kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্মৃ তি ক থা

উত্তম শর্মিলা উৎপল দত্তের সঙ্গে সুন্দরবনে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



উত্তম শর্মিলা উৎপল দত্তের সঙ্গে সুন্দরবনে

পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা। স্মৃতি-বিস্মৃতির আলো-আঁধারে ঢাকা ছিল। হঠাৎ ১৯৭৪ সালের ডায়েরিটা হাতে পেয়ে পড়তে গিয়ে ঘটনাটির বিবরণ চোখে পড়ল। সঙ্গে তখনকার তোলা কয়েকটি ছবি। স্মৃতিকাতর মনে ইচ্ছা জাগল, নিজের জীবনের এই উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি নিয়ে এত দিন কিছু লিখিনি, এখন লিখছি। আমার প্রজন্মের কিছু বিখ্যাত মানুষকে নিয়ে লেখা এই স্মৃতিকথা হয়তো এ প্রজন্মের পাঠকদেরও ভালো লাগবে।

১৯৭৪ সালের কথা। আমি তখন কলকাতায়। স্ত্রীর গুরুতর অসুস্থতার জন্য তাঁকে নিয়ে কলকাতায় গেছি চিকিৎসা উপলক্ষে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কাছে ক্যালকাটা পিজি হাসপাতালে (এখন নাম পরিবর্তিত হয়েছে)। উডবার্ন ওয়ার্ল্ড বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. তরিৎ কুমার ঘোষের তত্ত্বাবধানে স্ত্রী চিকিিসত হচ্ছেন। আমি থাকি কাছেই বিশাল নিজাম প্যালেসের তেতলার একটি কক্ষে। এককালে হায়দরাবাদের (এখন অন্ধ্র প্রদেশ) নিজাম কলকাতা এলে এই প্যালেসে থাকতেন। এখন এটি ভারত সরকারের স্টেট গেস্টহাউস।

আমি তখন ঢাকার একটি দৈনিকের সম্পাদনা করি। ফলে ঢাকায় গিয়ে সপ্তাহখানেক থেকে আবার কলকাতায় ফিরতে হয়। কলকাতায় আনন্দবাজার পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লিখি। ফলে কলকাতার শিল্পী, সাহিত্যিক-সাংবাদিকমহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়েছে। সকাল থেকে দুপুর হাসপাতালে স্ত্রীর কাছে থাকি। বিকেলে বেশির ভাগ সময় আনন্দবাজার অফিসের আড্ডায় যাই। আড্ডা হয় সন্তোষ কুমার ঘোষ, অমিতাভ চৌধুরী, গৌর কিশোর ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নরেন্দ্র নাথ মিত্র, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, কবিতা সিংহ এবং আরো অনেকের সঙ্গে। মাঝেমধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলী আসতেন আড্ডা গরম করতে।

সাহিত্যিক মনোজ বসু ও অন্নদাশঙ্কর রায়ের বাড়িতে প্রায়ই যেতাম। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন কলকাতায় ছিলাম, তখন এঁদের সঙ্গে পরিচয় ও আলাপ হয়। পরে তা ঘনিষ্ঠতায় পরিণত হয়। কলকাতায় আমার ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন অমিতাভ গুপ্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর বই লিখেছেন। পেশায় ছিলেন জেনারেল লাইফ ইনস্যুরেন্সের কলকাতা ব্রাঞ্চের প্রধান কর্মকর্তা। সাবেক ডালহৌসি স্কয়ারে ছিল তাঁর অফিস। মাঝেমধ্যে তাঁর অফিসেই সময় কাটাতাম। কলকাতায় গেলে তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িটি তিনি আমাকে ছেড়ে দিতেন। এই গাড়িতে আমি সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াতাম। গাড়ির ড্রাইভারের নাম ছিল আশুতোষ। আমি তাকে ডাকতাম স্যার আশুতোষ। সে খুব খুশি হতো।

অমিতাভ গুপ্তের মাধ্যমেই আমার পরিচয় হয় বিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা উৎপল দত্ত ও তাঁর স্ত্রী শোভা সেন এবং সত্যজিৎ রায় ও তাঁর স্ত্রী বিজয়া দেবীর সঙ্গে। উত্তম কুমার ও সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেও পরিচয় হয় অমিতাভ গুপ্তের সৌজন্যে। প্রথম আলাপেই উত্তম কুমার তাঁর ময়রা স্ট্রিটের বাসায় যেতে এবং ইন্দ্রপুরি স্টুডিওতে তাঁর একটি ছবির শুটিং দেখতে আমন্ত্রণ জানালেন। ইন্দ্রপুরি স্টুডিওতে গিয়ে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মুম্বাইয়ের এককালের বিখ্যাত নায়িকা (অশোক কুমারের সঙ্গে ‘কিসমত’ ছবিতে) নীলা চিটনিসের সঙ্গে পরিচিত হই।

উৎপল দত্তের নাটক নিয়ে তখন কলকাতা সরগরম। তিনি বামপন্থী নাট্যকার। সে জন্য আনন্দবাজার পত্রিকা তাঁর নাটকের বিজ্ঞাপন ছাপত না। কিন্তু তাতে তাঁর নাটকের দর্শকের সংখ্যা কামানো যায়নি। আমি তাঁর নাটক ও তাঁর অভিনয়ের ভক্ত হয়ে গেলাম। তাঁর টালিগঞ্জের বাসাটি ছিল নিজাম প্যালেস থেকে বহুদূরে। ট্রামে যেতে লাগত আড়াই ঘণ্টার ওপরে। তবু মাসে অন্তত দুইবার শোভা সেনের কাছ থেকে তাঁদের বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ পেতাম এবং যেতাম।

উৎপল দত্তের বিখ্যাত ‘ব্যারিকেড’ নাটকটি তখন কলকাতায় আবার মঞ্চস্থ করার আয়োজন চলছে। তার রিহার্সাল দেখার জন্য তিনি আমাকে ডাকলেন। তাঁর ‘লালকেল্লা’ নাটকের রিহার্সালও আমি দেখেছি। তাঁর অভিনীত ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবিটিও তখন মুক্তি পায়। আমার ছেলে অনুপমকে সঙ্গে নিয়ে সেই ছবি দেখতে গেছি। উৎপল দত্ত ও শোভা সেনের সঙ্গে বসে সেই ছবি দেখেছি।

তত দিনে উৎপল দত্ত আমার কাছে উৎপল দা এবং শোভা সেন শোভাদি হয়ে গেছেন। আমি তাঁদের কাছে তুমির পর্যায়ে নেমেছি। এই সময়ে একদিন শোভাদি হাসপাতালে আমার স্ত্রীকে দেখতে এলেন। সেখান থেকে ফিরে যাওয়ার পথে আমাকে বললেন, “বোম্বে থেকে শক্তি সামন্ত (ফিল্ম ডিরেক্টর) কলকাতায় এসেছেন তাঁর ‘অমানুষ’ (বাংলা ও হিন্দি) ছবির শুটিংয়ের জন্য। উৎপল, উত্তম কুমার, শর্মিলা ঠাকুর অভিনয় করছেন। দু-এক দিনের মধ্যে সুন্দরবনে শুটিং শুরু হবে। তুমি আমাদের সঙ্গে যেতে চাও?” জিজ্ঞেস করলাম, সুন্দরবনের অংশ পশ্চিমবঙ্গেও পড়েছে জানি। কলকাতা থেকে কত দূরে যেতে হবে? শোভাদি বললেন, ‘কলকাতা থেকে ৮০ মাইল দূরে সুন্দরবনের তুষখালীতে যেতে হবে। পথে আগুনমুখো নদী পার হতে হবে।’

শোভা সেনের মুখে আরো জানলাম, কলকাতা থেকে সোনারপুর, ঘটকপুকুর, মালঞ্চ হয়ে ধামাখালী পৌঁছে আগুনমুখো নদী পেরিয়ে তারপর তুষখালী। সেখানেই নদীর পারে গভীর অরণ্যে কাঠের অস্থায়ী কলোনি তৈরি করা হয়েছে। তাতে আমরা থাকব। আউটডোর শুটিং হবে নদীর পারে এবং গভীর বনের ভেতরে। এই ভ্রমণ এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চারের মতো। মনে মনে খুব উৎসাহিত হলাম। কলকাতায় কাজকর্মহীন জীবন একঘেয়ে হয়ে উঠেছিল। কাজের মধ্যে ছিল—সকালে স্ত্রীকে দেখার জন্য হাসপাতালে যাওয়া এবং বিকেলে আনন্দবাজার অফিসে লেখা নিয়ে গিয়ে আড্ডা দেওয়া। বৈচিত্র্যের মধ্যে ছিল, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মাতলামি নিয়ে মজা করা। তিনি তখন আনন্দবাজারে চাকরি করেন।

মাতাল অবস্থায় থাকলে আমাকে দেখেই বলতেন, ‘গাফ্‌ফার, তুমি আমার কবিতার কচু বোঝো।’ আর প্রকৃতিস্থ থাকলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে বলতেন, “গাফ্‌ফার, তোমার কাছে হাতজোড় করে মাফ চাচ্ছি। সুনীলের ‘কৃত্তিবাসে’ তোমার কবিতা পড়েছি। খুব ভালো লেগেছে।” সুনীল আর শক্তির মধ্যে কে বড় কবি, সে সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে টিপ্পনী কেটে দুই বন্ধুর মধ্যে ঝগড়া লাগাতাম। সুনীলের গড়িয়া হাটের বাড়িতে তাঁদের মদের আসরে বসেই এই কাজটা আমি বেশি করতাম।

১৯৭৪ সালের মে মাস। ৮ মে বুধবার আমাদের সুন্দরবনে যাত্রা করার কথা। তার আগের দিন ঘটল এক শোকাবহ ঘটনা। দীর্ঘ কয়েক বছর রোগশয্যায় প্রায় অজ্ঞান অবস্থায় থাকার পর ৭ মে মঙ্গলবার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী ৯৪ বছর বয়সে মারা গেলেন। খবরটা প্রথমে আমাকে দিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। তিনি তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। বড় পরিচয় দেশবন্ধুর মেয়ের ঘরের নাতি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। কলকাতায় আমার স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যবস্থা তিনিই করে দিয়েছেন।

বাসন্তী দেবীর মৃত্যুর খবর দ্বিতীয়বার পেলাম হেনাদাস গুপ্ত নামের এক গবেষক তরুণীর কাছ থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিভাগে কাজ করতেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের রাজনীতি ও স্বরাজ্য পার্টি’। এই গবেষণাগ্রন্থের কাজের জন্য তিনি রোজই দেশবন্ধুর বাড়িতে যেতেন এবং বাসন্তী দেবীর সেবায় জড়িয়ে পড়েন। এই হেনার সঙ্গে পরিচয় হতেই তিনিই আমাকে প্রায়ই বাসন্তী দেবীর বাড়িতে নিয়ে যেতেন। তাঁর লেখা দেশবন্ধু সম্পর্কিত বিশাল গবেষণাগ্রন্থ আমাকে উপহার দিয়েছেন। কলকাতায় হেনা আমার নিত্যদিনের সাথি হয়ে উঠেছিলেন। বলতেন, ‘আমাকে ঢাকায় নিয়ে চলুন। আমি বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি নিয়ে গবেষণা করতে চাই।’

আমি বাসন্তী দেবীর মরদেহের শ্মশানযাত্রী হইনি। ছোটবেলা থেকেই শ্মশান আমার খুব ভয়ের স্থান। বাসন্তী দেবীর মৃতদেহ তাঁর বাসায় থাকতেই নিউ মার্কেট থেকে ফুলের মালা কিনে তাঁর কফিনে অর্পণ করব ঠিক করলাম। সঙ্গে হেনা যাবেন। রওনা হব, এমন সময় নিজাম প্যালেসের কেয়ারটেকার এসে বললেন, ‘ঢাকা থেকে আপনার টেলিফোন এসেছে। নিচে অফিসঘরে আসুন।’

তখন মোবাইল ফোনের চল হয়নি। টেলিফোন ধরতে হলো নিচের অফিসঘরে গিয়ে। রিসিভার তুলতেই বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বর, ‘দেশবন্ধুর পত্নী আজ মারা গেছেন। তুমি শ্মশানঘাটে যাচ্ছ?’ বললাম, ‘না বঙ্গবন্ধু, শ্মশানে যেতে আমার বড় ভয়। আমি ফুলের মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে বাসায় যাব।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আমি সোবহান চৌধুরীকে (কলকাতায় তখন বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন) আমার শোকবার্তা সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়কে পৌঁছে দিতে বলেছি। তুমি দেশবন্ধুর বাসায় গেলে আমার হয়ে এই গ্রেট লেডির মরদেহে একটা ফুলের মালা দিয়ো।’ আমি নিউ মার্কেট থেকে দুইটা ফুলের তোড়া কিনেছিলাম।

 

দুই.

দিন যায় কথা থাকে। অবিভক্ত বাংলায় দেশবন্ধু যে দল-মত-নির্বিশেষে সব বাঙালির নেতা ছিলেন, তা আরো ভালোভাবে বুঝতে পারলাম বাসন্তী দেবীর মরদেহে ফুলের মালা দিতে গিয়ে। কংগ্রেসের দল-উপদলের নেতারা তো আছেনই, সিপিএম নেতা জ্যোতি বসুও ফুলের মালা হাতে কিউতে দাঁড়িয়ে। দেশবন্ধুর মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এসেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ, মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।’ আমি এই লাইন দুটি কাগজে লিখে বঙ্গবন্ধুর ফুলের তোড়ার সঙ্গে দেশবন্ধুর পত্নীকে উৎসর্গ করেছিলাম।

পরদিন তুষখালী যাব। ‘অমানুষ’ ছবির পরিচালক শক্তি সামন্ত তাঁর দলবল নিয়ে আগের দিনই চলে গেছেন। ছবিতে অভিনয় করেছেন উৎপল দত্ত, উত্তম কুমার, শর্মিলা ঠাকুর, অনিল চ্যাটার্জি, মানিক দত্ত এবং বোম্বের দুটি নতুন মুখ প্রেমা ও ঝর্না। তাঁরা যাচ্ছেন আজ। উৎপল দত্ত ও শোভা সেনের সঙ্গে অমিতাভ গুপ্তের টালিগঞ্জের বাড়ি থেকে আমার যাওয়ার কথা। সকাল সাড়ে ৬টায় অমিতাভ গুপ্ত নিজাম প্যালেসে গাড়ি পাঠালেন। আমরা সেই সাতসকালে তুষখালী রওনা হলাম।

সূর্যোদয়ের মুহূর্তে প্রায় যানবাহনমুক্ত কলকাতার রাস্তায় গাড়িতে বসে বেড়াতে ভালোই লেগেছিল। শহরের সীমানা পেরিয়ে আগুনমুখো নদীর দিকে যেতে প্রাকৃতিক দৃশ্য আরো মনোরম; কিন্তু সোনারপুর, ঘটকপুকুর, মালঞ্চ ও ধামাখালী পেরিয়ে আগুনমুখো নদীর পারে পৌঁছতেই আমার চক্ষু স্থির। আমি নদীমাতৃক বরিশাল জেলার মানুষ। মেঘনা, পদ্মা, কালাবদর নদী পাড়ি দিতে কখনো ভয় পাইনি। কিন্তু আগুনমুখো নদীতে এই শান্ত আবহাওয়াতে ১০-১২ হাত ঢেউয়ের অবিরাম ওঠানামা দেখে বুক শুকিয়ে গেল। এই ঢেউয়ের তাণ্ডব পেরিয়ে নদীর অন্য পারে তুষখালী পৌঁছব। বাহন ছোট ছোট ডিঙি।

উত্তম, উৎপল, শর্মিলারা আমাদের আগেই এসে ঝুপড়ির মতো চায়ের দোকান থেকে মাটির ভাঁড়ে চা পান করছিলেন। আমাদের দেখে সরবে এগিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানালেন। শর্মিলা ঠাকুরকে দেখে বিস্মিত হলাম। এত বড় মাপের অভিনেত্রী, কিন্তু কোনো গরিমা নেই। পরিচয় হওয়ার আগে নিজে থেকে যেচে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। উৎপল দত্তের কাছে আমার কথা জেনেছেন জানিয়ে বললেন, ‘ওহ্, আপনিই সেই জয় বাংলার লোক। আপনাদের বঙ্গবন্ধু কেমন আছেন?’

উৎপল দত্ত বললেন, ‘বঙ্গবন্ধু শুধু পূর্ব বাংলার নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরও নেতা। সত্যজিৎ গিয়েছিলেন বাংলাদেশে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল। তাঁর মুখেই শুনেছি, এই সাড়ে ছয় ফুট উঁচু মানুষটির কথা। আহ্! আর দশটি বছর আগে তিনি যদি জন্মাতেন, তাহলে দুই বাংলার মানুষকেই মুক্ত করে যেতে পারতেন।’ শোভা সেন তাঁকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘উৎপল, তুমি বড় বেশি রাজনীতি নিয়ে কথা বলো। আমরা তো ছবির শুটিংয়ে চলেছি।’

উৎপল বললেন, “মানুষের জীবনটাই তো রাজনীতিময়। শিল্প, সাহিত্য, নাটক, ছায়াছবি, সংগীত—সব কিছুই রাজনীতি ছাড়া অর্থহীন, আমি যে এখন ‘দুঃস্বপ্নের নগরী’ নামের নাটক লিখেছি, তা-ও তো অবাঙালি শাসকদের শোষণ-শাসনে অতিষ্ঠ কলকাতার মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, অর্থাৎ রাজনীতি ছাড়া আর কিছু নয়। এই রাজনীতি আছে বলেই মানুষ আমার নাটক দেখতে ছুটে আসে।’

উত্তম কুমার বললেন, ‘আমি কখনো ঢাকায় যাইনি। এখন যাওয়ার খুব ইচ্ছা। ঢাকার ছবিতে অভিনয় করতে পারলে আরো ভালো হতো।’ আমি বললাম, ‘বঙ্গবন্ধুর ইচ্ছা, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন নিয়ে একটি ছবি হোক। সেটি বাংলাদেশ-ভারত যৌথ উদ্যোগে হবে।’

উত্তম কুমার বললেন, ‘তাতে কোনো একটা প্রধান চরিত্রে অভিনয় করতে পারলে খুশি হতাম।’ শোভা সেন বললেন, ‘আপনি তো রোমান্টিক চরিত্রের অভিনেতা। এসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ছবিতে মানাবেন কি?’ উৎপল দত্ত মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, ‘মানাবেন, আলবত মানাবেন। তবে এই ছবির স্ক্রিপ্টটা আমাকে লিখতে হবে।’

নদীর ঘাটে তিন-চারটা বড়সড় ডিঙা এলো। আমাদের গাড়িগুলো উঠল দুটি ডিঙায়। আমরা ভাগ হয়ে আর দুটি ডিঙায় চাপলাম। উত্তম কুমার ও শোভা সেনের সঙ্গে একই ডিঙায় স্থান পেলাম। উত্তম কুমার আমার ভীত মুখ দেখে বললেন, ‘আপনি তো মেঘনা-পদ্মার দেশের লোক। তাহলে নদীর ঢেউ দেখে ভয় পাচ্ছেন কেন?’ বললাম, ‘আপনি ভয় পাচ্ছেন?’ উত্তম কুমার বললেন, ‘না, পাচ্ছি না। আমার জ্যোতিষী বলেছেন, নদীতে ডুবে আমার মৃত্যু নেই।’ শোভা সেন বললেন, ‘আপনি তাহলে জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করেন?’ উত্তম কুমার বললেন, ‘নিশ্চয়ই করি। আপনি করেন না?’ শোভা সেন বললেন, ‘ওরে বাপ রে! জ্যোতিষশাস্ত্রে বিশ্বাস করি, এ কথা উৎপল জানলে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেবেন।’

ডিঙি তুষখালীর ঘাটে পৌঁছল। ধড়ে যেন প্রাণ পেলাম। সুন্দরবনের ঘন জঙ্গল মনে ভীতি জাগায়, কিন্তু তার সবুজ শ্যামলিমা চোখ ও মনকে তৃপ্ত করে। এই ঘন অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যেই মোটা গাছের গুঁড়ির ওপর কাঠের মাচান পেতে ঘর তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে বেশ কয়েকটি কামরা। রান্নাবান্নারও ব্যবস্থা আছে। এটাকেই নাম দেওয়া হয়েছে ‘অমানুষ’ ছবির কলোনি। ওই কলোনির চারপাশে উঁচু করে ইটের দেয়াল দেওয়া। বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাঠের বাড়িতে ইটের দেয়াল কেন?’ উৎপলদা কাছেই ছিলেন। বললেন, ‘দু-তিন রাত এই বাড়িতে থাকতে হবে। তখন বুঝবে ইটের দেয়াল কেন। মাঝরাতে যখন একটা নয়, দু-চারটা হিংস্র বাঘ একসঙ্গে গর্জাবে, ইটের উঁচু দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করবে, তখন সুন্দরবন দেখার শখ মিটে যাবে।’

আসন্ন রাতের কথা ভেবে মনের খুশি খুশি ভাবটা চলে গেল। তুষখালীতে প্রথম রাতেই বাঘের হিংস্র গর্জন শুনতে শুনতে ভাবলাম, কলকাতা শহরের ৮০ মাইল দূরে এলেই বাঘের গর্জন শোনা যায়, তা জানতাম না। তার ওপর আছে সুতানলি সাপ। তা বিষধর ও ভয়ংকর। ইটের পাঁচিল দিয়ে তাকে রোখা যায় না। এর চেয়ে আমাদের ঢাকা ভালো। বাঘ-ভালুক নেই। এককালে বানরের উপদ্রব ছিল। এখন তা-ও নেই।

শুটিং শুরু হলো। শুটিংয়ের অবসরে কলোনির গাছগাছালি ভরা প্রাঙ্গণে চেয়ার পেতে দারুণ আড্ডা। শোভা সেন গল্প বলায় পটু। তিনি তাঁর শিল্পীজীবন ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক কথা বললেন। উত্তম কুমার জানতে চাইলেন, ঢাকার চলচ্চিত্রশিল্পের হালহকিকত কী। অমিতাভ গুপ্ত বললেন, ‘মাত্র গড়ে উঠতে শুরু করেছে। পাকিস্তানি শাসকরা ঢাকায় বাংলা চলচ্চিত্রশিল্প গড়ে উঠুক, তা চাইত না। বাস্তব অবস্থা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের সব সিনেমা হল কলকাতার বাংলা ছবি আর বোম্বের হিন্দি ছবির ওপর নির্ভরশীল ছিল। পাকিস্তানিরা চাইত, ভারতীয় ছবির আমদানি বন্ধ করে লাহোরে নির্মিত উর্দু ছবি চালাতে। তা সম্ভব হয়নি। উর্দু ছবিগুলো ছিল নিম্নমানের। কলকাতা ও বোম্বের ছবির জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে পারেনি।’

উত্তম কুমার বললেন, ‘যাক, আমরা তাহলে বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাইনি।’ আমি বললাম, ‘মোটেই না। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার ভারতীয় ছবির আমদানি বন্ধ করে দিয়েছিল। তাতে কাজ হয়নি। সিনেমা হলের মালিকরা তাঁদের হলে বোম্বে ও কলকাতার হিন্দি ও বাংলা পুরনো ছবিই বারবার দেখাতেন। বলতেন, এগুলো আগের আমদানি করা ছবি। নতুন ছবি তাঁরা আনছেন না। এটা ছিল চালাকি। চোরা পথেও ভারতীয় ছবি আসত।’

উত্তম কুমার বললেন, ‘বাংলাদেশে তো বাংলা ছবির বিরাট বাজার। এটা তো শূন্য থাকতে পারে না।’ বললাম, ‘এটা বুঝতে পেরে সেই পাকিস্তান আমলেই শেখ মুজিব ঢাকায় ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয় এবং শেখ মুজিব হন নতুন মন্ত্রিসভার শিল্প বাণিজ্য মন্ত্রী। তিনি লাহোর ও বোম্বের ছবির খপ্পর থেকে বাংলাদেশ ও বাংলা ছবিকে বাঁচানোর জন্য এফডিসি প্রতিষ্ঠা করেন। ফলে পাকিস্তান আমলেই ঢাকায় বাংলা ছবি নির্মাণের তৎপরতা শুরু হয়। তবে যন্ত্রপাতি ও কলাকুশলীর অভাবে এখনো আউটডোর শুটিংয়ের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।’

শক্তি সামন্ত বললেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় পরিস্থিতি এখন বদলে গেছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ে বাধা-নিষেধ উঠে গেছে। এখন ভারতীয় ছবি আমদানি করার ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো বাধা-নিষেধ রাখা উচিত নয়।’ তাঁর কথা শুনে অনিল ব্যানার্জি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন, ‘তবে বাংলাদেশে হিন্দি ছবির অবাধে যাওয়া আমাদেরও কাম্য নয়। হিন্দি ছবির দৌরাত্ম্য কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পকে প্রায় ধ্বংস করেছে। বাংলাদেশে ঢুকলে সেখানেও তা-ই করবে। বঙ্গবন্ধুর সরকারের উচিত হবে ছবি আমদানির ক্ষেত্রে কলকাতার বাংলা ছবিকে অগ্রাধিকার দেওয়া।’

অমিতাভ গুপ্ত বললেন, ‘আমি শুনেছি চলচ্চিত্র আমদানি-রপ্তানি সম্পর্কে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে শিগগিরই একটা চুক্তি হবে। দিল্লির কৌশল হলো, বাংলা ছবির বদলে বেশি হিন্দি ছবি বাংলাদেশে রপ্তানির ব্যবস্থা করা।’ অনিল চ্যাটার্জি বললেন, ‘আমাদের এটা রুখতে হবে। আমরা ডেপুটেশন নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাব। বিনীত অনুরোধ জানাব, তিনি বাংলাদেশকে মুক্ত করেছেন, বাংলা সংস্কৃতিকেও যেন বাঁচান। ঢাকার বাংলা ছবির জন্য একটা প্রটেকটিভ মার্কেট গড়ে তুলুন। পাশাপাশি কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রশিল্পকেও রক্ষা করুন।’

শক্তি সামন্ত বললেন, ‘বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোর চাহিদা মেটানোর মতো ছবি তৈরির সামর্থ্য ঢাকার এখনো নেই। কলকাতারও এখন নেই। তা ছাড়া কলকাতার বাংলা ছবিতেও নাচ-গান, বিনোদনের ব্যবস্থা হিন্দি ছবির মতো নেই। হিন্দি ছবি বাংলাদেশে পাঠাতেই হবে। তার চাহিদাই বেশি।’

উত্তম কুমার বললেন, ‘হিন্দি ছবির রমরমায় আমার কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু বাংলা ছবিকে বাঁচাতে হলে হিন্দি ছবির আগ্রাসনের মুখে এই মুহূর্তে কলকাতা ও ঢাকার যুক্ত উদ্যোগে ভালো ও উন্নত মানের বাংলা ছবি তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই।’ সেদিন আড্ডা ভাঙল উৎপল দত্তের একটা প্রস্তাব তোলার মধ্য দিয়ে, ‘চলুন, এ ব্যাপারে কলকাতার চলচ্চিত্রশিল্পের প্রতিনিধিরা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে একটা ডেপুটেশন নিয়ে যাই।’

 

তিন.

পরদিন নদীর পারে শুটিং, কিন্তু কাজ তেমন এগোচ্ছিল না। নদীর পারে বজরার মধ্যে শর্মিলা ঠাকুর। তাঁর ছোট বোনের ভূমিকায় অভিনয় করছিলেন নবাগতা প্রেমা। দৃশ্যটা হচ্ছে, শর্মিলাকে বজরার ভেতর থেকে ভিলেনের দল অপহরণ করে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। প্রেমা বাধা দিতে ছুটে এসেছে। ভিলেনদের সঙ্গে হাতাহাতির সময় সে ফিক করে হেসে ফেলছে। অমনি কাট চিৎকার। শুটিং বন্ধ। এ রকম কয়েকবার হলো। উত্তম কুমার বিরক্ত হলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন, আজ শুটিং বন্ধ থাক। তিনি ক্লান্ত। প্রেমারও আরো কিছু প্রস্তুতি দরকার।

সবাই তাতে রাজি। দিনও শেষ হয়ে এসেছিল। আমরা কলোনিতে ফিরে এলাম। কিন্তু পরদিন যে আমাদের কপালে আরো দুর্দৈব আছে, তা তখন জানতাম না। রাতে বাঘের গর্জনের সঙ্গে মেঘের হুংকার শুনেও তা অনুমান করতে পারিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে। আমাদের কাঠের কলোনির চারপাশে জলের প্লাবন। শোভা সেন অবস্থা দেখে বললেন, ‘এই সেরেছে। এখন সুন্দরবনে সাত দিন বন্দি থাকো।’

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘শোভাদি, সাত দিন বন্দি থাকতে হবে কেন?’ শোভা সেন বললেন, ‘তুমি সুন্দরবনের চরিত্র জানো না! এখানে বৃষ্টি শুরু হলে অবিরাম সাত-আট দিন চলে, থামাথামি নেই।’ তাঁর কথা শুনে আমি আঁতকে উঠলাম। অসুস্থ স্ত্রীকে কলকাতার হাসপাতালে রেখে, না বলে-কয়ে এসেছি। এখন কী হবে? শোভা সেনকে সে কথা বলতেই তিনি বললেন, ‘এখন ভাগ্যের ওপর সব ছেড়ে দিয়ে কটা দিন বাঘের ডাক শোনো।’

পরের দিনও আকাশের একই অবস্থা। যোগ হয়েছে ঝোড়ো বাতাস। ব্রেকফাস্ট টেবিলে উৎপল দত্ত প্রস্তাব করলেন, ‘এ রকম বদ্ধ ঘরে অলসভাবে বসে না থেকে আসুন আমরা একটা নাটক অভিনয় করি।’ শোভা সেন বললেন, ‘খুবই ভালো প্রস্তাব। কিন্তু নাটক কোথায়?’ উৎপল দত্ত বললেন, ‘আমার মাথায় একটা ছোট ঘণ্টাখানেকের নাটকের খসড়া আছে। দুপুরের আগেই লিখে ফেলতে পারব। সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ করা যাবে।’

শক্তি সামন্ত বললেন, ‘তবে তা-ই হোক। আমাদের সঙ্গে নায়ক-নায়িকা মায় সহনায়িকা পর্যন্ত আছে। শুভস্য শীঘ্রম।’

এত দীর্ঘকাল পর নাটকটির নাম মনে নেই। আমার ডায়েরিতে শুধু লেখা আছে, নাটকের নায়িকা শর্মিলা ঠাকুর। আমি তাঁর ছোট ভাই হয়েছিলাম। রিহার্সালের সময় শর্মিলাকে বললাম, ‘আমার কথায় পূর্ববঙ্গীয় টান—বিশেষ করে বরিশালের উচ্চারণ অনেক আছে। দর্শকের কাছে এটা কেমন লাগবে? বোন বলছে চমৎকার শান্তিপুরী বাংলা, আর তারই ছোট ভাইয়ের গলায় বরিশাইল্যা ভাষা!’

শর্মিলা হেসে ফেললেন। বললেন, ‘আমাদের এই ঘরোয়া নাটকে আমরাই শিল্পী এবং আমরাই দর্শক। সুতরাং ভাই আর বোনের ভাষার তারতম্য দেখে কেউ হাসবে না। হাসার লোক কোথায়?’ আমার কথা শুনে প্রেমা বললেন, ‘আপনার কথা শুনে যদি কেউ হাসে, তাহলে আমার কী হবে? আমার কথায় তো হিন্দির টান।’ সেবার সাত দিন ঘরবন্দি থাকতে হয়নি। চার দিন অঝোর কান্না কেঁদে আকাশ শান্ত হলো। সূর্য দেখা দিল মেঘ ভেঙে। শুটিং শেষ হলো। আমরা কলকাতায় ফিরে এলাম আবার সেই আগুনমুখো নদী পার হয়ে।

 

চার.

তারপর প্রায় তিন দশক কেটে গেছে। সম্ভবত ২০০৪ সালের কথা। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুবিহীন। আমি লন্ডনে। বহির্বিশ্বের প্রথম বাংলা টিভি লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত বাংলা টিভির পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ওয়েম্বলি পার্কের একটা বিশাল হলে বিরাট অনুষ্ঠান। দুই বাংলার অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক, গুণীজন এসেছিলেন এই অনুষ্ঠানে। শর্মিলা ঠাকুরও এসেছিলেন, সঙ্গে তাঁর স্বামী পতৌদির নবাব মনসুর আলী খান। ছিলেন ভারতের ক্রিকেটের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

এই অনুষ্ঠানে শর্মিলা ঠাকুরকে সম্মাননা পদক দেওয়া হয়। বিস্ময়করভাবে এই সম্মাননা পদক তাঁর হাতে তুলে দেওয়ার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এটা আমার জন্য বিরল সম্মান। মঞ্চে দীর্ঘদেহী সুপুরুষ নবাব মনসুর আলী খান দাঁড়িয়ে আছেন। পাশেই তাঁর স্ত্রী শর্মিলা ঠাকুর। তাঁর হাতে সম্মাননা পদক তুলে দিতে গিয়ে বললাম, ‘আমার নাম আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী। আমি বাংলাদেশের একজন সাংবাদিক।’ শর্মিলা ঠাকুর হেসে ফেললেন। বললেন, ‘আপনাকে আমি চিনি। সুন্দরবনের কথা আমি এখনো ভুলিনি।’

নবাব অব পতৌদির পরনে শেরোয়ানি, পায়জামা। শর্মিলার পরনে শাড়ি। নবাব অব পতৌদি নিজেই আমার দিকে হাত বাড়ালেন করমর্দনের জন্য। বললেন, ‘আমিও আপনাকে চিনি। আপনি বাংলা ভাষার জন্য গানটি লিখেছেন না?’ তিনি এই খবরও রাখেন জেনে বিস্মিত হয়েছিলাম। এই দেবদারুগাছের মতো ঋজু, সুঠাম ও সুদর্শন মানুষটি আজ নেই, কিন্তু চলচ্চিত্রজগতের এক প্রদীপ্ত তারকা শর্মিলা ঠাকুর এখনো বেঁচে আছেন। তিনি আরো দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুন। দিন যায় স্মৃতি অমলিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা