kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

অষ্টম শ্রেণি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

আফরোজা বেগম, সহকারী শিক্ষক, ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, খিলগাঁও, ঢাকা

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অষ্টম শ্রেণি : বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

ছিয়াত্তরের মন্বন্তর

সৃ জ ন শী ল  প্র শ্ন

প্রথম অধ্যায়

ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম

১।   ‘ফুলপুর’ নামক একটি দেশে একটি বিদেশি কম্পানি ব্যবসা করার উদ্দেশে আসে। কিন্তু উক্ত দেশটির সহজ-সরল মানুষ আর সম্পদের প্রাচুর্যতার কারণে বিদেশি কম্পানিটি লোভী হয়ে ওঠে। তারা তাদের ধূর্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের শাসককে যুদ্ধে পরাজিত করে বিজয় লাভ করে এবং নিজেরাই দেশ শাসন শুরু করে।

 

ক)   প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন কে?

     উত্তর : প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড ক্যানিং।

 

খ)   ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা করো।

     উত্তর : ১১৭৬ সালে বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তা-ই ইতিহাসে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

     ১৭৬৫ সালে দিল্লির সম্রাট শাহ্ আলমের নিকট থেকে দেওয়ানি লাভের পর লর্ড ক্লাইভ দ্বৈত শাসন প্রবর্তনের মাধ্যমে ইংরেজদের হাতে রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা দান করলে ইংরেজ কর্মচারীরা প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত কর আদায়ে চাপ সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত করের চাপে জনগণ ও কৃষকের নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা হয়। সে সময় দেশে পর পর তিন বছর অনাবৃষ্টির ফলে খরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬) বাংলায় নেমে আসে দুর্ভিক্ষের করাল ছায়া। এতে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়। ইতিহাসে এটি ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত।

 

গ)   উদ্দীপকে কোন কম্পানির ইঙ্গিত রয়েছে? উক্ত কম্পানি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করো।

     উত্তর : উদ্দীপকে ‘দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’র ইঙ্গিত রয়েছে।

     বাণিজ্য বিস্তারের যুগে ইউরোপের প্রভাবশালী নৌশক্তির অধিকারী দেশগুলো সম্পদের সন্ধানে বহির্বিশ্বে বেরিয়ে পড়ে। তাদের বেশির ভাগের লক্ষ্য ছিল পূর্বদেশসমূহ বিশেষত ভারতবর্ষ। এই উদ্দেশে ১৬০০ সালে ইংল্যান্ডে স্থাপিত হয় ‘দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’। এই কম্পানি ১৬৫১ সালে হুগলিতে এবং ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে।

     উদ্দীপকে উল্লিখিত ‘ফুলপুর’ নামক দেশে একটি বিদেশি কম্পানি ব্যবসা করতে এলেও দেশটির সহজ-সরল মানুষ আর সম্পদের প্রাচুর্যতার কারণে তারা লোভী হয়ে দেশের শাসককে যুদ্ধে পরাজিত করে নিজেরাই দেশ শাসন করে। এখানে ‘ফুলপুর’ নামক দেশটি দ্বারা ভারতবর্ষকে এবং বিদেশি কম্পানি দ্বারা ‘দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’কে ইঙ্গিত করা হয়েছে। ইংরেজ আমলের অনেক আগে থেকেই ভারতবর্ষে, বিশেষ করে বাংলায় বহিরাগত শক্তি প্রবেশ করেছিল। ধন-সম্পদের আকর্ষণের কারণেই সবার দৃষ্টি ছিল বাংলার দিকে। বাংলার প্রাচুর্যতার কারণেই কম্পানিটি ধীরে ধীরে এ দেশে তাদের প্রতিপত্তি বাড়িয়ে নবাবের দরবারে প্রভাব বিস্তারের মতো ক্ষমতা ভোগ করতে শুরু করে। ১৭৫৬ সালে আলিবর্দি খাঁর মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রভাবশালী ও অভিজাত ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে তারা ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে এই কম্পানিটি বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করে।

 

ঘ)   ধূর্ত পরিকল্পনাই কি বিদেশি  কম্পানিটির বিজয়ের একমাত্র কারণ ছিল? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।

     উত্তর : ধূর্ত পরিকল্পনাই বিদেশি কম্পানিটির অর্থাৎ ‘দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি’টির বিজয়ের একমাত্র কারণ ছিল না, এর পেছনে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

     ১৬০০ সালে ইল্যান্ডে স্থাপিত হয় দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি। এটি প্রথমে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাংলায় প্রবেশ করে এবং ১৬৫১ সালে হুগলিতে, ১৬৫৮ সালে কাশিমবাজারে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে। এই কম্পানির লোকজন অর্থাৎ ইংরেজরা ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। অন্যান্য দেশের কম্পানিগুলো তাদের ধূর্ততার কাছে টিকে থাকতে না পেরে ভারতবর্ষ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। একসময় ইংরেজ  কম্পানি বাংলায় ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করে।

     উদ্দীপকে উল্লিখিত ‘ফুলপুর’ নামক দেশে একটি বিদেশি কম্পানি ব্যবসা করতে এলেও দেশটির সহজ-সরল মানুষ আর সম্পদের প্রাচুর্যতার কারণে তারা লোভী হয়ে দেশের শাসককে যুদ্ধে পরাজিত করে নিজেরাই দেশ শাসন করে। এখানে ফুলপুর দেশটি দ্বারা ভারতবর্ষকে এবং বিদেশি কম্পানি দ্বারা দ্য ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। কম্পানিটি অর্থাৎ ইংরেজরা ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে বাংলায় ব্রিটিশ শাসনের সূচনা করে।

     ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-ওড়িশার নবাবের পরাজয় ও নির্মম মৃত্যু এবং ইংরেজদের হাতে বাংলার পতন হয়। তখন থেকেই শুরু হয় বাংলার ইতিহাসে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসনের কাল। শুধু ইংরেজদের ধূর্ত পরিকল্পনা তাদের বিজয়ের একমাত্র কারণ ছিল না, এর পেছনে আরো কিছু কারণ ছিল। উল্লেখযোগ্য কারণগুলো হলো—

 

১।   ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমল ছাড়া বহিরাগত শাসকদের সময়ে বাংলার মানুষ চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়। এতে  তারা শাসকদের প্রতি ছিল উদাসীন। ফলে ইংরেজ আক্রমণে নবাবের পতন বা স্বাধীনতার অবসান সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা বা আগ্রহ ছিল না।

২।   দীর্ঘকাল ধরে পুঁজি পাচারের ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অবস্থা ছিল শোচনীয়। বাণিজ্য বিস্তারের ফলে সৃষ্ট নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর মতো উদ্দীপনা তাদের মধ্যে ছিল না।

৩।   উদীয়মান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে ইংরেজদের উত্তরোত্তর শক্তি বৃদ্ধি, তাদের ধূর্ত পরিকল্পনা বোঝার মতো কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি দেশে ছিল না।

৪।   বাংলার শাসকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও চক্রান্ত এত গভীর ছিল যে তরুণ অনভিজ্ঞ সিরাজের পক্ষে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। এসব কারণে ইংরেজরা বিজয় লাভ করেছিল এবং এ দেশে ঔপনিবেশিক শাসনের সূচনা করতে পেরেছিল। তাই বলা যায়, শুধু ইংরেজদের ধূর্ত পরিকল্পনা তাদের বিজয়ের একমাত্র কারণ ছিল না; বরং আরো কিছু কারণ বিদ্যমান ছিল।