kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

আমার দাদা আর নাই

দাস পার্টি। সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানিদের আতঙ্কের নাম। দাস পার্টির কিশোর সদস্য ছিলেন মো. ইলিয়াস চৌধুরী। ২৫শে মার্চ কালরাত্রির হত্যাযজ্ঞের পর এক ভোরে তিনি বেরিয়ে পড়েন। সেসব গল্প, দাস পার্টির কমান্ডার জগতজ্যোতি দাসের সঙ্গে পরিচয়, ‘দাসবাবুর ছোটভাই’ হয়ে ওঠা, দুর্ধর্ষ সব অপারেশনের বর্ণনা তাঁর মুখ থেকে শুনেছেন ইয়াহইয়া ফজল

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১১ মিনিটে



আমার দাদা আর নাই

অঙ্কন : মাসুম

একাত্তরের ২৫শে মার্চ কালরাত্রির গণহত্যার খবর আমরা পরদিনই পাই। এর পর থেকে ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা চলছিল। সারাক্ষণ ভাবতাম, কিছু একটা করা দরকার। তখন ভৈরব থেকে আজমিরীগঞ্জ-শেরপুর নৌপথ চালু ছিল। কাকাইলছেও গ্রাম এই পথেই, গ্রামটি হিন্দু অধ্যুষিত এবং আওয়ামী লীগের ঘাঁটি, তাই সহজেই পাকিস্তানিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

মার্চের ২৬ অথবা ২৭ তারিখ আমাদের বদলপুর গ্রামের সব কিশোর ও তরুণকে নিয়ে সভা ডাকা হলো। সভায় সিদ্ধান্ত হলো, যুদ্ধে যোগ দিতে হাওর পাড়ি দিয়ে ভারত যাব সবাই। শর্ত পরদিন ভোরে সূর্য ওঠার আগেই সবাইকে জড়ো হতে হবে গ্রামের স্কুলের কাছে বটগাছের নিচে। আমি আর আমার ছোট ভাই বদিউজ্জামান কথামতো ভোরে সেখানে উপস্থিত হই। সূর্য ওঠে। কিন্তু কেউ আর আসে না। ফিরে যাব এমন ভাবনা একবারের জন্যও মাথায় আসেনি। আমরা দুই ভাই যুদ্ধে রওনা হয়ে যাই।

নৌকায় আজমিরীগঞ্জ পার হলাম। চৈত্রের শেষ আর বৈশাখ শুরুর সময়। দীর্ঘ পথ হেঁটে মারকুলি পৌঁছার পর আবার নৌকা পাওয়া গেল। অনুনয়-বিনয়ের পর মাঝি নদী পার করে আমাদের শাল্লা উপজেলার ধল গ্রামে পৌঁছিয়ে দিল। সকাল থেকে হাঁটা শুরু করে সন্ধ্যার দিকে দিরাই পৌঁছলাম। পেটে ভীষণ খিদে, পায়ে ব্যথা, পা ফুলে গেছে।

সকালে একটা দলের সঙ্গে রওনা দিয়ে দিরাই ও পাগলার মধ্যবর্তী জয়কলসের কাছে বাজারে এসে দেখি, খাকি পোশাক পরা রাজাকাররা ঘোরাঘুরি করছে। আমাদের দলে তখন আরো লোকজন। সংখ্যায় বেশির ভাগ হিন্দু। তারা রাজাকারদের দেখেই হাওরের দিকে পালাতে লাগল। আমরাও ঝুঁকি না নিয়ে তাদের সঙ্গে সরে গেলাম। পরে উঁচু-নিচু টিলার বাঁশঝাড় ভেদ করে বাদাঘাট পৌঁছি। সেখান থেকে বেদেদের নৌকায় বালাঘাটের দিকে যাই। বর্ডারের কাছাকাছি যেতেই কয়েকজন যুবক আমাদের পাকিস্তানি সেনাদের চর ভেবে আটকায়। তাদের বুঝিয়ে বলি, আমরা স্পাই নই, যুদ্ধে যেতে চাই। এবার পথ দেখিয়ে দেয়। তাদের দেখানো পথে আমরা ময়লং শরণার্থী ক্যাম্পে পৌঁছি। সেখানে গাছে উঁচু-নিচু মাচায় শরণার্থীরা বসবাস করছে। আমরাও রাত কাটাই সেখানে।

গুলিটা আমার বাঁ পায়ের বৃদ্ধাঙুলের পাশে কোনাকুনি লেগে বেরিয়ে যায়। আমার সেদিকে খেয়াল নেই। মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরছে, ‘দাদারে মারিলাইছে (মেরে ফেলেছে)। তবে গুলি দাদার গায়ে লাগেনি। তিনি অভিনয় করে পড়ে গিয়ে পরক্ষণে উঠেই গ্রেনেড চার্জ করেন

 

পরদিন সকালে দুই ভাই কথা বলছি। এমন সময় আমাদের চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় এক তরুণ জানতে চাইলেন, ‘তোদের বাড়ি কোথায়?’ বললাম, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের জলসুখা গ্রামে। বছর বাইশের তরুণের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বললেন, ‘আমার বাড়িও তো সেখানে।’ এরপর অভয় দিলেন, ‘ঠিক আছে। তোদের আর কোনো চিন্তা নেই।’ জানলাম, তাঁর নাম জগতজ্যোতি দাস।

জগতজ্যোতির সাহস আর নেতৃত্বগুণ আমাদের মুগ্ধ করে ফেলে। অপরিচিত তরুণ দ্রুত আমাদের আপনজন হয়ে ওঠেন, শ্রদ্ধা আর নির্ভরতায় পরিণত হন।

এখানে, বালাঘাটে ১৫ দিন কেটে যায়। এর মধ্যে আরেকটি দল এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। তত দিনে যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুকদের সংখ্যা শতকের ঘর ছাড়িয়েছে। একদিন আব্দুস সামাদ আজাদ (পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রী) এলেন। আমরা তাঁকে ঘিরে ধরে বললাম, আমরা যুদ্ধ করতে চাই। আমাদের ব্যবস্থা করে দিন। তিনি তখন বললেন, ‘এখনো ক্যাম্প তৈরি হয়নি।’ এরপর একদিন এলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি আমাদের কাছ থেকে পাঁচ দিনের সময় নিলেন। ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় শিলং ক্যান্টনমেন্ট থেকে আর্মির তিনটি বড় লরি আসে। সব মিলিয়ে ১১৪ জন কিশোর ও তরুণদের নিয়ে বালাট থেকে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ইকো-১-এ রওনা হয় বহর।

টানা ৩২ দিনের প্রশিক্ষণ। তারপর আমাদের কয়েকজনকে বিশেষায়িত ট্রেনিং দেওয়া হয় ব্রিজ ও স্থাপনা ধ্বংস, জাহাজ ও নৌপথ যুদ্ধের। প্রশিক্ষণ শেষে পুরো দলকে তিন গ্রুপে ভাগ করা হয়। বিদায় অনুষ্ঠান হয়। সেদিন অতিথি হয়ে আসেন ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিত সিং অরোরা।

জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩৬ জন বিশেষ প্রশিক্ষিত গেরিলার সঙ্গে আমরা দুই ভাইও জোয়াই-শিলং-চেরাপুঞ্জি-বালাট হয়ে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে সংযুক্ত হই। আমাদের সামরিক পরামর্শক ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর ভাট ও ক্যাপ্টেন বর্মা। দলের কমান্ডার করা হয় জগতজ্যোতি দাসকে। তার নামেই আমাদের দলের অফিশিয়াল নাম হয় দাস পার্টি।

দেশে ঢোকার পাঁচ দিন পর আমরা চলে আসি টেকেরঘাটে। সেখান থেকে পাঠানো হয় তাহেরপুর ক্যাম্পে। এর তিন দিন পর প্রথম অপারেশন। পাগলা ও জগন্নাথপুরের জয়কলস মাঝামাঝি সদরপুর ব্রিজ গুঁড়িয়ে দিতে হবে। সিলেট-সুনামগঞ্জের এই সড়কে পাকিস্তানি বাহিনী নিয়মিত যাতায়াত করে। সে কারণে এ ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়া জরুরি। দাদার নেতৃত্বে আমরা ১৫-২০ জনের দল রওনা হয়ে পৌঁছি সন্ধ্যায়। তারপর অপেক্ষা আর প্রস্তুতি। রাত ১০টার দিকে ব্রিজটি উড়িয়ে দিতে সক্ষম হই আমরা।

জুলাই মাসে জামালগঞ্জ থানা ও সাচনা বাজার আক্রমণের পরিকল্পনা হয়। দাস পার্টিসহ তিনটি দলকে নির্বাচন করা হয়। প্রথম দলের কমান্ডার ইপিআরের আব্দুল হাই, সেকেন্ড ইন কমান্ড সিরাজুল ইসলামের দল সাচনা বাজারের বাংকারগুলোতে আক্রমণের দায়িত্ব পায়। আমাদের দাস পার্টির দায়িত্ব পড়ে জামালগঞ্জ থানা সদরের বাংকার দখলে নেওয়া। আর মোজাহিদ মিয়া ও ইব্রাহিম খলিলের দলটি ব্যাকআপ হিসেবে থাকবে বলে পরিকল্পনা হয়।

আমরা পাঁচ-সাতটি নৌকায় রওনা হই। জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় (তত্কালীন সার্কেল অফিস) ও থানা কাছাকাছি ছিল। থানার পাশে পুকুরপাড়ে অবস্থান নিই। একই সময়ে নদীপথ থেকে মোজাহিদ ভাই গুলি করেন। এর অর্থ হচ্ছে, তাঁরা তাদের অবস্থানে পৌঁছে গেছেন। এ সময় সার্কেল অফিসের দোতলা থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। আমরাও পাল্টা গুলি ছুড়ি। এক ফাঁকে পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) বাসায় ডেমুনেশন (ভবন ধসাতে ব্যবহূত এক্সপ্লোসিভ) বসানো হয়। এর শব্দ বেশি, এক মাইল দূর থেকেও শোনা যায়। বিকট শব্দে সেটা বিস্ফোরিত হয়। সারা রাত যুদ্ধ হয়। এত জটিল যুদ্ধ ছিল যে কখন ভোর হয়ে যায় টেরই পাইনি। থানা ও ইউনিয়ন পরিষদের কাছাকাছি একটা স্কুল ছিল। পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকাররা পালিয়ে সেখানে একটি বাংকারে আশ্রয় নেয়। দাদা সিদ্ধান্ত নেন, সেখানে গ্রেনেড চার্জ করবেন। তিনি এগোতে থাকেন। আমি কাভার করতে থাকি। তিনি যখন গ্রেনেড চার্জ করতে হাত তুলেছেন, এ সময় তাঁর মাথা বরাবর গুলি ছুটে আসে। দাদা পড়ে যান। গুলিটা আমার বাঁ পায়ের বৃদ্ধাঙুলের পাশে কোনাকুনি লেগে বেরিয়ে যায়। সেদিকে খেয়াল নেই। মাথায় তখন একটা কথাই ঘুরছে, ‘দাদারে মারিলাইছে (মেরে ফেলেছে)। তবে গুলি দাদার গায়ে লাগেনি। তিনি অভিনয় করে পড়ে গিয়ে পরক্ষণে উঠেই গ্রেনেড চার্জ করেন।

পাশের এক বাড়ি থেকে এক মহিলা চিত্কার করে আমাদের বলেন, ‘তাড়াতাড়ি চলে যান। পাঞ্জাবিদের লঞ্চ আসছে।’ আমরা আর দেরি করি না। ফিরে চলি। কিছুদূর হাঁটার পর টের পেলাম, পা ভারী হয়ে আসছে। দাদাকে বললাম, হাঁটতে পারছি না। গুলি লাগার স্থানে ব্যথা করছে। তিনি ক্ষতস্থান গামছা দিয়ে বেঁধে দেন। আমরা ফিরে আসি। ক্যাম্পে ডা. নজরুল হক চিকিত্সা করেন। ক্ষত পুরোপুরি না শুকালেও পাঁচ-ছয় দিন পরেই আবার যুদ্ধে নেমে পড়ি।

মুক্তিযুদ্ধে আমার সবচেয়ে বেদনার স্মৃতি বাহুবল বিদ্যুত্ লাইন ধ্বংসের অভিযানের স্মৃতি। কয়েকটি নৌকায় আমরা খালিয়াজুড়ির কল্যাণপুর থেকে অভিযানে রওনা হই। নদীপথে আজমিরীগঞ্জ পেরিয়ে বাহুবল বিদ্যুত্ লাইন ধ্বংস করাই মূল লক্ষ্য।

তত দিনে হাওর এলাকা ও নদীপথে পাকিস্তানি সেনাদের আতঙ্ক হয়ে উঠেছে দাস পার্টি। বিশেষ করে আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত নিয়মিত নদীপথে কার্গো, গানবোট, লঞ্চ ডুবাচ্ছি আমরা। সেদিন তারা আমাদের জন্য খুব পরিকল্পিতভাবে ফাঁদ পেতে রেখেছিল।

ভোরবেলা রওনা দিয়ে সকাল ৯টার দিকে বদলপুর ইউনিয়ন কার্যালয়ের সামনে পৌঁছি। সামনে নদী মোড় নিয়েছে। মোড়ের কাছাকাছি আসতেই দেখি, রাজাকাররা কয়েকটি নৌকা আটকে চাঁদা তুলছে। একজন বোধ হয় আমাকে চেনে, চিত্কার করে বলল, ‘ও দাসবাবুর ছোট ভাই। রাজাকাররা আমাদের আটকে চাঁদা নিচ্ছে।’

খবরটা দাদাকে দিতেই দাদা বললেন, নৌকা ভিড়াও। নৌকা পাড়ে ভিড়ার আগেই দাদা লাফ দিয়ে নেমে পড়লেন ডাঙায়। ব্রাশফায়ার করে কয়েকজন রাজাকারকে সেখানেই মেরে ফেলা হলো। বাকিরা দুই নৌকা নিয়ে পালিয়ে যেতে লাগল। দাদা আমাকে বললেন, ‘দু-চারজনকে নিয়ে যা, রাজাকারগুলিরে ধরে নিয়ে আয়।’ আমি রাজি হলাম না। দুই পাশে বিল। মধ্যে চরের মতো বেশ কিছু এলাকা। আমি বললাম, ‘এখানে প্রচুর রাজাকার আছে, আমি এভাবে যাব না।’ দাদা বললেন, ‘বুঝেছি, তুই আমি ছাড়া যাবি না।’ বলেই রওনা দিলেন। সঙ্গে সব মিলিয়ে ১২ জন। অন্যরা আসতে চাইল। দাদা ধমক দিলেন, ‘কয়টা রাজাকার ধরার জন্য সবার আসা লাগে নাকি?

রাজাকাররা নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে শুকনো বিল পেরিয়ে জলসুখার দিকে পালিয়ে যায়। দাদার নিজের গ্রাম জলসুখা। বাড়ির এত কাছে এসেও তিনি বাড়িতে যাননি। নৌকায় ফিরে আসার পথে গুলির শব্দ পাই। আমার সন্দেহ হয়। দাদাকে বলি—দাদা, চায়নিজ রাইফেলের শব্দ মনে হচ্ছে। রাজাকারদের কাছে তো চায়নিজ রাইফেল থাকার কথা নয়। তাহলে কি পাকিস্তানি সেনারা গুলি করছে? দাদা আমার কথা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুই আমার চেয়ে বেশি বুঝিস?’ আমি বললাম, ‘না। তুমি বেশি বোঝো। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এটা চায়নিজ রাইফেলের শব্দ।’

নদীর পাড়ে যাওয়ার আগে বিলের কাছে যেতেই দেখি একদিকে আজমিরীগঞ্জ, অন্যদিকে শাল্লা ও মারকুলির দিক থেকে গানবোটে পাকিস্তানি সেনারা এসে নদীর পাড়ে পজিশন নিচ্ছে। বদলপুরের দিকেও গুলির শব্দ। বুঝতে পারি, আমাদের ঘিরে ফেলা হয়েছে।

বিলের মাঝখানে আমরা ১২ জন আটকা পড়ে যাই। শত্রুদের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব এত কম যে পাকিস্তানি অফিসারদের কমান্ড আমরা স্পষ্ট শুনতে পাই। সঙ্গী যে ৩০ জনকে নৌকায় রেখে এসেছিলাম, তারাও ব্যাকআপ দিতে আসতে পারছে না। কারণ তাদের আর আমাদের মাঝখানে আরেকদল পাকিস্তানি সেনা। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। বেলা বাড়তে থাকে। যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়ায়—মাথার ওপর উড়তে থাকে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর দুটি ফগার। আমাদের কারো মধ্যে যেন ভয় নেই। সঙ্গী আইয়ুব আলী মজা করে বলতে থাকে, ‘আমার পিঠে গুলি লাগাতে পারে না যেন।’ হঠাত্ একটা গুলি ঠিকই তার মাথায় লাগে। হেলমেট ছিল বলে সেটা সরাসরি মাথায় আঘাত করে না। তবে হেলমেটে লেগে সেটার স্প্লিন্টার তার পিঠসহ সারা শরীরে আঘাত হানে। আরো দুজনকে সঙ্গে দিয়ে তাকে তখন পেছন দিকে বদলপুরের দিকে পাঠিয়ে দেন কমান্ডার। এরপর আরো একজন আহত হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। আমি দাদাকে বলি, ‘দাদা, এখন কী করা যায়?’ দাদা বলেন, ‘কোনো কমান্ড নাই রে। যে যেভাবে পারিস জান বাঁচা।’ এ কথা শুনে অনেকেই চলে যায়। দাদার এলএমজির সহযোগী ইদ্রিস আলী এবং আমার সহযোগী আবু শহীদও নাই। একসময় দাদা জানতে চান, ‘গুলি কতটা আছে-রে?’ আমি বললাম, ছয়-সাতটা ম্যাগাজিন ভরা আছে। আর খুচরা কিছু আছে।’ দাদা বললেন, ‘আমার কাছেও এ রকম আছে। চালিয়ে যা।’

বিকেল ৩টার দিকে একটা গুলি আমার বুকে লাগে। শার্ট খুলে দেখি, বুকের চামড়া ছেদা করে বেরিয়ে গেছে। আরেকটু ভেতর দিয়ে গেলে হূিপণ্ড ফুটো হয়ে যেত। দাদা বললেন, ‘দাঁড়া, বেঁধে দিই।’ ক্ষতস্থান বেঁধে আবারও যুদ্ধে মন দিই আমরা।

আমি গুলি লোড করি আর দাদা পাকিস্তানি বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকেন। ফাঁকে ফাঁকে দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলাও ছুড়ি আমরা। যুদ্ধে ১৫ জনের মতো পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।

সন্ধ্যা নামার আগেই বড় ক্ষতি হয়ে যায়। হঠাত্ দাদা বলে ওঠেন, ‘আমি যাইগ্যা।’

আমি তাকিয়ে দেখি গলা কাটা মহিষের মতো দাদা পানিতে উল্টে আছেন। ডুবে যাচ্ছেন। আমি সব ছেড়ে দাদা দাদা বলে চিত্কার করে উঠি। আমার ডাক শুনে দাদা আরেকবার মাথা তোলেন। এরপর আবার ডুবে যান। আমার দাদা আর নাই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা