kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

উপায় না দেখে মড়ার ভান করে শুয়ে থাকি

কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যে অবস্থিত কোদালকাটি চরের মুক্তিযোদ্ধা নুর মোহাম্মদ। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায়ই বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। দেশ স্বাধীন করে তবেই ঘরে ফেরেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন কুদ্দুস বিশ্বাস

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




উপায় না দেখে মড়ার ভান

করে শুয়ে থাকি

অঙ্কন :প্রসূন

দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমাদের বাড়ির পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বাড়িতে মা-বাবাকে বললাম, যুদ্ধে যাব। কিন্তু তাঁরা নিষেধ করে বললেন, তোমার বয়স হয়নি। মনে মনে ঠিক করলাম, পালিয়ে যাব। একদিন স্কুল ছুটির পর আমার এক বন্ধুর হাতে বই-খাতা দিয়ে যোগ দিলাম বাড়ির পাশের খাড়ুভাঁজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণশিবিরে। পরের দিন আমাকে নেওয়ার জন্য মা-বাবা ক্যাম্পে আসেন। আমি তাঁদের দেখে লুকিয়ে যাই। এখানে ১০ দিনের মতো প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে আমাকে পাঠানো হয় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে।

ভয়াবহ ওই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে আসি। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের অবিরাম ওই গোলাবর্ষণের বিকট শব্দে ও আতঙ্কে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। শ্রবণশক্তি হারিয়ে যায় আমার, যা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি

সুন্দরগঞ্জের যুদ্ধে আমাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে পাকিস্তানি হানাদাররা। যুদ্ধে আমার গুলিতে প্রথম যখন একজন পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্য লুটিয়ে পড়ে, তখন আমার সাহস আরো বেড়ে যায়। উত্সাহ-আনন্দে আমি একের পর এক গুলিবর্ষণ করতে থাকি। এখানে দীর্ঘ এক মাস যুদ্ধ করে পাকিস্তানি বাহিনীর ১৭ সদস্যকে হত্যা করি আমি। আমার সাহসিকতা দেখে আমাদের কমান্ডার অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমাকেও আরো প্রশিক্ষণের জন্য ভারতের দার্জিলিংয়ের মুজিব ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেন। সেখানে এক মাসের মতো ট্রেনিং নেওয়ার পর দেশে ফিরি। আমাকেসহ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল পাঠানো হয় বড় যুদ্ধক্ষেত্র লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধার বড়খাতা সম্মুখযুদ্ধে।

কমান্ডার সুবেদার ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে ২০০ মুক্তিযোদ্ধার একটি দল নেমে পড়ি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে। আমাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি হানাদাররা। ওরা যখন পিছু হটে, তখন আমরা তাদের বাংকার দখলে নিই। এ অবস্থায় পাকিস্তানি সেনারা তাদের অসংখ্য সদস্য নিয়ে একযোগে আমাদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। আমাদের কাছে কোনো বোমা ছিল না। পাকিস্তানি সেনাদের দখলে নেওয়া বাংকার থেকে রাইফেল দিয়েই পাল্টা জবাব দিতে থাকি। একসময় তারা আমাদের ওপর আর্টিলারি ও শেলিং বোমা বর্ষণ শুরু করে দেয়। খুব কাছ থেকে পাকিস্তানি সেনাদের অবিরাম বোমাবর্ষণে আমার সঙ্গে থাকা ২০০ মুক্তিযোদ্ধার করুণ মৃত্যু ঘটে। কোনো উপায় না দেখে আমি মড়ার ভান করে শুয়ে থাকি। ভয়াবহ ওই যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে আসি। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের অবিরাম ওই গোলাবর্ষণের বিকট শব্দে ও আতঙ্কে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই। শ্রবণশক্তি হারিয়ে যায় আমার।

ওই যুদ্ধে বেঁচে ফেরার পর একই সেক্টরের আওতায় মুক্তিবাহিনীর আরেক দলে যোগ দিই। আমাদের পিছনেই ছিল ভারতীয় বাহিনীর একটি বড় দল। প্রতিজ্ঞা করি, যেকোনো মূল্যে এবার পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে হবে। ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে বোঝাপড়ার পর একদিকে মুক্তিবাহিনী, অন্যদিকে ভারতীয় বাহিনী একযোগে আক্রমণ শুরু করি। লড়াই চলে বেশ কয়েক দিন। পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সদস্য আমাদের আক্রমণে নিহত হয়। একপর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদাররা পিছু হটতে থাকে। আমরাও ব্যাপক উত্সাহ নিয়ে তাদের ধাওয়া করি। আমাদের তাড়া খেয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা লালমনিরহাট ছেড়ে রংপুর ক্যাম্পে গিয়ে ওঠে।

তাদের পিছু নিয়ে আমরাও রংপুরের হারাগাছ এসে পৌঁছি। এখানে আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়ে নতুন মিশন শুরু করি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে খুঁজে বের করতে লাগলাম বাজাকারদের। কয়েক দিনে আমরা প্রায় তিন হাজার রাজাকার আটক করি। এরই মধ্যে খবর এলো পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেছে। দেশ স্বাধীন হলো। রাজাকারদের রংপুর জেলখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফিরে এলাম নিজের বাড়িতে।

আমার হারিয়ে যাওয়া শ্রবণশক্তি আর ফিরে পাইনি। কানের কাছে এসে উচ্চৈঃস্বরে কথা বললেই শুধু শুনতে পাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা