার হাবভাব লক্ষ করছি। আমার চোখ লোভী জোঁকের মতো আটকে থাকল তার ওপর। আকস্মিক একটা প্রসারিত হওয়ার ভাব লক্ষ করলাম, একটা টান লেগেছে—তার মুখের পুরো চামড়া যেন বিস্তৃত হয়ে কানের পেছনে চলে যাচ্ছে, তাতে চোখ দুটি সরু হতে হতে মঙ্গোলিয়ানদের মতো দেখতে হলো। শক, মানে খুব বড় ধাক্কা। তার সঙ্গে সর্বগ্রাসী আতঙ্ক। গোটা জগৎ হুড়মুড় করে মাথায় ভেঙে পড়ার অনুভূতি। মন যেখানে নিশ্চিতভাবে জানত সব ঠিক আছে, এখন হঠাৎ যদি জানতে হয় কিছুই ঠিক নেই, তাহলে আপনার কেমন লাগবে ভেবে দেখুন। তার হাত কিছু ধরতে চাইল, একটা অবলম্বন খুঁজছে। দেয়ালের ওপর হাত রাখল, ভাব দেখে মনে হলো, এই মাত্র নিজের পতন ঠেকাল। দেয়ালের খুব কাছে চলে গেল, প্রায় আলিঙ্গন করার ভঙ্গি। আমি তাকে হাঁপাতে দেখছি, যদিও খাটাখাটুনির কোনো কাজ তাকে করতে হয়নি। আবার দরজার দিকে ঘুরে গেল মোস্তাক আলি, হাঁটছেও সেদিকে। ধীর পায়ে হাঁটছে, যেন খুব ক্লান্ত। তারপর দরজার গায়ে শুধু হাত নয়, পেট, ঊরু, বোধ হয় বুকও ঠেকাল। দরজার সঙ্গে কী যেন একটা করছে বলে মনে হলো, ওটা যেন জ্যান্ত কিছু। সেটা এমন সাবধানে খুলল, আপনি শত চেষ্টা করলেও দেখতে পেতেন না। খুলল মাত্র আধা ইঞ্চি বা তারও কম। সরু ফাঁক দিয়ে আমি তাকে ভয়ে ভয়ে বাইরে উঁকি মারতে দেখলাম।

কেন দরজাটা খুলল সে, আমি জানি না; এখন আবার কেনই বা বন্ধ করে দিচ্ছে তা-ও জানি না। দরজার সামনে থেকে আঁকাবাঁকা পথ তৈরি করে ফিরে আসছে, প্রবল হতাশার কারণে বেশ অনেকটাই ভারসাম্য হারানোর অবস্থা। আমি তাকে একটা চেয়ারে ঢলে পড়তে দেখলাম, একমুহূর্ত পর ছোঁ দিয়ে মদের বোতল নিল হাতে। তার এই মদ খাওয়া তিনবার দেখা হচ্ছে আমার। প্রথমবার সরাসরি বোতল থেকে খেয়েছিল, দ্বিতীয়বার গ্লাসে ঢেলে, এখন আবার বোতলের গলা চেপে ধরে সরাসরি গলায় ঢালছে। এমনকি সে যখন বোতলটা নিজের ঠোঁটের কাছে তুলেছে, কাঁধে বসানো তার মাথা ঘুরে গেল আরেক দিকে, দরজাটা আবার একবার দেখবে বলে, যে দরজা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো তার একান্ত গোপন রহস্য তারই মুখের ওপর ছুড়ে মেরেছে।

চোখ থেকে দুরবিন নামালাম।

ওই লোক গিল্টি! আর কোনো প্রমাণের দরকার আছে কি? তার এই নার্ভাস আচরণ দেখে পঞ্চম শ্রেণির একটা শিশুও বলে দিতে পারবে, মোস্তাক আলি নিশ্চয়ই কোনো অপরাধ করেছে। মরুকগে, পুলিশ বন্ধু!

আমি আমার ল্যান্ডফোনের দিকে হাত বাড়ালাম, সঙ্গে সঙ্গে সেটা আবার টেনেও নিলাম। কি লাভ ওদের ফোন করে? ওরা আগে যেমন আমার কথা ভালো করে শোনেনি, এখনো শুনবে না। আমি যদি বলি, ‘তুই যদি দেখতি ওই লোকের মুখের কী অবস্থা হয়েছে, ইত্যাদি।’ উত্তরে বলা আসাদের গলা পরিষ্কার শুনতে পেলাম আমি, ‘অজ্ঞাতনামার লেখা চিঠি পেলে সবাই বিষম ধাক্কা খায়, অভিযোগ সত্যি হোক বা মিথ্যা। ওই রকম একটা চিঠি পেলে তোরও ওই একই অবস্থা হবে।’

আমাকে দেখানোর জন্য পুলিশের কাছে রয়েছে একটা আসল মিসেস চামেলি মোস্তাক। সত্যি আছে, নাকি ওটা তাদের বিশ্বাস? পরিবর্তে ওদের সামনে আমাকে হাজির করতে হবে একটা মরা মিসেস চামেলি মোস্তাক, এটা প্রমাণ করার জন্য যে তারা দুজন এক এবং অভিন্ন নয়। আমাকে এখন তাহলে এই জানালার সামনে বসে ওদের একটা লাশ দেখাতে হবে। কাজটা কি সহজ? হ্যাঁ, খুব সহজ। কিভাবে?

প্রথমে ওই লোক লাশটা আমাকে দেখাবে। তাহলেই ওদের আমি সেটা দেখাতে পারব। এই কেসের সমাধান এখন একমাত্র এই পথেই আসতে পারে।

সেটা পেতে অনেকগুলো ঘণ্টা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হলো আমাকে। আমি কী খুঁজছি সেটা সারাক্ষণ মনে রেখে আমার চিন্তাশক্তির লাগাম আমি ছেড়ে দিলাম, যাও, হন্যে হয়ে খোঁজো, দেখো কোনো সূত্র পাও কি না। এভাবে দুপুরটা পার হলো। এই পুরোটা সময় খাঁচায় বন্দি প্যান্থার যেমন অবিরত পায়চারি করে, মোস্তাক আলিও ঠিক তা-ই করল। দুটি মন, কিন্তু একই চিন্তায় ভরাট—পার্থক্য শুধু এই যে আমার বেলায় সেটা উল্টো হয়ে আছে। কিভাবে বিষয়টা লুকিয়ে রাখা যায়, কিভাবে সেটা লুকানো অবস্থা থেকে বের করে আনা যায়।

আমার ভয় হচ্ছে, মোস্তাক আলি পালিয়ে না যায়। সত্যি যদি পালিয়ে যেতে পারে, আমার সব চেষ্টা ভেস্তে যাবে, কারণ সে না থাকলে আমি সূত্র পাব কোত্থেকে? এই কেসটার গতি-প্রকৃতি দেখে আমার মনে হচ্ছে, অপরাধী নিজেই তার অপরাধ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ করে দেবে আমাকে। সে-ই আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে নিজের হাতে খুন করা স্ত্রীর কাছে। অপরাধটা সে আমার চোখের সামনে করেছে, অথচ সেটা আমি দেখতে পাইনি। এটা আমার অনেক বড় ব্যর্থতা। অর্থাৎ আমার দিকে একটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া হয়েছে, ব্যর্থতার গ্লানি থেকে বাঁচতে হলে আমাকে ওই মেয়েটার লাশ খুঁজে পেতে হবে।

ভাবলাম, মোস্তাক যদি পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তাহলে অন্ধকার না নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে সে, কারণ কারো চোখে ধরা না পড়ার জন্য অন্ধকার তার দরকার। কাজেই আমার হাতে এখনো খানিকটা সময় আছে। আবার এমনও হতে পারে যে পালানোর কথা ভাবছে না সে, যদি না তাকে পালাতে বাধ্য করা হয়—হয়তো এখনো মনে করছে, ওখানে থাকার চেয়ে পালানোটা আরো বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে।

আমার চারপাশে সাধারণত যেসব শব্দ সব সময় তৈরি হয়, সেগুলো রোজকার মতো আজও তৈরি হচ্ছে; কিন্তু আমি সেগুলো খেয়াল করছি না, আমার মন আর মাথা শুধু একটা বিষয় নিয়েই ব্যস্ত থাকছে, স্ত্রীর লাশ কিভাবে দেখাতে বাধ্য করা যায় লোকটাকে, আমি জানার সঙ্গে সঙ্গে সেটা যাতে পুলিশকে বলে দিতে পারি।

আমি অস্পষ্টভাবে সচেতন ছিলাম, বাড়ির মালিক কিংবা আর কেউ অপর এক ব্যক্তিকে নিয়ে, অপর এই ব্যক্তি হয়তো সম্ভাব্য ভাড়াটে, সাততলার অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকেছেন, যেটা এরই মধ্যে পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে। এই ফ্ল্যাটটা মোস্তাক আলির ফ্ল্যাটের দুটি তলার ওপরে; সাত আর পাঁচতলার মাঝখানের ফ্ল্যাটে এখনো কাজ চলছে। এই মুহূর্তে সাততলায় যাঁরা এসেছেন, তাঁদের আমি মাঝেমধ্যে চোখ তুলে দেখছি, তবে আমার দৃষ্টি প্রায় সারাক্ষণ মোস্তাক আলিকে নিয়েই পড়ে আছে। এই হলো পরিবেশ, আর এরই একপর্যায়ে ছোট্ট একটা সিনক্রোনাইজেশনের ঘটনা ঘটল—আমি বলতে চাইছি, একই ঘটনা দুই জায়গায় ঘটতে দেখলাম, তবে চরিত্রগুলো আলাদা। এটা ঘটার পেছনে অবশ্যই কোনো পরিকল্পনা নেই, যারা জড়িত তারা জানেও না যে তাদের দ্বারা এই মুহূর্তে সে রকম কিছু ঘটছে। দালানের মালিক এবং সম্ভাব্য ভাড়াটে, ঘটনাক্রমে দুজনই সাততলার ফ্ল্যাটের বৈঠকখানার জানালার সামনে রয়েছে, ওই একই মুহূর্তে মোস্তাক আলিও পাঁচতলায় নিজ ফ্ল্যাটের বৈঠকখানায় রয়েছে, সেও ওই জানালার সামনে। দুটি গ্রুপই ওখান থেকে একসঙ্গে কিচেনের দিকে হাঁটা ধরল, তাদের পাশে দেয়াল থাকায় দুটি গ্রুপ একটু পর একই সময়ে আমার দৃষ্টিপথ থেকে হারিয়ে গেল। কয়েক সেকেন্ড আমি তাদের কাউকে দেখতে পেলাম না। তারা, অর্থাৎ গ্রুপ দুটি, আবার দৃশ্যমান হলো কিচেনের জানালায় পৌঁছে—এবং এখানেও তারা একসঙ্গে পৌঁছল। দৃশ্যটা দেখে আমার গা ছমছম করে উঠল, এবং অবিশ্বাস্য বলে মনে হলো, ওই দুই গ্রুপকে কেউ যেন একই সুতায় বেঁধে নিয়ে পুতুলনাচ নাচাল। এই একই রকম ঘটনা হয়তো আগামী পঞ্চাশ বছরে আর ঘটবে না। তারা তিনজন কিচেনে ঢুকে কয়েক পা এগোনোর পর ছকটা ভেঙে গেল, যে কাজ তাদের এইমাত্র করতে দেখলাম, সে রকম আর কিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটল না।

