kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

স্মৃ তি ক থা

সেগুনবাগিচা

কাজী আনোয়ার হোসেন

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সেগুনবাগিচা

আমার জন্ম সেগুনবাগিচার এই ২৪ নম্বর বাড়িতেই, ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির সুবাদে আমার বাবা কাজী মোতাহার হোসেনকে অনেক বছর সপরিবারে এ-বাড়ি ছেড়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় থাকতে হয়েছে। রুটি কারখানার এক ইংরেজ মালিকের কাছে বাড়িটা ভাড়া দিয়ে আমরা হোসনি দালানের ভাড়াবাড়ি, বর্ধমান হাউস (এখন যেটা বাংলা একাডেমি), তারপর বর্তমান মেডিকেল কলেজের উত্তর ও দক্ষিণের দুই গেটহাউস এবং ফজলুল হক হলের হাউস টিউটরের কোয়ার্টারে ছিলাম। আমাদের বাড়িটা বহু বছর পাকিস্তান সরকার রিকুইযিশন করে রেখেছিল। অনেক দেন-দরবার করে আমরা এ-বাড়ির দখল ফিরে পাই ১৯৫০ সালের দিকে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি।

সে সময় মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিঙের চিহ্নমাত্র ছিল না এই এলাকায়। আমাদের একতলা বাড়ির ছাতে দাঁড়িয়ে পুবে তাকালে ফাঁকা মাঠের ওপারে বহুদূরে দেখা যেত পল্টন লাইনের বিশাল এক বয়োবৃদ্ধ বটগাছ। এখন ওটা আছে কি না কে জানে! আর ছিল সেগুনবাগিচার অধুনালুপ্ত বিশাল জলাভূমি। এখন সেটা ভরাট করে কয়েক শ’ বহুতল ভবন তৈরি হয়েছে। দুই দিক থেকে পানি আসত এই জলাধারে। পশ্চিম দিক থেকে বুড়িগঙ্গার পানি আসত ধানমণ্ডি লেক হয়ে কলাবাগানের মধ্য দিয়ে রমনা লেকে, সেখান থেকে পুবের রাস্তার নিচ দিয়ে বর্তমান শিল্পকলা একাডেমির বুক চিরে একটা পুরানো কালভার্টের নিচ দিয়ে। আরেকটা ধারা আসত পুরানো ঢাকার মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে দক্ষিণ দিক থেকে। সেটারও উৎস ওই বুড়িগঙ্গাই। বর্ষায় এই পানি মতিঝিল হয়ে কমলাপুর ছাড়িয়ে চলে যেত পুবের কোনও নদীতে। পঞ্চাশের দশকে এক বন্যায় আমার ছোট ভাই ও আমি কালভার্টের পাশে বেঁধে রাখা একটা নৌকায় করে চলে গিয়েছিলাম কমলাপুরে আমাদের বড় বোনের বাড়িতে। সন্ধের পর ওখান থেকে দাঁড় বেয়ে ফিরে আসতে যে কী কষ্ট হয়েছিল, তা আজও মনে আছে। উল্টো দিক থেকে আসা নৌকাগুলো আবছাভাবে আমাদের দেখেই চেঁচিয়ে উঠছিল : যার যার ডাইনে...যার যার ডাইনে! শহরের মাঝখানে কেমন গ্রামের পরিবেশ।

রাতে হারিকেন ও টেঁটা (কোঁচ) নিয়ে সেগুনবাগিচার এই মস্ত জলাশয়ের হাঁটুপানিতে মাছ মারতাম আমি, আমার ছোটভাই নুরু (ওয়েস্টার্ন কাহিনী-লেখক প্রয়াত কাজি মাহবুব হোসেন) আর বাবু (রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী প্রয়াত জাহিদুর রহিম)। পায়ের নিচে পিচ্ছিল ঢোঁড়া সাপ কিংবা বড়সড় কুচে মাছ পড়লে ভয় পেয়ে ছপ্-ছপ্ সে কী দৌড় আমাদের!

আমাদের বাড়ির নাম ছিল ‘কাজী মঞ্জিল’। আমাদের ঠিক দক্ষিণে উলুখাগড়ায় ছাওয়া একটা খালি প্লট ছিল...সেখানে কিছুটা জায়গা পরিষ্কার করে নিয়ে বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে আমরা ব্যাডমিন্টন খেলতাম। তারই দক্ষিণের একতলা বাড়িটা ছিল অবসরপ্রাপ্ত স্কুল ইন্সপেক্টার জনাব আবদুর রহিম সাহেবের। তাঁরই কনিষ্ঠ পুত্র বাবু, অর্থাৎ জাহিদুর রহিম ছিল আমার জানের দোস্ত। এখন সেই জমিতে উঠছে দশতলা আধুনিক বাড়ি। আরেকজন বাবু ছিল আমাদের পাড়ায়। কাজী মঞ্জিলের ঠিক পশ্চিমের রাস্তাটা ধরে সোজা উত্তরে গেলে বাঁ দিকের শেষ বাড়িটাতে থাকত বাবু, খান বাহাদুর আবদুল্লাহ সাহেবের ছোট ছেলে, ভাল নাম আরিফুর রহমান। একই ক্লাসে পড়তাম আমরা একই স্কুলে। ও ছিল খেলার পাগল, দারুণ ক্রিকেট খেলত; ইতিহাসে মাস্টার্স করে চট্টগ্রামে চাকরিরত অবস্থায় মারা যায়। এ পাড়ায় সে-যুগে একমাত্র এই বাবুদেরই সুন্দর একটা ভক্সল গাড়ি ছিল। জাহিদুর রহিমদের বাড়ির পাশের প্লটে এসে বাড়ি করেন এস.পি গফুর সাহেব; তাঁরও এক ছেলে ফকু (এনামউদ্দীন ক্বাদরি) আমাদের সঙ্গে সেইন্ট গ্রেগরি হাই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ত। আমাদের বাড়ির উত্তরের বাড়িটা ছিল ইতিহাসের অধ্যাপক এবং পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. মোহাম্মদ হোসেনের। তাঁর বড় ভাই ড. জাকির হোসেন ভারতের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

খেলাধুলো...ব্যায়াম...পুবের মাঠে ফুটবল...পুকুরে সাঁতার, শীতকালে ব্যাডমিন্টন...আর সারাবছর ডাক্তার জোহরা বেগম কাজীর বাড়ির সামনের উঠানে (এখন সেটা টেকনো ড্রাগস-এর বহুতল ভবন) প্রতিদিন বিকেলে চলত আমাদের বেদম টেবিলটেনিস চর্চা।

তখন এই এলাকায় বাড়ি ছিল হাতেগোনা অল্প কয়েকটা — কালভার্টের দক্ষিণে দশ-বারোটা, আর উত্তরে বড়জোর আট-দশটা। এখন আর সেই কালভার্টের অস্তিত্ব নেই। আজ যেখানে এজিবি আর অডিট অফিসের বারো-চোদ্দ তলা বিশাল সব দালান, আগে সেখানে ছিল উলুখাগড়া ছাওয়া বড় বড় মাঠ... প্রায়ই আমরা টর্চ ও লাঠি নিয়ে দল বেঁধে শেয়াল তাড়া করতাম রাতে। এখন যেখানে চিটাগাং হোটেল, তার সামনে চমৎকার একটা পুকুর ছিল, মনের সুখে সাঁতার কাটতাম আমরা সে-পুকুরে। একবার নামলে আর উঠতে চাইতাম না, শেষে ঢিল মেরে পানি থেকে তুলতে হতো। তখন অবশ্য চিটাগাং হোটেল ছিল না, ছোট্ট একটা বেড়ার ছাপড়া তুলে চা-বিস্কিট বেচতেন আকবর মিয়া ও তাঁর ছোট ভাই কালু মিয়া। আমরাই ছিলাম তাঁদের প্রথম কাস্টোমার। সারাদিন কী পরিশ্রমই না করতেন দুই ভাই মিলে!

বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ,

তদর্ধং কৃষিকার্যঃ, তদর্ধং রাজকার্যঃ,

ভিক্ষায় নৈব নৈব চ।

এই সংস্কৃত শ্লোকটিকে নিজেদের সারাজীবনের কর্মকাণ্ড দিয়ে সত্য প্রমাণ করেছেন চট্টগ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত এই দুই সহোদর ভাই। এজিবি অফিসের বারো তলা দালান যখন তৈরি হচ্ছে, তখন স্বচক্ষে দেখেছি, ওখান থেকে টুকরি ভরে মাটি মাথায় করে এনে নিজেদের নিচু জমিতে ফেলছেন দুই ভাই। আজ ঢাকার যে কোনও প্রান্তে রিক্সায় উঠে যদি বলেন : সেগুনবাগিচায় যাব, প্রশ্ন আসবে : সেগুনবাগিচার কুনখানে নামবেন? যদি বলেন : চিটাগাং হোটেলের কাছে, ব্যস আর কিছু বলতে হবে না, পৌঁছে যাবেন আপনি আপনার গন্তব্যে। এ এক মস্তবড় অর্জন।

সেগুনবাগিচার কৃতিপুরুষ, সাফল্যের এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত ডাক্তার ইব্রাহিম। এই তো সেদিন, পঞ্চাশের দশকে নিজ বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা প্লটে শুরু করলেন তাঁর সাধের ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন। উদ্দেশ্য : মানুষের জন্য কিছু করবেন। ডায়াবেটিস রোগের ভয়ঙ্করত্ব সম্পর্কে সে সময়ে এদেশের মানুষের কোনও ধারণা প্রায় ছিলই না। অকালমৃত্যু ঘটছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের। আরও কয়েক লক্ষ ভুগছিল এই রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়—হার্ট, প্যানক্রিয়াস, কিডনি ও চোখের মারাত্মক সব রোগে। আজ চেয়ে দেখুন, শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনের বারডেম হাসপাতাল, ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হসপিটাল অ্যাণ্ড রিসার্চ সেন্টার এবং সেগুনবাগিচায় মহিলা ও শিশুদের জন্য বিশাল ডায়াবেটিক হাসপাতালের দিকে। মহৎ উদ্দেশ্যের পিছনে অক্লান্ত পরিশ্রম আজ কোথায় তুলে এনেছে তাঁকে! ভাবতে গেলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। অথচ সামনাসামনি দেখেছি, অত্যন্ত অমায়িক, সাদাসিধে, মাটির মানুষ ছিলেন তিনি। ষাটের দশকে গান গাইতাম রেডিও-টিভিতে। ডাক্তার ইব্রাহিমের ছোট ছেলে কবির তখন প্রায়ই আমাকে ধরে নিয়ে যেত তাদের বাসায় আয়োজিত গানের ঘরোয়া জলসায়। এমন নিরহঙ্কার, নির্লোভ মানুষ আমাদের জাতির গর্ব।

আমার বয়স হয়েছে — লিখতে গিয়ে কার কথা যে বাদ ফেলে দিয়েছি টের পাচ্ছি না। শিল্পপতি জহিরুল ইসলাম বাড়ি করেছিলেন আমাদের এখানে, দাবার বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যাণ্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদের বাবা মাশুক ভাই থাকতেন আমাদের বাড়ির সামান্য উত্তর-পুবের একটা বাড়িতে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক সময় বেশ কয়েক বছর ছিলেন আমাদের বাড়ির লাগোয়া পশ্চিমের ২৫ নম্বর বাড়িতে। তাঁর দুই মেয়ে হাসিনা ও রেহানা (বয়স তখন বড়জোর আট-নয় বছর হবে) খেলা করত আমার ভাগ্নী টিয়া-জুঁইদের সঙ্গে। আইয়ুব খান যখন পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে, তখন এই বাড়ি থেকেই গ্রেপ্তার হন বঙ্গবন্ধু, প্রতিবেশী হিসাবে আমাকে ডেকে নেয়া হয়েছিল সাক্ষী হিসাবে। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের আগে এই একই বাড়িতে থাকতেন চিফ ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বার। তাঁর কীর্তির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে : ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ও রমনা পার্ক তৈরি। সেই ২৫ নম্বর বাড়িটি এখন গাজি টিভির কার্যালয় হিসাবে পরিচিত।

আরও যাঁদের দেখেছি কিন্তু এখন মনে করতে পারছি না, তাঁদের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে এবার বিদায় নিচ্ছি। ধন্যবাদ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা