kalerkantho

সোমবার। ১৯ আগস্ট ২০১৯। ৪ ভাদ্র ১৪২৬। ১৭ জিলহজ ১৪৪০

বি শে ষ র চ না

কুয়াকাটায় কাটল কেমন

হানিফ সংকেত

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২২ মিনিটে



কুয়াকাটায় কাটল কেমন

অঙ্কন : বিপুল শাহ

দুই দশক ধরেই ‘ইত্যাদি’কে স্টুডিওর চার দেয়ালের ভেতর থেকে বাইরে এনে আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাচ্ছি শিকড়ের সন্ধানে। উদ্দেশ্য নিজেকে জানা এবং অন্যকে জানানো। ২০১৮ সালের শেষ অনুষ্ঠানটি আমরা করেছিলাম বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অবস্থিত সুনামগঞ্জ জেলার দুর্গম অঞ্চল তাহিরপুর উপজেলার টেকেরঘাটে। পাহাড়-নদী-হাওরবেষ্টিত টেকেরঘাটে অনুষ্ঠান শেষ করার কিছুদিন পরই প্রস্তুতি শুরু হলো পরবর্তী অনুষ্ঠানের। কারণ ধারণস্থান ঠিক করা একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। যেহেতু উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘ইত্যাদি’ করা হয়েছে, তাই চিন্তা করলাম এবার দক্ষিণাঞ্চলে যাব। তাই দক্ষিণাঞ্চলের যেসব জেলায় ‘ইত্যাদি’ করা হয়নি, সেসব জায়গা নিয়ে আমরা ভাবতে শুরু করলাম। যেহেতু ‘ইত্যাদি’র ভাবনার মধ্যে থাকে ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিক্ষা-সংস্কৃতি ও প্রাচীন নিদর্শন তুলে ধরা, অর্থাৎ শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। তাই কোনো জেলায় গিয়ে কোনো খোলা মাঠ বা স্টেডিয়ামে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হয় না। ‘ইত্যাদি’র ধারণস্থানেরও একটি বিশেষত্ব থাকে। যেমন—রংপুরে আমরা তাজহাট জমিদারবাড়ি, রাজশাহীতে পুঠিয়া জমিদারবাড়ি, চট্টগ্রাম বন্দর, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত, ঢাকার সংসদ ভবন, লালবাগের কেল্লা, বগুড়ার মহাস্থানগড়, কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধ বিহার, নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, কুষ্টিয়ার রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, ফরিদপুরে কবি জসীম উদ্দীনের বাড়ি—এমন বিভিন্ন জেলায় অর্ধশতাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করেছি। দক্ষিণাঞ্চলেও অনেক স্থান রয়েছে, যেসব স্থানের ইতিহাস-ঐতিহ্য বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার মতো। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যেসব স্থানে আমরা মঞ্চ নির্মাণ করব, সেখানে আমাদের আমন্ত্রিত ৫ থেকে ১০ হাজার মানুষের স্থান সংকুলান হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া ‘ইত্যাদি’ হবে জানলে পুরো শহর এবং আশপাশের দর্শকরা বাঁধভাঙা স্রোতের মতো আসে অনুষ্ঠান উপভোগ করতে। তাই অনুষ্ঠানের সীমিত আসনের বাইরে তাদেরও স্থান সংকুলানের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি স্থানটির একটি গুরুত্বও থাকতে হবে। প্রাচীন কোনো প্রত্ন নিদর্শন, পর্যটনকেন্দ্র, সমুদ্রসৈকত কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সামনে মঞ্চ নির্মাণের উপযোগী স্থানও থাকতে হবে। সব কিছু মিলিয়ে ‘ইত্যাদি’ ধারণের স্থান নির্বাচন প্রক্রিয়াও কিছুটা জটিল।

সব জেলায়ই ‘ইত্যাদি’ ধারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি প্রতিটি জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে গিয়ে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করতে। অনেক ভেবেচিন্তে সীমান্তবর্তী পাহাড়ঘেরা টেকেরঘাটে ধারণ করা ‘ইত্যাদি’র পর আমরা স্থান হিসেবে বেছে নিলাম সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে।

ধারণস্থানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমরা গত ২২ জানুয়ারি ‘ইত্যাদি’র বিভিন্ন বিভাগের কর্মীদের নিয়ে কুয়াকাটা যাই। ঢাকা থেকে লঞ্চে বরিশাল এবং সেখান থেকে মাইক্রোবাসে কুয়াকাটা। আমরা যখন কুয়াকাটা পৌঁছি তখন সকাল ৯টা। হোটেলে গিয়ে লাগেজ রেখে সদলবলে বেরিয়ে পড়ি ধারণস্থান নির্ধারণের উদ্দেশে। ‘ইত্যাদি’র টিমে আমরা ছিলাম মোট ১০ জন। হোটেল থেকে রাস্তায় বেরিয়ে অবাক হয়ে গেলাম, কারণ এখানেও অনেকটা টেকেরঘাটের মতো অবস্থা। চলাচলের জন্য তেমন কোনো যানবাহন নেই। সমুদ্রসৈকতে ভ্রমণের জন্য কক্সবাজারের মতো এখানে তেমন কোনো গাড়ির ব্যবস্থাও নেই কিংবা মেরিন ড্রাইভ। চলাচলের একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। আমরা আমাদের মাইক্রোবাসে সমুদ্রতীরে এসে পৌঁছতেই বিভিন্ন বয়সের বেশ কিছু মানুষ এগিয়ে আসে আমাদের দিকে। তারা সবাই মোটরসাইকেলচালক। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, মাত্র দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই তারা পুরো কুয়াকাটার আকর্ষণীয় স্থানগুলো আমাদের দেখিয়ে দেবে। স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় আমরা ১০টি মোটরসাইকেল নিলাম। সবাই মিলে একেকটা বাইকে চড়ে বসলাম। সমুদ্রতীর ঘেঁষে চলছে বাইক। বাইকের আওয়াজে সমুদ্রের ছোট ছোট মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে, চমৎকার সে দৃশ্য। কুয়াকাটায় এই মোটরবাইকচালকরাই গাইডের দায়িত্ব পালন করে। দুই ঘণ্টা ধরে সাগরের তীর ঘেঁষে এই গাইডরা আমাদের যে স্থানগুলোতে নিয়ে গেল তা হলো—লেম্বুরচর, শুঁটকিপল্লী, সি ফিশ মিউজিয়াম, নারিকেলবীথি, ঝাউবন, ফাতরার বন, টেংরাগিরি, গঙ্গামতির চর, রাখাইনপল্লী, মিশ্রিপাড়া ও কাউয়ারচর।

কুয়াকাটার পশ্চিমে রয়েছে আন্ধারমানিক নদের মোহনা, সখিনার সি-বিচ এবং ম্যানগ্রোভ বন ফাতরার বন। একটি বনের নাম ফাতরা শুনতে কিছুটা শ্রুতিকটু হলেও বাইকচালক জানালেন, মূলত এখানে আগে বিভিন্ন ধরনের নাম-না-জানা আজেবাজে গাছ হতো। তাই স্থানীয়রা এই বনকে ফাতরার বন বলত। বনটির আসল নাম টেংরাগিরি।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের প্রবেশপথ থেকে মোটরবাইকে যাত্রা শুরু করে লেম্বুরচর যাওয়ার সময় পথে কিছু ছোট ছোট পোকার ঝাপটা এসে লাগবে চোখে-মুখে, যা আপনার আনন্দময় ভ্রমণকে বিষাদময় করে তুলতে পারে। তাই সানগ্লাস কিংবা চোখে চশমা পরে নেওয়া ভালো। আর যাঁরা কাউয়ারচরে লাল কাঁকড়া দেখতে যাবেন তাঁদের হতাশ হতেই হবে। কারণ মোটরসাইকেলের আওয়াজ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব কাঁকড়া গর্তে ঢুকে যাবে। যদিও অনেকেই বলেন, এখানে এলেই লাল কাঁকড়া আপনাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেবে, এ কথা মোটেও সঠিক না।

আমরা দীর্ঘ দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা মোটরবাইকে অনেকটা পথ ঘুরে ‘ইত্যাদি’ করার মতো আকর্ষণীয় কোনো স্থান খুঁজে পেলাম না। মাত্র দু-একটি জায়গা পাওয়া গেছে, যেখানে মোটরসাইকেল ছাড়া আর কোনো যানবাহন যাবে না। তদুপরি ওসব স্থানে বিদ্যুৎও নেই। কিন্তু আমাদের অনুষ্ঠান ধারণের জন্য বিদ্যুতের সংযোগ কিংবা জেনারেটর পরিবহনের ব্যবস্থা থাকতে হবে; পাশাপাশি সেট ও লাইটের কয়েক ট্রাক মালপত্র ধারণস্থানে নেওয়ার মতো রাস্তা থাকতে হবে। প্রথম দিন সিদ্ধান্তহীনতায় কেটে গেল। পরদিন খুব ভোরে উঠে আবারও স্থান নির্বাচনের জন্য ছুটলাম। যেতে যেতে সমুদ্রতীরে একটি জায়গায় দেখলাম কয়েকটি তালগাছ এবং শখানেক মাছ ধরার নৌকা দাঁড়িয়ে আছে। চোখ আটকে গেল। এসব তালগাছ রাতে আলোকিত করলে এবং মঞ্চের পেছনে যদি শতাধিক বড় বড় মাছ ধরার নৌকা রাখা যায় তাহলে ভালোই লাগবে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, নৌকাগুলো এখানে থাকবে না। ওরা আসে এবং নির্দিষ্ট সময় পরে চলে যায়। কিন্তু এখানে সেট করতে গেলে নৌকা লাগবেই। কী করে পাওয়া যাবে এত নৌকা? জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। তিনি তাঁর জেলায় ‘ইত্যাদি’ হবে জেনে খুব খুশি হলেন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। কথা বললাম স্থানীয় পৌর মেয়রের সঙ্গে। তিনিও সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন। তাঁদের আশ্বাসে বিশ্বাস পেয়ে সদলবলে ঢাকা চলে এলাম। শুরু হলো কুয়াকাটাকে নিয়ে পরিকল্পনা এবং নির্মাণ আয়োজন। দীর্ঘ এক মাস ধরে পটুয়াখালী জেলা এবং এর বিভিন্ন উপজেলার বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করে সাজানো হলো ‘ইত্যাদি’র কুয়াকাটা পর্ব। আয়োজন শেষে গত ২০ ফেব্রুয়ারি (২০১৯) যাত্রা শুরু করলাম আবারও কুয়াকাটায়। এবারে স্থান নির্ধারণ নয়, অনুষ্ঠান ধারণের জন্য। অগ্রগামী দল চলে গেছে আরো পাঁচ দিন আগে। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারি কুয়াকাটা গিয়ে আমরা বেশ বিপদেই পড়ে গেলাম। সে সময় একুশে ফেব্রুয়ারি ও শুক্র-শনি মিলিয়ে কয়েক দিনের বন্ধে কুয়াকাটায় কয়েক লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে। কুয়াকাটায় এত পর্যটক আসবে তা আমাদের ধারণায়ই ছিল না। কোনো হোটেল-রেস্তোরাঁয় স্থান সংকুলান হচ্ছে না; যদিও আমাদের থাকার জায়গা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খাবার। প্রায় ১৫০ জন লোকের খাবার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ল। কয়েকটি হোটেল মিলিয়ে আমাদের খাবারের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অতিরিক্ত লোক হওয়ায় আমাদের জন্য নির্ধারিত খাবারও পর্যটকদের খাইয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ক্ষুধায় অনেকেই আধাসিদ্ধ অবস্থায় ভাত খেয়েছেন। কেউ বা আলু সিদ্ধ, ডিম ভাজি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করেছেন। তারপর যারাই জেনেছে এখানে ‘ইত্যাদি’ ধারণ করা হবে, তারা আর নড়ছে না। তাদের বেশির ভাগই ‘ইত্যাদি’ দেখে যাবে। কারণ ‘ইত্যাদি’র ধারণ দেখা তাদের জন্য এই ভ্রমণে একটি বাড়তি পাওনা।

অবশেষে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় গত ২২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আগুনমুখা, পায়রা ও লোহাদিয়া নদীবিধৌত পটুয়াখালী জেলার সাগরকন্যা কুয়াকাটার সমুদ্রসৈকতে লক্ষাধিক দর্শকের উপস্থিতিতে ধারণ করা হলো ‘ইত্যাদি’র কুয়াকাটা পর্ব, যা প্রচারিত হয়েছে গত ২৯ মার্চ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত বিচিত্র বৈচিত্র্যে সমুজ্জ্বল জেলা পটুয়াখালী। জেলা শহর থেকে প্রায় ৭২ কিলোমিটার দক্ষিণে কলাপাড়া উপজেলায় মহিপুর থানায় অবস্থিত সাগরকন্যা কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত। ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের কুয়াকাটা সৈকত দেশের অন্যতম নৈসর্গিক স্থান। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শুধু এই সৈকত থেকেই সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সৈকতের পূর্ব প্রান্তের গঙ্গামতির চর থেকে সূর্যোদয় এবং পশ্চিম প্রান্তের লেম্বুরচর থেকে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়।

‘সাগরের বুকে সূর্য উদয়

সাগরে অস্ত যাওয়া

সৌন্দর্যের বেলাভূমি ছুঁয়ে হাঁটা

এই সেই কুয়াকাটা’—

কুয়াকাটার নামকরণ কেন কুয়াকাটা? জানা যায়, বর্মী রাজা ১৭৮৪ সালে রাখাইনদের মাতৃভূমি আরাকান দখল করলে রাজার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে হাজার হাজার রাখাইন তাদের মাতৃভূমি আরাকান ছেড়ে বড় বড় নৌকায় অজানার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। একসময় তারা বঙ্গোপসাগরের তীরে জনমানবশূন্য রাঙ্গাবালী দ্বীপে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। সমুদ্রের পানি পানযোগ্য নয় বলে দুই শতাধিক বছর আগে আরাকান থেকে আসা এই রাখাইন সম্প্রদায় সুপেয় পানির আশায় এখানে প্রচুর কূপ বা কুয়া খনন করে। সেই কূপ বা কুয়া থেকেই এই অঞ্চলের নাম হয়েছে কুয়াকাটা।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের কাছে ঐতিহ্যবাহী শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের পাশেই রয়েছে প্রাচীন কূপগুলোর একটি। কুয়াকাটা ভ্রমণে এলে সব পর্যটকই কূপটি দেখতে যায়।

কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে রাখাইন আদিবাসীদের আরেকটি বাসস্থল রয়েছে, নাম মিশ্রিপাড়া। মিশ্রিপাড়াও মূলত রাখাইনপল্লী হিসেবে পরিচিত। এখানকার রাখাইন নারীদেরও প্রধান কাজ কাপড় বুনন। এখানে রয়েছে আরেকটি বুদ্ধমন্দির, আর প্রাচীন এই মন্দিরে রয়েছে প্রায় ৩৭ মণ ওজনের অষ্টধাতুর তৈরি ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের মূর্তি। এখানেও দেখা যায় প্রাচীন কুয়াগুলোর একটি কুয়া বা কূপ।

কুয়াকাটা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার উত্তরে রয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম মাছ ব্যবসার কেন্দ্র আলীপুর। সারা বছরই এখানে দেখা যায় জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। এই বন্দর থেকে প্রতিদিন শত শত ট্রলার বঙ্গোপসাগরে যায় মাছ ধরতে। কুয়াকাটায় রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র কোস্ট গার্ড বাহিনীর প্রশিক্ষণ ঘাঁটি সিজি বেইস ‘অগ্রযাত্রা’।

পটুয়াখালী জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত আরেকটি স্থান হচ্ছে রাঙ্গাবালী উপজেলায় বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা সাত কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্রসৈকতের অপরূপ রূপের সোনারচর। ২০১১ সালের ১৬ ডিসেম্বর সরকার এই চরকে বন্য প্রাণীদের অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করে। এই সোনারচর থেকেও সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়।

সাম্প্রতিককালে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে জেগে উঠেছে আরেকটি নতুন চর। জেলেদের কাছে হাইরের চর নামে পরিচিত এই চরটি বিজয়ের মাসে খুঁজে পাওয়া গেছে বলে এর নামকরণ করা হয়েছে চরবিজয়। হাজার হাজার অতিথি পাখি আর চরজুড়ে লাল কাঁকড়ার বিচরণ চরটিকে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বর্ষার সময় চরটি ডুবে থাকে এবং বর্ষা শেষে শীত মৌসুমে সাগরের বুকে আবার জেগে ওঠে এই চর।

পটুয়াখালী জেলার এই কুয়াকাটায়ই রয়েছে দেশের দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন। কক্সবাজার দিয়ে আসা প্রথম সাবমেরিন কেবলের তুলনায় প্রায় আট গুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন এই স্টেশন চালু হওয়ায় নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে দক্ষিণাঞ্চলসহ পুরো দেশ। উল্লেখ্য, দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবলের দৈর্ঘ্য হচ্ছে ২০ হাজার কিলোমিটার।

পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় অবস্থিত দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। পায়রা বন্দরের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন শিল্পপণ্য পরিবহনে যেমন সময় বাঁচানো যাবে, তেমনি ব্যয়ও কমে যাবে। তা ছাড়া অন্য সমুদ্রবন্দরে যে নৌকাগুলো প্রবেশ করতে পারে না, সেগুলো এখানে এসে পণ্য ওঠানামা করাতে পারবে। মূলত পায়রা সমুদ্রবন্দর হবে একটি আন্তর্জাতিক মানের গভীর সমুদ্রবন্দর। বলা যায়, ভবিষ্যতে এই বন্দরটি আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবে। ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর অপারেশন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর তখন থেকে বন্দরটি আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে।

এ অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন আশার আলো পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। বলা হয়, এটিই দেশের সবচেয়ে বৃহৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুেকন্দ্র, যেখানে ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন হবে। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নের নিশানবাড়িয়া মৌজায় কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৬ সালে। ওই বছরেরই ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

মুক্তিযুদ্ধে পটুয়াখালীর রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। একাত্তরের ২৬ এপ্রিল হানাদার বাহিনী পটুয়াখালী আক্রমণ করে। পটুয়াখালী জেলার পুরনো জেলখানার অভ্যন্তরের গণকবর মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার নির্মম সাক্ষী হয়ে আছে আজও। রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শেষে ১৯৭১ সালের ৮ ডিসেম্বর পটুয়াখালী জেলা হানাদারমুক্ত হয়। এই জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে চরগঙ্গামতি, আগুনমুখা নদীর মোহনা, নৌকা জাদুঘর, শুঁটকিপল্লী, সি ফিশ মিউজিয়াম, লেম্বুরচর, পানি জাদুঘর, চাবিজয়, সোনার চর ইত্যাদি। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের পূর্বপুরুষদের বাড়িও পটুয়াখালী জেলায়।

কুয়াকাটায় পর্যটকদের জন্য দর্শনীয় আরেকটি বস্তু হচ্ছে কুয়াকাটার বুদ্ধমন্দিরসংলগ্ন বেড়িবাঁধের পাশে সংরক্ষিত একটি বিশেষ নৌকা। নৌকাটি ২০১৩ সালের আগস্ট মাসে এখানে স্থাপন করা হয়। এটিই হচ্ছে শতাধিক বছরের (২০০ বছরের) পুরনো নৌকা। ২০১২ সালের জুনের শেষ দিকে ঝাউবনসংলগ্ন বালুর বুকে ব্যতিক্রমী প্রত্নসম্পদ এই নৌকাটি দৃশ্যমান হয় এবং পরবর্তী সময় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের তত্ত্বাবধানে এটি উত্তোলন করা হয়। বিশেষভাবে সংরক্ষিত নৌকাটি কাঠ, লোহা ও তামার পাত দিয়ে তৈরি।

পটুয়াখালী জেলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। এই অঞ্চল লোকগীতি, বিশেষ করে জারি ও ভাটিয়ালিগানের জন্য বিখ্যাত। প্রায় দুই শ বছর আগের সাক্ষী বাউফল উপজেলা সদরের ঐতিহাসিক নিদর্শন জমিদার মহেন্দ্র রায়চৌধুরী ও রাজেন্দ্র রায়চৌধুরীর কাছারিবাড়ি, যেটি বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস হিসেবে পরিচিত। চতুর্দশ শতাব্দীতে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহর শাসনামলে বরিশাল, ফরিদপুর ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য ছিল। বাউফলের নাজিরপুর ইউনিয়নের কচুয়া নামক স্থানে এই চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী ছিল।

আবহমান বাংলার লোকশিল্পের মধ্যে প্রাচীনতম হচ্ছে মৃিশল্প। বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম মদনপুর। একসময় এই  মদনপুরের পালপাড়াকে মৃিশল্পনগরী বলা হতো। তখন দেশের মৃিশল্পের চাহিদার একটি বিরাট অংশ এই এলাকা থেকে মেটানো হতো। এখানে দৈনন্দিন জীবনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, যেমন—হাঁড়ি, পাতিল, কলস, থালা-বাসন ইত্যাদি তৈরি করা হয়। এখন বাউফলের যেকোনো পালপাড়ায় ঢুকলেই দেখা যায়, মাটির শিল্প তৈরিতে নারী-পুরুষরা সারাক্ষণ ব্যস্ত। দিনমজুরিতেও বহু নারী-পুরুষ কাজ করছে। কিন্তু অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল, টিন, প্লাস্টিক ও ম্যালামাইনসামগ্রী বাজার দখল করে নেওয়ায় মাটির তৈরি জিনিসপত্রের ব্যবহার কমে গেছে। তার পরও পটুয়াখালীর বাউফলের কয়েকজন মৃিশল্পী নানা প্রতিকূলতায় তাদের এই পুরনো ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। তারা রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে মান্ধাতার আমলের কারুকার্য ও রুচির পরিবর্তন ঘটিয়ে নান্দনিক ও শৈল্পিক চিন্তাচেতনা দিয়ে নতুন নতুন শৌখিন মৃৎসামগ্রী তৈরি করতে শুরু করে।

এবার পটুয়াখালীর সাপের খামার প্রসঙ্গ। সাপ সবার কাছে অভিশাপ নয়, বরং ভয়কে জয় করে শিখতে হয় সাপ ধরার কৌশল। আর সুকৌশলে এই কৌশল রপ্ত করেছেন পটুয়াখালীর সদর উপজেলার নন্দীপাড়ার আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস, যিনি বিশ্বাসের সঙ্গেই সাপ চাষকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন এবং তাঁর এই সাপের খামার অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে সাপ ধরা ও পালনের পদ্ধতি দেখতে দেখতেই একসময় সাপের খামার গড়ার চিন্তা মাথায় আসে রাজ্জাক বিশ্বাসের। ২০০৩ সালে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত একটি দেশি কোবরা ও ২৪টি ডিম দিয়ে নন্দীপাড়া গ্রামে ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ নামে একটি সাপের খামার শুরু করেন। এরপর দিন দিন তাঁর খামারে বাড়তে থাকে সাপের সংখ্যা। বর্তমানে তিন প্রজাতির ২৫০টি বিষধর সাপ রয়েছে তাঁর কাছে। ব্যাঙ, ইঁদুর, মুরগি, কোয়েল ও কোয়েলের ডিম খেতে দেন সাপকে। সাপকে খাওয়ানোর জন্য ব্যাঙের চাষও করেন তিনি। সাপকে খাওয়ানোর কাজটি বেশির ভাগ সময় রাজ্জাক নিজ হাতেই করে থাকেন। প্রত্যেক সপ্তাহে খামারের সব সাপকেই ব্রাশ দিয়ে পরিষ্কার করেন। আর মাঝেমাঝে সাপকে চলাচল করার জন্য পানিতে ছেড়ে দেন।

রাজ্জাক বলেন, বিভিন্ন বিষধর সাপ থেকে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উৎপাদন হতে পারে ক্যান্সার, বি-ভাইরাস নামক মারণব্যাধিসহ একাধিক রোগের ওষুধ অথবা অ্যান্টিভেনম। প্রতিদিনই কেউ না কেউ রাজ্জাকের এই সাপের খামার পরিদর্শনে আসে। ফিরে যায় বিচিত্র সর্প অভিজ্ঞতা নিয়ে।

আপনাদের অনেকেরই হয়তো পটুয়াখালী জেলার বাউফলের ধুলিয়া গ্রামের মোতালেবের কথা মনে আছে। ১৯৯৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর প্রচারিত ‘ইত্যাদি’তে আমরা তাঁর ওপর একটি প্রতিবেদন প্রচার করেছিলাম। ১৯৭৬ সালে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ক্ষুধা ও অভাবের তাড়নায় বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলে একজন ডাচ ভদ্রলোক তাঁকে হল্যান্ডে নিয়ে যান। হল্যান্ডে মোতালেবের ১৭টি বছর কেটে যায়। কিন্তু নিজের শিকড়ের খোঁজে বাংলাদেশে বারবার এসে অনেক খোঁজাখুঁজি করে দীর্ঘ দেড় যুগ পরে ১৯৯৪ সালে খুঁজে পান তাঁর পরিবারকে। মোতালেবের পরিবারকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি আমাদের দেশে এবং বিদেশে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সেই সময় ‘ইত্যাদি’তেও মোতালেব বলেছিলেন, তিনি শুধু তাঁর পরিবারেরই নয়, তাঁর গ্রামের উন্নয়নেও কিছু করতে চান। দীর্ঘ ছয় বছর পর ২০০১ সালের মে মাসে আমরা ‘ইত্যাদি’তে দেখিয়েছিলাম, মোতালেব তাঁর স্ত্রী দুশীকে নিয়ে গ্রামের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড করে চলেছেন এবং সে জন্য ১৯৯৭ সালেই তিনি স্লোব নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। মোতালেবের এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা, পয়োনিষ্কাশন এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য গ্রামে কয়েক শ টয়লেট ও নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহের জন্য পোল্ট্রি ফার্ম করে দিয়েছে। নির্মাণ করেছে মা ও শিশুস্বাস্থ্য ক্লিনিক। শুরু করেছে এতিম ছেলে-মেয়েদের জন্য একটি এতিমখানা।

বিভিন্ন সময় মোতালেবের এই প্রতিষ্ঠানে বিদেশিরা আসত এবং সময় কাটাত এতিম শিশুদের সঙ্গে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে মিশে আবেগাপ্লুত হয়ে যেত বিদেশিরা। ২০১৯ সালে পটুয়াখালীতে ‘ইত্যাদি’ করতে এসে আমরা আবারও গিয়েছিলাম বাউফলের ধুলিয়া গ্রামে মোতালেবের গ্রাম উন্নয়ন কার্যক্রমের অগ্রগতি দেখতে। জেনে অবাক হয়েছি, এখন তাঁর প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুধু তাঁর গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়, বিস্তৃতি লাভ করেছে জেলার আটটি উপজেলায়।

বর্তমানে মোতালেব তাঁর এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দুই হাজার ৬০০ গভীর নলকূপ স্থাপন করেছেন, যা আটটি উপজেলার প্রায় দুই লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করেছে। এই সময়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে ১৪ হাজারের অধিক স্যানিটারি ল্যাট্রিন স্থাপন করেছেন, যা এক লাখ মানুষের জন্য উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে। বর্তমানে পাঁচটি উপজেলায় তিনটি পানি ও স্যানিটেশন প্রকল্প চলমান, যা দেড় লাখ মানুষের জন্য নিরাপদ পানি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে মোতালেবের স্ত্রী দুশী মৃত্যুবরণ করেন। পেশাগতভাবে ফার্মাসিস্ট ছিলেন বলে একসময় দুশী এই হাসপাতালে সেবিকা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্ত্রীর স্মৃতি ধরে রাখতে মোতালেব হাসপাতালের নাম রাখেন ‘ইনগ্রিড মেমোরিয়াল হসপিটাল’। বর্তমানে হাসপাতালে সার্বক্ষণিকভাবে দুজন ডাক্তার, নার্স, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, আউটডোর-ইনডোর, এক্স-রে, প্যাথলজি, আলট্রাসনোগ্রাম ও অপারেশন থিয়েটার, নিজস্ব অ্যাম্বুল্যান্সসহ সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সুবিধা থাকার কারণে কালীশুরী ইউনিয়নে কারোরই স্বাস্থ্যসেবার জন্য শহরে যেতে হয় না। এরই মধ্যে এই হাসপাতালের উদ্যোগে ১ লাখ ২৫ হাজার নারী ও পুরুষকে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতন করা হয়েছে।

কুয়াকাটার বিস্তীর্ণ সাগর, দিগন্ত পর্যন্ত পানি আর পানি, তার বুকে মাছ, নৌকা আর জাল নিয়ে চলে যেসব মানুষের জীবনচক্র, কুয়াকাটায় অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তেমনই একজন মানুষের দেখা পেয়েছিলাম আমরা, যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে হলেও এগিয়ে আসেন অন্যের জীবন রক্ষা করতে। তাঁর এই নিঃস্বার্থ মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য সাগরের মাঝিরা তাঁর নাম দিয়েছেন সাগরবন্ধু। তিনি হচ্ছেন কুয়াকাটা ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনপুর গ্রামের মন্নান মাঝি।

মন্নান মাঝি যেন সাগরের সন্তান। সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশিতেই জীবন খুঁজে নিয়েছেন তিনি। সাগরকে ঘিরেই চলছে তাঁর নিজের জীবনসংগ্রাম এবং অন্যের জীবন বাঁচানোর অসাধারণ জীবন। আলীপুর মৎস্যবন্দর আর সাগরেই সময় কাটে মন্নান মাঝির। সাগরের মাঝিরাই ভালোবেসে তাঁকে বানিয়েছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার ফিশিং ট্রলার মাঝি সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি।

মন্নান মাঝির বয়স ৫৬ বছর। অভাবের তাড়নায় ২০ বছর বয়স থেকেই প্রথম সাগরে যাওয়া শুরু করেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে অবিরাম চলছে তাঁর সাগরযাত্রা। তবে বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকলে কিংবা রেডিওতে ঝড় বা বিপদের সংকেত শুনলে যাত্রাবিরতি দেন, অন্যদেরও নিবৃত্ত করেন। মাছ ধরতে যাওয়ার সময় মন্নান মাঝির সঙ্গী থাকে ১৭ থেকে ১৮ জন। তাঁর ব্যবহৃত ট্রলারের নাম এফবি মরিয়ম। এই ট্রলার নিয়েই শুরু হয় তাঁর গভীর সমুদ্রে যাত্রা এবং মাছ ধরা। বর্ষায় কুয়াকাটায় আর শীতে কক্সবাজারে চলে তাঁর মৎস্য শিকার। মাছ ধরার স্থানে যেতে এক মাসও লেগে যায়, ফিরতেও ঠিক তেমনি।

সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে কেউ যদি বিপদে পড়ে কিংবা বোট বা ট্রলার নষ্ট হয়ে যায়, মন্নান মাঝি নিজের মাছ ধরা বাদ দিয়ে বিপদ মাথায় নিয়ে সেই মাঝিদের উদ্ধার করে ঘাটে নিয়ে আসেন। সেই যাত্রায় তাঁর আর মাছ ধরা হয় না। ২০০৭ সালে প্রলয়ংকরী সিডরের সময় অনেক মাঝির লাশ উদ্ধার করে তাদের বাড়িতে নিয়ে পৌঁছে দেন মন্নান মাঝি। যেকোনো সাগর মাঝির বিপদে-আপদে সাগরে এবং ডাঙায় উভয় স্থানেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন মন্নান মাঝি।

শুধু সাগরই নয়, গ্রামে কেউ যদি কোনো ব্যাপারে সাহায্য চাইতে আসে, বিশেষ করে কোনো কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কিংবা কারো চিকিৎসার প্রয়োজন হলে মন্নান মাঝি উদ্যোগ নিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন।

মন্নান মাঝির মনে দাগ কেটেছে এমন দু-একটি ঘটনার কথা জানতে চেয়েছিলাম। শুরু করেন ১৯৮৩ সালের একটি ঘটনা দিয়ে, ‘গভীর রাতে জাল ফেলে অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ গোঙানির আওয়াজ শুনতে পাই। টর্চের আলো ফেলে দেখি একটি বিকল ট্রলার। ট্রলারের মাঝিদের আটজনের মধ্যে সাতজনেরই অবস্থা সঙ্গিন। মাঝিরা জানান, ২২ দিন ধরে ট্রলার বিকল হয়েছে। সাত দিন ধরে অনাহারে আছেন। আমি দেরি না করে জাউ রান্না করে তাতে চিনি মিশিয়ে খাওয়াই মুমূর্ষু জেলেদের। সরিষার তেল গরম করে হাতে-পায়ে মাখিয়ে দিই। তারপর মাছ ধরা বন্ধ করে ওই রাতেই রওনা দিই আলীপুর। ১৬ ঘণ্টা লেগেছিল তীরে পৌঁছতে। অসহায় জেলেদের ট্রলারও ঠিক করে দিয়েছিলাম আমি।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন মন্নান মাঝি।

এমন অনেক ঘটনায় অন্যকে উদ্ধার করতে গিয়ে মাছ না ধরেই ফিরে এসেছেন গভীর সমুদ্র থেকে। মন্নান মাঝি বলেন, ‘মাছ ধরতে যাওয়ার সময় পথে দেখি খাজুরার এক মাঝির ট্রলার ডুবেছে। ১২ জন মাঝি ছিল সেটিতে। একটুও কালক্ষেপণ না করে নিজের ট্রলারের সবাইকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি উদ্ধারকাজে। সবাইকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষমও হই। ফিরিয়ে নিয়ে আসি আলীপুর। মাছ না ধরে ফিরে আসায় মালিকের ৪০ হাজার টাকা লোকসান হয়। তাতে ট্রলারের মালিক রাগ করেননি, বরং উৎসাহ দিয়েছেন।’

কোথাও মাছ ধরতে গেলে নৌকা যখন কূলে নোঙর করা থাকে, সবাই হোটেলে গিয়ে রাত্রি যাপন করলেও মাছ ধরার বিরতিতে মন্নান মাঝি নৌকায়ই থাকেন। কারণ তিনি মনে করেন, এই নৌকাটিই তাঁর ঘর। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে এই নৌকাটিই তাঁর আশ্রয়। এই নৌকায়ই তিনি স্বস্তি বোধ করেন। গভীর সমুদ্রে গিয়েও যখন এই নৌকায়ই থাকেন তখন কূলে এসে হোটেলে থেকে পয়সা খরচ করে লাভ কি। নৌকায়ই শান্তি।

অনেক বিপন্ন মাঝির জীবন রক্ষা করেছেন মন্নান মাঝি। জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার নিজের জীবনই বিপন্ন হয়ে পড়েছে, এমন ঘটনা কি কখনো ঘটেছে? ২০০১ সালের একটি ঘটনা বললেন, সে সময় কুয়াকাটা থেকে দক্ষিণে ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত সাগরের অভ্যন্তরে যান মন্নান মাঝি। হঠাৎ ঝড় শুরু হয়। কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। প্রবল বেগে দুলতে থাকে ট্রলার। সবাই দোয়া-দরুদ পড়া শুরু করেন। কিন্তু একসময় উল্টে যায় ট্রলার। ট্রলারে রাখা তেলের ড্রাম ধরে ভাসতে থাকেন মন্নান মাঝিসহ পাঁচজন। ভাসতে ভাসতে ১৪ দিন পর সুন্দরবনের হিরন পয়েন্টে আসেন। পাঁচ দিন সুন্দরবনে ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকেন। একসময় নৌবাহিনীর সদস্যরা এসে তাঁদের উদ্ধার করেন। কিন্তু বাকিদের কোনো খোঁজ পাননি। মেনে নিয়েছেন, সাগরের মাঝিদের সাগরই নিয়ে গেছে। সাথিদের জন্য কেঁদেছেন অনেক। এখনো হারানো সাথিদের পরিবারের খোঁজখবর নেন মন্নান মাঝি।

সব শেষে ‘ইত্যাদি’র দর্শকদের উদ্দেশে কিছু বলতে বললে মন্নান মাঝি বলেন, ‘আমরা বলি মানুষ মানুষের জন্য, কিন্তু মানুষ যদি মানুষের বিপদে এগিয়ে না আসে, সে কিসের মানুষ? আমরা সবাই সবার সুখে-দুঃখে এগিয়ে আসব, সেটাই আমি বলতে চাই।’

সুখে-দুঃখে নিঃস্বার্থভাবে সবার পাশে দাঁড়ানোর জন্যই কুয়াকাটার মন্নান মাঝিকে সাগর মাঝিরা নাম দিয়েছে ‘সাগরবন্ধু’। মানুষের বিপদে মানুষই তো এগিয়ে আসবে। কবির কথায়, ‘সকলের তরে সকলে আমরা—প্রত্যেকে মোরা পরের তরে’। আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বিপন্নকে উদ্ধারে যে এগিয়ে যায়, সে-ই তো মানুষ। আমাদের সমাজজীবনে তেমন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাক, জেগে উঠুক মানবতা।

মন্তব্য