kalerkantho

রবিবার । ২১ আষাঢ় ১৪২৭। ৫ জুলাই ২০২০। ১৩ জিলকদ  ১৪৪১

কারো আপাতত স্বস্তি, কারো মুখ ভার

করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থায়ও। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত পেয়েছে রেজাল্ট। এখন নতুন চিন্তা কলেজে ভর্তি হবে কবে? এদিকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কবে পরীক্ষা হবে এ দুশ্চিন্তায় ঘুম হারাম। বিস্তারিত জানাচ্ছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

৭ জুন, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কারো আপাতত স্বস্তি, কারো মুখ ভার

আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা আতিয়া ফাইরুজ জাহিনের। বলল, ‘আমার এমনিতেই টেনশন বেশি। এখন তো রীতিমতো পাগল হওয়ার দশা। পড়তে গেলে মনে হয় কী হবে পড়ে, কবে পরীক্ষা এটাই তো জানি না। কখনো মনে হয় সব তো পড়াই, আর পড়ার কী দরকার। কখনো আবার মনে হয় মনোযোগ না থাকায় অনেক কিছুই যে আর ঠিকমতো মনে করতে পারছি না। আবার কোনো মুভি দেখতে কিংবা বই পড়ার সময় মনে পড়ে—হায় হায়, কয় দিন পর না আমার পরীক্ষা। এখন এভাবে সময় কাটালে চলবে। মামণিকে যখন টুকটাক কাজে সাহায্য করি, তখনো মুখটা কালো হয়ে থাকে টেনশনে। কী যেন ভাবতে থাকি আনমনে। কখনো দেখা যায়, তরকারিতে এক মসলার জায়গায় আরেক মসলা দিয়ে ফেলি। চায়ে তিন-চার চামচ চিনি দিয়ে শরবত বানিয়ে ফেলি। হঠাৎ মামণির ডাকে হুঁশ ফেরে। মনে পড়ে করোনা বাংলাদেশে হানা দেওয়ার ঠিক আগে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আত্মীয়-স্বজনরা সবাই মিলে গিয়েছিল সেন্ট মার্টিনে। মামণি আর আমার ছোট বোন জারিনও গিয়েছিল, মামণি যেতে বলেছিল বারবার, কিন্তু পরীক্ষার কথা ভেবে যাইনি। মনটা কিন্তু পড়েছিল ওই সেন্ট মার্টিনেই। অথচ সেই পরীক্ষাই কি না হলো না।’

ঢাকা সিটি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আবু হোরায়রা ফাহিমের অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। করোনার সময়ে একরাশ হতাশার কথা বলল ফোনালাপে। ‘দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছি এটা বলার এখন আর সুযোগ নেই। এত দিনে আমাদের এইচএসসি শেষ হওয়ার কথা। কবে পরীক্ষা হবে নিশ্চিতভাবে জানা না থাকায় কী করব এটাই বুঝতে পারছি না। এর মাঝে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যাপারটাও চলে আসছে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি প্রতিযোগিতা কাজ করে ভর্তি পরীক্ষার কথা ভেবে। পরীক্ষা শেষ হলে, রেজাল্ট হওয়ার আগেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে পড়ার উৎসাহে উত্তেজিত থাকে সবাই। তবে এখন পরীক্ষাই কবে হবে সে নিশ্চয়তা না থাকায় উৎসাহে অনেকটাই ভাটা পড়েছে।’ চেষ্টা করছে নিজেকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখার। এ ছাড়া সময় কাটছে ঢিমেতালে, অনলাইনে লাইভ ক্লাসগুলো অনুসরণের চেষ্ট করছে। তবে মাথায় সব সময় চিন্তা একটাই ফাহিমের, পরীক্ষা কবে হবে?

সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে কথা হলো ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা মুসাররাত আবির জাহিনের সঙ্গেও। জানালো দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে গল্পের বই পড়ছে, ইতিমধ্যে লকডাউনে পঞ্চাশটার মতো বই পড়ে শেষ করেছে। পাশাপাশি টুকটাক লেখালিখিও চলছে, কিছু অনলাইন কোর্স করছে, প্রগ্রামিং শিখছে, একটু-আধটু রান্নাবান্না করছে। ঘরের কাজে মাকে সাহায্যও করা হয়। এগুলো করার অন্যতম কারণ নিজের মনোবল ধরে রাখার চেষ্টা করা—জানালো জাহিন। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা এখন বেশ দোদুল্যমান একটা অবস্থায় রয়েছে, অনেকটা ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো। যদিও সারাক্ষণ পড়াশোনার মধ্যে ডুবে থাকা যায় না, তবু পড়াশোনার পেছনে অন্য সবের চেয়ে একটু বেশি সময় দিচ্ছে। এটা চরম সত্য—সব স্বাভাবিক হলেই এইচএসসি, এরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আর ভর্তি পরীক্ষার জন্য ইন্টারের বইয়ের বিকল্প নেই। এত দিন বিগত বছরের এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন সমাধান করলেও এখন ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নগুলো নেড়েচেড়ে দেখছে। প্যাটার্ন সম্পর্কে ধারণা রাখছে। ‘যদিও বাসা থেকে আর পড়তে বসার জন্য কেউ তাগাদা দিচ্ছে না, তবু নিজের ইচ্ছায় যতটুকু পড়া যায়। খাতায় না লেখার কারণে হাতের লেখার বারোটা বেজে গেছে। তা ছাড়া এখন যে অবস্থা, শারীরিক স্বাস্থ্যের চেয়ে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়েই আমি বেশ চিন্তিত। ৮০ দিন ধরে ঘরবন্দি। মাঝেমধ্যে ছুটে কলেজে যেতে ইচ্ছা করে, কলেজের আইসিটি ল্যাবের সামনে একটা পিলার আছে, যখনই ল্যাবের সামনে দিয়ে যেতাম, তখনই পিলারটা জড়িয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম। ওইভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা আমি খুব মিস করি। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় কত দিন ভালো করে আকাশ দেখি না, চোখে-মুখে রোদ লাগাই না, বুকভরে শ্বাস নিই না।’ এমন অনুভূতি কাজ করছে জাহিনের মতো শত শত শিক্ষার্থীর মনে।

এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে নিজেদের ফলাফল নিয়ে, অয়নের সঙ্গে কথা বলে তা স্পষ্ট। অয়ন চক্রবর্তী বরিশাল জিলা স্কুল থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন আছে বরিশালে নিজের বাসায়। অয়ন বলল, ‘দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর নানা শঙ্কার শেষে এসএসসি পরীক্ষার ফল পেলাম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগে থেকেই নানা পরিকল্পনা ছিল, এসএসসির পর কয়েক মাস কী কী করব। যদিও তার কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিতর্কের পাঠ ও ইংরেজি শিক্ষার কোর্সে ভর্তি হয়েও ক্লাস করা হয়নি। প্রতিবছর এসএসসির ফলাফলের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভালো ফলের আনন্দে উৎসবে মেতে ওঠে। এ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তো নয়ই; প্রিয়জনদের সঙ্গেও আনন্দ-উৎসবে মেতে ওঠা হয়নি। এবার ফল পেয়েছি মেসেজের মাধ্যমে।’ করোনা পরিস্থিতির কারণে এসএসসির ফল পেতে দেরি হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই কলেজ ভর্তি এবং ক্লাস কার্যক্রম পিছিয়ে যাবে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির ব্যাপ্তি নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। অয়ন বলল, এমন পরিস্থিতিতে নতুন শ্রেণির পড়ালেখা বাধাগ্রস্ত হচ্ছেই; কারণ সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ ছুটির সময়ে বহু গল্পের বই-উপন্যাস পড়া হয়েছে, তবে এখনো সব কিছুই কেন জানি ভালো লাগছে না, অনিশ্চয়তা কাজ করছে সব সময়। এ ছাড়া ইউটিউবে বিভিন্ন শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ভিডিও দেখে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছে।

এদিকে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল থেকে বাণিজ্য বিভাগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে উম্মুল খয়ির ফাতিমা। এসএসসি পরীক্ষা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কেননা এই ফলাফলের ওপর কলেজের ভর্তি নির্ভর করে; এমনকি পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময়ও এটা কাজে লাগে। কিন্তু ফাতিমার আশানুরূপ ফল আসেনি। তবু পরিবারসহ সবাই তার পাশে রয়েছে। ফাতিমা বলল, ‘আমার মা-বাবা সব আত্মীয়-স্বজনকে আমি যে জিপিএ পেয়েছি তা-ই আনন্দের সঙ্গে বলছেন। করোনার কারণে কলেজের কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না বলে ঘরে বসে বাণিজ্য বিভাগের উচ্চ মাধ্যমিকের বইগুলোর পাতা ওল্টাচ্ছি। প্রতিদিন সাধারণ জ্ঞান পড়ছি নিয়ম করে। ইংলিশ ভোকাবুলারি থেকে নতুন নতুন শব্দ শেখার চেষ্টা করছি।’ পেছনে যা ঘটেছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছে ফাতিমা।

 

এই সময় ঝুঁকি নেওয়া যায় না

মু. জিয়াউল হক, চেয়ারম্যান, ঢাকা শিক্ষা বোর্ড

‘এখন পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার ব্যাপারে আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে এটা ঠিক করা হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের এ সময়ে এই ঝুঁকি নেওয়া যায় না। ১৩ লাখ পরীক্ষার্থীর পাশাপাশি প্রতিদিন দুই লাখ শিক্ষকসহ অন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে পরীক্ষায়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করে পরীক্ষা নেওয়া কঠিন। তা ছাড়া আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ছয় ফুট দূরত্ব নিশ্চিত করে ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার আসনবিন্যাস করা মুশকিল। পরিস্থিতি অনুকূল হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার পর এই পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উৎকণ্ঠার ব্যাপারটা আমরা বুঝি। শিক্ষার্থীরা মনোবল অটুট রেখে পড়ালেখা যেন চালিয়ে যায়। নিজেদের স্বাস্থ্যের দিকে নজর রাখে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে।

এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের ব্যাপারেও একই কথা খাটে। আমরা ঝুঁকির মধ্যে থেকেই তাদের ফল প্রকাশ করেছি; কিন্তু এখন ভর্তি কার্যক্রম শুরু করলে ১৬ লাখ শিক্ষার্থী বিপদের মধ্যে পড়বে। তবে তাদেরও দুশ্চিন্তার কিছু নেই। আপাতত উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির বইগুলো একটু পড়তে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে গেলে তাদের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হবে।’

 

মন্তব্য