kalerkantho

নবম-দশম শ্রেণি

বাংলা দ্বিতীয় পত্র

লুৎফা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা, ঢাকা

১০ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলা দ্বিতীয় পত্র

সারাংশ

১. নিন্দা না থাকিলে পৃথিবীতে জীবনের গৌরব কি থাকিত? একটা ভালো কাজে হাত দিলাম, তাহার নিন্দা কেহ করে না, সেই ভালো কাজের দাম কী? একটা ভালো কিছু শিখিলাম, তাহার নিন্দুক কেহ নাই, ভালো গ্রন্থের পক্ষে এমন মর্মান্তিক অনাদর কী হইতে পারে? জীবনকে ধর্মচর্চায় উৎসর্গ করিলাম, যদি কোনো মন্দ লোক তাহার মধ্যে মন্দ অভিপ্রায় না দেখিল, তবে সাধুতা যে নিতান্তই সহজ হইয়া পড়িল। মহত্ত্বকে পদে পদে নিন্দার কাঁটা মাড়াইয়া চলিতে হয়। ইহাতে যে হার মানে, বীরের সংগতি সে লাভ করে না। পৃথিবীতে নিন্দা দোষীকে সংশোধন করিবার জন্য আছে তাহা নহে; মহত্ত্বকে গৌরব দেওয়া তাহার একটা মস্ত কাজ।

সারাংশ : মানবজীবনকে সুন্দর, সফল ও গৌরবময় করার জন্য নিন্দা বা বিরূপ সমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো কাজ, উত্তম গ্রন্থ, মহৎ ধর্ম চর্চা—সব কিছুকেই নিন্দার কষ্টিপাথরে যাচাই করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হয়। নিন্দার মাধ্যমেই ভালো কাজ পায় গৌরবজনক স্বীকৃতি। নিন্দুকের সমালোচনার মাধ্যমেই ভুলত্রুটি সংশোধিত হয়। নিন্দা যেমন দোষীকে সংশোধনের সুযোগ দেয়, তেমনই মহত্ত্বের গৌরব প্রকাশ করে থাকে। তাই নিন্দার কাছে হার মানলে গৌরবের জয়মাল্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২. মানুষ সৃষ্টির সেরা প্রাণী। জগতের অন্যান্য প্রাণীর সহিত মানুষের পার্থক্যের কারণ মানুষ বিবেক ও বুদ্ধির অধিকারী। এই বিবেক, বুদ্ধি ও জ্ঞান নাই বলিয়া আর সকল প্রাণী মানুষ অপেক্ষা নিকৃষ্ট। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের উৎকর্ষ সাধন করিয়া মানুষ জগতের বুকে অক্ষয় কীর্তি স্থাপন করিয়াছে, জগতের কল্যাণ সাধন করিতেছে। পশুবল ও অর্থবল মানুষকে বড় বা মহৎ করিতে পারে না। মানুষ বড় হয় জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের বিকাশে। জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের প্রকৃত বিকাশে জাতির জীবন উন্নত হয়। প্রকৃত মানুষই জাতীয় জীবনের প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন আনয়নে সক্ষম।

সারাংশ : পশুবল কিংবা অর্থবল দুটিই মনুষ্যত্ব বিকাশের অন্তরায়। জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেকের অধিকারী বলে মানুষ সৃষ্টির সেরা প্রাণী। জ্ঞান, বুদ্ধি ও মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশের মাধ্যমে মানুষ হয়ে ওঠে যথার্থ মানুষ। আর এ জন্যই জগতে মানুষের কীর্তি অক্ষয় ও অম্লান। তাই জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নে প্রত্যেক মানুষেরই উচিত জ্ঞান ও মনুষ্যত্বের অনুশীলন করা।

৩. জাতি শুধু বাইরের ঐশ্বর্য সম্ভার, দালানকোঠার সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সামরিক শক্তির অপরাজেয়তায় বড় হয় না, বড় হয় অন্তরের শক্তিতে, নৈতিক চেতনায় আর জীবন পণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়। জীবনের মূল্যবোধ ছাড়া জাতীয় সত্তার ভিত কখনো শক্ত আর দুর্মূল্য হতে পারে না। মূল্যবোধ জীবনাশ্রয়ী হয়ে জাতির সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়লেই তবে জাতি অর্জন করে মহত্ত্ব আর কর্মের যোগ্যতা। সব রকম মূল্যবোধের বৃহত্তম বাহন ভাষা, তথা মাতৃভাষা, আর তা ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব লেখক আর সাহিত্যিকদের।

সারাংশ : কোনো দেশ বা জাতির সম্মান বাইরের ঐশ্বর্য-সম্ভার, দালানকোঠার সংখ্যা বৃদ্ধি কিংবা সামরিক শক্তির অপরাজেয়তায় বড় হয় না। অন্তরের এই ঐশ্বর্যের অন্য নাম সামাজিক মূল্যবোধ। মনের ঐশ্বর্য এবং জীবনাশ্রয়ী এই মূল্যবোধ জাতিকে পৌঁছায় সম্মানের উচ্চ শিখরে। আর এই মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীনতায় ও নৈতিক চেতনায়। সব রকম মূল্যবোধের বৃহত্তম বাহন মাতৃভাষা। তাই জাতির ভিত্তিকে দৃঢ় করতে হলে এই মূল্যবোধের প্রসার দরকার, যা মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বত্র সঞ্চারিত করার দায়িত্ব লেখক এবং সাহিত্যিকরাই নিতে পারেন।

সামান্য পিপীলিকা থেকে মৌমাছি পর্যন্ত সবাই ভবিষ্যেক গুরুত্ব দেয়। ভবিষ্যতের মাঝেই লুকিয়ে আছে নিজেকে সফল করার উপকরণ

৪. অতীতকে ভুলে যাও। অতীতের দুশ্চিন্তার ভার অতীতকেই নিতে হবে। অতীতের কথা ভেবে ভেবে অনেক বোকাই মরেছে। আগামীকালের বোঝা অতীতের বোঝার সঙ্গে মিলে আজকের বোঝা সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। ভবিষ্যেকও অতীতের মতো দৃঢ়ভাবে দূরে সরিয়ে দাও। আজই তো ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যৎকাল বলে কিছু নেই। মানুষের মুক্তির দিন তো আজই। আজই ভবিষ্যতের কথা যে ভাবতে বসে, সে ভোগে শক্তিহীনতায়, মানসিক দুশ্চিন্তায় ও স্নায়বিক দুর্বলতায়। অতএব, অতীতের এবং ভবিষ্যতের দরজায় আগল লাগাও আর শুরু করো দৈনিক জীবন নিয়ে বাঁচতে।

সারাংশ : বর্তমানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে প্রকৃত শক্তি। অতীতের ব্যর্থতার জন্য আক্ষেপ করে কিংবা ভবিষ্যতের সাফল্যের স্বপ্নে বিভোর হয়ে বর্তমানকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। অতীত ও ভবিষ্যতের চিন্তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলে মানুষকে বর্তমানকে কাজে লাগানো উচিত সবচেয়ে বেশি। কারণ বর্তমানের কাজের মধ্যে নিহিত মানুষের ভবিষ্যৎ সুখ ও সমৃদ্ধি।

৫. ভবিষ্যতের ভাবনা ভাবাই হলো জ্ঞানীর কাজ। পিঁপড়ে-মৌমাছি পর্যন্ত যখন ভবিষ্যতের জন্য ব্যতিব্যস্ত, তখন মানুষের কথা বলাই বাহুল্য। ফকির-সন্ন্যাসী যে ঘরবাড়ি ছেড়ে আহার-নিদ্রা ভুলে পাহাড়-জঙ্গলে চোখ বুজে বসে থাকেন, সেটা যদি নিতান্ত গঞ্জিকার কৃপায় না হয়, তবে বলতে হবে ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবে। সব জীবজন্তুর দুটি চোখ সামনে থাকার মানে হলো ভবিষ্যতের দিকে যেন নজর থাকে। অতীতের ভাবনা ভেবে লাভ নেই। পণ্ডিতেরা তো বলে গেছেন, ‘গতস্য শোচনা নাস্তি।’ আর বর্তমান সে তো নেই বললেই চলে। এই যেটা বর্তমান, সেই এই কথা বলতে বলতে অতীত হয়ে গেল। কাজেই তরঙ্গ গোনা আর বর্তমানের চিন্তা করা, সমানই অনর্থক। ভবিষ্যত্টা হলো আসল জিনিস। সেটা কখনো শেষ হয় না। তাই ভবিষ্যতের মানব কেমন হবে, সেটা একবার ভেবে দেখা উচিত।

সারাংশ : জ্ঞানী ও চিন্তাশীল মানুষ ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবেই কাজ করেন। সামান্য পিপীলিকা থেকে মৌমাছি পর্যন্ত সবাই ভবিষ্যেক গুরুত্ব দেয়। ভবিষ্যতের মাঝেই লুকিয়ে আছে নিজেকে সফল করার উপকরণ। অতীত গত আর বর্তমান নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী, তাই অতীতের জন্য অনুশোচনা করে লাভ নেই। ক্ষণস্থায়ী বর্তমান ভেবে ভবিষ্যতের কাজের পরিকল্পনা করে অগ্রসর হওয়াই দূরদর্শিতার লক্ষণ।

৬. আজকের দুনিয়াটা আশ্চর্যভাবে অর্থ বা বিত্তের ওপর নির্ভরশীল। লাভ ও লোভের দুর্নিবার গতি শুধু আগে যাওয়ার নেশায় লক্ষ্যহীন প্রচণ্ড বেগে শুধু আত্মবিনাশের পথে এগিয়ে চলেছে। মানুষ যদি এই মূঢ়তাকে জয় করতে না পারে, তবে মনুষ্যত্ব কথাটাই লোপ পেয়ে যাবে। মানুষের জীবন আজ এমন এক পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে, সেখান থেকে হয়তো নামবার উপায় নেই, এবার উঠবার সিঁড়ি না খুঁজলেই নয়। উঠবার সিঁড়ি না খুঁজে পেলে আমাদের আত্মবিনাশ যে অনিবার্য, তাতে আর কোনো সন্দেহ থাকে না।

সারাংশ : মানুষ বর্তমানে অর্থের নেশায় যতই ধাবিত হচ্ছে, ততই সে আত্মহননের পথে এগিয়ে চলেছে। অর্থ-সম্পদ লাভ ও লোভের দুর্নিবার নেশা আজকের মানুষকে এক চরম অবক্ষয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ পথে এসে পেছনে ফেরার পথ নেই। তাই এই মরণনেশা থেকে নিজেকে সংযত করতে না পারলে মানুষের মনুষ্যত্ব কথাটাই হয়তো লোপ পেয়ে যাবে।

মন্তব্য