kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পাহাড়ের ঢালুতে থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম

দেশের জন্য যুদ্ধ করতে অনেক স্মরণীয় ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ফিলিপ বিজয় ত্রিপুরাকে। সেসব দিনের গল্প বলেছিলেন তিনি। শুনেছিলেন আবু দাউদ

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




পাহাড়ের ঢালুতে থাকায় সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম

অঙ্কন : মাসুম

দেশের পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকলে জেঠা অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ হাবিলদার যোগেশ চন্দ্র ত্রিপুরার পরিবারের সঙ্গে রামগড় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে যাই। সত্তর সালের ডিসেম্বরে তখনকার ভারতের সাব্রুম মহকুমার হরিণায় আশ্রিত হই আমরা। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের খবরটি বাংলাদেশের মতো তখন ভারতেও বেশ আলোড়ন তোলে। হরিণায় স্থানীয় রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ওই ভাষণের খবরটি প্রচারিত হলে আরো অনেকের সঙ্গে অনুপ্রাণিত হয়ে উঠি আমিও। মনে মনে স্বাধীনতার ইচ্ছা জাগে। তখন আমার বয়স মাত্র ১৮। ওই বয়সেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।

মানিকছড়ির গাড়িটানা এলাকায় এক গোপন স্থানে রাতে খেতে বসেছি। ওই সময় খবর আসে যে পাকিস্তানি আর্মি আসছে। কেউ কেউ বলতে শুরু করল, আমাদের তারা ঘিরে ফেলেছে

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার আগে ভারতে মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয় আমার। তাতে বয়স ১৭ বছর বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে তখন ১৮ বছরের বেশি ছিল আমার বয়স।

প্রয়াত সাংবাদিক সুবোধ বিকাশ ত্রিপুরার অনুরোধে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে ইয়ুথ ক্যাম্পে যোগ দিই। শুরু হয় একের পর এক প্রশিক্ষণ। প্রস্তুত হয়ে উঠলাম যুদ্ধের জন্য। সর্বশেষ চাকুলিয়ায় ফ্রন্টিয়ার ফাইটার (এফএফ) নামের বিষেশায়িত ট্রেনিং হয় তিন দিনের। ১৯৭১ সালের আগস্টে মাটিরাঙার অযোধ্যা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ফেরে আমাদের প্রশিক্ষিত ফাইটার বাহিনী। শুরু হলো নতুন পথচলা। লক্ষ্য একটাই—দেশ স্বাধীন করা। হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরার নেতৃত্বে ৪৬ জনের দলটা ভোর নাগাদ দেশের মাটিতে প্রবেশ করে।

দেশে ফেরার পর নানা ঘটনাপ্রবাহের কথাই মনে পড়ছে। শুরুর যুদ্ধের কথাটাই বলছি প্রথমে। খাগড়াছড়ির মানিকছড়ির ডাইনছড়িতে প্রথম সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। একটু একটু কুয়াশা পড়ছিল। সময়টা আনুমানিক সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস হতে পারে। মানিকছড়ির গাড়িটানা এলাকায় এক গোপন স্থানে রাতে খেতে বসেছি। ওই সময় খবর আসে যে পাকিস্তানি আর্মি আসছে। কেউ কেউ বলতে শুরু করল, আমাদের তারা ঘিরে ফেলেছে। প্রস্তুত হয়ে গেলাম সঙ্গে সঙ্গে। পরে বুঝতে পারি, ঘটনাটি তেমন ছিল না। তারা (পাকিস্তানি আর্মি, মিজো ও রাজাকার) পাহাড়ের নিচ দিয়ে ধানি জমির আইলে আইলে চলে যাচ্ছিল। আমরা যে এখানে আছি টেরই পায়নি। তবু আমরা দুই প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা অ্যাম্বুশ করলাম। এক প্লাটুন সামনে, আরেক প্লাটুন কভারেজে ছিলাম। পাহাড়ের ঢালুতে থাকায় আমরাই সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলাম। মুক্তিবাহিনীই প্রথম গুলি ছোড়ে। তারাও পাল্টা গুলি ছোড়ল। তুমুল যুদ্ধ চলল। তবে অবস্থানগত সুবিধার কারণে আমাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতিই হয়নি। কেউ হতাহত হয়নি। তবে পাকিস্তানি বাহিনীর অন্তত তিনজন নিহত হয়। আর্মিরা তাদের কাঁধে তুলে নিয়ে যায়।

মানিকছড়ি রাজবাড়িটি অনেকটা জোরপূর্বক দখল করে নিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি। সেখানেই তাদের ক্যাম্প ছিল। শুনতে পেলাম, পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা রামগড়ের দিকে আসছে। রাত তখন ১০টার বেশি বাজে। বৃষ্টি পড়ছিল। ভিজে ভিজেই আমরা মানিকছড়ি-জালিয়াপাড়া সড়কের মাঝামাঝি একটি ব্রিজের দুই ধারে লুকিয়ে অপেক্ষায় থাকি। গভীর রাতে—এই সাড়ে ৩টা-৪টার দিকে জানতে পারি, পাকিস্তানি বাহিনী রাস্তা পরিবর্তন করে চলে গেছে। সেবার আর যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়নি।

তখন শীতকাল। মানিকছড়ির যোগ্যাছোলা এলাকায় রোদ পোহানো অবস্থায় শুনলাম যে পাকিস্তানি আর্মি অ্যাটাক করবে। সঙ্গে সঙ্গে পজিশন নিয়ে নিলাম। আমাদের অবস্থান টের পেয়ে তারা টু ইঞ্চি মর্টার নিক্ষেপ করতে শুরু করে। তাতে একটি ছাগল মারা গেলেও আমাদের ক্ষতি হয়নি। আমরাও পাল্টা জবাব দিয়েছি রাইফেল, এসএমজি ও গ্রেনেড ছুড়ে। তারপর ব্যাপক যুদ্ধ শুরু হলো। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আমাদের সঙ্গের এক মারমা যোদ্ধা নিহত হয় বলে মনে আছে। তবে নাম-পরিচয় নিশ্চিত ছিলাম না। ওদের কতজন মারা গেছে জানতে পারিনি। তবে বেশ কিছু সৈনিক যে মার গেছে তাতে সন্দেহ নেই। ওই যুদ্ধে আমাদের টিম লিডার ছিলেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা