kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

রাজনীতির মহাকাব্য রচিত হওয়ার দিন

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ

বাঙালি জাতির ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় দিন আজ ৭ই মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনেই ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে রচিত হয়েছিল রাজনীতির এক ঐতিহাসিক মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’—এই কথাগুলো উচ্চারণ করে কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ৭ই মার্চের এমন ঘোষণা শুধু বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব ছিল। মাত্র ১৯ মিনিটের এই একটি ভাষণ জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেসকো এই ভাষণকে ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের লক্ষ্যই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বাঙালিদের যে করতে হবে তাও তাঁর দূরদৃষ্টিতে ধরা পড়েছিল বহু আগে। ৭ই মার্চের ভাষণে সেই দিকনির্দেশনাও স্পষ্ট। ভাষণে তিনি বললেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল।’ পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশে ভাষণে উচ্চারিত হলো সাবধানবাণী, ‘আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়া রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।’ আবার দেশের সংগ্রামী জনতাকে সাবধান করতেও ভোলেননি তিনি, ‘মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটতরাজ করবে।’ দিলেন জনযুদ্ধের ডাক, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল। এবং তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা—রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব; এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লা।’ আর এর পরই তাঁর সেই অমোঘ উচ্চারণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যেন ঘোষণা হয়ে গেল সেদিনই। সারা দেশের মানুষ পেয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতার বীজমন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ওই ভাষণ দিয়েছিলেন। একদিকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, অন্যদিকে তাঁকে যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে অভিহিত করা না হয়, সেদিকেও তাঁর সতর্ক দৃষ্টি ছিল। তিনি কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন, কী করতে হবে তা বলে দিলেন, আবার পার্লামেন্টে যোগদানের জন্য চারটি শর্ত দিয়ে একটি ধোঁয়াশা তৈরি করলেন। বঙ্গবন্ধু সেদিন সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তিনি একজন বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা হিসেবেই চিহ্নিত হতেন। আন্তর্জাতিক সমর্থন থেকে বঞ্চিত হতেন। পাকিস্তানিদের আরো বেশি করে বাঙালি নিধনের ক্ষেত্র তৈরি হতো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেলেন, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। মার্কিন সাময়িকী নিউজ উইকের ভাষায় বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাজনীতির ‘কবি’। সে ক্ষেত্রে ৭ই মার্চের ভাষণ ছিল একটি শ্রেষ্ঠ কবিতা। একই সঙ্গে এই ভাষণে তিনি যে দায়িত্ব সচেতনতা ও ধীশক্তির পরিচয় রেখে গেছেন তা অতুলনীয়। তাই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির অস্তিত্বের মতোই সত্য হয়ে থাকবে।

মন্তব্য