kalerkantho

বুধবার। ৬ মাঘ ১৪২৭। ২০ জানুয়ারি ২০২১। ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

নবম শ্রেণি ► বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের নমুনা অ্যাসাইনমেন্ট-১ তৈরি করেছেন ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের সহকারী শিক্ষক আফরোজা বেগম

২৮ নভেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নবম শ্রেণি ► বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অঙ্কন : প্রসূন হালদার

তোমরা নিশ্চয়ই অবগত আছ যে ‘কভিড-১৯’ মহামারির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্তৃক সংক্ষিপ্ত ও পুনর্বিন্যাসকৃত সিলেবাসের আলোকে অ্যাসাইনমেন্টের মাধ্যমে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওই মূল্যায়নের মাধ্যমে তোমাদের অর্জিত শিখনফলের দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী ক্লাসে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তাই নির্দেশিত অ্যাসাইনমেন্টটি ভালো মানের করার জন্য নিচের বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখবে।
            ♦ বিষয়বস্তুর সঠিকতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে।
            ♦ লেখায় তথ্য, তত্ত্ব, সূত্র ও ব্যাখ্যা পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
            ♦ নিজস্বতা ও সৃজনশীলতা বজায় রাখবে।

অ্যা সা ই ন মে ন্ট - ১

কাজ-২

[পূর্ব প্রকাশের পর]

স্বাধীন বাংলাদেশ

১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা লাভের জন্য বাঙালিরা অনেক দুঃখকষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণের হাত থেকে মুক্তি লাভের আশায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আওয়ামী লীগকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দেয়। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা প্রদানের ক্ষেত্রে নানা রকম ষড়যন্ত্র শুরু করে।

১৯৭১ সালের মার্চ

পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণে জনগণকে মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র জনগণের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ।

১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং স্বাধীনতার সাংবিধানিক ঘোষণাপত্র গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। দীর্ঘ ৯ মাস এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ৯৩ হাজার সদস্য ওই দিন আত্মসমর্পণ করে। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম ‘বাংলাদেশ’ নামের রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটে। স্বাধীনতা লাভের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারকে মোকাবেলা করতে হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বঙ্গবন্ধুর শাসনামল

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হতে থাকে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং সরকারপ্রধানের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সামগ্রিক পুনর্গঠন, ভারতে অবস্থানরত এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, সংবিধান প্রণয়ন, নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠান, ভারতের মিত্রবাহিনীর সদস্যদের ফেরত পাঠানো, বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায় ইত্যাদি তার শাসন আমলের উল্লেখযোগ্য অর্জন।

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া

বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন চারদিকে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা, কান্না, হাহাকার আর ধ্বংসযজ্ঞ। রাষ্ট্রীয় কোষাগার ছিল অর্থশূন্য। ৩০ লাখ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে এক কোটি শরণার্থীর পুনর্বাসন, গ্রামগঞ্জের লাখ লাখ ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ, সর্বোপরি সাড়ে সাত কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানের চাহিদা পূরণ এবং আইন-শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল সদ্যঃস্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়েই শুরু হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল। এ ক্ষেত্রে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করেছেন তাহলো—

নতুন সংবিধান প্রণয়ন কার্যকর করা

১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী সংবিধান আদেশ জারি করেন। ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ৩৪ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘খসড়া সংবিধান প্রণয়ন’ কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটি ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান বিল আকারে গণপরিষদে পেশ করে।  ৪ নভেম্বর উক্ত সংবিধান গণপরিষদে গৃহীত হয় এবং ১৬ই ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়।

গণপরিষদ

১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু ‘বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ’ নামে একটি আদেশ জারি করেন। এই আদেশবলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা গণপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হন। ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় আইন-কানুন পাস ও কার্যকর করা সম্ভব হয়।

পরিত্যক্ত কারখানা জাতীয়করণ

স্বাধীনতার পর আদমজীসহ বিভিন্ন কল-কারখানার পাকিস্তানি অবাঙালি শিল্পপতিরা বাংলাদেশ ত্যাগ করলে বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালে সেগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানায় এনে বাংলাদেশের সম্পদে পরিণত করেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ

পাকিস্তান আমলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সরকারের কাছ থেকে যৎসামান্য বেতন-ভাতা পেতেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় ৩৮ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয় করেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭২ সালে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। এই কমিটি ১৯৭৪ সালে একটি গণমুখী বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষানীতির রূপরেখা উপস্থাপন করে। এভাবে বঙ্গবন্ধুর সরকার দেশের জন্য একটি যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।

রিলিফ প্রদান রেশনিং প্রথা

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও মানুষকে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত কম্বল, খাদ্যদ্রব্য ও অর্থ সাহায্য বণ্টন করেন। এ ছাড়া শহর ও গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপকভাবে ন্যায্য মূল্যে খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী কেনার জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করেন।

১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচন

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠিত হয়।

শোষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি

মুক্তিযুদ্ধে সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশ যখন ব্যস্ত, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্য ও তেলের দাম বেড়ে যায়। ১৯৭৩-৭৪ সালে বন্যায় দেশে খাদ্যোৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। এসবের ফলে দেশে খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়। সর্বোপরি দেশের ভেতরে মজুদদার, দুর্নীতিবাজ ও ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী তৎপর হতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর সরকার জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও শোষণহীন সমাজ গঠনের লক্ষ্যে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ ‘বাকশাল’ গঠন করে। গণমানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু নতুন একটি ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেন। এটিকে জাতির পিতা ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেন।

পররাষ্ট্রনীতি

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘বাংলাদেশ শান্তিতে বিশ্বাস করে, কারো প্রতি বৈরী আচরণ সমর্থন করবে না।’ তিনি স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়।’ আর এ নীতির ভিত্তিতেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয়েছে। তিনি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান ও পুনর্গঠনে সহযোগিতা দেওয়ারর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ করেন। স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৪০টি দেশ বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ফেরত যাওয়া

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সেনাবাহিনী মিত্রবাহিনী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলকে অপপ্রচারের সুযোগ না দিয়ে বঙ্গবন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সরকারকে মিত্রবাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেন। ফলে ১৯৭২ সালের মার্চ মাসেই মিত্রবাহিনী ভারতে ফিরে যায়।

আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশ

১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের এবং ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে। বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলায় প্রথম ভাষণ দেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনেও সদস্য পদ লাভ করে। বিশ্ব শান্তি পরিষদ বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে। বঙ্গবন্ধুর সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানের মর্যাদা লাভ করে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের হাল ধরতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারকে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করতে হয়। এর মধ্যেও স্বল্প সময়ে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা