kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

বিজ্ঞান

ভিঞ্চির নোট বুক

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মোনালিসার স্রষ্টা লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি আমাদের কাছে চিত্রশিল্পী হিসেবে বেশি পরিচিত হলেও তাঁর নোট খাতাগুলোয় কী আছে জানলে চমকে উঠবে। ওই সব নোট বুকে মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, হৃদপিন্ডের গঠন, তা কিভাবে কাজ করে, পাখি কিভাবে ওড়ে, কালি তৈরির পদ্ধতি, প্যারাশুূট, উড়ালযান, ডুবোজাহাজ তৈরির বিভিন্ন বুদ্ধি, যুদ্ধাস্ত্র তৈরির নানা নকশা ঠাঁই পেয়েছে এমন কত্ত কিছু। চলো আজ সেসব খাতার পৃষ্ঠায় উঁকি মেরে জেনে নিই লিওনার্দোর কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও আবিষ্কারের কথা! সাহায্য করছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব

কাচের হৃদপিণ্ড 

শারীরবিদ্যাও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির চিন্তাভাবনা থেকে বাদ যায়নি। ফলে অবধারিতভাবেই তিনি হৃদপিন্ডের  গঠন এবং এর কাজ নিয়েও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাঁর নোট খাতায় উল্লিখিত একটি পরীক্ষার কথা তোমাদের না বলে পারছি না। মানুষের হৃদপিন্ডের  ভেতরের অবস্থাটা বোঝার জন্য ভিঞ্চি প্রথমে একটি ষাঁড়ের হৃদপিণ্ড কে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে একটি আস্ত কাচের হৃদপিন্ডের  মডেল তৈরি করেন। এটি তৈরির পরের কাজটি ছিল হৃদপিন্ডে রক্ত চলাচল পরীক্ষা। সে জন্য তিনি পানি এবং কিছু ঘাস সেই কাচের হৃদপিন্ডে প্রবেশ করিয়ে ভেতরের পানি ও ঘাসের প্রবাহ লক্ষ করেন। সেখান থেকেই অসাধারণ প্রতিভাধর লিওনার্দো বের করে ফেলেন মানুষের দেহে রক্ত চলাচলের নানা অজানা কথা। বিবিসির তথ্যমতে, মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি এবং সেগুলোর কাজের বিবরণ নিয়ে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির নোট খাতা ভর্তি থাকলেও হৃিপণ্ডের কার্যকলাপ নিয়েই আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৫০৭ সাল থেকে তিনি হৃদপিণ্ড  নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মেতে উঠেন এবং লিপিবদ্ধ করে রাখেন সে সম্পর্কিত নানা তথ্য। একজন ১০০ বছর বয়সী মৃত ব্যক্তির হৃদপিণ্ড  পরীক্ষা করে তিনিই সর্বপ্রথম করোনারি আর্টারি রোগের বর্ণনা দেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো প্রায় ৫০০ বছর আগে হৃিপণ্ড নিয়ে লিওনার্দোর নোট খাতায় পাওয়া বিভিন্ন আবিষ্কারের মধ্যে বেশির ভাগই বর্তমানে সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।

প্যারাশুট

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যে তাঁর সময়ের চেয়ে কতটা এগিয়ে ছিলেন তা তাঁর আবিষ্কারগুলো দেখলেই বোঝা যায়। আধুনিক প্যারাশুট আবিষ্কারের কয়েক শতক আগেই  নিজের ধারণা এবং পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়ে একটি প্যারাশুটের নকশা করেন। সেই নকশার পাশে লেখেন, যদি একজন মানুষের ২৩ ফুট প্রশস্ত এবং ২৩ ফুট গভীর লিনেনের তৈরি একটি তাঁবু থাকে তবে সে যেকোনো উচ্চতা থেকেই একেবারে নিরাপদে অবতরণ করতে পারবে। বহু বছর চলে গেলেও লিওনার্দোর এই আবিষ্কারটিকে কেউ পরীক্ষা করে না দেখায় তা ঢাকা পড়ে যায়। কিন্তু আড্রিয়ান নিকোলাস নামের এক ব্যক্তি একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নিয়ে লিওনার্দোর সেই প্যারাশুটটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখেন। দ্য গার্ডিয়ান থেকে জানা যায়, ১৪৮৫ সালে ভিঞ্চির আঁকা নোট খাতার নকশা অনুযায়ী একটি প্যারাশুট বানিয়ে আড্রিয়ান নিকোলাস আকাশে উড্ডয়নরত বেলুন থেকে লাফ দিয়ে প্রায় দেড় মাইল ভেসে ভূমিতে নিরাপদে অবতরণ করেন। তবে ২০০০ সালে ৩৮ বছর বয়সী সাহসী মানুষটির সেই পরীক্ষাটি খুবই ভয়ানক ছিল, কারণ প্যারাশুট বিষয়ে প্রায় সব অভিজ্ঞ ব্যক্তিই লিওনার্দোর নকশাকে অকেজো হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। কিন্তু ভয়ানক দুঃসাহসিকতা দিয়ে মাটিতে নিরাপদে পৌঁছে নিকোল প্রমাণ করেন যে ভিঞ্চি তাঁর নোট খাতায় ঠিকই লিখেছিলেন।

হেলিকপ্টার

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি ১৫০৫ থেকে ১৫০৬ সালে একটি ছোট নোট খাতার পুরোটাই পাখির ওড়ার কৌশলের সচিত্র বিবরণ দিয়ে ভরে ফেলেন। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মাথায় উড়ালযান তৈরির ভূত চেপে বসে। সে জন্য বিস্তারিত বিবরণসহ বহু স্কেচ আঁকেন এবং একাধিক উড়ালযানের নকশাও তৈরি করেন। স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, লিওনার্দো পাখির ওড়ার কৌশল এবং উড়ালযান তৈরির বিভিন্ন বুদ্ধি নিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার শব্দ লেখেন এবং ৫০০ স্কেচ আঁকেন। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো তাঁর বিভিন্ন উড়ালযানের মধ্যে বর্তমানকালের হেলিকপ্টারের মতো একটি যানও ছিল! এই স্কেচটি তিনি করেন ১৪৯৩ সালে আধুনিক হেলিকপ্টার আবিষ্কারের প্রায় ৪৫০ বছর আগে! ইঞ্জিন তখনো আবিষ্কার হয়নি বলে লিওনার্দোর হেলিকপ্টার ছিল মনুষ্যশক্তিচালিত। খসড়া অনুযায়ী চারজন মানুষকে একটি কাঠের পাটাতনের ওপর চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে হেলিকপ্টারটির পাখা ঘোরাতে হতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, লিওনার্দোর হেলিকপ্টার কি উড়বে? উত্তরটা পাওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছেন। দেখা গেছে চারজন মানুষ এবং হেলিকপ্টারের ভর মিলে এতই ভারী হয়ে যায় যে সেটির আর ওড়ার কোনো সামর্থ্যই থাকে না। তা ছাড়া মানুষও উড়ালযানটির পাখাটিকে প্রয়োজনীয় গতিতে ঘোরাতে পারে না বলে লিওনার্দোর হেলিকপ্টারও কখনো উড়তে পারেনি। তবে সেটি আধুনিক কালের হেলিকপ্টার তৈরির পথিকৃৎ এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

 

বহুনলা কামান

ভিঞ্চি কিন্তু যুদ্ধাস্ত্র তৈরি নিয়েও বহু চিন্তাভাবনা করেছেন। স্টিমিট.কম থেকে জানা যায়, ১৪৮২ সালে তিনি মিলানের ডিউকের দ্বারা বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র উদ্ভাবনের কাজে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সে সময়ে তৈরি কামানের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল, সেগুলো একই সময়ে মাত্র একটি গোলা ছুড়তে পারত। ফলে আরেকটি গোলা ভরতে এবং ছুড়তে লেগে যেত প্রচুর সময়। এই সমস্যা দূর করতে লিওনার্দো একটির পরিবর্তে তিন সেট নল ব্যবহার করেন তাঁর নোট বুকে। প্রতি সেটে ১১টি করে নল। প্রতিটি নল থেকেই স্বাধীনভাবে গোলা ছোড়া যাবে এভাবে। ফলে এক সেট নল থেকে গোলা ছোড়ার পর অন্য সেট নল থেকে তখনই গোলা ছোড়া এবং সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা সেটের নলগুলোতে গোলা ভরে নেওয়া সম্ভব। এভাবে একটি গোলা ছোড়ার পর কোনো সময় অপচয় ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে শত্রুপক্ষের ওপর গোলা ছোড়া অব্যাহত রাখা সম্ভব; এ যেন একের ভেতর ৩৩টি কামান! স্টিমিট.কমের তথ্যমতে, ১৯৬৮ সালে ক্রোয়েশিয়ায় ভিঞ্চির পরিকল্পিত তিন নলা একটি কামান পাওয়া যায়। ভিঞ্চির এই আবিষ্কারকেই আধুনিক কালের মেশিনগানের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।   

 

গাড়ি

সেই ৫০০ বছর আগে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি স্বচালিত গাড়ির নকশা করেছিলেন! নকশা অনুযায়ী গাড়িটিকে ধাক্কা দিতে হতো না কিংবা সাইকেলের মতো প্যাডেল দেওয়ারও কোনো প্রয়োজন পড়ত না। গাড়িটি কয়েল স্প্রিংয়ের মাধ্যমে নিজে নিজেই চলত। তাই  অনেকে এটিকে বিশ্বের প্রথম রোবট হিসেবেও ধরে নেন। শুধু তা-ই নয়, গাড়িটিতে স্টিয়ারিং এবং ব্রেকও ছিল। তাঁর গাড়িটি এতটাই আধুনিক ছিল যে এটি বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের অবাক করে রেখেছে। ২০০৬ সালে ফ্লোরেন্সের ইতালি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড মিউজিয়াম অব দ্য হিস্টোরি অব সায়েন্স ভিঞ্চির সেই বিখ্যাত নকশা থেকে গাড়িটি তৈরি করে সবাইকে অবাক করে দেয়। কারণ তাদের বানানো গাড়িটি সত্যি সত্যিই কাজ করে। সেটা কিভাবে কাজ করে তা জানতে চাইলে ঝটপট দেখে নিতে পারো এই ভিডিওটি!

https://www.youtube.com/watch?v=a2qeZrejZp0

লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্ম ১৪৫২ সালের ১৫ এপ্রিল ফ্লোরেন্সের অদূরবর্তী ভিঞ্চি নগরের এক গ্রামে। আর মৃত্যু ১৫১৯ সালের ২ মে। অর্থাৎ তাঁর সব আবিষ্কার প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো।

ইতালীয় রেনেসাঁর কালজয়ী চিত্রশিল্পী এই পরিচয় ছাড়াও তাঁর আরো অনেক পরিচয় রয়েছে। বহুমুখী প্রতিভাধর মানুষটি একজন ভাস্কর, স্থপতি, সংগীতজ্ঞ, সমরযন্ত্রশিল্পী এবং বিংশ শতাব্দীর বহু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের নেপথ্য জনক।

ভিঞ্চি কিন্তু বাম হাতে লিখতেন। এখানেই শেষ নয়! তিনি আমাদের মতো বাম থেকে ডানে না লিখে ডান থেকে বামে লিখতেন।

তাঁর বিস্তর কাজের মধ্যে মাত্র সাত হাজার পৃষ্ঠা এখনো অক্ষত আছে। তাঁর লেখার অর্থ বুঝতে না পারার কারণে অযত্ন-অবহেলায় অনেক অমূল্য আবিষ্কার কালের অতলে হারিয়ে গেছে।

লিওনার্দোর অনেক নকশাই শুধু তাঁর পর্যবেক্ষণ এবং অভিজ্ঞতার আলোকে করা। সেগুলো বেশির ভাগই তিনি বাস্তবে পরীক্ষা করে দেখেননি। তা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর পর নোট খাতার নকশা অনুযায়ী বিভিন্ন জিনিস বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে এবং পুরোপুরি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। কোনো পরীক্ষা ছাড়া সেই সময়ে এত নিখুঁত নকশা করা সত্যিই আশ্চর্যজনক একটি ব্যাপার।

এত কথা শুনে নিশ্চয়ই লিওনার্দোর নোট খাতাটি কেমন ছিল তা জানার কৌতূহল জেগেছে! তাহলে দেরি না করে তাঁর নোট খাতার কিছু অংশে উঁকি দিতে চলে যেতে পারো এই লিংকে! http://www.bl.uk/manuscripts/Viewer.aspx?ref=arundel^ms^263^f001r

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা