kalerkantho

শুক্রবার ।  ২৭ মে ২০২২ । ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ২৫ শাওয়াল ১৪৪

শহীদুল জহিরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা

তাশরিক-ই-হাবিব

৯ ডিসেম্বর, ২০১৬ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শহীদুল জহিরের অসাম্প্রদায়িক চেতনা

অঙ্কন : মানব

শহীদুল জহিরের সঙ্গে পুরান ঢাকার সম্পর্কসূত্রেই তাঁর শিল্পীমানসে সন্নিহিত অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের জয়গান সম্পর্কে দৃষ্টিপাত করা যাক। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে তাঁর বিশিষ্টতা এবং স্বাজাত্যবোধ প্রসঙ্গে গবেষক, সমালোচক ও পাঠকরা ধারণা পেতে শুরু করেছেন। উত্তরাধুনিক এ লেখক গল্পে, উপন্যাসে মানুষের জীবনবাস্তবতাকে অত্যন্ত সচেতনভাবে তুলে ধরেছেন, যেখানে বহির্বাস্তবতা ও অন্তর্বাস্তবতার মিথষ্ক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বারবার উপস্থিত। সাহিত্যে পরিবার, সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র ও ধর্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যক্তি ও সমষ্টিমানুষের সম্পৃক্ততার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে বিভিন্নভাবেই রূপায়িত হয়ে চলেছে।

বিজ্ঞাপন

এ ক্ষেত্রে একেকজনের লেখনীর স্বাতন্ত্র্য নিরূপিত হয় স্বীয় জীবনবোধ, বেড়ে ওঠার পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশ, সমকালে ঘটে চলা আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার অভিঘাত, প্রাত্যহিক জীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও শিল্পদৃষ্টির সমন্বয়গুণে। জহির পুরান ঢাকার বাসিন্দা হিসেবে বাল্যকাল থেকে পরিণত জীবনের অনেকটা সময়  কাটিয়েছেন। এ অঞ্চলকে নিয়ে অজস্র স্মৃতিময় ঘটনার সাক্ষ্য ধারণ করে আছে তাঁর গল্প ও উপন্যাস। ঢাকার অন্যান্য স্থানের তুলনায় এখানে বহুকাল ধরেই হিন্দু সম্প্রদায়ের উপস্থিতি বেশি। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের বিষবাষ্পে দগ্ধ হয়ে এদের অনেককেই নিজেদের শেকড় ছেড়ে ভারতে পাড়ি জমাতে হয়েছে। দ্বিজাতিতত্ত্বে বিবৃত সাম্প্রদায়িকতার মানদণ্ডে ভারতীয় উপমহাদেশের বিভাজন যে এতদঞ্চলের জনজীবনকে বিধ্বস্ত করে তুলেছিল, ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত রয়েছে। জহিরের আলোচিত গল্প ‘কাঁটা’-তে প্রতিফলিত হয়েছে এ সম্প্রদায়ের অস্তিত্বসংকটের রূপরেখা, যেখানে সংখ্যালঘু হিসেবে তারা প্রতিনিয়তই প্রতিবেশী মুসলমান তথা সংখ্যাগুরু বাসিন্দাদের প্রতি অপরাধবোধে আক্রান্ত। লক্ষণীয়, তিনি এ গল্পে ওই দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে তিনটি ভিন্ন কালিক পটভূমিতে প্রতিস্থাপিত করলেও অন্তিম পর্যায়ে সংঘটিত ঘটনাগুলোর অভিন্ন পরিণতিই দেখা যায়। অর্থাৎ সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দ্বারা সংখ্যালঘু নিপীড়ন, এমনকি বধই যেন তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের চূড়ান্ত সমীকরণ! এ গল্পের নাম প্রথমে ‘কাঁটা’ রাখলেও এরপর তা বদলে ‘মনোজগতের কাঁটা’ এবং অবশেষে ‘কাঁটা’ হিসেবে স্থির করার ক্ষেত্রে লেখকের বিশেষ যুক্তি ছিল। সেটি হলো, ‘কাঁটা’র প্রতীকে হিন্দু-মুসলমানের চেতনালোকে পরস্পরের প্রতি বৈরিতা, সাম্প্রদায়িকতা, সংশয় ও আস্থাহীনতা বহুকাল ধরে এতটাই পরিপুষ্ট হয়েছে যে সেটি উপড়ে ফেলা অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে লেখক হিসেবে জহিরের ভূমিকা বরাবর সক্রিয় থাকে ইতিহাসের পটভূমিতে এ দুই সম্প্রদায়ের আন্তসম্পর্কের বাস্তবানুগ বয়ানে। কিন্তু তিনি তা কখনোই সরাসরি বলেন না; বরং পাঠকের বিবেচনার ওপর বিষয়টির নিষ্পত্তির ভার অর্পণ করেন সমস্যাটির ইতিবৃত্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে। নিঃসন্তান সুবোধ-স্বপ্না দম্পতির নারায়ণগঞ্জ, সাতক্ষীরা ও সিরাজগঞ্জ থেকে উপর্যুপরি তিনবার ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পুরান ঢাকার ভূতের গলি মহল্লার আব্দুল আজিজ ব্যাপারির কুয়াবিশিষ্ট বাড়িতেই ভাড়াটে হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ। এর পরিণতিতে প্রতিবার তাদের মৃত্যুর পর মৃতদেহ নিতে আসা সুবোধের ছোট ভাই পরানচন্দ্রের উপস্থিতি জাদুবাস্তবতার কাঠামোতে এ গল্পে পরিকল্পিতভাবেই বিন্যস্ত হয়। এসব ঘটনা প্রথমবার ঘটে ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার পটভূমিতে, এরপর মুক্তিযুদ্ধকালীন বৈরী প্রতিবেশে, তৃতীয়বার ভারতের অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রতিক্রিয়ায়। কখনো দুর্ঘটনাবশত, কখনো বা সংঘটিত ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তাদের প্রাণপাতের ঘটনা প্রকটিত করে এ দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অস্তিত্বহীনতার দুর্বিষহ বাস্তবতাকে। গল্পে রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত এসব নৃশংস ঘটনার পরিণতি থেকে লেখকের শিল্পীমানসের প্রবণতা অনুধাবন করা যায়। দাঙ্গা চলাকালীন এক বৃষ্টিস্নাত রাতে চন্দ্রালোকে উদ্ভাসিত রাতের অনিন্দ্য সৌন্দর্য তথা কুয়ার টলমল জলে বিচ্ছুরিত পূর্ণিমার চাঁদের বস্তুতুল্য উপস্থিতির অন্তরালবর্তী শূন্যতা সম্পর্কে তাদের ভাবনায় সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়নি। ফলে হাত বাড়িয়ে প্রতিবিম্বিত চাঁদ ধরতে গিয়ে কুয়ায় এ দম্পতির সলিল সমাধির ঘটনায় পরস্ফুিট হয়, অন্ধকারে আবৃত কুয়ারূপ ধর্মান্ধতায় আচ্ছন্ন ভারতীয় উপমহাদেশে পূর্ণিমার চাঁদের অসামান্য দ্যুতির বিচ্ছুরণ তথা অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান অলীক কল্পনামাত্র। এরপর মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘনঘোর পরিস্থিতিতে মহল্লার তথাকথিত আশ্রয়দাতারাই যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এ দম্পতির কুয়ায় মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে, তা আদৌ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পাকিস্তানি হানাদারদের অস্ত্রসজ্জিত আক্রমণ আর সংখ্যাগুরু মুসলমানদের ধর্মীয় অহমবোধের অসহায় শিকার হয়ে সংখ্যালঘু এ দম্পতির অপমৃত্যু প্রকৃতপক্ষে সমকালীন বিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক বাস্তবতার সমান্তরালে জনজীবনের অসহিষ্ণু, বিক্ষুব্ধ মনোভঙ্গিরই উগ্র বহিঃপ্রকাশ। এর ভয়াবহ রূপটি প্রকাশিত হয়েছে গুজবের ভিত্তিতে মুসলমান প্রতিবেশীদের দ্বারা নিষ্ঠুরভাবে এ দম্পতির কুয়ায় নিহত হওয়ার ঘটনায়। বাবরি মসজিদ ধ্বংস হওয়ায় এ দম্পতি খুশিতে উল্লসিত হয়ে মিষ্টি খেয়েছে—এমন গুজবের ভিত্তিতে এভাবে তাদের হত্যার ঘটনা থেকে বোঝা যায়, একই মহল্লার বাসিন্দা হলেও বহিরাগত হিন্দু দম্পতিকে তারা প্রতিবেশী হিসেবে কখনোই মেনে নিতে পারেনি। তাই তাদের অস্তিত্বকে বিলীন করে তবেই ধর্মান্ধ মুসল্লিরা পরিতৃপ্তি খুঁজে পান। কিন্তু এর পরিণতিতে তাদের চেতনালোকে সন্নিহিত বিবেকী সত্তাকে প্রতিনিয়তই যে অসহনীয় যন্ত্রণায় রক্তাক্ত হতে হয়, সেই অন্তর্বাস্তবতার রূপায়ণও এ গল্পে ঘটেছে। কেননা, কোনো ধর্মেই মানুষ হত্যা অনুমোদিত নয়। তা ছাড়া কৃতকর্মের দায় বহনের বাধ্যবাধকতা থেকে কোনো মানুষই মুক্ত নয়। সে কারণেই এসব ঘটনার পরিণতিতে ভূতের গলির মুসলমান বাসিন্দাদের সমষ্টিচেতনায় জাগ্রত অপরাধবোধের প্রাবল্য দিন দিন তীব্রতর হয় সংখ্যালঘু এ দম্পতিকে নির্মমভাবে হত্যা ও এর সহায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টির অনুতাপবোধে। এর পরিণতিতে তারা যে ধীরে ধীরে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে, গল্পটিতে সেই ইঙ্গিতও সুস্পষ্ট। ধর্মীয় ঔদার্য ও সহনশীলতাকে আশ্রয় করে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে আন্তমানবিক সম্পর্কে একাত্ম হওয়া সম্ভব, এ বাণীকেই লেখক গল্পটিতে ধারণ করেছেন। তুলসীগাছের প্রতীকে হিন্দু সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব সংকটের রূপায়ণ এ গল্পে লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে পড়বে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘একটি তুলসীগাছের কাহিনী’ গল্পটিকে। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাস-সংস্কার, আচরিত মূল্যবোধের সহায়ক অনুষঙ্গ হিসেবে গৃহে এ গাছের সশ্রদ্ধ উপস্থিতি এবং একপর্যায়ে এর প্রাণহীনতা থেকে ধারণা করা যায় রাজনৈতিক বিক্ষুব্ধতার কালে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো দেশের নাগরিকদের সংখ্যালঘু হিসেবে অবনমিত হওয়ার স্বরূপ। লক্ষণীয়, সমগ্র গল্পেই লেখক নীরব থেকেছেন বাঙালি জাতির অন্তর্গত এ দুই প্রধান সম্প্রদায়ের অন্তর্গত বাসিন্দাদের টানাপড়েন ও ধর্মীয় পরিচয়গত সংকট থেকে উত্তরণের ব্যাপারে। এর মানে এই নয়, তিনি সাম্প্রদায়িকতার সমর্থক এবং সে কারণেই হিন্দু-মুসলমানের বিরোধকে এ গল্পের প্রতিপাদ্য করেছেন। তাঁর গল্প যে পরিশ্রমী পাঠকের মেধা ও চিন্তার সামর্থ্যকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই তিনি স্বীয় বিবেচনার মাধ্যমে গল্পের সারসত্যকে অনুসন্ধান ও এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পাঠকের ওপর দায়িত্ব আরোপ করেন। হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে উঠে বাঙালি জাতির প্রতিনিধি হিসেবে পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ, মানবিক সম্পর্কের গ্রন্থনাই তাঁর সাহিত্যভাবনার মূল সুর। এ গল্পে তাদের সংকট ও সমস্যার বিস্তৃত পরিচয়ের পাশাপাশি এ অচলায়তন ভাঙার দিকনির্দেশনা ইঙ্গিতে ব্যক্ত হয়েছে। তাই মনোযোগী পাঠকমাত্রই গল্পটি পাঠ শেষে বুঝে উঠতে পারেন, লেখক হিন্দু বা মুসলমান কারো প্রতিই প্রকাশ্য বা প্রচ্ছন্ন সমর্থন জানাননি; বরং আন্তরিক, যুক্তিগ্রাহ্য আচরণের মাধ্যমে পরস্পরের প্রতি অসাম্প্রদায়িকতার জয়গানকেই তিনি এ গল্পে উপজীব্য করেছেন। তাঁর অনেক গল্পই পুরান ঢাকার কোলাহলমুখরিত জনজীবনের অবারিত চাঞ্চল্য ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণপ্রবাহকে ধারণ করে। সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে বহু ধারায় বিস্তৃত মানবজীবনের পূর্ণায়ত জীবনচিত্রণে শহীদুল জহিরের হাতিয়ার অসাম্প্র্র্রদায়িক চেতনার উদ্ভাসন ও শাশ্বত মানবিক মূল্যবোধে আস্থা পোষণ। এ কারণেই তিনি পাঠকের হৃদয়ে মৃত্যুঞ্জয়ী লেখকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।



সাতদিনের সেরা