kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

পুরো নিকলীই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে

কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দারুণ সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন মোজাম্মেল হক আবীর। তাঁর যুদ্ধের স্মৃতি শুনেছিলেন নাসরুল আনোয়ার

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে




পুরো নিকলীই গুলির

শব্দে কেঁপে ওঠে

অঙ্কন :প্রসূন

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভৈরব হাজী আসমত কলেজে বিএ পড়তাম। একাত্তরের ২৫শে মার্চের পর কয়েকজন সমমনা মিলে ভারতের মেঘালয়ে চলে যাই। ইকোয়ানে টানা ৩০ দিন প্রশিক্ষণ নিই। সেখান থেকে আমাকেসহ সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে দেশে পাঠানো হয় এলাকার খোঁজখবর নিতে। সঙ্গে অস্ত্রও দেয়।

এলাকায় এসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকারসহ তাদের এদেশীয় দোসরদের জুলুম-নির্যাতন দেখে আর ভারতে ফিরে যাইনি। সহযোদ্ধাদের নিয়ে নেমে পড়ি প্রতিরোধযুদ্ধে। একে একে বেশ কিছু সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই। এগুলোর মধ্যে দুটির কথা বলব আজ।

বর্ষার পানি যায় যায়। কোনো কোনো জমিতে অগ্রহায়ণের ধানের চারা। আবার কোথাও বা বীজতলা থেকে কৃষকরা চারা তুলে রেখেছেন। পাট কাটাও শেষের পথে। একাত্তরের অক্টোবর নাগাদ কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার পূর্বাঞ্চলের পরিবেশ এমনই। এ জায়গা দিয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে একটি রেলপথ ভৈরবের দিকে চলে গেছে। এ রেলপথেই মানিকখালী ও বাজিতপুরের সরারচরের মাঝামাঝি এলাকার বগামারায় একটি রেল সেতু আছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কিশোরগঞ্জে অবস্থানরত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ রেলপথ দিয়েই বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, ভৈরব এবং এসব স্টেশন হয়ে হাওরের অষ্টগ্রামসহ বিভিন্ন থানা এলাকায় যাতায়াত করত।

বাজিতপুর, নিকলীসহ আশপাশের এলাকার থানা সদরগুলোতে দখলদার বাহিনীর শক্ত অবস্থান থাকলেও এ দুই থানার মধ্যবর্তী হিলচিয়া এলাকাটি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ‘মুক্তাঞ্চল’ হিসেবে ব্যবহার করছিলেন। একটি বাড়িতে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। এর নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক ইয়াকুব মিয়া, গ্রুপ কমান্ডার আব্দুল মোতালিব বসুসহ অনেকেই। ভারত থেকে আসার পর কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেলপথটিকে হায়েনার দল চলাচলের প্রধান রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে জানতে পেরে আমাদের মাথায় রেলপথটি অচল করে দেওয়ার চিন্তা আসে।

এঁরা করলেন কি, আমাদের কিছু না জানিয়েই নিকলী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন! ঘুমের মধ্যেই ভোররাতে আমাদের বহনকারী নৌকাগুলো নিকলীর টিক্কলহাটির গোরস্তানের পাশে নিয়ে যান। এদিন ছিল ১৯ অক্টোবর

নৌকা চালিয়ে যাই হিলচিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। আলোচনার পর সবাই সম্মত হই, যেকোনো মূল্যে বগামারা সেতুটি গুঁড়িয়ে দেব। সেতু এলাকা রেকি করার জন্য লোক পাঠাই। এর দুদিন পর নিকলী-বাজিতপুরসহ আশপাশের এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা আবার ওই ক্যাম্পে একত্র হই। দিনটি ছিল ২ অক্টোবর। আমাদের সঙ্গে আরো ছিলেন নিকলীর ধোপাহাটির রিয়াজুল ইসলাম খান বাচ্চু, আব্দুল মোতালিব বসু ও তাঁর বাহিনীর ২০-২৫ জনসহ ৫০ জনের বেশি মুক্তিযোদ্ধা। এ বৈঠকে ওই দিনই বগামারা সেতু উড়িয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।

রাতেই আমাদের যার কাছে যে অস্ত্র ছিল তা নিয়েই বগামারা রওনা হই। আগেই জেনেছিলাম, গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুটির উত্তর-দক্ষিণ দুই ধারের বাংকারে বেশ কিছু সশস্ত্র রাজাকার সেতু রক্ষণাবেক্ষণে নিয়োজিত আছে। কিছুদূর নৌকায় যাওয়ার পর নেমে হেঁটে হেঁটে রাত অনুমান ২টার দিকে আমরা ওই সেতুর তিন পাশে অবস্থান নিই। ভারত থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসা অ্যাম্বুশের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাই। আমাদের দুটি গ্রুপ রেলপথের দুদিকে এবং একটি গ্রুপ পশ্চিম পাশে অবস্থান নিই। আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কিছুটা দূরে পূর্ব দিকে অবস্থান করেন।

ঘুটঘুটে অন্ধকার! সেতুটি ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। এর মধ্যেই দেখি ভৈরবের দিক থেকে একটি ট্রেন ছুটে আসছে। ট্রেনটি ওই সেতুর ওপর দিয়ে শাঁই করে কিশোরগঞ্জের দিকে চলে যায়। ট্রেনের হেডলাইটের স্পষ্ট আলোয় আমরা সেতুটি দেখতে পাই। ট্রেন পাস হওয়ার পরই আমরা সেতুর আরো কাছে নিজ নিজ অবস্থানে চলে যাই। এর কিছুক্ষণ পরই রাজাকারদের বাংকার লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে শুরু করি। রাজাকাররাও পাল্টা গুলি চালাতে থাকে। এভারে ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটে ওঠে। একপর্যায়ে ওদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে আসে। আমাদের আহ্বানে ২৭ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে। এক রাজাকারের জন্য তার ৯-১০ বছরের ছেলেশিশু খাবার নিয়ে এসে রাতের বেলা বাংকারেই ছিল। রাজাকারের ছেলে হলেই কী! সে তো অপরাধ করেনি! এসব ভেবে শিশুটিকে আমরা হত্যা না করে বাঁচিয়ে দিই।

এর পরপরই আমরা রাজাকারদের ২৭টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে হাতে নিয়ে নিই। এ সম্মুখযুদ্ধের সময় অনেকের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। এসব অস্ত্র পাওয়ার পর এগুলোই পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে হিলচিয়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হয়। এবার সেতুটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু হয়। সেতুর এক পাশে প্রায় তিন ফুট মাটি ফুঁড়ে বিস্ফোরক গেড়ে সেতুটি উড়িয়ে দিই। এর পর থেকে চূড়ান্ত বিজয়ের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানি আর্মিরা এ রেলপথ দিয়ে আর চলাচল করতে পারেনি।  

একদিন নিকলীর জালালপুর বাজারে তিনটি নৌকায় আমরা প্রায় ৬০-৬৫ জন মুক্তিযোদ্ধা অবস্থান করছিলাম। সে সময় নিকলী থানা, জিসি পাইলট স্কুল ও ঈদগাহ মাঠে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা ঘাঁটি গেড়ে সব রকম অপরাধ করে যাচ্ছে। নিকলীতে আমাদের অবস্থানের খবর পেয়ে আমার স্কুলের শিক্ষক দামপাড়ার আব্দুল জব্বার স্যার আমাদের জন্য নৌকায় করে খাবার নিয়ে আসেন। তাঁর কাছ থেকেই আমরা নিকলীতে হানাদারদের দোসরদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হই।

জব্বার স্যারের পরামর্শ ছিল, আমরা আরেকটু গুছিয়ে পুরো প্রস্তুতি নিয়ে যেন নিকলী অপারেশনে নামি। স্যারের কথা মেনে আমি, রিয়াজউদ্দিন খান বাচ্চুসহ অনেকেই রাতের খাবার খেয়ে নৌকায় ঘুমিয়ে পড়ি। ওদিকে জেগে থাকেন ইটনার প্লাটুন কমান্ডার হাবিব ঠাকুর, নিকলীর প্লাটুন কমান্ডার সিদ্দিকুর রহমান, হাসান আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা তো ঘুমেই। এঁরা করলেন কি, আমাদের কিছু না জানিয়েই নিকলী আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন! ঘুমের মধ্যেই ভোররাতে আমাদের বহনকারী নৌকাগুলো নিকলীর টিক্কলহাটির গোরস্তানের পাশে নিয়ে যান। এদিন ছিল ১৯ অক্টোবর।

কিছুক্ষণ পরই তাঁরা আমাদের ডেকে তোলেন। চোখ মেলতেই বলতে শুরু করেন, ‘আপনারা উঠুন, আমরা নিকলী এসে গেছি। এখনই উত্তম সময়। আজই নিকলী অ্যাটাক করব।’ তাঁদের কথা শুনে থতমত খেয়ে উঠে পড়ি। হাফপ্যান্ট ও হাফশার্ট পরে অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে তৈরি হয়ে রওনা দিই। আমরা তিন দিক থেকে অ্যাটাক করব। আমার দায়িত্ব পড়ে টিক্কলহাটি হয়ে ঈদগাহ মাঠের পাশের ঘাটের পাড়ের বাংকার অ্যাটাকের।

কথা ছিল, একটি গ্রুপ হাসপাতালের পাশ থেকে গ্রেনেড চার্জ করা মাত্রই আমরা সমানতালে আক্রমণ চালাব। হলো কি, এমন সময় তালাবপারের হাজী আশ্রব আলী ফজরের নামাজ পড়তে যাওয়ার পথে আমাদের দেখে ফেলেন। তাকে আমরা ক্যাম্প আক্রমণের কথা বলে বাড়ি ফিরে যেতে বলি। তিনি বাড়ির বদলে রাজাকারদের ক্যাম্পে গিয়ে আমাদের পরিকল্পনা ফাঁস করে দেন। এক মুহূর্ত দেরি না করে রাজাকাররা আমাদের অবস্থান অনুমান করে গুলি চালাতে শুরু করে। আমরা হতভম্ব হলেও পাল্টা গুলি চালাতে আরম্ভ করি। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। পুরো নিকলীই গুলির শব্দে কঁপে ওঠে।

ওদিকে ভোর হয়ে আসছে। এমন সময় মুক্তিযোদ্ধা হাসান আলী আচমকা গুলিবিদ্ধ হন। জারইতলার মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেককে দিয়ে হাসানকে চিকিত্সার জন্য পূর্বগ্রাম পাঠিয়ে দিই। আমার সঙ্গে এ সময় ছিলেন কটিয়াদীর আচমিতার সুবোধ, নিরু, তাহের প্রমুখ। কিন্তু তাঁরা নিকলীর রাস্তাঘাট চেনেন না। অন্য মুক্তিযোদ্ধারাও পাশে নেই। এসব কারণে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিল। আমাদের এ আক্রমণ আপাতত ব্যর্থ হয়। এ খবর পৌঁছে যায় হিলচিয়া ক্যাম্পে। পরে আব্দুল মোতালিব বসু বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা ছুটে আসেন। তাঁদের সঙ্গে আমরা পাঁচরুখী গ্রামে গিয়ে দেখা করি। এর পরই নতুন উদ্যমে শত্রুশিবিরে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিই।

ওই দিনই বিকেল নাগাদ আবারও নিকলী সদরে রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আমাদের বন্দুকযুদ্ধ শুরু হয়। রাজাকারদের ছোড়া গুলিতে নিকলী পূর্বগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক, ষাইটধারের মেগু মিয়া ও গুরুইয়ের মতিউর রহমান শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হন পূর্বগ্রামের কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নান্টু। এদিকে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমরা আর গোলাগুলি না করে দুই শহীদ ও এক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গুরুইয়ের পথে রওনা হই। পথিমধ্যে নৌকায় আহত নান্টুও মারা যান। রাতে আমরা হিলচিয়ায় থেকে পরদিন আবারও নিকলী অ্যাটাকের পরিকল্পনা করি।

পরদিন ঘটে তুলকালাম কাণ্ড। নিকলীর তত্কালীন চেয়ারম্যান (পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্য) আমিরউদ্দিন আহম্মদ মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চু ও আমাকে লোকমারফত চিঠি পাঠিয়ে জানান, ‘বহিরাগত রাজাকাররা অস্ত্র ফেলে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে গেছে। আর স্থানীয় রাজাকাররা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়েছে।’ আমরা যেন দ্রুত নিকলী ফিরে যাই। এ চিঠিটি আমাদের আগেই আব্দুল মোতালিব বসু পড়ে ফেলেছিলেন। তিনি আমাদের অপেক্ষা না করে আগেই নিকলীর নগরে গিয়ে রাজাকারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রগুলোর দখল বুঝে নেন। তাঁর লোকজন স্থানীয় রাজাকারদের পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে ১৪-১৫ জন রাজাকারকে হত্যা করে।

এভাবেই নিকলী শত্রুমুক্ত হয় এবং আমরা নিকলীর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করি। এরপর মতিউর রহমান বীরবিক্রমসহ অন্যদের নিয়ে মোহরকোনায় দয়াল সাহার কুটিরে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপন করি। এ ক্যাম্প থেকেই আমরা অষ্টগ্রাম, করিমগঞ্জের বালিয়াবাড়ি, কটিয়াদীর গচিহাটাসহ বিভিন্ন সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা