kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

বিজ্ঞান

অতিবেগুনিতে করোনা নাশ?

অনেকেই বলছেন, অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে করোনাভাইরাস ধ্বংস করা সম্ভব। আসলেই কি তাই? উত্তর খুঁজেছেন নাবীল অনুসূর্য

৫ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতিবেগুনিতে করোনা নাশ?

জীবাণুনাশক হিসেবে অতিবেগুনি রশ্মি বা আলট্রাভায়োলেট রে-র বেশ নামডাক আছে। এমনকি এটা দিয়ে পানি বিশুদ্ধ করার একটা পদ্ধতি বাতলানো আছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারও। সেটাও খুবই সহজ। পানি একটা স্বচ্ছ পাত্রে করে সরাসরি সূর্যের আলোতে রেখে দিতে হবে ছয় ঘণ্টা। তাতে সূর্যের আলোর অতিবেগুনি রশ্মি পানির অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে তৈরি করবে হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড। বাজারে যেসব জীবাণুনাশক পাওয়া যায়, সেগুলোর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এটি।

ফলে অনেকেরই ধারণা, অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহার করে ঠেকানো সম্ভব করোনাভাইরাস। ব্যাপারটা শুধু ধারণাতেই সীমাবদ্ধ নেই। অতিবেগুনি রশ্মি ব্যবহারের যন্ত্রপাতি বিক্রিও হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণে। থাইল্যান্ডের একটা স্কুলের প্রবেশপথে বসানো হয়েছে এই রশ্মির টানেল। অনেক হাসপাতালে এটা ব্যবহার করা হচ্ছে মেঝে জীবাণুমুক্ত করতে। টাকার মাধ্যমে ছড়ায় বলে ব্যবহার করছে অনেক ব্যাংকও। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যাচ্ছে চীনে। সেখানে অতিবেগুনি রশ্মির বিশাল টানেল বানানো হয়েছে। প্রতি রাতে সব বাসকে সেই টানেলে নিয়ে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, করোনাভাইরাস দমনে এই রশ্মি কি আসলেও কাজে দেয়? উত্তরটা বেশ জটিল। সূর্যের আলোতে মোটমাট তিন ধরনের অতিবেগুনি রশ্মি থাকে—ইউভিএ, ইউভিবি ও ইউভিসি। এর মধ্যে পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছায় মূলত ইউভিএ। এটা সহজেই আমাদের ত্বকে প্রবেশ করতে পারে। এবং ত্বকের বুড়িয়ে যাওয়া, মানে চামড়া কুঁচকে যাওয়া থেকে শুরু করে বলিরেখা—এসবের জন্য মূলত এই রশ্মিই দায়ী।

ইউভিবি আরো বেশি ক্ষতিকর। এটা ত্বকের ডিএনএ নষ্ট করে দিতে পারে। ত্বক পুড়ে যায়। এমনকি স্কিন ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। অবশ্য ভালো সানস্ক্রিন ক্রিম ব্যবহার করে এটা থেকে বাঁচা যায়। তবে সবচেয়ে ক্ষতিকর ইউভিসি। এই আলোর তরঙ্গগুলো ছোট ছোট ও ভীষণ শক্তিশালী। এটা যেকোনো জিনেরই ক্ষতি করতে পারে। এমনকি মানুষেরও। কপাল ভালো এটা বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ভেদ করে আসতে পারে না।

তবে ১৮৭৮ সালে বিজ্ঞানীরা এই ইউভিসিরও একটা ভালো দিক খুঁজে পান। এটা প্রায় সব ধরনের জীবাণুই ধ্বংস করতে পারে। সেই থেকে এটা জীবাণু ধ্বংসের প্রধান পদ্ধতি। সে জন্য কৃত্রিম ইউভিসি ব্যবহার করা হয় হাসপাতালে, বিমানে, অফিসে, কল-কারখানায়। এমনকি খাবার পানি বিশুদ্ধকরণেও।

কিন্তু এটা কি নভেল করোনাভাইরাস ধ্বংস করতে পারে? এখনো পর্যন্ত তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে আরেকটা করোনাভাইরাস নাশে এটা বেশ কার্যকর—সার্স করোনাভাইরাস। সে কারণেই অনেকের ধারণা, নভেল করোনাভাইরাস দমনেও এটা কার্যকর হবে।

তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ এর বিপরীত। তারা হাত বা শরীরের অন্য কোনো অংশ এই রশ্মি দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে কঠোরভাবে না করে দিয়েছে। কারণ এই আলো মানুষের শরীরের জন্য ভালো নয়। ইউভিবিতে ত্বক পুড়তে ঘণ্টাখানেক সময় লাগে। কিন্তু ইউভিসি সময় নেবে স্রেফ কয়েক সেকেন্ড। সরাসরি চোখে পড়লে আরো বিপদ। সরাসরি সূর্যের দিকে তাকালে যেমন চোখে ধাঁধা লাগে, ইউভিসিতে হবে তার দশ গুণ।

অবশ্য বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আরেক ধরনের ইউভিসি রশ্মির সন্ধান পেয়েছেন। তার নাম দেওয়া হয়েছে ফার-ইউভিসি। এটা ইউভিসির চেয়ে অনেক কম ভয়ংকর। কিন্তু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া দমনে সমান কার্যকর। তবে বাণিজ্যিকভাবে অতিবেগুনি রশ্মির যন্ত্রপাতিতে সেটা এখনো ব্যবহার শুরু হয়নি।

অন্যদিকে ইউভিএ ও ইউভিবি দিয়ে কাজ চলবে কি না তা এখনো পরীক্ষিত নয়। আগে একবার ১৫ মিনিট ইউভিএ রশ্মিতে রেখে সার্স করোনাভাইরাস ধ্বংসের পরীক্ষা হয়েছিল। লাভ হয়নি। কিন্তু আরো বেশি সময় রাখলে কী হবে বা ইউভিবি দিয়ে কাজ হয় কি না তা নিয়ে আর পরীক্ষা করা হয়নি।

তবে ধারণা করা হয়, ফ্লু দমনে এই রশ্মি বেশ কার্যকর। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ব্রাজিল। সেখানে গ্রীষ্মকালে ফ্লুর সংক্রমণ বেড়ে যায়। কারণ তখন সেখানকার বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সেই ধোঁয়ার কারণে সূর্যের আলোর ইউভিএ নিচ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। গবেষণায়ও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে—ফ্লুর ভাইরাস যত বেশি সূর্যের আলোতে থাকে তত দুর্বল হতে থাকে।

কিন্তু ফ্লুর ভাইরাস আর কভিড-১৯ সৃষ্টিকারী নভেল করোনাভাইরাস এক নয়। এই ভাইরাস নিয়ে এখনো এ ধরনের কোনো গবেষণা হয়নি। ফলে সূর্যের আলোতে এর কোনো ক্ষতি হয়, তা নিশ্চিতভাবে দাবি করার সুযোগ নেই। হলেও উঠবে নানা প্রশ্ন। তার জন্য কতক্ষণ সূর্যের আলোর প্রয়োজন হবে? আবার একেক অঞ্চলে সূর্যের আলোর প্রখরতা একেক রকম। ফলে এই সময়টাও অঞ্চলভেদে বিভিন্ন হবে। তার ওপর ত্বকের ক্ষতির বিষয়টি তো আছেই। দেখা গেল একজন করোনাভাইরাস থেকে নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে বাঁধিয়ে ফেলল স্কিন ক্যান্সার!

সবচেয়ে বড় কথা, একবার নাক-মুখ-চোখ দিয়ে শরীরের ভেতরে ঢুকে গেলে যত অতিবেগুনি রশ্মিই দেওয়া হোক না কেন, ভাইরাসের কিচ্ছু হবে না। কাজেই অতিবেগুনি রশ্মি নয়, করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে জোর দিতে হবে বারবার হাত ধোয়ার ওপর। আর চেষ্টা করতে হবে নাকে-মুখে-চোখে হাত না দিতে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা