kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্মৃ তি ক থা

রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা বহুভাবে ঋণী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৬ মিনিটে



রবীন্দ্রনাথের কাছে আমরা বহুভাবে ঋণী

শিক্ষিত বাঙালির জন্য রবীন্দ্রনাথের মতো আপনজন কেউ নেই। আমাদের অনুভূতি ও বুদ্ধি তাঁর কাছে ছেড়ে দিয়ে যতটা নিরাপদ ও নিশ্চিত থাকা যায়, ততটা আর কাউকে দিয়ে নয়।

আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আছেন। যেটি আমরা নিজেরা গড়ে তুলি, আমার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে, ঘটেছে পাঠ্যপুস্তকের ভেতর দিয়েই। সেখানে তাঁর কবিতা পড়েছি, ছবি দেখেছি। আর তাঁর গান শুনেছি সব সময়, গল্প পড়েছি কতবার। ‘ছুটি’ গল্প কে না পড়েছে। সেটি আমাদের সময় পাঠ্য থাকত। পড়েছি গল্পগুচ্ছের অনেক গল্প। ক্লাস নাইনে পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথের লেখা ছিল, ‘পায়ে চলার পথ’। সে রচনা এখনো মনের ভেতর গুনগুন করে। আমার যে বন্ধুর গলা ছিল উঁচু, আবৃত্তি করত স্কুলের অনুষ্ঠানে। তার গলায় ‘আজি এ প্রভাবে রবির কর, যদিও সন্ধ্যা নামিছে মন্দ মন্তরে’ এখনো কানে শুনতে পাই। কলেজে আমাদের বাংলা পড়াতেন অজিত কুমার গুহ। পড়িয়েছেন ‘সোনার তরী’ কবিতাটি। তাঁর পড়ানোতে সে কবিতাটি যেভাবে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল, তা ভুলতে পারিনি। আবৃত্তি তো ছিলই, ছিল ব্যাখ্যাও। সোনার তরী যে ইতিহাস—বিধাতা সে যে মানুষের সৃষ্টিটিকে নিয়ে যায়, নেয় না মানুষকে—ভাবতে পারতাম না অজিত গুহের কাছে না শুনলে।

সাতচল্লিশে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা পাড়ার ছেলেরা রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তীর অনুষ্ঠান করতাম। রবীন্দ্রনাথ অবশ্যই প্রধান; কিন্তু সঙ্গে নজরুলও থাকতেন, নিয়ে নিতাম সুকান্তকে। পরে বুঝেছি, ওটি ছিল আমাদের নতুন চেতনা। রবীন্দ্রনাথই প্রথমে; কিন্তু তার পরে, অনেকটা পরে ছিলেন নজরুল। আবার আমরা সুকান্তকেও সঙ্গে রাখতাম। মনে হয়, আমরা স্বপ্ন দেখতাম নতুন এক দেশের, যেখানে বিশ্বসাহিত্যের চর্চা জীবনের অংশ হবে এবং জাতীয়তাবাদ এগুলো সমাজ বিপ্লবের দিকে। পরে দেখেছি সমাজ সুকান্তকে বাদ দিয়েছে। কেননা তিনি বিপ্লবের কথা বলেন। হস্তক্ষেপ করেছে নজরুলের ওপরও। তাঁকে বাঙালি নয়, মুসলিম জাতীয়তাবাদের মুখপাত্র হিসেবে উপস্থিত করতে চেয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যেহেতু বাঙালি জাতীয়তাবাদের শ্রেষ্ঠ ধারক, তাই তাঁকে কিভাবে কোণঠাসা করা যায়, তার ফন্দিফিকির খুঁজেছে। পারেনি অবশ্য। রবীন্দ্রনাথ রয়ে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির সঙ্গে আমার পরিচয় কিছুটা পরে। তাঁর কয়েকটি ছবির পুনর্নির্মাণ আমার পড়ার জায়গাটিতে টাঙানো ছিল, এখন অবশ্য নেই। কেননা ঘর বদল করতে হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে, আমরা ক্রমে সংকুচিত হচ্ছি। তবে মনের ভেতর ছবিগুলোকে দেখতে পাই। সময়ে-অসময়ে। তাঁর রচনাবলির দুটি সেট আমার বইয়ের শেলফে আছে, একটি পুরনো অন্যটি নতুন। ইংরেজি রচনাগুলো রেখেছি হাতের কাছেই।

আর যেহেতু লেখার একটা অভ্যাস আছে, তাই রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখেছি। লিখেছি খুব আনন্দের সঙ্গে। লেখা হয়েছিল ‘কমুর বন্ধন’, যেটি একটি পুস্তিকা হিসেবে বের হয়েছে। ‘যোগাযোগ’-এর কমুকে আমি দেখেছিলাম ব্যবস্থার হাতে বন্দি হিসেবে। কমুর ভাই তাকে রক্ষা করতে পারে না। মুত্সুদ্দি ধনী লোক, সে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে আটকে ফেলে কলকাতার মস্ত এক বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ‘গোরা’ আমি বারবার পড়েছি এবং তার ওই নায়ক পুরুষের ওপর একটি প্রবন্ধও লিখেছি, সেটা আনন্দের সঙ্গে। আমার প্রবন্ধ আছে রবীন্দ্রনাথের নাটক বিষয়েও। তাঁর রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা নিয়েও লিখেছি। বড় একটা প্রবন্ধ আছে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদী চিন্তার ওপর। সব লেখা একত্র করে একটি বই হয়েছে ‘রবীন্দ্রনাথ কেন জরুরি’। অতিসম্প্রতি একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ‘রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্ক এবং তারপরে’। এতে দেখানো হয়েছে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের ভেতর নানা বিষয়ে ঐক্য ও পার্থক্য যেটা ছিল, তার প্রধান কারণ সময়। রবীন্দ্রনাথের কাল এবং নজরুলের কাল এক নয় এবং তাঁদের কাল তাঁদের লেখার ভেতর রয়েছে দাঁড়িয়ে। তাঁদের সাহিত্য সর্বজনীন; কিন্তু তাঁরা তাঁদের সময়েরও।

রবীন্দ্রনাথকে মনে হয়েছে একটা পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে নানা বৈচিত্র্য ও সার্বক্ষণিক চলমানতা। তিনি সব সময় লিখেছেন এবং সর্বদা এগিয়ে গেছেন। তাঁর জীবনে সময়ের অপচয় বলে কিছু নেই। সাহিত্যকে তিনি জীবন থেকে আলাদা করেননি এবং জীবনের বহু কিছু নিয়ে ভেবেছেন, সেই সঙ্গে সমষ্টিগত পশ্চাৎপদতাকে দূর করার জন্য অবিরাম ব্যস্ত ছিলেন। জীবন কিভাবে যাপন করতে হয়, সে ব্যাপারে তিনি আমাদের শিক্ষক।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আমি যা ভেবেছি এবং রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ চিন্তা সম্পর্কে আমি যা ভাবতাম, তার রেখা অবয়ব এ রকম হবে।

           

দুই.

কত যে গুণ ছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, তার সন্ধান তিনি নিজেই রাখতেন না। অন্যরাও রাখতে গিয়ে হিমশিম খায়; কিন্তু তাঁর গুণগুলো হঠাৎ বড়লোকের বিত্তের মতো অনার্জিত নয়, প্রতিটিই বিকশিত হয়েছে শ্রমে ও অনুশীলনে। তাঁর কাছে বহুভাবে ঋণী আমরা। একটা সাধারণ ঋণ হচ্ছে সাধনার, ক্রমাগত নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার, স্থির না হয়ে থাকা দৃষ্টান্তের। এই দৃষ্টান্তের অনুকরণ সহজসাধ্য নয় অবশ্যই। কিন্তু অতিশয় প্রয়োজন বটে। বিশেষ করে আমাদের মতো স্বল্পে সন্তুষ্ট এবং নড়বড়ে মেরুদণ্ডের সংস্কৃতিতে। তাঁর অবস্থান ও কর্মের একটি স্থান ছিল, ছিল বিশেষ একটি কাল; কিন্তু ওই স্থান ও কালের ভেতর আবদ্ধ থাকার মানুষ ছিলেন না রবীন্দ্রনাথ। সেই যে তাঁর প্রথম জীবনের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’, যাতে গুহার ভেতরে নির্ঝর জেগে উঠেছে। কেননা সে শুনছে সে প্রভাতপাখির গান, স্পর্শ পেয়েছে প্রভাতসূর্যের, স্বপ্ন গেছে ভেঙে এবং প্রাণের ভেতর অনিবার্য আবেগ থরথর করে কেঁপে উঠছে, ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা আঘাতে আঘাত কর, এটি তো কোনো প্রাকৃতিক ঝরনার কথা নয়, একেবারেই রবীন্দ্রনাথের নিজের কথা এবং সেই সঙ্গে সব মানুষের কথাও, যারা জাগতে চায়, বের হয়ে পড়তে চায় পাহাড় ডিঙিয়ে, চলে যেতে চায় বিস্তৃত জনপদে। রবীন্দ্রনাথ নিজে কখনো থামেননি, সারা জীবনই যাত্রী ছিলেন।

যাত্রী হিসেবে তিনি বিভিন্ন গন্তব্যে গেছেন; কিন্তু তাঁর নিজের ঠিকানাটা ছিল নির্দিষ্ট, সেটি তাঁর দেশ। ঠিকানাবিহীন যাত্রী আসলে ভবঘুরে, যার গমনাগমনের ঠিকঠিকানা থাকে না। সে রকম যাত্রী রবীন্দ্রনাথ কখনোই ছিলেন না। তিনি নানা জায়গায় গেছেন, নতুন অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সংগ্রহ করেছেন; কিন্তু অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন তাঁর দেশের কাছে। অসীম তাঁকে ডেকেছে, অত্যন্ত আন্তর্জাতিক ছিলেন দৃষ্টিভঙ্গিতে। জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে তাঁর সময়ে অন্য কোনো ভারতবাসী অমন করে বলেনি; কিন্তু সব সময়ই ছিলেন দেশপ্রেমিক। আমাদের পক্ষে দেশপ্রেমের শিক্ষাটাও তাঁর কাছ থেকে প্রাপ্য। এই যাত্রীটি প্রয়োজনে একলা চলার কথা বলেছেন, তাঁর জীবনে একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা দুটোই ছিল। অতি বড় মাপের মানুষ যা হয়, তা তাঁর জীবনে ঘটেছে। বন্ধু পাওয়া ভার হয়েছে, স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন ৪১ বছর বয়সে, ভিড়ের মধ্যে হাঁপিয়ে উঠতেন, থাকতে পছন্দ করতেন গ্রামে; শান্তিনিকেতনে, কুষ্টিয়ায়; শাহাজাদপুরে, পদ্মায় নৌকা ভাসিয়ে কত দিন কাটিয়েছেন, কতবার গেছেন তিনি বিদেশ ভ্রমণে, কত বিচিত্র সব উপলক্ষে; কিন্তু সব সময়ই তিনি আমাদেরই লোক, আমাদের অতিশয় আপনজন। সহযাত্রী হিসেবে তিনি তাঁর দেশের মানুষকে সঙ্গে নিতে চেয়েছেন, বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে। অনেক কঠিন দুর্যোগ গেছে; তাঁর দেশের মানুষকে সঙ্গে নিতে চেয়েছেন, বদলাতে চেয়েছেন সমাজকে। অনেক কঠিন দুর্যোগ গেছে তাঁর ব্যক্তিজীবনে; কিন্তু কখনোই বিচ্ছিন্ন হননি মানুষের কাছ থেকে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি আছে; কিন্তু প্রকৃতি আছে মানুষের কারণেই, মানুষ আছে বলেই।

জন্ম রোমান্টিক—রবীন্দ্রনাথ বলেছেন নিজেকে। খুবই সংগত এই বর্ণনা। তিনি সর্বদাই রোমান্টিক; যেন গানের পাখি এবং তাঁর গানই তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি এবং সেসব গানের প্রতিটিই অনবদ্য কবিতা। এত অধিক গীতিকবিতা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অন্য কোনো কবি রচনা করেছেন বলে জানা যায় না। তাঁর পর্বতরা সর্বদাই হতে চায় নিরুদ্দেশ মেঘ। কিন্তু তিনি তো আবার স্থান ও কালের মানুষ। আবদ্ধ ছিলেন না অবশ্যই; কিন্তু তাই বলে যে সীমানায় তাঁর অবস্থান তাকে যে ঘৃণা করতেন, তা-ও নয়। আসলে ভালোবাসতেন। গভীর ছিল মমতা। যে জন্য তাঁকে বদলাতে চাইতেন।

পারিবারিক ও সাংসারিক দায়িত্ব পালনে নিপুণ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কিন্তু আবার সর্বদাই তাঁর যোগ ছিল সমাজের সঙ্গে, রাজনীতির সঙ্গেও। কৃষি ক্ষেত্রে সমবায়ের প্রচলন, কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, উন্নত চাষের আয়োজন—এসব কাজ অন্য রোমান্টিক কবির সাজে কি না, বলা কষ্ট; কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে এ ধরনের কাজে কার্পণ্য করেননি, সে তো আমরা সবাই জানি। কবির হাত পরিণত হয়েছে কৃষকের হাতে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন, সেখানে প্রবর্তন করেছেন নতুন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি, বিশ্বকে নিয়ে এসেছেন বিদ্যালয়ের কাছে। কিন্তু বিদ্যালয়ের নিজস্বতা এবং তাঁর স্থানীয়ত্বকে বিঘ্নিত হতে দেননি কোনো মতেই। রাজনৈতিক আন্দোলনেও ছিলেন তিনি। কখনো কখনো একেবারে সামনে। যেমন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে। পরে পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে। বন্দি মুক্তির দাবি যখন উঠেছে, আমরা দেখেছি তাঁকে প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা করতে।

একজন রোমান্টিক কবি কতটা বাস্তববাদী হতে পারেন, তার নিদর্শন ইংরেজি সাহিত্যে যেমন শেকসপিয়ার, বাংলা সাহিত্যে তেমনি রবীন্দ্রনাথ। সে বাস্তববাদিতা শুধু তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মে পাব না, পাব তাঁর অসামান্য ছোটগল্পগুলোতেও। সেখানে মানুষকে যেভাবে দেখেছেন তিনি, তেমনিভাবে দেখা তাঁর পক্ষেই সম্ভবপর, যাঁর কল্পনাশক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা। তাই বলে কল্পনা ও বাস্তববাদিতা যে একাকার হয়ে একই স্রোতে মিশে গেছে, তেমনটা নয়; মিশে গেলে তাঁর দৃষ্টি অমন জীবন্ত ও সর্বজনীন হতো না। যেটা ঘটেছে তা হলো দুই পক্ষের ভেতর একটা দ্বন্দ্ব বেধেছে, বাস্তববাদিতা কল্পনাতে অবাস্তবিক মতো ছাড় তো দেয়ইনি; বরং কল্পনাকে বাধ্য করেছে সতর্ক পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত থাকতে। অন্যদিকে কল্পনার শক্তি বাস্তব ঘটনা ও মানুষকে প্রাণহীন অবস্থায় থাকতে দেয়নি; তাদের বিদীর্ণ করে ভেতরে, একেবারে ভেতরে গিয়ে প্রবেশ করেছে এবং সেই ভেতরে রয়েছে ঘাতপ্রতিঘাতের বিচিত্র তরঙ্গমালা, তাদের নিয়ে এসেছে সামনে, প্রকাশ করেছে অনবদ্য ভাষাতে, মণ্ডিত করে দিয়েছে সর্বজনীন তাৎপর্যে। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের সব রচনায়ই একটা দ্বন্দ্ব কার্যকর। সেই দ্বন্দ্ব শুধু যে ওই কল্পনা ও বাস্তবের তা নয়, আবেগ ও বুদ্ধিরও বটে; আবেগ সেখানে শৃঙ্খলা পেয়েছে বুদ্ধির প্রয়োগে এবং বুদ্ধি নিজেও শক্তিশালী হয়েছে আবেগের সঙ্গে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে। এই দ্বন্দ্বের কারণেই রবীন্দ্রনাথের সব রচনাই অমন জীবন্ত—হোক সে কবিতা, কী প্রবন্ধ, নাটক অথবা চিত্রকলা।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ও বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধজুড়ে রবীন্দ্রনাথের জীবন ও কর্মের বিস্তার। সেই সময় অনেক রাজনৈতিক ও সামাজিক দ্বন্দ্ব ছিল প্রবল। রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বটা ছিল বিদেশি শাসকদের সঙ্গে ভারতবর্ষের মানুষের। সমাজে ছিল সাম্প্রদায়িকতা, যার জন্ম ও লালন অবশ্য রাজনীতির হাতেই, রাজনীতি থেকেই সে সমাজ এসেছে—এমনটা বলা অনায্য নয়।

রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধান পুরুষ ছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। রবীন্দ্রনাথ রাজনীতির লোক নন; কিন্তু রাজনীতি বিষয়ে অসচেতন ছিলেন না কখনোই। তখনকার রাজনীতিতে গান্ধীর ভূমিকাই ছিল প্রধান—রবীন্দ্রনাথ বারবার উল্লেখ করেছেন সে কথা। কিন্তু দ্বন্দ্ব ছিল দুজনের দৃষ্টিভঙ্গিতে। পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে বলা প্রয়োজন যে কোনো কোনো দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন গান্ধীর তুলনায় এগিয়ে। যেমন ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির মিশ্রণের বিষয়টি। গান্ধী অবশ্যই অসাম্প্রদায়িক ছিলেন; কিন্তু তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষ বলা কঠিন। কেননা রাজনীতির সঙ্গে তিনি ধর্মকে যুক্ত করতে চাইতেন, স্বপ্ন দেখতেন রামরাজ্যের, রাজনৈতিক সংগ্রামকে আধ্যাত্মিক রূপ দেওয়ার ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ ছিল স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ রাজনীতিকে প্রাধান্য দিতে নারাজ ছিলেন, এটা ঠিক। তাঁর বিবেচনায় সমাজ বড় রাষ্ট্রের চেয়ে; কিন্তু রাজনীতিকে তিনি উপেক্ষা করেননি। আরো বড় কথা এটা যে রাজনীতিকে তিনি রাজনীতি হিসেবেই দেখতে চেয়েছেন আধ্যাত্মিক কাজের রাজনৈতিক রূপ হিসেবে না দেখে। যেমন ধরা যাক, চরকার কথা। গান্ধী চরকাকে রাজনৈতিক অস্ত্র মনে করতেন। রবীন্দ্রনাথ তা করতেন না। তিনি চরকাবিমুখ ছিলেন না; কিন্তু চরকা কেটে যে স্বাধীনতা আসবে, তেমনটা মানতেন না। একসময় গান্ধী বিদেশি কাপড় বর্জনের ডাক দিয়েছিলেন; কিন্তু বিদেশি কাপড় পোড়ালে দেশি গরিব মানুষের যে মস্ত উপকার হবে—এমন বিশ্বাস রবীন্দ্রনাথের ছিল না। দুজনের দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পার্থক্যটা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে ১৯৩৪ সালে বিহারে যে ভূমিকম্প ঘটে সে সম্পর্কে গান্ধীর মন্তব্য ও রবীন্দ্রনাথের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায়। গান্ধী বলেছিলেন, ভূমিকম্পটি ঘটেছে অস্পৃশ্যতার পাপের দরুন শাস্তি হিসেবে। অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে জাগতিক ঘটনার এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় মানুষের যে ক্ষতি এবং ঈশ্বরের যে অবমাননা ঘটে, তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন রবীন্দ্রনাথ।

‘গোরা’ (১৯০৭-০৯) উপন্যাসের সেই প্রবল নায়ক যেভাবে তার হিন্দু জাতীয়তাবাদের মোড়কটি ছিন্ন করে বের হয়ে এলো, সে-ও এক নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ বৈকি। রবীন্দ্রনাথ কৌতুকের সঙ্গে দেখিয়েছেন, নব্য হিন্দুত্ববাদের প্রাবল্যে অস্থির এই যুবক আসলে ব্রাহ্মণ তো নয়ই, জন্মসূত্রে হিন্দুও নয়। সিপাহি অভ্যুত্থানকালে তার জন্ম ও তার মাতা-পিতা আইরিশ। এমন সন্দেহ অমূলক নয় যে গোরার নব্য হিন্দুত্বের মধ্যে বিবেকানন্দের প্রক্ষেপ ঘটেছে; কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে একসময় রবীন্দ্রনাথ নিজেও গোরার মতোই নব্য হিন্দুত্বের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন, যার নিদর্শন তাঁর প্রথম জীবনের অনেক প্রবন্ধে পাওয়া যায়; বিশেষভাবে দৃষ্টিগোচর হয় ১৯০৪ সালে লেখা ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতাতে, যেখানে তথাকথিত ধর্মরাজ্য স্থাপনে শিবাজীর আগ্রহের পক্ষে জয়ধ্বনি করা হয়েছে। কিন্তু গোরা যেমন তার ভ্রম বুঝতে পেরেছে, রবীন্দ্রনাথও তেমনি ধর্মীয় সংস্কৃতিতে আস্থার বৃত্ত ভেঙে বের হয়ে এসেছেন।

  উপন্যাসের শেষে আত্মপরিচয় উন্মোচনকারী সেই অপ্রত্যাশিত ও ভয়ংকর ভূমিকম্পটির পরে গোরা গেছে পরেশবাবুর কাছে, গিয়ে বলছে, ‘আমি যা দিনরাত্রি হতে চাচ্ছিলুম অথচ হতে পারছিলুম না, আজ আমি তাই হয়েছি। আজ আমি ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই।’ পরেশবাবুর কাছে সে চাইছে সেই দেবতার মন্ত্র, ‘যিনি হিন্দু, মুসলমান, খিস্ট্রান, ব্রাহ্ম সবাই, যিনি শুধুই হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’ আর যে আনন্দময়ীকে সে এত দিন মাতা বলে জানত, কিন্তু আসলে যিনি তার পালিতা মাতা, তাঁর কাছে গিয়ে গোরা বলে, ‘মা, তুই আমার মা। যে মা খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম, তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই—শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা। তুমিই আমার ভারতবর্ষ।’

  রবীন্দ্রনাথ অবশ্য পরিপূর্ণরূপে বাঙালি ছিলেন এবং তাঁর ভারতীয় সত্তা ও বাঙালি সত্তার ভেতর দ্বন্দ্ব তো নয়ই, বিরোধও তিনি দেখতে পাননি। অথচ অভ্যন্তরে একটা বিরোধ তো নিশ্চয়ই, দ্বন্দ্বও ছিল। কেননা বাঙালিত্ব জিনিসটা হচ্ছে ভাষাভিত্তিক, আর ভারতীয় পরিচয়টা হলো ধর্মভিত্তিক। গোরা যে বলছে সে এমন দেবতা খুঁজছে, যিনি কোনো ধর্মের নন, সব ভারতের দেবতা। তার সেই অনুসন্ধানের ভেতরেই তো ধর্ম রয়ে গেছে, রয়েছে ধর্মবাদিতাও। তা ছাড়া ভারতকে গোরা যে এক ভাবছে, সেই ঐক্যের ভিত্তিটা কী? ভূগোল, অর্থনীতি, নাকি অন্য কিছু? ভৌগোলিক দিক থেকে ভারত হলো পৃথিবীর মতোই বৈচিত্র্যময়; অর্থনীতিতেও সে অসম। ব্রিটিশ যুগে প্রশাসনিক একটা কৃত্রিম ঐক্য চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভারতবর্ষ কখনোই এক জাতির দেশ ছিল না, ছিল বহু জাতি নিয়ে গঠিত একটি মহাদেশ, যেখানে স্বতন্ত্র জাতিসত্তাগুলোর ভিত্তি ধর্ম ছিল না, ছিল ভাষা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ভারতীয়দের একটি সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে একই সমতলে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারত, কিছুটা দিয়েও ছিল বৈকি। কিন্তু ভারতীয়দের কাছে ব্রিটিশের ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা যতই পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকল, ততই হিন্দু-মুসলিম এই দুই ধর্মাবলম্বীদের মুখপাত্ররা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল এবং তখনই দেখা দিল সাম্প্রদায়িকতা। ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ভারতবাসীকে এক জাতি বলে মনে করত; কিন্তু ভারতের এক-চতুর্থাংশ মুসলিম, যারা প্রতিনিধি হিসেবে দেখা দিল, তারা বলল, ভারতে এক জাতি নয়, জাতি রয়েছে দুটি—হিন্দু ও মুসলমান। সেই দ্বন্দ্বের ফলে শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিণত হয়েছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়, যার পরিণতিতে ভারত ভাগ হয়ে গেছে—প্রথমে হয়েছে দুই টুকরা, এখন সেখানে টুকরা তিনটি, ভবিষ্যতে সংখ্যা আরো বাড়বে—এমন আশঙ্কা।

ভারতের জন্য জাতীয় সমস্যার সমাধান ছিল সবাইকে এক জাতিতে পরিণত করার চেষ্টা না করে বরং সব জাতিসত্তাকে স্বীকৃতি দিয়ে তদনুযায়ী কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন এবং তাদের নিজস্ব প্রয়োজনে সারা ভারতে একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। তাহলে একই সঙ্গে বাঙালি, পাঞ্জাবি, মারাঠি প্রভৃতি হওয়া এবং ভারতীয় হওয়া দুটোই সম্ভব হতো, বিরোধ বাধত না। এই বোধের জন্ম নেওয়ার সময়টা অবশ্য রবীন্দ্রনাথের কালে আসেনি, রবীন্দ্রনাথ তেমন কথা বলেনওনি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ খুব বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন মাতৃভাষার চর্চার ওপর। বাঙালি যে বাংলা ভাষার কারণেই বাঙালি, এই সরল সত্য তিনি জোর দিয়ে বলে গেছেন। বাংলা ভাষা চর্চায় তাঁর নিজের অবদান অসামান্য। রবীন্দ্রনাথের আগের বাংলা সাহিত্যে এবং বাংলা ভাষার সঙ্গে পরের সাহিত্য ও ভাষার পার্থক্যটা পরিমাণ করা অসম্ভব; কিন্তু তা যে বিরাট তা নিয়ে কেউ কখনো সংশয় প্রকাশ করবে না। শব্দের ব্যবহার, উপমা, রূপক, বাক্য গঠন, সব কিছুতেই তিনি পরিবর্তন এনেছেন এবং সব কিছুকে মিলিয়ে বদলে দিয়ে গেছেন আমাদের রুচি। আমাদের বলা, লেখা, ভাবনা, অনুভব করার ক্ষমতা সব কিছুতেই রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আসলে অন্য কেউ নন, তিনি নিজেই। তিনি নিজেই নিজেকে প্রতিপক্ষ করে ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন। মাতৃভাষার চর্চা তাঁর আগেও হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বঙ্কিমচন্দ্রের কথা। দেশপ্রেম ও বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধকরণ উভয় ক্ষেত্রেই বঙ্কিমচন্দ্র  ছিলেন অসাধারণ। কিন্তু দুজনের ভেতর পার্থক্য রয়েছে, যেটা খুবই পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ গানের সঙ্গে যে গানটি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গানেও মা আছে, কিন্তু সে মা দেবী নন, মাতৃভূমিই শুধু। দুটি গানের ভেতরকার এই ব্যবধান বলে দেয় যে রবীন্দ্রনাথ শুধু পরে আসেননি, অনেকটা পথ ভেঙেও এসেছিলেন। বাংলা সাহিত্য ও বাঙালি জাতি উভয়কেই তিনি এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িকতার পথ ধরে। সাহিত্যকে অসাম্প্রদায়িকীকরণে তাঁর দান অতুলনীয়। সাম্প্রদায়িক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তিনি কাজ করেছেন পরিপূর্ণ অঙ্গীকার নিয়ে। কিন্তু রাষ্ট্র ছিল প্রতিপক্ষ। পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র মাতার প্রতি ভালোবাসার সন্তানকে এক হতে দেয়নি, উসকানি দিয়ে, লোভ দেখিয়ে, বাঙালিকে ভাগ করে দিয়েছে দুই পক্ষে এবং একপক্ষকে শত্রু করে তুলেছে অন্যপক্ষের। 

অনুলিখন : শ্যামল চন্দ্রনাথ

মন্তব্য