kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

এসএসসি প্রস্তুতি ► বাংলা প্রথম পত্র

লুৎফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



রচনা

বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্য

সূচনা : ষড়ঋতুর লীলা নিকেতন আমাদের এই বাংলাদেশ। একের পর এক তাদের আগমন, লীলাখেলা ও অন্তর্ধান আমাদের বিস্মিত, আনন্দিত ও মুগ্ধ করে। তাদের আবির্ভাব যেমন রহস্যময় ও উপভোগ্য, তেমনি অন্তর্ধানও আকস্মিক। ঋতুগুলো যেন অদৃশ্য কোনো শিল্পীর সুদক্ষ পরিচালনায় আবির্ভূত হয়ে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে আবেগ, আনন্দ-উল্লাস জাগিয়ে তোলে। কবির ভাষায়—

ঋতুর দল নাচিয়া চলে, ভরিয়া ডালি ফুলে ও ফলে।

ঋতুর ক্রম : রুক্ষ জলবায়ুর বিবর্তনে ছয়টি ঋতু এ দেশের প্রকৃতিতে আবির্ভূত হলেও এদের স্থায়িত্বকাল আগের মতো সমান নয়। তার পরও ছয়টি ঋতুতেই প্রকৃতি নতুন রূপে সাজে। সে সাজ কখনো রুদ্র, রুক্ষ, শুষ্ক, সবুজ-শ্যামল, কখনো বা ফুলে-ফলে শোভিত। ঋতুগুলোর বৈশিষ্ট্য, সৌন্দর্য সম্ভার আলাদা হলেও এক অদৃশ্য গতির শৃঙ্খলে সবাই বাঁধা।

গ্রীষ্ম :   ঘাম ঝরে দরদর গ্রীষ্মের দুপুরে

            মাঠ-ঘাট চৌচির, জল নেই পুকুরে

            রোদ যেন নয় শুধু গনগনে ফুলকি

            আগুনের ঘোড়া যেন ছুটে চলে দুলকি।

ঋতুচক্রের শুরুতেই গ্রীষ্ম আসে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এ মাস দুটি নিয়ে। সূর্য তাপের প্রখরতায় তার আত্মপ্রকাশ। দারুণ অগ্নিবাণে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলতেই যেন তার আবির্ভাব। কালবৈশাখীর দুরন্ত ঝাপটায় পুরনো জীর্ণজরাকে ঝরিয়ে দেওয়ার দুর্বার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে আসে। প্রচণ্ড গরমে প্রাণিকুল যখন বৃষ্টি বিন্দুর জন্য ছটফট করতে থাকে, তখন কালবৈশাখীর মত্ত ঝাপটার সঙ্গে বৃষ্টিও আসে। গ্রীষ্মের দাবদাহ তাতে ক্ষণিকের জন্য কমলেও এ ঋতুতে শারীরিক স্বস্তিবোধ আসে না। কবির ভাষায়—

            ঝাঁঝ মাখা হাওয়া এসে ডালে দেয় ঝাপটা

            পাতা নাড়ে, ফুল পড়ে বাপরে কী দাপটা।

তবে গ্রীষ্ম শুধু উত্তাপই দেয় না, আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, তরমুজের মতো রসাল ফলে আমাদের মন-প্রাণ ভরিয়ে দেয়।

বর্ষা :    জল ঝরে, জল ঝরে, সারা দিন, সারা রাত

            অফুরান নামতায় বাদলের ধারাপাত

            (শ্রাবণে — সুকুমার রায়)

আষাঢ়-শ্রাবণ মাস নিয়ে বর্ষা আসে দিগ্বিজয়ী বীরের মতো কালো মেঘের পিঠে সওয়ার হয়ে, বজ্রের ডামাডোল বাজিয়ে, বিদ্যুতের নিশান উড়িয়ে। বর্ষার এই সাড়ম্বর আগমনে প্রকৃতির সর্বত্র বিপুল সাড়া জাগে। গ্রীষ্মের দাবদাহকে দূরে সরিয়ে ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যে প্রকৃতিকে ভরিয়ে দেয়, তৃষিত ধরিত্রীকে শ্যামলতা-সবুজতায় রাঙিয়ে দেয়। বর্ষার এ রূপসম্ভারে বিমুগ্ধ হয়ে কবি বলে উঠেছেন—

      বৃষ্টি এলো...বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি। পদ্মা-মেঘনার

      দুপাশে আবাদি গ্রামে, বৃষ্টি এলো পুবের হাওয়ায়।

      বিদগ্ধ আকাশ, মাঠ ঢেকে গেল কাজল ছায়ায়।

      বিদ্যুৎ রূপসী পরী মেঘে মেঘে হয়েছে সওয়ার

      (বৃষ্টি : ফররুখ আহমদ)

বর্ষার বদৌলতে আমাদের শ্রেষ্ঠ ফসল ধান-পাট প্রভৃতি সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে যেমন হাজির হয়, তেমনি খেয়ালি বর্ষা কোথাও অতিবর্ষণে বন্যা এনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে নানাভাবে বিঘ্নিত করে। তার এ খেয়ালিপনার সুযোগ নিয়ে রোগশোকের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্দশার অন্ত থাকে না। কবির ভাষায়—

            বর্ষাকালে পল্লিভাসে চতুর্দিকে বারি

            বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, দেয় না খেয়া পাড়ি।

বর্ষা তাই একটা বিচিত্র ঋতু, যার স্বভাবের মধ্যে রয়েছে স্ববিরোধিতা। একদিকে সে নিয়ে আসে মানুষের জন্য আশা, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশ্বাস, আবার অন্যদিকে এনে দেয় চরম হতাশা, দুঃখ ও কষ্ট।

শরৎ : আজিকে তোমার মধুর মুরতি

       হেরিনু শারদ প্রভাতে;

       হে মাতঃ বঙ্গ! শ্যামল অঙ্গ

ঝলিছে অমল শোভাতে।

পারে না বহিতে নদী জলধার

মাঠে মাঠে ধান ধরে না ক আর।

ডাকিছে দোয়েল গাহিছে কোয়েল

তোমার কানন সভাতে;

মাঝখানে তুমি দাঁড়ায়ে জননী

শরৎকালের প্রভাতে।

 (কল্পনা : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

ভাদ্র-আশ্বিন মাস নিয়ে শরৎ আসে বর্ষার সমস্ত সৌন্দর্যকে ধারণ করে, অর্থাৎ বর্ষার কালো মেঘ শরতের নীল আকাশে সাদা পাল তুলে ছুটে বেড়ায়। শরতে স্নিগ্ধ সূর্য কিরণে মাঠ-ঘাট, নদ-নদী ঝলমল করতে থাকে। নদীতীরে ফোটে কালফুল, সুনীল আকাশের ছায়া পড়ে শান্ত নদীর বুকে, শিশির ভেজা শিউলি ফুল অনুপম সৌন্দর্য নিয়ে হাসে ঘাসের বুকে। রাতের আকাশে বসে লাখো তারার মেলা। শরতের রূপে প্রকৃতি হয় পরিপূর্ণ। তাইতো শরৎ রূপের রানি। কবির ভাষায়—

আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই, লুকোচুরির খেলা।

নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা রে ভাই... লুকোচুরির খেলা।

আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে... উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে;

আজ কিসের তরে নদীর চরে চখা-চখীর মেলা।

 (প্রকৃতি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

হেমন্ত : এইতো হেমন্ত দিন, দিল নব ফসল সম্ভার,

        অঙ্গনে অঙ্গনে ভরি, এই রূপ আমার বাংলার

        রিক্তের অঞ্চল ভরি, হাসি ভরি, ক্ষুধার্তের মুখে

        (সুফিয়া কামাল)

ঋতুর রানি শরতের তিরোভাবের পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস নিয়ে হিমের ঘন ঘোমটায় আবৃত হয়ে হাজির হয় হেমন্ত। ঘরে ঘরে ফসলের সওগাত বিলিয়ে দেওয়ার জন্যই যেন হেমন্তের আগমন ও অবস্থান। নিজেকে উজাড় করে দেওয়াই যেন হেমন্তের ব্রত। পুরো দুই মাস ধরেই এ ঋতু নতুন ধানের নবান্ন মানুষের হাতে তুলে দেয়।

শীত : হিম হিম শীত শীত

       শীত বুড়ি এলো রে;

       কনকনে ঠাণ্ডায় দম বুঝি গেল রে।

পৌষ ও মাঘ মাস নিয়ে গঠিত শীত ঋতু যেন হেমন্তেরই প্রগাঢ়তর রূপ। কুয়াশার আবরণে প্রকৃতির রূপ ঢেকে দিয়ে শীত একে একে তার সব আভরণ খুলে ফেলে দিয়ে যেন বৈরাগ্যের ব্রত উদ্্যাপন করে। এ সময় গাছপালা পত্রপল্লবহীন হয়ে পড়ে। শীতের হিমেল ছোঁয়া কষ্টকর হলেও গ্রীষ্মের প্রখরতার মতো তা মানুষকে পোড়ায় না; বরং শীতকালে রোদ মানুষের দেহে-মনে আনন্দের পরশ বুলিয়ে দেয়। অঢেল খাদ্যশস্য ও টাটকা শাকসবজি শীতের উপহার। পৌষের পিঠাপুলি, মাঘের খেজুরের রস জীবনের আনন্দকে অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। শীতের হিমেল হাওয়া গাঢ় কুয়াশা যদিও গরিব মানুষের জন্য দুঃসহ, তবু শীত মানুষের পছন্দের ঋতু।

বসন্ত : ঋতুচক্রের শেষ ঋতু বসন্ত আসে ফাল্গুন-চৈত্র মাস নিয়ে, শীতকে বিদায় দিয়ে। এ ঋতু আসে নবীন প্রাণ, নবীন উৎসাহ-উদ্দীপনা ও যৌবনের সঞ্জীবনী সুধা নিয়ে। তার পরশে জেগে ওঠে গাছে গাছে নতুন পাতা, পাখির কলকাকলিতে মুখর হয় আকাশ-বাতাস। কোকিলের কুহু কুহু ধ্বনিতে মানুষের মনে জাগে আনন্দের স্পন্দন। ভ্রমরের গুঞ্জনে মুখর হয় ফুলবাগান। ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায় নানা রঙের প্রজাপতি। অশোক, পলাশ-কৃষ্ণচূড়া মধুমালতীর গন্ধে প্রকৃতির রাজ্যে শুধু হয় মাতামাতি। ঋতুরাজ বসন্তের রূপে মুগ্ধ কবি তাই গেয়ে উঠেন—

আহা, আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে,

এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়।

 (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

উপসংহার : বাংলাদেশের ঋতুচক্র তার রং, রূপ ও বৈচিত্র্যে পরিপূর্ণ করে তোলে এ দেশের প্রকৃতিকে। এ দেশের মানুষের মন তাই বিভিন্ন ঋতুতে নানা রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ঋতুচক্রের মহিমায়, এ দেশ তাই সুখ-সৌন্দর্য ও শান্তির নিকেতন। তাই কবি আবারও বলে ওঠেন—

এমন স্নিগ্ধ নদী কাহার, কোথায় এমন ধুম্র পাহাড়;

কোথায় এমন হরিেক্ষত্র আকাশ তলে মেশে।

এমন ধানের ওপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে।

পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখী; কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি

গুঞ্জরিয়া আসে অলিপুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে—

তারা ফুলের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে।

এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি

সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি।

 (ধনধান্য পুষ্পভরা : দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা