kalerkantho

শুক্রবার । ২৩ আগস্ট ২০১৯। ৮ ভাদ্র ১৪২৬। ২১ জিলহজ ১৪৪০

স্মৃ তি ক থা

স্মৃতির দর্পণে কৈশোর তারুণ্যের দিনগুলো

আহমদ রফিক

৫ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ২২ মিনিটে



স্মৃতির দর্পণে কৈশোর তারুণ্যের দিনগুলো

কৈশোর থেকে তারুণ্যের সময় পর্বটি আমার জীবনের পরম সম্পদ, শ্রেষ্ঠ অর্জন। রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষায়, ‘সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি’—বিচিত্র ঘটনাবহুল তো বটেই। এগুলোকে ধরে রেখেছি সজীব স্মৃতিতে। জীবনসায়াহ্নে নিত্যদিনের অবসরে কিংবা অনিদ্রার মহামুহূর্তগুলোতে স্মৃতির রোমন্থন নিঃসন্দেহে উপভোগ্য, অন্যকে সে আস্বাদের অংশ দিতে পারলে মনে আনন্দ জন্ম নেয়।

গ্রামের আকর্ষণীয় প্রাকৃত পরিবেশ ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে সেই যে এক দুর্গম মহকুমা শহর নড়াইলে পাড়ি দেওয়া—বলা চলে অভাবনীয় নতুন অভিজ্ঞতা—স্টিমার, ট্রেন, বাস, নৌকা—সবই সে যাত্রায় সহায় (১৯৩৭, মে)। দেখতে দেখতে কিভাবে একটি সোনালি দশক পার হয়ে গেল বুঝতেই পারিনি। হঠাৎ চোখ মেলে দেখি, আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিচ্ছি (১৯৪৭)। এরই মধ্যে কত যে অভিজ্ঞতা, দু-একজন সত্যিকার বন্ধু, সেও এক দুর্লভ প্রাপ্তি।

মহকুমা শহর নড়াইল ছিমছাম সুন্দর হলেও বাঁকফেরা চিত্রা নদীর বেষ্টনীতে গাছগাছালিসহ আমার চোখে অনন্য—নারকেল, সুপারি, তাল, খেজুরগাছের প্রাধান্য, গ্রামেরই যেন শহুরে রূপ। নদীতে স্টিমার ও লঞ্চ, আর এক রাস্তার শহরটিতে লাল ইটের আদালত ভবন, মুনসেফ ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবদের অনুরূপ দ্বিতল বাসভবন, আর নদীর ধারে দোতলা নীলকুঠিতে আধুনিক চেহারার এসডিও সাহেবের বাংলো।

শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, পেশাজীবীপ্রধান শহরটির রাজনৈতিক চরিত্র বহুমাত্রিক—জাতীয় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, কৃষক প্রজা পার্টি এবং কমিউনিস্ট পার্টি ও এর কয়েকটি অঙ্গদল (কৃষক সমিতি, মৎস্যজীবী সমিতি) এর প্রমাণ। এদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে; কিন্তু পরবর্তীকালের রাজনীতির মতো মারামারি-খুনোখুনি নেই। অবশ্য সেটা এ শহরেরই বৈশিষ্ট্য। অন্যত্র রাজনীতির তীব্রতা কম রক্ত ঝরায়নি, বিশেষ করে ১৯৪৫ থেকে ৪৭-এ পাকিস্তান আন্দোলন ও দেশভাগকে ঘিরে। তখনো শান্ত চিত্রাতীরের নড়াইল। এর নদী ও সংরক্ষিত পুকুর সুদর্শন কালিদাস ট্যাংক তখনো স্বচ্ছ।

অদূরে চিত্রাতীরে ব্যবসাকেন্দ্র রূপগঞ্জ (পরবর্তীকালে শিল্পী এস এম সুলতানের স্মৃতিধন্য)—সেখানে স্বনামখ্যাত জমিদারদের তৈরি স্কুল ও কলেজ আর আকর্ষণীয় ফুলবাগান—সেখানেই প্রথম দেখি দুর্লভ ম্যাগনোলিয়াকে—অসাধারণ নামে ও চেহারায়, সুমিষ্ট ঘ্রাণে। জমিদারবাবুদের শখের বাগান—যেখান থেকে সহপাঠী অবনী দৈনিক পত্রিকা দেওয়ার সুবাদে দু-একটি ম্যাগনোলিয়া চুরি করত, সাইকেলে চড়ে যেতে যেতে দেখাতে ভুল করত না।

পিতৃহীন অবনী তার দাদার পরিবারে আশ্রিত। তার দাদার সংবাদপত্রের এজেন্সিই নয়, একটি বাসও ছিল, চমকপ্রদ নাম ‘প্রেমের ঠাকুর’। আরো তিনটি বাস, তেমনই নাম—‘বিশ্বভারতী’, ‘পার্থ সারথী’ ও ‘নরনারায়ণ’ নড়াইল-যশোর রুটে চলাচল করত। জেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম।

দৈনিক পত্রিকা বলতে আনন্দবাজার, যুগান্তর, আজাদ ও স্টেটসম্যান আসত যশোর থেকে। দিনের কাগজ দিনেই মিলত তাজা খবরসহ। গোটা শহরে একটিমাত্র বড়সড় আকারের রেডিও—হিন্দু মহাসভা মানসিকতার কংগ্রেসি নেতা বিত্তবান ডাকসাইটে আইনজীবী জ্যোতিষ চক্রবর্তীর বাড়িতে। সন্ধ্যা হলে সেখানে ভিড় জমত অনেক শহরবাসীর, খবর শোনার জন্য।

রাজনীতিমনস্ক শহর নড়াইলে তখনো মুসলিম লীগ মুসলমান সমাজে একচেটিয়া থাবা বসাতে পারেনি। তবে কলেজছাত্রদের মধ্যে তাদের প্রভাব বাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু শহরের শিক্ষিত শ্রেণিতে, বিশেষ করে আইনজীবীদের মধ্যে প্রাধান্য কংগ্রেসের, মুসলমানদের মধ্যে মুসলিম লীগের। কিন্তু সেখানে ছিল কংগ্রেস ও প্রজা পার্টির অবস্থান। মধ্যখানে কমিউনিস্ট পার্টি তাদের অঙ্গদলসহ। পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে ১৯৪৬-এর প্রাদেশিক নির্বাচন উপলক্ষে। শহুরে রাজনীতিতে ১৯৪৫-৪৭ ছিল গুরুত্বপূর্ণ সময় পর্ব।

 

 

দুই

শহর নড়াইল গ্রাম থেকে আসা এক কিশোরকে সাহিত্য ও রাজনীতির চেতনা উপহার দিয়েছিল। গড়ে তুলেছিল বই পড়ার এক নিবিড় অভ্যাস—পাঠ্য বই থেকে এ বৃত্তের বাইরে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি এবং বিচিত্র সিরিজের গোয়েন্দাকাহিনি। সেই সঙ্গে একটু একটু করে লেখার অন্তর্নিহিত তাগিদ—যে প্রভাবে দশম শ্রেণির একটি ছাত্রের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল আস্ত একটি গোয়েন্দা উপন্যাস লিখে ফেলা। এবং সেটি কলকাতায় ‘রোমাঞ্চ’ সিরিজের কার্যালয়ে পাঠানো।

বই পড়া যেমন নিজের ছোট্ট খুপরিতে, তেমনি ডাকবাংলোয় বা নদীর ধারে মোটামুটি বিশাল বকুলগাছের নিচে বসে (গোরা)। নজরুলের ‘অগ্নি-বীণা’ ও সুভাষের ‘তরুণের স্বপ্ন’ যেমন রাজনৈতিক স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তেমনি বিচিত্র পথের হাতছানি ছিল একাধিক রাজনৈতিক বইয়ে। বিদেশি ইংরেজশক্তি শাসিত পরাধীন স্বদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম কিশোর-চেতনায় গভীরভাবে দাগ কেটেছিল।

পাঠাভ্যাসে হেমেন্দ্র কুমার রায়ের এবং অনুরূপ একাধিক লেখকের কিশোরপাঠ্য বই বা রবীন্দ্রনাথের ‘মহুয়া’ ও ‘শেষের কবিতা’ একমাত্র পড়ার বিষয় ছিল না—ছিল প্রবোধ সান্যালের ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘আঁকাবাঁকা’ বা ‘হাসু বানু’ কিংবা বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের    ‘নীলাঙ্গুরী’র মতো একাধিক উপন্যাস অভিভাবকের চোখ এড়িয়ে।

অন্যদিকে ‘ভগিসং ও তার সহকর্মীরা’ কিংবা ভূপর্যটক রামনাথ বিশ্বাসের ‘তরুণ তুর্কি’, ‘মরণ বিজয়ী চীন’, ‘লাল চীন’ ইত্যাদি। পাঠাভ্যাসে ছিল বয়স্কদের ভাষায় যাকে বলে ‘এঁচড়ে পাকা’—যে পাকামি পরবর্তীকালে আমাকে সক্রিয় রাজনীতির অঙ্গনে টেনে নিয়েছিল। একই কথা খাটে সাহিত্য-পাঠের পরিণাম সম্পর্কে।

যশুরে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মেপাক্রিন ও প্যালুড্রিনের বড়ি ও ভয়াবহ তেতো কুইনিন মিক্সচার খেতে খেতে বিছানায় শুয়ে বঙ্কিম ও মধুসূদন পাঠ, বাঁধানো ‘প্রবাসী’, ‘বিচিত্রা’ ও ‘ভারতবর্ষ’ পাঠ কিশোরটিকে নিয়ে যেত আমুদরিয়া-সিরদরিয়ার বালুসৈকতে, যেখানে স্বপ্নদেখা মানুষ বালুতে স্বর্ণরেণু খুঁজে বেড়ায়। ধীরেন্দ্রলাল ধরের লেখা ধারাবাহিক ভ্রমণকাহিনিও ছিল আকর্ষণীয়। আর দেব সাহিত্য কুটির প্রকাশিত গোয়েন্দা গল্পের সিরিজ। লেখক সবাই খ্যাতিমান। হেমেন্দ্রকুমার রায়, বুদ্ধদেব বসু, সৌবিন্দ্র মোহন মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

তবে সবচেয়ে বেশি চেতনায় প্রভাব ফেলেছিল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ ও ‘চতুর্দশপদী কাব্য’, ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’র মতো প্রহসন এবং স্কুল-লাইব্রেরি থেকে আনা ওমর খৈয়ামের রুবাই ও শেলির নির্বাচিত কবিতা, রবীন্দ্রনাথের দু-একটি প্রেমের কবিতার বই।

বই পড়ার পাশাপাশি চেতনায় গভীর প্রভাব রাখে কিছু বিস্ফোরক চরিত্রের রাজনৈতিক ঘটনা—যেমন ১৯৪২-এর ‘ইংরেজ ভারত ছাড়’ আন্দোলন, ১৯৪৬-এ কলকাতায় সংঘটিত ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ক্যাবিনেট মিশন প্রস্তাব কিংবা আজাদ হিন্দ্ ফৌজের বিচারভিত্তিক ছাত্র আন্দোলন এবং ভারতীয় নৌসেনাদের বিদ্রোহ। এককথায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে দেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম।

স্বভাবতই সাহিত্যের চেয়ে রাজনীতি এক পা এগিয়ে থাকে। এ যেন অদূর ভবিষ্যৎ দিনগুলোর ছায়াপাত। দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক ও তার বিপরীত রাজনীতির ঘনঘটা, এর কিছুটা নড়াইলের নাগরিক চেতনা স্পর্শ করে। একদিকে হক-সোহরাওয়ার্দী, অন্যদিকে গান্ধী-জিন্নাহ-নেহরু—রাজনৈতিক নেতৃত্বের নামগুলো মুখে মুখে ফেরে—সেই সঙ্গে সুভাষ। এসব প্রভাবে গঠিত হয় ফরোয়ার্ড ব্লক ছাত্রসংগঠন। বন্ধুদের জবরদস্তিতে আমি সে শহর কমিটির সেক্রেটারি, সভাপতি দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী। যশোর থেকে এক যুবনেতা আসেন। কালিদাস ট্যাংকের পারে ঘাসের গালিচায় এক বিকেলে বৈঠক করেন, দিয়ে যান কিছু রাজনৈতিক কাগজপত্র। খুলে যায় জীবনের অন্য একটি দরজা। তিন বন্ধু মিলে একটি প্রচারপত্র ছেপে হানা দিই লোহাগড়া স্কুলে। যেতে পারিনি লক্ষ্মীপাশা। রাতে বাসায় ফিরে মৃদু বকুনি জোটে। আবেগধর্মী প্রচারপত্রটি আমার লেখা।

তৃতীয় রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টি তখন গভীর সমস্যায়। হিটলার কর্তৃক সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ার কারণে যুদ্ধরত সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মিত্রশক্তি হিসেবে এবং ওই যুদ্ধ জনযুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হয় কমিউনিস্ট পার্টির বিচারে। কিন্তু ব্রিটিশবিরোধী ভারতীয় জনতা সে মূল্যায়ন মেনে নেয়নি। ব্যতিক্রম কমিউনিস্ট সমর্থকরা। রাজনীতিসচেতন সাধারণ ছাত্ররাই শুধু নয়, বেশির ভাগ শহরবাসীকে এ প্রশ্নে দেখেছি কমিউনিস্টবিরোধী মতামত প্রকাশ করতে। কলকাতা থেকে আসা দু-একটি প্রগতিবাদী সাহিত্য পত্রিকায় অবশ্য দেখা গেছে কমিউনিস্ট মূল্যায়নের পক্ষে মত প্রকাশ করতে।

গল্পের বই পড়ে, ছাত্ররাজনীতির তৎপরতা ও     দু-একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে আড্ডায় সময় ভালোই কাটছিল। যুদ্ধের সময়টাতে রাজনীতিসচেতন শহরবাসীর সময় কেটেছে দুই পরস্পরবিরোধী শক্তির জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশে। যুদ্ধ শেষ। মিত্রশক্তির জয়ে স্বাধীনতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। আজাদ ফৌজের বিচার নিয়ে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন অবশ্য এ শহরকে ততটা স্পর্শ করেনি।

তবে দু-একটি ঘটনা শহরবাসীকে আলোড়িত করেছে। প্রথমত, প্রাদেশিক নির্বাচন। নড়াইল কেন্দ্র থেকে একদা জনপ্রিয় কৃষক নেতা সৈয়দ নওশের আলীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ডাকবাংলোয় তাঁর দিন কয়েকের উপস্থিতি, সমর্থক ছাত্র-জনতার উত্তেজনা, লীগপন্থীদের বিরোধিতা ইত্যাদি ঘটনায় শহরটা মেতে উঠেছিল। উত্তেজনা আমাদেরও মনে। নির্বাচনের ফলাফল ছিল হতাশাব্যঞ্জক। মুখ্যমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর কলকাতা থেকে পাঠানো গুণ্ডাবাহিনীর হামলা, বুথ দখল, আজাদ পত্রিকার মিথ্যাচার শহরে উত্তেজক আলোচনার বিষয় হয়েছিল।

দ্বিতীয় উত্তেজক ঘটনা অবশ্য ভিন্ন চরিত্রের। টাউন হলে বিশেষ ব্যবস্থায় সিনেমা প্রদর্শনী—হলে উপচে পড়া ভিড়। সর্বত্র আলোচনা ওই ‘নারী’ সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে। স্কুলের দু-চারজন মাস্টার মশাইকেও দেখা গেছে এ প্রদর্শনীতে দর্শক হিসেবে।

আর আমার ব্যক্তিজীবনে অ্যাডভেঞ্চার মিহিদানার শহর বর্ধমানে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক ছাত্র সম্মেলনে ডেলিগেট হিসেবে যোগদান। সঙ্গী সিনিয়র ছাত্র স্কটিশ চার্চ কলেজের দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী স্থায়ী কমিটির সভাপতি। তাঁর হোস্টেলরুমে কলকাতায় এক বেলা কাটানো বিশেষ কারণে, সে এক ইতিহাস। সম্মেলন জমেছিল খুব বর্ধমানের মহারাজার অতিথিশালায়।

এমনিতে গরমকাল, এর ওপর রাতভর ছাত্রনেতাদের উত্তপ্ত বিতর্ক আগস্ট আন্দোলনের চরিত্র নিয়ে। সেটা রিভোল্ট, না রেভল্যুশন—এই বৃথা বিতর্কের উত্তাপে রাত কেটে যায়। আমার অবাক লাগে বাঙালি সন্তানদের আলোচনা-বিতর্কের মাধ্যম ছিল ইংরেজি। আমরা নীরব শ্রোতা। এই আমার প্রথম বাইরে যাওয়া—বড়দা কেন যে আপত্তি করেননি সেটাই আরেক বিজয়। দিন তিনেক পর ঘরের ছেলের ঘরে ফেরা।

এ শহর আমার কিশোরজীবনের বহু চমকপ্রদ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। স্কুলের মাস্টার মশাইদের প্রিয় ছাত্র, স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও অনুরূপ প্রিয় আমার সোনালি সময় কেটেছে নড়াইলে। সেসব স্মৃতি কি ভোলা যায়? কিংবা ভোলা যায় মহিষখোলায় মাস্টার মশাইয়ের উঁচু মাটির দাওয়ায় বসে সাহিত্য আলাপের মাধুর্যে ভরা বিকেলগুলো—আমি, দেবু, জ্যোত্স্না মাস্টার মশাইয়ের সাহিত্যালোচনার মুগ্ধ শ্রোতা। দেশ বিভাগ সব তছনছ করে দেয়।

আর স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা টাউন হলে। চেনা পরিদর্শক ঘুরেফিরে এসে দেখে যাচ্ছেন কী লিখছি, কেমন লিখছি। ইংরেজি থার্ড পেপারের দিন সময় শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিতেই প্রধান পরিদর্শক স্থানীয় ফুড কন্ট্রোলার সাহেব বাধা দিয়ে বলে ওঠেন, ‘একি, কোথায় যাচ্ছ?’ ‘লেখা তো শেষ’—আমার জবাব। ‘তা হোক, লেখাগুলো আরেকবার পড়ে নাও।’

এমন এক হার্দ্য পরিবেশ ছেড়ে আমাকে চলে আসতে হয়েছিল ধলেশ্বরীতীরের আরেক শহরে, কলেজে ভর্তি হব বলে। কারণ এরই মধ্যে বড়দার বদলি নড়াইল থেকে ঝিনেদায়, যেখানে কোনো কলেজ নেই। অতএব, বিষণ্ন মনে পরিবারের সঙ্গে স্বপ্নের শহর নড়াইল ত্যাগ—বন্ধুবিচ্ছেদ, বান্ধবীবিচ্ছেদ, যেন এক অদৃশ্য শক্তির টানে। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। এরপর একবার, মাত্র একবার সেপ্টেম্বরে বড়দার এক কাজে নড়াইল যেতে হয়। শহরে পৌঁছে হতবাক আমি। চেনা মুখের মানুষগুলো নেই, বাড়িগুলোর দরজা-জানালা বন্ধ। আছে শুধু পরিচিত মুসলমান পরিবারগুলো— আফসার সাহেব, ওয়ালিয়র রহমান সাহেব প্রমুখ। নেই আইনজীবী সুধীর বাবু, জ্যোতীষ বাবু, এম বি ডাক্তার সোম বাবু কিংবা দেবু, বিমলেশ, অবনী, শিশির, মীরা, জ্যোত্স্না, শিখা। দেশ বিভাগ তাদের কেড়ে নিয়েছে। শুধু বিষণ্ন চিত্রা একমনে বয়ে চলেছে।

 

তিন

দেশভাগের ঘোষণার সময়টায় আমি গ্রামে। মানুষের উল্লাস পাকিস্তান পেয়ে; ঝরুক রক্ত, তাতে কি? সেজো চাচা মুন্সীগঞ্জে তাঁর চাকরিস্থল বদল করেন। বাস বাস্তুচ্যুত এক মহিলার প্রিয় ভবনে—নাম ‘নির্মলা কুটির’। দোতলা বাড়ি। হরগঙ্গা কলেজের ছাত্র আমি। এই শহরে এখনো বেশ কিছু হিন্দু মধ্যবিত্ত পরিবার বাস্তুত্যাগী হয়নি (পরে হয়েছে)। এখানেও মেধাবী ছাত্রবন্ধু জুটে যায় দেবুর মতোই। কলেজটা মুক্ত মাঠে—চারপাশে শস্যক্ষেত, এক পাশে কয়েকটি হোস্টেল ভবন। এগুলো নদীতে স্টিমার যাত্রার সময় দেখা যায়।

পরিচয় হয় কমিউনিস্ট ছাত্রনেতা অজয় রায়ের সঙ্গে—কমার্সের ছাত্র। আরো একজন শামসুল ইসলাম (পরবর্তীকালে বিএনপির মন্ত্রী), এক বছরের জুনিয়র স্থানীয় ছাত্র ইয়াজউদ্দিন (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি); এমনই আরো অনেক পরিচিত স্বজন—যেমন ছাত্র ফেডারেশন নেতা শফিউদ্দিন আহমদ। তার বড় ভাই দলত্যাগী শামসুদ্দিন সাহেবকে নিয়ে—সে এক মজার গল্প।

চাচি মজলিসি টাইপের, অসম্ভব অতিথিপরায়ণ আর গানের ভক্ত। বড়সড় একটা গ্রামোফোনে গান শোনেন, আর হাতে সেলাইয়ের কাঠি দ্রুত তালে চলমান। বেশির ভাগই রবীন্দ্রসংগীত স্বনামখ্যাত শিল্পীদের গাওয়া—পঙ্কজ মল্লিক, হেমন্ত মুখার্জি, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মুখার্জি (পরে মিত্র), শচীন দেব বর্মন। চাচা গম্ভীর, রাশভারি ধরনের, স্বল্পভাষী—পরিবারপ্রধান হয়েও বিচ্ছিন্ন। চাচাতো ভাই মানিক আমার সহপাঠী। চরিত্র বিচারে আমার বিপরীত ধারার—বলতে হয় একস্ট্রোভার্ট, বন্ধু জমাতে খুব দক্ষ। দুই চাচাতো বোন স্কুলে পড়ে।

এই পরিবারের যে মানুষটি আমাকে আকর্ষণ করেন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেন, তিনি সেলিমদা, পরিবারের মেজো ছেলে, মেধাবী। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে দেশভাগের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার শেষ ধাপে। রাজনৈতিক বিশ্বাস ও কাজে মার্ক্সবাদী—কলকাতায় ছাত্র ফেডারেশনের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। পোশাকি নাম নাজিরুদ্দিন আহমদ—পরবর্তী সময়ে তাঁর খ্যাতি ও পরিচিতি এ কে এন আহমদ নামে। তিনিই এ পরিবারে প্রগতিশীলতার আবহ আমদানি করেন, ছোট সদস্যদের দেখভালের দায়িত্ব নেন, তাদের ভবিষ্যৎ তৈরিসহ।

দুর্বোধ্য কারণে আমার প্রতি তাঁর স্নেহের ভাগটা ছিল কিছু বেশি। তাঁরই আগ্রহে আমার মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও সাহিত্য পাঠ, ক্রমে তাতে আস্থা, ছাদের চিলেকোঠায় বসে পুলিশ কর্মকর্তা চাচার চোখ এড়িয়ে সেসব বই পড়া—বিশেষ করে ওয়েব দম্পতির লেখা সংক্ষিপ্ত ভাষ্যের ঢাউস বই ‘সোভিয়েট কমিউনিজম’। কী কঠিনই না মনে হয়েছিল তখন! এ বাড়িতে আসত ‘পরিচয়’, ‘অগ্রণী’ প্রভৃতি পত্রিকা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস, সবার প্রিয় লেখক।

শহরে ছাত্র ফেডারেশনের প্রভাব তখনো শেষ হয়নি পাকিস্তানি দমননীতি সত্ত্বেও। শফিক, সম্ভবত তার বহির্মুখী স্বভাবের কারণে কমিউনিস্ট ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে কিছুটা জড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৮-এর উগ্র পার্টি নীতির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে, গমন দেশের অন্যত্র। ছাত্র ফেডারেশনের আয়োজিত সম্মেলন হুমকির মুখে পণ্ড হয়ে যায়। অজয় রায়ের সঙ্গে সম্মেলন নিয়ে আলাপচারিতার কারণেই বোধ হয় আমার ওপর হামলা মধু নামের এক সিনিয়র ছাত্রের।

তখনকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিমাফিক আমার গতি হয় থানায়। ভাগ্যিস খবর পেয়ে চাচা আমাকে ছাড়িয়ে এনেছিলেন, তা না হলে তখনই আমার ছাত্রজীবনে ঢ্যাড়া পড়ত। মধুর এ অন্যায় আচরণ সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কলেজ কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতির কারণে অজয় রায়কে হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে যেতে হয়। এক রাতে তাঁকে দেখি নির্মলা কুটিরের নিচতলায় রাতের খাওয়া শেষ করতে। খাবার পরিবেশন করছিল এ পরিবারের সবচেয়ে স্মার্ট মেয়েটি, ওপরে চাচা নিদ্রামগ্ন। যাকে বলে ‘বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা’।

কিছুদিন পর বজ্রযোগিনী গ্রাম থেকে অজয় রায়ের লেখা একটি চিরকুট পাই, জরুরি কারণে দেখা করার জন্য। অবাক হই—এ চিরকুট আসা উচিত ছিল শফিকের কাছে। তবু চিরকুটবাহকের সঙ্গী হয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করি। একটি বন্ধ ঘরে দিনের বেলা মোমবাতির আলোয় একটি বই পড়ছিলেন অজয় রায়। কিছু কথা, কয়েকজন ছাত্রের কাছে কিছু প্রচারপত্র পৌঁছে দেওয়া, শফিউদ্দিনের সঙ্গে দেখা করার অনুরোধ ইত্যাদি ছিল তাঁর বক্তব্য।

কলেজে যে দু-একজন বন্ধু জুটেছিল—এম এন রায় নামের মেধাবী ছাত্রটি তাদের মধ্যে বিশিষ্ট। পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আমাদের অবস্থান ছিল প্রথম বা দ্বিতীয়, অনেকটা যেন স্কুলজীবনের দেবু ও আমি। আইএসসি ফাইনাল পরীক্ষায় ওর রেজাল্ট আমার চেয়ে ভালো হয়েছিল। আমি তখন পাঠ্য বিষয় থেকে মার্ক্সবাদী সাহিত্য পাঠে অধিক মগ্ন। এরপর ওরা চিরতরে বাস্তুত্যাগী। আর দেখা হয়নি।

কলেজজীবনে বড় প্রাপ্তি ছিল ইংরেজির অধ্যাপক, পরবর্তীকালের সুসাহিত্যিক অরবিন্দু পোদ্দারের স্নেহসিক্ত সান্নিধ্য। প্রায়ই বিকেলে এক রাস্তার শহর মুন্সীগঞ্জের জাহাজঘাট পর্যন্ত হাঁটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। সেই সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। কলেজ ম্যাগাজিনে আমার লেখা সুকান্তর ওপর একটি প্রবন্ধ নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন ও উপদেশ এখনো সঠিক বলে মনে করি। দুর্ভাগ্য, তাঁর সঙ্গে ভবিষ্যতে যোগাযোগ রাখিনি, কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো কিনেছি ও মনোযোগের সঙ্গে পড়েছি, উপকৃত হয়েছি।

বিকেলে হাঁটার অভ্যাস ছিল সহপাঠী বন্ধু রায়ের সঙ্গেও। ওর এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ থেকে কুবেরের বয়ানে উদ্ধৃতি, বেশ মজা করে। তার আরেক বন্ধুর ঝোঁক ছিল কলকাতায় ট্রামে-বাসে বাঙাল ভাষায় কথা বলে ঘটিদের বিরক্তি উৎপাদন, আর সে গল্প সহাস্যে আমাদের শোনানো। এরা সবাই পরে একসময় দেশত্যাগী। দায়টা ওদের নয়, প্রকৃতপক্ষে তা পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক নীতির।

দেশভাগ নিয়ে আমার খুব কষ্ট হতো বাস্তুত্যাগীদের কথা ভেবে। মনে হতো, কোথায় আছেন, কেমন আছেন নির্মলা কুটিরের মালকিন। যেমন দেখেছি নড়াইলে, তেমনি ঢাকায়। তোপখানা রোডের সামনে বিশাল জমিতে দোতলা বাড়ি ‘পরম ভবন’, শান্তিনগরের ‘প্রিয়বাস’, সিদ্ধেশ্বরীর ‘কুঞ্জকুটির’-এর মালিকরা কেমন আছেন পিতৃপুরুষের বাসস্থান ছেড়ে গিয়ে। ঢাকা-মুন্সীগঞ্জই শুধু নয়, পূর্ববঙ্গের শহরগুলোও বাস্তুত্যাগীদের অশ্রুজলে চিহ্নিত। যেমন দেখেছি মুন্সীগঞ্জে পাশের বাড়ির খুশীদের কান্নাভেজা চোখে স্টিমারযাত্রা—দেখা হয়েছিল একবার কলকাতায়।

দেশভাগ এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক অধ্যায়। এর ভালো-মন্দ, ঠিক-বেঠিক নিয়ে বিতর্ক বিস্তর। ১৯৪৯-এ আইএসসি পরীক্ষা দিয়ে মুন্সীগঞ্জ ছেড়ে আসি। ধলেশ্বরীর তীরে বছর দেড়েকের জীবন আমাকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপহার দিয়েছিল—মার্ক্সবাদী দর্শন ও রবীন্দ্রসংগীত। এখানেই প্রথম ১১ মার্চের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে যোগদান এবং সাহিত্যচর্চায় হাতেখড়ি কবিতা ও প্রবন্ধ লিখে।

 

চার

‘স্মৃতি সতত সুখের’—এই আপ্তবাক্য আমার জীবনে নিত্যদিনের সত্য হয়ে ওঠেনি—পুরো জীবনটাই আনন্দ-বেদনার মিশ্রণ। স্মৃতির দর্পণে ফুটে ওঠা ছবিগুলো তেমন কথাই বলে। কৈশোরের নদীতে আনন্দময় অবগাহনের শেষে ছিল বিচ্ছেদ বেদনা, তারুণ্যের শুরুতে ধলেশ্বরীর স্নানে নেতির দিকটারই আধিক্য। আর বুড়িগঙ্গায় দীর্ঘ সময়ের সাঁতার কত যে ঘটনাবহুল, তাতে দুঃখ-তাপের ভাগটাই বেশি, বেশি রাজনৈতিক হতাশা, ব্যক্তিজীবনের নান্দনিক একাকিত্ব। জীবনসায়াহ্নে হিসাব মেলাতে গেলে সেটাই সত্য হয়ে ওঠে—বিস্তর অনিচ্ছাকৃত সিদ্ধান্তের পরিণামে।

চেয়েছিলাম দুই বন্ধু মিলে প্রেসিডেন্সিতে পড়ব, দেশভাগ তা হতে দেয়নি। এমনকি হয়নি লড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়া। ঢাকায় এসে ইচ্ছা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিস্ট্রি পড়ার, ঘটনার টানে ভর্তি হতে হলো মেডিক্যাল কলেজে। অবশ্য সেখানে অভিজ্ঞতা আমাকে হতাশ করেনি। তখনকার মেডিক্যাল হোস্টেলের পরিবেশ ছিল রাজনীতি ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় মননশীল। সাহিত্য, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাট্যাভিনয়ের চর্চা ছিল ব্যাপক। চারুকলার দিকটিও গৌণ ছিল না। পোস্টার ও সচিত্র দেয়ালপত্রে এর প্রমাণ প্রকাশ পেয়েছে।

শিক্ষকরা যত কঠিনই হোন, তা ছাত্রদের সংস্কৃতিচর্চাকে পেছনে ঠেলতে পারেনি। বরং কিছুসংখ্যক জুনিয়র শিক্ষক ছাত্রদের এই প্রবণতায় বাতাস দিয়েছেন, তাঁরাও নাট্যচর্চায় অংশ নিয়েছেন। এই চর্চার বড় অংশ ছিল প্রগতিবাদী চরিত্রের। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত প্রথম কলেজ ম্যাগাজিনটি এর প্রমাণ। রক্ষণশীল অধ্যক্ষ ডা. টি আহমদ এটি নিষিদ্ধ করেও ছাত্রদের মনোবল ভাঙতে পারেননি। ওতে আমার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল।

তবে একটি কাজে তিনি সফল হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট কর্মী আবদুল হাই এবং আমজাদ হোসেন ও শামসুদ্দোহাকে রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার কারণে কলেজ থেকে বহিষ্কার করে তাদের ছাত্রজীবন ও ভবিষ্যৎ নষ্ট করতে পেরেছিলেন। সময়টা অবশ্য ১৯৪৮—অর্থাৎ বাম রাজনীতির জন্য প্রতিকূল। এ পরিবেশে আমার পক্ষে প্রগতিবাদী, বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া যেন এক ভবিতব্য এবং তা ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়।

পরিচয় হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল, ঢাকা হলের প্রগতিবাদী ছাত্রদের সঙ্গে। দু-চারজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব। যেমন আনোয়ারুল হক খান, গাজীউল হক, আতিকুল্লাহ, দেবপ্রিয় বড়ুয়া প্রমুখ। এ ছাড়া বিশেষ ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় ছাত্র ফেডারেশন কর্মী, যশোরের আফসার সিদ্দিকীর সঙ্গে। তাদের সঙ্গে সে সম্পর্ক আমৃত্যু অটুট ছিল। এ পর্বে স্কুলবন্ধু হেদায়েত হোসেন চৌধুরীর (হিরুর) সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ তার রাজনৈতিক পার্শ্ব পরিবর্তন ও মুসলিম লীগপন্থী  হওয়ার কারণে।

ঢাকা তখন আধা-আধুনিক শহর—কাঁচা-পাকা রাস্তা আর বিস্তর গাছগাছালি ও ঝোপ-জঙ্গলের কারণে। মালিবাগ-খিলগাঁও তখন জঙ্গলাকীর্ণ ঢাকাই মহল্লা। ক্রমে তার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে। সেখানকার কাঁচা রাস্তায় ঝোপঝাড়ে বুনোফুলের হালকা সুবাস রডোডেনড্রনগুচ্ছ ছাড়াই মন ভোলায়। মতিঝিল এলাকা সবে তৈরি হতে শুরু করেছে। মহল্লাগুলোতে তখনো বিস্তর গাছগাছালি ও পুকুর—রমনা পার্কে সারপেস্টাইন লেকে নীল পদ্ম ও রঙিন শাপলা ফুল, বিশাল শিরীষগাছে ডালভর্তি ফুল, আর রেসকোর্স মাঠের আকর্ষণই আলাদা। মনে করিয়ে দেয় বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিধন্য পুরানা পল্টন ও সেগুনবাগানের কথা—যা পাকিস্তানি সংস্কৃতির টানে সেগুনবাগিচা নামে পরিচিতি পেয়ে যায়। কমলাপুর মহল্লা তার প্রাকৃত সৌদর্য নিয়ে আকর্ষণ করে গভীরভাবে। তেমনি সিদ্ধেশ্বরীপাড়া— হাফিজউদ্দিন সাহেবদের বাড়িতে শীর্ণ ম্যাগনোলিয়া ফুল নড়াইলের জমিদারবাড়ির বাগানের কথা মনে করিয়ে দেয়। রাস্তার এক পাশে বিলাতি মেহেদির বেড়া—আমাদের গ্রামের বাড়ির কথা স্মৃতিতে টেনে আনে।

পুরান ঢাকার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত দিক ছিল সুখাদ্যে ঠাসা রেস্তোরাঁ—হোটেল ও সিনেমা হল—সেখানে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ছায়াছবির প্রাচুর্য—ছাত্রদের জন্য মননশীলতার আরাম—মুকুল, মানসী, রূপমহল, মায়া, শাবিস্তান ইত্যাদি বিচিত্র নামের সিনেমা হলের প্রতিটি শোতে জমজমাট ভিড়। রিকশা-ঘোড়ার গাড়ি আর গোলগাল টাউন সার্ভিস বাস তখনকার ঢাকার যাতায়াতব্যবস্থার প্রধান দিক।

মুসলিম লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকা জাগতে শুরু করেছে, তার ঘুম ভাঙছে মূলত প্রতিবাদী ছাত্র-যুবাদের কল্যাণে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ হয়ে ১৯৫২—ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরক চরিত্র নিয়ে প্রতিবাদী রাজনীতির উত্থান, প্রধান মাধ্যম নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। একদা মুসলিম লীগের ভিন্নপন্থীরা এখানে জড়ো হয়েছেন।

স্মৃতিচারণায় দেখতে পাচ্ছি, নবাবপুর রোড ধরে মিছিলে হাঁটছি, সামনে চুড়িদার পায়জামা ও কালো শেরোয়ানি পরা রাজনৈতিক নেতা আতাউর রহমান খান। কেন্দ্রীয় সরকারের মূলনীতি কমিটিতে উর্দু রাষ্ট্রভাষা প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সমাবেশের সূচনা মিছিলে। খানসাহেবের পাশে কামরুদ্দীন সাহেব ও আওয়ামী মুসলিম লীগের শীর্ষনেতারা দ্রুত পায়ে হাঁটছেন। বার লাইব্রেরিতে বৈঠক, বিকেলে আরমানীটোলা ময়দানে জনসভা। ১৯৪৮ সালে মার্চের পর এটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী আন্দোলন। নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটতে দেখা যাচ্ছে।

মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এসে গেল ১৯৫২ সাল। একদিকে প্রগতিবাদী, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী গণতন্ত্রী রাজনীতির প্রকাশ ও বিকাশ ধীরেসুস্থে। কিন্তু ১৯৪৮ থেকে সূচিত ভাষা আন্দোলনে ছাত্র-যুবাদেরই প্রাধান্য, তাদের স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা মূলত ছাত্রাবাস ও শিক্ষায়তন ঘিরে—স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক। মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, মিটফোর্ড স্কুল, বাদ নেই কামরুননেসা স্কুলসহ প্রিয়নাথ স্কুল থেকে নবকুমার ইনস্টিটিউশন পর্যন্ত। ছাত্র-ছাত্রীরাই ভাষা আন্দোলনের মধ্যমণি।

এমন আন্দোলন থেকে সরে থাকা যায়? যায়নি। একাডেমিক পড়াশোনায় শিথিলতা, মিছিল-সভা-সমাবেশই প্রধান হয়ে ওঠে, তবে সাহিত্য পাঠে ঘাটতি ছিল না পূর্ব ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়। সদ্য স্থাপিত নিউ মার্কেটের গোটা পশ্চিমাংশে শুধুই বইয়ের দোকান—পশ্চিমবঙ্গীয় ও বিদেশি বইয়ে ঠাসা। প্রাধান্য পেপারব্যাক সিরিজের—পেঙ্গুইন, পেলিক্যান ইত্যাদি। এক টাকা, দেড় টাকা দাম—কত যে বই কেনা। শুধু ছাত্ররাই নয়, মননশীল চাকুরেদেরও দেখা গেছে এন্তার বই কিনতে।

একটা দারুণ মননশীল পাঠাভ্যাস তখনকার আধুনিক চেতনার ছাত্রদের মধ্যে, নাগরিকদের মধ্যে। সরকারি চাকুরেদের জন্য তৈরি আজিমপুর কলোনির বাসিন্দারা এই আধুনিকতার শরিক। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। সেলিমদা তখন স্টেট ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, আজিমপুর কলোনির বাসিন্দা। প্রায়ই শেষ বিকেলে আমার হোস্টেলে তাঁর হাজিরা—রেসকোর্স, রমনা পার্কে হাঁটতে হাঁটতে সাহিত্য ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা।

সে আমলে এস এম হল একদিকে রাজনৈতিক বিচারে যেমন রক্ষণশীলতার কেন্দ্র, তেমনি মেধাবী-পড়ুয়া ছাত্রদের পছন্দের আবাস, অনেক পার্থক্য ফজলুল হক, ঢাকা হলের সঙ্গে চরিত্র বিচারে। আমার যোগাযোগ মূলত শেষ দুই হল এবং মিটফোর্ডের প্রগতিবাদী ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে। একসময় মুসলিম লীগের মাস্তানদের হামলায় এস এম হল থেকে পালিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন মুনীর চৌধুরী ও তাঁর সঙ্গী নাজিরুদ্দিন আহমদ (সেলিমদা)।

পরে হুলিয়া মাথায় নিয়ে সাদেককে হল ছেড়ে আত্মগোপনে যেতে হয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যুক্ত হওয়ার কারণে। এবার আমাদের আরেক বন্ধু ওই হল ছেড়ে আমার রুমে আশ্রয় নেয়, কারণ ভিন্ন নয়। সিলেটের মোহাম্মদ ইলিয়াস বেশ আয়েশে-আরামে আমার রুমে চতুর্থ সিটের বাসিন্দা। পরবর্তীকালে দেখেছি তার রাজনৈতিক পার্শ্বপরিবর্তন। বছরে বার কয় তার ঢাকায় আসা সওদা করতে। বার দুই নিউ মার্কেটে দেখা। পরিবর্তনের জন্য কোনো ধরনের গ্লানিবোধ নেই।

মুসলিম লীগ সরকারের অর্বাচীন নির্বুদ্ধিতার কারণে ১৯৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি ইতিহাস হয়ে ওঠে ছাত্র-অছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে। পুলিশের গুলিতে মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাঙ্গণে শাহাদাতবরণ করেন রফিক-জব্বার-বরকত-সালামসহ আরো কয়েকজন। চোখের সামনে মৃত্যু দর্শন। এরপর ‘শহীদ দিবস অমর হোক’ নতুন এই স্লোগান তুলে সপ্তাহখানেক সকাল-সন্ধ্যা মিছিল আর মিছিলে হাঁটা—সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। গ্রেপ্তারের ভয়ে রাত্রিবাস সিদ্ধেশ্বরীতে ভাগ্নে হিরুদের বাড়িতে।

শুধু শহর ঢাকাই নয়, গোটা দেশের নাড়িতে প্রতিবাদের স্পন্দন—তৈরি করি হোস্টেল প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার, করেন আরো অনেকে। ঐতিহ্য সৃষ্টি করে একুশে ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’—১৯৫৩ থেকে এদিন অতি ভোরে ছাত্রদের নগ্নপদ প্রভাতফেরি—স্লোগান, গান ও লক্ষ্য আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পমাল্যের শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন, যা এখন মধ্যরাতে স্থানান্তরিত। এরই মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে রাজনীতি ও সামাজিক স্তরে।

স্মৃতির দর্পণে আমার কৈশোর-তারুণ্যের নানা রঙা দিনগুলোর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ছবিগুলো এখনো সজীব। জীবনসায়াহ্নে পৌঁছে সেই সোনালি-রুপালি দিনগুলোকে এখনো দেখতে পাই একই বাস্তবতায়; কিন্তু সময় তাদের চরিত্র পাল্টে দিয়েছে নানাভাবে, সেটাই বারবার ভাবি। ভাবি ইতিহাসের কী বিচিত্র আচরণ!

কৈশোর-তারুণ্যের দীর্ঘ তৎপরতার সামান্য কিছু অংশ স্মৃতি থেকে এখানে তুলে ধরা হলো। অনেক প্রিয়-অপ্রিয় তথ্য বাদ দিতে হয়েছে সংগত কারণে। ভাবছি, দীর্ঘ জীবনের বিচিত্র অধ্যায়গুলো লিপিবদ্ধ করলে কেমন হয়—ব্যক্তিগত এবং সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চিত্রগুলোসহ। দেখা যাক, সময় সে সুযোগ দেয় কি না।

মন্তব্য