kalerkantho

বিশেষ রচনা

দেশে দেশে কোরবানি

৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



দেশে দেশে কোরবানি

দেশভেদে কোরবানির পদ্ধতি এক হলেও উৎসব পালনে খানিকটা বৈচিত্র্য দেখা যায়। বিস্তারিত লিখেছেন কাসেম শরীফ

 

একেক দেশে একেক ধরনের পশুর প্রাধান্য থাকে। পশু সংগ্রহের পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। তাই কোরবানির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আছে। সাধারণত বিশ্বজুড়েই ঈদের নামাজের পরপরই সামর্থ্যবানরা তাদের কোরবানির পশু খোলা মাঠ, রাস্তা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার নামে কোরবানি করে।

 

ইন্দোনেশিয়া

আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। এখানে পশু কোরবানি করা হয় সামাজিকভাবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা হাট থেকে কোরবানির পশু কিনে মসজিদে দিয়ে আসে। মসজিদ এলাকায় কতগুলো পরিবার আছে তার হিসাব ইমামের কাছে থাকে। ঈদের নামাজের পর সবাই মিলে কোরবানির পশু জবাই করে। এরপর যত ঘর আছে মাংস তত ভাগে ভাগ করে সবার ঘরে দিয়ে আসা হয়। তবে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারা তা না নিয়ে গরিবদের দিয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়াতেও ঈদের দিন সামাজিক বৈষম্য ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করে। একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায়। শিশুরা দিনভর মেতে থাকে হাসি-আনন্দে।

 

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়াতেও সমাজবদ্ধভাবেই কোরবানি করা সবার পছন্দ। স্থানীয় মসজিদে কোরবানি করে গোশতও একসঙ্গে বণ্টন করা হয়। ইদানীং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে ‘বিলাসী’ কোরবানির হাট গড়ে উঠেছে। এগুলোকে হাট না বলে কোরবানির পশুর শোরুমই বলা হয়! ধনী ক্রেতারা ওই সব শোরুমে ভিড় করে। ল্যাপটপ ও ট্যাব হাতে সেলসম্যান থাকে। চড়া দামে কেনে পশু। এ ছাড়া মাংস বণ্টন প্রক্রিয়া ইন্দোনেশিয়ার মতো মসজিদ থেকে পরিচালনা করা হয়।

 

মিসর

মিসরের নিজস্ব কিছু রীতিনীতি ও স্বকীয়তা রয়েছে। জিলকদের শেষ দিনগুলো থেকে তাদের কোরবানি ও ঈদুল আজহার উৎসব শুরু হয়। ঈদুল ফিতরের সময় বিভিন্ন ধরনের আলোকবর্তিকা ও পিদিম দিয়ে সাজে রাস্তাঘাট সাজানো হলেও কোরবানির ঈদে তেমন করা হয় না। সেখানে ঈদুল আজহার আনন্দ আমেজে থাকে ভিন্ন আবহের। ঘরবাড়ি নতুন করে সাজানো হয়। গ্রাম ও মরু অঞ্চল থেকে শহরে কোরবানির পশু নিয়ে আসা হয়। কায়রো, আলেক্সান্দ্রিয়া, পোর্ট সাইদ, ইসমাইলিয়া, সুয়েজ, মানসুরা, মিনয়া প্রভৃতি অঞ্চলে কোরবানির পশুর বৃহৎ বাজার বসে। ঈদের দিন লাখো মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করে। মসজিদগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। আশপাশের আঙিনাগুলোও নামাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। নামাজ শেষে শিশুদের মধ্যে ঈদ-সেলামি ও বিভিন্ন উপহার বিতরণ করা হয়। কোরবানি শেষে পরিবারের সবাই মিলে সকালের নাশতা করে। ঈদের দিন স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একে অপরকে ‘ঈদি’ দেয়। সন্ধ্যায় সবাই মিলে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের দেখতে যায়। আবার অনেকে ঈদের দ্বিতীয় দিন দর্শনীয় এলাকাগুলোতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যায়।

 

কাতার

কাতারে বিলাসী ক্রেতাদের জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড, ইরান ও তুরস্ক থেকে কোরবানির পশু আনা হয়। পশুর দাম প্রতিবছর প্রায় একই থাকে। মূল্যের তারতম্য খুব একটা হয় না। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোরবানির পশুর বাজার ও কোরবানি সংক্রান্ত অন্যান্য বাজার তদারকি করা হয়। কোরবানিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দোহা, মদিনাতুল খালিফা, ওকরাহ প্রভৃতি শহরে ভিন্ন রকম তৎপরতা দেখা যায়।

 

সৌদি আরব

পবিত্র হজ ও কোরবানি এই দুইয়ে মিলে সৌদিতে ঈদুল আজহার উৎসব বেশ জমকালোভাবে পালিত হয়। প্রচলিত রীতি ও নিয়ম অনুযায়ী সৌদির জনগণ ও বহিরাগত হাজিরা ঈদুল আজহা পালন করেন। ঈদের নামাজের পর খুব সকালে পরিবারের সবাই মিলে কোরবানির জন্তু জবাই দেখে। জবাইয়ের পর সেখান থেকে অল্প কিছু কোরবানির গোশত বাড়িতে এনে রান্না করা হয়। নাশতা শেষে শিশুরা প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যায়। সাধারণত পরিবারের প্রবীণদের সঙ্গে সবাই সাক্ষাৎ করে। তার সঙ্গে নাশতা-পানি করতে করতে খোশগল্পে মেতে ওঠে। সৌদির উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে দেখা যায়, ঈদের নামাজের পর পরিবারের নারীরা একটি ঘরে একত্র হয়। এরপর সবাই মিলে বাচ্চাদের উপহার, সেলামি ও বিভিন্ন মুখরোচক খাবার দেয়। জোহরের নামাজের শেষে মানুষজন বিশ্রামের জন্য নিজেদের ঘরে ফিরে আসে। মাগরিবের নামাজের পর নতুন করে আবার সমবেত হয়। সাধারণত বড় বড় পরিবার ও অভিজাত শ্রেণির লোকজন ঈদ উদ্‌যাপন করতে সন্ধ্যার পর তাঁবু স্থাপন করে। এতে বিভিন্ন রকমের খাবারের পসরা সাজানো হয়। এরপর খাবারের বড় দস্তরখান বিছিয়ে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবারে অংশগ্রহণ করে।

 

আরব আমিরাত ও কুয়েত

কাতার, আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত প্রভৃতি দেশে কোরবানির পশু কেনার আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। অনেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে পশু দেখে ক্রয় করে। আবার অনেক বড়লোক আনন্দের সঙ্গে ঘটা করে কোরবানির হাটে যায়। কোরবানির জন্য এসব দেশের প্রায় সব পরিবারই কয়েকটি করে পশু কেনে। ঈদের দিন ভোরে সূর্যাস্তের পর দ্রুত ঈদের নামাজ আদায় করে। একে অপরকে উপহার দেয়। ভিনদেশি অসহায়দেরও ঈদের সেলামি দিতে ভোলে না। ঈদুল আজহার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মোট তিন দিন বেশ আনন্দ করে কোরবানির পশু জবাই করে এখানকার বাসিন্দারা। প্রতিবেশীদের কাছে গোশত বিতরণ করে। নিজেদের ঘরে-বাইরের মানুষকে দাওয়াত করে। যেসব প্রবাসী থাকে, তাদের জন্য এই তিন দিন বেশ আনন্দের।

 

মরক্কো

ঈদের নামাজ শেষে মারাকিশিরা ঈদ শুভেচ্ছা জানাতে ঝটিকা সফর করে। এরপর খুব দ্রুত পশু কোরবানি করে। তারা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অংশ হিসেবে কোরবানির পশুর মাথায় মেহেদি মাখায়। বিভিন্নজন আবার মাথায় আগের বছরের কোরবানির পশুগুলোর শিং মাথায় পরে আনন্দ করে। এরপর পশমাবৃত আলখাল্লা ধরনের পোশাক পরে কোরবানিদাতাদের কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানায় শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ঈদুল আজহার তিন দিন তাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। প্রথম দিন তারা পরিবারের সবাই মিলে চুলার কাছে একত্র হয়। এরপর গোশত ভুনা করে সম্মিলিত খাবারে অংশ নেয়।

দ্বিতীয় দিন কোরবানির জন্তুগুলোর মাথা (প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পর) সিদ্ধ করে রান্না ও ভাজা করা হয়। আবার এদিন একে অপরের বাসায় বেড়াতেও যায়। আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তৃতীয় দিন তারা গোশতের রকমারি খাবার তৈরি করে। নিজস্ব পদ্ধতিতে তারা কোরবানির গোশত দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে। রেফ্রিজারেটর আবিষ্কারের আগে থেকেই তারা বিভিন্ন প্রাচীন পদ্ধতিতে গোশত সংরক্ষণ করে। অনেক দিন পরও তারা অতিথি ও আগন্তুকদের কোরবানির গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করে। কোরবানির পশুর গোশতকে তারা খাবারের বরকত হিসেবে বিবেচনা করে।

 

লেবানন

ঈদ আসার আগে থেকেই শুরু হয় ধোয়া-মোছা, পরিচ্ছন্নতা, আসবাবের পরিবর্তন, সাজসজ্জা, সুগন্ধি বিতরণ ও মিষ্টান্ন খাবার তৈরির আবেশ। মসজিদগুলোতে নতুন বাতি, হজ ও ঈদের শুভেচ্ছা বাণীর প্ল্যাকার্ড ইত্যাদি লাগানো হয়। গ্রামাঞ্চলও নতুন করে সাজানো হয়।

 

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যে মুসলমান বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রতিটি মসজিদে তিন থেকে চারটি ঈদের জামাত হয়। কয়েক বছর ধরে লন্ডনের খোলা পার্কে ঈদের জামাত চালু হয়েছে। পূর্ব লন্ডনে স্টেপনিগ্রিন পার্ক ও ইফোর্ডে ভ্যালেন্টাইনস পার্কে খোলা আকাশের নিচে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাত শেষে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি আদায় করে সেখানকার মুসলমানরা। ঈদের এক মাস আগে থেকে কোরবানির মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এখানে কোরবানির অর্ডার নেওয়া হয়’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। কোরবানিদাতারা এসব প্রতিষ্ঠানে নাম লিখিয়ে কোরবানির পশুর দাম দিয়ে আসে। ওই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট স্থানে ঈদের জামাতের পর কোরবানি করা হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শতাধিক খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হয় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। নিউ ইয়র্ক সিটিতেই ২৫২টি মসজিদ রয়েছে। সব কটিতেই ঈদের জামাত হয়। ঈদের জামাতের পর শুরু হয় কোরবানি। নির্দিষ্ট গ্রোসারিতে অথবা পশুর খামারেই সাধারণত কোরবানি করে সেখানকার মুসলমানরা। গ্রোসারিতে কোরবানি করলে কোরবানিদাতার নাম, বাবার নাম আর অর্থ দিয়ে আসতে হয়। তারাই কোরবানি করে গোশত প্যাকেটে করে রেখে দেয়। গ্রোসারিতে খোলা ময়দানে নিজ হাতে কোরবানির আমেজ পাওয়া যায় না বলে অনেকে ঈদ জামাত শেষে কোরবানি করার জন্য পশুর খামারে চলে যায়। সেখান থেকে পছন্দমতো পশু কিনে খোলা আকাশের নিচে নিজ হাতে কোরবানি দেয়। খামারে ইসলামী পদ্ধতিতে জবাই করে দেওয়ার জন্যও লোক থাকে। খামার ও গ্রোসারি ছাড়াও বিভিন্ন শহরে খোলা ময়দানে কোরবানির অনুমতি দেওয়া হয়। নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, মিশিগানসহ কিছু এলাকায় খোলা ময়দানে কোরবানির সুযোগ থাকে।

 

রাশিয়া

রাশিয়ার দুই কোটি মুসলমানের ২০ লাখই বাস করে মস্কোতে। রাজধানী মস্কোতে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ঈদুল আজহা। গেল বছর নগর কর্তৃপক্ষ দুটি পার্কে ঈদের জামাত আয়োজন করায় মস্কোতেও এসেছে খোলা ময়দানে জামাতের আমেজ। মস্কোর ৩৯টি মসজিদে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা হয়েছে। গেল ঈদুল ফিতরে কাজান স্টেডিয়ামে বিশাল ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম অধ্যুষিত তিনটি প্রদেশে ঈদ উপলক্ষে এক দিনের সরকারি ছুটি থাকে। কোরবানির জন্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে আগেই বুকিং দিয়ে রাখতে হয়। ঈদের জামাতের পর রাশিয়ার মুসলমানরা নগরের বাইরের নির্দিষ্ট স্থান অথবা খামারে গিয়ে কোরবানি করে।

 

সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ মুসলমান। প্রতিটি এলাকায়ই কিছু মুসলমানের বাস রয়েছে। মুসলমানদের আলাদা এলাকাও রয়েছে। সেখানে কোরবানির প্রায় তিন মাস আগে কোরবানির পশুর জন্য নিকটতম কোনো মসজিদের মাধ্যমে দরখাস্ত করতে হয়। সরকার অস্ট্রেলিয়া থেকে পশু এনে সেই মসজিদে হস্তান্তর করে। কোরবানিদাতা মসজিদের কাছে কোরবানি করে গোশতের কিছু অংশ নিজের জন্য নিয়ে আসে বাকিটা অন্য মুসলমানদের জন্য মসজিদেই রেখে আসে। মসজিদ থেকেই এই গোশত গরিবসহ অন্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

 

একেক দেশে একেক ধরনের পশুর প্রাধান্য থাকে। পশু সংগ্রহের পদ্ধতিতেও রয়েছে ভিন্নতা। তাই কোরবানির ক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব কিছু স্বকীয়তা আছে। সাধারণত বিশ্বজুড়েই ঈদের নামাজের পরপরই সামর্থ্যবানরা তাদের কোরবানির পশু খোলা মাঠ, রাস্তা কিংবা নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার নামে কোরবানি করে।

 

ইন্দোনেশিয়া

আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। এখানে পশু কোরবানি করা হয় সামাজিকভাবে। সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা হাট থেকে কোরবানির পশু কিনে মসজিদে দিয়ে আসে। মসজিদ এলাকায় কতগুলো পরিবার আছে তার হিসাব ইমামের কাছে থাকে। ঈদের নামাজের পর সবাই মিলে কোরবানির পশু জবাই করে। এরপর যত ঘর আছে মাংস তত ভাগে ভাগ করে সবার ঘরে দিয়ে আসা হয়। তবে যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো, তারা তা না নিয়ে গরিবদের দিয়ে দেয়। ইন্দোনেশিয়াতেও ঈদের দিন সামাজিক বৈষম্য ভুলে সবাই একসঙ্গে আনন্দ করে। একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায়। শিশুরা দিনভর মেতে থাকে হাসি-আনন্দে।

 

মালয়েশিয়া

মালয়েশিয়াতেও সমাজবদ্ধভাবেই কোরবানি করা সবার পছন্দ। স্থানীয় মসজিদে কোরবানি করে গোশতও একসঙ্গে বণ্টন করা হয়। ইদানীং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতে ‘বিলাসী’ কোরবানির হাট গড়ে উঠেছে। এগুলোকে হাট না বলে কোরবানির পশুর শোরুমই বলা হয়! ধনী ক্রেতারা ওই সব শোরুমে ভিড় করে। ল্যাপটপ ও ট্যাব হাতে সেলসম্যান থাকে। চড়া দামে কেনে পশু। এ ছাড়া মাংস বণ্টন প্রক্রিয়া ইন্দোনেশিয়ার মতো মসজিদ থেকে পরিচালনা করা হয়।

 

মিসর

মিসরের নিজস্ব কিছু রীতিনীতি ও স্বকীয়তা রয়েছে। জিলকদের শেষ দিনগুলো থেকে তাদের কোরবানি ও ঈদুল আজহার উৎসব শুরু হয়। ঈদুল ফিতরের সময় বিভিন্ন ধরনের আলোকবর্তিকা ও পিদিম দিয়ে সাজে রাস্তাঘাট সাজানো হলেও কোরবানির ঈদে তেমন করা হয় না। সেখানে ঈদুল আজহার আনন্দ আমেজে থাকে ভিন্ন আবহের। ঘরবাড়ি নতুন করে সাজানো হয়। গ্রাম ও মরু অঞ্চল থেকে শহরে কোরবানির পশু নিয়ে আসা হয়। কায়রো, আলেক্সান্দ্রিয়া, পোর্ট সাইদ, ইসমাইলিয়া, সুয়েজ, মানসুরা, মিনয়া প্রভৃতি অঞ্চলে কোরবানির পশুর বৃহৎ বাজার বসে। ঈদের দিন লাখো মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করে। মসজিদগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই থাকে না। আশপাশের আঙিনাগুলোও নামাজের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। নামাজ শেষে শিশুদের মধ্যে ঈদ-সেলামি ও বিভিন্ন উপহার বিতরণ করা হয়। কোরবানি শেষে পরিবারের সবাই মিলে সকালের নাশতা করে। ঈদের দিন স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও পরিবারের অন্য সদস্যরা একে অপরকে ‘ঈদি’ দেয়। সন্ধ্যায় সবাই মিলে প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের দেখতে যায়। আবার অনেকে ঈদের দ্বিতীয় দিন দর্শনীয় এলাকাগুলোতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যায়।

 

কাতার

কাতারে বিলাসী ক্রেতাদের জন্য অস্ট্রেলিয়া, ভারত, নিউজিল্যান্ড, ইরান ও তুরস্ক থেকে কোরবানির পশু আনা হয়। পশুর দাম প্রতিবছর প্রায় একই থাকে। মূল্যের তারতম্য খুব একটা হয় না। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোরবানির পশুর বাজার ও কোরবানি সংক্রান্ত অন্যান্য বাজার তদারকি করা হয়। কোরবানিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দোহা, মদিনাতুল খালিফা, ওকরাহ প্রভৃতি শহরে ভিন্ন রকম তৎপরতা দেখা যায়।

 

সৌদি আরব

পবিত্র হজ ও কোরবানি এই দুইয়ে মিলে সৌদিতে ঈদুল আজহার উৎসব বেশ জমকালোভাবে পালিত হয়। প্রচলিত রীতি ও নিয়ম অনুযায়ী সৌদির জনগণ ও বহিরাগত হাজিরা ঈদুল আজহা পালন করেন। ঈদের নামাজের পর খুব সকালে পরিবারের সবাই মিলে কোরবানির জন্তু জবাই দেখে। জবাইয়ের পর সেখান থেকে অল্প কিছু কোরবানির গোশত বাড়িতে এনে রান্না করা হয়। নাশতা শেষে শিশুরা প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যায়। সাধারণত পরিবারের প্রবীণদের সঙ্গে সবাই সাক্ষাৎ করে। তার সঙ্গে নাশতা-পানি করতে করতে খোশগল্পে মেতে ওঠে। সৌদির উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে দেখা যায়, ঈদের নামাজের পর পরিবারের নারীরা একটি ঘরে একত্র হয়। এরপর সবাই মিলে বাচ্চাদের উপহার, সেলামি ও বিভিন্ন মুখরোচক খাবার দেয়। জোহরের নামাজের শেষে মানুষজন বিশ্রামের জন্য নিজেদের ঘরে ফিরে আসে। মাগরিবের নামাজের পর নতুন করে আবার সমবেত হয়। সাধারণত বড় বড় পরিবার ও অভিজাত শ্রেণির লোকজন ঈদ উদ্‌যাপন করতে সন্ধ্যার পর তাঁবু স্থাপন করে। এতে বিভিন্ন রকমের খাবারের পসরা সাজানো হয়। এরপর খাবারের বড় দস্তরখান বিছিয়ে সবাই একসঙ্গে রাতের খাবারে অংশগ্রহণ করে।

 

আরব আমিরাত ও কুয়েত

কাতার, আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত প্রভৃতি দেশে কোরবানির পশু কেনার আধুনিক ব্যবস্থা রয়েছে। অনেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে পশু দেখে ক্রয় করে। আবার অনেক বড়লোক আনন্দের সঙ্গে ঘটা করে কোরবানির হাটে যায়। কোরবানির জন্য এসব দেশের প্রায় সব পরিবারই কয়েকটি করে পশু কেনে। ঈদের দিন ভোরে সূর্যাস্তের পর দ্রুত ঈদের নামাজ আদায় করে। একে অপরকে উপহার দেয়। ভিনদেশি অসহায়দেরও ঈদের সেলামি দিতে ভোলে না। ঈদুল আজহার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় মোট তিন দিন বেশ আনন্দ করে কোরবানির পশু জবাই করে এখানকার বাসিন্দারা। প্রতিবেশীদের কাছে গোশত বিতরণ করে। নিজেদের ঘরে-বাইরের মানুষকে দাওয়াত করে। যেসব প্রবাসী থাকে, তাদের জন্য এই তিন দিন বেশ আনন্দের।

 

মরক্কো

ঈদের নামাজ শেষে মারাকিশিরা ঈদ শুভেচ্ছা জানাতে ঝটিকা সফর করে। এরপর খুব দ্রুত পশু কোরবানি করে। তারা আনন্দ-উচ্ছ্বাসের অংশ হিসেবে কোরবানির পশুর মাথায় মেহেদি মাখায়। বিভিন্নজন আবার মাথায় আগের বছরের কোরবানির পশুগুলোর শিং মাথায় পরে আনন্দ করে। এরপর পশমাবৃত আলখাল্লা ধরনের পোশাক পরে কোরবানিদাতাদের কাছে গিয়ে ধন্যবাদ জানায় শুভেচ্ছা বিনিময় করে। ঈদুল আজহার তিন দিন তাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। প্রথম দিন তারা পরিবারের সবাই মিলে চুলার কাছে একত্র হয়। এরপর গোশত ভুনা করে সম্মিলিত খাবারে অংশ নেয়।

দ্বিতীয় দিন কোরবানির জন্তুগুলোর মাথা (প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার পর) সিদ্ধ করে রান্না ও ভাজা করা হয়। আবার এদিন একে অপরের বাসায় বেড়াতেও যায়। আনন্দ-উচ্ছ্বাস ও শুভেচ্ছা বিনিময় করে। তৃতীয় দিন তারা গোশতের রকমারি খাবার তৈরি করে। নিজস্ব পদ্ধতিতে তারা কোরবানির গোশত দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে। রেফ্রিজারেটর আবিষ্কারের আগে থেকেই তারা বিভিন্ন প্রাচীন পদ্ধতিতে গোশত সংরক্ষণ করে। অনেক দিন পরও তারা অতিথি ও আগন্তুকদের কোরবানির গোশত দিয়ে আপ্যায়ন করে। কোরবানির পশুর গোশতকে তারা খাবারের বরকত হিসেবে বিবেচনা করে।

 

লেবানন

ঈদ আসার আগে থেকেই শুরু হয় ধোয়া-মোছা, পরিচ্ছন্নতা, আসবাবের পরিবর্তন, সাজসজ্জা, সুগন্ধি বিতরণ ও মিষ্টান্ন খাবার তৈরির আবেশ। মসজিদগুলোতে নতুন বাতি, হজ ও ঈদের শুভেচ্ছা বাণীর প্ল্যাকার্ড ইত্যাদি লাগানো হয়। গ্রামাঞ্চলও নতুন করে সাজানো হয়।

 

যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যে মুসলমান বেড়ে যাওয়ায় এখন প্রতিটি মসজিদে তিন থেকে চারটি ঈদের জামাত হয়। কয়েক বছর ধরে লন্ডনের খোলা পার্কে ঈদের জামাত চালু হয়েছে। পূর্ব লন্ডনে স্টেপনিগ্রিন পার্ক ও ইফোর্ডে ভ্যালেন্টাইনস পার্কে খোলা আকাশের নিচে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাত শেষে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি আদায় করে সেখানকার মুসলমানরা। ঈদের এক মাস আগে থেকে কোরবানির মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘এখানে কোরবানির অর্ডার নেওয়া হয়’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। কোরবানিদাতারা এসব প্রতিষ্ঠানে নাম লিখিয়ে কোরবানির পশুর দাম দিয়ে আসে। ওই সব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট স্থানে ঈদের জামাতের পর কোরবানি করা হয়।

 

যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে শতাধিক খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় ঈদ জামাত হয় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। নিউ ইয়র্ক সিটিতেই ২৫২টি মসজিদ রয়েছে। সব কটিতেই ঈদের জামাত হয়। ঈদের জামাতের পর শুরু হয় কোরবানি। নির্দিষ্ট গ্রোসারিতে অথবা পশুর খামারেই সাধারণত কোরবানি করে সেখানকার মুসলমানরা। গ্রোসারিতে কোরবানি করলে কোরবানিদাতার নাম, বাবার নাম আর অর্থ দিয়ে আসতে হয়। তারাই কোরবানি করে গোশত প্যাকেটে করে রেখে দেয়। গ্রোসারিতে খোলা ময়দানে নিজ হাতে কোরবানির আমেজ পাওয়া যায় না বলে অনেকে ঈদ জামাত শেষে কোরবানি করার জন্য পশুর খামারে চলে যায়। সেখান থেকে পছন্দমতো পশু কিনে খোলা আকাশের নিচে নিজ হাতে কোরবানি দেয়। খামারে ইসলামী পদ্ধতিতে জবাই করে দেওয়ার জন্যও লোক থাকে। খামার ও গ্রোসারি ছাড়াও বিভিন্ন শহরে খোলা ময়দানে কোরবানির অনুমতি দেওয়া হয়। নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, মিশিগানসহ কিছু এলাকায় খোলা ময়দানে কোরবানির সুযোগ থাকে।

 

রাশিয়া

রাশিয়ার দুই কোটি মুসলমানের ২০ লাখই বাস করে মস্কোতে। রাজধানী মস্কোতে ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালিত হয় ঈদুল আজহা। গেল বছর নগর কর্তৃপক্ষ দুটি পার্কে ঈদের জামাত আয়োজন করায় মস্কোতেও এসেছে খোলা ময়দানে জামাতের আমেজ। মস্কোর ৩৯টি মসজিদে ঈদ জামাতের ব্যবস্থা হয়েছে। গেল ঈদুল ফিতরে কাজান স্টেডিয়ামে বিশাল ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম অধ্যুষিত তিনটি প্রদেশে ঈদ উপলক্ষে এক দিনের সরকারি ছুটি থাকে। কোরবানির জন্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে আগেই বুকিং দিয়ে রাখতে হয়। ঈদের জামাতের পর রাশিয়ার মুসলমানরা নগরের বাইরের নির্দিষ্ট স্থান অথবা খামারে গিয়ে কোরবানি করে।

 

সিঙ্গাপুর

সিঙ্গাপুরের মোট জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ মুসলমান। প্রতিটি এলাকায়ই কিছু মুসলমানের বাস রয়েছে। মুসলমানদের আলাদা এলাকাও রয়েছে। সেখানে কোরবানির প্রায় তিন মাস আগে কোরবানির পশুর জন্য নিকটতম কোনো মসজিদের মাধ্যমে দরখাস্ত করতে হয়। সরকার অস্ট্রেলিয়া থেকে পশু এনে সেই মসজিদে হস্তান্তর করে। কোরবানিদাতা মসজিদের কাছে কোরবানি করে গোশতের কিছু অংশ নিজের জন্য নিয়ে আসে বাকিটা অন্য মুসলমানদের জন্য মসজিদেই রেখে আসে। মসজিদ থেকেই এই গোশত গরিবসহ অন্য মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

 

মন্তব্য