kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

উপকূলীয় জনজীবন বাঁচান

নোনা পানির আগ্রাসন

২০ নভেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, অধিক হারে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে থাকা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা অভিঘাত মোকাবেলা করছে সারা পৃথিবী। বাংলাদেশের মতো কিছু দেশে এই অভিঘাত অনেক ব্যাপক। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি শ্রম ও উৎপাদনশীলতা হারানো পাঁচটি দেশের একটি বাংলাদেশ। কপ২৭ সম্মেলনে উপস্থাপিত ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান অব বাংলাদেশ (২০২৩-২০৫০)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের উপকূলীয় ১৯ জেলার আবাদযোগ্য জমির প্রায় অর্ধেক লবণাক্ততার শিকার হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মৃত্তিকাসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, এর ফলে উপকূলীয় জেলাগুলোতে বছরে খাদ্যশস্য উৎপাদন কম হচ্ছে প্রায় ৩০ লাখ ২৭ হাজার টন। প্রতিনিয়ত বাড়ছে লবণাক্ততার শিকার জমির পরিমাণ। মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও। গতকালের কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে উপকূলীয় মানুষের নানা স্বাস্থ্য সমস্যার কথা।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ যে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে জাতীয় গবেষণায় তো বটেই, আন্তর্জাতিক অনেক গবেষণায়ও তা উঠে এসেছে। এ ক্ষেত্রে ১০টি প্রধান ঝুঁকির অন্যতম হচ্ছে নোনা পানির ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন। উপকূলের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিনির্ভর। স্বাভাবিক জোয়ারেও এখন অনেক বেশি এলাকা তলিয়ে যায়। কৃষিজমি, মাছের ঘের তলিয়ে যায় নোনা পানিতে। ফলে মিঠা পানিনির্ভর ফসল তো বটেই, উদ্ভিদ, মাছসহ জলজ প্রাণীও টিকতে পারছে না। মানুষের স্বাস্থ্যেও মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বাগেরহাট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের এক গবেষণা থেকে জানা যায়, উপকূলীয় এলাকায় প্রতি লিটার পানিতে লবণাক্ততার গ্রহণযোগ্য মাত্রা হচ্ছে এক হাজার মিলিগ্রাম। কিন্তু মোংলায় প্রতি লিটার পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া যায় চার থেকে সাড়ে ৯ হাজার মিলিগ্রাম পর্যন্ত। অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে ৯ গুণ বেশি। ১৯৬২ সালে বাগেরহাটের মোংলা পয়েন্টে পশুর নদের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ ছিল দুই পিপিটি (পার্টস পার থাউজেন্ড), ২০০৮ সালে সেখানে পাওয়া গেছে ২০ পিপিটি। অতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করে মানুষ উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, পেটের পীড়াসহ নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়ছে। এমনকি সেই পানিতে গোসল বা হাঁটাচলা করলেও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ‘রিভার স্যালাইনিটি অ্যান্ড ক্লাইমেট চেঞ্জ এভিডেন্স ফ্রম  কোস্টাল বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালে উপকূলের ১৯ জেলার ১৪৮টি উপজেলার মধ্যে অতি উচ্চমাত্রায় লবণাক্ততার শিকার হবে ১০টি উপজেলা। এ সময়ের মধ্যে লবণাক্ততা, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য জলবায়ুসংক্রান্ত বৈরী প্রভাবের কারণে এ অঞ্চলের এক কোটি ৩৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। শুধু লবণাক্ততা নয়, একই কারণে বাড়ছে খরার প্রকোপও। প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গড়ে প্রতিবছর খরায় ক্ষতির শিকার হচ্ছে প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় ব্যাপক তৎপরতা প্রয়োজন। নোনা পানি ও খরাসহিষ্ণু কৃষি গবেষণা এগিয়ে নিতে হবে। উপকূলীয় বেড়িবাঁধ শক্তিশালী করে ফসল, উপকূলীয় জনজীবন ও চাষাবাদ রক্ষা করতে হবে।



সাতদিনের সেরা