kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

যে শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়

চলে গেলেন তোয়াব খান

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



যে শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়

চলে গেলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক, একাত্তরের কলমযোদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধা তোয়াব খান। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জগতে তাঁর নাম উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধায়।

তোয়াব খান শুধু একটি নাম নয়, ছিলেন সাংবাদিকতায় একটি প্রতিষ্ঠান। খোলা চোখে জগৎ ও জীবনকে দেখতেন বলেই নতুনকে গ্রহণে তাঁর কোনো কুণ্ঠা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

তা সে শব্দ আর ভাষাই হোক কিংবা হোক নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ।

তোয়াব খান সাংবাদিক জীবনের সূচনা করেন ঢাকায় পঞ্চাশের দশকে নতুন সাংবাদিকতার একজন অগ্রদূত হয়ে। দৈনিক সংবাদ ছিল তাঁর প্রথম কর্মক্ষেত্র। ১৯৫৫ সালে তিনি যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। ১৯৬১ সালে তিনি দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক হন। এরপর ১৯৬৪ সালে যোগ দেন দৈনিক পাকিস্তানে। স্বাধীনতার পর দৈনিক পাকিস্তান থেকে বদলে যাওয়া দৈনিক বাংলার প্রথম সম্পাদক ছিলেন তোয়াব খান। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেসসচিব ছিলেন। প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শব্দসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন তোয়াব খান। সে সময় তাঁর আকর্ষণীয় উপস্থাপনায় নিয়মিত প্রচারিত হয় ‘পিণ্ডির প্রলাপ’।

দৈনিক জনকণ্ঠের শুরু থেকে গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত পত্রিকাটির উপদেষ্টা সম্পাদক ছিলেন তিনি। এরপর নতুন আঙ্গিক ও ব্যবস্থাপনায় প্রকাশিত দৈনিক বাংলার সম্পাদকের দায়িত্ব নেন তিনি।

সাংবাদিকতার সব বিভাগেই তাঁর অবাধ বিচরণ। মননে মুক্তচিন্তার অধিকারী। পেশাদারিত্বেও প্রগতিশীলতা ছিল তাঁর মজ্জাগত। পেশার মর্যাদা ও বিবেকের স্বাধীনতা বজায় রাখার জন্য তোয়াব খান জেল-জুলুমও সহ্য করেছেন। মৌলবাদীদের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। মৌলবাদীদের সমর্থক সরকারের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন। তোয়াব খান মাথা নত করেননি।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রে একেকটি মাইলফলক রচিত হয়েছে তাঁরই নেতৃত্বে। প্রথম চাররঙা সংবাদপত্র এর মধ্যে একটি। সব সময় পাঠকই তাঁর ‘প্রাইমারি কনসার্ন’। সংবাদপত্রে পুরো পাতা ফ্যাশন আর টেকনোলজির জন্য বরাদ্দের কথা তাঁর আগে আর কে-ই বা ভেবেছেন! দৈনিক জনকণ্ঠে তিনি সেটাই করেছেন। পাঠককে দিয়েছেন নতুন স্বাদ। এটা একদিকে যেমন পাঠকদের কথা মাথায় রেখে, তেমনি সময়ের দাবি মেনে। সাংবাদিকদের সম্পর্কে পুরনো ধ্যান-ধারণাও তিনি বদলে দিয়েছেন। প্রত্যেক সহকর্মীর কাছ থেকে সেরা কাজটা আদায় করে নেওয়ার বিরল ক্ষমতা ছিল। এ ক্ষমতাই রচনা করেছে তাঁর সাফল্যের ভিত।

পেশা হিসেবে সাংবাদিকতার অবস্থান একটু স্বতন্ত্র। এ শুধু রুটি-রুজির মাধ্যমই নয়, একই সঙ্গে এ এক মহান ব্রতও। তোয়াব খানের জীবন তার উদাহরণ। সময়ে কেমন করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় তাও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন একাত্তরের মহাদুর্যোগে।

বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসে সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বলতে যা বোঝায়, তার শেষ সলতে ছিলেন তোয়াব খান। তিনি ছিলেন পেশাগত সাংবাদিকতায় শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ঠিকানা।

অগ্রসর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সাংবাদিকতাকে ব্রত হিসেবে নিয়েছেন তিনি। তিনি শুধু একজন সাংবাদিক নন, বরং সাংবাদিকদের সাংবাদিক। পেশাগত জীবনে সাড়ে ছয় দশক পেরিয়ে নিঃসন্দেহে তিনি আজ এক প্রতিষ্ঠান।



সাতদিনের সেরা