kalerkantho

শনিবার । ৯ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২৭ জমাদিউস সানি ১৪৪১

টিন তারকা

উড়ছে মোহনা

১৯ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



উড়ছে মোহনা

বিটিভিতে ছোবল নাটক দিয়ে মিডিয়ায় যাত্রা শুরু মোহনা মাহাজাবীনের। ২০টির বেশি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছে এরই মধ্যে। দুরন্ত টিভির ‘মনের জাদুঘর’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করেও নাম কামিয়েছে। এবার অভিষেক হচ্ছে বড় পর্দায়। ‘পরাণ’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে দেখা যাবে তাকে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে পড়া খুদে অভিনেত্রীর সঙ্গে গল্প করেছেন গোলাম মোর্শেদ সীমান্ত

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মুক্তমঞ্চে শুরু হয় মোহনার সঙ্গে আড্ডা। সঙ্গে নিয়ে এসেছে আরেকটি মেয়েকে। সেও শিশুশিল্পী। কিছুদিন আগে গ্রামীণফোনের এক বিজ্ঞাপনে ছোট একটি মেয়েকে দেখতে পাই আর আজ দেখি সেই মেয়েটি আমার সামনে। জানতে পারলাম ও মোহনার বোন। তবে আড্ডাটা হবে আজ মোহনার সঙ্গেই।

 

নাচ, আবৃত্তি, অভিনয়

২০১৫ সাল, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি নাচের ওপর তিন বছরের কোর্সে ভর্তি হয় মোহনা। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ে আসা। কথা বলে মানুষকে মুগ্ধ করা সবচেয়ে কঠিন। কিন্তু মোহনার জন্য কাজটা বেশ সহজ হয়ে যায় তার মধুর বাচনভঙ্গির কারণে। ছোটবেলা থেকেই আবৃত্তি শিখছে এই খুদে তারকা। অভিনয় শেখার জন্য এক বছরের একটা কোর্স করে মোহনা শিশু একাডেমিতে। বিটিভিতে ধারাবাহিক নাটক ছোবলের মাধ্যমে অভিনয়ের জগতে পা দেয়। নাটকটিতে নীলা চরিত্রে অভিনয় করে সে। তারপর বিজ্ঞাপনে ডাক পাওয়া শুরু। এখন তো সিনেমায়ও ডাক পেয়ে গেছে। বর্তমানে নাচ শিখছে নন্দনকলায়।

 

নাচতে নাচতে তার্কিতে

শিশু একাডেমির তিন বছর কোর্স সমাপনী পরীক্ষায় প্রথম হয় সে। যারা ভালো নাচ করে, তাদের নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে ভিনদেশি বিভিন্ন নাচের প্রতিযোগিতায় দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠায় শিশু একাডেমি। সে সূত্রেই ২০১৬ সালে তুরস্কে যায়। তখন তার বয়স ৯ বছর, পড়ছে তৃতীয় শ্রেণিতে। মোহনা বলল, প্রতিবছরই শিশু একাডেমি থেকে বাইরের দেশে নাচের প্রতিযোগিতায় পাঠানো হয় প্রতিযোগীদের। বিচারকরা নির্বাচন করেন, কারা যাবে সেসব প্রতিযোগিতায়। তার্কিতে যাই আমরা আটজনের একটি দল। কষ্টের ব্যাপার ছিল, পরিবার ছাড়া যাওয়াটা। তাদের ছাড়া কখনো দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি, তাও একেবারে দেশের বাইরে। সেখানে ৩৭টি দেশের প্রতিযোগীরা অংশ নেয়। তিনটি ধাপে আয়োজিত হয় অনুষ্ঠানটি। আমাদের দলের সবচেয়ে ছোট সদস্য ছিলাম আমি। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, সেখানের মানুষের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলতে হবে। গিয়ে দেখি তারা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলছে। তখন তাদের ইশারায় কথা বুঝানো লাগত, ওটা ছিল একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা। সেখানকার খাবারদাবারও অন্য রকম। খেতে খানিকটা কষ্ট হয়। এ ছাড়া প্রতিটি দেশের প্রতিযোগীরা আমাকে অনেক গিফট দিয়েছিল। আমিও তাদের গিফট দিয়েছিলাম।

 

যত কাজ

এখন পর্যন্ত ২০টি বিজ্ঞাপনে কাজ করেছে মোহনা। এর মধ্যে রবি, হারপিক, ডোমেক্স, হরলিক্সের কাজগুলো উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বেশ কিছু ফ্যাশন হাউসে মডেল হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে আছে সেইলর, নয়ার, শৈশব। দুরন্ত টিভিতে ‘মনের জাদুঘর’ ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে বেশ জনপ্রিয়তা পায় এই খুদে শিশুশিল্পী। তারপরই ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় ডাক পেয়ে যায়। রায়হান রাফির পরাণ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে দেখা যাবে ২০২০ সালে ভালোবাসা দিবসে। চ্যানেল আইতে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি নাটকে  কাজ করার কথা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এই নাটকের কাজ দিয়েই বছর শুরু করতে চায় মোহনা মাহাজাবীন। মোহনার পছন্দের পরিচালক অমিতাভ রেজা। কেন জানতে চাইলে বলল, ‘হরলিক্সের বিজ্ঞাপনে তাঁর সঙ্গে যখন কাজ করার সুযোগ হয়, তখন দেখতে পাই তিনি একটি নিয়মের মধ্যে চলেন। যেমন এক ঘণ্টার মধ্যে এই শুটটা শেষ মানে শেষ। দুপুর ১টার মধ্যে দুপুরের খাবার খাওয়া শেষ সবার, রাত ১০টার মধ্যে রাতের খাবার শেষ হবে। এ ছাড়া তাঁর বিজ্ঞাপন দেখে মুগ্ধ হই বারবার।’ মোহনার পছন্দের অভিনেতা-অভিনেত্রী চঞ্চল চৌধুরী এবং জয়া আহসান। সুযোগ পেলে তাঁদের সঙ্গে অভিনয় করতে চায়।

 

মনের জাদুঘর

দুরন্ত টিভিতে দীপংকর দীপনের পরিচালনায় মনের জাদুঘর নাটকে শিউলী চরিত্রে অভিনয় করে মোহনা। দুরন্ত টিভির শিশুতোষ চ্যানেল, তাই ৬৪ পর্বের নাটকটিতে অভিনয় করেছে যারা, বেশির ভাগই শিশু। নাটকটিতে এক দরিদ্র মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করে মোহনা। মাঝেমধ্যে ঘুমের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস এই শিউলী চরিত্রটির। তিন বন্ধুকে নিয়েই নাটকটি এগোতে থাকে। অন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের নাম ছিল মুগ্ধ ও রাফা। মুগ্ধ চরিত্রে অভিনয় করেছে রাতুল এবং রাফার ভূমিকায় আফরা। একজন বই পড়ে খুব, একজন মিথ্যা কথা বলত।

 

প্রথম সিনেমা পরাণ

পরাণ সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন রায়হান রাফি। পরাণ সিনেমায় একসঙ্গে প্রথমবারের মতো অভিনয় করেছেন ইয়াশ রোহান ও বিদ্যা সিনহা মিম। মিমের ছোট বোনের ভূমিকায় দেখা যায় মোহনাকে। চরিত্রটির নাম সুপ্তি। চলচ্চিত্রটিতে মোহনার দুলাভাই হলেন ইয়াশ।

এ ছাড়াও শরিফুল ইসলাম রাজ অভিনয় করেছেন একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে। পরাণ সিনেমার শুটিং শেষ হয়েছে এরই মধ্যে। হয়েছে পুরান ঢাকা, সাভার ও ময়মনসিংহে। মোহনার শুটিং হয়েছে পুরান ঢাকা এবং ময়মনসিংহে। বলল, ‘যেহেতু এটা একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা, প্রথমে খুবই নার্ভাস ছিলাম। কিন্তু রায়হান রাফি ভাইয়া প্রতিটি শুটের আগে অভিনয় করে বুঝিয়ে দেন কী করতে হবে, এতে আমার জন্য খুব সহজ হতো কাজটা। একদিন সারা রাত শুটিং হয়েছিল, সেদিন মানিয়ে নেওয়াটা কষ্ট হয়েছিল। সবার সঙ্গে অনেক সুন্দর সম্পর্ক হয়ে যায়। আমি যেহেতু ছোট, সবাই খুব আদর করত।’ নায়িকা মিম তোমায় কী বললেন জানতে চাইলাম। ‘আপু আমাকে খুব পছন্দ করেছেন। আমার বড় বোন যেহেতু তিনি, সিনেমায় প্রায় সময় তাঁর সঙ্গে থাকা হয়েছে। এখন থেকেই খাবারের ওপর নজর দিতে বলেছেন, তবে বড় হয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে না ফিটনেস নিয়ে। চুল কাটতে বারণ করেছেন।’ অভিনেতা রাজের পোস্টার লুক দেখে তো আমি ভয় পেয়ে গিয়েছি, তুমি ভয় পাওনি জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘আমি তো প্রথম ভয়ে সামনেই যাইনি, তখন আস্তে আস্তে দেখা হচ্ছে, তিনি বললেন, এটা কি প্রথম সিনেমা, আমি বললাম জি। বললেন, ভালো করে অভিনয় করো, আশা করি ভালো করবে।’ নির্মাতা রায়হান রাফির থেকে কী উপদেশ পেলে? মোহনা উত্তর দিল, ‘ভাইয়া তো আমার অভিনয় দেখে খুশি। বলেছেন, ভবিষ্যতে নায়িকা হিসেবে দেখতে চান। সব সময় সেরাটা দিয়ে কাজ করতে বলেছেন।

পরিচালকের কথা

পোড়ামন-২ এবং দহন সিনেমার কল্যাণে সবার কাছেই এখন বেশ পরিচিত তরুণ নির্মাতা রায়হান রাফি। ফোনালাপে জানতে চেয়েছিলাম, মোহনার অভিনয় প্রসঙ্গে। বললেন, ‘মোহনার অভিনয় দেখে এককথায় আমি মুগ্ধ। প্রথমবারের মতো বড় পর্দায় কাজ করাটা চ্যালেঞ্জিং ছিল, কিন্তু অভিনয়ে তা বোঝা মুশকিল। প্রথম দিনের শুটিং শেষে আমাদের টিমকে তাকে নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। বড় বড় শিল্পীর সঙ্গে অভিনয় করাটা সত্যি একটি ভয়ের ব্যাপার, কিন্তু আমি মোহনার অভিনয়ের সে ছাপটা দেখতে পাইনি। মিমের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে অভিনয় করেছে সিনেমাটিতে, দর্শক সিনেমাটি মুক্তি পেলে আরো ভালোভাবে বুঝতে পারবে মোহনার অভিনয়ের দক্ষতা।’ আরো বললেন, ‘মোহনা যদি সামনে ঠিকমতো অভিনয় করে যেতে পারে, তাহলে পূজা যেভাবে শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করতে করতে আজকে নায়িকায় পরিণত হয়েছে, সেভাবে ভবিষ্যতে নায়িকা হিসেবে ভালো কিছু করতে পারবে বলে আশাবাদী। আমার মনে হয় মোহনার রক্তে অভিনয় মিশে আছে। সে বারবারই নিজেকে প্রমাণ করেছে ক্যামেরার সামনে। অভিনয়টি যাতে নিখুঁতভাবে শিখতে পারে, সেদিকে সময় দিতে হবে মোহনার। আমার বিশ্বাস পড়ালেখার পাশাপাশি মন দিয়ে অভিনয়টা করলে ইনশাআল্লাহ ও অনেকদূর যাবে।’

 

স্কুল তারকা

স্কুলে রীতিমতো তারকা এখন সে। অনেকে নায়িকা বলেও ডাকে মেহনাকে। শিক্ষকরাও পছন্দ করেন। এমনকি পরাণ সিনেমা মুক্তি পেলে সবাই একসঙ্গে সিনেমা দেখতে যাবেন বলেও জানিয়েছেন। যখন বন্ধুরা নায়িকা বানিয়ে দিতে বলে, তখন মোহনা বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, ওখানে কিভাবে কাজ করতে হয়, তার হাতে কিছুই থাকে না। কিছু বন্ধু মানলেও অনেকে রাগ করে বসে, তখন কিছুটা মন খারাপ হয়।

 

নকল পরিবার

নানা ধরনের মজার অভিজ্ঞতাই হয় তার। ‘সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে তার্কিতে গিয়ে। আমরা দুজন ছেলে ও ছয়জন মেয়ে ছিলাম দলে। সবাইকে একটা হোস্ট ফ্যামিলিতে দেওয়া হয়, সেখানে মা-বাবা থাকে, ভাই-বোন থাকে। তাদের সঙ্গে আমাদের চলাফেরা করতে হয়েছিল। এই চলাফেরাটা ছিল কষ্টদায়ক। কেননা তাঁরা তার্কি ভাষায় কথা বলতেন। একসময় তো আমি মুখে কথা বলাই ভুলে গিয়েছিলাম, তাঁদের সঙ্গে শুধু হাত আর চোখের ইশারা দিয়ে বুঝাতাম সবকিছু। তবে নিঃসন্দেহে ওটা ভিন্ন ধরনের এবং মজার অভিজ্ঞতা ছিল।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

পড়ালেখার পাশাপাশি নাচ এবং অভিনয় চালিয়ে যেতে চায় এই খুদে তারকা। বাবার ইচ্ছা মেয়ে ডাক্তার হবে, তাই জেএসসি পরীক্ষা দিয়েই বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পুরোদমে পড়াশোনা শুরু করবে। তাঁর ইচ্ছা ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার এবং অভিনয় দিয়ে মানুষকে মুগ্ধ করার। এ ছাড়া অভিনয় আরো নিখুঁত করার জন্য ভালো জায়গায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার ইচ্ছা আছে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা