kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

ইতিহাসের পাতা থেকে

মহামারি স্তম্ভ

অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার বিখ্যাত এক মহামারি স্তম্ভের গল্প শুনাচ্ছেন ইশতিয়াক হাসান

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মহামারি স্তম্ভ

যুদ্ধে বিজয়ের উদ্‌যাপন হয় খুব ঘটা করে। তবে অন্য কোনো ধরনের শত্রু যেমন—মহামারির বিরুদ্ধে জয়ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়, বিশেষ করে আগের জমানায়, যখন পৃথিবীর জনসংখ্যা হঠাৎ হঠাৎ কমিয়ে দিয়ে যেত ভয়ংকর সব মহামারি। লোকেরা এই অভিশাপ ও দুর্ভোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করত এবং ঈশ্বরের জন্য নানা ধরনের নৈবদ্য পেশ করত। বড় বড় শহরে গির্জা বানানো হতো। যেমন—ভিয়েনার সান্তা মারিয়া দেল্লা সেল্যুট চার্চ। ১৬২৯-৩১ সালে প্লেগের পর এটা তৈরি হয়। কেউ কেউ আবার বিজয়স্তম্ভ তৈরি করত। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার প্লেগ কলাম ব পেসতসল।

দানিয়ুব নদীর তীরে অবস্থিত ভিয়েনা ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে বিখ্যাত এক বাণিজ্যকেন্দ্র। এ বিষয়টিই চৌদ্দ শতক থেকে ভিয়েনার জনসাধারণকে ভয়াবহ প্লেগের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ব্যবসায়ীদের শহর হওয়ায়, দানিয়ুবের তীর ছিল পোশাক, কার্পেট ও শস্যের ভাগাড়ে ভরপুর। এতে ছিল ইঁদুরদের আধিপত্য। শহরটাও ছিল ঘনবসতিপূর্ণ, মানুষ আবর্জনা ফেলত নদীতে, না হলে শহরের রাস্তাঘাটে। মধ্যযুগের ইউরোপে জীবনযাত্রা ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর। ওই সময় প্লেগ মহামারির বারবার হানা দেওয়ার অন্যতম কারণ এটি। যখনকার কথা বলছি, তখন অস্ট্রিয়ার হাবসবার্গ শাসকদের রাজকীয় প্রাসাদ ছিল ভিয়েনায়ই। ১৬৭৯ সালের দিকে দেখা গেল ভিয়েনার দোরগোড়ায় প্লেগ হাজির।

অন্য আরো অনেক মহামারির মতো গোড়ায় দরিদ্র এলাকাগুলোয় করাল থাবা বিস্তার করে মহামারি, তারপর ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে তুলনামূলক ধনী মানুষদের মধ্যেও। আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকলে হাবসবার্গ শাসক প্রথম লিওপোল্ড শহর থেকে পালান, তবে রাজকর্মচারীরা রোগ থেকে রক্ষা পেল না। ভিয়েনায় মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা পড়ে নিদেনপক্ষে ৭৬ হাজার মানুষ। মনে রাখতে হবে ওই সময় শহরটির জনসংখ্যাই ছিল এক লাখ ১০ হাজার। এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন কতটা ভীতিপ্রদ ছিল রোগটা। মৃতদেহগুলো ঘোড়ার গাড়িতে করে শহরের বাইরে নিয়ে গিয়ে বিশাল খোলা গর্তে ফেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। রোগ ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে লোকেরা এই কাজ করতে রাজি হতে চাইত না। একপর্যায়ে উপায়ান্তর না দেখে জেলে আটকে থেকে কয়েদিদের বাধ্য করা হয় এই দাহের কাজে। চিকিৎসকরা যেন পালাতে না পারেন তাই হাত বেঁধে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হতো। তবে একসময় বিদায় নিল অভিশপ্ত এই মহামারি। নগর কর্তৃপক্ষ হলি ট্রিনটির (খ্রিস্টানদের মতে, ঈশ্বরের তিন সত্তা) প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি প্লেগ কলাম স্থাপন করার পরিকল্পনা করল। ওই বছরই কাঠের একটি স্তম্ভ বসানো হলো। সেখানে ৯ জন দেবদূতের সঙ্গে হলি ট্রিনটিকে মূর্ত করে তোলা হলো। ১৬৮৭ সালে এর বদলে ওই জায়গায়ই স্থাপিত হলো আরো মজবুত একটি পাথরের মহামারি স্তম্ভ।

সতেরো শতকের শেষ অর্ধেকটায় অনেক অস্ট্রিয়ান শহরেই প্লেগ স্তম্ভ ছিল বেশ সাধারণ ব্যাপার। প্লেগের সময় সাধারণত কাঠ দিয়ে বানানো হতো এই স্তম্ভগুলো। যদি কাঠের এই ইমারত কাজে দিত তবে ট্রিনটি এবং মা মেরির প্রতি সম্মান জানিয়ে স্থায়ী স্তম্ভ বানানো হতো। এই ধরনের প্লেগ স্তম্ভগুলো তৈরিতে তখন নানা শৈল্পিকরূপ দেওয়া হতো। এর অনেকগুলোর নকশাই করেন ইতালির লুদোভিকো বার্নাচিনি এবং অস্ট্রীয় স্থপতি ও ভাস্কর জোহান বার্নডি ফিসকার ভন এরলাচ। ভিয়েনার প্লেগ স্তম্ভের ভিত্তির ভাস্কর্যগুলোর নকশা করেন ফিসকার, এদিকে হলি ট্রিনটির নিচের দেবদূতদের ভাস্কর্য এবং প্রার্থনারত শাসক লিওপোল্ডের ভাস্কর্যের নকশা করেন বার্নাচিনি।

ইউরোপের অন্যান্য শহরেও এ ধরনের প্লেগ স্তম্ভ দাঁড় করানো হয়। স্লোভাকিয়ার কসিসে ১৭০৯-১৯ এর প্লেগের পর একটি, মোটামুটি কাছাকাছি সময়ে চেক রিপাবলিকের কুতনা হোরায় একটি এবং ১৬৫০ সালে প্রাগের পুরনো টাউন স্কয়ারে এ রকম একটি স্তম্ভ খাড়া করা হয়, তবে এটা হাবসবার্গদের প্রতীক মনে হওয়ায় ১৯১৮ সালে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।

মন্তব্য