যতই অবিশ্বাস্য হোক, যতই স্বাভাবিক না হোক, প্রশ্ন হলো—আমাকে এটা এত বিরক্ত করছে কেন? সব কিছু সত্ত্বেও আমি যেখানে এটাকে প্রকৃতির একটা খেয়াল বলে মেনে নিতে পারছি, সেখানে আমার মনে এত খুঁতখুঁত করার কী আছে? কেন আমার মনে হচ্ছে, ওখানে কী যেন একটা ছিল; কিন্তু আমি সেটা দেখতে পাইনি। সুষ্ঠু ও সাবলীল একটা ঘটনা, তার মধ্যে কোথাও কি কোনো ত্রুটি বা অসংগতি ছিল? বিষয়টা নিয়ে খুব বেশিক্ষণ চিন্তা করার সময় পাওয়া গেল না, আমাকে আমার নিয়ম ধরা কাজে মন দিতে হলো। বাড়ির মালিক আর সম্ভাব্য ভাড়াটে সাততলার ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে গেছেন। আমি এখন শুধু মোস্তাক আলিকে দেখতে পাচ্ছি। আমার স্মৃতিশক্তি মনের পর্দায় ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ঘটনাটা স্মরণ করতে পারছি ঠিকই, কিন্তু হুবহু হচ্ছে না বলে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। আমার চোখে ত্রুটি কিংবা ছন্দঃপতন, যা-ই বলি, হয়তো ধরা পড়ত, ঘটনাটা যদি আবার ঘটতে দেখতাম; কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়।

বিষয়টা আমার অবচেতন মনে ডুবে গেল, ওখানে ওটা গ্যাঁজ তৈরি করবে না কী করবে কে জানে, আমি আমার কাজে মন দিলাম।

একসময় আমি আন্দাজ করতে পারলাম, বিষয়টা আসলে কী হতে পারে। ততক্ষণে সন্ধে হওয়ার পর অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে; কিন্তু সময় লাগলেও ব্যাপারটা আমি কোনো একভাবে ধরতে পেরেছি। আমার আন্দাজ সঠিক কি না, সেটা জানতে হলে একটা পরীক্ষা করতে হবে। সেটা সহজ কোনো কাজ নয়, তাতে অনেক ঝামেলা আছে, আছে অনেক প্যাঁচও। কিন্তু এই একটা পদ্ধতিই শুধু আমার মাথায় আসছে, অন্য বিকল্প যদি কিছু থাকেও, আমি সেটা নিজের মাথায় আনতে পারছি না। আচমকা সচকিত হয়ে ঝট করে মাথা ঘোরানো, সাবধান হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট একটা দিকে দ্রুত একটা পা ফেলা—ব্যস, তার বেশি আমার আর কিছুর দরকার নেই। এবং এই সংক্ষিপ্ত, অনিশ্চিত, ক্ষণস্থায়ী ফাঁস হওয়ার ঘটনাটা ঘটাতে হলে আমার দরকার হবে দুটি ফোন কল, এবং দুটি ফোন কলের মাঝখানে আধঘণ্টার জন্য ওই লোকের অনুপস্থিতি। আমার পরিকল্পনায় নসিবেরও একটা ভূমিকা আছে, সেটাকে কোনোভাবেই ছোট বলা যাবে না। ওর সাহায্য ছাড়া আমি, সত্যি কথা বলতে কি, অচল।

‘নসিব।’ আমি ওকে ডাকলাম।

‘স্যার’ বলে আমার ঘরে ঢুকল সে।

‘তুমি তো ৫২৫ নম্বর বিল্ডিংয়ে গেছ।’ বললাম ওকে। ‘গ্রাউন্ড ফ্লোরে দাঁড়িয়ে মোস্তাক আলির নামও জেনে এসেছ। ওই বোর্ডে বা অন্য কোথাও কি ভাড়াটেদের ফোন নাম্বার লেখা আছে? দেখো তো মনে করতে পারো কি না।’

‘মুবাইল নম্বর লিখা না থাকলেও সমস্যা নাই, কেয়ারটেকার হেগো হক্কলের নম্বর জানে।’ উত্তর দিল নসিব।

‘আমি কি তোমাকে কেয়ারটেকার জানে কি জানে না জিজ্ঞেস করেছি?’

‘না, তা না জিগাইলেও আমি স্যার বুইজা লইছি আপনে আমারে কী কামে পাঠাইবেন।’

‘কী কাজে পাঠাব?’

‘মোস্তাক সাবের মুবাইল নম্বর আনতে।’

‘নক করে তোমার মোস্তাক সাবকে বলবে, আমি তার নম্বর চেয়েছি?’

 জিব কাটল নসিব। ‘না না, কী কন, স্যার। এইডা যে গুপন ব্যাপার, হেইয়া আমি জানি। আমি কেয়ারটেকার...’

‘না, তুমি কেয়ারটেকারের কাছেও যাবে না। তুমি কাউকে ওই লোকের ফোন নাম্বার জিজ্ঞেস করবে না। তুমি শুধু দেখবে, মোস্তাক আলির ফোন নাম্বার ওখানে কোথাও লেখা আছে কি না। যদি থাকে, কারো চোখে ধরা না পড়ে সেটা টুকে আনবে। এটাই তোমার কাজ। যদি না পাও, সোজা ফিরে আসবে।’ নসিব ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলে আবার আমাকে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, তাদের কাছে নিশ্চয়ই ওই লোকের ফোন নাম্বার আছে। তবে একান্ত বাধ্য না হলে অন্তত এ ব্যাপারে আমি পুলিশের সাহায্য নিতে চাই না। আমি শুধু তখনই ওদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাই, যখন বলতে পারব লাশটা কোথায় আছে।

‘জে, স্যার।’ বলল নসিব। আমার কথায় খুশি হতে পারেনি, বোঝা গেল বারবার মাথা নাড়ছে দেখে।

পনেরো মিনিট পর ফিরল নসিব। তার সারা মুখে হাসি, হাতে একটা কাগজ। ‘এই লন, স্যার। মোস্তাক সাবের মুবাইল নম্বর।’

কাগজটা নিয়ে তার দিকে আমি সন্দেহের চোখে তাকালাম। ‘ওখানে লেখা ছিল? কিন্তু তোমার এত হাসার কি আছে?’

‘না, স্যার, ওখানে কিছু লিখা নাই। তবে ওই বিল্ডিংয়ের বাইরে একটা পুস্টার টাঙানো হইছে, তাতে মোস্তাক সাবের মুবাইল নম্বর রইছে দেইখ্যা লিখখা আনলাম।’

‘পোস্টার মানে? কিসের পোস্টার?’

‘পুস্টারে লিখসে এউগা পুরান পিয়ানু বিক্রি হইবে। দাম আলোচনা সাইরা না কি জানি। তারপর মোস্তাক সাবের নাম আর মুবাইল নম্বর।’

বুঝলাম সব। ওকে শুধু বললাম, ‘বাহ্, এ তো ভালোই হলো, কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে ফোন নাম্বারটা পেয়ে গেছ। ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজে যাও। তবে খানিক পর আবার তোমাকে আমার দরকার হবে।’

কী যেন জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করল না, কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল নসিব। নিজেকে আমি প্রশ্ন করলাম, পিয়ানো? লোকটা নিজে বাজায়? নিশ্চয়ই তাহলে গানও গায়? কী দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা? দেখা যাচ্ছে, যারা সংগীত পছন্দ করে না, তারা মানুষ খুন করতে পারে বলে যে কথাটা শেকসপিয়ার বলে গেছেন, সেটা যেমন ক্ষেত্রবিশেষে সত্যি হলেও হতে পারে, তেমনি এও মিথ্যা নয় যে যারা সংগীত পছন্দ করে তারাও মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পারে।

এটার সঙ্গে, মানে এই পিয়ানোর সঙ্গে তার স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার কোনো সম্পর্ক আছে নাকি? অন্তত একটা বিষয় পরিষ্কার, স্ত্রীর লাশ ওই পিয়ানোতে লুকিয়ে রাখা হয়নি। তা রাখা হলে এই কদিনে দুর্গন্ধে পাড়ার লোক টিকতে পারত না। তা ছাড়া স্ত্রীর লাশসহ কেউ নিজের পিয়ানো বিক্রি করতে যাবে না।

পিয়ানো, তুমি আমার মাথা থেকে বিদায় হও।

অন্ধকার ঘরে বসে আছি। হাত বাড়িয়ে ক্রেডল থেকে ফোনের রিসিভার তুললাম। একটা জানালা থেকে আরেক জানালায় কল যাবে, যে জানালায় যাবে, সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি। ডায়াল করার পর অপেক্ষা করছি, তাকিয়ে আছি যাকে ফোন করেছি তার দিকে, সে ফোন তুললে সেটা আমি দেখতে পাব।

ওই যে, দেখতে পেলাম। মোবাইল তুলল সে।

তার গলা পেলাম আমার ফোনে, কর্কশ, রাগ রাগ ভাব। ‘হ্যালো?’

ভাবলাম : কী আশ্চর্য, না? আজ তিন দিন ধরে আমি তাকে খুনি বলে অভিযোগ করে আসছি, অথচ এ-ই প্রথম তার গলা শুনতে পাচ্ছি।

আমি নিজের গলা যেমন, তেমনই রাখলাম, গোপন রাখার চেষ্টা করিনি। এটা পরিষ্কার যে আমি কখনো তাকে দেখব না, সেও আমাকে কখনো দেখবে না। তাকে আমি বললাম, ‘আপনি আমার চিরকুট পেয়েছেন?’

উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল মোস্তাক আলি, সতর্ক গলায়, ‘আপনি কে ফোন করেছেন?’

‘এমন একজন, যে সব জানে।’

‘কী জানে?’ প্রশ্নটায় চালাকি আছে।

‘জানে, আপনি যা জানেন। আমি আর আপনি, আমরাই শুধু জানি।’

লোকটা নিজের ওপর চমৎকার নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছে। আমি কোনো শব্দই শুনতে পেলাম না। তবে তার জানা নেই যে আরেক দিক থেকে উন্মুক্ত হয়ে আছে সে। জানালার গোবরাটে দুটি মোটা বইয়ের মাঝখানে বাইনোকুলার আটকে রেখেছি, তাতে চোখ রেখে তার ওপর কড়া নজর রাখছি। শার্টের কটা বোতাম খুলতে দেখলাম তাকে, মুখের ভাব দেখে মনে হলো, হাঁসফাঁস করছে। তারপর চোখের সামনে হাত তুলল, আলোয় ধাঁধিয়ে গেলে আপনি যেভাবে হাত তুলে চোখ আড়াল করেন।

এবার তার গলার স্বরে দৃঢ়তা রয়েছে। ‘আপনি কী নিয়ে কথা বলছেন আমি জানি না।’

‘ব্যবসা নিয়ে কথা বলছি, আবার কী নিয়ে। এই তথ্যটা আমার জন্য মূূল্যবান, এটা থেকে আমি কিছুটা লাভবান হব, আমি যদি এ রকম ভাবি সেটা কি অন্যায়? বিশেষ করে আমি যেখানে চাইছি না ব্যাপারটা জানাজানি হোক, এখানেই থেমে যাক।’ আমি চাইছি লোকটা যেন বুঝতে না পারে যে এই কেসে জানালার ভূমিকা আছে। ওগুলো এখনো আমার দরকার। আর এই মুহূর্তে যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দরকার। ‘সেদিন রাতে দরজা বন্ধ বা খোলা নিয়ে আপনি যথেষ্ট সাবধান ছিলেন না। এমন হতে পারে যে ঠিকমতো ছিটকিনি লাগানো হয়নি, তাই বাতাস লেগে সামান্য খুলে গিয়েছিল।’

এই কথাটা তাকে আঘাত করল ঠিক তার বাঁচার জায়গাটায়। এমনকি তার দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দটাও ফোনের মাধ্যমে শুনতে পেলাম। ‘আপনি কিছু দেখেননি। দেখার মতো কিছু ছিল না।’

‘সেটা আপনার ওপর নির্ভর করে। আমি কেন পুলিশের কাছে যেতে চাইব?’ খুকখুক করে একটু কাশলাম। ‘এটা থেকে আমি যদি আয় করতে না পারি।’

‘ওহ্।’ বলল লোকটা, তার গলার স্বরে এক ধরনের স্বস্তি বোধ করার লক্ষণ। ‘আপনি কি আমার সঙ্গে...দেখা করতে চাইছেন? এটাই আসল ব্যাপার?’

‘সেটাই সব দিক থেকে ভালো না? আপনিই বলুন। আপাতত সঙ্গে করে ঠিক কত আনতে পারবেন?’

‘আমার কাছে এখন বেশি নেই। হাজার পাঁচেক হতে পারে।’

‘ঠিক আছে, বাকিটা নিয়ে পরে আমরা একটা সমঝোতায় আসব। আপনি বাসাবো পার হয়ে বিশ্বরোড বাসস্ট্যান্ডে চলে আসতে পারবেন?’ রিকশা না, অটো বা ময়ূরীতে চড়ে যেতে-আসতে আধাঘণ্টা লাগবে তার। ‘তার আগে বলুন, চেনেন তো? ওখানে একটা ওভারব্রিজ আছে, ওটা পার হয়ে রাস্তার অপর দিকে আসুন। আমি এখন সেখানেই আছি। এখানে লোকজনের তেমন ভিড় নেই।’

‘আপনারা কজন আসবেন?’ খুব সাবধানে জানতে চাইল মোস্তাক আলি।

‘শুধু আমি। সব কিছু নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারলে কাউকে লাভের ভাগ দিতে হয় না।’

মনে হলো কথাটা তার ভালো লেগেছে। ‘ওদিকটায় আমি না হয় গেলাম একবার,’ বলল সে। ‘শুধু এটা বোঝার জন্য যে ব্যাপারটা আসলে কী নিয়ে।’

সে তার মোবাইল সেট কান থেকে নামানোর পর আমি তার দিকে আরো তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকালাম। সেটা পকেটে ভরতে ভরতে হনহন করে ফ্ল্যাটের শেষ কামরায় চলে গেল, মানে বেডরুমে, কদিন ধরে যে ঘরের ধারেকাছেও দেখা যায়নি তাকে। ওখানে ঢুকে কাপড়ে ঠাসা একটা আলমারির দরজা খুলল, তার ভেতর খানিকটা সেঁধিয়ে গেল। ওখানে দাঁড়িয়ে কী করছে বোঝা যাচ্ছে না। মনে হলো, কিছু খুঁজছে। ভঙ্গি দেখে মনে হলো, ভেতরটা হাতড়াচ্ছে। তারপর সেটা যেন পেল, আমি তার পেশিতে ঢিল পড়ার ভাবটা খেয়াল করলাম। খুব তাড়াতাড়ি জিনিসটা বের করে ট্রাউজারের পকেটে ঢোকাল। ভঙ্গিটার মধ্যে আড়ষ্ট ভাব আছে। কী ঢোকাল পকেটে? পিস্তল?

লোকটা বড় কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অফিসে চাকরি করে, সে চাকরি এত বড় নিশ্চয়ই নয় যে সঙ্গে পিস্তল রাখার দরকার হবে তার, সে রকম হলে নন্দীপাড়া/দক্ষিণগাঁওয়ের মতো ঘিঞ্জি এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিত না, যেখানে মুদি দোকানের মালিক থেকে শুরু করে রিকশাওয়ালারা পর্যন্ত প্রায় সবাই জামায়াত আর জঙ্গিদের প্রতি সদয়। তাহলে ওই লোকের কাছে পিস্তল রয়েছে যে?

অবশ্য আজকাল কারো কাছে পিস্তল থাকা খুব বড় কোনো ব্যাপার না। পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা দিয়ে যে কেউ ইচ্ছা করলে কালোবাজার থেকে একটা কিনতে পারে। এই লোকও হয়তো তা-ই কিনেছে। সঙ্গে পিস্তল থাকলে সাহস পাওয়া যায়, পালানোর সময় কেউ পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ালে সেটা উপড়ে ফেলা যায়।

যদি পিস্তল হয়, আমার জন্য ভালো খবর,     ভাবলাম। পাঁচ হাজার টাকার জন্য বাসাবোর মাথায় বিশ্বরোডে যাব না আমি।

ফ্ল্যাট অন্ধকার হয়ে গেল। তার মানে রওনা হয়ে গেল মোস্তাক আলি।

নসিবকে ডাকলাম।

‘জে, স্যার। কুন সম বুলাইবেন জানি না দেইখা দরজার পাশে বইসা ছিলাম।’

‘ভালো করেছ। শোনো, তোমাকে দিয়ে আমি একটা কাজ করাতে চাইছি। কাজটা একটু কঠিন। তার মধ্যে কিছুটা ঝুঁকিও আছে। তোমার একটা পা ভেঙে যেতে পারে, তোমাকে টার্গেট করে কেউ গুলি করতে পারে, কিংবা তোমাকে গ্রেপ্তারও করা হতে পারে।’

‘এত্ত বড় বড় ক্ষতি হইব; তার পরেও আপনে কামটা আমারে করতে বলতাছেন?’

‘আমাকে শেষ করতে দাও। শোনো, তুমি আমার কাছে কাজ করছ...দশ বছর চলছে। ঠিক তো? আগে কখনো তোমাকে এ রকম ঝুঁকির কাজ করতে বলেছি? বলিনি। আজও বলতাম না, নিজে যদি করতে পারতাম। আমি পারব না, অথচ কাজটা করতে হবে, এ রকম পরিস্থিতিতে তোমাকে ছাড়া আর কাকে সেটা করতে বলতে পারি, বলো?’

‘স্যার, আপনে আমারে অন্য রকম বিপদে ফালাইতাছেন।’

‘অন্য রকম বিপদ মানে?’

‘স্যার, আমারে আপনের এত কথা কওনের তো দরকার আছিল না। আপনে যে কামই আমারে করতে কইবেন হেইডা আমি করুম, আপনের মুখের ওপর না কইতে পারুম না। এইডাই আমার অন্য রকম বিপদ, অহন বুজছেন?’

এরপর সরাসরি কাজের কথায় চলে গেলাম। ‘আমাদের এই বিল্ডিংয়ের পেছনে চলে যাও। খালি প্লটের বেড়াগুলো টপকাতে হবে তোমাকে। ৫২৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের পেছনে পৌঁছবে। কদিন ধরে মাচার ওপর দাঁড়িয়ে ওই বাড়ির বাইরের দেয়ালে কাজ করছে রাজমিস্ত্রিরা, নিশ্চয়ই দেখেছ তুমি।’

‘দ্যাখছি। এক দিন কইরা বাদ দা করে।’

‘হ্যাঁ, জানো দেখছি। আজ ওরা কাজ করছে না। ওই মাচা ধরে ওপরে উঠবে তুমি। উঠবে একেবারে সেই পাঁচতলার ফ্ল্যাটের ঝুলবারান্দার সামনে পর্যন্ত, তারপর মাচা থেকে ওই বারান্দা হয়ে ঢুকে পড়বে ফ্ল্যাটের ভেতর।’

‘ফ্ল্যাটে ঢুকুম? ক্যান? ঢুকুমই বা কেমনে? দরজা ভাইঙ্গা?’

‘আমার ঝুলবারান্দায় দরজা আছে?’

মাথা চুলকাল নসিব। ‘হেগো নাই, আপনে কইতাছেন?’

‘আমি জানি না। তবে ওখানে দরজা যদি থাকেও, ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সেটা বন্ধ করেনি সে।’

‘ওহানে ক্যান যামু আমি? কী লয়া আমু? কী খুঁজুম?’

‘কিছু না।’ পুলিশ এরই মধ্যে ওখানে একবার তল্লাশি চালিয়েছে, কাজেই খোঁজাখুঁজি করার দরকার কী। ‘তোমাকে কিছু খুঁজতে হবে না, কিছু নিয়ে আসতেও হবে না। ওখানে ঘর আছে তিনটি। আমি চাই প্রতিটি ঘরের জিনিসপত্র তুমি খানিকটা এলোমেলো করে দিয়ে আসবে, মোস্তাক আলি ফিরে এসে দেখে যাতে বুঝতে পারে তার ফ্ল্যাটে কেউ ঢুকেছিল। কার্পেটের কোণ সরাবে, চেয়ার-টেবিল একটু সরিয়ে রাখবে, আলমারির দরজা বন্ধ করবে না। সাবধান, কোনো জিনিস নেবে না। এই নাও, এটার ওপর চোখ রাখবে তুমি।’ নিজের হাতঘড়ি খুলে নসিবের কবজিতে পরিয়ে দিলাম। ‘তোমার হাতে সময় কিন্তু নির্দিষ্ট। পঁচিশ মিনিট। সেটা এই মুহূর্ত থেকে শুরু হলো। এর মধ্যে কাজটা শেষ করে ফিরে আসবে তুমি। যদি পঁচিশ মিনিটের বেশি ওখানে না থাকো, তোমার কোনো বিপদ ঘটবে না। যখন দেখবে পঁচিশ মিনিট পুরো হয়েছে, বাকি কাজ শেষ না করেই বেরিয়ে আসবে ওখান থেকে।’

‘আবার মাচা ধইরা দোল খাইতে খাইতে?’

‘না। বেরিয়ে আসার সময় মাচায় চড়ার ঝুঁকি নেওয়ার দরকার নেই। ফ্ল্যাটের দরজা খুলবে, সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে নিচে নামবে, ওই বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে আসবে সামনের গেট দিয়ে।’

‘দরজা খুলুম ক্যামনে? চাবি পামু কই?’

‘আসাদ আমাকে বলেছে, ওই বিল্ডিংয়ের সব দরজায় ইয়েল লক। ওই দরজা বাইরের হাতলে যে বোতাম আছে সেটায় চাপ দিলে লক হয়ে যাবে, বাইরে থেকে কেউ ঢুকতে চাইলে চাবি দিয়ে তালা খুলতে হবে তাকে; কিন্তু ভেতর থেকে কেউ হাতল ঘোরালে খুলে যাবে লক, তাকে চাবি ব্যবহার করতে হবে না।’

আমি ধরে নিচ্ছি ফ্ল্যাটের এলোমেলো অবস্থা দেখে মোস্তাক আলি ধরে নেবে, কেউ একজন ডুপ্লিকেট চাবি ব্যবহার করে ভেতরে ঢুকেছিল।

‘স্যার।’ শুকনো গলায় বলল নসিব, ‘আপনে কইলেন আমারে কেউ গুলি করব। ক্যান কইলেন?’

‘তুমি যার বাড়িতে ঢুকবে, তার কাছে পিস্তল থাকলে গুলি তো করবেই সে। তুমি যদি গুলি খেতে না চাও, সে পথ তোমার জন্য খোলা আছে। ওই যে বললাম, পঁচিশ মিনিট। নির্দিষ্ট ওই সময় পার হওয়া মাত্র ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

‘বুজছি। তার পরও ডর লাগতাছে। যুদিও আমি জানি আমি যামু। আমারে যাইতে হইবে।’ নসিব চলে গেল।

খানিক পর তাকে আমি আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনের ছোট একটা দরজা দিয়ে পাশের বিল্ডিংয়ের পেছনের উঠানে বেরিয়ে আসতে দেখলাম, তার আগে তাকে একটা নিচু পাঁচিল টপকাতে হয়েছে, তবে সেটা আমি দেখতে পাচ্ছি না। ঝুলবারান্দায় থাকলে দেখতে পেতাম। পাশের বাড়ির উঠান পার হয়ে এবার তাকে একটা বেড়া টপকাতে হলো। এটাই শেষ নয়, এ রকম আরো একটা বেড়া টপকাতে পারলে মাচাটার সামনে পৌঁছতে পারবে নসিব। চারদিকের কোনো জানালা থেকে কেউ তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে, সে ক্ষেত্রে নসিবকে রক্ষার জন্য তার সঙ্গে আমাকে কথা বলতে হবে—আমি বলব কিছু একটা আনতে আমিই ওকে পাঠিয়েছি। তবে আমাদের ভাগ্য ভালো, কেউ নসিবকে চ্যালেঞ্জ করল না।

নসিবের যে বয়স হয়েছে, সে তুলনায় খুব ভালোই কাজ দেখাচ্ছে সে। এখন তাকে তো আর আগের মতো তরুণ বলা যাবে না। পাঁচিল বা বেড়া টপকাতে তার কোনো সমস্যা হয়নি। মাচা বেয়ে ওপরে উঠতেও তার কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। মাচা আর পাঁচতলার ঝুলবারান্দার মধ্যে একটা ফাঁক আছে, সেটা বেশ বড় বলেই মনে হলো, আমি যেখানে রয়েছি সেখান থেকে মাপ আন্দাজ করা কঠিন। তবে দেখলাম, ওখানে থেমে ইতস্তত করছে নসিব, তার মানে ফাঁকটা বেশ বড়ই হবে, লাফ দিয়ে পার হতে ভয় পাচ্ছে। ভাবলাম, ওর মোবাইলে আমি কল করব কি না। কিন্তু অত উঁচুতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ফোন পেলে হঠাৎ ঘাবড়ে যেতে পারে, এই ভেবে অপেক্ষা করছি। তারপর দেখলাম একটা পা বাড়িয়ে ঝুলবারান্দার নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে সে। পেল নাগাল, তারপর মাচা ছেড়ে দিয়ে ধরে ফেলল ঝুলবারান্দার নিচু রেলিংয়ের মাথা। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি। বারান্দায় নেমে ঘুরল, আমার দিকে তাকাল, আমি তাকে হাত ঝাঁকিয়ে কাজ শুরু করার সংকেত দিলাম। ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকল নসিব।

কাজটা আমি ওকে করতে দেখছি। ওকে নিয়ে আমার একটু চিন্তাও হচ্ছে। ওখানে থাকা অবস্থায় ওর যদি কোনো বিপদ দেখা দেয়, আমি ওকে রক্ষা করতে বা কোনো রকম সাহায্য করতে পারব না। এমনকি মোস্তাক আলির কাছে যদি পিস্তল থাকে, সেটা যদি লাইসেন্স করা হয়, নসিবকে গুলি করার অধিকার তার আছে—যেহেতু তার বাড়িতে অনধিকার প্রবেশের ঘটনা ঘটছে। আমাকে সমস্ত দৃশ্যের পেছনে থাকতে হবে, শুরু থেকে যেভাবে থাকছি। আমি নিজের আড়াল থেকে বেরিয়ে নসিবের সামনে কোথাও একটা লুকআউট হিসেবে এবং তার ঢাল হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি না। তবে জানি যে সরকারি ডিটেকটিভরা মোস্তাক আলির ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা করেছিল। ভাবলাম তাদের কেউ নিশ্চয়ই এখন আর ওখানে নেই।

কাজটা খুব দ্রুত সারতে চাইছে নসিব। দুরবিনে চোখ রেখে তাকিয়ে আছি, ওকে খুব উত্তেজিত লাগছে। ওর দ্বিগুণ উত্তেজিত হয়ে আছি আমি, কাজটা ওকে করতে দেখে। পঁচিশ মিনিট শেষ হতে যেন পঞ্চাশ মিনিট লেগে যাচ্ছে। অবশেষে কাজটা শেষ করল নসিব, প্রতিটি ঘরের আলো নেভাল। জানালার পাশ ঘেঁষে হেঁটে ফ্ল্যাটের সামনের দিকে চলে যেতে দেখছি ওকে, তারপর দরজা খুলে ল্যান্ডিংয়ে বেরিয়ে গেল। পেরেছে নসিব! ফুসফুসের সব বাতাস শব্দ করে ছাড়লাম, সেটাকে পঁচিশ মিনিটের পুরনো বলা যেতে পারে।

কয়েক মিনিট পর সিঁড়িতে নসিবের পায়ের আওয়াজ পেলাম। দরজা খুলে যখন ঘরে ঢুকছে, সাবধান করে দিয়ে বললাম, ‘এখানে আলো জ্বেলো না। এখনই আমাকে কিছু বলার দরকার নেই তোমার, তুমি বরং ফ্রিজ খুলে এক পিরিচ পুডিং আর এক বোতল ঠাণ্ডা কিছু খাও, ঘেমে তো দেখছি গোসল হয়ে গেছে।’

ফ্ল্যাট ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার উনত্রিশ মিনিট পর বাসাবো, বিশ্বরোড থেকে ফিরল মোস্তাক আলি। একজন মানুষের বাঁচা-মরার প্রশ্ন যেখানে জড়িত, চার মিনিটের মার্জিন খুব সরুই বলতে হবে। যা-ই হোক, এখন তাহলে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত নাটকের চরম এবং শেষ পর্ব অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এবং এখানে অনেক বড় কিছু প্রাপ্তির আশা করা হচ্ছে। ওই লোককে আমার দ্বিতীয় ফোনটা করতে হবে ফ্ল্যাটের পরিবর্তিত দৃশ্য দেখার সময় পাওয়ার আগেই। সময়ের বাটোয়ারা গুরুত্বপূর্ণ, সে রকম জটিলও, তবে আমি এখানে বসে হাতে রেডি রেখেছি ল্যান্ডফোন, তার নাম্বার ডায়াল করছি বারবার, বাতিলও করছি প্রতিবার। আবার ডায়াল করলাম, এবার আর কাটলাম না। আলো জ্বালার জন্য সুইচে হাত দিয়েছিল, সেই হাত তখনো নামাতে পারেনি, তার ফোন বাজতে শুরু করল।

এই ফোন কলই গল্পটা বলতে যাচ্ছে।

‘কথা ছিল আপনি টাকা নিয়ে যাবেন, পিস্তল নিয়ে নয়; সে কারণেই আমি আপনার সঙ্গে দেখা করিনি।’ সে যে ধাক্কাটা খেল, আমি সেটা পরিষ্কার দেখতে পেলাম। ‘আমি আপনাকে ট্রাউজারের পকেট টিপতে দেখেছি, যেখানে ওটা আপনি রেখেছেন, বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে রাস্তায় বেরোনোর সময়।’ হতে পারে তা হয়তো করেনি সে, কিন্তু করেছে কি করেনি তা তার মনে থাকবে না। সঙ্গে আগ্নেয়াস্ত্র থাকলে প্রায় সবাই ওভাবে স্পর্শ নেয়; তবে কেউ যদি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে অভ্যস্ত হয়, তাহলে আলাদা কথা।

‘আপনি শুধু শুধু অত দূর গেলেন আর ফিরে এলেন। তবে আপনি চলে যাওয়ার পর আমি আমার সময় নষ্ট করিনি। আমি আগে যতটুকু জানতাম, এখন তার চেয়ে বেশি জানি।’ এই অংশটা গুরুত্বপূর্ণ। আমি তার চেহারার সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। ‘আমি জেনে গেছি কোথায় আছে ওটা। আমি ঠিক কী বলতে চাইছি আপনি অবশ্যই সেটা বুঝতে পারছেন। এখন আমি জানি কোথায় রেখেছেন ওটা। আপনি যখন ফ্ল্যাটে ছিলেন না, আমি তখন ওখানে ঢুকেছিলাম।’

লোকটা একটা কথাও বলছে না। আমি শুধু তার শ্বাস-প্রশ্বাসের আওয়াজ পাচ্ছি।

‘আমার কথা আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? চারদিকে তাকান। ফোন কেটে দিয়ে নিজের চোখেই দেখুন সব। এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যান। আমি ওটা পেয়েছি, মানে জানি কোথায় লুকানো হয়েছে।’

ফোন কেটে পকেটে রাখল, ধীর পায়ে হেঁটে বৈঠকখানার দরজা পর্যন্ত গেল, ভেতরে হাত ঢুকিয়ে আলো জ্বালল। নিজের চারদিকে একবার শুধু তাকাল, এক দিক থেকে আরেক দিকে ঝাড়ু দেওয়ার ভঙ্গি, দৃষ্টিতে বিব্রত ভাব, সে দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোনো পয়েন্টে স্থির হলো না, তার ওই দৃষ্টির মধ্যখান বলে কিছু তৈরি হলো না।

ওখান থেকে আবার আগের জায়গায় ফিরল লোকটা, ধীরেসুস্থে একটা চেয়ারে বসল, তারপর সারা মুখে গম্ভীর হাসি নিয়ে ফোন করল আমাকে। মাত্র তিনটি শব্দ উচ্চারণ করল সে, স্বর একেবারে নরম, বিদ্বেষে ভরা সন্তুষ্টির সুরে, ‘আপনি একটা মিথ্যুক।’

আমি দেখলাম ফোনের যোগাযোগ কেটে দিল সে, সেটটা কোথাও নামিয়ে রাখল, হতে পারে নিচু টেবিলে বা সোফার হাতলে। আমিও ফোনের রিসিভার ক্রেডলে নামিয়ে রাখলাম।

পরীক্ষাটা সফল হয়নি। তার পরও ব্যর্থ বলা যাবে না। লোকটা আমাকে লোকেশনটা দেয়নি, যেমনটা দেবে বলে আশা করেছিলাম আমি। তার পরও ওই কথাটা, ‘আপনি একটা মিথ্যুক’ বলে আসলে নীরবে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে যে সেটা ওখানেই পাওয়া যাবে, তার চারপাশে কোথাও। এমন নিরাপদ জায়গায় রাখা হয়েছে, জানে তা নিয়ে তার উদ্বিগ্ন হওয়ার দরকার নেই, এমনকি নিশ্চিত হওয়ার জন্য সেদিকে তাকানোরও প্রয়োজন নেই।

কাজেই আমার এই পরাজয়ের মধ্যে এক ধরনের নিষ্ফলা বিজয় অর্জিত হয়েছে। যদিও আমার কাছে সেটার এক কানাকড়ি দাম নেই।

চেয়ার বা সোফা ছাড়ল সে, জানালার সামনে খানিক পায়চারি করছে, বোঝা যাচ্ছে, খুব চিন্তিত। তারপর পায়চারি থামিয়ে অটল দাঁড়িয়ে থাকল, আমার দিকে পেছন ফিরে। তাকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। তার কারণ সম্ভবত এই যে সে কী করছে আমি সেটা দেখতে পাচ্ছি না। আমি জানি, মোবাইল ফোনটা তার সামনে কোথাও আছে। কাউকে ফোন করছে, এমন মনে হলো না। অনেক মানুষ এই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়। তার মাথা একটু নত হয়ে আছে, এটা ছাড়া আর কিছু দেখছি না তার মধ্যে। ভালো করে তাকাচ্ছি, কিন্তু তার কনুই নড়ছে বলে মনে হলো না। এখন সে যদি তর্জনী দিয়ে সেলফোনের বোতাম টেপে, আমি তা দেখতে পাব না।

আরো দশ সেকেন্ড ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকল মোস্তাক আলি, তারপর সরে গেল একপাশে। ওখানের আলো নিভে গেল; আমি তাকে হারালাম। লোকটা অনেক সাবধান হয়ে গেছে, দিয়াশলাইও জ্বালছে না, অন্ধকার ঘরে আগে যেমন তাকে জ্বালতে দেখেছি।

তার ওপর নজর রাখার জন্য তাকে আমার দেখতে পেতে হবে; কিন্তু সে যেহেতু অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, আমার মন অন্য একটা কাজের কথা স্মরণ করিয়ে দিল আমাকে—সেই বিচিত্র টাইপের ছোট্ট সিনক্রোনাইজেশন, আজ দুপুরের দিকে যেটা আমি ঘটতে দেখেছি, যখন একজন সম্ভাব্য ভাড়াটে সাততলার একটা জায়গা থেকে আর মোস্তাক আলি পাঁচতলার সেই একই জায়গা থেকে একই সময়ে হাঁটতে শুরু করে এক জানালার সামনে থেকে পরবর্তী জানালা পর্যন্ত গিয়েছিল। যা দেখেছি, তা থেকে বের করে আনতে হবে কী দেখিনি? যা দেখেছি তার মধ্যে অসংগতি বা বিচ্যুতি ছিল কি না আমি নিশ্চিত নই, তবে সে রকম কিছু না থাকলে আমার মন খুঁতখুঁত করবে কেন? এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে গিয়ে আমি মাত্র এইটুকু এগোতে পেরেছি : আপনি যখন নিখুঁত নয় জানালার এমন কাচের ভেতর দিয়ে কারো দিকে তাকান, কাচের ওই ত্রুটির কারণে লোকটাকে একটু অন্য রকম দেখাবে, তার কাঠামোয় এক সেকেন্ডের জন্য অসামঞ্জস্য ফুটে উঠবে, দেখতে লাগবে তার শরীরে যেন একটা ঢেউ খেলে গেল, এটা ততক্ষণ থাকবে, যতক্ষণ কাচের ওই অংশটাকে পাশ কাটিয়ে চলে না যাবে সে। কিন্তু এটা সে রকম নয়, এ রকম কারণ দেখিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। এখানকার কেস আলাদা, এখানে জানালা খোলা রয়েছে, জানালায় কোনো কাচ নেই। এবং আমি ওই সময় লেন্স, অর্থাৎ দুরবিন ব্যবহার করছিলাম না। আমার মাথা গরম হয়ে উঠছে। কী দেখেছি? বুঝতে পারছি না কেন কী দেখেছি!

 আমার ফোন বাজল। আসাদ, ধারণা করছি। এ রকম একটা সময়ে আর কেউ আমাকে ফোন করবে না। হতে পারে পরে চিন্তাভাবনা করে দেখে ওই ব্যাটা বুঝতে পেরেছে আমার সঙ্গে অযৌক্তিক আচরণ করেছে...।

রিসিভার তুলে আমি আমার স্বাভাবিক গলায় বললাম, ‘হ্যালো?’

অপর দিক থেকে কেউ কিছু বলল না।

আবার বললাম, ‘হ্যালো? হ্যালো? হ্যালো?’ আমি আমার গলার নমুনা দিয়ে যাচ্ছি।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওদিক থেকে কোনো শব্দ এলো না।

একসময় রিসিভার নামিয়ে রাখলাম। ওদিকের ওই ফ্ল্যাট এখনো অন্ধকার, খেয়াল করলাম।

আমি কেমন আছি দেখতে নসিব একবার ঘরে ঢুকল। যেকোনো কারণেই হোক, খানিকটা গম্ভীর বা অসন্তুষ্ট দেখাচ্ছে তাকে, বাধ্য না হলে আমার সঙ্গে কথা বলছে না। দোরগোড়ায় দাঁড়াল সে, ভালো করে শুনতে পেলাম না, সম্ভবত এ রকম কিছু একটা বলল, ‘অহন যুদি আমি যাই গা, সারব?’

সঠিক স্পট জানার জন্য ওই লোককে আরেকটা ফাঁদে ফেলার কথা ভাবছি আমি। নসিব যা-ই বলে থাকুক, আমি মাথা ঝাঁকিয়ে তাতে সম্মতি জানিয়েছি।

সিঁড়ি বেয়ে তার নিচে নামার আওয়াজ পাচ্ছি কানে, তবে তার কথা আমি ভাবছি না। নিচের দরজার তালা খোলার শব্দও পেলাম।

দ্বিতীয় ফাঁদটা কী হবে? ভাবছি আমি। তারপর অন্য একটা চিন্তা চলে এলো। গোটা বাড়িতে আমি এখন একা, এবং আমার নড়াচড়া একটা চেয়ার পর্যন্ত সীমিত।

একেবারে আচমকা ওই ফ্ল্যাটে আলো জ্বলল। জ্বলল মাত্র একমুহূর্তের জন্য, আবার সঙ্গে সঙ্গে তা নিভেও গেল। কিছু একটা দেখতে পাওয়ার জন্য আলোর দরকার হয়েছিল তার। তার যে আলোর মধ্যে থাকার ইচ্ছা নেই, সেটা বোঝা যাচ্ছে জ্বেলেই নিভিয়ে দেওয়ায়। একটা জিনিস খুঁজছিল সে, না পেয়ে আলোটা তাকে জ্বালতে হয়েছে। নিশ্চয়ই অন্ধকারে কিছুক্ষণ হাতড়াচ্ছে; কিন্তু পায়নি, তারপর বাধ্য হয়ে আলো জ্বেলেছে। জিনিসটা পেয়েছে, তা সে যা-ই হোক, বলতে গেলে আলো জ্বালার সঙ্গে সঙ্গে, এবং আবার সেটা নেভানোর জন্য দ্রুত ফিরে গেছে সুইচ অফ করতে। সেদিকে ফেরার সময় যখন ঘুরল, আমি তাকে ঝট করে একবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতে দেখলাম। বাইরে তাকানোর জন্য জানালার কাছে এলো না, শুধু পাশ কাটানোর সময় তাকাল একবার।

তার এই তাকানোটা একেবারে অন্য রকম লাগল আমার। আমি তার ওপর যে কদিন ধরে নজর রাখছি, তাতে তার আচরণ আর ভাবভঙ্গি সম্পর্কে আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, সেখানে এভাবে তাকানোর কোনো দৃষ্টান্ত নেই। এ রকম একপলক সময়ের কোনো কাজকে যদি তাকানো বলে স্বীকৃতি দেওয়া যায়, আমি তাহলে সেটার নাম দেব উদ্দেশ্য নিয়ে তাকানো। ওটা আর যা-ই হোক, শূন্য দৃষ্টি ছিল না, ওটা আর যা-ই হোক, না বুঝে তাকানো ছিল না; তার দৃষ্টি নির্দিষ্ট কিছুর ওপর স্থির হওয়ার জন্য উজ্জ্বল একটা স্ফুলিঙ্গ ছিল। তার দৃষ্টি এক দিক থেকে আরেক দিকে সাবধানে পিছলে যাওয়ার ঘটনা আগে আমি দেখেছি; কিন্তু এটা সে রকম কিছু না। আগে দেখেছি, একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে শুরু হয়েছে তার তাকানো, তারপর কিছু দেখতে বাদ না দিয়ে চলে গেছে আরেক দিকে। এবার তা ঘটেনি, এবার তার একপলকের দৃষ্টি সরাসরি এবং সোজা আমার জাফরি লাগানো ছোট জানালায় আঘাত করেছে, সেটার আয়ু ছিল এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগের সমান, তারপর আবার সরে গেছে। এবং প্রায় একই সঙ্গে আলোও চলে গেল, সেও হারিয়ে গেল।

অনেক সময় আপনার ইন্দ্রিয় কিছু জিনিস ধরে ফেলে, সঠিক অর্থ কী হবে মন তা অনুবাদ করে বোঝানোর আগেই। মোস্তাক আলির ওই তাকানো আমার চোখ দেখেছে। মন সেটার সঠিক অর্থ বের করতে রাজি হলো না বা ব্যর্থ হলো। ‘ওটার কোনো অর্থ ছিল না।’ ভাবলাম আমি। ‘লক্ষ না করা একটা লক্ষ্যস্থল, তার দৃষ্টি কাকতালীয়ভাবে আমার জানালায় ছুটে এসেছিল, আলোর দিকে এগোনোর সময়।’

আবার সেই ডিলেইড অ্যাকশন। বোবা একটা ফোন কল। গলার স্বর পরীক্ষা? তার পরই শুরু হলো উত্তেজনা জাগানো অন্ধকার, যে অন্ধকারে দুজন একই খেলা খেলতে পারে—পরস্পরের জানালার ওপর নজর রাখা, কেউ কারো চোখে ধরা না পড়ে। তারপর কী হলো? আলো জ্বালল, এবং সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে ফেলল। রণকৌশল হিসেবে খুব খারাপ; কিন্তু সেটা এড়ানোর কোনো উপায় তার ছিল না। আলো নেভাতে যাওয়ার সময় একপলকের চোরা দৃষ্টি, অশুভ আক্রোশে ভরপুর। আমার মন এগুলোর সবই গ্রহণ করল; কিন্তু সবগুলো গলিয়ে এক করল না, ফলে কোনো অর্থ তৈরি হলো না। আমার চোখ তার কাজ ঠিকঠাক করেছে; কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে আমার মন—ব্যর্থ যদি না-ও হয়ে থাকে, বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছে।

ষাটটার বান্ডিলে সেকেন্ড পাচার হয়ে যাচ্ছে। উল্টো দিকের বিল্ডিংয়ের পরিচিত চৌকো আকৃতি এবং তার চারপাশ নীরব এবং স্থির। এটাকে এক ধরনের রুদ্ধশ্বাস নিস্তব্ধতা বলা যেতে পারে। এবং তার ভেতর একটা শব্দ মাথা গুঁজে দিল। সেটা কোত্থেকে শুরু হলো বোঝা মুশকিল। একবার মনে হলো বেশ খানিক দূর থেকে আসছে, পরক্ষণে মনে হলো, ঝুলবারান্দা থেকে, আবার মনে হলো চারদিক থেকে। তবে এই শব্দ কখনো কারো চিনতে ভুল হয় না। রাতের নীরবতাকে থেমে থেমে ভাঙাই এই ঝিঁঝি পোকাদের কাজ।

ওগুলোকে নিয়ে নসিবের কুসংস্কারের কথা মনে পড়ল আমার। ঝিঁঝি পোকা ডাকলে আশপাশে কেউ নাকি মারা যায়, তার এবং তার মায়ের ভাষ্য মতে, ওগুলোর ওই ডাক নাকি মৃত্যুর সিগন্যাল। এটা নাকি কখনো মিথ্যা প্রমাণিত হয়নি। তা যদি সত্যি হয়, আশপাশের দালানগুলোয় যারা বসবাস করে তাদের কারো ভাগ্য আজ হয়তো সত্যি খুব খারাপ—

নসিব চলে গেছে মাত্র দশ মিনিট হলো। কিন্তু এখন আবার ফিরে এসেছে সে, নিশ্চয়ই কিছু নিতে ভুলে গেছে। এ রকম তার আগেও হয়েছে, গজগজ করতে করতে ফিরে আসে, ভুলো মনকে গালি দেয়। বেশির ভাগ সময় নিজে যে ঘরে থাকে, তার চাবি ফেলে রেখে যায়। তার জানা আছে, নিচে নেমে আমি তাকে ভেতরে ঢোকাতে পারব না। নিজের ফিরে আসা নীরব রাখতে চাইছে সে। ভাবছে, আমি বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছি। যাওয়ার সময় ওকে আমার গম্ভীর মনে হয়েছিল। ভাবলাম, নসিব কি আবার গাঁজা ধরেছে? ধুৎ, আমিও না! গাঁজা খেলে কেউ কখনো গম্ভীর হয় না; বরং সাধারণত বেশি কথা বলে আর হাসে, অন্তত যারা অভিজ্ঞ তাদের সে রকমটাই বলতে শুনেছি। সদর দরজা থেকে অস্পষ্ট ধাতব শব্দ ভেসে আসতে শুনছি, তালা খুলতে সমস্যা হচ্ছে তার। আমার এই ভাড়া করা বাড়িটা মান্ধাতার আমলের। রাস্তা থেকে সিঁড়ির কটা ধাপ বেয়ে উঠলে যে দরজা পড়বে, সেটা সারা রাত খোলা থাকে, বাতাসের ধাক্কা লাগলে বাড়ি খায় দেয়ালে। দরজা পার হলে ছোট একটা জায়গা, সরাসরি সামনে লোহার পাত দিয়ে তৈরি সদর দরজা। ওটার তালা সাধারণ লোহার চাবি দিয়ে খোলা হয়। গাঁজার নেশা হোক বা ক্লান্তি, নসিব সম্ভবত তার হাত স্থির রাখতে পারছে না, সে জন্যই তালার ফুটোয় চাবি ঢোকাতে সমস্যা হচ্ছে তার। নেশা না করা সত্ত্বেও এর আগে এ রকম করেছে বলে মনে পড়ল আমার।   ভাবলাম, গাধাটা দিয়াশলাই জ্বালছে না কেন। আলো না থাকাতেই তালার ফুটো দেখতে পাচ্ছে না সে। কে জানে, তার কাছে হয়তো দিয়াশলাই নেই।

স্বস্তি বোধ করলাম। আওয়াজটা শেষ পর্যন্ত থেমেছে। আমার নার্ভে লাগছিল ওটা। আওয়াজ থেমেছে, সিঁড়িতে তার পায়ের শব্দও নেই। তালা খুলতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছে নসিব। সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফেলে যাওয়া জিনিসটা কাল এসে নেবে। আমি জানি, বাড়ির ভেতর ঢোকেনি সে, কারণ ঝনঝন ধাতব আওয়াজের সঙ্গে সদর দরজা বন্ধ করাই তার অভ্যাস, আমি অনেক বকাঝকা করা সত্ত্বেও যে অভ্যাস ছাড়তে পারেনি সে, তার দ্বারা দরজা আস্তে বন্ধ করা হয় না। তা ছাড়া শুধু যে সদর দরজায় শব্দ হয়নি তা নয়,   সিঁড়ির ধাপেও তার পায়ের আওয়াজ পাচ্ছি না।

তারপর হঠাৎ ব্যাপারটা বিস্ফোরিত হলো। ঠিক নির্দিষ্ট এই মুহূর্তে কেন, আমি জানি না। সেটা আমার মনের ভেতর কিছু রহস্যময় কাজকর্মের ফসল হতে পারে। অবশেষে স্তূপ আকারে অপেক্ষায় থাকা বারুদের নাগাল পেয়ে গেল মন্থরগতি একটা আগুনের ফুলকি। নসিবসংক্রান্ত সমস্ত চিন্তা, সদর দরজা সম্পর্কে ভাবনা, এবং অন্য যাবতীয় বিষয় সব আমার মাথা থেকে নিঃশেষে বেরিয়ে গেল। ওটা ওখানে আজ মাঝদুপুর থেকে অপেক্ষা করছিল, এবং শুধু এখন—আর কিছু নয়, এ হলো আরো ডিলেইড অ্যাকশন। নরকে যাক শালার ওই ডিলেইড অ্যাকশন।

সম্ভাব্য ভাড়াটে লোক আর মোস্তাক আলি, দুজন বৈঠকখানার জানালা থেকে একই সময়ে রওনা হয়েছিল। এরপর ওদের দুজনের পাশে দেয়াল পড়ল, কাজেই তাদের আমি দেখতে পাইনি, আবার দেখতে পেয়েছি তারা যখন কিচেনের জানালার সামনে পৌঁছেছে, তখনো একজনের ওপর অপরজন। কিন্তু এক ধরনের ঝাঁকি বা অন্য কোনো ত্রুটি কিংবা একটা লাফ দেওয়ার মতো কিছু ঘটেছে, একেবারে ওখানেই, যেটা আমার অস্বস্তি বোধ করার কারণ হয়ে উঠেছিল। চোখ কিন্তু বিশ্বস্ত সার্ভেয়ার। ওদের দুজনের সময়ের বাটোয়ারা নিয়ে কোনো অসংগতি ছিল না, অসংগতি ছিল সমান্তরালতা বা সাদৃশ্য নিয়ে, কিংবা এখানে হয়তো অন্য কোনো শব্দ ব্যবহার করা দরকার, যেটা আমার মাথায় আসছে না। ঝাঁকি বা টান, যা-ই বলি, সেটা ছিল খাড়া, অনুভূমিক নয়। ‘লাফ’টা ছিল ওপর দিকে।

এখন আমি ধরতে পেরেছি, এখন আমি জানি। এবং এটা ফেলে রাখা যাবে না। এটা অসম্ভব রকমের ভালো একটা ব্যবস্থা, ওই লোকের উদ্ভাবনীশক্তির প্রশংসা না করলে তার প্রতি অন্যায় করা হবে, হোক সে একটা খুনি। ওরা একটা লাশ চেয়েছে? আছে, ওদের দেখানোর জন্য একটা লাশ আমার কাছে আছে।

খেপে থাকুক আর যা-ই থাকুক, কাজী আসাদকে এখন আমার কথা শুনতে হবে। আমি আর সময় নষ্ট করলাম না। আমি তার অফিসের নাম্বারে ফোন দিলাম। নাম্বার ঘুরিয়েছি অন্ধকারে, সাহায্য করেছে আঙুলের স্পর্শ আর স্মৃতিশক্তি; ক্রেডলসহ ফোনটা টেনে এনেছি কোলের ওপর। সিআইডি অফিসে তারা খুব কম শব্দ করে, শুধু একটা ছোট্ট ক্লিক শুনতে পেলাম। ঝিঁঝি পোকার ওই ডাকের মতো অত দূরেও যেন নয়।

‘কে বলছেন? কাকে চাইছেন?’

নিজের পরিচয় দিলাম, বললাম কাকে চাইছি।

‘তিনি ডিউটি সেরে বাড়ি ফিরে গেছেন।’ আসাদের এক সহকারী নিজের পরিচয় জানিয়ে বলল।

ব্যাপারটা ফেলে রাখার উপায় নেই। ‘ঠিক আছে, আপনি আমাকে আসাদের বাড়ির ফোন নাম্বার দিন।’

এক সেকেন্ড ইতস্তত করে সহকারী বললেন, ‘আচ্ছা, দিচ্ছি, আপনি লাইনে থাকুন। কয়েক সেকেন্ড পর আবার তার গলা শুনতে পেলাম। ‘বলছি, লিখে নিন।’

‘লিখছি।’

‘০১...’ শুধু এই দুটি সংখ্যা উচ্চারণ করলেন সহকারী, তারপর থেমে গেলেন।

‘হ্যাঁ, লিখেছি—থামলেন কেন, বলুন?’

 ওদিক থেকে কোনো সাড়া নেই।

‘হ্যালো? হ্যালো?’ বারবার বলছি; কিন্তু লাইন মরে গেছে, কোনো শব্দই পাচ্ছি না।

আমার মাথায় কী যেন একটা ঢোকার চেষ্টা করছে; কিন্তু পথ পাচ্ছে না বা আমি সেটা গ্রহণ করতে পারছি না। মনে হলো, অপর প্রান্ত থেকে ফোন রেখে দেওয়া হয়নি। আমার এটা ল্যান্ডফোন, কাজেই সুযোগটা নিয়ে আমার ফোনের তার কেউ কেটে দিয়েছে। এত তাড়াতাড়ি? এ রকম রাতে? আর যেভাবে কাটল, যেন মনে হচ্ছে আমার বাড়ির ভেতর ঢুকে তারটা কাটতে হয়েছে। অর্থাৎ আমার সঙ্গে রয়েছে, একই বাড়িতে। এই বাড়ির বাইরে কাটার মতো কোনো তার নেই, সব আন্ডারগ্রাউন্ডে।

ডিলেইড অ্যাকশন। এবার এটা চূড়ান্ত, এ রকম ভুলে মানুষ প্রাণ হারায়। সব অর্থেই দেরি হয়ে গেছে। একটা বোবা ফোন কল। ওদিক থেকে দিকনির্দেশ পাওয়ার জন্য একপলক তাকানো। খানিক আগে মনে হলো, নসিব ফিরে আসার চেষ্টা করছে।

এখন এটা স্পষ্ট যে মৃত্যু এই বাড়ির কোথাও আমার সঙ্গে রয়েছে। এদিকে আমি নড়াচড়া করতে পারি না, এই চেয়ার ছেড়ে না পারব দাঁড়াতে, না পারব নিরাপদ কোথাও সরে যেতে। এমনকি খানিক আগে আসাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ করার চেষ্টাটা যদি সফল হতো, তার পরও অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার খেসারত না দিয়ে আমি পার পেতাম না। এখন আর সময়ই নেই যে কিছু করব। আমি জানালায় মুখ ঠেকিয়ে কাছাকাছি দালানগুলোর লোকজনকে লক্ষ্য করে চেঁচাতে পারি। কিন্তু তারা সবাই শুয়ে পড়েছে, ঘুমাচ্ছে। তা ছাড়া জেগে থাকলেও বুঝতে পারবে না কোত্থেকে চিৎকারটা আসছে, সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না, আমাকে সাহায্য করতে হলে কিভাবে কী করতে হবে। আমার আর্তনাদ শুনে তারা নিজেদের জানালায় আসবে। আওয়াজটা কোন জানালা দিয়ে আসছে, বুঝতে পারার আগেই এদিকের সব খেলা শেষ হয়ে যাবে। যদি ধরে নিই তাদের কেউ একজন আমার এখানে চলে আসবে, তাতেই বা লাভ কী? সে এসে কী দেখবে? আমাকে দেখবে, যে প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিৎকার করেছিল। মরে পড়ে আছি। না, চেঁচানোর জন্য আমি মুখ খুললাম না। কারণটা এই নয় যে আমি সাহসী, কারণ হলো—এটা পরিষ্কার যে তাতে কোনো কাজ হবে না।

আর বিশ কি ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে যাবে লোকটা। এখন নিশ্চয়ই সিঁড়িতে রয়েছে, যদিও আমি তার কোনো শব্দ শুনতে পাচ্ছি না। ধাপের মেঝেতে যদি জুতার একটু ঘষা লাগত, কাঠের রেলিং যদি একটু ক্যাঁচ করে উঠত, বুঝতে পারতাম ঠিক কোথায় রয়েছে সে। এটা যেন অন্ধকারে আটকা পড়ে গেছেন আপনি, জানেন নীরবে চলছে একটা গোক্ষুর, আপনার চারপাশে কোথাও কুণ্ডলী ছড়াচ্ছে, ফণা তুলছে, আপনি জানেন না ছোবলটা কখন মারবে।

এখানে আমার সঙ্গে কোনো অস্ত্র নেই। অন্ধকার আলমারিতে কিছু বই আছে, রথী-মহারথীদের বেশ কটা আবক্ষ মূর্তি আছে, তার মধ্যে দু-একটা চীনামাটির, দু-একটা ব্রোঞ্জের তৈরি। নমস্য কার্ল মার্ক্স, আইনস্টাইন, নিউটন, রবি ঠাকুর ছাড়া আরো কয়েকজন। এগুলোর একটাও আমার সংগ্রহ করা নয়। সত্যি কথা বলতে কি, এগুলো যে কার, তা-ও আমার জানা নেই। আমি যখন বাড়িটা ভাড়া নিই, এগুলো এভাবেই এখানে ছিল। সবচেয়ে কাছাকাছি, মনে পড়ছে, নিউটনের মূর্তি রাখা আছে। আকারে ওটাই সবচেয়ে বড়।

চেয়ারের মেঝে থেকে শরীরের মাঝখানটা ওপর দিকে তুলে মরিয়া হয়ে ওটার নাগাল পাওয়ার জন্য আঁচড়াচ্ছি। দুবার আমার আঙুলের ডগা ওটার স্পর্শ নিয়ে পিছলে গেল, তৃতীয়বার চেষ্টা করতে টলে উঠল ওটা, চতুর্থবারের ছোঁয়ায় খসে পড়ল আমার কোলের ওপর, এত ভারী যে চাপ দিয়ে আবার আমাকে বসিয়ে দিল চেয়ারে। আমার পায়ের কাছে ভাঁজ করে রাখা আছে একটা কম্বল। এ রকম গরম আবহাওয়ায় ওটা আমার কাজে লাগে না, তবে কদিন বৃষ্টি হলে ওটা আমাকে গায়ে জড়াতে হয়, তা না হলে ঠাণ্ডা লেগে জ্বর চলে আসার ভয় থাকে। ওটা তুলে শরীরের চারদিকে জড়ালাম, তারপর চেয়ার থেকে ঝুঁকে যতটা নিচু হওয়া যায় হলাম, আমার মাথা আর একটা কাঁধ চেয়ারের হাতল থেকে ঝুলছে, দেয়ালের একেবারে পাশে। এরপর আবক্ষ মূর্তিটা তুলে আমার অপর কাঁধের ওপর বসালাম, ওখানে ওটা ভারসাম্য বজায় রেখে ধরে রাখলাম দ্বিতীয় একটা মাথা হিসেবে, কম্বল টেনে দেওয়া হয়েছে ওটার দুই কানের চারদিকে। পেছন থেকে, অন্ধকারে, ওটাকে দেখে মনে হবে...আমার আশা...

আমি নাক দিয়ে বেশ জোরালো শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলছি, বসে বসে ঘুমানোর সময় মানুষ যেভাবে ফেলে। এটা তেমন কঠিন কিছু নয়। টেনশন আর ভয় থেকে আমি এমনিতেই হাঁপাচ্ছি, সেটা একটু বাড়িয়ে দিতে হয়েছে মাত্র।

ওই লোক নব, কবজা, আংটা, হাতল ইত্যাদি খুব ভালো বোঝে, ব্যবহার করতে জানে দক্ষতার সঙ্গে। আমি দরজা খোলার কোনো শব্দ পাইনি। এই দরজা, কাঠের, ঠিক আমার পেছনে। অন্ধকারের মধ্যে বাতাসের একটা নরম আলোড়ন আমার দিকে চলে এলো। ওটাকে আমার অনুভব করতে পারার কারণ হলো খুলিতে, আসল খুলিতে, ওই সময় চুলের গোড়া পর্যন্ত ভিজে জবজব করছিল।

আমাকে যদি ছুরি মারার চেষ্টা হয়, কিংবা ডাণ্ডা বা হাতুড়ি দিয়ে মাথায় মারতে আসে, সময়মতো মাথাটা সরিয়ে নিতে পারলে দ্বিতীয় সুযোগ জুটবে কপালে, খুব বেশি হলে এটুকুই আশা করতে পারি আমি, এ আমার জানা আছে। আমার হাত আর কাঁধ বেশ মোটা আর শক্তিশালী। প্রকাণ্ড ভালুুকের মতো আলিঙ্গনের ঢঙে তাকে আমি নিজের ওপর নামিয়ে আনতে পারব, প্রথম ছুরির কোপ বা ডাণ্ডার আঘাত এড়ানোর পর এবং আমার গায়ের সঙ্গে চাপ দিয়ে তার ঘাড় বা কলারবোন ভেঙে ফেলতে পারব। কিন্তু অস্ত্রটা যদি পিস্তল হয়, আমাকে শেষ পর্যন্ত মেরে ফেলবে সে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের পার্থক্য। তার কাছে পিস্তল আছে, আমি জানি, ওটা সে খোলামেলা বিশ্বরোডে আমার ওপর ব্যবহার করতে যাচ্ছিল। তবে এখানে, আমি আশা করছি, চার দেয়ালের ভেতর, তার নিজের পালানোর পথ নির্বিঘ্ন রাখার প্রয়োজনে...

সময় শেষ।

গুলির আলো ঘরটাকে এক সেকেন্ডের জন্য আলোয় ভরিয়ে তুলল, এতই গাঢ় ছিল অন্ধকার। অন্তত কামরার কোণগুলো, কাঁপা কাঁপা বিদ্যুৎ চমকের মতো। চীনামাটির মূর্তি বাড়ি খেল আমার কাঁধে, ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।

আমি ভাবলাম, প্রচণ্ড রাগে মেঝের ওপর মিনিটখানেক লাফালাফি করল লোকটা। তারপর তাকে আমি ছোটাছুটি করতে দেখলাম, প্রথমে আমাকে পাশ দিয়ে জানালার সামনে চলে গেল, কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে দেখে নিল, ওখান থেকেই আমি তার কীর্তিকলাপ চাক্ষুষ করেছি। কিন্তু যেহেতু জাফরি লাগানো আছে, ওই পথে পালানো যাবে না। কিন্তু তার ভাব দেখে পরিষ্কার বুঝলাম, পালানোর কথা ভেবে তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কারণটাও বুঝতে  পারলাম। নিচতলায়, রাস্তার দিকের খোলা দরজা বাতাসে বাড়ি খাচ্ছে দেয়ালে, ওই শব্দ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তার মনে। তবে এখনো আমাকে অন্তত পাঁচবার মেরে ফেলতে পারে সে।

চেয়ারের হাতল আর দেয়ালের মাঝখানে সরু একটা ফাটলের মতো জায়গা, শরীরটা ওখানে গলিয়ে দিলাম; কিন্তু আমার পা দুটি তার পরও ওপরে থেকে গেল, আরো ওপরে থেকে গেল আমার মাথা আর এক দিকের কাঁধ।

বন করে আধপাক ঘুরল লোকটা, এত কাছ থেকে গুলি করল যে মনে হলো, আমার মুখের ওপর সূর্য উঠল। আমি সেটা অনুভব করিনি, কাজেই...গুলিটা লাগেনি।

‘তুমি শালা...’ রাগে ঘোঁতঘোঁত করছে সে। ওটাই সম্ভবত তার শেষ কথা। তার বাকি জীবন শুধুই অ্যাকশন, মৌখিক নয়।

দু-তিনটি লাফ দিয়ে ঝুলবারান্দায় বেরিয়ে গেল, আওয়াজ শুনে বুঝতে পারলাম, ফ্রেম লাগানো নেট এক পাশে সরিয়ে লাফ দিল নিচে। নিচে কিছুটা জায়গা পাকা, দোতলা থেকে ওখানে পড়লে দু-একটা হাড় ভাঙার কথা। কিন্তু শব্দ শুনে বুঝলাম, ঘাসে ঢাকা ভেজা মাটিতে পড়েছে। চেয়ারের হাতলে তুললাম নিজেকে, শরীরটা ঠেলে দিলাম জানালার দিকে, চিবুক সামনে থাকায় জাফরিতে লেগে থেঁতলে গেল সেটা। গ্রাহ্য না করে নিচে তাকিয়ে অপেক্ষা করছি।

ঠিকমতোই নেমেছে সে, আহত হয়নি এতটুকু, পায়ে স্প্রিং লাগানো রোবটের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটছে, তরতর করে বেড়া দুটি টপকাল, মাচার কাছে পৌঁছে ইতস্তত করল একমুহূর্ত, তারপর লাফ দিয়ে উঠে পড়ল তাতে। বাঁশ ধরে ঝুলতে ঝুলতে ওপরে উঠছে, এক সারি বাঁশ থেকে আরেক সারি বাঁশের ওপর, গন্তব্য নিজের পাঁচতলার ফ্ল্যাট। ওই ফ্ল্যাটের অন্তত একটা জানালা খোলা দেখতে পাচ্ছি আমি, বাকিগুলোও হয়তো খোলা, আংশিক হতে পারে, ঠিক ধরতে পারছি না। গোটা ফ্ল্যাট অন্ধকার।

ওই জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে চেষ্টা করবে সে। এটার ওপর তার বেঁচে থাকা নির্ভর করছে—আপাতত। কাজটা তেমন কঠিন নয়, তবে মাথা ঠাণ্ডা রেখে করতে হবে। অস্থিরতা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

দোতলা পার হলো। পার হলো তিনতলা, তারপর চারতলা। এবার নিজের ফ্লোরের জানালায় পৌঁছতে যাচ্ছে। পারল পৌঁছতে। এবার ভেতরে ঢুকবে। কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। জানালার গোবরাট ছেড়ে দিল সে, তার শরীর পুরোপুরি মাচায় ফিরে এলো। ওখান থেকে দ্রুত আরো ওপরে উঠে যাচ্ছে। কয়েক ফুট ওপরে ওঠার পর থামল, মাথা পেছন দিকে কাত করে ছাদের কিনারা দেখার চেষ্টা করল, হয়তো ভাবছে, ওখানে যাওয়াটা নিরাপদ হবে কি না। আবার তাকে আমি আরো ওপরে উঠে যেতে দেখছি। নিজের ফ্ল্যাটে না ঢুকে ছয়তলার দিকে যাচ্ছে কেন? এই সময় পাঁচতলার ফ্ল্যাটের জানালার আশপাশ থেকে গুলি হলো, আওয়াজ শুনে মনে হলো, প্রকাণ্ড ড্রামে আঘাত করা হয়েছে।

ছয়তলা পার হলো লোকটা, পার হলো সাততলা, তারপর উঠে পড়ল নিজ দালানের ছাদে। আল্লাহ্, জীবনকে কী ভীষণ ভালোবাসে লোকটা! তার নিজের জানালায় দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন তাকে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকতে দেয়নি, কাজেই একটা সরলরেখা ধরে সরাসরি তাদের মাথার ওপর উঠে গেছে সে। তার ফ্ল্যাটের জানালা আর ছাদের কিনারা, এ দুই জায়গার মাঝখানে মাচার বাঁশ আর দড়িদড়া জট পাকিয়ে আছে, জানালা থেকে এখন কেউ তাকে গুলি করতে চাইলেও লাগাতে পারবে বলে মনে হয় না।

তার ওপর নজর রাখতে এত ব্যস্ত ছিলাম, আমার চারপাশে কী ঘটছে না ঘটছে কিছুই খেয়াল করিনি। হঠাৎ করে আসাদকে আমার পাশে দেখতে পেলাম, লোকটাকে ভালো করে দেখতে পাওয়ার জন্য চোখে নাইট গ্লাস তুলল। আমি তাকে বিড়বিড় করতে শুনলাম, ‘এই কাজটা করতে আমার ঘৃণা হচ্ছে, এতক্ষণে তার নিজেরই পড়ে যাওয়া উচিত ছিল।’

ছাদের নিচু পাঁচিলের ওপর দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষা করছে লোকটা, তার মাথার ঠিক ওপরে জ্বলজ্বল করছে একটা তারা। তার জন্য অমঙ্গলের প্রতীক ওই নক্ষত্র। ওখানে দাঁড়িয়ে নিচে তাকিয়ে তার ফ্ল্যাটের জানালা খুঁজছে বলে মনে হলো, ওখান থেকে কেউ মাথা বের করে তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করলে গুলি করবে। খুন হওয়ার আগে খুন করার ইচ্ছা। কিংবা সে হয়তো খুন হয়ে গেছে, এবং তা সে জানে।

আকাশ থেকে একটা গুলি হলো, আমার জানালার শার্সি হাজার টুকরো হয়ে আমাদের দুজনের ওপর ছড়িয়ে পড়ল, এবং আমার ঠিক পেছনের মেঝেতে ছিটকে পড়ল একটা বই।

এরপর আর কাজটা করতে ঘৃণা লাগা সম্পর্কে কিছু বলল না আসাদ। আমার মুখ তার হাতে চেপে আছে। তার কনুইয়ের রিকয়েল আমার দাঁতগুলো ঝাঁকিয়ে দিল। ফুঁ দিয়ে ধোঁয়া সরাতে হলো আমাকে, যাতে ওই লোকের চলে যাওয়াটা দেখতে পাই।

এককথায় ভয়াবহ। প্রথম আধা মিনিট কিছু বুঝতে দিল না। ছাদের কিনারায়, নিচু পাঁচিলের ওপর, যেমন দাঁড়িয়ে ছিল, তেমনি দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর হাতের পিস্তল ছেড়ে দিল, যেন বলতে চাইল, ‘এটা আমার আর দরকার হবে না।’ তারপর পিস্তলের পিছু নিল সে। পতনটা দেখার মতো কিছু নয়, সোজা নেমে গেল, পুরো মাচা একবারও একটু না ছুঁয়ে। পড়ল ঝোপঝাড় থেকে মুখ বের করা কাঠের তক্তার ওপর, তারপর চোখের আড়াল হয়ে গেল। আবার সেটা দেখতে পেলাম। ওই তক্তা তাকে নিয়ে দেবে গিয়েছিল, তারপর স্প্রিংবোর্ডের মতো তাকে ছুড়ে দিয়েছে ওপর দিকে। আবার পড়ল সে, ওটাই শেষবার। ব্যস, এটুকুই।

আসাদকে আমি বললাম, ‘ব্যাপারটা আমি ধরতে পেরেছি। শেষমেশ সেটা আমার মাথায় এসেছে। ছয়তলার ফ্ল্যাট, ওই লোকের ওপরের ফ্ল্যাটটা, যেটায় এখনো কাজ করছে রাজমিস্ত্রিরা। কিচেনে সিমেন্টের মেঝে, অন্যান্য কামরার মেঝের চেয়ে একটু বেশি উঁচু করা হয়েছে ওটা, সম্ভবত বিদেশে প্রচলিত আগুন আইন মাথায় রেখে এবং বৈঠকখানায় পা ফেলার সময় খানিক নেমে যাওয়ার অনুভূতি পেতে চাওয়ার কারণেও, যতটা পারা যায় কম খরচে। যা, মেঝেটা খুঁড়ে দেখ...’

এক সেকেন্ড দেরি নয়, সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল আসাদ। সে গেল স্বাভাবিক পথ ধরে। ওদিকের ফ্ল্যাটে এরই মধ্যে আলো জ্বলেছে। দু-তিনজন লোককে হাঁটাচলা করতে দেখতে পাচ্ছি আমি। পাঁচ-সাত মিনিট পর তাদের সঙ্গে যোগ দিতে দেখলাম আসাদকে। তারা সবাই কিচেনে চলে গেল। দেরি নয়, তখনই মেঝে খোঁড়ার কাজ শুরু করল তারা।

কাজটা সারতে আধাঘণ্টা লাগল ওদের। জানালার সামনে এসে আমাকে ভি-চিহ্ন দেখাল আসাদ। এর মানে হলো, হ্যাঁ।

পরদিন সকাল প্রায় আটটার আগে এলো না আসাদ। আমার কাছে আসার আগে সব দিক সামলাতে হয়েছে তাকে, সরাতে হয়েছে ওদের। সরাতে হয়েছে দুজনকেই, মানে তাজা লাশ আর ঠাণ্ডা লাশ, দুটোকেই। সে বলল, ‘নুরুল, আমি সব ফিরিয়ে নিচ্ছি। ওই বোকার হদ্দটা, মানে যাকে আমি ট্রাংকটা পরীক্ষা করতে পাঠিয়েছিলাম—ইয়ে মানে, দোষটা তার নয়, এক অর্থে। দোষ দিতে হলে আমাকে দিতে হবে। তার ওপর এ রকম কোনো নির্দেশ ছিল না যে মহিলার চেহারার বর্ণনা চেক করতে হবে। তাকে শুধু ট্রাংকের ভেতর কী আছে সেটা পরীক্ষা করতে বলা হয়েছিল। সে তার কাজ শেষ করে ফিরে এসে সাধারণ একটা রিপোর্ট দিল, ভেতরে শুধু কাপড়চোপড় আছে, মোস্তাক আলির স্ত্রী মিসেস চামেলি মোস্তাক নিজের চাবি দিয়ে ট্রাংক খুলে দেখিয়েছেন। আমি বাড়ি ফিরে গেছি, শুয়েও পড়েছি এবং আচমকা পপ্! কী যেন মাথার ভেতর ফাটল—পুরো দুদিন আগে ওই দালানের একজন ভাড়াটেকে জেরা করার সময় যা জেনেছি, তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের সঙ্গে আমার লোকের রিপোর্ট মিলছে না। দেরিতে বোধগম্য হওয়ার একটা ব্যাপার আছে, জানিসই তো!’

‘এই কেসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওটা আমাকে ভুগিয়েছে’—গলায় খেদ নিয়ে স্বীকার করলাম। ‘আমি ওটাকে ডিলেইড অ্যাকশন বলি। আরেকটু হলে আমাকে মেরে ফেলেছিল।’

‘আমি পুলিশ অফিসার, তুই তো আর তা না।’

‘সে জন্যই বুঝি একেবারে সঠিক সময়ে ঝলসে উঠলি?’

‘তাইতো। আমরা এদিকে এলাম জেরা করার জন্য ব্যাটাকে তুলে নিয়ে যাব বলে। যখন দেখলাম ফ্ল্যাট খালি, সে নেই, আমার লোকদের ওখানে থাকতে বলে এখানে আসার জন্য রওনা হলাম, ভাবলাম অপেক্ষার সময়টা তোর সঙ্গে দেখা করে দুঃখিত বলে আসি। সিমেন্টের মেঝের ব্যাপারটা তুই ধরতে পারলি কিভাবে?’

কাকতালীয় সিনক্রোনাইজেশন সম্পর্কে বললাম তাকে। ‘সম্ভাব্য ভাড়াটে লোকটা কিচেনে মোস্তাক আলির চেয়ে বেশি লম্বা হয়ে উদয় হলো, একমুহূর্ত আগে ওরা দুজন একসঙ্গে যখন বৈঠকখানার জানালায় ছিল, তখনকার তুলনায়। এটা গোপন কিছু নয় যে মিস্ত্রিরা সিমেন্ট দিয়ে মেঝে বানাচ্ছিল এবং ওখানকার মেঝে তৈরি করতে তারা কর্ক কম্পোজিশন ব্যবহার করেছে, যে কারণে বেশ অনেকটা উঁচু দেখাচ্ছিল মেঝেটা। কিন্তু সেটা নতুন একটা অর্থ পেয়ে যায়। যেহেতু বিল্ডিংয়ের টপ ফ্লোর, অর্থাৎ সাততলা তৈরির কাজ কিছুদিন আগেই শেষ হয়ে গেছে, কাজেই ছয়তলাটাই হতে হবে। এভাবেই সাজাই আমি, স্রেফ একটা থিওরি হিসেবে। মেয়েটা কয়েক বছর ধরে রোগেশোকে ভুগছিল, আর লোকটার ছিল না চাকরি, হয়তো ঘুষটুস খেয়ে হারিয়েছে সেটা—এই দুটি কারণে সে তার মানসিক সুস্থতা হারিয়ে ফেলে। তারপর অপর মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় হয়...’

‘আজই এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে তার ওই সহকারিণীকে, খুব ভোরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাকে।’

‘লোকটা সম্ভবত প্রথমে স্ত্রীর নামে বীমা করেছে, তারপর ধীরে ধীরে তাকে বিষ খাওয়াতে শুরু করে, চেষ্টা করেছে যাতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পায়। আমার ধারণা—মনে রাখবি, এটা আমার শুধুই কল্পনা—এক রাতে খাবারে বিষ মেশানোর সময় দেখে ফেলে মেয়েটা, যে রাতে ওদের ফ্ল্যাটে সারা রাত আলো জ্বলতে দেখা গেছে। কিভাবে দেখেছে বলা কঠিন, হয়তো সন্দেহ করেছিল, হয়তো মেশানোর সময় দেখেছে। যা-ই হোক, ধরা পড়ে যাওয়ায় মাথা খারাপ হয়ে যায় লোকটার, এবং এত দিন যেটা এড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করছে, সেটাই করে বসল—হিংস্র আক্রোশে খুন করে ফেলল স্ত্রীকে—সম্ভবত গলা টিপে মেরেছে কিংবা মাথায় বাড়ি মেরে। বাকি সব কাজ তাড়াহুড়া করে সারা হয়েছে। ওপরতলার অ্যাপার্টমেন্টের কথা ভেবেছে সে, কী অবস্থা দেখার জন্য ওঠে সেখানে। মিস্ত্রিরা মাত্রই মেঝে তৈরি করে ফিরে গেছে, সিমেন্ট তখনো শক্ত হয়নি, এবং যাবতীয় মালমসলা ওখানেই সব রাখা ছিল। বাথটাব আকৃতিতে মেঝে খোঁড়ে সে, মেয়েটার মাপমতো। লাশটা সেখানে রেখে সেটার ওপর নতুন করে সিমেন্ট করা হয়। সম্ভবত পুরো মেঝে যতটুকু উঁচু ছিল, তা-ও দু-এক ইঞ্চি বেশি উঁচু করা হয়েছে। স্থায়ী, গন্ধবিহীন কফিন বলা যায়। পরদিন মিস্ত্রিরা ফিরে এসে ওই মেঝের ওপর কর্ক সারফেসিং বিছায়, কোনো কিছু লক্ষ না করে। তারপর সে তার বান্ধবীকে কুমিল্লার ওদিকে পাঠিয়ে দেয়, যেখানে তার স্ত্রী বার কয়েক বেড়াতে গিয়েছিল, সম্ভবত কোনো রিসোর্টে। তবে তার বান্ধবী নিশ্চয়ই সেখানে ওঠেনি, উঠেছিল এমন কোথাও, যেখানে কেউ তাকে চিনবে না। ট্রাংকের চাবি তখনই তাকে দিয়ে রেখেছিল মোস্তাক আলি। বান্ধবীকে পাঠানোর পর ট্রাংকটাও পাঠায়, তারপর আগে ব্যবহার করা একটা পোস্টকার্ড লেটারবক্সে ফেলে, বছর লেখা অক্ষরগুলো পানি দিয়ে ঝাপসা করে। এক কি দুই সপ্তাহ পর হয়তো বলা হতো, মোস্তাকের স্ত্রী সাগরে ডুবে ‘আত্মহত্যা’ করেছে, দীর্ঘদিন অসুস্থতাজনিত কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে। একটা চিরকুট লিখে স্বামীর কাছ থেকে বিদায় চেয়ে নিত, এবং তার কাপড়চোপড় পাওয়া যেত কক্সবাজারের সৈকতে। এর মধ্যে ঝুঁকি থাকত; তার পরও বীমার টাকাটা পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা ছিল।’

সকাল নয়টার মধ্যে আসাদ আর তার লোকজন বিদায় নিল। আমি তখনো আমার চেয়ারে বসে আছি, এত বেশি উত্তেজনার ভেতর দিয়ে সময় পার করেছি যে চোখে একফোঁটা ঘুম নেই। ঘরে ঢুকল নসিব। বলল, ‘স্যার, ডাক্তার শরাফত আইতে পারেন নাই, তয় তিনি তাঁর ক্লিনিকের এক লোকরে পাঠাইছেন।’

‘কই দেখি।’

সাদা অ্যাপ্রন পরা এক তরুণ ঢুকল কামরায়, বলল, ‘স্যার, ভালো আছেন?’

‘এই পা নিয়ে কী করে ভালো থাকি, বলো?’

 ‘জি, ঠিকই তো। ডাক্তার শরাফত বলেছেন, আপনার পায়ের ব্যান্ডেজ আজ খোলা উচিত। সারা দিন ওখানে বসে থাকতে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে।’

—বিদেশি গল্প অবলম্বনে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা