kalerkantho

মঙ্গলবার । ৫ ফাল্গুন ১৪২৬ । ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪১

ধারাবাহিক উপন্যাস
তনু কাকা

রাজবাড়ির আন্ধকারে

মোস্তফা মামুন

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



রাজবাড়ির আন্ধকারে

অঙ্কন : মাসুম

(পূর্ববর্তী সংখ্যার পরে)

বিক্রম সাহেবের চোখ ভিজে যায়। নিজের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কান্না যায় না বলেই কি না তিনি চোখ লুকান। আমাদেরও চোখ ভিজে আসে।

এসব সময়ে অবশ্য কাকা কিভাবে যেন আবেগমুক্ত থেকে যায়। স্বাভাবিক গলায় জানতে চায়, ‘তাহলে আপনাকে আনোয়ার সাহেবের সন্দেহ কেন? সন্দেহ বলা ঠিক হবে না, উনি মোটামুটি নিশ্চিত।’

‘সেটাই তো প্রশ্ন রে ভাই। কত বোঝানোর চেষ্টা করলাম।’

‘এটা কি ঠিক আপনি সেদিন অসুস্থ ছিলেন?’

‘ঠিক। এটাই তো পয়েন্ট। আমি অসুস্থ হয়ে ঢাকায় পড়ে আছি, এই সুযোগটাই কেউ নিয়েছে।’

‘আঁখির মাকে তাহলে আপনি ফোন করেননি?’

‘প্রশ্নই ওঠে না। আনোয়ার আমাকে রেখে মাত্র বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ওনার মাথায় সহজ জিনিসটাই ঢুকছে না, আঁখিকে দেখতে চাইলে তো ওকেই বলতে পারতাম।’

‘তা ঠিক। কিন্তু এমনও তো হতে পারে যে, আপনি চেয়েছিলেন আনোয়ার সাহেব না জানেন...উনি রাস্তায় থাকা অবস্থায়ই। তা ছাড়া ওনার ফোনটাও সঙ্গে ছিল না এটা আপনিই শুধু জানতেন।’

‘ফোনটা ও ভুল করে ফেলে এসেছিল। ওর এই ফোন ফেলে যাওয়ার অভ্যাস আছে।’

‘বুঝলাম। তাহলে আপনার কি মনে হয়? আপনার নাম করে ফোন করে আঁখিকে কে ঘর থেকে বের করতে পারে?’

‘সেটাই তো খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’

‘কত দূর এগোলেন?’

‘খুব বেশি দূর আগাতে পারিনি, আবার বলতে পারেন অনেক দূর এগিয়েছি।’

‘বুঝলাম না।’

‘বুঝিয়ে বলছি।’

‘আগে বলুন, আপনার সন্দেহটা দূর হয়েছে?’

‘তাতে লাভ কী? আনোয়ার সাহেবের কাছে আপনি ততক্ষণই অপরাধী, যতক্ষণ পর্যন্ত আঁখিকে পাওয়া না যাচ্ছে।’

‘সত্যি বললে আমার নির্দোষ প্রমাণিত হওয়াটা গৌণ। মূল বিষয় মেয়েটাকে খুঁজে পাওয়া। আনোয়ার আমাকে সন্দেহ করায় মুশকিল হচ্ছে—মেয়েটাকে খুঁজতে হচ্ছে লুকিয়ে লুকিয়ে, এটাই সমস্যা।’

‘আচ্ছা এটা কি এ রকম হতে পারে না যে আপনি কাজটা যেভাবে করতে চাইছেন, মানে এই স্থাপনাগুলোর সংস্কার করতে চাইছেন এর আদি কাঠামো ঠিক রেখে, সেই কাজে যারা বাধা দিচ্ছে আপনি তাদের ফাঁসিয়ে দিতে চান!’

‘ফাঁসিয়ে দিয়ে আমার লাভ?’

‘ওরা সরে দাঁড়াল।’

‘ওরা সরে দাঁড়ানোর লোক না।’

‘কিভাবে প্রমাণ করবেন?’

‘ওদের এখানে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। ওরাই আমাকে সরাতে চায়।’

‘হুঁ, কিন্তু ড. আসগর যে বলছেন আরেকটি কারণও আছে।’

ড. আসগর আবার কেঁপে ওঠেন।

‘কি কারণ?’ বিক্রম সাহেবও একটু অবাক হয়ে আসগরের দিকে তাকান।

‘ময়মনসিংহ গীতিকার একটা পুরনো সংস্করণ ছিল আনোয়ার সাহেবের কাছে। সেটার জন্য?’

‘আমি বিষয়টি জানি। ওটা তো তারা পেয়ে গেছে। মেয়েকে তো এর জন্য অপহরণের আর দরকারই পড়ে না।’

‘এর মানে কি দাঁড়ায় না যে আরেকটি পক্ষ আছে, যারা আঁখিকে অপহরণ করতে চেয়েছিল।’

‘আমার মনে হয় ওরা না।’

‘কেন মনে হয়?’

বিক্রম সাহেব গলা নামিয়ে বলেন, ‘কারণ তাদের সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হচ্ছে।’

‘তাই নাকি?’

আদৃতা চিত্কার করে জানতে চায়, ‘আঁখি কেমন আছে?’

বিক্রম বলেন, ‘আঁখি ভালো আছে। বেঁচে আছে। ওরা যত্নেই রেখেছে। আমার সঙ্গে আজও কথা হয়েছে।’

‘তাই নাকি?’ কাকাও অবাক।

‘হ্যাঁ। ওরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে নিয়মিত। ওদের শর্ত একটাই, আমি সরে দাঁড়াব। ওরা আঁখিকে ফেরত দিয়ে দেবে।’

‘আপনি সেটা মানতে রাজি?’

‘ছিলাম না শুরুতে। ফোন পেয়ে চেষ্টা করেছি ওদের আস্তানা খুঁজে বের করতে। কত জায়গায় যে ঘুরেছি, ফোন রেকর্ড করেছি, ফোনের লোকেশন বের করে জায়গামতো গিয়েছি; কিন্তু পাইনি। এদের হাত যে এত লম্বা তা বুঝতে পারিনি।’

‘এখন কি আপনি রাজি হয়ে যাচ্ছেন?’

‘আর তো কোনো উপায় দেখি না।’

এবার বিক্রম সাহেব সত্যিই ভেঙে পড়েন। এ রকম মানুষ হাউমাউ করে কাঁদবেন, ভাবতেই পারিনি। তবে এর মধ্যেও আনন্দের খবর এটাই। আঁখি বেঁচে আছে। ওকে ফিরে পাওয়া খুবই সম্ভব।

কাকা জানতে চায়, ‘আপনি আনোয়ার সাহেবকে এটা জানাননি?’

‘জানানোর সুযোগ কোথায়? ও তো আমার কথা বিশ্বাসই করে না। তাই শেষ পর্যন্ত আসগর সাহেবের সঙ্গে কথা বলে আপনার কাছে এলাম। আপনি বললে আনোয়ার বিশ্বাস করবে হয়তো। তখন হয়তো সবাই মিলে...’

কাকা একটু ভেবে বলে, ‘ওদের কি এই একটাই শর্ত। আপনি এসব থেকে সরে যাবেন।’

‘হ্যাঁ, শর্তটা হলো আমাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে বলতে হবে যে এটা আসলে করা সম্ভব নয়। এখানে মাল্টিপ্লেক্স বিল্ডিং করাই ভালো। আমার ফার্ম একটা বিশ্বখ্যাত ফার্ম, এ বিষয়ে আমাদের মতামতটাকেই শেষ কথা ধরে নেওয়া হয়।’

‘আপনার জন্য কাজটা তাহলে কঠিনই। আপনার পুরো ক্যারিয়ার শেষ।’

‘সেটা এমন কোনো সমস্যা না। আমি ফ্রান্সে চলে যাব। আমি সে দেশেরও নাগরিক। এই বিষয়ে আমার যে দক্ষতা তাতে বিশ্বের যেকোনো কম্পানিতে আমার লাখ লাখ ডলারের চাকরি বা কনসালট্যান্সি আছে; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য...’

‘ওদের শর্ত হলো বিষয়টি এমনভাবে ঘটবে, যেন আমিই অপহরণ করেছিলাম। ভাবা যায়, আমি আর কোনো দিন আঁখিকে দেখতে পাব না। ও বড় হয়ে জানবে, একটা জোচ্চোর মানুষ ওকে নিজের মেয়ের মতো আদর করার ভঙ্গি করে অপহরণ করে নিয়েছিল। ভাবা যায়!’

বিক্রম সাহেব হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।

আমরা কী বলব বুঝতে পারি না।

 

১০.

কাকা বলল, ‘আপনি একটা পাল্টা প্রস্তাব দেবেন।’

বিক্রম সাহেব বলেন, ‘কী প্রস্তাব?’

‘বলবেন আঁখিকে আপনার কাছে ফিরিয়ে দিতে। আপনি ওকে নিয়ে ফ্রান্স চলে যাবেন।’

বিক্রম সাহেব যেন ঠিক বুঝতে পারেন না।

কাকা বলে, ‘আপনার কি ধারণা এই প্রস্তাবে ওরা রাজি হবে?’

‘হবে।’

‘তাহলে আপনি সেটাই করুন।’

‘তাতে তো আমার সব শেষ। আঁখি আমার সঙ্গে যেতে চাইবে না। আনোয়ার আরো নিশ্চিত হবে আমিই...’

‘সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো মেয়েটাকে উদ্ধার করা দরকার।’

বিক্রম সাহেব চুপ করে ভাবতে থাকেন।

এখন আমরা আমাদের হোটেলরুমেই। শশী লজ থেকে বিক্রম সাহেবকে সঙ্গে করেই ফিরেছি। তাঁর কাছ থেকে জানা গেছে, প্রতিদিন রাত ৮টার সময় ওরা তাঁকে ফোন করে। সেই সময় আঁখির সঙ্গে ওকে কথাও বলিয়ে দেয়।

আঁখির সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি যে সত্য সেটা আমাদের কাছে প্রমাণ করতেই বিক্রম সাহেবও হোটেলে এসেছেন। ঠিক হয়েছে, আঁখির সঙ্গে কথা বলার পর আমরা আমাদের পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। ড. আসগর অবশ্য আসেননি। ওর নাকি কী একটা ওষুধ খেতে হয়। দরকার হলে রাতে আমাদের সঙ্গে হোটেলে দেখা করবেন, জানিয়ে গেছেন।

এখন সাড়ে ৭টা বাজে। আরো মিনিট ১৫ সময় আছে হাতে।

কাকার ফোন বাজে। ভেবেছিলাম আনোয়ার সাহেব; কিন্তু কাকা ফোনটা ধরেই বলে, ‘জি নবারুন বাবু বলুন।’

আরো কিছু কথাবার্তা হয় তার সঙ্গে। নবারুন বাবু জানতে চান, আমাদের ভ্রমণ কেমন হলো, তিনি ঠিকঠাক খাতির করতে পারেননি বলে কিছুটা আফসোসও করলেন।

কাকা বলল, ‘খুব খাতির হয়েছে। সুবেদার আপনাকে বলেনি সব কিছু?’

‘হ্যাঁ, তা বলেছে।’ স্পিকারে দেওয়ায় আমরাও কথাগুলো শুনতে পাই। ‘তবু আমি থাকলে আরেকটু ভালো হতো। কিছুই করতে পারলাম না আপনাদের জন্য।’

নবারুন বাবু ফোনটা রাখতেই বিক্রম বলেন, ‘একমাত্র এই ভদ্রলোকই কিছুটা আমার অবস্থান বুঝতে পেরেছেন।’

‘তাই নাকি? ওনার সঙ্গে যোগাযোগ আছে আপনার।’

‘উনি আমাকে বিশ্বাস করেছিলেন; কিন্তু আনোয়ার সাহেবকে বিশ্বাস করাতে পারেননি।’

‘ও’।

কাকা হঠাৎ জানতে চায়, ‘আপনি তো গত কিছুদিন ফোন ট্র্যাকিংয়ের কাজটা করেছেন?’

‘জি। আমার এক বন্ধু আছে ফোন কম্পানির বড় কর্তা। ওকে ধরে, যতবার আমার কাছে ফোন এসেছে প্রতিবারই আমি ট্র্যাক করেছি। কিন্তু সমস্যা হলো, ওরা সাধারণত ফোন করে নানা রকম অ্যাপস থেকে। যেগুলো ঠিক ট্র্যাক করা যায় না। করলেও সময়সাপেক্ষ।’

‘আচ্ছা আমি আপনাকে এখন একটা ফোন নম্বর দিচ্ছি। এটা এখনই ট্র্যাক করা যাবে।’

বলে কাকা ওর মোবাইল বের করে একটা নম্বর দেয় বিক্রম সাহেবকে।

বিক্রম সাহেব নম্বরটা নিয়ে কী যেন একটা মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। কাকা বলে, ‘সম্ভব হলে আজ সারা দিন কার কার সঙ্গে ওর কথা হয়েছে এটাও বের করা সম্ভব।’

বিক্রম সাহেব নম্বরটি তাড়াতাড়ি এসএমএস করে দেন ওর সেই বন্ধুকে।

আমি নম্বরটি কার জিজ্ঞেস করতে যাব, পারলাম না। সেই সময়ই বেজে ওঠে বিক্রম সাহেবের ফোন।

বিক্রম সাহেব স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই বললেন, ‘এই যে...’ ফোনটা ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে প্রশ্ন, ‘আজকের মধ্যেই ডিলটা আমরা শেষ করে ফেলতে চাই।’

‘আজকের মধ্যেই?’

‘হ্যাঁ। আপনি রাতের মধ্যেই ডিজাইনগুলো আর এই প্রজেক্ট করা সম্ভব নয় এ রকম চিঠি দিয়ে বেরিয়ে যাবেন। কালকে ধরবেন প্যারিসের ফ্লাইট। আপনি ফ্লাইটে ওঠার পরই মেয়েটা ওর বাসায় চলে যাবে।’

‘কিন্তু আমি ফ্লাইটে ওঠার পর যদি মেয়েটাকে আপনারা না ছাড়েন।’

‘আহাম্মকের মতো কথা বলবেন না। এই মেয়েটাকে আমাদের কোনো দরকার নেই। ওকে আমরা ধরে রাখব কেন?’

‘কিন্তু আপনাদেরই বা আমি বিশ্বাস করব কোন যুুক্তিতে?’

‘এ ছাড়া আপনার আর কোনো উপায় নেই।’

‘হুঁ।’ একটু থামেন বিক্রম সাহেব।

কাকা তাড়া দেয়। সেই পাল্টা প্রস্তাবটা দেওয়ার জন্য।

বিক্রম সাহেব গলা পাল্টে বলেন, ‘তার চেয়ে বরং আরেকটি ভালো প্রস্তাব আছে আমার কাছে।’

‘আপনার আবার কী প্রস্তাব?’

‘মেয়েটিকে আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেন। আমি ওকে নিয়ে ফ্রান্সে চলে যাব। ব্যস। সব শেষ।’

     (চলবে)

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা