kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দশম শ্রেণি : বাংলা দ্বিতীয় পত্র

মো. নূরুন্নবী বাবু, সহকারী শিক্ষক, শাহজাহানপুর রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দশম শ্রেণি  : বাংলা দ্বিতীয় পত্র

প্র ব ন্ধ

পরিবেশদূষণ ও তার প্রতিকার

 

     ভূমিকা

     প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশে একদিন জীবন সঞ্চার হয়েছিল এ পৃথিবীর বুকে। বায়ুমণ্ডলে তখন প্রাণের বন্ধু অক্সিজেনের অভাব ছিল না। খাদ্য-জলে ছিল সতেজ বিশুদ্ধতা। ফলে পৃথিবীতে জীবনের দ্রুত বিকাশ সম্ভব হয়েছিল। এলো উন্নত মস্তিষ্কের মানুষ। অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সে নির্বিচারে প্রকৃতি-সংহারকে মূল হাতিয়ার করল। বিজ্ঞানের নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পৃথিবীতে ডেকে আনা হলো অতি যান্ত্রিকতা। বায়ুমণ্ডলে আজ আর নেই সেই প্রথম দিনের বিশুদ্ধতার প্রতিশ্রুতি। পরিবেশে নেই জীবনের সুনিশ্চিত আশ্বাস। নির্বিচারে প্রকৃতি ধ্বংস এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন পরিবেশদূষণের মধ্য দিয়ে মানুষ তাদের গড়া এই সুন্দর পৃথিবীতে ডেকে এনেছে এক সর্বব্যাপী ক্ষয় ও অবক্ষয়ের মহামারি। কবির ভাষায়—

     ‘মানুষ আত্মভেদী, আত্মনাশী নীল পতঙ্গ/একদিন পাঁজরের হাড় দিয়ে গড়েছিল, পৃথিবী

     একদিন মানুষই ধ্বংস করবে তাকে।’

 

     পরিবেশদূষণ কী  ইউনেসকো, Earth summit and internatioal relations-এর দৃষ্টিতে পৃথিবী নামের গ্রহের প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা, যা আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে তাকে পরিবেশদূষণ বলা হয়।

     পরিবেশদূষণের সূত্রপাত প্রাচীন পৃথিবীতে আগুন আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই সূচিত হয় প্রাণের ধাত্রী অক্সিজেনের ধ্বংসলীলা। এই কাজের পাশাপাশি শিল্প বিপ্লব পরিবেশের প্রতি সবচেয়ে বড় আঘাত হানে। তবে বর্তমানে পরিবেশদূষণের প্রভাবকগুলো যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। ফলে পৃথিবীর পরিবেশ ক্রমেই খারাপের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

 

     পরিবেশদূষণের কারণ

     ১৯৬৯ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্য তিনটি কারণ চিহ্নিত করেন।

     এগুলো হলো—

     ক. জনসংখ্যা বিস্ফোরণ

     খ. নগরায়ণ ও

     গ. নতুন প্রযুক্তির প্রভাব।

     তবে বিংশ শতাব্দীর শেষে পরিবেশবিজ্ঞানীরা এর যেসব কারণ চিহ্নিত করেছেন, সেগুলো হলো :

     ক. জনসংখ্যা : জনসংখ্যার চাপ একটি লোকালয়ে কতটুকু ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঢাকা মহনগরী। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরীতে পরিণত হয়েছে।

     খ. বৃক্ষনিধন ও মরুকরণ : সুস্থ পরিবেশের জন্য কোনো ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা খুবই জরুরি, যা পৃথিবীর বহু দেশেই নেই। বর্তমানে বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ নিধনের হার ১:৩। অর্থাৎ প্রতিবছর গড়ে ৬০ লাখ বৃক্ষ উজাড় হচ্ছে।

     গ. রাসায়নিক দ্রব্য ও কীটনাশক ব্যবহার : উন্নত ও অধিক ফসল ফলানোর জন্য কৃষকরা অপরিকল্পিতভাবে জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করে থাকে। এর ফলে জীবজগৎ ও পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের অনিয়ন্ত্রিত ও ইচ্ছাধীন ব্যবহার এবং প্রয়োগও পরিবেশদূষণের কারণ।

     ঘ. বায়ুদূষণ : কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ যেমন পানিদূষণে মূল ভূমিকা রাখে, তেমনি এর কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণেও ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া গাড়ির কালো ধোঁয়াও বায়ুদূষণের প্রধান কারণের একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযাীয় বাতাসে ভাসমান বস্তুকণার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ২০০-৪০০ মাইক্রোগ্রাম। অথচ ঢাকার গড় পরিমাণ ৭০০-১৮০০ মাইক্রোগ্রাম। অন্যদিকে বাতাসে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৩৩৫ পিপিএম। পৃথিবীর বেশির ভাগ শহরে এর মাত্রা ৪০০ পিপিএমের বেশি। এভাবে বায়ুদূষণের ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

     ঙ. পানিদূষণ : পৃথিবীর মোট পানির ৬০ শতাংশই কলুষিত। শিল্প বিপ্লবের পর পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই পানিদূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

 

     চ. শব্দদূষণ : মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নগর-মহানগরের যান্ত্রিকতা বৃদ্ধি পাওয়ায় দূষণ তীব্রতর হচ্ছে, যা পরিবেশকেই দূষিত করছে।

     প্রতিকার

     পরিবেশদূষণ প্রতিরোধকল্পে প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। কিন্তু তা আন্তরিকতাবর্জিত বাকসর্বস্ব এক নিষ্প্রাণ আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বিশ্বের জ্ঞানপাপীর দল বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করে, বিশ্বের পরিবেশদূষণের জন্য অশ্রু বর্ষণ করে, আবার জ্ঞাতসারে সমানে পারিবেশদূষণ করে চলে। এ এক আত্মঘাতী মানসিকতার লক্ষণ। আর অরণ্য নিধন নয়, প্রত্যেক মানুষের জন্য চাই আনুপাতিক অরণ্য সৃষ্টি। কার্বন নিঃসরণের হাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য পুরনো গাড়িগুলো বাতিল করা দরকার। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের রকেট নিক্ষেপ রাসায়নিক ও জীবাণু বোমা এবং পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ নিষিদ্ধ হওয়া দরকার।

     তাই নতুন শতাব্দীর পরিবেশকে নির্মল করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয় রোধে নিম্নের পন্থাগুলো অবলম্বন করতে হবে—

     ক. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে পরিকল্পিত দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে।

     খ. পরিবেশ আইন বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

     গ. পরিবেশ সংরক্ষণে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

     উপসংহার

     আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্যই পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করতে হবে। তা না হলে পরিবেশদূষণজনিত অপমৃত্যু কেউ ঠেকাতে পারবে না। তাই আমাদের আজকের স্লোগান হোক ‘বাঁচ এবং বাঁচতে দাও।’



সাতদিনের সেরা