kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

সবচেয়ে ভয়াবহ অপারেশনটি ছিল সাঁকোয়া ক্যাম্পে

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে দেশের জন্য যুদ্ধ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন নজরুল ইসলাম খোকা। তিনি তখন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র। অংশ নেন মুক্তিযুদ্ধে। তাঁর সঙ্গে গল্প করেছেন রফিকুল ইসলাম

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




সবচেয়ে ভয়াবহ অপারেশনটি ছিল সাঁকোয়া ক্যাম্পে

অঙ্কন : মাসুম

যুদ্ধের সময় রাজশাহী নগরী ছেড়ে সপরিবারে প্রথমে গোদাগাড়ীর মহিশালবাড়ীতে চলে যাই। এরপর সবাই ভারতের মুর্শিদাবাদে যাই। সেখানে আমাদের পৈতৃক আবাস রয়েছে। কিন্তু দেশ স্বাধীন করার চিন্তা মাথায় নিয়ে কিভাবে পালিয়ে থাকি। যোগ দিই মুর্শিদাবাদের লালগোলা ক্যাম্পে। সেখানে ট্রেনিং চলছিল গেরিলাবাহিনীর। ছোটবেলা থেকেই কাব, স্কাউট ট্রেনিং থাকায় ক্যাম্পে অস্ত্রের প্রশিক্ষণটি সহজ হয়ে ওঠে। বয়স কম থাকলেও প্রশিক্ষণে ভালো করায় যুদ্ধে অংশ  নেয়ার সুযোগ পাই। এপ্রিল মাসেই সেখান থেকে চলে যাই ভারতের চাকুরিয়া ক্যান্টনমেন্টে। ২১ দিনের প্রশিক্ষণে অস্ত্র ও গোলাবারুদ, বিস্ফোরণ, গেরিলা হামলা এবং জুডো শেখানো হয়। তখন কমান্ডিং অফিসার ছিলেন লে. কমান্ডার বি কে মিত্র এবং মেজর পি এ মধু। মে মাসে প্রশিক্ষণ শেষে আবার চলে আসি লালগোলা অপারেশন ক্যাম্পে। পরে গেরিলাযুদ্ধে অংশ নিই।

মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজশাহী ছিল ৭ নম্বর সেক্টরের অধীনে। ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল কাজী নুরুজ্জামান। এই সেক্টরের আরো কিছু সাব-সেক্টর ছিল। সাব-সেক্টর ৩-এর দায়িত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর। সাব-সেক্টর ৪-এর দায়িত্ব পালন করেন মেজর গিয়াস উদ্দিন। পাকিস্তান বাইরের বিশ্বে প্রচার করছিল, বাংলাদেশে কোনো প্রতিরোধ যুদ্ধ হচ্ছে না। বিষয়টি তদারকির জন্য জাতিসংঘ থেকে একটি দল আসে বাংলাদেশে। দলটি রাজশাহীতে আসে ২৫ মে। কিন্তু তাদের তো বোঝাতে হবে, আসলেই দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ চলছে। এরই মধ্যে খবর আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাহেববাজার হয়ে সার্কিট হাউসে অবস্থান নেবে জাতিসংঘের সেই দলটি। খবর পেয়ে তত্কালীন সাব-সেক্টর ৪-এর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন ১৫ জনকে তিনটি দলে ভাগ করে দেন। ঘোড়ামারা পাবলিক লাইব্রেরির পেছনে এক মহিলার বাড়িতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখি আমরা। একটি দল আবদুল গফুরের নেতৃত্বে রাজশাহী বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড এলাকায় অপারেশনে নামে। এই দলে ছিলাম আমি। অপর একটি গ্রুপ সোনাদীঘিতে অবস্থান নেয়। তৃতীয় দলটি বাকিদের কাভার করছিল। আমাদের হাতে ছিল সেভেন্টি সেভেন ফায়ার গ্রেনেড, একটি করে স্টেনগান এবং তিনটি করে এসএমজি ম্যাগাজিন। যাতে পুরো ভবনটি গুঁড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। রাত তখন প্রায় ১২টা। সাহেববাজারে জাতিসংঘের দলটির গাড়ির আওয়াজ শুনে প্রথমে সোনাদীঘিতে ও পরে বিদ্যুত্ ভবনে ফায়ার গ্রেনেড চার্জ এবং ব্রাশফায়ার করে আমাদের গেরিলাদলটি। কাজ শেষে সদর হাসপাতালে প্রাচীর টপকে পদ্মা নদীর সামনে চলে আসি। নদীতে বাঁধা নৌকায় করে ফিরে যাই ঘাঁটিতে। তখন জাতিসংঘ দল টের পায়, বাংলাদেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ হচ্ছে।

কিন্তু মেজর গিয়াস নির্দেশনা দেন, পাকিস্তানিরা যেন এপার না আসতে পারে। সেই নির্দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৌকাগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দিই আমরা। সে সময় দুই সহযোদ্ধা শহীদ হন

এর পরেও বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। যুদ্ধকালীন কমান্ডার শফিকুর রহমান রাজার নেতৃতে জেলার ৯টি থানায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অপারেশন করি। ওই সময় একদিকে সারা দেশে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সঙ্গে রাজশাহীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহীতে আসতে হলে নৌকায় চড়ে কিছুটা পথ পাড়ি দিয়ে অভয়া ব্রিজ পার হয়ে আসতে হতো। এরপর গোদাগাড়ী থেকে ট্রাকে করে রাজশাহীতে প্রবেশ করবে তারা। কিন্তু মেজর গিয়াস নির্দেশনা দেন, পাকিস্তানিরা যেন এপার না আসতে পারে। সেই নির্দেশে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৌকাগুলো বোমা মেরে উড়িয়ে দিই আমরা। সে সময় দুই সহযোদ্ধা শহীদ হন। তারপর সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে নতুন জায়গায় অবস্থান নিই। গোদাগাড়ী থেকে প্রেমতলী যাওয়ার পথে একটি ব্রিজ পড়ে। সেনাবাহিনীর বোমা বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ হারুন-অর রশীদের নির্দেশনায় অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রিজটি গুঁড়িয়ে দিই আমরা। এখনো সেখানে গোলাবারুদের চিহ্ন রয়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ অপারেশনটি ছিল তানোরের সাঁকোয়া ক্যাম্পে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি শক্ত ঘাঁটি ছিল সেখানে। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে ওই ক্যাম্প রাজশাহীর সব মুক্তিযোদ্ধার টার্গেট ছিল। শফিকুর রহমান রাজা, বীরপ্রতীক নূর হামীম রিজভী, চেয়ারম্যান আলী মনসুরসহ আরো কয়েকটি দলের বিশাল সমন্বিত বাহিনী মিলে হামলা চালায় সেখানে। সাঁকোয়া ক্যাম্পে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী গেরিলা বাহিনীর কাছে টিকতেই পারেনি। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা মিলে ধূলিসাত্ করে দিই ক্যাম্পটিকে। থানা দখল করে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াই। ওই ক্যাম্প দখলের পর মর্মান্তিক এক অভিজ্ঞতা হয়। আমরা ক্যাম্প দখলের খুশিতে উল্লাস করছি, এমন সময় ছোট ফুটফুটে এক মেয়ে হাজির হলো। বলল, তার বাবাকে এক রাজাকার ধরে নিয়ে এসেছে। আমরা যাদের আটক করেছি, তাদের মধ্যে রাজাকারটিকে দেখিয়ে দিল মেয়েটি। জানতে পারি, মেয়েটার বাবাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে আগেই। রাগে এতটা দিশাহারা হয়ে গেলাম যে ওই রাজাকারটাকে দিয়ে কবর খুঁড়িয়ে ওই গর্তেই তাকে জীবন্ত কবর দিলাম। ঘটনাটা এখনও ভুলতে পারি না। এটা আমার মনের ওপর এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে কয়েক দিন হাসপাতালে কাটাতে হয়।

সাঁকোয়া ক্যাম্প জয়ের পর শফিকুর রহমান রাজার নেতৃত্বে রাজশাহী অভিমুখে রওনা হই। রাজশাহী এসে প্রথমে অলোকার মোড় টেলিফোন অফিস এবং পরে সিটি কলেজে অবস্থান নিই আমরা।

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হলেও রাজশাহী পাকিস্তানিদের দখলমুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা আসার আগেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলে গিয়ে অস্ত্র জমা দিয়ে আসি আমরা। তারুণ্যের উল্লাসটা চোখে পড়লেও মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতরের চাপা কান্না হয়তো তখন কেউ টের পায়নি। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অনেক মানুষের প্রাণ, অন্যদিকে দেশের স্বাধীনতা। কখনো সেই আবেগটা বর্ণনা করা যাবে না।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা তৈরির দায়িত্ব কাঁধে নিই। সে সময় রাজশাহীর সব এলাকা ঘুরে, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে শহীদ এবং অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই করে রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রায় এক হাজার ৮১৮ জনের তালিকা তৈরি করে পাঠাই। যা বর্তমানে বেড়ে দুই হাজার ৬০০-তে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তৈরি হয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। চারবার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের জেলা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা