kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ আষাঢ় ১৪২৭। ৩ জুলাই ২০২০। ১১ জিলকদ  ১৪৪১

করোনায় কিশোরের দিনলিপি হুট করে জীবনটা বদলে গেল স্বপ্নগুলো আছে বলেই এখনো পাগল হয়ে যাইনি

অমিত হাসান রুদ্র, দ্বাদশ শ্রেণি, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজ, ঢাকা।

১৭ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনায় কিশোরের দিনলিপি হুট করে জীবনটা বদলে গেল স্বপ্নগুলো আছে বলেই এখনো পাগল হয়ে যাইনি

প্রায় ৪৫ দিনের মতো বাসা থেকে বের হই না। এক অদৃশ্য শক্তি থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে ঘরবন্দি জীবন যাপন করছি। জীবনটা কী ছিল আর কী হয়ে গেছে তুলনা করলে এখন অবাক হই। আগে খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতাম। আম্মুর ধমক শুনেই দিনের শুরু হতো, মানে ঘুম ভাঙত। আর এখন ঘুম ভাঙতে ভাঙতে ১২টা। ঘুম থেকে উঠে,  হাত-মুখ ধুই, দাঁত ব্রাশ করে নিই। তারপর বই নিয়ে বসি। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা! পড়তে বসলে মনে হয়, কী জন্য এই পড়া? এই জীবনের মানে কী? এই ভাবনায় কোথায় যে হারিয়ে যাই। হুঁশ ফিরলে বুঝি আমি উল্টো করে বই ধরে রেখেছি। ওই যে কবে পরীক্ষা সেটাই তো জানি না। তারপর দুপুরের খাবার দাও বলে আম্মুকে ডাক দিই। তখনই খেয়াল আসে, রমজান মাস! আম্মু এসে আমাকে বুঝায় আর ২০ দিন পরই পরীক্ষা। গত প্রায় দুই মাস ধরেই শুনছি, বকাও খাচ্ছি।

মাঝে মাঝে মাকে কাপড় ধুতে সাহায্য করি। এরপর গোসল সারতে সারতে বিকেল। কলেজে দুটি ক্লাবে অ্যাক্টিভ ছিলাম। বাংলা বিতর্ক আর কালচারাল ক্লাব। একটায় সহসাধারণ সম্পাদক, আরেকটায় সভাপতি। এই বিকেলবেলাটা মূলত ক্লাবের গ্রুপ চ্যাটেই কাটে। যথারীতি দেশ পরিবর্তনের আলোচনা দিয়ে শুরু হয় এবং মিম/ট্রল শেয়ার করতে করতে ক্লান্ত হওয়ার মাধ্যমেই পরিসমাপ্তি। তবে বেশ ভালো লাগে, সময়টা কাটে। কাজ হয় না যে তা না। কয় দিন আগেই ক্লাবের সবাই মিলে অনলাইন ডিসকর্ডভিত্তিক ডিবেট ফেস্ট নামালাম। দুদিন ভারী ব্যস্ত্ত সময় পার করেছি। অবসর সময় কাটাতে কাটাতে ব্যস্ততা এখন উপভোগ করি। বেঁচে আছি মনে হয়। আগে প্রতিদিনই এই চমৎকার মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হতো। তাদের অনেক অনেক মিস করি মাঝেমাধ্যে। এগুলো করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে আসে। ইফতার পরিবেশনে আম্মুকে সাহায্য করি। পরিবারের সঙ্গে একটা মধুর সময় কাটে।

আমার একটা অভ্যাস, সন্ধ্যার পর বারান্দায় বসে কানে হেডফোন দিয়ে গান শোনা বা ইউটিউবে ঘোরাঘুরি করা। চেষ্টা করি নিজেকে বোঝানোর, এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মোটিভেশন দিই নিজেকে। আমি একটা ব্যান্ড দলে কাজ করতাম। নিজেদেরই স্টুডিও ছিল। কত দিন যাই না!  মিউজিক আমার সব কিছু বলতে গেলে। হুট করে জীবনটা বদলে গেল। প্রথম কয় দিন কষ্ট হয়েছে প্রচুর। এখন কম হয়। ব্যান্ডমেইটরা ভিডিও কল দেয় প্রায়ই। এই মানুষগুলো জীবনে না থাকলে কোয়ারেন্টিন কিভাবে কাটাতাম আমি জানি না।

১০টায় পরিবারের সবার সঙ্গে রাতের খাবার খাই। ভালো আড্ডা হয়, আব্বুর কাছে গল্প শোনা হয়। থালা-বাসনও মাজা লাগে, যদিও আপত্তি নেই আমার। তারপর একটু পড়া। এটা যে খুব চমৎকার নাটক তা আগেও বলেছি। বই খুললেই নতুন নতুন মনে হয়। হতাশা জাগে, বেজে যায় ১২টা। না, আসলেই  রাত ১২টা বাজছে!  রাত ১২টার পরের সময়টা খুব দামি আমার কাছে। সব কিছু চুপ হয়ে যায়। আমি গান নিয়ে বসি। রেওয়াজ করি। গিটার নিয়ে বসি। মিউজিক থিওরি পড়ি, ইম্প্রোভাইস করি, চেষ্টা করি প্রতিদিন সামান্য হলেও কিছু কম্পোজ করার। নিজের স্বপ্নগুলোকে তো মরে যেতে দিতে পারি না! তাই না? স্বপ্ন ছাড়া আমি অর্থহীন। কোয়ারেন্টিনে খারাপ আছি বলব না। নিজের স্বপ্নগুলো লালন করতে পারি দেখেই বোধ হয় পাগল হয়ে যাইনি। কোনো কিছু একটা করে সময়গুলো কাটাতে পারছি, কম কী? সাহিরর সময় হয়ে গেল। আম্মু জেগে যাবে। যাই একটু ঘুমের অভিনয় করি। এবার বুঝলে কেন ১২টায় উঠি?

            অনুলিখন : জুবায়ের আহম্মেদ

মন্তব্য