kalerkantho

রবিবার । ১৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৭ রবিউস সানি                    

গ ল্প

পিতা ও প্রেমিক

ইমদাদুল হক মিলন

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩১ মিনিটে



পিতা ও প্রেমিক

অঙ্কন : ধ্রুব এষ

ঝুমু বলল, আমাদের বাড়িটা কেমন অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। ঘরদুয়ার, বাগান, গাছপালা, পুকুর, এত বড় উঠান-আঙিনা, বিশাল বাড়ি। ঘুপটিমতো বাড়ি না, খোলামেলাই। তার পরও বাড়িটা আমার মনে হতো অন্ধকারাচ্ছন্ন।

রুমকি হাসল। তাই?

তাই। সিজনে সিজনে বাড়ির চেহারা বদলাচ্ছে। বাগানে ফুল ফুটছে, ফল ধরছে গাছে গাছে। বাঁশবন শনশন করছে হাওয়ায়। পাখি ডাকছে, প্রজাপতি উড়ছে। পুকুরজলে চলাচল করছে মাছ। উঠানে নেমে চরছে কাক শালিক। রোদে ভরে যাচ্ছে বাড়ি, জ্যোত্স্নায় ফকফক করছে। বর্ষার বৃষ্টিতে অন্ধকার রাতের মতো হচ্ছে পরিবেশ। সব মিলিয়ে খুবই স্বাভাবিক অবস্থা। তার পরও আমার মনে হতো বাড়িটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। কোথাও যেন তেমন আলো নেই।

রুমকির ঠোঁটে তখনো হাসি। কী বলতে চাও, সহজ করে বলে ফেলো ননদিনী। তোমার ভাষা খুব সুন্দর। বলার ভঙ্গিও সুন্দর। তুমি যে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী, তোমার কথা শুনেই তা বোঝা যায়।

এবার ঝুমুও হাসল। প্রশংসার জন্য ধন্যবাদ ভাবি। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আর ওই যে তুমি ননদিনী বলে আমাকে ডাকো, এই ডাকটা আমার খুবই মধুর লাগে। অসাধারণ লাগে। তুমিও কথা বলো খুবই সুন্দর করে।

আসল কথাটা বলো। বাড়ি অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হতো...

না না, এখন আর সেটা মনে হয় না। এখন আমাদের বাড়ি আলোয় ভর্তি। চারদিকে শুধুই আলো। কোথাও নেই একটুও অন্ধকার। তুমি বউ হয়ে এসে এই বাড়ি আলোকিত করে ফেলেছ। আমি একটুও বানিয়ে বলছি না, তোমাকে খুশি করার জন্য বলছি না। আমি আমার অনুভূতির কথা সহজ-সরল ভাষায় পরিষ্কার করে বলছি। তুমি দেখতে যে কী সুন্দর, আমার মনে হয় তুমি নিজেও তা জানো না। যেমন চেহারা ফিগার গায়ের রং, তেমন স্নিগ্ধ রুচি, তেমন হাসি, কথা বলার ভঙ্গি, সব মিলিয়ে তোমার অবস্থা রবীন্দ্রনাথের গানের লাইনের মতো। ‘তোমার তুলনা তুমি’।

হয়েছে হয়েছে, এত ফোলাতে হবে না।

আমি তোমাকে ফোলাচ্ছি না। ওই যে বললাম, আমি আমার অনুভূতির কথা বলছি। তুমি হাঁটাচলা করো বা উদাস হয়ে বসে থাকো বা গোসল সেরে এসে শাড়ি শুকাতে দাও উঠানের তারে অথবা সংসারের টুকটাক কাজ করো, বিকালবেলা সামান্য সাজগোজ, অর্থাৎ যা-ই করো তুমি, আমি তোমাকে আড়চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। আমার তখন কী মনে হয়, জানো? মনে হয়, তোমার শরীর থেকে অদ্ভুত এক আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে। সেই আলোয় আমাদের বাড়ির সব অন্ধকার কেটে গেছে। আমাদের বাড়ি ঝলমল করছে আলোয় আলোয়।

মুখ ঘুরিয়ে ঝুমুর দিকে তাকাল রুমকি। ইস, তুমি যে কেন পুরুষ হওনি!

পুরুষ হলে কী হতো?

আমি নিশ্চিত, তোমার প্রেমে পড়তাম। এত সুন্দর করে কোনো পুরুষ যদি আমার প্রশংসা করত, তাহলে তার প্রেমে না পড়ে আমি পরতাম না।

এই তো লাইনে এসেছ। তোমার জীবনের এই দিকটাই তো আমি জানতে চাই।

অর্থাৎ আমি কারো প্রেমে পড়েছি কি না, কারো সঙ্গে আমার ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল কি না, এই সব?

ঠিক তাই। তুমি যে রকম মেয়ে, সব মিলিয়ে যে সৌন্দর্য তোমার, যে রকম আকর্ষণীয় তুমি, এমন কোন পুরুষ আছে, যে তোমার প্রেমে পড়বে না?

আমি তো বলিনি কেউ পড়েনি।

গভীর আগ্রহে দুই হাতে রুমকির একটা হাত ধরল ঝুমু। কে পড়েছে, বলো না ভাবি। প্লিজ, বলো! আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। বলো না ভাবি।

বুঝতে পারছ না?

না। আমি কী করে বুঝব?

আরে তোমার ভাই। তোমার ভাইটি আমার প্রেমে পাগল। আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বোঝে না।

ঝুমু একেবারে নিভে গেল। ধুৎ। ভাইয়ার কথা আমি জানতে চাইনি।

তাহলে কার কথা জানতে চেয়েছ?

মানে বিয়ের আগে অন্য কেউ তোমাকে পছন্দ করত কি না ইত্যাদি ইত্যাদি।

মুখের মজাদার ভঙ্গি করে রুমকি বলল, তোমার ভাই আমার স্বামী এবং প্রেমিক। সে আমাকে খুবই ভালোবাসে। আমার জন্য পাগল।

তা তো জানিই। কিন্তু...

কোনো কিন্তু নেই। তুমি আমার প্রেমিকের কথা জানতে চেয়েছ, আমি তা বলে দিলাম।

আমি জানতে চাইছি বিয়ের আগের কথা। তুমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো। ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার আগের কথা। তোমার মতো মেয়ের এ রকম অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ কিভাবে হয়? তোমার বিয়ে হওয়ার কথা প্রেম করে। বলো না, সেসব কথা বলো না।

আমার কোথাও কোনো প্রেম ছিল না।

তুমি আমাকে মেরে ফেললেও এ কথা আমি বিশ্বাস করব না।

না বিশ্বাস করলে আমার কিচ্ছু করার নেই। আমি তোমাকে পরিষ্কার বলছি, আমার কোথাও কোনো প্রেম-ভালোবাসা ছিল না। বাবা তোমার ভাইকে পছন্দ করলেন, তোমাদের এত নামকরা পরিবার, এত টাকা-পয়সা, ব্যবসা-বাণিজ্য, এত বড় বাড়ি, এত প্রভাব-প্রতিপত্তি, তোমার ভাই এবং তোমাদের পরিবার আমাকে পছন্দ করল, আমি বাবার কথায় রাজি হয়ে বিয়ে করে ফেললাম। বিয়ের পর টের পেলাম তোমার ভাই আমাকে খুবই ভালোবেসে ফেলেছে, আমার প্রেমে পাগল।

তুমি কি তাকে ভালোবাসো? তুমি কি তার প্রেমে পাগল?

নিশ্চয়।

তোমার কথা আমি বিশ্বাস করলাম না।

কেন?

ব্যাখ্যা করার কিছু নেই। করলাম না আর কি!

রুমকি কথা বলল না।

ফাগুন মাসের বিকালবেলাটা অন্য দিনের তুলনায় আজ যেন একটু বেশি সুন্দর। একটু বেশি যেন মনোরম বিকালবেলার আলো। একটু বেশি মায়াময় যেন বিকালবেলার হাওয়া। আকাশও যেন একটু বেশি স্বচ্ছ। পাখিরা যেন গত দিনের তুলনায় একটু বেশি ডাকছে আনন্দের ডাক। সুগন্ধি ফুল বেশির ভাগই ফোটে সন্ধ্যার পর। রাতের বেলা। আজ যেন বিকালবেলায়ই ফুটেছে কোনো কোনো ফুল। হাওয়ায় ফুলের গন্ধ। বাঁশবন আর গাছের পাতারা তোলপাড় করছে ফাগুন হাওয়ায়। এই পরিবেশে বাগানে পায়চারি করছে রুমকি আর ঝুমু। রুমকির পরনে কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি, ঝুমুর পরনে সাদার ওপর বেগুনি কাজ করা সালোয়ার-কামিজ।

বাড়িটা শহরের একটু বাইরে। চমৎকার পরিবেশে বনেদি ধরনের বাড়ি। ফাগুন মাসের বিকালবেলা এই বাড়ির বাগানে ধীর ভঙ্গিতে পায়চারি করতে থাকা বাড়ির নতুন বউটি আর মেয়েটিকে পরির মতো লাগছে।

একসময় নীরবতা ভাঙল ঝুমু। আমি বুঝতে পারি ভাবি, ও রকম কিছু থাকলেও তুমি আমাকে বলবে না। আমি তোমার ননদ। ননদের কাছে ভাবি কোনো দিনও তার প্রেম-ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে না। এটাই স্বাভাবিক। স্বামীর বোনকে কোনো মেয়েই তা বলে না বা বলতে চায় না। কিন্তু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই। আমাকে তুমি কতটা চিনেছ তা জানি না। তবে আমি তথাকথিত ননদদের মতো না। আমি একটু অন্য রকম। তুমি আমাকে বন্ধু ভাবতে পারো। আর বন্ধু হিসেবে আমি খুবই বিশ্বস্ত। পেটে বোমা মারলেও আমার পেট থেকে কেউ কথা বের করতে পারবে না। তুমি আমাকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারো। নির্ভর করতে পারো আমার ওপর।

একটা কথা আমি জানতে চাই। তোমার কেন মনে হচ্ছে যে আমার কোথাও প্রেম ছিল বা আমি কাউকে ভালোবাসতাম?

হঠাৎ হঠাৎ তোমাকে দেখে মনে হয়।

আমার কী দেখে মনে হয়?

কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তুমি হঠাৎ একটু উদাস হও। একটু আনমনা হও। হাসি-আনন্দের মুহূর্তেও মুহূর্তের জন্য তোমার চোখ যেন কোথায় চলে যায়। মনে হয়, সবার মধ্যে থেকেও তুমি সবার মধ্যে নেই। তুমি একা। অনেক সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলো, দীর্ঘশ্বাস লুকাও। একদিন আমি দোতলার বারান্দা থেকে দেখেছি, এই বাগানে হাঁটতে হাঁটতে তুমি দু-তিনবার চোখ মুছলে।

হয়তো আমার তখন বাড়ির কথা মনে পড়েছিল। মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। হয়তো আমি আমার বাবা কিংবা মাকে মিস করছিলাম।

না, আমার তা মনে হয়নি। আমার মনে হয়েছে, তুমি অন্য কোনো কারণে ও রকম লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদেছ। হয়তো ওই কান্না তোমার একান্ত নিজস্ব মানুষটির জন্য। হয়তো সেই মানুষটিকে তুমি মিস করছ।

রুমকি কথা বলল না।

ঝুমু বলল, আরেক দিন দেখলাম, তুমি তোমার রুমের জানালায় দাঁড়িয়ে উদাস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছ। দূর থেকে তোমার মুখটা দেখে আমার এত মায়া লাগল! মনে হলো, তোমাকে আমরা যেন এই বাড়িটাতে আটকে রেখেছি। এই বাড়ি যেন তোমার জন্য একটা খাঁচা। তুমি যেন খাঁচায় আটকে আছ। আরেক দিন, উচিত নয় এমন একটা দৃশ্যও দেখে ফেললাম। সকালবেলা, দশটা-সাড়ে দশটা হবে। আমি ভেবেছি ভাইয়া বেরিয়ে গেছে। ভাইয়া সাধারণত বাবার সঙ্গে বেরোয়। বাবা অফিসে যান কাঁটায় কাঁটায় দশটায়। ভাইয়াও গিয়ে তাঁর সঙ্গে অফিসে বসে। সেদিন যে ভাইয়া তখনো যায়নি আমি বুঝতে পারিনি। তোমাকে চমকে দেওয়ার জন্য পা টিপে টিপে তোমার রুমে ঢুকতে গেছি। দরজার পর্দা মাত্র একটু ফাঁক করেছি, দেখি ভাইয়া তোমাকে চুমু খেল, তুমি চুমু খেতে দিলে ঠিকই, কিন্তু তোমার মুখে কাউকে বুঝতে না দেওয়ার মতো বিরক্তি। চোখেও সেই বিরক্তির ছায়া। আমার মনে হলো, স্বামীকে তুমি অ্যাভয়েড করছ না ঠিকই, আবার অন্তর থেকে সাড়াও দিচ্ছ না। এই তিন ঘটনার পর থেকে আমি তোমার কথা খুব ভাবি। তোমার জন্য আমার খুব মায়া হয়। আমি বুঝে গেছি, আমার ভাইয়ার সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছে, তাকে তুমি স্বামী হিসেবে বাহ্যিকভাবে মেনে নিয়েছ, অন্তর থেকে নাওনি। তোমার মনে বাস করছে অন্য আরেকজন।

রুমকি উদাস হয়ে আছে। কথা বলছে না।

ঝুমু বলল, আমি জানি, নারীর মন পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রের চেয়েও গভীর। সেখানে যা লুকিয়ে থাকে, তা নিজে ছাড়া কেউ জানে না। তবে সেই লুকানো রহস্য বন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগি করলে মনের ভার কিছুটা কমে। জানি, আমি তোমাকে হয়তো কোনো রকম সাহায্যই করতে পারব না, শুধু সহানুভূতিটুকু দেখাতে পারব। আর তোমার তো বিয়েই হয়ে গেছে। এখন তো তোমার আর ফেরার কোনো পথ নেই।

রুমকি গম্ভীর গলায় বলল, তুমি ধরে নিচ্ছ কেন আমি কোথাও ফিরতে চাই, কারো কাছে ফিরতে চাই? আমি যদি বিয়েতে রাজি না হতাম তাহলে কি মা-বাবা জোর করে আমাকে বিয়ে দিতে পারতেন? আজকালকার দিনে কি তা সম্ভব?

তা ঠিক।

আর তুমি খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টির মেয়ে বলে, তীক্ষ অনুভূতির মেয়ে বলে আমাকে নিয়ে এভাবে ভেবেছ বা আমার মন বোঝার চেষ্টা করছ। তোমার চোখে যা পড়ছে, অন্যের চোখে তা পড়বে না। অন্যে এভাবে ভাববে না। জীবন এভাবেই কেটে যাবে। দিন যাবে, সংসারের চেহারা বদলাবে, বাচ্চাকাচ্চা হবে, আজকের এই মন বা ফেলে আসা দিনের সেই মনটিও থাকবে না। সময় মানুষকে সব ভুলিয়ে দেয়।

আমার ধারণা, ভালোবাসার অনুভূতিটা বদলায় না। চিরকালই তা মনের মধ্যে থেকে যায়। মনের মানুষটির ছবিতে ধুলো পড়ে। আচমকা হাওয়ায় ধুলো কখনো কখনো একটু সরে যায়। মানুষটি স্পষ্ট হয়।

ঝুমু একটু থামল। যা বোঝার আমি বুঝে গেছি, ভাবি। বলতে চাইলে তোমার কথা আমাকে তুমি বলো। না বলতে চাইলে বোলো না।

আকাশে গোল চাঁদ উঠেই ছিল। সন্ধ্যা হতে না হতেই স্পষ্ট হলো। দুজন মানুষের কথায় পরিবেশ গম্ভীর হয়ে উঠেছে। রুমকি তা হালকা করার চেষ্টা করল। প্রাণবন্ত গলায় বলল, ননদিনী, তোমার সমস্যাটা কী বলো তো? তোমার মনের গভীরে কে জায়গা করে নিয়েছে? তার কথা বলো আমাকে। আমিও তোমার মতো করে বলছি, তুমি আমাকে শতভাগ বিশ্বাস করতে পারো, শতভাগ আস্থা রাখতে পারো আমার ওপর। আমিও কথা লুকিয়ে রাখতে জানি। যদি মনে করি, এ কথা কখনো কাউকে বলব না, সেটা মরে গেলেও বলব না। আমার ফেরার কোনো পথ নেই। নিজেই আমি আমার পথ বন্ধ করে দিয়ে এসেছি। তোমার পথ খোলা। তোমার এখনো বিয়ে হয়নি। আমার সাহায্য তোমার লাগতে পারে।

ঝুমু উত্ফুল্ল গলায় বলল, সাহায্য তুমি আমাকে করবে?

নিশ্চয় করব। বলো, কী করতে হবে?

আজ থাক। দু-এক দিন পরে বলি।

ঠিক আছে।

দুই

আমাকে তুমি যেমন দেখছ, আমি মোটেই তেমন না। বিয়ের চার মাস আগে আমি একদিন বদলে গেলাম। হঠাৎ করেই বদলে গেলাম। ধীর শান্ত চুপচাপ হয়ে গেলাম। উদাস বিষণ্ন হয়ে গেলাম। প্রয়োজনের বাইরে কথা বলি না। যেটুকু দায়িত্ব, শুধু সেইটুকুই করি। বাড়তি কোনো কিছু এখন আর আমার মধ্যে নেই। আমি এখন একজন বদলে যাওয়া মানুষ।

দোতলার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল রুমকি। এই জানালা দিয়ে তাকালে বাড়ির পেছন দিককার বাগানের গাছপালা দেখা যায়। বাঁধানো পুকুরের ওপারকার বাঁশবন দেখা যায়, নীল সাদা আকাশ দেখা যায়। এখন তিনটা বাজে। দুপুর শেষ হচ্ছে ধীরে ধীরে। বাইরে ফাগুন মাসের রোদ হাওয়া।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে রুমকির রুমে এসেছে ঝুমু। রুমকিই ডেকে এনেছে। খেয়েছে দুজন একসঙ্গেই। তিন বেলা বরের সঙ্গেই খায় রুমকি। সকালে নাশতা করে বাবার সঙ্গে অফিসে চলে যায় আনিস। দুপুরে বাড়িতে এসে খেয়েদেয়ে ঘণ্টাখানেক রেস্ট। তারপর আবার অফিস। পাঁচটার পর আর অফিস করে না। তাদের ট্রান্সপোর্টের বিজনেস। বাস ট্রাক আছে, লঞ্চ কারগো আছে। একটা নামকরা কোল্ড স্টোরেজ আছে। বড় ব্যবসা। বাপ-ছেলে মিলে সামাল দেয় সব।

আজ সকালে নাশতা করেই বেরিয়ে গেছে আনিস। একটা নতুন কারগো তৈরি হচ্ছে। ফতুল্লার ওদিকটায়, বুড়িগঙ্গার ওপারের এক ডকইয়ার্ডে চলছে কাজ। প্রায় শেষের পথে। আর কদিন লাগতে পারে নদীতে নামতে, ও-ই দেখতে গেছে। সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসবে। শুধু দুপুরের খাওয়াটাই আনিসের সঙ্গে আজ হলো না রুমকির। সকালেরটা হয়েছে, রাতেরটা হবে। এ জন্য দুপুরটা আজ ঝুমুর সঙ্গে কাটাচ্ছে। সেদিনের পরই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ঝুমুকে নিজের কথাগুলো বলবে রুমকি। ঝুমুরটাও শুনবে। এ কদিনে রুমকি বুঝতে পেরেছে, ঝুমুকে সব বলা যায়। ঝুমুকে বিশ্বাস করা যায়। গভীর একটা বন্ধুত্ব ঝুমুর সঙ্গে তার হয়েছে।

খাটে হেলান দিয়ে বসেছে রুমকি। ঝুমু আধশোয়া হয়ে আছে বিছানায়। বলল, সব কিন্তু বলতে হবে ভাবি। কিচ্ছু লুকাবে না।

লুকাব না। লুকাতে চাইলে এসব কথা তোমাকে বলতামই না। আমার স্বভাব হচ্ছে, আমি কোনো কিছুই আধাআধি করতে পারি না। করলে পুরোটাই করি, না হলে করি না।

একটু উদাস হলো রুমকি। তবে তোমার ভাইয়ের সঙ্গে আমি এক ধরনের অভিনয় করে যাচ্ছি। ভান করছি, তাকে আমি খুব ভালোবাসি। আসলে...

তা আমি বোধ হয় কিছুটা বুঝেছি। তুমি বলো, যা বলতে চাইছ বলো। শোনার জন্য আমি ছটফট করছি।

ওই যে বললাম, যা দেখছ, আমি একদমই তেমন ছিলাম না। আমি খুবই চঞ্চল মেয়ে ছিলাম। ছটফটে, অস্থির স্বভাবের। এক জায়গায় বেশিক্ষণ স্থির হয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভবই ছিল না। না বাড়িতে, না কলেজে। বাড়ি মাতিয়ে রাখতাম, কলেজ মাতিয়ে রাখতাম। আর সাহসও ছিল খুব। ভয় পেতামই না।

বল কী? তোমাকে দেখে তো তা মনে হয় না! মনে হয়, তুমি খুবই নরম নিরীহ ভীতু স্বভাবের সাধারণ একটা মেয়ে।

রুমকি ম্লান হাসল। নিজেকে আমি এভাবে তৈরি করেছি। বদলে নিয়েছি।

একটু থামল রুমকি। তারপর বলল, তুমি তো জানোই, আমি নরসিংদী সরকারি কলেজে পড়তাম। সমাজবিজ্ঞানে অনার্স। বাড়ি মনোহরদী। নরসিংদী সদরেও আমাদের একটা বাড়ি আছে। ওই বাড়িতেই থাকতাম। বাবা কৃষি অফিসার। মা প্রাইমারি স্কুলের টিচার। আমি মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। বেশ সচ্ছল আমরা। টাকা-পয়সা আছে, গ্রামে জায়গা-সম্পত্তি প্রচুর। আমি কোনো দিন অভাব দেখিনি। যা চেয়েছি তা-ই পেয়েছি। স্কুল টিচার বলে মা একটু কড়া ধাতের মানুষ। শাসন করতে পছন্দ করেন। টিচারদের যা হয় আর কি! চারপাশের সবাইকেই ছাত্র-ছাত্রী মনে করেন। বাবা একেবারেই অন্য রকম। খুবই ভালোবাসেন আমাকে। এ জন্য আমারও সব আবদার বাবার কাছেই। বাবা আমাকে বেশ দামি একটা মোবাইল ফোন কিনে দিয়েছেন। উনত্রিশ হাজার টাকা দাম। এ নিয়ে মা এমন গজগজ শুরু করলেন! কেন এত দাম দিয়ে ফোন কিনে দিতে হবে? তোমার লাই পেয়ে মেয়ে বখে যাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। বাবা চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। মায়ের কথা শুনে কথাই বলেন না। মিটিমিটি হাসেন। আমাকে আড়ালে ডেকে বলেন, দু-চার দিন এ রকম গজগজানি চলবে। তারপর আপনা-আপনিই থেমে যাবে। তুই ওসব নিয়ে ভাবিস না। আমি তো বাবারই মেয়ে। হেসে বলি, আমাকে নিয়ে তুমি ভেবো না, বাবা। মায়ের কথা আমি গায়েই মাখছি না।

একটু থামল রুমকি। আনমনা গলায় বলল, এই ফোন থেকেই শুরু হয়েছিল...

ঝুমু নড়েচড়ে উঠল। অপলক চোখে তাকাল রুমকির দিকে। বুঝতে পারল, রুমকির মন চলে গেছে পেছনে ফেলে আসা এক জীবনে। চোখের দৃষ্টিও বদলে গেছে। স্মৃতিকাতর মানুষের চোখ মুহূর্তেই অন্য রকম হয়ে যায়। যেন চোখও ঢুকে গেছে স্মৃতির ভেতর। শুধু মন না, চোখও দেখতে পাচ্ছে সেই জীবন। ঝুমু কথা বলল না।

রুমকি বলল, সোহেল আর আমান দুই বন্ধু ডিগ্রিতে পড়ত। আমাদের কলেজে ভর্তি হওয়ার পরই বন্ধুত্ব হয়েছে দুজনের। সোহেলদের বাড়ি আমাদের পাশের গ্রামে। গ্রামের নাম দাইবাড়ি। আমাদেরটা তো তুমি জানোই। গণ্ডারদি। আমানের বাড়ি কাপাসিয়া। ওদের গ্রামের নাম খিরাটি। আমানের এক খালাতো ভাই নরসিংদীতে থেকে মাদরাসায় পড়ে। মেসে থাকত। ওর নাম হাফিজ। তিনজন একই বয়সের। আমান নরসিংদীতে থেকে ডিগ্রিতে পড়বে, থাকতে হবে নরসিংদীতেই। ধরল হাফিজকে। আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়ির মেস ভাড়া নিল। সোহেলও চলে এলো ওদের সঙ্গে। তিন বন্ধু মিলে মেসজীবন শুরু করল। মেসবাড়িটা ছিল গাবতলীতে। হাফিজ ছেলেটাকে আমি চিনতাম। আমার ফোন নাম্বারও ছিল হাফিজের কাছে। হাফিজের মোবাইল নেই। তবু আমার নাম্বারটা কেন যে ও নিয়েছিল! আর আমার তো অন্য রকম মন। মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সঙ্গেই বেশি বন্ধুত্ব। সারাক্ষণ হৈচৈ ছোটাছুটি করছি কলেজে। ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি। কলেজের বাইরে গিয়ে চা ফুচকা খাচ্ছি। স্যারদের সঙ্গেও ভালো খাতির। কলেজ মাতিয়ে রাখা প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। প্রেমট্রেমের মধ্যে নেই। যদিও দেখতে ভালো। যে কেউ পছন্দ করবে। কেউ কেউ হয়তো করতও। আমার ডাকাবুকো স্বভাবের জন্য প্রপোজ করতে সাহস পেত না। বাবা মোবাইল কিনে দেওয়ার পর কলেজের অনেকের কাছে আমার নাম্বার চলে গেছে, কলেজের বাইরেও গেছে কারো কারো কাছে। যেমন হাফিজ। মাদরাসায় পড়া ছেলে। সাদা লম্বা পাঞ্জাবি আর গোল টুপি পরে থাকে।

থাকুক, আমার অসুবিধা কী?

একটু থামল রুমকি। তারপর বলল, সোহেল নিম্নবিত্ত ঘরের ছেলে। বাবা ছোট চাকরি করে। একটা বোন আছে, এসএসসি পরীক্ষা দেবে। গ্রামে জায়গা-সম্পত্তিও বলতে গেলে নেই। বাড়ি-ঘরদুয়ার, ওই তো—ও রকম পরিবারের যেমন হয় আর কি! সোহেল টিউশনি করে পড়ার খরচ চালাত। টিউশনির পয়সা জমিয়েই কেমন কেমন করে একটা মোবাইল কিনে ফেলল। ওর একটু শৌখিনতাও ছিল। আবার মেয়েদের সঙ্গে দুষ্টুমি করার মনোভাবও ছিল। হয়তো এ জন্যই ফোনটা কিনেছিল। প্রথম দিন ফোন কিনেই সন্ধ্যার পর সেই ফোন নিয়ে বসেছে তিন বন্ধু। কোনো মেয়ের ফোন নাম্বার পেলে তার সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করবে। ওই রকম কারো ফোন নাম্বার জানা নেই সোহেলের। আমানেরও নেই। আমান ছেলেটা উঁচু-লম্বা, স্বাস্থ্যবান। গায়ের রং শ্যামলা। অদ্ভুত একটা সরলতা আছে চেহারায়। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মেয়েদের ব্যাপারে আগ্রহ কম। হাফিজের আগ্রহ থাকলেও বোঝার উপায় নেই। তবে সোহেলের ব্যাপক আগ্রহ। আমান আর হাফিজকে জ্বালিয়ে খেতে লাগল। দে না কোনো একটা মেয়ের নাম্বার। একটু কথা বলি। হাফিজ আমার নাম্বারটা দিল। দিয়ে বারবার সাবধান করল। খবরদার সোহেল, কিছুতেই বলবি না আমার কাছ থেকে তুই রুমকির নাম্বার পেয়েছিস। তাহলে রুমকি আমাকে খেয়ে ফেলবে। ও যে রকম মেয়ে। এই মেসে এসে আমাকে পেটাবে। পরে সোহেল আমাকে এসব কথা বলেছে। যা হোক, নাম্বার পেয়েই আমাকে ফোন দিল সোহেল। ধরলাম। সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল। তারপর দুবার মিসড কল দিল। সেদিন আমি আর কলব্যাক করলাম না। পরদিন আবার মিসড কল। রাতের বেলা। থার্ড ডেতে ফোন করল। ধরলাম, কেটে দিল। দু-তিনবার এই কাণ্ড। ধরি কেটে দেয়, ধরি কেটে দেয়। মেজাজ এমন খারাপ হলো, নিজেই কল দিলাম। প্রথমবার ধরল না। দ্বিতীয়বার ধরল। খুবই বিরক্ত হয়ে আছি। রাগলাম না, বিরক্তমাখা গলায় বললাম, কী ব্যাপার, ফোন দিয়ে কথা বলছেন না! মিসড কল দিচ্ছেন! আপনি কে? ও ঘাবড়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ভয় পাচ্ছিলাম। আমার গলা আরেকটু চড়ল। ভয় পেলে ফোন করার দরকার কী! বলল, কথা বলতে ইচ্ছা করছিল।

ছেলেটার গলার স্বর সুন্দর। কথা বলার ভঙ্গিটা ভালো। বিনয়ী, নম্র। আমি রাগ করতে গিয়েও পারলাম না। তারপর দেখি আর ফোন করে না। কেন যেন আমি দু-তিন দিন মনে মনে অপেক্ষাও করলাম। আগে ও রকম কোনো দিন হয়নি আমার। আমি হৈচৈ করা, সারাক্ষণ আনন্দে মেতে থাকা মেয়ে। কোনো কিছুতেই তেমন সিরিয়াস না। হঠাৎ এ রকম হচ্ছে কেন আমার? চিনি না শুনি না, দেখি নাই কোনো দিন, এক দিন শুধু দু-এক মিনিটের কথা, তাতে এ রকম লাগছে কেন? তিন দিন পর আমিই ফোন করলাম। কী ব্যাপার, এক দিন ফোন করে অফ হয়ে গেলেন? সেদিন স্বাভাবিকভাবে কথা হলো আমাদের। তারপর রোজই কথা হয়। খুবই সাধারণ কথাবার্তা। প্রেম-ভালোবাসা ওসব ব্যাপারট্যাপার না। বাড়ি কোথায়, কী পড়েন—এইসব। কোথায় পড়েন জানতে গিয়ে জানা হলো, আমরা একই কলেজে পড়ি। পুকুরের পুব পারে ওদের বিল্ডিং, পশ্চিম পারে আমাদের। দিন দশেকের মধ্যে দেখা হয়ে গেল। আলাদা করে সে কোথাও অপেক্ষা করবে, আমি আসব বা আমি কোথাও অপেক্ষা করব, সে আসবে তেমন কিছু না। কলেজেই দেখা হবে। সবার সামনেই। কী ভেবে আমি ওর জন্য একটা ফতুয়া কিনলাম। নতুন একজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবে, কিছু একটা গিফট দেওয়া উচিত। রক্ত রঙের ফতুয়া। ওর শরীরের মাপ জানি না। আন্দাজেই কিনলাম। দুপুরের দিকে ও এলো। সঙ্গে আমান। আমাদের কলেজের দুটো মাঠ। পশ্চিম দিককার মাঠটা বিশাল। পুব দিককারটা তত বড় না। আমাদের মাঠের বকুলগাছটার তলায় আমরা সাতটা মেয়ে আড্ডা দিচ্ছি। ওরা দুজন এলো। সোহেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল আমান।

ছেলেটা দেখতে যে খুব হ্যান্ডসাম, দেখলেই মেয়েরা একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়বে তেমন কিছুই না। সাধারণ একটা ছেলে। হাইট ভালো, ফিগার ভালো। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথায় ঘন চুল। জিন্স আর অফহোয়াইট টি-শার্ট পরা। পায়ে কেডস। কী রকম একটু লাজুক, ভীতু ধরনের। দেখলে মায়া লাগে।

আমার কিছু মনেই হলো না। দু-একটা কথার পর ফতুয়ার প্যাকেটটা দিলাম। নিল ঠিকই, নিয়েই সামনের দিকে তাকাল। অসহায় গলায় বলল, আমি তো কিছু আনিনি। আমার বান্ধবীরা হাসাহাসি শুরু করল। আমিও হাসলাম। আমি ক্যান্ডি পছন্দ করি। কলেজের বাইরে ‘স্বাধীন স্টোরে’ ভালো ক্যান্ডি পাওয়া যায়। নিয়ে এসো। ও দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এলো।

তুমি বলে ফেললাম। আমার চেয়ে বছরখানেকের বড় একটা ছেলে। আমাদের কলেজে পড়ে, আমার ডিপার্টমেন্টে না হোক, আমরা তো সেম ব্যাচের! ক্যান্ডি খেতে খেতে সোহেল, আমান আর আমরা বান্ধবীরা বেশ একটা হৈচৈ করলাম। নতুন বন্ধুত্ব। দেখি সোহেল আমানও আমাকে তুমি করে বলছে।

তার পর থেকে ফোনে কথা হয়। রোজ রাতেই কথা হয়। ধীরে ধীরে কথা বলার সময় বাড়ছে। আমি দেখি, ওর সঙ্গে কথা না হলে ভালো লাগে না। কী রকম ছটফট করি। রাতে ঘুম হয় না। ও ফোন না করলে বা আমি ফোন করে না পেলে মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বিকাল-সন্ধ্যায় ও দুটো টিউশনি করে। সেই সময় ফোন বন্ধ থাকে। বাড়ি গেলে কখনো কখনো ফোন ধরতে দেরি করে, আমি এত রেগে যাই! ধমকাতে শুরু করি। আমি যত ধমকাই ও তত নরম। অতি শান্ত স্বভাবের ছেলে। এত মায়া লাগে কথা বললে!

ধীরে ধীরে আমরা ঘনিষ্ঠ হতে লাগলাম। কলেজ থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে এদিক-ওদিক বেড়াতে যাই। ঘোড়াদিয়া বাজার, পুটিয়াবাজার ওই সব দিকে ঘুরে বেড়াই। রিকশায় ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে বসে থাকি। ওর সাহস কম। সহজে আমার হাত ধরতে চায় না। আমিই ওর হাত ধরি। কোনো কোনো দিন মেঘনার পারে চলে যাই। নৌকা নিয়ে নদীতে ঘুরে বেড়াই। দু-একবার আমানও নৌকায় আমাদের সঙ্গে ঘুরেছে। ও তো একটু নির্বিকার টাইপের ছেলে। ওর সামনেই আমরা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকি। হাসাহাসি করি, খুনসুটি করি। ভেতরে ভেতরে দুজন দুজনার জন্য পাগল। রাতের পর রাত কথা বলে কাটে। ওর ফোনে ব্যালান্স শেষ হয়ে গেলে আমি ফ্লেক্সিলোড করে দিই। বেড়াতে গেলেও টাকা-পয়সা আমিই খরচ করি। ও টাকা পাবে কোথায়?

বর্ষাকাল এসে গেল। বৃষ্টি শুরু হয় মাঝে মাঝে। ও রকম এক বৃষ্টির দিনে আমরা দুজন রিকশা নিয়ে ঘুরছি। দুপুরের পরই মনে হয় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বৃষ্টিতে নির্জন একটা রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। অয়েলক্লথের পর্দায় ঢেকে আছি দুজনে, তবু বৃষ্টির ছাট আসছে। ভিজে যাচ্ছি। তখনই দেখি দুটো মোটরসাইকেল আসছে পেছন পেছন। কিছুক্ষণ পেছনে থাকে, কিছুক্ষণ সামনে। অর্থাৎ আমাদের ফলো করছে। আকাশে মেঘ, ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে, চারদিক অন্ধকার হয়ে আছে, ধারে-কাছে কোনো বাড়িঘর নেই, সোহেল খুবই ঘাবড়ে গেল। কী হবে এখন?

রিকশাঅলাও ভয় পেয়েছে।

বললাম না, আমি খুবই ডাকাবুকো স্বভাবের ছিলাম। সাহসও ছিল অনেক। কী করবে ওরা? দুটো চ্যাংড়া টাইপের ছেলে। আমাদের বয়সীই হবে। কিছুক্ষণ দেখার পর রিকশাঅলাকে বললাম, রিকশা থামান তো মামা। রিকশাঅলা ভয় পেল, সোহেলও ভয় পেল। আমার হাত ধরে বলল, কী করছ? দিলাম ওকে এক ধমক। তুমি চুপ করো। মামা, রিকশা থামান। রিকশা থামল, পেছনে মোটরসাইকেল দুটোও থামল। পর্দাটর্দা ফেলে বৃষ্টিতেই আমি লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নামলাম। মারমুখো ভঙ্গিতে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সরাসরি তুই-তোকারি। এই, তোদের সমস্যা কী? ফলো করছিস কেন? ভাগবি না স্যান্ডেল খুলব?

চ্যাংড়া দুটো এমন ভয় পেল! একটাও কথা বলল না। উল্টো দিকে মোটরসাইকেল চালিয়ে চোখের পলকে ভাগল। রিকশাঅলা খুব খুশি। উচিত শিক্ষা দিছেন আন্টি। সোহেল বলল, তোমার সাহস আছে। বললাম, একটা ভীতুর ডিমের সঙ্গে জীবন কাটাব, দুজনের একজনের তো সাহস থাকতে হবে।

তত দিনে আমি বুঝে গেছি, সোহেলের সঙ্গে আমার হয়ে গেছে। প্রেম বলো, ভালোবাসা বলো, আত্মার টান বলো—সবই ওর জন্য আমার তৈরি হয়ে গেছে। ওকে ছাড়া আমার উপায় নেই। এর মধ্যে আমরা চুমু খেয়েছি, দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থেকেছি। দুজনই উষ্ণ হয়েছি; কিন্তু সেক্স করিনি। ও চাইলে সেটাও হয়ে যেত। আমি মনে মনে চাইতাম। পূর্ণ যৌবনবতী মেয়ে, আমার তো ইচ্ছে করবেই। আবার লজ্জাও লাগত।

মাস সাতেক এ রকম চলল, তার পরই ওরা দুই বন্ধু ঢাকায় চলে গেল। সোহেলের কিছু একটা করতে হবে, নয়তো বিয়ের পর আমাকে খাওয়াবে কী! অন্যদিকে পড়াশোনাও শেষ করতে হবে। ঢাকায় গিয়ে আমান জুওলজিতে ভর্তি হলো তিতুমীরে, আর সোহেল প্রাইভেটে বিএ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল, ফাঁকে ফাঁকে ওর এক মামার সঙ্গে ছোটখাটো বিজনেস। মামার ডলার-পাউন্ডের ব্যবসা ছিল। ওই ব্যবসায় ইনভলভড হলো।

তখন আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেছে। ফোনে রোজই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হয়। মাঝে মাঝে ও আসে নরসিংদীতে। ও রকম রিকশা নিয়ে ঘুরে বেড়াই। হাফিজের মেসে গিয়েও দেখা করি।

একটু থামল রুমকি। উদাস গলায় বলল, এইভাবে দুই বছর।

ঝুমু কথাই বলছে না। চুপচাপ রুমকির কথা শুনে যাচ্ছে। বাইরে ফাগুন মাসের বিকাল। কৃষ্ণচূড়া ফুটেছে অনেক। গাছের পাতা কাঁপছে হাওয়ায়। অন্যমনস্ক হাওয়া ঢুকে যাচ্ছে রুমকির ঘরে। বসন্তকালের আকাশ গভীর মমতায় স্থির হয়ে আছে বাগানের ওপর।

আমার অনার্স শেষ হওয়ার পরই বিয়ের কথাবার্তা শুরু করলেন মা। বাবা চাইছিলেন মাস্টার্সের পর বিয়ে। মা বললেন, বিয়ের পরও মাস্টার্স করা যাবে। মেয়ের বয়স হয়ে গেছে। এরপর শরীরের সৌন্দর্যে ভাটা পড়তে শুরু করবে। বিয়ে দিয়ে দাও। আমি সোহেলকে জানালাম। সোহেল দিশাহারা হলো। যদিও ওদের বাড়িতে আমার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। তাদের তো কোনো আপত্তি নেই। মেয়ে সুন্দরী, বাড়ির অবস্থা ভালো, উচ্চশিক্ষিত। অসুবিধা কী! কিন্তু সোহেল তো এস্টাবলিশড হয়নি! এখনই বিয়ে করবে কী করে! এই ধরনের আলোচনাও হচ্ছিল। যা হয় আর কি! আমার মা-বাবা তো জানেন না যে তাঁদের মেয়েটি বর ঠিক করে বসে আছে। মাকে না, বাবাকে কথাটা বললাম। শুনে বাবা কোনো কথাই বললেন না। গম্ভীর হয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, তোর মাকে এখনই কিছু বলার দরকার নেই। দেখা যাক। আমি আশ্বস্ত হলাম। কয়েক দিন পর বাবা গম্ভীর মুখে আমার রুমে এলেন। আমি সোহেলদের পরিবারের সব খোঁজখবরই নিয়েছি। নিজেই গিয়েছিলাম ওদের গ্রামে। বাড়ির ভেতর ঢুকিনি, কাউকে কিছু বুঝতেও দিইনি। বাড়ির দিকটা ঘুরে দেখে এসেছি। ও রকম পরিবারে তোর বিয়ে হতে পারে না। ওই বাড়িতে গিয়ে তুই থাকতেও পারবি না। তুই যে রকম সচ্ছলতার মধ্যে বড় হয়েছিস, ওখানে বিয়ে হলে তার কিছুই তুই পাবি না। জীবনে তোর কোনো কিছুতে আমি বাধা দিইনি। তুই যা চেয়েছিস, যা বলেছিস—সবই সব সময় আমি মেনে নিয়েছি। কোনো দিন তোর কাছে আমি কিছু চাইওনি। এই প্রথম চাইছি। আমার কথা তোকে রাখতে হবে। সোহেলকে তোর ছাড়তে হবে। ওই পরিবারে তোকে আমি বিয়ে দেব না।

বাবার ও রকম চেহারাও আমি কোনো দিন দেখিনি, ও রকম কথাও শুনিনি। আমি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ফোন করলাম সোহেলকে। সোহেল খুবই ঘাবড়াল। কী হবে এখন? তোমাকে ছাড়া আমি জীবন কাটাতে পারব না। আমার সব স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাবে। কত স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে আমি দেখেছি...

আমিও তো কত স্বপ্ন তোমাকে নিয়ে দেখেছি। মেয়েরা যেমন দেখে। সংসারজীবন। দুজন দুজনকে ভালোবেসে, আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা! আমাদের সচ্ছলতা না থাক, সংসারে যেন ভালোবাসা থাকে। আমার দিন যেন শুরু হয় তোমার মুখ দেখে, তোমার শুরু হবে আমার মুখ দেখে। দুজন দুজনকে বুকে জড়িয়ে কেটে যাবে আমাদের রাতগুলো...

রুমকি আবার থামল। জানালা দিয়ে তাকাল আকাশের দিকে। আমি শক্ত মেয়ে। সহজে ভাঙি না। কান্নাকাটি আমি করলাম না। গম্ভীর গলায় সোহেলকে বললাম, তুমি রেডি হও। আমরা পালিয়ে বিয়ে করব। বিয়ের পর বাড়িতে জানিয়ে দেব। তারপর যা হওয়ার হবে।

একটা দিনও ঠিক করা হলো। সোহেল ঢাকা থেকে আসবে। আমান, হাফিজও থাকবে ওর সঙ্গে। তারপর কোর্ট, কাজির অফিস—যেখানে যেভাবে যা যা করতে হয় করবে।

আগের দিনই নরসিংদীতে চলে এলো সোহেল। হাফিজের পড়াশোনা শেষ পর্যায়ে। এখনো সেই মেসেই থাকে। তিন বন্ধু সেখানে রাত কাটাল। সকাল দশটার দিকে একটা জায়গায় আমাদের মিট করার কথা। সোহেল অপেক্ষা করবে। আমি আসার পর আমার রিকশায় করেই বিয়ে করতে রওনা দেবে।

রুমকি আবার উদাস হলো। আগের রাতেই আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেললাম।

ঝুমু চমকাল; কিন্তু কথা বলল না।

রুমকি বলল, সারাটা রাত আমার শুধু বাবার কথা মনে হলো। আমাকে এই পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় এনেছেন বাবা। কত যত্নে বড় করেছেন। গায়ে আঁচড়টি লাগতে দেননি। যখন যা চেয়েছি তা-ই পেয়েছি। কখনোই কোনো ব্যাপারে আমাকে না করেননি। মায়ের চেয়ে বাবাকে আমি অনেক অনেক বেশি ভালোবাসি। সেই বাবা জীবনে এই একটা ব্যাপারে আমাকে না করেছেন, অনুরোধ করেছেন তাঁর কথা রাখতে, তা-ও আমার কথা ভেবেই। আমার ভালোর জন্যই। আমি যেন জীবনে সুখী হই, সেটাই তিনি চাইছেন। তাঁকে আমার বোঝানোর সাধ্য নেই, বাবা, মানুষ শুধু সচ্ছল জীবনেই ভালো থাকে না। মানুষ ভালো থাকে ভালোবেসে। যদি ভালোবাসা না থাকে, তাহলে জীবনে আর থাকে কী!

আমাদের মতো পরিবারের মা-বাবারা এসব বুঝতে চান না। যতই যুক্তি আমি দিই, তাঁরা মানবেন না। আমার মন তাঁরা বুঝতে চাইবেন না। তার পরও আমার কান্না পেল না। আমি শক্ত হয়ে গেলাম, গম্ভীর হয়ে গেলাম।

পরদিন সকালবেলা ঠিক সময়েই গেলাম জায়গামতো। গিয়ে দেখি সোহেল একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে। সেদিনও আকাশ মেঘলা। রোদ নেই। সুন্দর পাঞ্জাবি পরেছে সোহেল। খুব ভালো লাগছে ওকে দেখতে। আমার রিকশা দেখেই হাসিমুখে এগিয়ে এলো। রিকশায় উঠতে যাবে, বললাম, দাঁড়াও। রিকশা থেকে নেমে সেই গাছতলাটায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সোহেল অবাক। তোমার কী হয়েছে? আমি সোহেলের মুখের দিকে তাকালাম না। ধীর শান্ত কিন্তু ইস্পাতের মতো কঠিন গলায় বললাম, তোমাকে আমি বিয়ে করতে পারছি না, সোহেল। তুমি আমাকে ভুলে যাও। আজকের পর তোমার সঙ্গে আমার আর কোনো দিনও দেখা হবে না, কথা হবে না।

সোহেলের মুখটা এমন হলো, যেন এই মাত্র ওর বুকে কেউ ছুরি মেরেছে। কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব হয়ে থাকল সে, তারপর বলল, কী বলছ রুমকি? কেন? কেন তুমি এ রকম সিদ্ধান্ত নিলে? কী করেছি আমি?

তুমি কিছুই করোনি। তোমার কোনোই দোষ নেই। দোষ আমার। আমি আমার বাবার কথা রাখছি।

ঝুমু তীক্ষ চোখে রুমকির দিকে তাকাল। রুমকির চোখ দুটো ছলছল করছে। গলা জড়িয়ে এলো। কোনো রকমে বলল, তারপর আমার হাত ধরে সোহেল যে কী কান্নাটা কাঁদল! তুমি এত নিষ্ঠুর হয়ো না রুমকি। আমাদের জীবন নষ্ট কোরো না, স্বপ্নগুলো তছনছ করে দিয়ো না।

সোহেলের কান্না দেখে আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। কিন্তু আমি শক্ত, আমি ইস্পাত হয়ে গেছি। আমার চোখে পানি নেই। আলতো করে সোহেলের হাতটা ছাড়িয়ে রিকশায় উঠলাম...

দীর্ঘক্ষণ পর এই প্রথম কথা বলল ঝুমু। তারপর?

সোহেল ফোনে অনেক চেষ্টা করল। আমান, হাফিজও কথা বলার চেষ্টা করল ফোনে। আমি কারো ফোন ধরিনি। ওই ফোনটা একসময় অফই করে দিলাম। নতুন সিম নিলাম। মাস পাঁচেক পর পুরনো ফোনটা অ্যাকটিভ করেছি। সোহেলের ফোন এলো। ধরলাম ফোনটা। ধরে একটাই কথা বললাম, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।

ঝুমু বলল, সোহেল এখন কোথায়?

কানাডায়। শুনেছি ওদের এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়র মেয়েকে বিয়ে করেছে। মেয়ের ফ্যামিলি বহু বছর ধরে কানাডায়। যে মামার সঙ্গে সোহেল বিজনেস শুরু করেছিল, সেই মামাই ঘটকালি করেছেন। শুনেছি, সোহেল নাকি বাংলাদেশে থাকতেই চাইছিল না। মেয়েটা ডিভোর্সি, ওর চেয়ে বয়সে বড়।

একটু থামল রুমকি। তারপর বলল, আমি জানি, আমার ওপর অভিমান করেই দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তটা সোহেল নিয়েছে। কোনো দিনও হয়তো আর বাংলাদেশে ফিরবে না।

চেপে চেপে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রুমকি। কত স্বপ্ন ওকে নিয়ে আমি দেখতাম। প্রতিদিনকার স্বপ্ন, প্রতি রাতের স্বপ্ন, প্রতি মুহূর্তের স্বপ্ন। আমার সেই স্বপ্ন ছিনতাই হয়ে গেল। আমি জানি, ওই মেয়ের সঙ্গে কোনো দিনও সুখী হবে না সোহেল। তাকে নিয়ে কোনো স্বপ্নও দেখবে না। শুধু জীবনটা কাটিয়ে যাবে, যে জীবন আমি কাটাচ্ছি। ওপর ওপর দেখে সবাই বুঝবে, কত সুখে আমরা আছি। হাসছি খেলছি, আনন্দ করছি, সন্তান জন্ম দিচ্ছি; কিন্তু ভেতরটা কাঁদছে অন্য একজনের জন্য। যে জীবন চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না।

রুমকির চোখ দুটো ছলছল করতে লাগল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল সে।

ঝুমু আলতো করে তার একটা হাত ধরল। গভীর মায়াবী গলায় বলল, সম্ভব হলে তোমার সেই জীবনটা আমি ফিরিয়ে দিতাম।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা