kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

প্র কৃ তি

জোনাকির ঝিকিমিকি

বিপ্রদাশ বড়ুয়া

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২৭ মিনিটে



জোনাকির ঝিকিমিকি

ছবি : কাকলী প্রধান

জ্যোত্স্নার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া শতবর্ষী যুবক মহুয়া বৃক্ষের নিচে তিনতলার রোদ-জ্যোত্স্না-ঝলমল তিন দিক উন্মুক্ত প্রথম কক্ষটিতে আমার আবাস। চন্দ্রাতপের মতো ঝামরে পড়ে মহুয়াগাছটি বিলিয়ে যাচ্ছে রৌদ্র-ছায়া-জ্যোত্স্না। বসন্ত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় বাদুড় ও চামচিকেরা কলহাসির তৃপ্তি ফেলে যায় রাতভর। পূর্ণিমা-অমাবস্যা কি ঝড়-বৃষ্টিমুখর অপ্রসন্ন রাতেও। মহুয়ার ফুল ও ফল প্রিয় খাদ্য ওদের। ফুলের রস খেয়ে ওরা প্রমত্তও হতে জানে ওদের মতো। কখনো বা ওদের কথা বা কলহাস্য-চেঁচামেচির অর্থও খুঁজে ফিরি আমার মতো করে। কী তাদের পাখার বিধুনন ও ক্রেঙ্কার! তবে একটা সময়ে নিস্তব্ধ হয়ে ঝুলে থেকে আবেশ-বিহ্বলতা ভোগ করে। মহুয়ার মধুর মত্ততা উপভোগে মগ্ন হয়ে পড়ে! পাখি হয়ে জন্মাবার কোনো সুযোগ পেলে আমি কার্পণ্য করতাম না আমার   ছেলে-মেয়ের মায়ের অনুমতি আদায় করে নিতে। প্রকৃতির মধ্যেই আছে সব রহস্য ও সমাধান। বজ্র, সামুদ্রিক ঝড়, খরা, হত্যাশিল্প ও গ্রহ-নক্ষত্রের মহাজাগতিক নিয়ম-শৃঙ্খলা নিয়ে বাদুড়ও দায়বদ্ধ সব কিছুর সঙ্গে। আমিও।

আমাদের প্রিয় ধরাধামে পাখিদের মতো গায়কশিল্পী আর কোনো প্রাণী কি আছে! মানুষের সঙ্গে পাখিদের তুলনা কি করব আমরা! জন্মের পরই মানবশিশু কেঁদে না ওঠা পর্যন্ত ধাত্রী বা ডাক্তার-নার্স উদ্বিগ্ন হয়ে থাকে। মানবশিশুর প্রথম শব্দ-স্ফুটনকে আমরা কান্না বলি কেন? ও তো তার প্রথম কথা বা সংগীত বা মুক্তির আকুলতা বা আনন্দ অথবা বিস্ময় অথবা বেদনাভরা প্রসন্নতা। অথবা অজানা-অচেনা অপার এক বিস্ময়। অথবা প্রথম সংগীত, যার কোনো ব্যাকরণের প্রয়োজনও নেই। আবার তা আকাঙ্ক্ষিত এবং সংগীতময়। কান্না যদি হয় তাহলে? অন্য প্রাণীদের  তো তা নয়!

আবার প্রাণিজগতে পাখিদের মতো গায়কশিল্পী অন্য কোনো প্রাণীর মধ্যে নেই। নয়তো মানুষ কেন সপ্তসুরের সা ময়ূর, রে চাতক, মা ক্রৌঞ্চ (কোঁচবক), পা কোকিল থেকে গ্রহণ করেছে। সপ্তসুরের মধ্যে চারটিই অধিকার করে আছে পাখি। মানুষের একান্ত নিজস্ব কোনোটিই নয়, সব স্বর প্রকৃতির অপরিহার্য অন্য অংশীদার প্রাণীদের থেকে ধার করা। অর্থাৎ আদিম মানুষকে মানুষ হয়ে ওঠার জন্য বারবার হাত পাততে হয়েছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড অর্থাৎ প্রকৃতির কাছে! তার মূল কারণও মানুষ প্রকৃতির সন্তান। একথা দম্ভ হেতু মানুষ বারবার ভুলে থাকে যে সে এই পৃথিবীর সন্তান।

সচরাচর তৃষ্ণার্তের মতো সন্ধেয় ঘরে থাকি আমি। তখন উত্তরের জানালার চারটি কপাট খুলে তিনটি সুনিবিড় কোমল বালিশে মাথা উঁচু করে, শিকারি মাছরাঙার মতো হন্যে হয়ে উত্তরের আকাশের দিকে চেয়ে থাকি। দিনের শেষে তখন শালিক-চড়ুইদের পেট পুরে খেয়ে আস্তানায় ফেরার সময়। ওরা নীড়ে থাকে বাচ্চা ফোটানোর ঋতুতে, নয়তো নীড়ের দরকারই পড়ত না, গাছের ডালের জুতমতো জায়গা পছন্দ করে নিয়ে সারা জীবন কাটিয়ে দিত। মানুষও গাছতলা ও গুহা ছেড়ে স্থায়ী ঘর, গ্রাম ও নগরের পত্তন করেছে। ঘরবাড়ি, নগর, গ্রীষ্মাবাস, শৈলাবাস, সমুদ্রসৈকতের লীলাক্ষেত্র একের পর এক সৃষ্টি করে চলেছে। কোনো প্রয়োজন সত্যিকার ও স্থায়ী প্রয়োজন কি না তা কি বুঝতে পেরেছে?

আমার উত্তরের জানালার সঙ্গে প্রায় লাগোয়া একতলা উত্তর-দক্ষিণ প্রসারিত পাকা ভবন। তার উত্তর পাশে টিনের ছাউনির পাকা রসুইঘর। তার পশ্চিম দিকে উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত বড় দিঘি। চোখ ও মন ভোলানো আর স্বপ্ন-জাগানিয়া। ইচ্ছে হলে চিতসাঁতারের নামে দীর্ঘ সময় ভেসে থেকেছি আপন খেয়ালে। দিঘির চারদিকে স্কুল, ছাত্রাবাস, হলঘর, পান্থনিবাস, বোধিবৃক্ষ ও শতাব্দীর অবশিষ্ট কিছু লিচু, মহুয়া, অর্জুন, অশোক, আম বা তেঁতুল বৃক্ষ। সদ্য ফুল দেওয়া চালতাগাছকেও অবহেলা করছি না। ও সৌন্দর্যশ্রেষ্ঠের দলে পড়ে।

উত্তর ও পুবের চার কপাটের জানালা খুলে দিলে নাগরিক হাওয়া, তখন পাখিদের যথেচ্ছ কাকলি বা সংগীত এবং আলোর বন্যা নামে। মাঝে মাঝে পুরনো ঢাকা থেকে বানর-বানরি চলে এসে অভয় মনে বেড়ানো উপভোগ করে যেত। ধর্মরাজিকের আবাসিক দশ-পনেরোটি সারমেয় তখন নিজেদের অধিকার ঘোষণা করত লাগাতার। ওরা মাটিতে, বানর-বানরিরা গাছের ডালে। ওই অসম আস্ফাালনও উপভোগ্য। বিহারের পোষা হরিণগুলো ওদের বিশালাকার নিরাপদ আবাসে চোখ-কান ভরে উপভোগ করত। পুকুরের রাজহাঁসগুলো সুরেলা তীক্ষ ক্রেঙ্কার ভাসায় দিঘির জলে। ওখানে ভাসমান বাঁশ বা কাঠের ওপরে শীতকালে সুন্ধিকচ্ছপ রৌদ্র সেবন করে। আমি শত সতর্ক হয়েও ওদের একটিও ছবি কোনো দিন তুলতে পারিনি। ওই নিয়ে দৈনিক পত্রিকায় তাই লিখতেও পারিনি শেষ পৃষ্ঠায়, প্রকৃতিবিষয়ক অন্য লেখাগুলোর মতো। পার্কের গাছপালার ঘুপচি আড়ালে        তরুণ-তরুণীর চুমুর মুহূর্ত ধরা এর চেয়ে অনেক সহজ। সহজের চেয়ে কঠোর কঠিনও কখনো কখনো হয়ে যায় এভাবে সহজিয়া লুকোচুরি। বলধার সিবিলি অংশে যেতে এ জন্য ভয় পাই।

মূল ভূমির ঠিক মাঝখানে বড় দিঘি। চারদিকে বিহারের সব স্থাপনা, স্কুল, ছাত্রাবাস, হাসপাতাল, হলঘর, বোধিবৃক্ষ প্রভৃতি। বিশাল তেঁতুল, অর্জুন, মহুয়া, লিচু, আম প্রভৃতি বৃক্ষ মহাশয়েরা। ওরা সমীহ আদায় করে আর শুদ্ধ অক্সিজেন জোগান দেয়। এরা আদি বাসিন্দা, নতুন-পুরাতন গাছপালা সবাই সহজে শনাক্ত করতে পারবেন।

উত্তর ও পুবের জানালার সব কপাট খুলে দিয়ে আলো-হাওয়ার হাট বসে প্রলুব্ধ করতে। কিন্তু শীতকালে নাছোড়বান্দা উত্তুরে মারকুটে হাওয়ার তরাসে পারি না পরিযায়ী পাখিদের রাতের অস্থায়ী আবাসে ফেরার রস উপভোগ করতে। বেশিক্ষণ। শীত আরেক প্রিয় ঋতু আমার, কিন্তু ও যে আমার বুকের পোষা পাখিটিকে অমনি-অমনি উসকানি দিয়ে বেড়ায়। পাখিটি হলো আমার বুকে বলে-কয়ে ঘাপটি মেরে থাকা তরুণ তরল সর্দি। আমার স্থায়ী ডাক্তার খালি বলেন, ওর সঙ্গে সই পাতিয়ে নেননি এখনো! এসব অন্ধিসন্ধি না জানলে জনপ্রিয় হবেন কী করে! শুনে ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানাই।

আহা! এই গ্রীষ্মের শেষে আজ ২৩শে জুন ২০১৬, বঙ্গাব্দের ৯ই আষাঢ়—এখনো মৌসুমি বায়ুর কোনো হদিস নেই প্রধান বাংলা দৈনিকগুলোতে। কালের কণ্ঠকে ফোন করলাম গরমে অতিষ্ঠ হয়ে, অগত্যা। মৌসুমি বায়ু নিয়ে পত্রিকার কে মূল্যবান মাথা খরচ করেন বা করেন না জানতে চাইলাম। দৈনিক পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় দৈনিক আবহাওয়া কেন স্থান পায় না জানতে চেয়ে। অভিযোগ ও অবিনীত অভিপ্রায় জানিয়ে। সেই সঙ্গে কিঞ্চিৎ উষ্মাও।

এ বছর সারা জষ্টি গেল মেঘ-মেঘ গুড়-গুড় করে। বৃষ্টি-বৃষ্টি লুকোচুরিতে। না-না, তার চেয়েও বেশি গর্জনশীল বজ্রমাণিক বিভীষিকা। বজ্রপাতে বহু বছর এ রকম করে মানব প্রাণহানি হতে দেখিনি। এ রকম জলহাওয়া বা বজ্রগর্ভ বৃষ্টির শব্দসন্ত্রাস বহু বছর শুনি না, দেখি না। আপনি শুনেছেন বজ্রপাতে এত মানুষ নিঠুর-নিধন হতে! কখনো! শতাধিক। পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতেও একই। পত্রিকাগুলোও যেন কী! প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক যেকোনো মৃত্যুর খবর দিতে পারলে অন্য কোনো খবরের খাদ্য তাদের মুখে যেন রোচে না। মানুষের চেয়ে প্রকৃতি কি বেশি মাংসাশী! বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষ প্রায় সব প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করে।

প্রসন্ন অলস ২৭শে মে ২০১৬। মনোভূমিতে আজ আমার কোনো না কোনো গল্পের ভাবী জন্মদিন হবে! সূর্য ডোবার আগে থেকে অপ্রতিহত উত্তরের আকাশ দেখার সঙ্গী মুক্ত তিনটি শ্বেত শিমুলের উপাধানে   মাননীয় মাথা মহাশয়কে রাখলাম আয়েশে। শেষ বিকেলে নীড়ে ফেরা পাখিদের পুব থেকে পশ্চিমে যেতে যেতে প্রাত্যহিক সংগীতমুখর মহার্ঘ ভালোবাসা উপভোগের সময় এটি। ওদের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে আমিও লটকে পড়ি। শালিক ও চড়ুইদের সঙ্গে। পাতিকাকেরা তো আছেই। শালিকের মধ্যে আছে ভাটশালিক ও ঝুঁটিশালিক। গাংশালিক শনাক্ত করতে পারিনি ওদের ফেরার সময়। ওরা পুব দিকে চরতে যায় আমি নিদ্রাছিন্ন হয়ে পশ্চিমের টানা খোলা বারান্দায় যাওয়ার আগে আগে। কোনো কোনো দিন নিজের সঙ্গে প্রায় হানাহানি করে চোখ পুছতে পুছতে বারান্দায় গিয়ে প্রসন্ন চোখে দাঁড়াই। তখন বাসনা জাগে খুব শক্তিশালী একটি ক্যামেরার মালিক হতে। শীতের পরিযায়ী পাখি বঙ্গভবনে আশ্রয় নিলে আমার মাথার ওপর দিয়ে ভোরে চরতে যায়। সন্ধের প্রাক্কালে ডাকতে ডাকতে ফেরে। আমি তিনতলার ছাদে উঠে যাই। মহামান্য রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবনের পুকুরের অতিথি নিবাসী ওরা। বছর কয়েক আগে মতিঝিলের সুউচ্চ অফিসের জানালা দিয়ে হঠাৎ ওদের আবিষ্কার করি। পুকুরের এপার-ওপারের সঙ্গে টানা দড়ি বাঁধা দেখে ওর সাহায্যে ওদের খাবার দেয় অনুমান করে নিয়েছি। ভালোবাসা ও আনন্দের এই স্মৃতি দীর্ঘ কয়েক বছর আগের দেখা। আমার ছাদের ওপর দিয়ে       যাওয়া-আসার সময় ওদের ফের ভালোবাসা জানাই। আমার জীবনের মহার্ঘ ও আনন্দময় স্মৃতি ওরা। আমার লেখার উসকানিদাতাও।

উপাধানে মাথা মহাশয়কে রাখলাম আয়েশি বিলাসে, নাকি বিলাসী আয়েশে বলব! শেষ বিকেলে নীড়ে ফেরা পাখিদের পুব থেকে পশ্চিমে যাওয়ার সময়, সংগীতমুখর মহার্ঘ আনন্দ ভালোবাসা উপভোগের সুসময় আমার। সারা দিন কোনো বই পড়িনি কালের কণ্ঠ ও বণিক বার্তা দৈনিক দুটি ছাড়া। লিখিনি আধ কলমও। এ রকম বেশ সোমত্ত কদিন যাচ্ছে কেটে। লিখতে পারি, পড়তে পারি, গান শুনতে পারি, কোথাও বেরিয়ে পড়ে জম্পেশ আড্ডায় ধ্যানী হয়ে যেতে পারি! কিন্তু কিছুই করিনি, এমনকি দুপুরে ঘুমও দিইনি সারাক্ষণ শুয়ে শুয়ে থেকেও। মৃত্যুর পর তো শুধু ঘুমই কাজ, তোফা আড্ডা হয়তো সেখানে দেওয়ার সুযোগ হয়ে যেতেও পারে। বিচিত্র অন্য জীবন হলেও তোফা। পচা কাসুন্দি ঘাঁটতে না হলেই হয়।

এই উত্তরের জানালা দিয়ে প্রতি সন্ধের প্রাক্কালে পাখিদের ফেলে যাওয়া সুরগুলো আমার মূল্যবান অলস সময়ে বারবার শোনা যেত যদি! মূল্যবান অলস সময়েও যদি বারবার শোনা যেত! গানের মতো মাদকতাময় সুখাদ্য আর একটি জিনিস আছে আমার। অবসরে ও বন্ধুর সঙ্গে অথবা একান্ত একা নীল প্রয়োজনে!

সন্ধের প্রাক্কালে আমার একান্ত কক্ষে থাকলে (থাকাটাই স্বাভাবিক), অবশ্যই তখন উত্তরের চার কপাটের দু কপাট খুলে, সঙ্গে পুবের চার কপাটের সব খুলে দিয়ে (সেখানে মশাবিরোধী জাল সদ্য লাগিয়েছি) শ্বেতশিমুলের মহার্ঘ তিনটি বালিশ মাথায় ও কোলে নিয়ে আয়েশ করে আজ পাখিদের নীড়ে ফেরা দেখব। বিশেষ করে হংস বলাকা খুঁজব উত্তরের আকাশে, এরা সম্ভবত পারিযায়ী পাখি নয়। আজ জোর ইচ্ছে জেগেছে ওদের দেখার। নীড়ে ফেরা পাখিদের। নীড় বলতে সেখানে যেসব গাছে ওরা রাত্রিপাত করে। রাতভর গাছের ডালে বসে বসে। ওরা নীড় বাঁধে বাচ্চাদের জন্য, ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাতে। উড়তে শেখার পর গাছের ডালই বিছানা-বালিশ ওদের।

সন্ধের পূর্ব ও প্রাক্কালে আমার কক্ষে আমি থাকলে অবশ্যই উত্তরের জানালা খুলে শ্বেত শিমুলের উপাধানে মাথা মহাশয়কে সঁপে দিয়ে আয়েশ করে পাখিদের নীড়ে ফেরা দেখাই তো কাজ। নীড় বলতে যেখানে যেসব গাছে ওরা রাত্রিপাত করে ডালে বসে বসে। সব পাখি নীড়ে থাকে না মানুষের মতো। ডিম দেওয়া ও বাচ্চা ফোটানোর সময়েই ওদের নীড়ের দরকার। বাচ্চা বড় হয়ে উড়তে শেখা পর্যন্ত। বছরের বাকি সময় ওরা গাছের ডালে বসে বসে ঘুমোনোই তো করে। তা-ও স্ত্রী বা পুরুষ পাখি ডিমে তা দিলে একজনকে তো ডালে বসে ঘুমুতে হয়। বাচ্চা উড়তে শেখা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা। বছরের বাকি সময়টায় প্রায় সব পাখি নীড়হারা। কোনো কোনো পাখি, যেমন হাঁস, দিব্যি এক পায়ে দাঁড়িয়ে ঘুমিয়ে নেয়। বাঃ!

উত্তর দিকের ছাড়াও পুব দিকের চার কপাটের জানালার নিকাশ এসে পড়ে। জানালার নিচেই পুব পাশে একতলা টিনের চালের পাকা ঘর। চালের   এটা-ওটা কাঠের জিনিসপত্রে ঘর করে নিয়েছে মা বিড়ালি তার দুটি বাচ্চার। বাচ্চা দুটি নিয়ে ওদের বাপের কোনো দায়দায়িত্ব নেই। মানুষের ও অনেক জীবজন্তুর এবং পাখিদের বাবার দায় বেশ আছে। বিড়াল পরিবারের বাঘ-সিংহ-চিতাদের সবারই প্রায় এক রকম স্বভাব। সিংহ পরিবার নিয়ে থাকে বলে তার স্বভাব একটু ভিন্ন। তা ছাড়া তার হারেমে রাজামাফিক কয়েকজন রানি আছে। তার পরও প্রয়োজনে সে নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে।

পুবের জানালার বিড়ালির একটি বাচ্চা কোথায় যেন কিভাবে কী হয়ে গেল আমি দেখতে পাইনি, জানি না। একা ওই অন্য একটি বাচ্চার তখন থেকে স্বভাব হয়ে গেছে অদ্ভুত। মা চলে যায় খাবারের খোঁজে, বাচ্চাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে একা রেখে। বাচ্চাটি তখন চালের ভাঙা আসবাবপত্রের আড়ালে ঢুকে পড়বে। এক টুকরো টিনের কুঠরি বা নীড়ও হয়ে আছে ওখানে ওর জন্য। দুই বাড়ির সীমানা পাঁচিলের এপারে-ওপারে অনেক বাড়ি, একেবারে ঘিঞ্জি। কোনো রকম নিয়মনীতি নেই। সীমানা পাঁচিলের ওপর দিয়ে বিড়ালি রাজসিক ভঙ্গিতে চলতে চলতে স্বভাব অনুযায়ী আশপাশ দেখবে। সীমানা পাঁচিল থেকে পরবর্তী বাড়ির একতলা টিনের ওপর দিয়ে যেতে যেতে মা বিড়ালি ডাকবে একবার। ওটা তার বুকের একমাত্র ধন বাচ্চাকে সাবধান করে দেওয়া। তখনো ছানাটি তার গোপন আশ্রয়ের গর্তের মুখের বাইরে। মায়ের ওই শব্দসংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সে ঢুকে পড়ল গুহাপ্রায় নিভৃত স্থানে। অদূরে কোথাও হুলো বিড়াল থাকতেও পারে। পাঁচিলের আড়ে অথবা অন্য কোনোখানে। হয়তো সে বিড়ালিকে এ সময় দেখতে পেল না বলে শীতল। বিড়াল পরিবারের অন্য অন্য প্রাণী বাঘ-সিংহ-চিতাদের ধর্ম এক রকম। হুলো যদি তপ্ত হয় বিড়ালির মিলন চায়, আর তখন যদি বিড়ালির বাচ্চা থাকে সে কখনো মিলন নেবে না। জাতের স্বভাব অনুযায়ী পুরুষটি তখন বিড়ালির বাচ্চাকে মেরে তার পথ সুগম করে নেবে। আমার তো ওই একা বাচ্চাটির দিকে করুণা বেড়ে উঠছে দিনের পর দিন। ভাবনার একটি কক্ষ ওরা দখল করে নিয়েছে। মা যখন খেয়ে ফিরে আসবে তখনকার বাচ্চার ব্যবহার দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকি। না, ছানাটি একবারও উঁকি মারেনি গুপ্তস্থান থেকে। আগে দেখেছি মায়ের একটি ছানা এই হুলো মেরে গিয়েছিল এবং বিড়ালির সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। এতে ওদের দুটি বাচ্চা হয়েছিল। সে দু বছর আগের কথা। পুবের এই জানালা দিয়েই ওদের সব দেখেছিলাম। সন্তান হওয়ার পর হুলোর আর কোনো দায়দায়িত্ব নেই।

আমি জানালার দিক করে চেয়ারে আটকে বসে থাকি। দেখি খাবার খেয়ে মায়ের ফিরে আসা। মা ও ছানার আনন্দ দেখি। কী উল্লাস ছানার! মা তখন ছানার আদর নিচ্ছে, খুব একটা প্রকাশ করছে না সন্তান-স্নেহ, কিন্তু শরীরের ভাষা আদর নেওয়ার, মায়েরও তো সন্তানের আদর খাওয়ার অধিকার বা লোভ আছে। এই দৃশ্য দেখার আশায় আমি বারবার উত্তরের জানালায় থেকে আকাশে ভুবন চিল ওড়ার দৃশ্য ফেলে রেখে পুবের জানালায় চলে আসি। বিড়ালির আসার অপেক্ষায় থাকি। বিড়ালি যতক্ষণ ফিরে না আসে ততক্ষণ ছানা নিভৃত আড়াল থেকে বের হয় কি না দেখার অপেক্ষায়। আমি কত শিস দিয়েছি, মিউমিউ ডাক পেড়ে দেখেছি। ওর চেনা টুসকি মেরে ডেকেছি। না, কখনো বেরিয়ে আসেনি। পরে আর কখনো ওভাবে ওকে বের করার চেষ্টা করিনি। ওর ঘাড়ে বিপদ এসে পড়ার ভয়ে। মা তো জীবনের   ঘাত-প্রতিঘাত খেয়ে এখন বড়। ছানাটাকে আর মাসখানেক এভাবে চোখে চোখে রাখবে, ছানাটি তত দিনে অনেক শিখে নিয়েছে এবং হুলোকে ভয় না পাওয়ার সাহস সঞ্চয় করে নিয়েছে। এই সাহসী ছানার চলাফেরাও অন্য রকম।

একসময় মা ফিরে এসেছে। আমি ততক্ষণ পুবের জানালায় আটকেই আছি। মায়ের কী স্বস্তি! তার সন্তান ঠিক আছে, বেঁচে আছে, হুলো দেখতে পায়নি, বালাই সাট। আমারও আনন্দ। ছানাও তার সব রকম আনন্দ একে একে প্রকাশ করে যাচ্ছে। মা কখন দুধ খেতে দেবে, শুয়ে পড়ে কোল খুলে দেবে, গা চেটে দেবে, লেজ নিয়ে খেলতে দেবে, শিকারি হয়ে ওঠার কলাকৌশলও ওর সঙ্গে শেখাবে। মাঝেমধ্যে বাচ্চা কোনো ভুল করলে বা সীমাছাড়া হয়ে উঠলে থাবা মেরে শিক্ষা দেবে।

আমি চেয়ে থাকি। কী উল্লাস বাচ্চার! মা সব দেখছে, কিন্তু কেন জানি দুধ খেতে দিচ্ছে না, আবার রাগও দেখাচ্ছে না। তাহলে কি বিড়ালি বুকে দুধ আসার সময় নিচ্ছে! নিজের পেটের খাবার হজম হওয়ার একটু সময়! আমিও নাছোড়। আর তখন অমনি বুক পেতে দিল সন্তানের মুখে। মা এতক্ষণ মাথা উঁচু করে শুয়ে শুয়ে সন্তানের আবদার গুনছিল, গা চেটে দিচ্ছিল। এটাও তো মায়ের দায়িত্ব একার। বাপটা তো আছে নিজের তালে, প্রাণীদের মধ্যে বিড়াল পরিবারের পুরুষদের এই স্বভাব প্রকৃতির খেলা! বিড়ালছানা বাপের আদর কী চেনে না।

ছেলেবেলায় আমাদের বিশাল ভিটেয় বিড়াল, কুকুর, গরুর সঙ্গে পুকুর ও টোয়ার আড্ডা ছিল। শতবর্ষী গাছপালার সঙ্গে নাতি-তরুণদের ভিড়।

পুবের জানালায় আরামকেদারা নিয়ে বসে দেখি মা ও বাচ্চার আনন্দঘন সম্মিলন। কী উল্লাস! কিন্তু মা মার্জিত। গায়ে গা ঠেকিয়ে লেজ উঁচিয়ে বারবার ভালোবাসা ও একমাত্র আবদার প্রকাশ করছে বুঝতে পারছি আমি। আমিও এতক্ষণ ধরে মা বিড়ালির অপেক্ষায় আছি, মা ও সন্তানের ভালোবাসার পাঠ নেওয়ার অপেক্ষায় ক্ষুধার্ত হয়ে আছি।

বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চ আদালত এলাকাতেই এখন ঢাকার প্রাচীনতম একমাত্র বৃক্ষদের সৌন্দর্য ও আবাস টিকে আছে। চিল, কাক, নীলকণ্ঠ, বসন্তবাউরি এখনো দেখতে পাই। প্রাচীন পদাউক, পাকুড়, গগনশিরীষ, বট, অশ্বত্থদের দেখতে যাই। বলি, ভালো থেকো, টিকে থেকো যত দিন লড়াই করে পারো। কী করব, ঢাকার সড়ক ও জনপথ কর্তৃপক্ষ যে কুম্ভকর্ণের নিদ্রায় মগ্ন! এই করতে করতে আমার চায়ের নেশার সময়ের ঘণ্টা বাজে। চীনে বা জাপানি উত্কৃষ্ট চায়ের মদির ডাক পড়ে। বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক কেটলি নিয়ে পানি গরমে লেগে পড়ি। জাপানি বান্ধবীর দেওয়া বিখ্যাত কারাত্সু চায়ের পেয়ালা তুলে নিই হাতে। কিভাবে গরম পানিতে চায়ের পেয়ালা উষ্ণ করে তুলতে হবে তার পাঠ শিখিয়েছেন তায়কো কুরুকাওয়া-সান। তাঁর দেওয়া ওকাকুরা কাকুজ্যের বিশ্ববিখ্যাত বই ‘দ্য বুক অব টি’ জ্ঞানবিকাশ বড়ুয়া ও আমার অনুবাদে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। সঙ্গে আছে ইউসুনারি কাওয়াবাতার ‘হাজার সারস’ বই থেকে পাওয়া অধীত বিদ্যা। চায়ের রাকুবাটি, চা-উৎসবের ছোট্ট কুটির, যা তোকিও ও ফুকুওয়াকা শহরের চা-উৎসবে ও চা-কুটিরে উপভোগ করে এসেছি মুগ্ধ বিহ্বলতায়, তেমন করে কোথায় আর পাব। চা-চা-চা, জাপানের অমর ঐতিহ্য; সঙ্গে চা-সুন্দরীদের নিবেদন-রীতি। কত বই যে তায়কো-সান পাঠিয়েছেন...এক জীবনে তাঁর ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। আমাকে বাধ্য হয়ে পরবর্তী জীবন মানতে হয়—পরবর্তী জীবনও দার্শনিকদের মতবাদ।

আমার উত্তরের জানালা আমাকে বঞ্চনা করে না। এই জানালা দিয়ে উত্তরের প্রায় দিগন্ত পর্যন্ত দেখা যায়। ওখানে ওই আকাশে মেঘ নামে, আরো নিচেও নামে, আমি দেখতে দেখতে শেষ বিকেল কোতল করি। তা-ও এত সহজে পারি না। সব কিছু কি এত সহজে নিজের ইচ্ছে অনুযায়ী দেখা পাওয়া সম্ভব। এই উত্তরাকাশে দেখতে পাই শীতের পাখিদের আনাগোনা। চিল-শকুনদের বিশ্রামের ওড়াউড়ি অঞ্চল দিয়ে পরিযায়ী পাখিরা চলাফেরা করে ভোর ও সন্ধের প্রাক্কালে। আমার ক্যামেরা ও বাইনোকুলার অত শক্তিমান নয় বলে হৃদয়ের জেবে অন্যান্য দুঃখের সঙ্গে সব তুলে রাখি।

নিচে পুকুরপারের নাতি-তরুণ ও তরুণ ঘন গাছপালার ডালের মাথায় তখন চলে পাতিকাকদের বৈকালিক নিত্যকার দর্পণসুন্দর উপভোগ্য খেলা। এ সময় বৃষ্টি হলে, বসন্ত-গ্রীষ্ম-বর্ষা হলে আরো সুন্দর। বৃষ্টি ছাড়াও শুধু শুধু তারা ডাকাডাকি ওড়াউড়ি করবে। পুকুরের আম-বেল-নিম-নারকোলগাছের শীর্ষ থেকে সীমানা দেয়াল ছাড়িয়ে বাইরের পুব দিকের ছয়তলা ভবনের কার্নিসে বা ছাদের দেয়ালে গিয়ে বসা...। আবার দু-এক মিনিটের মধ্যেই কী কারণে কাককণ্ঠের হুল্লোড় তুলে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে। তাতেও শান্তি-স্বস্তি নেই। ফের তারা উড়ল পুব দিকে ছয়তলা ভবনের ওপর। কে তাদের তাড়াচ্ছে, কে তাদের বলছে, কে-ই বা ভয় দেখাচ্ছে তেমন কোনো যুক্তি আমি খুঁজে খুঁজে প্রায় একজনমের জন্য হয়রান। একদঙ্গলে শতেক পাতিকাক যদি কা-কা ডেকে একই খেলায় প্রতিদিন মেতে থাকতে পারে, আমিও বা না উপভোগ করে থাকি কী করে! পুব থেকে পশ্চিম ও পশ্চিম থেকে পুব বারবার পাল্টাতে হচ্ছে দৃষ্টি, উত্তরের জানালা দিয়ে কাকের খেলা দেখতেই লেগেছি। অল্প বৃষ্টির দিনে উপভোগ্য-কাতর আমার মন সন্ধের আসন্ন সময়ের নর্ম ক্রীড়া হয়ে উঠেছে। অথচ এখন ওদের প্রজনন-পূর্ব সময়ও নয়। সে কোকিলের সঙ্গে বসন্তে রেখে এসেছে।

২১শে আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জুলাই ২০১৬ খ্রি. কোথা থেকে মেঘ-সুন্দরী আষাঢ় ছাড়া পেয়ে এলো সবুজবাগ, দু-দশ দণ্ড অবসর তন্ন তন্ন খুঁজে! মৌসুমের বৃষ্টির প্রথম প্রবল ছোঁয়া পেয়ে শিহরণ লাগল। বদলে গেল বজ্রগর্ভ মেঘের প্রাণী হত্যায় পাপবিদ্ধ চরিত্রের। সারা দেশে শতাধিক মানুষের প্রাণ লুট করে নিল বজ্রাঘাত। সেই জষ্টি থেকে বজ্রপাত ও বৃষ্টির ছিনিমিনি চলছে। আষাঢ়ের বজ্র নয়, সংগীতও নেই তার, শুধু একতরফা ত্রাস, আষাঢ়ের সুষমাহীন। সারা দেশে মৌসুমি বৃষ্টি হচ্ছে আজ অনিবার্য। আমার পড়া দুটি দৈনিক পত্রিকাতেও আজ মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টির খবর লেখেনি। আষাঢ়ের ৬-৭ তারিখ মৌসুমি বায়ুর বৃষ্টি নামে। নীল আকাশ ছেয়ে জয়ধ্বজা ওড়ায়, জয় বাংলা গায়। আজই তার দেখা পেলাম সুফলাদুপুর শেষে আড়াইটার দিকে। আমি উত্তরের জানালা দখল করে খুঁজছি। রোদ আরো আগে পেয়েছে ছুটি, ছেলেবেলার স্কুল ছুটির মতো। বিকেল ধুয়ে আষাঢ় সন্ধে এলো ঘনিয়ে। পাতিকাকেরা বৈকালিক-সান্ধ্য খেলার মহড়া শুরু করেছে। এত তাদের বাহানা ও দাপট, এত দেমাগ যে আমি তল পাই না। পাঁচটার দিক থেকে ওদের বাহানা, ওড়াউড়ি ও রঙ্গরসিকতা বাড়াবাড়ি রকম ফুলেফেঁপে ওঠে। ঢাকা রেলস্টেশনের মেহগনি-শিরীষের পুবের নাগরিক বনখণ্ড থেকে গাছপালা পেরিয়ে দলবদ্ধ হয়ে তারা আমার উত্তুরে জানালা পেরিয়ে পুব পাশের ছয়তলার ছাদে দিনশেষের খেলা শুরু করেছে। এ কি খেলা, নাকি ব্যয়াম। অথবা ফুর্তি! বিলাস!

সন্ধের আগে আস্তানায় ফেরা পাখিদের না দেখে পারি না। ওরা যখন ফেরে, হিসাব করি আমি। কোনো কোনো দিন শুমার করেও দেখেছি। কাকদের চেয়ে শালিকের গতি বেশি, শালিকের চেয়ে চড়ুইয়ের। সাঁই করে চড়ুই দ্রুত বেরিয়ে যায় জানালা ফেলে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লায় চড়ুইয়ের আস্তানা আছে। আস্তানায় গিয়ে কী মধুর ঝিমঝিম-ঝিমঝিম কাকলিই না তারা তোলে! ওদের পাশাপাশি শালিকের আস্তানা থাকলে তা হয়ে ওঠে আরো ভিন্ন রকম সংগীতালেখ্য। ঢাকা শহরের কয়েক জায়গায় হঠাৎ হঠাৎ ওদের সমবেত সংগীত-সুধা শুনে থাকি। সে এক মধুর আলেখ্য দেখার শামিল।

ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে শাপলা চত্বরের পুব-উত্তর কোণের কদমগাছটি আমাকে টেনে রাখে। তার আগে নটর ডেম কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পারে দুর্লভ সোনালি ফলের পাকুড়গাছটি। ফুলভরা কৃষ্ণচূড়াগাছটি আগুনঝরা বাণে মধুর বিদ্ধ করে রাখে। রমনা পার্কে বড়-ছোট তিনটি দুর্লভ বাওবাব বৃক্ষ বিভোল করে দেয়। বিখ্যাত অগ্নিশিখা বা রুদ্রপলাশগাছটি রমনা পার্কের মতো বয়োবৃদ্ধ হয়েও আগুনরঙা ফুল ফুটিয়ে যায়। আমিও ছুটে যাই অভিবাদন জানাতে গ্রীষ্মের কোনো বিকেল খুঁজে নিয়ে। আমি ভুলতে পারি না অসচরাচর কুয়াশার ভোরে কদাচিৎ প্রাতর্ভ্রমণের স্মৃতিকথা। সবুজবাগ থেকে রিকশায় করে পার্কের অরুণোদয় তোরণে নেমে ঢুকে পড়লাম। দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দীর কুসুম্ভবীথিতে। বসন্ত হলে উজ্জ্বল ঘন লাল নব পত্রালির সম্মিলিত উচ্ছ্বাসের সঙ্গ দিতে। তারপর ফুল ফুটে পাপড়ি যখন পথের ওপর মখমলের মতো বিছিয়ে থাকবে, জুতা-মোজা খুলে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দুর্লভ পরশ কি আপনার হওয়ার অবসর কখনো হয়েছে? না হয়ে থাকলে আগামী বসন্ত তো রয়েইছে। এই পৃথিবী বিখ্যাত ধুলো-দূষিত ঢাকা নগরীতে এমন কিছু কিছু অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ বা অবসর নাতি-অল্প তো আছে। বাইরে হেয়ার রোডে (নাকি সড়কে) আছে দুই সারি পদাউক বৃক্ষ। ওদের গাছ না বলে বৃক্ষ বলাই সমীচীন। ওরা একান্তই পূর্ব এশীয় মনোরম বৃক্ষ। এক শ বছর আগে প্রাউডলক সাহেব ইংরেজদের রাজত্বের সময় ঢাকা নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে নিযুক্ত হয়ে এই মহামান্য বৃক্ষদের নির্বাচিত করে রোপণ করেন। এর গাছ ভরা ফুল এক দিনেই বাসী হয়ে গাছতলার শয্যা নেবে। আমি এর ছবি তুলতে যাওয়ার আগে জেনেছি, আর আমার লেখার পাঠিকা-পাঠকদের সব জানিয়ে দিয়েছি। গোমর রাখিনি। সকাল থেকে সন্ধে; ব্যস, রাতেই গাছ থেকে হাওয়া। তবে অন্য ডালের কলি অন্য দিন ফুটে এক দিনে শেষ।

আজ শতাব্দীর বিখ্যাত মহুয়া বৃক্ষটি আর নেই। জীর্ণ-বৃদ্ধ হয়ে সে এখন আর নেই। অথচ এ রকম বৃক্ষদের এখন বাঁচিয়ে রাখা যায় চিকিৎসা দিয়ে। ওর কোটরে খুঁড়ুলে পেঁচার আবাস ছিল। দিনে গিয়ে ওদের সঙ্গে গাছতলায় দাঁড়িয়ে বৃক্ষ মহাশয়ের সঙ্গে ওদেরও শুভ কামনা করে এসেছি। আর কাঠবিড়ালিদের ওখানে লুকোচুরিও উপভোগ করেছি। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার চেয়ে বেশি বয়সী বলে সম্মানও জানাতাম সব সময়। বৃক্ষদের ও বয়স্কদের মান্যি করার পাঠ পেয়েছি মা-ঠাকুমা থেকে। আর গ্রামের সেই ইছামতী ক্যাং ফ্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গুরু মহাশয়দের কাছে। সেই স্কুল এখন উঠে গেছে। হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ তিন শিক্ষকের কাছে আমরা এই স্কুলে শিক্ষা নিয়েছি।

ছিল ইছামতী জ্ঞানদায়িনী পাঠাগার। বছর দশেক আগেও অস্তিত্ব ছিল। আজ বেঁচে থাকলে এক শ বছর পূর্ণ হতো। মাধ্যমিক পাস করার পর বছর দুয়েকের জন্য সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছিলাম। আমি তখন কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক বাণিজ্য বিভাগের ছাত্র। আমার পড়াশোনার ব্যাপারটা একটু ছন্নছাড়া বিদঘুটে। মাধ্যমিক পাস করে এক বছর ঢাকার জগন্নাথ কলেজে নৈশ বিভাগে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হই। এক বছরের মাথায় অ্যাপেন্ডিসাইটিসে আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষা দিতে পারলাম না। তখন এই রোগে তলপেটের ডান দিকে এক বিঘত কেটে পেটের বর্জ্য বের করে নিত। ড. জামান আমার চিকিৎসক। সিস্টার রাভি আমার দেখাশোনা করতেন। স্থান মিটফোর্ড মেডিক্যাল কলেজ, বুড়িগঙ্গার তীরে মনোরম পরিবেশ। তখন বুড়িগঙ্গা ছিল পরিচ্ছন্ন তরুণী, সন্ধের দখিনা হাওয়া ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতা। হাসপাতালের বারান্দা থেকে দেখতাম আর দখিনা পবনের উচ্ছ্বাস ও একরকম মাতাল সুগন্ধ পান করতে দাঁড়াতাম।

সিস্টার রাভি এসে একদিন বললেন, আপনার জন্য বই এনেছি। এখানে কতক্ষণ আছেন!

সন্ধে থেকে। চলুন, কী বই...।

গর্কির ‘নবজাতক’ ও কলকাতার পুজো সংখ্যা সিনেমা মাসিক।

অমনি চেয়ারে বসার ইচ্ছা ছুড়ে মেরে বললাম, চলুন দেখি! ‘নবজাতক’ আমি কতবার যে পড়েছি আমার গ্রামের পাঠাগার থেকে, তা ওকে তক্ষুনি বলে, তক্ষুনি হাঁটা দিলাম বুড়িগঙ্গার সান্ধ্য আকর্ষণ ছিঁড়েখুঁড়ে তছনছ করে। গর্কির ‘মা’ পড়ে নিয়েছি, পাঠাগার থেকেই।

সিস্টার রাভি অমনি বলে বসলেন, সে কি! বুড়িগঙ্গার হাওয়া কি অমনি দূষিত হয়ে গেল?

ওর পাশে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বললাম, কত দিন আমার সেই প্রিয় গল্পটি পড়ি না।

কোনটি?

আগে আপনার প্রিয় কোনটি যদি বলেন! বলবেন?

আমি আগে আপনার প্রিয় গল্পটির কথা জানতে চেয়েছি।

আসলে আপনার পছন্দের সঙ্গে আমার মেলে কি না...

যদি মিলে যায় কী হবে!

ঘেঁচু হবে।

মানে?

তুমি একটা উজবুক।

মানে?

আমি উজবেকিস্তান থেকে নয়, চট্টগ্রাম থেকে...

অর্থাৎ চাটগাঁইয়া ভূত।

সিস্টার, আমি অপমানিত বোধ করলাম...।

না না না, আমি আপনাকে যাচাই করে দেখলাম আপনি কতখানি চট্টগ্রামের। সত্যি! নাকি সান্ত্বনা।

সত্যি। সত্যি। সত্যি। তিন সত্যি।

অমনি আমি ডান হাত বাড়িয়ে চিত করে বললাম, আমার হাতের তালুতে একটি চিমটি দিন।

সে আবার কী?

আগে দিন, তারপর বলব।

আগে বলুন, তারপর দেব।

আপনার পালা আগে—আমি বললাম, প্রায় গোপন ভালোবাসা গোপন করে রাখার মতো। কারণ সিস্টার আমার চেয়ে বয়সে বড়, সম্মানেও।

হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম আমার শয্যার পাশে। বালিশের ওপর আমার প্রিয় লেখকের বিখ্যাত বই ‘নবজাতক’। চেলকাশ, ছাব্বিশজন পুরুষ ও একজন নারী, বুড়ি ইজেরগিল, নবজাতক এবং অন্য একটি নাম মনে করতে পারছি না। এ রকম আমার হয়, তাহলে কি এই বয়সেই ভুলো মনের রোগে ধরছে...।

সিস্টারের কথামতো বিছনায় শুয়ে পড়তেই তিনি রক্তচাপ মাপার যন্ত্র নিয়ে কাজে লেগে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ড. জামান আসবেন বললেন। আগামীকাল নাগাদ আমার অপারেশন হবে জানিয়ে দিয়ে কোনো ভয় না মানতে সাহস দিয়ে, আশ্বাস দিয়ে চললেন। ওর আশঙ্কাহীন হাসি দেখে এবং কোমল হাতের স্পর্শে আমি বিগলিত স্রোতে ভেসে চললাম।

পরদিন অপারেশনের সময় আমার বড়দা ছিলেন। অপারেশনের পর সিস্টার আমার জ্ঞান ফিরে আসার সময় পাশে ছিলেন। আমার বড়দাও। কোথায় কোন নক্ষত্রলোক থেকে যেন ফিরে আসছি বহু পথ উড়ে...। ভীষণ তেষ্টায় আমার বুক শুকিয়ে বইয়ে পড়া মরুভূমি হয়ে গেছে।

সিস্টার আমার হাত ধরে বললেন, আর একটু...আর একটু।

আমি চোখ খুলে দেখা ও তার আগে কোন সুদূর তারার দেশ থেকে উড়ে উড়ে নিজের কাছে ফিরে আসা আবার দেখতে পেলাম, সেই পথের যেন আর শেষ নেই। আমি আমাকে বললাম, ফিরে আয়, ফিরে আয়...। আর ভাবছি সারা জীবনভর আমি শুধু পানিই খাব... পানি...পানি...পা-নি-ই-ই। তখনই মনে হলো আমার হাত তুলতে পারছি না। আমার হাত কে যেন ধরেবেঁধে আছে।

পানি-পানি-পানি।

আমার হাত...আমার হাত...

খুলে দেব? সিস্টার বললেন।

বললাম, আমার হাত বাঁধা কেন? দয়া করে খুলে দিন, সিস্টার। চোখ খুলতেই দেখি পাশে বড়দা, চোখে আনন্দের অশ্রু। সিস্টার তখন বেরিয়ে গিয়ে ওষুধ খাওয়া কাচের ছোট্ট গ্লাস নিয়ে এলেন। ওতে ঢোক দুয়েক পানি। আমার মাথা তুলে ধরে এক হাতের ওপর রেখে অন্য হাতে মুখে পানি ঢেলে দিয়ে বললেন, আস্তে আস্তে ঢোক নিন।

ওতে পুরো এক ঢোক পানিও নেই। আহা, অমৃত!

তখন আমার মনে এলো, ভালো হয়ে আমি শুধু পানিই খাব, শুধু পানি।

আমি তৃষিত চোখে সিস্টারের দিকে তাকালাম। সিস্টার হাসলেন প্রায় শাসনের চোখে।

আর একটু দিলেন। তারপর বললেন, এখন আর নয়, একটু পরে দেব, লক্ষ্মীটি। ওর লক্ষ্মীটি শুনে আমি অচেনা এক আবেগে ভেসে চললাম। ওর দিকে চেয়ে চেয়ে। তখন কী যেন না ভেবেই আর এক ঢোক দিয়ে হাত থেকে আমার মাথা খেলার পুতুল রাখার মতো বালিশে রেখে বললেন, একটু পরে আমি নিজে থেকে দেব। চাইতে হবে না।

ডাক্তার চলে গেলেন! আর এক ঢোক পানি দিলেন সিস্টার।

দুদিন পরে হাসপাতাল ছাড়ার বিকেলে সিস্টার বড়দাকে বললেন, আপনি জিনিসপত্র নিয়ে গাড়ি ঠিক করুন। আপনার ভাইকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালের কোথায় কোথায় দিয়ে প্রায় বগলদাবা করে নিয়ে চললেন। আমার পাথরের মতো গুরুভার তলপেট সিস্টারের মমতায় কাগজের নৌকো হয়ে ভেসে চলেছে। বুড়িগঙ্গার নৌকো দুলছে সান্ধ্য হাওয়ায়। রমনা পার্কের বুড়ো মহুয়াগাছ দুর্দান্ত যুবক হয়ে দুলছে। ডান হাতে আমাকে আগলে ধরে কোন সুদূরে যেন নিয়ে চলেছে।

সিস্টার ফিসফিস করে বললেন, তুমি একদিন লেখক হবে। তখন আমার কথা মনে করে কিছু লিখবে আশা করতে পারি। তোমার দিনপঞ্জি আমি পড়েছি। জানো, সেই থেকে আমিও লিখছি। ওতে শুধু তোমার কথা, তোমার স্বপ্ন নিয়ে খেলা আর খেলা। আমার ছোট ভাইকে নিয়ে যেমন খেলায় হারিয়ে যাই...।

আমার তখন কেন জানি কান্না পেয়ে যায়। আমার দিদির মতো ভালোবাসছিল মনে হয়েছে...। নাকি অন্য জনমের সখা...।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা