kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

দেশ স্বাধীন না করে ফিরব না

মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুদ্ধ করেন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার রহিমগঞ্জ ইউনিয়নের হরিণাকান্দা গ্রামের শেখ আলী আহামেদ দুদু। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার নানা অভিজ্ঞতা তাঁর থেকে শুনেছেন মোস্তফা খান

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দেশ স্বাধীন না করে ফিরব না

অঙ্কন : মাসুম

বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে মনস্থির করি যুদ্ধে যাওয়ার। এলাকার ছালাম আকন্দ, আবুল বাশার আকন্দ, সোবাহানসহ কয়েকজন মিলে ফুলপুর খেলার মাঠে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নিতে যাই। মাঠে এক দুঃসাহসী কাণ্ড আমাকে দেশপ্রেমে আরো প্রেরণা দেয়। পুলিশ অফিসার আকবর প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। এ সময় হঠাত্ এসে উদয় হওয়া পাকিস্তানি বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার থেকে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে আকবর ভাই হেলিকপ্টারটির দিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলি করতে আরম্ভ করলে সেটি হালুয়াঘাটের দিকে দ্রুতগতিতে পালিয়ে যায়।

২৬শে মার্চ ১৯৭১। ফুলপুরে নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত্ করলে শামছু ভাই বললেন, পাকিস্তানি বাহিনী সারা দেশে চলে আসছে। দেশের জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। আসার পথে দেখলাম, আব্দুর রব ভাইসহ কয়েকজন চলে যাচ্ছেন ভারতে। আমার তাঁদের সঙ্গে যাওয়া হলো না। তখন টাকা তো দূরের কথা, তিন দিন ধরে খাওয়া নেই আমার। কিভাবে কিছু টাকা জোগাড় করা যায় ভাবছিলাম। রাস্তা দিয়ে চলার পথে কথা হয় কৃষক সোবাহান ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর কাছে কাজ চাইলে বিলের জমিতে কচুয়া পরিষ্কারের কাজ দিলেন। পানিতে নেমে কচুয়া পরিষ্কার করে দুই দিনে আড়াই টাকা পেলাম। তা নিয়ে মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা হলাম ভারতের উদ্দেশে, দেশের জন্য যুদ্ধ করব।

শুরুতেই খবর আসে, বাশুয়া কবীরপুর ও টিলাটিয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। দোকানদার কেরামত ভাই আমাকে বিষয়টা জানান। তাড়াতাড়ি রাস্তার পাশে কলাবাগানে আশ্রয় নিই। একপর্যায়ে ওরা আমাকে না পেয়ে চলে যায়। রাত ১২টায় এক বাড়িতে আশ্রয় নিই। বাড়ির মালিকের স্ত্রী আলু, টমেটোসহ মাছের তরকারি দিয়ে ভাত দিলেন। পেট ভরে খাই। কয়েক মাসের মধ্যে প্রথম তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। ওই বাড়িতে গোয়ালঘরে বিছানায় ঘুমানোর জায়গা হয়েছিল। আবার রওনা হওয়ার পর পথে শরণার্থীদের ভিড়, আতঙ্কে ছোটাছুটি করছে লোকজন—এসব দেখে খুব খারাপ লাগছিল। নালিতাবাড়ীর আরফান মাস্টারের বাড়িতে আড়াই-তিন শ মুক্তিযোদ্ধা রাত কাটাই। তারপর যাই ভারতের বিএসএফ ক্যাম্পে। কমান্ডার বাজিত সিং সকাল ১১টার দিকে পাঠিয়ে দেন ইউথ ক্যাম্পে। অধ্যক্ষ মতিউর রহমান স্যার ছিলেন ওই ক্যাম্পের ইনচার্জ। খোলা আকাশের নিচে নিজেরা তাঁবুর ব্যবস্থা করি। একপর্যায়ে এলাকার হানিফ উদ্দিন ও আব্দুস সালাম খান ক্যাম্পের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ফিরে যান। প্রতিজ্ঞা করি দেশ স্বাধীন না করে ফিরব না।

এই বাড়িটি ছিল রাজাকারের এক কমান্ডারের,  সে ছিল ওই মেয়ের শ্বশুর। হঠাত্ ওই রাজাকার বাড়িতে ঢুকে হাতের সাইকেলটি ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে বলে ‘ভাত দে। চারদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়ছে। বালিয়ার মাহমুদ হুজুরকে মেরে ফেলছে।’ ভয়ে কাঠ হয়ে বসে থাকি

হঠাত্ ডাক আসে, আমাদের তুরা ট্রেনিং সেন্টারে যেতে হবে। রাত ৪টায় ট্রেনিং সেন্টারে পৌঁছে যাই। ক্যালদাস ছিলেন তুরা ট্রেনিং সেন্টারের মাস্টার। তিনি বাংলায় কথা বলতে পারতেন না। ওই সেন্টারে মেডিক্যাল শেষে ভারতীয় সেনারা ভেতরে নিয়ে যায় আমাদের। ভালো জায়গায় থাকাসহ উন্নত খাবার দেওয়া হয়। চারটি কম্পানি করা হয়। আমি আলফা কম্পানির অধীনে। এমএসসি মোসলেম উদ্দিন ছিলেন কমান্ডার। আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক মার্টহ্যালি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক, ভারতের একজন জেনারেল এবং জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন। সেখান থেকে ভূরুঙ্গামারীর ট্রানজিট ক্যাম্পে পাঠানো হয় আমাদের। তারপর বিএসএফ ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে ১৫ জনের একটি চৌকস দল গঠন করে পাঠানো হলো বালিয়া মাদরাসা এলাকায়। ওই এলাকা রাজাকার-আলবদরের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়টা আগস্ট মাস। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাস্তাঘাটে পানি। দলনেতা পুলিশ সার্জেন্ট হালিমসহ নেওলা খুড়ি হয়ে জিউক্কা চলে যাই। বালিয়ার দিকে রওনা হয়ে বওলা পৌঁছলে বৃষ্টির কারণে যাত্রায় বিরতি টানতে বাধ্য হলাম। একটা আশ্রয় খুঁজে নিয়ে সবাই ঘুমিয়ে যাই। ঘুম ভাঙতে দেখলাম রাত ১২টা। আবার রওনা দিলাম। চাঁদের আলোয় দ্রুত পা চালাই। লোকজন আমাদের রাস্তায় দেখে ভয় পেয়ে যায়। বললাম, আমরা আপনাদের লোক, ভয় নেই। বালিয়া সিডস্টোর এলাকায় চার-পাঁচজন রাজাকার আমাদের পরিচয় জানতে চায়। পরিচয় গোপন রাখলে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহ করে আমাদের দিকে গুলি ছোড়ে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ফায়ার করি। গুলি খেয়ে রাজাকার মাওলানা মাহমুদ ওপরে উঠে আমার সামনে লাফ দিয়ে পড়ে যায়। রাশিয়ান এসএমজি রাইফেলের গুলি খেয়ে সামনে রাজাকারের লাশ পড়ার দৃশ্য আজও মনে পড়ে।

এদিকে ফুলপুর তারাকান্দায় চতুর্দিকে রাজাকার আলবদর হানাদার বাহিনীর আগমন ঘটে। আমরা ১৫ জন তিন-চারজন করে ছোট ছোট দল গঠন করি। আমি, সোবাহান, আনোয়ার—এই তিনজন কালিখা গ্রামের এক বাড়িতে আশ্রয় নিই। বাড়ির এক নববধূ আমাদের দেখে তাঁর স্বামীকে পাঠান। সারা শরীর ভেজা। এ অবস্থায় তাঁর লুঙ্গি ও মেয়েটার একটা শাড়ি ও পেটিকোট দেন। বাড়িটি ছিল রাজাকারের এক কমান্ডারের, সে ছিল ওই মেয়ের শ্বশুর। হঠাত্ ওই রাজাকার বাড়িতে ঢুকে হাতের সাইকেলটি ফেলে দিয়ে স্ত্রীকে বলে, ‘ভাত দে। চারদিকে মুক্তিযোদ্ধারা ঢুকে পড়ছে। বালিয়ার মাহমুদ হুজুরকে মেরে ফেলছে।’ ভয়ে কাঠ হয়ে বসে থাকি। সেদিন ওই রাজাকার কমান্ডারকে তার স্ত্রী ঘরে না ঢুকিয়ে গোসল করিয়ে তড়িঘড়ি করে ভাত দিয়ে বিদায় করেন। আমরা যে এখানে, নববধূ, তাঁর শাশুড়ি ও স্বামী—এই তিনজন ছাড়া কেউ টের পাননি। পরে নববধূর হাতে রান্না করা আউশের চালের খিচুড়ি পেট ভরে খাই। এরপর সন্ধ্যায় চলে যাই ঢাকুয়া বাজারের পূর্ব পাশের জঙ্গলে। সেখান থেকে পরদিন সন্ধ্যায় মালিঝির জোহা গ্রামের উত্তর পাশ দিয়ে ভারতে পৌঁছি। শিববাড়ী ইউথ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন হাতেম আলী। পরদিন গেলাম ঢালু ক্যাম্পে। এ কম্পানির কমান্ডার ছিলেন হাশিম ভাই। ২ নভেম্বর তেলিখালী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। রাত ৩টায় শুরু হওয়া সম্মুখযুদ্ধে ২১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৫০ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন। সারা রাত মর্টারের শেল ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী। আমরাও পাল্টা আক্রমণ ও তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি। সহযোদ্ধা হযরত, মমতাজ, সোবাহান, আনোয়ার, আব্দুল ওয়াহেদসহ কয়েকজনের কথা মনে আছে। শক্তিশালী পাকিস্তানি বাহিনীর এ ক্যাম্পে আমরা তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলি।

হযরতকে দেখলাম, ২০ গজ দূর থেকে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে স্টেনগান দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যেতে। পাকিস্তানি সেনারা মর্টার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে স্প্লিন্টারের  আঘাতে হযরত মারা যান। সাহস করে ক্যাম্পের ভেতরে ঢুকে পড়ি আমি। ক্যাম্পে পড়ে আছে পাকিস্তানি বাহিনীর সারি সারি লাশ। বাংকারে তাদের অস্ত্র, গোলাবারুদ রেখে পালিয়ে গেছে।  ইসমাইল হোসেন খান নামের পাকিস্তানি বাহিনীর এক সদস্যকে জাপটে ধরে ফেলি। আমি চিত্কার করে গামছা উঁচু করে বলি, ‘জয় বাংলা।’ ভারতীয় একজন সেনা অফিসার হিন্দিতে বলেন, ‘শাবাশ বীরবাহাদুর।’ এমন সময় এ ক্যাম্পে লোক দেখে গুলি করার মুহূর্তে তাঁরা সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে বলেন, ‘আমরা দুজন নারী।’ মাথায় মোড়ানো গামছা দুই টুকরা করে দিলে গায়ে চাপিয়ে দুজন বের হয়ে আসেন। চিত্কার করে কাঁদছিলেন, আর বলছিলেন—বিজয়টা আগে এলে আমাদের সর্বনাশ হতো না। তাঁদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। পাল্টা আক্রমণ আর হয়নি হানাদারদের শক্তিশালী এ ক্যাম্প থেকে। ভোররাতে আমাদের বিজয় নিশ্চিত হয়। আমাদের আটজন মুক্তিযুদ্ধা শহীদ হলেও পাকিস্তানি বাহিনীর ৮০ জন সদস্য মারা যায়। এ সময় পাকিস্তানি সেনা ইসমাইল হোসেন খানকে জীবিত ধরে ফেলি। একপর্যায়ে অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তেলিখালীর ভয়াবহ যুদ্ধে আমাদের বিজয় একটা বড় মাইলফলক হয়ে আছে। নিহত মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশের সীমান্তে সমাধিস্থ করা হয়। প্রতিবছর সে জায়গায় নির্মিত স্মৃতিসৌধে গিয়ে তাঁদের স্মরণ করি।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা