kalerkantho

শনিবার । ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ । ৬ জুন ২০২০। ১৩ শাওয়াল ১৪৪১

হরর ক্লাব

তাহলে তিনি কে ছিলেন!

আব্দুল আলিম ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। বছরখানেক আগে গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলপুর যাওয়ার পথে ভূতুড়ে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। তাঁর মুখেই শুনুন পুরো ঘটনা

২৯ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তাহলে তিনি কে ছিলেন!

বিকেলবেলায় আমার স্ত্রী ফোনে জানায়, ছেলে ফাহিমের খুব জ্বর। শুধু ‘বাবা-বাবা’ করছে। ছেলের অসুখের কথা শুনে আমি বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির উঠি। সন্ধ্যা ৬টায় অফিস ছুটি হলে বাসে চড়ে বসি। দীর্ঘ জ্যাম ও ক্লান্তিকর ভ্রমণ শেষে যখন ফুলপুর এসে পৌঁছি, তখন রাত ১টা বাজে। ফুলপুর থেকে আমাদের বাড়ি দুই কিলোমিটারের মতো। আধা ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেও বাড়ি যাওয়ার রিকশা-ভ্যান কিছুই পাইনি। হেঁটে যাওয়ার জন্যই মনস্থির করি; কিন্তু এত রাতে হেঁটে যাব—ভাবতেই ভয়ে আঁতকে উঠি। মনেপ্রাণে চাচ্ছিলাম, যদি অন্তত একজন লোক পাই, যার সঙ্গে কথা বলতে বলতে হাঁটা যাবে। তা-ও পাইনি। অগত্যা একাই হাঁটা শুরু করি। রওনা দেওয়ার সময় স্ত্রীকে ফোন করি। বলি, কোনো যানবাহন পাইনি। হেঁটে আসছি। সে জানতে চায়, আমার সঙ্গে কেউ আছে কি না। আমি বলি, না। কাউকে পাইনি। অনন্যোপায় হয়ে একাই হাঁটছি। ফুলপুর থেকে আধা কিলোমিটার আসার পর মনে হলো, সমস্ত প্রকৃতি মানুষজনের সঙ্গে ঘুমে ন্যুব্জ। শান্ত, নিথর। মাঝেমাধ্যে ঝিঁঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। মোবাইল টর্চের সাহায্যে পথ দেখে এগিয়ে চলছি। মনে মনে দোয়া-দুরুদ পড়ছি। হঠাৎ রাস্তার পাশের কলাগাছে ধপ করে শব্দ হয়। নীরবতার মাঝে সামান্য শব্দটিও আমার মনে তীরের মতো বিঁধে যায়। চমকে উঠি। থমকে দাঁড়াই। মোবাইল টর্চের আলো ফেলে দেখি, একটি বাদুড় কলাগাছের পাতায় ঝুলছে। সাহস সঞ্চয় করে আবার সামনে এগোতে থাকি। কিছুক্ষণ পর মনে হয়, কিছু একটা পেছন থেকে সামনে গেল। দৌড়ে। সাদা রঙের কিছু একটা হবে। আমার বুকে ধুকধুকানি বেড়ে যায়; কিন্তু সেদিকে তাকাই না। হাঁটছি। দ্রুত পায়ে, কালেমা মুখে। কিছুদূর হাঁটার পর খেয়াল করি, কিছু একটা আমার সামনে দিয়ে হাঁটছে। সাদা। ওটা ‘মিউমিউ’ করে ডেকে ওঠে। ও, একটা বিড়াল। বিড়ালটার দিকে আলো ফেলি। আলো দেখে আমার দিকে উল্টে তাকায়। সাদা চোখ দুটি যেন জ্বলছে। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে সন্দেহ দানা বাঁধতে শুরু করে, ‘এটা বিড়াল তো! নাকি বিড়ালরূপী অন্য কিছু!’ হাত-পা কাঁপতে থাকে। কিন্তু থেমে থাকলে তো চলবে না। এগোচ্ছি। অনুভব করি, বিড়ালটা আমার সঙ্গে আর আসছে না। যদিও আমি পেছন দিকে ফিরে তাকাইনি। এমনিভাবে প্রায় অর্ধেক রাস্তা পার করে চলে আসি। এতটুকু রাস্তা পার করি; কিন্তু একটা যানবাহনও চোখে পড়েনি। এমন সময় আবছা আলোয় দেখতে পাই, পথের পাশে কেউ একজন বসে আছে। হ্যাঁ, মানুষই। মনে হলো প্রস্রাব করছে। বয়স ৬০-৬৫ হবে। ধবধবে সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরনে। আমার মনে ভয় ধরে যায়, আবার কোনো বিপদের মুখোমুখি হচ্ছি না তো! কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে তিনি উঠে দাঁড়ান। খক খক করে কেশে বলেন, কে বাবা তুমি? বলি, আমি আব্দুল আলিম। তিনি আবার জানতে চান, কোথায় যাবে বাবা? উত্তরে বলি, দত্তপাড়া। তিনি এবার বলেন, আমিও ওদিকেই যাব। চলো তাহলে। এই বৃদ্ধ লোকটিকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েও ভয়মুক্ত হতে পারিনি। কারণ লোকটিকে চিনতে পারিনি। আমি আর লোকটি পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি, মাঝেমধ্যে এক-আধটু কথা হচ্ছে। তিনি জিজ্ঞেস করেন, তোমাদের বাড়ির নাম কী? আমি বলি, আমাদের বাড়ির নাম হাজিবাড়ি। আব্দুল্লাহ হাজি আমার বাবা। লোকটি উত্ফুল্ল মনে হয়। তিনি বলেন, তোমার আব্বা বড় ভালো লোক। এবার তিনি তাঁর পরিচয় দেন, আমি আশিক তরফদার। বেপারীবাড়ির মোস্তফাকে চেনো? আমি বলি, হ্যাঁ, মোস্তফা চাচাকে তো চিনিই। তিনি বলেন, আমি মোস্তফার একমাত্র বোনের জামাই। তোমার বাবা আমাকে চেনেন। তাঁকে আমার ‘সালাম’ দিয়ো। আমাদের বাড়ির কাছাকাছি এসে তিনি বেপারীবাড়ির রাস্তা ধরেন। মনে মনে বলি—যাক, মুরব্বির সঙ্গ পেয়ে ভালোই হলো। বাড়িতে এসে দেখি, মা-বাবা আর আমার স্ত্রী আমার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবা এগিয়ে এসে জানতে চান, পথে কোনো সমস্যা মানে ভয়টয় পাওনি তো? আমি বলি, তরফদার আংকলকে পেয়ে যাওয়ায় ভয়টা কম পেয়েছি। বাবা জানতে চান, কোন তরফদার? আমি বলি—আশিক তরফদার। তিনি আবার জানতে চান, কোন আশিক তরফদার? আমি বলি—উনি তো বললেন, বেপারীবাড়ির মোস্তফা চাচার একমাত্র বোনজামাই তিনি। বাবা এবার বিস্মিত হলেন। ‘বলিস কী, ওই আশিক তরফদার তো আমার বন্ধু মানুষ ছিল। আমি বাবার দিকে তাকাই। আশ্চর্য চোখে। ‘ছিল মানে!’ এবার বাবার কণ্ঠে ভয়ের সুর। তিনি বলেন, ছিল মানে এখন আর নেই। গত সপ্তাহেই তো আশিক তরফদার মারা গেল। আমি নিজ হাতে তাকে দাফন করে এলাম! আমার সারা শরীর বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। ‘মারা গেছেন! তাহলে আমি কার সঙ্গে এলাম!’

                                                                     (অনুলিখন : মো. মাঈনউদ্দীন)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা