kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে

মাত্র ১৪ বছর বয়সে অস্ত্র হাতে যুদ্ধে অংশ নেন মশিউর রহমান বাবুল। গলাচিপায় তাঁর মতো কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় ‘বিচ্ছুবাহিনী’। পটুয়াখালী জেলার একমাত্র সম্মুখযুদ্ধের গল্প তাঁর মুখ থেকে শুনেছেন সাইমুন রহমান এলিট

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে

অঙ্কন :প্রসূন

উনসত্তরের আন্দোলনের সময় বড়রা মিছিল-মিটিং করলে আমিও ছুটে যেতাম তাদের সঙ্গে। তখনই রাজনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর সারা দেশের মতো গলাচিপাও উত্তাল হয়ে ওঠে। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য বিভিন্ন জায়গায় ছুটে বেড়াই। তবে ছোট বলে সুবিধা করতে পারছিলাম না। এরই মধ্যে সুযোগ মিলে যায় ’৭১-এর নভেম্বর মাসে। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কে এম নুরুল হুদা ট্রুপ কমান্ডার হয়ে গলাচিপা থানায় আসেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল নিয়ে গলাচিপার পানপট্টি কমিউনিটি সেন্টারে ঘাঁটি গাড়েন। সেখানে আমি, এস এম মাহবুবুল আলম, শাহজাহানসহ চার-পাঁচজন নিয়ে গড়ে তোলেন ‘বিচ্ছুবাহিনী’। আমাদের দায়িত্ব হলো, পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের গতিবিধি লক্ষ রাখা এবং সময়মতো খবরাখবর দেওয়া।

এরই মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনী গলাচিপায় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের ঘাঁটির খবর পেয়ে যায়। আমরা সিদ্ধান্ত নিই, ওদের আগেই গলাচিপা থানা আক্রমণ করব। শুরুতে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। ওই সময় গলাচিপার সদর রাস্তায় সীমিত মানুষ চলাফেরা করত। খুব বেশি প্রয়োজন না হলে কেউ রাস্তায় নামত না। গলাচিপার পানপট্টি আক্রমণের দু-এক দিন আগে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান জানার জন্য গলাচিপা বন্দরের সদর রোডের বটতলার রাস্তা দিয়ে একা একা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে থানার দিকে যাচ্ছিলাম। বটতলার কাছে এলে হঠাত্ করেই পাকিস্তানি বাহিনীর একটি টহল গ্রুপ আমার সামনে পড়ে। ওরা আরেকটু হলে আমাকে দেখেই ফেলেছিল। কোনোমতে নিজেকে আড়াল করতে পাশের বণিকদের বাড়ির একটি চিপা গলির ভেতর ঢুকে পড়ি। কিন্তু সেখানেও নিশ্চিন্তে থাকতে পারিনি। পাকিস্তানি বাহিনীর বুটের আওয়াজ ভেসে এলো। আমার একেবারে কাছে। দুরু দুরু বুকে অপেক্ষা করছিলাম। বুটের আওয়াজ যত প্রকট হচ্ছিল, হূত্কম্পন তত বাড়ছিল। একটু এগিয়ে টহল টিমটি কিছু সময় দাঁড়িয়ে কী মনে করে আমাকে পাশ কাটিয়ে আবার সামনের দিকে—অর্থাত্ পূর্ব দিকে চলে যায়। অল্পের জন্য সেদিন কোনোমতে হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা পাই। এরপর বণিকদের গলি পেরিয়ে কালীবাড়ি হয়ে দ্রুত চলে যাই পানপট্টি। ওই দিন নতুন করে আরেকবার বাঁচার আনন্দ উপভোগ করলাম। তবে এই অভিযানে একটা লাভ হলো—জানতে পারলাম, পাকিস্তানিদের বড় দলটা এখনো এসে পৌঁছেনি। ছোট একটা দল টহল দিচ্ছিল।

তখন আমাদের কাছে কোনো ভারী অস্ত্র ছিল না। কিন্তু আমরা দুটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে ওয়ান, টু, থ্রি বলে একসঙ্গে ফায়ার করি। এতে পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ওরা ভাবে, আমাদের কাছে হয়তো ভারী অস্ত্র আছে

১৭ নভেম্বর দিবাগত রাতে মুক্তিবাহিনী গলাচিপা থানা আক্রমণের পরিকল্পনা করে। গলাচিপা থানার তিন দিক থেকে আক্রমণের কথা ছিল। থানার দক্ষিণ দিক থেকে কে এম নুরুল হুদা ও পূর্ব দিক থেকে ডেপুটি কমান্ডার হাবিবুর রহমান শওকত নেতৃত্ব দেবেন এবং খালের উত্তর প্রান্ত (কাঠগোলা) থেকে আরেকটি গ্রুপ আক্রমণ করবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে একজন মুক্তিযোদ্ধার এসএলআর থেকে অসতর্কতাবশত একটি গুলি বেরিয়ে যায়। এতে পাকিস্তানি বাহিনী সতর্ক হয়ে পড়ে। আমাদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে। ওই রাতে আমরা পিছু হটে পানপট্টি ফিরে যাই। রাতে আমরা পানপট্টি কমিউনিটি সেন্টারে ঘুমিয়ে ছিলাম। ১৮ নভেম্বর সূর্য ওঠার আগে পাকিস্তানি বাহিনীর সুসজ্জিত ২০০ সেনা মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি পানপট্টি কমিউনিটি সেন্টারে আক্রমণের জন্য রওনা হয়। সেন্টারের কাছাকাছি এলে আমরা জানতে পারি, হানাদাররা কাছাকাছি এসে গেছে। এ সময় ট্রুপ কমান্ডার কে এম নুরুল হুদা আমাদের কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করে পজিশন নিতে বলেন। আমার অবস্থান ছিল কমিউনিটি সেন্টারের পূর্ব পাশের বাংকারে। একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে অবস্থান নিই। হানাদাররা আমাদের দিকে প্রথমে হালকা মেশিনগানের গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে আসতে থাকে। এ সময় ধানক্ষেতে অবস্থান নেওয়া মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি শুরু করে।  পাকিস্তানি বাহিনী আমাদের বাংকার দখলে নেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। তখন আমাদের কাছে কোনো ভারী অস্ত্র ছিল না। কিন্তু আমরা দুটি থ্রি নট থ্রি রাইফেল থেকে ওয়ান, টু, থ্রি বলে একসঙ্গে ফায়ার করি। এতে পাকিস্তানি বাহিনী বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ওরা ভাবে, আমাদের কাছে হয়তো ভারী অস্ত্র আছে। তারা আমাদের অবস্থান লক্ষ্য করে মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পরপর ছয়টি মর্টার শেল অবিস্ফোরিত অবস্থায় কাছের ধানক্ষেতে পড়ে। একটি মাত্র মর্টার শেল আমাদের বাংকারের কাছে বিস্ফোরিত হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। ভেবেছিলাম, এবার হয়তো উড়িয়ে দেবে। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল বলে বেঁচে যাই। বিকেল ৩টার আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী মেজর ইয়ামিনের নেতৃত্বে তীব্র আক্রমণ চালায়। আমরাও তিন দিক থেকে পাল্টা জবাব দিতে থাকি। সবচেয়ে ঝুঁকি ছিল উত্তর ও পশ্চিম দিকে। আমাদের ক্যাম্পে বরিশালের জাহাঙ্গীর নামের এক যোদ্ধা মেশিনগান চালাতেন। ট্রুপ কমান্ডার নুরুল হুদা তাঁকে বিভিন্ন দিক থেকে মেশিনগানের গুলি করার জন্য নির্দেশ দিলেন। পাকিস্তানি বাহিনী সাঁকো পার হতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জড়ো হয়ে এবার পশ্চিম দিক দিয়ে আসা শুরু করে। ছোট খালের দুই পারে দুই গ্রুপ অবস্থান নেয়। পূর্ব পাশে আমরা এবং পশ্চিম দিকে পাকিস্তানি বাহিনী। দুই-আড়াই ঘণ্টা গোলাগুলির পর তিনজন রাজাকারের লাশ পাওয়া যায়। পাঁচ-ছয়জন পাকিস্তানি সৈন্য আহত হয়। বেগতিক দেখে হানাদাররা আমাদের ক্যাম্পের দক্ষিণ দিকের একটি খালি ভিটা (তালুকদারের ভিটা নামে পরিচিত) বাড়িতে মর্টার ফিট করে। মর্টারের ফায়ারে সহযোদ্ধা রবীন্দ্রনাথ হালদার খোকন ধানক্ষেতে আহত হন। বৃষ্টির মতো মর্টার চার্জ করছিল পাকিস্তানিরা। আমাদের ক্যাম্পের কাছে প্রচুর হোগলপাতার বন ও ছৈলাগাছ থাকায় মর্টার লক্ষ্য ভেদ করতে পারেনি। এদিকে আমরাও গুলি করতে থাকি। বিকেলের দিকে হঠাত্ করে পাকিস্তানি বাহিনীর মেজর ইয়ামিন পালিয়ে যায়। ইয়ামিন চলে যাওয়ায় রাজাকাররাও পালিয়ে যায়। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে। ওরা ক্যাম্পের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর দিক থেকে আক্রমণ চালায়। সন্ধ্যার পরেও গুলি করতে থাকে। একপর্যায় ৭টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী পানপট্টি থেকে পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয় লোকজন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে আমাদের কাছে আসে। পরে আমরা ওই রাতেই গলাচিপা-চরকাজল নদী পার হয়ে চরকাজল অস্থায়ী ক্যাম্পে যাই। এরই মধ্যে ২৪ নভেম্বর শুনি, থানা ছেড়ে শত্রুরা পালিয়ে গেছে। ২৫ নভেম্বর থানা দখল করে অস্ত্র নিয়ে নিই এবং থানায়ই আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প তৈরি করি। মুক্ত হয় গলাচিপা থানা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা